মঙ্গলবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২১

আলেক্স লা গামা'এর গল্প : বিয়ের পোশাক





অনুবাদ: ড. এলহাম হোসেন

চার মাসে রাস্তাটির চেহারায় খুব একটা পরিবর্তন ঘটেনি। দুই পাশের সারি সারি বাড়িগুলো আগের মতোই আছে। বাড়িগুলোর সামনে বেড়ায় ঘেরা গ্যারেজ আর বারান্দা। ভারতীয়দের মুদি দোকানগুলোও ঠিক আগের মতো আছে। গুদামঘরের পেছনের বিশাল দেয়ালজুড়ে সাইনবোর্ড সাঁটানো। ধূসর ফুটপাতগুলো পড়ে আছে আগের চেহারাতেই। কিছু কিছু জায়গা ফেঁটে হা করে আছে। গত চারমাসে বাড়িগুলোর রং কিছুটা ফ্যাকাশে হয়ে গেছে, কিছু কিছু জায়গায় চটেও গেছে। বড় বড় ফাঁটল গুদামের দেয়ালজুড়ে কালো অক্ষরের লেখাগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
 
রাস্তায় লোকজনও আছে। কোনো কোনো বাড়ির দরজার সামনে আবার দু’জন, তিনজন করে জটলা পাকাচ্ছে। যারা অলস তারা সারি বেঁধে গুদামের দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আড্ডা দিচ্ছে। নর্দমার মধ্যে নেমে বাচ্চারা খেলছে। মোদ্দাকথা হলো, রাস্তার কোনকিছুই বদলায়নি।
 
সামনের দিকে তাকিয়ে ও পথ চলছিল। কিন্তু লোকজনের মধ্যে ওর ব্যাপারে কৌতূহলের যে ঢেউ বয়ে যাচ্ছিল তা ও নিজেই লক্ষ করলো। গায়ে পড়েই সবাই ওর ব্যাপারে আগ্রহ দেখালো। একটি দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আড্ডারত একটি দলের মধ্যে প্রথমে ফিসফাসের সূচনা হলো। তারপর সেখান থেকে এটি পরের দরজায়, এরপর তার পরের দরজায় সম্প্রসারিত হতে লাগলো। মহিলারা আড়চোখে ওর দিকে তাকাচ্ছিলো। নিজেদের মধ্যে ফিসফাস করছিল। প্রথমে ওকে এগিয়ে আসতে দেখলো। তারপর ও যেইমাত্র ওদের পাশ কাটিয়ে যাচ্ছিলো তখনই ওরা অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো।

“দেখ দেখ, ও যাচ্ছে, ও যাচ্ছে।”

“ছেনালি করে চারমাসের জেলখেটে এলো।”

“ওই, আবার বাড়ি ফিরে এলি? তোর মতো বেশ্যাকে আমরা আর এই রাস্তায় দেখতে চাই না।”

সবার সূচাগ্র তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ওর ওপর নিক্ষিপ্ত হলো।

সবার মধ্যে সন্দেহ আর রাগ। তবে, সবাই ভেতরে ভেতরে খুশি, কারণ নিজেদের মধ্যে গালগল্পের বিষয় তো একটা পাওয়া গেছে।

কিন্তু পুরুষ মানুষদের মধ্যে ব্যাপারটি আলাদা। কেউ ওর দিকে সরাসরি তাকিয়ে আছে; কেউ বা আঁড়চোখে। ওর বিজয়ে কেউ কেউ আবার মুচকি হাসছে। প্রেমিক সাদা হলেই বা কার কী আসে যায়? ওর তো কপাল ভালো, তাই না? এক ভিক্ষুক আরেক ভিক্ষুককে তো আর ঈর্ষা করে না, এমনকি তা সীমার বাইরে হলেও। ছেলে তো ছেলেই। আর মেয়ে তো মেয়েই।

ও তো এখনও ওদের আশেপাশেই আছে। কাজেই, ওদের কারো না কারো তো এখনও সুযোগ আছে।

নারী জাতির হিংসা-বিদ্বেষে ওরা মজা পায়। তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করতে করতে বলে, “এই যে, মায়রা কেমন আছো? তোমাকে আবার দেখে ভালো লাগলো। সবকিছু কেমন চলছে, মায়রা?

মহিলারা যে ওদের দিকে তাকিয়ে আছে, তাও ওরা লক্ষ করলো। তারপর দাঁত খিচিয়ে হাসি দিয়ে প্রমাণ করতে চাইলো যে, ওরা আসলে যা করছে তা ঠিকই আছে।

ও মুচকি হাসলো। কিন্তু মাথা উঁচু রেখে সামনের দিকে তাকিয়ে পথ চলতে লাগলো। তবে, ভেতরে ভেতরে এক ধরনের তিক্ততা বোধ করতে থাকলো। কাঁদতে লাগলো। কড়াইয়ে জলের সঙ্গে লবন মিশিয়ে জ্বাল দিলে যেমন সেটি উবে যায়, সেভাবে কান্নার ফলে ওর বেদনা উবে গেলেও তিক্ততা রয়ে গেল। মুচকি হাসলেও ওর মুখে অবজ্ঞার রেখা দৃশ্যমান।

ও লম্বা, শ্যামলা, সুন্দর। ঠোঁট দু’টো ভরাট। প্রশস্ত চোয়াল, টিকালো নাক, দৃঢ় চিবুক আর চোখ দু’টো নীল। এই বৈশিষ্ট্যগুলো ও বৈবাহিক সূত্রে আবদ্ধ সঙ্করায়িত পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে লাভ করেছে। ওর শরীরের গাঁথুনি মজবুত। চার মাসের কঠোর পরিশ্রমের কারণে শরীরটা শক্ত হয়ে গেছে। তবুও সুন্দর। স্তন দু’টো ভরাট, নিতম্ব প্রশস্ত। পেটটি বসানো। উরু আর পা দু’টো লম্বা ও সুপ্রতিসম।

অবশেষে ও বাড়ি পৌঁছলো। সিঁড়ি বেয়ে বারান্দায় উঠলো। সামনের দরজা খোলা মাত্রই করিডোরের শেষ প্রান্তে অবস্থিত রান্নাঘর থেকে খাবারের গন্ধ এসে ওর নাসিকা রন্ধ্রে প্রবেশ করলো। তেলে ভাজা পেঁয়াজের সেই পুরাতন গন্ধ।

বারান্দা ধরে হেটে গেল। ওর মা একজন বয়স্ক মহিলা। কালো স্টোভের ওপর বসানো পাতিলে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে রান্না করছেন। বেঁটে হলে কী হবে, তাঁর শরীরের গাঁথুনি মজবুত। হালকা চুল মাথার পেছনে খোঁপা করা।

রান্নাঘরের দরজার চৌকাঠে মায়রা হেলান দিয়ে দাঁড়ালো। হঠাৎ করে ওর বুকের ভেতরটা ভয়ে দুরুদুরু করতে লাগলো। নিজেকে সামলে নিয়ে খুব স্বাভাবিকভাবেই, ‘মা’ বলে ডাকলো।

থতমত খেয়ে ওর মা ঘুরে তাকালেন। নানান কিছুতে মাখা হাতে একটি চামুচ দিয়ে সাসপেনে তরকারী নাড়ছিলেন। মায়রা তার মধ্যবয়সী মায়ের ম্রিয়মান চোখে চোখ রাখলো। দেখলো, তাঁর বিস্ময় ধীরে ধীরে কঠোরতায় পরিণত হলো। ওর মা'র মুখমণ্ডলের চামড়ায় খাঁজ পড়েছে। গলার চামড়ায় অনেক ভাঁজের গভীর রেখা দৃশ্যমান।

“ওহ, তুই তাহলে ফিরে এলি। লজ্জা-শরমের মাথা খেয়ে, মান সম্মানের বারোটা বাজিয়ে ফিরে এলি, নাহ?”

“আমি ফিরে এলাম মা,” মায়রা বলল।

“তুই আমাদের মান সম্মান ধূলোয় মিশিয়ে দিয়েছিস,” ওর মা কঠোর গলায় বললেন।

চামুচটা এখনও তাঁর হাতে। কথা বলার সময় তাঁর মেয়ের মুখের সামনে সেটিকে এদিক-ওদিক নাড়াচ্ছিলেন। “আমরা সবাই ভদ্রলোক। কিন্তু তুই আমাদের সম্মান হানি করেছিস।” হঠাৎ তাঁর মুখটা কুঁচকে গেল। চোখ থেকে জলের ধারা বইতে লাগলো। “তুই আমাদের মান-সম্মান নষ্ট করলি। তুই তোর পছন্দের ছোকড়াটাকে বেছে না নিলেও পারতিস। অথচ তুই ওই শ্বেতাঙ্গ লম্পটটার সঙ্গে রাত কাটালি। তোকে কত কষ্ট করে মানুষ করলাম। আর তুই কি-না আমাদের মান-সম্মান ধূলোয় মিশিয়ে দিলি। আমাদের বংশের কেউ কখনো জেলে যায়নি। আর তুই কিনা...। 
একজন বৃদ্ধ মহিলাকে আঘাত করার জন্য এটিই যথেষ্ট।”

মায়রা ওর মায়ের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। কর্মক্লান্তি এবং কঠোর পরিশ্রমে বিধ্বস্ত ওর মায়ের শরীরের দিকে তাকিয়ে ওর মধ্যে করুণার উদ্রেক হলো। কিন্তু কিছু একটা করুণাকে পাশে হটিয়ে দিলো। এবার সে ধীরস্থিরভাবে বলল, “এতে কোনো অসম্মান হয়নি, মা। একজন লোকের গায়ের রং কী বা সে কোত্থেকে এসেছে, তা বিচার না করে তাকে ভালোবাসলে অসম্মান হয় না। ও ভালো মানুষ। তুমি ওকে যেমন লম্পট বলছো ও আসলে তেমন নয়। পারলে ও আমাকে ঠিকই বিয়ে করতো। ও সব সময় আমাকে এ কথাই বলতো।”

“তোর নিজের জাতের লোকজনের কথা একটুও ভাবলি না? নিজের জাতের কোন ছেলেকে পছন্দ করলে কী হতো?” ওর মা’র কাঁপা কাঁপা গলা হেঁচকি-তোলা কান্নায় গড়ালো। ভেতরে ভেতরে প্রচণ্ড যাতনা বোধ করলেন।

“কালো ছেলেকে ভালোবাসলে কোন দোষ নেই।” এবার তার মধ্যে যতটা না রাগ তার চাইতে বেশি বিরক্তি প্রকাশ পায়।

“কেউ তো বলছে না যে, কৃষ্ণাঙ্গ ছেলেকে ভালোবাসার মধ্যে দোষের কিছু আছে। আমি শুধু একটি শ্বেতাঙ্গ ছেলের প্রেমে পড়েছি। ব্যাস।”

“এটি বেশ্যাগিরির চাইতে ভালো কিছু নয়,” আয়রার মা কাঁদতে কাঁদতে বললেন। “এর চাইতে ভালো কিছু নয়।”

“ঠিক আছে,” মেয়েটি প্রচণ্ড তিক্ততায় বললো। “আমি তাহলে একজন বেশ্যার চাইতে ভালো নই। ঠিক আছে। তাহলে ব্যাপারটি তাই হোক। আমি বেশ্যা। আমি তোমাদের অসম্মান করেছি। এখন তাহলে।”

“তুই এভাবে তোর মায়ের সঙ্গে কথা বলতে পারিস না।” হাতের চামুচ নাড়াতে নাড়াতে বয়স্ক মহিলা রাগে চিৎকার করতে লাগলেন। “তোকে আমি মানুষ করলাম। আর তুই তোর মার সঙ্গে এভাবে কথা বলছিস। তোর মধ্যে আমার প্রতি কোনো সম্মান বোধ নেই। তোর মঙ্গলের প্রতি তোর কোনো তোয়াক্কা নেই। ঐ যে তোর বোন এ্যাডি। ওর শীঘ্রই বিয়ে হবে। এখানকারই একটি ভালো ছেলের সঙ্গে। ও তোর মতো না। তুই বিয়ে করে ওর কাছে দৃষ্টান্ত হতে পারতিস। তুই, হ্যা তুই।”

“শুনে খুব খুশি হলাম যে, এ্যাডির বিয়ে হচ্ছে”, মায়রা এক রকম জোর করেই শুষ্ক গলায় কথাটি বললো।

আমি আশা করি ও একজন ভালো স্বামী পাবে, যে ওকে এমন কোথাও নিয়ে যাবে যেখানে ওরা নিজেদের মতো করে চলতে পারবে।”

“তোর মায়ের প্রতি সম্মানবোধ থাকলে তুই এভাবে আমার সঙ্গে কথা বলতে পারতিস না। তোর আসল চেহারাটা তুই প্রকাশ করছিস। তুই যেখানে চারমাস জেলে কাটিয়ে আমাকে অসম্মান করেছিস সেখানে এ্যাডি আমাকে সাহায্য করেছে। এখন আবার তুই পরিবারের জন্য অকল্যাণ বয়ে নিয়ে এসেছিস। তুই একটা কুফা, তুই পাপী।”

মায়রা অবজ্ঞাভরে হাসলো। তারপর বললো, “ঠিক আছে, আমি বেশ্যা। আমি তোমাদের অসম্মান করেছি। আমি তোমাদের জন্য অমঙ্গল বয়ে নিয়ে এসেছি। ঠিক আছে মা। কিন্তু চিন্তা করো না। আমার সঙ্গে তোমাকে কোথাও না খেয়ে থাকতে হবে না।”

“তুই আবার চাকুরি করবি,” ওর মা চিৎকার করে বলেন। “আমি যদি মহাজন হতাম, তাহলে কোথাও তোকে চাকুরি দিতাম না।”

“তুমি থামো তো মা। এভাবে চিৎকার করলে তুমি তো অসুস্থ হয়ে পড়বে।”

“অসুস্থ হয়ে পড়লে সেটা কার দোষে, বল?”

মায়রা ক্রোধান্বিত বয়স্ক মহিলার দিকে আরেকবার তাকিয়ে এবার ঘুরে দাঁড়ালো। মনে হলো, ও কেঁদে ফেলবে। কিন্তু মনস্থির করলো যে, ও কাঁদবে না। ইতোমধ্যে ও কম কাঁদেনি।

এবার ওর মাকে রেখে বারান্দার একটি দরজা দিয়ে ঘরে ঢুকলো।

এটা সেই একই ঘর। একটি দেয়ালের সঙ্গে হেলান দেওয়া একটি ওয়ারড্রোব আর দু’টি সিঙ্গেল বেডের মাঝখানে একটি ড্রেসিং টেবিল। ঐ বিছানা দু’টোতে ও আর এ্যাডি ঘুমাতো। ও যে পোশাক পড়া ছিল, তা গায়ে রেখেই বিছানায় শুয়ে পড়লো। ছাদের দিকে তাকিয়ে রইলো।

এ্যডির বিয়ে হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে সে সত্যিই আনন্দিত। ও আর এ্যাডি খুবই ঘনিষ্ট। ভাবলো, “মিক্সড মেরেজ আইন এবং ইম্মোরালিটি আইন না থাকলে আমিও বিয়ে করতে পারতাম। অযথা বিয়ে না করে চারমাস জেল খাটলো বেচারা টমি।”

ভাবতে লাগলো টমি কী ওকে সত্যি সত্যিই ভালোবাসতো। অবশ্যই। সে ওকে ভালোবাসতো। তবে এর জন্য তাকে অনেক বেশি মূল্য দিতে হয়েছে। কিন্তু এতকিছু কিসের জন্য তাকে করতে হয়েছে? সে যদি ওকে ভালোই বাসতো তবে ওর জন্য যা যা দরকার তার সবই সে করতো। যাই হোক না কেন। সম্ভবত টমির কোন উপায় ছিল না। তাই, যে রাতে পুলিশ এসে হাজির হলো সে রাতে সে তার শোবার ঘর থেকে ড্রয়িং রুমে গেল। তারপর ড্রয়ার থেকে পিস্তল বের করে নিজের বুকেই গুলি চালালো।

এই হলো টমির ব্যাপার। সম্ভবত ব্যাপারটি তার জন্যও অসম্মানজনক। খুব সম্ভব তার মধ্যে প্রেমভাব থাকা সত্ত্বেও সে এমনটি ঘটিয়েছিল। কিন্তু মায়রা এর চাইতে বেশি কিছুর পরোয়া করে না।

বিছানায় শুয়ে শুয়ে এ ব্যাপারটা নিয়ে ও আর বেশি কিছু ভাবতে চাইলো না। তার পরিবর্তে বরং ও এ্যডিকে নিয়ে ভাবতে লাগলো। ও এ্যাডিকে সুন্দর একটি উপহার দিতে চায়। অবশ্যই ও বিয়ের অনুষ্ঠানে যাবে না। ওর প্রিয় পরিবারকে বিব্রতকর পরিস্থিতি থেকে ও রক্ষা করবে। কিন্তু এ্যডিকে ও একটি চমৎকার উপহার দেবে।

ওর ভাবনার মাঝখানেই সামনের দরজা শব্দ করে খুলে গেল। এগিয়ে আসা পায়ের শব্দ শোনা গেল করিডোরে। দরজা খুলে গেল। এ্যাডি এসে পড়েছে।

“মায়রা, মায়রা। প্রিয় বোন আমার। তুই ফিরে এসেছিস।”

ওর ছোটবোন এসে পড়েছে। ব্যাগ আর জ্যাকেট এক ঝটকায় পাশে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে এ্যাডি মায়রাকে বুকে জড়িয়ে ধরলো। "আমি রাস্তায় বুড়ি মুরগীদের আমার বোনের ব্যাপারে ক্যাক ক্যাক করতে শুনে ছুটে এলাম।”

“হ্যালো এ্যাডি। তোকে দেখে খুব ভালো লাগছে। একটু চুমু দেনা আমায়। হ্যাঁ, আমি জানি, ওরা অনেকদিন ক্যাক ক্যাক করবে,” তিক্ততা প্রকাশ করে ও বলল। “বয়স্ক মহিলার অনুভূতিও একই রকম।”

“তুই কিছু মনে করিস না। বাদ দে ওসব। আমি খুশি হয়েছি যে, তোকে আমার বিয়েতে পাব।”

“তোর ছেলেবন্ধুটি কেমন?”

“ঠিক আছে,” এ্যাডি দাঁত বের করে হাসে। “তেমন পাত্তা দেয় না। ওর পরিবারের অবশ্য কিছু বলার আছে। কিন্তু আমার ওকে এমনই মনে হয়।” ঘুসি দেখিয়ে হাসতে হাসতে বলে,

“তাকে এ্যাডির কথা শুনতে হবে। নইলে কোন পরিবার নয়।”

“তোর কি সবকিছু রেডি?”

হ্যাঁ। বিয়ের ড্রেসটা এই সপ্তাহান্তে, অর্থাৎ শনিবারের আগেই সময়মতো পেয়ে যাব। কিছু টাকা বাঁচিয়ে বাড়ির জন্য কিছু জিনিস কিনেছি। জো একটি কাউন্সিল কটেজের ব্যাপার দেখছে। ওরা বলেছে, আমরা উঠতে পারব।”

“আমি তোকে মিস করবো।”

“আরে ধুর। তুই যেকোনো সময় আমাদের দেখতে আসবি। শোন, তুই চাইলে আমি জো কে বলব, আমাদের সঙ্গে থাকবি। কী বলিস?”

“নাহ। তুই তোর মতো থাকবি। সুখি হবি। আমি এখানে থাকবো। আমি আর মা সম্ভবত সবসময় যুদ্ধ করে যাবো। তবে আমি সবকিছু ঠিক করে নেবো।”

“মায়রা, তুই তাহলে কী করতে যাচ্ছিস?”

“জানি না,” মায়রা বলল। “মায়ের বয়স হয়েছে তার তো দেখাশুনার জন্য একজন লোকের দরকার হবে। এবার বল, তোর সব তৈরি আছে তো?”

হ্যাঁ আছে। শুধু সম্ভবত পরের শনিবার রাতে ফ্রকটা বদলাতে হতে পারে। অনুষ্ঠানের পুরোটা সময় তো আমি বিয়ের পোশাকই পরে থাকবো। প্যারিস ফ্যাশনে আমি খুব সুন্দর একটি ফ্রক দেখেছিলাম। কিন্তু আমার মনে হয় শনিবার রাতে আমি সেটি পরতে পারবো না। পার্টিতেও বিয়ের পোশাক পরে থাকতে খুব বাজে লাগবে। সেটি এই পোশাকের উপর ঢেলে পড়তে পারে। সান্ধ্য অনুষ্ঠানের জন্য কনেকে তাই পোশাক বদলাতে হয়। জো’র বাড়িতেই পার্টির আয়োজন করা হবে। আমার মনে হয়, পার্টিতে আলাদা পোশাক পরলে খুব ভালো হবে। কিন্তু সব পয়সা ইতোমধ্যে শেষ করে ফেলেছি। এখন আরও আট গিনি যোগার করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। খু-উ-ব চমৎকার রেশমি স্লিপার। সত্যিই স্মার্ট।”

বিছানার পাশ থেকে উঠে দাঁড়িয়ে এ্যাডি তার কর্মস্থলের পোশাক খুলে ফেলতে লাগলো।

“মায়রা বল, কোনো কিছু কি খারাপ হয়েছে?”

“নাহ, একদম না। আমি সবসময় ধোয়া-মোছার কাজ করতাম। কিন্তু আমি এ ব্যাপারে কিছু বলতে চাই না রে।”

“আমরা বলব না,” কালো সরু জিন্স পড়তে পড়তে এ্যাডি হাসতে হাসতে বললে। “এই তো শেষ হয়ে গেল। এখন শান্ত হয়ে বিশ্রাম নে। খাবার তৈরি হলে তোকে ডাকবো। চা খাবি?”

“ঠিক আছে।”

এ্যাডি দাঁত বের করে হাসতে হাসতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। মায়রা একা বিছানায় শুয়ে রইলো। প্রিয় বোন এ্যাডি। একজন বেশ্যার বোন। মা হয়ত বলবে, আমি ফিরে এসে এদের জন্য অকল্যাণ বয়ে নিয়ে এসেছি।” সবার জন্য ওর খারাপ লাগলো। ওর মার জন্য এ্যাডির জন্য, রাস্তার সব মহিলার জন্য আর বেচারা টমের জন্য। টম এটি সহ্য করতে পারতো না। তার প্রতি আর তার প্রেমের প্রতি। নিজের প্রতি আর তার “আমি তোমাকে ভালোবাসি” কথাটির প্রতি। সে-ও মরে গেছে সেই মুহূর্তেই যখন টম পিস্তলের ট্রিগারে চাপ দিয়েছিল। বেচারা টম। ওর সবার জন্য দুঃখ হলো।

ও ভাবলো, এ্যাডি সুখের সংসার গড়তে চলেছে। ও চায় এ্যাডি সুখি হোক। নিজে নিজেই বলল, এ্যাডি যে রেশমি স্লিপারটি চেয়েছে সেটিই সে ওকে বিয়ের উপহার হিসেবে দেবে। আট গিনি উপার্জন করা ওর জন্য কঠিন কোনো ব্যাপার নয়।



লেখক পরিচিতি: আলেক্স লা গামা দক্ষিণ আফ্রিকার ঔপন্যাসিক ও বর্ণবাদ-বিরোধী রাজনীতিবিদ। তাঁর জন্ম-সাল ১৯২৪। আফ্রিকার রাজনৈতিক ও সামাজিক টানাপোড়েন, বর্ণবাদ ও মনস্তাত্ত্বিক সংকট তাঁর উপন্যাস ও ছোটগল্পের ভাঁজে ভাঁজে গেঁথে আছে। সাহিত্যে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৬৯ সালে তিনি লোটাস প্রাইজ ফর লিটেরেচার লাভ করেন। ১৯৮৫ সালে তিনি কিউবার হাভানায় মারা যান। অনুদিত গল্পটি তাঁর ‘স্লিপার সাটিন’ ছোটগল্পের বাংলা ভাষান্তর।



অনুবাদক পরিচিতি:
এলহাম হোসেন
ইংরেজি সাহিত্যের শিক্ষক।
আফ্রিকান সাহিত্যে পিএইচডি
প্রাবন্ধিক।অনুবাদক।
ঢাকায় থাকেন।




কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন