রবিবার, ৮ নভেম্বর, ২০২০

মার্গারেট মিচেল'এর ধারাবাহিক উপন্যাস : যেদিন ভেসে গেছে--বিশ পর্ব


অনুবাদ : উৎপল দাশগুপ্ত

অগাস্ট মাস শেষ হয়ে যাবার মুখে সেই উষ্ণ উত্তাল দিনগুলোর গোলাগুলি বর্ষণের শব্দ হঠাৎই একদিন থেমে গেল। শহর জুড়ে তখন এক ভীতিপূর্ণ নৈঃশব্দ। পাড়াপড়শিরা রাস্তায় বেরিয়ে অনিশ্চিতভাবে একে অন্যের দিকে তাকাত, এরপর কপালে কি আছে তা নিয়ে স্তি। কলরবমুখর দিনগুলোর পরে এই অস্বস্তিকর নীরবতা কারও মনের ভার লাঘব করতে পারল না, উলটে চাপ আরও বাড়িয়ে দিল। ইয়াঙ্কি দলের হঠাৎ চুপ মেরে যাবার কারণ কি সেটাই কারও মাথায় এল না। ট্রুপের ব্যাপারেও কোন খবর পাওয়া যাচ্ছিল না, শুধু ওর রেলপথ রক্ষা করার জন্য দলে দলে আরও দক্ষিণে পিছিয়ে এসেছে এইটুকুই জানা গেল। লড়াই কোথায় হচ্ছে – বা আদৌ লড়াই হচ্ছে কি না – আর লড়াই হয়েই থাকে সেটা কার প্রতিকূলে – এসব কিছুই জানা যাচ্ছে না। 

আজকাল যেটুকু খবর পাওয়া যায় সেটাও মুখে মুখে। কাগজ নেই, কালি নেই, খবরের কাগজ চালানোর মত লোকজনের অভাব – সংবাদপত্র ছাপানো বন্ধই হয়ে গেছে অবরোধের পর থেকে। মাঝে মাঝে ভয় জাগানো কোন উড়ো খবর দাবানলের মত শহরের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ছে। এই রকম থমথমে পরিস্থিতিতে উদ্বেল জনতা জেনারাল হুডের হেডকোয়ার্টারে গিয়ে খবরের জন্য ধর্ণা দিতে লাগল। টেলিগ্রাফ অফিসে, ডিপোতে গিয়ে সবাই খবরের প্রত্যাশায় ভিড় জমাল। ভাল খবরের প্রত্যাশায়, কারণ শেরম্যানের কামানের আওয়াজ বন্ধ হয়ে যাওয়া অনেকেই আশা করছে যে কনফেডারেটরা ইয়াঙ্কিদের তাড়িয়ে দিয়ে এখন ডাল্টনের পথ ধরে ওদের পিছনে ধাওয়া করছে। খবর কিছুই এলো না। টেলিগ্রাফ অফিস থেকে কোন প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেল না। দক্ষিণের একমাত্র অবশিষ্ট রেলপথের পরিসেবাও বন্ধ। তার ফলে ডাকব্যবস্থাও কার্যত বিচ্ছিন্ন। 

হঠাৎ নিস্তব্ধ হয়ে পড়া শহরে ধূলিমলিন দমবন্ধ করা গরম নিয়ে শরৎকাল এসে পড়ল। শহরবাসীর উদ্বিগ্ন হৃদয় আরও রুক্ষ শুষ্ক হয়ে পড়ল। টারার থেকে কোন খবর আসার অনন্ত প্রতীক্ষা নিয়ে অথচ মুখে একটা সাহসের ভাব বজায় রেখে স্কারলেট ভাবে অবরোধের সময় থেকে এক অন্তহীন কাল শুরু হয়েছে – যেন ও চিরটা কাল কামানের আওয়াজ শুনেই অভ্যস্ত – এখন এই নৈঃশব্দকে কেমন যেন অশুভ মনে হয়। কিন্তু এত সব ঘটে গেছে অবরোধ শুরু হবার মাত্র তিরিশ দিনের মধ্যে। তিরিশ দিনের অবরোধ! লাল মাটির রাইফেল পিট দিয়ে শহরটা ঘিরে রাখা আছে, একঘেয়ে কামানের আওয়াজ চলেছে বিরামহীন, অ্যাম্বুলেন্সের আর বলদের টানা গাড়ির লম্বা লাইন, শহরের ধুলোমাখা রাস্তায় আর হাসপাতালে রক্তের রেখা, কবর দেওয়ার লোকজনের আসা যাওয়া –ঠাণ্ডা হয়ে যাবার আগেই শরীরগুলো অগভীর গর্তের মধ্যে কোনক্রমে শুইয়ে দেওয়া! সবই মাত্র তিরিশ দিনে! 

আর ইয়াঙ্কিরা ডালটন থেকে দক্ষিণের চলে আসার পর মাত্র চার মাসই কেটেছে! মাত্র চার মাস! সেই দূরে চলে যাওয়া দিনগুলো মনে করে স্কারলেট ভাবে সে যেন গতজন্মের ব্যাপার! নাহ্‌ কিছুতেই হতে পারে না – চার মাস নয় – অনন্তকাল কেটে গেছে বলে মনে হয়। 

চার মাস আগে! মাত্র চার মাস আগেও ডালটন, রিসাকা, কেনেসও পাহাড় ও কেবল রেলপথ বরাবর কতগুলো জায়গার নাম বলেই জানত। আজ সেগুলো যুদ্ধক্ষেত্র, মরিয়া হয়ে লড়াই করবার জায়গা, নিরর্থক লড়াইয়ের ফলে জনস্টনকে অ্যাটলান্টার দিকে পিছিয়ে আসতে বাধ্য করেছিল! পীচট্রীর খাঁড়ি, ডেকাতূর, এজ়রা চার্চ, কিংবা উটয় খাঁড়ি আজ আর কোন মনোরম জায়গার সুন্দর সুন্দর নাম বলে মনে হয় না। আর কখনো এই সব জায়গাকে নিরিবিলি গ্রাম বলে ভাবতে পারবে না – যেখানে বন্ধু আর পরিচিতরা ওকে হাসি মুখে অভ্যররথনা জানাবে – সেই শ্যামল পরিবেশ যেখানে ও পিকনিক করতে গেছিল – অনেক সুপুরুষ অফিসারদের সাথে – ধীরে বয়ে চলা ছোট নদীর পাড়ে বসে! এই জায়গাগুলোও এখন যুদ্ধের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। সেই সবুজ ঘাসের ওপর – যেখানে ওরা বসেছিল – এখন সেখানে ভারী কামানের চাকার দাগ পড়ে গেছে – মরিয়া পায়ে পায়ে যুদ্ধে সেই ঘাস পদদলিত হয়েছে – যেখানে আহত হয়ে পড়ে গিয়ে অসীম যন্ত্রণায় মানুষ ছটফট করতে করতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে ..... 

সেই সব অলস ধীরগতি নদী এখন রক্তের রঙে লাল – জর্জিয়ার মাটির থেকেও বেশি লাল। পীচট্রীর খাঁড়ি তো, সবাই বলে, ইয়াঙ্কিরা যখন পেরিয়ে এসেছিল রক্তে লাল করে দিয়েছিল। এখন পীচট্রী খাঁড়ি, ডেক্যাটুর, এজ়রা চার্চ উটয় খাঁড়ি আর কোন জায়গার নাম নয়। আজ ওখানে অনেক বন্ধুর কবর, জলা ঘাসের ঝোপে কত শরীর পচে গলে যাচ্ছে – যাদের কবর দেওয়ার সময় হয়নি – যে সব জায়গা থেকে শেরম্যান অ্যাটলান্টাকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে হুডের বাহিনীকে আক্রমণ করেছিলেন আর প্রাণপণ লড়াই করে হুডের বাহিনী ওদের তাড়িয়ে দিয়েছিল। 

খবর শেষ পর্যন্ত এল – উদ্বেগে ব্যাকুল শহরবাসীর কাছে – খবরটা অবশ্য সুখের নয় – বিশেষ করে স্কারলেটের কাছে তো নয়ই। জেনেরাল শেরম্যান আবার শহরের চতুর্থ প্রবেশদ্বারে – জোন্সবোরোর রেলপথের ওপর, প্রচুর সৈন্যসামন্ত নিয়ে চড়াও হয়েছেন । কনফেডারেট সৈন্য যারা শহরের অন্যপ্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল, তারা ছুটে গেছে ওদের মোকাবেলা করার জন্য। এতদিনের নিস্তব্ধতার কারণ এখন বোঝা গেল। 

“জোন্সবোরোই কেন?” স্কারলেটের বুক ভয়ে কেঁপে উঠল – ওটা তো টারার একেবারে কাছে! “কেন ওরা বারবার জোন্সবোরোর ওপরই চড়াও হয়? রেলপথ আক্রমণ করার জন্য আর কোন জায়গা কি ওরা খুঁজে পায় না?” 

এক সপ্তাহ হতে চলল, টারা থেকে কোন চিঠি পায়নি। জেরাল্ডের যে ছোট্ট চিঠিটা শেষবার পেয়েছিল, সেটা ওকে আরও চিন্তায় ফেলে দিয়েছে। ক্যারীনের অসুখটা খারাপের দিকে যাচ্ছে, আর ওর শরীরটা মোটেই ভাল যাচ্ছে না। এখন তো কতদিনে নতুন চিঠি আসবে কেউ বলতে পারবে না – জানতেও পারবে না ক্যারীন বেঁচে আছে না মরে গেছে! ওহ্‌ অবরোধের আগেই যদি ও টারায় চলে যেতে পারত! – মেলানি যাক চাই না যাক! 

জোন্সবোরোতে লড়াই চলছে – অ্যাটলান্টায় এই খবরটা জানা ছিল। কিন্তু কি হচ্ছে না হচ্ছে সেটা জানা গেল না – আর পাগলের মত নানা রকম গুজব হাওয়া ভেসে আসতে লাগল। দুশ্চিন্তায় দুশ্চিন্তায় শহরের লোকের ঘুম চলে গেল। অবশেষে একজন ক্যুরিয়ারের মারফৎ জোন্সবোরো থেকে ভাল খবর এল। ইয়াঙ্কিদের তাড়িয়ে দেওয়া গেছে। কিন্তু যেতে যেতে ওরা জোন্সবোরোতে হামলা চালিয়ে ডিপো জ্বালিয়ে দিয়েছে, টেলিগ্রাফের তার কেটে দিয়ে গেছে আর প্রায় তিন মাইলের মত রেলপথ উপড়ে দিয়েছে। ইঞ্জিনিয়ারদের দল উদয়াস্ত সেগুলো মেরামতের কাজে লেগে রয়েছে,কিন্তু তাতেও সময় লাগবে কারণ ইয়াঙ্কিরা রেললাইনের তলার কাঠের পাটাতনগুলো উপড়ে আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিয়েছে। রেল লাইন গুলো তুলে নিয়ে সেই আগুনে ফেলে গরম করে দুমড়ে মুচড়ে টেলিগ্রাফের পোলে জড়িয়ে দিয়েছে – ঠিক মনে হচ্ছে এক একটা বিশাল আকারের কর্কস্ক্রু। এসময়ে নতুন লোহার রেল জোগাড় করা রীতিমত দুঃসাধ্য ব্যাপার। 

ইয়াঙ্কিরা টারায় যায়নি, শেষ পর্যন্ত। জেনারাল হুডের সংবাদ নিয়ে যে ক্যুরিয়ার এসেছিল, সেই স্কারলেটকে ভরসা দিল। লড়াইয়ের পরে জোন্সবোরোতে জেরাল্ডের সঙ্গে ওর দেখা হয়েছিল – ঠিক ওর অ্যাটলান্টা রওয়ানা হবার আগেই। জেরাল্ড একটা চিঠি স্কারলেটের হাতে দেবার জন্য অনুরোধ করেন। 

কিন্তু জোন্সবোরোতে বাপী কি করছেন? জবার দিতে গিয়ে তরুণ ক্যুরিয়ার একটু অস্বস্তিতে পড়ে গেল। জেরাল্ড একজন সেনাবাহিনীর ডাক্তারকে বাড়িতে নিয়ে যাবার জন্য খোঁজ করছিলেন। 

রৌদ্রে দাঁড়িয়ে ছেলেটাকে ধন্যবাদ জানানোর সময় স্কারলেট খুব দূর্বল বোধ করতে লাগল। নিশ্চয়ই এলেনের ডাক্তারিবিদ্যায় কুলোয়নি বলেই জেরাল্ড ডাক্তারের খোঁজে এসেছিলেন! তার মানে ক্যারীন নিশ্চয়ই মৃত্যুশয্যায়! লাল ধুলো উড়িয়ে ক্যুরিয়ার চলে যাবার পরেই কাঁপা হাতে জেরাল্ডের চিঠিটা স্কারলেট খুলে ফেলল। কাগজের অভাব এতই প্রকট যে জেরাল্ড এই চিঠিটা ওর আগের পাঠানো চিঠিটার লাইনের ফাঁকগুলোতে লিখেছেন। সেটা পড়া খুবই দুষ্কর ব্যাপার। 

“স্নেহের মামনি, তোমার মা আর দুই বোন সকলেই টাইফয়েডে শয্যাশায়ী। ওরা খুবই অসুস্থ, কিন্তু যাতে ওঁরা ভাল হয়ে ওঠেন, সেই প্রার্থনাই করছি। তোমার মা অসুস্থ হয়ে পড়ার সময় আমাকে পই পই করে বলে দিয়েছেন যে কোন মতেই যেন তুমি ওয়েডকে নিয়ে এখানে এসে অসুস্থ হয়ে না পড়। উনি তোমাকে আশীর্বাদ জানাচ্ছেন, আর ওঁর ভাল হয়ে ওঠার জন্য প্রার্থনা করতে বলেছেন।” 

“ওঁর ভাল হয়ে ওঠার জন্য প্রার্থনা করতে বলেছেন!” স্কারলেট সিঁড়ি বেয়ে ছুট্টে ওপরে নিজের ঘরে চলে গেল। বিছানার পাশে হাঁটু মুড়ে বসে করজোড়ে প্রার্থনা করতে লাগল। এত মন দিয়ে প্রার্থনা এর আগে ও কখনও করেনি। জপমালা ছাড়াই, বার বার একই কথা বলে যেতে লাগল, “হে ঈশ্বরের মাতা, ওঁকে নিয়ে নিও না! আমি এখন থেকে খুব ভাল হয়ে যাব, যদি তুমি ওঁকে না নাও! তুমি দয়া করে ওঁকে নিয়ে নিও না!” 

এর পরের এক সপ্তাহ, স্কারলেট ভয় পাওয়া পশুর মত বাড়ির এখানে ওখানে পায়চারি করে বেড়াল – খবরের জন্য উন্মুখ হয়ে – যে কোন আওয়াজ শুনলেই চকিত হয়ে ওঠে – ঘোড়ার পায়ের আওয়াজ শুনলেই অন্ধকারে নীচে নেমে যায় যখন সৈন্যরা এসে দরজায় করাঘাত করে – কিন্তু টারার কোন খবরই আসেনা। ওর আর টারার মাঝখানে ধূলিধূসর পঁচিশ মাইল পথটাই যেন পুরো পৃথিবীর পরিব্যাপ্তি নিয়ে আড়াল করে দাঁড়িয়েছে। 

চিঠিপত্রের যোগাযোগ এখনও বিঘ্নিত হয়েই রয়েছে – কনফেডারেটরা কোথায় কিংবা ইয়াঙ্কিরা কি ছক কষছে কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। শুধু এইটুকু জানা গেছে হাজার হাজার ধূসর আর নীল সৈন্য অ্যাটলান্টা আর জোন্সবোরোর মাঝামাঝি কোথাও রয়েছে। এক সপ্তাহের মধ্যে টারার কোন খবর পাওয়া যায়নি। 

টাইফয়েডের অনেক রুগীকে অ্যাটলান্টার হাসপাতালে দেখে অভুস্ত স্কারলেট জানে এক সপ্তাহে এই মারাত্মক রোগে কি হতে পারে। এলেন অসুস্থ, হয়ত মারা যাচ্ছেন – আর স্কারলেট অসহায় ভাবে মাত্র দুজন লোকের ওপর নির্ভর করে একজন অন্তঃসত্ত্বা মেয়ের দায়িত্ব নিয়ে বাড়ি থেকে দূরে পড়ে আছে। এলেন অসুস্থ – হয়ত মৃত্যুশয্যায়। কিন্তু এলেন তো অসুস্থ হতে পারেন না! উনি তো কখনও অসুস্থ হয়ে পড়েননি। কথাটা বিশ্বাস করাটাই যে কষ্ট – কথাটা যে স্কারলেটের নিরাপত্তার ভিতটাই নড়িয়ে দিচ্ছে! অসুস্থ সবাই হয়েছে, কিন্তু এলেন তো কখনও অসুস্থ হননি। এলেন অসুস্থ মানুষের সেবা করেছেন আর তাদের ভাল করে তুলেছেন! স্কারলেটের খুব বাড়ি চলে যেতে ইচ্ছে করছে। একটা শিশুর ভয়ব্যাকুল আর্তি নিয়ে বাড়ি যেতে চায়। 

বাড়ি! সেই প্রশস্ত সাদা রঙের বাড়ি যার জানলায় সাদা পর্দা ঝোলানো! বাড়ি মানে গুল্মের ঝোপ ঘিরে মৌমাছিদের আনাগোনা! বাড়ির সামনের চৌকাঠে কালো ছেলেটা হাঁস আর টার্কি ফুলের বাগান থেকে তাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে! মাইলের পর মাইল বিস্তৃত লালমাটিতে সাদা তুলোর ফুল সূর্যের আলোর ছোঁয়ায় ঝলমল করছে! সেটাই তো ওর বাড়ি! 

ইশ! অবরোধ শুরু হবার সঙ্গে সঙ্গেই ও যদি বাড়ি চলে যেত! যখন সবাই এই শহর ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছিল! মেলানিকেও নিরাপদেই নিয়ে যেতে পারত – তখনও হাতে সময় ছিল। 

“ওহ, মেলানিকে নিয়েই যত ঝামেলা!” হাজার বার মনে মনে বলল। “আন্ট পিটির সাথে ও তো ম্যাকনে চলে যেতেই পারত! ওটা তো ওর নিজের জায়গা – নিজের আত্মীয়-স্বজন – আমার তো তা নয়! আমার সঙ্গে তো ওর কোন রক্তের সম্পর্কই নেই! তাও কেন ও আমাকেই আঁকড়ে ধরে রেখেছে? ও ম্যাকনে চকে গেলে, আমি তো অনায়াসে বাড়িতে মায়ের কাছে চলে যেতে পারতাম! এখনও – এখনও সুযোগ পেলেই আমি চলে যেতে পারি – ইয়াঙ্কিদের পরোয়াও করি না – শুধু ওই বাচ্চাটার জন্যই ওর হাত পা বাঁধা! জেনারাল হুড নিশ্চয়ই আমার সঙ্গে একজন সঙ্গী দিতেন – এই জেনারাল হুড –উনি খুবই ভাল লোক – আমি জানি আমি ওঁকে একজন সঙ্গী আমার সাথে দেওয়াতে রাজী করিয়ে ফেলতাম – আর একটা শান্তির পতাকা – যাতে আমি লড়াইয়ের ময়দানের ভেতর দিয়ে নিরাপদে বেরিয়ে যেতে পারতাম! কিন্তু আমাকে তো বাচ্চাটার জন্য অপেক্ষা করতেই হবে! ও মা! মাগো! মরে যেওনা মাগো! ..... আচ্ছা বাচ্চাটা এখনও এসে পড়ল না কেন? আমি আজই ডঃ মীডের কাছে জিজ্ঞেস করব – বাচ্চাটা আগে আগে নিয়ে আসার কোন রাস্তা আছে কি না – যাতে আমি বাড়ি চলে যেতে পারি – অবশ্য একজন সাথী পেলে। ডঃ মীড বলছিলেন ওর সঙ্কট হতে পারে! হে ভগবান! যদি ও মরে যায়! মেলানি মারা গেল! ধরা যাক ও মারা গেল! আর অ্যাশলে – না আমি এরকম কথা ভাবব না – এরকম ভাবাটা ভাল নয়! কিন্তু অ্যাশলে – আমি এটাও ভাবব না – কারণ হয়ত ও বেঁচেই নেই! কিন্তু ও আমার কাছ থেকে কথা নিয়ে নিয়েছিল – আমি মেলানির যত্ন করবে। যদি আমি যত্ন না নিই – আর ও মারা যায় আর অ্যাশলে যদি বেঁচে থাকে – না আমি কিছুতেই এসব কথা ভাবব না। আর আমি ঈশ্বরকে কথা দিয়েছি যে আমি ভাল হয়ে যাব – যদি উনি আমার মা’কে না তুলে নেন … ওহ বাচ্চাটা এসে গেলেই পারে! আমি এখান থেকে যেতে পারলে বাঁচি – বাড়ি যেতে পারলে – যে কোন জায়গায় যেতে পারলে – এই জায়গাটা ছাড়া!” 

থমথমে, নিস্তব্ধ শহরটাকে স্কারলেট ঘৃণা করতে শুরু করেছিল – এক সময় যে শহরটাকে ও ভালবাসত। অ্যাটলান্টা আগের মত কলরবমুখর – উদ্দীপনাময় শহর আর নেই। অবরোধের পরের গোলাবারুদের প্রাণ কাঁপানো আওয়াজের পরে এই নিস্তব্ধতায় মনে হচ্ছে এক বিশাল মহামারীর পরে শহরটা যেন ধুঁকছে। গোলাবারুদের আওয়াজ আর ধোঁয়ার মধ্যে তবু এক ধরণের উত্তেজনা ছিল। এখনকার স্তব্ধতা ভয়াবহ। ভুতে পাওয়া শহর – অনিশ্চয়তা, ভয় আর স্মৃতি সবাইকে তাড়া করে ফিরছে। সবার চোখেমুখে উদ্ভ্রান্ত দৃষ্টি। যে ক’জন সৈন্যকে স্কারলেট শহরে ঘোরাফেরা করতে দেখতে পায় – সবাইকে খুব ক্লান্ত দেখায় - শেষ অঙ্কে হার মেনে নেবার প্রস্তুতি নিয়ে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। 

অগাস্ট মাসের শেষ দিন। নির্ভরযোগ্য খবর পাওয়া গেল যে লড়াই চলছে – অ্যাটলান্টায় যুদ্ধের পরে আবার মরণপণ লড়াই। দক্ষিণের কোন জায়গায়। যুদ্ধের গতির মোড় ঘুরে যাবার আশঙ্কায় অ্যাটলান্টাবাসী হাসতে কিংবা নিজেদের মধ্যে রসিকতাটুকু পর্যন্ত করতে ভুলে গেল। সেনাবাহিনী যেটা অন্তত দু’সপ্তাহ আগেই বুঝতে পেরেছিল, শহরবাসীও এখন জেনে গেছে যে যুদ্ধ এখন শেষ হবার মুখে – ম্যাকনের রেলপথ যদি বেদখল হয়ে যায় তাহলে অ্যাটলান্টার পতন অনিবার্য। 

সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম দিনে এক দমবন্ধ করা ভয় নিয়ে স্কারলেটের ঘুম ভাঙ্গল – যে ভয়টা বুকের মধ্যে নিয়েই আগের দিন রাত্রে ঘুমোতে গেছিল। ঘুমের ঘোরে মনে মনে বলল, “কাল রাতে ঘুমোতে যাবার আগে কি নিয়ে যেন আমার দুশ্চিন্তা হচ্ছিল? ও হ্যা, মনে পড়েছে! যুদ্ধ নিয়ে। কাল কোথায় যেন খুব লড়াই হচ্ছিল। কিন্তু জিতল কারা?” চোখ কচলে ও উঠে বসল। কালকের ভয় আবার ওর মনে চেপে বসল। 

এই ভোরবেলাতেও কেমন যেন গুমোট ভাব – বেশ গরম – এক তপ্ত মধ্যাহ্নের আভাস দিচ্ছে – ঝকঝকে নীল আকাশ – আর নির্দয় সূর্যের গনগনে তাপ। বাইরে রাস্তায় কোন সাড়াশব্দ নেই। ওয়াগনের চলে যাবার শব্দ নেই। সেনাবাহিনীর পায়ে পায়ে লাল ধুলো ওড়ার সম্ভাবনা নেই। প্রতিবেশীদের রান্নাঘর থেকে নীগ্রোদের অলস কথাবার্তার আওয়াজ নেই। ব্রেকফাস্ট তৈরির আওয়াজটুকুও পাওয়া যাচ্ছে না। কারণ মিসেজ় মীড আর মিসেজ় মেরিওয়েদার ছাড়া সকলেই ম্যাকনে চলে পালিয়ে গেছেন। এমন কি বাড়ির মধ্যে থেকেও কোন আওয়াজ শোনা যাচ্ছে না। দূরে দোকানপাটও সব বন্ধ। সেই সব দোকানপাটের মালিকরা রাইফেল নিয়ে শহরের বাইরে কোথাও না কোথাও দাঁড়িয়ে আছে। 

গত এক সপ্তাহের তুলনায় আজকের এই নিস্তব্ধতা আরও বেশি করে দুঃসহ মনে হচ্ছে। আড়মোড়া কেটে ও তাড়াতাড়ি বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ল। কোন প্রতিবেশীর চেহারা দেখতে পাওয়ার আশায় জানলার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। যদি কোন দৃশ্য দেখে মনটাকে একটু প্রফুল্ল করা যায়। রাস্তায় কোন লোকজন নেই। গাছের পাতাগুলো এখনও গাঢ় সবুজ, কিন্তু লাল ধুলোর আস্তরে ঢেকে রয়েছে। লক্ষ্য করল সামনের ফুলের ঝোপ অনাদৃত হয়ে পড়ে রয়েছে একরাশ বিষণ্ণতার বোঝা নিয়ে। 

দাঁড়িয়ে থাকতে ওর কানে অনেক দূর থেকে হালকা একটা বাজ পড়ার শব্দ ভেসে এল – যেন কোন আসন্ন ঝঞ্ঝার পূর্বাভাষ। 

“বৃষ্টি হবে,” ওর মনে হল, তারপর ওর পল্লীঅঞ্চলে লালিত সংস্কার থেকে ভাবল, “হ্যা এখন একটু বৃষ্টি হওয়া খুব দরকার।” কিন্তু পরের মুহুর্তেই মনে হল, “বৃষ্টি! না বৃষ্টি মনে হচ্ছে না তো! কামানের আওয়াজ!” 

ওর বুক দুরদুর করে উঠল। জানলা থেকে ঝুঁকে পড়ে কান খাড়া করে আওয়াজটা কোন দিকে আসছে বুঝতে চাইল। আওয়াজটা এত দূর থেকে আসছে যে প্রথমে ঠাহর করতে পারল না। “ভগবান, আওয়াজটা ম্যারিয়েটার দিক থেকে আন!” ও মনে মনে প্রার্থনা করতে শুরু করল। “অথবা ডিক্যাটুরের দিক থেকে! অথবা পীচট্রী খাঁড়ির দিক থেকে! দক্ষিণ দিক থেকে যেন কোনমতেই না আসে! দক্ষিণ দিক থেকে কোনমতেই না!” শকত হাতে জানলার কবাট ধরে ও কান সজাগ করে আওয়াজটা শোনার চেষ্টা চালিয়ে যেতে লাগল। আস্তে আস্তে আওয়াজটা বাড়তে লাগল। ওটা দক্ষিণ দিক থেকেই আসছে। 

দক্ষিণ দিক থেকে কামানের আওয়াজ? ওদিকেই তো জোন্সবোরো – তার মানেই টারা – তার মানেই এলেন! 

ইয়াঙ্কিরা হয়ত এখন – এই মুহুর্তেই – টারাতে! ও আবার কান পেতে শোনার চেষ্টা করল – কিন্তু দূর থেকে ভেসে আসা ফায়ারিংএর আওয়াজ ভালো মতই শোনা যাচ্ছে। না ওরা কিছুতেই এখনও জোন্সবোরোতে যেতে পারেনি! অত দূরে যদি চলে গিয়েই থাকে, তাহলে আওয়াজটা আরও অস্পষ্ট শোনাবে। তবে ওরা নিশ্চয়ই জোন্সবোরোর দিকে আরও দশ মাইল এগিয়ে গেছে – বোধহয় রাফ অ্যাণ্ড রেডির বসতির কাছাকাছি চলে গেছে! কিন্তু রাফ অ্যাণ্ড রেডি থেকে জোন্সবোরো তো মাত্র দশ মাইল দক্ষিণে! 

দক্ষিণ দিক থেকে কামানের আওয়াজ – মানে অ্যাটলান্টার পতনের ঘন্টা বাজতে শুরু করেছে! স্কারলেটের কাছে দক্ষিনে লড়াই মানে টারার কাছে লড়াই – ওর মায়ের নিরাপত্তা নিয়ে এক রাশ দুশ্চিন্তা। অশান্তভাবে পায়চারি করতে করতে এর পরিণতি ওর কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠতে লাগল – প্রথমবার – ধূসরবাহিনী লড়াইতে হেরে যেতে বসেছে। অবরোধ, গুলির আওয়াজ, ঝনঝন করে জানলার কাঁচ ভেঙ্গে পড়া অন্নজলের আর পোশাকের অনটন, , মুমুর্ষু মানুষের আর্তনাদ – কোন কিছুই স্কারলেটকে যুদ্ধের ভয়াবহতা সম্বন্ধে আতঙ্কিত করতে পারেনি, যতখানি শেরম্যানের বাহিনীর টারার কাছাকাছি চলে যাওয়ায় আজ আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে। টারার মাত্র কয়েক মাইলের মধ্যে শেরম্যানের বাহিনী! যদি ওরা হেরেও যায়, তাহলেও তো ওরা টারায় চলে যেতে পারে! তিন তিনটে অসুস্থ মহিলাকে নিয়ে জেরাল্ড কি কোথাও পালাতে পারবেন? 

ওহ্‌ ও যদি এই মুহুর্তে ওখানে থাকতে পারত! ইয়াঙ্কিরা থাকলেও কিছু এসে যায় না! জোরে জোরে পায়চারি করতে গিয়ে যত ওর রাতের পোশাক পায়ে জড়িয়ে যেতে লাগল ততই ওর চিত্তচাঞ্চল্য বাড়তে লাগল। ও বাড়ি চলে যেতে চায়। ও এলেনের কাছে থাকতে চায়। 

নীচে রান্নাঘর থেকে কাপ ডিশ নাড়াচাড়ার শব্দ পেল; প্রিসি ব্রেকফাস্ট বানাচ্ছে। কিন্তু মিসেজ় মীডের বেটসির সাড়াশবচ পেল না। প্রিসির খনখনে গলায় ভেসে এলো, “Jes’ a few mo’ days of tote de wee-ry load ……” গানটা স্কারলেটের মনের অস্বস্তি বাড়িয়ে দিল; গানের বেদনাবিধুর কথাগুলো ওর আতঙ্ক বাড়িয়ে দিল। গায়ে একটা র‍্যাপার জড়িয়ে ও বড় বড় পা ফেলে হলে এসে পেছনের সিঁড়ির কাছে এসে হাঁক লাগাল, “ বন্ধ কর্‌, – এক্ষুণি বন্ধ কর্‌ গানটা প্রিসি!” 

নীচে থেকে “আচ্ছা ম্যাডাম” বলে গোমড়া জবাব শুনতে পেল। হঠাৎ লজ্জা পেয়ে একটা বড় শ্বাস নিল। 

“বেটসি কোথায়?” 

“জানি না। ও আসেনি।” 

স্কারলেট মেলানির দরজার সামনে গিয়ে অল্প একটু ফাঁক করে রোদের আলোয় ঝলমল করা ঘরে উঁকি মারল। রাত্রিবাস পরে মেলানি চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে। চোখের তলায় কালির বৃত্ত। পানপাতার মত মুখটা ফুলে গেছে। রুগ্ন শরীরটা উৎকট আর বেঢপ লাগছে। স্কারলেটের খুব ইচ্ছে হল অ্যাশলে ওর এই চেহারাটা একবার দেখুক। যত গর্ভবতী মহিলা স্কারলেট দেখেছে, তাদের সবার থেকেই ওকে অনেক বেশি খারাপ দেখাচ্ছে। যখন স্কারলেট ওর দিকে তাকিয়ে দেখছিল তখন মেলানি চোখ মেলে চাইল, ঠোঁটের কোনে উষ্ণ হাসি নিয়ে। 

“এসো,” একটু বেখাপ্পাভাবে পাশ ফিরে, ওকে আহ্বান জানাল। “সকাল হতে না হতেই ঘুম ভেঙ্গে গেছে। ভাবছিলাম। স্কারলেট, তোমার কাছে একটা কথা জানতে চাই।” 

স্কারলেট ঘরে ঢুকে বিছানার ওপর বসে পড়ল। সূর্যের প্রখর আলো বিছানার ওপর এসে পড়েছে। 

হাত বাড়িয়ে মেলানি স্কারলেটের হাত তুলে নিল – পরম নির্ভরতার সাথে। 

“সোনা,” ও বলে উঠল, “কামানের আওয়াজের জন্য আমার এত খারাপ লাগছে। জোন্সবোরোর দিক থেকে আসছে – তাই না?” 

স্কারলেট অস্ফুটে “হুম্‌” বলে উঠল। কথাটা মনে পড়ে যেতেই অস্বস্তিটা আবার ফিরে এল। 

“আমি বুঝতে পারি, কত দুশ্চিন্তার মধ্যে তুমি দিন কাটাচ্ছ! আমি জানি, তুমি তোমার মায়ের কথা জেনে গত সপ্তাহেই বাড়ি চলে যেতে – শুধু আমার জন্য পারোনি। ঠিক কি না?” 

খুব অভদ্রভাবে স্কারলেট বলল, “হ্যা।” 

“স্কারলেট, সোনা, তুমি আমার জন্য কত কিছু করছ! আমার নিজের বোন থাকলেও এত কিছু করত না – এত সাহসও থাকত না। এজন্যই আমি তোমাকে এত ভালবাসি। বাধা হয়ে দাঁড়ানোর জন্য আমার খুব খারাপ লাগছে!” 

স্কারলেট একদৃষ্টে ওকে দেখল। ওকে ভালবাসে! সত্যি! কি বোকা! 

“আর স্কারলেট, শুয়ে শুয়ে আমি ভাবছিলাম – আমার তোমার কাছ থেকে একটা জিনিষ চাইবার আছে!” ও স্কারলেটের হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল। “যদি – যদি আমি মরে যাই, আমার সন্তানকে – তুমি কি ওকে নেবে?” 

মেলানির চোখ প্রত্যাশায় উজ্জ্বল হয়ে উঠল। 

“নেবে?” 

স্কারলেট ভয় পেয়ে এক ঝটকায় হাতটা ছাড়িয়ে নিল। ভয়ে ওর গলার আওয়াজ কর্কশ হয়ে উঠল। 

“এমন বোকার মত কথা বোলো না, মেলি। তুমি মোটেই মরে যাচ্ছ না। প্রথম সন্তানের সময় সব মেয়েই ভাবে যে ও মরে যাবে। আমিও ভেবেছিলাম।” 

“না তুমি কখনও ভাবনি। তুমি কোন কিছুতেই ভয় পাওনা। তুমি শুধু আমাকে সাহস দেবার জন্য এসব বলছ! মরতে আমি ভয় পাইনা – শুধু বাচ্চাটার জন্য ভয় হয়! যদি অ্যাশলে – স্কারলেট তুমি আমাকে কথা দাও – আমি মরে গেলে তুমি ওকে নিয়ে নেবে। তাহলে আমার ভয় করবে না। আন্ট পিটিপ্যাটের অনেক বয়স হয়ে গেছে – একটা বাচ্চা মানুষ করার জন্য। হানি আর ইণ্ডিয়াও খুব ভাল – কিন্তু আমি – আমি চাই তুমিই আমার বাচ্চাকে নাও! কথা দাও স্কারলেট। যদি ছেলে হয়, তাহলে ওকে অ্যাশলের মত করে মানুষ কোরো – আর যদি মেয়ে হয় – আমি চাইব যে ও তোমার মত হোক।” 

“অলক্ষুণে কথা যত সব!” স্কারলেট বিছানা থেকে ছিটকে উঠে পড়ল। “একে তো হয়রানির শেষ নেই, তার ওপর আবার তুমি মরে যাওয়ার কথা বলে ঘ্যান ঘ্যান শুরু করলে!” 

“সত্যিই আমি খুব দুঃখিত। কিন্তু তুমি আমাকে কথা দাও – মনে হচ্ছে ও আজই এসে পড়বে। না না আমি বুঝতে পারছি – আজই ও আসছে। কথা দাও!” 

বিহ্বল চোখে মেলানির দিকে তাকিয়ে ও বলে ফেলল, “ঠিক আছে কথা দিলাম।” 

মেলানিটা কি এতই বোকা – ও বুঝতেই পারে না যে ও অ্যাশলেকে ভালবাসে? না কি জানে বলেই ও ভাবে যে স্কারলেট অ্যাশলের সন্তানেকে ভাল ভাবে মানুষ করবে? এক মুহুর্তের জন্য ওর প্রবল ইচ্ছে হল চেঁচিয়ে মেলানিকে জিজ্ঞেস করে, কিন্তু মেলানি ওর হাতটা আবার তুলে নিয়ে নিজের গালে ঠেকাল – তখন ওর প্রশ্ন ঠোঁটেই রয়ে গেল। ওর চোখে চাউনিতে গভীর প্রশান্তি। 

“আজই হবে – সেটা কি করে বুঝতে পারলে, মেলি?” 

“সকাল থেকেই একটা ব্যাথার অনুভুতি – তবে খুব বেশি নয়।” 

“তাই নাকি? আমাকে ডাকনি কেন? প্রিসিকে পাঠিয়ে ডঃ মীডকে ডাকিয়ে আনতাম।” 

“ওটা কোরো না, স্কারলেট। জানোই তো রুগী নিয়ে উনি কত ব্যস্ত – সবাই কত ব্যস্ত রয়েছেন! একটু শুধু খবর পাঠিয়ে দাও, আজ কখনও ওঁকে আমাদের দরকার পড়তে পারে। আর মিসেজ় মীডের কাছেও খবর পাঠাও – উনি এসে আমার কাছে বসতে পারবেন। উনি বুঝতে পারবেন ঠিক কখন ডাক্তারকে ডাকার দরকার পড়বে।” 

“এত বেশি নিঃস্বার্থ হোয়ো না! তুমি ভাল করেই জান, হাসপাতালের অন্য সবার মত তোমারও একজন ডাক্তার দরকার! আমি এখনই ওঁকে খবর পাঠাচ্ছি।” 

“প্লীজ় স্কারলেট, পাঠিওনা। কখনো কখনো সারাদিন লেগে যায় – আমি কিছুতেই ওঁকে সারাদিন এখানে বসিয়ে রাখতে পারব না। বেচারা রুগীদের ওঁর জন্য হাপিত্যেশ করে থাকতে হবে। শুধু মিসেজ় মীডকে আসতে বল। উনি ঠিক বুঝবেন।” 

“ঠিক আছে, তাই হবে।“ স্কারলেট হাল ছেড়ে দিয়ে বলল।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন