সোমবার, ২৬ জুলাই, ২০২১

আকুতাগাওয়া রিয়োনোসুকে'এর: একটা অদ্ভুত গল্প




  অনুবাদ: সুমু হক

এক শীতের সন্ধ্যায় আমার পুরোনো বন্ধু মুরাকামির সাথে হাঁটতে বেড়িয়েছিলাম, গিনজার মূল সড়কটা ধরে।

"খুব বেশিদিন হয়নি, চিয়েকোর কাছ থেকে একটা চিঠি পেয়েছি। ও তোমার কথা লিখেছে," মুরাকামি সাসেবো শহর থেকে ওর বোনের সাথে চলা কথোপকথনটা মনে করে করে আমায় বলছিল।

“চিয়েকো ঠিক আছে তো?”

“হ্যাঁ, ইদানিং বেশ কিছুদিন হলো ও বেশ ভালোই আছে। গতবার যখন টোকিওতে এসেছিল, সেসময় ওর একটা ভয়ংকর রকম নার্ভাস ব্রেকডাউন হয়েছিল...তুমি বোধহয় শুনেছো।”

“শুনেছিলাম। যদিও সেটা নার্ভাস ব্রেকডাউন ছিল, না অন্যকিছু, সেটা জানতাম না।"

“ওহ, তুমি ঠিক জানতে না তাহলে? চিয়েকো যখন এলো, সেসময় যেন মনে হলো ও একেবারেই পাগল হয়ে গেছে। ঠিক যখনই মনে হতো যে এইবার ও ঠিক কাঁদতে শুরু করবে, ও জোরে জোরে হাসতে শুরু করতো। আর যখন মনে হতো যে ও হাসছে … বেশ ভালোই, ঠিক তক্ষুণি আমাকে খুব অদ্ভুত একটা গল্প বলতে শুরু করতো।”

“অদ্ভুত গল্প?”

উত্তরটা না দিয়েই মুরাকামি ধাক্কা দিয়ে একটা ক্যাফের কাচের দরজা খুললো। আমাকে ভেতরে নিয়ে গিয়ে নিজেও বসলো ক্যাফের বাইরে থেকে ভেতরে লোকের আসা-যাওয়ার পথের বিপরীতে একটা টেবিলে।

“একটা অদ্ভুত গল্প। তোমায় হয়তো বলেনি। সাসেবোতে ফিরে যাবার আগে আমায় এইটা বলে গিয়েছিল।”

“তুমি তো জানোই, যুদ্ধের সময় চিয়েকোর স্বামী ইউরোপে, ভূমধ্যসাগরের কাছাকাছি কোথাও কর্মরত ছিল, প্রথম সারির একজন কমিশনড অফিসার। ওর স্বামী সেখানে থাকাকালীন ও আমার সাথে একবার দেখা করতে এসেছিল, যুদ্ধ তখন প্রায় শেষের দিকে। ওর নার্ভাস ব্রেকডাউনগুলো তখন আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে। খুব সম্ভবত ওর স্বামীর কাছ থেকে প্রতি সপ্তাহে নিয়মিতভাবে যে চিঠিগুলো আসতো সেগুলো হঠাৎ, কোনো কারণ ছাড়া বিনা নোটিসে সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়াতেই এমনটা হয়েছিল।

বিয়ের মাত্র ছ'মাসের মাথায়ই স্বামীর কাছ থেকে চিয়েকোকে বিদায় নিতে হয়, তাই ওই চিঠিগুলোর জন্যে ও অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতো। এতটাই, যে আমি যদি এমনকী এ নিয়ে ওর সাথে সামান্য ঠাট্টাও করতে চাইতাম, যেমনটা আমি মাঝেমধ্যেই করি আর কি, ও মুহূর্তের মধ্যেই বিষাদে ডুবে যেত।

ঠিক সেই সময়টাতেই। সেদিন, হ্যাঁ, সেদিনটা ছিল একটা সরকারি ছুটির দিন। সারাটাদিন ধরে বিরামহীন বৃষ্টি হয়ে চলেছিল আর দুপুরটা ছিল মারাত্মক ঠান্ডা। চিয়েকো বলেছিল যে অনেকদিন বাদে সেদিন প্রথমবারের মতো কামাকুরায় যাবে। ওর এক স্কুলের বন্ধুর বিয়ে হয়েছিল কামাকুরার এক ব্যবসায়ীর সাথে, তার সাথেই সেদিন দেখা করতে যাবে বলেছিল। আমার মনে হয়েছিল বটে, যে ওরকম বৃষ্টির মধ্যে অতটা পথ পাড়ি দিয়ে কামাকুরায় যাবার কোনো মানেই হয়না, তাই আমি আর আমার স্ত্রী দুজনেই ওকে বলেছিলাম যে পরদিন অবধি অপেক্ষা করে যেতে। কিন্তু চিয়েকোও গোঁ ধরে রইলো, যে রোদ হোক, চাই বৃষ্টি হোক, ও সেইদিনই বাইরে যাবেই। আর রেগেমেগে হন্তদন্ত হয়ে বেড়িয়ে গেল, যে ঠিক এইটাই ও করবে।

বেরোবার মুখে আমাদের বলে গেলো, রাতে হয়তো বা ও ওর বন্ধুর বাড়ি থেকে গিয়ে পরের দিন ফিরে আসবে। কিন্তু খানিকক্ষণ বাদেই আবার দরজা দিয়ে ফিরে এলো, বৃষ্টিতে ভিজে সপসপে হয়ে আর ঠান্ডায় নীল হয়ে যাওয়া চেহারা নিয়ে। ও বলে যে ও নাকি সেই সেন্ট্রাল ট্রেন স্টেশন থেকে রিভারসাইড স্টেশন পর্যন্ত অতখানি পথ বৃষ্টির ভেতর ছাতা ছাড়া হেঁটে এসেছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম যে এমন একটা কাজ ও কেনই বা করতে যাবে, আর তখনই, মানে, আর কি, সেটাই হলো গিয়ে ওই অদ্ভুত গল্পটা।

ততক্ষণে ও বোধহয় প্রায় সেন্ট্রাল স্টেশনে পৌঁছে গিয়েছে - না না, দাঁড়াও, হয়তোবা তার খানিকটা আগে। ও হয়তোবা মাত্র ট্রেনে উঠেছে, কিন্তু সবগুলো সিটই প্রায় ভর্তি। ও তখন ওই ঝুলন্ত চামড়ার হ্যান্ডেলগুলো ধরে দাঁড়িয়ে জানালা দিয়ে দূরে শান্ত সমুদ্রের দিকে তাকিয়েছে। কিন্তু ট্রেন ততক্ষণে ছুটতে শুরু করেছে জিনবোচো এলাকার ভেতর দিয়ে, অর্থাৎ কিনা, টোকিও শহরের ঠিক মাঝ বরাবর দিয়ে, অর্থাৎ সেখান থেকে ওর ট্রেনের জানালা দিয়ে সমুদ্র দেখতে পাবার কোন প্রশ্নই উঠছে না! নিচের রাস্তার ট্রাফিকের ফাঁক দিয়ে ও নাকি দেখতে পেয়েছে যে সমুদ্রের ঢেউগুলো উঠছে আর নামছে। যদিও ওর মনে হয়েছিল যে জানালায় ঝাপ্টা লাগা বৃষ্টির জল আর বাইরে দিয়ে দেখা অস্পষ্ট দিগন্তের কারণেই হয়তোবা ওর মনে হয়েছে ও এমন সমুদ্রের ঢেউয়ের ওঠানামা দেখতে পেয়েছে, কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্ত থেকে, চিয়েকোর মনের ভেতরটায় কোথায় কি একটা যেন গোলমাল হয়ে গেল।

ট্রেনটা যখন সেন্ট্রাল স্টেশনে এসে দাঁড়ালো, তখন সেখানে লাল-টুপি-পরা একজন কুলি অকস্মাৎ ওকে জিজ্ঞেস করে বসলো, "আপনার স্বামী কেমন আছেন?" ব্যাপারটা অদ্ভুত তো বটেই, আরও আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই যে একটা কুলি ওকে আচমকা এমন একটা প্রশ্ন করে বসলো, ব্যাপারটা চিয়েকোর একটুও আশ্চর্য বলে মনেই হলো না। "ধন্যবাদ, আমি আসলে জানিনা উনি ঠিক কেমন আছেন, কেননা বেশ কিছুদিন হলো, আমি ওঁর কাছ থেকে কোন খবরই পাইনি কিনা," ও কুলিটিকে উত্তর দিল। কুলিটি এবার বললো,"আমায় তাহলে বরং এখুনি গিয়ে একবার আপনার স্বামীর খোঁজ নিয়ে আসতে দিন।" যদিও কুলিটি বলেছে যে সে ওর স্বামীর খোঁজ নিয়ে এনে দেবে, ওর স্বামী কিন্তু তখন বহুদূরে দেশের বাইরে। ঠিক এই কথাটাতেই ও সম্বিৎ ফিরে পেলো যে কুলিটির কথাটা কতখানি পাগলাটে। কিন্তু ও কি উত্তর দেবে ভেবে উঠতে পারার আগেই একটি সালাম ঠুকে দিয়ে কুলিটি ভিড়ের ভেতর মিলিয়ে গেলো।

হাজার খুঁজেও চিয়েকো লোকটিকে আর দ্বিতীয়বার দেখতে পেলো না। তার চেয়েও বড় কথা হলো, ও বলে যে ও কিছুতেই মনে করতে পারছিল না, কুলিটার চেহারাটা দেখতে ঠিক কেমন ছিল; বাকি সব কুলিগুলোই দেখতে ঠিক ওর মতো একইরকম লাগছিল। চিয়েকো কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছিল না, যে কি ঘটছে। ওর মনে হচ্ছিলো, চারিদিকের সবাই যেন শুধু ওর দিকেই তাকিয়ে আছে। কামাকুরা যাবার চেয়েও, ওর তখন মনে হলো, ওকে এবার স্টেশনের বাইরে যেতে হবে। তাই কেমন ঘোরের ভেতরেই, এমনকি হাতের ছাতাটা অবধি না খুলে ও দৌড়ে স্টেশনের বাইরে চলে এলো এবং বৃষ্টিতে ভিজে একশা হয়ে গেলো।

ও আমায় এসব বলার পর আমার মনে হলো এ ঠিক ওর মানসিক অস্থিরতার ফল আর ওর শরীরটাও নিশ্চয়ই খারাপ করেছে। এরপরের তিনদিন ধরে ওর চললো ধুম জ্বর আর সেই সাথে বিড়বিড় করতে থাকলো "আমায় দয়া করে ক্ষমা করে দাও," আর "তুমি কেন ঘরে ফিরে আসছো না?" যেন ও ওর স্বামীর সাথে কথা বলছিল। কিন্তু কামাকুরায় যেতে চাইবার জন্যে ওর দৈব শাস্তির সেখানেই শেষ নয়। ওর অসুখ সেরে যাবার পরও, কুলিদের প্রসংগে কোনো কথা ওঠা মাত্রই ও সমস্ত দিনের জন্যে কেমন একটা গভীর বিষাদের ভেতর ডুবে যেত আর ওর কাছ থেকে একটা কথাও শুনতে পেতাম না। এখন একটা কথা ভাবলে বেশ হাসিই পায়, একদিন ও কোথাও সাইনবোর্ডে শিপিং কোম্পানির বিজ্ঞাপনে একটা লাল-টুপি-পরা কুলির ছবি দেখে ফেলে যেখানে যাচ্ছিলো সেখানে না গিয়ে সোজা বাড়ি ফেরত চলে আসে।

এভাবে মাসখানেক চলার পর তারপর ওর ওই কুলিদের আর লাল টুপির ভয় আস্তে আস্তে কমতোে শুরু করলো। "শোন, কিয়োকা ইজুমির ওই উপন্যাসে মেনিমুখো একটা কুলি ছিল, কি, ছিল না? হয়তো সেটা পড়েই এইসব পাগলামির শুরু," চিয়েকো বেশ হাসতে হাসতেই আমার স্ত্রীকে বলে। তারপর মার্চ মাসে একদিন আবার ও হঠাৎ-ই একটা কুলির মুখোমুখি হয়। সেই থেকে ওর স্বামী বাড়ি ফেরা অবধি ও আর কোনদিন ট্রেন স্টেশনে যায়নি, তা সে ওর যত প্রয়োজনই থাকুক না কেন। সেইজন্যেই তুমি যখন কোরিয়ায় চলে গেলে, ও তোমাকে বিদায় জানাতে আসেনি; ও কুলিদেরকে ভয় পেতো।

কয়েক সপ্তাহ বাদে, ওর স্বামীর এক বন্ধু দু'বছর আমেরিকায় থাকার পর এই প্রথম জাপানে ফিরলো। চিয়েকো সকাল সকাল বাড়ি থেকে বেরুলো তার সাথে দেখা করবে বলে, কিন্তু, জানোই তো, আমাদের এলাকাটা একেবারেই জনমানবহীন বললেই চলে, আর দিনেদুপুরে সেখানে পথেঘাটে কাউকে দেখতে পাওয়াই মুশকিল। এরকমই একটা নির্জন পথের মাঝখানে কেউ একটা কাগজের চড়কির ফুল রেখে গিয়েছিল, যেরকমটা এমনিতে দেখলে কেউ হয়তো আর দ্বিতীয়বার ভাববেও না কিছু। সেদিন আবার খুব মেঘলা আর জোর বাতাসের দিনও ছিল, যার ফলে রঙিন কাগজের চড়কির ফুলটা বনবন করে ঘুরছিল। চিয়েকো বলেছিলো, ওটাকে দেখামাত্রই ওর কেমন অস্বস্তি হতে থাকে, আর ফিরে তাকিয়ে দেখতে পায় যে, লাল-টুপি-পরা একটা লোক উল্টোদিকে ফিরে কেমন মাথা নিচু করে ঝুঁকে বসে আছে। স্বভাবতই, এই লোকটাই নিশ্চয়ই কাগজের চড়কিগুলো বিক্রি করছিলো, অথবা নিছক রাস্তায় বসে একটা সিগারেট খাচ্ছিলো। কিন্তু ও যেইনা ওই লাল টুপিটাকে দেখেছে, ঠিক আগের মতোই ওই অদ্ভুত অনুভূতিটা ওকে পেয়ে বসে, আর ও ভেবে নেয় যে এবার ওর ওখান থেকে চলে যাওয়াই উচিত। কিন্তু কিছুই হয়নি। অন্তত, ও স্টেশনে পৌঁছনো অবধি।

ও যখন মানুষের ভিড় ঠেলে ওর স্বামীর বন্ধুর সাথে দেখা করবার জন্যে টিকেট গেটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলো, ঠিক তক্ষুনি কেউ একজন ওর পেছন থেকে এসে বলে, "আপনার স্বামী তাঁর বুকের ডান দিকটাতে একটা আঘাত পেয়েছেন। সেই জন্যেই আপনি কোনো চিঠিপত্র পাচ্ছিলেন না।"

চিয়েকো চড়কির মত পাক খেয়ে দ্রুত পেছন ফিরলো, কিন্তু সেখানে কোনো কুলি তো দূরের কথা, কেউই নেই। যারা ছিলেন, তাঁরা হলেন, বুঝতেই পারছো, অন্যান্য কমিশনড নৌবাহিনির অফিসারেরা এবং তাঁদের স্ত্রীরা। স্বভাবতই, এঁদের মধ্যে থেকে কেউ ওকে অযাচিতভাবে এমন কোনো কথা বলবেন না, এমনটা হওয়া অসম্ভব, আর তাছাড়া এই কণ্ঠস্বরটা যে বলেছে, সেই কথাটাও নিতান্তই অদ্ভুত। সে যাই হোক না কেন, সেখানে যে কোনো লাল- টুপি পরা কুলি দাঁড়িয়ে নেই, এইটুকু দেখেই ও বেশ স্বস্তি অনুভব করতে পারতো।

সেখান থেকে ও গেট দিয়ে ভেতরে যায় আর সবার মতোই, আর দেখতে পায় যে ওর স্বামীর সহকর্মীটি গেট থেকে বের হয়ে একটি গাড়িতে উঠতে যাচ্ছেন। দেখামাত্রই, পেছন থেকে আবার একটি কণ্ঠস্বর খুব স্পষ্ট করে বলে ওঠে, "ম্যাডাম, মনে তো হচ্ছে আপনার স্বামী সামনের মাসেই ঘরে ফিরছেন।" ও আবার খুব দ্রুত পেছন ফেরে কথাটা কে বললো দেখবার জন্যে, কিন্তু পরস্পরকে হাত নেড়ে বিদায় জানাতে থাকা স্বামী-স্ত্রী যুগলেরা ছাড়া এবারও সেখানে আর কেউ ছিল না। ওর পেছনে কেউ ছিল না, তবে ওর সামনে কিছুটা দূরে একদল কুলি গাড়িতে মালপত্র তুলছিল।

ও একটা কুলির দিকে তাকিয়ে ভাবলো এই কুলিটাই কিনা, যে কিনা কেমন অদ্ভুত একটা হাসি হাসি মুখ করে ওর দিকে তাকিয়েছিল। হাসিটা দেখে চিয়েকো এতটাই ফ্যাকাশে হয়ে গেল, যে ওর পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া মানুষগুলো পর্যন্ত এবার লক্ষ করলো। কিন্তু নিজেকে খানিকটা শান্ত করার চেষ্টা করতে যেতেই ও টের পেলো, দুটো লোক, যাদেরকে ও এতক্ষণ কুলি ভাবছিল, আদতে একটাই মাত্র লোক। তার ওপরে আবার যে একটা কুলি মালপত্রগুলো টেনে নিয়ে যাচ্ছে, ওর চেহারাটা ওকে দেখে যে লোকটা হেসেছিল, তার থেকে একেবারে আলাদা। আর ও কিছুতেই মনে করতে পারছিল না, যে কুলিটা ওর দিকে তাকিয়ে হেসেছিল, তার চেহারাটাই বা কিরকম দেখতে, তার কারণ ওর স্মৃতিশক্তিটা ততক্ষণে মেঘের মতই ঘোলাটে হয়ে গেছে। যতই চেষ্টা করছিল, ও কেবল ওই মাথার লাল টুপিটুকু ছাড়া আর কিছুই মনে করতে পারছিল না, একটা নাক আর চোখ শূন্য মুখ যেন কিছুতেই মনে আসছিল না। এরপর চিয়েকো আমায় ওর অদ্ভুত গল্পের দ্বিতীয় অংশটুকু বলে।

এর ঠিক এক মাস বাদে, তোমার কোরিয়া যাবার কাছাকাছি সময়েই ওর স্বামী ঘরে ফেরে।

বুকের ডান পাশে একটা আঘাতের কারণেই সে এতকাল কোনো চিঠিপত্র লিখতে পারেনি, বেশ অদ্ভুত ব্যাপারই বলতে হয়, ওই কুলির বলা কথাটাই শেষমেশ সত্যি হয়ে দাঁড়ায়। "চিয়েকো তো দিনরাত ওর স্বামীর কথাই কেবল ভাবতো, তাই ওর পক্ষে টের পাওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু নয়," আমার স্ত্রী ঠাট্টা করেই বলেছিল। কিন্তু এর প্রায় দিন পনেরো বাদে, চিয়েকো ওর স্বামীর সাথে তার সাসেবোর পোস্টিংয়ে চলে গেলে দেখতে পেলো, ওদের পৌঁছনোর আগেই কি করে যেন তার সেই না পাঠানো চিঠিগুলোকে কেউ লেটারবক্সে জমিয়ে রেখেছিল। ওরা চিঠিগুলো দেখে চমকে গিয়েছিল, কিন্তু অদ্ভুত গল্পটার শেষ এখানেই নয়।

এর অল্প ক'দিন পরের কথা, চিয়েকো আর ওর স্বামী সেন্ট্রাল স্টেশনে দাঁড়িয়েছিল, এমন সময় লাল-টুপি-পরা যেই কুলিটা ওদের মালপত্র বয়ে নিয়ে এসেছিল, সে ট্রেনের জানালা থেকে মুখ বের করে ওদেরকে সালাম দেয় কিংবা কিছু একটা বলে। কুলিটার ওপর চোখ পড়তেই ওর স্বামীর চেহারা ফ্যাকাশে হয়ে যায়, অন্তত আমাকে ও তেমনটাই বলে, খানিকটা লজ্জিত হয়েই।

জানা গেল যে মার্সেইয়ে কর্মরত থাকবার সময় ওর স্বামী একবার তার বন্ধুদের সাথে একটি ক্যাফেতে গিয়েছিল, এবং কোনো এক অদ্ভুত কারণে, সেখানে একজন লাল-টুপি-পরা জাপানি কুলিও বসা ছিল। কুলিটি উঠে এসে, যেন তারা পরস্পরকে বহুকাল ধরে চেনে এমনভাবে জিজ্ঞেস করলো, সে কেমন আছে। যদিও একজন জাপানি কুলির মার্সেইয়ে ঘুরে বেড়ানোর কোনো কারণ থাকাই সম্ভব নয়। কিন্তু ওর স্বামী ওকে বলে যে সেসময় সে খুব বেশি কিছু ভাবেনি, বরং নিজের বুকের ডান দিকের আঘাতটার কথা তাকে জানায়, আর এও জানায় যে সে কবে বাড়ি ফিরতে যাচ্ছে। ওর একজন বন্ধু বেশ মাতাল হযে গিয়েছিল এবং ঠিক এই সময় সে বেসামাল হয়ে একগ্লাস কনিয়াক উল্টে ফেলে দেয়। চিয়েকোর স্বামী যখন জাপানি কুলিটির দিকে দ্বিতীয়বার মনোযোগ দিতে যাবে, ততক্ষণে ক্যাফেটি থেকে তার সমস্ত চিহ্ন রীতিমত নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে।

তাহলে লোকটা ছিলটা কে? এখনও যখন সে এ বিষয়ে কথা বলতে যায়, ঠিক নিশ্চিত হতে পারে না যে সে কি তখন স্বপ্ন দেখছিল, না ঘটনাটা বাস্তবে ঘটেছিল, যদিও সে তখন সম্পূর্ণ জেগেই ছিল। তার ওপর আবার তার সাথে তখন আর যারা সেখানে ছিল, তাদের আর কেউই লাল-টুপি-পরা কোন কুলিকে লক্ষই করেনি। শেষ অবধি সে ঠিক করে যে আর কাউকে কিছু বলবে না। সে জাপানে ফেরার পর চিয়েকো তাকে ওর সাথে লাল-টুপি-পরা কুলিদের নিয়ে ঘটে যাওয়া অদ্ভুত ঘটনা দুটোর কথা বলে।

তাই সে ধরেই নেয় যে লাল-টুপি-পরা যে কুলিটাকে সে মার্সেইয়ে দেখেছিল, সে একই লোক, কিন্তু ঘটনাটা শুনতে খুব বেশি মাত্রায় ভূতের গল্পের মত শোনায়। যেহেতু তখন তার পদোন্নতির কথা চলছে, সে তার স্ত্রীকে শুধু শুধু দুশ্চিন্তায় ফেলতে চায়নি, তাছাড়া লোকে কি বলবে সে আশংকাও ছিল বৈকি, তাই সেইদিন অবধি সে এই বিষয়ে একটি কথাও কাউকে জানায়নি। কিন্তু সেদিন সে জাপানে যে লোকটিকে দেখে, ঠিক সেই লোকটিকেই সে মার্সেইয়ে দেখেছিল, তাতে কোন সন্দেহ নেই। ওর স্বামী যখন কথা বলা থামিয়ে দিল, তখন খানিকক্ষণ নিজের ঠোঁট কামড়ে ধরে রেখে অবশেষে কণ্ঠস্বরে ভীষণ অস্বস্তি নিয়ে চিয়েকো জিজ্ঞেস করলো, " কিন্তু, সমস্ত ব্যাপারটাই কি একটু অদ্ভুত নয়,?"

এটা যদি সেই লোকটাই হয়, এমনকি তার চোখের পাপড়ি অবধি, তাহলে আমি কেন ওর চেহারাটা ভালো করে মনে করতে পারছি না? জানালা দিয়ে যখন ওকে দেখলাম, আমি জানতাম এটা ওই, লোকটাই, আর কেউ নয়,’…”

ওর তিনজন বন্ধুকে ক্যাফেতে ঢুকে পাশের টেবিলে বসে হাত নেড়ে ওর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে দেখে মুরাকামি হঠাৎ গল্পটাকে মাঝপথেই থামিয়ে দিল। আমরাও তাই উঠে দাঁড়ালাম। “এবার তাহলে, আমার যাওয়া উচিত। তুমি কোরিয়া যাবার আগে আমি আরেকবার এসে তোমার সাথে দেখা করে যাবো।"

আমি ক্যাফে থেকে বেরিয়ে নিজের অজান্তেই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম।

সেটা ছিল তিন বছর আগের ঘটনা, এতদিনে বুঝতে পারলাম কেন ও কথা দিয়েও সেন্ট্রাল স্টেশনে এসে আমার সাথে গোপনে দেখা করার কথাটা রাখেনি, পরে একটা চিঠিতে জানিয়েছিল, ও চিরকাল একজন বিশ্বস্ত স্ত্রী হয়েই থাকতে চেয়েছে।

মূলগল্প: A Strange Story by Akutagawa Rynosuke



লেখক পরিচিতি:

আকুতাগাওয়া রিয়োনোসুকে ছিলেন জাপানের টাইশো পর্যায়ের একজন লেখক এবং তাঁকে জাপানি ছোট গল্পের জনক হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়ে থাকে। তাঁর জন্ম ১৮৯২ সালের ১লা মার্চ। ১৯২৭ সালের ২৪ শে জুলাই মাত্র ৩৫ বছর বয়সে তিনি বার্বিটলের ওভারডোজে আত্মহত্যা করেন। জাপানের সবচেয়ে সম্মানজনক সাহিত্য পুরস্কারগুলোর একটি, আকুতাগাওয়া পুরস্কারটি তাঁরই সম্মানে প্রতিষ্ঠিত হয়।

আকুতাগাওয়া ছিলেন তাঁর বাবা টোশিজো নিহারা এবং মা ফুকু আকুতাগাওয়ার তৃতীয় সন্তান। জন্মের পরপর তাঁর মায়ের মানসিক অসুস্থতা দেখা দিলে তাঁকে তাঁর মামা ডোশো আকুতাগাওয়া এবং তাঁর পরিবার দত্তক নেন। খুব অল্প বয়স থেকেই তিনি ধ্রুপদী চাইনিজ সাহিত্যের প্রতি এবং সেই সাথে সাথে মোরি ওগাই এবং নাৎসুমে সোসেকির কাজগুলোর প্রতি আগ্রহী ছিলেন।

তিনি উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রথম পড়াশোনা শুরু করেন ১৯১০ সালে এবং সেখানেই তাঁর সাথে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে কান কিকুচি, কুমে মাসাও, ইয়ুজো য়ামামোতো এবং সুচিয়া বুনমেইর সাথে, পরবর্তীতে তাঁরা সবাই সাহিত্যিক হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। ১৯১৩ তে টোকিওর ইম্পেরিয়াল বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যে পড়াশোনা শুরু করেন এবং লেখালেখি করতে শুরু করেন।

পড়াশোনা শেষ হবার পর তিনি কিছুদিন য়ুকোসুকা, কানাগাওয়ার নেভাল প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি ভাষার প্রশিক্ষক হিসেবে শিক্ষকতা করেন, এবং তারপর পুরোপুরি লেখালেখিতে মনোনিবেশ করেন।

আকুতাগাওয়ার বিশ্বাস ছিল যে সাহিত্য হওয়া উচিত সার্বজনীন এবং এর মাধ্যমে পশ্চিমি এবং জাপানি সভ্যতাকে কাছাকাছি নিয়ে আসা যেতে পারে। তাঁর লেখায় এর প্রভাব স্পষ্টই দেখা যায়। তিনি একাধারে বিভিন্ন সংস্কৃতি এবং বিভিন্ন সময়ের সাহিত্য থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে আধুনিকভাবে সেগুলোকে নিজের মতো করে সাজাতেন। সংস্কৃতি এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়ের বিবর্তন আকুতাগাওয়ার অনেক কাজেরই মূল বিষয়বস্তু ছিল। বিশেষ করে তখন, যখন জাপান প্রবলভাবে পশ্চিমা সাংস্কৃতিক প্রভাবগুলোর মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছিল, যেমন বলা যায়, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কাছাকাছি সময়ের মিশনারি প্রভাবের প্রেক্ষাপটে লেখা গল্পগুলোর কথা।
 
আকুতাগাওয়ার সাহিত্য জীবনের শেষ দিকটা তাঁর শারীরিক এবং মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতির দ্বারা বিশেষভাবে প্রভাবিত হয়। তাঁর এ সময়কার কাজগুলো স্পষ্টতই আত্মজৈবনিক, কোনো কোনো কাজ তো এমনকি সরাসরি তাঁর ডায়রির পাতা থেকেই নেয়া। তাঁর এ সময়কার কাজগুলোর ভেতর "দাইদোজি শিনসুকে নো হ্যানসেই" ( দাইদোজি শিনসুকের প্রথম জীবন, প্রকাশকাল ১৯২৫) এবং "টেনকিবো" (মৃত্যুর বিবরণ, প্রকাশকাল ১৯২৬) গুরুত্বপূর্ণ।

আকুতাগাওয়ার শেষ দিনগুলোর কাজের ভেতর রয়েছে "কাপ্পা" (প্রকাশকাল, ১৯২৭) জাপানের লোকসাহিত্যের ওপর ভিত্তি করে লেখা একটি স্যাটায়ার, "হাগুরুমা" (যন্ত্রের ঘূর্ণিপাক প্রকাশকাল ১৯২৭), "আরও আহো নো ইসশো" (বোকার জীবন, ১৯২৭), এবং বাঙ্গেইটাকি না, আমারি নি বাঙ্গেইটাকি না" (কথার কথা, সবই শুধু কথার কথা, ১৯২৭)

জীবনের শেষদিকে আকুতাগাওয়া দৃষ্টিবিভ্রম এবং মানসিক বিপর্যয়ে ভুগতে থাকেন। তাঁর ধারণা ছিল যে উত্তরাধিকারসূত্রে তিনিও তাঁর মায়ের মতোই মানসিক অসুস্থতার শিকার হয়েছেন। প্রথমে একবার আত্মহত্যার চেষ্টা করে ব্যর্থ হলেও অবশেষে তিনি ১৯২৭ সালের ২৪শে জুলাই মাত্র ৩৫ বছর বয়সে আত্মহত্যা করেন। তাঁর উইলে আত্মহত্যার কারণ হিসেবে তিনি লিখে গিয়েছিলেন এক ধরনের "অস্পষ্ট নিরাপত্তাহীনতা"র কথা।

তাঁর এই সংক্ষিপ্ত জীবনেই আকুতাগাওয়া ১৫০টির ও বেশি ছোট গল্প লিখে গেছেন। আকিরা কুরোসাওয়ার ধ্রুপদী চলচ্চিত্র 'রাশোমন' আকুতাগাওয়ার একটি গল্পের ওপর ভিত্তি করেই নির্মিত। জাপানি কম্পোজার মায়াকো কুবোও আকুতাগাওয়ার গল্পের ওপর ভিত্তি করে 'রাশোমন' নামে একটি অপেরা রচনা করেন। ১৯৩৫ সালে আকুতাগাওয়ার বন্ধু কান কিকুচি প্রতিভাবান তরুণ লেখকদের জন্যে আকুতাগাওয়ার সম্মানে আকুতাগাওয়া সাহিত্য পুরস্কারটির প্রতিষ্ঠা করেন।

---------------
 

অনুবাদক পরিচিতি:
সুমু হক
অনুবাদক। প্রাবন্ধিক
কানাডায় থাকেন

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন