মঙ্গলবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২১

মো ইয়ান'এর গল্প : মানুষ ও পশু

 
 অনুবাদ: দিলশাদ চৌধুরী

তবুও যখন আরেকটি সকাল এলো, এক ঘন, উত্তাল কুয়াশার স্তুপ সাপোরো সমুদ্রের ওপর দিয়ে ধীর গতিতে তটের দিকে এগিয়ে চললো। প্রথমে এটি ছড়িয়ে পড়লো সতেজ উপত্যকায়, তারপর এক ঝঙ্কার তুলে উপরের দিকে উঠলো পাহাড়চূড়ো আর সেখানকার ঘিঞ্জি ছোট ঝোপগুলোকে ঘিরে ধরতে। যখন ওটা টলতে টলতে পাহাড়ের অমসৃণ কালো খাড়াগুলো পেরিয়ে তার ওপাশের উপত্যকার দিকে যাচ্ছিলো, স্বচ্ছ এক ঝর্ণা কড়কড়ে, তবু রহস্যজনক এক নিনাদ তাতে ছড়িয়ে দিলো। দাদামশাই উপুড় হয়ে পেটে ভর দিয়ে শুয়ে থাকে পাহাড়ের মাঝ বরাবর এক গুহায়, যেখানে সে আশ্রয় নিয়েছে, সাবধানে শুনে যাচ্ছে চঞ্চলা বসন্তের ধ্বনি, মোরগের চিৎকার, যেহেতু গ্রামে তারা প্রভাতঘোষক, আর সমুদ্রস্রোতের গভীর গর্জন।
আমি প্রায়ই নিজেকে নিয়ে ভাবি যে একদিন সমুদ্র পাড়ি দেব নিজের পরিশ্রমে আয় করা একটা বড় অংকের টাকা নিয়ে --- একবার বিশ্ববাজারে মানবমুদ্রার স্থান শক্ত হলে -- ওই পথটা ধরে যেটা দিয়ে জাপানিরা বাধ্যতামূলক শ্রমিক স্থানান্তর করত। যখন আমি হোকাইডো দ্বীপে পৌঁছাব, পথের এক চিত্র মাথায় নিয়ে যেটা দাদামশাই আমাকে শতবার বলেছে তার গল্পে, আমি খুঁজব সেই গুহা, সমুদ্রমুখী পাহাড়ের গায়ে যেখানে সে দশ বছরেরও বেশি সময় ধরে আশ্রয় নিয়েছিলো। 
কুয়াশা গুহার মুখে উঠে এলো, যেখানে ওটা মিশে গেলো গুল্মের ঝোপ আর ঘন আঙুরলতার সাথে আর দাদামশাইয়ের দেখার রাস্তা বন্ধ করে দিলো। স্যাঁতস্যাতে গুহাটার দেয়াল তামাটে রঙের মস আর শৈবালে ঢাকা ছিলো। পাথরের বহিরাংশে একাধিক পশুর কোমল লোমচামড়া জড়ানো ছিলো; দেয়ালগুলো থেকে শেয়ালের দুর্গন্ধ বের হচ্ছিলো যা কিনা প্রতিনিয়ত মনে করিয়ে দিচ্ছিলো তার বাহাদুরি কিংবা তার হিংস্রতা যার মাধ্যমে সে শেয়ালের ডেরাটা দখল করেছে যেটা এখন তার আবাস। কিন্তু ততদিনে দাদামশাই পুরোপুরি বিস্মৃত হয়েছিলো যে ঠিক কবে সে পালিয়ে এই পাহাড়ে চলে এসেছিলো। 
 
আমার জানার কোনো পথ নেই যে একজন মানুষ, যে কিনা চোদ্দ বছর ধরে এক প্রাচীন পাহাড়ের জংলায় এক নেকড়ের মত জীবনধারণ করেছে, কিভাবে দেখে সময়কে কিংবা অনুভব করে এর ক্রমাগত বয়ে চলাকে। হয়ত তার ক্ষেত্রে দশ বছর কেটে গেছে স্রেফ একটা দিনের মত করে অথবা হয়ত এক দিনের দৈর্ঘ্যই অনুভূত হয়েছে দশ বছরের মত। তার জিভ জড়িয়ে গিয়েছিলো, কিন্তু তার কানে আর চিন্তায় প্রতিটি উচ্চারণই স্পষ্ট ছিলোঃ কত ঘন কুয়াশা! জাপানি কুয়াশা! আর তাই তার মনে উজ্জ্বল হয়ে ভেসে উঠলো ১৯৩৯ এর ঘটনাগুলো, অষ্টম চান্দ্রমাসের চোদ্দতম দিন, যখন তার নির্দেশ অধীন সৈন্যরা, যার মধ্যে তার ছেলেও ছিলো, ব্লাক ওয়াটার নদীর সেতুর তলায় লুকিয়ে ছিলো একসারি জাপানি ট্রাক উড়িয়ে দিতে। ওই দিনের সকালটাও এমনই ছিলো যখন এক বিশাল কুয়াশা আকাশ ঢেকে রেখেছিলো। 
 
লাল যব বৃন্তের একটানা সারি ঘন কুয়াশার ভেতর থেকে ভেসে উঠলো। সমুদ্রের ঢেউয়ের পাথরের সাথে আছড়ে পড়ার শব্দ হয়ে উঠলো ট্রাকের ইঞ্জিনের হুংকার। পাথরের মধ্য দিয়ে বয়ে চলা ঝর্ণার মচমচ শব্দ হয়ে উঠলো ডোউগুয়ানের রসেভরা হাসির আওয়াজ, আমার বাবা। উপত্যকায় পশুদের পদক্ষেপের শব্দ হয়ে উঠলো দাদামশাই আর তার সৈন্যদের ভারী নিশ্বাসের ধ্বনি।
 
কুয়াশাটা বেশ ভারী ছিলো, যেন কোনো উড়ন্ত নীর। অনেকটা সল্টওয়াটার হারবার গ্রামের দ্বিতীয় লিউর তৈয়ার করা হাওয়াই মিঠাই। তুমি ওটাকে ছুঁয়ে দেখতে পারবে, এমনকি এক টুকরো ছিড়েও নিতে পারবে। যখন আমার ফুপু, ছোট্ট হুয়াগুয়ান, হাওয়াই মিঠাই খেয়েছে, ওটা তার মুখে আটকে গিয়েছিলো এক টুকরো সাদা রুটির মত। এক জাপানি কুত্তার বেয়নেটের মাথায় তাকে তোলা হয়েছিলো... এক অথর্ব যন্ত্রণা তাকে গোলকের মত কুঁকড়ে ফেললো। সে দাঁতে দাঁত চেপে এক হুংকার ছাড়লো যেটা তার কণ্ঠের গভীর থেকে উঠে এসেছিলো। এটা কোনো মানুষের শব্দ ছিলোনা, আর অবশ্যই, কোনো নেকড়ের শব্দও ছিলোনা। এটা ছিলো সেই শব্দ যেটা দাদামশাই শেয়ালের ডেরায় বসে করতো। 
 
বুলেটে যেন মই দেয়া জমি, আর যবের শীষগুলো ঝুঁকে পড়ছে মাটিতে। কুয়াশা ছিড়ে বেরিয়ে আসা শেলগুলো পেছনে লম্বা লেজ টেনে দেয়। ওরা উড়ে এসেছিলো শেয়ালের গুহার অভ্যন্তরে, পাথরের দেয়ালগুলো গলিত ইস্পাতের মত জ্বলে উঠলো, স্বচ্ছ পানির বুদবুদ তপ্ত লোহার ওপর হিশহিশ শব্দে তার নাকে পৌঁছে দিচ্ছিলো বাষ্পের গন্ধ। একটা প্রস্তরখন্ডে ঝোলানো ছিলো শেয়ালের হালকা খয়েরি লোমচামড়া। নদীর পানি, বুলেটে ক্ষতবিক্ষত, যেন কেঁদে উঠছিলো পাখিদের কর্কশ কাকলীর মত। লাল পালকের গায়কপাখি, নীল পালকের ভরতপাখি। সাদা ঈল মাছগুলো পেট উলটে মরে পড়ে থাকে ব্লাক ওয়াটার নদীর পান্না সবুজ পানিতে। কালো চামড়া আর পিচ্ছিল মাংসের বড় ডগফিশ উপত্যকায় স্রোতের প্রবল আছড়ে পড়ার সাথে লাফিয়ে উঠতে লাগলো। ডাউগুয়ানের হাত ঝাঁকি খেলো যখন সে তার ব্রাউনিং পিস্তলটা তাক করলো। সে গুলি চালালো! কালো ইস্পাতের হেলমেটটা ছিলো কচ্ছপের খোলের মত। পিং পিং পিং! ইতর জাপানি! 
 
আমি কোনোদিন স্বচক্ষে এই দৃশ্য দেখতে পাইনি যেখানে দাদামশাই তার গুহায় শুয়ে তার স্বদেশের কথা চিন্তা করছে, কিন্তু আমি কখনোই ভুলবোনা একটা অভ্যাসের কথা যেটা সে সাথে নিয়ে এসেছিলো। যত আরামদায়ক বিছানাই হোকনা কেন, সে সবসময় পেটে ভর দিয়ে ঘুমাতো, হাঁটু মুড়ে, আড়াআড়ি দুই বাহুতে থুতনি রেখে। সে ছিলো যেন এক বন্য পশু, সদা সজাগ। আমরা কখনোই পুরোপুরি নিশ্চিত হতে পারতাম না যে কখন সে ঘুমাচ্ছে আর কখন সে সজাগ। কিন্তু আমি প্রতিবার জেগে ওঠার পর প্রথম যে জিনিসটা দেখতাম তা হলো তার উজ্জ্বল সবুজ চোখ। তাই আমার মনে একটা ছবি আছে যে সে কিভাবে তার গুহায় ঘুমাতো আর শুয়ে থাকার সময় তার মুখের ভাব কেমন থাকত।
 
তার শরীরের কাঠামো সবসময়ের মত একইরকম রইলো --- অর্থাৎ তার হাড়ের কাঠামোয় কোনো পরিবর্তন এলোনা। তার মাংসপেশি, তা সত্ত্বেও, প্রতিনিয়ত স্নায়ুচাপে থাকার কারণে খিঁচ লেগে গেলো। তার সরু শিরার মধ্য দিয়ে তেজে রক্ত প্রবাহিত হত, শক্তি উৎপন্ন করত, কোনো টানটান ধনুকের ছিলার মত। তার চিকন, আয়ত মুখের ওপর নাকটা ছিলো লোহার মত শক্ত, ছাইচাপা শিখার মত তার চোখ জ্বলত। তার মাথার জট লাগা নোয়ারঙা চুল ছিলো যেন জ্বলন্ত খড়ের আগুন। 
 
যেইনা কুয়াশাটা ছড়িয়ে গেলো, ওটা হয়ে উঠলো পাতলা, স্বচ্ছ, বায়বীয়। এর দোদুল আড়াআড়ি ছেদ সরে গেলে গুল্মলতার আগায় ঝুলে থাকা রেশমের ফিতা প্রকট হয়, আঙুরের লতানো জালিকা, বনের বৃক্ষশীর্ষ, গ্রামের দৃঢ় মুখ আর সমুদ্রের ধূসর নীল দাঁত। যব বৃন্তের লাল আগুনমুখা কুয়াশা ভেদ করে প্রায়ই উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। কিন্তু যেইনা কুয়াশা কাটতে লাগলো, যবের মুখব্যাদান কমে এলো। নৃশংস জাপানি দৃশ্যায়ন নির্দয়ভাবে কুয়াশার শুন্যস্থানগুলো পূরণ করে ফেললো, আর দাদামশাইয়ের জন্মভূমির স্বপ্নগুলোকে হিচড়ে বের করে দিলো। ধীরে ধীরে কুয়াশাটা বৃক্ষপূর্ণ উপত্যকায় ফিরে গেলো। 
 
এক বিশাল সমুদ্রের লালচে আভা দাদামশাইয়ের চোখদুটো ভরিয়ে দিলো। ধূসর নীল ঢেউ বালুময় বেলাভূমিকে অলসভাবে চাটতে লাগলো, আর একটা রক্তলাল আগুনের গোলক সমুদ্রের গহীন থেকে নিজের পথ করে নিলো। 
 
দাদামশাই মনে করতে পারলোনা, অবশ্য কোনো পথও ছিলোনা যার মাধ্যমে সে স্মৃতি হাতড়ে দেখবে, যে কতবার ওই জল ঝরানো সূর্যটাকে সে পানির মধ্য থেকে লাফ দিয়ে উঠতে দেখেছে। আশার প্রতীক ওই রক্তলাল আগুন, এত উষ্ণ যে সে কেঁপে উঠতো, হৃদয়ে উন্মাদনা জন্ম নিত। যবের এক বিশাল জমি সমুদ্রে সুন্দর বিন্যাসের সৃষ্টি করলো। ডাঁটগুলো ছিলো তার পুত্রকন্যাদের ঋজু দেহ, পাতাগুলো ছিলো তাদের হাওয়ায় নাড়াতে থাকা বাহু, সূর্যের আলোয় ঝলকে ওঠা তরবারি যেন। জাপানি এই সমুদ্র যেন যবের সাগর হয়ে উঠলো, সমুদ্রের অস্থিরতা দেখা যেত যবের ডাঁটের বুকের ওঠানামায়, আর বেগে ধাবিত হওয়া স্রোত যেন যবের রক্ত। 
 
হোকাইডোর সাপোরো শহরের ঐতিহাসিক নথির একটি লিপিবদ্ধ তথ্য অনুসারে, ইউশিকাওয়া সাডাকো, কিয়োটোর কাছের কোনো গ্রামের এক কৃষক নারী, অক্টোবর ১, ১৯৪৯ এর সকালে উপত্যকার এক ধানক্ষেতে গিয়েছিলো যেখানে এক হিংস্র বনমানুষ তাকে নিগ্রহ করে। আমার এক জাপানি বন্ধু, মিঃ নাগানো, আমাকে এই জিনিস খুঁজে পেতে সাহায্য করেছিলো আর আমার জন্য এটাকে চীনা ভাষায় অনুবাদও করে দিয়েছিলো। ওই বনমানুষ নাম পাওয়া লোকটি ছিলো আমার দাদামশাই আর আমার এই নথি ঘাটার উদ্দেশ্য ছিলো একটা সময় আর স্থান নির্দিষ্টরূপে নিশ্চিন্ত হওয়া যেখানে দাদামশাইয়ের ভাষ্যমতে একটা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সংঘটিত হয়েছিলো। ১৯৪৩ এর মধ্যশরৎ উৎসবের সময় তিনি আটক হন এবং পরে তাকে হোকাইডোতে নিয়ে যাওয়া হয় বাধ্যতামূলক শ্রমিক হিসেবে। ১৯৪৪ এর বসন্তে যখন পাহাড়ি ফুলগুলো পুরোপুরি ফুটে উঠেছিলো, তিনি এক শ্রমিক ছাউনি থেকে পালিয়ে যান এবং অর্ধপশু অর্ধমানব হিসেবে পাহাড়ে জীবনধারণ শুরু করেন। ততদিনে, যখন গণতন্ত্র ঘোষণা করা হয় অর্থাৎ অক্টোবর ১, ১৯৪৯ এর মধ্যে, তিনি দুইহাজার দিনরাতেরও বেশি সময় জঙ্গলে কাটিয়ে ফেলেছেন। এখন যে সকালের কথা আমি বলছি, একমাত্র ওই বিরাট কুয়াশা ছাড়া তাতে আর কোনো নির্দিষ্ট বিশেষত্ব ছিলোনা, যেটা তার জন্য সহজ কিন্তু আরও অস্বস্তিকর করে ফেলেছিলো সেই দিনগুলো মনে করা, সেই উৎসবমুখর জীবন যেটা সে আর তার প্রিয়জনেরা স্বভূমিতে বসে কাটিয়েছিলো। তার আগের বিকেলে কি হয়েছে সে আরেক কাহিনি। 
 
এটা হোকাইডোর আর দশটা সাধারণ সকালের মতই ছিলো। কুয়াশা কেটে গিয়েছিলো আর সূর্যটা সমুদ্র আর বনের অনেকটা উপরে উঁচুতে ঝুলছিলো। অল্পকিছু ঝলমলে সাদা পাল পানির ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিলো। দূর থেকে দেখে মনেই হচ্ছিলোনা যে তারা আদৌ চলছে। বাদামি শৈবালের স্তর বালুর ওপর শুয়ে যেন রোদে নিজেদের শুকিয়ে নিচ্ছে। জাপানি জেলেরা উপর পানিতে কিলবিল করা শৈবাল একত্রিত করছিলো, যেন অনেক অনেক বড় খয়েরি গুবরে পোকা। যবে থেকে আমার দাদামশাই এক ধূসর দাঁড়ির জেলের হাতে নিগৃহীত হয়েছে, তার মন ভরে জাপানিদের প্রতি ঘৃণা তৈরি হয়েছে, এবার হোক তারা নৃশংস কিংবা মায়াময় চেহারার। সুতরাং, যখন সে গ্রামে গেলো রাতের বেলা শৈবাল আর শুটকি মাছ চুরি করতে, তার মনে কোনো আজেবাজে অপরাধবোধের অনুভূতির জন্য কোনো জায়গা ছিলোনা। একটা মরচে ধরা পুরনো কাঁচি নিয়ে সে অনেক দূর অব্দি গেলো কেবল বেলাভূমিতে শুকোতে দেয়া জেলেদের মাছধরা জাল ছিড়ে দেবার জন্য।
 
সূর্য সব পুড়িয়ে দিচ্ছিলো। এমনকি উপত্যকার শেষ কুয়াশাটুকুও গায়েব হয়ে গিয়ে সমুদ্র ক্রমশ সফেদ হয়ে উঠছিলো। সমগ্র পাহাড়ের সমস্ত গাছের বড় বড় লাল আর হলুদ পাতা মিশে গেলো পাইন ও দারুগাছের উজ্জ্বল সবুজ পাতার সাথে, ঠিক যেন আগুনের জিভ। গাঢ় লাল আর সবুজের মধ্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে নিখাঁদ সাদার বিন্যাস -- ভুজবৃক্ষের ছাল। নিঃশব্দে আরও এক শরতের দিন উপস্থিত হয়েছে। শরতের পর এলো তীব্র শীত, সেই বিশ্রী হোকাইডোর শীত, এমনই শীত যা দাদামশাইকে ভালুকের মত শীতযাপনে বাধ্য করেছে। এমনি বলছি, কিন্তু যখন পাহাড়ে শরতসূচক বেগুনি ফুলগুলো ফুটেছিলো, তখন তার শরীরে আরও চর্বি ছিলো। কেবল এই শীতের প্রস্তুতি বেশ ভালো, কারণ মূলত তিনদিন আগে সে এই গুহাটাকে সুরক্ষিত করেছেঃ সূর্যের সামনে, বাতাসের কাছে, এই জায়গাটা ছিলো লুকিয়ে থাকার পক্ষে বেশ ভালো আর নিরাপদ। তার পরবর্তী পদক্ষেপ ছিলো শীতের জন্য খাবার সংরক্ষণ। সে মতলব আঁটলো দশটি আলাদা রাতে বাইরে গিয়ে বিশটি আংশিক শুকনো শৈবালের আঁটি নিয়ে আসার। ভাগ্য যদি সহায় হয়, তাহলে হয়ত সে কিছু শুটকি মাছ আর আলুও চুরি করতে সমর্থ হবে৷ 
 
স্রোতের টান গুহা থেকে খুব বেশি দূরে ছিলোনা, যার অর্থ তাকে তুষারে পায়ের ছাপ পড়ে যাবার চিন্তা করতে হবেনা যেহেতু সে আঙুরলতা ধরে ঝোপঝাড় পেরিয়ে উঠবে। এটা একটা আরামদায়ক শীতকাল হবে, গুহাটাকে ধন্যবাদ। এটা তার জন্য একটা শুভদিন ছিলো আর সে ছিলো খুবই খুশি। সাধারণভাবেই, সে জানতেও পারলোনা যে সেইদিনে সকল চীনারাই আনন্দে উদ্বেল হয়েছিলো। সে যখন তার দারুণ সম্ভাবনা নিয়ে ভাবছিলো, তার ছেলে, আমার বাবা -- একটা ঘোড়ার পিঠে চলছিলো, এক নতুন সেনা উর্দি পরা, তার পিঠে একটা রাইফেল ঝোলানো। সে এবং তার দল ইমপেরিয়াল শহরের পূর্ব দেয়ালের পাদদেশে একটা লোকাস্ট গাছের নিচে জমায়েত হয়েছিলো, যেখানে তারা অপেক্ষা করছিলো তিয়ানানমেনেতে এক গৌরবময় কুচকাওয়াজে অংশ নেবার জন্য। 
 
সূর্যের আলো পাতা আর ডালের মধ্য দিয়ে পরিশুদ্ধ হয়ে দাদামশাইয়ের গুহায় এসে তার হাতের ওপর পড়লো। তার ধাতুরঙা আঙুল, গিঁটগুলো নখরের মত। শক্ত খুশকি আবৃত করে রেখেছে হাতের পেছন আর আঙুলের নখ খণ্ডিত এবং ভঙ্গুর। তার হাতের পেছন তপ্ত আর সেখানে চুলকানি সূর্যের কারণে। তবুও হালকা তন্দ্রায় সে তার চোখ বন্ধ করে, ঝিমুনির সাথে তার কানে আসে দূরবর্তী বন্দুকের গর্জন। সোনালি আর লাল আলোর টেক্কা দেয়া জাঁকজমক যেন দারুণরকম এক হাজার ঘোড়ার সারিতে রূপ নিলো, যেন এক জরির নকশা, ছুটে চলা স্রোতের মত, তার বুকের ভেতর থেকে নিঃসরিত হচ্ছে। দাদামশাইয়ের হ্যালুসিনেশন আর দেশ স্বাধীনের আনন্দময় উৎসবের মধ্যে যে ঘনিষ্ঠ সংযোগ তৈরি হয়েছে তা যেন দাদামশাইয়ের কল্পনায় জৌলুশ যোগ করলো। বলতে গেলে, অবশ্যই, সব ধরনের তত্ত্বই প্রয়োগ করা যায় -- টেলিপ্যাথি বা অতিপ্রাকৃতিক শক্তি -- তা হয়ত এই ব্যাখ্যার অতীত ব্যাপারটিকে ব্যক্ত করতে পারবে।
 
বহু বছর ধরে পাহাড়ে বসবাস করায় দাদামশাই লাভ করেছিলো শ্রবণ ও ঘ্রাণের ব্যতিক্রমী তীক্ষ্ণ অনুভব। এটা কোনো বিরল প্রভাব ছিলোনা, আবার কোনো বাড়িয়ে বলা দম্ভোক্তিও ছিলোনা। এটা ছিলো এক সাধারণ অকাট্য সত্য। সত্যের ভার বাগাড়ম্বরের চেয়ে বেশি আর মিথ্যে কখনো সত্যিকে ঢেকে রাখতে পারেনা। এই কথাটা দাদামশাই প্রায়ই প্রকাশ্য আসরগুলোতে বলতো। তার গুহার ভেতরে সে কান বন্ধ রাখতো আর বাইরে নাক। আঙুরের লতা একটু সরে গেলো, বাতাসে নয়। সে বাতাসের ধরণ আর বৈশিষ্ট্য জানত আর ডজনের ওপর বাতাসের স্রেফ ঘ্রাণ শুকে পার্থক্য বলে দিতে পারত। যেইনা সে কম্পিত আঙুরলতাগুলোর দিকে তাকালো, সে চিনতে পারলো শেয়ালের গায়ের গন্ধ আর বুঝতে পারলো যে অতঃপর প্রতিশোধ উপস্থিত। যেদিন সে তার চাকু দিয়ে কোমল পশমের শেয়াল শাবকগুলোকে মেরে গুহা থেকে ছুড়ে দিয়েছিলো, সেদিন থেকেই সে অপেক্ষা করছিলো শেয়ালটার প্রতিশোধের জন্য। সে ভয় পায়নি, বরং তার মধ্যে যেন আগুন জ্বলে উঠেছিলো৷ মানুষের জগৎ থেকে নিজেকে সরিয়ে নেবার পর, জন্তুরাই তার সহচর এবং প্রতিপক্ষে পরিণত হয়েছিলোঃ নেকড়ে, ভালুক, শেয়াল। সে ওদের ভালোভাবে চিনতো, আর ওরাও চিনতো তাকে। এক ভালুকের সাথে প্রায় জীবনপণ যুদ্ধ করবার পর তারা এখন একে অন্যের পথ থেকে দূরে থাকে। তবুও দেখা হয়ে গেলে দাঁত খিচিয়ে গর্জন করে দুজনেই, কিন্তু তাদের গর্জন শক্তি প্রদর্শনের জন্য নয় বরং অভিবাদন জানানোর উপায় হিসেবেই দেখে তারা আর ভদ্রলোকের মত কখনোই সন্ধির বাইরে যায়না, একে অন্যকে আক্রমণও করেনা। নেকড়ের দল আমার দাদামশাইকে ভয় পেত, ওরা তেমন যোগ্য প্রতিপক্ষ ছিলোনা।কোনো বড় মাপের হিংস্র প্রাণীর মোকাবিলার ক্ষেত্রে নেকড়ে রাস্তার দোঁআশলা কুকুরেরও অধম৷ কিন্তু শেয়াল, নেকড়ে আর ভালুকের প্রতিতুলনায়, ধূর্ত কুটিল এক ছোট্টবন্ধু। হিংস্র, কিন্তু কেবল কোনো বুনো খরগোশ বা খামারের মুরগির সামনে। 
 
সে তার দুটো মূল্যবান সম্পদ তুলে নিলো -- একটা কাটারি আর কেঁচি -- দুহাতে দুটো। শেয়ালের বৈশিষ্ট্যসূচক গন্ধ আর আঙুরলতার নড়াচড়া আরও তীব্র হয়ে উঠলো। ওটা লতার সাহায্য নিয়ে উঠে আসছিলো। দাদামশাই সবসময় ভেবে এসেছিলো যে এই আক্রমণটা হয়ত হবে গভীর রাতে। একটা শেয়ালের বুদ্ধি আর শক্তি দুটোই রাতের আঁধারের সাথে যুক্ত। দিনেদুপুরে নিজের রাজ্য পুনরুদ্ধারের আর সন্তানদের মৃত্যুর প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য ছুড়ে দেয়া এই আহবান তাকে বিস্মিত করলো। যখন সৈন্য বেশি থাকে, সেনাপতি প্রতিরক্ষার দিকে জোর দেয়; যখন বন্যার পানি বাড়ে, আলগা মাটিই ওটাকে আটকে দেয়। অন্যকথায়, সব ব্যবস্থা প্রাকৃতিকভাবেই হয়ে যাবে। এর চেয়েও অনেক বেশি বিপদের সম্মুখীন হয়েও, দাদামশাই শান্ত আর আত্মপ্রত্যয়ী ছিলো। অন্যান্য দিনের সাথে তুলনায়, যখন তার একমাত্র কাজ ছিলো মাটিতে শুয়ে থাকা, এই সকালটা যেন শপথ নিয়েছে অনেকটা উত্তেজনা দেবার।
 
সমুদ্রের অন্যপাশে শক্তিশালী অশ্বারোহী সৈন্যরা ওই সময়ে কুচকাওয়াজ করে তাদের বীরসুলভ নেতাকে অতিক্রম করছিলো যখন সে ঘোষণা করলো গণতন্ত্রের উত্থান, তখন নিচে শত হাজারো মুখ তপ্ত চোখের জলে সিক্ত হয়ে উঠেছিলো।
 
এক মোটা আঙুরলতাকে থাবা দিয়ে আঁকড়ে ধরে, আগুনরঙা লাল শেয়ালটা গুহার সেই স্তরে উঠে এলো যেখানে দাদামশাই লুকিয়ে ছিলো। এক চতুর হাসির সাথে উজ্জ্বল সূর্যালোকে ওটার কটাক্ষ দেখা গেলো। ওটার চোখের চারপাশের বৃত্ত ছিলো ঘন কালো আর মোটা সোনালি পাপড়ি ওটার চোখের পাতা থেকে বিচ্ছুরিত হচ্ছিলো। একটা মা শেয়াল ছিলো ওটা। দাদামশাই দেখলো দুইসারি বিষন্ন স্তন, মৃত শাবকদের জন্য দুধ উপচে পড়ছে তাতে। বড়, মাংসল লাল শেয়ালটা বেগুনি আঙুরলতায় ঝুলে ওটার জংলা লেজ লোভনীয়ভাবে সামনে পিছে দোলাচ্ছিলো, যেন এক বুনো তরমুজ, এক ভয়ানক শিখার মত যা এমনকি লোহাকেও গলিয়ে দিতে পারে।
 
দাদামশাই হঠাৎই এক ক্লান্তি অনুভব করলো কাটারি ধরা হাতটাতে। তার আঙুলগুলো যেন মৃত, কঠিন আর অসার হয়ে উঠলো। তার এই সমস্যার মূলে ছিলো শেয়ালটার মুখভঙ্গি। ওটার উচিত ছিলো দাঁত খিচিয়ে একটা বন্য ভঙ্গি করা, মিষ্টি হেসে মোহনীয়ভাবে লেজ নাড়ার বদলে। ওই দৃশ্য দাদামশাইকে নিশ্চল করে দিয়েছিলো আর তার আঙুলগুলোকে অসার। হালকাভাবে দুলতে থাকা আঙুরলতাটা গুহার মুখ থেকে কেবল অল্প কয়েক ফুট দূরে ছিলো। সূর্যটা মাথার ওপর দিয়ে গুল্মঝোঁপের পাতার ওপর নিজের ঔজ্জ্বল্য ছড়িয়ে দিয়ে তাদের পরিণত করলো টুকরো টুকরো সোনার পাতে। তার কাজ শুধু এইটুকু যে তাকে গিয়ে আঙুরলতাটাকে কেটে দিতে হবে যাতে শেয়ালটা নিচের উপত্যকায় তলিয়ে যায়, কিন্তু সে হাতই তুলতে পারলোনা। শেয়ালটার মোহিনী মায়া ছিলো সীমাহীন আর চাতুর্যের ওজন অপরিমাপযোগ্য। শেয়ালঘটিত বিভিন্ন কিংবদন্তি তার মনে ঢেউ খেলে গেলো, আর সে বিস্মিত হলো এই ভেবে যে শেয়ালদের ব্যাপারে এত গল্প সে তার মাথায় কবে জমা করেছে। পিস্তলবিহীন হাতের কারণে সে তার সাহসে ক্ষয় অনুভব করলো। সেই দিনগুলোতে, যখন সে তার কালো ঘোড়ার দুপাশে দুই পা দিয়ে বসত হাতে অস্ত্র নিয়ে, তখন সে কোনো কিছুকেই ভয় পেত না।
 
শেয়ালটার ভেতর থেকে উচ্চগ্রামের কম্পনধ্বনি বের হয়ে ওটার লেজ নাড়ানোকে যেন সাহচর্য দিতে লাগলো, শব্দটা ছিলো যেন কোনো বিলাপরত নারীর কান্নার মত। দাদামশাই বুঝতেই পারলোনা যে কেন সে ইতস্তত করছিলো, কেন সে হঠাৎ অক্ষম হয়ে গেলো। তুমি কি সেই ডাকাত ইউ ঝান'আও নও যে কিনা খুন করত পলক না ফেলেই? সে তার চাকুর ভঙ্গুর হাতলটা আঁকড়ে ধরলো আর নিচের দিকে একটু উবু হয়ে শেয়ালটার আক্রমণের জন্য অপেক্ষা করছিলো যেহেতু ওটা আঙুরলতায় ঝুলে সামনে পেছনে দোল খাচ্ছিলো। তার বুক ধকধক করছিলো, ঠান্ডা রক্তের ধারা মাথার দিকে ধাবমান হচ্ছিলো আর তার চোখের সামনের অংশটাকে ভরিয়ে দিচ্ছিলো পানি আর বরফের রঙে। কাঁটার মত ব্যথা তার রগে আঘাত করলো। মনে হলো যেন শেয়ালটা তার মতলব ধরতে পেরে গেছে। ওটা তখনো ঝুলছিলো কিন্তু পরিধি কমে আসছিলো। এখন দাদামশাইয়ের ওকে মাত করতে অনেকটা ঝুঁকি নিতে হবে। ওটার মুখের ভাবটা ছিলো অনেকটাই একটা কামুক নারীর মত। ভঙ্গিটা এমন যেটার সাথে দাদামশাই ছিলো খুবই পরিচিত। সে অনুভব করলো যে একমুহূর্তে শেয়ালটা নিজেকে সাদা শোক পোশাক পরা এক মহিলায় রূপান্তরিত করতে পারে। তাই সে নিজেকে সামনের দিকে ঠেলে দিলো, একহাতে আঙুরলতা আঁকড়ে ধরলো আর অন্য হাত শেয়ালটার মাথার দিকে নিশানা করলো।
 
শেয়ালটা ঝাপিয়ে পড়লো। দাদামশাইও সামনে ঝাঁপ দিলো, আর একটু হলে গুহার বাইরে পড়েই যেত। কিন্তু সে কোনোভাবে তার ভঙ্গুর চাকুটা দিয়ে শেয়ালটার মাথায় আঘাত করতে সক্ষম হলো। ঠিক তারপরই, যখন সে তার শরীরটাকে টেনে আবার গুহার মধ্যে আনছিলো, সে উপর থেকে একটা চিৎকার শুনলো। একটা গরম, পঁচা গন্ধ চিৎকারের সাথে যুক্ত হয়ে তাকে চেপে ধরলো। একটা বিরাট শেয়াল তার পিঠে ঝাঁপিয়ে পড়লো, তার বুক ও পিঠ থাবা দিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো, ওটার টানটান জংলা লেজ উত্তেজিতভাবে যেন বাতাসকে হাওয়া দিচ্ছিলো। অমসৃণ পশমগুলো দাদামশাইয়ের উরুতে যন্ত্রণাদায়কভাবে গেঁথে যাচ্ছিলো। একই সময়ে সে ঘাড়ের ওপর শেয়ালটার গরম নিশ্বাস অনুভব করতে পারছিলো যা প্রতিবিম্বিত হয়ে উলটে আবার ভেতরে চলে যাচ্ছিলো। তার পুরো পায়ের লোমগুলো দাঁড়িয়ে গেলো, যেন কিছু খুব পীড়াদায়কভাবে তার ঘাড়ের পেছন দিক খুড়ে চলেছে। শেয়ালটা তাকে কামড় দিচ্ছিলো আর একমাত্র তখনই সে পুরোপুরি বুঝতে পারলো জাপানের হোকাইডোর শেয়ালের তঞ্চকতা।
 
গুহা পুনরুদ্ধার করা এখন তার পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছিলো। এখনও যদি সে কোনোভাবে লড়াই করে ভেতরে ঢোকে, সেই শেয়ালটা, যেটাকে সে আহত করেছে, তার পিছু পিছু উঠে যেতে পারে, আর তারপর মদ্দা মাদি দুটো মিলে আক্রমণ করবে, একটা সামনে আর অন্যটা পেছন থেকে, আর তারপর দাদামশাই হয়ে যাবে স্বর্গীয় দাদামশাই। সে বিদ্যুতের গতিতে পুরো ব্যাপারটা বিশ্লেষণ করে নিলো। যদি সে নিজের জীবন বাজি রাখার সিদ্ধান্ত নেয়, তবে তার বেঁচে থাকার সম্ভাবনা খুবই কম। মদ্দা শেয়ালটার রেজারের মত ধারালো দাঁত তার শরীর ছিড়ে ঢুকছে, আর সে অনুভব করতে পারছিলো যে ওটা তার হাড় স্পর্শ করছে। গুড়ি মেরে তাড়াতাড়ি গর্তযুক্ত চাকু আর কেঁচি উপত্যকার মাটিতে ফেলে দুহাতে একটা আঙুরলতা খামচে ধরে পিঠে আঁকড়ে থাকা মদ্দা শেয়ালটাসহ বাইরে ঝাঁপ দিয়ে হাওয়ায় ঝুলতে থাকে।
 
উজ্জ্বল লাল রঙের ফোঁটা মাদী শেয়ালটার মাথার ক্ষত থেকে ক্ষরিত হচ্ছিলো। এটা দাদামশাই দেখলো যখন সে গুহা থেকে ঝাঁপটা দিলো। তার ঘাড় থেকে গরম রক্ত কাঁধ বেয়ে নেমে তলপেট আর নিতম্বে প্রবাহিত হচ্ছিলো। শেয়ালটার দাঁত যেন তার হাঁড়ের সন্ধিগুলোতে খোদাই হয়ে যাচ্ছে। মাংসপেশির ব্যথার চেয়ে হাড়ের ব্যথা সাত কি আটগুণ খারাপ; এই সিদ্ধান্তে সে এসেছে তার চীনের অভিজ্ঞতা থেকে। আর কোনো জীবিত জন্তুর দাঁত শার্পনেলের চেয়েও অনেক বেশি ভয়ংকর। প্রথমটার ব্যথায় জীবনের ঔজ্জ্বল্য থাকে; আর পরেরটায় মৃত্যুর গুরুভার। দাদামশাই এই মরণপণ লাফের ওপর ভরসা রেখেছিলো মদ্দা শেয়ালটাকে পিঠ থেকে ঝেড়ে ফেলার জন্য, কিন্তু ওটার নাছোড়বান্দা থাবা সব আশায় পানি ঢেলে দিলো। যেন চুম্বক বা কাঁটার হুক, এমনভাবে ওগুলো দাদামশাইয়ের কাঁধ আর কোমরে লেগে রইলো। ওটার মুখ আর দাঁত যেন তার ঘাড়ের সাথে মিশেই গেছে। আহত মা শেয়ালটা ব্যাপারটাকে তার জন্য আরও কঠিন করে তুললো যেহেতু ওটা ততটাও আহত হয়নি, আঙুরলতা ছেড়ে দিয়ে পড়ে যাবার মত। আক্রমণে মনোনিবেশ করতে ওটা আরও অর্ধমিটারের মত এগিয়ে এলো, তারপর তার পা কামড়ে ধরলো। যদিও তার পায়ের চামড়া অনেক শক্ত আর কড়া হয়ে উঠেছিলো যে কাঁটা বা ঝোঁপঝাড়ে বিশেষ বিচলিত হত না, কিন্তু তার পরেও, সে নিতান্তই রক্ত মাংসের একজন মানুষ, আর ওটার ধারালো দাঁত তার পক্ষে একটু বেশিই ছিলো। সে ব্যথায় চিৎকার করে উঠলো আর যন্ত্রণার কান্না তার দৃষ্টিকে ঝাপসা করে তুললো। 
 
দাদামশাই নিজেকে খুব জোরে ঝাঁকুনি দিলো। শেয়ালগুলোও তার সাথে টলে উঠলো কিন্তু ওগুলোর দাঁত তার মাংসের ভেতর গেঁথেই রইলো; হওয়ার মধ্যে হলো এই যে, দাঁতগুলো আরও গভীরে ঢুকে গেলো। ছেড়ে দাও দাদামশাই! এভাবে বেঁচে থাকার চেয়ে পড়ে যাওয়া ভালো। কিন্তু সে আঙুরলতাটাকে যেন জীবনপণ করে ধরে রাখলো। আঙুরলতাটার এতবড় জীবনে কখনোই ওটাকে এতখানি জোরাজুরি সহ্য করতে হয়নি। ওটা ক্যাচক্যাচ করে দুমড়েমুচড়ে গেলো, যেন কাতরাচ্ছে। ওটার শেকড় ছিলো গুহার ওপরের নরম ঢালে, যেখানে উঁচু থেকে ঝরে পড়া লাল আর হলুদ পাতার মধ্যে বেগুনি ফুলগুলো পুরোপুরি ফুটে রয়েছিলো। ওই জায়গাটা সেখানে যেখানে দাদামশাই খুঁজে পেয়েছিলো কচকচে, মিষ্টি, রসালো পাহাড়ি মূলা যেটা সে তার খাদ্যতালিকায় যোগ করেছিলো। এটা ওই জায়গাটাও যেখানে সে ওই আঁকাবাঁকা শেয়ালচলা পথটা আবিষ্কার করেছিলো যেটা অনুসরণ করে আঙুরলতা ধরে সে তরমুজের খোঁজ করছিলো -- তারপর পুরো পথ ধরে শেয়ালের ডেরায় যেখানে সে শাবকগুলোকে হত্যা করে গুহার বাইরে ছুড়ে দিয়েছিলো। দাদামশাই, তুমি যদি জানতে যে তুমি এভাবে হাওয়ায় ঝুলতে থাকবে, যন্ত্রণায় ছারখার হয়ে যাবে, তুমি ওই শাবকগুলোকে মারতেও না আর গুহাটাও দখল করতেনা, করতে কি? তার ছাই মুখটা যেন ইস্পাতরঙা। সে চুপ করে রইলো। আঙুরলতাটা সামনে পিছনে দুলছিলো আর গুহার ওপর থেকে ধুলোর বৃষ্টি ঝরাচ্ছিলো। সূর্যটা উজ্জ্বলভাবে ঝলমল করছিলো আর গুহার পশ্চিম দিকের জলস্রোতকে এমনভাবে চমকাচ্ছিলো যেন ওটা উপত্যকার গাছগুলোর মধ্যে এঁকেবেঁকে নেমে এসেছে। উপত্যকার ওধারের গ্রামটা বেলাভূমিকে ঘিরে ছিলো যেখানে হাজারে দশ হাজারে সাগরের ঢেউ ঝিলমিল করে আছড়ে পড়ত, একটা আরেকটার পেছনে জোরে পাক খেতে খেতে, নিরন্তর। সমুদ্রের শোধিত সংগীত দাদামশাইয়ের কানে ঢুকছিলো, দশ হাজার ঘোড়া যেন এক মিনিটে ধাবিত হচ্ছে, হালকা নাচের সুর তার ঠিক পরেই। সে শক্ত করে আঙুরলতা খামচে ধরলো, ছেড়ে না দেয়ার সিদ্ধান্তে অটল। 
 
আঙুরলতাগুলো মানুষ আর শেয়ালকে একই রকম সতর্কতা সংকেত পাঠালো ; তবুও মানুষ আর শেয়াল উভয়েই ওগুলোকে মুচড়েই চললো। ওগুলো ক্ষুদ্ধভাবে ছিন্ন হতে শুরু করলো।গুহার মুখটা আস্তে করে যেন বাতাসের সাথে ওপরে উঠে গেলো। সাধের জীবনের মায়ায় দাদামশাই লতা আঁকড়ে রইলো। গিরিচূড়া উপরে উঠে গেলো, ঝোপঝাড়ও, সবুজ উপত্যকা যেন দৌড়ে এলো তাকে জড়িয়ে নিতে। বনের সতেজ, ঠান্ডা বাতাস আর পঁচা পাতার গন্ধ এক নরম গদির সৃষ্টি করলো যা দাদামশাইয়ের পেটটাকে শান্তভাবে আরাম দিলো। লম্বা বেগুনি আঙুর লতাগুলো বাতাসে নাচতে লাগলো। সে বুঝতে পারছিলো, অনুভব করতে পারছিলো, যে তার পা কামড়ে থাকা শেয়ালটা ওটার আঙুরলতা ছিড়ে পড়ে গেছে আর পড়েই একটা কমনীয় ডিগবাজি খেয়েছে যেন এক স্বর্গীয় উল্কা। ঘোড়ার কেশরের মত বাঁক খেয়ে সাগরের ঢেউগুলো বেলাভূমিতে ভেঙে পড়লো। 
 
নিচে পড়ার সময় দাদামশাইয়ের মাথায় মরার কোনো চিন্তাই ছিলোনা। সে বলছিলো যে বনের মধ্যে আত্মহত্যা করতে গিয়ে এক বছরে তিনবার যখন তার দড়ি ছিড়ে গিয়েছিলো, তখনই সে বুঝে গিয়েছিলো যে সে মরবেনা। তার মধ্যে একটা পূর্বাভাস কাজ করছিলো যে তার শেষ নিশ্বাস পড়বে গিয়ে সেই উত্তরপূর্ব গাওমি শহরতলিতে, সমুদ্রের অপর তীরে। আর তাই যেহেতু তার মনে কোনো মৃত্যুভয় ছিলোনা, নিচে পড়ে যাওয়া হয়ে উঠলো উত্তেজনার আনন্দ উপভোগের এক দুর্লভ সুযোগ। তার শরীর যেন হালকা আর চেতনা স্বচ্ছভাবে মৃদু হয়ে আসছিলো। তার হৃদয় কম্পন বন্ধ করে দিলো, তার রক্ত গতি কমিয়ে আনলো আর নাভিমূল হালকা লাল আর গরম হয়ে উঠলো যেন এক কয়লার পাত্র। দাদামশাই অনুভব করলো যে বাতাস মদ্দা শেয়ালটাকে তার থেকে আলাদা করে নিয়ে যাচ্ছে -- প্রথমে ওটার পা, তারপর ওটার মুখ। মুখটা মনে হলো তার ঘাড় থেকে কিছু নিয়ে গেলো, কিন্তু ওটা কিছু রেখেও গেলো। ওটার বোঝা আচমকাই সরে গেলো, আর দাদামশাই খুব মসৃণভাবে হাওয়ায় তিনশ ষাট ডিগ্রি ঘুরে গেলো। ওই ঘূর্ণনটা তাকে সুযোগ করে দিলো মদ্দা শেয়াল আর ওটার সূচালো, বুনো মুখটা দেখার। ওটার পিঙ্গল পশম, পেট ছাড়া, পেটটা ছিলো তুষারশুভ্র। সাধারণভাবেই, সে দেখতে পেলো যে ওটার থেকে একটা ভালো চামড়া পাওয়া যাবে যেটা দিয়ে সে একটা চামড়ার জামা তৈরি করতে পারবে। গাছের মাথাগুলো জলদি জলদি উপরে উঠে যাচ্ছিলো -- প্যাগোডার মত তুষার পাইন, সাদা ছালের ভুজগাছ, আর হলুদ পাতার ওকগাছ যেন প্রজাপতির মত উড়ছে। সে ভেঙে পড়লো তাদের প্রসারিত শামিয়ানায়। 
 
প্রাণের মায়ায় দাদামশাই তখনো সেই মোড়ানো আঙুরলতাটা ধরে রেখেছিলো যখন ওটা একটা ওক গাছের শক্ত কিন্তু ভঙ্গুর শাখায় আটকে গেলো। যখন সে গাছের ছাউনিতে ঝুলছিলো, সে শুনলো ডালপালার টুকরো হয়ে ভেঙে যাবার শব্দ। সে একটা মোটা ডালের গোড়ায় গিয়ে পড়লো আর বাতাসে লাফিয়ে উঠলো; আবারো সে ডালটায় ধাক্কা খেলো আর আবারো তিড়িং করে লাফিয়ে উঠলো। শেষঅব্দি সে স্থির হলো কম্পমান গাছটার মধ্যে, শেয়ালদুটোকে দেখার একেবারে ঠিক সময়ে, প্রথমে প্রথমটা আর তারপর অন্যটা যেহেতু ওগুলো মরা পাতার পুরু গালিচার ওপর গিয়ে পড়েছে। যেন একজোড়া বিস্ফোরক, দুটো নরম শরীর কাদামাটি আর পঁচা পাতাদের চারিদিকে ছড়িয়ে দিয়েছিলো। দুটো নিষ্প্রভ শব্দ মরা পাতাদের মধ্যে হৈচৈ ফেলে দিয়েছিলো, পুরনোরা ঝরে পড়েছে দুটো একইরকম মৃত শেয়ালকে ঢেকে দিতে। যখন তারা লাল আর হলুদ পাতাদের নিচে চাপা পড়ে যাচ্ছিলো, সেরা রঙের শেয়ালগুলোর দিকে তাকিয়ে দাদামশাই সহসাই অনুভব করলো অদ্ভুত এক উষ্ণতায় তার বুক সম্প্রসারিত হচ্ছে। একটা মিষ্টি স্বাদে তার মুখ ভরে উঠলো আর একটা লাল পতাকা তার মাথায় উন্মুক্ত হলো। তার চারিদিকে আলো ছড়িয়ে পড়লো আর তার যন্ত্রণা পলকা বাতাসে মিশে গেলো। তার হৃদয়ে শেয়ালগুলোর প্রতি অনুভূতি উপচে পড়তে লাগলো। ওদের লাল আর হলুদ পাতার এক বিছানায় অভিজাতভাবে অবরোহনের দৃশ্য তার মনের ভেতর এবং বাহির প্লাবিত করছিলো। আমি রুক্ষভাবে বললাম, দাদামশাই তুমি মরেছ।
 
পাখির ডাক দাদামশাইকে জাগিয়ে তুললো। ঝলসানো মধ্যদুপুরে সূর্য তার ত্বকের কিছুটা পুড়িয়ে দিয়েছে, ডালপাতার ফাঁকের মধ্য দিয়ে ঝলমলে আলোর সোনালী স্রোত গলে বেরিয়ে আসছে। হালকা সবুজ কাঠবিড়ালিরা তড়িৎ গতিতে গাছ থেকে লাফিয়ে নামছিলো, তারা ওক গাছের ফল ছিড়ে তার খোসা চিবুচ্ছিলো, ওটার ভেতরের মাংস উন্মুক্ত হচ্ছিলো, সাথে এর সূক্ষ্ম তিক্ত সুবাস।
 
দাদামশাই তার শরীর সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠতে লাগলো। তার ভেতরের সব প্রত্যঙ্গ ঠিক ছিলো। তার পায়ের পাতা ব্যথা করছিলো, আর যেখানে মাদি শেয়ালটা কামড়েছিলো সে জায়গায় জমাট বেঁধেছে কালো রক্ত আর ছেড়া মাংস। তার ঘাড়ে ব্যথা করছিলো যেখানে মদ্দা শেয়ালটা দাঁত বসিয়েছিলো। সে নিশ্চিত ছিলোনা যে তার হাতদুটো কোথায়, খুঁজতে খুঁজতে ওগুলোকে তার মাথার ওপর পাওয়া গেলো, উঁচুতে তোলা অবস্থায় তখনো সেই আঙুরলতাটাকে ধরে আছে যেটা তার প্রাণ বাঁচিয়েছিলো। তার অভিজ্ঞতা তাকে বললো যে হাত দুটো নিজের স্থানচ্যুত হয়েছে। সে আড় ভাঙলো। মাথা ঘোরাচ্ছে, তাই সে নিচে তাকানো বন্ধ করলো। দাঁত ব্যবহার করে সে তার আঙুলগুলো আঙুরলতা থেকে আলাদা করলো। তারপর, তার পা আর ডালের গোড়ায় ভর দিয়ে সে তার হাতদুটোকে নিজেদের জায়গায় ফিরিয়ে আনলো। সে হাড়ের কড়ক শুনতে পেলো আর অনুভব করলো তার লোমকূপ দিয়ে ঘাম বেরিয়ে আসছে। একটা কাঠঠোকরা কাছেরই একটা গাছে আঘাত করছিলো। ঘাড়ের ব্যথাটা যেন প্রতিশোধ নিতে ফিরে এলো, যেন ওই কাঠঠোকরা ওর সূচালো ঠোঁট দিয়ে তার সাদা হয়ে আসা শিরাগুলোর একটায় ঠোকর দিচ্ছিলো। বনের পাখিদের কাকলী সমুদ্রের ঢেউয়ের শব্দ ঢেকে দিতে পারলোনা, আর সে জানতো যে সমুদ্র খুব কাছেই। যেই মূহুর্তে সে মাথাটা নিচু করলো তার মাথা ঝিমঝিম করে উঠলো আর সেটাই ছিলো গাছ থেকে নামার পথে সবচেয়ে বড় বিপত্তি। কিন্তু যেখানে আছে সেখানে থাকলে সেটা হয়ে যাবে আত্মহত্যার চেষ্টা। তার সাহসে গিট্টু লেগে গেলো, তার গলাও শুকিয়ে গেলো।
 
যখন সে শরীরটাকে গাছের সাথে শক্ত করে লাগিয়ে রেখে গাছ থেকে নামার চেষ্টা শুরু করলো, তার অকেজোর কাছাকাছি হাতদুটোকে কর্মক্ষম করে তোলার জন্য পা ও পেটটাকে কাজে লাগিয়ে দিলো। কিন্তু তার চেষ্টা বিশেষ দাম পেলোনা আর সে উল্টেপাল্টে মাটিতে পড়লো। পঁচা পাতার গালিচা তার জন্য গদির কাজ করলো। একটা বিস্ফোরণ ঘটানোর পক্ষে তার পতনের উচ্চতা ছিলো বেশ নিচু৷ মিষ্টি ঝাঝালো দুর্গন্ধ যা তার নিচ থেকে উঠছিলো, তার ঘ্রাণের অনুভূতিকে উদ্বেল করে তুললো। সে নিজের পায়ে দাঁড়ালো আর পানির শব্দ কানে নিয়ে, সামনের দিকে হোঁচট খেয়ে চলতে শুরু করলো। পঁচা পাতার আড়ালে স্রোত লুকিয়ে ছিলো আর যেইনা তাদের ওপর তার পা পড়লো, একটা ঠান্ডাভাব তাকে ছুঁয়ে দিতে অগ্রসর হলো আর তার পা দেয়া জায়গাটা থেকে পানি উঠে এলো। সে উপুড় হয়ে শুয়ে পঁচা পাতাগুলো সরাতে লাগলো স্তরে স্তরে, যেখানে পানির সবচেয়ে জোরদার শব্দ পাওয়া যাচ্ছিলো। ব্যাপারটা ছিলো একটা মসৃণ চ্যাপ্টা কেকের স্তরগুলো তুলে ফেলার মত। প্রথমে পানিটা ছিলো অপরিষ্কার; সে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলো ওটা পরিষ্কার হবার জন্য, তারপর সে মাথা নিচু করলো পানিটা পান করার জন্য আর ওই ঠান্ডা পানিটা তার বুকের ভেতর দিয়ে দৌড়ে গিয়ে পাকস্থলীতে পৌঁছালো ; দুর্গন্ধময় স্বাদটা প্রথমে কিছুক্ষণ পাওয়া গেলোনা। এটা আমায় মনে করিয়ে দিলো যুদ্ধের সেই মুহূর্তের কথা যখন সে হাত দিয়ে সরিয়ে নিচ্ছিলো ব্লাক ওয়াটার নদীর গরম, নোংরা, ব্যাঙাচি ভরা পানি। 
 
এখন যখন দাদামশাই পেটভরে পানি পান করতে পারলো, সে অনেকটাই ভালো বোধ করতে লাগলো আর আরও অনেকটা তেজ ফিরে পেলো। অতগুলো পানি তখনকার জন্য অন্তত তার ক্ষুধায় রাশ টেনে দিলো। সে হাত দিয়ে ঘাড়ের ক্ষতটা অনুভব করতে চাইলো। ওটার অবস্থা ছিলো একটা বিশৃঙ্খল মন্ডের মত, আর তার মনে পড়লো ওই ছুরি মারার মত ব্যথা যখন শেয়ালটা উড়ে গিয়ে ওটার দাঁত সরে গেলো৷ দাঁতে দাঁত চেপে সে আঙুল দিয়ে ক্ষতটা পরীক্ষা করলো। যা ভেবেছিলো, সে ওখানে একজোড়া সূচালো দাঁত পেলো। ওগুলো সরাতেই রক্তপ্রবাহ আবার শুরু হলো, কিন্তু বেশি নয়, আর সে ওটাকে প্রবাহিত হতে দিলো অনেকটা সময় ধরে যতক্ষণ না ক্ষতটা পুরোপুরি পরিষ্কার হয়। তারপর সে দম নিলো আর তার মাথা থেকে সব চিন্তা দূর করে মাথাটাকে সাফ করলো। বিবিধ উদ্ভিদের গন্ধের শক্তিশালী স্রোত থেকে সে খুঁজে নিলো একদম আলাদা আর তীব্র লাল লুসেসট্রাইফ পাতার ঘ্রাণ, আর সে ঘ্রাণ অনুসরণ করে সে পৌঁছে গেলো এক লম্বা পাইন গাছের পেছনে। আমি কখনোই এই গাছের সন্ধান কোনো ছবিওয়ালা চীনা উদ্ভিদ বিশ্বকোষে পাইনি। দাদামশাই কিছুটা ঔষধি পাতা তুলে নিলো আর চিবিয়ে পিন্ড তৈরি করলো, তারপর ওগুলোকে তার ক্ষতে ঘষে দিলো, একটা তার ঘাড়ে আর অন্যটা পায়ে। মাথা ঘোরানো কমাতে সে গেলো বেগুনি ডাঁটার পিপারমেন্ট খুঁজে দেখতে। কয়েকটা পাতা ছিড়ে নেবার পর সে ততক্ষণ ওগুলোকে কচলাতে লাগলো যতক্ষণ না রস বেরিয়ে আসে, তারপর সেগুলোকে কপালে লাগিয়ে নিলো। এখন তার ক্ষতগুলোয় আর যন্ত্রণা হচ্ছিলোনা। একটা চেস্টনাট ওক গাছের নিচ থেকে সে কুড়িয়ে খেলো একগুচ্ছ বিষহীন মাশরুম আর তার সাথে কিছু পাহাড়ি পেঁয়াজ। তার কপাল ভালো ছিলো যার কারণে সে কিছু বুনো আঙুরও খুঁজে পেলো। ক্ষুধা মিটিয়ে নেবার পর সে তার অন্ত্র আর মূত্রথলি খালি করলো। অতঃপর আবার সে নিজেকে তৈরি করে নিলো এক শক্তিশালী পার্বত্য প্রাণ হিসেবে। 
 
ওকগাছের নিচে পড়ে থাকা শেয়ালগুলোকে দেখতে সে হেঁটে গেলো। ডুমো মাছির দল ততক্ষণে ওদের ওপর ভনভন করতে শুরু করে দিয়েছে। সবসময় মাছিদের ভয় পাওয়া দাদামশাই পিছে হটে এলো। পাইন গাছ থেকে গড়িয়ে পড়া রস সুন্দর গন্ধ ছড়িয়ে দিচ্ছিলো। গাছের কোটরের মধ্যে ঘুমিয়ে নিচ্ছিলো ভালুকেরা; নেকড়ের দল পাথুরে স্তরগুলোতে নিজেদের শক্তির পরিচর্যা করছিলো। দাদামশাই বুঝছিলো যে তার নিজের গুহায় ফিরে যাওয়া উচিত, কিন্তু সমুদ্রের ঢেউয়ের প্রশান্ত আওয়াজ তাকে টানছিলো আর তাই সে তার নিজের দিনের বেলা লুকিয়ে থাকার আর কেবল রাতে বাইরে যাবার নিয়ম উপেক্ষা করলো। সত্যি বলতে -- সে কখনোই ভয় পেতনা -- ঢেউয়ের শব্দ ধরে সে এগিয়ে চললো। 
 
শব্দ শুনে সমুদ্র বেশ কাছেই মনে হচ্ছিলো, কিন্তু ওটা মূলত ছিলো কিছুটা দূরে। দাদামশাই বনের মধ্য দিয়ে চললো, উপত্যকাটার মতই লম্বা আর অপ্রশস্ত, আর তারপর একটা ঢালু টিলার ওপর উঠে গেলো যেখানে গাছের সারি ধীরে ধীরে পাতলা হয়ে আসতে শুরু করেছে। মাটিতে ফুটকি কেটেছে নিকেশ হওয়া গেছের গুড়ি। সে টিলাটাকে ভালোই চিনতো, যদিও আজকের আগে সে এই জায়গাটাকে কেবল রাতের বেলাতেই দেখেছে। রঙ আলাদা ছিলো, আর গন্ধও। গাছপালা ঢাকা জায়গাটার ভেতর ভেতর জায়গা ছিলো যেখানে ফ্যাকাসে ডাঁটার ভুট্টা আর মুগডাল চাষ করা হয়েছে। দাদামশাই দুটো সারির ভেতর উবু হয়ে বসে কিছু মুগডাল খেয়ে নিলো যেটা তার জিভে কিছু দানাদার অবশিষ্টাংশ রেখে গেলো। তার শান্তি শান্তি লাগছিলো, যেন কোনো তাড়াহুড়ো নেই, চিন্তাহীন কোনো পথিকের মত। এটা এমন একটা অনুভূতি ছিলো যেটা পাহাড়ের এই চোদ্দ বছরে সে মাত্র অল্প কয়েকবারই অনুভব করেছে। খাঁড়ির পানি থেকে এলুমিনিয়ামের চায়ের পাত্রের সাহায্যে লবণ বের করার সময়টা তার মধ্যে অন্যতম। পেট ভর্তি করে আলু খাওয়ার দিনটাও তেমন। প্রতিটিই ছিলো কোনো না কোনো বিশেষ ঘটনা, নিজ নিজ ক্ষেত্রে স্মৃতিবিধুর। 
 
মুগডাল খাবার পরে, সে টিলার ওপরের শেষ কয়েকশো মিটার হাঁটলো, সেখানে পৌঁছে সে সমুদ্রের নীল পানির দিকে তাকালো যেটা তাকে এই জায়গায় টেনে এনেছে, আর দেখলো টিলার নিচের ধূসর গ্রাম। বেলাভূমি স্তব্ধ ছিলো; এক বুড়োমতন দেখতে লোক রোদে শুকোতে দেয়া শৈবালের টুকরোগুলোকে উল্টেপাল্টে দিচ্ছিলো। গ্রামটা আলোড়িত হতে শুরু করলো গবাদি পশুর ডাকের মাধ্যমে। এই প্রথমবার সে দিনের আলোয় গ্রামটার কাছে এসেছে, আর তার সামনে ছিলো শাশ্বত জাপানি গ্রামের এক অনিরুদ্ধ চিত্র। ঘরবাড়ির একটু আলাদারকম কাঠামো বাদে, এটা উত্তরপূর্ব গাওমি শহরতলির কৃষি গ্রামগুলোর সাথে আকর্ষণীয়রকম সামঞ্জস্যপূর্ণ। একটা রুগ্ন, নিস্তেজ কুকুরের অদ্ভুত চিৎকার যেন তাকে সাবধান করতে চাইলো আর বেশি সামনে এগোনোর সাহস না দেখাতে। দিনের আলোয় যদি তাকে দেখা যায় পালানো অসম্ভব যদিওবা নাও হয়, মুশকিল হবে। তাই সে কিছু কাঁটাঝোপের পেছনে লুকিয়ে রইলো আর কিছুক্ষণ ধরে গ্রাম আর সমুদ্রটাকে দেখলো। একঘেয়ে লাগলে সে একটা সতেজ মেজাজ নিয়ে ফিরে চললো। কিন্তু তারপর তার মনে পড়ে গেলো চাকু আর কাঁচিটার কথা যেগুলো সে উপত্যকায় হারিয়ে ফেলেছে, আর তাকে আতঙ্ক ঘিরে ধরলো। ওই পরম সম্পদগুলো বাদে এমনি এমনি ছাড় পেয়ে যাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠবে। সে পা চালালো।
 
টিলার ওপর থেকে সে একটা ভুট্টাক্ষেত দেখেছিলো যেখানে ভুট্টার ডাঁটগুলো বাতাসে শব্দ করছিলো যেটা বেশ কাছে শোনাচ্ছিলো। সে উবু হয়ে একটা গাছের পিছনে লুকিয়ে পড়লো। ক্ষেতটা কয়েক একরের বেশি বড় নয়, আর ভুট্টাগুলোর চিকন, ছোটখাটো মঞ্জরি দেখতে স্বাস্থ্যবান মনে হচ্ছিলোনা, সম্ভবত পানি আর সার দুটোরই অভাব। সময়প্রপাতে ফিরে তার নাকে এলো মাগওর্ট পাতা পোড়া গন্ধ। ধোয়ার প্রান্ত ধরে মশা ভনভন করছিলো; একটা নাশপতি গাছে ঝিঝিপোকা উচ্চস্বরে কিচকিচ করছিলো; অন্ধকারে একটা ঘোড়া খড়ের সাথে মেশানো ভুষি খাচ্ছিলো; কবরস্থানের এক সাইপ্রেস গাছে বসে একটা পেঁচা করুণভাবে ডাকছিলো ; আর ওই ঘন, পুরু রাতটা শিশিরে ভেজা ছিলো। ভুট্টাক্ষেতে কেউ কাশলো। একজন নারী। চমকে উঠে দাদামশাই বেরিয়ে এলো তার ভাবাবেশ থেকে, উত্তেজিত, ভয়ার্ত। 
 
মানুষ ছিলো সেই জিনিস যাদের উপস্থিতি তাকে সবচেয়ে ভীত করে তুলতো আবার যাদের অভাব সে সবচেয়ে বেশি অনুভব করত।
 
উত্তেজনা আর ভীতির তাড়নায় সে নিশ্বাস আটকে চোখ তীক্ষ্ণ করলো, ভুট্টাক্ষেতের নারীকে এক নজর দেখার ইচ্ছায়। সে মাত্র একবারই কেশেছিলো, হালকাভাবে, তাও সে বুঝে গিয়েছিলো যে ওটা এক নারীর শব্দ। তার শ্রুতি যথেষ্ট তীক্ষ্ণ ছিলো আর সে এক জাপানি নারীর ঘ্রাণ শনাক্ত করতেও সক্ষম ছিলো। 
 
অতঃপর সেই নারীকে ভুট্টাক্ষেতে দেখা গেলো। ধূসর মুখ, বড় বড় একপত্র চোখ, মেঘলা। একটা পাতলা নাক, সাথে এক ছোট্ট কোমল মুখ। দাদামশাই তার প্রতি কোনোরকম আক্রোশ অনুভব করলোনা। চিরুনী না করা খয়েরি চুল উন্মুক্ত করে সে তার জীর্ণ স্কার্ফ খুলে ফেললো। তার শরীরে অপুষ্টির চিহ্ন স্পষ্ট ছিলো, একদম অনাহারী চীনা নারীদের মতই। দাদামশাইয়ের ভয় চুপিসারে সরে গিয়ে সেখানে জায়গা করে নিলো একগোছের সমবেদনা যা ছিলো অবস্থার সাথে বেমানান। এক ঝুড়ি ভুট্টা মাটিতে রেখে সে তার ঘামে ভেজা ভ্রু আর ধূসর মুখটা তড়িৎ গতিতে স্কার্ফ দিয়ে মুছে নিলো।
 
সে পরেছিলো একটা ঢিলেঢালা বস্তার মত, বাজেভাবে রঙ জ্বলে যাওয়া হলুদ জ্যাকেট যেটা দাদামশাইয়ের মাথায় শয়তানি চিন্তা জাগিয়ে তুললো। শরতের পলকা বাতাস বয়ে গেলো। বনের দিক থেকে ভেসে আসছিলো একটা কাঠঠোকরার একঘেয়ে ঠকঠকানি। তার পেছনে ফুঁসে উঠেছিলো সমুদ্র। দাদামশাই শুনলো সেই নারী নিচু কর্কশ গলায় কিছু একটা বিরবির করছে। বেশিরভাগ জাপানি নারীদের মতই তার ঘাড় আর বুক সাদা। নির্লজ্জভাবে, সে তার কাপড়ের বোতাম খুলে দিলো হাওয়া চলাচলের জন্য, যেটা স্থাণুর মত দাদামশাই দেখলো। তার ঝুলে পড়া স্তন দেখে সে বুঝলো যে ওই নারী এক স্তন্যদায়ী মা। যখন ডোউগুয়ান স্তন্যপানের সময় দাদীর স্তন মুচড়ে ধরতো, দাদী ওর নিতম্বে চাপড় মারতো। এখন সেই কৃশ বলিষ্ঠ ডোউগুয়ান বসে আছে তার উঁচু ঘোড়ার পিঠে, তিয়েনানমেনের ফটক দিয়ে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে হালকা করে লাগামটা ধরে রেখে। ঘোড়ার লোহার জুতো ঝনঝন শব্দ তুলছিলো পাথর ঢালাই রাজপথে, যখন সে আর তার সহচরেরা স্বর্গ মর্ত্য কাপিয়ে স্লোগান দিচ্ছিলো। দেয়ালের সবচেয়ে উঁচুতে দাঁড়ানো মানুষটিকে তার তাকিয়ে দেখতে ইচ্ছা করছিলো, কিন্তু কঠোর শৃঙ্খলা তাকে এ কাজ করতে বাঁধা দিলো। একমাত্র সে যা করতে পারলো চোখের কোণা দিয়ে একনজর দেখে নিলো লাল লন্ঠনগুলোর নিচে দাঁড়ানো সেই মহাপুরুষকে।
 
ওই জনশূন্য, মরু শৈল প্রান্তরে প্রসাব করার সময় সেই নারীর নিজেকে ঢাকার কোনো কারণই ছিলোনা। এই পুরো ব্যাপারটা দাদামশাইয়ের সামনেই ঘটছিলো আর সে তার রক্তের ফুঁসে ওঠা অনুভব করলো, তার ঘা যন্ত্রণায় দপদপ করে উঠলো। সে নত অবস্থা থেকে উঠে দাঁড়ালো, গাছের শাখার সাথে ধাক্কা খেয়ে তার হাতদুটো যে শব্দ করলো সে ব্যাপারে সে কিছু যেন খেয়ালই করলোনা।
 
সেই নারীর দ্যুতি বিহীন চোখ সহসা তীক্ষ্ণ হয়ে উঠলো আর দাদামশাই দেখলো তার মুখ খুলে যেতে। স্পষ্ট ভয়ের এক বিলাপ তার গলা চিড়ে বেরিয়ে এলো। হালকা টাল, তবুও বিদ্যুৎ গতিতে দাদামশাই তার দিকে এগিয়ে গেলো। নাজানি কতটা ভয়ংকর তাকে দেখাচ্ছিলো!
 
তার বেশিক্ষণ পরে নয়, স্রোতের স্বচ্ছ পানিতে সে তার অবয়ব দেখবে আর বুঝবে যে কেন ওই জাপানি নারী ভুট্টাক্ষেতে ন্যাকড়ার পুতুলের মত কুঁচকে গিয়েছিলো। 
 
দাদামশাই তাকে শুইয়ে ফেললো, তার শরীর যেন দাদামশাইয়ের দিকে সমর্পিত। ব্লাউজ ছিড়ে ফেলতেই সে দেখলো স্তনের নিচ থেকে তার হৃদয় জোরে জোরে কাঁপছে। নারীটির শরীর হাড়ে চামড়ায় লাগানো, তার শরীর ঘাম আর ময়লায় চটচটে। 
 
দাদামশাই তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লো, অশালীন প্রতিশোধের জঘন্য শব্দ ছুড়ে দিলো, একের পর এক, তার কানে প্রতিধ্বনি তুলেঃ জাপান! ইতর জাপানি! জাপানি কুত্তা! তোরা আমার নারীদের ধর্ষণ আর খুন করেছিস, আমার মেয়েকে বেয়নেটে তুলেছিস, আমার লোকেদের দাস বানিয়েছিস, আমার সৈন্যদের খুন করেছিস, আমার দেশের মানুষদের ওপর উৎপাত করেছিস আর আমাদের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছিস। আমাদের মধ্যে যে রক্তের ঋণ তা এই সমুদ্রের সমান। হাঃ হাঃ। আজকে তোদের মেয়ে আমার হাতে পড়েছে!
 
ঘৃণায় তার চক্ষু রক্তলাল হয়ে উঠলো। তার দাঁত জ্বালা করে উঠলো। এক শয়তানি শিখা তাকে ইস্পাতের মত শক্ত করে তুললো। সে নারীটিকে একটা থাপ্পড় কষিয়ে দিলো, তার চুল ছিড়ে নিলো আর স্তন খামচে ধরলো। মাংসের মধ্যে আঙুল ঢুকিয়ে দিলো৷ ওই নারী কাঁপছিলো আর গোঙাচ্ছিলো যেন ঘুমের মধ্যে কথা বলছে। 
 
দাদামশাইয়ের গলা তার কানের কাছে গর্জন চালিয়ে গেলো, নোংরা বাক্যেঃ যুদ্ধ করছোনা কেন? আমি তোমাকে ধর্ষণ করব, খুন করবো! আমি তোমায় অত্যাচার করে মৃত্যু অব্দি নিয়ে যাবো! চোখের বদলে চোখ! তুমি কি মরে গেছ? যদি মরেও গিয়ে থাক, তাহলেও আজ নিস্তার পাবেনা!
 
সে তার নিচের কাপড় ছিড়ে ফেললো, ত্যানাময়লা কাপড়গুলো সহজেই ছিড়ে যাচ্ছিলো, কাগজের মত। দাদামশাই আমাকে বলেছিলো যে, যখন ওই নারীর নিচের কাপড় খুলে গেলো, তার সারাগায়ে টগবগিয়ে দৌড়ে চলা গরম রক্ত আচমকা ঠান্ডা হয়ে গেলো আর তার শরীর, রাইফেলের ইস্পাতের মত শক্ত শরীর, নিস্তেজ হয়ে পড়লো, যেন কোনো মোরগের লড়াইয়ে হেরে যাওয়া মোরগ, পরাজিত মাথা নুইয়ে পড়েছে, আর পালক ছেড়া, ছিন্নভিন্ন। 
 
দাদামশাই বলেছিলো যে, সে দেখলো ওই নারীর লাল জাঙিয়ার ঊরুসন্ধিতে একটা কালো কাপড় তালি দিয়ে সেলাই করা, আর তার হৃদয় থমকে গেলো। 
 
দাদামশাই, তোমার মত চীনের এমন বীরপুরুষ কিভাবে এক টুকরো জোড়াতালি দেখে ভয় পেয়ে গেলো? ওটা কি তোমার লৌহ সমাজের নিয়মে কোনো অশনি সংকেত ছিলো?
 
নাতি আমার, এটা কোনো তালি ছিলোনা যাকে তোমার দাদামশাই ভয় পেয়েছে! 
 
দাদামশাই বললো যে ওই মহিলার লাল জাঙিয়ার ঊরুসন্ধিতে ওই কালো তালি দেখাটা ছিলো যেন লাঠির আঘাত খাবার মত। 
 
জাপানি নারীটি হয়ে উঠলো এক বরফের মত ঠান্ডা লাশ। পঁচিশ বছর আগের লাল যবের ক্ষেত এক দ্রুতগামী ঘোড়ার মত আরও একবার দাদামশাইয়ের চোখের সামনে ভেসে উঠলো। তার দৃষ্টি আবছা হয়ে এলো আর মন ভেসে গেলো। নিঃসঙ্গ সুর তার আত্মার গভীরে আবারও বেজে উঠলো, প্রতিটি লয়ে যেন তার বুকে হাতুড়ির আঘাত পড়ছিলো, আর সেই রক্তসমুদ্রে, সেই তপ্ত চুল্লিতে, সেই পবিত্র উৎসর্গ বেদিতে ছিলো ঠাকুমা, উপরের দিকে মুখ করে শুয়ে ছিলো যেন এক সুরম্য পান্না, এক মিষ্টি তরুণী মেয়ের শরীর। তার কাপড়ও একইভাবে ছিড়ে উন্মুক্ত করা হয়েছে ওই একইরকম লাল জাঙিয়া, ঊরুদেশে সেই একই কালো তালি। সেই সময়ে দাদামশাই তখনো এমন নিস্তেজ আর দুর্বল হয়ে পড়েনি, আর ওই কালো তালিটা এক চিহ্নে পরিণত হয়েছিলো যেটা যন্ত্রণাদায়কভাবে তার স্মৃতিতে গেঁথে গিয়েছিলো, কখনোই মুছে যায়নি। তার চোখের পানি ঠোঁটের কোণায় গড়িয়ে এলো যেখানে সে এক মিষ্টি আর কড়া স্বাদের মিশেল অনুভব করলো। 
 
দাদামশাই রুক্ষভাবে ক্লান্ত হাতে ওই নারীর কাপড় ঠিক করে দিলো। নারীর শরীরের ক্ষতদাগগুলো তাকে তীব্র অনুশোচনায় ঠেলে দিলো। টলটলে পায়ে সে হেঁটে চলে যেতে শুরু করলো। তার পা দুটো ছিলো অক্ষম আর নির্জীব। তার ঘাড়ের তপ্ত স্ফিত ক্ষত যেন পূঁজে ভরে স্পন্দিত হচ্ছিলো। তার সামনের গাছপালা আর পর্বতচূড়া রাঙা হয়ে উঠেছিলো ঝলমলে লালিমায়। তারও বহু উপরে, স্বর্গের উচ্চতায়, মেঘেদের কাছে, ঠাকুমা, তার বুক বুলেটে বিক্ষত, সে ধীরে ঢলে পড়লো দাদামশাইয়ের প্রসারিত বাহুতে। যখন তার শরীরের সমস্ত রক্ত প্রবাহিত হয়ে গেলো, তার শরীর হয়ে উঠলো এক সুন্দর লাল প্রজাপতির মত হালকা। বাহুতে তাকে নিয়ে, সে সামনের দিকে হেঁটে চললো, এক পথ ধরে যেটা চলে গেছে নমনীয় যবগাছের সারির মধ্য দিয়ে। আকাশের দিকে উঠে যাওয়া পথ ধরে আলো, স্বর্গের আলো, স্বর্গ মর্ত্য দ্রবীভূত করে নিচে নেমে এলো। সে দাঁড়িয়ে ছিলো ব্লাক ওয়াটার নদীর লম্বা বাঁধের ওপর, যেখানে হলুদ বুনোলতা জন্মায় আর সাদা ফুল ফোটে। উজ্জ্বল রক্তরঙা পানি তেলে জমাট বাঁধলো, এত উজ্জ্বল যে ওতে প্রতিফলিত হলো নীল আকাশ ও সাদা মেঘ, ঘুঘু আর বাজপাখি। দাদামশাই মাথায় ভর দিয়ে পড়ে গেলেন ওই গিরিপাতের ওপরের ভুট্টাক্ষেতের মধ্যে; ঠিক তার স্বদেশের যবক্ষেতের মত। 
 
দাদামশাই ওই নারীর সাথে কখনোই বলতে গেলে শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হয়নি, সুতরাং, জাপানি ইতিহাস উপাদানের ওই লোমশ বাচ্চা, যাকে পরে ওই নারী জন্ম দিয়েছিলেন, ওর সাথে তার কোনো সম্পর্ক নেই। কিন্তু তাও পুরো শরীর লোমে ভরা একজন তরুণ অর্ধজাপানি চাচা, আমাদের পরিবারের ক্ষেত্রে কলঙ্ক হয়ে উঠবেনা, বরং বলা যায়, গৌরব হয়ে উঠতে পারে। সত্যকে সম্মানের সাথে মান্যতা দেয়াই উচিত।
 
-----------------------
মূলগল্প: Man and Beast by Mo Yan, Translated by Howard Goldblatt


লেখক পরিচিতি: পিতৃদত্ত নাম গুয়ান মোয়ে হলেও পুরো বিশ্বজুড়ে মো ইয়ান পরিচিত তার লেখক নামেই৷ বিখ্যাত এই চীনা ঔপন্যাসিক এবং ছোটগল্পকারের জন্ম ১৯৫৫ সালে, চীনের শানডঙের গাওমি শহরতলিতে। রেড সোরগাম ক্লান, দ্যা রিপাবলিক অফ ওয়াইন, লাইফ এন্ড ডেথ আর ওয়ারিং মি আউট ইত্যাদি তার উল্লেখযোগ্য রচনা। ২০১২ সালে তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। সুইডিশ অ্যাকাডেমির মতে, লোককথা, ইতিহাস ও বর্তমান কালের মধ্যে মেলবন্ধন ঘটিয়ে এক ‘আবছায়ার বাস্তব জগত’ তৈরি করেছেন মো ইয়ান৷ খ্যাতনামা সাহিত্যিক গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের ‘ম্যাজিক রিয়ালিজম'-এর সঙ্গে মো ইয়ানের ‘হ্যালুসিনেটোরিক রিয়ালিজম'-এর তুলনা করা হয়৷



অনুবাদক পরিচিতি:
দিলশাদ চৌধুরী
কথাসাহিত্যিক। অনুবাদক
বর্তমানে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক সাহিত্য ও সংস্কৃতি নিয়ে পড়াশোনা করছেন।







কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন