মঙ্গলবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২১

মো ইয়ানের গল্প : ভালোবাসাবাসির গল্প



ইংরেজি অনুবাদ : হাওয়ার্ড গোল্ডব্লাটঃ
বাঙলা অনুবাদ : বেগম জাহান আরা

সেই শরতে টিম লিডার পনরো বছরের জুনিয়র এবং পঁয়ষট্টি বছরের বুড়ো কুও তিনকে মাঠের বাইরে পাঠিয়েছিলেন ওয়াটার-হুইলের কাছে। কেনো? পানিতে হুইল চালানোর জন্য। কিসের জন্য? বাঁধাকপির ক্ষেতে পানিসেচের জন্য। মধ্যবিশ বয়সের এক শহুরে মহিলা, হো লি ফিং-কে বিশ্ববিদ্যালয়ের লেখাপড়া ছাড়িয়ে পানিসেচের কাজে গ্রামে পাঠানো হয়েছিল। পানিসেচের খাদগুলোর দায়িত্বে ছিল সে।

একবার তেরতমো সৌরকালের কথা--, শরতের শুরুতে, বাঁধাকপির ক্ষেতে প্রতিদিন অবশ্যই পানিসেচের প্রয়োজন হতো, নইলে গাছের শেকড় পচে যাবে। টিম লিডার তিন জন কর্মিকে প্রতিদিন সকালে নাশতার পর ক্ষেতে পাঠাতেন বাঁধা কপির গাছে পানি দিতে। এই কাজটা তারা করত শরতের শুরু থেকে ঠাণ্ডা পড়া পর্যন্ত, মানে আঠারোতম সৌরকাল পর্যন্ত। শুধু সেচের কাজ করলেই হতো না, পাশাপাশি সার ছড়ানো, পোকামাকড় দমনের কাজ, ঝরে পড়া বাঁধাকপির পাতা মিষ্টি আলুর শেকড় দিয়ে বাঁধা, ইত্যাদি কাজও করতে হতো। প্রতিদিন তারা চারবার আধঘন্টা করে বিশ্রাম নিতো। শহুরে মেয়ে হো লি ফিং-এর নিজের একটা ঘড়ি ছিল। ঠাণ্ডা পড়তে শুরু করলে বাঁধাকপির পাতাগুলো কুঁচকে বলের মতো গোল হতে শুরু করে। তখন কর্মিদলের পানিসেচের কাজ শেষ হয়।

তখন ওয়াটার-হুইলটাকে খুলে গুটিয়ে, একটা হাতে ঠেলা গাড়িতে করে উৎপাদন টিমের এলাকায় নিয়ে গিয়ে স্টোরকিপারের কাছে জমা দেয়া হয়। সে সামান্য দেখে টেখে আবার সেটা দিয়ে দিত তাদের সাথে।

পরদিন সকালের নাশতার পর, তারা লোহার ঘন্টার নিচে দাঁড়িয়েছিল টিম লিডারের পরবর্তি আদেশের জন্য। লিডারের হাতে পুরনো একটা ঘড়ি ছিল। কুও তিন একজনকে ধরে বিন চাষের মাঠে পাঠালো। জুনিয়রকে পাঠালো উৎপাদন টিমের জমির দুরতম প্রান্তে জোয়ার বোনার জন্য। হো লি ফিং প্রশ্ন করল, "আর আমি? আমার কি কাজ লিডার?”

- “ জুনিয়রের সাথে যাও। যখন সে বীজ বুনবে, তখন তুমি পানিসেচের লাইন করে দিতে পারো।"

দলের একজন লিডারের আদেশকে অনুকরণ করে উত্তক্ত করার জন্য বলল,

“জুনিয়র, হো লি ফিং-এর লাইনটা ভালো ভাবে মনোযোগ দিয়ে দেখে কাজ করো। আর তোমার বীজগুলো যেন ঠিক জায়গা মতো পড়ে সেটার দিকেও লক্ষ রেখো।"

সকলে খুব শব্দ করে বিরক্তিকর ভাবে হেসে উঠল। জুনিয়রের মনে হলো, বুকের দেয়ালে হৃদয়টা গিয়ে ধাক্কা দিচ্ছে। সে হো লি ফিং-এর দিকে এক পলক তাকালো। পাথরের মতো শক্ত মুখে সে দাঁড়িয়েছিল। স্বাভাবিক ভাবেই খুব অখুশি দেখাচ্ছিল তাকে। আসলেই সে খুব মর্মাহত হয়েছিল। বলল, "গুল্লি মারি বুড়ো ছি-এর কথায়।" যন্ত্রণাদায়ক ফাজিলগুলোকে সে অভিশাপ দিল।

বাঁধা কপির এলাকাটা গ্রামের পুবদিকে পুকুরের পাশেই। বৃষ্টির পানিতে পুকুর টই টম্বুর। শৈবাল শ্যাওলাতে ভর্তি পুকুরটা। তাতে পানিকে দেখায় ঘন সবুজ এবং যতোটা না গভীর, তার চেয়ে অনেক বেশি গভীর। এই জায়গাটা বাঁধাকপির চাষ করার জন্য উৎপাদন টিম যে পছন্দ করেছে, তার প্রধান কারণ পর্যাপ্ত পানি পাওয়া যাবে এখানে। কুপের পানিতেও সেচ করা যায়, কিন্তু সে পানি পুকুরের মতো এত কাছে নয়। পুকুরের ধারের উঁচু জায়গায় রাখা ওয়াটার-হুইল দেখে মনে হয়, ওটা পুকুর ধারের উপকূল। জুনিয়র এবং বুড়ো কুও তিন নড়বড়ে কাঠের গোড়ায় বসে লোহার টানা হাতল ঘোরালো । ফলে চাকার একটা ধাপ ওপরে ওঠে, আর একটা ধাপ নামতে শুরু করে। এই প্যাঁচের জন্য কেমন কিচকিচ শব্দ হয়, কিন্তু অনবরত পানির ধারা প্রবাহিত থাকে। শরতের শুরু থেকে ঠাণ্ডা না পড়া পর্যন্ত, এই সময়টায় বৃষ্টি হয় না। এক দিনের জন্যও না। দিনের পর দিন তীব্র সূর্যের আলোতে আকাশ একেবারে ধোয়া ঝকঝকে দেখায়। পুকুরের উপরিভাগ থাকে একেবারে শান্ত। বাতাস বয়ে যাক বা না যাক, পানি নড়ে না। আকাশে মেঘের সাথে পুকুরের মিতালি দেখা যায়। কখনও জুনিয়র আনমনে মেঘের দিকে তাকিয়ে থাকে অনেকক্ষণ ধরে। তখন সে লোহার হাতল টানতে ভুলে যায়। কুওতিন বিরক্ত হয়ে বলে, "স্বপ্ন দেখা ছাড়ো জুনিয়র।"

পুকুরের উত্তর দিকে নলখাগড়ায় ভরা একটা জলাভুমি। দেখে মনে হয়, ঘুমানোর মাদুরের সমান কিছু একটা। জায়গাটা প্রতিদিন একটু একটু করে হলুদ হয়। সূর্য ওঠার সময় এবং অস্ত যাওয়ার সময় বাঁকা রোদ যখন জলাভুমির ওপর পড়ে, তখন মনে হয় যেন সোনা দিয়ে কেউ জায়গাটাকে ব্রাশ করছে।

সেই সোনালি জায়গাটায় বেশ বড়ো, উজ্জ্বল লাল গঙ্গা ফড়িং একটা সোনালি পাতায় যখন বসে, মনে হয় পুকুর আর নলখাগড়ার পাতা মিলে একটা স্বপ্নালু সমভুমির সৃষ্টি করেছে। সেখানে ধপধপে সাদা এক ডজনের মতো হাঁস এবং সাত আটটা মাদিহাঁস সাঁতার কাটছিল। মাঝে মাঝে লম্বা গলার পুরুষ হাঁস মাদি হাঁসগুলোর ওপর উঠছিল। হাঁসগুলোর এই খেলার সময় জুনিয়র যেন মাটিতে গেঁথে যাচ্ছিল মূর্তির মতো এবং ভুলে যাচ্ছিল পানির চাকা ঘুরানোর কথা। ফলে কুওতিন তাকে কটু ভাষায় বকা দিয়ে বলেছিল, “এই সবই শুধু ভাবছ, তাই না?”

দুষ্টু হাঁসগুলোর দিক থেকে দ্রুত দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে খুব জোরে লোহার হাতল টেনে দেয় জুনিয়র। জলের ফোয়ারা উঠেই পুরনো ওয়াটার হুইল আর্তনাদ করে উঠল। ঝন ঝন করে উঠল শেকল। জুনিয়র শুনতে পেলো, কুওতিন বলছে, "পিচ্চি অপগন্ডটা এখনও মানুষ হয়ে ওঠেনি, এবং ঐ সব কথাও ভালো করে বোঝেনি।"

জুনিয়র খুবই লজ্জা পেলো। চমৎকার উজ্জ্বল লাল ফড়িংগুলো পুকুরের ওপর উড়ে বেড়াতে লাগল। ঘটনাটার একটা নাম হলো, সময় রক্ষক বুড়ো কুও তিনকে ধন্যবাদঃ ছোটো কনে। / /

হো লিফিং বেশ লম্বা মেয়ে। কুও তিন-এর চেয়ে লম্বা। সে মার্শাল আর্ট জানতো। তারা শিখেছিল। মার্শাল আর্ট-এর বিশেষজ্ঞদের সাথে ইউরোপে সে খেলা দেখিয়েছে। বহু লোকে বলত, মার্শাল আর্টে সে যথেষ্ট নাম করতে পারত, যদি সামাজিক বিপ্লব না হতো। খুবই খারাপ হয়েছে তার জন্য। ধ্বংস হয়ে গেছে তার পারিবারিক সব কিছু। দুই রকম কথা শোনা যায়-- এক, তার বাবা পুঁজিবাদী ছিল এনং দুই ,পুঁজিবাদের পথ প্রদর্শক ছিল। এটা এখন বেশি গণ্য করা হচ্ছে না। পুঁজিবাদ এবং পুঁজিবাদের পথ প্রদর্শকের মধ্যে খুব একটা পার্থক্য নেই। এটা জানাই যথেষ্ট যে, তার পারিবারিক পটভুমি ভালো নয়।

হো লি ফিং-কে তার এলাকার সবাই খুব শান্ত মেয়ে বলেই জানতো। তাকে আরও অনেক শিক্ষিত শহুরে মেয়ের সাথে গ্রামে পাঠানো হয়েছিল। ছেলেমেয়েরা কেউ স্কুল শেষ করেছে, কেউ চাকরি নিয়েছে, বাকিরা নিজেদের শহরে ফিরে গেছে। শুধু সেই পড়ে আছে পেছনে। কারণটাও সবাই জানে। তার পারিবারিক পটভুমিই সে জন্য দায়ী।

গ্রামে আসার পর হো লি ফিং শুধু একবার তার মার্শাল আর্টের খেলা দেখিয়েছিল। জুনিয়রের বয়স তখন আট কি নয়ের বেশি হবে না। মাও শে তুং ভেবেছিলেন, প্রচার সভা খুব সাধারণ ঘটনা। শহুরে ছেলেমেয়েরা চমৎকার করে কথা বলত, কেউ গান করত, কেউ হারমোনিয়ম বাজাতো, কেউ বাঁশি অথবা দুই তারের 'হুছিন' বাজাতো। দলে দলে ছেলেমেয়েরা গ্রামে যেতো। কমিউনের সদস্যরা সারাদিন মাঠে কাজ করত, আর রাতে বিপ্লব করত। জুনিয়রের কাছে মাঠের কাজ খুব ভাল লাগতো। সন্ধেটা মনে হতো প্রতিদিনই নববর্ষের সন্ধে।

একদিন, অন্য রাতের মতোই, রাতের খাবার শেষে ঘর থেকে সকলে বেরিয়ে এসেছিল বিপ্লব করতে। একটা নোংরা পাটাতনের ওপর তারা নিজেদের গান এবং গানের যন্ত্রপাতি নিয়ে এসে দাঁড়াল। গ্যাস ল্যাম্পের ব্যাপারে সতর্ক থাকার পাটাতনের দুপাশে স্টিকার লাগানো। জুনিয়রের মনে পড়ল, একজন তরুণ হঠাৎ উচ্চকণ্ঠে চেঁচিয়ে বলেছিল, “দরিদ্র এবং নিম্নমধ্য শ্রেণীর কৃষক কমরেডগণ, আমাদের মহান নেতা মাও শে তুং নির্দেশ দিয়েছেনঃ বন্দুকের আগা থেকে শক্তি আসে। সুতরাং দয়া করে এখন হোলি ফিং-এর প্রতি মনোযোগ দাও, সে দেখাবে তার "নাইন-স্টেজ প্লাম-ব্লসম" বর্শা-খেলা।"

জুনিয়রের মনে আছে, এই কথায় সবাই পাগলের মতো হাত তালি দিয়েছিল। আশা করেছিল হো লি ফিং এসে পড়বে। বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হলোনা তাদের। খুব টাইট লাল পোশাকের সাথে পায়ে সাদা প্লাস্টিকের স্যাণ্ডাল পরে, মাথার ওপর চুলের বিঁড়া বেঁধে বেরিয়ে এলো সে। তার পোশাক দেখে, পোশাকের ভেতর থেকে উঁকি মারা বুকের অংশ এবং সুচ্যগ্র স্তনবৃন্ত দেখে টগবগে তরুণদের মধ্যে শুরু হয়ে গেল কানাঘুঁষা। কেউ কেউ বললও হো-এর সৌন্দর্য আসল। কেউ কেউ বলল, মনে হয়, না। দ্বিতীয় দলের কেউ কেউ জোর দিয়ে বলল, পোশাকের নিচে সে প্লাস্টিকের কাপ পরেছে। সে স্টেজে এসে লাল ট্যাসল দেয়া বর্শা হাতে নিয়ে আকর্ষণীয় মার্শাল পোজে দাঁড়িয়েছিল। ধনুকের মতো পিঠ বাঁকা করে চিবুক উঁচুতে তুলে কালো ঝলমলে চোখে দাঁড়ানোর সেই মনোহর ভঙ্গি অতুলনীয়। তারপর বর্শা ঘোরাতে আরম্ভ করল এমন ভাবে যে, এক সময় মনে হলো,স্টেজের ওপর শুধু লাল অস্পষ্ট একটা কিছু ঘুরছে। কখন সে শরীর ঘোরাচ্ছে, কখন পেঁচিয়ে উঠছে কিছুই বোঝা যাচ্ছিল না। অবশেষে ঘোরা থামিয়ে বর্শা নিয়ে সে লোহার ডাণ্ডার মতো সোজা হয়ে দাঁড়াল ,ঠিক যেন একটা লাল ধোঁয়াময় থাম্বা।

দর্শকেরা জমে গিয়েছিল তার খেলা দেখে। কারো মুখ থেকে একটু শব্দও বের হচ্ছিল না। তারপর হঠাৎ নম্র তালি বেজে উঠল, ভাবখানা এই যে, তালি দেয়ার শক্তিও নিঃশেষ হয়ে গেছে। সেটা ছিল গ্রামের তরুণদের জন্য নির্ঘুম একটা রাত।

পরদিন কমিউনের সদস্যরা মাটিতে হাতপা ছড়িয়ে বসে বিশ্রাম নিচ্ছিল। হো লি ফিং-এর "নাইন-স্টেজ প্লাম-ব্লসম" খেলাটা নিয়েই কথা বলছিল সবাই। কেউ কেউ বলল, মেয়েটার খেলা ঠিক ফুলের ডাঁটার মতোঃ আকর্ষণীয়, কিন্তু বাস্তব মনে হয় না। কেউ কেউ বলল, তার খেলাটা বাতাসের মতো, এত দ্রুত সে ঘুরছিল যেন একসাথে চার পাঁচ জনকে উড়িয়ে দেবে। এর চেয়ে বাস্তব আর কি চাই? কেউ কেউ বলল, এমন মেয়েকে কেউ যদি বউ হিসেবে পেতে চায়, তাহলে সত্যিকার সমস্যায় পড়বে। ভাগ্য ভালো হলে মেয়েটি তাকে পেটাবে না। এমন মেয়ে বিছানায় স্বামীর ওপর উঠে থাকবে। স্বামী যদি ষাঁড়ের মতো বলশালীও হয় তাও তার সাথে পারবে না। "নাইন-স্টেজ প্লাম-ব্লসম" খেলোয়াড় মেয়ের সাথে পারা সম্ভব নয়। এই সময় আলোচনাটা একটু ঘুরে গেল। জুনিয়র তখন বড়োদের সাথে কাজ করছিল। এমন সব কথাবার্তা শুনে সে একটু বিব্রত এবং মনঃক্ষুন্ন হলো।

হো লি ফিং ঐ একবারই "নাইন-স্টেজ প্লাম-ব্লসম" খেলাটা দেখিয়েছিল। এই ঘটনার রিপোর্ট চলে যায় 'কমিউন বিপ্লব কমিটির' কাছে। সেখান থেকে একটা ঘোষণা আসে, বর্শা সব সময় লালের মধ্যে লাল ফোজের হাতে থাকবে। এতে তাদের একচ্ছত্র অধিকার। অন্যদের হাতে কি করে বর্শা যায়, বিশেষ করে যারা পাঁচ রকম কালো তালিকার কোনোটার মধ্য থেকে এসেছে?

মাথা নিচু করে চরম নিরুৎসাহের সাথে কমিউন সদস্যদের পাশাপাশি কাজ করে যেতো হো লি ফিং। যখন অন্য শহুরে ছেলেমেয়েরা আনন্দ উল্লাস করে বাড়ি যেতো, তখন সে একেবারেই একা হয়ে পড়ত। এমন অবস্থায় তাকে অনেকেই সহানুভুতির দৃষ্টিতে দেখত। টিম লিডার তাকে হালকা কাজ দিত। তার বিয়ে নিয়ে কেউ ভাবত না। তরুণ গ্রামীণ যুবকেরা বর্শা নিয়ে তার খেলার অসাধারণ দক্ষতার কথা ভোলেনি। সুতরাং তার সম্পর্কে সবাই সাবধান থাকত।

একদিন হো ওয়াটার হুইলের গোড়ায় পা ঝুলিয়ে বসেছিল। একমনে দেখছিল পুকুরের সবুজ শান্ত পানি। পুকুরের অন্য কোনায় বসে বিশ্রাম নিচ্ছিল জুনিয়র। হো-এর দিক থেকে সে চোখ ফেরাতে পারছিল না। তার রোদপোড়া কালচে মুখ, উঁচু খাড়া নাক, ঘন কালো বড়ো বড়ো চোখের কোথাও সাদার ছোঁয়া নেই। তার ভ্রুদুটো চুলের দিকে তাকিয়ে দ্রুত নড়াচড়া করছিল। বাম চোখের ভ্রুর মধ্যখানে বড়ো ঘন লাল রঙের চৌকোনা একটা আঁচিল। তার দাঁতগুলো সাদা, মুখটা বেশ বড়ো সড়ো, এবং তার চুল এত ঘন যে মাথার হাড়ের কোনও অংশ দেখা যাচ্ছিল না। সেদিন তার পরনে ছিল নীল গ্যাবার্ডিনের আর্মি স্টাইলের টিউনিক। ধুতে ধুতে পোশাকের রঙ প্রায় সাদা হয়ে গেছে। বরফের মতো সাদা চামড়ার ওপর লেসের কুঁচি দেয়া সার্টের পকেট, বোতাম খোলা কলারের টিউনিক। জুনিয়র নিচের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে একটু বেসামাল হয়ে পড়ে এবং মুখ ঘুরিয়ে বাঁধা কপির এলাকায় তাকায়। সেখানে দুটো প্রজাপতি উড়ে উড়ে খেলছিল। কিন্তু সে প্রজাপতি দেখছিল না। তার মনে শুধুই হো লিফিং-এর টিউনিকের পকেটের ছবি ভাসছিল। পকেটের পেছনে তার ঢেউ খেলানো বুকের কথা ভাবছিল সে।

বুড়ো কুও তিন আসলে সত্যিকার কৃষক নয়। লোকের কাছ থেকে জুনিয়র শুনেছে, একদা যুবক কুও ছিল, ছিন তাওয়ের পতিতালয়ের "বিগ টিপট"। শব্দটার মানে জানে না জুনিয়র। জিজ্ঞাসা করতে তার লজ্জা লাগে।

কুও তিন এখন বিপত্নিক। কুমার জীবন কাটাচ্ছে। তবে কথিত আছে, লি কাওফা-র বউয়ের সাথে কিছু লটর পটর আছে তার। মহিলা তার চকচকে চুলগুলো টেনে পেছনে বাঁধে। ফরসা সুন্দর বড়ো মুখ। আলোর মধ্যে ছোটো ছোটো ধাপ ফেলে সে যখন হাঁটে, তখন মনে হয়, হাঁস হেঁটে যাচ্ছে। পুকুরের খুব কাছেই সে থাকে। ওয়াটার হুইলে পানি সেচের সময় জুনিয়র এবং কুও তিন তার বাড়ির অঙ্গন দেখতে পায়। একটা বড়ো কালো কুকুর চারপাশে শিকার খুঁজে বেড়ায়।

চারদিন যাবত তারা বাঁধাকপির এলাকায় পানি সেচ করছিল, তখন লি-র বউ খড়ের বাস্কেট নিয়ে পুকুরে এসেছিল। সে পুকুরের ধার দিয়ে আল্লাদিপনা করতে করতে অল্প সময়ের মধ্যে ওয়াটার হুইলের পাশে এসে " গে-গে-গে-গে" করে হাসতে লাগল।

কুও তিনকে উদ্দেশ্য করে সে বলল, "এই যে তিন চাচা, টিম লিডার তোমাকে সবচেয়ে ভালো কাজ দিয়েছে।"

কুওতিন হেসে হেসে বলল, “ দেখে মনে হচ্ছে কাজটা সহজ, কিন্তু আসলে তা নয়। জুনিয়রকে জিজ্ঞাসা করেই দেখো না।"

বেশ কয়েকদিন বাঁধা কপির এক সারিতে হুইল টেনে পানিসেচের পর জুনিয়র লক্ষ করল তার হাত দুটো ব্যথা করছে। সে দেঁতো হাসি দিয়ে লি-এর কালো চকচকে চুলের দিকে তাকালো। বেশ কৌতুক বোধ করল দেখে লি। জুনিয়র কিন্তু তাকে পছন্দ করেনি। একবারেই না।

লি বলল, "যে ন্যাঙড়া শয়তানটার সাথে আমার বিয়ে হয়েছে, তাকে পাঠানো হয়েছে দক্ষিণ পর্বতে পাথর সংগ্রহের অভিযানে। একমাস সে আসবে না, তাই তার বিছানা বালিশ সাথে নিয়ে গেছে। আমি মনে করি, আমাকে পাওয়ার জন্যই টিম লিডার কাজটা করেছে। নাহলে এতগুলো জোয়ান অবিবাহিত তরুণ এখানে থাকতে ন্যাঙড়া শয়তানটাকে পাঠালো কেনো সে?

জুনিয়র লক্ষ করল, চোখ পিটপিট করল কুও তিন। একটু নার্ভাস মনে হলো তাকে। তার গলার মধ্যে একটা শব্দ হলো। সে বলল, "সে দেখাচ্ছে, কতোটা মূল্য দেয় তোমাকে।"

লি ফুঁসে উঠে বলল, “ ফুঃ! বুড়ো শেয়ালটাকে বাইরে পাঠিয়েছেই আমাকে পাওয়ার জন্য।"

এইবার বুড়ো কুও তিন কথা বন্ধ করে দিলো। লি আলস্যভরে চোখ তেড়া করে বলল, চাচা এখন প্রায় দুপুর হয়ে এসেছে, তোমাদের বিশ্রাম নেয়ার সময় হলো।

কুও তিন হাত দিয়ে চোখ ঢেকে সূর্যের অবস্থান দেখতে চেষ্টা করে বলল, “ মনে হয় ঠিকই বলছো।" তারপর সে পানিসেচের হ্যান্ডেলের কাছে গেল এবং চিৎকার করে বলল, “হো লি সোনা, এখন বিশ্রামের সময় হয়েছে।"

লি বলল, " তিন চাচা, আমাদের কুকুরটা গতো কয়েকদিন যাবত খাবার খাচ্ছে না, আমার পক্ষ থেকে তাকে একনজর দেখবে কি?”

কুও তিন জুনিয়রের দিকে তাকালো। বলল, "পাইপটা খেয়ে তারপর।"

চলে যেতে যেতে লি বলল, “ বেশি দেরি করো না।"

টোবাকো এবং পাইপ বের করতে করতে কুও তিন বলল, “ঠিক আছে, ঠিক আছে, আমি জানি।"

জুনিয়রের দিকে তাকিয়ে কুও বলল, “কি খবর বালক? ধুম পান চলবে?” কথাটার উত্তরের জন্য অপেক্ষা না করেই কুও পাইপ মুখে দিয়ে টান দিলো। জুনিয়র দেখল কুও আগুন দিলো পাইপে। কুও বলল, "আমি বুড়ো হয়ে যাচ্ছি। বুড়ো হাড়ে আর বেশি সহ্য হয়না, তাই ব্যথা করছে।" কোমরে হাত দিয়ে কথাটা বলল সে।

কুও তিন হেঁটে লি-এর কাছে গেল। ওদের দুজনের দিকে না তাকিয়ে জুনিয়র বাঁধাকপির বাগানের দিকে তাকালো। সেখানে হো লি ফিং হাতে একটা চাষের যন্ত্র নিয়ে মাঠের প্রান্তে দাঁড়িয়েছিল। দৃশ্যটা দেখে জুনিয়র দুঃখ পেলো। ওয়াটার হুইলের চামড়ার জিনিস পত্র ধোয়ার জন্য পুকুরের পানি দূষিত হয়ে কাদা কাদা হয়ে গেছে এবং খারাপ গন্ধ উঠেছে। সে চেষ্টা করল পানি তুলতে। ধাতুর পাইপ ফাঁপা ঘর ঘর আওয়াজ করল। চেইন শব্দ করল এক কি দুইবার। হান্ডেল পেছন দিকে এলো একবার কি দুইবার, পানি সেচের খাদে না গিয়ে উলটো দিকে পুকুরে পড়ে গেল। নীরব হয়ে গেল ওয়াটার হুইল।

কাঠের গুঁড়ির ওপর পা ঝুলিয়ে বসে জুনিয়র লক্ষ করল যে, তার হাতে ঘঁষা খেয়ে খেয়ে হাতল বারের মরিচা উঠে গেছে। সেই রৌদ্র তপ্ত দিনে বাঁধা কপির বাগানের লাইনে পানি মন্থর গতিতে প্রবাহিত হচ্ছিল। সূর্যের আলো পড়ে মনে হচ্ছিল রুপোর টুকরো ছড়িয়ে আছে। কোথাও মনে হচ্ছে গাছগুলো জমে গেছে। দূরে উঁচু নদীর ধারের বাগানেও একই অবস্থা। তাদের ওপর পারসিমন গাছের সারি, যাদের পাতা ইতিমধ্যেই আগুন লাল হয়ে উঠেছে। জুনিয়র পশ্চিমদিকে তাকিয়ে দেখল কুওতিন লি-এর বাড়ির অঙ্গনে যাচ্ছে। বড়ো কুকুরটা একবার ঘেউ করে উঠে তাকে লেজ নাড়িয়ে স্বাগত জানালো। কুও তিন এবং কুকুরটা একসাথে ভেতরে গেল। ডালের গাছে বেগুনি ফুল ফুটেছে। অঙ্গনে একটা মই রাখা আছে। পুকুরের সামনে লতানো গোলাপের গাছ, সেখানে একটা হাঁস প্যাঁকপ্যাঁক করছে, আরেকটা হাঁস তার ডাকের প্রতিধ্বনি তুলছে। হাঁসদের দুইজোড়া পাখা ঝাঁপাঝাঁপি করছে পানির ওপর। লম্বা গলার সাদা হাঁসটা অন্য হাঁসকে পানির ভেতর ডুবিয়ে দিচ্ছে। যখন তারা ওপরে আসছে তখন লম্বা গলার হাঁসটা অন্য মাদি হাঁসটার ওপরে উঠছে। জুনিয়র লাফ দিয়ে মাটিতে নেমে হাত ভরে কাদা তুলে ছূঁড়ে মারলো বড়ো হাঁসটাকে। কিন্তু কাদা অতো দুরে গেল না। তাদের গায়ে তো লাগলই না, পানিতে পড়ল। কিছু পানি ছলকে উঠল মাত্র। মাদি হাঁসটার ওপর লম্বা-গলার হাঁসটা উঠেই পুকুরময় দাপিয়ে ঘুরে বেড়াতে থাকলো।

জুনিয়র আবেগের সাথে দেখছিল ঘটনাটা, যা সে আগে কখনও জানেনি। সে শিহরিত হলো। পুকুরের ওপর কুয়াশার মধ্যে হাঁসেরা লাফালাফি করছিল। সোজা হয়ে দাঁড়ানোর সাহস পাচ্ছিল না সে। হঠাৎ অনুভব করল, প্যান্টের ভেতর কিছু ফুলে উঠেছে। সেই সময় হো লি ফিং পুকুরের ধারদিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ওয়াটার হুইলের কাছে যাচ্ছিল।

আস্তে আস্তে একপা দুপা করে হো লি ফিং জুনিয়রের কাছে এলো। সে তখন মাটিতে বসে পড়েছে। তার মনে হলো, হঠাৎ সে অনেক বড়ো হয়ে গেছে। সূর্যের সোনালি আলো পড়ে ঝিলমিল করছিল চুল। জুনিয়রের বুক পাগলের মতো ধড় ফড় করছিল। দাঁতে দাঁতে লেগে মৃদু শব্দ হচ্ছিল। সে হাঁটুর ওপর হাত দুটো রাখলো, তারপর সেখান থেকে নামিয়ে পায়ের পাতার ওপর রাখলো হাত দুটো। অবশেষে পুকুরের কাদা তুলে ছোটো ছোটো বল বানাতে লাগল।

হো লি ফিং জিজ্ঞাসা করল। “ কুও তিন কোথায়, দেখেছো?”

- “সে লি কাওফা-র ঘরে গেছে ।" নিজের কাছেই তার গলার স্বর কেমন কাঁপা কাঁপা লাগল।

সে শুনতে পেলো হো লি ফিং কাঠের গুঁড়ির দিকে গেল এবং পুকুরে থুতু ফেললো। যখন হো-কে দেখার জন্য সে ফিরে তাকালো, দেখল হো লি ওয়াটার হুইলের ওপর হেলান দিয়ে পুকুর ময় কেলিরত রাজহাঁস এবং মাদি হাঁসটার দিকে চেয়ে আছে। দৃশ্যটা জুনিয়রকে খুব পুলকিত করল।

কিছুক্ষণ পর হো তাকে জিজ্ঞেস করল, “ তোমার বয়স কতো?”

- “ পনরো বছর ।"

- “ তুমি স্কুলে যাওনি কেনো?”

- “ আমি যেতে চাইনি।"

হো লি ফিং-এর সামনে দাঁড়িয়ে জুনিয়রের মুখ ঘামে ভিজে গেল। খিল খিল করে হাসছিল হো। জুনিয়র মাথা তোলার সাহস করতে পারলো না।

এরপর থেকে বুড়ো কুও তিন প্রতিদিন লি কাওফা-র বাড়ি যেতো বড়ো কালো কুকুরটার সাথে খেলা করার জন্য। ঐ সময় হো এবং জুনিয়র ওখান দিয়ে যেতো। জুনিয়র তক্ষণ নার্ভাস হয়ে যেতো এবং ঘামতো। এক এক সময় মনে হতো উঁকি দিয়ে দেখার কথা, কিন্তু সাহস হতো না। তবে সে কিছু অনুমান করতে পারত।

একদিন খুব গরম পড়েছিল। হো তার ফ্যাকাশে টিউনিক দিয়ে মুখ ঢেকেছিল। তখন তার পরনে ছিল গোলাপি অন্তর্বাস। জুনিয়র যখন তার ব্রায়ের ফিতে এবং স্ন্যাপগুলো দেখতে পেয়েছিল, আনন্দে তার তখন কাঁদতে ইচ্ছে হয়েছিল।

মৃদু বকুনি দিয়ে হো বলল, "এই পিচ্চি, কি দেখছো আমার দিকে চেয়ে?”

জুনিয়র লজ্জায় লাল হয়ে গেলেও সাহসের সাথে বলল, “ তোমার পোশাক দেখছি।"

ভ্রু কুঁচকে হো বলল, “নাম জানো পোশাকের? অপেক্ষা করো আমার সুন্দর পোশাক দেখার জন্য।"

লাজুক ভাবে জুনিয়র বলল, “যে কোনো পোশাকেই তোমাকে মানায় সুন্দর।"

- "ঠিক বলেছো ক্ষুদে বন্ধু, আমরা সুন্দর, তাই না?” হো উত্তর দেয়। তারপর বলে, “আমার একটা স্কার্ট আছে, পারসিমন গাছের পাতার মতো লাল।"

তারা দুজনেই নদীর ধারের পারজিমন গাছের দিকে ঘুরে তাকালো। কয়েকটা শীতের ঠাণ্ডা সহ্য করার পর এখন সূর্যের আলোতে গাছের পাতাকে মনে হচ্ছে লাল অগ্নি শিখার মতো।

জুনিয়র দৌড়ে গাছের দিকে গেল। নদীর ধারে যেতে যেতে সে গাছের ওপর উঠে নিচু একটা ডাল ভেঙে নিলো। ডালটা গুচ্ছ গুচ্ছ চকচকে লাল পাতায় ভর্তি।

যে কেউ পোকার ভয়ে কুঁচকে যেতো। ডালটা ভেঙে সে ছুঁড়ে ফেলে দিলো।

লাল পাতা সম্বৃদ্ধ ডালটা হো-র জন্য উপহার ছিল। হো ডালটার গন্ধ নিয়েছিল। লাল হয়ে গিয়েছিল তার মুখ। হয়তো পাতার রঙের প্রতিফলনেই।

কুও তিন দেখেছিল, জুনিয়র লাল পাতা সম্বৃদ্ধ ডালটা হো-কে দিয়েছে। তারা যখন ওয়াটার হুইলের কাছে ফিরে এলো, তখন কুও তিন গুগ গুগ করে হেসে বলেছিল, "আমাকে তোমাদের ঘটক হিসেবে চাও কি?”

জুনিয়রের কানের গোড়া পর্যন্ত লাল হয়ে গিয়েছিল। সে বলল, “ দূর ছাই, কি যে বলো!”

- "হো তো মন্দ নয়, কেমন উঁচু বুক আর প্রশস্ত নিতম্ব ," কুও তিন বলে।

- “ এমন ভাষায় কথা বলো না মাস্টার, সে শিক্ষিত শহুরে মেয়ে। আমার চেয়ে দশ বছরের বড়ো, কতো লম্বা ---”

- “ তাতে কি? “ কুও তিন বলে, “ শিক্ষিত মেয়ে হলে কি হবে, অন্য সবার মতো সে এখানেই কাজ করে। তাছাড়া মেয়েরা দশ বছরের বড়ো হলে কিছু আসে যায় না। লম্বা মেয়ে, খাটো ছেলে, এ সব কিছু নয়। বুকের মধ্যে মুখ ঘঁষতে কি আনন্দ! এখন এ রকমই হয়।

কুও তিনের লম্বা বক্তব্য শুনে জুনিয়রের সারা শরীরে ঝাঁকুনি লাগল এবং তার দেহের তাপ বাড়তে থাকলো।

- “এই যে ছোট্ট চড়ুই উঠে দাঁড়াও,” কুও তিন বলল, "দেখতে তেমন ছোটো লাগছে না কিন্তু।"

সেই দিনের পর থেকে কুও তিন নাছোড়বান্দা হয়ে জুনিয়রকে বিশেষ বিষয়ে জ্ঞান দিতে লাগল তার কৌতুহল না মেটা পর্যন্ত। জুনিয়র তাকে "বিগ টিপট" বলে খোঁচাও দিলো। কুও তিন খুশিমনে পতিতা পল্লীর অতীত কথাগুলো হজম করল।

জুনিয়র ওয়াটার হুইল ঘুরালো। কিন্তু তার মন তখন বহুদুরে। হো লি ফিং-এর ছায়া তার চোখের ওপর ঘুরতে থাকে। কুও তিন এই সুযোগ নেয়। ঘটনা বুঝেই সে বেশি করে তাকে কামপ্রবৃত্তিমূলক কথা বলে।

ফাটা ফাটা গলায় জুনিয়র বলে, "মাস্টার তিন, দয়া করে এই ধরনের কথা আর বলো না।"

- "আরে বোকা গাধা, কি করছো মিন মিন করে? তার কাছে যাও। সেও তোমার জন্য পাগল হয়ে আছে।"

একদিন জুনিয়র উৎপাদন টিমের ব্যঞ্জনবাগানে গিয়ে একটা গাজর চুরি করল। তারপর সেটা ধুয়ে ঘাসের মধ্যে লুকিয়ে রাখলো যতোক্ষণ না হো লি ফিং আসে।
হো যখন এলো, বুড়ো কুও তিন তখনও আসেনি। সেই ফাঁকে জুনিয়র হো-এর হাতে গাজরটা দিলো।
গাজরটা নেয়ার সময় হো লি জুনিয়রের মুখের ভাষা পড়তে চেষ্টা করল।

জুনিয়র শুধু মনে করছিল, ঐ সময় তাকে কেমন লাগছিল দেখতে? তার রুক্ষ এলোমেলো চুল এবং ছেঁড়া খোঁড়া কাপড়ে?

হো লি ফিং জিজ্ঞাসা করল, “ আমাকে গাজর দিলে কেনো?”

- “কারণ, আমি তোমাকে পছন্দ করি,” জুনিয়র বলে।

ঘঁষে ঘঁষে গাজরের ছাল ছিলে ফেলতে ফেলতে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে হো বলে, "কিন্তু তুমি তো বাচ্চা ছেলে---।” হাতে গাজর নিয়ে হো মাথা নাড়তে নাড়তে চলে গেল।

জুনিয়র এবং হো লি ফিং দুরের মাঠে এবার জোয়ার বুনতে চলে গেল। ছোটো ছোটো প্রাণীর কারণে কিছু জায়গা খালি থেকে গেছে। তারা যে মাঠে গেল সেখানে কেবল সরগুম তোলা হয়েছে। নতুন জোয়ার গাছে কলি আসতে শুরু করেছে। সরগুম গাছের শুকনো খড়্গুলো মাঠের এককোনে জমা করে রাখা হয়েছে। শরত কাল এসে গেছে, ঠাণ্ডাও পড়তে শুরু করেছে। জোয়ারের বীজ বুনে সরগুমের শুকনো খড়ের সামনে তারা একটু ওম পাওয়ার আশায় বিশ্রামের জন্য বসলো। তখনও সূর্যের আলো ছিল। তাদের সামনে অবারিত মাঠ। সেখানে নতুন চারাগাছ এবং শস্য কাটা ফাঁকা মাঠ। ওপরে পাখিরা কিচির মিচির করে ঘুরে ঘুরে উড়ছে।

হো এক গোছা সরগুমের গাছ মাটিতে রেখে পাতা ছিঁড়ছে। জুনিয়র দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তার দিকে তাকিয়ে তার কাজ দেখছে। সূর্যের আলো পড়ে তার চোখ ছোটো হয়েছে, ঘামের মধ্যে থেকে তার সাদা দাঁত দেখা যাচ্ছে। মুখটা একটু হা হয়ে আছে।

জুনিয়রের মধ্যে শিহরণ জাগলো। তার ঠোঁট শুকিয়ে গেল। গলার কাছে কি যেন দলা পাকালো। কোনো মতে বলল সে, “কুও তিন আর লি কাওফা-র কথা কিছু জানো? কুও প্রতিদিন সেখানে যায়---"

চোখ পিট পিট করে খুব হাসলো হো।

“- --কুও তিন বাজে কথা বলে--- বলে তুমি নাকি---”

তখনও চোখ পিটপিট করছিল হো। সে তার হাত বাড়িয়ে দিলো এবং পা প্রসারিত করে বসলো।
এক পা এগিয়ে গেল জুনিয়র। " কুও তিন বলে, তুমি নাকি সব সময় ঐ সব কথা ভাবো, বুঝতে পারছো কি সব কথা----”
ওপরের দিকে তাকিয়ে হো হাসলো।

জুনিয়র হাঁটু গেঁড়ে বসলো তার কাছে। " বুড়ো কুও বলে, তোমাকে স্পর্শ করার সাহস থাকা উচিত আমার---”

হো হাসতেই থাকে।

জুনিয়র কাঁদতে শুরু করে। বলে, "বড়ো বোন, আমি তোমাকে স্পর্শ করতে চাই--- একবার ছুঁতে চাই ---শুধু একবার ---”

একটু পরেই জুনিয়র হো লি ফিং-এর নরম বুকের ওপর হাত রাখলো। হো তাকে দু হাত এবং পা দিয়ে পেঁচিয়ে ধরলো শক্ত করে ---

পরের বছর হো-এর জমজ বাচ্চা হলো। কথাটা অতঃপর কাওমি শহরের লোকের মুখে মুখে আনাচে কানাচে আকাশে বাতাসে সর্বত্র উড়ে বেড়াতে লাগল।


লেখক পরিচিতি
মো ইয়ানঃ
চীনা সাহিত্যের উপন্যাস এবং ছোটো গল্প লেখক।
জন্ম, ফেব্রুয়ারি ১৭, ১৯৫৫, কাওমি ওয়াইফাং, চীন।
মো ইয়ান-ই প্রথম চীনা লেখক, যিনি চীনা সাহিত্যে সর্ব প্রথম নোবেল প্রাইজ পেয়েছেন ২০১২ সালে। 'রেড সরগুম' তাঁর অন্যতমো বিখ্যাত উপন্যাস।

 ইংরেজি অন্যবাদক:
 ওয়ার্ড গোল্ডব্লাট
লন্ডনের সোয়াস বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর। সেখানে তিনি প্রায় ২৫ বছর যাবত চীনা সাহিত্য এবং সংস্কৃতি বিষয়ে শিক্ষাদান করছেন।

চীনা সাহিত্যের অনুবাদে তিনি দক্ষ। আধুনিক এবং সমসাময়িক চীনা সাহিত্যের অনুবাদক হিসেবে খ্যাত।



বাংলা অনুবাদক
বেগম জাহান আরা।
অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
গল্পকার। অনুবাদক। প্রবন্ধকার। 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন