সোমবার, ২৬ জুলাই, ২০২১

নিইমি নানকিচি'এর গল্প: দাদুর লণ্ঠন




 অনুবাদ: হারুন রশীদ


স্টোর রুমের কোনায় তার লুকানোর জায়গা থেকে একটি পুরোনো লণ্ঠন হাতে বেরিয়ে এলো তোইচি।

লণ্ঠনটি খুব অদ্ভুতুড়ে ধরনের। প্রথম দেখায় এটাকে ঠিক লণ্ঠনের মতো লাগে না। এর ভিত্তিটি প্রায় আশি সেন্টিমিটার ব্যাসের পুরু বাঁশের তৈরী এবং তার উপরে একটি ছোট পলতে বসানো। লণ্ঠনের চিমনিটা ঝকঝকে কাচের সিলিন্ডারের তৈরী।

"এটা একটি পুরানো বন্দুক, তাই না?" কৌতূহলী সাকিচি জানতে চাইলো। সে তেইচির সাথে লুকোচুরি খেলায় অংশ নিয়েছে।

জিনিসটা কী তা বুঝতে তোইচির দাদার একটু সময় লাগল। তিনি চোখে চশমা লাগিয়ে জিনিসটার দিকে গভীরভাবে মিনিটখানেক তাকিয়ে থাকার পর বুঝতে পেরে তিনি বাচ্চাদের বকা দিতে শুরু করলেন।

“এই দ্যাখো কাণ্ড! কী কারবার করে বসেছে এরা। আজকালকার বাচ্চাদের একা ছেড়ে দিলে কী যে দুর্মতির মধ্যে পড়তে হয়। তোমাদের দিকে নজর না রাখলে তো আমার সবকিছু লুট করে ফেলবে। যাও ভাগো, বের হও এখান থেকে। বাইরে গিয়ে খেলাধুলা করোগে। রেড রোভার বা অন্য যা কিছু খেলো তাতে আমার মাথাব্যথা নাই।”

বকা খেয়ে বাচ্চারা বুঝতে পারলো তারা কোন একটা ভুল করে ফেলেছে। তোইচি আর অন্যন্য প্রতিবেশি বাচ্চারা ঘর ছেড়ে বাইরে রাস্তায় খেলতে চলে গেল। তাদের চোখেমুখে অপরাধবোধের চিহ্ন।

বাইরে, বসন্তের মধ্যাহ্নের বাতাস রাস্তা থেকে ধুলাবালি ওড়াচ্ছিল। সাদা প্রজাপতিগুলি একটি বলদ টানা গাড়ির পেছন দিকে নেচে বেড়াচ্ছিল। খেলাধুলা করার জন্য জায়গাটা উপযুক্ত। কিন্তু বাচ্চারা খেলতে উৎসাহ পাচ্ছে না। বড়দের কাছ থেকে এরকম আচমকা বকা খেলে খেলার উৎসাহ মরে যায়।

তার চেয়ে ওরা নিকটস্থ প্লাজার দিকে গিয়ে ঘুরে আসার সিদ্ধান্ত নিল। ঘুরতে যাবার সময় পথে ফেলে দেওয়া কিছু বোতলের ঢাকনি কুড়িয়ে নিতে ব্যস্ত হলো ওরা এবং অচিরেই লণ্ঠনের কথাটা ভুলে গেল।

সন্ধ্যার সময় বাড়ি ফিরে তোইচি ঘরের কোনে লণ্ঠনটাকে দেখতে পেল। কিন্তু সে ওটা নিয়ে আর কিছু বললো না পাছে দাদা আবারো বিরক্ত হয়।

রাতের খাবারের পর তোইচি তার ঘরের আলমারির হাতল ধরে মোচড়ামুচড়ি করছিল। এই সময়টা খুব বিরক্তিকর। সময় কাটতে চায় না। সে তখন লাইব্রেরী ঘরের দিকে গিয়ে কৃষিবিজ্ঞানের অধ্যাপকের মতো দৃষ্টি দিয়ে ‘মুলা চাষের তত্ত্ব এবং প্রয়োগ’ নামক বড় বড় শিরোনামের মোটা বইটা নামিয়ে পড়তে শুরু করে।

নীরস জিনিস পড়তে গিয়ে অল্পক্ষণের মধ্যেই ক্লান্তি নেমে আসাতে সে আবারো বসার ঘরে ফিরে গেলো। তার দাদা সেখানে উপস্থিত নেই এটা নিশ্চিত হবার পর সে পা টিপে টিপে লণ্ঠনটার দিকে এগিয়ে গেল। আস্তে করে চিমনিটা খুলে ফেলল। তারপর পয়সার মতো দেখতে স্ক্রুগুলি খুলে পলতেটা টেনে বের করলো। দেখেটেখে পলতেটা যথাস্থানে ঢুকিয়ে রাখল।

গবেষণার মাঝপথে তোইচির দাদা এসে উপস্থিত হলো। একেবারে হাতে নাতে ধরা। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার দাদা এবার তাকে কোনও বকাঝকা করলেন না। কাজের মেয়েটা দাদার হাতে চায়ের কাপটা দিয়ে যাবার পর তিনি চা খেতে খেতে ধীরে সুস্থে তার পাইপটি ধরালেন। তারপর বললেন-

"বুঝলে তোইচি, এই লণ্ঠনটি আমার কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমি এটার কথা ভুলেই গিয়েছিলাম। অনেকদিন হয় এটার কথা ভাবিনি। তুমি যখন এটাকে স্টোররুম থেকে বের করে আনলে তখন আমি যেন সেই পুরোনো দিনে ফিরে গেলাম। তুমি যখন বুড়ো হবে তখন বুঝতে পারবে পুরোনো একটা জিনিস কীভাবে মানুষকে অতীতের দিনে ফিরিয়ে নিয়ে কতটা সুখী করতে পারে। "

তোইচি তার দাদার দিকে বোকা বোকা চোখে তাকিয়ে থাকলো। বকা খেয়ে সে ভেবেছিল দাদা তার উপর রাগ করেছিলেন। এখন দেখা যাচ্ছে সত্যি তিনি পুরানো লণ্ঠনটি দেখে খুশি হয়েছেন।

"এদিকে বসো, আমি তোমাকে এই লণ্ঠন সম্পর্কে সব খুলে বলছি," তাঁর দাদা বললেন।

তোইচি সবসময় ভাল গল্প শোনার জন্য প্রস্তুত থাকে, তাই সে আগেই দাদার পাশে বসার প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিল। তবে দাদার কথা শুনে বুঝলো এটা আরো দীর্ঘ কাহিনী হতে পারে, তাই সে তার সবচেয়ে প্রিয় এবং আরামদায়ক ভঙ্গিতে আয়েশ করে বিছানায় উঠে বসলো। দাদা গল্পটা শুরু করার সাথে সাথে সে কাত হয়ে শুয়ে পড়লো এবং তার পা দুটোকে জোড়া করে রেখে গল্প শুনতে লাগলো।

*****

এটা প্রায় পঞ্চাশ বছর আগের কথা, যখন রাশিয়ার সাথে আমাদের যুদ্ধ চলছিল। ইয়ানাবে শহরে তেরো বছরের একটি কিশোর ছিল। তাঁর নাম ছিল মিনোসুকে।

মিনোসুকের মা, বাবা, বা কোনও ভাই-বোন ছিল না। সে সত্যিকার অর্থে একজন অনাথ ছিল। ফলে সে কখনো কারো বাড়ির কাজের ছেলে, কারো জন্য বেবি সিটার এবং অন্য কারও জন্য কৃষি শ্রমিক। মিনোসুকের মতো বয়সী একটি ছেলে যা কিছু করতে পারে, মিনোসুক তার সব করত।

তবে সত্যি বলতে গেলে মিনোসুক এটাকে মেনে নিতে পারছিল না যে এভাবে লোকের কাজ করেই তার জীবন কাটাবে। যদি সে তার পুরো জীবন বেবি সিটার কিংবা চাল ঝাড়ার কাজ করতে ব্যয় করতে হয় তাহলে তার জন্ম নেয়াটাই বৃথা।

যে কোন তরুণ একটি সফল জীবনের স্বপ্ন দেখে। কিন্তু মিনোসুকে কীভাবে সাফল্য পাবে? সে কোনমতে চারটি খেতে পায়, সে একটি বই কেনার টাকাও যোগাড় করতে পারে না। এমনকি কিনতে পারলেও সেটা পড়ার সময় পায় না।

মনে মনে মিনোসুক ভাগ্য বদলের সুযোগের অপেক্ষায় ছিল। এক গ্রীষ্মের বিকেলে সেই সুযোগটা আসে। যেদিন মিনোসুকে রিকশা চালানোর কাজ পায়।

ইয়ানাবে শহরে তখন দুটি কি তিনটি রিকশা ছিল। নাগোয়া থেকে প্রচুর পর্যটক সমুদ্র সৈকতে বেড়াতে আসতো। তারা সাধারণত ট্রেনে করে হান্দা স্টেশনে নামতো। তারপর তারা একটি রিকশা নিয়ে ওনো কিংবা শিন-মাইকো উপকূলে পৌঁছাতো। ইয়ানাবে ছিল ওখানে যাবার জন্য রিকশা ধরার উপযুক্ত জায়গা।

রিকশা চালানো ছিল এমনিতেই ধীরগতির কাজ। ওনো থেকে ইয়ানাবে যাবার পথে একটি উঁচু জায়গা ছিল যা পেরোতে গিয়ে রিকশাগুলো আরো ধীর হয়ে যেতো। সেই সাথে আরো খারাপ হতো সেসব দিনে রিকশায় বিশালাকার ধাতব চাকা থাকতো যা ভারী এবং সবসময় ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ করতো। তাই যেসব ট্যুরিস্টের তাড়া থাকতো তারা তাদের গাড়ীর জন্য দু'জন চালক নিযুক্ত করতো। সেরকম এক গ্রীষ্মের দিনে এক পর্যটক এসে মিনোসুকেকে ভাড়া করলেন।

রিকশার সাথে বাঁধা রশিটি তার কাঁধের সাথে জড়িয়ে মিনোসুকে টানছিল। প্রচণ্ড গরমে সে ঘেমে উঠছিল তার পেশীগুলোর মধ্যে টান পড়ছিল। এটি একটি কষ্টসাধ্য কাজ যাতে অভ্যস্ত হয়ে উঠতে কিছুটা সময় লাগে। কিন্তু মিনোসুকে কষ্টকে পাত্তা দিল না- কষ্টের উপরে কৌতূহল জয়ী হলো। যতদূর মনে পড়ে সে তার নিজের গ্রামের বাইরে সে কখনও পা রাখেনি। তার কোন ধারণা ছিল না গ্রামের সীমানার বাইরে মানুষেরা কীভাবে জীবনযাপন করে।

নীল গোধূলি লগ্নে যখন সূর্য অস্ত যাচ্ছিল, আশপাশের বস্তুগুলো ছায়ায় পরিণত হচ্ছিল, সেই সময়ে রিকশাটি ওনো শহরে পৌঁছালো।

এই প্রথম সে এমন একটা শহরে এসেছে। ওনো শহরে এসে মিনোসুকে প্রথমবারের মতো অনেক কিছুই দেখছে। প্রথমত, মিনোসুকে কখনো পাশাপাশি এতগুলো দোকান দেখেনি। ইয়ানাবে শহরে মাত্র একটি দোকান ছিল। সেখানেই পাওয়া যেতো শহরে কম-বেশি ব্যবহৃত সমস্ত জিনিস, চকোলেট, স্যাণ্ডেল জুতা, জামা কাপড়, ওষুধপত্রসহ সমস্ত কিছু।

তবে মিনোসুকে সবচেয়ে অবাক হয়েছিল যে এই বড় স্টোরগুলির প্রত্যেকটির নিজস্ব রঙিন কাচের লণ্ঠন আছে। মিনোসুকের গ্রামের বেশিরভাগ বাড়ি রাতের বেলা ঘুটঘুটে অন্ধকার হয়ে যায়। পানির জগ বা গ্লাস খুঁজে পেতে গ্রামবাসীদের অন্ধের মতো হাতড়াতে হয়। একটু স্বচ্ছল পরিবারগুলি সাধারণ প্রদীপ ব্যবহার করতে পারে - কিন্তু সেটি হলো একটিমাত্র পলতে নিয়ে তেলের বাটিতে জ্বলা প্রদীপ। যার চারদিকে কাগজ পরিবেষ্টিত থাকে। সেই প্রদীপটা সাধারণত বিয়ে শাদীর উপহার হিসেবে প্রাপ্ত হয়। প্রদীপ লণ্ঠনের ক্ষুদ্র শিখাটি চারপাশের কাগজকে একটি উষ্ণ কমলার আভা দেয় যা আশেপাশের পরিবেশকে কিছুটা রঙিন করে তোলে। কিন্তু সেই প্রদীপগুলো কখনোই ওনোর এই উজ্জ্বল বাতিগুলোর মতো এতটা আলো ছড়িয়ে জ্বলে না।

ওরকম ধরনের কাঁচের লণ্ঠনগুলো তখনো বিরল ও মূল্যবান জিনিস ছিল। যা কাগজের লণ্ঠনের চেয়ে দেখতে অনেক সুন্দর, যাতে দাগ পড়া কিংবা ছিঁড়ে যাবার ঝুঁকি ছিল না।

এই সমস্ত লণ্ঠন ওনো শহরকে রূপকথার প্রাসাদের মতো কোনও শহরে রূপান্তরিত করেছিল। মিনোসুকের বাড়ি ফিরতে ইচ্ছে করে না। একবার যে আলোর সন্ধান পেয়েছে সে কী আর কখনো অন্ধকারে ফিরে যেতে চাইবে?

যাত্রীর কাছ থেকে টিপস পাওয়ার পরে মিনোসুকে তার রিকশাটি ফেলে রেখে শহর পরিভ্রমণ শুরু করলো। সমুদ্রের গর্জন শুনতে শুনতে অচেনা অজানা একটা শহরের দোকানগুলো মুগ্ধ হয়ে দেখতে থাকে। দোকানে সাজানো আশ্চর্য সুন্দর লণ্ঠনগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকলো।

জামাকাপড়ের দোকানীরা তাদের ক্রেতাদের জন্য সেই লণ্ঠনের নীচে কিছু ক্যামেলিয়া ফুলের ছাপা কাপড় ঝুলিয়ে রেখেছে। মুদি দোকানদার তার স্টোরের লণ্ঠন থেকে মটরশুটির মালা গেঁথে ঝুলিয়ে রেখেছে। কোন কোন দোকানে ঝোলানো ছিল প্রার্থনার মালা। লণ্ঠনের ম্লান আলোর মধ্য দিয়ে ছেঁকে আসা মানুষগুলোর অস্তিত্বকে কেমন অলৌকিক মনে হচ্ছে -যেন সিনেমার চলমান চিত্র।

মিনোসুকে শুনেছিল যে পশ্চিমা সংস্কৃতির স্পর্শে জাপান কীভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে। তবে সে এখনো পর্যন্ত সে পুরোপুরি বুঝতে পারেনি আসলে ব্যাপারটা কী।

ঘুরতে ঘুরতে মিনোসুকে একটা দোকানের সামনে এসে দাঁড়ালো যেখানে অনেকগুলো লণ্ঠন জ্বলছিল। ওটা নিশ্চয়ই লণ্ঠনের দোকান।

মিনোসুকে এক মুহূর্তের জন্য দ্বিধায় পড়েছিল, নিজের হাতের মুঠোয় ধরা কয়েনগুলো শক্ত হাতে চেপে ধরে আত্মবিশ্বাসের সাথে দোকানে প্রবেশ করলো।

"আমি এগুলো থেকে একটি কিনতে চাই” " মিনোসুক লণ্ঠনের দিকে ইশারা করে বললো। সে তখনো জিনিসটার নাম জানে না।

দোকানী মিনোসুকের নির্দেশ করা ঝুলন্ত লণ্ঠনটি নামিয়ে আনলেন। কিন্তু দাম শুনে বোঝা গেল মিনোসুকের কাছে যে টাকা আছে তাতে কুলোবে না।

মিনোসুক তাই একটু জোর দিয়ে বলল, “দামটা কিন্তু আরেকটু কমাতে হবে”।

"আমি আর কমাতে পারবো না," ক্লার্ক জবাব দিলেন।

"তাহলে আমাকে পাইকারী দামে দিন।" মিনোসুকে বলল।

মাঝে মাঝে মিনোসুক খড়ের স্যান্ডেল তৈরি করত এবং এগুলি ইয়ানাবের সাধারণ দোকানে বিক্রি করত। সে জানতো যে সবকিছুর একটা পাইকারি ও খুচরা মূল্য আছে। পাইকারি মানে হলো সস্তা। মিনোসুকের স্যান্ডেলের কথাই ধরা যাক- দোকানদার এগুলি দেড় টাকায় কিনে এবং তারপরে রিকশাওয়ালার কাছে আড়াই টাকায় বিক্রি করে।

দোকানী জানেন না এই ছেলেটা কে। তাই তিনি মুহুর্তের জন্য অবাক হয়ে মিনোসুকের দিকে তাকালেন। অতঃপর তিনি বললেনঃ

“তুমি যদি লণ্ঠন ব্যবসায়ী হতে তাহলে আমি তোমার কাছে পাইকারি দরে বিক্রি করতে পারতাম। কিন্তু আমি যে কারো কাছে পাইকারি দামে বিক্রি করি না।"

"তাহলে আপনি লণ্ঠন ব্যবসায়ীর কাছে পাইকারি বিক্রি করবেন।"

"ঠিক তাই।"

"সেক্ষেত্রে ধরে নিন আমি একজন লণ্ঠন ব্যবসায়ী।"

লণ্ঠনটি এখনও তার হাতেই আছে, দোকানী হাসিতে ফেটে পড়ল। "তুমি? তুমি একজন লণ্ঠন ব্যবসায়ী?"

"আমি কসম কেটে বলছি আমি লণ্ঠনের ব্যবসায় নামতে যাচ্ছি। আমাকে শুধু এবারের মত একটি লণ্ঠন পাইকারী মূল্যে দিন, পরেরবার আমি আরো কয়েকটা কিনবো।”

প্রথমে দোকানি হাসছিল ঠিকই, কিন্তু মিনোসুকের আত্মবিশ্বাস দেখে তিনি খুশী হলেন। “ঠিক আছে, এবারের মতো আমি তোমাকে পাইকারী দামে দিলাম। কিন্তু সত্যি বলতে কী তোমার কাছে যে টাকা আছে সেটা পাইকারী দামের চেয়েও কম। তবু তোমার উৎসাহের প্রশংসা করছি। তুমি যেহেতু সত্যি সত্যি লণ্ঠনের ব্যবসায়ে নামতে যাচ্ছো তাই তোমাকে এই দামেই দিচ্ছি। আমি চাই তুমি আমার ল্যাম্প বিক্রি করবে তোমার শহরে।”

দোকানী মিনোসুকেকে লণ্ঠনটি দিলেন এবং কীভাবে এটি ব্যবহার করবে তা তাকে শেখালেন। মিনোসুকে লণ্ঠনটি জ্বালিয়ে দেখলো এটি তাদের কাগজের লণ্ঠনের চেয়ে অনেক বেশি উজ্জ্বল এটা। লণ্ঠনটা নিয়ে সে বাড়ির দিকে রওনা দিল।

সে যখন লণ্ঠনটাকে রিকশার মধ্যে ঝুলিয়ে বাড়ির পথে এগিয়ে যাচ্ছিল তখন মনে হচ্ছিল সে যেন তার সাথে একটা গ্রীষ্মকালীন ফুলের তোড়া বয়ে নিচ্ছে। অন্ধকারে গাছপালা ও বনের মধ্য দিয়ে পথ চলতে তার আর ভয় লাগছিল না।

কিন্তু মিনোসুকের মাথার ভেতরে আরো একটি বাতি জ্বলে উঠেছিল তখন। সে যদি এই লণ্ঠন বাতিটাকে তার গ্রামে বিক্রি করতে পারে, প্রতিবেশীদের বাড়িও উজ্জ্বল হয়ে উঠবে এবং তার গ্রামও পাশ্চাত্যের উন্নতির ছোঁয়া পাবে। এটা নিয়ে তার মধ্যে একটা বাণিজ্য চিন্তা কাজ করতে শুরু করলো।

*****

তবে মিনোসুকের নতুন ব্যবসায় উদ্যোগ প্রথমে সফল হয়নি। কারণ যে কোন ছোট শহরের মানুষেরা শুরুতে নতুন কোন উদ্ভাবন কিংবা ধারণাকে আমলে নিতে চায় না।

অনেক চিন্তাভাবনা করার পরে, মিনোসুকে গ্রামের একমাত্র ব্যবসায়ীর কাছে লণ্ঠনটি নিয়ে গেল এবং তাঁকে বললো যে তিনি যেন এটা তাঁর গ্রাহকদেরকে বাড়ি নিয়ে বিনামূল্যে ব্যবহার করার সুযোগ দেন তাহলে তারা উৎসাহিত হবে।

সাধারণ দোকানী সেই বৃদ্ধা মহিলা প্রথমে দ্বিধা করলেন। পরে তিনি ছাদে একটা পেরেক ঠুকে লণ্ঠনটাকে সেখানে ঝুলিয়ে দিলেন।

কিছু দিন পরে মিনোসুক কিছু স্যান্ডেল বিক্রি করতে যখন সেই দোকানে গেল তখন সেই বৃদ্ধা মহিলার সাথে দেখা। তিনি মিনোসুকে দেখে উৎফু্ল্ল হয়ে উঠলেন। ‘ওরে আমার মিনোসুকে! এই লণ্ঠন এত উজ্জ্বল। আমার গ্রাহকরা এমনকি রাতেরবেলা এটি দেখতে আসে। আমি এটা দিয়ে টাকাপয়সা সব পরিষ্কার গুনতে পারি। তুমি কী এটা আমার কাছে বিক্রি করবে?”

শুধু তাই না, তিনি বললেন আরো কয়েকজন নাকি এই লণ্ঠন কিনতে চায়। তিনি আরো তিনটি লণ্ঠন কেনার অর্ডার দিলেন। দেখে শুনে মিনোসুকে রীতিমত পুলকিত বোধ করলো।

মিনোসুকে তার স্যান্ডেল বিক্রি থেকে প্রাপ্ত লাভ এবং লণ্ঠন বিক্রির লাভ দুটো একসাথে নিয়ে ওনো শহরের দিকে রওনা দিল। সেখানে গিয়ে লণ্ঠন ব্যবসায়ীকে সব ঘটনা খুলে বলল। তার কাছে থাকা টাকাগুলো দিয়ে তিনটা লণ্ঠন দিতে বললো। যেহেতু তিনটা লণ্ঠনের দাম আরো বেশী, বাড়তি টাকাটা বকেয়া হিসেবে রাখার অনুরোধ করলো। দোকানী রাজী হলো এবং মিনোসুকে ইয়ানাবে ফিরে তিনটি লণ্ঠন বিক্রি করে টাকা পরিশোধ করলো।

এরপর থেকে মিনোসুকের লণ্ঠন ব্যবসার ধুম লাগলো।

প্রথমদিকে সে প্রথমে অর্ডার পাওয়ার পর লণ্ঠন কিনতে যেতো ওনো শহরে, পরে যখন তার নিজের টাকা হলো তখন সে কিছু কিছু লণ্ঠন কিনে স্টকে রেখে দিতো।

ধীরে ধীরে মিনোসুকে তার আগের বেবি সিটিং এবং অন্যন্য খুচরো কাজগুলো ছেড়ে দিয়ে পুরোটা সময় লণ্ঠন ব্যবসায় লেগে গেল। সে একটা লম্বা খুঁটিযুক্ত ঠেলাগাড়ি কিনে সেখানে লণ্ঠন ও চিমনিগুলো ঝুলিয়ে দিল। তারপর সেই ভ্রাম্যমাণ দোকান নিয়ে তার গ্রাম ও আশপাশের গ্রামে ঘুরে বেড়াতো চিমনির টুংটাং শব্দ ছড়িয়ে।

মিনোসুক এখন পরিপূর্ণ যুবক। কিন্তু তার কোন বাড়ি ছিল না। সে মেয়রের নির্মিত সরকারী দালানের একটা অংশে রাত্রিযাপন করতো। ধীরে ধীরে অর্থ সঞ্চয় করে সে নিজে একটা বাড়ি তৈরী করলো এবং বিয়ে করে সংসারী হলো।

একদিন সন্ধ্যায় মিনোসুক পাশের একটি শহরে তার জিনিসপত্র বিক্রি করার সময় ক্রেতাদের উদ্দেশ্যে বলছিল- "আপনি এখানে একটি লণ্ঠনের নীচে বসতে পারেন এবং পরিষ্কার আলোয় সংবাদপত্র পড়তে পারেন!" মিনোসুকে এর আগে মেয়রকে এই কথা বলতে শুনেছিল। একজন গ্রাহক তাকে এসে জিজ্ঞাসা করল, "তুমি কী সত্যি বলছো?" মিনোসুকে কখনোই মিথ্যা বলা পছন্দ করে না। সে তখন তার দাবীকে প্রমাণ করার জন্য মেয়রের অফিস থেকে একটা পুরোনো সংবাদপত্র সংগ্রহ করে আনলো এবং সেটা খুলে দিলে গ্রাহকের সামনে।

মেয়র ঠিকই বলেছিলেন। লণ্ঠনের আলোতে মিনোসুকে পৃষ্ঠার খুটিনাটি সব লেখা পরিষ্কারভাবে দেখতে পেল। "মিথ্যাবাদীরা ভালো ব্যবসায়ী হয় না," সে বিড়বিড় করে আপনমনে। তবে সে যাইহোক, মিনোসুকে লেখাগুলো পরিষ্কারভাবে দেখতে পেলেও খুব বেশী লাভ হলো না। সে বলল "আমার মনে হয় আমি এখনো আধুনিক নই। আমি দেখতে পাচ্ছি ঠিকই, কিন্তু পড়তে পারি না। "

তারপরে মিনোসুকে প্রতি রাতে মেয়রের বাড়িতে যেতো, যেখানে মেয়র তাকে অক্ষর পরিচয় শেখাতেন।

*****

আরো কয়েক বছর পর। মিনোসুকে তখন জীবনের সবচেয়ে উৎকর্ষময় সময় কাটাচ্ছিল। দুই সন্তানের বাবা সে। 'যে কেউ হয়তো আমাকে দেখে বলতে পারে আমি এখন স্বনির্ভর হয়েছি। কিন্তু যে যাই বলুক আমি কখনোই বলি না আমি এখনো সফল হতে পেরেছি'। সে মাঝে মাঝে আপনমনে ভাবতো।

এরকম একটা দিনে সে যখন লণ্ঠনের পলতে কেনার কাজে ওনো শহরে গেল, সেখানে দেখলো পাঁচ ছয়জন শ্রমিক রাস্তার পাশে গর্ত খুড়ে সেখানে বড় বড় কাঠের খুঁটি বসাচ্ছে। সেই খুঁটির উপর আড়াআড়িভাবে দুটো কাঠের টুকরো লাগানো, কাঠের টুকরার মধ্যে সিরামিকের গোলাকার চাকতি বসানো। ওই আজব জিনিসগুলো কী হতে পারে সেটা ভাবতে ভাবতে মিনোসুকে পরের রাস্তায় গিয়ে দেখলো সেখানেও একই জিনিস। একদল চড়ুই সেই কাঠের টুকরোগুলোর উপর বসে বিশ্রাম নিচ্ছিল।

প্রতিটি খুঁটি পঞ্চাশ মিটারের মতো দূরত্ব রেখে রাস্তার পাশ দিয়ে সারিবদ্ধভাবে বসানো হয়েছে।

অবশেষে মিনোসুকে রাস্তার পাশে রোদে নুডলস শুকোতে এক রাঁধুনীকে পেয়ে জানতে চাইলো ব্যাপারটা কী? সে বললো, 'ওগুলো এই শহরের বাসিন্দাদের জন্য বসানো হচ্ছে। কী যেন বলে তার নাম, ইলেক্ট্রিসিটি। আমাদের আর লণ্ঠনের দরকার হবে না।'

এই খবরটা মিনোসুকের সহ্য করা কঠিন ছিল। ইলেক্ট্রিসিটি ব্যাপারটা নিয়ে তার বিন্দুমাত্র ধারণা নেই। কিন্তু এটা যদি লণ্ঠনের পরিবর্তে ব্যবহৃত হয়, তাহলে এটা নিশ্চয়ই আলো জাতীয় কিছু হবে। এটা যদি আলো হয় তাহলে এটা লোকে বাড়িতেও ব্যবহার করবে। তবে তাদের ছোট শহরে এই রকম ইলেকট্রিক খুঁটি বসানোর কোন পরিকল্পনা শোনা যায়নি।

পরের মাসে মিনোসুকে যখন আবারো ওনো শহরে গেল, তখন দেখলো সারিবদ্ধ খুটিগুলোর মধ্যে কালো দড়ির মতো জিনিস দিয়ে টানা দেয়া হয়েছে সেই সিরামিকের চাকতিগুলোর মধ্য দিয়ে। সেই কালো দড়িগুলো কোথা থেকে শুরু হয়ে কতদূরে গেছে তার কোন সীমা দেখা যায় না।

মিনোসুকে একটু কাছে গিয়ে ভালো করে দেখে বুঝলো সেই খুঁটি থেকে কিছু কিছু দড়ি রাস্তার পাশের বাড়িগুলোর সাথে যুক্ত করা হয়েছে।

'হুমম তোমরা বলছো এটা নাকি ইলেকট্রিসিটি নামের কী এক ঘোড়ার ডিম, যা তোমাদের আলো দেবে, কিন্তু ওই দড়িগুলো যেভাবে টানা হয়েছে সেটা দেখে তো মনে হচ্ছে ওটা পাখিদের বিষ্ঠা ত্যাগ করার স্থান' বিদ্রুপের স্বরে মিনোসুকে বিড়বিড় করলো।

যাইহোক, সে যখন তাঁর পরিচিত একটি বারে গেল তখন দেখলো ঘরের মাঝখানে সবসময় ঝুলে থাকা সদৃশ্য ঝাড় লণ্ঠনটি এখন দেয়ালের এক কোনে ঝুলছে। তার জায়গায় নতুন ধরণের একটা বাতি, যার মধ্যে কেরোসিন রাখার পাত্র নেই। ওটা শুধুমাত্র একটা দড়ির সাথে যুক্ত।

"ছাদে ঝোলানো ওই কুৎসিৎ জিনিসটা কী?" মিনোসুকে জিজ্ঞাসা করল। "এখানে কিছু একটা ঝামেলা হয়নি তো?"

"ওহ, ওটা একটা ইলেকট্রিক বাতি!" বারটেন্ডার জবাবে বললো। "এটা একটা দারুণ জিনিস, বুঝলেন! এটাতে আগুন লাগার ভয় নেই, এটা অনেক বেশী উজ্জ্বল এবং এটা জ্বালাতে কোন ম্যাচের জ্বালানী দরকার হয় না! "

“কিন্তু ওটা দেখতে তো মনে হচ্ছে একটি কিম্ভুত বিকলাঙ্গ বস্তু। আমার তো মনে হয় ওটার কারণে আপনি অনেক কাস্টমার হারাবেন।"

বারটেন্ডার জানে মিনোসুকে লণ্ঠন ব্যবসায়ে আছে, সে কারণে তিনি ইলেকট্রিক বাতির সুবিধাগুলি সম্পর্কে আর কোনও কথা বাড়ালো না। মিনোসুকে নিজেও সে ব্যাপারে কোন আগ্রহ দেখালো না।

‘এই যে দেখেন, সিলিংটার দিকে তাকান। যেখানে পুরোনো ঝাড়লণ্ঠনটি ছিল সেখানে ছাদে কালো দাগ হয়ে গেছে। সে ওখানে সুন্দর করে ঝুলে থাকতো। এখন সেই লণ্ঠনটা নেই, তার বদলে এই ইলেকট্রিক বাতি, আপনার মতে এটাই আসল আশীর্বাদ। কিন্তু আপনি একবার ভাবুন তো পাশের ওই লণ্ঠনটি এটা দেখে কী ভাবছে?’

তখন দিনের আলো ফুরিয়ে রাত নেমে গিয়েছিল। বারের কারো কাছে যদিও কোন ম্যাচ ছিল না, তবু বারটেণ্ডারের হাতের জাদুতে এক পলকে মাথার ওপরে দপ করে জ্বলে উঠলো উজ্জ্বল এক বাতি। মিনোসুকে এত চমকে গেল যে সে নিজের চারদিকে এক পাক ঘুরে গেল।

‘এটাই হলো ইলেক্ট্রিসিটি মিস্টার মিনোসুকে’। বারটেন্ডার জানালেন।

মিনোসুকে দাঁতে দাঁত কিড়মিড় করে ওটার দিকে এমনভাবে তাকিয়ে থাকলো যেন সেটা তার জানের শত্রু। বাতিটা এত উজ্জ্বল ছিল যে রীতিমত তার চোখ কড়কড় করছিল।

"মিস্টার মিনোসুকে, ইলেক্ট্রিসিটি কী জিনিস সেটা এই একটা বাতি দিয়ে বোঝা যাবে না। আপনি একটু বাইরে গিয়ে ঘুরে ফিরে দেখুন না কেন? ”

মিনোসুকে দরজার দিকে গিয়ে বাইরে উঁকি দিলো। বারে যেরকম আলো জ্বলছে ঠিক সেরকম আলোকসজ্জা প্রতিটি বাড়িতে, প্রতিটা দোকানে। বাড়িঘর থেকে জানালা গলে রাস্তায় আলো পড়েছিল। লণ্ঠনের আলোয় অভ্যস্ত মিনোসুকের চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছিল উজ্জ্বল আলোয়। দীর্ঘসময় ধরে সে হতাশ হয়ে বাতিগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকলো।

এটা এখন পর্যন্ত আমার জীবনের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিপক্ষ। মনে মনে ভাবলো মিনোসুকে। যদিও সে আগে লণ্ঠনের প্রচার করতে গিয়ে জাপানের আধুনিকায়নের বিষয়ে অনেক কথা বলেছিল, কিন্তু তার ধারণা ছিল না ইলেকট্রিক লাইট তার চেয়েও একধাপ আধুনিক। তার মতো পরিশ্রমি উচ্চাভিলাষী একজনের জন্য এটা এক ধরনের পরাজয়। তবু সে ভাবলো বিদ্যুতের আলো বিষয়ক ব্যাপারটি নিয়ে সে কি ভুল চিন্তা করছে না তো?

সেদিন থেকে মিনোসুকের ভেতর এই শঙ্কা কাজ করতে শুরু করে যে ইয়ানাবের লোকেরাও একদিন বৈদ্যুতিক আলোর যুগে প্রবেশ করবে। যেদিন তারা বৈদ্যুতিক আলোর যুগে প্রবেশ করবে সেদিন থেকে ওরাও বারটেন্ডারের মতো তাদের লণ্ঠনগুলোকে দেয়ালে ঝুলিয়ে রাখবে অথবা কোন গুদামে ফেলে দেবে। তাদের আর কোন লণ্ঠন লাগবে না, লণ্ঠনওয়ালার প্রয়োজনও ফুরাবে।

আবার উল্টোদিকে ভেবে মিনোসুকের মনে হলো, তাদের ছোট শহরের লোকেরা তো প্রথমদিকে লণ্ঠনকে মেনে নিতে চায়নি, সেক্ষেত্রে তারা হয়তো বিদ্যুতের আলোকেও তেমন পছন্দ করবে না।

কিন্তু খুব শীঘ্রই, মিনোসুকে একটা ফিসফাসের অস্তিত্ব টের পেতে শুরু করলো তাদের শহরে। এখানকার বাসিন্দারা নাকি ওয়ানাবে শহরকে বিদ্যুতায়িত করার ব্যাপারে আলোচনা করতে চলেছে। তার মানে এই শত্রুটা এবার তাদের শহরেও মাথা ঢুকাতে যাচ্ছে। মিনোসুকের মনে হলো কেউ যেন তার মাথায় লাথি মারলো।

সে আর চুপ করে থাকতে পারল না! মিনোসুকে শহরে একটা বিদ্যুৎ বিরোধী গোষ্ঠী তৈরী করে প্রচার শুরু করলো- “এখানে বিদ্যুৎ আসা মানে পুরো শহর জুড়ে তার ছড়িয়ে পড়া ! আপনারা কী জানেন তারগুলি কোথা থেকে আসছে? গহীন পার্বত্য এলাকা থেকে আসবে তারগুলো। এর মানে হলো সেই তার বেয়ে রাতের অন্ধকারে শিয়াল বা কোনও শিকারী প্রাণী আপনার ঘরে এসে ঘরের পোষা প্রাণীদের খেয়ে ফেলবে। আমাদেরকে ভয়ানক বিপদে পড়তে হবে!"

যদিও মিনোসুকে কথাগুলো এভাবে বলতে গিয়ে নিজেই লজ্জিত হচ্ছিল। সে শুধু নিজের জীবিকাকে রক্ষা করার জন্য এতসব বাজে কথা বলছিল। তবু সে যখন শুনলো যে সকলের সম্মিলিত সমাবেশে শেষ পর্যন্ত ইয়ানাবে শহরকে বিদ্যুতায়িত করার পক্ষে রায় দিয়েছে তখন সেটা তার জন্য বড় ধরনের ধাক্কা। বৈদ্যুতিক বাতির এই সমস্যাটার কারণে তার মানসিক অসুস্থতার পাশাপাশি শারিরীকভাবেও অসুস্থ হয়ে পড়ার শঙ্কা দেখা দিল।

শীঘ্রই আশঙ্কাটি সত্য প্রমাণিত হলো। গ্রামের সেই বিদ্যুত সমাবেশের তিনদিন পর এক বিকেলে মিনোসুকে অসুস্থ হয়ে শয্যা নিল। যখন সে জেগে উঠলো, তখন সে প্রায় উন্মাদ।

মিনোসুকে সেই সমাবেশের নেতৃত্ব দেয়া মেয়রসহ জড়িত সবার প্রতি চরম অসন্তুষ্টি প্রকাশ করলো। মেয়রকে এমনসব বিষয়ে দায়ী করতে শুরু করলো যে বিষয়ে তিনি দায়ী নন। মিনোসুকে যে উজ্জ্বল মেধাবী পরিশ্রমী একজন মানুষ তাতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু সে তার ব্যবসায়িক ক্ষতির দুঃখে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে অযৌক্তিক পথে গিয়ে এমন একটা সিদ্ধান্ত নিল যেটা কোন বিচারেই সুবুদ্ধির পরিচয় দেয় না।

*****

সে রাতটি ছিল উষ্ণ। মাথার উপর ভেসে থাকা চাঁদের আলোয় ভেসে যাচ্ছিল চরাচর। দূরে কোথাও বসন্ত উৎসবের বাদ্য বাজছিল।

মিনোসুকে ঘর ছেড়ে বের হলো। সে রাস্তা দিয়ে না গিয়ে নর্দমার ইঁদুর কিংবা রাস্তার কুকুরের মতো ঘুপচি অন্ধকারে ঘাপটি মেরে চলতে শুরু করলো যেন কেউ তাকে দেখতে না পায়। মেয়রের বাড়িতে যাবার রাস্তা তার কাছে হাতের তালুর মতো পরিষ্কার। সে ঘর থেকে বের হবার সময় থেকেই জানতো কোথা থেকে কাজটা শুরু করতে হবে। আগুন লাগানোর সবচেয়ে উপযুক্ত জায়গা হলো গোয়াল ঘর। ওটার চালটা খড়ের তৈরী। বাড়িটা চুপচাপ, গোয়াল ঘরটাও নিস্তব্ধ। তার মানে গরুগুলো ঘুমিয়ে আছে। গরুরা দিনের বেলায়ও চুপ থাকে। জেগে থাকলেও গরুগুলো তার কাজে বাধা হয়ে দাঁড়াবে না এটা নিশ্চিত।

ম্যাচের কাঠির বদলে মিনোসুকে কিছু চকমকি পাথর এনেছিল। সে বাড়ি থেকে বের হবার আগে স্টোভের আশপাশে ম্যাচের খোঁজ করেছিল কিন্তু পায়নি। ভাগ্যক্রমে চকমকি পাথর পেয়ে গিয়েছিল।

মিনোসুকে চকমকি দিয়ে আগুন জ্বালালো। আগুনের শিখা নেচে উঠলো সাথে সাথে কিন্তু সেটা ছড়িয়ে পড়ছে না খড়গুলো একটু আদ্র ছিল বলে। কী ফালতু এই জিনিস, ঠিকমতো আগুনটাও ধরছে না। মনে মনে ভাবলো সে। ওদিকে আগুনের শিখা না বাড়লেও চকমকির ঠোকাঠুকি শুনে বাড়ির লোকেরা জেগে গেল।

মিনোসুকে রাগে গজগজ করতে করতে বললো-’শালার চকমকি, আমার আসলে একটা ম্যাচ নিয়ে আসা উচিত ছিল। এসব পুরোনো জিনিস এ যুগে অচল’

কথাটা বলার পরপর মিনোসুকের মাথায় একটা ভাবনা চক্কর দিয়ে উঠলো। কী যেন বলেছিল সে? ‘এসব পুরোনো জিনিস এ যুগে অচল’…..’এসব পুরোনো জিনিস এ যুগে অচল’….বারবার তার মগজে কথাগুলো ঘাই দিতে লাগলো।

উজ্জ্বল একটা চাঁদ যেভাবে অন্ধকার রাতকে আলোয় ভরিয়ে দেয় ঠিক তেমনি ওই বাক্যটা মিনোসুকের মাথা থেকে প্রাচীন অন্ধকার দূর করে আলো জ্বালিয়ে দিল। এখন সে পরিষ্কার বুঝতে পারলো সে কী ভুল করতে যাচ্ছিল। লণ্ঠন ছিল বিগত যুগের জিনিস যা এ যুগে অচল। এই আধুনিক যুগে বিদ্যুতের আলোই সর্বোৎকৃষ্ঠ। এটার কারণেই সারা পৃথিবী বদলে গেছে। এভাবেই আধুনিকতা এগিয়ে যায়। আধুনিক জাপানের নাগরিক হিসেবে মিনোসুকে নতুন প্রযুক্তির জন্য গর্ববোধ করতে শুরু করলো। তার ব্যবসা বসে যাওয়ার অর্থ হলো যুগ এগিয়ে যাচ্ছে। এবং সে এখানে এমন একটা মানুষের ঘরে আগুন দিতে এসেছে যে কোন ভুল করেনি। তাকে কোন ভুতে পেয়েছিল এই কুৎসিত কাজটা করতে এসেছিল। পৃথিবী যেভাবে বদলে গেছে, মিনোসুকেকেও সেভাবে বদলে নিতে হবে নিজেকে। সে এই ব্যবসা সরিয়ে রেখে নতুন কোন ব্যবসায় নামবে।

মিনোসুকে বাড়ি ফিরে গেল। সে তার স্ত্রীকে জাগিয়ে বাড়ির সবগুলো লণ্ঠনে কেরোসিনে ভর্তি করে জ্বালিয়ে দিল। তার স্ত্রী জানতে চাইলো সে আসলে কী করতে যাচ্ছে? মিনোসুকে বুঝতে পারলো তার স্ত্রী তাকে বাধা দিতে পারে, তবু সে কিছু বললো না। তার বাড়িতে পঞ্চাশটার মতো লণ্ঠন ছিল, সবগুলো কেরোসিনে পরিপূর্ণ করা হলো। প্রতিদিন সে যেভাবে কাজে বের হয়, ঠিক সেভাবে মিনোসুকে সবগুলো লণ্ঠনকে তার ঠেলাগাড়িতে ঝুলিয়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল। এবার সে ম্যাচটা নিতে ভুল করলো না।

রিজের পশ্চিম দিকের রাস্তাটা চলে গেছে হান্দা পুকুরের পাশ দিয়ে। বসন্তের সময় পুকুরটা যখন ভরে ওঠে তখন এর স্বচ্ছ উপরিভাগ চন্দ্রালোকে চিকচিক করতে থাকে। বেশ কিছু উইলো আর অন্যন্য ঝোপঝাড় পুকুরের উপর ঝুঁকে আছে।

এদিকের রাস্তায় একটা জনপ্রাণীর চিহ্নমাত্র নেই। ঠিক ওই কারণে মিনোসুকে জায়গাটা বেছে নিয়েছিল। মিনোসুকে একে একে প্রতিটি লণ্ঠন জ্বালালো। সবগুলো জ্বালানো হয়ে গেলে সে ওগুলোকে গাছের শাখায় ঝুলিয়ে দিতে শুরু করলো। যখন একটা গাছ ভার নিতে পারছে না, তখন পরের গাছে ঝোলানো শুরু করলো। এভাবে সে সবগুলো লণ্ঠনকে তিনটা আলাদা গাছের শাখায় শাখায় ঝুলিয়ে দিল।

থম ধরা সেই রাতে লণ্ঠন কিংবা তার শিখা দুটোই স্থির অচঞ্চল হয়ে ছিল। লণ্ঠনের আলোতে সমগ্র এলাকা দিবালোকের মতো আলোকিত। তারই মধ্যে ছুরির ফলার মতো জল কেটে এগিয়ে আসছে মাছের দল, বাতিগুলো ছুঁয়ে দেখার বাসনায়।

‘এভাবেই আমি আমার ব্যবসার সমাপ্তি ঘটালাম’ - আপনমনে মিনোসুকে বললো। কিন্তু সে ওখান থেকে নড়তে পারলো না। সে দীর্ঘ সময় ধরে লণ্ঠন শোভিত বৃক্ষগুরোর দিকে তাকিয়ে থাকলো। সে এই লণ্ঠনগুলোকে ভালমতন চিনে। কত গভীর সেই চেনাজানা।

‘এমন করে আমি আমার ব্যবসার অবসান ঘটালাম’ বিড়বিড় করতে করতে মিনোসুকে এবার পুকুরের উল্টোদিকে চলে গেল। সেখান থেকে সে দেখতে পেলো লণ্ঠনগুলো থেকে ঠিকরে আলো বের হচ্ছে। প্রায় পঞ্চাশটি বাতি। আরো পঞ্চাশটির প্রতিবিম্ব জ্বলছে নীচের পুকুরে। মিনোসুকে তাদের দিকে দীর্ঘ সময় তাকিয়ে থাকলো। কত প্রিয় এই লণ্ঠনগুলো।

কিছুক্ষণ পর মিনোসুকে পায়ের কাছ থেকে একটা পাথর কুড়িয়ে নিল। তারপর সে সবচেয়ে বড় লণ্ঠনকে লক্ষ্য করে সর্বশক্তি প্রয়োগ করে পাথরটা ছুড়ে মারলো। মুহুর্তেই একটা কর্কশ শব্দে লণ্ঠনটি ভেঙে পড়ে নিভে গেল।

‘তোমাদের দিন শেষ। পৃথিবী এগিয়ে যাচ্ছে।’ বলতে বলতে সে আরেকটা পাথর কুড়িয়ে দিয়ে দ্বিতীয় লণ্ঠনকে লক্ষ্য করে ছুড়লো। ওটাও ভেঙ্গে চুরচুর হয়ে নিভে গেল।

‘পৃথিবী এগিয়ে যাচ্ছে। এটা বিদ্যুতের যুগ।’ বলতে বলতে তৃতীয় লণ্ঠনটিও ভেঙ্গে দিল পাথর ছুড়ে। মিনোসুকের চোখ দুটো ভিজে আসছে। সে চোখে এমন ঝাপসা দেখছিল যে লক্ষ্যবস্তুকে খুঁজে পাচ্ছিল না।

এভাবেই মিনোসুকে তার লণ্ঠন ব্যবসার অবসান ঘটিয়েছিল। তারপর সে বাড়ি ফিরে এল এবং নতুন একটা ব্যবসা খুলে বসলো। সে একটা বইয়ের দোকান দিল।

‘মিনোসুকে এখনো সেই বুকস্টোরটি চালায়’- বলে তোইচির দাদা গল্পের সমাপ্তি টানলেন। ‘তবে সে এখন খুব বুড়ো হয়েছে বলে তার ছেলে দোকানটি দেখাশোনা করে।’ তিনি ঠাণ্ডা হয়ে যাওয়া চায়ের কাপে চুমুক দিলেন। তোইচি কিছুক্ষণ দাদার দিকে তাকিয়ে থাকলো। কিছুক্ষণ পর সে উঠে বসলো এবং হাত দুটো রাখলো দাদার হাঁটুর উপর।

“বাকী ৪৭টা লণ্ঠনের কী হলো তারপর?”

“কে জানে? হয়তো কোন পথচারী কুড়িয়ে নিয়েছে সেগুলো।”

“তাহলে বাড়িতে তোমার কাছে আর কোন লণ্ঠন নেই”

তিনি স্টোররুম থেকে তোইচির খুঁজে পাওয়া লণ্ঠনটির দিকে তাকিয়ে বললেন- “মাত্র একটি”

“কী নিদারুণ অপচয়। আমি নিশ্চিত ওগুলো কেউ না কেউ কিনে নিত”- তোইচি বলল।

“সত্যি অপচয়। এখন আমি ওগুলো সম্পর্কে যখন ভাবি আমার মনে হয় আমি ওগুলো সস্তায় বিক্রি করে দিতে পারতাম। যদিও আমাদের শহরে বিদ্যুত চলে আসে তবুও পঞ্চাশটা লণ্ঠন আমি সহজেই বিক্রি করতে পারতাম। আমাদের দক্ষিণের গ্রাম ফুকুদানিতে এখনো লণ্ঠন ব্যবহার করে। তাছাড়া আরো অনেক গ্রামে দীর্ঘ সময় ধরে লণ্ঠন ব্যবহার চালিয়ে গেছে। কিন্তু তখন আমার রক্ত গরম ছিল। আমি অত কিছু ভেবে দেখিনি।”

“হ্যাঁ খুব বোকামো করেছো তুমি” তোইচি তার নিষ্পাপ বালকোচিত স্বরে মতামত দিল।

“বোকামি হয়েছিল তা সত্যি। কিন্তু তোইচি….”তোইচির দাদা তার পৌত্রের হাতদুটো আঁকড়ে ধরে বললো- “আমি যে আচরণ করেছিলাম সেটা নিরেট গাধামি ছিল কোন সন্দেহ নেই, কিন্তু আমি মনে হয় আমি যেভাবে আমার ব্যবসা ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম সেটা ছিল খুব দর্শনীয়। আমি তোমাকে যেটা বলতে চাইছি, যদি তোমার ব্যবসা জাপানের অগ্রগতিতে কোন কাজে না লাগে, তাহলে সেটা বাদ দিয়ে দাও। কেউ যদি তার পুরোনো বাতিল ব্যবসাকে অন্ধের মতো আঁকড়ে ধরে বলতে চায় যে পুরোনো দিনের জিনিসগুলোই ভালো, তাহলে বুঝতে সে প্রগতির পথে বাধা এবং তার আত্মবিশ্বাসের অভাব রয়েছে।”

তোইচি তার দাদার দিকে তাকালো। যার মুখটা যদিও ছোট কিন্তু দারুণ উদ্ভাসিত। অবশেষে সে বললো, ‘বেশ দাদু, আমার মনে হয় তুমি ঠিক কাজটি করেছিলে।” তারপর একটু পরিণত মানুষের চাহনি দিয়ে সে পুরোনো লণ্ঠনটির দিকে ফিরে তাকালো।
-------------

 
লেখক পরিচিতি:

জাপানের হ্যান্স ক্রিশ্চিয়ান এণ্ডারসন নামে পরিচিত নানকিচি নিইমি জন্মেছিলেন ৩০শে জুলাই ১৯১৩ সালে। খুব অল্প বয়স থেকে তাঁর মধ্যে সাহিত্য প্রতিভার স্ফূরণ দেখা দিয়েছিল। ১৮ বছর বয়সে তিনি টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে পড়তে যান। পড়াশোনার পাট চুকানোর পর তিনি টিবিতে আক্রান্ত হয়ে নিজের শহরে ফিরে আসেন। সেখানে একটি বালিকা স্কুলে শিক্ষকতার কাজ নেন। সাথে সাথে তিনি সাহিত্যচর্চা করতে থাকেন। অল্পসময়ের মধ্যে তিনি লিখে ফেলেন বিশ্বসাহিত্যে স্থান পাওয়ার যোগ্য বেশ কিছু গ্রন্থ। তাঁর লেখা উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলো হলো- Gon, the Little Fox, Buying Mittens, Grandfather’s Lamp, Hananoki Village and the Thieves, A Tale of Ryôkan: a Ball and a Child at a Basin তিনি বেশিদিন লেখালেখি করতে পারেননি। মাত্র ২৯ বছর বয়সেই অসুস্থ হয়ে পরলোকগমন করেন।


অনুবাদক পরিচিতি:
হারুন রশীদ
গল্পকার। অনুবাদক। ইতিহাস গবেষক
প্রকাশিত গ্রন্থ: ‘উপনিবেশ চট্টগ্রাম: ৫০০ বছরের ধারাবাহিক ইতিহাস' এবং
'International Trade Management'.
 চট্টগ্রামে থাকেন।


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন