মঙ্গলবার, ১৬ মার্চ, ২০২১

বেগম জাহান আরা'র গল্প : চিকিৎসা


হতভম্ব হয়ে গেছে ইস্কান্দার। আবার অ্যান্টিবায়োটিকের কোর্স দিয়েছেন ডাক্তার সাহেব। চতুর্থবার এই নিয়ে। কিন্তু খুক খুক কাশি আর সর্দি সর্দি ভাব যাচ্ছে না। গলার দুই পাশের ব্যথাও থেকে যাচ্ছে। সবচেয়ে অবাকের বিষয় হলো, দুই মাসে তার ওজন কমেছে আট কেজি। তা নিয়ে মাথা ব্যথা নেই ইস্কান্দারের। বেশ ভুঁড়ি হয়েছিলো। সেটা কমছে ভেবে খুশিই হচ্ছিলো সে।

বিষয়টা নিয়ে কথা তুললো তার এক প্রতিবেশি, হাস্নাহেনা বিশ্বাস। ইসকান্দারের সাথে এক অফিসে কাজ করে তারা। শুধু চাকরির সুবাদে বন্ধুত্ব নয়। পাড়াতুতো সম্পর্কটাই বড়ো। এখন ফেইস বুকের কল্যানে আকাশতুতো বন্ধুও। ধানমন্ডির এক ভবনে প্রায় দশ বছর হয় তারা পাশা পাশি ফ্লাটে আছে। পরে জানা যায়, তাদের বাবারাও বন্ধু ছিলেন রাজশাহিতে থাকার সময়। দুই পরিবারের বাবা মায়েরা কদিনের জন্য বেড়াতে এলে মিলন মেলা বসে যায়। অন্য প্রতিবেশিরা এই দুই পরিবারের সৌহার্দ সম্প্রীতি দেখে রীতিমতো হিংসে করে।

হাস্না হেনাই একদিন বলে, এতো রোগা দেখাচ্ছে কেনো তোমাকে ইস্কান্দার ভাই?

-আমি চেয়েছি, তাই।

-মানে?

-ভুঁড়ি হয়ে যাচ্ছিলো না?

-বয়সের ওজন খারাপ লাগে না তো।

-না না , ঠিক আছি আমি।


দিন কেটে যায়। ইস্কান্দার আরও শুকিয়ে গেছে। এবার হেনা বললো, একবার ব্যাংকক থেকে চেক আপ করে এসো ভাই।

-এপোলো হাসপাতালের রিপোর্টে বলেছে, সব ঠিক আছে।

-তবু বেটার চেক আপ করা ভালো। তাছাড়া তুমি তো এফর্ড করতে পারো। তবে কেনো, না?

-যতোটা ভাবো, অতোটা নয়। বাইরে যাওয়া মানেই তো দুতিন লাখ টাকার ব্যাপার।

-হোক না।

-দেখি এবারে পঞ্চমবারের মতোও অ্যান্টিবায়োটিক খেয়ে।


শিক্ষিত লোককে বেশি বলা যায় না। হেনা জানে, বারবার অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়া ঠিক না। তাছাড়া সবার একধরণের ড্রাগ ঠিক কাজও দেয় না। দেশের চিকিতসায় কেমন এক অবহেলা আর অমনোযোগ থাকে ডাক্তারদের। হয়তো যে ড্রাগ সে খাচ্ছে, সেটার প্রতিরোধ গড়ে উঠেছে

শরীরে। সেটা দেখা দরকার। তা করবে না। ডাক্তার ওশুধ দিয়েই খালাস। দুই চোয়ালের গোড়া ফোলা। দেখে মনে হয় মামসের ফোলা।

কেমন এক মায়া জাগে ইস্কান্দারের জন্য। মেয়ে তিনটেই বিদেশে। বৌটার ইনসোমনিয়া রোগ। সারারাত জেগে থাকে। সারাদিন ঘুমায়। কাজের বুয়ারাই সংসার দেখে। আর সে নিজে তো সিঙ্গেল মাদার। ছাড়াছাড়ি হয়নি তাদের। বিদেশে গিয়ে আর ফিরে আসেনি মানুষটা। আসবেও না। আইনি তালাক নেয়ার ব্যাপারে হেনার কোনও তাগাদা বা আগ্রহ নেই। চলছে জীবন, চলুক। বলা তো যায়, বাচ্চাদের বাবা বিদেশে থাকেন।

যদিও হাস্যকর, অপমানকর, তবু সমাজ সংসারের চোখে সম্মানের মনে করা হয়।

দুই ছেলে মেয়ে নিয়ে একাই থাকে হেনা। ভালো চাকরি করে। অভাব নেই সংসারে। দেশের বাড়ি থেকে কলাটা মূলোটা আসতেই থাকে। ছেলে অনার্সে ভর্তি হলো একটা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে। গতো মাস থেকে একটা এপার্টমেন্টে চলে গেছে। চারজন ছাত্র বাসা ভাড়া নিয়ে বিশ্ববদ্যালয়ের কাছাকাছি থাকে। মেয়ের বিয়ের কথা পাকা হয়েছে। আগামি সপ্তায় তার বিয়ে। ফোনে ফোনে দাওয়াত। ফোনে কমিউনিটি সেন্টার ভাড়া করা। ফোনে ডেকোরেটর ঠিক করা। মেনু ঠিক করা। অনলাইনে বিয়ের বাজার করা। একা একাই সব কাজ সেরে ফেলেছে। বাবা মার বয়স হয়েছে। নানা রোগ ব্যাধিতে জর্জরিত। নিজের বাড়ি ছেড়ে কোথাও থাকতে চান না। বাস্তবতা হলো, হেনারও সময় নেই তাদের দেখভাল করার। তাই আসবেন বিয়ের দুদিন আগে। চলেও যাবেন দুদিন পরে।

প্রায় দুতিন সপ্তা গেলো বিয়ের ঝামেলায়। ইস্কান্দারের খোঁজ নেয়া হয়নি। বিয়ের দিন দেখেছিলো নিমন্ত্রিত অতিথিদের সাথে। ভালোই আছে মনে হয়েছে। ওর স্ত্রীর খবরটা নিতে পারেনি। বিয়ের দাওয়াতেও আসেনি। হয়তো শরীর ভালো ছিলো না। কে জানে? একটু কি বেশি ভাবছে হেনা ওদের কথা আজকাল? প্রশ্নটা হঠাতই মনে আসে। কেমন কুন্ঠা জাগে।

একমাস ছুটি শেষে কাজে জয়েন করেই শুনলো ইস্কান্দার ছুটিতে। খুব একটা অপরাধ বোধ হলো হেনার। বলতে গেলে ঘাড় ঘুরোলেই বাসা। একবার খোঁজ নিতে হতো। আসলে এতো কাজ জমে থাকতো প্রতিদিন। কখন যে সূর্য উঠতো আর কখন অস্ত যেতো, সেটার হিসেব রাখাও দায় ছিলো। মেয়ের বিয়ের পর অতিথিদের আনাগোনা নিত্য। রাত বারোটার আগে বিছানায় যেতে পারেনি। ক্লান্তিতে শরীর ভেঙে ঝুর ঝুর করে খসে পড়ার দশা। তবু পরদিনের কাজ গুছিয়ে রাখতে হতো।

পরদিন সন্ধে বেলায় ইস্কান্দারের বাসায় যায় হেনা। কাজের বুয়ারা বললো, ডাক্তারের কাছে গেছে সাহেব। পরদিনও দেখা হলো না। শুক্রবারে আবার গেলো ইস্কান্দারের বাসায়। শুনশান বাসা। বৌ নিশ্চয় ঘুমাচ্ছে। কাজের বুয়ারা ঘুরে ফিরে ঝাড়া মোছা করছে। ইস্কান্দার লিভিং রুমেই শুয়ে আছে ডিভানের ওপর। শুকনো মুখ। বেশ রোগা দেখাচ্ছে। এক মাসে কেউ এতো রোগা হয়? দুইদিকের চোয়ালের গোড়া ফুলে আছে দেখাই যাচ্ছে।

ইস্কান্দার জানালো, রক্তে ইনফেকশন পাওয়া গেছে। বিশষ করে টনসিলের ফোলা কমছে না। তাই বাইরে থেকে সিরিঞ্জ দিয়ে টনসিলের টিসু নেয়া হয়। রিপোর্টে সামান্য ম্যালিগন্যানসি পাওয়া গেছে।

চমকে ওঠে হেনা। কিন্তু প্রকাশ করে না মুখের ভাবে। বলে, এবার তাহলে বাইরে গিয়ে একটা থরো চেক-আপ করে এসো ভাই। আর না করো না।

-মনে মনে তাই ঠিক করেছি।

-মেয়েদের সাথে কথা হয়েছে?

-এখনও না।

-হুম! কথা বললে ভাল হতো না?

-আজই বলবো মনে করেছি।

-তা কোথায় যাবে ভাবছো?

-ভেবেছিলাম দিল্লি যাবো। কিন্তু বন্ধুবান্ধবেরা কেউ বলছে ব্যাংকক, কেউ বলছে সিঙাপুর।

-আমার এক ভাগ্নি ডাক্তার। সে গিয়েছিলো চিকিতসার জন্য। তার মতে, অনকলোজির ব্যাপারে সিঙাপুরই ভালো।

-বাইরে চিকিতসা খুব এক্সপেনসিভ হয়ে গেছে হেনা।

এমন করে উচ্চারণ করলো নামটা, বুকের ভেতর গিয়ে রিন রিন করে উঠলো হেনার। কদিন আর এমন করে ডাকতে পারবে? হৃদয় জুড়ে কেমন এক হাহাকার অনুভব করে। এই রোগতো সারার নয়। কনফার্ম টিকেট দিয়ে গেছে আজরাইল। শুধু তারিখটা বলেনি।

ব্যস্ত নাগরিক জীবনে যা হয়। আবার নিজের বৃত্তে নাক ডুবে যায় হেনার। তবু খোঁজ রাখে ইস্কান্দারের। সিঙাপুরে যাওয়ার সব খবরই রাখে। খচ খচ করে মন। ক্যান্সারের মতো একটা রোগ ইস্কান্দারের না হলে কি হতো? এক বৌয়ের জন্যেই তো জীবনটা ছ্যারাবেরা। মায়া লাগে হেনার। কি চমতকার সুদর্শন মানুষ! এদের জীবনেই যতো গেরো।

সিঙাপুর থেকে ফোনে ইস্কান্দার জানালো, হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। প্রথম চেক আপেই ওরা জানিয়েছে, রক্তে ইনফেকশন তো আছেই, ম্যালিগন্যান্সিও আছে দুই টনসিলে। ফুলে চারগুন হয়ে আছে দুটো টনসিল। চব্বিশ ঘন্টার মধ্যেই অপারেশন করতে হবে। সাথে সাথেই শুরু হবে কিমো। অপারেশন ফি দশহাজার ডলার। ইস্কান্দারের কাছে আছে তিন হাজার ডলার। বাকি টাকা জোগাড় করতে হবে, কিন্তু কি ভাবে?

নিদারুন প্রশ্ন। চাকুরে মধ্যবিত্তের জীবনে এক লহমায় দশ হাজার ডলার, মানে প্রায় দশ লাখ টাকা। জোগাড় করা কি সহজ কথা? হেনা বলে, একটু ভেবে নিই।

-কি আর ভাববে হেনা? অপারেশন টপারেশন হবে না। দেশেই ফিরে আসি কাল।

-তোমার তো হড়বড়ে স্বভাব ভাই। বললাম, একটু ভাবি। পৃথিবীতে কোনো সমস্যারই রেডিমেইড সমাধান নেই। এটা তো বোঝো?

-আহা, তুমি যদি আমার সাথে আসতে দুদিনের জন্য!

-সে না হয় যাওয়া যাবে। এখন কাঁদিও না আমাকে। বলো তো, জামাইদের সাথে সম্পর্ক কেমন তোমার?

-ভালোই ।

-টাকা ধার নিতে পারবে?

-অনেক টাকা যে হেনা।

-তুমি তো ধার নেবে।

-তা ঠিক।

-তাহলে চাও। চরম দুর্দিনে লজ্জা করে থাকলে চলে না।

-কিন্তু একদিনের মধ্যে কিভাবে পাবো টাকা?

-কয়েক মিনিটের মধ্যে আজকাল পৃথিবীর দুরতমো প্রদেশ টাকা পাওয়া যায় ‘ওয়েস্টার্ণ ইন’ ব্যাঙ্কের মাধ্যমে।

-তাই? জানতাম না তো?

-পুরুষ মানুষ অনেক কিছুই যে জানে না, সেটাও জানে না তারা।

-তুমি পারোও বটে হেনা। দিলে তো একটা খোঁচা?

হাসে দুজনেই মন খুলে হা হা করে। বুকের ভেতরে জমে থাকা ভারি বদ্ধ একটা বাতাসের চাপ উড়ে গেলো ইস্কান্দারের।। ফুরফুরে লাগছে। আহা, আনন্দ কতো কাছে থাকে মানুষের!

ইস্কান্দার ভাবে, কি যে লক্ষ্মী মেয়ে এই হেনা। পড়লো গিয়ে এক অভাগা বর্বর শয়তানের হাতে। সংসার আলো করে রাখার মতো মেয়ে। তার ঘরে এলে পুতুলের মতো করে সাজিয়ে রাখতো। উপচে উঠতো জীবন সুখের নুপুর নিক্কনে। নিষ্ঠুর বিধাতা! এমন ভুল হিসেব হয় কি করে তার!

এপোলোর রিপোর্ট পাওয়ার পর থেকে কেমন এক আঁধার ঘিরে ধরেছে তাকে। বৌটা কিছুই বুঝতে পারছে না। চার বছর থেকে সাকিনার ইনসোমনিয়া। সাথে ডিপ্রেশন। ক্রমেই বাড়ছে তার সমস্যা। সংসারটা নীরব অরন্য হয়ে গেছে। মানুষজন আছে, সাড়া শব্দ নেই। কাজের বুয়ারা ঘোরে ফেরে, কথা বলে না মালকিনের সাথে। কারণ, সাকিনা তো ঘুমের ঘোরেই থাকে। তার ওপর সারা দেহে কেমন একটা বিস্বাদ অনুভব এখন ইস্কান্দারের। জীবন বলে কিছু নেই তার। প্রায় আটত্রিশ বছরের সংসার। দিশেহারা লাগে মাঝে মাঝে। হেনার সাথেই যা কথা হয়। ও একাধারে বন্ধু, বোন, প্রতিবেশি , পরামর্শক এবং আরও কিছু হয়ে উঠেছে এই দুর্দিনে। সারাক্ষন কাছে পেতে ইচ্ছে করে।

ব্যবস্থা হয়ে গেলো। সেদিন বিকেলেই টাকা পেয়ে গেলো ইস্কান্দার। পরদিন অপারেশনও হলো। চারদিন পরে ফিরে এলো ঢাকায়। কেমন বিধ্বস্ত হয়ে গেছে চেহারা। ধকল গেছে বেচারার ওপর দিয়ে। কি ভীষণ একা মানুষটা! এমন সময় পরিবারের কেউ না কেউ কাছে থাকে। হেনা সাথে গেলে কি হতো? মনটা মোচড় দিয়ে ওঠে। আসলে ক্যানসার শোনার পরে থেকেই মন ভেঙে গেছে ইস্কান্দারের। স্বাভাবিক। সাথে শারীরিক, মানসিক, অর্থনৈতিক, এবং পারিবারিক চাপ।

সিঙাপুরের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী কিমো চলছে। ঢাকায় বলেছিলো, স্টেজ ওয়ান। সিঙাপুর বলেছে, স্টেজ ফোর। প্যানক্রিয়াস আক্রান্ত হয়েছে। ইস্কান্দার অফিস করে। কিমো নেয়। বাড়ির বাজার করে। পার্টিতে যায়। শুধু টুওরে যায় না। কিমো নেয়ার নিয়মটা ভাঙে না।

কিমোটা সে পরিচিত হাসপাতালে গিয়েই নেয়।

হেনা মাঝে মাঝে কিমো নেয়ার দিনে যায়। বসে গল্প করে। চেষ্টা করে ওর থেঁতলে যাওয়া সময়টার গায়ে ব্যথা নাশক আরামের মলম বুলিয়ে দিতে।

ইস্কান্দারের একটা অব্যক্ত প্রত্যাশা জন্মে গেছে হেনার কাছে। কিমোর দিনে সে কাছে না থাকলে খুব খারাপ লাগে। এইসব কথা মুখ ফুটে বলতে হয় না কাউকে। হেনা বেশ বোঝে। তাই সপ্তায় একদিন অন্তত কিমোর সময়টা সে থাকে হাসপাতালে। বেশ লম্বা সময় তারা গল্প করে। কখনও

চা বিস্কুট চানাচুর খায়। রাজ্যের খাজুরে গল্প ডেকে আনে। হেনা কপালে হাত বুলিয়ে দিলে কখনও ঘুমিয়ে পড়ে ইস্কান্দার। দেহের মধ্যে ফোঁটায় ফোঁটায় ওশুধ যায়। দেখতে দেখতে কখনও হেনার দুচোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে টপ টপ করে। আহা, মানুষটা চলে যাচ্ছে ধিরে ধিরে। কেমন একটা দুঃসহ বোধ ছড়িয়ে পড়ে তার মন শরীর জুড়ে।!

এরই মধ্যে পরিচিত এক প্রতিবেশির সাথে দেখা হাসপাতালেই। তার স্ত্রীর সিজারিয়ান করে বেবি হয়েছে। তারপর থেকেই বেবিকে অক্সিজেন টেন্টে রাখা হয়েছে। আস্তে আস্তে জানলো হেনা, ছয় মাসের বেবিকে পৃথিবীতে আনা হয়েছে। কারণ, মায়ের হাই বিপি।

ডাক্তারি ব্যাখ্যা জানে না হেনা। তবে মনে হয়, কাজটা ঠিক হয়নি। এই আধুনিক চিকিতসার কালে বিপি সামলে পেটের বাচ্চাটাকে আরও কয়েক সপ্তা রাখা যেতো না কি? কানাঘুঁষো আগেও শুনেছে হেনা যে, শুধু বিল বাড়ানোর জন্য এই রকম অমানবিক কাজ করা হয় হাসপাতালে। লোকে আরও বলে, ব্যথা ভাল করে না উঠতেই সিজার করে ফেলে হাসপাতালে। রোগি মারা যাওয়ার পরে লাইফ সাপোর্ট দিয়ে রাখে বিল বানানোর জন্য।

অসম্ভব মনে হয় হেনার। কেমন করে এসব হয়? অবিশ্বাস্য! অমানবিক!

একদিন ইস্কান্দার এবং হেনা দেখতে গেলো প্রতিবেশির বৌকে। তিনি আবার নিজেই ডাক্তার। কথায় কথায় হেনা বলেই ফেল, ডাক্তার হয়ে আপনি কি করে সিজার করতে দিলেন ভাই?

মহিলা বললেন, জানেন, ওরা আমাকে রাতে ঘুমোতেই দিতো না। এক ঘন্টা পর পর ডেকে তুলে বিপি দেখতো। ফলে বিপি রিডিং নামতো না। শরীর খারাপ লাগতো আমার। তখন সিস্টার বলতো, আপনার সিজার তো মাস্ট। বেবি দুর্বল হয়ে পড়েছে। শুনতে শুনতে আমিও ভাবলাম, বেবিটা তো বাঁচুক। তারপর তো এই অবস্থা।

হেনা জানতে চায়, কবে বাড়ি যেতে পারবেন বেবি নিয়ে?

- আমি তো আজই যেতে পারি। কিন্তু বেবিকে নাকি সাত সপ্তা অক্সিজেন টেন্টে রাখতে হবে। কতো যে বিল হবে, আল্লাই জানেন।

হেনার মনে হলো ডাক ছেড়ে কাঁদে। কি অবস্থা! কেমন জীবন তারা কাটাচ্ছে? টাকাই বড়ো হয়েছে এখন? চিকিতসা হয়েছে নিরেট ব্যবসা। শুধু দেশেই নয়। বিদেশেও একই ব্যাবসা। আসলে বিদেশ থেকেই তো শিখছি আমরা সব শয়তানি।

ফিরে এসে ইস্কান্দার কিমো দিতে শুরু করলো। কয়েক ঘন্টা মহিলা এবং তার অপুষ্ট বাচ্চাটারই গল্প করলো তারা। প্রসঙ্গ পালটে হেনা বলে, আচ্ছা ইস্কান্দার ভাই , কিমো দিয়ে টনসিলের ফোলা কমিয়ে, তোমার অপারেশন করলে কি ভালো হতো?

- এখন মনে হয়, সেটাই করা উচিত ছিলো। কিন্তু ওঁরা এমন তাড়াহুড়ো করলেন, যেনো তখনি সার্জারি করলে আমি রোগ মুক্ত হয়ে যাবো।

- কথা কি, আমরা তো ডাক্তার নই। তাই ওদের ওপর নির্ভর করতেই হয়।

- সেই তো কিমো দিচ্ছি হেনা। মরি তো নি?

- ওরা হয়তো ভাবে, রোগি যদি চলে যায়, তাহলে তো টাকাও যাবে।

- তাই মনে করো তুমি?

- নির্ঘাত। না হলে এই তড়িঘড়ি করবে কেনো? একবার ভাবলো না, একদিনের মধ্যে এতোগুলো টাকা কোথায় পাওয়া যাবে?

- হুম।

- তোমার ভাগ্য ভালো, জামাই দিয়েছিলো টাকা। দশ হাজার ডলার তো চাট্টিখানি কথা নয়!

- এখন মনে হয়, ব্যাংকক গেলেই ভালো ছিলো।

- কি আর ভালো হতো? হয়তো এক হাজার ডলার কম লাগতো। অথবা না। সবাই রাক্ষস হয়ে গিয়েছে। টাকার ব্যবসাই বড়ো। রোগ রোগি কিছু নয়।

- মানুষ তাহলে করবে কি? চিকিতসা করবে না?

- নিশ্চয় করবে। আমরা বাঁচতে চাই সবাই। সব কিছুর বিনিময়ে সুস্থ হতে চাই। এই চাওয়াকেই ওঁরা এক্সপ্লয়েট করে। ভয় দেখায়। তড়িঘড়ি করে। আয়ুর স্বপ্ন দেখায়। চিকিতসা বানিজ্যের পশরা করে তোলে রোগীকে।

হঠাত শ্বাস কষ্ট শুরু হয় ইস্কান্দারের। হেনা দৌড়ে গিয়ে ডাক্তার ডেকে আনে। সিস্টার এসে অক্সিজেন পাইপ লাগায় নাকে। কিছুক্ষনের মধ্যে ইস্কান্দারের শ্বাস স্বাভাবিক হয়। দেখে খুব কষ্ট লাগে তার।

মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় হেনা। ইস্কান্দার হেনার হাতটা ধরে বুকে রাখে।

নিঃশব্দে ঝরে হেনার অশ্রু।

- কাঁদছো কেনো হেনা? একটা মিরাকল হতেও পারে তো?

শুনে বুক ফেটে যায় হেনার। ভাবে, ওসব শুধু গল্প। আশার ওপারে আশার স্বপ্ন। এতো উন্নত চিকিতসা চলছে। কিছুমাত্র উন্নতি দেখা যায় না।



হঠাত ইস্কান্দার টেনে নেয় হেনাকে বুকের ওপর। বলে, আহ কি শান্তি। এই সব কিছু ছেড়ে চলে যাবো খুব তাড়াতাড়ি, তাই না হেনা?



বিব্রত হেনা। ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে। মনে হলো, হঠাত এক ঝাঁক গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে গেলো তার বুকে। নাকে মুখে ফিনকি দিয়ে রক্ত উঠলো।

ইস্কান্দারকে জড়িয়ে ধরে বলে, এসব বলতে নেই। শান্ত হও প্লিজ। একটু পরেই আবার শ্বাস কষ্ট শুরু হলো।

ডাক্তার এসে রেডিও থেরাপির কথা বললেন। সেজন্য অন্য হাসপাতালে যেতে হলো। ইস্কান্দারের ধারণা, রেডিও থেরাপি দিলে মিরাকেল হতেও পারে। কিন্তু ফল হলো উল্টো। থেরাপির ফলে ইস্কান্দারের শরীরে রক্তের প্লেটিলেট হঠাত করে আশংকাজনক হারে কমে গেলো। এই সম্ভাবনার কথা বলেনইনি ডাক্তার। নতুন মালদার রোগি ভর্তি করাতে পারলে তাঁর শেয়ারে কড়ি জমবে। এই রোগি আর কদিন। এ তো যমযাত্রার ট্রানজিটে এখন। যে কোনোও সময় টেইক অফ-এর ডাক পড়বে।

হেনা ভাবলো, বাঁচতে চেয়ে ইস্কান্দার এবার মারাই যাবে। এমন ব্যয়বহুল চিকিতসার এই ফল? হেনার ইচ্ছে ছিলো না রেডিও থেরাপি দেয়া। কিন্তু বলতে পারেনি। মিরাকেলের বদ্ধমূল আশা ইস্কান্দারের মনে। মাথার সব চুল পড়ে গিয়ে কেমন অসহায় দেখাচ্ছে তাকে। বাসায় ফিরে নির্জনে কাঁদে হেনা।

ডাক্তারের সাথে কথা বলে হেনা একদিন। তিনি জানালেন, আমরা ওঁকে অপশন দিয়েছিলাম। উনি চাইলেন থেরাপি।

- এই চিকিতসার সাইড এফেক্টই যে প্লেটিলেট কমে যাওয়া, সেটা বলেছিলেন?

- ঠিক মনে পড়ছে না। তা রোগি আপনার কে হন?

- কাজিন। বন্ধু।

এমন প্রশ্ন সাধারণত ডাক্তারেরা করে না। বিরক্ত হয় হেনা।

কদিন কি ঝক্কি গেলো। প্লেটিলেট পাওয়া যায় না সহজে। একজন বললো, পেপের সবুজ পাতার রস খেলে প্লেটিলেট বাড়ে তাড়াতাড়ি। এই সহজ জিনিসটার যেনো দুর্ভিক্ষ লেগেছে। নগর জীবনের মরুভূমিতে গাছ পালা খুঁজেই পাওয়া যায়না। পেপের গাছ তো আরোই না। তবু অনেক চেষ্টায় কষ্টে সংগ্রহ করা গেলো পেপে পাতার রস। সবুজ রঙের পানীয় দেখেই ইস্কান্দার মুখ ঘুরিয়ে নিলো। খাবে না সে। সিস্টারেরা অনেক বুঝিয়ে জোরাজুরি করে একবার একগ্লাস খাওয়ালো। সেই প্রথম, সেই শেষ।

কিন্তু রক্ত জোগাড় করতেই হয়েছে। সেও কি সহজ কাজ? যমে মানুষে টানাটানির একশেষ! খরচের কথা না বলাই ভালো।

জীবন মরণ সন্ধিক্ষনে কেটে গেলো পাঁচ দিন। বাড়ি ফিরে বিশ্রাম হলো না। ডাক্তার আবার কিমো শুরু করতে চাইলেন। উপায় নেই। কিন্তু কিমো নিয়েই বা কি হবে আর? হেনা বুঝতেই পারছে সব। ইস্কান্দার বোঝে না?

দেড় বছরে ধনে প্রাণে শেষ হয়ে গেছে ইস্কান্দার। মেয়েরা একে একে এসেছে। দেখে গেছে বাবাকে। প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকা খরচ হয়। বাড়ি বিক্রির প্রয়োজন দেখা দিলো। মেয়েরা চাইলো, বাড়িটা থাক। আপাতত তারা টাকা দেবে চিকিতসার। বড়ো মেয়ে চায়, বাবাকে লাইফ সাপোর্ট দেয়া হবে। অন্যেরা চায় না। ইস্কান্দারও চায় লাইফ সাপোর্ট। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অতি ব্যয়বহুল চিকিতসার জন্য সব রকম সাহায্যের আশ্বাস দিলো।

হেনাকে ডাক্তার বলেছেন, ফুসফুসের অবস্থা খুবই খারাপ। দেখছেন তো প্রায়ই নিশ্বাসের কষ্ট দেখা দিচ্ছে। সময়টা শেষ হয়ে এসেছে একেবারেই। যে কোনও দিন, মানে, মানে বোঝেনই তো। পরিচিত জনদের খবর দেন। কেউ দেখতে চাইলে, এসে দেখে যাবেন।

কি বলবে হেনা? এমন এক অসুখ বেধে গেলো, যার কোনও চিকিতসা নেই। বৌটা আধা জীবন্ত অবস্থায় বেঁচে আছে। তবু তো সংসার নামের খেলাটা ছিলো ওদের জীবনে। এখন কি হবে? আধা পাগল বৌটাকে দেখবে কে? কিন্তু সে কে? এতো ভাবছে কেনো? সে কেনো পরিচিতদের খবর দেবে?

বাড়িতে এসে হাউমাউ করে কাঁদলো হেনা। কেনো এই কান্না, বুঝতে পারলো না। বুকটা ফেটে যাচ্ছে। সত্যিই তো, ইস্কান্দার তার কে? এতো কষ্ট হচ্ছে কেনো তার জন্য? আহারে জীবন! যতো চিকিতসাই হোক, যতো টাকাই খরচ হোক, আয়ু ফুরিয়ে গেলে আর থাকা যায় না এই সুন্দর পৃথিবীতে। লাইফ সাপোর্ট শুধুই সান্ত্বনা। মৃত্যুর পর কিছুক্ষন শরীর গরম রাখা মাত্র। শিক্ষিত মানুষ ইস্কান্দার। নিশ্চয় বোঝে সব। তবুও বোঝে না।

সেই রাতেই নার্স ফোন করে জানালো, ইস্কান্দারকে অতি দ্রুত লাইফ সাপোর্ট দিতে হবে। একেবারেই অক্সিজেন যাচ্ছে না ভেতরে। কোথায় যেনো একটা সই লাগবে। খুব তাড়াতাড়ি দরকার সইটা। দিতে হবে তাকেই কাজিন হিসেবে। বড়ো ডাক্তার বলেছেন।

আজরাইলের দেয়া কনফার্ম টিকেট হাতেই আছে ইস্কান্দারের। আহহা, টেক অফের সময় হয়ে গেছে তবে! এই জগতের পর্যটন শেষ হয়ে গেলো তার! ইস, কফিনের গায়ে শেষ পেরেকটা তাকেই কেনো ঠুকতে হবে? দিশেহারা লাগছে হেনার। মানুষটা চলে যাবে হয়তো আজই! আর কোনোদিন দেখা হবেনা তার সাথে। কান্নাও আসছে না তার। কাজ করছে না কোনও অনুভূতি।

ফোনটা রেখে বিছানায় আছড়ে পড়লো সে।

ধুমায়িত বাড়বাগ্নির সহস্র শিখা ঝাঁপিয়ে পড়লো তার গায়ে। জেগে থেকেই পুড়ে ছাই হতে লাগলো হেনা।



লেখক পরিচিতি
বেগম জাহান আরা

৩০/১০/১৯ , গোলম, জার্মানি

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন