মঙ্গলবার, ১২ জানুয়ারী, ২০২১

কল্পবিজ্ঞান লেখক রে ব্র্যাডবারির পূর্বস্মৃতি


মঙ্গল, আমাকে বাড়ি নিয়ে যাও

অনুবাদ : 
এমদাদ রহমান

[মৃত্যুর কয়েকদিন আগে, ২০১২ সালের ২৮ মে, দ্য নিউইয়র্কারে রে ব্র্যাডবারির এই লেখাটি ছাপা হয়েছিল।] 

আমার বয়স যখন সাত বা আট বছর ছিল, তখনই ইলিনয়ের ওয়াকেগানে আমার দাদা-দাদি'র পুবোনো বাড়িতে অতিথিদের নিয়ে আসা কল্পবিজ্ঞানের ম্যাগাজিনগুলো পড়তে শুরু করি। সেই বছরগুলো ছিল এমনই ভরপুর যখন হুগো গার্নসব্যাক বিস্ময়কর গল্পগুলো প্রকাশ করছেন, আর এমন সব আশ্চর্য রঙে বিভায় আর রেখায় সেসব গল্পের ছবি আঁকছেন, যেসব আমার ক্ষুধার্ত এবং তৃষ্ণার্ত কল্পনাশক্তিকে উস্কে দিচ্ছিল, উজ্জীবিত করছিল। এর মধ্যেই, ১৯২৮-এ যখন বাখ রজার্স হাজির হলেন, আমার মধ্যে সৃষ্টির কীটপতঙ্গগুলো কিলবিল করতে শুরু করে দিল, হ্যাঁ, সেটা ১৯২৮-ই ছিল, আর মনে আছে আমি সেই শরৎকালে উন্মাদ হয়ে যাচ্ছিলাম পড়ার আনন্দে। যে-তীব্রতার সঙ্গে গল্পগুলো আমি পড়ছিলাম, তাকে বর্ণনা করার একমাত্র উপায় হলো এই একটি শব্দ- উন্মাদ। পরবর্তী জীবনে এমন পাগলপারা উন্মাদনা আপনার খুব কমই ঘটবে যখন আপনার দিনগুলো রাতগুলো এমন অদ্ভুত আচ্ছন্ন করা কল্পনা আর আবেগে পূর্ণ থাকবে না।

এখন যখন পেছন ফিরে তাকাই, সেই দিনগুলোয় ফিরে যাই বা রোমন্থন করি ঠিক তখনই আমি বুঝতে পারি যে সেই সময়ের পাগলামিকে আমার বন্ধুরা এবং স্বজনেরা কীভাবে দেখেছিলেন! সে ছিল একের পর এক মরিয়া হওয়ার উল্লাস, উল্লাসের পর এক একটি কল্পনার হিস্টিরিয়া, তারপর উদ্দীপনা, তারপর এভাবে একের পর অদ্ভুত সব ব্যাপার! আমি চিৎকার করতে থাকতাম, আবিরাম ছুটতে থাকতাম, কোথাও আমার বিন্দুমাত্র স্থিরিতা ছিল না; তার পেছনে একটাই মাত্র কারণ ছিল- শেষ হয়ে যাওয়ার ভয়। কেবলই মনে হতো যে জীবন বুঝি আজকের সন্ধ্যাতেই শেষ হয়ে যাবে। সব স্তব্ধ হয়ে যাবে।

আমার জীবনের পরের উন্মাদনাপর্বটি আসে ১৯৩১-এ, যখন এ্যাডগার রাইস বারোজের 'টারজান' অবলম্বনে হ্যারল্ড ফস্টার রবিবারের জন্য রঙিন সিরিজটি শুরু করেন; এবং একই সঙ্গে আমি আমার চাচার বিওন্স হাউজে 'জন কার্টার অফ মার্স' সিরিজের বইগুলি আবিষ্কার করি। আমি নিশ্চিত যে আমার পক্ষে কোনও ভাবেই 'মার্টিয়ান ক্রনিকলস' লেখা সম্ভব হতো না, যদি বারোজ আমার ওপর সেই সময়ে প্রভাব না ফেলতেন।

আমি 'জন কার্টার' এবং 'টারজান'-এর সিরিজগুলো মুখস্থ করে ফেলেছিলাম, দাদুবাড়ির সামনে লনে বসে যে শুনতে চাইতো তাকেই গল্পগুলি বলতে পারতাম। বারবার। পুনরাবৃত্তির কোনও ক্লান্তি আমার ছিল না। গ্রীষ্মের রাতগুলোয় বাড়ির সামনে সেই লন থেকে মঙ্গলের লাল আলোকে- আমাকে নিয়ে যাও!; তোমার বাড়ি যাব। আমাকে বাড়ি নিয়ে চলো। আমি উড়ে চলে যেতে চাই ঠিক সে জায়গাটিতে যেখানে পৃথিবীর প্রাচীন শহরগুলির দিকে মৃত-সমুদ্রের ওপর দিয়ে অদ্ভুত ধুলোরা উড়ে যেতে থাকে।

আমি যখন পৃথিবীতে বেড়াতে এসে আটকে গিয়েছিলাম, তখন আমি টাইম-ট্রাভেল করতাম, বড়দের কথাবার্তা শুনতাম, তারা উষ্ণ রাতের বেলা বাড়ির লন এবং গাড়িবারান্দায় কথা বলছেন, যার সবই পূর্বস্মৃতি। তাদের পূর্বস্মৃতিতে আমার টাইম ট্রাভেল চলতো; কোথাকার মানুষ কোথায় কোথায় কোথায় ভেসে চলেছে! চতুর্থ জুলাই, আমাদের স্বাধীনতা দিবসের শেষে, চাচাদের সিগারেট হাতে দার্শনিক আলোচনা শেষে, খালামণি, ভাগ্না ভাগ্নি আর চাচাত ভাইদের আইসক্রিম আর লেমনেড শেষ হতে আতশবাজি পোড়াতে পোড়াতে আমরা ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। রাতের এই সময়টা বিশেষ সময়, দুঃখের সময়, 'দ্য টাইম অফ বিউটি'। সৌন্দর্যের সময়। ফানুস ওড়ানোর সময়।

এমনকি সেই বয়সে আমি সবকিছু যে এক সময় শেষ হয়ে যায় বুঝতে শিখেছিলাম, এই যেমন ফানুসের মনোরম কাগজের আলো! আমি আমার দাদাকে চিরদিনের জন্য হারিয়েছিলাম, আমার মাত্র পাঁচ বছর বয়সে। তার জীবন শেষ হয়ে গিয়েছিল। যিনি পৃথিবীর মঙ্গলের জন্য চিরতরে চলে গিয়েছিলেন। দাদার সঙ্গে আমার অন্তরঙ্গ স্মৃতিকে আমি ভুলতে পারিনি : গাড়ি বারান্দার সামনের লনে আমরা দু'জন, আমাদের দিকে তাকিয়ে আছেন আমাদের বিশজন স্বজন; কাগজের ফানুসটি আমাদের মাঝে একটি চূড়ান্ত উত্তেজনাকর মুহূর্তের জন্য রাখা হয়েছে- ফানুসটি, যাকে আকাশ লণ্ঠন করে আমাদের সকলের উষ্ণ নিঃশ্বাসে ভরে উড়িয়ে দিতে আমরা প্রস্তুত!

দাদাকে সেই বাক্সটি বহন করতে সাহায্য করলাম, যার মধ্যে ছিল ফানুস তৈরির হালকা টিস্যু কাগজ যাতে করে ফানুসের মধ্যে তার আত্মাটিকে ভরে দেওয়া যায় আর সে ধীরে ধীরে শ্বাস নিতে শুরু করল। এবার সে হালকা হয়ে উড়ে যেতে সক্ষম হবে আর মধ্যরাতের আকাশের দিকে অদম্য উড়তে থাকবে। দাদা ছিলেন ঋত্বিক আর আমি তার সাহায্যকারী। আমি বাক্স থেকে লাল-সাদা-নীল কাগজ বের করতে সাহায্য করলাম, আর দেখতে লাগলাম দাদা শুকনো খড় দেওয়া একটা বাটিতে আগুন দিলেন। একবার যখন আগুন জ্বলতে শুরু করে, ফানুসটি নিজে থেকেই ফিসফিসিয়ে কিছু একটা বলতে বলতে বড় হতে থাকে, তার ভেতরটা গরম বাতাসে পূর্ণ হয়ে যায়, আর সে উড়ে চলে মহাশূন্যের দিকে।

তবে আমি তাকে উড়ে যেতে দিইনি। দিতে পারিনি। ধরে রেখেছিলাম। ফানুসটি এতো সুন্দর ছিল, তার ভেতরে আলো ও ছায়া আনন্দে নৃত্য করছিল! কেবল দাদা যখন আমার দিকে তাকালেন, একটু মাথা ঝুঁকিয়ে নীরবে কিছু বললেন, কেবল তখনই আমি ফানুসটিকে বাতাসে উড়িয়ে দিলাম আর সে শেষ পর্যন্ত সমবেত স্বজনদের মুখ আলোয় রাঙিয়ে বারান্দার ওপর দিয়ে উঠে যেতে লাগলো। আলোকিত করে বারান্দা পেরিয়ে বেলুনটিকে মুক্ত করে দিতে পারি? ফানুসটি আপেল গাছের ওপরে, ঘুমন্ত শহরের ওপরে অবিরাম চলে যেতে লাগলো আর রাতভর সে আকাশের দিকে যেতে যেতে একটা তারার মতো হয়ে গেল।

আমরা কমপক্ষে দশ মিনিট দাঁড়িয়ে তাকে দেখলাম, যতক্ষণ না তাকে দেখতে পাই; ততক্ষণে আমার কান্নার জল গড়িয়ে পড়ছিল, দাদা আমার দিকে তাকাচ্ছিলেন না। শুধু কান্নায় ভারি হয়ে আসা গলায় বারকয়েক কাশলেন, মাটি ঘষলেন পা দিয়ে, আত্মীয়স্বজনরা একে একে চলে যেতে লাগলেন। কেউ আমার চোখ মুছিয়ে দিতে দিতে রঙিন কিছু পটকা উপহার দিলেন। শেষ রাতে স্বপ্নে দেখলাম ফানুসটি ফিরে এসেছে, জানালার কাছে স্থির হয়ে আছে!

পঁচিশ বছর পরে, আমি লিখলাম 'দ্য ফায়ার বেলুনস' গল্পটি, যে-গল্পে ছিল এমন কয়েকজন ঋত্বিকের কথা যারা ঈশ্বরের চমৎকার সৃষ্টিগুলোকে দেখতে মঙ্গলে শোভাযাত্রায় গিয়েছিলেন। মঙ্গলে সৃষ্টিসন্ধানের এই গল্পটি ছিল গ্রীষ্মের সেইসব দিনগুলোর প্রতি আমার শ্রদ্ধাঞ্জলি যখন আমার দাদা বেঁচে ছিলেন। গল্পের ঋত্বিকদের একজন দেখতে ছিলেন অবিকল আমার দাদার মতো, যাকে আমি মঙ্গলে পাঠিয়েছিলাম সেই সুন্দর ফানুসগুলোকে দেখে আসার জন্য...
সে দিনগুলো পৃথিবী থেকে চিরতরে হারিয়ে গেছে। হারাতে হারাতে তারা সব উজ্জ্বল হতে হতে পৃথিবীর প্রাচীন শহরগুলির দিকে মৃত-সমুদ্রের ওপর দিয়ে উড়ে চলেছে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন