মঙ্গলবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২১

আব্দুলরাজাক গুরনাহর নোবেল জয় ও এর অভিঘাত :

“তাঁর চমৎকার ও সময়সংবেদী উপন্যাসগুলো ইংরেজি ভাষাভাষী মানুষদের বাইরের সাহিত্যের প্রভাবে প্রাণবন্ত।”
--------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------
এই প্রবন্ধটি ১০ অক্টোবর,২০২১ তারিখে প্রকাশিত হয়েছে দি নিউ ইয়র্কার পত্রিকায়। এ সময়ের অন্যতম লেখক -প্রাবন্ধিক ক্রিস্টেন রূপেনিয়ান সদ্য নোবেল পুরস্কার প্রাপ্ত কথাসাহিত্যিক আব্দুলরাজাক গুরনাহপাঠ বিষয়ে লিখেছেন। অনুবাদ করেছেন আফ্রিকান সাহিত্যবিশেষজ্ঞ ড: এলহাম হোসেন।

মূল: ক্রিস্টেন রূপেনিয়ান
অনুবাদ: এলহাম হোসেন

২০০৯ সালে যখন আমি উত্তর-ঔপনিবেশিক সাহিত্যে হাতে-কলমে পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম, তখন প্রথম গুরনাহর উপন্যাসের সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটে। সে-সময়ের পঠন-পাঠনে তাঁর ব্যাপারে যে বিষয়টি আমার এখন সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে, তা হলো- তাঁর লিখনশৈলী। এটি আমার মধ্যে ব্যাপকভাবে বিশ্লেষণমূলক সংবেদনশীলতাকে উস্কে দেয়। তখন স্নাতকের ছাত্র থাকাকালীন কোন উপন্যাস পড়ার সময় সেই বইয়ের কোন পাতার মার্জিনে হিজিবিজি প্রশ্নবোধক চিহ্ন না দিয়ে, আবেগসূচক চিহ্ন ব্যবহার না করে, বা অসার কোন মন্তব্য না লিখে সেই পাতা আমি উল্টাতাম না। সে-সময় ১৯৯৪ সালে প্রকাশিত গুরনাহর পূর্ব-আফ্রিকার ঔপনিবেশিক অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করে রচিত প্যারাডাইস উপন্যাসটির মধ্যে কেমন যেন এক ধরনের আনন্দের সঙ্গে ডুবে ছিলাম, তা এখনও মনে পড়ে। বইটির নাড়া দেওয়ার বিশাল ক্ষমতা, যৌনতার বিষয়ের অবতারণা, প্রধান চরিত্রের স্বপ্নালুতা, আগ্রাসী ও আধিপত্যবাদী ঔপনিবেশিকতার করালগ্রাসে স্থানীয় বহুসংস্কৃতির ধারক-বাহক জাতির ত্রাহি অবস্থা ইত্যাদি, যেগুলো এক সময় আমি নোট করতাম, সেগুলো লেখার জন্য আবার কলম ধরলাম।

কয়েক বছর পর ক্লাসে উত্তর-ঔপনিবেশিক সাহিত্য পড়াতে গিয়ে আমি গুরনাহর ষষ্ঠ উপন্যাস বাই দ্য সী পড়াতাম। বইটি জানজিবারের দু’জন লোকের মধ্যকার সম্পর্কের টানাপোড়েনের উপর আলোকপাত করেছে। এরা অনেক বছর পর ইংল্যান্ডে মিলিত হয়েছে। ইতিহাস, আত্মপরিচয় এবং স্মৃতিচারণা এই উপন্যাসের আখ্যান জুড়ে রয়েছে। কিন্তু আমার যতদূর মনে পড়ে, (স্বীকার করতে বাধা নেই যে, আমার স্মৃতিশক্তি বেশ বাজে) যতটা আশা করেছিলাম, উপন্যাসটি আমাকে ততটা টানতে পারেনি। বাই দ্য সী একটি দীর্ঘ ও অতিনিবিষ্ট উপন্যাস। এর মূল ফোকাস চরিত্রগুলোর উপর। এটি তর্ক নয়, বরং অভিজ্ঞতাকে উস্কে দেয়।

গুরনাহ যখন বৃহস্পতিবারে নোবেল পুরস্কার লাভ করলেন তখন আমার পূর্বনির্ধারিত সব কাজ বাদ দিয়ে তাঁর ২০১৭ সালে রচিত গ্রাভেল হার্ট উপন্যাসটি পড়তে শুরু করে দিলাম। এটি বেছে নেওয়ার কারণ:

 আমি আগে এটি পড়িনি
 এর শিরোনাম নিয়েও আমার কৌতুহল ছিল।
 কিন্ডেল-এর কাছ থেকে এটি সংগ্রহ করা যায় এবং
 স্ট্রান্ডের রাস্তার ধারের বইয়ের দোকানে এর মাত্র অল্প কয়েকটি কপি ছিল।
আমি বলব, গ্রাভেল হার্ট বিষাদমাখা, স্মৃতি-জাগানিয়া এবং খুব মজার একটি উপন্যাস। এটি পড়ে শরতের বিকেল কাটানো যায় যদিও আমি মনে করি, নোবেল কমিটি গুরনাহর প্যারাডাইজ উপন্যাসটিকে তাঁর প্রধান কাজ হিসেবে উল্লেখ করে সম্ভবত সঠিক কাজই করেছে।

গ্রাভেল হার্ট শুরু হয়েছে আকর্ষণীয় এবং কিছুটা প্রবঞ্চনামাখা আত্মবিশ্বাস নিয়ে: আমার বাবা আমাকে চাননি,” উপন্যাসের প্রথম ছত্রে এর কথক সালিম এ কথা ঘোষণা করে। সালিমের বাবা-মা’র ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হওয়ার পেছনের কারণগুলো একটি বয়ানে হাজির করা হয়। এটি কখনও সামনে এগোয়, আবার কখনও পেছনে সরে যায়। মনে হয় যেন উপন্যাসের গল্প প্রায়ই এর মূল বিষয় থেকে সরে যায়। এরপর উপন্যাসের শেষ তৃতীয়াংশে সালিমের বাবা ফিরে এসে বর্ণনার সবগুলো সুতো একসাথে বেঁধে ফেলেন। গুরনাহর স্বভাবসূলভ লিখনশৈলী অনুসরণ করে উপন্যাসটির আখ্যান-প্রবাহ বর্ণনার স্বাভাবিক গতিপথ থেকে বিচ্যুত হয়েছে। নানান বিষয়ের মধ্যে ছড়িয়ে গেছে, যেমন- ফটোগ্রাফ, চিঠিপত্র এবং অন্যান্য শিল্পবস্তু নিয়ে ভাবনায় আটকে যাওয়া, সংবেদী অতীতের স্মৃতিচারণা, বিভিন্ন ঘটনা সংক্রান্ত সংক্ষিপ্ত বিবরণী, অনুমানভিত্তিক কাহিনী, বাস্তুচ্যুত মানুষদের অসংলগ্ন স্মৃতিকথা ইত্যাদি। ইতোমধ্যে সালিমের বাবার গল্প বেশ দ্রুত এগিয়ে চলে। এটি সেইসব মানুষদের একটি নির্মল ও সাবলীল আখ্যানের গল্প যারা সারা জীবন শুধুই একটি অনুত্তোর প্রশ্নেরই উত্তর খোঁজার জন্য হাঁচড়পাঁচড় করে বাঁচে। প্রশ্নটি হলো: কেন আমার এমন হলো?

তরুণ বয়সে সালিম ইংল্যান্ডে বসবাসের উদ্দেশে আফ্রিকা ছাড়ে। সেখানে প্রচন্ড পারিবারিক বাধা স্বত্তেও সে সাহিত্য নিয়ে পড়াশুনা করে। উপন্যাসের কাহিনীর বেশিরভাগ অংশ জুড়ে সে ওখানেই কাটায়। বছরের পর বছর দূর থেকে সম্পর্কের চিড় খাওয়ার কথা নিস্ফলভাবে ভাবতে ভাবতে অবশেষে সে বাড়ি ফিরে তার বাবার মুখোমুখি হয়। বইটির শেষের দিকে যখন সালিমের বাবা তাঁর বয়ান হাজির করা শেষ করেন, তখন সালিম তাকে জিজ্ঞাসা করে, “আপনি কি কখনও মেজার ফর মেজার পড়েছেন? উত্তরে বাবা বলেন, তিনি কখনই শেক্সপীয়র ভালোভাবে বোঝেননি (ওর গৌরচন্দ্রিকার মধ্যকার বিস্ময় প্রকাশক শব্দ, পাত্রপাত্রীর মঞ্চ থেকে প্রস্থানের ব্যাপার-স্যাপার, অন্যের কথা শোনার বিষয়- এসবের কিছুই আমি কখনই বুঝিনি।)। এবার সালিম একটি ক্লান্তিকর আখ্যান-সারাংশ দিতে শুরু করলো। ওর কথার সারবত্তা হলো- ওদের পরিবারের করুণ কাহিনী মেজার ফর মেজারের কাহিনীরই প্রতিফলন। তবুও ওদের নিজেদের গল্পে ওদের বাবার ভূমিকা এতটাই তুচ্ছ যে, শেক্সপীয়রের নাটকের কোন গল্পের সঙ্গে এর কোন তুলনা হয় না।

তার নিরাবেগ দায়সারাভাবের এমন বুদ্ধিদীপ্ত সমালোচনার জন্য তার বাবা হতবুদ্ধি হয়ে গেলেন। “তাহলে শেক্সপীয়র আর পড়ার জন্য মাথা ঘামাব না,” তিনি বললেন। “এতে যদি আমার কোন অংশগ্রহণ না-ই থাকে তবে পড়ে লাভ কি।” পিতা-পুত্রের এই কথোপকথনের মধ্য দিয়ে পশ্চিমা সাহিত্য-ধারা কিভাবে অন্যদের আলিঙ্গন করার কথা বলেও চিলেচ্যাপ্টা করে ছাড়ে, তার চিত্রায়ণ ফুটে উঠেছে। অথবা যে সংস্কৃতি আপনার নিজের সংস্কৃতিকে বাস্তব বলেই স্বীকৃতি দিচ্ছে না, তাকে আলিঙ্গন করতে গিয়ে আপনি কিভাবে একা হয়ে যান, তার চিত্রায়ণ এখানে পাওয়া যায়। ইংরেজি মাতৃভাষা না হওয়া স্বত্তেও যাঁরা এই ভাষাকেই লেখার মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছেন, গুরনাহ তাঁদের অনেকের মতই ভিন্ন সংস্কৃতি, এর প্রভাব এবং এর সঙ্গে নিজ সংস্কৃতির গভীর ব্যবধান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

২০০৪ সালে রচিত ‘রাইটিং এণ্ড প্লেস’ প্রবন্ধে গুরনাহ লেখেন, “আমি মনে করি লেখক প্রথমে পড়তে থাকেন। তারপর পড়তে পড়তে এক পর্যায়ে লিখতে শুরু করেন। অর্থাৎ পড়তে পড়তে যখন অনেক কথা জমে যায়, তখন সেগুলো তাঁকে লিখতে সক্ষম করে তোলে।” তিনি পঠনের ক্রমান্বয়ে পরিবর্তনের কথাও বলেছেন। এটি তাঁর অভিজ্ঞতার ঝুলিকে সমৃদ্ধ করেছে। তাঁর সীমিত সামর্থ্য, জানজিবারে বেড়ে ওঠা, মাতৃভাষায় রচিত সাহিত্যের পাঠ অর্থাৎ কিশোয়াহিলি ভাষার সাহিত্যে তাঁর বিচরণ, শিকড়ছিন্ন ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শিক্ষা, যা তিনি সেখানে গ্রহণ করেছিলেন- সবই তাঁর অভিজ্ঞতাকে সমৃদ্ধ করেছে। স্থানীয় মসজিদে কুরান শিক্ষা এবং তরুণ উদ্বাস্তু হিসেবে ইংল্যান্ডে পালিয়ে গিয়ে ইংরেজি ভাষাকে পাঠের বিষয় হিসেবে গ্রহণ করা ইত্যাদি তাঁর অভিজ্ঞতার সঞ্চয় বাড়িয়েছে।

আমি বিশ্বাস করি, শুধু গুরনাহ কেন, যেকোন লেখককেই মূল্যায়ন করতে গেলে তিনি যে ঐতিহ্যের মধ্যে বসবাস করেন, তার সম্বন্ধে জানতে হয়। যে বইগুলোর পঠন তাঁর অভিজ্ঞতার ঝুলি পূর্ণ করে, সেগুলো সম্বন্ধে জানতে হবে। তা না হলে লেখক কী বলতে চাচ্ছেন, তা আমরা জানব কিভাবে? তাঁর স্বর, পরোক্ষ উদ্ধৃতির ব্যবহার এবং বইগুলোর মধ্যকার আন্তঃসম্পর্ক জানা কিভাবে সম্ভব? ইংরেজি ভাষার অসাধারণ সাংস্কৃতিক আধিপত্যের কারণে এই ভাষাভাষী পাঠকদের একটা সুবিধা আছে। নোবেলজয়ী লেখকরা যে ঐতিহ্যকাঠামোর মধ্যে থেকে লেখেন, তার এক বিরাট অংশের মধ্যে এরা ঢুকে পড়তে পারেন। এমনকি যে লেখকগণ ইংরেজিতে লেখেন না, তাঁরাও কিছু ইংরেজি ক্লাসিক পড়ে থাকেন। অন্ততপক্ষে অনুবাদে তো বটেই। এটি অন্যসব প্রভাবকে সহজে পাশকাটাতে সাহায্য করে, যেমন- কিশোয়াহিলি কবিতা, ইসলামিক গল্প এমনকি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক কালের স্কুলের সেকেলে বই যেগুলো সারা বিশ্বের সকল প্রজন্মের চিন্তাকে অবয়ব দান করেছে।

প্রতি বছর নোবেল কমিটি বিশ্বসাহিত্যের বিশাল এক সমদ্র থেকে একজনকে বেছে নেয়। তাঁকে পক্ষপাত দেখিয়ে বাকি সব লেখকের মধ্যে তাকে বড় বলে ঘোষণা করে। এটি অবশ্য সুস্পষ্টভাবে বিভ্রান্তিকর। অনেক লেখক আছেন যাঁদের অনেকেরই অভিজ্ঞতার ঝুলি পূর্ণ। এঁরা একে অপর থেকে অনেক অনেক আলাদা। এঁদেরকে একে অপরের সঙ্গে তুলনা করার যুৎসই কোন মাপকাঠি নেই। আমরা নিজেদের লেখক হিসেবে কল্পনা করি বা না করি, নোবেল কমিটির সিদ্ধান্ত লেখককে ঘনিষ্ঠভাবে পাঠ করতে আমাদের সবাইকে উদ্বুদ্ধ করে।

যেইমাত্র নোবেলজয়ী লেখকের নাম ঘোষণা করা হয়, তখনই আমরা তাকে নিয়ে ভাবতে শুরু করি। বলি, আহা, ‘এক্স’ হলে ভালোই হতো। যখন গুরনাহর প্যারাডাইস উপন্যাসের ফুরিয়ে আসা ব্যবহৃত কপি কেনার জন্য হুড়োহুড়ি লেগে গেছে (অথবা অ্যামাজনে বাই দ্য সী এখন বিক্রি হচ্ছে নয়শত চুয়াত্তর ডলারে), তখন এই ফাকে আমরা গুরনাহর অন্য দু’একটা বই সংগ্রহ করে পড়ে ফেলতে পারি। এতে গুরনাহকে গভীরভাবে মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে। হতে পারে কিশোয়াহিলি কবিতা বা ভ্রমণ কাহিনী অথবা “দ্য থাউজেন্ড এন্ড ওয়ান নাইট অথবা পূর্ব-আফ্রিকার অপর মহান লেখক নগুগি ওয়া থিয়োং’ওর কোন উপন্যাস ... বা শেক্সপীয়রের মেজার ফর মেজার, যা আমি নিজে কখনই পড়িনি বলে স্বীকার করছি।


লেখক পরিচিতি
ক্রিস্টেন রূপেনিয়ান
জন্ম ১৯৮২ সাল।
আমেরিকান লেখক। প্রাবন্ধিক। 
ইংরেজি সাহিত্যে পিএইচডি। 






অনুবাদক
এলহাম হোসেন
ইংরেজি সাহিত্যে পিএইচডি।
পেশা : অধ্যাপনা।
অনুবাদক। প্রাবন্ধিক।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন