শনিবার, ১৫ মে, ২০২১

মোস্তাক শরীফের গল্পঃ মীমাংসা


গত সাতদিনে এ নিয়ে এগারোবার তার সঙ্গে আলোচনা করতে এল গ্রামের মানুষেরা।

তারা কখনও একসঙ্গে আসে না। প্রথমে দু-তিনজন, তারপর পাঁচ-ছ’জন এবং তারপর একসঙ্গে জনা পনের। বাড়ির সামনে উদ্দেশ্যহীনের মতো দাঁড়িয়ে থাকে, খুশখুশ করে কাশি দেয়, নিজেদের মধ্যে নিচুগলায় আলাপ করে। সে বুঝতে পারে, তাকে কী বলবে সে পরামর্শ সেরে নিচ্ছে নিজেদের মধ্যে। বাতি বন্ধ করে চুপচাপ বসে থাকে সে। ইদানিং বাতি খুব কমই জ্বালায়। ঘটনা এই নয় যে তেল শেষ হয়ে গেছে। আসলে আলোর চেয়ে অন্ধকারই ভালো লাগে। প্রশ্ন উঠতে পারে, সারাদিন এবং রাতেরও অনেকটা সময় বাতি বন্ধ করে সে কী করে? এ প্রশ্নের সহজ উত্তর হতে পারে, সে ঝিমোয়। তবে উত্তরটা আসলে এত সহজ নয়। কারণ তাকে দেখতে আয়ুষ্কালের শেষ প্রান্তে চলে আসা ঝিমুনিরোগে আক্রান্ত কোনো মোরগের মতো দেখালেও পারতপক্ষে সে ঝিমোয় না। সত্যি বলতে কী, সর্বশেষ কবে ঝিমিয়েছে সেটিও তার স্পষ্ট মনে পড়ে না। বস্তুত বহুদিন সে ঠিকমতো ঘুমায়ও না। বার্ধক্য প্রথম যে ক্ষতিটা করেছে সেটি হচ্ছে ঘুম কেড়ে নেয়া। এখন আর ঘুমায় না সে। খাটে আধশোয়া হয়ে বসে দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে থাকে। যে খাটের কথা বলা হচ্ছে সেটি তার ঊর্ধ্বতন চতুর্থ পুরুষের কেনা, কেউ কেউ বলে সুদূর বার্মা থেকে নিয়ে আসা। না, কাঠগুলো নয়, সরাসরি খাটটিই নিয়ে আসা হয়েছে। গড়পড়তা খাটের মতো নয় এর মাপ, দৈর্ঘ্যে সাড়ে আট ফুট, প্রস্থে সোয়া পাঁচ ফুটের মতো। অনায়াসেই দু-তিনজন পাশাপাশি শুতে পারে, তবে এ খাটের ইতিহাসে একজনের বেশি মানুষ কখনও শোয়নি এতে। তার প্রপিতামহ, পিতামহ, পিতা এবং হিসাবহীন বিগত অনেকগুলো বছর ধরে সে। তেল চিটচিটে তোশকটি কবে পাতা হয়েছে তার মনে নেই। খাটের পায়াগুলো লৌহদণ্ডের মতো, কালো এবং পিচ্ছিল। মাথার দিকে অর্ধগোলাকৃতি আরেকটি কাষ্ঠখণ্ড নিপুণভাবে সংযুক্ত, যাতে আছে নানারকম নকশা। খেয়াল করে দেখলে তার মধ্যে মাথায় ফুলগোঁজা অরণ্যবাসী নারী, হাস্যমুখ শিশু এবং শালপ্রাংশু শরীরের যুবকদের মুখ দেখা যায়। এ থেকে ধারণা করা দোষণীয় হবে না যে এই খাটটি যিনি নকশা করেছিলেন তিনি অরণ্যকে ভালোবাসতেন।

গ্রামের মানুষেরা বাইরে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করছে। গত দশদিনে এক মুহূর্তের জন্যও বাইরে যায়নি, তবু সে জানে আজ অমাবশ্যা। ঘরভর্তি যার অন্ধকার তার কাছে বাইরের অমাবশ্যার তেমন কোনো আবেদন থাকার কথা নয়, তবু আকাশভর্তি মাইল মাইল অন্ধকারের কথা ভেবে সে আবেগাক্রান্ত হয়। বস্তুত শৈশব থেকেই আলোর চেয়ে অন্ধকারের সঙ্গেই তার সখ্য বেশি। তার মনে পড়ল বৃদ্ধ পিতামহের সঙ্গে ঘন্টার পর ঘণ্টা পায়ে হেঁটে পাহাড়ে বেড়ানোর কথা। সন্ধ্যার ঘনায়মান অন্ধকারে পাহাড়কে মনে হতো সুদূর অতীতের কোনো স্মৃতিচিহ্ন। পাহাড়ের আনাচে কানাচে বুনোলতা খুঁজে বেড়াতেন তার পিতামহ, কাঙ্ক্ষিত লতা বা গুল্মটি পাওয়ার পর বৃদ্ধের চেহারায় খেলা করত সন্তুষ্টি, তাঁর বলিরেখাময় কপাল চন্দ্রলোকে চিকচিক করত, পিতামহের তৃপ্তি স্পর্শ করত পৌত্রকেও। কেন হাসছে না বুঝেই হাসত সে। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পাহাজের ভাঁজ ও খোঁড়লে আটকে থাকা অন্ধকারকে আরো ঘনসংবদ্ধ মনে হতো, দীর্ঘক্ষণ সেখানে কাটিয়ে তারা যখন ফিরত অন্ধকার তখন আরো নিবিড় ও স্বয়ম্ভু হয়ে প্রকৃতিকে পুরোপুরি করায়ত্ত করে নিয়েছে।

দরজায় টোকা পড়ল। বস্তুত প্রথম পদশব্দটি পাওয়ার পর থেকেই উৎকর্ণ হয়ে এ টোকারই অপেক্ষা করছে সে। শুরুর বিব্রতভাবটি কেটে যাওয়ার পর আলোচনা করতে আসা মানুষগুলো ক্রমে সাহসী
হয়েছে। হতে পারে অন্ধকারে দীর্ঘ অস্বস্তিকর অপেক্ষা তাদের মধ্যে দরজায় করাঘাতের জন্য যথেষ্ট
আত্মবিশ্বাস তৈরি করেছে। অবশ্য নিচুগলায় নিজেদের মধ্যে আলাপচারিতাও আত্মবিশ্বাস জোগানোর
ক্ষেত্রে সাহায্য করেছে। দরজায় আঘাত করার আগ পর্যন্ত গোটা ব্যাপারটাই ছিল অনিশ্চিত। আলোচনা হতে পারত, নাও হতে পারত। কিন্তু টোকা দেয়ার মাধ্যমে এ সংক্রান্ত যাবতীয় অনিশ্চয়তার অবসান ঘটল। আপাতত। অর্থাৎ গত সাতদিনে একাদশবারের মতো।

বরাবরই দরজা খুলতে সময় নেয় সে। আজও নিল। ঘরের কোনায় উঁচু টেবিলে রাখা জগ থেকে পানি ঢালল গ্লাসে, ঢকঢক করে পানি খেল, শব্দ করে হাঁটাহাঁটি করল খানিক, অনর্থক টেবিল চেয়ার আগুপিছু করল, গলা খাঁকারি দিল, হুড়কোতে জং ধরে চিরস্থায়ীভাবে আটকে যাওয়া পেছনের জানালা ঠেলাঠেলি করল, তারপর যখন বুঝল এরপর আর সময় নষ্ট করার উপায় নেই তখন দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এল।

ঘন অন্ধকারের মধ্যে আলাদা করে চেনা যাচ্ছে না কাউকে। হেমন্তের শুরু এখন। সেভাবে শীত পড়তে শুরু করেনি, তবু জটলা করে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষদের কারো কারো গায়ে চাদর। এমনকি কানটুপি দিয়ে মুখমন্ডল প্রায় ঢেকেও ফেলেছে দু-চারজন। অন্ধকারের কারণে আলাদা করে কাউকে চেনা যাচ্ছে না, তবে গ্রামপ্রধানের চৌকোনা চেহারাটি আঁচ করা যাচ্ছে ঠিকই। জটলার মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে সে, নিচুগলায় শলা-পরামর্শ করছে কারো সঙ্গে, হাতদুটো অনাবশ্যকভাবে বুকে ভাঁজ করা। চৌকাঠে খানিকক্ষণ অনড় দাঁড়িয়ে থেকে আগতদের জরিপ করল বৃদ্ধ, তারপর খসখসে গলায় শুধালো, ‘কী চাও তোমরা?’

হতে পারে শ্লেষ্মার কারণে তার প্রশ্নটি পরিষ্কারভাবে শোনা যায়নি অথবা প্রথম কে কথা বলবে সেটি
সাব্যস্ত করতে দেরি হওয়ায় অস্বস্তিকর একটি নীরবতা নামল। তবে প্রশ্নটি দ্বিতীয়বার করার আগেই
জটলা থেকে নিজেকে আলাদা করল গ্রামপ্রধান, গলা খাঁকরাল, তারপর বলল, ‘প্রতিবার যে কথাটি বলি সেটি বলার জন্যই এসেছি আমরা। আপনি জানেন আমরা কী চাই।’

‘এবং এটাও জানো, আমি কী চাই। এর আগের দশবার একই উত্তর দিয়েছি, এবার সেটি ভিন্ন
হওয়ার কোনো কারণ ঘটেছে কি?’

‘কিন্তু যে গ্রামে আপনার জন্ম, যার শস্য-জল-আলো-হাওয়া আপনাকে বাঁচিয়ে রেখেছে, যেখানে
সারাজীবন কাটালেন তার প্রতি কি আপনার কোনো দায়বদ্ধতা নেই?’

‘তার আগে আমাকে জানতে হবে দায়বদ্ধতার সংজ্ঞা তোমাদের কাছে কী? হতে পারে আমরা সম্পূর্ণ
ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গী থেকে একই ব্যাপারকে দেখছি।’

প্রশ্ন আর উত্তর, যুক্তি-পাল্টা যুক্তি, মত এবং পাল্টা মতের যে নিস্ফল পরম্পরা দু’পক্ষ গড়ে তুলেছে
সেটি এবারও অব্যাহত থাকার পুরো আশঙ্কাকে ঘাড়ে নিয়েই গ্রামপ্রধান বলল, ‘প্রতি শীতে একই অনুরোধ নিয়ে আপনার কাছে আসি, প্রতিবার একইভাবে আমাদের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করছেন। কিন্তু ছেলেমানুষী জেদ ছাড়া যুক্তিসঙ্গত কোনো কারণ দেখাতে পারছেন না। আপনি কি চান
আপনার অসহযোগিতার কারণে আমাদের জীবন বিপন্ন হোক?’

‘আমার কাছে আমার জীবনও মূল্যবান। তোমরা কেন চাইছ আমার জীবন বিপন্ন হোক?’

শুরুর অস্বস্তি ঝেড়ে ফেলে গ্রামপ্রধানের কণ্ঠস্বর এখন অনেক জোরালো। আত্মবিশ্বাস আর আবেগ
ছলকে পড়ছে তার গলা থেকে, ‘কত বয়স হলো আপনার? কেবল এ গ্রাম কেন, আশেপাশের দশটি
গ্রামেও আপনার বয়সী কেউ নেই। গ্রামের সবচেয়ে শক্তপোক্ত বাড়িটা আপনার, আঙ্গোরা ছাগলের
লোমে বানানো আপনার কম্বলটি দশ গ্রামের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর আর আরামদায়ক। একা এত বড় বাড়িতে থাকেন, অথচ দশজন লোক অনায়াসে থাকতে পারবে এখানে। জীবনে আর কী পাওয়ার
আছে আপনার? আরাম-আয়েশ, ভালো খাবার, এসবের কোনো আকর্ষণ তো আপনার থাকার কথা
নয়?’

জবাব দেবার আগে লম্বা একটা দম নিল বৃদ্ধ। ‘আগেই বলেছি, তোমাদের আর আমার দৃষ্টিভঙ্গী এক নয়। অধিকার আর দায়িত্ববোধের সংজ্ঞা তো নয়ই। আচ্ছা, তোমার প্রশ্নের জবাব দেয়ার আগে আমি একটা প্রশ্ন করি। আজ যদি তোমার বাবা থাকত আমার জায়গায় তাহলে কী করতে?’ 
জবাব দেয়ার আগে এক মুহূর্তও ভাবল না গ্রামপ্রধান, ‘কেবল আমার বাবা কেন, আশেপাশের দশ গ্রামের মধ্যে আপনার সমান আয়ু আর কেউ পায়নি। সত্যি বলতে কী, এত বছর যে বেঁচে থাকা সম্ভব সেটিই আমাদের ধারণায় ছিল না। সর্বশেষ প্লাবন, সর্বশেষ গোত্রযুদ্ধ এমনকি সর্বশেষ মহামারীরও আগে আপনার জন্ম। ইতিহাসের কোন ঘটনা যে আপনার জীবৎকালে ঘটেনি সেটিই এক রহস্য বটে। অতএব আমার বাবা বা আর কারো বাবার তুলনা এখানে অপ্রাসঙ্গিক।’

থমথমে মুখে চুপ করে রইল সে, বলিরেখাময় তার চেহারায় প্রবল এক বিষাদের ছায়া ধীরে ধীরে
ডালপালা মেলছে। ‘তাহলে আমাকে কী করতে বলো তোমরা?’

‘আপনি প্রব্রজ্যায় যাবেন। এ ঘর, আরামদায়ক এসব পোশাক-আশাক, এমনকি খাবারদাবার সব ফেলে যেতে হবে। আপনার এ ঘরে আমরা গৃহহীনদের আশ্রয় দেব। আপনার সামান্য এই ত্যাগের বিনিময়ে অসহায় মানুষদের উপকার হবে, কাজেই এ দান চরম গৌরবের।’

ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল সে, যেন গ্রামপ্রধানের যুক্তি বুঝতে পারছে না। ‘একজন বৃদ্ধের জীবন এবং গৃহহীনের জীবন, কোনটার মূল্য বেশি বলে তুমি মনে কর?’

‘আমি একজন গৃহহীনের কথা বলছি না, বলছি একাধিক, সম্ভবত এক ডজন গৃহহীনের জীবন।
আপনি নিশ্চয়ই স্বীকার করবেন, একের স্বার্থের চেয়ে বহুর স্বার্থ উর্ধ্বে?’

‘সে বিষয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই আমার। কিন্তু আমি বলতে চাইছি অন্য কথা। তোমরা কি নিশ্চিত যে বৃদ্ধ একজন মানুষকে গৃহহীন করে সম্পূর্ণ অরক্ষিত অবস্থায় প্রকৃতির খেয়ালখুশির হাতে ছেড়ে দেয়াটা মানবিক? তোমরা কি নিশ্চিত যে এটি হত্যাকাণ্ড নয় প্রকারান্তরে? হত্যাকে কীভাবে ন্যায্যতা দাও তোমরা? কোন যুক্তিতে?’

প্রতিবার এ জায়গাটিতে এসে আলোচনা থমকে যায়, কারণ গ্রামপ্রধান বা আর কেউ বৃদ্ধের এ প্রশ্নের সন্তোষজনক কোনো উত্তর দিতে পারে না। তবে পথের মধ্যে গোঁ ধরা পাথরের মতো অনড় পড়ে থাকা এ প্রসঙ্গটিতে আজ আটকে না থাকার সংকল্প নিয়ে এসেছে গ্রামপ্রধান।

‘আমরা ব্যাপারটিকে সেভাবে দেখছি না। আমরা বলছি এ গ্রাম, যা আপনাকে অন্ন আর আশ্রয় দিয়েছে, দিয়েছে নিরাপত্তা, সুখ আর শান্তি, তার প্রতি আপনার দায়িত্ব আছে এবং আমাদের বিবেচনায় সে দায়িত্ব হলো অন্যদেরও অন্ন, আশ্রয়, নিরাপত্তা, সুখ ও শান্তিদান। আপনার মতো প্রাজ্ঞ একজনের কাছে আমরা স্বার্থপরতা আর সংকীর্ণতা চাই না, চাই উদারতা।’

বৃদ্ধ কোনো উত্তর দেবার আগেই জটলা থেকে বেরিয়ে এল আরেকজন, গ্রামপ্রধানের চেয়ে অনেক বয়স্ক, গ্রামের একমাত্র মশলার দোকানটি তার। গায়ের চাদরটি টেনেটুনে সে বলল, ‘ব্যাপারটিকে আপনি এভাবে দেখছেন কেন? প্রব্রজ্যায় যাওয়ার মানেই মৃত্যু নয়। এমনও হতে পারে এখন যেভাবে আছেন তার চেয়েও ভালোভাবে বেঁচে থাকলেন? হয়তো কম্বলের ওম পাবেন না, বিশাল ঘরে থাকার
আরাম পাবেন না, কিন্তু কম্বলের ওম কি কাউকে শান্তি দিতে পারে যখন অসহায় মানুষ আশ্রয়ের
সন্ধানে ঘুরে বেড়ায়?’

নিজের বক্তৃতার সৌন্দর্যে লোকটা নিজেই মুগ্ধ হয়ে গেল। জটলার মানুষেরাও প্রশংসার চোখে তার দিকে তাকায়। তারা জানত না এমন গুছিয়ে, যুক্তি দিয়ে কথা বলতে পারে সে। সত্যিই, তাদের কেউ কেউ ভাবে, প্রয়োজন কীভাবে মানুষের অন্তর্নিহিত প্রতিভাকে বের করে নিয়ে আসে!

বৃদ্ধকে অস্থির দেখায়। অন্তবিহীন এই আলোচনা, যুক্তি-পাল্টা যুক্তির খেলা তাকে ক্রমশ ক্লান্ত করে তুলেছে। কিন্তু গ্রামবাসীর কাছে নিজের দুর্বলতা প্রকাশ না করার সিদ্ধান্ত নেয় সে। জানে, এ অপেক্ষাতেই আছে তারা। সেজন্যই ঢেউ যেভাবে বারবার দল বেঁধে সমুদ্রতটে আসে সেভাবেই আসছে ক্রমাগত। বস্তুত তার এবং গ্রামবাসীর সংকল্পের মধ্যে এক লড়াই এটি, কে জিতবে কে হারবে জানে না কেউ। তবে বিনা যুদ্ধে হাল ছাড়ার পরিকল্পনা কারও নেই, এটি পরিষ্কার।

এবার মুখ খুলল দীর্ঘদেহী এক তরুণ, যাকে আগে কখনো দেখেনি বৃদ্ধ। তরুণদের প্রায় কাউকেই চেনে না সে, এমনকি জানে না তাদের পিতা বা পিতামহের পরিচয়ও। বস্তুত, তরুণদের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া বহু আগেই বন্ধ করে দিয়েছে সে। পিতামহের সঙ্গে পাহাড়ে বেড়াতে যাবার দিনগুলো এখনও জ্বলজ্বলে তার মনে, কিন্তু এখন, এ সময়ে কেউ আর পৌত্র বা দৌহিত্রকে নিয়ে পাহাড়ে বেড়াতে যায় কিংবা ফুল-পাখি-লতা-গুল্ম চেনায় কিনা সে জানে না। আগ্রহও বোধ করে না জানার। তার শৈশব আর বর্তমানের মধ্যে বিশাল ও অনতিক্রম্য ব্যবধানকে সে মেনে নিয়েছে। সে জানে, কোনো শিশুরই আর পিতামহের সঙ্গে পাহাড়ে যাওয়া হবে না।

মশলাদোকানির মতো উঁচুগলায় নয়, ধীর আর শান্ত উচ্চারণে কথা বলল যুবক। ‘আমরা জানি আপনি ভাস্কর্য তৈরি করতে পছন্দ করেন (যুবকের এটি জানার কথা নয়, সবিস্ময়ে ভাবল সে), অনেক বসন্ত আগে আপনার পাহাড়ি ঈগলকে পোষ মানানোর গল্প লোকের মুখে মুখে ফেরে এখনও।’

‘এসব গল্পকথা আমি নিজেই ভুলে গেছি,’ কণ্ঠস্বরে বিরক্তির ভাব চাপা দিতে পারে না বৃদ্ধ। ‘কী বলতে চাও সেটি সোজাসাপ্টা বলো।’

‘আত্মত্যাগ,’ আকস্মিক বাধা পেয়ে খানিক বিপর্যস্ত বোধ করলেও যুবক আত্মবিশ্বাসী গলায় বলে,

‘আপনার কাছে আত্মত্যাগ চাই আমরা।’

‘আমার জীবনকে ব্যয়যোগ্য মনে হচ্ছে তোমাদের? ব্যবহার শেষে ফেলে দেয়া থলের মতো?’

‘অর্জনে পরিপূর্ণ জীবন আপনার। কোনো অতৃপ্তি থাকার কথা নয়।’

‘অতৃপ্তির কী জানো তুমি হে?’ উত্তপ্ত শোনায় বৃদ্ধের গলা, ‘তৃপ্তি কাকে বলে আর কাকে বলে অতৃপ্তি সেটি বোঝার বয়স তোমার হয়নি।’

‘আমি জানতে চাই এ জীবনে আর কী অর্জনের ইচ্ছে আছে আপনার? আর ক’টি ভাস্কর্য তৈরি করতে চান? আর ক’টি ঈগলকে পোষ মানাবেন? নাকি আবারও কালোকেশী কিংবা পিপুলের খোঁজে চষে বেড়াবেন পাহাড়ে?’

‘আমার কোনো অর্জনের দরকার নেই,’ মেজাজ শান্ত রাখার চেষ্টা করল বৃদ্ধ, ‘এসবের কিছুই করব
না আমি।’

‘তাহলে?’ যুক্তির যুদ্ধে জয় সময়ের ব্যাপার মাত্র, এমন এক ভাব করে উদগ্রীব বলায় বলল যুবক,

‘জীবনের বাকি সময় কী করার পরিকল্পনা আপনার?’

‘কিছুই না। বেঁচে থাকার যৌক্তিকতা প্রমাণের জন্য তোমাদের যদি ঈগলকে পোষ মানানো কিংবা ভাস্কর্য তৈরির মতো পরীক্ষা দিতে না হয় তাহলে আমাকে কেন দিতে হবে? এটা কি এজন্য যে তোমাদের আগে পৃথিবীতে এসেছি আমি? কেবল আগে জন্ম নেয়ার অপরাধে দড়াবাজিতে নামতে হবে আমাকে? প্রমাণ করতে হবে আসলেই আমি বেঁচে থাকার যোগ্য?’ তীব্র ক্ষোভ যেন উপচে পড়ে বৃদ্ধের গলায়। নিজের অজান্তেই এক পা পেছনে হটে যায় যুবক। অন্যরা তাকিয়ে আছে পাথরের মতো মুখ করে।

‘তুমি কি বাঁচতে চাও বাছা?’, হঠাৎ নরম শোনাল বৃদ্ধের গলা।

‘চাই,’ বুক টানটান করে বলল যুবক।

‘আমিও চাই। তোমার বাঁচা যদি অপরাধ না হয় তাহলে আমারটা কেন হবে?’

‘আমাদের তুলনা চলে না,’ যুবককে অসহায় দেখায়। ‘আমার জীবন সবে শুরু হয়েছে, আর আপনি সমৃদ্ধ, সুন্দর, পরিপূর্ণ একটি জীবন কাটিয়েছেন। তাছাড়া,’ সমর্থনের আশায় আশেপাশে তাকায় সে, ‘প্রব্রজ্যায় যাওয়া মানেই যে নিশ্চিত মৃত্যু তাওতো নয়। আমাদের যে কেউ আপনার আগেই মারা
যেতে পারে।’

‘জুয়াটা খেলতে চাই না আমি,’ তিক্ত একটা হাসি মুহূর্তের জন্য দেখা দিয়েই মিলিয়ে যায় বৃদ্ধের ঠোঁটে।

যুবককে একপাশে সরিয়ে দিয়ে সামনে বাড়ে গ্রামপ্রধান। ‘শীত আসছে। গত শীতে নীলদিঘির পাশে মরে পড়েছিল গৃহহীন এক মানুষ, কেউ জানে না কে সে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে এবারের শীত হবে তার চেয়েও কঠিন। আপনি নিশ্চয়ই চান না আশ্রয়ের অভাবে মারা যাক গৃহহীন মানুষ?’

‘কারো মৃত্যুই চাই না আমি,’ বলল বৃদ্ধ। ‘কারো’ শব্দটিতে জোর দিল, যাতে তার উত্তরের নিহিতার্থ নিয়ে সন্দেহ না থাকে কারো মনে।

‘তাহলে গৃহহীন,আশ্রয়হীন, সম্বলহীন মানুষদের বাঁচানোর জন্য কী করা উচিত?’ গোত্রপ্রধানের গলায় ক্ষোভ ও অসহায়ত্ব।

‘সেটা আমি বলতে পারব না। তোমরা আসতে পার।’

‘আপনি নিশ্চিত থাকতে পারেন আবার আসব আমরা,’ দরজা বন্ধ করে দেবার আগে গোত্রপ্রধানের

ক্ষুব্ধ, গনগনে গলা শুনতে পায় বৃদ্ধ।

বন্ধ দরজায় পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে বৃদ্ধ। টের পায়, মানুষগুলো চলে যাচ্ছে ধীর পায়ে। ধূসর কোনো প্রেতের মতো তাদের এক এক করে গিলে নিচ্ছে অন্ধকার। সমুদ্রতটে মাথা কুটে মরা ঢেউয়ের কথা আবারও মনে হয় তার। এবং শৈশব ও যৌবনের অসংখ্য ছবি তার চোখের সামনে দিয়ে ভেসে যেতে থাকে। দীর্ঘ একটি জীবন যে সে যাপন করেছে এক মুহূর্তের জন্যও মনে হয় না বৃদ্ধের, বরং শৈশব ও কৈশোরের দিনগুলোকে ভীষণ সাম্প্রতিক আর নিকটবর্তী মনে হয়, এমনকি গতকালের চেয়েও। গতকাল বা তার আগের দিন কী করেছিল মনে পড়ে না, কিন্তু পিতামহের সঙ্গে পাহাড়ে ঘুরে বেড়ানো কিংবা বহুবর্ণা প্রজাপতি দেখে বিস্মিত হবার কথা স্পষ্ট মনে পড়ে। ‘কখনও ভাবিনি বেঁচে থাকার যৌক্তিকতা প্রমাণের জন্য তর্কযুদ্ধে নামতে হবে আমাকে,’ বিস্ময়ের সঙ্গে বিড়বিড় করে বৃদ্ধ। গ্রামপ্রধানের ধারালো চোখ, মশলাদোকানির উত্তেজিত অঙ্গভঙ্গি আর দীর্ঘদেহী তরুণের আত্মবিশ্বাসী চেহারা চোখে ভাসে তার। এবং বিষম ক্লান্তিবোধ করে হঠাৎ। গ্রামবাসীর সঙ্গে যুক্তিতর্কের খেলা পরবর্তীবারও অমীমাংসিত থাকবে কিনা তা নিয়ে এই প্রথম কিছুটা সংশয়বোধ হতে থাকে তার।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন