সোমবার, ২৬ জুলাই, ২০২১

মিয়েকো কাওয়াকামি'এর গল্প: লজ্জা



অনুবাদ- ফারহানা আনন্দময়ী
 
নারুমির স্বপ্নে প্রায়ই সেই ‘আমি’টা আসে, যে আমিটায় প্রাণ ছিল। পনের বছর বয়সী সেই নারুমি। তখন ওর হাত-পাগুলো ছিল দারুণ সুন্দর আর ছিল মেদহীন পেট, ছবি-আঁকার কাগজের মতো মসৃণ, সমান। সে যখন একটু বাঁকা হয়ে ঝুঁকতো, ওর কাঁধের আর মেরুদণ্ডের হাড়ের খাঁজটা দারুণভাবে ফুটে উঠতো। একটা হরিণশিশুর প্রাণশক্তি ওর মধ্যে ছিল, একটুও ক্লান্ত না হয়ে অনেকটা পথ দৌড়ে যেতে পারতো সে। ওর স্ফিত স্তন আর স্তনবৃন্তের রঙ ছিল দারুণ চোখকাড়া, প্রশ্নহীন সুন্দর। কোমরের বাঁক আর ওর উরু আর বাহুতে যে ঔজ্জ্বল্য খেলা করতো, তার ঠিকরে-পড়া আভা নারুমির উজ্ব্বল আগামীকেই ইঙ্গিত করতো। সেই নারুমি যা ইচ্ছে তাই করতে পারে, যেখানে যেতে মন চায়-সেখানেই যেতে পারে। ওকে কেউ আঘাত দিতে পারে না, সে-ও কাউকে কষ্ট দেয়ার মানুষ নয়। ওর স্বপ্নের সেই নারুমি একেবারেই অনন্য।
শরীরটা ছিল ওর কিন্তু ওর দেহসৌন্দর্য কখনোই যেন তার নিজের মালিকানাধীন ছিল না। বাইরের মানুষেরা ওকে সারাক্ষণই মনে করিয়ে দিতো, সেই সৌন্দর্য ভোগ কিংবা উপভোগের একমাত্র অধিকারী তারা। তারা এ দৃষ্টিভঙ্গি নারুমিকে প্রকাশ্যে জানাতো, ইঙ্গিত করতো আড়ালে, মৃদুস্বরেও বলতো, আগ্রাসীভঙ্গিতেও বলতো। ওর সৌন্দর্য নিয়ে মানুষের এই আদিখ্যেতা নারুমির অন্তর্গত কোনো চিন্তাচেতনায় আঁচড় কাটতো না। ওদের সকল মনযোগ যেন নারুমির আবেদনময় শরীরীসৌন্দর্যের প্রতি! নারীশরীরটাই ওদের কাছে মূখ্য, নারুমি নামের মানুষসত্তাটা একেবারেই গৌণ সেই সমস্ত উৎসাহী মানুষগুলোর কাছে। এক মুহূর্তের জন্যও নারুমিকে ওরা ভাববার সেই ফুরসত দিত না- নারুমি প্রথমত একজন মানুষ, এবং এই শরীরটা ওর। নারীদেহের সৌন্দর্যের মহিমায় ওকে এতটাই আচ্ছন্ন করে রাখতো সকলে, নারীসত্তার বোধের অতল প্রপাতে সে কেবল ভেসে যেতে থাকলো, ডুবে যেতে থাকলো অন্ধকার কুয়ায়। একফোঁটা শ্বাস নেবার জন্য ওর কী অক্লান্ত লড়াই! কিন্তু সে কেবলই ডুবে যেতে থাকলো অন্য মানুষের ইচ্ছের স্রোতধারায়। কখনো বা যদি অনেক চেষ্টায় কুয়া বেয়ে আলোর দিকে ফিরতে চাইতো, সে অনুভব করতো, নিজেকে নিয়ে নিজের কাছে ফেরা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে। নিজেকে সে কিছুতেই নিজের ইচ্ছে বা শর্তের রোদ্দুরে শুকিয়ে নিতে পারতো না। কেবলই ভিজে স্যাঁতসেঁতে থাকা অন্যের ইচ্ছেজলে। 
 
স্বপ্নভেঙে বেরিয়ে ওর কিছুক্ষণ সময় লাগতো বাস্তবের জলহাওয়ায় নিজেকে মিলিয়ে নিতে- হাতপাগুলোয় আড়মোড়া ভেঙে, কয়েকবার করে চোখের পাতা খুলে-মেলে তবেই সে সহজ হতো। ঘুমোনোর ঠিক আগে যে হ্যামবার্গারটা ও খেয়েছিল, সেটাও কেমন পেট ভার করে রাখতো। কোনো দরকার ছাড়াই বেশিবেশি খাবার রান্না করতো সে। একবারও ভাবতো না, রয়ে-যাওয়া খাবারগুলো তো রয়েই যাবে, খাওয়ার অন্য কেউ নেই। হঠাৎ ওর চোখে পড়লো ফ্রাইয়িং প্যানে ডেমিগ্লস সস্‌টা এখনো অনেকটা লেগে আছে। একবার ভাবলো গরমভাত মাখিয়ে ওটুকুও খেয়ে নিই। কিন্তু ভাত তো ফ্রিজে, ঠাণ্ডা-শক্ত। কী আর করা! ভাত মাখিয়ে খাওয়ার চিন্তা বাদ দিয়ে আঙুল দিয়ে চেটেই সস্‌টুকু খেয়ে ফেললো ও। এরপর যথারীতি সিঙ্কে নিয়ে বাসন ধোয়াধুয়ির কাজে লেগে গেল। 
 
তা প্রায় দশ বছর হতে চললো, যখন থেকে নারুমি নিজের শরীরে স্তরে স্তরে মেদ জমতে দিতে আর নিজেকে বাঁধা দিতো না! 
 
খুব বেশি সময় নেয়নি নারুমি নিজেকে এই পর্যায়ে নিতে। ওর যখন যেটা খেতে ইচ্ছে করতো, তা সে দিনের যে কোনো সময়েই হোক, ও গোগ্রাসে খেয়ে ফেলতো সব। ওভেনের মধ্যে ময়দামেখে ব্রেড বানাতে দিলে খানিকপরে যেমন বাদামি হয়ে ফুলেফেঁপে ওঠে, নারুমির শরীরটাও সেভাবে ফুলতে লাগলো মাংস-মেদে। আশপাশের মানুষেরা একটু অস্বস্তিভরা অবাক দৃষ্টিতে নারুমিকে দেখতে শুরু করলো। কেউ কেউ টিপ্পনি কাটতো, কেউ কেউ সমবেদনা জানাতো। কিন্তু কী এক অদ্ভুত কারণে নারুমি আয়নার সামনের দাঁড়িয়ে যখন আর আগের সেই দেহবল্লরী দেখতে পেত না, সে যেন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতো। সে তার শরীরকে আরো কয়েক স্তরের মেদমাংসে স্ফীত করতে চাইতো, যেন বাইরের পৃথিবীর মানুষের সাথে ওর নিজস্ব ‘আমি’র ব্যাবধান আরো খানিকটা বাড়ে। কেউ যদি তাকে ছোঁয়ও, তার অন্তর্গত ‘আমি’কে যেন স্পর্শ করতে না পারে। নিজেকে এমন আকৃতিতে নিয়ে গেল, যে, ও যখন কাজে বাইরে বেরতো, সকলে ওর দিকে কেমন করে যেন তাকিয়ে থাকতো। আর ও সেটাই চাইতো- নিজের মধ্যে আরো, আরো বেশি ঢুকে যেতে। ঘরের যেটুকু কাজ, সে নিজেই করতো। ওর বর বেশিরভাগ সময়ে বাড়ির বাইরে কাটাতো, তবু যখন ফিরতো, তার খাবারের ব্যবস্থা ওই করতো। নয় বছরের একটা মেয়ে আছে নারুমির- একদম ওর মতোই দেখতে-শুনতে, তাকেও যত্নআত্তি করতো ও। বাকি সময়ে নিজেকে আয়নায় দেখতো শুধু, যথেষ্ট ওজন বেড়েছে কিনা, শরীরটা অনেকবেশি মাংসল হলো কিনা, সেটা নিশ্চিত হতো। প্রচুর আমিষ তো খেতোই, চর্বি, মিষ্টিজাতীয় খাবার, জুস ইচ্ছেমতো খেতো সে। আর যেটা সে সবচেয়ে বেশি করতো, তা হলো, যখনতখন ঘুম। 
 
বিকেলের দিকে অনেকগুলো শপিং ব্যাগ হাতে নিয়ে সে একটা ক্যাফেতে ঢুকলো। আজ এত জিনিস সে কিনেছে ব্যাগগুলো ফেটে পড়ছে, এখুনি ছিঁড়ে যাবে। ও ভাবলো, কিছু বাড়তি ব্যাগ নেয়া উচিত ছিল দোকান থেকে, তাহলে এমন গাদাগাদি করে জিনিস ঢুকাতে হতো না। আর জুসের একটা অফার থাকায় সেদিন জুসের বোতলেই ব্যাগ ভারি হয়েছিল বেশি- যতটা পেরেছে, জুসের বোতল নিয়েছে! 
 
সেদিন বাইরে খুব গরম ছিল। ক্যাফেতে বসে ভীষণ ঘামছিল ও। পুরু একটা ছোট তোয়ালে দিয়ে ঘাম মুছতে মুছতে সে এক গ্লাস ঠাণ্ডা দুধ আর একটা গ্রিন-টি-আইসক্রিম অর্ডার করলো। কিছু ক্যালরি শরীরে জমাতে হবে, এটাও ছিল ওর ভাবনায়। একটু দূরে একটা টেবিলে দু’জন নারী বসে গল্প করছিল। উচ্চস্বরে, বিরামহীন কথা বলছিল। ওদের সন্তানেরা বড় হয়ে গেছে, যার যার জীবনে থিতু হয়েছে, বরেরা এখন কাজে অবসরপ্রাপ্ত, তাদের সারাদিন বাড়ির আশেপাশে এলাকায় গন্তব্যহীন ঘোরাফেরা করা ছাড়া আর কোনো কাজ নেই। আর তারা, মানে, এই দুই নারী সকালে বেরিয়ে জিমে গিয়েছিল, বিকেলে ফিরতি পথে সান্ধ্যখাবার কেনাকাটা করে নেবে। মাঝখানের এই সময়টুকু এই ক্যাফেতে বসে খেজুঁরে আলাপ। দুজনের একজন বসে তার কাঁচাপাকা চুলগুলোর মধ্যে আঙুল ঘষছিল আর জোরে জোরে হাসছিল। অন্যজন আইস-টি খাচ্ছিল, খুব দ্রুতগতিতে স্ট্র নাড়ছিল আর নারুমির দিকে ফিরে ফিরে দেখছিল, অনেকটা বলিরেখা ছিল এই নারীটির চোখের পাশে। নারুমির কপালের উপর ঘামে লেপ্টে-থাকা চুল, ঘেমে চকচক করতে-থাকা চিবুক আর বগলের কাছে অনেকখানি ভিজে থাকা নারুমির টি-শার্ট, ওর বিশাল দেহ... সবটাই সেই নারী খেয়াল করে দেখছিল। খুবই অস্বস্তিকর সেই দৃষ্টি। এমনকি একটা চেয়ারে নারুমি তার অত বড় দেহটা কীভাবে এঁটে নিয়ে বসতে পেরেছে, সেটাও যেন সেই নারীর এক বিশেষ কৌতূহলের বিষয়। এসব দেখাদেখির পাশাপাশি ওরা গলা উচিয়ে গল্প করতেই লাগলো। আর ওদের আলাপের বিষয় ছিল খুব সম্প্রতি ঘটে যাওয়া একটা ধর্ষণকাণ্ড, যা পত্রিকায় আলোড়ন তুলেই ক’দিন পরে অন্য ঘটনার তলায় মিলিয়ে গিয়েছে। 
 
স্মার্টফোনটা ব্যাগ থেকে বের করে নারুমি ওর টুইটার পেজটা দেখতে লাগলো। না, ও নিজে কখনো কিছু টুইট করে না। রাজ্যের সব সেলিব্রিটিকে ফলো করে, গসিপ ম্যাগাজিন, ফুড ব্লগারস, অভিজাত গেরস্ত-স্ত্রীদের শখের ছবি এসবই দ্যাখে বসে বসে। টুইটগুলো দেখতে দেখতে ওর কান চলে যাচ্ছিলো পাশের টেবিলের আলাপে। ওরা যা নিয়ে আলাপ করছে সেটা নারুমি টুইটারে আর ট্যাবলয়েড পত্রিকায় ক’দিন আগে পড়েছে। বিষয়টা নিয়ে ওর খানিকটা জানা আছে। ওর চোখে ভাসছে সাংবাদিক-সম্মেলনে বসা সেই নারীটির মুখ, চোখের জল আটকে রাখা ভাসাভাসা দু’টি চোখ। বিখ্যাত এক টিভি সাংবাদিকের সাথে সান্ধ্যভোজে গিয়েছিল নারীটি। ওখানে ওকে কৌশলে প্রচুর মদপান করানোয় সে বেহুঁশ হয়ে পড়েছিল। আর এরপরে হোটেলে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করা হয় তাকে। ঘটনার পরে সেই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে প্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছিল বটে, কিন্তু দু’দিন না যেতেই রাজনীতির উপরতলার চাপে তাকে মুক্ত করে দেয়া হয়, অভিযোগ তুলে নিতে বাধ্য করা হয়। নিপীড়িত নারীটির সংবাদসম্মেলনটি সরাসরি দেখানো হয়েছিল মিডিয়ায়। কিন্তু কিছুদিন পরে সব চুপচাপ। কোনো পত্রিকা-মিডিয়া আর টুশব্দ করেনি এই বিষয়ে। সব ধামাচাপা পড়ে যায় কোনো এক অজানা কারণে। শুধু দু’একটা ছোটখাট অনলাইন পত্রিকা ক’দিন লেগে ছিল ঘটনার ফলোয়াপে- পরে সেটুকুও বন্ধ হয়ে যায়। 
 
“ঘটনাটা যদি সত্যিই ঘটে থাকে তাহলে সেটা ভয়ঙ্কর ব্যাপার। কিন্তু কী জানো, আমার যতদূর মনে হয়, লোকটার প্রভাব কাজে লাগিয়ে মেয়েটা নিজের কোনো কাজ হাসিল করতে চেয়েছিল। এজন্যই লোকটার সাথে বসে এভাবে মদপান করেছিল। এরকম ঘটনা হরহামেশাই ঘটে”। পাশের টেবিলে বসা নারীদের একজন বললো। 
 
“হ্যাঁ। তাইতো। একজন লোকের সাথে তুমি স্বেচ্ছায় মদপান করতে কখনোই যাবে না, যদি না তার সাথে তোমার শোবার ইচ্ছে থাকে! লোকটার কামনা তো তখন জাগবেই। আর মেয়েটার মুখ দেখলেই বুঝবে, সে ভালোমতোই জানতো, এরপরে কী হতে পারে”। 
 
“একদম সত্য বলেছো। একটু মাথা খাটালেই বোঝা যাবে, মেয়েটার শরীরীভাষা এটাই বলছিল। ও যদি এটাকে আরো শক্তভাবে, ভদ্রভাবে সামলে নিতো, তাহলে এরকম বিশ্রি ঘটনা ঘটতোই না”। 
 
“আরে, তা কী করে হবে! মেয়েটাকে দেখেই তো বোঝা যাচ্ছে, ও এইসব পেশারই মেয়ে। লোকটা ছিল ওর খদ্দের। আর সেভাবেই ঘটনা এগিয়েছে”। 
 
“ঠিক, ঠিক। মেয়েটাই ওকে ডেকে এনেছিল। আর সংবাদসম্মেলনে মেয়েটার পোশাক কেমন ছিল, খেয়াল করে দেখেছো? ব্লাউজের বোতামগুলো কতটা নিচ পর্যন্ত খোলা রেখেছিল, দেখেছো? অর্ধেক স্তন তো বের করেই রেখেছিল!” 
 
“হ্যাঁ, হ্যাঁ, আমিও দেখেছিলাম। সে ইচ্ছে করেই এরমভাবে পোশাক পরেছিল”। 
 
“তোমাকে আমি বলছি, দেখো, মেয়েটা একটা বারগার্ল। আমাদের সময়ে, আমাদের মতো মেয়েরা কখনো ওর মতো চলতো না”। 
 
ওদের এইসব আলাপ শুনতে শুনতে নারুমি ওর ঠাণ্ডাদুধের পানীয়তে ছোট করে চুমুক দিলো আর রূপালি কাটাচামচটা দিয়ে গ্রিন-টি আইসক্রিমের শক্ত টপিংটা খোঁচাতে শুরু করলো। 
 
“যা-ই ঘটুক না কেন সেই রাতে, মেয়েটার পক্ষে আর কিছুই নেই এখন”। নারুমির চেয়ারের দিকটায় যে নারী বসে ছিল, সে বললো। “কে সত্য বলছে আর কে মিথ্যা, এটা এখন আর কোনো বিষয়ই নয়। মেয়েটা নিজেই মুখ খুলেছে এবং প্রকাশ্যে বলেছে যে লোকটা তাকে ধর্ষণ করেছে। এরপরে সে শুধুই একটা বাতিল জিনিস। মানুষজন এখন শুধু তাকেই খারাপ বলবে, আর বাকি জীবনটা তাকেই এই লজ্জা বয়ে বেড়াতে হবে”। 
 
এই আলাপের মধ্যেই তাদের পানীয় শেষ হয়ে এলো আর সেইসাথে বদলে গেল আলাপের গতিপথ। এখন তারা এলাকার কোন্‌ লন্ড্রিতে নতুন কী অফার দিয়েছে সেই বিষয়ে ঢুকে গেল। 
 
নারুমির আইসক্রিমের কোটিং গলে গিয়ে উপরেরদিকে বিন্দুবিন্দু জলের ফোঁটার মতো তরল জমতে লাগলো। ও কিছুতেই চোখ সরাতে পারছিল না। ওই জলের বিন্দুগুলোর সাথে ওর ঘামবিন্দুর কোনো তফাৎ খুঁজে পাচ্ছিলো না সে। চোখের সামনের সেই বিন্দুগুলো এক থেকে অজস্র হচ্ছিলো আর প্রতিটি বিন্দুতে সে আলাদা আলাদা ছবি দেখতে পাচ্ছিলো। ছবিগুলো আদতে কিসের সেটায় ওর কোনো মনযোগ ছিল না- ঝাপসা থেকে ঝাপসাতর হচ্ছিল তারা... নারুমিও যেন অন্তহীন এক অপেক্ষায়, সময় পেরনোর। কখন যেন সে চোখ বুজে ফেললো। খুব শক্ত করে চোখটা বুজে থাকলো। ও দেখতে পেলো ওর মেদবহুল মাংসল শরীর, স্ট্রেচমার্কগুলো সেলাইয়ের লম্বালম্বা ফোঁড়ের মতো সারা শরীরজুড়ে, চামড়ার নিচে শিরাগুলো মাকড়সার জালের মতো ছড়িয়ে যাচ্ছে। ওর গায়ে স্তরে স্তরে যত বেশি মাংস জমছে, ও যেন বাইরের পৃথিবী থেকে আরও দূরে, আরো দূরে সরে যাচ্ছে। তার স্থুল দেহের আড়ালে ওর সত্তা, ওর আত্মা ঢুকে যাচ্ছে ভেতরে। ওর মনে হতে থাকে, ও নিজেকে লুকিয়ে ফেলেছে, বাইরের কেউ ওকে আর দেখতে পাচ্ছে না। সে এখন নিরাপদ অবস্থানে চলে গেছে নিজেকে নিয়ে। বিন্দুর মতো ছোট হতে হতে মিলিয়ে যাচ্ছে যেন সে। কিন্তু সত্যিটা হলো, পুরোপুরি কিছুতেই মিলিয়ে যাচ্ছে না বিন্দুটি। ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র আকৃতি নিয়েও বিন্দুটি রয়ে গেছে। আর ওরা ওকে দেখতে পাচ্ছে এখনো। নারুমি জানে না, কীভাবে ওদের দৃষ্টির আড়ালে একেবারে হারিয়ে যেতে হবে। 
 
সে কিছুতেই সেই স্মৃতির টুকরোগুলো মনে করতে পারছে না, খুব চেষ্টা করছে মনে করতে। ও যে স্মৃতিগুলোতে বাঁচতে চায়, সেগুলো হারিয়ে যায়, আর যেগুলো চায় হারিয়ে যাক, সেটাই ফিরে ফিরে আসে। কিছু স্মৃতি আছে, যা ওকে তাড়া করে ফেরে, মনে হয় পেছন থেকে কে যেন ভারী একটা বস্তা ওর মাথার ওপর চাপিয়ে দিয়েছে আর সেটাই ওকে বয়ে নিতে হচ্ছে জীবনভর। সে তখন এক অন্য সময়ে, অন্য একটা স্থানে ফিরে যায়। ওর তখন পনেরো, শীতের বিকেল, হাইস্কুলে ওঠার পরীক্ষার ঠিক আগে আগে। সারাদিন স্কুলে পড়ালেখার চাপ সেরে সেদিন ও একাই ফিরছিল বাড়ির দিকে। অন্যদিন বাইসাইকেলে ফেরে, কিন্তু সেদিন হেঁটেই ফিরছিল। খুব শীত ছিল, সাদাসাদা হিমেল মেঘ যেন ওর নিঃশ্বাসের সাথে জড়াজড়ি করে ভাসছিল, ঠিক মুখের সামনেই। ঘন জমাটবাঁধা মেঘগুলোকে ও দেখতে পাচ্ছিলো, চাইলে মুঠোবন্দি করতে পারবে এরকম মনে হচ্ছিলে। সন্ধ্যা নেমে এসেছে, রাতের গাঢ় নীল আকাশের গায়ে এরম সাদা মেঘ, কেমন একটা স্বর্গীয় অনুভুতি হচ্ছিলো ওর। ঠিক সেই মুহূর্তে কোথা থেকে একজন পুরুষ এসে দাঁড়ালো ওর পেছনে। সে বুঝতে পারলো, লোকটা ওর কাঁধের কাছে জাপটে ধরেছে আর একটু পরেই শক্তহাতে জড়িয়ে ধরেছে ওর গলার কাছটায়। আরেক হাতে নারুমির মুখচাপা দিয়ে ধরেছে। ও টের পেল ওকে জোর করে টেনে পাশের পার্কিং জায়গায় নিয়ে গেল লোকটা। ধাক্কা দিয়ে দেয়ালের সাথে লাগিয়ে দিলো ওকে। ও কোনো আওয়াজ করতে পারছে না, কিছুতেই নিজেকে মুক্ত করতে পারছে না। এরমধ্যে কেটে গেল প্রায় আধাঘন্টা। এরপরে ওকে ছেড়ে দিল লোকটা। বিধ্বস্ত অবস্থায় নারুমি আবার বাড়ির পথ ধরলো। 
 
স্নানঘরে ঢুকে জলের ঝরনাটা জোরে ছেড়ে দিলো ও, উষ্ণ জলের ধারা ওর মাথার অপর ঝরঝর করে পড়তে থাকলো। কিছুতেই থামছিল না ওর শরীরের কাঁপুনি। যতক্ষণ পর্যন্ত না ওর চিবুকের সেই চরম অস্বস্তিকর অনুভুতিটা না কমছিল, ও দু’হাতের তালু দিয়ে ঘষতেই থাকলো নিজের মুখটা। দাঁতে দাঁত চেপে মেঝেতে বসে রইলো, খুব চেষ্টা করছিল সহজভাবে শ্বাসপ্রশ্বাস নেবার জন্য। তবে কিছুতেই যোনিতে হাত দিতে সাহস পেলো না। এরপরে চারটা রাত ও ঘুমাতেই পারেনি। যতই দিন যাচ্ছিল, ওর ভাবনাচিন্তা সব ঘোলাটে হয়ে আসছিল। ওর মনে শুধু সেই দৃশ্যগুলো আসছিল ঘুরেঘুরে। কিছুতেই নিস্তার পাচ্ছিল না। এত এলোমেলো সেইসব ভাবনা যে, সে এই ঘটনার কোনো ব্যাখ্যা নিজে বের করতে পারছিল না। অস্থির হয়ে শেষে একদিন মাকে সব খুলে বললো নারুমি। “একজন লোক সেদিন রাতে পার্কিং লটে নিয়ে গিয়ে আমাকে জোর করে স্পর্শ করেছে”। মেয়ের এই স্বীকারোক্তিতে ওর মা এতটাই হতবাক হয়ে গেল যে, কোনো উত্তরই সেই মুহূর্তে তার মুখে এলো না। যদিও মাকে এই ঘটনা বলতে নারুমিকে মানসিকভাবে নিজের সঙ্গে অনেকটা বোঝাপড়া করতে হয়েছিল, তবে বলার পরে সে যেন অনেকখানি নির্ভার হয়ে গেল। নারুমির মা খানিকটা সামলে নিয়ে মেয়েকে আশ্বস্ত করলো, ওকে আর বাড়তি কোনো প্রশ্নই করলো না। শুধু বললো, ও যেন এই ঘটনা ওর বাবাকে না বলে। মেয়ের চোখের দিকে না-তাকিয়ে সে আরো বললো, “শোনো, তুমি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছো তোমার সাথে কী ঘটেছে। এই কথা তুমি আর কাউকে বলবে না, কোনোদিন না। যদি পারো, ভুলে যেতে চেষ্টা করো। কারণ আর কেউ যদি জানে এই লজ্জার ঘটনা, তোমার বাকি জীবনটা তুমি আর কখনোই সহজভাবে যাপন করতে পারবে না”। 
 
দিন গড়াতে লাগলো। হাইস্কুলে ওঠার পরে নারুমিকে কমিউটার ট্রেনে করে প্রতিদিন স্কুলে যাওয়া আসা করতে হতো। খুব ভিড় থাকতো দেড়ঘন্টার এই যাত্রাপথে আর প্রায়ই সকালে ওকে ভিড়ের সুযোগে শারীরীকভাবে হেনস্তা হতে হতো। পুরুষগুলো ওর স্কার্টের উপর দিয়ে বা নিচে হাত ঢুকিয়ে ওর নিতম্বে চাপ দিতো, কখনো আঙুলও ঢুকিয়ে দিতো ওর যোনিতে। ওর স্তনে হাত দিয়ে চাপ দিতেও কেউ কেউ দ্বিধা করতো না। কখনো এমনও হতো, কেউ তার পুরুষাঙ্গ ওর নিতম্বে ঘষে ঘষে বীর্য ফেলে যেত! নারুমি ওর ঘাড়ের কাছে ফেলা এই কুৎসিত পুরুষগুলোর নিঃশ্বাসের মধ্যে নিজের বেঁচেথাকার ইচ্ছেগুলো ক্রমেই ধ্বংস হচ্ছে, টের পেতে থাকলো। ওর সুন্দর শরীরটা ধীরে ধীরে যেন শক্ত, রিক্ত, বিবর্ণ হয়ে উঠছিল। জীবন্ত শরীরটা মৃত শরীরের মতো পরিত্যক্ত মনে হতো ওর। নিজের শরীর দিন দিন নারুমির কাছে অচেনা হয়ে উঠলো। এ শুধু ওর একার অভিজ্ঞতা বা একার যন্ত্রণা নয়। ও জানতে পারলো, ওর বয়সী অন্য মেয়েরাও এই অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে যেতে বাধ্য হচ্ছে। এইসব পুরুষের কাছে নিপীড়নের এই পন্থা শুধুই এক বিকৃত বিনোদনের বিষয় হয়ে উঠলো। এটা যে অপরাধ, সেই বোধ ওদের নিজেদের তো ছিলই না। সমাজও ওদেরকে অপরাধীর চোখে দেখতো না। ধর্ষণ বা এই শারীরীক হেনস্তাগুলোর বিকৃতির মধ্যেই নারুমি আর ওর সহপাঠিদের জীবন এগিয়ে যেতে থাকে। 
 
ভেতরে ভেতরে মরে যেতে থাকা নারুমিকে বিয়ে করে ফেলার জন্য চাপ দিতে থাকে ওর মা-বাবা। বিয়েতে দ্বিমত করার কোনো কারণই খুঁজে পায় না ও। জীবনের প্রতি কোনো আকর্ষণই কাজ করতো না ওর। তাই ওর চেয়ে দু’বছরের বড়, দেখতে ছোটখাট, খুব কম-কথা-বলা মানুষটিকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করে না। যেহেতু লোকটা খুব কম কথা বলতো আর নারুমিকে ঘিরে তার কোনো প্রশ্ন ছিল না, এই বিষয়টা নারুমিকে বিয়ের পরে অনেকখানি স্বস্তি দিয়েছিল। নারুমির অতীত বা ওকে ঘিরে-থাকা কোনো মানুষ নিয়ে ওর বরের যে অনাগ্রহ, সেই ফাঁকটা নারুমিকে নিজের অসহ যন্ত্রণার অতীতকে ভুলতে সাহায্য করেছিল। ধীরেধীরে নিজেকে গ্লানিমুক্ত করতে সহজ করে দিয়েছিল এই বিয়েটা। 
 
প্রথমবার বরের সঙ্গে সঙ্গম করা নিয়ে একটা ভীতি কাজ করছিল ওর মনের ভেতরে। নারুমি ভেবেছিল, সেই আগের মতোই ভীষণই পীড়াদায়ক হবে এই সঙ্গম। ওকে হয়তো যন্ত্রণার চরমে পৌঁছে নিজেকে আবারো নিঃশেষ করতে হবে। একজন মানুষকে চোখখোলা রাখা অবস্থায় হত্যা করলে যে ভয়াবহ অনুভুতি হয়, নারুমির কাছে এটা অনেকটা সেরকমই। কারণ এত বছর তো তাই-ই হয়ে এসেছে। এবার ভিন্ন হবার কোনো কারণ তো নেই। এসব ভাবনাকে মগজে জমিয়ে নিজের শরীরকে পেতে দিলো তার সঙ্গীর কাছে। কিন্তু অদ্ভুত কাণ্ড! বরের সাথে সঙ্গমে তার সেই বিষাক্ত যন্ত্রণাময় স্মৃতির কোনোকিছু গ্রাস করলো না। অনুভূতিশূন্য এক সঙ্গম! না যন্ত্রণা, না আনন্দ! দু’টোর কোনোটাই সে অনুভব করলো না। আবেগহীন, অনুভুতিহীন, স্বাদহীন এক সঙ্গম। সঙ্গমকালে নারুমির শরীর না জাগলো, না মরলো। ওর মনে হচ্ছিলো, ওর শরীরটা একদলা সাদাভাত, আর তা থেকে মর্চি ভাতের পিঠায় রূপান্তরিত হলো। পাথরের উপরে রেখে কতগুলো হাত তাকে দলেমলে গোল গোল ভাতের দলায় পরিণত করলো, টুকরো টুকরো ভাগ করলো। একদম সেই অবয়বহীন, স্বাদহীন একটা ভাতের পিঠা। 
 
সঙ্গমশেষে ও যখন টের পেল কোনো যন্ত্রণা নেই, অনুভূতির কোনো রূপান্তর নেই, ভয় বা শূন্যতার বোধ থেকে সে একটা মুক্তির স্বাদ পেলো। সারাজীবনের জন্য যা ওর কাছে একটা বিশাল ভার হয়ে ছিল, সে ভার যেন নেমে গেল। যাপনের একটা নতুন স্তরে সে পৌঁছালো, যদিও তা কোনো আনন্দ বা উপভোগের বিষয় হলো না মোটেও। এই নতুন পর্বটা অদ্ভুত এক শূন্য অনুভূতির; আবেগ নেই, আনন্দ নেই। থাক, তবু এ-ও ভালো, সেই গ্লানি তো আর নেই, ভয় আর নেই। তারপরেও নারুমির গলার কাছটায় ধরে এলো, চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়তে থাকলো জলের বিন্দু। 
 
বিয়ের পরে এভাবে কিছুমাস কাটানোর পরে একদিন ওর বর আর পারলো না, নিজের অতৃপ্তির বা বিরক্তির কথা নারুমিকে জানালো।

“আচ্ছা, তুমি কি আরেকটু লজ্জালজ্জাভাব করতে পারো না সঙ্গমের সময়ে? আমি তো জানি, মেয়েরা এ সময়টাতে এরকমই করে। তুমি এত বেশি নির্লিপ্ত থাকো যে আমার শরীর কোনোভাবেই সাড়া পায় না। ইচ্ছে না করলে একটু উত্তেজনার অভিনয়ও তো করতে পারো ওই সময়টাতে, তাতে বোঝোই তো, আমার ওটা শক্ত হতে সুবিধা হয়। প্লিজ...” 
 
নারুমি হাতে অনেকগুলো শপিং ব্যাগ নিয়ে হেঁটে ফিরছিল। ব্যাগভর্তি জিনিস, ভারী, ফুলে আছে। হাঁটার সময়ে ওর হাঁটুতে সেই ব্যাগগুলো বাড়ি খাচ্ছিলো। ডান, বাম, ডান, বাম... এক একবার বাড়ি লাগছে হাঁটুতে আর ওর মনে হচ্ছে, শুনতে পাচ্ছে, হাঁটো, হাঁটো, কিংবা এবার থামো, থামো। হাঁটার জেরে খুব ঘামছিল ও। সারা শরীর বেয়ে ঘাম পড়ছিল। “কে আমার এই শরীরটাকে বানিয়েছে? কেই বা হাঁটাচ্ছে? কে, কেনই বা? কেন এত ঘামে এই শরীর? সারা পৃথিবীর সকলের ঘাম কি এই শরীরেই জমে? এই শরীরের ঘামগুলো কি সবই আমার? এই শরীরটাই কি আমার?” হাঁটতে হাঁটতে এসবই ওর মনে আসছিল কেন যেন। 
 
বাড়ি থেকে একটু দূরে তখন, আর দশ মিনিটের পথ, নারুমি দেখতে পেল পার্কের মধ্যে কতগুলো ছোট ছোট ছেলেমেয়ে খেলছে। ওর মেয়েও আছে ওদের সাথে। বেশিরভাগ সময়েই বাড়ির বাইরে নারুমি বা ওর মেয়ে দুজন দুজনের সাথে দেখা হলে কথা বলে না। কিন্তু আজ নারুমিকে দেখে বাচ্চাদের একজন ওর মেয়েকে বলে উঠলো, “এটা তোমার মা না?” 
 
নারুমি শুনতে পেয়েও না-শোনার ভান করে হেঁটে এগিয়ে গেল। 
 
“ভালই হলো। তুমি তাহলে তোমার মায়ের সাথেই ফিরে যেতে পারবে”। মেয়ের একজন বন্ধু বলে উঠলো। 
 
“কী মজার দ্যাখো। দূর থেকে ওর মাকে মানুষের মতো মনে হচ্ছে না। মনে হচ্ছে বড় একটা বল। না হেঁটে ও তো গড়িয়ে গড়িয়েই যেতে পারবে”। 
 
জোরে জোরে হাসতে হাসতে আরেকটি মেয়ে বললো। 
 
“আমার মা বলেছে, তোমার মা বোধহয় অসুস্থ। দিনকে দিন সে কেবল মোটাই হচ্ছে। এত মোটা হলে তোমার মা তো আর ক’দিন পরে নিঃশ্বাস নিতে পারবে না। নড়াচড়াও করতে পারবে না। এটা একটা অসুখ। স্বাভাবিক সুস্থ মানুষের কখনো এত ওজন হয় না”। 
 
“তোমার জন্যও খুব খারাপ লাগে জানো। এটা কি তোমাদের পারিবারিক অসুখ? আরেকটু বড় হলে তুমিও কি এরকম মোটা হয়ে যাবে? এত ওজন হলে তুমি তো নড়তে পারবে না। মরে যাবে, তোমার মায়ের মতো”। 
 
নারুমির মেয়ে জোর করে খুব চেষ্টা করলো ওদের হাসাহাসিতে যুক্ত হতে। ও বাড়িতে ফেরার কোনো আগ্রহ দেখালো না। কিন্তু ওদের মধ্যে একজন আবার বললো, “আচ্ছা, তুমি যাও। তোমার মায়ের সাথে বাড়িতে যাও”। 
 
খুব অল্প কিছুদিন হলো নারুমির মেয়ে এদের সাথে বন্ধুত্ব করেছে আর এই বন্ধু পাতাতে অনেকটা সময় লেগেছে ওর। সে ব্যাকপ্যাকটা কাঁধে ঝুলিয়ে পা বাড়ালো, ওর হাতগুলোও যেন পারলে ঠেলে বের করে আনে ওকে পার্ক থেকে। ঠোঁট দুটো চেপে ধরে মাথা নিচু করে মেয়েটা বেরিয়ে এলো। মনে হচ্ছিলো, একটা হালকা হাওয়ার ধাক্কাতেও সে মাটিতে পড়ে যাবে, মনে হচ্ছিলো, বেদনায় সে গুঁড়োগুঁড়ো হয়ে ধুলিকনার মতো বাতাসে মিশে যাবে। তার জিভের রঙ সব গিয়ে যেন জমা হয়েছে মুখের ভেতরে, যা কেউ দেখতে পায় না। আর এরসাথে কাঁপছিল ওর জিভটা। 
 
বাড়িতে ফিরে নারুমির মেয়েটি সোফায় বসে রইলো, ভাবলেশহীন অভিব্যক্তি। ও ভেবে পাচ্ছিলো না, মেয়েকে তখন কী বলবে। মেয়েটা এমনিতেই খুব চুপচাপ থাকে। কখনো দীর্ঘসময় নিশ্চুপ বসে থাকে। প্রকৃতিগতভাবেই সে এরকম, অন্য মানুষের কাছে নিজেকে প্রকাশ করতে স্বাচ্ছন্দ্য নয়, অনেকটা সময় নেয়। তবে মেয়েটা ভারি মিষ্টি। নারুমির মনে পড়লো, মেয়েটা খুব ছোট থাকতে ওরা দুজন মিলে নানারকমের পাথর কুড়াতো আর সেগুলোর এক একটা নাম দিতো। ও জুসের একটা বোতল আর গ্লাস হাতে করে নিয়ে মেয়ের পাশে বসলো। মেয়েটা মুখ নিচু করে নিজের কোলের দিকেই তাকিয়ে থাকলো। 
 
“একটু জুস খাবে তুমি?” 
 
আর অন্য কথা খুঁজে পাচ্ছিলো না নারুমি। ও একই কথা আবার বললো। মুখে কিছু না বলে মেয়েটা ঘাড় নাড়তে থাকলো, জল গড়িয়ে পড়ছিল ওর চোখ থেকে। চোখের পাপড়ি ভিজিয়ে দিয়ে অঝর ধারায় অশ্রু ঝরছিল, যেন কিছু একটা সে বের করে ভাসিয়ে দিতে চাইছে, মুক্তি পেতে চাইছে। জলের ধারা গড়িয়ে তার নীলরঙা স্কার্টটাও ভিজিয়ে দিচ্ছিলো। এক...তিন...ছয়... আমি সত্যিই দুঃখিত। তোমার বন্ধুরা নিশ্চয়ই আমাকে নিয়ে তোমার সাথে তামাশা করছিল। আমাকে দেখতে এমনই বেঢপ, যে তুমি বিব্রত হতেই পারো। আমি সত্যিই দুঃখিত, তোমার মা এত বিশ্রিরকম মোটা... এই কথাগুলো কতবার ও মেয়েকে বলতে চেয়েছে, কিন্তু প্রতিবারের মতো এবারও ঠোঁটে এসে আটকে গেল। কিছুতেই মেয়েকে বলতে পারলো না। মেয়েটা তখনও চুপ করে বসে আছে, শুধু চোখ দিয়ে জল গড়াচ্ছে। নারুমি ওর কাছে গিয়ে বসে দু’হাত দিয়ে আগলে ধরলো মেয়েকে, কিন্তু কিছুতেই মুখে কিছু বলতে পারলো না। ও দেখছে, মেয়েটার পা-গুলো কেমন চিকন, হাঁটুর হাড্ডি সব বেরিয়ে আছে, সেই রুগ্ন শরীরের মেয়ের কাছে বসে নারুমি স্বপ্ন দেখতে লাগলো। ওর চোখ দুটো খোলা... ও স্বপ্নে দেখছে, সেই স্বপ্নটা, যা ও প্রাণময় অবস্থায় দেখতো। যখন ও সকলের চোখে সুন্দর ছিল। ও কাউকে আঘাত করতো না, ওকেও কেউ কষ্ট দিতো না, যেখানে মন চায়, ও যেতে পারতো, যখন তখন। কেবলই সুন্দর একটা শরীর, যে শরীর ওর নিজের বলে মনে হতো না। সেই শরীরটা স্বপ্ন দেখতো তখন। ওর মেয়েটা কেঁদেই চলেছে, ছোট্ট শরীরটা থেকে কান্না বের হচ্ছে, শরীরের সব শক্তি দিয়ে ও বেঁচে-ওঠার লড়াই চালাচ্ছে। নারুমি কল্পনা করতে চেষ্টা করছে, মেয়ের ছোট্ট শরীর নিয়ে ওকে আর কী কী সামলাতে হবে আগামীতে। তার কাছ থেকে কী হরণ করা হবে, কী দেয়া হবে বা কী সে হারিয়ে ফেলবে! নারুমি ধীরে ধীরে মেয়ের কাঁধের উপর হাত রাখলো। মেয়ের বেদনায় ওর বুকের পাঁজর যেন ভেঙে যাচ্ছে। ওর অসহায়ত্ব ওকে দুমরে-মুচড়ে দিচ্ছে যেন ভেতর থেকে। চিৎকার দিয়ে কাঁদতে ইচ্ছে করলো ওর। মেয়ের সাথে গলা জড়িয়ে ধরে কাঁদতে পারলে হয়তো বাঁচাটা সহজ হতো। একসঙ্গে, সশব্দে। কিন্তু একি! ও তো ঘামে ভিজে যাচ্ছে। ওর সারা শরীর থেকে ঘাম বেরোচ্ছে। নারুমির গলা, বগল, কপাল, ঊরুর মধ্যেখানে দরদর করে ঘাম বেরোচ্ছে, ভিজে যাচ্ছে। ওর সারা শরীর ভেসে যাচ্ছে ঘামে। ঘামবিন্দুগুলো বাড়ছে তো বাড়ছেই, গড়িয়ে গড়িয়ে পড়ছে...ওর পুরো শরীর ঘামে আবৃত... শরীরটা মৃতের মতো ঠাণ্ডা। 
--------------------
মূলগল্প: Shame by Mieko Kawakami, Translated by Louise Heal Kawai & Hitomi Yoshio


 
লেখক পরিচিতি- জাপানের ওসাকায় জন্মনেয়া মিসেকো কাওকামি কবি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন ২০০৬ সালে। ২০০৭ সালে প্রকাশিত তার প্রথম উপন্যাস ‘My ego, my teeth and the world’ সেরা নবীন লেখক হিসেবে ‘সুবোচি শোয়ো’ পুরস্কার পায়। এর কয়েক বছর পরে ‘Breasts and Eggs’ উপন্যাসের জন্য জাপানের সম্মানীয় পুরস্কার ‘আকুতাগাওয়া পুরস্কার লাভ করেন তিনি। ২০১৬ সালে ‘গ্রান্টা বেস্ট জাপানী লেখক’ হিসেবে নির্বাচিত হন। তার দুটো উপন্যাস ইংরেজিতে অনুদিত হয়ে প্রকাশিত হয়েছে। কাওয়াকামি বর্তমানে টোকিওতে থাকেন।




অনুবাদক(বাংলা) পরিচিতি:
ফারহানা আনন্দময়ী
কবি। গদ্যকার। অনুবাদক









কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন