শনিবার, ১৫ মে, ২০২১

আলী নূরের ধারাবাহিক স্মৃতিকথা: তুচ্ছ দিনের গান-- পর্ব: ৪-৬




 
চার

আব্বা গ্রামকে বড়ো ভালবাসতেন। চাকুরি উপলক্ষে সারা জীবন শহরে শহরেই কাটালেন। প্রথমে জামশেদপুরে টাটা কোম্পানিতে, পরে চট্টগ্রাম ডিষ্ট্রিক্ট বোর্ডে। কিন্তু নিজের গ্রামকে ভুলেননি কখনো। সময় পেলেই ছুটে যেতেন মকিমপুরে। তাঁর আদরের, আমোদের লোকজন নিয়ে মেতে থাকতেন কয়েকদিন। চিটাগাং এর ডিষ্ট্রিক্ট ইঞ্জিনিয়ার পদ থেকে অবসর গ্রহণ করে গ্রামেই থাকবেন স্থির করলেন। সুন্দর করে বাড়ি বাঁধলেন- বাপের আমলের পুরোনো বাড়ি থাকা সত্বেও; এখন যেখানে আমি ‘অমৃত সদন’ বানিয়েছি। বিরাট করে পুকুর কাটলেন। পুকুর পাড়ের চারদিকে অসংখ্য আম গাছ কাঁঠাল গাছ লাগালেন। পশ্চিম ভিটায় বিরাট ঘর, প্রধান শোবার ঘর। দক্ষিণ ভিটায় বারবাড়ি অর্থাৎ বাইরের ঘর, বাইরের লোকদের বসার ঘর। এই ঘরে সেজ ভাই থাকতেন। বড়ভাই বিয়ের পর ভাবীকে নিয়ে এই ঘরে থেকেছিলেন বেশ কিছুদিন। উত্তর ভিটায় আরেকটি ছনের চৌচালা ঘর। বড়ভাই কলকাতার কলেজের বন্ধুবান্ধব নিয়ে এলে এই ঘরে থাকতেন। খুব গানবাজনা চলতো। গ্রামোফোনে নতুন নতুন রেকর্ড বাজতো। বড় ভাই নিজেও হারমোনিয়াম নিয়ে বসতেন। বড় ভাই এর গলা ভারি মিষ্টি ছিল । 
গ্রামের এই বাড়ি, এই পুকুর, এই উঠান, এই গাছগাছালি, সব আমার খুব আপন হয়ে উঠল। আমি প্রকৃতির মধ্যে মিশে গেলাম। ক্লান্ত দুপুরে একা একা ঘুরে বেড়াতাম পুকুর পাড়ে। কোথাও সীম গাছের মাঁচার নিচে গিয়ে দেখতাম ঘুঘুর বাসা। কোনটাতে ডিম আবার কোনটাতে বাচ্চা ফুটেছে সবে। পালক গজায়নি। ভারি মমতা হতো এদের দেখে। আজও পাখির প্রতি আমার দুর্বলতা গেলো না।

গ্রামের ছেলেদের সঙ্গে আমাকে মিশতে দেয়া হতোনা। একমাত্র নন্দী বাড়িতে যেতে পেতাম আব্বার সঙ্গে। এছাড়াও দু’একটা বাড়িতে যেতাম। যেমন সোনারামপুরের পাঞ্জত আলী ভাই এর বাড়ি । ভাই জোয়ান পুরুষ। ভাবী আর ছোট্ট হামাগুড়ি দেয়া এক বাচ্চা নিয়ে সংসার। শিশুটির কোমড়ে ঘুঙুর বাঁধা। গ্রামে এই ঘুঙুর বাঁধা খুব আবশ্যক ছিল । ছোট বাচ্চারা পুকুরের দিকে গেলে যেন খোঁজ রাখা যায়। সব বাড়িতেই একটা পুকুর থাকত। ভাবী খুব আদর করতেন আমাকে। দুপুরে কখনও গেলে আদর করে খেতে বসিয়ে দিতেন । পুকুর থেকে সদ্য তোলা ছোট মাছের ঝোল, ধনেপাতা দিয়ে রান্না; অমৃতের মত লাগতো। আমাদের গ্রামের সব মেয়েদের রান্নাই খুব ভালো। তখনকার দিনে খাওয়ানো-দাওয়ানোর বড়ো চল ছিল। আব্বা গ্রামের সম্মানী ব্যাক্তি, সবার সঙ্গে মিশতেন আপন করে। তাই আমার বড়ো আদর ছিল সব ঘরে। আব্বাকে খাওয়াতে চাইত সবাই। আর আমি এ ব্যাপারে থাকতাম আব্বার নিয়মিত সঙ্গী।

মকিমপুরের এই নতুন বাড়ি নিয়ে আমার বাল্যের, শৈশবের অনেক স্মৃতি। এই বাড়ির উত্তরের ঘরে মনুর জন্ম। নীনারও জন্ম এই ঘরে, কার্তিক মাসের এক দারুণ ঝড়ের রাতে। মেয়ে জামাইরা এলে এই ঘরেই থাকতেন। একবার অনেকে এসেছিলেন কুমিল্লা থেকে। তাজু ভাইসাহেব বুবু ও বাচ্চারা, মিনুবু, বাচ্চুভাই বড়ভাই, সবাই। বাড়ি ভরভরাট। তাজু ভাইদের সঙ্গে এসেছিলেন তার ছোট ভাই আমিন ভাইসাব, আরো ছিলেন মফিজ মামা, মতু মামা ও আরো কয়েকজন। শীতের বিকেলে মতু মামারা গুলতি নিয়ে সাদা বক তাড়া করতেন। মতু মামার হাতের তাক খুব ভালো ছিল। একবার গুলতি দিয়ে একটা বক শিকার করে তাক লাগিয়ে দিলেন। বড় ভাইএর বন্দুকের টিপ ছিল ভালো। তাজু ভাইসাবের বন্দুক নিয়ে খুব ভোরে বের হতেন শিকারে। তখন খুব শিকার পাওয়া যেত। শামুককাঁচা, ওয়াক, বক, এইসব। আর পাওয়া যেত অনেক বালিহাঁস। শীতের দিনে এইসব বালিহাঁস এসে আশ্রয় নিত বিভিন্ন গৃহস্থের বড়োবড়ো পুকুরে। গ্রামে বন্দুকের উপদ্রব ছিল না বলে এইসব পুকুরে বালিহাঁসরা ছিল খুব নিরাপদ। পুকুরে মেয়েরা হাড়ি-পাতিল বাসন-কোসন মাজত। হাঁসগুলো খুব কাছে থেকেও ভয় পেত না। একবার অনেক হাঁস মেরেছিলেন বড়ো ভাই। গুলি খেয়ে কিছু হাঁস ডুব দিয়ে পালাতে চেষ্টা করত। আমি ছুটতাম জ্যান্ত হাঁস ধরতে, পুষব বলে। একবার এক পুকুরে বালিহাঁসের ডিম পাওয়া গেল। শাফীভাই এনে আম্মাকে দিলেন। আম্মা মুরগির তা দিয়ে দশটা বাচ্চা ফুটালেন। কালো ঠোট, কালো সব ছোট ছোট রেশমি লোম। গামলা ভরা পানিতে ছাড়তেই সাঁতরে ডুব দিতে লাগলো। দু’একদিন পর মারা গেল সব। আসলে অতি ছোট বাচ্চা প্রথম পানিতে ছাড়তে হয়না একথা জানতো না কেউ।

আম্মা জোরে-সোরে কৃষিকাজ শুরু করে দিলেন। অর্থাৎ নিজেই নিলেন কৃষিকাজের দায়িত্ব। আর বর্গা নয়। অনেক কৃষক- মজুর থাকতো আমাদের বাড়িতে। এদের রান্না হতো বাইরের চুলোয়। আম্মা, মিনুবু দেখতেন সবকিছু আর যদু চাচা বাইরের সব। পুকুর-ভরা মাছ। গোয়ালভরা গরু আর গোলাভরা ধান। আম্মার খুব সুনাম। সবাই খুব পয়মন্ত বলতো। সকাল বেলায় দুধ দোয়ানোর গম্ভীর শব্দে ঘুম ভাঙ্গতো । গরুর আহলাদি বাচ্চাগুলো লেজ তুলে ধিতিং ধিতিং নাচতো। সন্ধ্যায় ক্লান্ত মজুরেরা আহারাদি সমাপ্ত করে দক্ষিণের বাইরের ঘরে আশ্রয় নিতো। তারপর চলতো তাদের তামাক খাওয়া আর তামাক পাতা কেটে তামাক বানানোর পালা। বড় বড় তামাক পাতা কুচিকুচি করে কেটে চিটেগুড় মিশিয়ে তামাক তৈরি হতো। তত্ত্বাবধানে যদু চাচা। গল্প চলতো আর পাট দিয়ে পাকানো হতো দড়ি। আরো তৈরি হতো বাঁশ ও বেতের বিভিন্ন ঝুড়ি, মাছ ধরার পলো, ওচা ও নানা মাপের চাঁই। হাতের কাজ আমাকে ভীষণ আকর্ষণ করতো। ঘুম না-আসা পর্যন্ত আমি এসব কাজ আশ্চর্য হয়ে দেখতাম। কিছুদিনের মধ্যে আমি রশি তৈরি, বাঁশ, বেতের কাজে পারদর্শী হয়ে গেলাম। আমি বড়ো হয়ে অন্য কিছু করব একথা মনে আসতো না। হাতেরকাজ এখনও কিছু পেলেই আমার করতে ইচ্ছে করে। আমি যখন কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজিয়েট স্কুলে পড়তাম তখনও স্কুলে যাওয়া আসার পথে এক মুচির দোকানে দাঁড়িয়ে জুতা সেলাইয়ের কাজ দেখতাম। আমার ভালো লাগতো। আর ভালো লাগতো বই বাঁধাইয়ের কাজ। কুমিল্লা মোগলটুলীতে বইয়ের দোকান গুলোর সামনেই ছিল দুই তিনটা বাঁধাইয়ের দোকান। আমি প্রায় প্রত্যেক দিন বাসা থেকে অনেকদূর হেঁটে এই বই বাঁধাইয়ের দোকানে পৌঁছতাম। বইয়ের পাতা সেলাই আর মসৃণ করে পাতাগুলো কাটার কাজ দেখতাম অনেক মনোযোগ দিয়ে। বই বাঁধাই এবং ছাপাখানার কাজ আমার এখনও খুব ভালো লাগে। বই বাঁধাইয়ের উপর আমার অনেক বই আছে, আমাজন থেকে কেনা।

এদিকে আম্মার জয়জয়কার। অনেক ধান হয়েছে আমাদের ক্ষেতে। বিরাট আকারের গোটা চারেক গোলা ভরা। আমাদের অনেক ধানের জমি। বাড়ির সামনের উঠোনে ধান মাড়াইয়ের কাজ চলতো। আমার হাতেও একটা কঞ্চি দেওয়া হতো গরু তাড়ানোর জন্য। আমি যেন এগুলোতেই আনন্দ পেতাম। আম্মা প্রমাদ গুনলেন। ভাবলেন গ্রামের পরিবেশে থেকে থেকে আমার লেখাপড়া হবেনা। চাষা-ভুষা হয়ে যাবো। আব্বাকে তাড়া দিতেন আবার শহরে চলে যাবার জন্য। আম্মার এই তাগিদেই শেষ পর্যন্ত মকিমপুরের এই বিশাল বাড়ি জামশদের আব্বা তালেব আলীর কাছে বিক্রি করে দিয়ে একদিন আমরা পাড়ি জমাই ঢাকায়, ১৯৪৮ এর মার্চ মাসে।
 
বর্ষাকালে আমাদের বাড়ির চারপাশ পানিতে তলিয়ে যেত। তখন নৌকা ছাড়া চলাফেরার কোনো উপায় ছিল না। কিছুদিনের মধ্যে আমি নৌকা চালানো শিখে ফেললাম। লগি দিয়ে নৌকার ব্যালেন্স এবং দিক ঠিক রেখে বেশ চালাতে পারতাম। আব্বা পুরোনো বাড়িতে যাবেন। আমাকে বললেন, নৌকা চালিয়ে নিয়ে যেতে পারব কিনা। আমার সে কী উত্তেজনা! আব্বাকে নিয়ে খুব পারদর্শিতার সঙ্গে নৌকা চালিয়ে গেলাম এবং ফিরে এলাম। কিন্তু আব্বা এ নিয়ে তেমন কিছু বললেন না। বোধ করি নৌকা চালানোতে আমার এই অতি আগ্রহ খুব একটা পছন্দ করলেন না। হয়তো আমার ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করলেন।

বড়ো বড়ো মহাজনী নৌকা আসতো বাড়ির পূব দিকে। ধান নিয়ে কুটি কিংবা কসবার গঞ্জে যাবে মিলে ভাঙানো কিংবা বিক্রির জন্য। আমি ছোট একটা ছিপ নিয়ে এই সব নৌকার পিছনে বসে ছিপ ফেলে অনেক কৈ মাছ ধরতাম। নতুন পানির কৈ মাছ ভারি ̄সুস্বাদু। কৈ মাছের প্রতি আমার দুর্বলতা তখন থেকেই। আর একটা কাজ খুব ভাল লাগতো। ওচা দিয়ে টাকী মাছের পোনা ধরতে। খেতের উপর হাঁটু সমান মানে আমার কোমড় সমান পানি। এসব খেতের পানিতে টাকী মাছ তার পোনা নিয়ে ভেসে বেড়াতো। বাতাবি লেবুর লাল কোঁয়ার মতো পোনাগুলো। পিছন ওচাটা চেপে ধরে সামনে থেকে তাড়া করে পোনাগুলোকে ওর মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়ে ওচাটাকে টেনে তোলা হত। কখনো কখনো মা’টাও ধরা পড়ত। একবার মনু এসে বেশ কিছুদিন ছিল। পোনা ধরার এই উৎসবে মেতে উঠল আমার সঙ্গে। অঘটনও ঘটত কখনো কখনো। এক ভরা দুপুরে একঝাঁক পোনা সুদ্ধু ওচা টেনে তুলতেই দেখি পোনার ঝাঁকের সঙ্গে একটা সাপ ওঠে এসেছে। পোনামাছ এদের প্রিয় খাদ্য। যাক, একথা আর কাউকে বলা সমীচীন মনে হলো না, যদি পোনামাছ ধরা বন্ধ করে দেয়!

 
পাঁচ


গ্রামের জমিদার হলধর নন্দী আব্বার বাল্যকালের বন্ধু। নন্দীবাবুর জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত গ্রামে থাকাকালীন সময়ে আব্বা প্রত্যেক সন্ধ্যায় নন্দীবাড়িতে বসতেন তাঁর বাল্যবন্ধু জমিদার হলধর নন্দীর সঙ্গে। মাঝে-মধ্যে আমাকেও নিয়ে যেতেন সঙ্গে করে। চলত খোশ গল্প, তার সঙ্গে সুগন্ধী তামাকের ধুমায়িত হুঁকার মৃদু গুঞ্জরণ। রুপায় বাঁধানো ফর্সী হুঁকা, বিরাট নল, প্রমান সাইজের কল্কি, তাতে কতক্ষণ পর পরই তামাক ফেরানোর জন্য ছিল কয়েকজন ভৃত্য। উপরে হাতে টানা পাখা। পাখা টানার জন্য আরো কয়েকজন ভৃত্য। বিরাট ফরাস পাতা। অনেকক্ষণ চলতো এই বৈঠক। প্রধান জমিদার স্বয়ং, সঙ্গী আব্বা, কিছু পারিষদবৃন্দ এবং গ্রামের কিছু লোক যারা জমিদারের কাছের মানুষ। ছোট ভাই লালু নন্দী অর্থাৎ শশধর নন্দীর এসব আসরে ঠাঁই নাই। আমাদের রাতের খাওয়া নন্দী বাড়িতেই হতো। জমিদার বাবুর স্ত্রীকে আমি জ্যাঠিমা ডাকতাম। ছোট ভাই লালু নন্দীর ছেলে বাদল আমার সহপাঠী এবং ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল। জ্যাঠিমা নিঃসন্তান ছিলেন। বাদলকেই পুত্র স্নেহে টেনে নিয়েছিলেন কোলে। অনেকদিন স্কুল থেকে বাদলের সঙ্গে চলে যেতাম নন্দীবাড়ি। জ্যাঠিমা আমাদের দুজনকেই কোলে বসিয়ে খেতে দিতেন ঘিয়ে ভাজা মুড়ি, নন্দীবাড়ির বিখ্যাত ছাপসন্দেশ । । জ্যাঠিমা বেঁচে নেই, বছর কয়েক আগে মারা গেছেন।
 
নন্দী বাড়িতে মহাসমারোহে পুণ্যাহ হতো। পুণ্যাহর সময় প্রজাদের জন্য খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থার রীতি ছিল। মুসলমান প্রজাদের ব্যাপারে নন্দীরা বিশেষ যত্নবান ছিলেন। আম্মার রান্নার হাতের সুনাম ছিল। নন্দীদের একটা বড় পুকুর আছে সোনারামপুরের দক্ষিণে মিরপুরের কাছ ঘেঁষে। এই পুকুর থেকে বিরাট বিরাট কাৎলা মাছ জাল দিয়ে ধরা হত। এগুলো সোজা আসত আম্মার কাছে। আম্মা রান্না সেরে সব ভরে দিতেন বিরাট সাইজের টিনের টাবে। এইরকম গোটা কতক টাবে যেত কাৎলা মাছের ঝোল, মুরগির ঝাল গোস্‌ত, বিভিন্ন তরিতরকারির নিরামিষ, মাষকলাইয়ের ডাল । এগুলো খেতে খেতে অভ্যাগতরা আম্মার রান্নার প্রশংসা করতেন। আমাদের বাড়ি থেকে আরো যেত কাঁদিকাঁদি চাঁপা কলা। আমাদের পুকুর পাড়ের চারদিকে ছিল অসংখ্য চাঁপা কলার গাছ।

নন্দী বাড়ির সঙ্গে আমাদের পরিবারের এক অপূর্ব সম্পর্ক ছিল। আমার ছেলেবেলার অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে এই নন্দীবাড়িকে ঘিরে। মহাসমারোহে দুর্গাপূজা হত নন্দীবাড়িতে। নন্দীবাড়ির পূজা মন্ডপটি ছিল পরিপাটি করে নিকানো একটি বিরাট উঠোন। কোনো নামকরা মূর্তিগড়ার কারিগর আসতেন বাইরে থেকে। খড় দিয়ে তৈরি হতো প্রতিটি মূর্তির কাঠামো। তার উপর কাদার প্রলেপে প্রলেপে অপূর্ব সুষমায় ফুটে উঠত প্রতিমার অবয়ব। দশভূজা দুর্গা। প্রতিটি হাতে সংহার অস্ত্র। এক হাতে বর্শার ফলক অসুরের বুকে বেঁধা। এক পা সিংহের কেশরের উপর। পাশে তাঁর পুত্র, গণেশ। পাশেই অপূর্ব কান্তি কার্তিক, বসে আছেন রাজহাঁসের পিঠে। ওদিকে কন্যা স্বরস্বতী, ফোঁটা পদ্মের বুকে দাঁড়িয়ে। কাছেই আরেক কন্যা লক্ষ্মী, তাঁর বাহন পেঁচা। সবচেয়ে রহস্যময় লাগতো কলা বৌ’কে। লালপাড় সাদা শাড়ি-পেঁচানো একটি কলাগাছ। অন্যান্য প্রতিমার চেয়ে আলাদা। এইসব পৌরাণিক কল্পকাহিনী বেশ লাগত। রূপকথার মত আচ্ছন্ন করে রাখত। দুর্গাকে মনে হতো সাক্ষাৎ দুর্গতিনাশিনী। এক্ষুনি সব অমঙ্গল দুর করে শুচি করে যাবেন এই ধরা। ঢোল ও কাঁসর বাদ্যে মেতে উঠতো সারা গ্রাম। সারাদিন আমার কাটতো নন্দী বাড়িতে। এ যেন আমারও অনুষ্ঠান। আমিও যেন ঐ বাড়িরই কেউ।
 
প্রতি সকালে পাঁঠা বলি হতো। বলি দিতেন শান্তি দা। পূর্বপুরুষের প্রাচীন একটি খড়্গ সিঁদুর মেখে রাখা হতো হাড়িকাঠের কাছে। স্নান সেরে ধুতি পরে খালি গায়ে অপেক্ষা করতেন শান্তিদা। তারপর এক সময় অনেক ঢোল কাসর বাদ্যের মধ্যে এক কোপে ধড় থেকে মুন্ডটি নামিয়ে দিতেন পুজা মন্ডপের মাঝখানটিতে মা দুর্গার সামনে। পাঁঠার পর দ্বিখণ্ডিত হতো একটি চাল কুমড়া, তারপর একটি কলা। দেবীর প্রসাদের ব্যবস্থা হতো প্রচুর। নামাবলী গায়ে ঘন্টা বাজিয়ে পুরোহিত পুজো করতেন। সন্ধ্যায় প্রতিমার সামনে ঢাক এবং কাঁসার ঘন্টার অপূর্ব দ্বৈত-বাদনে আরতি হত। ধূপদানে ধূপ জ্বালিয়ে অপরূপ ছন্দে, ভঙিতে নাচতেন সাধনদা, শান্তিদা, বাদলের দাদা মিহির, আরো কারা। সে এক দৃশ্য । আমি অনেক পূজা দেখেছি কিন্তু এখনও আমার গ্রামের নন্দী বাড়ির সেই দুর্গাপূজা আমার মনে ছবির মত আঁকা আছে। হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সকলের স্বতঃস্ফূর্ত যোগদানে এক অভুতপূর্ব ভ্রাতৃত্বের বন্ধন অনুভব করা যেত। তারপর দশমীর দিন এক বেদনার অনুভূতি আমাদেরকেও যেন পেয়ে বসতো। বিকাল হতেই বেজে উঠত বিদায়ের ঘণ্টা- বিসর্জনের পালা। সামনের প্রাচীন কালীবটগাছের পাশ দিয়ে যে ছোট নদীটি গিয়ে মিশেছে পশ্চিমের বুড়িগাঙে তাতেই প্রতিমা বিসর্জন হতো। চারিদিক একটা বেদনার সুর। আমার মনেও তার ছোঁয়া এসে লাগত। একসময় আব্বার হাত ধরে বাড়ি ফিরতাম।



ছয়

নন্দী বাড়িকে ঘিরে আমার অনেক স্মৃতি। ঢাকা চলে আসার পরও আব্বা যখনই গ্রামে যেতেন নন্দী বাড়িতে উঠতেন। আমিও গেছি কয়েকবার। আমাদের থাকার ব্যবস্থা হতো বাইরে একটি সুন্দর অতিথি ঘরে। বিশিষ্ট অতিথি অর্থাৎ অফিসাররা এলে এ- ঘরে বসতেন। সুন্দর সুন্দর চেয়ার। উপরে সুন্দর হাতে টানা পাখা। পালা করে কয়েকজন টানতো এই পাখা। সুন্দর কারুকাজ করা খাট।

বাদল আমার সহপাঠী ও ঘনিষ্ঠ বন্ধু। জমিদারনন্দন, লেখাপড়ায় কোনো আগ্রহ নেই। দেখতে বেশ সুন্দর, গায়ের রং ফর্সা। ওর বড়ো ভাই মিহির, আগরতলায় ওকালতি করেন। ওর এক বোন নিয়তি। এদের কথা মনে আছে। আমরা ঢাকা চলে আসার পর বাদল একবার এসে আমার সঙ্গে বেশ ক’দিন ছিল আমাদের চামেলীবাগের বাসায়। পাড়ায় তখন আমরা ব্যাডমিন্টন খেলতাম। হিন্দু ছেলেরা সবাই চলে গেছে পশ্চিমবঙ্গে । মুসলমান ছেলেরা অতো সতো বুঝত না। বাদলকে বাদল মিঞা বলে ডাকতো একান্ত আপন ভেবেই।

নন্দীদের ছিল এক অতি সুন্দর নৌকা। ছৈ এর উপর নিখুঁত বাঁশের আর বেতের কাজ। জমিদারের উপযুক্ত বজরা বটে। আটজন মাল্লা চালাতো এটি। নন্দীবাড়ির ঘাটেই বাঁধা থাকতো সবসময়। আর ছিল ছয় বেহারার একটি অতি সুন্দর পাল্কি। বেহারারা সব উড়ে মানে উড়িয়া। খুব তাগড়া জোয়ান। দুটোই আম্মার ব্যবহারের জন্য ছিল অবারিত। বিয়ের প্রায় তিন যুগ পর ঘোর সংসারী আম্মার প্রাণ এই প্রথম আকুল হলো বাপের বাড়ি যাবার জন্য। অনেক জাঁকজমক করে, অনেক উৎসাহ নিয়ে আমরা অর্থাৎ আব্বা, আম্মা, বুলু আর আমি নানা বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলাম নন্দীদের বিলাসী বজরায় করে।

দুপুর নাগাদ আমাদের প্রথম যাত্রাবিরতি পীরকাশিমপুরে। পীর সাহেব সম্পর্কে আম্মার ফুফা। খুব আদরযত্ন করলেন ভ্রাতুষ্পুত্রী এবং জামাতার। বিদায়পর্বে পীর সাহেব তাঁর নবপরিণীতা বধুকে সামনে আনলেন। পা ছুঁয়ে সালাম করতে গিয়ে আম্মা হতভম্ব। এ যে তাঁর মেজকন্যা মিনুর বয়সের চেয়েও কম!

মুরাদনগরের একটি প্রশ্বস্ত খাল দিয়ে চলল আমাদের বজরা। আমি একটা মোড়া নিয়ে দেখছি চারদিকের সব সুন্দর দৃশ্য। একসময় চোখে পড়ল এক সুউচ্চ অট্টালিকা। বিশাল এলাকা নিয়ে। দেখতে আমাদের সলিমুল্লাহ হলের মত। কিন্তু আরো উঁচু, তিনতলা। আমাদের বজরা একেবারে এর পাশ ঘেঁষে চলল। এটি বিখ্যাত শ্রীকাইল কলেজ। ভিতরের দিকে আরো একটি তিনতলা সুরম্য ভবন। প্রিন্সিপালের অফিস এবং বাসভবন। আব্বা বললেন বছর চারেক আগে অর্থাৎ ১৯৪১ এ এই গ্রামের সুযোগ্য সন্তান ক্যাপ্টেন দত্ত তাঁর জন্মস্থানকে স্মরণীয় করে রাখতে এই অতুলনীয় দৃষ্টনন্দন কলেজটি প্রতিষ্ঠা করেন। বলা হয় তিনি ১৯০৮ সালে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে এফ.এ. পাশ করে মাত্র ২৪০ টাকা সম্বল করে কলকাতা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন। রাতে খিদিরপুর ডকে কুলির কাজ করে তিন তাঁর পড়ার খরচ যোগাতেন। একথা জেনে কলেজের অধ্যক্ষ কর্ণেল কালভার্ট তাঁকে আর্থিক সাহায্য দেন। তিনি ১৯১৫ সালে এম.বি পাশ করেন। পরে ইন্ডিয়ান আর্মিতে যোগ দিয়ে তিনি ক্যাপ্টেন পদে উন্নীত হন। চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করে তিনি বেঙ্গল ইমিউনিটি প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার হন এবং প্রভূত অর্থ উপার্জন করেন। তাঁর এক ভাই কামিনীকুমার দত্ত একজন বিখ্যাত আইনজীবি ছিলেন। তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সরকারের আইনমন্ত্রী ছিলেন। করাচীতে আমি ছাত্র থাকাকালীন তিনি গনপরিষদের বৈঠকে গেলে আমি তাঁর কাছ থেকে পার্লামেন্টে যাওয়ার পাস নিতাম।

বিকেল গড়াতে আমাদের বজরা এসে পড়ল তিতাসের তরঙ্গসঙ্কুল বুকে। ঢেউয়ের দোলায় আমাদের বজরা দুলতে লাগল। আমার নানাবাড়ি তিতাসের তীরে ফরদাবাদ গ্রামে। আমার নানা পুলিশের লোক, বাড়ির নাম দারোগা বাড়ি। নানা ছিলেন ভীষণ ব্যক্তিত্বসম্পন্ন পুরুষ। গলার আওয়াজটাও ছিল তেমন ভারী এবং দারোগা সুলভ। বড় বড় চোখ, গায়ের রঙ ঘোর কৃষ্ণবর্ণ। বেশ লম্বা-চওড়া। দেখলে সমীহ হয়। নানা ছিলেন ভারি আলাপী। অপরাহ্ন গড়াতে নানার বাড়ির ঘাটে পৌঁছাল আমাদের বজরা। অভ্যর্থনা করে নেওয়া হলো মেয়ে, জামাই ও নাতিনাতনিদের । আমার মনে পড়ে সন্ধ্যার দিকে একটা বিরাট কাতলা মাছ আনা হলো যার মুড়োটা কাটা হলো কুড়াল দিয়ে। বেশ আনন্দে কাটলো কদিন। আম্মা নানার বড় মেয়ে। আব্বা ভীষণ আদরের জামাই। খুব ঘটা করে বিয়ে হয় তাঁদের। হাতীর হাওদা করে বর এসেছিল সেই ১৩২৭ সনের কোন এক শুভদিনে। নানা ছোট দুই নাতি-নাতনিকে এই প্রথম দেখলেন। আমি সেই থেকেই নানার আদরের ধন।

নানাবাড়ি থেকে আমরা রওয়ানা হলাম খালাবাড়ি বাঞ্ছারামপুরে। খালা ছিলেন অপরূপ সুন্দরী। গা ভরে সোনার গয়না পরতেন। সোনার রঙের সঙ্গে মিশে যেত গায়ের রং। খালার চোখ ছিল বড় বড়। খালুও দেখতে ভারী সুদর্শন ছিলেন। তিতাসের আরেক প্রান্তে উজানচরের হাটের কাছে খালুর বাড়ি। তাঁর বড়ো ভাই গনি মিঞা সাহেব ছিলেন এলাকার বিশিষ্ট ব্যক্তি। তাঁর ছেলে তখনকার দিনের সাব-ডেপুটি। এ বাড়িতে আমাদের মাধবপুরের মিঞা বাড়ির মেয়ে সামসুল আলমের বোনের বিয়ে হয়। তিনি বাবুর মা। সুশিক্ষিতা মহিলা। বাবু এই এলাকাল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছিল। আমার খালাত ভাইরা হচ্ছেন খোর্শেদ ভাই, মোহসেন ভাই, বাচচু ও খোকা আর খালাত বোন আনোয়ারা। কেউ বেঁচে নেই।

নানাবাড়ির অন্যান্যদের কথা বলতে হয়। আম্মারা তিন বোন, আম্মা, দুলুখালা (বাঞ্ছারামপুর), ছিদু খালা (লাতু ভাই এর মা)। আমরা গ্রামে থাকার সময় ছিদু খালা মারা যান। মনে পড়ে আম্মা বিলাপ করে কেঁদেছিলেন খালার মৃত্যু সংবাদ পেয়ে। আম্মার একমাত্র ভাই কনা মামা, মাসুর আব্বা। মাসু আমার মামাত ভাই। অতি ভালো ছেলে। অনেক কষ্ট করে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সবার জন্য খুব মায়া। আমার মামাও খুব স্নেহপরায়ণ ছিলেন। সবার প্রতি অসীম মমতা ছিল তাঁর। আব্বার আর মামার মধ্যে ছিল গভীর বন্ধুত্ব। দুজনে তামাক নিয়ে বসলে আর সময়ের কথা মনে থাকত না। আরেকজন মামা, আম্মার চাচাত ভাই ইউনুস মামা ছিলেন আমাদের সবচেয়ে কাছের, সবচেয়ে আদরের।

আমি আর লাতুভাই যখন ভিক্টোরিয়া কলেজে পড়তাম ইউনুস মামাও তখন ঐ কলেজে পড়তেন। থাকতেন ফুলার হোষ্টেলে। আমাদের বিড়ি সিগারেটের পয়সার অভাব হলেই ছুটতাম ইউনুস মামার কাছে। মামা কখনও ফেরাতেন না। মামার বাবা কাজ করতেন টাটাতে। আব্বাও চাকুরীজীবনের প্রথমে জামসেদপুরে টাটা ষ্টীল মিলে চাকুরী করেন। সম্ভবত নানাই উৎসাহিত করে নিয়ে যান প্রবাসে। নানী আব্বার সমবয়সী ছিলেন এবং দেখতে ছিলেন ভারী সুন্দরী। আব্বার প্রবাস জীবন নানা-নানীর সঙ্গে যে অতি আনন্দে কেটেছিল আব্বা সেইসব সব মমতা মাখানো সুখের স্মৃতির কথা আমাদেরকে বলে ভারি আনন্দ পেতেন! নানীর ছেলে মেয়েরাও, অর্থাৎ ইউনুস মামা ও অন্যান্য মামারা, কথাবার্তায় আচার ব্যবহারে ছিলেন অতি মার্জিত। আব্বা এদের ভারি পছন্দ করতেন। অন্যরা ছোট ছিলেন বলে ইউনুস মামার সঙ্গেই আব্বার খুব বন্ধুত্ব, খোশ-গল্প। মামা আদমজী স্কুলে ইংরেজির শিক্ষক হিসাবে জীবন বেছে নেন। প্রতি সপ্তাহে ছুটির দিন রবিবারে দুপুরের আগেই পৌঁছে যেতেন আমাদের চামেলীবাগের বাসায়। আব্বা সকাল থেকেই উসখুস করতেন। আম্মাকে তাড়া দিতেন মুরগি রাঁধার জন্য, মুখে বলতে পারতেন না যে ইউনুস মামার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় আছেন। ভারি মিষ্টি সম্পর্ক ছিল দুজনের মধ্যে। মামার সঙ্গে অনেক হাসি-রসিকতা করতেন। আব্বা আসলে ভীষণ আমুদে লোক। আমোদ ছাড়া থকতে পারতেন না। আব্বা বুদ্ধিমান লোকজনদের পছন্দ করতেন। স্বল্পবুদ্ধির লোকদের ছিল ভীষণ অপছন্দ। মামা ছিলেন কথাবার্তায় রসিক অথচ মার্জিত। আব্বাকে বড়ো সম্মান করতেন। মামার সঙ্গ পেয়ে আব্বা একেবারে মেতে উঠতেন। আমার ভারি ভালো লাগতো। রাতের খাওয়া দাওয়া সেরে গুলিস্তান থেকে শেষ বাস ধরার উদ্দেশ্যে এক সময় হন্তদন্ত হয়ে ছুটতেন ইউনুস মামা। আব্বার সব আনন্দ উচ্ছ্বলতা যেন নিমেষেই ম্লান হয়ে যেত।

বাঞ্ছারামপুর থেকে ফেরার পথের কিছু দুঃসহ স্মৃতি আমার একদিনের অম্লান আনন্দকে যেন বিরস করে দিলো। আমরা এবার অন্য পথ ধরে ফিরছিলাম। ছোট গাঙের মত, দুপাশে ছবির মত সব গ্রাম। সময়টা ছিল পঞ্চাশের মন্বন্তরের চরম সময়। যদিও দুর্ভিক্ষের বিভৎসতা শহরেই ছড়িয়ে থাকে। কারণ খাদ্যের অভাবে কাজের আশায় অনাহারী দরিদ্র লোকেরা শহরের দিকেই ছোটে। কিন্তু এর কিছু নিষ্ঠুর চিহ্ন যে পিছনে পড়ে থাকে তা দুঃসহ। মকিমপুর ছাড়ার আগে শুনেছিলাম যুদ্ধের পায়ে পায়ে দুর্ভিক্ষ আসছে। একবার আব্বা কুমিল্লা থেকে ট্রেনে কসবা এসে শোনেন, আমাদের গ্রামের বিভূতি বাবু কসবা বাজারে চালের দাম তিরিশ টাকায় পৌঁছেছে শুনে তৎক্ষণাৎ হার্ট ফেল করে মারা যান। অথচ তাঁর নিজের কোন অভাব ছিল না। এত দাম দিয়ে কী করে চাল কিনে সাধারণ লোক বাঁচবে তাই ছিল তাঁর দুশ্চিন্তা। এসব শুনেও দুর্ভিক্ষ যে ঠিক কী জিনিস তা বুঝতাম না। আমার ধারণা দুর্ভিক্ষ মানে যখন ভিক্ষা পাওয়া যায় না। কিন্তু এ যে চরম দারিদ্র্য, তীব্র ক্ষুধা, অনাহার, মহামারী এবং মৃত্যু এ জানতাম না।

নৌকার ছৈ এর ভিতর আমার গা গুলিয়ে আসে। আমি একটা মোড়া নিয়ে বাইরে এসে বসি। এদিকের গাঙ অপ্রশস্ত, বড় খালের মত। দুএকটা কলা গাছের মত কী ভেসে যাচ্ছে তার উপর দু’চারটা শকুনের ঝাপটাঝাপটি দেখে আব্বাকে ওগুলো কী জিজ্ঞেস করতে আব্বা আমার চোখের উপর হাত রেখে আড়াল করতে চাইলেন। আমার কৌতূহল বেড়ে গেল। খানিক দূর যেতেই আরেকটা চোখে পড়ল। এবার পরিষ্কার, এগুলো মড়া, পঁচেফুলে ভেসে যাচ্ছে। তার উপরে বসে তিন চারটে শকুন তাদের বিশ্রী ছিলা গলা ঢুকিয়ে মড়াটার ভিতর থেকে টেনে হিঁচড়ে সব বের করে খাচ্ছে। কিছুদূর যেতে আরো একটা। তারপরও আরো দু’তিনটে। আব্বা আমাকে জোর করে ভেতরে নিয়ে এলেন। বুঝিয়ে বললেন এগুলো আশেপাশের গ্রামের দুর্ভিক্ষের সব মড়া। অভাবের কারণে এদের কোন সৎকার করা যায়নি। কোনমতে কলসি বেঁধে গাঙের পানিতে ডুবিয়ে দেয়া হয়েছে।

শ্যামল ঘেরা, ছায়া-ঢাকা, মায়া ভরা এইসব গ্রামগুলিতে যেথায় আকাশে বাতাসে ছিল পাকা ধানের বাসে বাসে সবার নিমন্ত্রণ, সেথায় হায়রে কখন এল সমন অনাহারের বেশে!

ঘরে ফিরেই আম্মা তাঁর ধানের গোলা খুলে দেন। আমাদের গ্রামে অনাহারে কেউ মরেনি।



(ক্রমশ)



লেখক পরিচিতি:
আলী নূর
পেশায় আইনজীবি।
বই পড়া, গান শোনা, ফুল ফোটানো, নাটক কিংবা ওড়িশি নৃত্য অথবা উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত, যন্ত্রসঙ্গীত এইসব নিয়েই তাঁর আনন্দযাপন। তাঁর নানা শখের মধ্যে দেশভ্রমণ, ছবি আঁকা, ফটোগ্রাফি এবং সিনেমাটোগ্রাফি অন্যতম। তিনি জীবনযাপন নয় জীবন উদযাপনে বিশ্বাসী।

ব্রিটিশ-ভারত, পাকিস্তান এবং স্বাধীন বাংলাদেশ এই তিন কাল তিনি দেখেছেন, দেখছেন। ‘তুচ্ছদিনের গানের পালা’ কেবল তাঁর জীবনের গল্প নয় বরং গল্পচ্ছলে ইতিহাসের পরিভ্রমণ।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন