মঙ্গলবার, ১২ জানুয়ারী, ২০২১

করোনাকালের গল্প : মাস্কের দৈববাণী



মূল: নেল রোজ 
অনুবাদ : ফজল হাসান


এ কাজটি মাস্কই করেছে । 

কোন আবদ্ধ জায়গায় আটকে থাকলে আমি সব সময় আতঙ্কে থাকি । সুতরাং আচম্বিতে মুখোশ পড়া লোকজন দেখলে আমার বুকের ভেতর ধুকপুকানী এবং উদ্বেগ বেড়ে যায় । 

কেউ কেউ মেডিকেলের সাধারণ মাস্ক পড়েছে এবং বাকিরা প্লাসটিকের মাস্ক পড়ে মুখমন্ডলের পুরোটাই ঢেকে রেখেছে । তবে সেসব মাস্কের মধ্যে দেখার জন্য চোখের সামনে ছিদ্র রয়েছে । 

ভয়ানক, অস্বস্তিকর এবং রীতিমতো ভয়ঙ্কর । 

আমি গভীর শ্বাস নেই এবং চতুর্দিকে তাকাই । 

আমি কোন নরকে আছি? 

নাকি আমি আদৌ নরকে ছিলাম? 

দূরে আগুণের লেলিহান শিখা ভীষণ বেগে উপরের দিকে উঠে যাচ্ছে । অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেনের সঙ্গে পুলিশ গাড়ীর হর্ণ মিলে আমার কানের পর্দা ফাটিয়ে দিচ্ছিল । 

কিছু মানুষ দৌঁড়াতে শুরু করে এবং অন্য পথচারীরা বৃত্তের চতুর্দিকে উদ্দেশ্যহীন ভাবে হাঁটতে থাকে । 

তাদের চোখে হতাশার চিহ্ন ফুটে আছে এবং তাদের সেই চাহনির দিকে দৃষ্টি পড়তেই আমার শিরদাঁড়া বেয়ে একটা হিম স্রোত নিচে নেমে যায় । 

আমি বৃত্তের মতো ঘুরতে থাকি এবং বেপোরোয়া ভাবে খুঁজতে থাকি কোথায় আছি । 

কিন্তু কোন কিছুই আমার কাছে পরিচিত মনে হয় না । 

অকস্মাৎ বিরক্তিকর শব্দ এসে আমার কানে আঘাত হানে । 

বাড়ি যাও! ঘরের ভেতর থাকো! অবশ্যই এখন তোমাকে রাস্তা ছেড়ে চলে যেতে হবে । খুব তাড়াতাড়ি ছড়িয়ে পড়ছে । আমরা থামাতে পারছি না । এক্ষুনি বাড়ি যাও! 

উদ্ভ্রান্তের মতো আমি দৌঁড়াতে শুরু করি, কিন্তু জানি না কোথায় যাবো । 

তবে আমি জানি. নিজেকে রক্ষা করার জন্য আমার একটা কিছু অথবা কাউকে খোঁজা দরকার । কিন্তু এত মানুষের আতঙ্কিত মুখ আমার মন অন্য দিকে ধাবিত করতে পারেনি । 

প্লাস্টিকের পেছনে তাদের কালো চোখ । তখনও ভয়ে জ্বলজ্বল করছিল । 

তারপর আমার মনে পড়ে । 

জেনিস, আমার মেয়ে । 

আমি কেমন করে ওকে ভুলতে পারি? আমাকে বাড়ি পৌঁছুতে হবে এবং চটজলদি । 

কিন্তু আমার পা দেখে মনে হচ্ছিল তারা যেন কোন কিছুর মধ্য দিয়ে দৌঁড়াচ্ছে । 

আমি দৌঁড়াই এবং আরো দ্রুত দৌঁড়াই । ঘন ঘন নিঃশ্বাস টানি এবং রীতিমতো হাঁপাতে থাকি । 

আমাকে বাড়ি যেতে দাও … আমাকে … 

আচমকা আমি থমকে দাঁড়াই । ভীষণ গরমে ঘেমে গেছি । কপাল থেকে ঘামের ফোঁটা গড়িয়ে পড়ছে । 

শোবার ঘরের দরজার পাল্লা খোলার শব্দে আমি দুঃস্বপ্ন থেকে জেগে উঠি । সেখানে দাঁড়িয়ে আমার মেয়ে জেনিস চিৎকার করছে, ‘বাবা, আমাদের দেরি হয়ে যাচ্ছে । সময় মতো আমাকে স্কুলে পৌঁছুতে হবে ।’ 

‘আসছি!’ 

দরজা বন্ধ । স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে আমি উপলব্ধি করলাম যে, এইমাত্র যা অনুভব করেছি তা আসলে এক ভয়ঙ্কর দুঃস্বপ্ন । 

কেবল স্বপ্ন মাত্র । ঈশ্বরকে ধন্যবাদ । 

আমি উঠে বাথরুমে ঢুকি, শাওয়ার চালু করি এবং চটজলদি গোসল করি । বাইরে বেরিয়ে এসে টিভির রিমোট হাতে নেই । 

‘সমগ্র বিশ্বে করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ছে । সম্ভবত এটা অতিমারীর আকার ধারণ করবে । আমাদের অবশ্যই …’ 

আমি স্থির হয়ে যাই । তারপর একসময় কাঁপতে আরম্ভ করি ।






লেখক পরিচিতি
বৃটিশ লেখিকা নেল রোজের পুরো নাম নেল রোজ লভরিজ । ইতোমধ্যে তাঁর তিনটি উপন্যাস এবং তিন শ’-এর অধিক রচনা প্রকাশিত হয়েছে । তাঁর লেখার মূল বিষয়বস্তুর রয়েছে মনস্তাত্ত্বিক ঘটনা, পুনর্জন্ম, দেবদূত, আত্মা জগৎ, বংশ, ভীতিকর কাহিনী এবং স্বাস্থ্য । ‘জিপসিজ: আই ম্যারিড অ্যা রোমানি!: অনেষ্ট, র‌্য অ্যান্ড এক্সট্রেমলি ফানি (প্রকাশিত: ২০১৭) এবং ‘জিপসিজ ২: গোয়িং অ্যা বিট ডিনলো’ (প্রকাশিত: ২০২০) তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ । বর্তমানে তিনি লন্ডনে বসবাস করেন ।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন