মঙ্গলবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২১

মো ইয়ান'এর গল্প : উপশম


অনুবাদ- ফারহানা আনন্দময়ী 


সেই বিকেলে, মা কুইজান’স হোমের সাদা চুনকাম করা দেয়ালটায় একটা পোস্টার সেঁটে দিলো আর্মড ওয়ার্ক ডিটাচমেন্টের কর্মচারীরা। জিয়াও নদীর ওপরে সেতুর দক্ষিণমুখে পরদিন সকালে মৃত্যদণ্ড সেরে ফেলার কাজটা সম্পন্ন হবে, এরকমই লেখা ছিল রাস্তার দিকে মুখ-করা পোস্টারটায়। এ বছর এতবেশি মানুষকে এখানে গুলি করে মেরে ফেলা হয়েছে যে, এ গ্রামের বেশিরভাগ মানুষেরই আর এটা নিয়ে তেমন আগ্রহ কাজ করে না। কিন্তু এরকম একটা কাজ দেখবার জন্য লোক তো চাই! তাই এভাবে ওদের দৃষ্টি আকর্ষণ করাটা খুব জরুরি ছিল।  
বাবা ঘুমভেঙে যখন আমাকে ডাকতে শুরু করলো তখনও ঘরের মধ্যে ঘুটঘুটে কালো অন্ধকার, ভোর ফোটেনি ঠিকমতো। গায়ে জ্যাকেট চাপিয়ে, তেলে সলতে পাকিয়ে আলোটা জ্বালবার চেষ্টা করলো বাবা। আমাকে ডাকছে, কিন্তু এত শীতে, গরম কম্বলটা সরিয়ে বিছানা থেকে উঠতে একটুও ইচ্ছে করছিল না আমার। শেষে বাবা আমাকে টেনে তুলে বললো, “আর্মড ওয়ার্ক ডিটাচমেন্টের লোকেরা ভোর-ভোর ওদের কাজটা সেরে ফেলতে চায়। এখুনি যদি আমরা গিয়ে না পৌঁছাই, তাহলে আমাদের কাজটা করার সুযোগ হারাবো।” 
 
বাবার পেছন পেছন রাস্তায় বেরিয়ে এলাম আমি। পুব আকাশে তখনো সূর্য পরিষ্কার ওঠেনি। রাতেজমা বরফে সারাপথ ভীষণ ঠাণ্ডা। উত্তুরে হাওয়ায় রাস্তায় পড়েথাকা জঞ্জালও উড়ে গিয়ে পথটা যেন পরিস্কার করে রেখেছে। কিন্তু কনকনে ঠাণ্ডা হাওয়ায় যেন জমে যাচ্ছিলাম আমি- আঙুল, পায়ের গোড়ালি এমন কুঁকড়ে আসছিল, মনে হচ্ছে যেন বিড়ালে চিবিয়ে ধরেছে। আমরা যখন মা এলাকাটা পার হচ্ছিলাম আর্মড ওয়ার্ক ডিটাচমেন্টের অফিসারদের কোয়ার্টারটা চোখে পড়লো। জানালা দিয়ে একটা আলো আসছে আর কিছু একটা ধ্বনির আওয়াজ কানে এলো, মনে হলো। বাবা বললো, “পা চালিয়ে এসো। ওরা নাস্তা খাচ্ছে, বেশি সময় নেই হাতে।” 
 
নদীর কিনারে এসে আমার হাতটা ধরে উপরে টেনে তুললো বাবা। ওখান থেকে আমরা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম লোহার সেতুটা আর নদীর উপরে জমে থাকা বরফের আস্তরগুলো।

“এখানে আমরা কোথায় লুকোবো, বাবা?”

“সেতুর নিচে কোনো একখানে।”

জায়গাটা কেমন পরিত্যাক্ত আর পিচকালো অন্ধকারে ঢাকা। ঠাণ্ডার কথা আর নাই বা বললাম। এদিকে আমার মাথার তালুতে কেমন সুড়সুড়ি লাগতে শুরু করলো।

“বাবা, মাথায় কে যেন সুড়সুড়ি দিচ্ছে মনে হচ্ছে।”

“আমারও এরকমটা হচ্ছে। আসলে এখানে অনেক মানুষকে মেরেছে তো ওরা। সেইসব মৃতদের আত্মা এখানে সারাক্ষণ ঘোরাফেরা করে। ওরাই হয়তো এমন করছে!”

ঠিক তখুনি সেতুর নিচে ওই অন্ধকারের মধ্যে গায়ে লোমওয়ালা কিসের যেন স্পর্শ পেলাম আমি। বাবাকে বললাম, “হ্যাঁ, এই তো ওরা!”

“আরে, ধুর না। এগুলো ওদের ভূত না। এরা তো কুকুর, ওই মৃতদেহগুলো খেতে আসে এখানে।” 
 
এই হাড়কাঁপানো শীতে জমে এইটুকু হয়ে যাচ্ছিলাম আমি । কিছু ভাববার শক্তি পাচ্ছিলাম না। সব বাদ দিয়ে দাদুর মুখটা কেবল মনে পড়ছিল- ছানিতে ঘোলা হয়ে যাওয়া দুটো চোখ! প্রায় অন্ধ! এদিকে ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে, বরফগুলো গলছে একটু একটু করে। বাবা একটা পাইপ ধরিয়ে আয়েশে টান দিলো, তামাকের গন্ধটা নাকে এসে লাগলো আমার। ঠাণ্ডায় আমার নাক, ঠোঁট যেন অসাড় হয়ে আসছিল। বাবাকে বললাম, “আমি তো জমে যাচ্ছি। একটু দৌড়ে আসি আশপাশ থেকে?”

“না। এখন কোথাও যেয়ো না। দাঁতে দাঁত কামড়ে একটু সহ্য করে নাও। সূর্যের রঙ লাল থাকতে ওরা বন্দিদেরকে মারার কাজটি শেষ করবে।”

“আজ ওরা কাকে গুলি করে মারবে, বাবা?”

“জানি না। একটু পরেই বুঝতে পারবো। তবে মনে হচ্ছে, কম বয়সী কেউ হলে ভালো।”

“কেন?”

“কমবয়সীদের শরীরটা তাজা, শক্ত থাকে। ভালো ফল পাওয়া যায় তাতে।”

আরো কিছু জানবার ইচ্ছে হচ্ছিলো আমার, কিন্তু বাবাকে দেখে মনে হলো সে খুব অধৈর্য। আর কোনো কথার জবাব দেবার আগ্রহ নেই। বললো, “আর কোনো কথা বোলো না। ওখানে ওরা যা কিছু করবে সবই আমরা এখান থেকে দেখতে পাবো, শুনতে পাবো।”
 
ধীরে ধীরে বেলা বাড়তে লাগলো, সূর্যটা লালচে থেকে মাছের পেটের মতো ফিকে রঙ নিচ্ছে। এরই মধ্যে কুকুরগুলো এত জোরে ডাকতে শুরু করলো যে গ্রামের নারীদের হইচই, চিৎকার সব ওই ডাকের মধ্যে ডুবে যেতে থাকলো। আমরা একটু সরে এসে দাঁড়ালাম নদীর তীরটা ঘেঁষে, গ্রামের দিকে মুখ করে। খুব ভয়ভয় করতে লাগলো এবার আমার। ওই কুকুরগুলো এত ভয়ঙ্করভাবে ডাকছে আর কী রকম হিংস্র চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে; আমাকে পেলে যেন হাড্ডিমাংস সব একসাথে খেয়ে ফেলবে! কিছুতেই বুঝতে পারছিলাম না, কত তাড়াতাড়ি, কীভাবে এখান থেকে যাবো আমি! এরইমধ্যে বাবাকে দেখলাম একটু নিচু হয়ে কাছে চলে এলো, ঠাণ্ডায় ওর ঠোঁট কাঁপছে। বেশি ঠাণ্ডা লাগছে কিনা জানতে চাওয়াটাই বাহুল্য, আমি জানি।

শুধু বললাম, “কিছু কি শুনতে পেয়েছো তুমি?”

“চুপ। এখুনি এসে পড়বে ওরা এখানে। শুনতে পেলাম, বন্দিদেরকে বাঁধছে ওরা।”
 
এবার আমি সরে এলাম বাবার কাছে, কাঁপতে কাঁপতে বসে পড়লাম একটা আগাছার ওপরে। কান পেতে খুব মন লাগিয়ে শুনতে চাইছিলাম, গ্রামের দিক থেকে কিসের কথাবার্তা আসছে। একটা পুরুষকণ্ঠ আদেশের সুরে বলছে, “গ্রামবাসীরা, তোমরা সেতুর ওই দক্ষিণ দিকটায় চলে যাও। মৃত্যুদণ্ড দেবার কাজটি ওদিকেই করবো আমরা। আজ মেরে ফেলা হবে অত্যাচারী জমিদার মা কুইজান, ওর স্ত্রীকে আর বেকুব গ্রাম্যনেতা লুয়ান ফেংশানকে। আর্মড ওয়ার্ক ডিটাচমেন্ট প্রধান ঝাং এর নির্দেশ এটা। এদেরকে শাস্তি পেতেই হবে, এরা দালাল হয়ে কাজ করেছে।”
 
দেখলাম বাবা নিজমনে গজরাচ্ছে। “কেন ওরা মা কুইজানের সাথে এটা করছে? কেন ওরা ওকে গুলি করে মেরে ফেলবে? মা কুইজান হলো গ্রামের শেষ মানুষটা, যার সাথে এটা করা যায়!”

মাত্রই আমি জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছিলাম বাবাকে, কেন মা কুইজানকে মেরে ফেলাটা ঠিক হচ্ছে না! কিন্তু মুখটা হা করার আগেই কানে এসে লাগলো রাইফেলের ট্রিগার টেনে ধরার আওয়াজ, আর তার সঙ্গেসঙ্গেই আকাশে ছড়িয়ে গেল একটা গুলির আওয়াজ। তখুনি শুনতে পেলাম কোনো ঘোড়া যেন এদিকে ছুটে আসছে, ঠকঠক, ঠকঠক ঘোড়ার খুড়ের আওয়াজ তীব্রভাবে কাছে আসতে লাগলো। ভয় পেয়ে গেলাম বাবা আর আমি! নিজেদেরকে আরেকটু আড়ালে সরিয়ে ঘটনাটা বুঝতে চাইলাম। ততক্ষণে সূর্যরস্মি রূপালি হয়ে নদীর ধারের পাথরের ওপর ঠিকরে পড়তে শুরু করেছে। হঠাতই শুনলাম একদল মানুষের হট্টগোল। আমাদের খুব কাছেই একজন লোক বলছে, হাঁসের মতো ফ্যাসফ্যাসে গলায়, “যেতে দাও ওকে। আমরা কখনোই ওর পিছু নেবো না।”
 
কে যে গুলিটা ছুঁড়েছিল, তা আমরা জানি না। কিন্তু গগনবিদারি গুলির আওয়াজটা এক্কেবারে আশেপাশে প্রতিধ্বনিত হতে লাগলো। এমন কি আমাদের নাকে গানপাউডারের গন্ধটাও লাগলো এসে।
 
সেই হাঁসের মতো ফ্যাসফ্যাসে গলার লোকটা আবার বলে উঠলো, “এত নির্বোধের মতো গুলিটা কে করলো? ও তো বোধহয় এতক্ষণে পাশের গ্রামে পৌঁছে গেছে!”

“কিছুতেই আমি বুঝিনি, এরকম একটা কাজ সে করতে পারবে। ঝ্যাং, ও বোধহর ওর চাষাদের কেউ হবে।”

“আমার তো মনে হচ্ছে, ও হলো এই জমিদারের পা-চাটা কুত্তা।“ ঝ্যাং বললো।

এসব বলতে বলতেই কেউ একজন সেতুর রেলিং টার ধারে গিয়ে পেশাব করলো! ইশ! কী বাজে ঝাঁঝাঁলো গন্ধ!

“ছাড়ো এখন এসব। আরো কাজ বাকি আছে আমাদের। চলো বাকিটা করতে হবে।” ঝ্যাং তাড়া দিলো।

আমার কানের কাছে বাবা ফিসফিসিয়ে বললো, “এ হলো আর্মড ওয়ার্ক ডিটাচমেন্টের প্রধান অফিসার ঝ্যাং। সরকার ওকেই দায়িত্ব দিয়েছে, দলের প্রতি যারা বিশ্বাসঘাতকতা করবে ওদের এভাবে নির্মূল করে দেবার জন্য।”
 
পুবের আকাশে এখন স্পষ্টতই গোলাপি আভা গাঢ় হয়েছে। মেঘের কারুকাজ এখন আকাশটাতে ছড়িয়ে পড়েছে। দিনের আলো এখন প্রায় স্পষ্ট। ওই কুকুরগুলোকে দেখতে পাচ্ছি ছেঁড়াছুটা কাপড়, মানুষের খুলি, হাড্ডি এগুলো নিয়ে নাড়াচাড়া করছে। এদিক ওদিক দৌড়াদৌড়ি করছে। একটু পরপর মৃতখুলিগুলো মুখে নিয়ে চিবোচ্ছে। এসব দেখতে কেমন গা ঘিনঘিন করে উঠলো আমার। নদীর ধারটাও শুকনো মরামরা লাগছে, হিমশীতল হাওয়ায় আগাছাগুলো বিবর্ণ। আমি বাবার দিকে ফিরলাম। আমি তার শ্বাস-প্রশ্বাসের তাল অনুভব করতে পারছিলাম, কিন্তু সময়টা থমকে আছে। স্থবির। তখুনি বাবা বলে উঠলো, “ওরা আসছে আবার।”
 
সকলের হট্টগোল আর পদধ্বনির আওয়াজ কমে আসতেই সেতুর ওপরে আর্মি ওয়ার্ক ডিটাচমেন্ট দলের তোড়জোড় শুরু হলো মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের। এরই মধ্যে একটি কণ্ঠস্বর ভেসে এলো, “মিস্টার ঝ্যাং, মিস্টার ঝ্যাং, সারাজীবন আমি একজন ভালোমানুষ হয়েই কাটিয়েছি।”

বাবা অস্ফুট স্বরে বললো, “এটা মা কুইজানের গলা।”

পাশ থেকে আবেগে থরথর, ভাঙাভাঙা গলায় আরেকজন বলে উঠলো, “মিস্টার ঝ্যাং, গ্রামের প্রধান হবার জন্য আমরা অনেক সময় ব্যয় করে, অনেককে খুঁজেছিলাম। কাউকেই তখন পাইনি সেরকম। তাই আমাকেই প্রধান হতে হয়েছিল। আমাকে মাফ করেন। আমার এই তুচ্ছ জীবনকে ভিক্ষা দেন। ঘরে আমার আশি বছর বয়সী মা আছে, ওকে দেখাশোনা করতে হয় আমাকেই। আমার জীবন ভিক্ষা চাইছি আপনার কাছে।”

বাবা কানের কাছে মুখ এনে বললো, “এ হলো লুয়ান ফেংসান।”
 
এর পরপরই উচ্চস্বরে এক নারীকণ্ঠ বলে উঠলো, “মিস্টার ঝ্যাং, আপনি কী করে আমাদের সব আতিথেয়তা ভুলে গেলেন? আমাদের ঘরে যখন আপনি গিয়েছিলেন, কতকিছু ভালোমন্দ রেঁধে খাওয়ালাম। ঘরে থাকা সবচেয়ে ভালো ওয়াইনটা দিলাম পান করার জন্য। এমন কি, আমাদের আঠেরো বছরের কন্যাও কত খেয়াল রাখলো আপনার! মিস্টার ঝ্যাং, আপনার অন্তর কি লোহার পাতে তৈরি? এতটুকু মায়া নেই?”

“মা কুইজিনের স্ত্রীর গলা মনে হলো।” বাবা বললো।

সবশেষে আরেকটি নারীকণ্ঠে শোনা গেল, “উহ... আআ... ইয়া...!”

“লুয়ান ফেংসানের বোবা স্ত্রী” ফিসফিসিয়ে বলে উঠলো বাবা এবার।
 
এতক্ষণ পরে শক্ত, রূঢ় কন্ঠে চিফ ঝ্যাং কথা বলা শুরু করলো, “তোমরা যতই কাকুতি-মিনতি করো বা চিৎকার করো, কোনো লাভ নেই। তোমাদেরকে মরতেই হবে। সবাইকেই একদিন মরতে হয়। আর ভেবে দ্যাখো, যত তাড়াতাড়ি তোমরা এই দুনিয়া থেকে বিদায় নেবে, আবার অন্যরূপে ফিরে আসবার সুযোগ তত বেশি পাবে”।
 
এ কথা শুনে গলা চড়িয়ে মা কুইজিন উপস্থিত গ্রামবাসীকে কিছু বলতে চাইলো। “আমি তো সারাজীবন তোমাদের উপকার ছাড়া কোনো ক্ষতি করিনি। আজ সময় হলো, আমার জন্য তোমরা এবার মুখ খোলো।“

এদের মধ্যে কিছু মানুষ তখন হাঁটুভেঙে বসে চিফ ঝ্যাংকে উদ্দেশ্য করে বললো, “ক্ষমা করুন। এত নির্দয় হবেন না চিফ ঝ্যাং। এরা ভালো মানুষ। এদেরকে বাঁচতে দিন, মেরে ফেলবেন না দয়া করে।”

এইসব কাকুতি-মিনতির মধ্যেই হঠাৎ এক তরুণ চিৎকার করে বলে উঠলো, “চিফ ঝ্যাং, এক কাজ করতে পারি আমরা। এই কুলাঙ্গার দালালগুলোকে সেতুর ওপরে উঠিয়ে একশো বার মাটিতে মাথা ঠুকিয়ে আমাদের প্রতি আনুগত্য জানাতে বলি। এরপরে ওরা এই কুত্তাজীবনে ফিরে যাক। কী বলেন আপনি?”

“তোমার কি মনে হয় আমি প্রতিশোধপরায়ণ কোনো দানব? আচ্ছা, গাও রেনশান, তুমি বোধহয় কখনো মিলিশিয়া বাহিনীতে কাজ করেছো? তাই এভাবে বলছো। শোনো, এসব কথায় কোনো কাজ হবে না। আর গ্রামবাসীরা, এটা নিয়ে এত সময় নষ্ট করবার মতো সময় আমার হাতে নেই। মরতে ওদেরকে হবেই। সকলেই প্রস্তুত হয়ে যাও।” বিরক্ত হয়ে বললো চীফ ঝ্যাং।

“আমার পক্ষ হয়ে কথা বলো তোমরা।” মা কুইজান আবারো মিনতি জানালো।
 
আর্মি ওয়ার্ক ডিটাচমেন্টের অফিসারেরা সেতুর পাশটা খালি করার জন্য গ্রামবাসীকে সরিয়ে দিতে থাকলো।

নিরুপায় হয়ে, আর কোনো গত্যন্তর না দেখে মা কুইজিন আকাশের দিকে মুখ তুলে চিৎকার করে কেঁদে উঠলো। “হা ঈশ্বর, তুমি কি অন্ধ? এই যে আমি সারাজীবন মানুষের ভালো করে এলাম, এই তার প্রতিদান! মাথায় গুলি খেয়ে মরা!! আর ঝ্যাং, তুমিও শুনে রাখো, তুমি একটা মাগীর বাচ্চা, তোমার মৃত্যু বিছানায় হবে না- এই তুমি জেনে রেখো। অভিশাপ রইলো।”
 
এরপরের দৃশ্যগুলো মুহূর্তেই ঘটে গেল। কিছু অফিসার দৌড়ে গিয়ে সেতুর পথটা একদম খালি করে দিলো। দক্ষিণ প্রান্ত থেকে একজন চিৎকার করে বললো, “হাঁটু মুড়ে বসো।” উত্তরপ্রান্ত থেকে আরেকজন গলা চড়িয়ে বলে উঠলো, “সবাই সরে যাও।”

দ্রুম...দ্রুম...দ্রুম... তিনবার শোনা গেল গুলির শব্দ!
 
গোলাগুলির আওয়াজটা যেন আমার কানের পর্দাটা ফাটিয়ে দিলো, মনে হলো। একবার মনে হলো আমি বুঝি বধির হয়ে গেছি। সূর্যটাও এরমধ্যে তেঁতে উঠেছে। রোদ্দুরের লালচে আভা মেঘের ঢাল বেয়ে এমনভাবে নেমে এসেছে নিচে, যেন দীর্ঘ দীর্ঘ ফার গাছকে সে ঢাকনি দিয়ে রেখেছে। বিশালাকার মানবদেহের মতো দেখতে কিছু মেঘ গড়িয়ে নেমেছে সেতুর ওপারে। নিচের বরফের আস্তরে সেসবের ছায়া আছড়ে পড়ছে নৈঃশব্দ্যের এক প্রবল ভার নিয়ে। স্বচ্ছ স্ফটিকের মতো ধারালো রক্তধারা যেন গড়িয়ে পড়ছিল মেঘের চূড়া থেকে! সেতুর উত্তরপ্রান্তে একটা আতঙ্ক আর ভয়ার্ত পরিবেশ সৃষ্টি হলো তখন সেইসব গ্রামবাসীদের মধ্যে, যাদেরকে জোর প্রচার চালিয়ে এখানে আসতে বাধ্য করা হয়েছিল। আবারো সেই দৌড়াদৌড়ি, হুংকার... “হাঁটু মুড়ে বসো” “জায়গা খালি করো”- এসবের মধ্যে দিয়ে শেষ করে দেয়ার পায়তারা চলছিল চারটি প্রাণকে। 
 
আবারো সেই গুলির আওয়াজ! জীর্ণ কোট গায়ে, টুপি ছাড়া মাথায় লুয়ান ফেংসান নদীর কিনার বেয়ে গড়িয়ে পড়লো। প্রথমেই ধাক্কা খেল মা কুইজিনের দেহের সঙ্গে। সে-ও ততক্ষণে গুলিখাওয়া প্রাণহীন দেহ! এরপর একে একে মেরে ফেলা হলো দুই নারীকে। গুলি খেয়ে যেন হাত-পা শূন্যে উড়িয়ে দিয়ে তারা গিয়ে পড়লো নদীর তীরে, ওদের সঙ্গীদের দেহের পাশে। এতক্ষণ খুব শক্ত করে ধরে ছিলাম আমি বাবার হাতটা। হঠাৎ মনে হলো, আমার পা বেয়ে গরম কী একটা তরল নেমে যাচ্ছে। প্যান্ট ভিজে যাচ্ছে! কমের পক্ষে ছ’সাতজন মানুষ সেতুর উপরে দাঁড়িয়ে হই-হট্টগোল করা শুরু করে দিয়েছে ততক্ষণে। ওরা ঠিক আমাদের মাথার ওপরে দাঁড়ানো, পাথরগুলোতে এত চেপে দাঁড়িয়েছে, যেন মাথার উপরে ভেঙে পড়বে! চিৎকার দিয়ে তারা বলছে,”চিফ, মৃতদেহগুলো কি আবার পরীক্ষা করে দেখবো, মরেছে কিনা?”

“কিসের এত গরজ পড়েছে? ওদের মগজগুলো এমনভাবে ছিন্নভিন্ন হয়ে ছিটিয়েছে, স্বয়ং প্রভু নেমে এসেও ওদেরকে আর প্রাণ ফিরিয়ে দিতে পারবেন না!”

“তাহলে যাই। জুয়োর স্ত্রী আমাদের জন্য বিন-কার্ড আর ওইল ফ্লিটার্স বানিয়ে অপেক্ষা করছে তো!” 
তারা দাপাদাপি করে সেতুর উত্তরপ্রান্ত দিয়ে ফিরে যাবার জন্য এগোলো। ওদের পদধ্বনিতে এরকম মনে হচ্ছিলো, যেন ওরা কোনো পর্বতারোহী দলের সদস্য। পাথরের উপরে পায়ের শব্দ আর পাথরের ঘষার আওয়াজে যে কোনো সময় ভেঙচুড়ে পড়বে, এরকম আশঙ্কাও মনের মধ্যে আসছিল। শেষ পর্যন্ত ফিরে গেল তারা।
 
বাবা এবার আমাকে ধাক্কা দিয়ে বলে উঠলো, “ কী রে, এরকম বেকুবের মতো দাঁড়িয়ে থাকলে হবে? কাজ শুরু করো।”

উদ্ভ্রান্তের মতো চারপাশটায় তাকিয়ে থাকলাম আমি। কোনোকিছুর কোনো মানে খুঁজে পাচ্ছি না। এই যে এত পরিচিত আমার বাবা, পাশেই দাঁড়িয়ে- অথচ তাকেও কেমন অচেনা লাগছে।

“হুহ!” কেবল এটুকু শব্দই আমার মুখ থেকে কোনোরকমে বেরলো।

“তুমি কি ভুলে গেছো, এখানে আমরা তোমার দাদুর ওষুধের জন্য এসেছি। এভাবে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকলে চলবে! কুকুরগুলো আসবার আগেই খুব তাড়াতাড়ি কাজটা সারতে হবে আমাদের।”

কথাগুলো আমার কানে এসেছে, কিন্তু আমার চোখ আটকে আছে সেই বন্য কুকুরগুলোর দিকে; বিভিন্ন সাইজের, রঙের! যারা কী হিংস্রভাবে তাকিয়ে ছিল! নদীর ধার থেকে আমাদের দিকেই কী ভয়ঙ্করভাবে এগিয়ে আসছিল। যেই না গুলির শব্দ হলো, অমনি গলা ছেড়ে ঘেউঘেউ করতে করতে কোথায় লুকিয়ে গিয়েছিল।
 
খেয়াল করে দেখলাম, ওদেরকে তাড়ানোর জন্য বাবা পা দিয়ে কতগুলো ভাঙা ইট ছুঁড়ে ছুঁড়ে দিতে থাকলো। আর ওরা রাগে গড়গড় করছিল- আমাদের সামনের জায়গাটায় দাঁড়িয়ে। এবার বাবা করলো কী! কোটের পকেট থেকে ধারালো ছুরিটা বের করে জোরে জোরে ঘুরাতে লাগলো ওদের সামনে। ছুরির উপর আলো পড়ে বাবার ছায়াটাকে কেমন অদ্ভুত রহস্যময় লাগছিল। ওই সময়টুকুর জন্য কুকুরগুলো থমকে থাকলো, এগোলো না। বাবা তখন শার্টের হাতাটা গুটিয়ে, কোমরের বেল্টটা জোরে বেঁধে কাজ শুরু করার প্রস্তুতি নিলো। আমাকে বললো, “ওদের দিকে চোখটা রাখো। এদিকে এগোলেই বলো।”
 
ঈগল যেমন তার শিকারকে খাঁমচে ধরে, বাবাও তেমনি একটা নারী দেহকে টেনে খামচে ধরলো। পরমুহূর্তেই মা কুইজানের উপুড় হয়ে থাকা দেহটাকে মেলে ধরলো তার দিকে মুখ করে। বাবা একটু ইতস্ততঃ করছিল। এরপর হাঁটু গেড়ে বসে, মাথাটা মাটিতে ঠেকিয়ে মা কুইজানের মৃতদেহর সামনে বসে বললো, “আমাকে ক্ষমা করবেন। আনুগত্যের সীমাটা আমি পেরিয়ে যাচ্ছি। যদিও এটা করতে নিজেকেই ধিক্কার দিচ্ছি আমি।”
 
মা কুইজানের মৃত্যুর আগের মুহূর্তটা মনে পড়লো আমার। রক্তমাখা মুখে মাটিতে নুয়ে পড়তে পড়তে সে বলেছিল, “ঝ্যাং, মিলিয়ে নিয়ো আমার কথা। তোমার মৃত্যু বিছানায় হবে না।” বাবা খুব চেষ্টা করছিল মা কুইজানের কোটের সামনের বোতামগুলো খুলতে; কিন্তু কিছুতেই সামলে নিতে পারছিল না। শেষে আমাকে বললো, “ছুরিটা তুমি ধরো তো। আমাকে একটু সাহায্য করো”।

মনে পড়ছে, আমি গিয়ে ছুরিটা নেবার আগেই বাবা দাঁত কামড়ে ছুরিটা ধরে কোটের বোতামগুলো খুলবার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছিল। বীনের সমান আকারের হলুদ, উজ্জ্বল রঙের বোতাম! বাবার আর ধৈর্যে কুলোচ্ছিল না। টানাটানি করে খুলতে না পেরে টেনে কোটটাই ছিঁড়ে ফেলতে চাইছিল। শেষপর্যন্ত ছিঁড়েই ফেললো কোটটা । কোটের ঠিক নিচে সাটিন কাপড়ের আরেকটা লাইনিং ছিল, গেঞ্জির মতো গায়ের চামড়ার সাথে লেগে ছিল। সেটাতেও দেখলো বোতাম ওরকমই। ওটাও টেনে ছিঁড়ে ফেলতে উদ্যত হলো। বাবার যেন আর তর সইছিল না। আমি শুনতে পাচ্ছিলাম, পরতের পরে পরত এরকম কাপড় দেখে বাবা বিরক্তিতে গজগজ করতে থাকলো। আমিও খানিকটা অবাক হলাম, পঞ্চাশের উপরে বয়স এই মা কুইজানের, তিনি কোটের নিচে এত রকমারি কাপড় কেন পরেছেন! বাবা এতই বিরক্ত আর অধৈর্য হয়ে উঠলো যে, একটানে ভেতরের কাপড়টা কেটে ফেলে কুইজানের বুক, পেট, পাকস্থলি উন্মুক্ত করে ফেললো নিমেষেই। আরেকটু নিচু হয়ে বাবা সোজাসোজি হাত দিয়ে চাপ দিলো হৃতপিণ্ডের ওপরে। পরমুহূর্তেই ওর মুখটা সোনার মতো চকচক করে উঠলো। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে ছিটকে দূরে এসে বললো, “বাবা, দেখ তো, তার কি হৃদস্পন্দন এখনো আছে?”
 
আমি নিচু হয়ে হাত দিলাম। হ্যাঁ। স্পন্দন পাওয়া যাচ্ছে। তবে খুব দুর্বল, আস্তে- একটা খোরগোশের হৃদস্পন্দনের চেয়েও কম শক্তির। কিন্তু এখনো আছে স্পন্দন।
 
“হে আমার দ্বিতীয় পিতা, আপনার মগজ, ঘিলু সব এমনভাবে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে যে প্রভু এসে আপনাকে আর বাঁচাতে পারবে না। আপনি শুধু আমাকে আপনার উপযুক্ত সন্তান হয়ে ওঠার শক্তি দেন। আপনি কি তা দেবেন না?” এটা বলতে বলতে বাবা মুখ থেকে ছুরিটা নিয়ে আবার বসে গেল মা কুইজানের বুকের ওপর উপুড় হয়ে। দাঁতে দাঁত চেপে শক্ত হয়ে সে এবার হৃতপিণ্ডটা দু’ভাগ করতে চাইছে। ছুরি দিয়ে পোঁচ দিচ্ছে; কিন্তু কিছুতেই কাটতে পারছিল না। চামড়ার নিচে ওই অংশটুকু রবারের মতো কেমন যেন একটা আস্তরণ! বাবা প্রাণপণ চেষ্টা করছিল। “দ্বিতীয় প্রভু মা কুইজান, আমি জানি এরকম মৃত্যু আপনার প্রাপ্য নয়। আপনার ক্ষোভ যা সবই ঝ্যাং এর জন্যই প্রযোজ্য। আমাকে কেবল আমার কাজটি করার সম্মতি দিন। এছাড়া আর কিচ্ছু করার নেই আমার।”
 
আবারও কাজে মনযোগ দিলো বাবা। দু’বার ছুরির পোঁচ দেবার পরেও কাটতে পারলো না। অস্থিরতায় ঘাম জমতে শুরু করলো বাবার কপালে, চিবুকটা শক্ত হয়ে উঠলো, বরফকুচির মতো বিন্দুবিন্দু ঘাম জমছিল ওখানেও। এদিকে কুকুরগুলো এক ইঞ্চি এক ইঞ্চি করে আমাদের কাছে এগিয়ে আসতে শুরু করলো। ওদের চোখ দু’টো জ্বলন্ত কয়লার মতো টকটকে লাল, ঘাড়ের কাছের পশমগুলো কেশরের মতো সোজা-শক্ত হয়ে ফুলে উঠলো, বিষদাঁতগুলো বেরিয়ে আসছে, মনে হলো। “বাবা, তাড়াতাড়ি করো। কুকুরগুলো চলে এলো ব’লে!” বাবা উঠে দাঁড়িয়েই ছুরিটা আবার মাথার ওপরে তুলে শূন্যে ঘোরাতে লাগলো। যতটা পারা যায়, ওদেরকে ভয় দেখিয়ে দূরে সরিয়ে রাখার চেষ্টা। দৌড়ে ফিরে এলো আবার, কুইজানের পাশে বসে পড়ে বললো, “মা কুইজান, আমার আর কোনো পথ নেই। তোমাকে কেটেছিঁড়ে ফেলতেই হবে এখুনি। এই কাজটা এখন আমি না করলেও, খানিক পরে ওই কুকুরগুলোই দাঁত দিয়ে তা করবে। তার চেয়ে বরং আমার হাতে এ কাজ হোক।”
 
চোয়াল শক্ত হয়ে গেল বাবার, চোখ দু’টো বিস্ফারিত! নিজের সংকল্পে শক্ত হয়ে থেকে ছুরি দিয়ে চিরে ফেললো মা কুইজানের বুকের কাছ থেকে নিচ অব্দি। ছুরিটাকে ঝাঁকুনি দিয়ে পাশে সরিয়ে ফেলতেই কালো ঘন রক্তের ধারা বয়ে যেতে শুরু করলো। পাঁজরগুলো নিথর হয়ে রইলো। একটা গড়গড় গড়গড় আওয়াজ কানে এলো আর দেখলাম ছুরিটা চামড়ার নিচের মেদকে ভেদ করে পাকস্থলির এদিকে ওদিকে পোচ দিচ্ছে। সাপের মতো কুণ্ডলি পাকানো, হলদে নাড়িভুড়ি সব! কী বিশ্রী, উৎকট একটা দুর্গন্ধ এসে নাকে লাগলো আমার। 
 
দু’হাত দিয়ে নাড়িভুঁড়িগুলো ঘাটাঘাটি করতে করতে বাবাকে খুব উত্তেজিত দেখাচ্ছিল। সে এটা টানছিল, ওটা টানছিল। নিজের মনেই গালাগালি করতে লাগলো। এক পর্যায়ে পাকস্থলির পাশ থেকে উঠে গেল।

“কী খুঁজছিলে বাবা, তুমি অস্থির হয়ে?”

“পিত্তথলিটা! পিত্তথলিটা কোথায় গেল!”

বলতে বলতে হৃতপিণ্ডের কাছে আরেকটা পোচ দিল। এরপর পাজরটা কেটে ফেললো। ফুসফুসের ওখানেও কাটাকুটি চালাতে লাগলো। শেষমেশ কলিজাটায় হাত লাগালো। কলিজাটা কাটতেই বাবার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠলো।

“এই তো! এই তো পেয়েছি!” ডিমের সমান সেই পিত্তথলিটা!

কলিজার গা ঘেঁষে ধীরে ধীরে ওটা বের করলো, বের করে হাতের তালুর উপর নিলো বাবা। একটু ভেজা ভেজা আর পিচ্ছিল। সূর্যের আলো পড়ে সেটা চকচক করে উঠলো, ঠিক যেন একটা গাঢ় বেগুনী রত্নখণ্ড!

খুব সাবধানে আমায় দিয়ে বললো, “খুব খেয়াল করে ধরে রেখো। আমি এখন লুয়ান ফেংসানের পিত্তটা বের করবো।“
 
এবার বাবার আর কোনো ভুলই হলো না। অভিজ্ঞ সার্জনের মতো ফেংসানের বেল্ট খুলে, জীর্ণ-দীর্ণ কোটটা টেনে ছিঁড়ে ফেললো। এরপর এক এক করে ধাপে ধাপে ফেংসানকে চিরতে লাগলো। সব ধাপ শেষ করে সেই প্রার্থিত পিত্তথলির কাছে পৌঁছালো বাবা। ছোট একটা অ্যাপরিকটের মতো দেখতে ফেংসানের পিত্তটাও হাতে করে নিয়ে উঠে দাঁড়ালো।

“চলো। আমাদের কাজ শেষ। আমাদের জিনিস পেয়ে গেছি আমরা।”

নদীর ধার ধরে আমরা দৌড়াতে শুরু করলাম। পেছন ফিরে দেখি, ছিঁড়েখুঁড়ে পড়ে থাকা ওইসব নাড়িভুঁড়ি- চর্বি নিয়ে ওই কুকুরগুলো কামড়াকামড়ি করছে। আর সূর্যের লাল আভা ছড়িয়ে পড়ছিল ওইসব রক্তাক্ত ছিন্নভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ওপরে। 
 
চক্ষু চিকিৎসক লুও দুসান, তিনি দাদুর চোখ পরীক্ষা করে বলেছিল, ছানিটা একদম শেষ অবস্থায় এসে পৌঁছেছে। এই রোগটা ছড়াচ্ছে তার চোখের ভেতরের শিরার ক্যাভিটি থেকে। এর চিকিৎসা আছে বটে; তবে তা খুব অদ্ভুত, বিশ্রী। সব দেখেশুনে দুসান তার ওভারকোটটা হাতে ঝুলিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিলো। বাবা দৌড়ে গিয়ে তাকে অনুনয় করে বললো, “কী এমন কঠিন চিকিৎসা! বলুন আমাকে।” 
 
“হুম। একটা চিকিৎসা আছে... তোমার মায়ের ছানিটা একদম পরিষ্কার হয়ে যেতে পারে, যদি কোনো শুকরের পিত্তটা চেপে তার রসটা চোখে দেয়া যায়।”

“মেষের পিত্তথলিতে কাজ হবে না?”

“হ্যাঁ, হ্যাঁ। মেষ-এও কাজ হবে। এমন কি ভল্লুকের পিত্তের রসও দিতে পারো চোখে। তবে কী জানো, তুমি যদি মানুষের পিত্তথলি জোগাড় করতে পারো কোনোভাবে, এটায় কাজ হবে সবচেয়ে বেশি। তোমার মায়ের দৃষ্টি এক্কেবারে পরিষ্কার হয়ে যাবে। কিন্তু তা কি আর সম্ভব, বলো?”
 
ঘরে ফিরে বাবা ঠিক সেই কাজটাই করলো। মা কুইজান আর লুয়ান ফেংসানের পিত্তথলিটা চেপে তার রসটা একটা চায়ের পেয়ালায় নিলো। সবুজ একটা চায়ের পেয়ালা! তারপর দু’হাতে ধরে তুলে দিলো দাদুর হাতে। দাদু পেয়ালাটা ঠোঁটের কাছে নিয়ে জিহ্‌ভা দিয়ে ছুয়ে চেষ্টা করলো স্বাদ নেবার।

ভ্রু-টা কুঁচকে বাবার দিকে ফিরে বললো, “গুজির বাবা, কী দিলে এটা আমাকে! কী বিশ্রী তেঁতো। কোথা থেকে কী এনেছো এটা?”

“মা, এটা মা আর লুয়ানের পিত্তরস। তোমার চোখে দিলে সেরে উঠবে তুমি।”

“হ্যাঁ, সে তো বুঝলাম। মা মানে তো বুঝলাম, ঘোড়া। কিন্তু লুয়ান কী?”

আমি সেই মুহূর্তে নিজেকে আর সংবরণ করতে পারলাম না। উত্তেজিত হয়ে বলে উঠলাম, “দাদু, দাদু, এটা মানুষের পিত্ত! মা কুইজান আর লুয়ান ফেংসানের পিত্তথলি থেকে বাবা বের করে এনেছে!”
 
বিকট এক চিৎকার দিয়ে পরমুহূর্তেই দাদু এলিয়ে পড়লো ইট-বিছানো খাটের ওপরে। পড়ে রইলো পাথরমূর্তির মতো এক মৃতদেহ।

-------------------------

মূলগল্প: The Cure by Mo Yan, Translated by Howard Goldblatt



লেখক পরিচিতি: মো ইয়েন, চীনা লেখক, উপন্যাস আর ছোটগল্প লেখার জন্য তিনি বিশ্বব্যাপি পরিচিত। জন্ম ১৭ ফেব্রুয়ারি, ১৯৫৫। সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন ২০১২ সালে।

 




অনুবাদক পরিচিতি:

ফারহানা আনন্দময়ী

কবি। গদ্যকার। অনুবাদক।



1 টি মন্তব্য: