বৃহস্পতিবার, ৬ জানুয়ারী, ২০২২

রোয়াল্ড ডালের গল্প: সমুদ্রে ডুব দিলো যে লোকটি




অনুবাদ: মনিজা রহমান

তৃতীয় দিন সকাল থেকে সমুদ্র বেশ শান্ত। যাদের কখনও জাহাজের ডেকের আশপাশ দিয়েও দেখা যায়নি, সেই সব ভীতু যাত্রীরাও কেবিন থেকে বেরিয়ে এল। সান ডেকে গিয়ে তারা স্টুয়ার্ডদের রাখা চেয়ারে বসল দলেবলে। তবে বলতে কি, জানুয়ারির সূর্যের আলো এত ম্যাড়মেড়ে আর নিরুত্তাপ যে, যাত্রীদের ভীতু ফ্যাকাশে মুখকে তা আর উজ্জ্বল করতে পারল না! 
জাহাজটি যখন যাত্রা শুরু করল তারপরে প্রথম দুই দিন আবহাওয়া বেশ খারাপই ছিল বলতে হবে। আজ তৃতীয় দিন সকাল থেকে শান্ত আবহাওয়া পুরো জাহাজে সবার মধ্যে স্বস্তির পরিবেশ সৃষ্টি করল। ডিনারের আগে টানা বারো ঘন্টা শান্ত আবহাওয়ার অভিজ্ঞতা যাত্রীদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দিল বহুগুন। রাত আটটায় মূল খাবার ঘরটিতে সবাইকে বেশ নিশ্চিন্তে ও তৃপ্তি সহকারে খাওয়া দাওয়া করতে দেখা গেল। অভিজ্ঞ নাবিকরা তো রীতিমত উচ্চস্বরে হৈ হল্লা করে খেতে লাগল।

খাওয়া দাওয়া অর্ধেকও শেষ না হতেই যাত্রীরা কিসের যেন দোলা অনুভব করল। চেয়ারে বসা তাদের শরীর যেন দুলছে। জাহাজটি জায়গার মধ্যে ঘুরতে শুরু করেছে। শুরুতে এটি খুব মৃদু ছিল। ধীর-অলসভাবে একবার একদিকে, আরেকবার অন্যদিকে ঝুঁকছিল। ঝাঁকুনি যদিও মৃদু কিন্তু পুরো রুমের মেজাজ পরিবর্তনের জন্য যথেষ্ঠ ছিল। যাত্রীরা তাদের খাবারের ওপর থেকে চোখ সরিয়ে আড়চোখে এদিক ওদিক তাকাচ্ছিল। তাদের মুখে ভীতু হাসি। চোখে আতঙ্কের গোপন ঝলক।

ডিনারের রুমে ফিটফাট-ধোপধুরস্ত পোষাক পরা কয়েকজন যাত্রী এই অবস্থার মধ্যে খাবার আর আবহাওয়া নিয়ে টানা হাসি ঠাট্টা করে যাচ্ছিল। তাদের হাসাহাসি কৌতুক পাশের ভীতু যাত্রীদের মনোকষ্টের কারণ হল। জাহাজের দুলুনি ক্রমে বৃদ্ধি পেতে যেতে ভয়ংকর আকার ধারণ করল। পাঁচ ছয় মিনিট পরে জাহাজটি ডানদিকে কাত হয়ে গেল। তারপর বামে। এভাবে ডানে বায়ে বিপদজ্জনকভাবে দুলতে লাগল। যাত্রীদের চেয়ারের সঙ্গে নিজেদের আটকে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছিল।

অবশেষে সত্যিই যখন বিশাল ঢেউ এল জাহাজটি রীতিমত ঘুরে গেল। টাকা পয়সা রাখছিলেন যে পার্সার তার টেবিলে বসেছিলেন মিস্টার উইলিয়াম বর্টিবল। তিনি দেখতে পেলেন প্লেটে রাখা হল্যান্ডাইজ সস দেয়া তার পোলড টারবট কাঁটাচামচের নীচ নিচে থেকে সরে যাচ্ছে। সবাই উত্তেজিত হয়ে প্লেট এবং ওয়াইনগ্লাসগুলিকে নিজেদের নাগালে নিয়ে এল। পার্সারের ডানদিকে বসা মিসেস রেনশো সামান্য চিৎকার পাশের ভদ্রলোকের হাত চেপে ধরলেন।
 
‘খুব জঘন্য রাত আসছে,’ মিসেস রেনশোর হাতের দিকে তাকিয়ে পার্সার বললেন। কথাটি তিনি এমনভাবে বললেন যেন অন্য কিছুর ইঙ্গিত দিতে চান।

একজন স্টুয়ার্ড তাড়াতাড়ি এসে প্লেটের ফাঁকে ফাঁকে থাকা টেবিল ক্লথে পানি ছিটিয়ে পরিষ্কার করে দিল। উত্তেজনা কিছুটা কমে গেল। বেশীরভাগ যাত্রী তাদের খাওয়া দাওয়া চালিয়ে যেতে লাগল। মিসেস রেনশোসহ কয়েকজন যাত্রী মেঝেতে খুব শক্তভাবে পা চেপে ধরে দুলতে দুলতে টেবিলের সবচেয়ে কাছের দরজা দিয়ে বের হয়ে গেল।

‘আচ্ছা,’ পার্সার বলল, ‘তাহলে সে চলে গেল।’ তিনি ঝাঁকুনি সামলে ঘুরে শান্তভাবে বসে থাকা মুখগুলোর দিকে তাকালেন। এই শান্তমুখগুলো ছিল সেরা নাবিকদের। যাত্রীরা যাদের নিয়ে গর্ব করে।

খাওয়া দাওয়া শেষ হবার পরে কফি পরিবেশন শুরু হতে মিস্টার বটিবোল উঠে দাঁড়ালেন। ঢেউয়ের দুলুনি শুরু হবার পর থেকে তাকে বেশ গুরুগম্ভীর ও চিন্তাশীল মনে হচ্ছিল। উঠে দাঁড়িয়ে কফি কাপটা নিয়ে মিসেস রেনশোর খালি চেয়ারে বসলেন। তারপর ঝুঁকে পার্সারের কানে ফিসফিস করে বললেন, ‘ ক্ষমা করবেন, দয়া করে আমাকে একটা কথা বলতে পারবেন?’

ছোটখাট, চর্বিযুক্ত লাল চেহারার পার্সার সামনের দিকে ঘুরে গিয়ে বললেন, ‘কি সমস্যা. মিস্টার বর্টিবোল?

‘আমি যা জানতে চাই তা হল..’ মিস্টার বর্টিবোলের চেহারার উদ্বেগ পার্সারের চোখ এড়াল না। ‘আমি যা জানতে চাই সেটা হল- ক্যাপ্টেন কি আজ জাহাজ কত পথ পাড়ি দেবে তার অনুমান করে ফেলেছেন? নিলামে পুলের জুয়ার কথা বলছি। এটা বলছি এই জন্য যে এরকম বাজে আবহাওয়া শুরুর পরে ক্যাপ্টেন হয়ত আজ নিলামে পুলের জুয়া করবেন না!’

পার্সার এবার নিজেকে ফিরে পেলেন। ও এই কথা! মিস্টার বর্টিবোলের ভাবভঙ্গী দেখে তিনি ভেবেছিলেন কি না কি! হেসে পেট শিথিল করে আরামে শরীর ছেড়ে দিয়ে চেয়ারে বসলেন।

‘উচিত নয় জেনেও আপনাকে বলছি- হ্যাঁ’।

পার্সার নিজেও মিস্টার বর্টিবলের মতো ফিসফিসিয়ে উত্তর দিলেন। একজন ফিসফিসিয়ে কথা বললে, অন্যজনের কণ্ঠও স্বয়ংক্রিয়ভাবে নীচে নেমে আসে।

‘কতক্ষণ আগে আপনি মনে করেন তিনি এটা করেছেন?’

‘আজ বিকেলের কোন এক সময়ে হবে। ক্যাপ্টেন সাধারণত বিকেলে এই কাজটা করেন।’

‘বিকেল কয়টায়?’

‘ওহ, বলেছি তো নির্দিষ্ট করে বলতে পারব না! চারটার দিকে হতে পারে বলে অনুমান করছি।’

‘এখন আমাকে আরেকটা কথা বলুন। ক্যাপ্টেন কিভাবে সিদ্ধান্ত নেন কোন নম্বরটি হতে পারে? এজন্য কি তাকে প্রচুর খাঁটতে হয়?’

পার্সার মিস্টার বর্টিবোলের উদ্বিগ্ন মুখের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন। লোকটা কি রকম হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারছিলেন তিনি।

--ক্যাপ্টেনকে দেখেননি নেভিগেটিং অফিসারদের সঙ্গে বাতচিত করতে! তারা আবহাওয়াসহ সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে আলাপ করেছে। এরপরেই ক্যাপ্টেন তার অনুমানের কথা জানিয়েছে।

মিস্টার বর্টিবোল মাথা নাড়লেন। উত্তরটা হজম করার জন্য কিছুক্ষণ থামলেন। তারপর তিনি বললেন-

-আপনার কি মনে হয় ক্যাপ্টেন জানতেন, আজ সন্ধ্যায় আবহাওয়া খারাপ হবে?

--আমি আপনাকে সেটা বলতে পারব না।

পার্সার উত্তর দিলেন। তিনি সামনের লোকটার ছোট কালো চোখের মনির দিকে তাকিয়ে দেখলেন, উত্তেজনায় যেন কাঁপছে।

--আমি সত্যিই আপনাকে বলতে পারব না মিস্টার বর্টিবোল। কারণ আমি নিজেই জানিনা।

--যদি আবহাওয়া আরো খারাপ হয়, তবে কম অঙ্কের বাজি ধরা উচিত হবে, তাই না?

এবার লোকটির ফিসফিসানি আরো তীব্র, আরো উদ্বেগপূর্ণ।

--সম্ভবত সেটাই করা উচিত। জঘন্য আবহাওয়ার কথা বিবেচনা করে ক্যাপ্টেন বাজির অনুমান করেছে কিনা আমি জানিনা! বুড়োটা যখন বিকেলে বাজির ঘোষণা দেয়, তখন তো আবহাওয়া বেশ শান্ত ছিল।

--সম্ভবত আপনার ধারণাই সঠিক হবে। আমারও সন্দেহ বুড়ো এই জঘন্য রাতের কথা ভেবেছিলেন কিনা! আজ বিকেলে যখন সে তার অনুমানের কথা জানিয়েছিল, সমুদ্র তো তখন বেশ শান্ত ছিল।

টেবিলে থাকা অন্যরা চুপচাপ পার্সারের কথা শোনার চেষ্টা করছিল। রেস ট্র্যাকে গেলেও আপনি এ রকম দৃশ্য দেখতে পাবেন। ঘোড়ার প্রশিক্ষক যখন কথা বলে তখন হা করে রীতিমত সম্মোহিত হয়ে জুয়াড়িরা তার কথা শোনে। দেখে মনে হবে তারা বুঝি ঘোড়ার মুখ থেকে সরাসরি কিছু শুনছে।

টেবিলের অন্যদের কান এড়িয়ে মিস্টার বর্টিবোল আবার ফিসফিস করে জানতে চাইলেন-

--আরেকটা প্রশ্ন। যদি আপনাকে মাত্র একটি নম্বর কেনার অনুমতি দেয়া হয়, আপনি আজ কোন নম্বরটি বেছে নেবেন?

--কত নম্বর পর্যন্ত ধরা যাবে এখনও জানিনা। রাতের খাবারের পরে নিলাম শুরু না হওয়া পরযন্ত তারা বাজির পরিসীমা ঘোষণা করবে না। তাছাড়া এসব জুয়া টুয়ায় তেমন ভালোও না আমি। টাকা পয়সার হিসাব রাখা আমার কাজ, সেটাই করতে চাই।

পার্সার বেশ ধৈরয্যের সঙ্গে উত্তর দিল।

‘আমাকে ক্ষমা করবেন’ বলে মিস্টার বর্টিবোল উঠে দাঁড়ালেন। সাবধানে মেঝেতে পা শক্ত করে চেপে রেখে হাঁটতে লাগলেন। জাহাজের তীব্র দুলুনির কারণে দুইবার তাকে চেয়ারের হাতল ধরে থামতে হল।

--দয়া করে সান ডেকের বাটন টিপুন।

লিফটম্যানকে বললেন মিস্টার বর্টিবোল।

খোলা ডেকে বেরিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে বাতাস তাকে কাবু করে ফেলল। তিনি বাতাসের বিরুদ্ধে লড়াই করে সামনে এগিয়ে গিয়ে শক্ত করে রেলিং ধরলেন। অন্ধকার সমুদ্রে বিশাল বিশাল ঢেউগুলোর দিকে তাকিয়ে রইলেন।

-- সমুদ্রের অবস্থা বেশ খারাপ, তাই না স্যার?

ফেরার সময় লিফটের লোকটি জানতে চাইল।

লিফটম্যানের কথার উত্তর না দিয়ে, ছোট লাল চিড়ুনি দিয়ে চুলগুলি আঁচড়ে আগের জায়গায় নিয়ে এলেন মিস্টার বর্টিবোল। তিনি উল্টো লিফটম্যানের কাছে জানতে চাইলেন-

--তুমি কি মনে কর, আবহাওয়ার কারণে জাহাজ তার গতি কমিয়ে দিয়েছে?

‘—জি, জি স্যার। অবশ্যই স্যার। ঝড় শুরু হবার পরে জাহাজের চলার গতি অনেক কমে গেছে। এই ধরনের আবহাওয়ায় দুটি পথ খোলা থাকে, হয় গতি কমিয়ে দিতে হবে, নয়ত সমস্ত যাত্রীদের সমুদ্রে ফেলে দিতে হবে। হাহাহা।

নিচে ধূমপান-কক্ষের লোকেরা ইতিমধ্যে নিলামের জন্য জড়ো হয়েছিল। ডিনার জ্যাকেটে পুরুষদের চেহারা ছিল নিস্পৃহ। নারীরাও ছিল অভিব্যাক্তিহীন।

মিস্টার বর্টিবোল নিলামকারীর কাছাকাছি একটি টেবিলে চেয়ার টেনে বসলেন। পায়ের ওপর পা ফেলে, হাত ভাঁজ করে নিজের আসনে এমনভাবে বসলেন তিনি, যেন ঝোড়ো বাতাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত। ভয় যাতে কোনভাবে কাবু করতে না পারে এমন একটি সিদ্ধান্ত নিতে চলেছেন তিনি।

সম্ভবত সাত হাজার ডলারের জুয়া খেলা হবে এখানে। দুই থেকে তিনশো টিকেট এর মধ্যে বিক্রি হয়ে গেছে। ব্রিটিশ জাহাজ হওয়ায় সব হিসাব নিকাশ পাউন্ডে হচ্ছিল। কিন্তু মিস্টার বর্টিবোল আমেরিকান হওয়ায় তিনি ডলারে হিসাব করতে পছন্দ করতেন। তার জন্য সাত হাজার ডলার- প্রচুর টাকা। একশ ডলারের বিলে টাকাগুলো তাকে দেয়া হবে।

টাকাগুলি পেলে জ্যাকেটের ভিতরের পকেটে নিয়ে উপকূলে যাবেন। সেখান থেকে তিনি একটি নতুন লিঙ্কন গাড়ি কিনবেন। ওই গাড়ি চালিয়ে জাহাজ ঘাট থেকে বাড়ি যাবেন। এথেল যখন বাড়ির জানালা দিয়ে গাড়িটি দেখবে ওর মুখ আনন্দে ভরে যাবে।

মিস্টার বর্টিবোল কল্পনায় দৃশ্যটি দেখতে পাচ্ছিলেন। নতুন হালকা সবুজ লিঙ্কন গাড়িটি বাড়ির সামনে দরজায় থামল।

‘হ্যালো, এথেল, আমার প্রিয়তমা’ যেন কিছুই হয়নি এমনভাবে তিনি কথা বলবেন। ভাবছিলাম তোমাকে একটা উপহার দেব। বাড়ি ছাড়ার সময়ে জানালায় তোমার বিষণ্ণ মুখের কথা চিন্তা করেছি পুরো সময়। তখন থেকে ভাবছিলাম, কিভাবে তোমাকে আনন্দিত করা যায়।’

‘গাড়িটা তোমার ভালো লেগেছে প্রিয়তমা?’ তিনি জিজ্ঞাসা করবেন। ‘আর গাড়ির রঙটা?’ তিনি এথেলের মুখের অভিব্যাক্তি গভীর আনন্দের সঙ্গে খেয়াল করবেন।

নিলামকারীর চিৎকারে মিস্টার বর্টিবোল বাস্তবে ফিরে এলেন।

--ভদ্রমহোদয়গণ, ক্যাপ্টেন অনুমান করেছেন, আগামীকাল মধ্যরাতের মধ্যে আমরা পাঁচশত পনেরো মাইল যেতে সমর্থ হব। যারা মনে করেন, জাহাজ আরো দূরে যাবে কিংবা এরচেয়ে কম যাবে তাদের জন্য লো ফিল্ড ও হাই ফিল্ড আলাদাভাবে বিক্রি হবে। এখন আমার টুপি থেকে প্রথম সংখ্যা বের করব…পাঁচশ বারো….

রুমটা একদম নিস্তব্ধ হয়ে গেল। চেয়ারে বসে থাকা প্রত্যেক ব্যাক্তির চোখ নিলামকারীর দিকে। বাতাসে এক ধরনের চাপা উত্তেজনা ছিল। বিডগুলি উচ্চতর হওয়ার সাথে উত্তেজনা বাড়তে থাকল। এটা সাধারণ খেলা বা কৌতুক না। যখন একজন আরেকজনকে দর বাড়িয়ে নিতে দেখে, তাকে হাসতে দেখলেও, আপনি নিশ্চিত হতে পারেন শুধু তার ঠোঁট হাসছে, চোখ উজ্জ্বল আর একেবারে ঠান্ডা।

পাঁচশ বারো নাম্বারটি একশ দশ পাউন্ডের পরে থেমে গেল। পরের তিন চারটি সংখ্যাতেও একই পরিমানের অর্থ ধরা হল।

জাহাজটি প্রচন্ডভাবে দুলছিল। যতবার নিলামকারী হেঁটে আসছিলেন, দেয়ালের ওপরের কাঠের প্যানেলগুলি এমনভাবে কাঁপছিল যেন এটা ভেঙ্গে দু টুকরো হয়ে যাবে। নিলামে মনোনিবেশ করে যাত্রী তাদের চেয়ারের হাতল শক্ত করে ধরে রেখেছিলেন।

‘লো ফিল্ড!’ নিলামকারী ডাক দিলেন। ‘পরবর্তী সংখ্যাটি লো ফিল্ড।’

মিস্টার বর্টিবোল সোজা হয়ে বসলেন। তাকে খুব উত্তেজিত দেখাচ্ছিল। তিনি অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। যখন সবাই বিড ডাকা শেষ করবে, তখন তিনি ঝাঁপিয়ে পড়ে শেষ বিড করবেন।

মিস্টার বর্টিবোল হিসাব করে দেখলেন, ব্যাঙ্কে তাঁর এ্যাকাউন্টে কমপক্ষে পাঁচশত ডলার জমা আছে। ছয়শত হতে পারে। যেটা প্রায় দুইশত পাউন্ডের বেশী। এই নিলাম দুইশত পাউন্ডের বেশী যাবেনা।

‘আপনারা সবাই জানেন…’ নিলামকারী বলছিলেন, ‘লো বিড প্রতিটি সংখ্যাকে স্পর্শ করে। এই ক্ষেত্রে প্রতিটি সংখ্যা পাঁচশত পাঁচের নীচে। যারা আনুমানিক হিসেবের চেয়ে জাহাজ কম মাইল যেতে সমর্থ হবে মনে করছেন, তারা এখানে বাজি ধরবেন। এখন আপনারা একটা নম্বর কিনে বিডে অংশ নিতে পারেন। তাহলে আমি কি বিড শুরু করব?’

একশ ত্রিশ পাউন্ড পযর্ন্ত বিড উঠে গেল। মিস্টার বর্টিবোলের পাশে থাকা অন্যরা লক্ষ্য করলেন আবহাওয়া বেশ জঘন্য আকার ধারণ করেছে। একশ চল্লিশ.. পঞ্চাশ… সেখানে থেমে গেলেন। নিলামদাতা হাতুড়ি তুললেন।

‘একশো পঞ্চাশে যাচ্ছি………..।’

‘ষাট!’ মিস্টার বর্টিবোল ডাকলেন। ঘরের প্রতিটি মুখ ঘুরে তার দিকে তাকাল।

‘সত্তর!’ কেউ একজন বলল।

‘আশি!’ মিস্টার বর্টিবোল আবার ডাক দিলেন।

‘নব্বই!’ আরেকজন বলল।

‘দুইশত!’ মিস্টার বর্টিবোল ডাক দিলেন। তিনি এখন থামছেন না কারো জন্য।

কিছুক্ষণ নীরবতা।

‘কেউ কি দুইশ পাউন্ডের বেশী যেতে চান?’ নিলামকারী জানতে চাইলেন।

মিস্টার বর্টিবোল বার বার নিজেকে বলতে লাগলেন, চুপ হয়ে বসে থাকো। একদম স্থির হয়ে যাও। কোন দিকে তাকিও না। এই সময়ে কারো দিকে তাকানো ভালো নয়। নি:শ্বাস ধরে রাখো। যতক্ষণ তুমি দম আটকে রাখতে পারবে কেউ তোমার ওপর বিড করতে পারবে না।’

‘দুইশ পাউন্ডে যাচ্ছি আমরা...’ নিলামকারীর গোলাপী টাকের মাথায় হালকা ঘাম জমেছিল। ‘যাচ্ছি.............চলে গেছে!’ লোকটা টেবিলে হাতুড়ি দিয়ে বাড়ি দিল।

মিস্টার বর্টিবোল দ্রুত একটা দুইশ ডলারের চেক লিখে নিলামকারীর সহকারীর হাতে তুলে দিলেন। তারপর তিনি শেষে কি হয় জানার জন্য উদগ্রীব হয়ে অপেক্ষা করতে লাগলেন। সবকিছু না জেনে গেলে রাতে ঘুমাতে পারবেন না।

শেষ সংখ্যাটি বিক্রি হওয়ার পরে সব মিলে অঙ্কটা দাঁড়িয়েছে একুশ শত পাউন্ডে। ডলারে হিসেব করলে প্রায় ছয় হাজার। বিজয়ী পাবে এখানে নব্বই শতাংশ। দশ শতাংশ যাবে দাতব্য প্রতিষ্ঠানের কাছে। ছয় হাজারের মধ্যে নব্বই শতাংশ মানে প্রায় পাঁচ হাজার চারশ ডলার। আচ্ছা... অঙ্কটা খারাপ নয়! মনে মনে ভাবলেন মিস্টার বর্টিবোল। এই অর্থে তিনি একটা লিঙ্কন গাড়ি কিনতে পারবেন। তারপরেও কিছু বাকী থাকবে। মিস্টার বর্টিবোল মনে মনে তৃপ্তি বোধ করতে লাগলেন। একটা আনন্দছোঁয়া সন্তুষ্টি আর উত্তেজনা নিয়ে মিস্টার বর্টিবোল তাঁর কেবিনে চলে গেলেন।

সকালে ঘুম থেকে উঠে মিস্টার বর্টিবোল বেশ কয়েক মিনিট চোখ বন্ধ করে বিছানায় শুয়ে রইলেন। তিনি ঝড়ো হাওয়ার শব্দ শুনতে চাইলেন। জাহাজের দুলুনির জন্য অপেক্ষা করলেন। কিন্তু কোন ঝোড়ো আওয়াজ ছিল না। জাহাজটিতে কোন দুলুনিও ছিল না। সে লাফিয়ে পোর্টহোল থেকে বেরিয়ে এল।

ওহ যীশু, ওহ্‌ ঈশ্বর! সমুদ্র কাঁচের মতো মসৃণ। জাহাজটি এর মধ্য দিয়ে দ্রুত গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। বোঝা যাচ্ছে রাতের কোন এক সময়ে আবহাওয়া শান্ত হয়ে এসেছে।

মিস্টার বর্টিবোল মুখ ঘুরিয়ে ধীরে ধীরে তার বাঙ্কের কিনারে বসলেন। ভয়ের একটি শিরশিরে অনুভূতি তার শিরদাঁড়া থেকে নেমে গেল। তার এখন কোন আশা নেই। আবহাওয়া রাতের মতো খারাপ থাকলে তার জয় নিশ্চিত ছিল।

‘হায় ঈশ্বর,’’ তিনি উচ্চস্বরে বললেন। ‘আমি এখন কি করব?’

হায় হায় এখন এথেলকে কি বলবেন? তাকে কোনভাবে বলা যাবে না তিনি তাদের দুই বছরের সঞ্চয়ের পুরোটাই জাহাজের এক বাজির পিছনে ব্যয় করেছেন। কিন্তু বিষয়টা গোপন রাখাও সম্ভব না। কারণ এথেলের চেক ব্যাঙ্ক থেকে ফিরে আসবে। বাড়িতে টেলিভিশনের সেট আর এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকার যে মাসিক কিস্তি তাদের দিতে হয, তার কি করবেন!

মিস্টার বর্টিবোল তার প্রিয় নারীর চোখে রাগ ও অবজ্ঞা দেখতে পাচ্ছিলেন। রাগে নীল চোখ ধূসর হয়ে যাচ্ছিল। চোখ দুটি অজান্তে সংকুচিত হয়ে যাচ্ছিল। যেমনটি তাদের মধ্যে ঝগড়া হলে হয়।

‘হায় খোদা! আমি এখন কি করব?’

মিস্টার বর্টিবলের জেতার সম্ভাবনা এখন দিবাস্বপ্নের মতোই। সামান্যতম সুযোগ নেই। যদি না এই আজাইরা জাহাজ পিছনে যেতে শুরু করে। এটা কিভাবে সম্ভব! ক্যাপ্টেনকে কি বলা যায় এটা করার জন্য! শুধু মুখে বলবেন না, বাজিতে জিতে যে অর্থ পাবে তার দশ শতাংশ ক্যাপ্টেনকে ঘুষ দেয়া যেতে পারে। ক্যাপ্টেন চাইলে অঙ্কটা আরো বাড়িয়ে নেবেন বর্টিবোল।

হঠাৎ একটা ভাবনা বিদ্যুৎ চমকের মতো তার সারা শরীরে শিহরন তুলে গেল। ভাবনাটি তাকে এতটাই উত্তেজিত করে ফেলল যে বিছানা থেকে লাফ দিয়ে উঠে দৌড়ে পোর্টহোলে চলে গেলেন। সেখান থেকে সমুদ্রের দিকে তাকালেন।

মনে মনে তিনি ভাবতে লাগলেন, কেন নয়! কেন পারবে না সে সমুদ্রে লাফ দিয়ে পড়তে! সমুদ্র তো এখন পুরোপুরি শান্ত। যতক্ষণ না তারা তাকে তুলে নেবে ততক্ষণ সাঁতরে নিজেকে ভাসিয়ে রাখতে কোন সমস্যা হবে না। তার একটা অস্পষ্ট অনুভূতি হল কাজটা আগেও কেউ করেছে, কিন্তু কে করেছে সেটা মনে করতে পারলেন না।

সে সমুদ্রে পড়ে গেছে জানার পরে জাহাজটি থেমে যাবে। তারপর তাকে উদ্ধার করার জন্য একটা নৌকা নামানো হবে। নৌকাটিকে তাকে পেতে আধা মাইল পিছনে যেতে হবে। তারপর তাকে উদ্ধার করে জাহাজে ফিরিয়ে আনতে এক ঘন্টা লেগে যাবে। এক ঘন্টায় জাহাজটি প্রায় ত্রিশ মাইল পাড়ি দেয়। তাহলে জাহাজটি সম্ভাব্য হিসাব থেকে ত্রিশ মাইল দূরে সরে যাবে।

হ্যা এটাই তাকে করতে হবে। তার ধরা ‘লো ফিল্ড’ তখন নিশ্চিতভাবেই জিতবে। সমুদ্রে পড়ে যাবার আগে শুধু তাকে নিশ্চিত হতে হবে কেউ তাকে পড়ে যেতে দেখল কিনা! কারণ কাউকে না কাউকে তো জাহাজ কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে।

সমুদ্রে সাঁতার কাটতে সুবিধা হয় এমন হালকা ধরনের কাপড় পরিধান করতে হবে তাকে। তিনি এমনভাবে পোষাক পরবেন, যাতে বলতে পারেন ডেক টেনিস খেলতে গিয়ে পিছলে সমুদ্রে পড়ে গেছেন। একটা টিশার্ট, হাফপ্যান্ট আর টেনিস জুতা পরলেই হবে। ঘড়িটা হাতে নিয়ে সময় দেখে রেখে দিলেন তিনি। ঘড়ির দরকার নেই।

এখন বাজে সোয়া নয়টা। যত তাড়াতাড়ি কাজটা করা যায় ততই মঙ্গল। দ্রুত কাজটা শেষ করতে হবে। কারণ এই বাজির সময়সীমা শেষ হবে দুপুরের মধ্যে।

মিস্টার বর্টিবোল তার খেলাধুলার পোষাক পরে ভীত ও উত্তেজিত মন নিয়ে সানডেকে পা রাখলেন। তার ছোট শরীরে সাদা পাতলা পা কালো লোমে আবৃত ছিল। টেনিস জুতো পরে তিনি খুব সাবধানে ডেকের ওপর হাঁটতে লাগলেন। হঠাৎ তিনি ডেকে ভেড়ার লোমের কোট পরা একজন বয়স্ক মহিলাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কিছুটা ঘাবড়ে গেলেন। রেলিংয়ে হেলান দিয়ে মহিলা সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে ছিলেন।

কোটের কলারটা উচুঁ থাকার কারণে ভদ্রমহিলার চেহারা ভালোভাবে দেখতে পারছিলেন না মিস্টার বর্টিবোল। স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে তিনি দূর থেকে মহিলাকে লক্ষ্য করছিলেন। হ্যাঁ, মিস্টার বর্টিবোল মনে মনে নিজেকে বললেন, এই ভদ্রমহিলা কাজটা করবেন। কোন বিপদ দেখলে অবশ্যই তিনি অন্য কারো মতো দ্রুত এ্যালার্ম দেবেন।

‘এক মিনিট। কাজটা করার আগে এক মিনিট অপেক্ষা কর। সময় নাও। উইলিয়াম বর্টিবোল,কেবিনে নিজেকে কি বলেছিলে, তোমার কি সেটা মনে আছে? ভাবার চেষ্টা করো।’ এভাবে নিজেকে বলতে লাগলেন তিনি।

এমন তো নয় মিস্টার বর্টিবোল একজন অসতর্ক-এলেবেলে ধরনের মানুষ! স্থলভাগ থেকে হাজার মাইল দূরে একটি জাহাজের সানডেকের ওপর থেকে সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়ার দু:সাহসিক চিন্তা তাঁকে আতংকিত করে তুলছিল। তিনি আগে নিশ্চিত হতে চাইছিলেন, জাহাজ থেকে পড়ে গেলে মহিলা আসলেই এ্যালার্ম দেবে কিনা! তিনি কি মহিলাটিকে আগে কখনও দেখেছিলেন? তিনি অন্ধ কিংবা বধির নন তো! এমন হবার কোন সম্ভাবনা নেই যদিও। তবু আগে পরীক্ষা করে নিতে দোষ কি! প্রশ্নটা যখন জীবন-মৃত্যুর!

আবার এমন কি হতে পারে না মহিলাটি নিজেও এই বাজিতে মোটা অঙ্কের টাকা ধরেছেন! মিস্টার বর্টিবোলকে উদ্ধার করার জন্য জাহাজ থেমে গেলে হয়ত তিনি বাজিতে হেরে যেতে পারেন! নিজের স্বার্থে মানুষকে খুন করা এখন ডালভাতের মতো। মিস্টার বর্টিবোল সেদিন পত্রিকায় পড়েছিলেন, ছয় হাজার ডলারের চেয়েও কম অর্থে একজন ব্যাক্তিকে তার সহকর্মীরা হত্যা করেছিল। প্রতিদিনই তো পত্র-পত্রিকায় এমন খবর ছাপা হচ্ছে।

কথা বললে একজন মানুষের চরিত্র কিছুটা হলেও বোঝা যায়। তাই লাফ দেবার আগে মহিলার সঙ্গে খানিকক্ষণ গল্পগুজব করে নিলে ক্ষতি কি! কথাবার্তায় মহিলাকে আন্তরিক ও দয়ালু মনে হয় তবেই তো তিনি নিশ্চিন্তে পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারেন। যদিও মিস্টার বর্টিবোলের বুকের কোথায় ভয়ের একটা চিনচিনে অনুভূতি কাজ করছিল।

মিস্টার বর্টিবোল গুটি গুটি পায়ে মহিলার দিকে এগিয়ে যান। তার পাশের রেলিংয়ে হেলান দিয়ে আনন্দময় কণ্ঠে বলেন, ‘হ্যালো’।

ভদ্রমহিলা ঘুরে দাঁড়িয়ে তার দিকে তাকিয়ে হাসলেন। আশ্চর্য্যজনকভাবে হাসিটা ছিল খুব আন্তরিক ও সুন্দর। যদিও তার সাদামাটা মুখে বয়সের ছাপ প্রবল। ‘হ্যালো’ বলে তিনি প্রত্যুত্তর দিলেন।

‘প্রথম পরীক্ষায় মহিলা পাশ করেছে।’ মিস্টার বর্টিবোল মনে মনে নিজেকে বললেন। ‘সে অন্ধও নয়, বধিরও নয়।’

এবার বর্টিবোল তার দ্বিতীয় পরীক্ষায় গেলেন। ‘গত রাতের বাজি সম্পর্কে আপনার ভাবনা কি?’

‘বাজি?’ ভ্র কুচকে ভদ্রমহিলা উত্তর দিল। ‘কিসের বাজি?’
 
‘ওই যে রাতের খাবারের পরে হাস্যকর যে কাজটা হয়ে আসছে বহুদিন ধরে, জাহাজ প্রতিদিন কত দূর যাবে, তাই নিয়ে বাজি! যত্তসব ফালতু। আপনি এটা নিয়ে কি ভাবছেন জানতে খুব ইচ্ছা করছে।’

ভদ্রমহিলা তৎক্ষণাৎ মাথা নাড়লেন। আবার তিনি হাসলেন। আগের মতোই মিষ্টি ও মনোরম সেই হাসি। তবে সেখানে এবার কিছুটা ক্ষমা প্রার্থনার আভাসও ছিল।

‘আমি আসলে খুব অলস।’ তিনি বললেন। ‘ খুব তাড়াতাড়ি ঘুমাতে যাই আমি। এমনকি রাতের খাবারও বিছানায় খাই। বিছানায় বসে রাতের খাবার খেতে বেশ আরাম লাগে।’

‘ওহ্ আচ্ছা। আমাকে এখন যেতে হবে। এটা আমার ব্যায়াম করার সময়।’ মিস্টার বর্টিবোল তার দিকে ফিরে হাসলেন। তারপর ধীরে ধীরে সানডেকের কিনারে চলে যেতে লাগলেন।

যেতে যেতে আবার বললেন, ‘সকালে ব্যায়াম করার অভ্যাস আমার দীর্ঘদিনের। যাই হোক আপনাকে দেখে ভালো লাগল। সত্যিই খুব ভালো লাগলো।’ এভাবে কথা বলতে বলতে মিস্টার বর্টিবোল প্রায় দশ পা পিছিয়ে এলেন। ভদ্রমহিলা এক দৃষ্টে ওনার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
 
এখন পর্যন্ত সবকিছু ঠিকঠাক আছে। মনে মনে ভাবলেন মিস্টার বর্টিবোল। সমুদ্র যথেষ্ঠ শান্ত। তিনি সাঁতার কাটার জন্য হালকা পোষাক পরেছিলেন। আটলান্টিকের এই অংশে যে কোন মানুষখেকো হাঙ্গর নেই এই ব্যাপারে তিনি নিশ্চিত। সমুদ্রে পড়ে গেলে তৎক্ষণাৎ এ্যালার্ম দেবার জন্য একজন অমায়িক দয়ালু বুড়িও রয়েছে ডেকের ওপর।

জাহাজটি তাকে উদ্ধার করার জন্য কত সময় ব্যয় করবেন এটাই এখন প্রশ্ন। অবশ্য এক্ষেত্রে তিনি নিজে কিছুটা কারসাজি করতে পারেন। যেমন লাইফবোটে ওঠার সময়ে প্রচুর সময় নিতে পারেন। তাছাড়া কিছুটা সময় আশেপাশে সাঁতার কাটবেন। উদ্ধারকারী লাইফবোট দেখার পরে ইচ্ছে করে দূরে সরে যাবেন। অনেকটা লুকোচুরি খেলার মতো। মিস্টার বর্টিবোল জানেন, প্রতিটি মিনিট এমনকি প্রতিটি সেকেন্ড নষ্ট হওয়া মানে তার জেতার সম্ভাবনা উজ্জ্বল হওয়া। যত কালক্ষেপণ করবেন তার জয়ের সম্ভাবনা ততোই বৃদ্ধি পাবে।

মিস্টার বর্টিবোল আবার ডেকের দিকে এগোতে শুরু করলে নতুন এক ভয় তাকে গ্রাস করল। সে কি জাহাজের প্রপেলারে আটকে যাবে? তিনি শুনেছিলেন, বিশাল জাহাজ থেকে পড়ে যাওয়া এক ব্যাক্তি প্রপেলারে আটকে মারা যান। কিন্তু মিস্টার বর্টিবোল আর সত্যি সত্যি পড়ে যাচ্ছেন না, তিনি তো আসলে লাফ দেবেন, দুটো বিষয় তো আলাদা। প্রপেলারের কথা মাথায় রেখে যথেষ্ঠ দূরত্ব রেখে লাফ দেবার কথা নিজেকে বললেন তিনি।

মিঃ বটিবোল ভদ্রমহিলার কাছ থেকে প্রায় বিশ গজ দূরে রেলিংয়ের দিকে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলেন। বয়স্ক মহিলা এখন আর তার দিকে তাকিয়ে নেই। এটা একদিক থেকে খুব ভালো ব্যাপার। মিস্টার বর্টিবোলও চাইছিলেন না তিনি যে আসলে লাফ দিচ্ছেন এটা কেউ দেখুক। কেউ না দেখলে তিনি পরে বলতে পারবেন,দুর্ঘটনাবশত পা পিছলে পড়ে গেছেন।

মিস্টার বর্টিবোল জাহাজের পাশ দিয়ে সমুদ্রের দিকে উঁকি দিলেন। সানডেক থেকে সমুদ্রের দূরত্ব অনেক। এত ওপর থেকে লাফ দিলে পানির ধাক্কায় তিনি ডুবে যেতে পারেন। এজন্য তাকে সোজা হয়ে লাফ দিতে হবে। চেষ্টা করতে হবে প্রথমে পা দুটিকে পানির সমতলে নিতে।

‘জি জনাব, সমুদ্রের পানি বরফের মতো ঠান্ডা ও গভীর।’ মিস্টার বর্টিবোল নিজেকে বলতে লাগলেন। ‘কিন্তু এজন্য কাঁপাকাঁপি করলে চলবে না। তোমাকে একজন সাহসী মানুষ হতে হবে উইলিয়াম বর্টিবোল, একজন সাহসী মানুষ। কাজটা এখনই করতে হবে, নয়তো কখনই নয়....

তিনি কাঠের চওড়া টপরেইলে উঠলেন। তারপর সেখানে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। তিন সেকেন্ডের জন্য তিনি ভারসাম্য বজায় রাখলেন। ভয়ংকর তিনটি সেকেন্ড...। তারপর তিনি লাফ দিলেন। তিনি সামনের দিকে ঝুঁকে এমনভাবে লাফ দিলেন যাতে অনেকদূর যেতে পারেন। লাফ দেবার সময়েই তিনি চিৎকার করে বললেন, ‘বাঁচাও, বাঁচাও’।

তিনি সমুদ্রে পড়ে গিয়ে আবার ‘বাঁচাও, বাঁচাও’ বলে চিৎকার করে উঠলেন। তারপর পানির আঘাতে নীচে চলে গেলেন।

সাহায্যের জন্য প্রথম চিৎকার শোনার পরে রেলিংয়ের ওপর হেলান দেয়া মহিলা তৎক্ষণাৎ সমুদ্রের দিকে তাকালেন। বিস্ময়ে সামান্য লাফিয়ে উঠলেন। চারপাশে দ্রুত চোখ বোলাতে সাদা শর্টস ও টেনিস জুতা পরা ছোটখাটো লোকটিকে সমুদ্রে পড়ে যেতে দেখলেন। মুহূর্তের জন্য ভদ্রমহিলা বুঝতে পারছিলেন না তার এখন কি করা উচিত! তিনি কি একটা লাইফবেল্ট ছুঁড়ে দেবেন, নাকি ছুটে গিয়ে দ্রুত এ্যালার্ম বাজাবেন! নাকি শুধু চিৎকার করে লোকজন জড়ো করবেন!

ভদ্রমহিলা রেলিং থেকে সামান্য পিছিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন। তাকে কেমন স্থির, উত্তেজনাবিহীন আর সিদ্ধান্তহীন দেখাচ্ছিল! আবার তিনি ছুটে রেলিংয়ের কাছে এলেন। সমুদ্রের যে জায়গাতে অশান্ত সেদিকে তাকালেন। শীঘ্রই ফেনার মধ্যে দিয়ে একটি গোলাকার কালো মাথা দেখা গেল। একটি হাত ওপরে উঠে এল। হাতটি বার বার দুলিয়ে লোকটি দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছে। সেই সঙ্গে তার আকুল কণ্ঠস্বর শুনতে পেলেন। ক্রমে কালো দাগটি দূরে সরে যেতে লাগল। এতটা দূরে চলে গেল যে তিনি নিশ্চিত হতে পারছিলেন যে এটি সেখানে ছিল কিনা!

কিছুক্ষণ পরে ডেকের ওপাশ থেকে চশমা চোখে এক মহিলা বেরিয়ে এল। তিনি প্রথম মহিলাকে দেখে সামরিক কায়দায় মার্চপাস্টের ভঙ্গীতে তার দিকে এগিয়ে গেলেন।

‘আপনি এখানে? আর আমি সব জায়গাতে খুঁজে মরছি।’ চশমা চোখের মহিলা বললেন।

বয়স্ক মহিলাটি ঘুরে তার দিকে তাকালো। কিন্তু কিছু বলল না

‘জাহাজের এমন কোন জায়গা নেই যে আপনাকে খুঁজিনি!’

‘এটা খুব অদ্ভুত জানো!’ বয়স্ক মহিলাটি বললেন। ‘এইমাত্র একজন লোক জামাকাপড় পরা অবস্থায় সমুদ্রে ডুব দিলেন।’

‘এই রে! পাগলামি কথাবার্তা দেখি আবার শুরু হয়েছে!’

‘না, না.. পাগলামি নয় কিন্তু। লোকটি বলছিল, সে ব্যায়াম করতে চায়। তারপর সে সমুদ্রে ডুব দিল। এমনকি কাপড় চোপড়ও খোলেনি!’

‘আপনি এখন নীচে চলুন তো!’ চশমা পরা মহিলার চোখমুখ শক্ত হয়ে গেছে। তার চেহারায় সতর্কভাব। সে আগের তুলনায় কম সদয়ভাবে কথা বলছিল। ‘ভবিষ্যতে আর কখনই আপনাকে এভাবে একা ডেকে ঘুরে বেড়াতে দেওয়া হবে না। এখন নীচে চলুন।’

‘আচ্ছা, ম্যাগি।’ বয়স্ক মহিলার কোমল হাসিতে ফুটে উঠল এক ধরনের অসংলগ্নতা।

যেতে যেতে বললেন, ‘চমৎকার ছিলেন কিন্তু লোকটি। ডুবে যেতে যেতে আমার দিকে তাকিয়ে হাত নাড়লেন!’

----------------

মূলগল্প: Deep in the Pool by Roald Dahl


অনুবাদক পরিচিতি:
মনিজা রহমান
কথাসাহিত্যিক। অনুবাদক। সাংবাদিক
নিউইর্য়কে থাকেন।

 

 



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন