মঙ্গলবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২১

মো ইয়ান'এর গল্প: লোহার বাচ্চা

বাংলা অনুবাদ: অমিতাভ চক্রবর্ত্তী

‘লোহা গলিয়ে দুরন্ত উত্তরণ’ প্রচার পর্বের (গ্রেট লিপ ফরওয়ার্ড স্মেলটিং ক্যাম্পেইন-এর) সময় চলছিল তখন। সরকার প্রায় দুশো হাজার শ্রমিক জোগাড় করেছিল একটা কুড়ি মাইল লম্বা রেললাইন বানানোর জন্য। আড়াই মাসের মধ্যে কাজটা শেষ করা হয়েছিল। এই রেল লাইনের উপরের দিকটা জুড়ে দেওয়া হয়েছিল গাওমি স্টেশনের জিয়াওজি লাইনের সাথে। আর নিচের দিকটা ছড়িয়ে রয়েছিল উত্তর-পূর্ব গাওমি শহরতলীর ঝোপড়ি অঞ্চলের অসংখ্য রেল লাইনের মধ্যে।  
আমার বয়স তখন চার কি পাঁচ, জনতা ক্যান্টিনের পাশে একটা নার্সারী স্কুলে আমাদের সব্বাইকে একসাথে জড়ো করে রাখা হয়েছিল। এক সারিতে পাশাপাশি পাঁচটা মাটির বাড়ি, তাদের ঘিরে তার দিয়ে বাঁধা চারাগাছের ছয় কি সাত ফিট লম্বা বেড়া। বড় বড় কুকুরগুলোও সেই বেড়া ডিঙ্গোতে পারেনা, আমাদের মত ছোট বাচ্চাদের ত কথাই নেই। আমাদের বাবা, মা কি বড় ভাইবোনেদের - এক কথায় বলতে গেলে, একটা নিড়ানী কি বেলচা ধরতে পারে এমন সব্বাইকে - বাধ্যতামূলকভাবে শ্রমিক ব্রিগেডে নিয়ে নেওয়া হয়েছিল। তারা খেত, ঘুমাত ঐ কাজের জায়গাতেই। ফলে, একটা লম্বা সময় ধরে আমরা তাদের দেখা পাইনি। আমাদের “নার্সারী স্কুল” জেলখানাটির দায়িত্ব দেওয়া ছিল ডিগডিগে রোগা তিন কঙ্কালসার বুড়ি মহিলার হাতে। তিনজনের একই রকম বাজপাখীর ঠোঁটের মত নাক আর কোটরে বসা চোখ। দেখাত যেন তিনজনে একে অপরের হুবহু প্রতিরূপ - ক্লোন। প্রতিদিন তারা তিন কড়াই বুনো শাকসব্জি দেওয়া পরিজ বানাত: সকালের এক কড়াই, দুপুরের একটা, আর সন্ধ্যার জন্য আরেকটা। ক্ষুধার্ত নেকড়ের মত হামলে পড়ে সেই খাবার আমরা গোগ্রাসে খেয়ে যেতাম যতক্ষণ না আমাদের ছোট ছোট পেটগুলো ফুলে শক্ত জয়ঢাক হয়ে যেত। তারপর আমরা বেড়ার কাছে গিয়ে বাইরের দৃশ্যের দিকে চেয়ে থাকতাম। বেড়ার উইলো আর পপলারের গা থেকে নূতন ডালপালা বেরিয়েছে। যে সব ডালে কোন পাতা নেই সেগুলো এর মধ্যেই শুকোতে শুরু করে দিয়েছে। এখনই ছেঁটে না ফেললে ওগুলো থেকে বড় বড় কানের মত দেখতে কিংবা ছোট ছোট সাদা কাঠ-ছত্রাক বেরিয়ে আসবে।

প্রাণভরে ঐ ছোট ছত্রাকগুলো খেতে খেতে আমরা বেড়ার ওপাশের রাস্তা দিয়ে লোক চলাচল দেখতাম। বাইরের শহর থেকে আসা শ্রমিকরা এদিক থেকে ওদিকে চলে যেত। নোংরা লোকজন সব, অগুন্তি, মাথায় জটা পড়া চুল। সেই সব লোকজনের মধ্যে আমরা আমাদের নিজের লোকজনদের খুঁজতাম, আমাদের চোখ জলে ভেসে যাচ্ছে, আমরা জিজ্ঞেস করতাম:
“ও কাকু, বলোনা, আমার বাবাকে দেখেছ তুমি?”
“ও কাকু, বলোনা, আমার মাকে দেখেছ তুমি?”
“আমার দাদাকে দেখেছ?”
“আমার দিদিকে দেখেছ?”
তাদের কেউ কেউ আমাদের উপেক্ষা করত যেন তারা কোন কথা শুনতেই পায় না। কেউ আবার ঘাড় ঘুরিয়ে আমাদের দিকে চকিতে তাকাত, তারপর মাথা ঝাঁকাত। কিন্তু কেউ কেউ থাকত যারা হিংস্রভাবে আক্রমণ করত আমাদের -
“এদিকে আয়, ছ্যাঁচড়া বেজম্মার গুষ্টি!”
 
তিন বুড়ি দরজায় বসে থাকত, আমাদের দিকে কোন নজর নেই তাদের। ছ-ফুট লম্বা গাছের বেড়া টপকানো আমাদের সাধ্যের বাইরে, আর গাছের চারাগুলো এত গায়ে গায়ে লাগা, তাদের ফাঁক গলেও বের হওয়া যাবে না।
 
বেড়ার এ পাশে আমাদের নজরদারীর জায়গা থেকে আমরা দেখতে পেতাম দূরে একটা মাটির ড্রাগন ধীরে ধীরে মাথা চাড়া দিয়ে ঊঠছে আর সেই ড্রাগনের পিঠ বেয়ে লোকজনের বড় বড় দল ব্যস্ত হয়ে ওঠা-নামা করছে, যেন পাহাড়ের গা বেয়ে পিঁপড়ের দঙ্গল চলেছে। আমাদের বেড়ার সামনে দিয়ে যে মজুররা যাতায়াত করত তারা বলত ঐখানে রেল লাইন বসাবার জন্য শক্ত জমি বানানো হচ্ছে। আমাদের মা-বাপ-ভাই-বোন-আত্মীয়রা ছিল ওই মানুষ-পিঁপড়ে কলোনীর বাসিন্দা। থেকে থেকে লোকজনেরা হঠাৎ করে সেই ড্রাগনের পিঠে হাজার হাজার লাল পতাকা পুঁতে দিত। আবার অন্য কখনো হাজার হাজার সাদা পতাকা লাগিয়ে দিত। তবে বেশির ভাগ সময় কোন পতাকাই থাকতনা। কিছু পরের দিকে ড্রাগনের চূড়ায় অসংখ্য চকচকে জিনিস এসে হাজির হল। পথ-চলতি মজুররা বলত ওগুলো সব ইস্পাতের রেল লাইন।

একদিন এক বালি-রঙা চুলের তরুণ বয়সী লোক রাস্তা ধরে হেঁটে এল। লোকটা এত লম্বা যে মনে হচ্ছিল স্রেফ হাত তুলে আমাদের বেড়ার মাথা ছুঁয়ে ফেলবে। আমরা যখন আমাদের নিজেদের লোকদের কথা জিজ্ঞেস করলাম, আমাদের অবাক করে দিয়ে সে হাঁটতে হাঁটতে বেড়ার এ পাশে পর্যন্ত চলে এল, উবু হয়ে বসল, আহ্লাদ করে আমাদের কারো নাক ঘষে দিল, কারো পেটে খোঁচা দিল, কারো বা ছোট নুনু ধরে চিমটি কেটে দিল। এই প্রথম কোন লোক আমাদের কোন প্রশ্নের উত্তর দিল।
“কি নাম বললি তোর বাপের?”
“ওয়াং ফুগুই”
“আঃ, ওয়াং ফুগুই,” নিজের থুতনি ঘষতে ঘষতে উত্তর দিল সে, “চিনি ত, ওয়াং ফুগুইকে চিনি আমি।”
“তুমি জান, কবে সে এসে আমায় নিয়ে যাবে?”
“সে আর আসবে না। কদিন আগে ইস্পাতের রেল বয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় তার নীচে পিষে মরে গেছে।”
“ওয়া…” হেঁচকি তুলে কাঁদতে রইল একটা বাচ্চা।
“আমার মাকে দেখেছ তুমি?”
“কি নাম তোর মায়ের?”
“ওয়ান চিউলিং।”
“আঃ, ওয়ান চিউলিং,” থুতনি ঘষতে ঘষতে জবাব দিল সে, “ওয়ান চিউলিংকে চিনি আমি।”
“তুমি জান, কবে সে এসে আমায় নিয়ে যাবে?”
“সে আর আসবে না। এই সেদিন রেলের নীচে পাতার কাঠ বয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় তার নীচে চাপা পড়ে থেঁতলে মরে গেছে।”
“ওয়া…” আর একটা বাচ্চা ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল।
একটুক্ষণের মধ্যেই আমরা সবাই ফোঁপাতে লাগলাম। বালি-রঙা চুলের লোকটা উঠে দাঁড়িয়ে শিস দিতে দিতে চলে গেল।

দুপুর থেকে শুরু করে সূর্য ডুবে যাওয়া পর্যন্ত কেঁদে গেলাম আমরা। বুড়িগুলো যখন আমাদের রাতের খাবারের জন্য ডেকে নিয়ে গেল তখনো কেঁদে যাচ্ছিলাম আমরা। “বলি, কান্নাকাটি কিসের?” খিঁচিয়ে উটল তারা। “কান্না না থামাস যদি, তোদের ধরে ধরে মরা মানুষের গর্ত্তে ফেলে দিয়ে আসব।”
মরা মানুষের গর্ত্ত কি তাই নিয়ে আমাদের কোন ধারণা ছিল না, কিন্তু সেটা যে ভয়ংকর খারাপ কোন জায়গা সেটা আমরা নিশ্চিত করেই জানতাম। আমাদের কান্না থেমে গেল।

পরেরদিন আবার আমরা বেড়ার ধারে গিয়ে জমা হলাম ওপারের দৃশ্য দেখার জন্য। সকালের মাঝামাঝি তখন, বেশ কয়েকজন মজুর দৌড়তে দৌড়তে একটা দরজার পাল্লা বয়ে নিয়ে এল, তার উপর একজন রক্তে ভেসে যাওয়া মানুষ শুয়ে আছে। বুঝতে পারলাম না মানুষটা মেয়েমানুষ না ব্যাটাছেলে, কিন্তু দরজার ধার বেয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়া দেখতে পাচ্ছিলাম আর মাটিতে রক্ত পড়ে ছিটকে ওঠার শব্দও শুনতে পাচ্ছিলাম।

একটা বাচ্চা কাঁদতে শুরু করল, এবং দেখতে না দেখতে আমরা সবাই কাঁদতে শুরু করলাম, যেন পাল্লায় পড়ে থাকা মানুষটা আমাদের নিজেদেরই কেউ।

দুপুরের জাউ শেষ করে আমরা আবার বেড়ার ধারে গিয়ে বসলাম, দেখি দুজন রাইফেলধারী কালো গাঁট্টাগোট্টা পুলিশের পাহারায় আমাদের দিকে হেঁটে আসছে সেদিনের সেই বালি-রঙা চুলের অল্প বয়সী লোকটা। হাতদুটো পিছমোড়া করে বাঁধা, নাক-চোখ ফোলা, থ্যাঁতলানো; ঠোঁট ফেটে রক্ত পড়ছে। আমাদের পাশ দিয়ে চলে যাওয়ার সময় সে একবার পিছন ফিরে আমাদের দিকে তাকিয়ে চোখ টিপলো, যেন সে খুব খুশিতে আছে, এর থেকে বেশী খুশি কেউ হতেই পারে না।

আমরা সবাই একসঙ্গে চেঁচিয়ে ডাকলাম ওকে, কিন্তু পাহারাদারদের একজন ওর পাঁজরে রাইফেলের খোঁচা মেরে খিঁচিয়ে উঠল: “চলতে থাক্‌!”

তারপর এক সকালে আমরা তখন বেড়ার গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছি, দেখি দূরের রেল-জমিটা লাল পতাকায় জেগে উঠেছে, আমরা ঘন্টা বাজার আওয়াজ শুনলাম, ড্রাম বাজার আওয়াজও। কোন কিছু কারণে ঐ লোকগুলো সব মহা আনন্দে চিৎকার-চেঁচামেচি করছে। দুপুরের খাবার সময় বুড়িরা আমাদের প্রত্যেককে একটা করে ডিম দিল আর বলল: “বাচ্চারা, রেল লাইন বসানো শেষ। আজকেই প্রথম ট্রেনটা আসার কথা আছে। তার মানে এবার তোমাদের বাবা-মায়েরা তোমাদের নিতে আসবে। আমরা এতদিন ধরে তোমাদের দেখাশোনা করার দায়িত্ব পালন করেছি। আজকে রেলপথ বানানোর কাজটা যে শেষ হল, এই ডিমগুলো দিয়ে এখন আমরা সেটার জন্য উৎসব করব।”

আমরা আনন্দে প্রায় পাগল হয়ে উঠলাম। যাক, আমাদের নিজেদের লোকেরা তা হলে মরে যায়নি। বালি-রঙা চুলের লোকটা আমাদের মিথ্যে কথা বলেছে। ওকে যে পিছমোড়া করে বেঁধে টানতে টানতে নিয়ে গেছে, ঠিক করেছে।

ডিম আমরা এতই কম পেয়েছি যে বুড়িদের আগে আমাদের ডিমের খোসা ছাড়ানোটাও দেখিয়ে দিতে হল। এবড়ো খেবড়ো করে খোসা ছাড়িয়ে আমরা দেখি ডিমের মধ্যে পালকওয়ালা ছোট ছোট মুরগীর ছানা। আমরা যখন কামড় বসালাম সেগুলো কিচমিচ করে উঠল আর রক্ত বেরিয়ে এল। আমরা খাওয়া থামিয়ে দিতে বুড়িগুলো এগিয়ে এল আর আমাদের খাওয়া চালিয়ে যেতে হুকুম করল। আমরা তাই করলাম।

পরের দিন যখন বেড়ার সামনে আমাদের ছড়িয়ে ছিটিয়ে জড়ো করা হল, আমরা রেল লাইনের উপর আরো লাল পতাকা দেখতে পেলাম। পরে সেদিন বিকাল বেলায় লাইনের দু পাশেই লোকজনেরা লাফালাফি আর হৈ-হল্লা শুরু করে দিল, কারণ মাথা থেকে ঘন ধোঁয়ার ঢেকুর তুলতে তুলতে দৈত্যাকার কিছু একটাকে এগিয়ে আসতে দেখা যাচ্ছে। জিনিসটা লম্বা, কালো আর বিশাল বড়। দক্ষিণ-পশ্চিম দিক থেকে ওটা গর্জন করতে করতে এগিয়ে এল। ঘোড়ার চেয়ে জোরে ছুটে এল ওটা। এর থেকে জোরে কোন কিছু আমরা ছুটতে দেখিনি আগে। আমাদের মনে হল, পায়ের নীচের মাটি থরথর করে কাঁপছে, ভয় লাগছিল আমাদের। তারপরে হঠাৎ কোথা থেকে কে জানে, সাদা পোষাক পড়া এক গুচ্ছ মহিলা এসে হাজির হল আর জোরে জোরে হাততালি দিয়ে ঘোষণা করল:
“ট্রেন আসছে! ট্রেন এসে গেছে!”
গর্জন করতে করতে ট্রেনটা উত্তর-পূর্ব দিকে ছুটে চলে গেল। যতক্ষণ পর্যন্ত না ওটার লেজের শেষটুকুও চোখের আড়ালে মিলিয়ে গেল, ট্রেনটার দিকে তাকিয়ে রইলাম আমরা।

বুড়িরা যেমন কথা দিয়েছিল, ট্রেনটা চলে যাওয়ার পর যার যার বাচ্চাদের নিয়ে যাওয়ার জন্য বড়রা একে একে এসে হাজির হতে থাকল। মাটকে নিয়ে চলে গেল, ল্যাম, পিলার, বীনকেও নিয়ে গেল, এক এক করে সবাইকে নিয়ে গেল, শুধু আমি পড়ে রইলাম।
 
তিন বুড়ি আমায় ঠেলে বেড়ার বাইরে বার করে দিয়ে বলল: “যা, বাড়ি যা!”
 
আমি ত সেই কোন কালে ভুলে গেছি কোথায় থাকতাম আমি, তাই কাঁদতে কাঁদতে বুড়িদের একজনকে কাকুতি মিনতি করে বললাম আমায় বাড়ি নিয়ে যেতে। কিন্তু সে আমায় ধাক্কা দিয়ে এক পাশে ঠেলে দিল, ঘুরল, আর তারপর দৌড়ে ভিতরে চলে গিয়ে তার পিছনের দরজাটা বন্ধ করে দিল। তারপর একটা চকচকে পিতলের তালা লাগিয়ে সেটাকে নিশ্চিত করে আটকে দিল। আমি বেড়ার বাইরে দাঁড়িয়ে কান্নাকাটি করলাম, চিৎকার করলাম, আর কত যে দয়াভিক্ষা করলাম, কিন্তু তারা আমায় গ্রাহ্য করলনা। বেড়ার একটা ফাঁক দিয়ে আমি দেখলাম একেবারে একরকম দেখতে তিন বুড়ি মাঠের এক জায়গায় একটা ছোট কড়াই বসিয়ে তার নীচে জ্বালানি কাঠ গুঁজে দিয়েছে। কাঠগুলোয় আগুন ধরাল, তারপর কড়াইয়ে হাল্কা-সবুজ তেল ঢালল। কাঠগুলো যখন ভাল রকম জ্বলে উঠ ফটফট করে ফাটছে আর আগুনের শিখা উপর দিকে লকলক করে বেড়ে উঠেছে, তেলটা ফেনা ছাড়তে শুরু করল। ফেনা কমে গেলে কড়াইয়ের ধার থেকে সাদা ধোঁয়া উঠে এল। বুড়িরা ঠাস ঠাস করে কয়েকটা ডিম ফাটিয়ে নিজেদের বানানো চপস্টিক দিয়ে সেগুলোর ভিতর থেকে পালকওয়ালা ছোট ছোট ছানাগুলো খুঁচিয়ে বার করে কড়াইয়ের মধ্যে ফেলে দিল। সেগুলো গরম তেলে পড়ে জ্বলে উঠল আর মাংস রান্নার গন্ধ ছড়িয়ে কড়াইময় গড়াতে লাগল। বুড়িরা তখন রান্না হওয়া মুরগীছানাগুলো তেল থেকে তুলে আনল, এক-দুবার সেগুলোতে ফুঁ দিল, তারপর মুখের ভিতর ছুঁড়ে দিল। তাদের গালগুলো ফুলে উঠল, একবার এই দিকে তারপর অন্য দিকে – আর তাদের ঠোঁটগুলো তৃপ্তির আওয়াজ করে নাড়াতে থাকল। খাওয়ার পুরোটা সময় তারা চোখগুলো বন্ধ করে রেখেছিল আর সেখান থেকে জলের ধারা নেমে আসছিল। আমি যতই কান্নাকাটি করি কি চিৎকার করি, তারা কিছুতেই দরজা খুলল না। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমার চোখের জল শুকিয়ে গেল আর গলা গেল বসে। একটা তেলতেলা কালো গাছের গোড়ায় কাদাজলের একটা গর্ত নজরে এল আমার। তেষ্টা কমানোর জন্য সেটার কাছে গেলাম আমি। কিন্তু জলটা খেতে যাওয়ার ঠিক আগে আমার চোখে পড়ল - গর্তটার একপাশে একটা হলুদ রঙের ব্যাঙ। আর একটা সাপও আছে। সাপটার কালো রঙ, পিঠ জুড়ে সাদা সাদা ছিট। ব্যাঙটা আর সাপটা লড়াই করছে। আমার ভয় করছিল কিন্তু তেষ্টাও পেয়েছিল অসম্ভব। তাই আমি ভয়টা চেপে রেখে হাঁটু গেড়ে বসে আঁজলা ভরে জল তুলে নিলাম। খানিকটা জল আঙ্গুলের ফাঁক দিয়ে গলে গেল। সাপটা ব্যাঙটার পা কামড়ে ধরেছে আর ব্যাঙটার মাথার চামড়া থেকে সাদা রস বেরিয়ে আসছে। জলটা নোনতা মত, আর কিরকম গা-গুলানো। আমি উঠে দাঁড়ালাম, কিন্তু কোথায় যাবো কিছু জানা নেই। আমার কান্না পাচ্ছিল, কাঁদলাম তাই, কিন্তু চোখ দিয়ে কোন জল বের হল না। 
 
আমি গাছ দেখেছি, জল, হলুদ ব্যাঙ, কালো সাপ, লড়াই, ভয়, জলতেষ্টা, হাঁটু গেড়ে বসা, আঁজলা করে জল তোলা, দুর্গন্ধ জল, গা গুলোনো, আমি কেঁদেছি, চোখে কোন জল নেই … । এই, তুই কাঁদছিস কেন? তোর কি বাবা মরে গেছে? মা মরে গেছে? তোর নিজের সবাই কি মরে গেছে? আমি মাথাটা ঘোরালাম, যে বাচ্চা ছেলেটা আমায় প্রশ্নগুলো করল তার দিকে তাকিয়ে দেখলাম আমি। লম্বায় আমার মাথার সমান-ই হবে। গায়ে কোন জামা-কাপড় নেই। চামড়াগুলো দেখতে কেমন মরচে মরচে। আমার মনে হল এ যেন কোন লোহার বাচ্চা। কালো কালো চোখ। আর দেখলাম সে একটা ছেলে, একদম আমার মত।

সে বলল, এই কাঠুয়া, কাঁদছিস কেন তুই? আমি বললাম, কাঠুয়া না, আমি মোটেও কাঠের বানানো নই। সে বলল, সে যাই হোক, আমি তোকে কাঠুয়া বলেই ডাকব। তারপর সে বলল, কাঠুয়া, চল, আমার সাথে ঐ রেলপথের উপর খেলবি চল। সে বলল ঐখানে অনেক কিছু আছে, দেখবার, খাওয়ার, আর খেলা করার।

আমি তাকে বললাম একটা সাপ একটা ব্যাঙকে প্রায় গিলে ফেলেছে এতক্ষণে। সে বলল, গিলতে দে, ঝামেলা করিস না, সাপেরা বাচ্চাদের মজ্জা চুষে খেয়ে ফেলতে পারে।

ও আমায় রেলপথের দিকে নিয়ে গেল। দেখে মনে হচ্ছিল হাতের কাছে, কিন্তু সেখানে পৌঁছন সহজ হল না। হাঁটছি ত হাঁটছি, দেখছি ত দেখছি, কিন্তু রেলপথ সেই যেমন দূরে ছিল, তেমনই দূরে থেকে যাচ্ছিল, যেন সারাটা সময় আমরা যেমন যেমন হেঁটেছি, রেলপথটাও তেমন তেমনই হেঁটে চলেছে। ভাল খাটনি পড়ে গেল, তবে শেষ পর্যন্ত পারলাম আমরা। আমার পাদুটো আর নেই প্রায়। আমি ছেলেটাকে জিজ্ঞেস করলাম তার নাম কি। সে আমায় বলল, ‘তুই যেটা বলবি, সেটাই আমার নাম।’ আমি বললাম, ‘তোকে একটা মরচে ধরা লোহার মত দেখতে।’ সে বলল, ‘তুই যদি বলিস আমি লোহা তা হলে আমি ঠিক তাই।’ আমি বললাম, ‘লোহার বাচ্চা।’ জবাবে সে ঘোঁত ঘোঁত আওয়াজ করে হেসে উঠল। আমি লোহার বাচ্চার পিছন পিছন রেললাইন পর্যন্ত হেঁটে গেলাম। রেলপথটা বড্ড খাড়াই। লাইন দুটো দেখে আমার মনে হল যেন দুটো ইয়া লম্বা সাপ সেই কোন দূরের থেকে গুঁড়ি মেরে বের হয়ে এসেছে। আমি কল্পনা করলাম যেন আমি ওদের কোন একটার উপর পা রাখলে সেটা এঁকেবেঁকে নড়ে উঠবে, আর তার আগামাথাহীন কাঠের লেজ দিয়ে আমার পা দুটো পেঁচিয়ে ধরবে। আমি সাবধানে একটা লাইনের উপর পা রাখলাম। লোহার পাতটা ঠান্ডা, কিন্তু সেটা শিউতে ওঠে নি বা তার লেজ আছড়ায়নি।

দূরে তাকিয়ে দেখলাম সূর্য এখনই পাহাড়ের পিছনে ডুবল বলে। বিশাল বড় দেখাচ্ছে তাকে আর টকটকে লাল। এক ঝাঁক সাদা রঙের পাখী কোন একটা জলাশয়ের ধারে নেমে এল। একটা গা ছমছমে তীক্ষ্ণ কর্কশ আওয়াজ শোনা গেল। লোহার বাচ্চা বলল ট্রেন আসছে। দেখলাম, লোহার তৈরী চাকাগুলোর রঙ লাল আর কতগুলো লোহার হাত সেগুলোকে ঘুরিয়ে চলেছে। আমার মনে হল চাকাগুলোর তলা থেকে ছুটে বের হওয়া হাওয়ার ঝাপটা আশপাশে থাকা মানুষজনকে তার পেটের ভিতর টেনে ঢুকিয়ে নিতে পারে। লোহার বাচ্চা ট্রেনটাকে দেখে হাত নাড়ল যেন সেটা তার বন্ধু কেউ।

সেই রাতে ক্ষিধেয় পেটের ভিতরটা কামড়ে ধরছিল। লোহার বাচ্চা একটা মরচে ধরা লোহার বাটের টুকরো তুলে নিয়ে আমায় খেতে বলল। আমি বললাম, ‘আমি ত একটা মানুষ, আমি কি করে লোহা খাব?’ লোহার বাচ্চা জিজ্ঞেস করল, ‘মানুষ লোহা খেতে পারবে না কেন? আমিও ত একটা মানুষ আর আমি দিব্যি লোহা খাই। বিশ্বাস না হয়, দেখ আমায়।’ আমি দেখলাম লোহার বাচ্চা মুখের মধ্যে লোহার টুকরোটা পুরে দিল আর – কচমচ কচমচ – লোহা খেতে থাকল। মনে হল, লোহার টুকরোটা খাস্তা আর মুচমুচে, আর ওকে দেখে যা মনে হচ্ছে, স্বাদেও বেশ ভালই। আমার জিভে জল চলে এল। আমি ওকে জিজ্ঞেস করলাম কোথায় ও এইভাবে লোহা খেতে শিখল। ও বলল, কবে থেকে আবার লোহা খাওয়া ‘শিখতে’ লাগে? আমি বললাম, ‘আমি ত পারি না।’ আর সে আমায় জিজ্ঞাসা করল – ‘কেন পারিস না? আমার কথায় বিশ্বাস না হলে খাওয়ার চেষ্টা করেই দেখ একবার।’ ইস্পাতের বাটটার না খাওয়া অর্ধেকটা সে বাড়িয়ে ধরল আমার দিকে আর বলল, ‘চেষ্টা ত কর।’ আমি বললাম, ‘আমার ভয় হচ্ছে যে আমার দাঁত ভেঙ্গে যাবে।’ সে বলল, ‘কেন ভেঙ্গে যাবে?’ সে আরও বলল, ‘মানুষের দাঁতের থেকে শক্তিশালী আর কিছু নেই। নিজে চেষ্টা করে দেখলেই বুঝতে পারবি কি বলতে চাইছি আমি।’ আমি দোনামোনা করে লোহার টুকরোটা নিলাম, মুখের মধ্যে ঢোকালাম, এবং চেটে দেখলাম সেটার স্বাদটা কেমন। নোনতা, টকটক, আর আঁশটে মত, অনেকটা নুনে জারানো মাছ যেমন হয়। একটা কামড় দিয়েই দেখ, বলল সে। আমি চেষ্টা করলাম একটা টুকরো কেটে নিতে আর কি অবাক কাণ্ড, কোনরকম জোরজারি না করেই পেরেও গেলাম দিব্যি! চিবোতে শুরু করার পর খাবারের গন্ধে মুখটা আমার ভরে গেল আর যত খেতে থাকলাম, সেটা তত আরো সুস্বাদু হয়ে উঠল। খেয়েই চললাম যতক্ষণে না নিজের অজান্তেই লোভীর মত গোগ্রাসে পুরোটা খেয়ে শেষ করে ফেললাম। ‘কেমন? মিথ্যে বলিনি আমি, বলেছি কি?’ ‘না, বলিসনি তুই’, বললাম আমি। ‘আমায় এরকম লোহা খাওয়া শিখিয়ে দিলি, ভাল ছেলে তুই। আমার আর শাকসব্জী দিয়ে ঝোল খেতে লাগবে না।’ সে বলল, ‘যে কেঊ লোহা খেতে পারে, কিন্তু লোকেরা সেটা জানে না এখনো।’ আমি বললাম, ‘যদি তারা সেটা জানত, তবে আর তাদের কোন শস্যের চাষ করতে লাগত না, লাগত কি?’ সে বলল, ‘তোর কি মনে হয়, লোহা গলানো চাষ করার থেকে সোজা? বাস্তবে ঠিক তার উল্টোটা, আরও কঠিন। আর শোন, খবর্দার কাউকে বলবি না যে লোহা খেতে কি মজার, কারণ একবার যদি ওরা সেটা জেনে যায়, তাহলে ওরা সবাই লোহা খেতে শুরু করে দেবে, তোর আর আমার জন্য একটা কণাও তখন আর পড়ে থাকবে না।’ ‘তা হলে আমায় তুই এই গোপন কথাটা জানিয়ে দিলি কেন?’ আমি জিজ্ঞাসা করলাম। লোহার বাচ্চা বলল, ‘আমার একটা বন্ধু পেতে ইচ্ছে করছিল, কারণ একা একা লোহা খাওয়ায় কোন মজা নেই।’

উত্তর-পূর্বমুখী রেল লাইন ধরে আমি ওর পিছন পিছন হেঁটে গেলাম। এখন যখন আমি লোহা খেতে শিখে গেছি, আমার আর রেল লাইনকে ভয় লাগছিল না। আমি নিজের মনে বিড়বিড় করলাম – ‘লোহার রেল, লোহার রেল, মাথায় যেন ঢোকে, বদমাইশি করেছিস কি চিবিয়ে খাব তোকে।’ লোহার বাটটার আধখানা হজম করে ফেলার ফলে আমার আর এখন ক্ষিধে পাচ্ছিল না, পায়েও বেশ জোর পাচ্ছিলাম। দুটো লাইনের একটার উপর দিয়ে লোহার বাচ্চা আর আরেকটার উপর দিয়ে আমি হেঁটে চললাম। এত জোরে জোরে হাঁটছিলাম আমরা যে একটুক্ষণের মধ্যেই আমরা সেই জায়গাটায়, যেখানে আকাশটা গনগনে লাল হয়ে রয়েছিল, সেখানে পৌঁছে গেলাম। সাত কি আটটা বিশাল বিশাল চুল্লী বাতাসে আগুন ছিটিয়ে দিচ্ছিল। আমি লোহার টাটকা, জিভে জল আনা গন্ধ পাচ্ছিলাম। ও বলল, ‘সামনে ওখানেই সেই জায়গা যেখানে ওরা লোহা আর ইস্পাত গলাচ্ছে। কে জানে, তোর বাবা-মা হয়ত ওখানেই আছে।’ আমি বললাম, ‘ওখানে ওরা আছে কি নেই, তাতে আমার বয়েই গেছে।’

একটানা হেঁটে চলতে চলতে হঠাৎ করে রেল লাইনটা ফুরিয়ে গেল। আমাদের চারপাশে মাথা সমান উঁচু উঁচু আগাছার ঘেরাটোপে মরচে পড়া লোহার ছাঁট আর ইস্পাতের টুকরো টাল হয়ে আছে। বেশ কিছু ভাঙ্গা-চোরা ট্রেন আগাছার মধ্যে কাত হয়ে পড়ে আছে, যে সব ছাঁট লোহা আর ইস্পাত তারা বয়ে এনেছিল সেগুলো উপচে পাশেই মাটিতে গড়িয়ে গেছে। জায়গায় জায়গায় মানুষের ভীড় দেখলাম। চারপাশের লোহা আর ইস্পাতের মধ্যে উবু হয়ে বসে লোকগুলো খাওয়া-দাওয়া করছিল। লোহা গলানো চুল্লীর গনগনে শিখার আলোয় তাদের মুখ লাল টকটক করছে। খাবার সময় এখন। কি খাচ্ছিল তারা? মাংসের ডাম্পলিং আর ডিম দিয়ে মিষ্টি আলু। খেতে নিশ্চয়ই খুব ভালো লাগছে তাদের, গালগুলো এমনভাবে ফুলে আছে, যেন মনে হচ্ছে মাম্পস্‌ হয়েছে সবার। কিন্তু আমার কাছে সেই মাংসের ডাম্পলিং আর ডিম আর মিষ্টি আলুর দুর্গন্ধ কুকুরের গুয়ের থেকেও খারাপ লাগছিল। আমার পেটের ভিতর পর্যন্ত এমনভাবে গুলিয়ে উঠল যে গন্ধ এড়াতে আমায় হাওয়ার উল্টোদিকে দৌড় লাগাতে হল। আর ঠিক সেই মুহুর্তেই ভীড়ের মধ্য থেকে একজন পুরুষ আর একজন মহিলা দাঁড়িয়ে ঊঠে চিৎকার করে ডাকল:
“কুয়োশাং!”
 
প্রথমটায় আমি খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু তারপরে আমি তাদের আমার বাবা আর মা বলে চিনতে পারলাম। তারা হাঁচড়-পাঁচড় করতে করতে আমার দিকে এগিয়ে এল। আর হঠাৎ করেই আমি বুঝতে পারলাম কি ভয়ংকর মানুষ তারা, কিছু না হোক ঐ “শিশুপালন কেন্দ্রের” তিন বুড়ির সমান ভয়ংকর ত বটেই। তাদের গায়ের তীব্র দুর্গন্ধ নাকে আসছিল আমার, কুকুরের গুয়ের থেকেও বীভৎস। তাই যখন ওরা প্রায় ধরে ফেলেছে আমায়, আমি ঘুরে দাঁড়িয়ে দে ছুট। ওরা আলো নিয়ে আমার পিছন পিছন দৌড়ে এল। আমি একবারের জন্যও পিছনে দেখবার সাহস করে মাথা ঘোরাইনি, কিন্তু যখনই তারা আমার মাথা ছুঁয়ে ফেলছিল, আমি তাদের আঙ্গুলগুলো টের পাচ্ছিলাম। আর ঠিক সেই সময়েই আমি আমার প্রাণের বন্ধু, লোহার বাচ্চার গলা শুনতে পেলাম, সামনেই কোথাও থেকে ও চিৎকার করে বলল:

“কাঠুয়া, কাঠুয়া, লোহার ছাঁটের ঢিবিটার উপরে চলে আয়।”

আমি দেখতে পেলাম, লোহার ছাঁটের ঢিবিটার উপরে এক মুহুর্তের জন্য ওর ঘন লাল শরীরটা দেখা দিয়েই চোখের আড়ালে মিলিয়ে গেল। আমি দৌড়ে ঢিবিটার উপর লাফিয়ে পড়লাম, কোথাও কতকগুলো কড়াই মাড়িয়ে, কোথাও নিড়ানি, কোথাও লাঙ্গল, রাইফেল, কামান, আর যা যা সামনে পড়ল সব মাড়িয়ে, টপকে আমি ঢিবির মাথায় উঠে পড়লাম। লোহার বাচ্চা একটা ড্রেনপাইপের ভিতর থেকে আমায় হাত নেড়ে ডাকল। ঝটপট আমার কাঁধদুটো বাঁকিয়ে, হাঁচড়-পাচড় করে আমি পাইপের মধ্যে ঢুকে পড়লাম। ভিতরটা রাত্রির মত অন্ধকার, আর মরচের গন্ধে চারদিক ভরে আছে। একটা কুটো পর্যন্ত দেখতে পাচ্ছিলাম না, কিন্তু আমি বুঝতে পারলাম, বরফের মত ঠাণ্ডা একটা হাত এসে আমার হাতটা ধরল। আমি জানি, ওটা লোহার বাচ্চার হাত। ও ফিসফিস করে বলল:
“ভয় পাস না, আমার পিছন পিছন আয়। ওরা এখানে আমাদের দেখতে পাবে না।”
 
আমি তাই ওর পিছন পিছন হামাগুড়ি দিয়ে এগোলাম। আমার কোন ধারণা ছিল না, পাইপটা এঁকেবেঁকে কোথায় গিয়েছে। ফলে গুঁড়ি মেরে মেরে চলতে থাকলাম যতক্ষণ না সামনে একফালি আলো দেখতে পেলাম। লোহার বাচ্চার পিছু পিছু আমি একটা পায়ে চলা পথে এসে হাজির হলাম। পথটা একটা ফেলে যাওয়া ট্যাঙ্কের পাশ দিয়ে চলে গেছে। ট্যাঙ্কের গা বেয়ে আমরা ওটার মাথায় কামান চালানোর চূড়া-কুঠরীটায় উঠে পড়লাম। চূড়া-কুঠরীটার গায়ে পাঁচকোণা সাদা তারা আঁকা আর সেটা থেকে মরচে ধরা, গায়ে গর্তওয়ালা কামানের নল আকাশের দিকে কোণা করে মাথা উঁচিয়ে বেরিয়ে আছে। লোহার বাচ্চা বলল সে চূড়া-কুঠরীটার ভিতর হামাগুড়ি দিয়ে ঢুকতে চেয়েছিল কিন্তু কুঠরীর ঢাকনিটা মরচে পড়ে শক্ত হয়ে আটকে গেছে। “আয়, স্ক্রুগুলো চিবিয়ে খেয়ে ফেলি আমরা,” বলল ও।
 
তখনো চার হাত-পায়ে হামা টেনেই চলছি আমরা, ঢাকনিটার চারপাশে ঘুরে ঘুরে সব কটা মরচে ধরা স্ক্রুকে এক এক করে কামড়ে কামড়ে খুলে নিয়ে চটপট খেয়ে ফেললাম আমরা যতক্ষণ না ঢাকনাটাকে আলগা করে ফেলা গেল। ঢাকনাটাকে এরপর ছুঁড়ে ফেলে দিলাম আমরা। চূড়া-কুঠরীর ধাতুটা ছিল নরম, অনেকটা যেন বেশী পেকে যাওয়া পীচের মত। কুঠরীর ভিতরে ঢুকে যাওয়ার পর নরম স্পঞ্জের মত লোহার আসনে যুত করে বসলাম আমরা। লোহার বাচ্চা আমায় ছোট একটা ঘুলঘুলি দেখাল যেখান দিয়ে আমি বাবা-মাকে দেখতে পাচ্ছিলাম। দূরে ছাঁট লোহার একটা স্তুপের উপর হামাগুড়ি দিয়ে চড়ছিল ওরা। ওদের নড়াচড়ায় নানা জিনিসপত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে বিকট আওয়াজ হচ্ছিল যা ওদের কান্নাভেজা চিৎকারের সাথে মিলে মিশে যাচ্ছিল:
“কুয়োশাং, কুয়োশাং, মাণিক আমার, বেরিয়ে আয়, বেরিয়ে আয় বাবা, মাংসের ডাম্পলিং খাবি আয়, মিষ্টি আলু নে, ডিমও আছে … ....”

ওদের দেখে আমার অচেনা লোক বলে মনে হচ্ছিল। আর যখন ওরা আমাকে মাংসের ডাম্পলিং আর মিষ্টি আলু, আর ডিমের লোভ দেখাচ্ছিল, আমি ঘেন্নায় মুখ সিঁটকালাম। শেষমেষ ওরা আমায় খুঁজে পাওয়ার আশা ছেড়ে দিয়ে ফিরে চলে গেল।

কুঠরীটা থেকে হামাগুড়ি দিয়ে বের হয়ে এসে আমরা কামানের নলটার দু পাশে পা ফাঁক করে দাঁড়ালাম। ওখান থেকে বেশ ভালোভাবে দেখা যাচ্ছিল কিভাবে চুল্লীগুলোর মুখ থেকে আগুনের শিখার লাফিয়ে লাফিয়ে উঠছে, কোনটা কাছে, কোনটা দূরে, আর সেগুলো ঘিরে লোকজনেরা ছুটোছুটি করছে। লোহার কড়াইগুলো তুলে নিচ্ছিল তারা, একটা – দুটো – তিনটে, তারপর সেগুলো আকাশে ছুঁড়ে দিচ্ছিল আর দেখছিল কিভাবে মাটিতে পড়ে সেগুলো ভেঙ্গে টুকরো হয়ে যাচ্ছিল। তারপর তারা গাম্বা গাম্বা হাতুড়ী দিয়ে সেই টুকরোগুলোকে পিটিয়ে পিটিয়ে গুঁড়ো করছিল। লোহা পোড়ার মিষ্টি গন্ধ আমাদের নাকে ভেসে আসছিল। আমার পেট খিদেয় চনমন করতে শুরু করে দিল। মনে হয় আমার মনের কথা আন্দাজ করেই লোহার বাচ্চা ডাক দিল, “আয় রে, কাঠুয়া, ঐ কড়াইগুলোর এক-দুটো পাওয়া যায় কিনা দেখি। লোহার কড়াই খেতে খুব মজা।”

আমরা চুপিসারে আলোকিত জায়গাটায় ঢুকে পড়লাম, একটা বেশ বড়সড় কড়াই পছন্দ হল আমাদের, সেটা তুলে নিয়ে দে দৌড়, দে দৌড়। যে লোকগুলো আমাদের দেখতে পেয়েছিল, তারা এত চমকে গেল যে তাদের হাত থেকে হাতুড়ি পড়ে গেল।

“লোহা দানো!” দৌড়ে পালাতে পালাতে চিৎকার করছিল তারা। “লোহা দানো এসেছে!”
আমরা ইতিমধ্যে ছাঁট লোহার একটা ঢিবির মাথায় চড়ে বসেছি আর কড়াইটাকে মুখে পোরার মত ছোট ছোট টুকরোয় ভেঙে নিয়েছি। লোহার বাটের থেকে কড়াইয়ের স্বাদ অনেক ভালো ছিল।

আমরা যখন লোহার কড়াই দিয়ে মহানন্দে ভোজ সারছি, দেখি একটা লোক খোঁড়া পা আর পিছনে খাপে গোঁজা রিভলভার নিয়ে নড়বড় করতে করতে এগিয়ে এসে লোহা দানো বলে চ্যাঁচাতে থাকা লোকগুলোকে থাপ্পড় কষাল।
“বেজম্মার গুষ্টি!” খিস্তি করল সে। “তোদের এই জঘন্য গুজবের চোটে সব গোল পাকিয়ে যাচ্ছে। একটা শেয়াল দানো হয়ে যেতে পারে, একটা গাছও পারে। কিন্তু কে কোথায় শুনেছে যে লোহা দানো হয়ে যায়?”
 
লোকগুলো এমনভাবে উত্তর দিল যেন সবাই মিলে একটা গলাতেই কথা বলছে। “শোনেন গো রাজনৈতিক প্রশিক্ষক, আমরা মিছা কথা বলছি না। আমরা লোহার কড়াইগুলো ভেঙে গুঁড়ো করছিলাম। আর সেই সময় এক জোড়া লোহার বাচ্চা, সারা শরীর মরচেতে ঢাকা, ছায়ার ভেতর থেকে ছুটে বেরিয়ে এল, একটা কড়াই ছিনতাই করে নিল, তারপর সেটা নিয়ে দৌড়ে পালিয়ে গেল। স্রেফ হাওয়ায় মিলিয়ে গেল।”
“দৌড়ে পালিয়ে গেলটা কোথায়? ” জিজ্ঞেস করল খোঁড়া লোকটা।
“ছাঁট-লোহার ঢিবিতে” উত্তর দিল লোকগুলো।
“চুত-মারানি গ্যাঁজা-খোরের দল!” বলে উঠল খোঁড়া লোকটা। “এই হতচ্ছাড়া নির্মনিষ্যি জায়গায় বাচ্চা ছেলে কোত্থেকে আসবে, শুনি?”
“সেই জন্যেই ত আমাদের এত ভয় ধরে গেছে।”
খোঁড়া লোকটা তার পিস্তল বার করে এনে ছাঁট লোহার স্তূপে তিনখানা গুলি চালিয়ে দিল – ক্ল্যাং ক্ল্যাং ক্ল্যাং, লোহার ছাঁটের থকে সোনালী ফুলকিরা ছিটকে উঠল।

লোহার বাচ্চা বলল:
“কাঠুয়া, চল, ওর কাছ থেকে বন্দুকটা কেড়ে নিয়ে খেয়ে ফেলি আমরা, কি বলিস তুই?”
আমি বললাম:
“ওর কাছ থেকে আমরা যদি বন্দুকটা নিয়ে নিতে না পারি, তা হলে কি হবে?”
“এখানে থাক তুই। আমি গিয়ে নিয়ে আসছি ওটা।”
 
লোহার বাচ্চা তুরতুর করে ছাঁট-এর স্তূপ বেয়ে নেমে গেল, তারপর মাটিতে পেট ঘষে ঘষে আগাছার ভিতর দিয়ে হামা টেনে এগিয়ে গেল। আলোতে থাকা লোকগুলো ওকে দেখতে পাচ্ছিল না, কিন্তু আমি পাচ্ছিলাম। যখন আমি দেখলাম ও হামাগুড়ি দিয়ে খোঁড়া লোকটার পিছনে পৌঁছে গেছে, আমি একটা লোহার চাকতি তুলে নিয়ে কড়াইটার গায়ে ঠং করে আওয়াজ করলাম।
“শুনতে পেলে?” লোকগুলো চিৎকার করে উঠল। “লোহা দানো এখানেই আছে।”
যেই না খোঁড়া লোকটা পিস্তলটা ছোঁড়ার জন্য তুলেছে, লোহার বাচ্চা ওর উপর লাফিয়ে পড়ে ওর হাত থেকে সেটা ছিনিয়ে নিল।
লোকটা চেঁচিয়ে উঠল
“লোহা দানো!”
খোঁড়া লোকটা একদিকে কাত হয়ে গড়িয়ে পড়ল।
“বাঁচাও!” সে চেঁচিয়ে উঠল। “ওটা একটা গুপ্তচর, ধর, ধর ওটাকে - ”
পিস্তলটা হাতে নিয়ে লোহার বাচ্চা হামাগুড়ি দিয়ে আমার পাশে চলে এল।
“কেমন হল?” বলল সে।
আমি ওকে বললাম কি দারুণ কাজ করেছে সে, শুনে ওর খুব ভাল লাগল। সে পিস্তলের নলটা কামড়ে খুলে নিয়ে আমার দিকে বাড়িয়ে ধরল সেটা।
“খা,” বলল সে।
আমি একটা কামড় বসালাম। স্বাদটা বারুদের মত লাগল। আমি থু থু করে ফেলে দিয়ে বিরক্তি জানালাম
“যাচ্ছেতাই খেতে এটা। কোন কাজের না।”
ও স্বাদ বোঝার জন্য হাতলের উপর দিক থেকে খানিকটা কামড়ে তুলে নিল।

“ঠিক বলেছিস তুই,” বলল ও, “কোন কাজের না। আমি এটা ওকেই আবার ফেরৎ পাঠিয়ে দিচ্ছি।”
ও পিস্তলটা খোঁড়া লোকটার পায়ের কাছে ছুঁড়ে দিল।
আমি আমার আধ-খাওয়া নলটাকে একই জায়গায় ছুঁড়ে ফেললাম।
খোঁড়া লোকটা পিস্তলের টুকরোদুটো হাতে তুলে নিল, হাঁ করে তাকিয়ে থাকল সে দিকে তারপর চিৎকার করতে শুরু করল। সে টুকরোদুটো ছুঁড়ে ফেলে দিল তারপর যত তাড়াতাড়ি পারল লাফাতে লাফাতে কোথায় চলে গেল। ঢিবির মাথায় আমরা যেখানে বসে ছিলাম সেখান থেকে ওর ঐরকম পালানো দেখতে দেখতে হাসতে হাসতে মরি প্রায়।

সেদিন রাত গভীর হলে একটা তীক্ষ্ণ সরু আলোর রেখা ভীষণ জোরে ভকভক ভকভক শব্দ করতে করতে দক্ষিণ-পশ্চিমদিকের অন্ধকারটা চিরে ফেলল। আরেকটা ট্রেন আসছে।

দেখলাম, ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে ট্রেনটা রেললাইন ধরে শেষ প্রান্তের দিকে এগিয়ে গেল, আগে থাকতেই সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা আরেকটা ট্রেনের পিছনে গিয়ে ধাক্কা মারল সেটা। বগিগুলো একটা আরেকটাকে দুমড়ে মুচড়ে দিয়ে থেমে গেল, যে লোহাগুলো বয়ে এনেছিল, সেগুলো আওয়াজ তুলে লাইনের দুপাশে গড়িয়ে গেল।

আর কোন ট্রেন আসবে না এর পর। আমি জিজ্ঞাসা করলাম ট্রেনের কোন অংশ খেতে বিশেষ ভাল লাগে কি না। ও বলল চাকাগুলোর স্বাদ সবচেয়ে ভাল। তাই আমরা একটা চাকা খেতে শুরু করলাম। কিন্তু মাঝামাঝি গিয়ে থেমে গেলাম।

টাটকা গলানো লোহার জন্য আমরা লোহা গলানোর চুল্লীগুলোর ওখানেও গেলাম। কিন্তু যেসব মরচে ধরা লোহা খেতে আমরা অভ্যস্ত ছিলাম সেগুলোর থেকে সুস্বাদু আর কিছু পাইনি।

দিনের বেলা আমরা ছাঁট লোহার ঢিবিটার উপর ঘুমিয়ে থাকতাম আর রাতের বেলা লোহা গালিয়েদের জীবন অতিষ্ঠ করে তুলতাম। আতঙ্কের চোটে ওরা দুদ্দাড় করে ছুটে পালাত।

এক রাতে যে লোকগুলো গুঁড়ো করার কাজে ব্যস্ত ছিল আমরা তাদের ভয় দেখাতে গেলাম। একটা চুল্লীতে মরচে লাল একটা কড়াই দেখতে পেয়ে আমরা সেটার দিকে দৌড়ে গেলাম। কিন্তু ঠিক যখন সেটা ধরতে যাবো, একটা বিশাল হুশ্‌শ্‌ আওয়াজ শুনতে পেলাম আমরা আর একটা দড়ির জাল আমাদের উপর এসে পড়ে আমাদের ঘিরে ফেলল।

আমরা দাঁত বার করে দড়িগুলোর উপর ঝাঁপিয়ে পড়লাম। কিন্তু যত জোরেই চেষ্টা করি না কেন, আমরা দড়িগুলো কেটে উঠতে পারলাম না।

“আমরা ওদের ধরে ফেলাছি,” পাগলের মত আনন্দে চেঁচাচ্ছিল ওরা, “আমরা ওদের ধরে ফেলেছি।”

এরপর খুব তাড়াতাড়িই, আমাদের মরচে ধরা শরীরগুলো ওরা বালি-কাগজ দিয়ে ঘষে ঘষে চেঁছে পরিষ্কার করে ফেলল*। ব্যথা লেগেছিল খুব, নরক যন্ত্রণার মত ব্যথা লেগেছিল।

____
 
মূলগল্প: Iron Child by Mo Yan, Translated by Howard Goldblatt, Bengali Translation: Amitabha Chakrabarti

* সম্ভবতঃ চুল্লিতে গলিয়ে ফেলার জন্য পরিষ্কার করে নিচ্ছিল – অনুবাদক
 

----------------
লেখক পরিচিতি
মো ইয়ান
মো ইয়ান আধুনিক চৈনিক সাহিত্যের একটি উল্লেখযোগ্য নাম। ২০০০ সালে কাও শিংচিয়েনের পর মো ইয়ান দ্বিতীয় চৈনিক সাহিত্যিক যিনি ২০১২তে সাহিত্যের সর্বোচ্চ পুরস্কার নোবেল লাভ করেছেন। লোককথা, ইতিহাস ও বর্তমান সময়ের মেলবন্ধন ঘটিয়ে এক 'আবছায়ার বাস্তব জগত' তৈরির এক নিপুণ কারিগর মো ইয়ান। সাহিত্যিক গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের ‘ম্যাজিক রিয়ালিজম'-এর সঙ্গে মো ইয়ানের ‘হ্যালুসিনেটোরিক রিয়ালিজম'-এর তুলনা করা হয়৷

 

অনুবাদক পরিচিতি:
অমিতাভ চক্রবর্ত্তী
কবি।গল্পকার। অনুবাদক
যুক্তরাষ্ট্রের টেনিসিতে থাকেন।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন