মঙ্গলবার, ১৬ মার্চ, ২০২১

রোয়াল্ড ডাল'এর গল্প : একটি শব্দের যন্ত্র


অনুবাদ : মনিজা রহমান

গ্রীষ্মের এক উষ্ণ সন্ধ্যা। সদর দরজা পার হয়ে বাড়ির পাশ দিয়ে দ্রুত হেঁটে চলেছেন ক্লাউসনার। এক সময় পিছনের বাগানে ঢুকে পড়লেন।

বাগানের শেষ প্রান্তে থাকা কাঠের চালার কাছে এসে তিনি থামলেন। দরজা খুলে ঘরের ভিতরে ঢুকলেন। ঢুকে দরজাটা ভিড়িয়ে দিলেন।

কাঠের চালাটা আসলে এক ধরনের রংবিহীন ঘর। দেয়ালের উল্টোদিকে বামে একটা লম্বা কাঠের বেঞ্চ। প্যাচানো তারের আবর্জনা, ব্যাটারি আর ছোট ছোট ধারালো সরঞ্জামের মধ্যে একটা প্রায় তিন ফুট লম্বা কালো বাক্স দাঁড় করানো। যেটা দেখতে অনেকটা শিশুর কফিনের মতোন।

ক্লাউসনার ঘরে ঢুকে বাক্সের দিকে এগিয়ে গেলেন। বাক্সের ওপরের অংশটা খোলা। তিনি ঝুঁকে বাক্সের ভিতরে রঙীন তার সরিয়ে ভিতরে উঁকি দিলেন। মুখ তুলে বাক্সের পাশে পড়ে থাকা এক টুকরো কাগজ হাতে নিলেন। মনোযোগ সহকারে কাগজটা পড়লেন। তারপর সেটা রেখে দিলেন। আবার বাক্সের ভিতরে উঁকি দিয়ে দেখতে লাগলেন। এরপরে তারের মধ্যে আঙ্গুল চালাতে শুরু করলেন। ধীরে ধীরে সংযোগ পরীক্ষা করতে লাগলেন। কাজ করতে করতে বার বার তিনি কাগজটা দেখছিলেন। আবার সেটা রেখে দিচ্ছিলেন। প্রায় এক ঘন্টার মতো ক্লাউসনার এটা করলেন। ।

তারপর তিনি বাক্সের সামনে একটা হাত রাখলেন। যেখানে তিনটি ডায়াল ছিল। তিনি সেগুলো ঘোরাতে শুরু করলেন। একই সাথে বাক্সের ভেতরে মেকানিজমের নড়াচড়া দেখতে লাগলেন।

হঠাৎ বাইরে কবরস্থানের পথে পায়ের আওয়াজ শুনতে পেলেন ‍ক্লাউসনার। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে তিনি দ্রুত দরজা খুলে দিলেন। লম্বা মতো একজন মানুষ ভিতরে ঢুকলেন। তিনি হলেন ডাক্তার স্কট। শুধু স্কট নামেই তিনি পরিচিত ছিলেন।

’বাহ্‌ বাহ্‌ বাহ্‌’ ডাক্তার বললেন, ‘তো এই হল সেই জায়গা যেখানে পুরো সন্ধ্যা আপনি নিজেকে লুকিয়ে রাখেন।’

’হ্যালো স্কট,’ ক্লাউসনার বললেন।

’আমি পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম,’ ডাক্তার তাঁকে বললেন, ‘তাই এখানে থামলাম, আপনি কেমন আছেন দেখার জন্য। দেখলাম বাড়িতে কেউ নেই। যে কারণে আমি ভিতরে ঢুকে বাগানের শেষ মাথায় এলাম। যাই হোক আপনার গলার অবস্থা এখন কেমন?’

’সব ঠিক আছে। আমি ভালো আছি।’

ডাক্তার রুমের মধ্যে এক ধরনের উত্তাপ অনুভব করলেন। তিনি একবার বেঞ্চের ওপর রাখা কালো বাক্সটার দিকে, আবার রুমের মধ্যে দাঁড়ানো মানুষটার দিকে তাকাতে লাগলেন। ’আপনি দেখছি এখনও টুপি পরে আছেন!’

’ও, পরে আাছি নাকি!’ টুপিতে হাত দিতে দিতে বললেন ক্লাউসনার। তারপর সেটা মাথা থেকে খুলে বেঞ্চে রাখলেন।

ডাক্তার আরো কাছে এলেন। ঝুঁকে বেঞ্চের ওপর রাখা বাক্সের ভিতরটা দেখলেন। ’কি এটা?’ ডাক্তার জানতে চাইলেন। ‘রেডিও বানাচ্ছেন নাকি?’

’না, শুধু পরীক্ষা নীরিক্ষা করছি।’

’কিন্তু ভিতরের জিনিষপত্র বেশ জটিল মনে হচ্ছে।”

’হ্যা’।” ক্লাউসনারকে কিছুটা উত্তেজিত ও বিভ্রান্ত দেখাচ্ছিল।

’এটা কি তাহলে?’ ডাক্তার প্রশ্ন করলেন। “ভয়ংকর দেখতে লাগছে।”

”এটা শুধু একটা নমুনা।’

’তাই?’

’এটাতে শব্দ সৃষ্টি করা যায়, এইটুকুই।”

’ঈশ্বরকে ধন্যবাদ! আপনি কি সারাদিন এই কাজ করেন নাকি?’

’আমি শব্দ ভালোবাসি।’

‘তাইতো দেখছি।’ ডাক্তার দরজা পর্যন্ত গেলেন। আবার ঘুরে দাঁড়ালেন, এবং বললেন, ‘দেখুন, আমি আপনাকে বিরক্ত করতে চাইনা। তবে আনন্দের ব্যাপার হল গলার সমস্যা আপনার আর নেই।’

কথা শেষ হবার পরেও ডাক্তার ওখানে দাঁড়িয়ে থাকলেন। বাক্সের দিকে তাকিয়ে রইলেন। বাক্সের ভিতরের জটিল বিষয়গুলো তাঁকে প্রচন্ড কৌতুহলী করে তুলেছিল। তাঁর এই অদ্ভুত ধরনের রোগী আদতে কি করছে জানার জন্য তীব্র বাসনা বোধ করছিলেন তিনি। ‘আসলে এটা সত্যি কিসের জন্য?’ তিনি জানতে চাইলেন। ‘আপনি আমাকে কৌতুহলী করে তুলেছেন।’

ক্লাউসনার একবার বাক্সের দিকে, আরেকবার ডাক্তারের দিকে তাকালেন। তারপর ডান কানের লতি ধরে চুলকাতে লাগলেন। সময় নিচ্ছিলেন তিনি। ডাক্তার দরজার কাছে দাঁড়িয়ে রইলেন। মৃদু হেসে অপেক্ষা করছিলেন ক্লাউসনারের মুখ খোলার জন্য।

’ঠিক আছে, যদি আপনি আগ্রহী হন, তবে আমি আপনাকে বলব।’ আবার কিছুক্ষণ থামলেন ক্লাউসনার। আসলে কিভাবে শুরু করবেন, বুঝে উঠতে পারছিলেন না। ডাক্তার সেটা বুঝতে পারলেন।

ক্লাউসনার এক পা থেকে অন্য পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়ালেন। এরপরে ডাক্তারের কানের লতির দিকে তাকিয়ে থাকলেন। তার পায়ের দিকে তাকালেন। অবশেষে ধীরে ধীরে তিনি বলতে লাগলেন, "ঠিক আছে... তত্ত্বটা সত্যিই খুব সহজ। মানুষের কান ...... আপনি জানেন সবকিছু শুনতে পায় না। এমন কিছু শব্দ আছে যা এত নিচু বা এত উঁচু যে কান শুনতে পায় না।”

‘হ্যা,” ডাক্তার বললেন, ‘আমি জানি।”

"আচ্ছা, মোটামুটি ভাবে বলতে গেলে, যে কোন আওয়াজ যার প্রতি সেকেন্ডে পনের হাজার কম্পন আছে- আমরা তা শুনতে পাই না। কুকুরের কান আমাদের চেয়ে ভালো। ধরেন একটি বাঁশি যার নোট এত উঁচু যে আপনি সেটা একেবারেই শুনতে পাবেন না। কিন্তু একটা কুকুর শুনতে পাবে।’

’হ্যা,’ ডাক্তার বললেন, ‘আমারও এমন একটা বাঁশি আছে।’

"হ্যা জানি আছে। আর সেই বাঁশির নোটের চেয়েও উঁচু, আরেকটা নোট আছে। আপনি সেটাও শুনতে পাবেন না। আর তার উপরে আরেকটা, আরও একটা উঠে আসছে চিরকালের জন্য। নোটের একটা ধারাবাহিকতা... নোটের অসীমতা … যদি আমাদের কান সেটা শুনতে পায়- এত উঁচু যে এক সেকেন্ডে মিলিয়ন বার কেঁপে ওঠে... এবং আরো মিলিয়ন গুণ বেশি .... ওপরে এবং আরো ওপরে, উচ্চতর এবং আরো উচ্চতর, যতদূর সংখ্যা যায়, যা.. অসীম... অনন্তকাল.... নক্ষত্রমন্ডলীর বাইরে।’

কথা বলতে বলতে ক্লাউসনারের চেহারা জ্বলজ্বল করছিল। তিনি হলেন একজন ছোট দুর্বল মানুষ। কিছুটা নার্ভাস প্রকৃতির। সবসময় উদ্বিগ্নভাবে নড়াচড়া করতেন। তাঁর বিশাল মাথা সব সময় বাম কাঁধের দিকে ঝুঁকে থাকতো। যেন তাঁর ঘাড় মাথাকে শক্তভাবে সমর্থন করার জন্য যথেষ্ট শক্তিশালী ছিল না। তাঁর চেহারা ছিল মসৃণ, ফ্যাকাশে, প্রায় সাদা। একজোড়া ইস্পাতচশমার পিছন থেকে উঁকি দেওয়া তাঁর ফ্যাকাশে ধূসর চোখগুলো ছিল ফোকাসবিহীন ও দূরবর্তী।

ডাক্তারের কাছে ক্লাউসনার ছিলেন স্বাপ্নিক, আনমনা প্রকৃতির। হঠাৎ করে যেন ঝাঁকুনি দিয়ে উঠতেন। তাঁর অদ্ভুত ফ্যাকাশে চেহারা আর ধূসর চোখের দিকে তাকিয়ে ডাক্তার অনুভব করলেন, এই ছোট্ট ব্যক্তির মধ্যে দূরত্বের একটা গুণ আছে। যা অপরিসীম দূরত্বের। যেন শরীর যেখানে আছে, সেখান থেকে মন অনেক দূরে।

ক্লাউসনার এরপরে কি বলেন সেই জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন ডাক্তার।

ক্লাউসনার লম্বা করে শ্বাস নিয়ে শক্ত করে দুই হাত বেঁধে দাঁড়িয়ে রইলেন। তারপর বলতে শুরু করলেন ‘আমি বিশ্বাস করি’। বলে থামলেন ক্লাউসনার। আগের চেয়ে ধীরে ধীরে তিনি বলতে লাগলেন, ‘সারা পৃথিবীতে এত শব্দ আছে যার বেশীরভাগ আমরা শুনতে পাইনা। উচ্চতর শ্রবণ অঞ্চলগুলিতে এক ধরনের উদ্দীপনামূলক সুর তৈরী হয়। সূক্ষ্ম সুরেলা এবং মারাত্মক গ্রাউন্ডিং ডিসঅর্ডার দিয়ে সংগীত তৈরি করা হয়ে থাকে। এমন একটি সংগীত যা আমাদের কানে আওয়াজ শোনার জন্য যদি কানটি তৈরী করা হয় তবে এটি আমাদের পাগল করে তুলবে। কিন্তু, কিছু একটা থাকতে পারে ... আমার সব সময় মনে হয়েছে…কিছু একটা থাকতে পারে-’

’হ্যা,’ ডাক্তার বললেন, ‘তবে সেটা সম্ভবপর হবেনা।’

বেঞ্চের ওপর পড়ে থাকা ছোট তামার তারের রোলের ওপর একটা মাছি বসেছিল। আঙ্গুল তুলে সেদিকে দেখিয়ে ক্লাউসনার বললেন, ‘কেন হবে না? কেন সম্ভবপর হবে না?’ ‘আপনি এই মাছিটাকে দেখেছেন? কি ধরনের আওয়াজ মাছিটি এখন সৃষ্টি করছে? কেউ সেটা শুনতে পারছে না। কিন্তু আমরা সবাই জানি প্রত্যেক সৃষ্ট জীব হয়তো খুব উঁচু নোটে পাগলের মত শিস দিচ্ছে, অথবা ঘেউ ঘেউ করছে অথবা গান গাইছে। কারণ প্রত্যেকেরই মুখ আছে, তাই না? গলা আছে। কণ্ঠ আছে।’

ডাক্তার মাছিটির দিকে তাকিয়ে হাসতে লাগলেন। দরজার নবে হাত রেখে তিনি তখনও দাঁড়িয়ে আছেন। ‘তাহলে আপনি এটা পরীক্ষা করতে যাচ্ছেন?’

’কিছুক্ষণ আগে আমি একটা যন্ত্র বানিয়েছি।’ ক্লাউসনার বললেন, ‘যে যন্ত্র আমরা সাধারণভাবে শুনতে পাইনা এমন অনেক আওয়াজের অস্তিত্বকে প্রমাণ করে। স্বাভাবিকভাবে যখন আমি নিজে কিছুই শুনতে পাইনা না, তখন প্রায়ই আমি বসে বসে আমার যন্ত্রের কাঁটার মাধ্যমে বাতাসে শব্দ কম্পনের উপস্থিতি রেকর্ড করি। কারণ, এই শব্দগুলো আমি শুনতে চাই। আমি জানতে চাই এই শব্দরা কোথা থেকে আসে এবং কে বা কারা তাদের সৃষ্টি করে।’

’টেবিলের ওপর যে মেশিনটা পড়ে আছে, সেটাই কি আপনাকে ওই শব্দ শুনতে সাহায্য করবে?’ ডাক্তার জানতে চাইলেন।

’এটা করতে পারে। কে জানে? এখন পর্যন্ত ভাগ্য সুপ্রসন্ন হয়নি। কিন্তু আমি কয়েক জায়গায় পরিবর্তন করেছি। এই মেশিন, ‘ হাত দিয়ে মেশিনটি স্পর্শ করে ক্লাউসনার বললেন, ‘আজ রাতে আরেকটি ট্রায়াল দেবার জন্য আমি প্রস্তুতি নিচ্ছি। এই মেশিনটা সাজানো হয়েছে এমনভাবে যে- মানুষের কানে সহনশীল নয় এমন উচ্চ মাত্রার সাউন্ড ভাইব্রেশন পাওয়া যাবে। তবে সেটা সহনশীল হয়ে কানে আসবে। আমি এটাকে টিউন করেছি, অনেকটা রেডিও’র মতো।

’আপনি কি বলতে চাইছেন?’

’ এটা আসলে খুব জটিল। যেমন ধরুন আমি বাঁদুড়ের চিৎকার শুনতে চাইছি। কিন্তু তাঁর আওয়াজ অনেক উচুঁ তারে বাধা। প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ত্রিশ হাজার ভাইব্রেশন। সাধারণ কান সেই শব্দ ভালো ভাবে শুনতে পায় না। এখন যদি একটা বাঁদুড় এসে এই রুমের মধ্যে উড়তে থাকে- আমি আমার মেশিনে ত্রিশ হাজার ভাইব্রেশন সেট করতে পারব। বাদুড়ের চিৎকারের আওয়াজ স্পষ্টভাবে আমার যন্ত্রে টিউন করতে পারব। এমনকি সঠিক নোটটি শুনতে পারব। হয়তো সেটা এফ শার্প, অথবা বি ফ্ল্যাট, যাই হোক, যত উচুঁ বা নীচু আওয়াজের শব্দই হোক না কেন! আমি সেটা শুনতে পারব। আপনি কি এখন বুঝতে পেরেছেন?’

লম্বা কালো কফিন বাক্সের দিকে তাকিয়ে ডাক্তার বললেন, ‘আজ রাতে আপনি এটার পরীক্ষা করবেন, তাই না?’

’হ্যা।’

’আমি আপনার সাফল্য কামনা করছি।’ কথা বলতে বলতে ডাক্তার ঘড়ির দিকে তাকালেন। ‘হায় খোদা! আমাকে এখনই উড়াল দিতে হবে। বিদায়। আর ধন্যবাদ আমাকে এই বিষয়ে বলার জন্য। আমি আপনাকে আবার পরে ফোন করে কি হল জেনে নেব।’ ডাক্তার ঘর থেকে বের হয়ে দরজাটা ভিড়িয়ে দিলেন।

কিছুক্ষণের জন্য ক্লাউসনার কালো বাক্সের জড়ানো তার খুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। তারপর সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে মৃদু উত্তেজিত কণ্ঠে ফিসফিস করে বললেন, ‘এখন আবার চেষ্টা করবো..এবার এটাকে বাগানে নিয়ে যাবো... এবং তারপর সম্ভবত... রিসেপশন ভালো হবে। এখন উপরে তুলতে হবে... সাবধানে ... ওহ মাই গড, এটা এত ভারী।’

ক্লাউসনার বাক্সটা দরজা পর্যন্ত নিয়ে গেলেন। সেখানে গিয়ে বুঝতে পারলেন বাক্সটা না নামিয়ে তিনি দরজা খুলতে পারবেন না। আবার তিনি পিছনে ফিরে এলেন। বাক্সটা বেঞ্চের ওপর রাখলেন। দরজা খুললেন। তারপর বেশ কষ্ট করেই বাক্সটা বাগানে নিয়ে এলেন। বাগানের ছোট্ট কাঠের টেবিলে বাক্সটা রাখলেন। চালার কাছে ফিরে এসে ’ইয়ারফোন’ নিলেন। তারের সংযোগের সঙ্গে ইয়ারফোনের প্লাগ যুক্ত করলেন। ইয়ারফোন তারপর কানে লাগালেন।

পুরো সময়ে ক্লাউসনারের হাতের নাড়াচাড়া ছিল দ্রুত ও নির্ভুল। তাঁকে প্রচন্ড উত্তেজিত মনে হচ্ছিল। জোরে জোরে মুখ দিয়ে নিঃশ্বাস নিচ্ছিলেন ও বার করছিলেন। সেই সঙ্গে নিজের সঙ্গে কথা বলে যাচ্ছিলেন। কথাগুলো ছিল নিজেকে স্বান্ত্বনা ও উৎসাহ দেয়ার মতো। যদিও সে মনে মনে তিনি কিছুটা ভীত ছিলেন। ভীত ছিলেন এই জন্য যে যন্ত্রটা হয়ত কাজ নাও করতে পারে। কিংবা কাজ করলেও কি ঘটতে পারে সেই ভেবে।

বাগানের মধ্যে তিনি কাঠের টেবিলের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাঁকে এত ফ্যাকাশে, ছোট এবং পাতলা দেখাচ্ছিল যেন অনেকটা প্রাচীন, ক্ষয়রোগাক্রান্ত চশমাপরা শিশুর মত। সূর্য তখন অস্তগামী। চারদিকে যেন কোন বাতাস ছিল না। কোন শব্দ ছিল না। যেখানে তিনি দাঁড়িয়ে ছিলেন, সেখান থেকে পাশের বাগানে একটি নিচু বেড়ার উপর দিয়ে দেখতে পেলেন- একজন মহিলা হাতে ফুলের ঝুড়ি নিয়ে বাগানের ভিতর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন।

ক্লাউসনার ওই নারীকে দেখছিলেন, কিন্তু ভাবছিলেন অন্য কথা। তারপর টেবিলের বাক্সের দিকে ঘুরে সামনের দিকে একটা সুইচ চেপে ধরলেন। তিনি ভলিউম কন্ট্রোলের উপর তার বাম হাত রাখলেন এবং তার ডান হাত রাখলেন নবের ওপর। যে নবটি একটি বৃহৎ কেন্দ্রীয় ডায়াল জুড়ে কাটার সঙ্গে ঘুরছিল। অনেকটা রেডিওর তরঙ্গ-দৈর্ঘ্য ডায়ালের মত। ডায়ালটি অনেকগুলো সংখ্যা দিয়ে চিহ্নিত ছিল। একটি ধারাবাহিক ব্যান্ড, ১৫০০০ থেকে শুরু হয়ে ১,০০০, ০০০ পর্যন্ত গেছে।

ক্লাউসনার মেশিনের দিকে ঝুঁকে দাঁড়িয়ে রইলেন। তার মাথাটা টানটান উত্তেজনাপূর্ণ ভাবে কিছু শোনার জন্য একপাশে আটকে ছিল। তার ডান হাতটা ঘুরতে শুরু করল। কাটা ধীরে ধীরে ডায়ালের ওপারে যাচ্ছিল। এতটাই ধীরে ধীরে যে তিনি কোন নড়াচড়া দেখতে পারছিলেন না। তবে ইয়ারফোনে তিনি একটা মৃদু, শ্বাসকষ্টের মত শব্দ শুনতে পাচ্ছিলেন।

এই ভাঙ্গা শব্দের পিছনে ক্লাউসনার একটি দূরবর্তী গুনগুন শব্দ শুনতে পেলেন যা তার মেশিনেরই আওয়াজ ছিল। কিন্তু এটুকুই। যখন তিনি শুনছিলেন, এক অদ্ভুত অনুভূতি সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠলেন। একটি অনুভূতি যা কানকে মাথা থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছিল। ক্লাউসনারের দুই কান একটি পাতলা শক্ত তারদ্বারা তার মাথার সাথে সংযুক্ত ছিল। দেখতে অনেকটা তাঁবুর মত। তারগুলো লম্বা হচ্ছিল। দুই কান যেন একটি গোপন এবং নিষিদ্ধ অঞ্চলের দিকে চলছিল। একটি বিপজ্জনক আলট্রাসাউন্ড অঞ্চল, যেখানে মানুষের কান আগে কখনও যায়নি। সেখানে যাবার যেন কোন অধিকারও নেই।

ছোট্ট কাটাটা ধীরে ধীরে ডায়ালজুড়ে ঘুরতে লাগল। হঠাৎ ক্লাউসনার একটা চিৎকার শুনতে পেলেন। একটা ভয়ানক চিৎকার! আর তিনি লাফ দিয়ে উঠে টেবিলের কিনারাটা ধরে নিজের পতন ঠেকালেন । ছোট্ট কাটাটা ধীরে ধীরে ডায়ালজুড়ে ঘুরতে লাগল। ক্লাউসনার তাঁর চারপাশে এমনভাবে তাকালেন যেন যিনি চিৎকার করছেন তাঁকে দেখতে পাবেন। পাশের বাগানে মহিলা ছাড়া আর আশে পাশে কেউ ছিল না। ভদ্রমহিলা ঝুঁকে গাছ থেকে হলুদ গোলাপ কেটে ঝুড়িতে রাখছিলেন।

আবার শব্দটা হল। তীক্ষ্ণ একটা অমানবিক চিৎকার। সংক্ষিপ্ত, খুব পরিষ্কার এবং ঠাণ্ডা। নোটে একটা ছোট ধাতব গুণ ছিল যা তিনি আগে কখনো শোনেননি। ক্লাউসনার তার চারপাশে তাকিয়ে চিৎকারের উৎস খুঁজতে লাগলেন। পাশের বাড়ির মহিলাটি ছিল আশেপাশে একমাত্র জীবন্ত বস্তু। ক্লাউসনার তাকে নীচু হতে দেখলেন। এক হাতের আঙ্গুল দিয়ে একটি গোলাপের ডাল নিলেন। কেচি দিয়ে সেটা সাইজ করছিলেন। ক্লাউসনার আবার চিৎকার শুনতে পেলেন।

যখন গোলাপের ডাল কাটা হচ্ছিল ঠিক তখনই চিৎকারের শব্দ আসছিল।

পর মুহূর্তে মহিলাটি সোজা হয়ে উঠে দাঁড়ালেন। কাঁচিগুলো গোলাপসহ ঝুড়িতে রেখে হাঁটতে শুরু করলেন।

'মিসেস স্যান্ডার্স!' ক্লাউসনার চেঁচিয়ে উঠলেন। তার কণ্ঠস্বর উত্তেজনায় চিৎকার করে উঠল। "ওহ, মিসেস স্যান্ডার্স!"

চারদিকে তাকিয়ে মহিলাটি তার প্রতিবেশীকে লনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলেন। তিনি দেখলেন- একজন চমৎকার, হাত নাড়তে থাকা ক্ষুদে ব্যক্তি, যার মাথায় একজোড়া ইয়ারফোন আছে। ভদ্রমহিলার মনে হল- ক্লাউসনার এত উঁচু এবং জোরে তাকে ডাকছেন যেন তিনি আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন।

'আরেকটা কেটে ফেলুন! দয়া করে আরেকটা তাড়াতাড়ি কেটে ফেলুন!”

ভদ্রমহিলা চুপ করে দাঁড়িয়ে তাঁর দিকে তাকিয়ে রইলেন। "কেন, মিঃ ক্লাউসনার, তিনি বললেন, ‘ব্যাপারটা কি?’

‘দয়া করে আমি যা করতে বলছি তাই করুন,’ তিনি বললেন, ‘আরেকটা গোলাপ কেটে ফেলুন এক্ষুনি!’

মিসেস স্যান্ডার্স সবসময় তার প্রতিবেশীকে অদ্ভুত মানুষ বলে বিশ্বাস করতেন। এখন তাঁর মনে হচ্ছিল ক্লাউসনার পুরোপুরি পাগল হয়ে গেছেন। ভদ্রমহিলা ভাবছিলেন যে সে বাড়িতে ঢুকে তার স্বামীকে ডেকে নিয়ে আসবে কিনা। পরক্ষণেই তিনি তার চিন্তার পরিবর্তন করলেন। না না, ভদ্রলোক নিরীহ প্রকৃতির। আমি শুধু তার সঙ্গে মজা করবো।

"অবশ্যই, মিঃ ক্লাউসনার, যদি আপনি চান," বলতে বলতে ভদ্রমহিলা ঝুড়ি থেকে তার কাঁচি বের করে ঝুঁকে আরেকটা গোলাপ কাটলেন।

ক্লাউসনার আবার ইয়ারফোনে সেই ভয়ানক, তীক্ষ্ণ চিৎকার শুনতে পেলেন। আবার ঠিক সেই মুহূর্তে, যখন গোলাপের ডাল কাটা হয়। তিনি ইয়ারফোন খুলে বেড়ার দিকে দৌড়ে গেলেন।

"ঠিক আছে," তিনি বললেন "যথেষ্ট হয়েছে। আর নয়। প্লিজ, আর না।’

ভদ্রমহিলা ওখান দাঁড়িয়ে রইলেন। তার এক হাতে হলুদ রঙা একটি গোলাপ। অন্য হাতে গোলাপ কাটার কাঁচি।

’আমি আপনাকে কিছু বলতে চাই, মিসেস স্যান্ডার্স।’ ক্লাউসনার বললেন। ’এমন কিছু যেটা হয়ত আপনি বিশ্বাস করতে চাইবেন না।’

ক্লাউসনার বেড়ার উপরে তার হাত রাখলেন। তার ভারী চশমার মধ্য দিয়ে ভদ্রমহিলার দিকে মনোযোগ দিয়ে তাকালেন।

"আজ সন্ধ্যায় আপনি এক ঝুড়ি গোলাপ কেটে ফেলেছেন। আপনার কাছে এক জোড়া কাঁচি আছে। যা দিয়ে জীবন্ত বস্তুর ডাল কেটে ফেলে দিয়েছেন। আর প্রতিটা গোলাপ কাটার সময় তারা ভয়ানক ভাবে চিৎকার করে উঠেছিল। সেটা কি আপনি জানেন, মিসেস স্যান্ডার্স?

"না," ভদ্রমহিলা বললেন। "আমি অবশ্যই এটা জানতাম না।"

"এটা সত্যি ঘটেছে," ক্লাউসনার বললেন। তিনি দ্রুত শ্বাস নিচ্ছিলেন। তবুও তিনি তাঁর উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণ করতে পারছিলেন না। "আমি তাদের চিৎকার শুনতে পেলাম। যখনই আপনি একটা ডাল কেটে দিলেন আমি যন্ত্রণার আর্তনাদ শুনতে পেলাম। খুব উঁচু একটা শব্দ, সেকেন্ডে এক লক্ষ বত্রিশ হাজার কম্পন। আপনি এটা শুনতে পাননি। কিন্তু আমি শুনেছি।’

‘আপনি হয়তো বলতে পারেন,’ ক্লাউসনার আরো বললেন, ‘একটি গোলাপঝোপের অনুভব করার মত কোন স্নায়ুতন্ত্র নেই। কান্না করার কণ্ঠ নেই। আপনি ঠিকই বলেছেন। তাদের সেটা নেই। । অন্তত আমাদের মত নেই। কিন্তু আপনি জানেন না মিসেস স্যান্ডার্স, আপনি জানেন না!’ কথা বলতে বলতে ক্লাউসনার বেড়ার ওপর ঝুঁকে ফিসফিস করে বললেন- "যখন কেউ আপনার শরীরের কোন অংশ কেটে ফেলে তখন কি আপনি ব্যথা অনুভব করেন না। কেউ যদি কাঁচি দিয়ে আপনার কব্জি কেটে ফেলে দেয়, তখন আপনার কেমন লাগবে!’

"ওহ্ মিঃ ক্লাউসনার! শুভরাত্রি।’ দ্রুত ‍ঘুরে গিয়ে ভদ্রমহিলা বাগান থেকে বাড়ির ভিতরে চলে গেলেন।

ক্লাউসনার তার টেবিলের কাছে ফিরে এলেন। আবার তিনি কানে ইয়ারফোন লাগালেন। কিছু সময় শোনার চেষ্টা করলেন। তিনি তখনও যন্ত্রের মৃদু শব্দ আর গুঞ্জনের শব্দ শুনতে পাচ্ছিলেন, কিন্তু আর কিছুই না।

ক্লাউসনার ঝুঁকে লনে বেড়ে ওঠা ছোট সাদা ডেইজির দিকে তাকালেন। তিনি ফুলটাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি এবং আঙ্গুলের মাঝখানে নিলেন এবং ধীরে ধীরে উপরের দিকে টেনে নিলেন যতক্ষণ না ডাঁটা ভেঙ্গে যায়।

ডাঁটা ভেঙ্গে যাওয়ার মুহূর্ত থেকে ক্লাউসনার শুনতে পেলেন- ইয়ারফোনে একটা মৃদু উঁচু আর্তনাদ। যে আর্তনাদ তাকে অদ্ভুতভাবে উত্তেজিত করে তুলল। তিনি আরেকটা ডেইজি নিয়ে আবার এটা করলেন। আবার তিনি আর্তনাদ শুনতে পেলেন। কিন্তু তিনি এখন এতটা নিশ্চিত ছিলেন না- যে এই আওয়াজে ব্যথার প্রকাশ ঘটেছে।। আসলে এটা ব্যথার অনুভব ছিল না। ছিল অনেকটা চমকের মত।

আসলেই কি সেটা তাই? এই ফুল বা বৃক্ষ আসলেই কি মানুষের পরিচিত কোন অনুভূতি বা আবেগ প্রকাশ করে! এটা শুধু একটা কান্না, একটা নিরপেক্ষ, পাথুরে কান্না- একটা আবেগহীন নোট, যেটা আসলে কিছুই প্রকাশ করেনা। গোলাপের ক্ষেত্রেও একই রকম ছিল। তিনি এটাকে বেদনার আর্তনাদ বলে ভুল করেছিলেন। একটা ফুল সম্ভবত ব্যথা অনুভব করেনি। হয়ত অন্য কিছু অনুভব করেছে যা আমরা জানিনা। ………….

ক্লাউসনার উঠে দাঁড়িয়ে ইয়ারফোনগুলো খুলে নিলেন। অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল। তিনি দেখতে পেলেন তার চারপাশের বাড়ির জানালায় আলোর ঝলকানি জ্বলজ্বল করছে। সাবধানে টেবিল থেকে কালো বাক্সটা তুলে শেডের মধ্যে নিয়ে ওয়ার্কবেঞ্চে রাখলেন। তারপর তিনি বাইরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে বাড়ির দিকে এগিয়ে গেলেন।

পরের দিন সকালে সকালের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে ক্লাউসনার ঘুম থেকে উঠলেন। মেশিনটাকে তুলে বাইরে নিয়ে এলেন। ওজনের কারণে ভালোভাবে হাঁটতে পারছিলেন না তিনি। দুই হাত দিয়ে মেশিনটাকে বুকে জড়িয়ে ধরে তিনি এলোমেলোভাবে হাঁটতে লাগলেন। তিনি বাড়ি অতিক্রম করে সদর দরজায় এসে থামলেন। তারপর রাস্তা পার হয়ে পার্কে গেলেন। সেখানে গিয়ে তিনি থামলেন।

ক্লাউসনার চারদিকে তাকিয়ে দেখলেন। তারপর তিনি চলতে লাগলেন যতক্ষণ না বিশাল একটা গাছ তার সামনে পড়ল। গাছটা ছিল বিচ গাছ। গাছের গুড়ির কাছে মাটিতে মেশিনটা রাখলেন। তারপর দ্রুত বাড়িতে ফিরে গিয়ে কয়লা রাখার পাত্র থেকে কুঠারটা তুলে নিলেন। আবার রাস্তা পার হয়ে পার্কে এলেন। গাছের কাছে মাটিতে তিনি কুঠারটা রাখলেন।

তারপর আবার ক্লাউসনার চারদিকে তাকালেন। মোটা চশমার ভিতর দিয়ে নার্ভাস দৃষ্টি তার। সকাল ছয়টা বেজে গেছে।

কানে ইয়ারফোন লাগিয়ে ক্লাউসনার মেশিন চালু করলেন। তিনি এক মুহূর্তের জন্য পরিচিত মৃদু গুঞ্জন শুনতে পেলেন। তারপর তিনি কুঠারটা তুলে নিলেন। পা দুটো ফাঁক করে কুঠারটা শক্ত হাতে ধরে দাঁড়ালেন। কোপ দেবার পরে কুঠারের ব্লেডটি গাছের কাঠের গভীরে কেটে সেখানে আটকে রইল। আঘাতের মুহূর্তে তিনি ইয়ারফোনে একটি অন্যরকম শব্দ শুনতে পেলেন।

এটা একটা নতুন শব্দ! যা সে আগে শুনেছিল তার মতো না। একটা কঠিন, নোটবিহীন, উচ্চ গর্জন বলা যায়। গোলাপের চিৎকারের মত দ্রুত এবং সংক্ষিপ্ত নয়। কুঠারটি আঘাত হানার পরে এক মিনিট পর্যন্ত আওয়াজটি স্থায়ী হয়। তারপরে ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে যায়।

ক্লাউসনার আতঙ্ক নিয়ে সামনে তাকালেন- যেখানে কুঠারের ব্লেড গাছের কাঠের ভিতরে ঢুকে গিয়েছিল। তারপর আস্তে আস্তে কুঠারের হাতলটা ধরে টান দিয়ে ব্লেডটা আলগা করে মাটিতে ফেলে দিলেন। কুঠারটা যেখানে ক্ষত সৃষ্টি করেছে সেখানে আলতো করে আঙ্গুল দিয়ে স্পর্শ করলেন। আর বলতে থাকলেন, 'গাছ.. ওহ গাছ.. আমি দুঃখিত। আমি দুঃখিত। কিন্তু এটা ঠিক হয়ে যাবে…।’

গাছের গায়ে হাত দিয়ে ক্লাউসনার কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন। তারপর হঠাৎ তিনি ঘুরে দাঁড়ালেন। পার্ক থেকে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে গেলেন। রাস্তা পার হয়ে, সদর ফটক দিয়ে এবং তার বাড়িতে ফিরে গেলেন। তিনি টেলিফোন হাতে নিয়ে বই বের করে একটা নম্বর বের করলেন। সেই নম্বরে ডায়াল করে অপেক্ষা করতে লাগলেন। তিনি রিসিভারটিকে বাম হাতে শক্ত করে ধরে অধৈর্য্য ভঙ্গীতে অপেক্ষা করতে লাগলেন। অন্য প্রান্তে টেলিফোনের আওয়াজ তিনি শুনতে পেলেন। ওই পাশে ফোন তোলার ক্লিক শব্দ হল। ঘুম ঘুম কণ্ঠে একজন বলে উঠলেন, ’হ্যালো।’

’ড. স্কট?’ ক্লাউসনার জানতে চাইলেন।

’হ্যা। বলছি।’

’ড. স্কট, আপনি কি দ্রুত একটু আসতে পারবেন। খুব তাড়াতাড়ি।’

’কে বলছেন?’

’ক্লাউসনার বলছি। মনে আছে গতরাতে আমি আপনাকে কি বলেছিলাম শব্দ নিয়ে? আমার অভিজ্ঞতা নিয়ে? আমি কি ভাবছি..’

’হ্যা, হ্যা মনে আছে। কিন্তু কি ব্যাপার? আপনি কি অসুস্থ?’

’না, আমি অসুস্থ না। কিন্তু-’

’এখন মাত্র সকাল সাড়ে ছয়টা বাজে। আর আপনি এখন আমাকে কল করেছেন। আর বলছেন আপনি অসুস্থ না!’

’দয়া করে আসুন। একটু তাড়াতাড়ি। আমি চাই কেউ আমার কথা শুনুক। পুরো বিষয়টা আমাকে পাগল করে দিয়েছে। আমি বিশ্বাস করতে পারছি না…’

ডাক্তার একটা ক্ষেপাটে সুর শুনতে পেলেন ক্লাউসনারের কণ্ঠে। বিপন্ন কোন মানুষের কণ্ঠ যেমন হয়। ’এখানে একটা দুর্ঘটনা ঘটেছে। তাড়াতাড়ি আসুন।’

স্কট ধীরে ধীরে বললেন, ‘আপনি কি চাইছেন সাতসকালে আমি সেখানে চাই।’

’হ্যা, এখনই। একবারের জন্যে হলেও আসুন প্লিজ।’

’তাহলে আমি আসছি।’

ক্লাউসনার টেলিফোনের পাশে বসে অপেক্ষা করতে লাগল। তিনি ভাবার চেষ্টা করলেন গাছের চিৎকার কেমন ছিল! কিন্তু তিনি স্পষ্টভাবে মনে করতে পারলেন না। তাঁর শুধু মনে আছে শব্দটা বিশাল এবং ভীতিকর ছিল। শব্দটা তাকে আতঙ্কিত ও অসুস্থ করে তুলেছিল। তিনি কল্পনা করতে চেষ্টা করলেন- একজন মানুষকে যদি মাটিতে জোর করে ধরে রাখা হয় আর তার শরীরে যদি কেউ ব্লেডের মত ধারালো জিনিষ দিয়ে গভীরভাবে কাটে - তাহলে তার কিরকম ভয়ংকর অনুভূতি হবে।

একই ধরনের আওয়াজ হবে। না। একেবারে আলাদা। গাছের ছিল ভীতিকর, কণ্ঠবিহীন, শব্দবিহীন এক আওয়াজ। যে কোন মানুষের আতংকিত আওয়াজের চেয়েও ভয়ংকর। ক্লাউসনার সমস্ত জীবিত সৃষ্টি সম্পর্কে ভাবতে শুরু করলেন। তিনি তৎক্ষণাৎ গমের ক্ষেতের কথা ভাবতে লাগলেন। গমের ক্ষেতের ডাটাগুলো সোজা, হলুদ এবং জীবিত। গাছ কাটার যন্ত্র তারমধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। যন্ত্রটি প্রতি সেকেন্ডে পাঁচশত ডাল কাটছে।

ঈশ্বর রহম কর। তখন আতংকিত চিৎকারের মাত্রা কি হবে! পাঁচশত গম গাছ এক সঙ্গে কাটা হচ্ছে। প্রতি সেকেন্ডে আরো পাঁচশত গাছ কেটে ফেলে দেয়া হচ্ছে। তারা ভয়ংকরভাবে চিৎকার করছে। না, না। ক্লাউসনার ভাবলেন, ‘আমি আমার মেশিন নিয়ে গমের ক্ষেতে যেতে চাই না। এর পরে আমি আর রুটি খাব না। কিন্তু আলু, বাঁধাকপি, গাজর আর পেঁয়াজের কি হবে? আর আপেলের কি হবে? ওহ্ না।’

গাছ পাকা হলে ফল এমনিতে পড়ে যায়। আপেলের ক্ষেত্রে ঠিক আছে। যদি কেউ শাখা থেকে না ছিড়ে গাছ থেকে পড়ে যাওয়া আপেল খায়- তাহলে কোন সমস্যা নেই। তবে শাকসবজির ক্ষেত্রে এটা প্রযোজ্য নয়। যেমন ধরা যাক আলুর কথা। আলু নিশ্চয় চিৎকার করে। যেমন গাজর, পিঁয়াজ ও বাঁধাকপি করে।

ক্লাউসনার প্রধান ফটকের ল্যাচ ঘোরানোর শব্দ শুনতে পেলেন। লাফ দিয়ে উঠে বেরিয়ে এলেন। দীর্ঘদেহী ডাক্তারকে এগিয়ে আসতে দেখলেন। তাঁর হাতে একটা ছোট কালো ব্যাগ।

’তারপর,’ ডাক্তার বললেন, ‘কি সমস্যা হয়েছে ?’

’আমার সাথে আসুন ডাক্তার। আমি শব্দ শোনাতে চাই। আমি আপনাকে ডেকেছি কারণ একমাত্র আপনার সঙ্গে আমি বিষয়টা আলাপ করেছি। গাছটা রাস্তার ওপাশে অবস্থিত। আপনি কি এখন যেতে পারবেন আমার সঙ্গে?’

ডাক্তার তার দিকে তাকালেন। ক্লাউসনারকে আগের তুলনায় শান্ত দেখাচ্ছিল। পাগলামির কোন চিহ্ন নেই তার মধ্যে। শুধু কিছুটা বিক্ষিপ্ত আর উত্তেজিত লাগছিল।

তারা রাস্তা পার হয়ে পার্কের ভিতরে গেলেন। ক্লাউসনার ডাক্তারকে একটা বিশাল বিচ গাছের কাছের নিয়ে গেলেন। গাছের পায়ের কাছে সেই লম্বা কালো কফিন বাক্সের মধ্যে মেশিনটা ছিল। পাশে একটা কুঠার।

’আপনি এসব কেন এখানে নিয়ে এসেছেন?’ ডাক্তার প্রশ্ন করলেন।

’আমার একটা বড় গাছের দরকার ছিল।’ ক্লাউসনার জানালেন। ‘কিন্তু বাগানের মধ্যে কোন বড় গাছ পেলাম না।’

’কুঠার কিসের জন্য?’

’আপনি একটা কিছু দেখতে পাবেন অচিরে। তার আগে আপনি এয়ারফোন কানে লাগান। আর শোনার চেষ্টা করেন। খুব মন দিয়ে শোনার চেষ্টা করেন। আর তারপর আমাকে নির্দিষ্ট করে বলবেন কি শুনেছেন। আমি নিশ্চিত হতে চাই যে……’

ডাক্তার হাসলেন। তারপর ইয়ারফোন হাতে নিয়ে কানে দিলেন।

ক্লাউসনার নীচু হয়ে বসলেন। মেশিনের প্যানেলে সুইচ যুক্ত করলেন। কুঠার হাতে নিলেন এরপরে। পা ফাঁক করে কোপ মারার জন্য প্রস্তুত হলেন। এক মুহূর্তের জন্য থামলেন তিনি। ’আপনি কি কিছু শুনতে পারছেন ডাক্তার?’

’কেন আমি কি শুনবো?’

’ আপনি কি কিছু শুনছেন কিনা!”

’শুধু গুনগুন শব্দ।’

ক্লাউসনার কুঠার হাতে দাঁড়িয়ে রইলেন। কোপ দেবার জন্য উদগ্রীব তিনি। কিন্তু গুনগুন শব্দের ভাবনা তাকে এক মূহুর্তের জন্য থমকে দিল।

’আপনি আসলে কিসের জন্য অপেক্ষা করে আছেন?’ ডাক্তার জানতে চাইলেন।

’কিছুনা’। ক্লাউসনার উত্তর দিলেন।

তারপর ক্লাউসনার কুঠার হাতে গাছে কোপ দিলেন। কোপ দেবার সময় যেন তিনি কিছু অনুভব করলেন। তিনি শপথ করে বলতে পারেন যে তিনি মাটিতে দাঁড়িয়ে একটি আন্দোলন অনুভব করেছেন। তিনি তার পায়ের নিচে মাটির সামান্য পরিবর্তন অনুভব করলেন। যেন গাছের শিকড় মাটির নিচে সরে যাচ্ছে। কুঠারের ব্লেডটি গাছে আঘাত করে কাঠের গভীরে ঢুকে গেল। এই মুহূর্তে কাঠের ফাটলের শব্দ আর অন্য পাতার সাথে পাতার আওয়াজে চারদিক ভরে গেল।

ক্লাউসনারের দিকে তাকিয়ে ডাক্তার চিৎকার করে বললেন, 'সাবধান! দৌড়া লাগান! তাড়াতাড়ি দৌড় লাগান।

ডাক্তার ইয়ারফোন খুলে দ্রুত চলে যাচ্ছিলেন। লম্বা শাখাটা যখন ভেঙ্গে পড়ল, ক্লাউসনার ঠিক সেই সময়ে লাফ দিলেন। শাখাটা মেশিনের উপর ভেঙ্গে পড়ল।

ডাক্তার ছুটে এসে চেঁচিয়ে উঠলেন, 'শাখাটা কাছাকাছি ছিল! আমি ভেবেছিলাম আপনার গায়ে পড়েছে’।

ক্লাউসনার গাছের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। তার বড় মাথাটা হেলে ছিল একদিকে। তাঁর মসৃণ সাদা মুখে টেনশন ও ভয়ের ছাপ। ধীরে ধীরে তিনি এগিয়ে গেলেন গাছের দিকে। গাছের শরীর থেকে ব্লেডটা বের করে আনলেন।

’আপনি কি শুনতে পেরেছেন?’ ডাক্তারের দিকে ঘুরে তিনি জানতে চাইলেন। তাঁর কণ্ঠ এত মৃদু যে শোনাই যাচ্ছিল না।

দৌড়ে আসার কারণে ডাক্তার তখনও হাঁফাচ্ছিল। উত্তেজিত কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কি শোনার কথা বলছেন?’

’ইয়ারফোনে কিছু শুনতে পাননি, যখন কুঠার গাছের ভিতরে আঘাত করল?’

ডাক্তার তাঁর ঘাড়ের পিছনে চুলকাতে শুরু করলেন। ‘হ্যা, সত্যি কথা বলতে কি…’ তিনি থামলেন। তাঁকে কিছুটা ভয়ার্ত দেখাচ্ছিল। ‘ আমি নিশ্চিত না। আমি নিশ্চিত হতে পারছি না। কুঠার গাছে আঘাত করার এক সেকেন্ডের বেশী সময় পরে আমি ইয়ারফোন পরেছিলাম’

’হ্যা, হ্যা.. কিন্তু আপনি তো কিছু শুনতে পেরেছিলেন?’

’আমি ঠিক জানি না।’ ডাক্তার বললেন। ‘ আমি ঠিক জানিনা কি শুনেছি। সম্ভবত গাছের শাখা ভেঙ্গে পড়ার শব্দ হতে পারে।’ দ্রুততার সঙ্গে হড়বড় করে কথাগুলো বললেন তিনি।

’আওয়াজ শুনতে কেমন ছিল?’ ক্লাউসনার সামান্য ঝুঁকে আবার বলে উঠলেন, ’প্রকৃতপক্ষে কি শুনেছেন আপনি?’

’ও খোদা!’ ডাক্তার বললেন, ’ আমি সত্যি জানিনা। আমি এই আলোচনা এখানে থামিয়ে দিতে বেশী আগ্রহী। বাদ দিন এসব।’

’ডাক্তার স্কট, আওয়াজ শুনতে কেমন ছিল?’

’খোদার কসম বলছি। কিভাবে আপনাকে বলব জানি না।’ ডাক্তারকে নার্ভাস দেখাচ্ছিল। ক্লাউসনার নিজেকে ফিরে পেলেন। তখন তিনি ডাক্তার দিকে স্থির চোখে তাকিয়ে রইলেন। আধ মিনিটের বেশী সময় কোন কথা খুঁজে পাচ্ছিলেন না।

ডাক্তার তাঁর পা ঘোরালেন। কাঁধ ঝাঁকালেন। যাবার জন্য অর্ধেক ঘুরে গেলেন। ‘সবচেয়ে ভালো হয় যদি আমরা চলে যাই এখন।’

’শুনুন,’ ক্ষুদে মানবটি হঠাৎ বলে উঠলেন। এখন তাঁর মসৃণ সাদা মুখ হঠাৎ লাল হয়ে উঠল। ’আপনি এই পুরো জায়গা সেলাই করে দেবেন।’ তিনি আঙ্গুল দিয়ে গাছের শরীরের কুঠারের আঘাতে চিহ্ন দেখালেন। ‘দ্রুত আপনি এই জায়গাটা সেলাই করে দেন।’

’বোকার মতো কথা বলবেন না।’ ডাক্তার বললেন।

’আমি যেটা বলছি সেটা করুন। দ্রুত সেলাই করে দিন।’ কুঠারের হাতলটা হাতে নিয়ে নীচু গলায় কিন্তু হুমকি দেবার সুরে বললেন ক্লাউসনার।

’বোকার মতো কথা বলবেন না।’ ডাক্তার আবার বললেন। ’কাঠের শরীরে কিভাবে সেলাই করে আমি জানিনা। বাদ দিন। চলুন ফিরে যাই।’

’ কাঠের শরীরে কিভাবে সেলাই করে আপনি জানেন না?’

’না, আমি জানিনা।’

’আপনার ব্যাগে কি কোন আয়োডাইন আছে?’

’যদি থাকে কি কাজে লাগবে?’

’তাহলে কাঁটা অংশটা আয়োডাইন দিয়ে পেইন্ট করে দেবেন।’

’দেখুন..’ ডাক্তার বললেন, এবং এমনভাবে ঘুরলেন যেন এখনই চলে যাবেন। ‘হাস্যকর কথা বলবেন না। চলুন বাড়িতে ফিরে যাই। আর তারপর…’

ডাক্তার কিছুটা দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগছিলেন। তিনি দেখলেন ক্লাউসনারের হাতের আঙ্গুল কুঠারের গায়ে আরো শক্তভাবে আটকে বসেছে। তিনি দেখলেন, এখন একমাত্র রাস্তা হল এখান থেকে যত দ্রুত সম্ভব দৌড়ে পালানো। তিনি নিশ্চয়ই সেটা করতে পারবেন না।

’ঠিক আছে।’ ডাক্তার বললেন, ‘আমি আয়োডাইন দিয়ে পেইন্ট করে দিচ্ছি।’

তিনি তাঁর কালো ব্যাগটা আনতে গেলেন। ঘাসের ওপর দশ গজ দূরে ব্যাগটা পরে ছিল। ব্যাগটা খুলে আয়োডাইনের বোতল ও তুলা বের করলেন। তিনি গাছের কান্ডের কাছে গেলেন। বোতলের মুখ খুলে আয়োডাইন বের করে তুলায় নিলেন। হাঁটু গেড়ে গাছের কাঁটা জায়গায় লাগালেন। একটা চোখ তিনি ক্লাউসনারের ওপর রাখলেন। ক্লাউসনার তখনও হাতে কুঠার নিয়ে দাঁড়িয়ে ডাক্তারকে লক্ষ্য করছিলেন।

’ আপনি কি নিশ্চিত যে কাজটা ঠিকভাবে হচ্ছে।’

’হ্যা’। ডাক্তার বললেন।

’এখন আরেকটাতে করেন। ঠিক এর ওপরেরটা।’

তার কথামতো ডাক্তার তাই করলেন।

’ঠিক আছে।’ ক্লাউসনার বললেন, ‘আপনার কাজ শেষ।’

ডাক্তার সোজা হয়ে দাঁড়ালেন। অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তাঁর কাজ পর্যবেক্ষণ করলেন। ‘সবকিছু ভালো মনে হচ্ছে।’

ক্লাউসনার খুব কাছে এসে দাঁড়ালেন। এবং ক্ষত জায়গা ভালোভাবে পরীক্ষা করলেন।

’হ্যা।’ তিনি তাঁর বিশাল মাথা ধীরে ধীরে ওপরে-নীচে ওঠানামা করলেন। ‘হ্যা, খুব ভালো দেখাচ্ছে।’ এক পা পিছনে এসে যুক্ত করলেন, ‘আপনি কালকে আবার এসে সবকিছু দেখবেন?’

’ওহ্‌ হ্যা।’ ডাক্তার বললেন। ‘অবশ্যই’।

’এবং আরো একটু আয়োডাইন দেবেন?’

’যদি দরকার হয়। দেব।’

’ধন্যবাদ ডাক্তার।’ ক্লাউসনার বললেন। তিনি তাঁর মাথা নাড়লেন। হাত থেকে কুঠারটা ফেলে দিলেন। আচমকা হেসে উঠলেন। তাঁর হাসিতে কিছুটা পাগলামি ছিল। ডাক্তার তাঁর দিকে এগিয়ে এলেন। ক্লাউসনার ডাক্তারের হাত ধরে বললেন, ‘আসুন। এখন আমরা যাব।’

এই বলে তারা হাঁটতে শুরু করলেন। পার্কের ভিতর দিয়ে দুজনে নীরবে হেঁটে চললেন। কোন ব্যস্ততা ছিল না তাদের। বাড়ির উদ্দেশ্যে চললেন তারা।




অনুবাদক পরিচিতি
মনিজা রহমান
কবি। গল্পকার। অনুবাদক। সাংবাদিক। 
নিউ ইয়র্কে থাকেন।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন