মঙ্গলবার, ১৬ মার্চ, ২০২১

আদোলফো বিখয় কাসেরেস'এর গল্প : পাউলিনার স্মৃতিতে



অনুবাদ : জয়া চৌধুরী

পাউলিনাকে বরাবর চেয়েছি আমি। শুরুর দিককার স্মৃতিতে পাউলিনা আর আমি লরেল গাছে ঘেরা একটা অন্ধকার পাথরের সিংহ ভরা গোলাকার পার্কে বসে আছি। পাউলিনা বলছে আমি নীল রঙ ভালবাসি, আঙুর ভালবাসি, আইসক্রীম ভালবাসি, গোলাপ ভালবাসি, সাদা ঘোড়া ভালবাসি। আমি বুঝে গেছি আমার সুখের দিন শুরু হয়েছে। কেননা এইসব জিনিসগুলো দিয়ে পাউলিনাকে বোঝা যেত। আমাদের দুজনকে এমন জাদুময় দেখাত যে একটা গল্পের বইয়ের শেষে যেখানে দুটি আত্মার মিলন হচ্ছে সেখানে আমার বান্ধবীটি মার্জিনের পাশে লিখে রেখেছিল - “আমাদের পছন্দ আগেই মিলে গিয়েছে।” “আমাদের” শব্দটা সেইসময় ‘আমাকে’ আর ‘ওকে’ বোঝাত।

ঐ মিল সম্পর্কে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আমি যুক্তি দিয়েছিলাম যে আমি পাউলিনার সামান্য দূরের কোন ভাবনার এক খসড়া ছিলাম। মনে আছে একটা খাতায় লিখেছিলাম – সব কবিতাই কাব্যের হিজিবিজি আঁচড় আর প্রতিটি বিষয়েই ভগবানে পূর্বাভাস থাকে। ভাবতাম পাউলিনাকে দেখে আমি বেঁচে গেছি। আমি দেখতাম ( এবং আজও দেখি) আমার আমি হয়ে ওঠার সবচেয়ে ভাল সম্ভাবনা হচ্ছে পাউলিনা ও আমার একাত্ম হয়ে ওঠা। ও যেন একটা আশ্রয় যেখানে আমার স্বাভাবিক ত্রুটিরা আমার জবড়জং স্বভাব আমার গাফিলতি আমার গুমোর আমার অহংকার থেকে মুক্তি পেতাম।

জীবন একটা মিষ্টি অভ্যাস ছিল। তা আমাদের অপেক্ষা করতে শিখিয়েছিল। যেন কোন স্বাভাবিক এবং নিশ্চিত কিছু হবে। আমাদের ভবিষ্যৎ বিবাহিত জীবন সম্বন্ধে পাউলিনার বাবামা আগেই সিদ্ধান্তে পৌঁছে ছিলেন । ওঁরা আমাদের কথা দিয়েছিলেন যে আমি ডক্টরেট ডিগ্রি পাওয়ার পরেই আমার হাতে মেয়েকে তুলে দেবেন। একটা সাজানো ভবিষ্যৎ আমরা বহুবার কল্পনা করেছি, ধীরে সুস্থে কেরিয়ার করবার, বেড়াতে যাবার, ভালবাসবার... এত স্পষ্ট করে ভাবতে শুরু করতাম যে যেন একসঙ্গেই থাকতে শুরু করেছি আমরা।

আমাদের বিয়ের ব্যাপারে কথা বলা হয়ে গেলেও প্রেমিকপ্রেমিকার মত ব্যবহার করার চেষ্টাও করার কথা আমরা কখনো ভাবিই নি। পুরো ছেলেবেলাটা যখন আমাদের একসঙ্গে কেটেছে। একটা আধিক্যহীন শৈশবের বন্ধুত্ব রয়েই গিয়েছিল। আমার সাহস হতো না প্রেমিকার চরিত্রের বাস্তব রূপ দিয়ে ওকে বলা- “আমি তোমাকে ভালবাসি।“ যাইহোক কীভাবে ওকে ভালবাসব সেকথা ভেবে খুঁতখুঁত করা দ্বিধা নিয়ে আমি ওর দীপ্তিময় নিখুঁততা চেয়ে চেয়ে দেখতাম।

আমার কাছে বন্ধুবান্ধব এলে পাউলিনা ভালবাসত। ও সব সাজিয়ে গুছিয়ে তৈরী করে রাখত, আমন্ত্রিতদের আদরযত্ন করত আর চুপি চুপি বাড়ির মালকিনের চরিত্রটা পাল্পন করত। স্বীকার করছি এইসব আড্ডা আমার ভালো লাগত না। এইসব গেটটুগেদার করতাম যাতে খুলিও মন্তেরোর মত লেখকদের চিনে রাখাটা কোন ব্যতিক্রমী কাজ না হয়।

গেট টুগেদারের আগের দিন মন্তেরো প্রথমবার আমার বাড়িতে দেখা করতে এসেছিল। খুব ভাবভঙ্গী দেখাল লোকটা। প্রচুর ম্যানুস্ক্রিপ্ট নিয়ে স্বৈরাচারীদের মত আচরণ করল, তারপর সে খসড়া নাটকটাই পরে ছাপাতে দেয়। ও চলে যাবার একটু পরেই আমি ঐ প্রায় নিগ্রোদের মত কাল লোমশ লোকটার মুখটা ভুলে গিয়েছিলাম। সেইখানে যে গল্পটা আমি পড়েছিলাম সেটার উল্লেখ করে পাউলিনা বলেছিল- মন্তেরো আমার দর বাড়িয়েছে। পুরো সিনসিয়ারিটি নিয়ে লোকটা ওকেও বলে দেবে তার তিক্ততার প্রভাব বড্ড বেশিই ছিল। হয়ত সেটাই দৃষ্টি আকর্ষণ করত। কেননা সদর্থক ভাবেই তা বিভিন্ন ধরণের লেখককে নকল করার একটা ধোঁয়া ধোঁয়া ধান্দার পথ খুলে দিত। মূল আইডিয়াটা ছিল কুতর্ক চালানোঃ- যদি কোন বেহালাবাদক আর তার বেহালার বোঝাপড়ার ভেতর দিয়ে একটা বিষয় ও তার চলনের মধ্যে কোন সংকল্পিত সম্পর্ক মানুষের আত্মায় জেগে ওঠে। গল্পের নায়ক একটি মেশিন তৈরী করে যেখানে আত্মা তৈরী করা হয় ( একটা কাঠ আর দড়ি ও কোন এক নারী সৈনিকের কপাল।) তারপর নায়ক মারা যায়। তার শব সমাধি দেওয়া হয়। মেয়েটি তার দেখভাল করত। কিন্তু গোপনে লোকটা জীবিত ছিল। শেষ অনুচ্ছেদে নারী সৈনিকের উদয় হয় আর একসঙ্গে একটা স্টিরিওস্কোপ, একটা ট্রাইপড ও একটা লেড সালফাইড পাথর সেখানে পড়ে থাকে।

যতক্ষণ ধরে ওর এই তর্ক জাল–এর মধ্য থেকে সমস্যাটা আলাদা করে বের করতে পেরেছিম ততক্ষণে মন্তেরো লেখকদের সঙ্গে আলাপ করতে চেয়ে একটা অদ্ভূত প্রস্তাব দিল।

- কাল বিকেলে এসো- ওকে বললাম- কয়েকজনের সঙ্গে আলাপ করাব।

ও নিজেই নিজেকে অভদ্র বলে বর্ণনা দিল আবার নিমন্ত্রণ স্বীকারও করল। হয়ত ওকে আবার দেখতে পাব সেই আনন্দে রাস্তায় নেমে এলাম ওকে বিদায় জানাতে। আমরা যখন লিফট থেকে নামলাম উঠোনের পাশের বাগানটা আবিষ্কার করল মন্তেরো। বিকেলের নরম আলোয় হলঘরের কাচের দরজা ভেদ করে সেটার দিকে চেয়ে থাকল। লেকের বুকে জেগে ওঠা এক ফালি জঙ্গলের মত বাগানটাকে রহস্যময় লাগছিল। রাতের বেগুনী কমলা ফ্লাডলাইট ওটাকে চকোলেটের মত বীভৎস আকর্ষণীয় স্বর্গে বদলে ফেলত। বাগানটাকে মন্তেরো রাতেই দেখেছিল।

- তোমাকে খোলাখুলিই বলব- বাগান থেকে চোখ সরাতে সরাতে সে বলল- এই বাড়িটা যতখানি দেখলাম এই জায়গাটা তার মধ্যে সব চাইতে গুরুত্বপূর্ণ।

নির্দিষ্ট দিনে পাউলিনা আগেভাগেই চলে এসেছিল। বিকেল পাঁচটায় লোকজন আপ্যায়ণ করার জন্য সব সাজানো হয়ে আছে। ওকে দেখালাম সবুজ পাথরের একটা চীনা স্ট্যাচু, সেদিন সকালেই একটা অ্যান্টিক শপ থেকে কিনেছি। একটা বুনো ঘোড়া, হাতদুটো আকাশে, কেশর উড়ছে। দোকানী আমায় বলল ওটা প্যাশনের প্রতীক।

লাইব্রেরী ঘরের একটা তাকে ঘোড়াটাকে রাখল পাউলিনা আর বিস্ফারিত গলায় বলল- কী সুন্দর এটা... হ্যাঁ সত্যিকারের আবেগ নিয়ে বলল। আমি যখন বললাম - তাকেই দিচ্ছি ওটা - সে তখন আমার গলা জড়িয়ে চুমু খেল।

খাবার ঘরের সামনের ঘরটায় বসে আমরা চা খেলাম। ওকে বললাম- একটা স্কলারশিপ পেয়েছি দুবছরের জন্য, লন্ডনে গিয়ে লেখাপড়া করতে হবে। তাড়াতাড়ি আমরা জরুরী ভিত্তিতে বিয়েটা সেরে ফেলার কথা ভাবলাম। বেড়ানোর কথাও, ইংল্যান্ডে আমাদের থাকার কথা, জীবন কেমন হবে ( বিয়েটার মত এগুলোও শিগগিরিই এসব ঘটছে বলে আমাদের মনে হচ্ছিল।) আমাদের গেরস্থালি খরচের ডিটেইল হিসেব ভাবলাম, ক্ষতির কথা- সেসব মিষ্টি বিষয় যার জন্য আমরা আত্মসমর্পণ করেই দিয়েছিলাম; ঘুরতে যাবার সময় কতটা, বিশ্রাম নেবার সময় কত, কাজ করব কতটা হয়ত সেটাও। পাউলিনা যখন করবে সেই ফাঁকে আমি কোর্সের পড়া করে নেব। বইপত্র জামাকাপড় কি কি নেব ইত্যাদি ইত্যাদি। প্রোজেক্ট জমা দেবার কিছুদিন পরেই আমরা বুঝতে পারলাম যে আমার স্কলারশিপটা ফসকেই যাবে। আর এক সপ্তাহও দেরী নেই পরীক্ষার। তবে এটা পরিষ্কার ছিল পাউলিনার বাবামাও আমাদের বিয়েটা পিছোতে চাইছিলেন।

নিমন্ত্রিতরা আসতে শুরু করেছিল। আমার মনে আনন্দ ছিল না। কোন লোকের সঙ্গে যখন কথা বলছিলাম শুধু ভাবছিলাম কী করে লোকটার হাত থেকে সটকে পড়া যায়। বক্তার সামনে কোন ইন্টারেস্টিং বিষয় পেশ করার কথা ভাবাও আমার পক্ষে অসম্ভব ছিল। যদি কিছু মনে করতে চেষ্টা করতাম...। আমার স্মৃতি ছিল না...থাকলেও সেটা বহু দূরের স্মৃতি। উদবিগ্ন, মামুলি, মনমরা আমি এক জটলা থেকে অন্য জটলায় ঘুরছিলাম। চাইছিলাম লোকজন চলে যাক আমাদের একা থাকতে দিক। যাতে সেই মুহূর্তটা আসে। এত ক্ষণিকের সে মুহূর্তটুকু যে সময় আমি পাউলিনাকে ওর বাড়ি পৌঁছে দিতাম।

জানলার সামনে দাঁড়িয়ে মন্তেরোর সঙ্গে কথা বলছিল আমার প্রেমিকা। যখন দেখলাম ও চোখদুটো তুলল, মুখটা কি নিখুঁত ভাবে আমার দিকে ঝুঁকিয়ে দিল। আমার মনে হল পাউলিনার কোমলতার মধ্যে অনতিক্রমনীয় একটা আশ্রয় আছে যেখানে আমরা একান্তে থাকি। কিভাবেই না চাইছিলাম ওকে বলতে যে - আমি ওকে ভালবাসি! সে রাতেই একটা দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিলাম ভালবাসার কথা বলাটা ছেলেমানুষি- লজ্জার এমন মনোভাব ছাড়ব আমি। ইস যদি এখনই ওকে আমার ভালবাসার কথা জানাতে পারতাম! ওর চাউনিতে একটা ঝলমলে আনন্দ আর অবাক করা কৃতজ্ঞতা ধরা পড়েছিল।

পাউলিনা আমায় জিজ্ঞেস করল কোন কবি যেন তার প্রিয় নারী থেকে এত দূরে সরে যায় যে স্বর্গে দেখা হলে পর্যন্ত তাকে কুশলটুকুও জিজ্ঞেস করে না? কবির নাম আমার মনে ছিল- ব্রাউনিং। ভাসা ভাসা তার কটা লাইন। বাকি সন্ধ্যেটা অক্সফোর্ড সংস্করণটা হাটকে গেলাম। ওরা যদি আমায় পাউলিনার সঙ্গে থাকতে ছেড়ে না দেয় তাহলে অন্যদের সঙ্গে থাকার চেয়ে বেটার ওর জন্য কিছু খোঁজা। কিন্তু ব্যাপারটা এতই কঠিন ছিল যে হাল ছেড়ে নিজেকে জিজ্ঞেস করলাম কবিতাটা খুঁজে পাওয়া না গেলে তা অসম্ভব কিছু নয়। পিয়ানোবাদক লুইস আলবের্তো মরগ্যান আমাকে খেয়াল করেছিল। কারণ ও বলল-

- পাউলিনা মন্তেরোকে বাড়িটা ঘুরিয়ে দেখাচ্ছে।

আমি নিজের কাঁধ চেপে ধরলাম। প্রানপণে লুকোনো বিরক্তিটা চেপে নতুন উদ্যমে ব্রাউনিং-এর কবিতাটা খুঁজতে লেগে পড়লাম। চোখের কোন দিয়ে দেখলাম মর্গ্যানকে আমার ঘরে ঢুকতে। ভাবলাম ওকে ডাকি। পরক্ষণেই পাউলিনা আর মন্তেরোকে নিয়ে এল মর্গ্যান।

অবশেষে একজন অতিথি গেল। পরে হেলতে দুলতে বাকীরাও। সেই মুহূর্ত এল যখন ঘরে শুধু পাউলিনা আমি আর মন্তেরো রইলাম। যা ভয় করেছিলাম। পাউলিনা চমকে উঠে বললঃ

- খুব দেরী হয়ে গেছে। চলি,

মুহূর্তে মন্তেরো নাক গলালো।

- অনুমতি দিলে আমিই ওকে পৌঁছে দিচ্ছি।

- আমি যাব তোমার সঙ্গে।

পাউলিনাকে একথা বললে আমি মন্তেরোর দিকে তাকালাম। চোখ দিয়ে বোঝাতে চাইলাম আমার অবজ্ঞা আর ঘেন্না।

নিচে নামার পরে পাউলিনাকে বললাম সে চীনে ঘোড়াটা নেয় নি। বললাম-

- তুমি আমার উপহার দিতে নিতে ভুলে গেছ।

উঠে গেলাম ফ্ল্যাটে, মূর্তিটা নিয়ে এলাম। ওদের দেখলাম চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আছে। দৃষ্টি কাচের দরজা ভেদ করে বাগানটার দিকে। পাউলিনার হাত ধরলাম। মন্তেরোকে অন্য দিক দিয়ে কাছ ঘেঁষার কোন সুযোগই দিলাম না। কথাবার্তার মাঝে পাত্তা দিলাম না।

লোকটার খারাপ লাগল না। আমরা যখন পাউলিনার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে আসছিলাম সে আমার সঙ্গে সঙ্গে জোর করে এল। পথে আমরা সাহিত্য নিয়ে কথা বললাম। সম্ভবত খুব একাগ্র নিষ্ঠার সাথে। আমায় বলল – সে এক ক্লান্ত পুরুষ, কোন মহিলার কথা ভেবে মগ্ন। ওর পুরুষালী চেহারা আর সাহিত্যিকসুলভ দুর্বলতা –র অসঙ্গতি দেখে ভাবলাম একটা বর্ম দিয়ে ও সেটা রক্ষা করে। লোকটাকে বক্তা বলে মনে হলো না। সাহিত্যের দৌড় দেখে ঘেন্নায় ওর সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে হলো না। ওর দিকে চাইলাম- রোমশ মুখ আর শক্তপোক্ত ঘাড়।

সেই সপ্তাহে পাউলিনাকে প্রায় দেখিই নি। খুব পড়াশুনা করলাম। শেষ পরীক্ষাটার পরে ওকে ফোন করলাম। আমাকে চেঁচিয়ে অভিনন্দন জানাল, যেটা ওর পক্ষে স্বাভাবিক নয়। বলল- সেদিন বিকেলে ও বাড়ি আসবে।

দুপুরে ঘুমোলাম। ধীরে সুস্থে স্নান করলাম। ম্যুলারের ফাউস্ট বইটার পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে পাউলিনার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম।

ওকে দেখে অবাক হয়ে বললাম-

- তুমি বদলে গেছ।

- হ্যাঁ- ও উত্তর দিল- কিভাবে আমরা একে অন্যকে চিনেছি, তোমাকে বলার প্রয়োজন দেখি না। কারণ তুমি সেটা জান বলেই মনে করি আমি।

পরস্পরের চোখে তাকালাম আমরা, আনন্দ আর শুভেচ্ছা ভরা। বললাম- থ্যাঙ্ক ইউ।

আমাদের আত্মার মিল নিয়ে পাউলিনার তরফে স্বীকারোক্তি করার মত আনন্দ আমায় কোন কিছুই দেয় নি। জানি না কখন নিজেকে জিজ্ঞেস করেছি ( আচ্ছা, ওর কথার ভেতরে অন্য কথা লুকিয়ে নেই তো।) এই সম্ভাবনা ওঠার আগেই পাউলিনা ধোঁয়া ধোঁয়া একটা ব্যাখ্যা দিতে শুরু করল। দ্রুত শুনতে পেলামঃ

- সেদিন প্রথম বিকেলে আমরা প্রথমবার হারিয়ে যাচ্ছিলাম।

আমি নিজেকে প্রশ্ন করলাম, কারা হারিয়ে যাচ্ছিল। পাউলিনা বলে চলেছিল-

- ও খুব হিংসুটে। আমাদের বন্ধুত্বে ওর কোন আপত্তি নেই, কিন্তু ওর কাছে প্রতিজ্ঞা করেছি তোমার সঙ্গে দেখা করব না।

আমি অপেক্ষা করছিলাম, যদিও অসম্ভব খোলামেলা কথাগুলো আমায় শান্ত করে দিয়েছিল। জানি না পাউলিনা ইয়ার্কি করে, নাকি সিরিয়াসলি বলছিল। আমার মুখে কি ভাব ফুটে উঠেছিল কে জানে! কতটা হৃদয় ভাঙা যন্ত্রণা ছিল জানি না। পাউলিনা বলেই চলেছিল।

- চললাম। খুলিও অপেক্ষা করে থাবে আমার জন্য। আমাদের বিরক্ত করবে না বলে ওপরে উঠে এল না।

- কে? – আমি প্রশ্ন করলাম। পর মুহূর্তেই ভয় পেলাম যেন কিছুই ঘটে নি। যেন পাউলিনা আবিষ্কার করে না ফেলে আমি একজন ঠগ প্রবঞ্চক। সে যেন আর আমার মনের কাছে ছিল না।

- পাউলিনা স্বাভাবিক গলায় উত্তর দিল – খুলিও মন্তেরো।

উত্তরটা আমায় অবাক করে নি। যাই হোক সেই ভয়ংকর বিকেলে দুটো মাত্র শব্দ আমায় এত অস্থির করেছিল আর কোন কিছুই তা পারে নি। প্রথমবার আমার মনে হচ্ছিল আমি পাউলিনার থেকে দূরে সরে যাচ্ছি। নিঃস্পৃহ গলায় ওকে জিজ্ঞেস করলামঃ

- তোমরা বিয়ে করছ?

শুনলাম না ও কি উত্তর দিল। মনে হয় ওদের বিয়েতে আমায় নেমন্তন্ন করল।

তারপর নিজেকে একা মনে হল। সবকিছু অসম্ভব মনে হচ্ছিল। মন্তেরোর চেয়ে যোগ্য কেউ নেই। কিংবা আমিই ভুল করলাম? পাউলিনা ঐ লোকটাকে সত্যি ভালবাসে। ভাবনাটা ছাড়বার শপথ নেওয়া আমার পক্ষে সহজ ছিল না। আবিষ্কার করলাম যে জীবনে বহুবার এই সত্যের মুখোমুখি হয়েছি।

খুব মন খারাপ লাগছিল। কিন্তু মনে হয় ঈর্ষা করছিলাম না। দুহাত ছড়িয়ে মুখ ঝুলিয়ে খাটে শুলাম। একটু আগে পড়া বইটা হাতে ঠেকল। বিরক্তিতে ছুঁড়ে ফেললাম।

হাঁটতে বেরোলাম। মোড়ে একটা মেরি-গো-রাউন্ড নজরে এল। মনে হলো সেই বিকেলে আমার বাঁচা অসম্ভব। বছরের পর বছর ওকে ভেবেছি আর ছিঁড়ে খাবার যন্ত্রণাময় মুহূর্তগুলোকেও কিভাবেই না ওকে ভালোবেসেছি। (কারণ ওগুলো পাউলিনার সঙ্গে কাটিয়েছি)। ভবিষ্যতে একাকীত্ব –এর সময় সেই সব স্মৃতিগুলো চলে যেত আর ওগুলোকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পরীক্ষা করতাম। ওগুলোকে নিয়ে বাঁচতে শুরু করেছিলাম। তখন গভীর কষ্টে ডুবে গিয়ে সেসব ভাবছিলাম। আর তাই, উদাহরণ হিসেবে পাউলিনার গলায় আমাকে তার প্রেমিকের নাম ঘোষণা করে জানানো, গলার নরম ভাবটা আমাকে আশ্চর্য করেছিল প্রথমে। আমি কষ্টে ভেঙে পড়েছিলাম। ভাবলাম মেয়েটা আমায় ছুরি মারল। আর ও আমাকে ওর সেই মহামহিময়তা দিয়ে মুগ্ধ করে যাচ্ছিল ঠিক আগেও যেমন করত। ভাবতে ভাবতে বুঝে গেলাম ওর ঐ মমতা মহিমময়তা আমার জন্য নয় , বরং যে নামটা ও উচ্চারণ করেছিল তার জন্য ছিল।

স্কলারশিপটা নিয়েই নিলাম। চুপিচুপি চলে যাবার জন্য গোছগাছ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। যাই হোক খবরটা ছড়িয়ে পড়ল। যাবার দিন বিকেলে পাউলিনা দেখা করতে এলো।

মনে হয়েছিল আমার থেকে কত দূরে চলে গেছে ও। কিন্তু দেখামাত্রই নতুন করে প্রেমে পড়লাম। পাউলিনা বলার আগেই বুঝলাম ওর আসাটা চুপিচুপি। ওকে জড়িয়ে ধরলাম কৃতজ্ঞতায়। পাউলিনা অবাক হয়ে বললঃ

- তোমাকে চিরকাল ভালবাসব। কোন না কোনভাবে ভালোবাসব অন্য সবার চেয়ে বেশি।

ও হয়ত বিশ্বাস করত আমি বিশ্বাসঘাতকতা করেছি। ও জানত মন্তেরোর প্রতি ওর অনুরক্তি নিয়ে আমি কখনো সন্দেহ করি নি। কিন্তু যেহেতু ঘটে যাওয়া বিষয় নিয়ে বা ওরা কি কি কথা বলেছে সেসব নিয়ে বলতে ও পছন্দ করত না, আমি যদি বা নাও হই, অন্য কোন কাল্পনিক সাক্ষীর জন্যও একটা বিশ্বাসহন্তা দৃষ্টিভঙ্গি হয় সেটা- তাড়াতাড়ি বলে গেল পাউলিনা।

- ঠিক আছে। আমি তোমার জন্য কি ভাবি সেটা ভাবতে হবে না। আমি জুলিয়ার প্রেমে পড়েছি।

হয়ত ও ভেবেছিল নিজে বিশ্বাসহন্তার মত কাজ করেছে। জানত যে আমি কখনও মন্তেরোর প্রতি ওর একনিষ্ঠতাকে সন্দেহ করি নি, তবে যেসব শব্দগুলো ও বলছিল সেসব কোনটাই আমার জন্য বলা নয় জেনে আমি অসহিষ্ণু হয়ে পড়ছিলাম। সে যদি আমার জন্য নাও হয় কোন কাল্পনিক সাক্ষীর জন্য তো বটে- একটা বিশ্বাসঘাতকতার লক্ষ্য নেওয়া। ও দ্রুত বলে উঠল –

- এটা নিশ্চিত যে তোমার জন্য আমার কী মনোভাব সেটায় তোমার কিছু যায় আসে না। আমি খুলিওর প্রেমে পড়েছি।

বাকী কোন কিছুই আর প্রাসঙ্গিক নয় সেক্ষেত্রে। অতীত ছিল একটা পরিত্যক্ত মরুভূমি যেখানে ও মন্তেরোর জন্য প্রতীক্ষা করত। আমাদের প্রেমের জন্য, কিংবা বন্ধুত্বের জন্য – তেমন আমি মনে করতে পারি না।

তারপর কিছুক্ষণ কথা বললাম আমরা। আমার খুব রাগ হচ্ছিল। এমন ভান করলাম যেন তাড়া আছে। লিফটে এগিয়ে দিলাম ওকে। দরজা খুলতেই থমকে গেলাম। খুব ঝড় বৃষ্টি হচ্ছিল।

- আমি কোনো ট্যাক্সি ধরে নেব – বলল

চকিতে ঠেলে আসা আবেগ গলায় নিয়ে পাউলা চেঁচিয়ে উঠল-

- বাই, ডিয়ার।

রাস্তা পার হল, দৌড়োতে দৌড়োতে, তারপর দূরে অদৃশ্য হয়ে গেল। আমি ফিরলাম, বিষণ্ণ। চোখ তুলতেই দেখি একটা লোক বাগানে লুকোচ্ছে। লোকটা বসে পড়েছিল আর হাত দিয়ে কাচের ওপাশে বসে মুখটা আড়াল করছে। ও মন্তেরো।

অন্ধকার ঘন ঝোপের সবুজ রঙ ভেদ করে লাইল্যাক ফুলের বেগুনি কমলা আলো ছিটকাচ্ছিল কাচের গায়ে । মন্তেরোর মুখটা ভেজা কাচের গায়ে লেপ্টানো, ভাঙাচোরা বড্ড ফ্যাকাশে লাগছিল সেটা।

আমার অ্যাকোয়ারিয়ামের কথা মনে পড়ল। মাছের অ্যাকোয়ারিয়াম। তারপর অস্থির তিক্ততা নিয়ে নিজেকে বললাম মন্তেরোর মুখটা অন্যান্য দানবের মতই দেখাচ্ছিল। সমুদ্রের গভীরের মাছগুলো অ্যাকোয়ারিয়ামের জলের চাপে বেঁকেচুরে গিয়েছিল।

পরদিন সকালে জাহাজে চড়ে বসলাম। যাত্রাপথের প্রায় গোটা সময়টা নিজের কামরা ছেড়ে বেরোলাম না। খুব লিখলাম পড়াশোনা করলাম।

পাউলিনাকে ভুলতে চাইছিলাম। আমার ইংল্যান্ডে থাকার দু বছরে যত পেরেছি ওর ভাবনা সরিয়ে রেখেছি। সেই বুয়েনোস আইরেসের আর্জেন্টিনাবাসীদের থেকে আসা সংক্ষিপ্ত টেলিগ্রামগুলো যেগুলো ডায়রিতে রাখতাম গুঁজে সেগুলো পর্যন্ত। এটা ঘটনা যে রাতে স্বপ্নে ও আসত। এত বাস্তব এত আবেদনময়ী। আমি অবাক হতাম মনের কোনে ওর আসার পথে আমি যে বাধা সৃষ্টি করে রেখেছি তার বিরুদ্ধে হচ্ছে না এগুলো। জোর করে ওর স্মৃতি সরিয়ে রেখেছিলাম। প্রথম বছরের শেষ দিকে এসে রাতের স্বপ্ন থেকেও ওকে সরাতে পেরেছিলাম আমি। প্রায় ভুলে গেছিলাম ওকে।

ইওরোপ থেকে ফিরলাম যেদিন বিকেলে সেদিনই পাওলিনার কাছে যেতে ইচ্ছে করছিল। আশা নিয়ে নিজেকে বললাম ওর বাড়িতে ওর রেখে যাওয়া জিনিষপত্রের ভেতরে হয়ত ও জীবন্ত থাকবে। আমার ঘরে ঢুকতেই গলার কাছটা দলা পাকিয়ে উঠল। স্তব্ধ দাঁড়িয়ে রইলাম, আমার স্মৃতিদের কাছটিতে। সেই তুমুল আনন্দ আর কষ্টের মুহূর্তগুলো কাছে। তখন একটা লাজুক অনুভব এল মনে। আমাদের ভালবাসার গোপন মুহূর্তগুলো আমার কাছ থেকে সরে যায় নি কখনই। স্মৃতির গভীর থেকে উঠে আসে মুহূর্তেরা। জানলা দিয়ে আসা জোরালো আলোয় আমার চটকা ভেঙে গেল। বুয়েনোস আইরেসের আলো।

চারটের কাছাকাছি রাস্তার কোনে চলে গেলাম। এক কিলো কফি কিনলাম। রুটির দোকানের মালিক আমায় চিনতে পারলেন। দারুণ আন্তরিকভাবে স্বাগত জানালেন আমাকে। বললেন- বহুদিন হল- সঠিক ভাবে বলতে গেলে অন্ততঃ ছয়মাস হল ওঁর দোকান থেকে কোন জিনিষ কিনি নি। এইসব ভাল ভাল কথার পরে আমি ওঁর কাছে লজ্জা লজ্জা মুখে আধপাউন্ড রুটি চাইলাম। হামেশার মতই আমায় জিজ্ঞেস করলেন-

- সেঁকা রুটি না কাঁচা রুটি?

আমিও হামেশার মতন উত্তর দিলাম- কাঁচা।

বাড়ি ফিরে এলাম। সেদিনটা স্ফটিকের মত পরিষ্কার আর সাদা এবং খুব ঠান্ডা ছিল।

বাড়ি এসে পাউলিনার কথা ভাবতে ভাবতে কফি বানালাম। আমরা সাধারণতঃ শেষ বিকেলে দুজনে কালো কফি খেতাম।

স্বপ্নের মত আমার আবেগ মনের ভেতর পাউলিনাকে ডেকে আনত, আমার মনে যে পাগলামি বয়ে আনত তা সাদামাটা নির্বিকারভাবে কেটে গেল। ওকে দেখামাত্র হাঁটু গেঁড়ে বসে পড়লাম, কোলে মুখ গুঁজে রইলাম। ওকে হারিয়ে আমার ভেতর জমা হওয়া একরাশ কান্নার হাতে নিজেকে উন্মুক্ত করে দিলাম।

ওর ফিরে আসা এভাবেই হয়েছিল। দরজায় তিনটে কড়া নাড়ার আওয়াজ হল। কে হতে পারে রবাহুত! ভাবলাম কফিটা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে, ভাবতে ভাবতে দরজা খুলে দিলাম অন্যমনস্ক হয়ে।

তারপর ভাবলাম পাউলিনার চলে যাবার সময়টা দীর্ঘ হোক বা ছোট সেসব নিয়ে ভাবব না। ও বলেছিল আমি যেন ওকে অনুসরণ করি। বুঝছিলাম যা যা ঘটেছে তার ভিত্তিতে ও নিজের কথা সংশোধন করে নিচ্ছে। আমাদের সেই পুরনো আচারআচরণ যা নিজেদের মধ্যে করেছিলাম আমরা। মনে হল (সেই এক ভুলের ভেতর বারবার পড়ার মতই সে বিকেলে আমি অবিশ্বস্ত ছিলাম।) সেসব শুধরে নিয়েছিল বেশি বেশি দৃঢ়তায়। আমার কাছে যখন ও চাইল আমি ওর হাত দুটো ধরি (হাত! আমায় বলেছিল- এখনই!) এ কথার ফাঁকে ফেলে রেখে গেল আমায়। মিশে যাওয়া দুটো নদীর মত আমাদের আত্মারাও জুড়ে গেল। বাইরে ছাদের ওপর দেওয়ালের গায়ে বৃষ্টি পড়ছিল। সে বৃষ্টিকে অনুবাদ করলাম। যেন গোটা পৃথিবী উঠে আসছে, নূতনভাবে, আমাদের সন্ত্রস্ত ভালবাসা যেন ছড়িয়ে পড়ছে।

সে উত্তেজনা আমায় থামাতে পারল না। যাইহোক, আবিষ্কার করলাম মন্তেরো পাউলিনার কথাগুলোকে বিষিয়ে তুলেছিল। কয়েক মুহূর্তের জন্য ও যখন কথা বলছিল আমার নাছোড় ইচ্ছে করছিল প্রতিদ্বন্দ্বীর কথা শুনতে। চিনতে পারছিলাম কথা বলার ভঙ্গীর সেই পরিচিত শ্লথতা। চিনতে পারছিলাম সে নিষ্পাপ উস্কানিমূলক ভঙ্গী, আজও আমি নির্ভুল মনে করতে পারি কখনও ভুল না হওয়া সেই অশ্লীলতাকে।

নিজেকে অতি কষ্টে সামলালাম। মুখের দিকে চাইলাম, হাসিভরা চোখ দুটো। ওই তো পাউলিনা, স্বকীয় ও নিখুঁত। ওসব কিছুই তো পালটায় নি।

যতক্ষণে আয়না ছেয়ে ফেলছিল চারপাশের মালা, মুকুট কালো দেবদূত বেষ্টন করা বিষাদ আমার নিজেকে পৃথক মনে হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল অন্য পাউলিনাকে আবিষ্কার করছি। যেন অন্য ধরনে দেখছি ওকে। আলাদা হবার জন্য ভাগ্যকে ধন্যবাদ জানালাম। ওকে চেয়ে দেখবার অভ্যাসটায় ছেদ এনে দিয়েছিল। সে বিচ্ছেদ ওকে আরও সুন্দরী করে এনেছিল আমার চোখে।

পাউলিনা বলল- যাই আমি, খুলিও অপেক্ষা করছে।

ওর সেই অচেনা কন্ঠের মধ্যে অবজ্ঞা আর যন্ত্রণা মেশানো ছিল। আমায় তা হতবাক করে দিল। মনের দুঃখে ভাবলাম- পাউলিনা সেই পাউলিনা তো কখনও কাউকে ঠকায় নি। যখন চোখ তুললাম ও চলে গিয়েছিল।

কয়েক মুহূর্ত ইতস্ততঃ করে ওকে ডাকলাম। দরজার কাছে গিয়ে আবার ওকে ডাকলাম। রাস্তায় দৌড়ে গেলাম। দেখতে পেলাম না। আমার আবার ঠান্ডা লাগছিল। নিজেকে বললাম- ঠান্ডা পড়ে গেল। সামান্য ক’ফোঁটা বৃষ্টি হয়েছে একটা আগে। পিচ রাস্তা শুকনো।

বাড়ি ফেরি দেখি রাত নটা বাজে। খেতে বেরোতে ইচ্ছে করল না। মনে হল- কোনো চেনা পরিচিতের সঙ্গে দেখা হয়ে যায় যদি! একটা কফি বানালাম। দু তিন চুমুক দিলাম। রুটির মাথায় কামড় দিলাম একটা দুটো।

জানতাম না আমি আমাদের আবার কবে দেখা হবে। পাউলিনার সঙ্গে কথা বলতে খুব ইচ্ছে করছিল। আমার কিছু সংশয় যদি ও দূর করে দিত সেটা চাইছিলাম। (সেসব সংশয় যা আমায় ভেঙ্গেচুরে শেষ করে দিয়েছিল। ও সেগুলো সহজেই পরিস্কার করে বলে দিতে পারবে।) পরক্ষণেই নিজের অকৃতজ্ঞতায় ভয় পেয়ে গেলাম। নিয়তি আমায় সৌভাগ্য এনে দিল অথচ আমি সুখী হতে পারছিলাম না। সে বিকেল আমাদের গোটা জীবনের এক সারসংক্ষেপ ছিল। পাউলিনা এভাবেই বুঝেছিল। আমি নিজেও তাইই বুঝেছিলাম। তাই দুজনের কেউই প্রায় কোনো কথাই বলি নি। (কথা বলা, টুকিটাকি প্রশ্ন করা এসব ছিল অবশ্য, একটা নির্দিষ্ট ভঙ্গীতে তবে আমাদের আলাদাও করে দিচ্ছিল কথাগুলো)।

পরদিন পাউলিনাকে দেখার জন্য অপেক্ষা করার ভাবনাটা আমার কাছে প্রায় অসহ্য কঠিন হয়ে উঠছিল। সাহস করে ভাবলাম আজ রাতেই মন্তেরোর বাড়ি যাব। খুব তাড়াতাড়ি ভাবনাটা থেকে পিছিয়ে এলাম। পাউলিনার সঙ্গে আগে দেখা করার আগে ওদের কারো মুখোমুখি হওয়া সম্ভব না। একজন বন্ধুকে খুঁজে নেব ভাবলাম- লুই আলবের্তো মরগ্যানই ঠিক লোক হবে এ ব্যাপারে। ওই বলতে পারবে যতদিন পাউলিনার জীবনে আমি ছিলাম না ততদিন কেমন কেটেছে তার।

তারপর মনে হল শুয়ে পড়া যাক এবং ঘুমোই। ক্লান্ত হয়ে শুয়ে পড়লাম ঘুমোতে। ভাবলাম পরে সব কিছু ঠান্ডা মাথায় বোঝা যাবে। অপরপক্ষে আমিও চাইছিলাম না ওরা কেউ পাউলিনা সম্পর্কে উটকো মন্তব্য করুক। বিছানায় ঢুকে মনে হল ফাঁদে পড়েছি। (মনে হল কেউ বসে আছে দেখবার জন্য যে আমি জেগে আছি) । লাইট নিভিয়ে দিলাম।

পাউলিনার ব্যবহারে মন খারাপ করব না। বেশি রকমই জানতাম যে আসল পরিস্থিতি খুব সামান্যই জানি। যেহেতু মাথাটা চিন্তা ছাড়া ফাঁকা থাকছিল না কিছুতেই তাই সে বিকেলের ঘটনাগুলো ভাবতে লাগলাম।

ওর মুখ বিকৃত হয়ে গেলেও ওর আচরণ অদ্ভূত হয়ে গেলেও আমি তো ওকে ভালবাসবই। ওর থেকে আমায় কেউ দূরে সরাতে পারবে না। মন্তেরোর জঘন্য উদয় হবার আগেও মুখখানা যেমন ছিল, বরাবরের মতই তা পবিত্র অনন্য। নিজেকে বললাম – ওর মুখের মধ্যে সেই বিশ্বস্ততা যার ভাগ মন কখনও দিতে পারবে না।

নাকি সবটাই প্রতারণা? আমি আমার আকাঙ্খার এক অন্ধ তাড়না ও বিকর্ষণের প্রতিমূর্তিকে ভালবেসেছি? পাউলিনাকে কি কখনই চিনতে পারি নি?

সে বিকেলের একটা ছবি নির্বাচন করলাম- আয়নার অন্ধকার ও মসৃণ গভীরতার সামনে দাঁড়িয়ে পাউলিনা, আর আমি ওকে ডাকতে চেষ্টা করছি। যখন ওর থাকাটার আভাস পেলাম সঙ্গে সঙ্গে মনের মধ্যে একটা ব্যাপার পরিষ্কার হয়ে গেল- আমি ইতস্ততঃ করছিলাম কারণ আমি ওকে ভুলে রয়েছিলাম। নিজেকে গুটিয়ে এনে মনঃসংযোগ করতে চাইছিলাম ওর চেহারার ভাবনায়। স্মৃতি আর ফ্যান্টাসি আমার খামখেয়ালি ক্ষমতা, এলোমেলো থাকা আমার চুল টেনে ধরল, পোশাকের ভাঁজ, অন্ধকার ছন্নছাড়া বিকেলময় চারপাশ, কিন্তু আমার প্রেমিকা আবছা হয়ে গিয়েছিল।

অনিবার্য উৎসাহে অনেক ঝলমলে ছবি বন্ধ চোখের সামনে দিয়ে চলে গেল। তক্ষুনি একটা জিনিষ আবিষ্কার করলাম। নরকের অন্ধকার সীমানায়, আয়নার কৌণিক বিন্দুতে পাউলিনার ডানদিকে সবুজ পাথরের ঘোড়া ভেসে উঠল।

সে দৃশ্য যখন এল আমায় তা অবাক করল না। কেবল কয়েকমিনিট পরে মনে পড়ল মূর্তিটা বাড়িতে নেই। দু বছর আগে আমি ওটা পাউলিনাকে উপহার দিয়েছিলাম।

নিজেকে বললাম যে এসব বহুযুগের ঘটে যাওয়া স্মৃতির সুপার ইম্পোজিশন (সবচেয়ে পুরনোটা ঘোড়াটার , আর সবচেয়ে নতুনটা পাউলিনার)। প্রশ্নটা বিস্তারিত হয়ে রইল আর আমি শান্ত হয়ে রইলাম। আমাকে ঘুমোতেই হবে। তখন একটা লজ্জাকর ব্যাপার তৈরী করলাম আর একটা আলোও যেটা পরে দেখেছি করুণ- আমি যদি তাড়াতাড়ি না ঘুমোই – ভাবলাম- কাল সকালে আমায় বিধ্বস্ত দেখাবে আর পাউলিনা সেটা পছন্দও করবে না।

পরমুহূর্তেই খেয়াল করলাম শোবার ঘরের মূর্তিটা বিশ্বাসযোগ্য নয়। বাড়িতে ওটাকে অন্য ঘরেই দেখেছি (হয় তাকে অথবা পাউলিনার হাতে কিংবা আমার হাতেই)।

ভয় পেয়ে স্মৃতির দৃশ্যগুলোকে আবার দেখতে চাইলাম। আয়নাটা ফিরে এলো। চারপাশে দেবদূতেরা দাঁড়িয়ে, গলায় কাঠের মালা পরা, মাঝখানে আছে পাউলিনা, আর ঘোড়াটা ডানপাশে। আমি নিশ্চিত ছিলাম না ঘরের প্রতিফলন হচ্ছিল কী না। হয়ত প্রতিফলন হচ্ছিল, তবে ছন্নছাড়া সংক্ষিপ্ত উপায়ে। বদলে ঘোড়াটা লাইব্রেরীর তাকে পরিষ্কার ভাবে আড়াআড়ি করে শোয়ানো। গোটা গভীরের জায়গা জুড়ে ছিল লাইব্রেরীটা। আর একটা নতুন চরিত্র অন্ধকার আড়ে ঘুরে ঘুরে যাচ্ছিল যাকে প্রথমটায় চিনে উঠতে পারি নি। পরে আগ্রহের অভাবে নজর করলাম ওটা আমিই।

পাউলিনার মুখটা দেখলাম। পরোটা (আধা নয়)। কিভাবে তার সৌন্দর্য আর বিষণ্ণতার গভীর থেকে আমার দিকে ফিরে আছে। কাঁদতে কাঁদতে জেগে উঠলাম।

জানি না কখন ঘুমিয়ে পড়েছি। জানি শুধুই স্বপ্নটা উদ্ভাবনী কিছু ছিল না। ওটা চলেই যাচ্ছিল, নির্দয়ের মত। আর কল্পনাগুলো নিষ্ঠার সঙ্গে সন্ধের দৃশ্যগুলো পুনরায় উপস্থাপিত করেছিল।

ঘড়ি দেখলাম। পাঁচটা বাজে। তাড়াতাড়ি জেগে গেছি। যদিও পাউলিনার রেগে যাবার বিপদ আছে, ওর বাড়ি গেলাম। এই সমাধান আমার যন্ত্রণা প্রশমিত করতে পারল না।

সাড়ে সাতটায় ঘুম থেকে উঠলাম। লম্বা স্নান সারলাম। ধীরে ধীরে পোশাক পরলাম।

পাউলিনায় কোথায় থাকে দেখলাম না। দরোয়ান ফোনের ডিরেক্টরিটা দিল। সবুজ ডিরেক্টরি। মন্তেরোর নামে কোনো ঠিকানাই নেই। পাউলিনার নাম খুঁজলাম। সেটাও পেলাম না। পরখ করলাম মন্তেরোর পুরনো ঠিকানায় অন্য কেউ থাকে কী না। ভাবলাম পাউলিনার বাবামার ঠিকানাটা দেখি।

বহুদিন ওঁদের সঙ্গে দেখা হয় নি (যখন জানতে পারলাম পাউলিনা মন্তেরোকে ভালবাসে, ওঁদের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিলাম।) এখন নিজেকে রেহাই দেবার জন্য আমাকে যন্ত্রণা খুঁড়ে তার মুখোমুখি হতেই হবে। আমার হাসি উবে গেল।

ঠিক করলাম লুইস আলবের্তো মরগ্যানের সঙ্গে কথা বলব। এগারোটার আগে ওর বাড়ি যাওয়া ঠিক হবে না। রাস্তায় এলোমেলো হাঁটলাম। কাউকে দেখতে পেলাম না। মুহূর্তের ভাবনায় দেওয়ালে মাথা ঠোকার মত কিংবা ইতস্তত ছড়ানো শব্দের অনুভূতি যেন কানে এল। মনে পড়ল স্বাধীনতার চৌমাথায় এক ভদ্রমহিলা এক হাতে জুতো অন্য হাতে বই নিয়ে ভেজা পায়ে ঘাসের ওপর হেঁটে যাচ্ছে।

বিছানায় শুয়ে শুয়েই মরগ্যান আমায় ভেতরে আসতে বলল। দুহাতে ধরে একটা বিরাট বড় কাপে চুমুক দিচ্ছে। দেখলাম সাদা মত একটা তরল, তাতে রুটির টুকরো হবে ভাসছে।

- মন্তেরো কোথায় থাকে জানো?- জিজ্ঞেস করলাম ওকে।

পুরো দুধটা চুমুক দিয়ে দিল। তারপর তলায় পড়ে থাকা রুটির টুকরো খুঁটে নিচ্ছিল।

- মন্তেরো জেলে- বলল ।

আমার বিস্ময় লুকোতে পারলাম না। মরগ্যান বলে চলল-

- কীভাবে? তথ্যগুলো অস্বীকার করতে চাও?

সে কল্পনা করল। নিঃসন্দেহে আমি কেবল এই তথ্যগুলো অস্বীকার করতাম। কিন্তু কথা বলার ঝোঁকে সব লুকনো বিষয় উল্লেখ করলাম। মনে হচ্ছিল জ্ঞান হারিয়ে ফেলব। হঠাৎ করে পাহাড়চুড়ো থেকে পরে যাবার মত। সেখানেও শিষ্টাচার মাখানো, নিষ্করুণ তীক্ষ্ণ গলা ভেসে এল। সেইসব এড়ানো যায় না, চেনা তথ্যগুলো দানবের মত স্থির হয়ে বলে চলল।

মরগ্যান নিচের কথাগুলো বলল- মন্তেরো সন্দেহ করত পাউলিনা আমার সঙ্গে দেখা করতে আসবে। সে বাড়ির বাগানে লুকিয়ে ছিল। ওকে বেরোতে দেখল। পিছু নিল। রাস্তায় ওর সঙ্গে তর্কে জড়াল। দুজনেই উত্তেজিত হয়ে একটা ট্যাক্সিতে চড়ে বসল। কোস্তানেরার রাস্তায় আর হ্রদের কিনারা দিয়ে গোটা রাত হাঁটল। ভোরবেলা টাইগার হোটেলে একটা গুলি করল পাউলিনাকে। ঘটনাটা সেদিন সকালের আগের রাতে ঘটেনি। ঘটেছিল আমার ইউরোপে যাবার আগের রাতে। দু বছর আগে।

জীবনের কঠিনতম মুহূর্তগুলোতে সাধারণত আমরা রক্ষণাত্মক দায়িত্বজ্ঞানহীনতায় ভুগি। আর তখন কী করতে হবে আমাদের সেসব না ভেবে আমরা ঝুঁকে পড়ি ছোটখাট ব্যাপারের দিকে। এ ধরনেরই কোন এক মুহূর্তে আমি মরগ্যানকে প্রশ্ন করলাম-

- বাড়িতে, আমার বাইরে চলে যাবার আগে, আমাদের শেষ সাক্ষাৎকারের কথাটা তোমার মনে আছে?

মরগ্যান ঘাড় নাড়ল। আমি বলতে থাকলাম-

- তুমি যখন দেখছিলে যে আমি উদ্বিগ্ন ছিলাম আর পাউলিনাকে বেডরুমে খুঁজতে গেছিলাম, মন্তেরো তখন কি করছিল?

- কিছু না- একই রকম উৎফুল্ল ভাবে মরগ্যান উত্তর দিল,- কিচ্ছু না। ও হ্যাঁ এখন আমার মনে পড়ছে – ও আয়নার দিকে তাকিয়ে ছিল।

বাড়ি ফিরে এলাম। দরজায় ঢোকার সময় দারোয়ানের সঙ্গে ধাক্কা লাগল। নিরুত্তাপ ভাব দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলাম-

- জানেন, পাউলিনা মারা গেছে?

- কেন জানব না? – বলল সে- সবকটা পেপারে বেরিয়েছিল খুনের কথাটা। আমিই তো পুলিশকে জানিয়েছিলাম।

লোকটা কৌতূহলী চোখে তাকাল আমার দিকে।

- আপনার কিছু হয়েছে নাকি? – কাছে আসতে আসতে বলল। - আপনাকে পৌঁছে দেব?

ধন্যবাদ জানিয়ে দৌড়ে চলে এলাম। আবছা একটা স্মৃতি মনে পড়ল চাবি নিয়ে ধ্বস্তাধ্বস্তি করার, দরজার ওপাশ থেকে কিছু বিজ্ঞাপন ছাপানো কাগজ কুড়োনোর, চোখ বুঝে থাকবার, বিছানায় মুখ ঝুলিয়ে পড়ে থাকার স্মৃতি।

তারপর – এটা সত্যি যে কাল রাতে পাউলিনা আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল- ভাবতে ভাবতে আয়নার মুখোমুখি হলাম। ও মারা গেছিল একথা জেনে যে মন্তেরোর সঙ্গে ওর বিয়েটা ব্যর্থ হয়েছিল।

- একটা নৃশংস ভুল। - আমরাই সত্যি ছিলাম। ওর লক্ষ্য পূরণের জন্য, আমাদের লক্ষ্যপূরণের জন্য মৃত্যুর ঘর থেকে ফিরে এসেছিল। – বহুদিন আগে একটা বইয়ে লেখা পাউলিনার কথাগুলো মনে পড়ল। “আমাদের আত্মাদের মিলন হয়েছে- ভাবতে লাগলাম – গতকাল রাতে শেষপর্যন্ত সেই মুহূর্ত এল যখন আমি ওর হাতদুটো হাতে নিলাম।” তারপরবললাম- আমি ওর অযোগ্য।

পাউলিনা আমায় ক্ষমা করেছিল। আমরা কখনও এত ভালবাসিনি পরস্পরকে। এত কাছে কখনও আসিনি দুজনে।

প্রেমের এই বিজয়ী অথচ দুঃখী মহোল্লাসে তর্ক জুড়েছিলাম মনে মনে, আমার মস্তিস্ক বদলির প্রস্তাবে করার সরল অভ্যাস অনুযায়ী প্রশ্ন করল– কাল রাতের দেখা করার অন্য কোনো ব্যাখ্যা আছে কি।

ঠিক তখনই একটা বিস্ফোরণের মত আমি সত্যে পৌঁছলাম।

আমি নতুন করে একটা সত্য আবিষ্কার করতে চাইব। বরাবরের মত কপাল খারাপ বলেই সত্য যখন বেরিয়ে এল আমার ভয়াবহ ব্যাখ্যা রহস্যময় ঘটনাগুলোকে পরিষ্কার করে বুঝিয়ে দিচ্ছিল। এসবই নিশ্চিত করল ওরা।

আমাদের হতভাগ্য প্রেম পাউলিনাকে কবর থেকে টেনে তুলে আনতে পারে নি। ওটা পাউলিনার ভূত ছিল না।

আমি আমার প্রতিদ্বন্দ্বীর প্রতি হিংসের রাক্ষুসে ভূতটাকে সাপটে ধরে রেখেছিলাম।

রহস্যের সূত্র লুকিয়েছিল সেই ভোরের ভেতর, আমার বাইরে যাবার আগের ভোরে পাউলিনা কাছে এসেছিল দেখা করতে। মন্তেরো ওর পিছু পিছু এসেছিল আর বাগানে লুকিয়েছিল সেদিন। সারারাত ঝগড়া হয়েছিল, যেহেতু তার ব্যাখ্যায় মন্তেরো খুশি ছিল না। - এই লোকটা পাউলিনার পবিত্রতা বুঝবে কী করে? – ভোরে ওকে খুন করে।

ওকে জেলে কল্পনা করলাম। ও হয়ত নিষ্ঠুর ঈর্ষার গোঁয়ার্তুমির উদাহরণ হিসাবে সেদিনের সাক্ষাতের জন্য অনুশোচনা করছে।

সেই মূর্তি বাড়িতে ঢুকছে। যেরকমটি পরে ঘটেছিল। ওটা ছিল মন্তেরোর ভয়ংকর ভূতটার এক প্রদর্শনী। তখন তো আবিষ্কার করতে পারি নি। কারণ এত আবেগপ্রবণ ছিলাম এতই খুশী ছিলাম যে শুধু পাউলিনার ইচ্ছাপূরণের কথাই মাথায় থাকত তখন। যাই হোক চিহ্নগুলো ভুল করে নি। উদাহরণ হিসাবে বলা যায় বৃষ্টির কথা। সত্যিকারের পাউলিনার আসার দিনটার কথা। - আমার বাইরে চলে যাবার আগের ভোর, কোন বৃষ্টির শব্দ শুনি নি। মন্তেরো বাগানে, ওকে সরাসরি নিজের দেহের ওপরে অনুভব করেছিল। আমাদের কল্পনা করে ও বিশ্বাস করেছিল যে আমরা ওদের শুনে ফেলেছি। সেইজন্যই গতকাল রাতে বৃষ্টির শব্দ শুনেছি। অথচ পরে দেখেছি রাস্তা শুকনো ছিল।

আরেকটা সূত্র ছিল মূর্তিটা। একদিনই মাত্র বাড়িতে ওটাকে রেখেছিলাম যেদিন হাতে এসেছিল। মন্তেরোর কাছে ওটা জায়গায় প্রতিরূপ মাত্র ছিল। সেকারণেই গত রাতে হাজির হয়েছিল।

আয়নায় নিজেকে চিনতে পারছিলাম না। কারণ মন্তেরো আমায় পরিষ্কার করে চিনতে পারে নি। শোবার ঘরটাকেও ঠিকমত চিনে উঠতে পারে নি। পাউলিনাকেও সে চিনত না। মন্তেরো যে ছবিটা তুলে ধরেছিল সেটা সত্যিকারের পাউলিনার নয়।

তার ওপর ও তো ওর মত করেই কথা বলছিল।

বিকৃত এই ভূত আসলে মোন্তেরোর ভেতরকার ঝড়েরই রূপ। আমারটা বরং যথেষ্ট বাস্তব। এটাই প্রতীয়মান হয় যে পাউলিনা ফিরে আসে নি কারণ সে ঠকে গিয়েছিল তার ভালবাসার কাছে। এটাই প্রত্যয় হয় যে আমি কখনই ওর প্রেম ছিলাম না। এটাই বিশ্বাস হয় যে মোন্তেরো তার জীবনের দিকগুলোকে হেলাফেলা করে নি, যেগুলো আমি শুধু চিনতাম মাত্র। এটাই বোঝা যায় যে আমি সেই কথাগুলো পালন করেছিলাম যেগুলো পাউলিনা কখনই আমাকে বলে নি। যেগুলো আমার প্রতিদ্বন্দ্বী বহুবার শুনেছিল।




লেখক পরিচিতিঃ
আদোলফো বিওয় কাসারেসঃ ১৯১৪ সালে আর্জেন্টিনার বুয়েনোস আইরেস শহরে বিখ্যাত আইরিশ অভিবাসী প্যাট্রিক লিঞ্চ-এর পরিবারে জন্ম হয় সাহিত্যিক, কি, সমালোচক আদোলফো বিওয় কাসারেস-এর। ১১ বছর বয়সে প্রথম গল্প লেখেন “আইরিস ও মার্গারিটা”। তাঁর লেখা বহু সায়েন্স ফিকশন আছে। আর্জেন্টিনার সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি নোবেল বিজয়ী খোর্খে লুইস বোর্খেস এর সঙ্গে যৌথ ভাবে প্রচুর বই লেখেন তিনি। বিবাহ করেন ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর বোন লেখিকা সিলভিনা ওকাম্পোকে। ওক্তাভিও পাস তাঁর লেখায় ‘প্রেম’ সম্পর্কে বলেছিলেন – “ বিওয় কাসারেসের প্রেম একটা বাস্তব দৃষ্টিভঙ্গী। সম্পূর্ণ ও স্বচ্ছন্দ।

অবাস্তব দুনিয়ার কিছু নয় বরং আমাদের চেনা।” স্প্যানিশ ভাষার শ্রেষ্ঠ সাহিত্য পুরষ্কার সেরভান্তেস পুরস্কারে সম্মানিত হন তিনি। তাঁর মৃত্যু হয় বুয়েনোস আইরেসেই ১৯৯৯ সালে।



অনুবাদক পরিচিতি
জয়া চৌধুরী
কলকাতায় থাকেন। গল্পকার। কবি। অনুবাদক।
স্প্যানিশ ভাষার শিক্ষক। 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন