মঙ্গলবার, ১৬ মার্চ, ২০২১

লু ইয়াং'এর গল্প : রুপোলি বাঘ

 



অনুবাদ : ঝর্না বিশ্বাস

খুব ছোট বয়স থেকেই আমি নানীর সঙ্গে থাকতাম, নানী কানে শুনতে পেত না। বিশেষ কোনও পার্বন এলে অথবা মনে রাখার দিনগুলোতেই শুধু আমাকে মা বাবার কাছে পাঠানো হত। নানীর বাড়ির ঠিক পেছনটাতে মস্ত বড় এক জলাশয় ছিল, আর সেখানেই রূপোলি বাঘকে আমি প্রথম দেখি। তবে এখন যা কিছু বলতে চলেছি তা ওই বাঘকে ঘিরেই। প্রায়শই সেই বাঘের থাবা আমার ছোটবেলাকার স্মৃতিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে স্বমহিমায় তাঁর উপস্থিতি জানান দেয়।

তাই শুরুটা আমার ঐ বড় জলাশয় থেকেই করতে হবে। আদিকালে জল ধরে রাখতে এ রকম জলাশয় খুব দরকার পড়ত, এমনকি এখনও রঙটাং শহরের আশেপাশের কিছু গ্রামে তা আছে। এর নাম থেকেই বেশ বোঝা যাচ্ছে তাদের আকার পুকুরের মত হলেও গভীর ছিল। এগুলো সবসময় পরিষ্কার রাখা হত, আর সেখানে মহিলাদের বাসনপত্র ধোওয়া বা অন্তর্বাস ধোওয়া সম্পূর্নরূপে নিষিদ্ধ ছিল। কাছাকাছি যোজন দূরত্বের মধ্যে আর কোনও জলাশয় বা পুকুর মত কিছু ছিল না, দুই তিন ঘর লোকেদের জন্য এটাই যথেষ্ট ছিল যারা এর দেখাশোনাও করত। কখনও শূকরের খোঁয়াড়ে বা শুকনো ঘাসে আগুন লেগে গেলে এই জল কাজে লাগানো হত। তাদের কথামত আমার কানে না শুনতে পাওয়া নানীর মস্ত বড় এই পুকুরটি এভাবেই তৈরী হয়েছিল :

বেশ কিছু বছর ধরেই নানীর ভিটের গা ঘেঁষে একটা সরু নদী বইত। তারপর হঠাত্‌ একদিন সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো যে ওটা ভর্তি করে দিলে চাষের ভালো জমি পাওয়া যাবে। কিন্তু নানী আমার বরাবরই একগুঁয়ে, যতই পাড়া প্রতিবেশিদের আকথা কুকথা সহ্য করতে হোক তিনি এই মতের বিরোধিতা করলেন। আর তাই গ্রামবাসীরা যখন এই নদী ভর্তি করতে শুরু করল, কিছুটা জায়গা তাঁর বাড়ির পেছনটায় তখন ছেড়ে দেওয়া হলো। নানী গ্রামের বাইরের কজন লোক ভাড়া করে এনে সেখানে মাটি খোঁড়ার সিদ্ধান্ত নিল। বাঁশের খুঁটি দিয়ে তাঁরা প্রথমে গর্ত করতে শুরু করল, কিছু পরেই সেখানে ঘোলা জল দেখা গেল, আর তা ক্রমে গাঢ় সবুজ হলো – এটা এই এলাকার মস্ত বড় এক জলাশয় হয়ে উঠল। গ্রামের লোকেরা এটাকে সূর্য বংশের জলাশয় নাম দিল। কিন্তু কেনই বা নানী ও অন্যরা একে সূর্য আখ্যান দিয়েছিল সেটাই আসল কথা!

আমি যখন ছোট ছিলাম তখন এই মস্ত জলাশয়ের নাগাল পেতাম না। নানী সবসময় বলত এই জল নাকি একদিন আমার ভাগ্য নির্ধারণ করবে। আবার ভয়ও পেত যে এতে পড়ে গেলে আমাকে আর বাঁচানো যাবে না। কিন্তু আমার সমস্ত আশা আকাঙ্খা এই জলাশয় ঘিরেই থাকত।

সেই গ্রামে আমার চাইতে এক বছরের বড় একটা ছেলে ছিল, নাম তাঁর ডং। একবার সে একটা ছোট কচ্ছপ ধরে আমায় দেখাতে এনেছিল। খুব সুন্দর ছিল কচ্ছপটা। ওকে ধরতেই খোলস থেকে ওর মাথা আর পাগুলো সুড়ুত্‌ করে বেরিয়ে আসত, আর শূন্যে অসহায় ভাবে ও তখন হাত পা ছড়াত। যদিও জানতাম এগুলো ঠিক হচ্ছে না। গ্রামের একটি মেয়েকে আমরা প্রায়শই ডাকতাম আমাদের সাথে খেলা করার জন্য। ওর নাম ছিল জুয়ান; আমারই মত বয়স ছিল ওর। জুয়ান ওর পাতলা ম্যাড়মেড়ে হলুদ চুলগুলোকে ঝুঁটির মত বেঁধে রাখত। জুয়ান ডংএর খুব কাছাকাছি এসে কৌতুহলে সেদিন জিজ্ঞাসা করেছিল, “কচ্ছপ! কী করে ধরলে তুমি এটা?”

ডং বেশ উচ্চস্বরে জবাব দিয়েছিল, “ঐ মস্ত জলাশয় থেকে ধরেছি”।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, “আরো আছে নাকি ওখানে?”

ও মাথা নাড়িয়ে বলল, “অবশ্যই আছে। আমি যখন ধরেছিলাম কালো কাদামাটিতে মাখামাখি ছিল এটা। তামার বাটিতে ধুয়ে ওকে এমন পরিষ্কার করেছি। দেখ, এখন কেমন সাফ সুতরা লাগছে!”

আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, “কী করে জানলে ওখানে আরো কচ্ছপ আছে?”

জুয়ানের হাত থেকে কচ্ছপটা এক ঝটকায় টেনে নিয়ে ডং বলল, আমি জানিনা তবে মা এমন বলেছে।

জুয়ান তা শুনেই বলল, “আমি হলপ করে বলতে পারি যে ডং মোটেও এই কচ্ছপ ধরেনি। এটা মা আন্টি ধরে দিয়েছে ওর জন্য”। মা আন্টি হলো ডং এর মা। আমরাও তাকে মা বলি, ডংএর মা হিসেবে নয়, ওদের পারিবারিক সূত্রেই এই ‘মা’ ডাক পাওয়া।

আন্টি মা এই গ্রামের একজন বলিষ্ঠ মহিলা, এমনকি পুরুষদের থেকেও তাঁর শক্তি বেশি। শীতের ভোরের কনকনে ঠান্ডায় আমি তাকে বহুবার আমাদের ভিটে বাড়ির জানালার পাশ দিয়ে হেঁটে যেতে দেখেছি। সেই সময় তাঁর কাঁধে থাকত বিশাল বাঁশের ঝুড়ি আর একটা মস্ত বড় জাল। নানী বলত, ওই জাল দিয়ে উনি কুচো মাছ আর চিংড়ি ধরতেন। তাই এমন জলাশয় থেকে ছোট কচ্ছপ ধরা আন্টি মা-র কাছে বাঁ হাতের খেল ছিল। জুয়ানের কথাটা সেই কারণে আমিও বিশ্বাস করেছিলাম। কিন্তু ডংএর এতে প্রচন্ড রাগ হলো, তাঁর অহংকারে বাঁধল। কচ্ছপটা কোনও রকমে তাই হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে সে বিকটভাবে তাকালো আমাদের দিকে, তারপর চলে গেল।

সেইদিন থেকেই আমার সমস্ত ধ্যান ধারণা ঐ মস্ত জলাশয়কে ঘিরেই থাকত। যখনই মনে পড়ত ঐ গাঢ় সবুজ জলে বেশ কতকগুলো কচ্ছপ আছে, আমি চুপচাপ বসে থাকতে পারতাম না। অনেকবার ঠিক করেছিলাম নিজেই যাই একবার, দেখে আসি। বেশ কবার জলাশয়ের শেওলা ধরা সিঁড়িতেও আমি উঁকিঝুঁকি দিয়েছি। আর তার চাইতেও বেশিবার আমার কান ধরে সেখান থেকে নানী আমায় হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে গেছে ধুয়ো ভরা রান্নাঘরের দিকে। সেখানে টগবগিয়ে ফুটতে থাকা পাত্রের দিকে হাত দেখিয়ে নানী বলেছিল, “প্রিয় ইয়ং, দেখ তোমার জন্য শুকোড়ের মাংস রান্না করছি। আর আজ যদি ওই মস্ত জলাশয়ে ডুবে যেতে তাহলে এর স্বাদ তুমি কিছুতেই পেতে না...”

শীতের এই একটানা সময়ে তুলনামূলক ভাবে আবহাওয়া বেশ স্বচ্ছ ছিল। জলাশয় ঘিরে থাকা ছোট বড় গাছগুলোকে নানী কেটে পরিষ্কার করার জন্য লোক খুঁজছিল। গ্রামেরই একজনকে এ কাজে সাহায্যের জন্য নানী বলেছিল। এই কাকাকে গ্রামের সত্‌ মানুষ হিসেবে সবাই চেনে। বয়স মাত্র তিরিশ বছর কিন্তু পিঠের দিকটা কুঁজো হয়ে বেঁকে যাওয়াতে তাকে দেখলে ষাট বছরের বৃদ্ধ মনে হত। নানী তাকেই এ কাজে বেছে নিয়েছিল কারণ মানুষটা কর্মঠ এবং ভীষন চুপচাপ। কাকাকে পেয়ে নানী বলেছিল, “আর কী চাই। জল নিয়ে আর কোনও সমস্যাই রইল না। ইয়ংও জলাশয়ের কাছাকাছি খেলতে পারবে, এমনকি জলে পড়ে গেলেও চিন্তা নেই। তুমি আছ।”

আমিও তাই একটা মোটা জ্যাকেট গায়ে গলালাম, আর মাথায় টুপিতে কাকাকে অনুসরণ করতে করতে জলাশয় আবিষ্কারে এগোলাম। পেছনে নানী কাকাকে সাবধান করে দিল, “ইয়ংকে কিন্তু কিছুতেই জলে নামতে দিও না।”

সেখানে পৌঁছে দেখি সূর্যের আলো জলের ওপর চিকচিক করছে। এটুকু জানতাম এই কুঁজো কাকা বেশ খেটেখুটে চুপচাপ মত তাঁর কাজ সারবে। একটা বয়স্ক গাছে চড়ে কাকা তখন ব্যস্ত হয়ে পড়ল। আমি নীচে দাঁড়িয়ে দূর থেকে শুকনো ডালপালাগুলো ছাড়ানোতে সাহায্য করছিলাম। কিন্তু একটা সময় বিরক্ত লাগছিল এইসব, তাই কাকার দিকে তাকিয়ে বললাম, “জানো, ডংএর কাছে একটা ছোট কচ্ছপ আছে। এই জলাশয় থেকে ধরেছিল। তোমারও কি মনে হয় ওখানে আরো কচ্ছপ থাকতে পারে?”

কাঁটা লাগার মত করুন স্বরে কাকা বলল, “হ্যাঁ, থাকতেই পারে।”

“তাহলে আমি কেন দেখতে পাচ্ছি না...?”

“ওরা জলের নীচে লুকিয়ে থাকে তাই”। কাকা উত্তর দিল।

কিছুক্ষণ পর কাকা অন্য গাছে চড়ল। একমনে সে তাঁর কাজ করছিল। এই কাজ করতে সে একটা বড় কালো লোহার কাঁচি আর হাত করাত নিয়ে এসেছিল যার হাতলটা ছিল কাঠের তৈরি। আর তা দিয়ে একমনে কাজে ব্যস্ত ছিল। আ ইয়ং হাতে একটা কাঠি নিয়ে জলের কিনারায় এসে দাঁড়াল। সেখানে দাঁড়িয়ে গাছের শুকনো পাতা ও ডালপালাগুলো পড়ে যাওয়া দেখে ওর মনে হচ্ছিল যেন ঝুপঝুপ করে খয়েরি রঙের পালক ঝরে পড়ছে। একবার মাথা উঁচু করে ইয়ং গাছের ওপর দেখল কাকার বাঁকা শরীর ছুঁয়ে আছে ডালপালাগুলো।

কাকা মনোযোগের সাথে এক গাছ থেকে অন্য গাছে তাঁর কাজ সারছিল। তাই এতটুকু আভাস ছিলনা যে আ ইয়ং জলে এক দূর্ঘটনা ঘটিয়ে ফেলেছে – সে জলাশয়ে পড়ে গেছে।

দুটো ধারণা সেদিন খুব স্পষ্ট ছিল। এক, কাকা খুব আনন্দের সাথে তাঁর কাজ করবে ও দুই, আ ইয়ং জলে পড়ে যেতে পারে। তাই প্রথমটিকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল, পরেরটা নয়।

এমনকি এ ঘটনার পরেও স্মৃতি হাতড়িয়ে দ্বিতীয়টা বেশ কষ্ট করে খুঁজে বার করতে হয় আমাকে। বহু স্মৃতির ভিড়ে যা পুরনো ছবির মত দলা পাকিয়ে নষ্ট হয়ে গেছে যার খেয়াল রাখার প্রয়োজন কখনও হয়নি। হয়তো এটুকু মনে পড়বে যে জলাশয়ের সিঁড়িগুলো খুব স্যাঁতসেঁতে ছিল, শীতকালে আগাছা ভরে যেত তার আশেপাশে। সেখানে আলোর খেলা চলত সারাদিন। আর সেই গাঢ় সবুজ জলে অনেক ছোট কচ্ছপ লুকিয়ে থাকত। আ ইয়ংএর মনে হলো পায়ের নীচে এক জমাট বরফের চাতাল রয়েছে যার কাছাকাছি আসতেই পা ধীরে ধীরে আলগা হয়ে যাচ্ছিল। জলে পড়ে যাওয়া ছোট ডালপালাগুলো তখন মনে হচ্ছিল ওর চোখে আর ভুরুতে আলগা স্পর্শ করে যাচ্ছে। বড়দের কাছে এই জলাশয় একটা ডিম্বাকার স্নানঘরের মত মনে হলেও আ ইয়ংএর কাছে সেই সময় ছিল এটা সমুদ্র।

এতক্ষণ আ ইয়ং নিজের কথাই বলছিল। এখানে যা কিছু লেখা হলো তা সব আ ইয়ংএর কথাই। আ ইয়ং খুব করে চাইত ওই সবুজ জলাশয় থেকে একটা কচ্ছপ সে ধরবে। ও চাইত ওর খোলসে ফুটো করে তা ঝুলিয়ে রাখবে জলাশয়ের কিনারায়।

কাকা সেদিন কাজে এতই ব্যস্ত ছিল যে আমার জলে পড়ে যাওয়াটা বেশ সহজ হলো। জলের তলায় পৌঁছে মনে হচ্ছিল অনেক কিছু আমায় বাধা দিচ্ছে। মোটা পশমের কোট, টুপি আর হাতের ছড়িটা নিয়ে আমি জলের ওপর ভেসে আছি মনে হলো। যদিও সূর্য বংশের জলাশয়ের একটা মোটা আচ্ছাদন আমায় তখন জোরে নীচে টেনে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিল। জলে আমার ভাগ্যটা এতটুকুই জুড়ে ছিল যতক্ষন না আমি জলাশয়ের পাশ থেকে হেঁটে যাওয়া কারো চিত্‌কার শুনতে পেলাম।

পরে অবশ্য মা আন্টি সবাইকে বললেন, “সেদিন ইয়ংকে দেখে যদি অমন না করতাম তাহলে হয়তো ছেলেটা ডুবেই যেত।” উনি আরো বললেন, “এই জলাশয় এতই খাঁড়া যে একটা কাঁকড়া পর্যন্ত এগোতে পারেনা।” আন্টি মা বেশ শক্তপোক্ত মানুষ, সে সময় নানীর কাছেও ওনার গলা খুব কর্কশ মনে হলো। এই গলার জন্য সবার থেকে তাকে আলাদা করে চেনা যেত। তিনি কখনও জানতেই পারেননি তাঁর সেদিনের চিত্‌কার আ ইয়ংএর এখনও মনে থেকে গেছে, যা সে ভুলতেই পারেনি।

সেই সময় আমি প্রথম রূপোলি বাঘটাকে দেখি। জলের তলায় পৌঁছনোর পর পরই সেই রূপোলি বাঘের সাথে আমার সাক্ষাত্‌ হয়। বড় সুন্দর ছিল বাঘটা। পৃথিবীর বাকি জীবজন্তুর মতন রক্ত মাংসের ছিলনা সেটা। মনে হচ্ছিল একটা রূপোলি ছায়া দিয়ে তৈরি যেন। অথবা বলা যেতে পারে, রূপোলি শরীরে রূপোলি লোম, রূপোলি সে তাঁর চালচলনেও। আমি জলের তলা থেকে লক্ষ্য করছিলাম যে বাঘটা আমার মুখের খুব কাছাকাছি চলে এসেছিল। সূর্যের চ্ছটা তখন সেইখানে এসে পড়লে আমি চোখ বন্ধ করলাম। একটা সময় মনে হচ্ছিল এই রূপোলি বাঘ আমায় পুরো গিলে খাবে। মনে হচ্ছিল আমি ওর পেটে পৌঁছে গেছি। মনে হচ্ছিল আমি নিজেও এক রূপোলি বাঘ হয়ে গেছি। এমনটা হতেই থাকল। শেষ দেখা দৃশ্যটা শুধু মনে থেকে গেছে, যে এক রূপোলি বাঘ আরেক রূপোলি বাঘকে গিলে খাচ্ছে। জলের তলদেশে তখন কেউ নেই, যেন কোথাও কেউ ছিল না কখনও।

নানী বলল, আ ইয়ং সব সময়েই অসুস্থ ও অপয়া এক শিশু। জ্যোতিষীও তাঁর জন্মকাল বিচার করে তা পেয়েছে। ইয়ংকে সামনে থেকে না দেখলেও সে যে এমনটাই হবে জ্যোতিষী জানত।

কী আর করা, অনিচ্ছা সত্ত্বেও কোনও মতে পা টানতে টানতে একদিন জ্যোতিষী এসে হাজির হলো নানীর বাড়িতে। তারপর রান্নাঘরে কাঠের বেঞ্চিতে বসে বলল, “এই ছেলেটি গত জন্মে মহত্‌ কেউ ছিল। এমন মানুষেরা ফিরে আসেন, কিন্তু দীর্ঘদিন বাঁচেন না। এই ছেলের ভাগ্যেও জল, বা কোনও ধাতব জিনিস বা কাঠে মৃত্যু লেখা আছে। তবে আগুন কোনও ক্ষতি করবে না।”

নানী তখন আমার ডান দিকের কানটা খুব জোরে টানল, যেন আমি কোনও বেঁধে রাখা খরগোশ। আমার কানে আবারও খোঁচা দিয়ে সে জ্যোতিষীকে জিজ্ঞেস করল, “তাহলে বলুন, কেমন করে এই ভাগ্য খন্ডন করা যায়?”

জ্যোতিষী অনেকক্ষণ মাথা নীচু করে ভাবল তারপর শেষমেশ বলল, “নয় বছর বয়স হলেই মোটামুটি ঠিক হয়ে যাবে। তাই ততদিন নজরে রাখতে হবে। একবার নয় হয়ে গেলেই আর ভয়ের কিছু নেই।”

সেদিন আন্টি মা যখন সেই ঝোপঝাড়ের পাশ দিয়ে এগোচ্ছিল তখনই আমাকে ডুবতে দেখেছিল। তারপর মহা চিত্‌কারে তাঁর খটখটে হাতগুলো দিয়ে আমায় জোরে টেনে তুলেছিল জল থেকে। কাকাও এসব দেখে বেশ ভয় পেয়ে গেছিল। আন্টি মা আমার ভেজা শরীরটা জলের থেকে তুলে কাকার পিঠে চাপিয়ে দিয়েছিল। আর আমায় দেখে বলেছিল, “আ ইয়ং, তোমায় এখন হাত ধোওয়ার বেসিনে থাকা জল চুপচুপ তোয়ালের মত লাগছে।”

ছোটবেলায় জলের থেকে বেঁচে আসার পর আমি আরেক অসহনীয়তার মুখোমুখি হই। শুরু থেকে শেষ অবধি যা আমার অকালপক্কতাকেই নির্ধারণ করেছে। ছোটবেলায় মূত্রত্যাগে আমার অসুবিধা হত। যতই চেষ্টা করতাম হত না। সেই অসহ্য যন্ত্রনা সহ্য করার জন্য তখন বয়সটা বেশ ছোট ছিল। জল ভর্তি চোখে দেখতাম সেই সময় জুয়ান আর ডং লোহার বেলচা নিয়ে খেলা করছে।

একদিন ডংকে ডেকে এই অসুবিধার কথা বললাম। ডং বেলচা দিয়ে নিশানা করে বলল,

“ব্যাথার ঐ অংশটা কেটে ফেল। তাহলে আর ব্যাথাই থাকবে না।”

অবাক হয়ে বললাম, “নিজেই নিজেরটা কেটে ফেলব!”

আমি জুয়ানের দিকে ঘুরেও একই কথা বললাম, মূত্রত্যাগে আমার খুব অসুবিধা হচ্ছে।

জুয়ান বলল, দাঁড়াও দেখছি।

আমি ওর খুব কাছাকাছি এসে দাঁড়ালাম।

জুয়ান বলল, তুমি একটা অপদার্থ। সেই জন্যই জলে পড়েও কেমন বেঁচে গেছ।

আমার চোখ তখন লাল। সেই মুহুর্তে একটা চিত্‌কার শোনা গেল। “অসভ্য জুয়ান”।

কিন্তু কে বলল এটা।

আন্টি মা। মা আন্টি সেই সময় এসে বেশ রেগেই বললেন, “এখানে ওর সাথে কিসের জটলা হচ্ছে?”

যদিও নানী বিশ্বাস করত, জলে পড়ে যাওয়াতে ইয়ংএর ভয় ধরে গেছিল। এই জলাশয়ের পেছনেই তাঁর বহু টাকা গেছে। যখনই টাকার কথা মনে পড়ত, নানী চিত্‌কার করে বলত, ইয়ং ঘরে এসো। আজ তোমার জন্য মাংস রান্না হয়েছে। এইসব দিনগুলোতে আমি অবাক হয়ে ভাবতাম সত্যি সত্যি যদি আমি সেদিন সূর্য বংশের গভীর সবুজ জলাশয়ে ডুবে যেতাম তাহলে নানীর সব পয়সা হয়তো উশুল হয়ে যেত।

রঙটাং শহরে কারখানার পাশেই একটা হাসপাতালে বাবা আমায় নিয়ে গেল। বড় দরজা পেরিয়ে আমরা অন্ধকার ঘরে ঢুকলাম। এটা দেখতে অনেকটা পোশাক ঘর বা সাধারন স্নানের মত জায়গা। সেখানে সাদা দেওয়াল জুড়ে শুধু হিজিবিজি। কেউ একজন গরম জলের বোতল নিয়ে এলো। বোতলটা সবুজ রঙের আর পুরো জলে ভর্তি ছিল। বাবা আমার কুঁচকির কাছে এনে তা চেপে ধরল। প্রথমে জ্বালা করলেও পরে আরাম লাগলো। “এভাবে গরম দিলে তোমার ভালোলাগবে।” বাবা বলল।

যদিও এক মুহুর্তের জন্য আমার বিশ্বাস হলো না। কিছু আজব শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম পরের দরজায়। আওয়াজটা লোহার নিড়ানি আর কাঁচিতে ঘষা লাগলে যেমন হয় তেমন ছিল। আমি ভয় পেয়েছিলাম এই ভেবে যে হাসপাতালের লোকেরা এবার আমার ওপরে এটা ব্যবহার করবে। তখন রোগাপাতলা ফ্যাকাশে মুখের একজন মানুষ ঘরের ভেতরে এলো। তাঁর পরনে কোনো সাদা গাউন ছিলনা। বাবা মাথা ঝুঁকিয়ে জিজ্ঞেস করল, “এবারে কী আমরা ভেতরে যাব, ডাক্তার!

পরের ঘরটা ছিল মোটামুটি অন্ধকার। দেওয়ালের একদিকে লাগোয়া একটা উঁচু পাতলা লোহার বিছানা রাখা ছিল। বাবা আমায় সেই বিছানায় বসিয়ে দিল যার ওপর মাদুর পাতা আছে। মাদুরের ছোট বড় ছিদ্র দেখে মনে হচ্ছিল কারো গোঁড়ালি লেগে তা ফুটো হয়ে গেছে। বাবা আমার কপালে হাত রাখলেন, আর কুঁচকিতে থাকা বোতলটা তখন ঠান্ডা হয়ে গেছে।

ন বছর বয়সের আগের জীবনটা আমার খুব বিপজ্জনক ছিল কারণ কোন কিছুই শরীরে ভালো হচ্ছিল না। হাসপাতালে আমার হাহাকারে রঙটাং শহরের এক অর্ধ জনতার শান্তি ভঙ্গ হচ্ছিল। সেই বয়সেই আমি টের পেয়েছিলাম হাসপাতালের লোহার বিছানাটা আমার কাছে এক শাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং কিছু মানুষের অবজ্ঞার কারণও যারা আমার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নিয়ে রোজ নাড়াচাড়া করত। ন বছর বয়সের আগে একটা বড় অপারেশন হয়েছিল যা মনে করলে এখনও ভয় পাই। পরবর্তী দিনগুলোতে অবশ্য আমি লুওচেং এর বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবি হয়ে উঠি, আর এইসব দুঃখের গল্প সমস্ত মেয়ে বন্ধুদের শোনাই ও তাদের প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করি। তবে আমার মনে হয় তাঁরা কেউ জুয়ানের মত নয়। তাঁরা কখনই বলে না “আমিও দেখতে চাই।”

সেই রাতে বেশ কজন জানালা দিয়ে এ সব কিছুর এক ঝলক দেখতে চাইছিল – তাঁরা প্রত্যেকেই ছিল কারখানার শিশু শ্রমিক। জানালার এই গুপ্তচরেরা পরে আমায় বলেছিল যে অপারেশনের সময় আমাকে অজ্ঞান করা হয়নি। যেটা দেখা বেশ সাঙ্ঘাতিক ছিল ওদের কাছেও, কোনও মহিলার শিশু জন্ম দেওয়ার থেকেও বেশি ভয়ঙ্কর। তাঁরা আমার বাবা ও ডাক্তারের পুরো কথোপকথন শুনেছিল। ডাক্তার জিজ্ঞেস করেছিল, “ওকে কী অজ্ঞান করা হবে”? এবং বাবার উত্তর ছিল, না। এতে ওর স্মৃতিশক্তির ক্ষতি হতে পারে। ডাক্তার তা শুনে গলা খাঁকিয়ে, হাত কচলিয়ে বলেছিল, “তাহলে ঐ সময়টা আপনিই ওর হাতটা ধরে থাকতে আমাদের সাহায্য করবেন।” আরেকজন রুক্ষ মুখের মানুষকে আমার পা ধরে থাকার জন্য ডাকা হয়েছিল। যে তাঁর পকেট থেকে একটা লম্বা মত তার বের করেছিল। সেই তার এক ফুটের থেকেও লম্বা এবং যার শেষটা একটু থেঁতলানো ও বাঁকা। হাতে তুলে সেটা একবার দেখে নিল সে। তারপর বলল, এইবার সব ঠিক হয়ে যাবে।

জানালায় সেদিন থাকা গুপ্তচরেরা এই ব্যাপারটার আরো ভালোভাবে খোলসা করতে পারবে। তাঁরাই বলতে পারবে কিভাবে ওই রুক্ষ মানুষগুলো তাদের সরু হলুদ আঙুল দিয়ে সেই তারটা আ ইয়ংএর পুরুষাঙ্গে ঢুকিয়ে দিয়েছিল। সেই সময় আ ইয়ংকে দেখে মনে হয়েছিল গরম তাওয়ায় মাছ যেন লাফাচ্ছে। পেটে ক্রমাগত মোচড় আসছিল। যদিও হাত পা খুব জোরে চেপে ধরেছিল বাবা ও আরো একটি লোক। খুব জোরে কান্না পাচ্ছিল। অমানবিক ছিল সেই শব্দ। রক্তের সাথে মেশানো কিছু তরল বেরোল সেখান থেকে। নীচে বিছানো মাদুরটা তাতে ভিজে লাল হয়ে গেল এবং তা চুঁইয়ে পড়তে লাগল মেঝেতেও। আ ইয়ং মাথাটা লোহার বিছানায় চেপে গুটিয়ে শুয়ে পড়ার চেষ্টা করল।

বড় হবার পর বাবা প্রায়ই বলত, তোমাকে সেদিন অজ্ঞান করা হয়নি যাতে তোমার বুদ্ধির কোনও ক্ষতি না হয়। এ কথা শোনার পর চুপ থাকা ছাড়া আমার আর উপায় ছিল না। এত ব্যথা সহ্য করে “বুদ্ধি”কে বাঁচিয়ে রাখা কতটা যুক্তিযুক্ত আজও বুঝিনি। এই সময় আমার বইয়ের তাকে একটা বোতল থাকত, যার ভেতর থেকে দুটো বস্তু দেখা যেত। একটি বছর এক বয়সে কাটা আমার মাথার চুল ও আরেকটি মটরের আকারে একটি পাথর। ওই পাথরটা আমার শরীর থেকে ঐ রোগাপাতলা ডাক্তার বার করেছিল। এখনও প্রায়ই ভেবে অবাক হই, ঐ গোল নরম মটরের মত পাথরটা কিভাবে আমায় এত ব্যথা দিতে পারে!

জানালায় উঁকিঝুঁকি মারা সেদিনের কেউই কিন্তু সেই রূপোলি বাঘকে দেখেনি। আমি দেখেছি। চরম ব্যথার দিনগুলোতেও সেই বাঘ আমায় ধরা দিয়েছে। সেটা অন্য রূপোলি বাঘ। অথবা সেই বাঘ যে তাঁর স্বভাব বদলে ফেলেছিল। জলের তলার জন ছিল শান্ত; কিন্তু লোহার বিছানার নীচে থাকা বাঘটা ছিল বেশ হিংস্র প্রকৃতির। বিছানার নীচে অন্ধকার ছায়ার মধ্যে থেকে বাঘটা ওর মুখ হাঁ করেছিল যা আমার ডান গোঁড়ালিতে আঘাত করছিল। মনে হচ্ছিল ওর দাঁতগুলো আমার হাড়ে বিঁধছে। মনে হচ্ছিল বেশ জোরে আমার আর বিছানার মধ্যেকার যোগসূত্রকে ও টেনে ছিঁড়ে ফেলতে চাইছে। আমি ওর থেকে বেরিয়ে আসার আপ্রাণ চেষ্টা করছিলাম। বিছানার রেলিংকে শক্ত করে আঁকড়ে থাকার চেষ্টা করছিলাম। আর সাহায্যের জন্য চিত্‌কার করছিলাম। “ও আমাকে দূরে ছুঁড়ে ফেলতে চাইছিল।” কিন্তু হাসপাতালের ভেতরে বা বাইরে থাকা কেউই আমার এ ডাকে সাড়া দেয়নি। এই অপারেশন সেদিন চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে পৌঁছেছিল। আমার হাতও অবশেষে অসাড় হয়ে গেছিল কিন্তু তাঁরা শেষমেশ আমায় ছাড়েনি।

এই অপারেশনে আমার দুই জায়গা থেকে রক্তপাত হয়েছিল। আ ইয়ংএর চামড়া থেকে রক্ত বেরোচ্ছিল। রক্ত বেরোচ্ছিল গোঁড়ালি থেকেও। দু জায়গায় দু রকমের ব্যথা অনুভব করছিলাম। এভাবে কী ঠিক বোঝানো যায়? যদিও আমি বলতে চাই রূপোলি বাঘটা সত্যি সত্যি সেখানে ছিল। সে বহুবার এসেছে। বহুবার আমি তাঁর কামড় উপলব্ধি করেছি।

রূপোলি বাঘের সাথে আমার লড়াই মোটামুটি তিন দিন ও তিন রাত চলল। ঐ দিনগুলোতে হাসপাতালে আমি সমস্ত কিছু ভুলে গেছিলাম। লোহার বিছানাটাই ছিল এই যুদ্ধের আখড়া যেখানে সর্বশক্তি দিয়ে বাঘকে বাধা দিয়ে আমি জিত হাসিল করলাম। চতুর্থ দিন সকালে সেই কুঁজো কাকা এসে হাসপাতাল থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে গেল। তাঁর পিঠে শরীর এলিয়ে বেরোতে গিয়ে হাসপাতালের পাশে খোলা মাঠটা নজরে পড়ল। উত্তুরে হাওয়ায় বেশ ঠান্ডা লাগছিল তখন, গাল যেন ঠান্ডায় জমে গেছিল। এভাবেই মাঠের পর মাঠ পেরিয়ে গ্রামে পৌঁছলাম। সমস্ত ঘর বাড়ি ছাড়িয়ে ওপর থেকে এক ঝাঁক চড়াই তখন উড়ে যাচ্ছিল যেমনটি তাঁরা সবসময়েই করে।

ভিটের ছাউনির নীচে আমার কানে না শুনতে পাওয়া নানীকে দেখলাম দূর থেকে হাত নাড়াচ্ছে। যেন তিন দিন তিন রাত সে ওভাবেই দাঁড়িয়ে আছে। রঙটাং শহর থেকে ফিরে আসা প্রত্যেকের কাছে নানী আমার খবর জানতে চাইত। তাঁর একটাই প্রশ্ন ছিল, “আ ইয়ং কি কেঁদেছে?”

সেই কাকা আমায় নানীর কাছে নিয়ে এলো। আমিও নানীর কাছ ঘেঁষে বললাম, আ ইয়ং কিন্তু কাঁদেনি। সে ফিরে এসেছে। বলতে গিয়ে আমার গলা ধরে আসছিল। দেখলাম নানীও মুখ লুকিয়ে কাঁদছে। সেই সময় সে নিজেকে আড়াল করতে ভুলে গেছিল। দেখলাম বড় মুখখানা হাঁ করে নানী আমার সামনে কাঁদছে। যা দেখে তখন আমার মোটেও ভালোলাগছিল না।

পরের দিনগুলোতে আমি যখন লুওচেংএর এক বুদ্ধিমত্ত মানুষ হিসেবে পরিচিত হই তখন চাইতাম ছোটবেলায় নানীর সাথে কাটানো ওই ছাউনি ঘেরা ভিটের সমস্ত গল্প লিখে রাখব। যা খুব সহজ ও সত্‌ ভাবে লেখা হবে। রঙটাং শহরের গ্রামগুলোতে এখন আর অমন ভিটে একটাও নেই। ভিটের দেওয়ালগুলো দুই ফিট পুরু ছিল যা সম্পূর্ন মাটি দিয়ে লেপা। এই দেওয়াল তৈরিতেও বেশ হ্যাঁপা ছিল। এক একটা দেওয়াল দাঁড় করাতেই অনেক সময় লেগে যেত। এখনও ভিজে মাটির গন্ধ আমার সেই গ্রামকে মনে করায়। খড় বিছানো ছাউনি ঘেরা সেই ভিটে যা খুব যত্ন করে বানানো হত। আমার এখনও মনে আছে এগুলো তৈরিতে বিশেষ নজরদারি রাখা হত। তবে নানীর ভিটে বাড়িটা বেশ লজ্জায় ফেলে দিত আমায় যার কেবল একখানি দরজা আর রান্নাঘরে একটা ছোট জানালা ছিল। দুটো লিকলিকে গাছ জানালায় চোখ রাখলেই দেখা যেত যা আমি নয় বছর হতে হতেই বেশ লম্বা হয়ে গেল, ভিটের ছাউনি ছাড়িয়ে তখন তা আকাশপানে চেয়ে আছে।

এখন আমি সেই খালি ভিটের কথাই বলব। সবাই জানে, যখন আমার নানী মারা গেল তখন তাকে ভিটের পাশের বাগানেই কবর দেওয়া হয়েছে। আমিও সেই নয় বছর বয়স অতিক্রম শেষে একদিন ট্রেনে চড়ি ও লুওচেং শহরে এসে পাড়ি জমাই। এখানেই স্থায়ী হই নিজেও। তবে এখন সেই ফাঁকা ভিটেবাড়ির কথাই মনে পড়ছে। সেখানে আজ কেউ নেই। নানী ও আমি দুজনেই এখন সেখান থেকে অনেক অনেক দূরে।

তবে ওই ফাঁকা ভিটের মুখোমুখি হলে আমার বেশ অস্বস্তি হয়। যা নেই তাকেই আপ্রাণ খুঁজি। খুঁজি সেই খাবারের গন্ধ। শুঁকোড়ের মাংস বা ভুট্টা কেক খুব মনে পড়ে। নয় বছর বয়স পর্যন্ত যতবার আঘাত পেয়েছি, যতবার শরীর খারাপ হয়েছে বা মৃত্যুর মুখ থেকে বেঁচে এসেছি, এই ছাউনি ঘেরা রান্নাঘরের সুগন্ধ আমায় তরতাজা করে তুলেছে। প্রায়শই তখন নানীর হাতে বানানো শুঁকড়ের মাংস খেতাম। তাঁর হাতের ভুট্টার কেক ছিল নরম ও সুস্বাদু যার একদিকটা খয়েরি ও অন্যদিক হলুদ থাকত। তাঁর হাতের ছাপ লেগে থাকত কেকে। সেইসব দিনগুলোতে ছোট্ট মেয়ে জুয়ান খেলার জন্য আসত আর ততক্ষণ থাকত যতক্ষন না আমরা খাওয়া শেষ করি। নানীও সবসময় বলত, “দুজনে ভাগাভাগি করে খেও।” নানী আরো বলত খাওয়ার সময় সামনে থাকা কাউকে না দিয়ে খেলে পেটে ব্যথা হতে পারে।

তবে শেষ যেবার নানী ভুট্টা কেক বানিয়েছিল সেদিন কেউ দেখেনি। সারাদিন সে রান্নাঘরেই কাটিয়েছিল, সকাল থেকে রাত পর্যন্ত স্টোভের আগুন জ্বলেছিল সেদিন। সেইদিন নানী পাঁচশ একষট্টি খানা ভুট্টা কেক বানিয়েছিল যার প্রত্যেকটাই ছিল ভীষণ রকম সুস্বাদু, তাঁর আগের বানানো কেকগুলোর থেকেও।

অপারেশনে আমাকে অজ্ঞান না করানোয় ব্যথা অবশ্যই ছিল তবে বাবার মধ্যেও এর কিছুমাত্র অনুশোচনা লক্ষ্য করেছিলাম। সুদূর রঙটাং শহর থেকে বাবা আমার জন্য একটা তামার কাসর ঘন্টা এনে দিয়েছিল যার আকার ছিল ষাঁড়ের ক্ষুরছাপের মতন। সাথে একটা বাঁশের মুগুড় যা মোটা বস্তায় আঁটোসাঁটো করে পেঁচিয়ে রাখা ছিল। ওটা হাতে দিয়ে বাবা বলেছিল, “আ ইয়ং, তুমি যখনই ব্যথা অনুভব করবে তখন এই ঘন্টাটা যত জোরে পারো, বাজিও।” আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, তা কেন? উত্তরে বাবা বলেছিল, তুমি এটা বাজালে আমি শুনতে পারব এবং তোমায় হাসপাতালে নিয়ে যাব। এরপর ওই কাসর ঘন্টার দিকে তাকালেও তা ছোঁওয়ার সাহস করিনি। কিন্তু সেইদিন কেক বানানোর পর নানী বলেছিল, “কাল দুপুরের দিকে গ্রামে ফিরে যেও আর ঘন্টাটাও বাজিও”। আমি কেন জিজ্ঞেস করাতে নানী খুব জোরে কান মুলে বলল, “যা বলা হয়েছে শুধু তাই করবে”।

ছাউনি ঘেরা ভিটে বাড়ির পাশেই একটা সব্জি বাগানের জমি আর তাকে ছাড়িয়েই সেই জলাশয়। বাড়ির সামনেই গমক্ষেত – মাঠের পর মাঠ। শীতকালে ভিটের বাইরে সীমগাছ তেমন চোখে পড়ত না। সব কিছুরই মরশুমের সাথে বদল হত। বসন্তের যা কিছু বসন্তে – গ্রীষ্মের যা কিছু গ্রীষ্মে। পাতাঝরার সময়ও এক। শুধু শীতকালেই ব্যতিক্রম ছিল। সাদা বা বেগুনী রঙের একটাও সীম চোখে পড়ত না।

নয় বছর বয়স হতেই আমি নিজেও সাবলম্বী হলাম। এই সময় নানী আমায় ছেড়ে চলে গেল। একপ্রকার ঘোর লেগেছিল যেন। সেই সময় নানীকে প্রায়ই কাদামাখা নোংরা কাপড়চোপড়ে দেখা যেত যদিও অনেকে বলত কম বয়সে নানী বেশ আকর্ষণীয় ছিল দেখতে। এদের প্রত্যেকের কথা ছিল সত্যি, যদিও শেষ বেলায় তাকে চেনা যেত না। প্রায়ই তাকে বলতে শুনেছি, “নিজেকে অপবিত্র মনে হচ্ছে, আমি মৃত্যু চাই শুধু।”

সূর্য অস্ত গেলে ভুট্টার কেকগুলো নানী গ্রামের সকলের মধ্যে বিলিয়ে দিল। আস্তে আস্তে পায়ে হেঁটে তাঁর এই বিতরণ দেখে মনে হচ্ছিল এটাই শেষ উপহার যা সবাইকে দেওয়া হলো। সারা গ্রাম সেদিন কেকের গন্ধে ভরপুর ছিল।

এই গন্ধেই আমি সেদিন সারা রাত জাগি। নানী আমার গায়ে জড়ানো কাঁথায় হাত চাপড়িয়ে বলল, “ঘুমিয়ে পড়ো”। এই সময় আমি তাকে রাগাতে চাইনি। আমি ঘুমের ভান করলাম। কিন্তু ছোটবেলার সেই অন্ধকার দিনগুলোতে আমি সব কিছু শুনতে ও দেখতে পেতাম। আমি জানতাম গ্রামের বাইরের কোনও এক জায়গা থেকে সেই রূপোলি বাঘটা আসবে। এই রূপোলি বাঘ অন্যরকম। অথবা সেই একই যে সময়ের সাথে তাঁর স্বভাব বদলে ফেলেছে। এর চলনও খুব ধীরে এবং সেদিন ও ভিটের বাইরে এসে ঠাঁই দাঁড়িয়ে থাকল যেন এক পাথরের চাঁই – ভারী ও ঠান্ডায় জমাট বাঁধা।

সেই সময় আমি রূপোলি বাঘকে দেখি, আমি জানতাম না এটা আদৌ বাঘ কিনা, তাঁর রঙ কিছুই বুঝতে পারিনি। যদিও বয়স বাড়লে এই “রূপোলি বাঘ” শব্দটা আমায় প্রতিনিয়ত আঘাত করেছে, যা দিয়ে এখনও শৈশবের অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিই। “রূপোলি বাঘ” আমার সতেরো বছরের শিক্ষাকালের এক আশীর্বাদ। “রূপোলি বাঘ” আমার বক্তব্যকে সমৃদ্ধ করে, আমার সমস্ত অভিজ্ঞতার ওপর আলোকপাত করে এক প্রতিচ্ছবি তৈরি করে।

নানী জানালার বাইরে থাকা সেই গাছ পেরিয়ে, ভাঙা ইঁটের স্তুপ যা চিমনির চারদিকে ছড়িয়ে থাকত তা পেরিয়ে নিজেকে সেদিন বেশ কষ্টে একপ্রকার ঠেলেই উঠিয়ে দিল সেই রূপোলি বাঘের পিঠে। বাঘকেও সেই সময় বেশ অনুগত মনে হলো, মনে হলো সে যেন মাথা ঝুঁকিয়ে হাঁটু মুড়ে রয়েছে। আমি চিত্‌কার করে বললাম, “নানী, যেওনা তুমি। তুমি কিছুতেই ওকে এভাবে নিয়ে যেতে দিও না। যেওনা ওর সাথে।” আমি চিত্কার করতেই থাকলাম যতক্ষণ না সকাল হয়ে যায়।

পরদিন দুপুরে গ্রামে ফিরে আমি সেই ঘন্টাটা বাজাই। গ্রামের এদিক ওদিক ছুটে আমি ওটা বাজাতেই থাকি। যত জোরে সম্ভব ঠিক তত জোরেই। যেন পাগল হয়ে গেছি আমি। খুব করে চাইছিলাম সেই কাকা এসে আমায় মা বাবার কাছে নিয়ে যাক। আমি তাঁর কুঁজো পিঠে এলিয়ে সেই সব কিছুকে বিদায় দিতে চাইছিলাম – ডং, আন্টি মা আর সেই ছোট্ট মেয়ে জুয়ানকেও, যে বা যারা এক সময় আমায় অনুসরণ করত।

আমি বলতাম, “আজ এসো না আমার সাথে। ফিরে যাও। ফিরে যাও।”



[এরিক আব্রাহামসেন দ্বারা চীনা ভাষা হতে অনুবাদ করা হয়েছে এবং সহযোগিতায় ন্যানজিং ইউথ লিটেরারি প্রোজেক্ট]

প্রকাশিত জুন ৪ এবং ১১, ২০১৮ সংখ্যায়।


লেখক পরিচিতি
লু ইয়ং :
বর্তমানে ন্যানজিং নর্ম্যাল ইউনিভার্সিটির চীনা ভাষার অধ্যাপক, ডুয়ানলি লিটেরারি মুভমেন্টের একজন সদস্য এবং এই ভাষার একজন নিয়মিত লেখক যিনি রূপান্তরধর্মী ও বর্ণনামূলক লেখা নিয়ে ক্রমাগত গবেষণা করে চলেছেন। পাঠক যা চায় এবং যারা এমন লেখা ভালোবাসে সেই সমস্ত কিছু মাথায় রেখে তাঁর এই লেখালেখি।



সাক্ষাত্কার
লু ইয়ং এর বড় হওয়া ও লেখালিখির দিনগুলোতে

- ডেবোরা ট্রেসমেন

ডেবোরা ট্রেসমেন : 
সাপ্তাহিক সংখ্যার “Silver Tiger” কি ইংরেজিতে লেখা আপনার প্রথম প্রকাশনা? আপনার লেখালিখি ও চীনে এরূপ প্রকাশনা নিয়ে যদি আমাদের কিছু বলেন?

লু ইয়াং : 
ঠিকই। “Silver Tiger” আমার প্রথম দিকে লেখা একখানি ছোট গল্প আর এবারই তা প্রকাশ পেল ইংরেজিতে। নব্বই দশকের আগে আমি কিছু রূপান্তরধর্মী কল্পকাহিনী প্রকাশ করেছি যা চীনের কিছু গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্য জার্নালে আছে। এবং এর সাথেও কিছু গল্প যেমন “The small hours of 1993” ১৯৯৩ এ, “String and song” ধারাবাহিক যা ১৯৯২ ও ১৯৯৩ এ লেখা এবং “Guttering Flame” ধারাবাহিক যা ১৯৯৫ এ লেখা হয়েছে। এই সময় ছোট গল্প, উপন্যাসিকা ও পদ্য প্রকাশ করেছি। একটা উপন্যাস লিখেছিলাম যেটা হতাশ করেছিল খুব কারণ তা বেজিংএর এক প্রকাশনায় নয় বছর আটকে ছিল, পরে অবশ্য শাংঘাই থেকে ২০০৭ এ মুক্তি পায়। হেমিংওয়েজ-এর লেখা “The old man and the sea”র চীনা ভাষায় অনুবাদ করে প্রকাশ করেছিলাম।

ডেবোরা ট্রেসমেন : 
বেশ কিছু বছর আপনার রূপান্তরধর্মী কল্পকাহিনী লেখা বন্ধ। এর পেছনের কারণ কি? এখন কি আবার লিখতে শুরু করবেন?

লু ইয়াং : 
নব্বই দশকেই আমার সমস্ত লেখা ছাপা হয়েছে এবং ওই সময় চীনের অগ্রগ্রামী লেখকদের মধ্যে আমায় ধরা হত। তবে যখন লেখা বন্ধ রেখেছিলাম তখন আমার কলমের অসহয়নীয়তা লক্ষ্য করেছি। এটা নিয়ে বলাও বেশ কঠিন। খুব সহজ করে বলতে গেলে প্রতিষ্ঠা বা পরিচিতি আমার কাছে ধুলোর মতন। আর যখন এই লেখালেখি আমার থেকে সরে যায় তখন মনে হয় সব হারিয়ে ফেলেছি। তবে আবার লিখতে শুরুতে করব, অবশ্যই অন্য আঙ্গিকে – যা বেশিরভাগ হবে উপন্যাস, চিত্রনাট্য বা নাটক। কবিতা লেখা আমি কখনও ছাড়িনি তাই এটার শুরু নিয়ে বলছিনা। আর লেখা কেনই বা বন্ধ ছিল তা বলতে গেলে “The old man and the sea” অনুবাদের কথা অবশ্যই উল্ল্যেখ করতে হয় যার সাথে আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার যোগসূত্র রয়েছে। চমত্‌কার সাহিত্য সৃষ্টি একজন মানুষ কেবল একটিই বার করতে পারে। এই ব্যাপারটার মধ্যেও এক আশ্চর্য মাদকতা আছে। পরবর্তীতে এই দিকটা আরো বেশি করে লেখাতে তুলে ধরতে পারব আশা রাখি।

ডেবোরা ট্রেসমেন : ১
৯৯২ তে আপনি “Silver Tiger” লিখেছিলেন। এটা কি কোনও ধারাবাহিক গল্পের অন্তর্গত ছিল? এটা লেখার অনুপ্রেরণা কোথা থেকে পেয়েছিলেন?

লু ইয়াং : 
“Silver Tiger” গল্পটা ইচ্ছাকৃত এমন ধারাবাহিক ভাবে লেখা হয়নি যদিও পরে একটা গল্প লিখি যার অংশ এটা বলা যেতে পারে। ছোটবেলার লাফালাফি ও খেলার দিনগুলোতে এক শিশুমন খোলা জায়গায় বড় হতে থাকে যার শহর বা পাহাড় ঘেরা জায়গা নিয়ে কোনও ধারণাই ছিল না আর যাকে দেখলে পাতা বা গাছের ডালের সেই কীটের মত মনে হত – তাঁর কথাই বলতে চেয়েছি। বহু বছর পর আমার মনে হয়েছে তাঁর একাকীত্ম ও ভয়কে লেখাতে প্রকাশ করা দরকার।

ডেবোরা ট্রেসমেন : 
তাহলে কি এই গল্পে লেখা আ ইয়ংএর ছেলেবেলা আপনারই ছোটবেলাকে তুলে ধরেছে? এখানে যেভাবে বর্ণনা করা হয়েছে আপনিও কি ঠিক তেমন ভাবেই গ্রামে বড় হয়েছেন?

লু ইয়াং : 
হ্যাঁ। সেটা সত্যি। আ ইয়ং আমি নিজেই। তবে এই গল্প যে লিখিয়ে নিল তা আমি নই, গ্রামের ছেলেটিও না। সে কিছুটা কাল্পনিক এখানে – কাল্পনিক যা কিছু লেখা, আঁকা বা বলা হয়েছে। গল্পের গ্রাম, সেই সময় সব কিছুই একটা ঝাপসা মতন এখানে।

ডেবোরা ট্রেসমেন : 
গল্পের মধ্যে ভাষ্য বদল হচ্ছে। প্রথম ব্যক্তি ও তৃতীয় ব্যক্তিতে। এইরকম পরিবর্তনের কারণ কি?

লু ইয়াং : 
গল্পে ভাষ্য বদল গল্প বর্ণনার কোন বিশেষ কায়দা নয়। আরও অনেক গল্পে আমি এ কাজ করেছি। এটা আমার কাছে পারিপার্শ্বিক অবস্থাকে তুলে ধরার একটা চেষ্টা শুধু, আর কিছু নয়।

ডেবোরা ট্রেসমেন : 
রূপোলি বাঘ আসলে সত্যিকারের বাঘ নয়, তবে আ ইয়ংএর কাছে সে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এটা কি শুধুই মৃত্যুর এক প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত, নাকি কোন অন্তর্নিহিত অর্থ হিসেবে ব্যবহার আপনার এই গল্পে?

লু ইয়াং : 
বাঘটি এখানে অবশ্যই মনগড়া তবে এটা একটা প্রতীক হিসেবে ব্যবহার হয়েছে কিন্তু মৃত্যুর নয়। আ ইয়ং সমতলে বড় হয়েছে যেখানে সে কখনও বাঘের ছবি পর্যন্ত দেখেনি। ওই শিশু বয়সে অসুখ ও মৃত্যুকে এত কাছ থেকে সে দেখেছে যা কাউকে বলতে পারেনি। রূপোলি বাঘ তখন আ ইয়ংএর কাছে এক উপহার হয়ে এসেছিল যাকে সে সব কিছু বলতে পারে, বোঝাতে পারে।

ডেবোরা ট্রেসমেন : 
আপনি একজন রূপান্তরধর্মী কল্পকাহিনী লেখক যা সমসাময়িক চীনা কল্পকাহিনীতে দূর্ল্ভ। চীনে বা তার বাইরে কোথাও এমন কোনও লেখক আছেন কি যিনি আপনাকে প্রেরনা দেন?

লু ইয়াং : 
আধুনিক লেখাতে এই রূপান্তরধর্মী কল্পকাহিনীর এক বিশেষ জায়গা আছে তবে এটা ছোট গল্পের ক্ষেত্রে জরুরী নয়। এরকম বর্ণনামূলক লেখা লেখকের ভেতর থেকেই আসবে, যেটা বুঝতে পারা খুব জরুরী। আমি এরকম বহু লেখকের অনুরাগী যারা অনেক কাল্পনিক বস্তুকেও সামনে তুলে ধরে মানবতা বুঝতে সাহায্য করেছেন আর তখন পৃথিবীকে আমার বাসযোগ্য বলে মনে হয়েছে নইলে বেশ জটিল লাগে সব কিছু। আমার মনে হয় তাদের সেই প্রভাব আমার লেখাতে এক মস্ত বড় পাওয়া।

[লু ইয়ং এর এই কথোপকথন চীনা ভাষা থেকে অনুবাদ করেছেন এরিক আব্রাহামসন]

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন