শনিবার, ১৫ মে, ২০২১

মার্গারেট মিচেল'এর ধারাবাহিক উপন্যাস : যেদিন ভেসে গেছে--তেইশ পর্ব



অনুবাদ : উৎপল দাশগুপ্ত 

প্রিসি চলে যাবার পরে স্কারলেট ক্লান্তভাবে উঠে গিয়ে একতলার হলঘরে একটা বাতি জ্বালাল। ভেতরটা বেশ গরম – যেন সারা দুপুরের উত্তাপ চারটে দেওয়াল জমিয়ে রেখেছে। হতভম্ব ভাবটা আস্তে আস্তে কেটে যাচ্ছে, সাথে বেশ একটা খিদে খিদে ভাব। মনে পড়ে গেল এক চামচ ভুট্টাসেদ্ধ ছাড়া কাল রাতের পর থেকে আর কিছুই মুখে দেয়নি। বাতিটা তুলে নিয়ে রান্নাঘরে চলল। উনুন কখন নিভে গেছে, তা সত্ত্বেও ঘর একেবারে তেতে আছে। তাওয়ার ওপরে রাখা বাজরার একটুকরো শক্ত পাউঁরুটি নিয়ে ক্ষুধার্ত ভাবে কামড় বসাল, চোখ চালিয়ে খুঁজল আরও কিছু খাবার পাওয়া যায় কিনা। অল্প একটু ভুট্টা সেদ্ধ রয়ে গেছে। সেটা প্লেটে না ঢেলেই, একটা বড় হাতা দিয়ে খেতে শুরু করল। নুন দরকার ছিল। কিন্তু এত খিদের মধ্যে আর খুঁজতে ইচ্ছে হল না। চার হাতা খেয়ে ফেলার পরে খুব গরম করতে লাগল। এক হাতে বাতিটা আর অন্য হাতে পাউঁরুটির টুকরোটা নিয়ে বেরিয়ে হলঘরে চলে এল।

ওপরে গিয়ে মেলানির পাশে বসা উচিত – যদি বেচারার কিছু দরকার পড়ে – এত দুর্বল যে ডাকতেও পারবে না। কিন্তু দুঃস্বপ্নের জায়গাটায় ফিরে যেতে মন সরল না। মেলানি মরে গেলেও ওখানে আবার গিয়ে বসা অসম্ভব। ওই ঘরটা আবার করে দেখার কোনও ইচ্ছেই ওর নেই। মোমবাতিদানে বাতিটা রেখে সামনের বারান্দায় ফিরে গেল। তবু কিছুটা ঠাণ্ডা এখানে, যদিও রাতের হাওয়াতেও একটু উষ্ণতার ছোঁয়া। ল্যাম্প থেকে যে হালকা আলোর বৃত্ত তৈরি হয়েছে সিঁড়ির ধাপে, সেখানেই বসে পড়ে পাউঁরুটি চিবোতে লাগল।

খিদে মেটায় খানিকটা শক্তি ফিরে পেল, মনের মধ্যে জমে থাকা ভয়টা আবার জ্বালাতে শুরু করল। অনেক দূরে রাস্তার ধার থেকে একটা হাল্কা গুঞ্জন ভেসে আসছে। কিসের গুঞ্জন জানা নেই। আওয়াজটা উঠছে আবার নামছে, স্পষ্ট করে কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। কান পেতে শোনবার চেষ্টা করল, কিন্তু জোর পেল না। একটা ঘোড়ার খুরের আওয়াজ শোনবার জন্য ব্যাকুল হয়ে আছে। অপেক্ষায় আছে রেটের বেপরোয়া ভঙ্গী সহ আবির্ভাবের। রেট নিশ্চয়ই ওদের কোথাও নিয়ে যাবেন – যে কোনও জায়গায়! সে যেখানেই হোক না কেন, ওর কিছুই এসে যায় না।

প্রতীক্ষার মধ্যেই স্কারলেট গাছপালার ফাঁক দিয়ে একটা হাল্কা আলো দেখতে পেল। সচকিত হয়ে উঠল। আলোর উজ্জ্বলতা ক্রমে বাড়তে লাগল। অন্ধকার আকাশটা প্রথমে গোলাপী হয়ে উঠল, তারপর হাল্কা লাল। গাছের ওপর ফাঁক দিয়ে বেশ বড় একটা আগুনের হলকা আকাশের দিকে উঠে যাচ্ছে। লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল, বুক জুড়ে আতঙ্ক।

ইয়াঙ্কিরা চলেই এসেছে তাহলে! এসেই শহরে আগুন লাগিয়ে দিচ্ছে। হলকাটা মনে হচ্ছে শহরের পুব দিক থেকে মাঝখানে চলে আসছে। শিখাটা আরও বড় আকার নিয়ে আকাশের দিকে লাফিয়ে লাফিয়ে উঠছে আর চারদিকে ছড়িয়ে যাচ্ছে। গরম বাতাসে একটা পোড়া পোড়া গন্ধ।

দৌড়ে ওপরতলায় নিজের ঘরে থেকে ভাল করে দেখার জন্য জানলা দিয়ে ঝুঁকে পড়ল। বিভৎস দেখাচ্ছে আকাশটাকে। আগুনের লকলকে শিখার ওপর দিয়ে কালো ধোঁয়া বেরিয়ে এঁকে বেঁকে আকাশের দিকে উঠে যাচ্ছে। পোড়া গন্ধটা তীব্র হয়েছে। মাথাটা আর ঠিক মত কাজ করছে না। আগুনের শিখা যে কোনও সময় পীচট্রী স্ট্রীটে ঢুকে পড়ে এই বাড়িটাকেও গ্রাস করবে! ইয়াঙ্কিরা আক্রমণ করলে কোথায় পালাবে! নরকের শয়তানগুলো যেন ওর কানের কাছে এসে চেঁচামেচি শুরু করে দিয়েছে। আতঙ্কে দিশেহারা হয়ে জানলার কবাটগুলো দুহাত দিয়ে চেপে ধরে শান্ত হতে চেষ্টা করল।

মনে মনে আওড়াতে লাগল, “আমাকে ভাবতে হবে। আমাকে ভাবতে হবে।”

কিন্তু ভাবনাগুলো ভয় পাওয়া পাখির মত অশান্ত ভাবে চারপাশে ছটফট করে উড়ে বেড়াতে লাগল। কবাট ধরে জানলার বাইরে ঝুঁকে থাকতে থাকতেই কানে তালা লাগানো একটা বিস্ফোরণ হল, কামানের আওয়াজের থেকেও জোরে। বিশাল এক আগুনের ঝলকানি আকাশে। আরও বিস্ফোরণ। মাটি কেঁপে গেল। মাথার ওপর থেকে জানলার কাঁচ ঝনঝন শব্দে ভেঙ্গে ওর চার পাশে ছড়িয়ে পড়ল।

পৃথিবীটা যেন দুমদাম শব্দ আর লেলিহান অগ্নিশিখাময় নরকে পরিণত হয়েছে! ঝড়ের বেগে আগুনের স্ফুলিঙ্গ আকাশের দিকে উড়ে গিয়ে আস্তে আস্তে লাল ধোঁয়ার কুণ্ডলীর মধ্যে দিয়ে মাটিতে নেমে আসছে। মনে হল পাশের ঘর থেকে দুর্বলস্বরে কেউ ডাকল, ও কান দিল না। মেলানির জন্য এখন সময় দেওয়া অসম্ভব। আগুন দেখে যে আতঙ্ক শিরায় শিরায় ছড়িয়ে পড়ছে তার মধ্যে অন্য কোন কিছুর জন্যই সময় দেওয়া সম্ভব নয়। শিশুর মত ভয়ে দিশেহারা হয়ে মায়ের বুকে মুখ লুকিয়ে সান্ত্বনা খুঁজতে চাইছে এখন। কী ভাল হত বাড়িতে থাকলে! মা ওর পাশে থাকতেন!

কানে তালা লাগানো শব্দের মধ্যেই আরেকটা শব্দ কানে এল। কেউ যেন এক সাথে তিন ধাপ করে সিঁড়ি উঠতে উঠতে পথ হারানো কুকুরের মত চিৎকার করছে। প্রিসি ছুটে ঘরের ভেতরে ঢুকে স্কারলেটের বাহু এমন ভাবে আঁকড়ে ধরল যে মনে হল যেন মাংস খুবলে উঠে আসবে।

“ইয়াঙ্কিরা ....” স্কারলেট ভয় পেয়ে চেঁচিয়ে উঠল।

“না ম্যাম, এঁরা আমাদেরই লোক!” হাঁপাতে হাঁপাতে প্রিসি বলল, ওর নখ স্কারলেটের শরীরে আরও চেপে বসতে লাগল। “ওঁরা ফাউন্ড্রি, সৈন্যদের রসদের ডিপো আর গুদামে আগুন লাগিয়ে দিয়েছেন ... হে ভগবান .... মিস স্কারলেট! ওঁরা ৭০ গাড়ি কামানের গোলা আর বারুদে আগুন লাগিয়ে দিয়েছেন! হে যীশু – আমরা সবাই পুড়ে মরে যাব!”

বলেই আবার ডাক ছেড়ে কাঁদতে কাঁদতে স্কারলেটের বাহু এত জোরে আঁকড়ে ধরল যে ওর নখ বসে গেল। ব্যথায় স্কারলেট চেঁচিয়ে উঠে হাতটা ছাড়িয়ে নিল।

তাহলে ইয়াঙ্কিরা এখনও এসে হাজির হয় নি! এখনও চলে যাবার সময় আছে! ও মনে মনে সাহস জড়ো করবার চেষ্টা করতে লাগল।

মনে মনে ভাবল, “মাথাটা একটু ঠাণ্ডা রাখা দরকার, ভয় পেয়ে শুধু শুধু চেঁচামেচি করলে লাভ নেই।” প্রিসির আতঙ্কগ্রস্ত মুখটা দেখে নিজেকে শক্ত করল। তারপর ওর কাঁধ ধরে একটা ঝাঁকুনি লাগাল।

“চেঁচামেচি বন্ধ কর বলছি – বোকার মত কথা বলিস না। ইয়াঙ্কিরা তো এখনও এসে পৌঁছায়নি, বুদ্ধু কোথাকার! ক্যাপটেন বাটলারের দেখা পেয়েছিলি? উনি কখন আসছেন?”

প্রিসি কান্না বন্ধ করল, কিন্তু ওর দাঁতকপাটি বন্ধ হল না।

“হ্যাঁ ম্যাডাম, আমি ওঁকে একটা পানশালায় খুঁজতে গিয়ে পেলাম – যেমন আপনি আমায় বলেছিলেন ___”

“কোথায় পেলি সেটা নিয়ে অত মাথা ঘামাবার দরকার নেই। উনি আসছেন তো? ওঁর ঘোড়াটা নিয়ে আসতে বলেছিস তো?”

“হে ভগবান, মিস স্কারলেট, উনি বললেন যে সৈন্যরা ওঁর ঘোড়াটা নিয়ে নিয়েছে – অ্যাম্বুলেন্স টানার জন্য।”

“হে ঈশ্বর!”

“কিন্তু উনি আসছেন ___”

“কী বললেন?”

এতক্ষণে প্রিসির শ্বাসপ্রশ্বাস কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে, তবু চোখে এখনও আতঙ্কের চিহ্ন।

“আপনি আমাকে যেমন বলেছিলেন, ম্যাডাম, আমি ওঁকে একটা পানশালায় দেখতে পেলাম। আমি বাইরে থেকে চীৎকার করে ওঁকে ডাকলাম। উনি বেরিয়ে এলেন। যেই আমি ওঁকে বলতে আরম্ভ করেছি, একজন সৈন্য এসে ডিক্যাটুর স্ট্রীটের একটা স্টোর ভেঙ্গে তাতে আগুন ধরিয়ে দিল। উনি আমাকে টেনে নিয়ে ছুটতে ছুটতে ফাইভ পয়েন্টে নিয়ে এসে বললেন, ‘বল কী ব্যাপার? তাড়াতাড়ি বলবি!’ আমি বললাম যে আপনি বলেছেন যে ‘ক্যাপটেন বাটলার তাড়াতাড়ি আসুন আর আসার সময় আপনার ঘোড়া আর গাড়িটা নিয়ে আসুন।’ মিস মেলির বাচ্চা হয়েছে আর আপনি শহরের বাইরে যেতে চাইছেন। তখন উনি জানতে চাইলেন, ‘কোথায় যেতে চাইছেন?’ আমি বললাম – ‘আমি জানিনা, কিন্তু নিশ্চয়ই ইয়াঙ্কিরা আসার আগেই এখান থেকে চলে যেতে চান আর আপনিও সঙ্গে যান।’ তখন উনি হেসে বললেন যে ওরা ওঁর ঘোড়া নিয়ে চলে গেছে।”

আশার শেষ আলোটুকুও নিভে গেল। মনে মনে স্কারলেট খুব দমে গেল। কী বোকা ও, ওর জানা উচিত ছিল, পিছিয়ে যাবার সময় সৈন্যরা গাড়ি আর পশু তো নিয়ে যাবেই। পলকের জন্য প্রিসির কথা শুনে ও স্তব্ধ হয়ে গেল। তারপরই নিজেকে সামলে নিল।

“তারপর উনি বললেন, ‘মিস স্কারলেটকে বলিস নিশ্চিন্ত থাকতে। যদি একটাও ঘোড়া সৈন্যদের কাছে থেকে থাকে, তাহলে আমি সেটা চুরি করব।’ তারপর বললেন যে এর আগেও উনি ঘোড়া চুরি করেছেন। বলিস, যে গুলি খেয়েও মরতে হলেও, ওঁর জন্য একটা ঘোড়া আমি চুরি করে আনবই। তারপর বললেন, ‘যা তুই তাড়াতাড়ি বাড়ি চলে যা।’ কিন্তু আমি রওনা দেবার আগেই দুম করে বিকট আওয়াজ হল। উনি আমাকে বললেন যে ওটা কিছু নয়, ওটা আমাদের সৈন্যরাই অস্ত্রশস্ত্র পুড়িয়ে দিচ্ছে যাতে ইয়াঙ্কিরা এসে ওগুলো না পায় ___”

“তার মানে উনি আসছেন? একটা ঘোড়া উনি নিয়ে আসবেন?”

“তাই তো বললেন।”

একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস পড়ল। যদি ঘোড়া পাওয়ার কোনও উপায় থাকে তাহলে রেট বাটলার নিশ্চয়ই একটা জোগাড় করবেন। খুব বুদ্ধিমান মানুষ, রেট। যদি উনি ওদের এই নরক থেকে বের করে নিয়ে যেতে পারেন, তাহলে ওঁর সব অপরাধ ক্ষমা করে দেবে। পালাতে হবে! রেটের সাথে বেরিয়ে যেতে পারলে একদম নিশ্চিন্ত। রেট ওদের বিপদে আপদে রক্ষা করবেন। হে ঈশ্বর, রেটের জন্য ধন্যবাদ! নিরাপত্তার ব্যাপারটা একটু আশার আলো দেখাতেই স্কারলেট বাস্তব জগতে ফিরে এল।

“ওয়েডকে জাগিয়ে জামা কাপড় পরিয়ে দে আর কিছু জামাকাপড় গুছিয়ে নে – আমাদের সবার জন্য। একটা ছোট ট্রাঙ্কের মধ্যে। আমরা যে চলে যাচ্ছি সেটা এখনই মিস মেলানিকে বলার দরকার নেই। কিন্তু বাচ্চাটাকে গোটা দুই তোয়ালের মধ্যে জড়িয়ে নে। ওর কাপড়চোপড়ও নিতে ভুলিস না।”

প্রিসি তবুও ওর স্কার্ট আঁকড়ে ধরে রইল। ওর দু’চোখে ভয় ছাড়া আর কোনও অভিব্যক্তি ছিল না। স্কারলেট ওকে নাড়া লাগিয়ে হাতটা ছাড়িয়ে দিল।

“তাড়াতাড়ি যা,” বলে ও চেঁচিয়ে উঠতেই প্রিসি খরগোশের মত ভীরু পায়ে চলে গেল।

ভেতরে গিয়ে মেলানিকে একটু সাহস যোগানো উচিত – স্কারলেট বুঝতে পারছিল। যেরকম কান ফাটানো শব্দ ভেসে আসছে আর আলোর ঝলকানিতে চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছে তাতে মেয়েটা নিশ্চয়ই ভয়ে কুঁকড়ে গেছে। মনে হচ্ছে যেন পৃথিবীটা ধ্বংস হয় গেল!

তবু ওই ঘরে ফিরে যাবার কথা ভাবলেই গায়ে জ্বর আসছে। মিস পিটিপ্যাটের চিনেমাটি আর রূপোর বাসন যেগুলো ম্যাকনে পালিয়ে যাবার আগে উনি ফেলে গেছিলেন, সেগুলো গুছিয়ে নেবার জন্য সিঁড়ি দিয়ে নামল। ডাইনিংরুমে পৌঁছে ওর হাতদুটো এত কাঁপতে শুরু করল যে তিনটে প্লেট পড়ে গিয়ে চুরমার হয়ে গেল। উঠোনে দৌড়ে গিয়ে একবার কান পেতে কিছু শোনার চেষ্টা করল, তারপর আবার ডাইনিংরুমে ফিরে আসতেই হাত থেকে একটা রূপোর বাসন পড়ে গিয়ে ঝনঝন শব্দ করে উঠল। যাতে হাত লাগাচ্ছে সেটাই হাত থেকে পড়ে যাচ্ছে। তাড়াহুড়োর মধ্যে একটা ছেঁড়া কার্পেটে পা হড়কে মেঝেয় পড়ে গেল। তারপর ব্যথার অনুভুতি অগ্রাহ্য করেই তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়াল। ওপর তলায় প্রিসির চলার দুপদাপ আওয়াজ শুনে রাগ হতে লাগল। ও নিজেও তো উদ্দেশ্যহীনভাবে দুপদাপ হেঁটে চলে বেড়াচ্ছে!

ছুটে উঠোনে চলে এল। ভেতরে ফিরে না গিয়ে এক জায়গায় চুপ করে বসে পড়ল। এভাবে গুছিয়ে নেওয়া অসম্ভব। এখন রেটের অপেক্ষা করা ছাড়া কোনও গত্যন্তর নেই। মনে হল ঘন্টার পর ঘন্টা যেন কেটে যাচ্ছে, কিন্তু ওঁর দেখা নেই। অবশেষে অনেক দূর থেকে মরচে ধরা চাকার ক্যাঁচ ক্যাঁচ আওয়াজ পাওয়া গেল, আর খুঁড়িয়ে চলা ঘোড়ার খুরের আওয়াজ। উনি একটু তাড়াতাড়ি কেন করছেন না? ঘোড়াটাকে তো আরও জোরে ছোটাতে পারেন!

শব্দটা কাছে এগিয়ে এল। উঠে দাঁড়িয়ে রেটের নাম ধরে ডাকল। অল্প আলোয় দেখল, ছোট একটা ওয়াগন থেকে উনি নামলেন। গেট খোলার আওয়াজ। এগিয়ে আসার শব্দ। তারপর ল্যাম্পের আলোয় ওঁকে স্পষ্ট করে দেখা গেল। আর পাঁচটা সাধারণ দিনের মতই ধোপদুরস্ত পোশাক। মার্জিত আর রুচিসম্মত। যেন কোন বলড্যান্সে চলেছেন। সাদা লিনেনের কোট আর ট্রাউজ়ার, সিল্কের এম্ব্রয়ডারি করা ধূসর রঙের ভেস্ট। শার্টের বুকের কাছে হাল্কা কোঁচকানো। মাথার ওপর পানামা হ্যাঁট একদিকে উদ্ধতভাবে একদিকে হেলে আছে। ট্রাউজ়ারের বেল্ট থেকে হাতির দাঁতের হাতল দেওয়া দুটো ডুয়েলিং পিস্তল ঝুলছে। নানা ধরণের অস্ত্রশস্ত্রে কোটের পকেট উঁচু হয়ে আছে।

শিকারী পশুর মত ত্বরিত পদক্ষেপে এগিয়ে এলেন। প্রাচীনকালের কোনো যুবরাজের মত উদ্ধত মস্তক। যে ঘটনাপ্রবাহে স্কারলেট আতঙ্কিত, উনি সেটাই যেন খুব উপভোগ করছেন। নির্মম দৃষ্টি, সুসংহতভাবে হিংস্র। অন্য সময় হলে স্কারলেট রীতিমত সন্ত্রস্ত হয়ে উঠত।

এই সব অঘটন যেন নিছকই একটা কৌতুক! ওঁর কালো চোখদুটো নেচে উঠল। এই সব কান ফাটানো আওয়াজ আর আগুনের ঝলকানি যেন শুধুই বাচ্চাদের ভয় দেখানো! ওঁকে সিঁড়ি বেয়ে উঠে আসতে দেখে স্কারলেট এগিয়ে গেল, মুখ ভয়ে সাদা, কিন্তু ওর সবুজ চোখদুটো জ্বলছে।

“শুভ সন্ধ্যা,” চিরপরিচিত মন্থর স্বরে মাথা থেকে এক ঝটকায় টুপি খুলতে খুলতে বললেন। “খুবই মনোরম আবহাওয়া। শুনলাম তুমি নাকি বেড়াতে যেতে চাইছ?”

“দেখুন, মজা করলে আমি আর কক্‌খনো আপনার সাথে কথা বলব না,” কাঁপা কাঁপা গলায় বলে উঠল।

“তুমি ভয় পেয়েছ, এটাও আমাকে বিশ্বাস করতে হবে!” অবাক হবার ভান। হাসি দেখে স্কারলেটের ইচ্ছে করল ওঁকে সিঁড়ি থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিতে।

“হ্যাঁ আমি ভয় পেয়েছি, খুব ভয় পেয়েছি! আর ভগবান পাঁঠাকে যে বুদ্ধি দিয়েছেন, সেটুকু বুদ্ধিও যদি আপনার থাকত, তাহলে আপনিও ভয় পেতেন। বেশি কথা বলার সময় নেই, যে করেই হোক এখান থেকে বেরোতে হবে।”

“আপনার সেবায় লাগার জন্য আমি সদাই হাজির মহাশয়া। তবে ঠিক কোথায় যেতে চান, সেটা যদি একটু খুলে বলেন! বলতে পার, কেবল কৌতুহলের বশেই, আমাকে এখানে আসতে হল। কোথায় তোমার যাবার বাসনা, সেটা জানার জন্য। উত্তরদিকে যাওয়া অসম্ভব, পূর্ব, দক্ষিণ আর পশ্চিমেরও একই অবস্থা। ইয়াঙ্কিরা সব দিকেই ঘাঁটি গেড়ে আছে। একমাত্র একটাই রাস্তা আছে, যেদিকে এখনও ইয়াঙ্কিরা কব্জা করেনি – যে রাস্তা দিয়ে আমাদের সৈন্যরা শহর ছেড়ে চলে যাচ্ছে। তবে ওই রাস্তাও বেশিদিন আর খোলা থাকবে না। জেনারাল লী’র ঘোড়সওয়ার সৈন্যরা রাত দিন লড়াই করে রাফ অ্যান্ড রেডির রাস্তাটা খোলা রাখার চেষ্টা করছেন, যাতে আমাদের সৈন্যরা নির্বিঘ্নে বেরিয়ে যেতে পারে। আর তুমি যদি ম্যাকডোনা রোড ধরে সৈন্যদের পেছন পেছন যেতে চাও, তাহলে সর্বাগ্রে ওরা তোমার ঘোড়াটা কেড়ে নেবে। যদিও এটাকে সেই অর্থে সবল ঘোড়া বলা যাবে না, তবুও ওটা অনেক কষ্টে চুরি করে এনেছি। ঠিক কোথায় যাচ্ছ তুমি?”

ওখানে দাঁড়িয়ে ও কেঁপে চলেছিল, কথাগুলো কানে যাচ্ছিল, মাথায় ঢুকছিল না। প্রশ্নটা কানে যেতেই ওর হঠাৎই মনে হল ও জানে ও ঠিক কোথায় যাচ্ছে, আজকের এই চরম দুর্ভোগের মধ্যেও ওর যেন ঠিক করাই ছিল ও কোথায় যাবে! মাত্র একটাই তো জায়গা আছে!

“আমি বাড়ি যাচ্ছি,” স্কারলেট বলল।

“বাড়ি? মানে তুমি টারায় যাবে বলছ?”

“হ্যাঁ, হ্যাঁ! টারাতে! ওহ্‌ রেট, দেরি করাটা একদম ঠিক হবে না!”

ওর দিকে এমন ভাবে তাকালেন যেন মনে হল পাগলের প্রলাপ শুনছেন।

“টারা? হে ভগবান! স্কারলেট! আজ সারাদিন ওরা জোন্সবোরোতে লড়াই করেছে শোনোনি? রাফ অ্যাণ্ড রেডির রাস্তার দশ মাইল এদিক থেকে দশ মাইল ওদিক পর্যন্ত? এমন কী জোন্সবোরোর অলিতে গলিতে পর্যন্ত! এতক্ষণে ইয়াঙ্কিরা হয়ত টারায় পৌঁছে গেছে, হয়ত কাউন্টির সবখানে ছড়িয়ে গিয়েছে। কেউ বলতে পারে না ওরা ঠিক কোথায়, কিন্তু আশেপাশেই আছে। তুমি বাড়ি যেতে পারবে না। ইয়াঙ্কি সেনাবাহিনীর ভেতর দিয়ে তুমি যেতে পারবে না!”

“আমি যাব – যাব – যাবই!” ও চেঁচিয়ে উঠল।

“বোকা কোথাকার,” ওঁর গলার স্বর ব্যগ্র, কিছুটা উষ্মার আভাস। “ওদিক দিয়ে তুমি যেতে পারবে না। ইয়াঙ্কিদের পাল্লায় না পড়লেও, জঙ্গলে দুই সেনাবাহিনীর থেকেই পিছিয়ে পড়া আর পালিয়ে যাওয়া লোক ভরে আছে। আর আমাদের ট্রুপের অনেকেই জোন্সবোরো থেকে পিছিয়ে আসছে। ওরা দেখতে পেলেই তোমার ঘোড়াটা কেড়ে নেবে, ঠিক যেমন ইয়াঙ্কিরাও নেবে। তোমাদের পালাবার একমাত্র রাস্তা হল ট্রুপের পেছন পেছন ম্যাকডোনোর রাস্তা ধরে যাওয়া, আর প্রার্থনা করা যেন রাতের অন্ধকারে ওরা তোমাদের ঠাহর না করতে পারে। তোমরা টারা যেতে পারবে না। ধর কোনক্রমে ওখানে পৌঁছতে পারলে, দেখবে সব কিছু ওরা পুড়িয়ে দিয়েছে। আমি তোমাকে ওখানে যেতে দিতে পারি না। ভাবাটাই পাগলামি!”

“আমি বাড়ি যাব!”, ও জোরে চিৎকার করে উঠল, গলা ভেঙ্গে গিয়ে খসখসে আওয়াজ বেরোলো। “আমি বাড়ি যাব! আপনি আমাকে বাধা দিতে পারবেন না। আমি বাড়ি যাব! আমি মায়ের কাছে যেতে চাই! আপনি বাধা দিলে আমি আপনাকে খুন করে ফেলব! আমি বাড়ি যাবই!”

বহুদিন ধরে জমিয়ে রাখা ত্রাস আর উদ্বেগ ওর দু’চোখ বেয়ে জলধারার মত গড়িয়ে পড়তে লাগল। ওঁর বুকের ওপর হাত মুঠো করে আঘাতের পর আঘাত করতে করতে আবার ভাঙা গলায় চেঁচিয়ে উঠল, “আমি যাবই! যাবই! আমাকে যদি এক পা এক পা করে সারা পথ হেঁটে যেতে হয় তবুও!”

তারপর নিজের শরীরের ভার ওঁর ওপর ছেড়ে দিয়ে কান্নায় ভেজা গাল ওঁর ধোপদুরস্ত শার্টের ওপর ঘষতে লাগল। এতক্ষণ ধরে আঘাত করে চলা হাত ওঁর বুকের ওপর স্তব্ধ হয়ে রইল। উনি খুব আস্তে আস্তে ওর আলুথালু চুলে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন আর খুব স্নেহার্দ্র স্বরে সান্ত্বনা দিতে লাগলেন। এত শান্ত, এত স্নেহার্দ্র এবং শ্লেষহীন, যে ওর মনেই হল না যে রেট বাটলার কথা বলছেন। বরং মনে হল একজন অপরিচিত আগন্তুক, যার মুখ দিয়ে ব্র্যান্ডি আর তামাক আর অশ্বারোহণের গন্ধ ভেসে আসছে। মনে হল যেন জেরাল্ডই ওর দুঃখ ভোলানোর চেষ্টা করছেন।

“ঠিক আছে, সোনা,” উনি বললেন, খুবই মৃদুস্বরে। “কেঁদো না। তুমি নিশ্চয়ই বাড়ি যাবে। আমার ছোট্ট সাহসী মেয়ে তুমি। তুমি নিশ্চয়ই বাড়ি যাবে। নাও আর কেঁদো না।”

ও চুলের ওপর এক মৃদু স্পর্শ অনুভব করল। ওটা কি ওঁর ঠোঁট – অস্পষ্টভাবে বোঝার চেষ্টা করল। ওঁর স্পর্শ কত স্নেহময়, কত উষ্ণ! এই বাহুপাশে আজীবন বাঁধা থাকতে ইচ্ছে হল। এমন শক্তিশালী বাহুর মধ্যে থাকলে পৃথিবীর কেউ ওর কোনও ক্ষতি করতে পারবে না।

পকেট ঘেঁটে উনি একটা রুমাল বের করে এনে ওর চোখের জল মুছিয়ে দিলেন।

“নাও এখন লক্ষ্মী মেয়ের মত চোখমুখ পরিষ্কার করে নাও আমাকে বল তো কী করতে হবে! যা করার তাড়াতাড়ি করতে হবে!” কথাটা আদেশের সুরে বললেও চোখে এক ঝলক হাসি।

ও বাধ্য মেয়ের মত চোখমুখ মুছে নিল, কাঁপুনি থামছে না। ওঁকে কী বলতে হবে ভেবেই পেল না। ওর কিংকর্তব্যবিমুঢ় অবস্থা আর অসহায় দৃষ্টি দেখে উনি পরিস্থিতির সামাল দেবার দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিলেন।

“মিসেজ় উইল্কসের বাচ্চাও রয়েছে তো? ওঁকে সঙ্গে নেওয়ায় বিপদ আছে – ওই ভাঙ্গাচোরা ওয়াগনে ওঁদের নিয়ে পঁচিশ মাইল যাওয়া খুবই বিপজ্জনক। তার চেয়ে ওঁদের মিসেজ় মীডের কাছে রেখে যাওয়া ভাল।”

“মীডরা বাড়িতে নেই। তাছাড়া আমি ওকে ফেলে রেখে যেতে পারব না।”

“ঠিক আছে। উনি ওয়াগনে করেই যাবেন। সেই বাচ্চা বিচ্ছু মেয়েটা কোথায়?”

“ওপর তলায়, ট্রাঙ্ক গোছাচ্ছে।”

“ট্রাঙ্ক? ওই ওয়াগনে ট্রাঙ্ক নিয়ে যাবার কথা মনেও এনো না। তোমাদের সকলেরই জায়গা হবে কী না সন্দেহ আছে! আর চাকাগুলো যে কোনও মুহুর্তে খুলে যেতে পারে। ডাকো ওকে, আর বাড়ির সব চাইতে ছোট যে পালকের বিছানাটা আছে সেটা ওয়াগনে রাখতে বল।”

এর পরও স্কারলেট স্থানুর মত দাঁড়িয়ে রইল।। উনি শক্ত করে ওর হাতটা ধরলেন। মনে হল ওঁর খানিকটা শক্তি যেন ওর দেহে সঞ্চারিত হল। যদি ওঁর মত এমন নির্লিপ্ত ভাবটা বজায় রাখতে পারত! ওকে হলের মধ্যে ঠেলে নিয়ে গেলেন। কিন্তু ও অসহায় ভাবে ওঁর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। একটু ঠাট্টার সুরে বললেন, “মনেই হচ্ছে না যে এই সাহসী তরুণী আমাকে বলছিল ভগবান বা পুরুষ মানুষ কাউকেই ও ভয় করে না!”

তারপর হঠাৎ উনি খুব জোরে হেসে উঠে ওর হাত ছেড়ে দিলেন। রেগে গিয়ে জ্বলন্ত চোখে ওঁর দিকে তাকাল, চোখেমুখে ঘৃণা।

“আমি মোটেও ভয় পাইনি,” বলে উঠল।

“নিশ্চয়ই ভয় পেয়েছ। হয়ত এক্ষুনি তুমি অজ্ঞান হয়ে পড়বে আর আমার হাতের কাছে স্মেলিং সল্টের শিশি নেই।”

আর কিছুর করার কথা ভেবে না পেয়ে ও নিস্ফলভাবে মেঝেতে পা ঠুকতে লাগল। তারপর বাক্যব্যয় না করে ল্যাম্পটা তুলে নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে ওপরতলায় চলল। উনি পেছনে পেছনে চললেন। নিজের মনে মৃদু মৃদু হাসছেন বুঝতে পেরে নিষ্ফল আক্রোশে শরীর শক্ত হয়ে উঠল। ওয়েডের নার্সারিতে গিয়ে দেখল ও প্রিসির হাত আঁকড়ে ধরে বসে আছে। পুরো তৈরি হতে পারেনি আর কেবল হেঁচকি তুলছে। প্রিসিও ঘ্যানঘ্যান করে চলেছে। ওয়েডের বিছানার পালকের আস্তরনটা ছোট। প্রিসিকে বলল ওটা টেনে নীচে নিয়ে গিয়ে ওয়াগনে রাখতে। প্রিসি বাচ্চাটাকে ছেড়ে দিয়ে সেটাই করল। ওয়েড ওর পেছনে পেছনে নীচে নেমে গেল। কী হচ্ছে দেখার উত্তেজনায় হেঁচকি থেমে গেছে।

মেলানির ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে স্কারলেট বলল, “আসুন।” টুপিটা হাতে নিয়ে রেট ওর পেছন পেছন মেলানির ঘরে ঢুকলেন।

থুতনি পর্যন্ত চাদর টেনে মেলানি শুয়ে রয়েছে। মৃত্যুর পাণ্ডুর ভাব সারা মুখে। কোটরে ঢোকা, কালি পড়া চোখদুটো কিন্তু শান্ত। রেটকে শোবার ঘরে ঢুকতে দেখেও ও চমকে উঠল না, ব্যাপারটা যেন খুবই স্বাভাবিক। দুর্বল ভাবে একটু হাসতে চেষ্টা করল। হাসিটা মুখেই মিলিয়ে গেল।

“টারায় আমরা বাড়িতে যাচ্ছি,” স্কারলেট ওকে তাড়াতাড়ি বোঝানোর চেষ্টা করল। “ইয়াঙ্কিরা এসে পড়ছে। রেট আমাদের নিয়ে যাবেন। এটাই একমাত্র রাস্তা মেলি।”

মেলানি দুর্বলভাবে সম্মতিসূচক মাথা নাড়ালো, তারপর পাশে ওর বাচ্চার দিকে ইশারা করল। স্কারলেট ওকে কোলে তুলে নিয়ে তাড়াতাড়ি একটা তোয়ালে দিয়ে জড়িয়ে নিল। রেট বিছানার পাশে এসে দাঁড়ালেন।

“আমি চেষ্টা করব, যাতে আপনি আঘাত না পান,” খুব শান্ত স্বরে বললেন কথাটা। চাদরটা দিয়ে ওকে ভাল মত ঢেকে নিলেন। “দেখুন তো আপনি হাতদুটো দিয়ে আমার কাঁধে ভর রাখতে পারেন কিনা?”

মেলানি চেষ্টা করল। কিন্তু হাতদুটো নেতিয়ে পড়ে গেল। উনি নীচু হয়ে ওর ঘাড়ের কাছে একটা হাত রেখে, অন্য হাতটা হাঁটুর তলায় রেখে খুব আস্তে আস্তে ওকে তুলে নিলেন। যদিও টুঁ শব্দও করল না, তবু স্কারলেট দেখল ব্যথায় ওর ঠোঁট কুঁচকে গেল আর আরও পাণ্ডুর দেখাল। স্কারলেট ল্যাম্পটা উঁচু করে রেটকে আলো দেখাল, তারপর দরজার দিকে এগিয়ে যেতেই মেলানি দেওয়ালের দিকে ইশারা করল।

“কিছু বলতে চাইছেন?” রেট খুব কোমল স্বরে জিজ্ঞেস করলেন।

মেলানি কিছু একটা দেখানোর চেষ্টা করে ফিসফিস করে বলল, “ওই যে! চার্লস! প্লীজ়!”

প্রলাপ বকছে ভেবে রেট ওর দিকে তাকালেন, কিন্তু স্কারলেট ব্যাপারটা বুঝতে পেরে একটু বিরক্ত হল। দেওয়ালে ঝোলানো চার্লেসের ছবিটা আর ওর তরবারি আর পিস্তলের কথা মেলানি বলতে চাইছে।

“প্লীজ়,” মেলানি আবার ফিসফিস করে বলল, “তরবারিটা।”

“ঠিক আছে, ঠিক আছে,” এই বলে রেটকে আলো ধরে সাবধানে নীচে নামিয়ে ফিরে গিয়ে দেওয়াল থেকে ছবি, তলোয়ার আর পিস্তলটা খুলে নিল। কোলে বাচ্চা নিয়ে, তারপর বাতি আর এসব নিয়ে যেতে ওর একটু অস্বস্তিই লাগল। এই হল মেলানি! কোথায় মরার সময় নেই, ইয়াঙ্কিরা দোরগোড়ায় পৌঁছে গেল বলে, আর ও কিনা চার্লসের জিনিসের জন্য উতলা হচ্ছে!

নীচে যেতে যেতে ছবিটার দিকে স্কারলেটের এক ঝলক নজর পড়ল। চার্লসের বাদামী রঙের বড় বড় চোখ ওর চোখের সাথে মিলিত হতেই একটু কৌতুহল নিয়ে ছবিটা ভাল করে দেখল। এই লোকটা ওর স্বামী ছিল, বেশ কয়েক রাত একই বিছানায় শুয়েছে, আর ঠিক ওরই মত নরম আর বাদামী চোখের একটা সন্তান ওকে উপহার দিয়েছে। অথচ ওকে মনেই পড়ে না।

কোলে বাচ্চাটা অল্প নড়াচড়া করছে, “ওঁয়া” করে হাল্কা কেঁদে উঠতেই ওর মুখের দিকে তাকাল স্কারলেট। এ হল অ্যাশলের ছেলে – কথাটা এই প্রথম ওর মাথায় এল! একটা হাহাকার ওর সমস্ত সত্ত্বাকে ছেয়ে ফেলল –যদি ওর ছেলে হত – ওর আর অ্যাশলের!

প্রিসি সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে আসতেই স্কারলেট বাচ্চাটাকে ওর কোলে দিয়ে দিল। তারপর ওরা তাড়াতাড়ি নীচে নেমে এল। ল্যাম্পের আলোটা দেওয়ালে পড়ে আলোছায়া তৈরি করল। হলঘরে স্কারলেট একটা বনেট দেখতে পেয়ে মাথায় পরে রিবনটা থুতনির নীচে বেঁধে নিল। মেলানির কালো রঙের শোকের সময় পরবার বনেট। স্কারলেটের মাথায় ঠিকমত লাগতে চাইছিল না। কিন্তু নিজের বনেটটা কোথায় রেখেছে সেটা কিছুতেই মনে পড়ল না।

ল্যাম্প হাতে আর তলোয়ারটা ওর পায়ে ধাক্কা লাগা থেকে বাঁচিয়ে বাঁচিয়ে বাড়ির বাইরে এসে বারান্দার সিঁড়ি ধরে নীচে নেমে এল। মেলানি ওয়াগনে লম্বা হয়ে শুয়ে আছে। ওর পাশে ওয়েড আর তোয়ালে জড়ানো বাচ্চাটা। প্রিসি উঠে পড়ে বাচ্চাকে নিজের কোলে নিয়ে নিল।

ওয়াগনটা বড়ই ছোট আর ধারের তক্তাগুলো খুবই নীচু। চাকাগুলো ভেতরের দিকে হেলে আছে, যেন প্রথম ধাক্কায়ই খুলে বেরিয়ে আসবে। ঘোড়াটা এক ঝলক দেখেই ওর বুকের মধ্যে কাঁপুনি শুরু হয়ে গেল। খুবই ছোট্ট আর রুগ্ন পশু, মাথাটা ক্লান্তিতে সামনের পা দুটোর ফাঁকে প্রায় ঢুকিয়ে দিয়েছে। পিঠে দগদগে ঘা, আর যেভাবে নিঃশ্বাস নিচ্ছিল, সেভাবে কোনও স্বাস্থ্যবান ঘোড়া নিঃশ্বাস নেয় না।

রেট একটু হেসে বললেন, “তেমন বলবার মত ঘোড়া নয়, তাই না? মনে হছে যেন জিনের ভারেই মরে যাবে। কিন্তু এর থেকে ভাল কিছু পাওয়াও গেল না। ভবিষ্যতে কোনও একদিন তোমাকে ফলাও করে বলব, কোথায় আর কীভাবে এই ঘোড়া আমি চুরি করেছি, আর কীভাবে গুলি খেতে খেতে বেঁচে গেছি। একমাত্র তোমার প্রতি আমার অপরিসীম আনুগত্যের জন্যই, জীবনের এই পর্যায়ে আমাকে ঘোড়াচোর হতে হল – আর সেও কিনা এই রকম একটা ঘোড়ার চোর! এস আমি তোমাকে ওয়াগনে উঠতে সাহায্য করি।”

ল্যাম্পটা ওর হাত থেকে নিয়ে মাটিতে রাখলেন। একটা কাঠের তক্তা ফেলে সামনে বসার জায়গা করা হয়েছে। রেট স্কারলেটকে তুলে নিয়ে সেটার ওপর বসিয়ে দিলেন। সত্যি পুরুষ মানুষ হওয়া কত বিস্ময়কর ব্যাপার, আর রেটের মত এত শক্তিশালী একজন পুরুষ! স্কার্টটা সামলাতে সামলাতে ভাবল। রেট পাশে থাকলে, ও কোনো কিছুতেই ভয় পায় না – কামানের আওয়াজ কিংবা ইয়াঙ্কি যাই হোক না কেন।

উনি ওর পাশে এসে বসে লাগামটা হাতে তুলে নিলেন।

“একটু দাঁড়ান!” হঠাৎ ও চেঁচিয়ে উঠল। “সামনের দরজায় তালা লাগাতে ভুলে গেছি।”

উনি খুব জোরে হেসে উঠেই, ঘোড়াতে লাগামটা বেঁধে দিলেন।

“আপনি হাসছেন কেন?”

“তোমার কথা শুনে – তুমি তালা বন্ধ করে ইয়াঙ্কিদের ঘরে ঢোকা বন্ধ করবে!” কথাগুলো বলতে বলতে ঘোড়াটা চলতে শুরু করল, খুব আস্তে আস্তে আর বেশ অনিচ্ছাসহকারে। মাটিতে রাখা ল্যাম্পটা জ্বলতে লাগল। বৃত্তের আকারে আলোর এক ম্লান হলুদ শিখা – ওরা যত দূরে চলে যেতে লাগল তত আরও মলিন হয়ে যেতে লাগল।

পীচট্রী স্ট্রীট থেকে ঘোড়াটার ঘষটে চলা পাগুলোকে পশ্চিমদিকে চালনা করলেন। ওয়াগনটা আর্তনাদ করতে করতে সরু গলির এবড়োখেবড়ো রাস্তা দিয়ে ঝাঁকুনি দিয়ে চলতে লাগল। এরকম একটা ঝাকুনিতে মেলানির মুখ থেকে একটা অস্ফুট গোঙানি বেরিয়ে এল। মাথার ওপরে কালো কালো গাছগুলো রাস্তার দুপাশ থেকে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে আছে। রাস্তার দুধারে অন্ধকার বাড়িগুলো নীরবে দাঁড়িয়ে। সাদা রঙ করা কাঠের বেড়াগুলো অন্ধকারে সমাধির পাথরের মত লাগছে। সরু রাস্তাটা মনে হছে একটা অন্ধকার সুড়ঙ্গ। গাছের ফাঁক দিয়ে উৎকট লাল আকাশ আর নীচের অন্ধকার যেন ভূতের মত পরস্পরের সাথে পাল্লা দিয়ে ছুটে চলেছে। বাতাসে ধোঁয়ার গন্ধ বেড়েই চলেছে। গরম বাতাসের সাথে সাথে শহরের মধ্যস্থল থেকে শোরগোল ভেসে আসছে – মানুষের কোলাহল, ট্যাঙ্কের গড়িয়ে গড়িয়ে চলার শব্দ, আর সৈন্যদের মার্চে করে চলার আওয়াজ। রেট যেই একটা ঝাঁকুনি দিয়ে ঘোড়াটাকে নিয়ে অন্য একটা রাস্তা ধরলেন, পশ্চিম দিক থেকে এল একটা কান ফাটানো আওয়াজ আর আগুনের লেলিহান শিখা।

“মনে হয় ওটাই অস্ত্রশস্ত্রের শেষ ট্রেনটা,” রেট বললেন খুব শান্ত ভাবে। “বোকারা আজ সকালেই বের করে নিয়ে যেতে পারত! যথেষ্ট সময় ছিল হাতে। কিন্তু আমাদের পক্ষে ব্যাপারটা মোটেই সুবিধেজনক নয়। ভেবেছিলাম শহরটা পাক দিয়ে গেলে ডিক্যাটুর স্ট্রীটের আগুন আর পাগল জনতাকে এড়িয়ে যাওয়া যাবে। তারপর বিপদের মুখোমুখি না হয়েই শহরের দক্ষিণপশ্চিম দিক দিয়ে বেরিয়ে যাওয়া যাবে। কিন্তু আমাদের তো মারিয়েটা স্ট্রীট ধরতেই হবে, আর যদি আমার খুব ভুল না হয়ে থাকে তাহলে এই বিস্ফোরণ মারিয়েটা স্ট্রীটের আশেপাশেই হয়েছে।”

“আম – আমাদের – কি ওই আগুনের মধ্যে পড়তেই হবে?” স্কারলেটের গলার স্বর কেঁপে গেল।

“একটু পা চালাতে পারলে মনে হয় পড়তে হবে না,” কথাটা বলেই উনি লাফ দিয়ে ওয়াগন থেকে নেমে অন্ধকারে মিলিয়ে গেলেন। একটু বাদে লম্বা একটা গাছের ডাল হাতে ফিরে এলেন। নির্দয় ভাবে সেটা ঘোড়াটার দগদগে ঘাওয়ালা পিঠের ওপর বসিয়ে দিলেন। ঘোড়াটা পা টেনে টেনে ছুটতে শুরু করল। হাপরের মত জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিতে নিতে। ওয়াগনটা লাফাতে লাফাতে চলল। বাচ্চাটা কেঁদে উঠল। ওয়েড আর প্রিসিও ওয়াগনের কোনে ধাক্কা লেগে কঁকিয়ে উঠল। একটা টুঁ শব্দও বেরোলো না কেবল মেলানির মুখ থেকে।

মারিয়েটা স্ট্রীটের কাছাকাছি পৌঁছতেই গাছের সারি হালকা হয়ে গেল। ঘরবাড়ির ওপর থেকে লকলকে আগুনের শিখা রাস্তাটা দিনের আলোর থেকেও বেশি উজ্জ্বল করে রেখেছে। পাল ছিঁড়ে গেলে ডুবন্ত জাহাজ যেমন ভাবে দুলতে থাকে, ঠিক তেমনি ভাবে দোদুল্যমান দানবাকৃতি ছায়া সৃষ্টি করছে।

স্কারলেটের দাঁতকপাটি লেগে গেল। ভয়ে এতটাই আচ্ছন্ন ছিল যে সেটা বোঝার ক্ষমতাটুকুও হারিয়ে ফেলেছিল। আগুনের শিখা চারপাশে উত্তাপ ছড়াচ্ছিল, তা সত্ত্বেও ওর কাঁপুনি থামতে চাইছিল না। হাটুগুলো এমন ভাবে না কাঁপলে, এই নরক থেকে রেহাই পাবার জন্য এক্ষুণি ওয়াগন থেকে লাফ দিয়ে নেমে অন্ধকার পথ ধরে আবার মিস পিটিপ্যাটের বাড়ির আশ্রয়ে চলে যেত। রেটের দিকে ঘেঁষে এল। কম্পমান হাতে ওঁর বাহু স্পর্শ করে ওঁর মুখের দিকে তাকাল। যদি কিছু সান্ত্বনার কথা শোনান, ভরসা দেন। শিখার আলোয় দেখল উনি অনাদিকালের প্রস্তরমূর্তির মত বসে আছেন, দুর্জ্ঞেয়, অকরুণ। ওর স্পর্শ পেয়ে ঘুরে তাকালেন। ওঁর চোখ আগুনের শিখার মতই ভয়াবহ ভাবে জ্বলছে। স্কারলেটের মনে হল উনি পরিস্থিতিটা যেন তীব্র ঘৃণা সহকারে উপভোগ করছেন। যেন এই লেলিহান শিখাকে উনি আমন্ত্রণ করে ডেকে এনেছেন।

ওঁর বেল্টের আটকানো লম্বা নলের একটা পিস্তলের ওপর হাত রেখে বললেন, “শোনো, কালো কিংবা সাদা, কেউ যদি ওয়াগনে তুমি যেদিকে বসেছ, সেদিক থেকে এসে ঘোড়ার গায়ে হাত দেয়, তাহলে সময় নষ্ট না করে তাকে গুলি করবে, জবাবদিহি করার কথা পরে ভাবা যাবে। তবে দয়া করে ঘোড়াটাকে উত্তেজনার মাথায় গুলি করে বোসো না।”

“অ্যা- আমার কাছে একটা পিস্তল আছে,” ফিসফিস করে বলে কোলের ওপর যন্ত্রটাকে চেপে ধরল ও। মৃত্যু এলে ভয়ের চোটে ওটার সদ্ব্যবহার করতে পারবে কিনা সেটা নিয়ে ওর মনে গভীর সন্দেহ আছে।

“আছে বুঝি? কোথায় পেলে?”

“ওটা চার্লসের।”

“চার্লস?”

“ডিক্যাটুর চার্লসের – আমার স্বামীর।”

উনি মৃদু হেসে ফিসফিস করে বললেন, “সত্যিই কি কোনোদিন তোমার একজন স্বামী ছিল?”

একটু যদি উনি পরিস্থিতির গুরুত্বটা বুঝতেন! একটু যদি তাড়াতাড়ি চালাবার চেষ্টা করতেন!

“আমার ছেলে কোথা থেকে এল বলে আপনার ধারণা?” খুবই বিদ্বেষপূর্ণ ভাবে জিজ্ঞেস করল।

“আরে ও তো স্বামী না থাকলেও পাবার রকমারি উপায় আছে – ”

“আপনি কি একটু মুখ বন্ধ রেখে তাড়াতাড়ি চালাবেন?”

কিন্তু মারিয়েটা স্ট্রীটের একেবারে গায়ে, এখনও আগুন না লাগা একটা গুদামের ছায়ায় অচকিতে লাগামের রাশ টেনে ধরলেন।

“তাড়াতাড়ি করুন!” স্কারলেটের মনে একটাই ভাবনা। “তাড়াতাড়ি করুন! তাড়াতাড়ি করুন!”

“ওই দেখ সৈন্যরা যাচ্ছে,” উনি বলে উঠলেন।

জ্বলন্ত বাড়িগুলো পেরিয়ে, মারিয়েটা স্ট্রীট ধরে, রাইফেল হাতে ক্লান্ত পদক্ষেপে, দলটা বেরিয়ে এল। ওদের মাথা নীচু, তাড়া করবার ক্ষমতাটুকুও অবশিষ্ট নেই। আগুনে কাঠের পাটাতন ভেঙ্গে পড়ছে কিনা, ধোঁয়ায় চারদিক ঢেকে গেছে কিনা, এসব কিছুই নজর করবার ধৈর্য নেই। ওদের পোশাক শতছিন্ন, এতটাই যে অফিসার আর সৈন্যদের মধ্যে তফাত করবার যে সব চিহ্ন সেসব উধাও হয়ে গেছে। কারও কারও ছেঁড়া টুপীতে বিবর্ণভাবে সি.এস.এ. কথাটা দেখা যাচ্ছে। অনেকেই খালি পায়ে যাচ্ছে। কারও কারও বাহুতে বা মাথায় নোংরা ব্যান্ডেজ জড়ানো রয়েছে। ডান দিক, বাঁদিক কোন কিছু লক্ষ্য না করে ওরা এগিয়ে গেল। কারও মুখে কোনও কথা নেই, ওদের পায়ে চলার শব্দটুকুও না পাওয়া গেলে মনে হত যেন ভূতের মিছিল যাচ্ছে।

“ভাল করে দেখে নাও ওদের,” রেটের গলায় উপহাসের স্বর। “নাতি নাতনীদের কাছে গল্প করতে পারবে মহান সৈনিকদের পালিয়ে যেতে দেখেছ।”
ভয় ছাপিয়ে গিয়ে ঘৃণার অনুভূতিটাই প্রবল হয়ে উঠল মানুষটার ওপর। নিজের নিরাপত্তা, এই ওয়াগনের পেছনে বসে থাকার সবার নিরাপত্তাই নির্ভর করছে রেটের ওপর। ভালমতই জানে। তবুও এক মুহুর্তের জন্য ভয়টাকে খুব তুচ্ছ মনে হল। ভাগ্যের পরিহাসে আজ এই বীর সৈনিকদের পালিয়ে যেতে হচ্ছে। এত অবজ্ঞা ওঁর এদের প্রতি! একরাশ ঘৃণা ছাড়া মনে আর কোনও অনুভূতিই এলো না। চার্লসের কথা মনে পড়ল – বেঁচে নেই। অ্যাশলের কথা – কে জানে বেঁচে আছে কিনা। মনে পড়ল আরও সব স্ফূর্তিবাজ, সাহসী ছেলেগুলোর কথা, যারা আজ কবরে বন্দী হয়ে রয়েছে। কিন্তু ভুলে গেল একদিন ও নিজেও ওদের বোকা বলেই মনে করত। মুখ থেকে কোনও কথা বেরোলো না, কিন্তু ঘৃণা আর ক্রোধে চোখ জ্বলতে থাকল।

মিছিল প্রায় শেষের দিকে। পেছনের সারিতে বেঁটেখাটো একজন লোক। রাইফেলটা মাটিতে ঘষটাতে ঘষটাতে এগোচ্ছিল। হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ে অন্যদের দিকে চেয়ে রইল। ময়লা জমে থাকা চেহারায় ক্লান্তির ছাপ। যেন ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে চলছে। রাইফেলটা প্রায় ওরই মত লম্বা। তেলতেলে মুখে দাড়িগোঁফ গজায় নি। “পনেরো কী ষোলো,” স্কারলেট ভাবল, “হোমগার্ডদের কেউ হবে, নয়ত স্কুল পালানো ছেলে ছোকরাদের কেউ।”

স্কারলেটের চোখের সামনেই ছেলেটা মাটিতে পড়ে গেল। পেছনের সারির দুজন সৈন্য নীরবে ওর পাশে এসে পড়ল। একজন বেশ লম্বা আর রোগা, কালো দাড়ি, কোমরের বেল্ট পর্যন্ত নেমে এসেছে। চুপচাপ নিজের আর ছেলেটার রাইফেল দুটো সঙ্গীর হাতে ধরিয়ে দিল। তারপর নীচু হয়ে একটা ঝাঁকুনি দিয়ে অবলীলাক্রমে ছেলেটাকে নিজের কাঁধের তুলে নিল। আবার যাত্রা শুরু, একটু শ্লথ গতি, কাঁধের ওপর ভার থাকার জন্য একটু ঝুঁকে। ছেলেটা যদিও দুর্বল, তবুও মেজাজ দেখিয়ে বলছিল, “আমাকে নামিয়ে দাও! দোহাই তোমাদের! আমি হাঁটতে পারব।”

ভ্রূক্ষেপ না করে কালোদাড়ি এগিয়ে যেতে যেতে দূরে মিলিয়ে গেল।

লাগামটা আলগা করে ধরে রেট নির্বাক হয়ে ওদেরই লক্ষ্য করছিলেন, মুখে বিষণ্ণ হাসি। ঠিক তখনই কাছাকাছি কোথাও মড়মড় করে কাঠের পাটাতন ভেঙে পড়ার শব্দ। যে গুদামের নীচে ওরা আশ্রয় নিয়েছে, স্কারলেট খেয়াল করল, আগুনের একটা লিকলিকে শিখা সেটারই ছাদের ওপরে দেখা যাচ্ছে। লড়াইয়ের ধ্বজা আর পতাকায় আগুন ধরে গিয়ে আকাশটা আলোয় ভরে দিয়েছে। ধোঁয়ায় ওর নাক জ্বালা করতে লাগল। ওয়েড আর প্রিসি কাশতে শুরু করল। বাচ্চাটা হাল্কা করে হেঁচে ফেলল।

“ওহ রেট! আপনি কি পাগল হয়ে গেছেন! ঈশ্বরের দোহাই তাড়াতাড়ি চলুন! তাড়াতাড়ি!”

কোনও জবাব না দিয়ে রেট হাতে ধরা গাছের ডালটাকে এমন নির্মমভাবে ঘোড়াটার পিঠের ওপর বসিয়ে দিলেন। বেচারা এগোতে শুরু করল। যতটুকু ক্ষমতা অবশিষ্ট ছিল তাই নিয়ে ঘোড়াটা মারিয়েটা স্ট্রীট ধরে পড়িমরি করে ছুট লাগাল। সরু রাস্তাটার দুপাশের গৃহের সারিতে আগুন জ্বলছে – আগুনের একটা সুড়ঙ্গ যেন। সেটার মধ্যে দিয়েই ওয়াগনটা ছুটতে লাগল। তীব্র আলোয় চোখ ধাঁধিয়ে যাবার জোগাড়, আগুনের হলকায় চামড়া ঝলসে যাচ্ছে। অগ্নিদেবের প্রভাবে কড়িবরগা, কাঠের পাটাতন, দেওয়াল ভেঙে পড়ার দুমদাম, মড়মড়, পটপট শব্দে কান ঝালাপালা। আগুনের সুড়ঙ্গ বুঝি শেষ হবার নয়। অবশেষ ওয়াগন সেই জায়গাটা পার করে একটা প্রায় অন্ধকার জায়গায় এসে পৌঁছল।

চলতে চলতে ঘোড়াটা রেল লাইনে এসে হুমড়ি খেয়ে পড়তেই রেট আবার চাবুক চালালেন। বেশ অন্যমনস্ক আর দিকভ্রান্ত যেন। চওড়া কাঁধ কিছুটা সামনের দিকে ঝুঁকে গেছে। এই মুহুর্তের চিন্তাভাবনাগুলো যে মোটেই সুখকর নয় সেটা ওঁর হাবভাবেই বোঝা যাচ্ছিল। কপাল আর গাল থেকে দরদর করে ঘাম ঝরছে। ওঁর ভ্রূক্ষেপ নেই।

ওয়াগনটা একটা রাস্তা থেকে অন্য রাস্তায়, তারপরে আর একটা রাস্তায়, তারপর এক গলি পেরিয়ে অন্য গলি দিয়ে এগোতে লাগল। স্কারলেট যখন সহ্যসীমার বাইরে চলে গেছে তখন আস্তে আস্তে সেই দুমদাম, মটমট আর মড়মড় শব্দ স্তিমিত হয়ে এল। তবু রেট একটাও কথা বললেন না। শুধু একটু পরে পরেই চাবুক চালিয়ে যাচ্ছেন। আকাশের লাল আভা ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে। রাস্তাও খুব অন্ধকার। খুব ভয়াবহ। কথা চলতে থাকলে স্কারলেটের অস্বস্তি একটু কমত। এমনকি কোনও শ্লেষ, কিংবা অপমানকর কথাও যদি বলতেন তাও সই। কিন্তু রেট পুরোপুরি নিশ্চুপ।

“ও রেট,” ওঁর বাহুতে হাত রেখে নীচুগলায় বলল, “আপনি না থাকলে আমরা যে কী করতাম? আপনি যে সৈন্যদলে নেই সেটা খুবই স্বস্তির কথা!”

উনি ওর দিকে ঘুরে দেখলেন। সেই দৃষ্টি দেখে স্কারলেট হতভম্ব হয়ে গেল। রসিকতা বা শ্লেষের নামমাত্র নেই। ক্রুদ্ধ আর বিহ্বল চাউনি। তারপর গম্ভীরভাবে দৃষ্টি সরিয়ে নিলেন। নীরবতার মধ্যেই কেটে গেল অনেকটা সময়। ওয়াগন টাল খেতে খেতে এগিয়ে চলল। মাঝে মাঝে শুধু বাচ্চাটার মৃদু কান্না আর প্রিসির দীর্ঘশ্বাস। স্কারলেট ওকে খুব আক্রোশের সঙ্গে চিমটি কাটল। প্রিসি একবার চেঁচিয়ে উঠেই আবার ভয়ে চুপ করে গেল।

অবশেষে রেট একটা বাঁক নিয়ে একটা চওড়া রাস্তায় পড়লেন। অপেক্ষাকৃত মসৃনও। বাড়িঘর দূরে মিলিয়ে যেতে থাকল। রাস্তার দুপাশ ঘন জঙ্গল দেওয়ালের মত দাঁড়িয়ে।

“শহর ছাড়িয়ে চলে এসেছি আমরা,” রেট লাগাম টেনে ধরে সংক্ষেপে জানালেন। “রাফ অ্যান্ড রেডি যাবার প্রধান সড়কে।”

“থামবেন না। তাড়াতাড়ি চলুন!”

“ঘোড়াটাকে একটু জিরোতে দাও।” তারপর স্কারলেটের দিকে ঘুরে গিয়ে আস্তে আস্তে বললেন, “তুমি কি এখনও এই পাগলামী করতে চাও?”

“কী করতে চাই?”

“তুমি কি এখনও টারায় যাবার চেষ্টা করতে চাও? সেটা প্রায় আত্মহত্যার শামিল। টারা আর তোমার মাঝখানে কিন্তু স্টিভ লী’র অশ্বারোহী বাহিনী আর ইয়াঙ্কি সৈন্যরা লড়াই করছে।”

হে ভগবান! উনি কি তাহলে ওদের বাড়ি নিয়ে যেতে অস্বীকার করছেন? আজকের এই বীভৎস দিনের শেষে!

“হ্যাঁ হ্যাঁ রেট। রেট দয়া করে চলুন! ঘোড়াটা একটুও ক্লান্ত হয়নি!”

“এক মিনিট। এই রাস্তা দিয়ে তুমি জোন্সবোরো যেতে পারবে না। রেললাইনের ধার দিয়েও যাওয়া ঠিক হবে না। রাফ অ্যান্ড রেডি থেকে দক্ষিণ দিক জুড়ে ওরা সারাদিন লড়াই করছে। এছাড়া আর কোনও রাস্তা তোমার জানা আছে কি? ওয়াগন চলে যাবার মত সরু রাস্তা কিংবা গলি যাতে করে রাফ অ্যান্ড রেডি কিংবা জোন্সবোরো এড়িয়ে যাওয়া যায়?”

“হ্যাঁ আছে তো,” স্কারলেট একটু আশ্বস্ত হয়ে বলে উঠল। রাফ অ্যান্ড রেডির দিকে আরও একটু এগিয়ে গিয়ে একটা ওয়াগন যাবার রাস্তা আছে, যেটা জোন্সবোরো রোড থেকে ঘুরে অনেকটা ভেতরে ঢুকে গেছে। বাপী আর আমি ওই রাস্তায় ঘোড়ার পিঠে করে অনেকবার গেছি। ওটা ম্যাকিন্টশদের বাড়ির কাছাকাছি বের হয়। ওখান থেকে টারা মাত্র এক মাইল।”

“ভাল কথা। আশা করি তুমি রাফ অ্যান্ড রেডি পার হয়ে ঠিকঠাকই যেতে পারবে। বিকেলের দিকে জেনারাল স্টিভ লী পশ্চাদপসরণ তদারক করার জন্য ওখানেই ছিলেন। হয়ত ইয়াঙ্কিরা এখনও ওখানে গিয়ে উঠতে পারেনি। স্টিভ লী’র লোকেরা যদি তোমার ঘোড়া নিয়ে না নেয় তাহলে তুমি পৌঁছে যেতে পারবে।”

“আমি পৌঁছে যেতে পারব?” স্কারলেটের গলায় সংশয়।

“হ্যাঁ তুমিই,” ওঁর কণ্ঠস্বরে কিছুটা রুক্ষতা।

“রেট – আপনি – আপনি আমাদের নিয়ে যাবেন না?”

“না, আমি এখান থেকে ফিরে যাব।”

উদভ্রান্ত চোখে মাথার পেছনে ধূসর আকাশটা দেখল, অন্ধকারে সারি সারি গাছের দিকে তাকাল যেগুলো কয়েদখানার মত ওদের ঘিরে রেখেছে, ওয়াগনের পেছনে বসা আতঙ্কিত মানুষগুলোর দিকে তাকাল – আর সব শেষে ওঁর দিকে। ও কি পাগল হয়ে যাচ্ছে? ওঁর কথাটা ঠিক মত শুনেছে তো?

ওঁর মুখে হাসি। বিবর্ণ আলোয় সাদা দাঁতগুলো দেখা যাচ্ছে। চোখের কোনে সেই পুরোনো বিদ্রুপের আভাস।

“আমাদের ছেড়ে চলে যাচ্ছেন? কোথায় – আপনি কোথায় যাবেন?”

“সৈন্যদলের সাথে যাব, সোনা।”

একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস নিল। বিরক্তও হল কিছুটা। উনি কি ঠাট্টা করার আর সময় পেলেন না? রেট – সৈন্যদলের সঙ্গে! নিজেই তো প্রায় বলে থাকেন ওই বোকা লোকগুলো যত ভাষণবাজী আর ড্রামের আওয়াজে উদ্বুদ্ধ হয়ে নিজেদের প্রাণ বিসর্জন দেবার জন্য তৈরি হবে, ততই চালাক লোকদের কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা কামানোর সুযোগ বেড়ে যাবে!

“ওহ্‌ আমাকে এভাবে ভয় পাইয়ে দেবার জন্য আপনাকে খুন করে ফেলতে পারি তা জানেন? চলুন, যাওয়া যাক।”

“আমি মোটেও ঠাট্টা করছি না, সোনা। আমার এই যে দেশপ্রেম, এই যে আত্মত্যাগের মহৎ ইচ্ছেখুব কষ্ট পেলাম তুমি গুরুত্ব দিলে না! কোথায় তোমার দেশাত্মবোধ, আমাদের মহান উদ্দেশ্যের প্রতি তোমার ভালবাসা? তুমি কি চাও যে লড়াইয়ে হেরে গিয়ে আমি শহীদ হয়ে যাই? কী বলার আছে তোমার? তাড়াতাড়ি বলে ফেল। লড়াইয়ের ময়দানে নামার আগে আবেগময় একটা বক্তৃতা দিয়ে বিদায় নিতে চাই!”

ওঁর চিরপরিচিত মন্থর কথা বলার ভঙ্গী স্কারলেটের কানে উপহাসের মত শোনালো। উনি উপহাস করছেন। নিজেকেও যেন উপহাস করছেন। কী বলছেন যা তা? দেশপ্রেম, শহীদ হওয়া, আবেগময়? এসব সত্যি হতেই পারে না। এমন অন্ধকার রাস্তা! মৃতপ্রায় একজন মহিলা! সদ্যোজাত শিশু! আর দুটো আতঙ্কিত প্রাণে! সব বোঝা ওর একার ঘাড়ে চাপিয়ে উনি মনের আনন্দে কেটে পড়ছেন! কথাটা কি বিশ্বাসযোগ্য? লড়াইয়ের ময়দানের ভেতর দিয়ে মাইলের পর মাইল যাওয়া, ইয়াঙ্কি সৈন্য, গুণ্ডা বদমাশ আরও না জানি কত কী আছে!

বহুদিন আগে, যখন ওর ছ’বছর বয়েস, গাছ থেকে পেটের ওপর পড়ে নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। শ্বাস ফিরে আসার আগের সেই বিষম কয়েকটা মুহুর্ত এখনও ভাল মত মনে আছে। রেটের দিকে তাকিয়ে ঠিক সেদিনের মত ওর নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে গেল, গা গুলিয়ে উঠল।

“আপনি ঠাট্টা করছেন রেট!” ওঁর বাহু আঁকড়ে ধরল। নিজেরই চোখের জলে কব্জি ভিজে গেল। উনি ওর হাতটা তুলে নিয়ে আলগাভাবে চুম্বন করলেন।

“কত স্বার্থপর তুমি, তাই না? শুধু নিজের কথাই ভাবলে, আর আমাদের কনফেডারেসির বীর সৈনিকদের কথা একবারও ভাবলে না! একবার ভাব তো, আমি যদি এই শেষ মুহুর্তে ওদের সাথে যোগদান করি, ওরা কতটা উৎসাহিত হবে!” কোমল অথচ বিদ্বেষের সুরে বললেন কথাটা।

“কি করে এ কাজ আপনি করতে পারছেন রেট? আপনি কেন আমাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছেন?”

উনি হেসে উঠলেন। “বুঝলে না? যে আবেগ দক্ষিণের সব মানুষকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায় – হয়ত সেই জন্যই। হয়ত আমার লজ্জা লাগছে। কে জানে?”

“লজ্জা! আমাদের এরকম অসহায় অবস্থায় ছেড়ে যাওয়ার জন্য লজ্জায় আপনার মরে যাওয়া উচিত!”

“প্রিয় স্কারলেট, তুমি মোটেও অসহায় নও। তোমার মত এত স্বার্থপর আর নিজের সিদ্ধান্তে অটল – এরা কখনোই অসহায় হয় না। যদি ভুলেও কোনও ইয়াঙ্কি তোমার সন্ধান পায়, তার কী হাল হবে সে কথা মনে করে আমি শিউরে উঠছি।”

স্কারলেট স্তব্ধ বিস্ময়ে হয়ে দেখল উনি আচমকা ওয়াগন থেকে নেমে ঘুরে এসে ওর পাশে দাঁড়ালেন, তারপর আদেশের সুরে বললেন, “নেমে এস।”

ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল ওঁর দিকে। উনি রুক্ষভাবে ওর বাহু ধরে এক ঝটকায় ওকে মাটিতে নামিয়ে আনলেন। তারপর টানতে টানতে ওকে ওয়াগন থেকে কয়েক পা দূরে নিয়ে গেলেন। ধুলো আর নুড়ি পাথর ওর পায়ে ফুটে যাচ্ছিল। দুঃস্বপ্নের মত রাতের অন্ধকার আর গরম ওকে জড়িয়ে রেখেছে।

“তুমি আমাকে বুঝবে বা ক্ষমা করে দেবে এরকম কোনও দূরাশা আমার মনে নেই। অবশ্য তাতে খুব কিছু একটা এসে যাবে না, কারণ আমি নিজেই জানিনা এই বোকামি আমি নিজেই কখনও বুঝতে পারব কিনা কিংবা এই বোকামির জন্য নিজেকে ক্ষমা করতে পারব কিনা! এই ভাববিলাস এখনও আমার মধ্যে আছে দেখে আমি নিজেই আশ্চর্য হয়ে যাচ্ছি! দক্ষিণের প্রতিটি লোককে এই লড়াইয়ে প্রয়োজন। ঠিক এই কথাটাই আমাদের সাহসী গভর্নর ব্রাউন সেদিন বলেছিলেন কিনা? সে যেতে দাও। আমি লড়াইতে চললাম,” বলে উনি হঠাৎ হেসে উঠলেন। সেই প্রাণখোলা হাসি অন্ধকার জঙ্গলে ধাক্কা খেয়ে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল।

“’ভালবাসিবার অবসর রহিল না, প্রেম যত ছিল মর্যাদা তারও বেশি’, বিদায় নেবার সময় বলা যেতেই পারে, কি বল? এই মুহুর্তে এর থেকে ভাল কিছু মনেই আসছে না! তবে আমি সেদিন বারান্দায় যাই বলে থাকি না কেন, আমি তোমায় সত্যি সত্যিই ভালবাসি স্কারলেট।”

ওঁর কণ্ঠস্বরে স্নেহপূর্ণ মন্থরতা। উষ্ণ দৃঢ় হাত দিয়ে স্কারলেটের বাহু স্পর্শ করে বলে চললেন, “তোমাকে ভালবাসি কারণ তোমার আর আমার চরিত্র একই রকম, দলছুট, শঠ আর স্বার্থপর। যতক্ষণ না আমাদের নিরাপত্তা আর স্বাচ্ছন্দ্য বিঘ্নিত হচ্ছে, পৃথিবী ধ্বংস হয়ে গেলেও আমাদের কিছু এসে যায় না।”

অন্ধকারে দাঁড়িয়ে উনি আরও অনেক কিছুই বলে গেলেন। স্কারলেট শুনতে পেল, কিন্তু মানে বুঝতে পারল না। কেবল একটা চিন্তাই ওর মনকে প্রবল ভাবে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল, যে উনি ওকে এখানে একা ছেড়ে চলে যাচ্ছেন, একা একা ইয়াঙ্কিদের মোকাবেলা করবার জন্য। আবেগহীন মনে একটা কথাই বার বার ঘুরে ফিরে আসছিল, “উনি আমাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। উনি আমাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছেন।”

তারপর দু’বাহু দিয়ে স্কারলেটের কোমর আর কাঁধ বেষ্টন করে ওকে কাছে টেনে নিলেন। স্কারলেট শরীরে ওঁর জানুদেশের স্পর্শ অনুভব করল। কোটের বোতাম গুলো ওর বুকে চাপ দিচ্ছিল। সারা শরীরে অদ্ভুত এক বিহ্বল শিহরণ অনুভব করল। স্থান আর কালের হিসেব হারিয়ে গেল। পুতুলের মত নিস্তেজ লাগছিল, দুর্বল আর অসহায় – অথচ ওঁর বাহুর স্পর্শ কত মনোরম।

“গত মাসে তোমাকে যা বলেছিলাম সে ব্যাপারে তুমি কিছু ভেবেছ? আমার বিপদ আর মৃত্যুর সম্ভাবনা হয়ত তোমাকে অনুপ্রাণিত করতে পারবে। ভেবে দেখ, মধুর এক স্মৃতি উপহার দিয়ে এক সৈনিককে তুমি মৃত্যুবরণ করতে পাঠাচ্ছ!”

উনি ওকে চুম্বন করতে শুরু করলেন। ওঁর গোঁফ মুখে সুড়সুড়ি দিচ্ছে। উষ্ণ ঠোঁট দিয়ে খুব আস্তে আস্তে চুম্বন। এতটাই ধীরেসুস্থে, যেন সমস্ত রাত চুম্বন করে কাটিয়ে দেবার মত সময় ওঁর হাতে আছে। চার্লস কখনও ওকে এভাবে চুম্বন করেনি। এমনকি টার্লটন ভাইদের বা ক্যাল্ভার্টদের ছেলেদের চুম্বনেও এরকম একই সাথে হাসি, কান্না, বিহ্বলতা অনুভব করেনি। ওর শরীরটা পেছনে হেলিয়ে দিয়ে গলায়, ঘাড়ে ঠোঁট বুলিয়ে আদর করতে লাগলেন।

“আহ্‌ কী স্বর্গীয় অনুভূতি,” বললেন খুব অনুচ্চস্বরে, “খুবই স্বর্গীয় অনুভূতি!”

অন্ধকারে ওয়াগনের দিকে তাকাল, আর তখনই ওয়েডের তীক্ষ্ণ গলা শোনা গেল।

“মা! ওয়েড ভয় পাচ্ছে!”

কুয়াশাচ্ছন্ন কম্পিত হৃদয় এক ঝটকায় শীতল বাস্তবে ফিরে এল। মনে পড়ল যে ও খুবই আতঙ্কগ্রস্ত – আর রেট ওকে ফেলে রেখে চলে যাচ্ছেন। জঘন্য প্রকৃতির ইতর লোক! এত কিছুর পরে আবার রাস্তায় দাঁড় করিয়ে কোন মুখে এমন অপমানজনক আর ইতর প্রস্তাব দিতে পারেন? রাগে সমস্ত শরীর জ্বলে গেল, শক্ত হয়ে উঠল। এক ঝটকায় নিজেকে ওঁর বাহুবন্ধন থেকে মুক্ত করে নিল।

“ইতর কোথাকার!” বলেই মনে মনে আরও গালাগালি মনে করার চেষ্টা করতে লাগল। জেরাল্ঙকে লিঙ্কন, ম্যাকিনটশ এদের সম্বন্ধে যে সব গালাগালি দিতে শুনেছে, কিন্তু কিছুই মনে পড়ল না। “জঘন্য, নোংরা লোক আপনি, নরকের কীট !” আরও শক্ত কোনও কথা না মনে পড়ায় একটু পিছিয়ে গিয়ে হাত উঠিয়ে গায়ের সমস্ত জোর দিয়ে সপাটে ওঁর গালে একটা চড় কষিয়ে দিল।

উনি শুধু বললেন, “আহ্‌!” অন্ধকারে বেশ কিছুক্ষণ দুজনে একে অপরের দিকে চেয়ে রইলেন। স্কারলেট ওঁর গভীরভাবে শ্বাস নেবার শব্দ পাচ্ছিল। ওর নিঃশ্বাসও দমকে দমকে পড়ছিল, অনেকটা ছোটার পর যেমন হয়।

“ওরা ঠিক কথাই বলে থাকে! সবাই ঠিকই বলে আপনার সম্বন্ধে! আপনি ভদ্রলোক নন!”

“খুবই কম বললে, প্রিয়তমে আমার!”

স্কারলেট বুঝল উনি মৃদু হাস্য করছেন। চিন্তাটা ওকে তাড়িত করল।

“যান! যান! দূর হয়ে যান! এখুনি চলে যান! জীবনে আর আপনার মুখ দেখতে চাই না! প্রার্থনা করি কামানের গোলা যেন আপনার ওপর এসে পড়ে! ছিন্নভিন্ন হয়ে যাক আপনার শরীর! আমি __”

“ঠিক আছে, আর বলার দরকার নেই। মোটামুটি তুমি কী বলতে চাইছ আমি বুঝে নিয়েছি। দেশের জন্য যখন প্রাণ বিসর্জন দেব, আশা করিীসব কথা বলার জন্য তখন তোমার অনুতাপ হবে।”

স্কারলেট বুঝল পেছন ঘুরে ওয়াগনের দিকে ফিরে যেতে যেতে উনি হাসছেন। বুঝতে পারল ওখানে গিয়েও উনি মৃদুস্বরে কথা বলছেন। ওঁর কন্ঠস্বর একেবারে বদলে গেছে। সৌজন্যমূলক, সম্ভ্রমপূর্ণ। মেলানির সাথে উনি এভাবেই কথা বলেন।

“মিসেজ় উইল্কস?”

প্রিসি ভয়ার্ত গলায় ওয়াগনের ভেতর থেকে জবাব দিল।

“হে ভগবান, ক্যাপটেন বাটলার! মিস মেলি ওইখানে অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছেন।”

“মারা যাননি তো? নিঃশ্বাস নিচ্ছেন তো?”

“হ্যাঁ, স্যার, নিঃশ্বাস নিচ্ছেন।”

“সেটা মন্দের ভাল। এত ব্যথা জেগে থাকলে উনি সহ্য করতে পারতেন কিনা জানিনা। ওঁর যত্ন করবে। এই নাও টাকাটা তোমার জন্য। আর একটা কথা। তুমি যতটা বুদ্ধু, তার থেকেও বেশি বুদ্ধু হবার চেষ্টা কোরো না।”

“হ্যাঁ স্যার, ধন্যবাদ স্যার।”

“বিদায় স্কারলেট।”

স্কারলেট বুঝতে পারল উনি ওর দিকে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন, কিন্তু ঘেন্নায় কোনও কথা বলল না। ঘেন্নায় ওর মুখ থেকে কোনও কথাই বেরোল না। নুড়ি পাথরের ওপর ওঁর পায়ের শব্দ শোনা গেল। ওঁর চওড়া কাঁধ অন্ধকারে মালুম হল। পরের মুহুর্তেই বুঝতে পারল উনি চলে গেছেন। বেশ কিছুক্ষণ পায়ে চলার আওয়াজ শোনা গেল, তারপর সেটাও দূরে মিলিয়ে গেল। কম্পিত বক্ষে মন্থর পায়ে ওয়াগনে ফিরে এল।

এমন একটা পাগলামির লড়াইতে – যেটা কিনা হেরেই যাওয়া হয়েছে – এই অন্ধকার ঠেলে উনি চলে গেলেন? কী আশ্চর্য! এই মানুষটা – যাঁর ঐশ্বর্যের সীমা পরিসীমা নেই – মহিলাসঙ্গ ছাড়া যাঁর চলে না – ভাল খাবার, ভাল মদ, নরম বিছানা ছাড়া থাকতে পারেন না – অত্যন্ত বিলাসী আর আড়ম্বরপূর্ণ জীবনযাপনে অভ্যস্ত – কী ভেবে উনি চলে গেলেন? এতদিন তো উনি এই সব লড়াকু জোয়ানদের নিয়ে ব্যঙ্গ করে এসেছেন। দিনের পর দিন ওরা না খেয়ে থাকে, শ্রান্তি, ক্লান্তি আর বিচ্ছেদ ওদের চিরদিনের সঙ্গী! সেই পথের শেষে কী আছে, কেউ বলতে পারে না! হয়ত মৃত্যুই! কী প্রয়োজন ছিল এমন নিরাপদ আশ্রয় ছেড়ে চলে যাওয়ার? তবু চলে গেলেন! আর ওকে এই অন্ধকার রাতে একা হাতে ইয়াঙ্কিদের মোকাবেলা করার জন্য!

গালিগুলো সব মনে পড়ে গেল। হঠাৎ করেই। কিন্তু তখন বড় দেরি হয়ে গেছে। উনি শুনতে পাবেন না। ঘোড়া থেকে নেমে, ঘাড়ের ওপর মাথা রেখে, ও ঝর ঝর করে কেঁদে ফেলল।

1 টি মন্তব্য: