বুধবার, ১৭ মার্চ, ২০২১

জুকিসওয়া ওয়ানার'এর গল্প : পরিযায়ী শ্রমিক


অনুবাদ: এলহাম হোসেন

[জুকিসওয়া ওয়ানারের জন্ম ১৯৭৬ সালে জাম্বিয়ায়। বর্তমানে দক্ষিণ আফ্রিকায় বসবাস করছেন। একাধারে সাংবাদিক, ঔপন্যাসিক ও সাহিত্য সংকলক। তাঁর প্রথম উপন্যাস The Madams প্রকাশিত হয় ২০০৬ সালে। এটি সাউথ আফ্রিকান লিটেরেরি এওয়ার্ড এবং কমনওয়েলথ রাইটার্স প্রাইজের জন্য মনোনয়ন পায়। ২০১৪ সালে আফ্রিকা-৩৯ তালিকার অন্তর্ভূক্ত হন। আফ্রিকার চল্লিশ বছরের কম বয়সী শিকড়সন্ধানী লেখিকা হিসেবে তিনি এই সম্মানে ভূষিত হন। এ পর্যন্ত চারটি উপন্যাস, তিনটি ননফিকশন এবং দু’টি শিশুতোষ রচনা করেছেন। অনুদিত গল্পটি তাঁর Migrant Labour এর বাংলা ভাষান্তর।]

“আমি দুঃখিত। আমি জানি, প্রতি ছয়মাস পর আপনার বেতন বৃদ্ধি পাওয়ার কথা। আমাদের সঙ্গে সই করা চুক্তিতেই তো আছে। “আর”, একটু থেমে, “আপনার কাজও অসাধারণ। তবে, এই মুহূর্তে আমাদের কোম্পানি আপনার বেতন বাড়ানোর মতো অবস্থায় নেই। বাজেটেও কুলোচ্ছে না।” কথাগুলো আফ্রিএইডের মহাসচিব জেমস কঙ্গায়ো বললেন। ঠিক একই উত্তর পেয়েছিলাম তার পূর্বসুরি লিভিংস্টোন স্ট্যানলির কাছ থেকেও।

আমি ছিলাম সাউদার্ন আফ্রিকান ডেভেলপমেন্ট রিজিয়নের রিজিয়নাল ম্যানেজার। মিজির বিদায়ের পর এতদঞ্চলে আমিই একমাত্র ব্যক্তি যার রোলোডেক্স গাড়িতে S A D C - র অনেক ক্ষমতাবান মন্ত্রী, প্রভাবশালী এম.পি. লিফ্ট নিয়েছেন। ঐ নেতাদের এখানকার লোকেরা নামেই চেনে। অথচ আমার মুখের উপর বলে দেওয়া হলো যে, বেতন বাড়ানো হবে না।

মনে হলো, অভিসম্পাত করি। কিন্তু, পারলাম না । এটি আমার কাজ নয়। আমি কি না করেছি। পুরুষদের উৎসাহ-উদ্দীপক ম্যাগাজিনের পরমর্শানুযায়ী যা যা করা দরকার, আমার বেতন বাড়ানোর জন্য অনুরোধ করার পূর্বে তার সবই করেছি। বেতন-কাঠামো পর্যালোচনা করার মিটিংয়েরও আয়োজন করেছিলাম। বাড়তি বেতন চাওয়ার জন্য পরিবেশ তৈরির জন্য সব বিষয়েরই উপস্থাপনা করেছিলাম। মেইল পাঠিয়ে শুক্রবারে মিটিং আয়োজন করার অনুরোধ করেছিলাম। এদিন বসেরা বিশ্রামে থাকেন। তখন মনেও ফুরফুরে ভাব থাকে। অথচ এই মিটিংয়েই আমাকে জানিয়ে দেওয়া হলো যে, আমার বেতন বাড়ানো হবে না।

আমার নাম তিনায়ে মুসন্জা। আঞ্চলিক সাহায্য-সহযোগিতার বিষয়ে আমার জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা ভালো।

মহাসচিবের মাসিক বেতন এতটাই বেশি যে, তা দিয়ে উনি এ অঞ্চলে গোটা কয়েক যুদ্ধ চালানোর খরচ জোটাতে পারবেন।

আমার বেতনও পর্যাপ্তই ছিল। আমি আমার ওয়ার্ক পার্মিট তুলে নিয়ে অন্য কোনখানে কি যেতে পারতাম না? আমার মত কর্মদক্ষতাসম্পন্ন ব্যক্তিকে আরও ভালো বেতন দিয়ে রাখার মত আরও অনেক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। আমার এক বন্ধু আমাকে একটি চাকুরির কথা বলেছিল। প্রতিষ্ঠানটি আমার ধারে-কাছেই। কী যেন নাম। ডিরেক্টর অব ডাইভার্সিটি বা এ রকমই কিছু একটা হবে। কর্পোরেট বিশ্বে টিকে থাকার জন্য রাজনীতিটা ভালোভাবে জানতে হয়। এখানে কাজের চাইতে পদ-পদবীর কদর বেশি। যাই হোক, তবে আমাকে ছুটিছাটা এবং বেতন-বোনাসের সদ্ব্যবহার করতে হয়।

ইতস্তত করতে করতে বললাম, “আপনি নিশ্চয় আমার ওয়ার্ক পার্মিট আটকাবেন না, আর আমাকে অন্য কোথাও কাজ করার সুযোগও দেবেন।”

কঙ্গায়ো উৎসুক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালেন। তাঁর নীল চোখ দু’টো সরাসরি আমার অন্তরে এসে বিঁধল। আহ, তাঁর নীল চোখ দু’টো! তাঁর চাহুনি যথেষ্ঠ রসকসহীন। কিন্তু, তাঁর নীল চোখ দু’টো শরীরের কালো রংয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়ে এমন একটা আবহ তৈরি করেছে যে, ও আপনার দিকে তাকালে আপনার মনে হবে কী যেন এক অপরাধ করে ফেলেছেন। কয়েকমাস পূর্বে একজন আফ্রিকান মহিলাকে বিয়ে করার পর থেকে অদ্ভুত কারণে উনি নীল কন্টাক্ট লেন্স ব্যবহার করতে শুরু করেছেন। তখন থেকে আমাদের ব্যবস্থাপনার উপরও রাগারাগি করতে শুরু করেছেন। শ্বেতাঙ্গরা কিভাবে আমাদের লোকজনদের ঠকাচ্ছে, তা নিয়েও তিনি রাগে গড়গড় করেন। তাঁর ইতিহাস জানলে অবশ্য যেকেউ এই বিষয়টাকে গুরুত্ব দিয়েই নেবেন।

আপনারা জানেন, কঙ্গায়ো সৃজনশীল বুদ্ধি-জ্ঞানসম্পন্ন একজন দক্ষিণ আফ্রিকী স্পেশাল ব্রাঞ্চের সাবেক কর্মকর্তা। আমার সহকর্মী মাকি যিনি হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজার, বলেন, দক্ষিণ আফ্রিকার যখন হাওয়া বদলে যাচ্ছিল অর্থাৎ, হ্যারল্ড ম্যাকমিলানের বক্তৃতার পর তবে মান্ডেলার রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পূবের্, কঙ্গায়ো তখন সবার সঙ্গে এক কাতারে সামিল হয়ে গিয়েছিলেন। তখন স্পেশাল ব্রাঞ্চে কর্মরত তাঁর কলিগদের খবরাখবর ইউডিএফ-এ চালান করতেন, বুঝাতে চাচ্ছিলেন, তিনি হিব্রু বাইবেলে উল্লেখিত ইসরাইলের প্রথম রাজা সাওলের মতো বদলে গেছেন। কিন্তু ইউডিএফ এর নেতারা তাঁকে অন্যদলের দালাল হিসেবেই বিবেচনা করতে লাগল। কতিপয় নেতা তাকে সন্দেহের চোখে দেখতে লাগল। উনি এখনও পর্যন্ত আশপাশের কিছু এলাকায় যেমন, সোয়েটোতে পা ফেলার সাহস পান না। স্থানীয় অনেক লোকের গুম ও খুনের জন্য তাঁকে দায়ী করা হয় বলে তার উপর হামলা করার হুমকি আছে।

কঙ্গায়ো বক্তৃতায় পটু। তাই, আমিও একটু চালাকি করলাম। যখন আমি বললাম যে, আমার ওয়ার্ক পার্মিট অন্য কোথাও ট্রান্সফার করব তখন তার কণ্ঠে হতাশা ধ্বনিত হওয়ার আগেই তার চোখের মণি যেন গলে গেল। “যখন আপনার জন্যই এতসব আয়োজন করলাম, তখন আপনি বলছেন যে, আপনি অন্য কোথাও কাজ করবেন?”

এবার সঙ্গত কারণেই থামলেন। আবার বলতে লাগলেন “ইয়াং ম্যান, আপনার কি জানা আছে, এ দেশে আপনার বয়সী কত তরুণ চাকুরির জন্য হন্যে হয়ে ঘুরছে? কত ডিগ্রীধারী জিম্বাবুয়ান চাকুরি না পেয়ে সেন্ট্রাল মেথোডিস্ট গীর্জার মেঝেতে ঘুমোচ্ছে?”

চাকুরির বাজে শর্ত নিয়ে যখন কেউ অভিযোগ করতে যায় তখনই দক্ষিণ আফ্রিকীরা এমন করে কেন? আমার সত্যিই জানতে ইচ্ছে হলো, আমার কতজন স্বদেশী ভাই সেন্ট্রাল মেথোডিস্ট গীর্জায় ঘুমোয়। কিন্তু আমি ভদ্রতার সীমা লঙ্ঘন করতে পারলাম না। আসল কথাটা হলো, বেতন বাড়ানোর ব্যাপারে আমি তো তাঁর আনুকুল্য চাইতেই এসেছি।

মাথা নাড়িয়ে বললাম, “না, কমরেড জেম্স”।

তাঁকে যেন কমরেড বলে সম্বোধন করি সে ব্যাপারে আমার উপর চাপ ছিল। আমার মনে হয়, তাঁর ধারণা আমি তাকে মানবহিতৈষী নেতা মনে করি। আমার আচরণে তার মনে এমন ধারণাও হয় যেন সে স্পেশাল ব্রাঞ্চের সব অপকর্মের গ্লানি মুছে এখন সে ধোয়া তুলসি, আর ইউডিএফ- এ তাঁর অবদানের আমি জয়গান করেছি।

“না, কমরেড জেম্স।” তিনি এমনভাবে কথা বলতে বলতে থামলেন যেন তিন বছরের শিশুর সঙ্গে তিনি কথা বলছেন।

“ঠিক আছে, যথেষ্ট হয়েছে। আমি যতদূর শুনেছি, আপনার দেশের অর্ধেক লোকই, তা তারা যোগ্যতাসম্পন্ন হোক বা না হোক, চাকুরির খোঁজে এ দেশে এসেছে, কারণ, আপনার দেশের অর্বাচীন নেতা মনে করেন, শ্বেতাঙ্গদের বিনিয়োগ ছাড়াই দেশ চালাতে পারবে।”

কঙ্গায়ো মাঝে মাঝে তাঁর পরিমিতি বোধ ছাপিয়ে যান। তিনি ভুলে যান যে, রাজনৈতিকভাবে তিনিই ঠিক। এনজিওতেও তিনি কাজ করেছেন। তিনি কি ভুলে গেছেন যে, দক্ষিণ আফ্রিকা আফ্রিকারই একটি দেশ।

মাথা নাড়িয়ে বললেন, “আমি আপনার ব্যাপারে হতাশ। আমার বিশ্বাস ছিল, আপনি আলাদা।”

আমাকে ব্ল্যাকমেইল করছেন-- এটা বুঝতে পেরে তাঁকে কথা শেষ করতে না দিয়েই উত্তর দিলাম, “অবশ্যই, স্যার। আমাকে যদি অন্যদের থেকে আলাদা হতেই হয় তবে, তা ভরাপেটেই হতে হবে। নিজের দারিদ্রকে আড়াল করে অন্যের দারিদ্রের বিরুদ্ধে বলার জন্য দাঁড়িয়ে যাওয়াটা আমার কাছে দ্বিচারিতা ছাড়া আর কিছুই নয়”।

কঙ্গায়োর চোখ চকচক করে উঠল। মনে হলো, আমার আওড়ানো শব্দবন্ধগুলো তাঁর ভালো লেগেছে। কিন্তু এমন ভাব দেখালেন যেন আমি কিছুই বলিনি। হতে পারে, হয়ত আমি বলিইনি। আবার, হতে পারে, আমি হয়ত ঐ কথাগুলোই শুধু বলতে চেয়েছিলাম। আমি আসলে কী বলতে পারতাম? তাহলে উনি হাসলেন কেন?

“নাহ, তাহলে শুনুন মি. মুসন্জা। আপনি যেতে চাইলে যান। তবে, আমাদের ওয়ার্ক পার্মিট পাবেন না। যাঁরা আপনাকে চাকুরি দেবেন তারাই আপনার ওয়ার্ক পার্মিটের ব্যবস্থা করবেন। শর্তানুযায়ী আপনি আমাদের টাকা ফেরত দেবেন। এবার বলুন, আপনি তাহলে থাকছেন, নাকি যাচ্ছেন?”

“আমি থেকে যাচ্ছি কমরেড”, আস্তে আস্তে বললাম। “দুঃখিত, আমি শুনতে পাইনি”, কঙ্গায়ো যেন আমার অসহায়ত্বের মজা নিচ্ছিলেন।

“আমি তো বলছি, আমি থেকে যাচ্ছি, স্যার”, একটু জোরে বললাম। কমরেড শব্দটার পরিবর্তে ‘স্যার’ শব্দের উপর জোর দিলাম। হাসতে হাসতে আমার পীঠে চাপড় দিলেন। তবে, সে হাসি শুধু মুখেই লেগে থাকলো, চোখে পৌঁছল না। “আপনি সত্যিই ভালো মানুষ মুসন্জা। ভালো মানুষ। ছয়মাস পর আমাদের দাতারা যখন দেখবে যে, আপনার মতো মেধাসম্পন্ন লোক আমাদের এখানে কাজ করছে তখন ওরা আমাদের তহবিল আরও বাড়িয়ে দেবে। তখন আপনার মাইনে বাড়ানোর ব্যাপারটা আমি বোর্ডের কাছে তুলবো। সম্ভব হলে তখন বিষয়টি দেখব।” কথাগুলো এমনভাবে বললেন যেন আমার বিষয়টা তার কাছে তেমন গুরুত্ব দেওয়ার মতো কিছু নয়।

ভেবেছিলাম তিনি আমার মাইনেটা বাড়ানোর ব্যাপারে তদবির করলে আমার কিছু স্বচ্ছলতা আসবে। তাই, তাঁকে অনুরোধ গিয়েছিলাম। যাই হোক, শেষমেশ উঠে পড়লাম। আমি তো চাকুরিটার দাস হয়ে গেছি। আমি একা হলে হয়ত টিকে যেতাম। আমার বাবা বেতনের টাকা দিয়ে আমাকে হারারের একটি প্রাইভেট স্কুলে পড়িয়েছেন। এখনও তাঁর বেতনটা পর্যাপ্তই মনে হয়। আমার বোনের লেখাপড়ার খরচাদির জন্য গোটা পরিবার আমার উপর নির্ভর করে। ওর স্কুলের বেতনটা কি জানি এক অজানা কারণে ইউ.এস. ডলারে শোধ করতে হয়। সেটি আবার প্রতি টার্মেই বাড়ে। অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচা যেমন, টেলিফোন বিল, ডি.এস.টি.ভি-র বিলও দিতে হয়। এগুলোকে আমি প্রয়োজনীয় বিষয়ই বলব। আমার ছোট ভাই রুসুনুঙ্গুকো। ও অবশ্য নিজেকে রুস বলেই ডাকে। ও যদি রোজগার করত তবে আমার সুবিধে হতো। কিন্তু ও তো খামারে কাজ করবে বলে ঠিক করেছে। তার মানে হলো, যখন ওর সুবিধে হবে তখন ও বেচা-বিক্রি করবে। তবে, কাজের জন্য গাড়ি নিয়ে বের হলেও তাতে মেয়েদের চাপিয়ে শহরে ঘুরতে যায়। যদিও খামারে ওর বউ আর দুই বাচ্চা আছে। এর উপর আবার নিজের খরচ। তবে হ্যাঁ, আমি তো আর না খেয়ে নেই। মেলভিলে দুই বেডের ছোট্ট একটা বাসা ভাড়া নিয়েছি। প্রায়ই রেস্তোরায় ডিনার করতে যাওয়ার আমার সামর্থ্যও আছে। তবে, আমার খরচার সঙ্গে যখন আমার বাবা-মা’র ভরণপোষণের খরচাপাতি যোগ হয় তখন দেখি, টাকা ফুরিয়ে গেছে কিন্তু মাস আর ফুরোয়নি। চার বছরের চুক্তি আমার। প্রথমে তিন বছর। এরপর সঙ্গে অতিরিক্ত ট্রায়ালের জন্য আর এক বছর। যতদিন থাকলে আবাসিক সুবিধা পাওয়া যায়, তার চাইতে এক বছর কম। এ দেশে তিন বছর ধরে আছি। বেতন বাড়িয়ে চাওয়ার পর কঙ্গায়ো আমার দিকে যেভাবে তাকিয়ে ছিলেন তাতে মনে হয় চুক্তি শেষ হবার পর তা আর নবায়ন হবে না। চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে গেলাম।

দুশ্চিন্তার মধ্যে হাবুডুবু খেতে লাগলাম। এ দেশকে আমি যেভাবে ভালোবেসেছি, এদেশের কাছ থেকে আমি সেভাবে ভালোবাসা পাইনি। আমার মনে আছে, অক্সফোর্ড ছেড়ে আসার সময় আমি কেমন উত্তেজিত বোধ করেছিলাম। স্বপ্ন দেখতাম, দেশে ফিরে গিয়ে সমমনা আফ্রিকী ভাইদের হাতে হাত মিলিয়ে মহাদেশটাকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য কাজ করব। কিন্তু, ফেরার পর থেকে কিছু একটা হাড়ে-হাড়ে টের পাচ্ছি। এই যে দক্ষিণ আফ্রিকা। এটি তো আফ্রিকারই দেশ। কিন্তু, ইংল্যান্ডে আমার যেমন লাগত এখানেও ঠিক তেমনটাই লাগছে। অভিবাসি। দক্ষিণ আফ্রিকার শেতাঙ্গদের কাছে আমি তো কালোদের কোটা পূরণ করছি মাত্র। ওরাই তো আফ্রিএইড বোর্ডের পুরোটা জুড়ে বসে আছে। আর এখানকার কৃষ্ণাঙ্গদের কাছে আমি ওদের শহরে বেড়াতে আসা নবাগত আগন্তুক। মনে হয় আমি যেন ওদের কোন এক ভাইয়ের চাকুরি দখল করে বসে আছি। প্রায়ই আমার মনে হয়েছে, আমি কি তোমাদের ভাই নই? (যদিও গলা ফাটিয়ে বলা সম্ভব হয়নি।)

অন্যান্য অভিবাসীদের অবশ্য পছন্দ না হলে চাকুরি ছেড়ে দেওয়ার সুযোগ আছে। ওরা যথেষ্ঠ বেতন পায়। ছুটি-ছাটা পায়। সপ্তাহান্তে মদ্য পান করে ফুর্তি। আমার ব্যাপারটা আলাদা। আমি আমার চাকুরিটাকে ভালো তো বাসতেই পারিনি, তার উপর আবার কম মাইনে। কোনমতে দু’মুঠো ভাতের যোগার হয় আর কি।

ছাড়তে চাইলেও পারলাম না। চাকুরি ছাড়লে বৈধ ওয়ার্কপার্মিট পাব না। যুক্তরাজ্যে উন্নয়ন খাতে ভুরিভুরি লোক আছে। তাই সেখানেও আর ফিরতে পারব না। একমাত্র ফিরে যাওয়ার জায়গাটা হলো জিম্বাবুয়ে। আমি সেখানে ফিরে যেতে পারবও না, যাবও না। যেখানে পুরো দেশসুদ্ধ মানুষ শুধু পালাচ্ছে আর পালাচ্ছে, সেখানে আমার ফিরে যাবার ব্যাপারটা হবে বোকামী। আমার প্রিয় স্থান জোজিতেই থেকে যেতে হবে। তবে, শুধু ‘জি স্যার, হ্যাঁ স্যার’ বলে এবং কৃষ্ণাঙ্গ বসের হাতে নিজেকে সওদা করতে দিতে হবে আর কি।

এরপর হঠাৎ মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে গেল। মোবাইল ফোনের নাম্বারগুলো স্ক্রল করে ওকে ফোন দিলাম।

“গ্রেস বলছি, হ্যালো”, ও উত্তর দিল।

“হ্যাঁ, হ্যালো। আপনার পুরাতন সহকর্মীরা কেমন আছেন তা তো ফোন করে একটু-আধটু জানতে চাইতে পারেন, না-কি?” আমি বললাম।

“ ও, তিনায়ে, আপনি?” সে এতজোরে চিৎকার দিল যে, ফোনটা কানের কাছ থেকে একটু দূরে সরিয়ে নিতে বাধ্য হলাম।

গ্রেস আফ্রিএইড- এর অফিসের অভ্যার্থনাকারী ছিল। ওকে যখন এ্যাকাউন্টসের কাজ করতে বলা হলো তখন ওর মোহভঙ্গ হলো। ও বুঝতে পারলো যে, ওখানে শুধু ওর মাইনেটাই সবার চেয়ে কম। কিন্তু, পদস্থদের বুঝাতেই পারল না যে, ওর মাইনেটা বাড়ানো দরকার। জোবার্গে থাকাকালীন আফ্রিএইডে সুবিধা আদায়ের ক্ষেত্রে ও আমাকে সাহায্য করতে পারে।

এ কাজে আমি পুরো সময়ের একটা সমীক্ষণ করি। সাউথ আফ্রিকার পরিসংখ্যান অনুযায়ী সেখানকার মেয়েরা ছেলেদের চাইতে ছাব্বিশ শতাংশ সময় বেশি কাজ করে। আমি ইচ্ছা করেই কঠোর পরিশ্রম করেছিলাম। দেখতে শুনতে খারাপ ছিলাম না। বুদ্ধি-শুদ্ধিতেও বেশ। ফলে, সবার নজরে পড়ে গিয়েছিলাম। এখানে থেকে যাবার মতো একটা চাকুরি পেয়ে গেলে দক্ষিণ আফ্রিকার একজন মহিলাকে বিয়ে করে প্রথমে থাকার ব্যবস্থা, তারপর নাগরিকত্ব নেব।

মনে-মনে ঠিক করলাম, গ্রেসই হবে সেই মহিলা।

আপনি দেখছি আমাকে টাকার অংকে মাপছেন। আপনার জন্য ব্যাপারটা কতই না সহজ। সম্ভবত আপনি একজন দক্ষিণ আফ্রিকী। তাই আমি কেমন উভয় সংকটে আছি তা আপনি বুঝতে পারছেন না। আমি কখনও কাউকে আঘাত করার চিন্তা করিনি। একটা সৎ জীবীকা চেয়েছিলাম। কিন্তু দুর্ভাগ্য আমার পিছু ছাড়লো না।

আমার বন্ধু এবং প্রাক্তন সহকর্মী মুজিলিকাজি চাকুরি ছেড়ে দিয়ে কেপটাউনে গেছে। ওর অবশ্য সুমন্যতা আছে।

গ্রেসকে আমার সহজেই মনে ধরেছিল। ও যতদিন আফ্রিএইডে চাকুরি করত আমার মনে হতো আমার ব্যাপারে ওর আগ্রহ আছে। কোন কাগজ-পত্রে সই করাতে এলে আমার সঙ্গে একটু বেশি সময় নিয়ে কথা বলত। তখন আমি ওকে পাত্তা দেইনি। তবে, এখন পাত্তা না দেওয়ার কোন কারণ নেই। আমাদের স্বার্থের কোন দ্বন্দ্ব ছিল না। শুধু মনে মনে চাইতাম, ওর পেছনে যেন কোন ছেলেবন্ধু ঘুরঘুর না করে। আগেই বলেছি, গ্রেস কিন্তু সুন্দরী।

“হ্যা, আমি বলছি। কেমন আছেন?”

“ধন্যবাদ, আমি ভালো আছি” ও উত্তর দিল।

“এই শুক্রবারে আপনার কোন পরিকল্পনা আছে কি-না তা জানতেই ফোন দিয়েছি।”

আমি গ্রেসের দীর্ঘ, লম্বা শ্বাসের শব্দ শুনতে পেলাম।

আমি জানতাম, আমি ওকে পেয়ে গেছি।

ওর পরিকল্পনা থাকলেও ও তা বাতিল করবে।

লজ্জা জড়ানো কন্ঠে উত্তর দিল। “আপনার মন যা চায় তাই হবে।”

“রাতে ডিনার করব, নাচব, ড্রিংকস করব, তারপর দেখা যাবে কোথায় যাওয়া যায়। এবার বলুন, আপনার কোন আপত্তি আছে কি-না?”

“আপত্তি নেই। আমার অফিস থেকে নিয়ে যেতে পারবেন তো?”

“অবশ্যই। ঠিকানাটা দিন।”

এভাবে গ্রেস আর আমি একাকার হয়ে গেলাম। ও রোজ ব্যাংকে কাজ করত। প্রথম ডেটিংয়ে ওকে সঙ্গে নিয়ে প্রিমি পিয়াত্তিতে গেলাম। মনে হলো, ঘরভর্তি সব মানুষ আমাকে হিংসে করছে ।

গ্রেস সৌন্দর্যের প্রতিমূর্তি। আফ্রিকী হোক আর যাই হোক। ওর ঠোট দুটো আকর্ষণীয়। যেন সেগুলোতে শুধু চুমু দেবার জন্যই তৈরি। নাকটা মুখের গড়নের সঙ্গে খাপের খাপ মিলে গেছে। গালে টোল পড়ে। হাসলেও, না হাসলেও।

সবচেয়ে সুন্দর তার চোখ দুটো। ডাগর ডাগর চোখ দুটো কী যেন বলতে চায়। বেশি কিছু বলে না, তবে বার বার কিসের যেন ঈঙ্গিত দেয়। চোখের পাঁপড়িগুলো দীর্ঘ। টেলিভিশনে যে মাসকারার বিজ্ঞাপন দেখায় তার কোন প্রয়োজন নেই ওর। যে-কেউ ওর চোখের দিকে তাকালে তাতে হাবুডুবু খাবেই। আমার আত্মসংযমের প্রশংসা করি। ও আফ্রিএইডে চাকুরি করার সময় কেন যে ওর সঙ্গে ডেটিংয়ে যাইনি তা মাথায় ঢোকে না।

ও আমার মতই লম্বা। চমৎকার ত্বক। দক্ষিণ আফ্রিকীরা এই রঙকে দুধে-আলতা বলে। ক্যাটওয়াক করা মডেলদের মতো ওর পা দুটো লম্বা। মিনিস্কাট পড়ে। সঙ্গে হিল।

বেয়োনসির কথা থা’ক। ওর নিতম্বের খাঁজ যেন কোন এক দক্ষ কারিগর নিপুণ হাতে নিখুঁত করে গড়েছেন।

মোদ্দা কথা হলো, গ্রেস সুন্দরী।

আমরা খাবারের অর্ডার করলাম।

“এতদিন পরে ফোন দিলেন যে?” দ্বিতীয়বার হুইস্কির গ্লাসে যখন চুমুক দিচ্ছিলাম তখন ও জানতে চাইলো। ও অবশ্য তখন স্মিরনোফ স্পিনে চুমুক দিচ্ছিল। ইত্যবসরে স্টারটারের জন্য অপেক্ষা করছিলাম। আহ হা, ও আমার ফোনের জন্য অপেক্ষা করছিল।

“আমি ভেবেছিলাম প্রথমে তোমার আগের ছেলেবন্ধুর সঙ্গে ছাড়াছাড়িটা হয়ে যাক”, আমি উত্তর দিলাম।

“অন্য ছেলেবন্ধু? সেটা আবার কে?”

যা’ক বাবা, ওর তাহলে ছেলেবন্ধু নেই। অথবা সে অসংলগ্ন হয়ে পড়াতে হয়ত আগের ছেলেবন্ধুর অস্তিত্ব স্বীকার করছে না। ভালই কাজ হচ্ছে মনে হয়।

সেই প্রথম রাতেই আমরা সেক্স করলাম। ব্যাপারটা অবশ্য আমরা দু’জন আগে থেকেই ঠিক করেছিলাম। সপ্তাহান্তের ছুটির দিনটা সে আমার এখানেই কাটালো।

শীঘ্রই প্রিমি আমাদের আড্ডা দেওয়ার স্থানে পরিণত হলো, আর সপ্তাহের ছুটির দিন কাটে গ্রেসের সঙ্গে। গ্রেস যত সুন্দরীই হোক না কেন, ওর সঙ্গে আলাপচারিতায় আমার কষ্ট হয়। আলাপচারিতায় ওর কাছ থেকে নতুন কিছু আশা করা যায় না। সংবাদপত্রটা হাতে নিলে সে শুধু বিশেষ কিছু খবর পড়ে যেমন, লিমপোপোতে কোন জুলু সম্প্রদায়ের লোক কোন নারীকে ধর্ষণ করেছে ইত্যাদি, ইত্যাদি- এমন খবর।

ওর সঙ্গে সেক্স ভালো। কিন্তু, আলাপচারিতা আশাতীতভাবে নিরস। ভাঙ্গাঘরে গ্রেস চান্দের আলো নয়। আমার মেলভিলের বাড়িতে ও ঘুমোতে এলে সেক্সের পরে আমি ঘুমের ভান করার কৌশলে দক্ষতা অর্জন করে ফেললাম। ওকে বিয়ে করলে, তা হবে ক্লান্তিকর। যত ভালো চাকুরিই হোক না কেন, সপ্তাহান্তে ওর বারটা স্মারনোফ স্পিনের বিল মেটাতে গেলে চাকুরিটা আর থাকবে না। ব্যাপারটা হয়ত এমনও হতে পারে যে, আমরা পুরুষরা কখনও পরিতৃপ্ত নই। তবে, এ কথা সম্ভবত কোন পুরুষ-বিদ্বেষী মহিলা বলতে পারে।

তবে, আমি হলফ করে বলতে পারি যে, আমি গ্রেসের ব্যাপারে খুশিই ছিলাম। শুধু ওর চাইতে আর একটু ভালো কাউকে আশা করেছিলাম।

কিন্তু সময় আমার অনুকূলে ছিল না। আমি ভেবেছিলাম ছয়মাস ওর সঙ্গে ডেটিং করার পর ওকে প্রস্তাব দেব। বিয়ে করব। এখানকার স্থায়ী বাসিন্দা হব। ভালো চাকুরি নেব। একটা সময় পর ওকে মেনেও নেব।

এবার ঘটনাটা ঘটে গেল।

গ্রেসের সঙ্গে প্রেমের পঞ্চম মাসে (আমার কাছে অবশ্য তাই মনে হয়) স্লিন্ডিলের সঙ্গে আমার দেখা হয়ে গেল। আমি স্লিন্ডিকে পাত্তা না দিলেও পারতাম। গ্রেসকে নিয়ে পরিকল্পনায় কোন জটিলতা সৃষ্টির দরকার ছিল না। তবে, আমাকে না প্রচণ্ড লালসা পেয়ে বসেছিল। কী আর করা, মানুষ তো।






অনুবাদক পরিচিতি
এলহাম হোসেন
ইংরেজি সাহিত্যের শিক্ষক। 
আফ্রিকান সাহিত্যে পিএইচডি।
প্রবন্ধকার।  অনুবাদক।
ঢাকায় থাকেন। 

1 টি মন্তব্য:

  1. মুদ্রার দুই পিঠ-ই দেখানো নির্মেদ ঝকঝকে গল্প। অসাধারণ অনুবাদ। এ গল্প মনে থাকবে।

    উত্তরমুছুন