বৃহস্পতিবার, ৬ জানুয়ারী, ২০২২

ইন্দ্রাণী দত্তের দীর্ঘ সাক্ষাৎকার: দ্য আর্ট অফ ফিকশন

 
গ্রন্থণা-সাক্ষাৎকারগ্রহণে নাহার তৃণা

 

"... নির্জনে বসবাস করা, প্রকৃতির দৃশ্য উপভোগ করা এবং মাঝে মাঝে কিছু বই পড়ার চেয়ে আনন্দদায়ক আর কিছুই হতে পারে না..."  

নিকোলাই গোগোলের এমন ভাবনার বিপরীতে প্রচার সর্বস্ব কোলাহলের ভেতর এখন আমাদের বসবাস। এর ব্যতিক্রমও যে নেই তা নয়। তবে প্রচার-প্রচারণার বৃত্তে না থাকতে চাওয়াকে আজকাল আনস্মার্ট এবং কখনও কখনও রহস্যময় ধরে নেওয়া হয়।

একসময় শিল্প সাহিত্য জগতের মানুষদের নিয়ে সাধারণ পাঠকের মনে কৌতূহলের মেঘ জমতো। তারা দেখতে কেমন, কোথায় থাকেন, কেমন পোশাক পরতে ভালোবাসেন, কি পড়তে পছন্দ করেন, কোন ধরনের খাবার খেতে অভ্যস্ত ইত্যাদি নানা ব্যক্তিগত প্রশ্নের উত্তর জানার আগ্রহ ছিল। পাপারাৎসিদের জয়জয়কারের সময় উজিয়ে এখন সোশ্যাল মিডিয়ার নানা মাধ্যমে শিল্পসাহিত্যের অনেকেই তাদের ভেতর বাড়ির খবর প্রকাশে যথেষ্ট সরব। এখন আর গোপন কিছু থাকে না গোপনে। তা সত্ত্বেও আজও প্রচারের ভিড়ভাট্টা এড়িয়ে হাতে গোনা প্রিয় কয়েকজন লেখক-সাহিত্যিক আড়ালের স্বস্তিতে থাকতে পছন্দ করেন। ইন্দ্রাণী দত্ত সেরকম একজন। বিভিন্ন ওয়েবজিন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর গল্প-উপন্যাসের নাগাল পাওয়া গেলেও লেখক থাকেন অধিকাংশ পাঠকের ধরা ছোঁয়ার বাইরে। ইন্দ্রাণী দত্ত সোশ্যাল মিডিয়ায় তেমন সক্রিয় নন। যে কারণে তাঁকে ঘিরে জানতে চাওয়ার তালিকা সংকুচিত না হয়ে বরং বেড়েছে। তিনি কখন লেখালিখির সাথে যুক্ত হলেন, সাহিত্য নিয়ে তাঁর নানা ভাবনা, ইত্যাদি জিজ্ঞাস্য প্রশ্ন নিয়ে তাঁর মুখোমুখি হওয়ার একটা ইচ্ছে মনে অনেকদিন ধরে বুড়বুড়ি কাটছিল। কুলদা রায় সে ইচ্ছের ডানায় উৎসাহের হাওয়া দিলে চট জলদি ইন্দ্রাণী দত্তের সাথে যোগাযোগ করা হয়। সাক্ষাৎকার দেবার ব্যাপারে ইন্দ্রাণী দত্তের কিছু দ্বিধাদ্বন্দ্ব থাকলেও ইমেইল -হোয়াটাসপে মত বিনিময়ের ফাঁকে সেটা সরেও যায় একসময়। মেসেজ চালাচালির ফাঁকে তাঁর সম্পর্কে আরো কিছু তথ্য জেনে নেওয়া হয়। ইন্দ্রাণী দত্তের সাথে আলাপের সুতো ধরে লেখক-পাঠকের এক মধুর সম্পর্কের ঘেরাটপে দাঁড়িয়ে তাঁকে লিখিত বেশকিছু প্রশ্ন পাঠাই। কর্মময় জীবনের ব্যস্ততার ভেতর সময় বের করে সযত্নে তিনি সবগুলো প্রশ্নের উত্তর লিখে জানিয়েছেন।

ইন্দ্রাণী দত্তের জন্ম কলকাতায়। তিনি যখন জন্মান কলকাতা উপকণ্ঠের সেই অংশ তখন মফস্বল শহর ছিল। এখন অবশ্য বৃহত্তর কলকাতার আওতাধীন। শৈশবেই বইয়ের সঙ্গে সখ্য। পড়াশুনো করেছেন কলকাতার ক্রাইস্ট চার্চ স্কুল, বেথুন কলেজ, প্রেসিডেন্সি কলেজ ও যাদবপুর ইউনিভার্সিটিতে। পি এইচ ডিও যাদবপুর ইউনিভার্সিটি থেকেই। তারপর পোস্ট ডকের জন্য টরোন্টো ও সিডনি ইউনিভার্সিটি । স্কুল-কলেজ ম্যাগাজিনে সবাই যেমন লিখে থাকে, ইন্দ্রাণী দত্তেরও লেখাজোকার হাতেখড়ি সেখানেই । সেসময় মূলত প্রবন্ধ লিখেছেন। যদিও একবার কলেজের এক্সকারশনের অভিজ্ঞতা নিয়ে ছোট্ট একটি চিত্রনাট্য রচনা করেছিলেন। তবে তখনকার লেখাজোকায় প্যাশনের যোগ ছিল না।

প্রবাসে আসার পর মূলত লেখালিখির ঝোঁকটা শুরু হয় যা এক সময় প্যাশনে দাঁড়িয়ে যায়। তাঁর মুখ থেকেই বাকিটুকু শোনা যাক- “প্রবাসে চলে আসি ২০০১ এ। ২০০৪ নাগাদ বাংলালাইভ ওয়েবসাইটের মজলিশ বিভাগের খোঁজ পাই- সেখানে আড্ডাচ্ছলে টুকটাক লিখতাম। প্রবাসে থেকেও বাঙালী আড্ডা, বাংলায় লেখার সুযোগ- এই সব কারণেই যেতাম মূলত। ২০০৫/ ২০০৬ থেকে গুরুচণ্ডালিতেও আড্ডা দিতে শুরু করি। সেই সূত্রে ফিচার লেখার ডাক আসে- গুরু ও বাংলালাইভ থেকে- প্রবাসীর পত্র আর কী। আমার লেখক হয়ে ওঠার পিছনে বাংলা লাইভ ও গুরুচণ্ডা৯র পরোক্ষ অবদান রয়েছে। গুরুচণ্ডা৯র কথা আলাদা করে বলতে হয়- লেখক হিসেবে প্রথম স্বীকৃতি আমি গুরুচণ্ডা৯তেই পাই -ওঁরাই প্রথম আমাকে আমন্ত্রিত বিভাগে লিখতে ডেকেছিলেন। সেই শুরু লেখা নিয়ে সামান্য সিরিয়াস হওয়ার। গল্পে চলে আসি তার অনেক পরে। তখনও অত সিরিয়াস ছিলাম না। গল্প লিখেছি- কেউ কেউ ভালো-ও বলেছেন, সবই ঠিক। প্যাশন টের পেতে শুরু করেছি-এইমাত্র। ২০১২- তে আমার মা মারা যান। বিরাট একটা বদল আসে আমার। লেখার ব্যাপারে সিরিয়াস হয়ে যাই ঐ সময় থেকে।”

পেশাগতভাবে ইন্দ্রাণী দত্ত অস্ট্রেলিয়ার একটি যুক্তরাষ্ট্রীয় বিজ্ঞান সংস্থায় বিজ্ঞানী হিসেবে কর্মরত আছেন। নিজেকে তিনি বিজ্ঞানকর্মী ভাবতে পছন্দ করেন। এ পর্যন্ত তাঁর একটি ক্ষীণতনু গল্পগ্রন্থ ‘পাড়াতুতো চাঁদ’প্রকাশিত হয়েছে। অন্য একটি গল্পগ্রন্থ 'সূর্যমুখীর এরোপ্লেন' প্রকাশিতব্য। পাঠকমনে ভাবনার বুদবুদ তোলার মতো অসংখ্য গল্প লিখেছেন তিনি। ইন্দ্রাণী দত্তের প্রথম উপন্যাস ‘চার রঙের উপপাদ্য’ গুরুচণ্ডালিতে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছে।

দীর্ঘ এই সাক্ষাৎকারে ইন্দ্রাণী দত্ত তাঁর লেখালিখির কলকব্জা, শৈলী ইত্যাদি নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি নানা বিষয়ে মন খুলে বলেছেন। আশা করি পাঠক সাক্ষাৎকারটি পড়ে সাহিত্যিক ইন্দ্রাণী দত্তকে আরো গভীরভাবে আবিষ্কারের খাতিরে তাঁর রচনা পাঠে আগ্রহী হবেন। ইন্দ্রাণী দত্তের মতো একজন প্রতিভাময়-প্রাজ্ঞ লেখক-পাঠকের সাক্ষাৎকার আপনাদের সুখপাঠ্যের আনন্দ দেবে এই বিশ্বাসে সাক্ষাৎকারটি উপস্হাপন করা হলো।
 


সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী:
একজন লেখক সর্বাগ্রে একজন পাঠক। লেখক হয়ে ওঠার প্রস্তুতি হিসেবে আপনি কোন ধরণের লেখাজোকা বেশি পাঠ করেছেন?

ইন্দ্রাণী দত্ত:
সাহিত্য বিষয়ে, লেখালেখি নিয়ে আমি কী ভাবি, কী বুঝি আপনারা জানতে চেয়েছেন। কথোপকথন শুরুর আগে, এই পরিসরটুকু দেওয়ার জন্য আপনাদের আন্তরিক ধন্যবাদ দিতে চাই। একটা কথা গোড়াতেই বলে নিই- আমার উত্তর জগদ্দল পাথরের মত ধ্রুব নয়; এই সত্যি, আর কিছু হয় না-এরকম কোনো দাবি আমার থাকবে না। বস্তুত, একই প্রশ্নের প্রেক্ষিতে আমার উত্তর হয়ত পাল্টে যেতে পারে ভিন্ন পরিস্থিতিতে, ভিন্ন অভিজ্ঞতার পরে। প্রতিদিনই তো বদলাই আমরা। তাই আজ যা বলছি, তা শুধুই আজকের কথা, এই মুহূর্তে আমি কী ভাবছি। আর যাহা বলিব , সইত্য বলিব।

প্রথম প্রশ্নের ভূমিকায় আপনি বললেন, একজন লেখক সর্বাগ্রে একজন পাঠক । এ'কথায় আংশিক সহমত। প্রথমত লেখক আর পাঠকের সংজ্ঞা আপনি যা ভাবছেন, আমিও সেইমত ভাবি কী না সেই নিয়ে সংশয়ে রয়েছি। এই মুহূর্তে সেই সংশয়ে আলো ফেলার কোনো উপায় দেখছি না। দেখুন, এই পাঠক- লেখকের অবস্থান খুব গোলমেলে, লেখা পড়তে পড়তে , পরিসর পেলে পাঠক লেখক হয়ে ওঠেন মনে মনে-

আবার দেখুন, অনেক লেখক সেভাবে সাহিত্যপাঠের সুযোগ পাওয়ার আগেই লেখা শুরু করে দিয়েছেন; এ ব্যতীত এমন কবি বা লেখক আছেন জানি যিনি সমসাময়িক কোনো লেখা পড়তেনই না পাছে তাঁর লেখায় অন্য লেখকের প্রভাব পড়ে।

যাই হোক, আপাতত প্রচলিত লেখক- পাঠক সংজ্ঞা মাথায় রেখেই উত্তর দিই।

আমি দুদিন আগেও নিজেকে টেখক বলেছি। লেখক বলে ভাবি নি। তবে সম্প্রতি আমার বন্ধু সুলেখক মোনালিসা ঘোষ আমাকে বলেছেন, নিজেকে টেখক ভাবা পলায়নী মনোবৃত্তির পরিচায়ক -' নিজেকে লেখক বল, দায়িত্ব নে' -সে বলেছে। সে কথা শিরোধার্য করেই বলি, লেখক হয়ে ওঠার কোনো প্রস্তুতি আমার ছিল না। হঠাৎই দেখলাম , অনেকে আমাকে লেখক বলছেন। প্রস্তুতি কিছু ছিল না, কিন্তু পাঠ তো ছিলই, আছে। ছোটোবেলা থেকেই অনেকের মতই অক্ষর দেখলেই পড়ে ফেলি- ঠোঙার ভাঁজ খুলে, পান মোড়া কাগজ সোজা করে পড়েছি। লন্ড্রি থেকে আসা শাড়ির ভিতরে রাখা কাগজ বের করে রেখে দিয়েছি নিজের কাছে- পড়ব বলে। গল্প, উপন্যাস, কবিতা সবই পড়েছি। থ্রিলার, গোয়েন্দা গল্প - এই সব বড়ই পছন্দের- অনেক সিরিয়াস পাঠক এই নিয়ে আমাকে কিঞ্চিৎ ছি ছি করে থাকেন। তবে , একটা বয়সের পরে, সাহিত্যপাঠ , বিশেষত সমসাময়িক বিশ্বসাহিত্যপাঠ খুবই কমে গিয়েছিল আমার- পড়াশোনা, চাকরি, সংসার -সব মিলিয়ে। আপশোষ আছে তা নিয়ে। বিশেষ করে এখন -নিজের লেখা নিয়ে যখন সিরিয়াস । কিন্তু পিছিয়ে যেতে তো পারব না। চেষ্টা করছি সমসাময়িক বিশ্বসাহিত্যের হাল হকিকত বুঝতে। তো, যা বলছিলাম, প্রস্তুতি বলতে কিছু নেই। বিশেষ ধরণের লেখার প্রতি ঝোঁক নয়; সমস্ত রকম লেখাপাঠ আছে, থাকবেও। আর আপশোষ- কত পড়া বাকী রয়ে গেল!

সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী: 

কোন কোন লেখক আপনাকে আচ্ছন্ন বা প্রভাবিত করেছেন? সে সব পাঠের অভিজ্ঞতা কি আপনার লেখালেখিতে ছাপ ফেলে বা ফেলেছে?

ইন্দ্রাণী দত্ত:

সে তো করেইছেন। বিশেষত শৈশবে, বাল্যে, কৈশোরে , প্রথম যৌবনে। আচ্ছন্ন করার কথা বললে আমি রবীন্দ্রনাথ (গল্পগুচ্ছ), বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় ( চাঁদের পাহাড়, আম আঁটির ভেঁপু, আরণ্যক), বিমল কর (সুধাময়, জননী, খড়কুটো, অসময়), ডস্ট্ভয়েস্কি ( দ্য ইডিয়ট), টুর্গেনিভ (ফাদারস অ্যান্ড সানস), ভিক্টর হুগো ( হাঞ্চব্যাক অফ নোতরদ্যাম), চার্লস ডিকেন্সের ( এ টেল অফ টু সিটিজ, ডেভিড কপারফিল্ড) , হেমিংওয়ের কথা বলব। ভাবলে আরো কিছু নাম অবশ্যই আসবে। কিন্তু প্রথমেই বলেছি, আমি আজ মুহূর্তের ভাবনাই বলব। অত্যন্ত অল্পবয়সে পড়া এই সব আখ্যান আচ্ছন্ন করে রেখেছিল, আক্ষরিক অর্থেই। কতবার পড়েছি একই বই, একই লাইন - সেই আখ্যানের বাইরে ভাবতে পারি নি কিছু -ঐ জগতে ঢুকে গিয়েছি, বেরোতে পারি নি। পরবর্তীকালে অনেক লেখকের লেখা পড়েছি-দেশ, বিদেশের- ভালো লাগা, মুগ্ধ হওয়া সবই ঘটেছে , ঘটে চলেছে- তবে সে সব অনেকটাই বৌদ্ধিক মুগ্ধতা-আচ্ছন্ন হওয়া নয়।
বিমল করের লেখার ইশারাময়তায় সংক্রামিত আমি আকৈশোর। অনেক সময়ই বিমল করের ছায়া পড়ে আমার লেখায়।

সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী:
আপনার পাঠের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে আমাদের কিছু বলুন।

ইন্দ্রাণী দত্ত:

পাঠের অভিজ্ঞতা নিয়ে আগেও লিখেছি -গল্পপাঠে, অন্যত্রও। বিস্তারিত বলতে গেলে অন্য কথা বলার সুযোগই পাওয়া যাবে না। সারসংক্ষেপ করি।

তখন সম্ভবত আমার অক্ষরজ্ঞানও হয়নি- মা রঙচঙে বই থেকে গল্প পড়ে শোনাচ্ছে, সেখানে একটা লাইন- আকাশ ভেঙে পড়েছে রে আকাশ ভেঙে পড়েছে; মা পড়ছে, আর বিশাল একটা কিছু আমাকে গিলে নিচ্ছে, দমবন্ধ হয়ে আসছে ; কিন্তু বিশাল ব্যাপারটা যে কী আর বিরাটত্ব ঠিক কতখানি - সেইটা বুঝতে পারছি না। এই লাইনটা সেই শিশুকাল থেকে আমার সঙ্গে রয়ে গেছে। পাঠের অভিজ্ঞতা বলতে এই টাই মনে পড়ে সর্বপ্রথম। তারপর স্কুলে পড়ার সময় অজস্র বই পড়েছি- বাংলা , ইংরিজি আর আখ্যানকেও ছাপিয়ে গিয়েছে কয়েকটি লাইন- ঝিনুক কুড়োনোর মত যত্ন করে কুড়িয়ে এনে রেখেছি সারাজীবনের মত। পথের পাঁচালীর শেষ লাইন বলুন কি গুড আর্থের প্রথম লাইন- এইভাবে কুড়িয়ে আনা। অথবা গল্পগুচ্ছের এই লাইনগুলো- " নদীতে একটিও নৌকা নাই, মাঠে একটিও লোক নাই, মেঘের ছিদ্র দিয়া দেখা গেল, পরপারে জনহীন বালুকাতীরে শব্দহীন দীপ্ত সমারোহের সহিত সূর্যাস্তের আয়োজন হইতেছে। সেই নিস্তব্ধতার মধ্যে শিশু সহসা এক দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করিয়া বলিল, "চন্ন, ফু।" সমস্তজীবনের মত চন্ন ফু ডেমোক্লিসের খড়্গের মত আমার মাথায় ঝুলে রইল- এই বুঝি কেউ বলল - চন্ন ফু- এই বুঝি মুহূর্তের অসাবধানতা , এই বুঝি ঝপ করে একটা শব্দ হবে ...ভয়াবহ কিছু ঘটে যাবে এক নিমেষে -

বা, "খড়খড়ি দেওয়া লম্বা বারান্দাটাতে মিটমিটে লন্ঠন জ্বলিতেছে, সেই বারান্দা পার হইয়া গোটা চার পাঁচ অন্ধকার সিঁড়ির ধাপ নামিয়া একটি উঠান ঘেরা অন্তঃপুরের বারান্দায় প্রবেশ করিয়াছি, বারান্দার পশ্চিমভাগে পূর্ব-আকাশ হইতে বাঁকা হইয়া জ্যোৎস্নার আলো আসিয়া পড়িয়াছে, বারান্দার অপর অংশগুলি অন্ধকার, সেই একটুখানি জ্যোৎস্নায় বাড়ির দাসীরা পাশাপাশি পা মেলিয়া বসিয়া প্রদীপের সলিতা পাকাইতেছে" । যেন কিউবিজম আর্ট তাই না? টুকিয়ে এনে রেখেছি কোন বাল্যকালে। গগন ঠাকুরের সিঁড়ির ছবি অবশ্য অনেক পরে দেখি।

ননী ভৌমিকের অনুবাদে রাশিয়ান বই পড়তাম - লাইন তুলে এনেছি, শব্দ তুলে এনেছি- যত্ন করে রেখে দিয়েছি। ধরুন অ্যাসফল্ট কিম্বা ম্যালাকাইটের মত শব্দ যা উচ্চারণ করতেই হর্ষ জাগে; অথবা যেদিন পড়েছিলাম, 'সরণিতে গৃহকোণে যেন , সন্ধ্যায় জ্বলে ওঠে আলো'- বায়োস্কোপের বাক্সে চোখ রাখার মত ব্যাপার ঘটেছিল- বরফ পড়া পথ, দুদিকে কাঠের বাড়িতে আলো জ্বলছে, আকাশে তারা- এই সবই দেখা হয়ে গিয়েছিল স্রেফ একটা শব্দে। দেব সাহিত্য কুটিরের বঙ্গানুবাদে বিশ্ব সাহিত্যের অনেক আখ্যানই পড়ে ফেলেছি নিতান্ত ছোটোবেলাতেই। আর পাঁচটা বাচ্চার মত অপেক্ষা করেছি শারদীয় আনন্দমেলার- সন্তু -কাকাবাবু, গোগোল, গোঁসাইবাগানের ভূত...

পুরোনো আনন্দমেলা বাঁধাই করা ছিল বাড়িতে- সেখান থেকে মতি নন্দীকে চিনেছিলাম-""কমল উঠে দাঁড়াল। কোনও দিকে না তাকিয়ে মুখ নিচু করে সে মাঠের মাঝে সেন্টার সার্কেলের মধ্যে এসে দাঁড়াল। আকাশের দিকে মুখ তুলল। অস্ফুটে বলল, আমি যেন কখনও ব্যালান্স না হারাই। আমার ফুটবল যেন সারা জীবন আমাকে নিয়ে খেলা করে।"

স্কুলের শেষের দিকে যখন অদ্বৈত মল্লবর্মণ, মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায়, সতীনাথ ভাদুড়ি, বিমল কর , শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় পড়েছি, তখন অন্যরকম অভিজ্ঞতা হতে লাগল। বুঝতে পারছিলাম, এই সব গল্প পড়ার আগের মানুষ আর পরের মানুষ আলাদা- যেন পি সি সরকারের ম্যাজিক - বাক্সে ঢুকল একটা মেয়ে- হয় হারিয়ে গেল নয়ত বেরিয়ে এলো বাঘ হয়ে। গল্প সেই সময় থেকে আমার কাছে সার্কাসের আশ্চর্য তাঁবু।

শুধু গল্প , উপন্যাস নয়, রাণী চন্দ পড়েছি মুগ্ধ হয়ে। বুদ্ধদেব বসুর সব পেয়েছির দেশে, কালের পুতুল, আমার শৈশব, যৌবন সিরিজটা। মাধ্যমিক দিয়ে টুর্গেনিভের ফাদার্স অ্যান্ড সানস পড়েছিলাম- -“.... The tiny space I occupy is so infinitesimal in comparison with the rest of space, which I don’t occupy and which has no relation to me. And the period of time in which I’m fated to live is so insignificant beside the eternity in which I haven’t existed and won’t exist... And yet in this atom, this mathematical point, blood is circulating, a brain is working, desiring something... What chaos! What a farce!” চেকভের, মপাঁসার, অসকার ওয়াইল্ডের ছোট গল্প-

ভারজিনিয়া উল্ফ লিখছেন শেকস্পীয়ারের বোনের কথা-“ She died young—alas, she never wrote a word. She lies buried where the omnibuses now stop, opposite the Elephant and Castle. Now my belief is that this poet who never wrote a word and was buried at the cross–roads still lives. She lives in you and in me, and in many other women who are not here to–night, for they are washing up the dishes and putting the children to bed. ….. Drawing her life from the lives of the unknown who were her forerunners, as her brother did before her, she will be born. As for her coming without that preparation, without that effort on our part, without that determination that when she is born again she shall find it possible to live and write her poetry, that we cannot expect, for that would be impossible. But I maintain that she would come if we worked for her, and that so to work, even in poverty and obscurity, is worth while.” লাইন টুকে টুকে রেখেছি।

কত বলব?

তবে এও ঠিক, কলেজে, ইউনিভার্সিটি গিয়ে সাহিত্যপাঠ থেকে অনেকটাই সরে গিয়েছিলাম। পড়িনি তা নয়। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, তিলোত্তমা মজুমদার দের লেখা বাদ পড়ে নি। কিন্তু নিবিড়পাঠ ছিল না। তারও পরে, একটা সময়, স্বীকার করতে দ্বিধা নেই- মেনস্ট্রীমের গল্প উপন্যাস আর আগাথা ক্রিস্টি ছাড়া কিছুই পড়ি নি। সম্ভব ছিল না। কিন্তু ঐ যে অক্ষরের প্রতি টান। পড়তে হবে। কিছু পড়তে হবে।

বহু পরে সাহিত্যে মুগ্ধতা, নিবিড়পাঠ ফিরে আসতে থাকে অমর মিত্র, নলিনী বেরা, সুভাষ ঘোষাল, বিপুল দাসের লেখার হাত ধরে। আর নেটম্যাগাজিন যখন পড়তে শুরু করি তখন কিছু লেখক আমাকে মুগ্ধ ও বিস্মিত করেন - এঁদের মধ্যে শ্রেয়া ঘোষের নাম করব। ওঁর লেখা পড়ে মুগ্ধ হতাম, আমার তুচ্ছ লেখায় উনি মতামত দিলে ধন্য হয়ে গেছি। আজকের ইন্দ্রাণীর গড়ে ওঠার পিছনে শ্রেয়া ঘোষের অবদান সব থেকে বেশি। আজও এক লাইন লিখলেই ওঁকে পাঠাই সর্বাগ্রে। আচ্ছন্ন হতে ভুলেই গিয়েছিলাম- কুলদা রায়ের লেখা পড়ে বহুবছর পরে আচ্ছন্ন হয়েছিলাম, মনে পড়ে-স্বপ্নের লেখা সব।

নেটে যাঁদের গল্প বহুদিন ফলো করে এসেছি ও এখন করি, তাঁদের মধ্যে দময়ন্তী, প্রতিভা সরকার, একক, তারেক নূরুল হাসান, শ্রী দীপ্তেন, সৈকত বন্দ্যোপাধ্যায়, শাক্যজিৎ ভট্টাচার্য, বিশ্বদীপ চক্রবর্তী, তিতাস বেরা, মুরাদুল ইসলাম, পার্থসারথি গিরি, সায়ন্তন চৌধুরী, কুন্তলা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম করতেই হবে। এঁদের সকলের লেখার ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্ট্য আমাকে আকৃষ্ট করেছে । এ ছাড়াও অনেকেই আছেন- গল্পে, প্রবন্ধে, ভ্রমণকাহিনী বা ফীচারে- যাঁদের লেখার খোঁজ পেলেই পড়ে ফেলি। সবার নাম লিখতে পারছি না এই পরিসরে। দুঃখিত। নেটের লেখালেখি নিয়ে অনেক কথা বলার- আজ তা সম্ভব হবে না। বহু গুণীমানুষের লেখা পড়েছি নেটজগতে এসে। শিখেছি অনেক। তবে সমস্ত পড়ে ওঠা সম্ভব নয়। তাই যথারীতি না- পড়া অনেক।

ইদানিং, হোয়াটস্যাপের ছোটো গল্পের একটি গ্রুপে কত অজানা লেখকের গল্প পড়ার সুযোগ হচ্ছে। কত প্রচার বিমুখ মানুষ নীরবে লিখে চলেন। এক একটি লেখা পড়ে অবাক হয়ে যাই- তাঁদের লেখা পড়িও নি। কতজন পাঠক তাঁদের পড়েছেন সন্দেহ। এই এপ্রিলে একজনের গল্প পড়লাম। লেখকের নাম অশোক তাঁতী। গল্পের নাম বেতাল ও সন্ততি।উনি অকালে চলে গেলেন ঐ মাসেই -কোভিডে। আশ্চর্য গল্প ছিল সেটি।

কার্লেন ব্লিক্সেন, ডোরিস লেসিং, টোনি মরিসন, কোয়েটজি, মেরিলিন রবিন্সন , মার্কেজ, মার্গারেট অ্যাটউড, ওরহান পামুক, , খালেদ হোসেইনি, মুরাকামি, টিম উইনটন, কেট গ্রেনভিল, হ্যান কাং , অর্ভিন্দ আদিগা , ঝুম্পা লাহিড়ি, অমিতাভ ঘোষ, অরুন্ধতী রায় - পড়ি। যা পাই সব পড়ি। চেতন ভগত ও পড়ি। সব নাম লিখে ওঠা সম্ভব নয়। । এ ভাবে পাশাপাশি নাম বসিয়ে যাওয়াও ঠিক হচ্ছে না। আলাদা করে পাঠের অভিজ্ঞতা বলতে গেলে এই সাক্ষাৎকার আর শেষ হবে না।

থ্রিলারের মধ্যে অবশ্যই জে কে রলিং (রবার্ট গলব্রেথ), হোগাশিনো, জেন হারপার, মিশেল ব্যসি ( Michel Bussi - আমার উচ্চারণ ভুল হতে পারে), পলা হকিন্স, অ্যালেক্স মিকাইলিদিস, ক্রিশ্চিয়ান হোয়াইট। এখানেও অনেক নাম বাকি রইল। আসলে এই ভাবে পর পর নাম লিখে কোথাও পৌঁছতে পারব না। এই সাক্ষাৎকারে এইটুকুই থাক।

পাঠাভিজ্ঞতার কথা শেষ হওয়ার নয়।

বরং অন্য প্রশ্নে যাই।

সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী:

মার্গারেট অ্যাটউডের মতে প্রতিটি গল্পের নিজস্ব কণ্ঠস্বর আছে। গল্প তো কিছু শব্দের সমষ্টি নয়। তার আছে নিজস্ব কণ্ঠস্বর। সেই কণ্ঠস্বর পাঠকের কানে না পৌঁছনো অবধি সেটা গল্প হয়ে ওঠে না। নিজের লেখা উচ্চস্বরে পাঠককে প্রথম পাঠক হওয়ার সুযোগ কখনও নিয়েছেন আপনি?

ইন্দ্রাণী দত্ত:

মার্গারেট সম্ভবত নিজের লেখা নিজে এডিট করা নিয়ে এই কথা বলেছিলেন। বলেছিলেন, অ্যাজ ইউ এনটার দ্য লাইন- এডিটিং ফেজ, রীড ইয়োর ওন রাইটিং অ্যালাউড। এ গুড এডিটর 'স ইয়ার উইল ক্যাচ অকওয়ার্ড ফ্রেজেস দ্যাট ইয়োর আই অফন ওন্ট। লেখালেখি নিয়ে যখন সিরিয়াস হলাম, তখন থেকেই এই টি নিয়মিত করে থাকি- লেখা পাঠ না করলে, একই শব্দ পরপর বসেছে কীনা, লেখার মুডের সঙ্গে শব্দ নির্বাচন সাযুজ্যপূর্ণ কী না , সিনট্যাক্সের গন্ডগোল আছে কী না- এই ব্যাপারগুলো কেবল চোখ বুলোলে ধরা পড়ে না কিন্তু। মার্গারেট অ্যাটউডের এই কথা সম্প্রতিই জেনেছি। কিন্তু এই প্র্যাকটিস আমার দীর্ঘদিনের।

সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী:
লেখালেখির শৈল্পিক আঙ্গিক তৈরিতে আপনার কোনো পরামর্শ আছে?

ইন্দ্রাণী দত্ত:

পরামর্শ দেওয়ার যোগ্যতা আমার নেই। আমার নিজের বোধটুকুই বলতে পারি। আমি এক শিল্প সমালোচকের আত্মজীবনীতে পড়েছিলাম," গ্রামের বাড়ি বানাতে গেলে কোথায় বেড়া দিতে হবে, কিভাবে ছাউনি দিতে হবে, দেওয়ালে আল্পনা আঁকতে গেলে কোথায় রেখা টানতে হবে.. একথা সে রক্ত চলাচলের মধ্যেই শুনতে পায়, এজন্য তাকে রিচার্ড পড়তে হয় না, ব্রেতো পড়তে হয় না, অ্যারিস্টটলের শিল্পতত্ত্ব পড়তে হয় না। যে বাঁকুড়ার ঘোড়া তৈরি করেছিল তাকে কি কিছু পড়তে হয়েছিল? ...ভীতু স্বভাবের বৌটিকে তার ভালো লেগেছিল, যার সুন্দর , সাদা লম্বা গলা ছিল। এই রকম ভাবে সে ভেবেছিল, আমার যে ভালো লাগার জিনিস, তা যেন আমার কাছ থেকে চলে যেতে না পারে, তার হাঁটুই বন্ধ করে দিয়েছিল..এইভাবে সে এক অদ্ভূত মায়াজাল তৈরি করেছিল ঘোড়ার .. এই ঘোড়া সে নিজের ভেতরই খুঁজে পেয়েছিল, তার রক্ত চলাচলের মধ্যে কান পেতে শুনতে পেয়েছিল।... এটা শুনতে গেলে, এরকম ভাষায় কথা বলতে গেলে অ্যাতোটাই অনুভূতিপ্রবণ হতে হবে, যেন একটা পিঁপড়ে চলাচলও চোখ না এড়ায়"

এই কথা আমার চিন্তার সঙ্গে অনেকটাই মেলে। বহু জায়গায় আমি এই লাইনগুলো কোট করি। যে টা বলার, শৈল্পিক আঙ্গিক শিল্পী বা লেখকের ভিতর থেকে আসে। এ'জন্য কারো পরামর্শর দরকার পড়বেই না তার। তবে, একটা কথা বলিঃ পরিমিতিবোধ খুবই জরুরী। শিল্প দাঁড়িয়ে থাকে কতটা বলব আর কতটা বলব না র ব্যালেন্সে।

সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী:

একটি গল্প কতদিন ধরে লেখেন? লেখাকালীন সময়ের দৈর্ঘ্য কি আপনার গল্পকে প্রভাবিত করে? পরিচিত গণ্ডীর বাইরে বসে লিখলে কি তার ছাপ লেখায় পড়ে?

ইন্দ্রাণী দত্ত:

গল্পের আবছা অবয়ব মনে এলেই লিখতে বসি। একবার বসে গেলে, শেষ করতে খুব বেশি সময় কোনোদিনই লাগে নি। ইদানিং তো অত্যন্ত দ্রুত লিখেছি- কয়েকঘন্টায় গল্প শেষ হয়ে গেছে। সময় লাগে এর পরে। এডিট করেই চলি, করেই চলি- অন্তহীন এডিটিং। লেখা জমা দেওয়ার পরেও কাটাকুটি করি। ভুক্তভোগী সম্পাদকেরা জানেন।

চাকরি ইত্যাদি কারণে লেখার সময় মাপা- হ্যাঁ সে দৈর্ঘ্য প্রভাবিত করে বৈকী। বড় লেখায় হাত দিতে পারি না। ছোটো গল্প লিখে ফেলে আপশোষ হয়- কত কী বলা হল না। আর যেটা হয়, নিজের মনের টিউনিং এত দ্রুত বদলাতে হয়- অফিসের সময় যে টিউনিং, সংসারের খুঁটিনাটি কাজে মনের যে টিউনিং সেইটা ধাঁ করে বদলে ফেলা কঠিন হয় অনেক সময়- বিশেষত সময় যখন কম।

পরিচিত গণ্ডী বলতে, পরিচিত পরিবেশ বলছেন? নিজের লেখার টেবিলের বাইরে লিখি নি বহুদিন। জানি না পারব কী না। 

সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী:

আপনার 'মুকুলের বাড়ি' গল্পটি পড়ার পর মনে অ্যাপোক্যালিপটিক এক পৃথিবীর ছবি ভেসে ওঠে। গল্পকার হিসেবে আপনার কী মনে হয় যে আমরা অ্যাপোক্যালিপটিক পৃথিবীর দিকে এগিয়ে চলেছি?

ইন্দ্রাণী দত্ত:

এই নিয়ে ভাবি নি কিছু। কিন্তু লেখক হিসেবে অ্যাপোক্যালিপটিক পৃথিবীকে ধরার স্বপ্ন দেখি- বিপজ্জনক লেখা একটা- আমি নিজে দাঁড়িয়ে আছি ঘোর কমলা আকাশের নিচে , ছাই পড়ছে আকাশ থেকে, অ্যাপোক্যালিপস আসন্ন, রাস্তা চিরে চিরে ধ্বসে যাচ্ছে -বাড়ি টাড়ি ভেঙে পড়ছে, পাতালে ঢুকে যাচ্ছে- মানুষ হয় পালিয়ে গেছে নয় কেউ বেঁচে নেই। লেখক জানে যে কোনো মুহূর্তে সে মারা যাবে, এবং তার এই লেখাও হারিয়ে যাবে -তবু খসখস করে লিখে যাচ্ছে.. সবই সিনেমা প্রভাবিত বুঝতেই পারছেন- 2012 সিনেমায় সেই কনস্পিরেসি থিওরিস্ট যেমন শেষ মুহূর্ত অবধি রেডিও ব্রড্কাস্ট চালিয়ে গেল-

সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী:

'পদ্মের দল' গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র নিয়ে পাঠকমনে দ্বন্দ্ব তৈরি হয় যে কে এই গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র- মৃত্যুচিন্তা, স্বয়ং মৃত্যু, পরিতোষ নাকি মালিনী? এবং দ্বন্দ্বটিও শেষমেশ গল্পের একটি চরিত্র হিসেবে দাঁড়িয়ে যায় যেন - দ্বন্দ্ব তৈরির এই আবহ কি আপনি সচেতনভাবে করেছেন?


ইন্দ্রাণী দত্ত:

গল্প যখন শুরু করি, মৃত্যুচিন্তা, মৃত্যু স্বয়ং আর পরিতোষকে নিয়ে আরম্ভ করি- একটা পরিণতিতে পৌঁছই-কিন্তু নিজের কাছেই ফ্ল্যাট লাগে গোটা ব্যাপারটা- বদলে দিই -শেষে মালিনীকে ফোকাস করার সঙ্গে সঙ্গে এই দ্বন্দ্বটা স্বতঃস্ফূর্তভাবে এসে গেল। বলতে পারেন, গল্পের নিজস্ব স্লোপ আমাকে একটি পরিণতি বেছে নেওয়ার দিকে ঠেলে দিয়েছিল। আমি সেই পথ ধরেও শেষ অবধি ফিরে আসি, সেই স্লোপ অস্বীকার করে নিজের মত ঢাল তৈরি করি। কাজেই উত্তর হবে-হ্যাঁ, সচেতনভাবেই এই আবহ তৈরি-

সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী:

"পৃথিবীর সব গল্প বলা হয়ে গেছে, এখন কীভাবে বলতে হবে সেটাই জানা প্রয়োজন।" সাহিত্যিক সন্তোষ ঘোষের এ বক্তব্যের সঙ্গে আপনিও নিশ্চয় একমত হবেন। প্রশ্ন হচ্ছে নতুন করে নিজের গল্পটি বলার জন্য বিশেষ কোন কৌশলের উপর আপনি দৃষ্টি দিয়ে থাকেন? আখ্যান, বর্ণনাশৈলী না ভাষা?

ইন্দ্রাণী দত্ত:

আমি সহমত হলাম না সন্তোষকুমার ঘোষের এই বক্তব্যের সঙ্গে। যদিও এই মুহূর্তে, সম্পূর্ণ বক্তব্য শোনা সম্ভব নয়। বরং বলি, এই লাইনটির সঙ্গে একমত হলাম না। প্রথমত, গল্প যদি সার্থক শিল্প হয়ে ওঠে, তবে তাকে কোনোভাবেই খোপে খোপে ঢোকানো যায় না- সে তখন প্রিজমের মত - বিবিধ তল, বিবিধ কোণ। একটা নির্দিষ্ট উৎস থেকে আলো আসছে বটে, কিন্তু সে আলোর প্রতিসরণ ঘটছে; আবার ধরুন, ডিসপার্সিভ প্রিজমে আলো ভেঙে গিয়ে বহুবর্ণ হচ্ছে-

আর একটু অন্যভাবে বলি-

একজন মানুষ পাহাড় জঙ্গল পেরিয়ে হাঁটছেন- দূর থেকে দেখছেন অনেক পাথর -অজস্র পাথর- দূর থেকে সমস্তই কেবল পাথর; তারপর আরো কাছে আসছেন- দেখছেন বড় পাথর, ছোটো পাথর- ভিন্ন ভর, ভিন্ন আয়তন, ভিন্ন আকৃতি। আরো কাছে যাচ্ছেন মানুষটি -দেখছেন পাথরের রং কত অন্যরকম-লাল কালো সাদা- সে সব রঙেরও বিচিত্র সব শেড, আলো ছায়া নানাভাবে পড়ছে। ইনি একজন সাধারণ মানুষ। আবার মানুষটি একজন জিওলজিস্ট হলে, উনি দেখবেন গ্রানাইট, স্যান্ডস্টোন, মারবল, কোনটি ইগ্নিয়াস, কোনটি মেটামরফিক, কোনটি সেডিমেন্টারি- কোনটি প্রাচীন শিলা, কোনটি নবীন। সব আলাদা।

শিল্পসম্মত আখ্যানের গায়ে কোনো লেবেল দেওয়া যায় না- এইটা প্রেমের গল্প, এইটা যুদ্ধের গল্প; রসিক পাঠকও গল্পদের আলাদা আলাদা করেই চিনে নেন। । প্রেমের গল্পেরই স্থান কাল পাত্র বদলে দিলে হয়ত যুদ্ধের গল্প হয়ে যেতে পারে।

আপনার প্রশ্নের উত্তরে বলি, আমার কাছে আখ্যান, শৈলী দুইই গুরুত্বপূর্ণ। তবে এও ঠিক, এত কিছু ভেবে চিন্তে লিখতে বসি নি- কোনো গল্পে হয়ত আখ্যান মুখ্য, কোথাও শৈলী, কোথাও দুটিই।

সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী:

বাংলা সাহিত্যপাঠের পাশাপাশি বিশ্বসাহিত্য পাঠ কতটা প্রয়োজনীয়? লেখকজীবনে সে পাঠ কতটা প্রভাব রাখতে সক্ষম বলে মনে করেন?

ইন্দ্রাণী দত্ত:

অতীব প্রয়োজনীয়। ক্লাসিকের সঙ্গে কন্টেম্পোরারি। কত রকমের কাজ হচ্ছে পৃথিবীতে- নতুন চিন্তা, নতুন শৈলি - এগুলো সম্বন্ধে ধারণা তৈরি হওয়া খুবই দরকার- নিজের অবস্থান বোঝা যায়, নিজের লেখাকে তুচ্ছ মনে হয়- হীনমন্যতাবোধ নয়, নম্রতা , শ্রদ্ধাবোধ আসে, নিজের লেখাকে আরো উন্নত করার আগ্রহ জাগে- লেখালেখি করাকে সাধনা বলি যদি- এই সবই সেই সাধনার অঙ্গ।

সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী:

অনুবাদ সাহিত্যকে বিশ্বসাহিত্য পাঠের সহজলভ্য বা নাগালযোগ্য মাধ্যম বলা যেতে পারে। অনুবাদ সাহিত্য সম্পর্কে আপনার মতামত জানার কৌতূহল হচ্ছে

ইন্দ্রাণী দত্ত:

দেখুন, শৈশবে দেব সাহিত্য কুটিরের অনুবাদ সিরিজ, বাল্যে , কৈশোরে মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় আমাদের জন্য জানলা খুলে দিয়েছিলেন। সহজলভ্য, নাগালযোগ্য বললেন আপনি- একদম তাই। মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়ে আমি ইংরিজিতে ক্লাসিক পড়তে শুরু করি। নিচু ক্লাসে ইনিড ব্লাইটন পড়েছি ইংরিজিতে কিন্তু ক্লাসিক পড়া শুরু হল মাধ্যমিক দিয়ে। তাও সব বই ইংরিজিতে পাওয়াও যেত না সব সময়। মনে পড়ে, আমরা চিনুয়া আচিবি প্রথম পড়ি মানবেন্দ্রনাথের অনুবাদে। বুদ্ধদেব বসুর অনুবাদে কালিদাসের মেঘদূত যেমন পড়েছি, বোদলেয়র, রিলকে, হেল্ডালিনের কবিতাও পড়েছি। এই বঙ্গানুবাদ না থাকলে এসব কিছুই পড়া হত না। সাহিত্য আকাদেমি থেকে ভারতীয় নানা ভাষার বই এর বঙ্গানুবাদের নিয়মিত ক্রেতা অনেক।

কয়েকবছর আগে একটা লেখা পড়েছিলাম দ্য সাটল আর্ট অফ ট্রান্স্লেটিং ফরেন ফিকশন- সেখানে ব্রিটেনে অনুবাদ সাহিত্যের বর্তমান চাহিদার কথা ছিল- মজার কথা হল, সেখানে লেখা ছিল, সম্ভবত স্ক্যান্ডেনেভিয়ান থ্রিলারগুলির জনপ্রিয়তা থেকেই এই চাহিদা বাড়ে সম্ভবত। চাহিদা এতই বাড়ছে, এক অনুবাদক লিখেছেন যে প্রকাশক তাঁর কাছে পুরোনো সব লেখা যেমন ১৯৪০ এ লেখা টার্কিশ উপন্যাস, ফরাসী উপন্যাস পাঠাচ্ছেন অনুবাদের জন্য।

সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী:

ওপেনএন্ডেডনেস আপনার গল্পের একটি বৈশিষ্ট্য। এর প্রতি আপনার এতটা আগ্রহ সম্পর্কে জানতে চাই-

ইন্দ্রাণী দত্ত: 

আমি পাঠককে স্পেস দেওয়ায় বিশ্বাসী, একই সঙ্গে নৈঃশব্দের শক্তিতে ( সুভাষ ঘোষালের থেকে নৈঃশব্দের শক্তি শব্দবন্ধ ধার করলাম)। একটু ব্যাখ্যা করি।

দেখুন, আমি বিশ্বাস করি, লেখক এক পাতা লিখবেন , পরের পাতা শাদা রাখবেন -পাঠকের লেখার জন্য। পাঠক কল্পনা করবেন, পাঠক মনে মনে লিখবেন- লেখক , পাঠকের খেলা চলবে- একটা গল্প থেকে দশটা আখ্যান জন্ম নিতে পারে এই ভাবে, আর সর্বোপরি, লেখকের লেখা শেষ হয়ে যাওয়ার পরেও গল্প চলতে থাকবে পাঠকের মনে। আসলে বিমূর্ততা শিল্পের অন্যতম শর্ত- যা রূপ নেয় পাঠকের মনে, দর্শকের চোখে, শ্রোতার কানে। সব বলে দিলে বিমূর্ততা থাকে না।

কিন্তু লেখক যদি পাঠককে তাঁর দাস মনে করেন, তবে পাঠককে কোনো স্পেসই দেওয়া হয় না, লেখক যা বলবেন, সেটাই ধ্রুব হবে, যেখানে বলে উঠবেন শেষ, সেটাই সমাপ্তি হবে। দাস শব্দটা হয়ত রূঢ় হল, কিন্তু ব্যাপারটা মোটামুটি তাই- লেখক যা বলবেন সেইটাই সব, তার বাইরে কিছু নেই- তো এইখানে লেখক পাঠকের খেলার কোনো স্পেস থাকছে না- একটি গল্প থেকে দশটি গল্প জন্মও নেবে না কোনোদিন এই ক্ষেত্রে। আমি বিশ্বাস করি, লেখক পাঠকের হাত ধরে খানিক দূর একসঙ্গে এসে হাত ছেড়ে দেবেন। তিনি পাঠককে শিশু মনে করেন না- সমতুল্য মনে করেন- হাত ছেড়ে দেওয়া সেই কথা বলবে। আমি এই ধরণের লেখায় বিশ্বাসী বরাবর। ওপেনেন্ডেডনেস সেখান থেকে আসে।

আর একটা ব্যাপার হল- আমি নৈঃশব্দের শক্তিতে বিশ্বাসী। ইশারাময়তা থাকবে, আভাস থাকবে, সব বলা থাকবে না। এই শক্তি নিয়ে কতদূর এগোনো যায়- দেখি।

সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী:

আপনার প্রতিটি গল্পের গড়ানে একধরণের ধীরস্থিরভাব লক্ষ করা যায়। তাছাড়া আপনার গল্প পড়ে চট করে গল্পের সবটা ধরে ফেলা সম্ভব হয় না(অধিকাংশ গল্পের ক্ষেত্রেই এটি সত্যি)। সমুদ্রের সামনে গিয়ে ঢেউ দেখে যেমন তার গভীরতা চট করে ঠাহর হয় না- আপনার গল্পের ক্ষেত্রেও তেমনটা ভাবতে ভালোবাসেন অনেক পাঠক। গভীরে ডুব না দিলে গল্পের রহস্য স্পষ্ট হয় না। সূত্রগুলো ছড়িয়ে রাখেন সতর্পণে - এই ভঙ্গি বা শৈলি আয়ত্বের কৌশল সম্পর্কে কিছু বলুন।

ইন্দ্রাণী দত্ত:

সেই সব পাঠককে আমার কৃতজ্ঞতা। ব্যক্তিগতভাবে আমার কখনও মনে হয়, আমার লেখায় খানিকটা তাড়াহুড়ো থাকে। সেটা সময়ের টানাটানির কারণেই মূলত।

তো, আগের প্রশ্নের উত্তরেই দিয়েছি যা বললাম, ইশারাময়তা, আভাস, খানিক বিমূর্ততা- আমি এ'সবে বিশ্বাসী। আমি তো কমিউনিকেট করতে চাইছি আমার পাঠকের সঙ্গে। সরাসরি বলা কমিউনিকেট করে, অবশ্যই করে, কিন্তু আমার তাতে মন ভরে না- লেখক হিসেবে তো বটেই, পাঠক হিসেবেও। আভাসময়তা, ইশারাময়তা একটা লেখাকে শেষ হতে দেয় না, পাঠককে হাতছানি দেয় বরং- লেখার আরো গভীরে যেতে। এই চিন্তা, বিশ্বাস এসেছে বিমল কর পাঠের কারণে।অনেক অল্পবয়স থেকে বিমল কর পড়ে ইশারাময়তার ব্যাপারটা আমার রক্তে ঢুকে গেছে সম্ভবত। সেইজন্য লিখতে বসলে এই ভঙ্গি নিজের থেকেই আসে। আমাকে আয়ত্ত্ব করতে হয় নি সেভাবে। তবে এই ভঙ্গি পাঠকের পছন্দ হবে- তা ভাবি নি কোনদিন।

এখানে একটা কথা বলি। অতিরিক্ত ইশারাময়তা, অতিরিক্ত স্পেস দেওয়া পাঠকের সঙ্গে কমিউনিকেশনে অনেকসময় বাধা হয়ে যায়- একে হয়ত নেগেটিভ স্পেস বলা যায়। বলা কথা আর না বলা কথার ব্যালেন্স জরুরী। এই ব্যাপারটায় নজর দেওয়ার চেষ্টা করি। কৌশল বলতে হয়তো এটাই। 


সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী:

'চার রঙের উপপাদ্য' আপনার প্রথম উপন্যাস। যেটি এখন ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছে। গল্প নাকি উপন্যাস, কোনটির সঙ্গ বেশি উপভোগ করেন?

ইন্দ্রাণী দত্ত:

এই প্রথম উপন্যাস লেখা আমার, চেষ্টা বলতে পারেন। কয়েকমাসের সঙ্গ শুধু। সেই তুলনায় গল্প তো অনেকদিন লিখছি। এখনই তুলনা করা মুশকিল। মানে এনাফ ডাটা নেই।

তবু, যেটা বলার, উপন্যাস লিখতে খুব ভালো লেগেছে। পাঠক কীভাবে লেখাটা নেবেন / নিচ্ছেন জানি না। লেখায় ভুল ত্রুটি আছে-তাও জানি। এতদসত্ত্বেও , উপন্যাস লিখে অসম্ভব আনন্দ পেয়েছি। একটা অদ্ভূত সময়ে বসে লিখেছি আসলে- একদিকে চাকরি, কর্তব্য , ঘড়ির কাঁটা চোখ রাঙাচ্ছে, অন্যদিকে কোভিডজনিত অপ্রত্যাশিত সব শোক, আঘাত, দুঃখ, মৃত্যুভয় - সব কিছু একসঙ্গে বলেছে - সময় নেই সময় নেই।

সেই ব্যাকড্রপে লেখা। দ্রুত লেখা। অনেক চরিত্র , জটিলতা হ্যান্ডল করা, গতি কমানো, বাড়ানো- এক এক সময়ে মনে হ'ত, অকূল সমুদ্রে ভাঙা ডিঙি নৌকোয় আমি , কম্পাস নষ্ট হয়ে গেছে, বা নেই , ধ্রুবতারা দেখা দিতেও পারে বা দেখা দিলেও আমিও চিনে উঠতে নাও পারি-- আমাকে কূলে ভিড়তে হবে। শরীরে , মনে চাপ পড়েছে। সব মিলিয়ে এই রকম অভিজ্ঞতা আমার গল্প লিখে হয় নি।

এখন মনে হচ্ছে, আবার কত তাড়াতাড়ি দ্বিতীয় উপন্যাস লিখতে বসব!

সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী:

অনেক গল্পকারের ক্ষেত্রে দেখা যায় একটা পর্যায়ে গল্প লেখা কমিয়ে দিয়ে বেশিমাত্রায় উপন্যাসের দিকে ঝুঁকেন। আপনার সেরকম পরিকল্পনা আছে কী? দ্বিতীয় উপন্যাসের প্রস্তুতি কদ্দুর এগিয়েছে? উপন্যাসের কাহিনি কি ইতোমধ্যে ছকে ফেলেছেন?

ইন্দ্রাণী দত্ত:

এখনও সেরকম পরিকল্পনা কিছু নেই।পরিকল্পনা করে কিছু করি না সেইভাবে। হৃদয়ের কথা শুনব। আর সময় একটা ফ্যাকটর তো বটেই। তবে উপন্যাস আবারও লিখব।

সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী:

আপনার 'পয়লা আষাঢ়' গল্পটি আইডেন্টিটি ক্রাইসিসে আক্রান্ত রুবি কিংবা যে কারো হতে পারে - পাঠকের এমন মতামতের সঙ্গে আপনি সহমত পোষণ করবেন? জন হেনরিজম উপসর্গের সঙ্গে কী কোনোভাবে এ গল্পের সংশ্লিষ্টতা আছে?

ইন্দ্রাণী দত্ত:

দেখুন, যে কথা আগে বললাম, একটা গল্প থেকে দশটা গল্পর জন্ম অর্থাৎ পাঠকের স্পেস। অবশ্যই আমি সুকুমার রায়ের কালাচাঁদের ছবির মত ব্যাপার হোক- চাইছি না।

তো, পাঠক কল্পনা করেছেন আইডেন্টিটি ক্রাইসিস- অন্য একটা গল্প তৈরি হয়েছে। সহমত / অসহমতের কথা ওঠে না। পাঠকের স্বাধীনতা।

তবে আমি নিজে এভাবে লিখি নি। বলা যায়- আমার অ্যাপ্রোচ একটু আলাদা রকম ছিল- যেন ব্যাপারটা স্বাভাবিক। ঐ গলিতে , ঐ একলা মেয়ের কাছে একটা বাঘ থাকা খুব স্বাভাবিক কিন্তু ব্যাপারটা বাকিদের কাছে অস্বাভাবিক , মেয়েটিকে সেইজন্য বাঘকে লুকিয়ে রাখতে হয়। একটা সময় বাঘ দৃশ্যমান হয়- গল্পের ক্লাইম্যাক্স সেখানে। এখন এই গলি, গলির বাঁক, একলা মেয়েটি, সংসারের সর্বদিক থেকে ঘা খাওয়া একলা মানুষ, বাঘ- এই সব কিছুর একটা মনস্তাত্বিক ব্যাখ্যা হয়। আপনি জন হেনরিজম এর উল্লেখ করছেন এই সূত্রেই। পাঠক সেইভাবেই দেখেছেন। আমি লিখেছি মনস্তাত্বিক ব্যাখ্যাটা মাথায় রেখে নয়, একদম মনের ভেতরে রেখে। জন হেনরিজম এই কয়েনেজটি আমার অজানা ছিল কিন্তু এই কোপিং মেকানিজম আমার কিছুটা দেখা। আমার বলে নয়, আমাদেরই সবারই দেখা হয়তো। তো, এই কোপিং মেকানিজম মাথায় নয়, মনের ভেতরে রেখেই গল্পটা লিখেছি- বাঘ পোষা যেন খুব স্বাভাবিক। গল্পের প্রথম লাইন সেভাবেই লিখেছিলাম।

সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী:

সমাজ সচেতনতার পাশাপাশি লেখক সাহিত্যিকদের রাজনীতি সচেতন হওয়াকে কতটা জরুরি ভাবেন?

ইন্দ্রাণী দত্ত: 

এখানে দুটো কথা উঠেছে- সমাজ সচেতনতা আর রাজনীতি-

সমাজ সচেতনতা কথাটা আমি বদলাতে চাই- আমি বলব সংবেদনশীলতা । সচেতন আর সংবেদনশীল হওয়ার ফারাক সংবাদপত্রের প্রতিবেদন আর সার্থক সাহিত্যের মধ্যে যতটা, ঠিক ততটাই। কেবল সমাজ সচেতনতা নিয়ে সার্থক সাহিত্য হয় না। একজন শিল্পী বা সার্থক সাহিত্যিককে এমন অনুভূতিশীল / সংবেদনশীল হতে হয় ( আমার বিশ্বাসে) যে একটি পিঁপড়ের চলনও যাতে চোখ না এড়ায়।

আর রাজনীতি? রাজনীতি কি? ডান , বাম, কংগ্রেস, তৃণমূল, কনজারভেটিভ, লিবেরাল, এই সব খোপ খোপ রাজনীতির কথা নয়। যে রাজনীতিকে বাদ দিয়ে জীবন হয় না- তা পাওয়ার । ইনফ্লুয়েন্স নয়, পাওয়ার। অ্যান্ড পাওয়ার ইজ ফান্ডামেন্টালি রিলেটিভ। সবখানে। সুভাষ ঘোষালের একটি গল্প 'রৌদ্রশূন্যতা'। গৃহবধূ কল্যাণী দুপুরে একলা ভাত খায় ঠান্ডা ঠান্ডা মেঝেয়, রোদহীন ঘরে। পুরোনো বন্ধু তার স্ত্রীকে নিয়ে আসবে নিমন্ত্রণে- কল্যাণী ঠিক করে, সবার খাওয়া হয়ে গেলে, হাঁড়িকুড়ি উঠিয়ে এনে সে আর বন্ধুপত্নীটি বারান্দার দু-ফুট রোদে পিঠ দিয়ে বসে খাবে । শেষ পর্যন্ত সে খেতে বসে ঐ খাবার ঘরেই। সবার খাওয়ার পরে, এঁটোকাঁটা না তুলেই। এক কোণে একা। তার স্বামী জল খেতে এসে স্ত্রীকে খেতে দেখে। শেষটুকু হুবহু কোট করিঃ

'কল্যাণের মনে হল তার স্ত্রী একটা ধ্বংসস্তূপের মধ্যে বসে আছে। আর তার হাতে এইমাত্র উঠে এসেছে পাঁপড়। কোথাও কোনো অস্বচ্ছতা নেই। খাবার ঘর থেকে বেরিয়ে শোবার ঘরে বা বসার ঘরে চলে যাবার পথে বারান্দা জুড়ে দু-ফুট রোদ পড়ে আছে। ঝ্কঝকে তকতকে রোদের মেঝে। নিজের হাতে নিকিয়েছিল কল্যাণী। কল্যাণ এত বছর ধরে রক্তের জগতে রক্তশূন্যতার কথা শুনে এসেছে। এত বছর বাদে সে রৌদ্রের জগতে রৌদ্রশূন্যতার কথা জানল।'

রাজনীতি বলতে আমি এই ঠান্ডা ঘরের মেঝে আর বারান্দার রোদের দূরত্বটুকু বুঝি।
একজন সাহিত্যিককে এই রাজনীতি সম্বন্ধে সচেতন তো হতেই হবে।

সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী:

লেখালেখির জন্য আপনি নোটবুক ব্যবহার করেন? তাতে রোজকার নানা ভাবনা টুকে রাখতে অভ্যস্ত?

ইন্দ্রাণী দত্ত:

লেখা গিয়ে সিরিয়াস হওয়ার পর থেকে টুকে রাখার ব্যাপারে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। ভাবনা, কী একটা দুটো লাইন মনে এলেই লিখে রাখি। হাতের কাছে নোটবুকটি না থাকলে স্টিকি নোটে, মোবাইলের নোটস- যেখানে হোক লিখে রাখি। শুধু ভাবনা নয়, কিছু দৃশ্যও- লিখে রাখি বা ছবি তুলে রাখি। কী ভাবে, কবে কোথায় ব্যবহার করব জানি না- কিন্তু জমিয়ে রেখে দিই।

 সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী:

চলচ্চিত্রে বা সাহিত্যে বিষয়বস্তুর গুরুত্ব বা ওরয়োজন মাফিক যৌনতা উপস্থাপিত হতেই পারে।'শিল্পের জন্য শিল্প' এ ছুতোয় লাগামহীনতায় না ভেসে লেখক/ চলচ্চিত্রকারের কতটা নিয়ন্ত্রিত আচরণ কাম্য বলে মনে করেন?

ইন্দ্রাণী দত্ত:

দেখুন, আমার যেটা মনে হয়, এই দৃশ্য বা এই প্যারা দর্শক/ পাঠকের সঙ্গে কী ভাবে কমিউনিকেট করছে আর মূল যে আখ্যান সেখানে তার প্রয়োজনীয়তা কতখানি-

চমক দিতে চাইলাম বা গ্যালারির জন্য খেলতে চাইলাম- সেক্ষেত্রে ব্যালান্সের প্রয়োজন নেই। কিন্তু যিনি নৈঃশব্দের সামর্থ্যকে পুঁজি করেছেন, তাঁর কাছে কতটা বলব আর কতটা বলব না ব্যাপারটা গুরুত্বপূর্ণ। সুভাষ ঘোষাল বলেছিলেন , "শুধু গল্প বলা নয়, সেইসঙ্গে গল্প না-বলাও। শুধু কী বলব এই চিন্তাই নয়, সেই সঙ্গে কী বলব না এই দুশ্চিন্তাও।... নৈঃশব্দের সামর্থ্য নিয়ে কতটা এগিয়ে যাওয়া যায় , তার ওপরেই নির্ভর করে সব-মুন্ডু থাকবে না যাবে সেই ভবিতব্য"-

 

সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী:

প্রায়শ, একজন লেখকের সৃষ্টিকর্মের পাশাপাশি তাঁর ব্যক্তিগত বৃত্তান্ত পাঠক সাধারণের চর্চার বিষয়বস্তু হতে দেখা যায়- এ'বিষয়টিকে সমর্থন করেন? করলে কেন করেন? না করলে কেন নয়?
 

ইন্দ্রাণী দত্ত:

এখানে ব্যক্তিগত বৃত্তান্ত ব্যাপারটা আরেকটু বিশদ ব্যাখ্যা দাবি করে। মানে ব্যক্তিগত বলতে কী বোঝাচ্ছেন, বা এই ব্যক্তিগত বৃত্তান্ত লেখক নিজের লেখার প্রেরণা বা লেখার বীজ বা ব্যাকড্রপ বোঝানোর জন্য নিজেই জনসমক্ষে কখনও এনেছেন কী না-এইগুলি জানা প্রয়োজন। যেমন সমরেশ বসু ও কমিউনিস্ট পার্টির সম্পর্ক- হ্যাঁ সমরেশের লেখার পাশাপাশি এই কথাগুলি উঠে আসবে- সেটাই স্বাভাবিক। বা শঙ্খ ঘোষের সকালবেলার আলো প্রসঙ্গে তাঁর ভিটা ইত্যাদি আলোচিত হবেই- দেশ বিদেশ মিলিয়ে এর অজস্র উদাহরণ দেওয়া যায়।

কিন্তু আপনি যদি বলেন, লেখকের সৃষ্টির সঙ্গে সেই ব্যক্তিগত কাহনের কোনৈ যোগ নেই এবং লেখকও সে সব কথা জাহির করে বলে বেড়াননি কোথাও- তবে সাধারণের সে বিষয়ে আলোচনা তো অনধিকারচর্চা। সাহিত্য আলোচনা প্রসঙ্গে সে সব কেন আসবে বুঝতে পারছি না।

সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী:

হ্যাঁ, ওটাই বলতে চেয়েছি। লেখকের সৃষ্টির বৃত্ত ছেড়ে তাঁর ভেতর বাড়ির বিষয়াদি নিয়ে অহেতুক কৌতূহল দেখানো তো মোটেও স্বাস্হ্যকর কিংবা রুচিসম্মত নয়- ঠিক না?

ইন্দ্রাণী দত্ত:

একদম ঠিক। তবে ব্যাপারটা শুধু লেখক কেন, যে কোনো মানুষের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।


সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী:

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় লেখার আগে শিরোনাম ঠিক করে তারপর লিখতে পছন্দ করতেন। দেবেশ রায় ছিলেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঠিক উল্টো। রবীন্দ্রনাথের ভাষ্য, 'নাম হচ্ছে লাউয়ের বোঁটা , ওটা খাওয়া যায় না। তবে লাউটাকে ধরবার সুবিধা হয়।' ধরবার সেই উপলক্ষ্যের অর্থাৎ শিরোনাম নির্বাচনে রবি ঠাকুর বিশেষ যত্নশীল ছিলেন। আপনি আপনার লেখার শিরোনাম নির্বাচনে কোন পন্থা নিয়ে থাকেন?

ইন্দ্রাণী দত্ত:

ভেবে দেখলাম, আমার ক্ষেত্রে ব্যাপারটা মিশ্র। ঐ যে নোটবুকের কথা বলছিলাম, সেখানে শুধুই আস্ত নিটোল ভাবনা লিখে রাখি তা নয়, হঠাৎ কোনো শব্দ, শব্দবন্ধ মনে ঘুরঘুর করলে সেটাও লিখে রাখি। মনে আছে, 'সমরেশের জীবনদেবতা' কথাটা লিখে রেখেছিলাম। 'পাড়াতুতো চাঁদ' কথাটাও। নোটবুক ঘেঁটে দেখছি- 'লীলাময়ীর সকাল' কথাটা লেখা, 'অরফ্যানগঞ্জ ' নাম লেখা। কিন্তু এই নাম দিয়ে কোনো গল্প শুরু হয় নি। গল্প নিজের নিয়মে শুরু হয়েছে, খানিকটা এগোলে নোটবুকে লিখে রাখা কথাটা ব্যবহার করেছি। সমরেশের জীবনদেবতা গল্প শুরু করে যখন দেখলাম ঐ নামটা দেওয়া যায়, মুখ্য চরিত্রর নাম সমরেশ করে দিয়েছিলাম। 'লীলাময়ীর সকাল' হয়ে গিয়েছিল 'লীলাময়ীর সংসার'।

আবার 'পদ্মের দল', কী 'মুকুলের বাড়ি' শিরোনাম বস্তুত গল্পের থীম ছিল- পরে সেটাই শিরোনাম করে দিয়েছি।

লেখা শেষ হয়ে গেছে, নাম হাতড়াচ্ছি- সেরকম ঘটে নি কখনও। লিখতে লিখতেই থীম থেকে বা নোটবুক থেকে শব্দ নিয়ে নামকরণ করে ফেলেছি।

এ সবই গল্পের কথা।

যে উপন্যাসটি এই মুহূর্তে ধারাবাহিকভাবে বেরোচ্ছে- তার নামকরণ করেছিলাম লেখা শুরুর আগেই। ঠিক করেছিলাম, ২০১৮র নভেম্বর থেকে ২০১৯ এর অক্টোবর অবধি সময়কালের আখ্যান হবে। ছয় ঋতু। প্রতিটি ঋতুতে চারটি পৃথক পটভূমি পর পর আসবে। এই যে চারটি পটভূমি- তাদের যদি চারটি রং বলে ধরি, তবে এই চারটে রং দিয়ে আমি একটা বছর কে পেন্ট করব -এই রকম ভেবেছিলাম। ফোর কালার থিওরেম অনুযায়ী, no more than four colours are required to colour the regions of any map so that no two adjacent regions have the same colour. তো ঠিক করেছিলাম, , এক খোপের রঙ উপচে অন্য খোপে ঢুকবে না। অর্থাৎ সম্পর্কের যোগাযোগ থাকলেও একবছরের সময়কালে এক রঙের পটভূমির বাসিন্দার সঙ্গে অন্য রঙের পটভূমির মানুষের দেখা হবে না। এই ক্ষেত্রে, উপন্যাসের নামকরণকে ' লাউয়ের বোঁটা' বলা যায় সম্ভবত।

সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী:

আপনাকে যদি আপনার কোনো গল্প পুনর্লিখনের সুযোগ দেওয়া হয়, আপনি কী সানন্দে সে সুযোগ গ্রহণ করবেন?

ইন্দ্রাণী দত্ত:

হ্যাঁ করব। এমনিতে, লেখা হয়ে যাওয়ার পরেও দীর্ঘদিন কাটাকুটি, সংশোধন করি ( সময় পেলে )-একবার প্রকাশিত হয়ে গেলে, সে লেখা পড়তে পারি না- কী খারাপ একটা লেখা মনে হয়। বহুদিন কেটে গেলে তখন আবার পড়ি। অত খারাপ লাগে না তখন। তবুও মনে হয়, এটা সেটা বদলালে ভালো হয়.. তবে বিরাট কিছু পরিবর্তনের কথা ভেবেছি অল্প কটি গল্পের ক্ষেত্রে। যেমন অরফ্যানগঞ্জ গল্পটি ...

আর একটা ব্যাপার হয়। অনেকসময় লেখা প্রকাশিত হওয়ার পর মনে হয়েছে- আমি থীমের প্রতি বা চরিত্রের প্রতি সুবিচার করতে পারিনি। আমি যেখানে তাদের রেখেছি, এর থেকে অনেক ভালো জায়গা তারা দাবী করে। অ্যাকচুয়ালি, এই চার রঙের উপপাদ্য উপন্যাসটিতে পুরোনো লেখার কোনো অংশ ব্যবহার করেছি- বেটার জায়গা দিতে চেয়েই।

সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী:

ইসাবেল আয়েন্দে , প্রায় প্রতিটি লেখা তাঁর প্রিয় নির্দিষ্ট একটি তারিখে শুরু করেন। জানুয়ারির আট তারিখ। আপনার লেখালেখির দিনপঞ্জিতে সেরকম কোনো নির্দিষ্ট তারিখ বা প্রিয় সময় আছে?

ইন্দ্রাণী দত্ত:

ঊনিশশো একাশির আটই জানুয়ারি ইসাবেল তাঁর মুমূর্ষু পিতামহকে একটি চিঠি লেখেন। ঐ চিঠি থেকেই তাঁর প্রথম উপন্যাসের সূত্রপাত। তার পর থেকে উনি ঐ তারিখে নতুন লেখা শুরু করেন - এরকম পড়েছি।

না আমার লেখালেখির সেরকম কোনো প্রিয় দিন, তারিখ, মাস নেই।


সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী:
সচরাচর পাঠের জন্য আপনি কী ধরণের বই নির্বাচন করেন?

ইন্দ্রাণী দত্ত:
মুডের ওপর অনেকটাই নির্ভর করে। তবে ভালো থ্রিলার সব সময় পড়তে চাইব।
 

সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী:

ভ্রমণের সময় বই পড়তে পছন্দ করেন? কোন ধরণের বই আপনার ভ্রমণ সঙ্গী হয়?

ইন্দ্রাণী দত্ত:

খুব বেশি ভ্রমণ করি তা নয়। যে টুকু করি, চোখ কান খোলা রাখার চেষ্টা করি। নোট নি, ছবি তুলি। আর আমার একটা রোগ আছে- চলন্ত বাহনে বসার আসন পেলেই ঘুমিয়ে পড়ি। বই পড়া খুব প্রেফার করি না। পড়লে পত্রিকা জাতীয় কিছু। 

সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী:

একজন লেখকের প্রচুর প্রচার-প্রচারণার দিকটি লেখালেখির জন্য ক্ষতিকর ভাবেন?

ইন্দ্রাণী দত্ত:

আমি শুধুই আমার কথা বলতে পারি। আমার লেখার কথা সেরকম কেউ জানেন না। কিন্তু যদি এমন হয়, মানে কল্পনা করি যদি, হঠাৎ ঘুম থেকে উঠে সবাই আমার লেখা পড়তে শুরু করে দিয়েছেন, লেখার প্রচুর কাটতি, প্রকাশক, সম্পাদক সবাই আমার লেখা চাইছেন ইত্যাদি।

তো, এই খানে তিনটে অপশন আমার। এক, চাকরি ছেড়ে দিয়ে ফুলটাইম লেখক হয়ে যাব এবং চাইলেই লিখতে বসব, হু হু করে লিখব, যে কোয়ালিটির লেখাই হোক, প্রকাশের জন্য নির্দ্বিধায় জমা দেব। অপশন দুই, চাকরি ছেড়ে ফুল টাইম লেখক হব, অনেক বেশি পড়ব, লিখব, কিন্তু চাইলেই লেখা দেব না বা লেখার কোয়ালিটি মেন্টেন করব। অপশন তিন, যেমন আছি তেমনই থাকব। প্রচার প্রচারণাকে মায়া ভাবব। চাকরি ছাড়ব না। এখন যেমন অল্প লিখি তেমনই লিখব।

এইবারে কোন অপশন নেব তার ওপর নির্ভর করছে ক্ষতি অক্ষতি।
অর্থাৎ, প্রচার হলেই তা ক্ষতিকর তা নয়। লেখক ব্যাপারটা কী ভাবে নেবেন, তার ওপরেই সব নির্ভর করছে।

সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী:

পাঠকই একজন লেখকের সেরা পুরস্কার। তার বাইরে লেখালিখির স্বীকৃতি হিসেবে পুরস্কার প্রাপ্তির আকাঙক্ষা একজন লেখকের ভেতর থাকাটা অস্বাভাবিক নয়। এই প্রাপ্তিকে অনুপ্রেরণা কিংবা বাড়তি দায়িত্ব হিসেবে মনে করেন কী?

ইন্দ্রাণী দত্ত:

না অস্বাভাবিক নয় একেবারেই। পুরস্কার লিখবার অনুপ্ররণা দেয় কী না বলতে পারব না, তবে গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কার প্রাপ্তি লেখকের দায়িত্ব বাড়িয়ে দেয় বলেই মনে করি। সেটা ভালো না খারাপ হয় লেখকের জন্য -তা জানি না। লেখক যদি মনে করতে থাকেন, তাঁর হাতেই ভুবনের ভার, গোটা সাহিত্যজগত তাঁর মুখ চেয়ে- তাহলে তাঁর লেখায় সে চিন্তার প্রভাব কেমন ভাবে পড়বে কে জানে! 

সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী:
লেখালেখির জন্য আপনি নির্দিষ্ট কোনো রুটিন অনুসরণ করেন?

ইন্দ্রাণী দত্ত:

না। লেখা মাথায় এলে সময় খুঁজি লিখতে বসার। সময় না পেলে, নোট করে রাখি কী লিখব / প্রথম লাইন - এই সব। রুটিন করে বসলেই লেখা আসে তা নয়। বরং স্নান টান করে অফিস যাওয়ার মত একঘেয়ে হয়ে যায় ব্যাপারটা। এইটা আমার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। অনেকেই রুটিন করে লিখতে বসেন, লেখেন। সফল হন।

তবে, ইদানিং একটা ব্যাপার হয়েছে। উপন্যাসটি যেহেতু পর্বে পর্বে বেরোচ্ছে, লেখা আগে হয়ে গেলেও, পর্বগুলি ঘষা মাজা করে ফাইনাল ভারসান পাঠাই সপ্তাহের মাঝে- এই ব্যাপারটা নিয়ম করে করতে হচ্ছে।

সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী:
কোন সময়টিতে লিখতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন?

ইন্দ্রাণী দত্ত:

একটু নিরিবিলিতে লিখতে চাই। সকাল, দুপুর রাত বলে আলাদা করে কিছু নেই। সময়ের টানাটানিতে সেই রকম কোনো অপশনই নেই বলতে পারেন।

সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী:
কোন মাধ্যমে লেখালেখি করে আরাম পান: কাগজ , পেন্সিল- কলম, নাকি কম্পিউটারে?

ইন্দ্রাণী দত্ত:

লেখালেখি শুরু করেছিলাম বাংলা লাইভে প্রবাসীর পত্র আর গুরুচণ্ডা৯র বুলবুলভাজা দিয়ে। সেই সময় চাকরি সূত্রে ইন্টারসিটি ধরে লম্বা পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। ভারি ল্যাপটপ ছিল। ল্যাপটপ ক্যারি করতাম না। ঐ সময়, কাগজ কলমে লিখে রাখতাম ট্রেনে বসে। বাড়ি এসে টাইপ করতাম ল্যাপটপে, তারপর মেইল করে পাঠিয়ে দিতাম। সেই ব্যাপারটা দীর্ঘদিন চলেছে।

গল্প লেখা যখন শুরু করলাম, গোড়ার দিকে একই প্র‌্যাকটিস ছিল, তারপর দেখলাম, এভাবে ঠিক হচ্ছে না, ফ্লো আসছিল না । সময়ও নষ্ট হয় অনেক। তখন নোট রাখতাম কিন্তু লিখতাম না। সরাসরি ল্যাপটপে লিখতে শুরু করলাম। এখন আর কাগজ কলমে গোটা একটা লেখা লিখতেই পারব না। অভ্যাস আর কী। ল্যাপটপ কেড়ে নিলে, কাগজ কলমেই লিখব- না লিখে থাকা সম্ভব হবে না। 

সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী:

আপনার গল্প নিয়ে লিখিত পাঠপ্রতিক্রিয়া কি আপনি পড়েন? আলোচনার ইতিবাচক- নেতিবাচক বক্তব্যকে কতটা গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করেন?

ইন্দ্রাণী দত্ত:

লেখা শুরুর প্রথম দিকে, বয়স কম ছিল, লেখা নিয়ে কে কী বলছেন, জানার আগ্রহ ছিল খুব। কোনো প্রতিক্রিয়া না এলে হতাশ হতাম।

বয়স বাড়ে। অভিজ্ঞতা বাড়ে- লেখালেখি ছাড়াও মনুষ্য চরিত্র বিষয়ে। লেখা নিয়ে সিরিয়াসও হয়ে পড়ি- একটা সময়ের পর থেকে লেখা যেন সাধনার বিষয় হয়ে যায়। লেখার দোষত্রুটি নিজেই বুঝতে পারি। তখন থেকেই পাঠপ্রতিক্রিয়া পড়লেও ( ইতিবাচক, নেতিবাচক দুইই) মনে দাগ কাটে নি সেভাবে । যেহেতু লেখালেখি মূলত নেটজগতে, লেখার তলায় প্রতিক্রিয়া এলে আজকাল নোটিফিকেশন আসে। পড়েও আসি কে কী বললেন- কিন্তু নির্লিপ্তভাব এসেছে পাঠপ্রতিক্রিয়া নিয়ে।

ব্যক্তিগত বিদ্বেষহীন নেতিবাচক আলোচনা গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করতে আমার অসুবিধে হয় না, নিজেও জানি কী ত্রুটি আছে। এর আগে একটি প্রশ্নের উত্তরে অরফ্যানগঞ্জ রিরাইট করার কথা বলেছি। সেই চিন্তা কিন্তু মূলত এসেছে দুটি খানিক নেতিবাচক পাঠপ্রতিক্রিয়া থেকে। আমি এই দুজন পাঠকের মত পড়েছি, চিন্তা করেছি, সঠিক মনে হয়েছে বহুলাংশে।

সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী:

নিজের লেখার দীর্ঘজীবনের পূর্বাভাস কি লেখক সাহিত্যিকের কাছে ধরা দেয়? এ বিষয়ে আপনার কী বক্তব্য?

ইন্দ্রাণী দত্ত:

কবিরা অতীতে অনেকেই লিখেছেন এ নিয়ে। শেকসপীয়ারের লাইন আছে সম্ভবতঃ “সো লং অ্যাজ মেন ক্যান ব্রীদ, অর আইজ ক্যান সী, সো লং লিভস দিস, অ্যান্ড দিস গিভস লাইফ তো দী।" মিলটন এ'রকম লিখেছিলেনঃ " বাই লেবার অ্যান্ড স্টাডি, আই মাইট পারহ্যাপস লীভ সামথিং সো রীটেন টু আফটারটাইমস অ্যাজ দে শুড নট উইলিংলি লেট ইট ডাই।" রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, “জীবনের আশি বছর অবধি চাষ করেছি অনেক। সব ফসলই যে মরাইতে জমা হবে তা বলতে পারি না। কিছু ইঁদুরে খাবে, তবু বাকি থাকবে কিছু। জোর করে বলা যায় না, যুগ বদলায়, তার সঙ্গে তো সবকিছু বদলায়। তবে সবচেয়ে স্থায়ী আমার গান, এটা জোর করে বলতে পারি। বিশেষ করে বাঙালীরা, শোকে দুঃখে সুখে আনন্দে আমার গান না গেয়ে তাদের উপায় নেই। যুগে যুগে এ গান তাদের গাইতেই হবে। ”

আমি তুচ্ছ মানুষ। নিজের লেখা নিয়ে ভবিষ্যৎবাণী করার জায়গাতেই নেই।

সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী:

অভিনেতা-অভিনেত্রীদের ‘ড্রিম রোল’ বিষয়ে প্রায় বলতে শুনি। একজন লেখকের মনেও সেরকম কাঙ্ক্ষা থাকে হয়ত– বিশেষ কোন বিষয়, ব্যক্তি, ইতিহাসের ঘটনা ইত্যাদি নিয়ে লেখার স্বপ্ন দেখা। আপনার সেরকম কোনো ভাবনা আছে কী?

ইন্দ্রাণী দত্ত:

অভিনেতা অভিনেত্রী শুধু নয়- সব মানুষেরই জীবন, পেশা, নেশা বিষয়ে স্বপ্ন থাকে- ড্রীম জব কথাটা প্রায়শই শোনা যায়। খুব সম্ভব , এই ড্রীম শব্দের সঙ্গে সাফল্যের একটা সংযোগ থাকে। সাফল্য বলতে জনপ্রিয়তা, পুরস্কার, অর্থ- এই সব।

লেখকের স্বপ্ন আলাদা- তিনি এমন লেখা লিখতে চান যা ইতিপূর্বে কেউ লেখেন নি- সে লেখা জনপ্রিয় হবে কী হবে না , লিখবার সময়, সে সব তাঁর মনে থাকবে না। তিনি লিখবেন, নিজেরই মনঃপূত হবে না, হয়ত ছিঁড়ে ফেলবেন, আবার লিখবেন।

আমিও এমন লেখা লিখতে চাই। তবে এর জন্য পুরো সময় লেখায় দিতে হবে। বিশেষ কোন বিষয়, ব্যক্তি, ইতিহাসের ঘটনা ইত্যাদি নিয়ে লেখার কথা ভাবি নি। আসলে, অল্প বয়স থেকে অমর মিত্রের একটা লাইন পকেটে নিয়ে ঘুরি- শূন্য থেকে যাত্রা। অনুভূতি থেকে শুরু হয়, পরে তা বিষয় হয়ে যায়। এই উপন্যাস শুরুর কথা জেনে অনেকেই জিগ্যেস করেছিলেন কী নিয়ে লিখছি। কিছু নিয়ে নয়,শূন্য থেকে কিছু হয়ে উঠবে এই আশাতেই কলম নিয়ে বসি।

সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী:

'সমরেশের জীবনদেবতা' আপনার উল্লেখযোগ্য শক্তিশালী গল্পের একটি। এ গল্প লেখার ভাবনা আপনার মধ্যে কীভাবে অঙ্কুরিত হয়? 

ইন্দ্রাণী দত্ত:

১৯৯৩ এ র ৩০ শে মে আনন্দবাজার পত্রিকায় শ্রী পীযুষকান্তি নন্দীর একটি প্রতিবেদন বেরোয়-" যে গ্রামের মানুষ যখন তখন মরতে যান"। পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার এক গ্রামের কথা ছিল সেই প্রতিবেদনে। আত্মহত্যাপ্রবণ এক গ্রাম, শুধু গ্রাম নয়, গোটা একটা ব্লকই যেন আত্মহত্যাপ্রবণ । আপাতদৃষ্টিতে আত্মহত্যার কারণ অভাব, না খেতে পাওয়া নয়। মানুষ বিষাদে ভোগেন। খুব ইন্টারেস্টিং লেগেছিল অল্পবয়সে।

তো যাই হোক, ২০১১ নাগাদ, গুরুচণ্ডা৯ সাইটে অনলাইন আলোচনা চলছিল আত্মহত্যার কারণ , অকারণ নিয়ে। তখন এই প্রতিবেদনের কথা স্মরণে আসে। হাতের কাছে অবশ্যই অতদিন আগের সংবাদপত্র ছিল না। খোঁজ করে কাটিং জোগাড় করি, প্রতিবেদকের সঙ্গেও পরোক্ষে যোগাযোগ করে সে গ্রাম সম্বন্ধে জানতে চাই। তিনি আর খোঁজ রাখেন না - জানান।

তখন ঠিক করি নিজেই যাব সেই গ্রামে। বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে সে গ্রামে যাই শীতের ছুটিতে বাড়ি গিয়ে- ২০১২ সালের পয়লা জানুয়ারি। ঘুরে ঘুরে দেখি, কথা বলি, ফিরে গিয়ে গুরুচ্ণ্ডা৯ সাইটে ঐ আলোচনার লিংকেই প্রতিবেদন গোছের লিখি। সেই সময় একজন বলেন- এই নিয়ে গল্প লিখতে। গল্প লিখব ইচ্ছে ছিলই কিন্তু প্রয়োজনীয় আবেগ আসে নি -তাগিদ আসে নি ভেতর থেকে ইতিমধ্যে ২০১২ তেই মা মারা যান। আমার ভেতরে বিরাট একটা তোলপাড় ঘটে যায় নানাভাবে। লেখার ব্যাপারে অসম্ভব সিরিয়াস হয়ে উঠি। ২০১৩ নাগাদ ভেতর থেকে তাগিদ আসে- সমরেশের জীবনদেবতা লেখা হয়ে যায়- ঐ আত্মহত্যাপ্রবণ গ্রামটি, একজন লেখক হয়ে উঠতে চাওয়া মানুষের একাকীত্ব- সব মিলিয়ে লেখা আর কী-

সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী:

সাহিত্যে ছোট্টো একটি ঘটনা যেভাবে পুরো একটি চরিত্র কিংবা সম্পূর্ণ একটি গল্পে পরিণত হয়, সে ব্যাপারটি লেখালেখির এক আকর্ষণীয় দিক। হয়ে ওঠার এই প্রক্রিয়া সম্বন্ধে কিছু বলবেন?

ইন্দ্রাণী দত্ত:
দুজন বিখ্যাত লেখকের বক্তব্য কোট করি।

বিপুল দাস বলেন, 'প্রত্যেক মানুষই দ্রষ্টা। কিন্তু লেখক, তিনি যেমনই লিখুন, দ্রষ্টার সংজ্ঞা পার হয়ে স্রষ্টার ভূমিকায় আসেন শুধুমাত্র ঐ বীজবপন করার ক্ষমতার ফলে। যে সমাজে লেখকের শেকড়, যে বাতাসে তার রেসপিরেশন, সেই মাটির গর্ভে চলে যায় তার বোধের শেকড়। দু চোখ দু কান দিয়ে শুষে নেওয়া এইসব উপাদান ...রক্তের ভেতরে ঘোরাফেরা করে। গোপনে একটি বীজের জন্ম হতে থাকে। সৃষ্টির জন্য একটা প্যাশন কাজ করতে শুরু করে। একটি শায়ক তৈরি হয়। তারপর অপেক্ষা। বাসের ভেতরে দেখা কোনো ঘটনা, ট্রেনের জানলা দিয়ে দেখা একঝলক কোনো দৃশ্য, অথবা খবরের কাগজে পড়া কোনো খবর হঠাৎ মগজে আলোড়ন তোলে। সেই বীজের ঘুম ভাঙে। বিদ্ধ করবে বলে তার গমন শুরু হয়।'... 'এরপর লেখকের কেরামতি। বাক্যবিন্যাস, শব্দচয়ন, ফর্মের চতুরালি। ভ্রূণের হাত পা গজায়। জীবনবোধের জিন ঠিক করে সেই গল্পের চোখের রং, চুলের বৈশিষ্ট্য, সেই গল্পের মেজাজ.... আস্তে আস্তে একমেটে হয়, দোমেটে হয়... ডাকের সাজ ও গর্জনতেলে একটি সার্থক গল্প ঝলমল করে ওঠে।'

অমর মিত্র বলেন, 'বিষয় নিয়ে ও তো লিখি না। লেখার পরে তা হয়তো বিষয় হয়ে যায়। লেখার আগে তা তো থাকে সামান্য বেদনার অনুভূতি। হয়তো কিছুই না। শূন্য থেকে যাত্রা। খরাদীর্ণ মাটিতে অবিরাম কর্ষণ আর আকাশমুখী হওয়া, যদি মেঘ আসে,ফসল হবে। আমি সর্বক্ষণ মেঘের আশায় থাকি।'

দেখুন, দৃশ্য হোক, শব্দ হোক বা সংবাদপত্রের প্রতিবেদন - এসবই বীজ বা উপাদান। তার সঙ্গে একটা অনুভূতি। এটা একটা গল্পের স্টার্টিং পয়েন্ট হতে পারে নাও হতে পারে। হয়তো নোটবুকে টুকে রাখা জাস্ট একটা লাইন থেকে গল্প শুরু করলাম, বেশ ক লাইন লিখলাম, লেখা তখনও কোনো অভিমুখই নেয় নি, দুম করে একটা দৃশ্য, শব্দ আর তার সঙ্গে আবছা অনুভূতি মনে পড়ে গেল, যা নোটবুকে টোকা নেই- গল্পটা অভিমুখ নিয়ে নিল এই নোটবুক বহির্ভূত উপাদান দিয়ে। কী করে এটা হয় আমি জানি না- মস্তিষ্কে কী কাজ চলে , নিউরনরা কোন সিগন্যাল বহন করে সেই মুহূর্তে আমি জানি না- তবে ঐ মুহূর্তগুলো যেন হঠাৎ হাওয়ায় ভেসে আসা ধন। মাঝে মাঝে এক একটা বীজ যেমন উড়ে আসে। লিখিয়ে নেয়। একটা গন্ধ- রঙের গন্ধ হয়তো বা দুধ ওথলানোর - বীজ হয়ে এলো। অথবা একটা দৃশ্য-একটা পিঁপড়ে-কালো পিঁপড়ে একটা-কালো পিঁপড়ে ঘাসজমি পেরিয়ে আসছে-একটি দুটি ড্যান্ডেলায়ন, সিগারেটের খালি প্যাকেট, কোকের তোবড়ানো ক্যান পার হয়ে সে আসছিল-ঘাসজমি পেরিয়ে কার্ব বেয়ে রাস্তায় নামছিল। অথবা একটি পূর্ণ জলপাত্র, তলায় নীলচে বেগুণী নুড়ি। নুড়ি ছুঁয়ে উঠে আসছে -সাঁতার দিচ্ছে ওপর থেকে নীচ-নীচ থেকে ওপর- সিয়ামিজ ফাইটার- নিজের প্রতিবিম্বের সঙ্গে লড়ছে। কিম্বা দেওয়াল জুড়ে গ্রাফিতি-বেগুণি সবুজ লাল কালো তীক্ষ্ণ তির্যক অক্ষরমালা। অজস্র যৌন শব্দের মাঝে লেখা ছিল ডেভিড ওয়াজ হিয়ার-পাশে আঁকা নীল সফেন সমুদ্র-তার নিচে কালো কালিতে খুলি হাড়গোড়। এই সব বীজ ছিল। হয়তো ট্রাফিক লাইটে দাঁড়িয়ে আছি, দেখলাম একটা হলুদ বেলুন ভেসে ভেসে রাস্তা পেরোলো। অথবা একটি শবদেহ -শিশুর শব - গোলাপি টুপি গোলাপি সোয়েটার। চরাচর ভেসে যাওয়া জ্যোৎস্নায় ফলন্ত লেবুগাছ, ঝমঝম করে পিয়ানো বাজছে কোথাও-ফুটপাথে ডাঁই করা পুরোনো আসবাব, ল্যাম্পশেড, কীটদষ্ট বই-কে যেন চলে যাবে এই জ্যোৎস্নায়। কিম্বা এক প্রাচীন জলাশয়। সে জলাশয়ের পাশে সারিন্দা বাজে-ভোরে, সন্ধ্যায়। সদ্য আলো ফোটা আকাশ অথবা উল্টোটা -আলো নিভে আসছে , তারা ফুটছে। এক আকাশ পাখি। বাসায় ফেরা ডানার শব্দের নিচে আবৃতমুখ সে কোন বৃদ্ধ সারিন্দা বাজিয়ে চলেছে-কেশরুয়া বালমা... এই সব ছবি, ঘটনা আমাকে লিখতে বলে। যেন আবছা একটা নকশা দেখায় - যা সল্ভ করতে পারলে, বা এই থাম্বনেল কানেক্ট করতে পারলেই সেই আখ্যান রচিত হবে। এই সব বীজ - কোথাও রোপণ করার থাকে- মেলানোর থাকে-

কখনও পেরেছি। কখনও পারিনি।

সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী:

নোবেল প্রাপ্ত জাপানি সাহিত্যিক কেনজাবুরো ওয়ে হই হট্টগোলেও স্বাচ্ছন্দ্যে লিখতে অভ্যস্ত। সাহিত্যিক কুলদা রায় সঙ্গীত শুনতে শুনতে লিখতে পছন্দ করেন। রবিশঙ্কর বলেরও এই অভ্যেস ছিল। অনেক লেখক আবার নিরিবিলিতে লিখতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। আপনি কেমন পরিবেশে লিখে আরাম পান?

ইন্দ্রাণী দত্ত:

আমার একটু নিরিবিলি হলেই চলে যায়। গান শুনতে শুনতে অঙ্ক করার , পড়াশোনা করার অভ্যেস সেই ছোটোবেলার। সেটা রয়ে গেছে । গান শুনতে শুনতে লিখি- তবে গল্পের ক্রিটিকাল মুহূর্তে গান বন্ধ করে দি, নইলে গল্পের ভিতরে ঢুকতে পারি না। অনেক সময় মুড আনার জন্য গান শুনি। শুধু গান নয়, যন্ত্রসঙ্গীত, এমনকি স্তোত্রপাঠ শুনি। আমি ধার্মিক মানুষ নই। এর সঙ্গে ধর্মের কোনো যোগ নেই। কিন্তু মুড তৈরি করতে কাজ দেয়। ভোর চারটেয় মশারির তলায় শুয়ে আধো ঘুমে রেডিওতে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের চণ্ডীপাঠ শোনার সঙ্গে অনেক আবেগ, অজস্র স্মৃতি জড়িয়ে- চণ্ডীপাঠের একটা জায়গায়- বিমানে বিমানে গানের ঠিক আগে অনেকখানি চণ্ডীপাঠ আছে- সেখানে নারায়ণীর বিশ্বজোড়া রূপ বর্ণনা করতে গিয়ে বীরেন্দ্রকৃষ্ণর গলা কান্নায় বুজে আসে, তারপর দেবী প্রসীদ পরিপালয় বলতে গিয়ে কেঁদে ফেলেন। ঐ ব্রাহ্মমুহূর্ত, আধোঘুম, আধোঘুমে বিশ্বাস অবিশ্বাসের দড়ির ব্যালান্সের খেলা, কেঁদে ওঠার মোমেন্টটা- সাঙ্ঘাতিকএফেক্ট হয়। নিজের মধ্যে থেকে অন্য একটা আমি বেরিয়ে আসে-যাকে আমি আগে দেখি নি, আর দেখবও না। ঐ টা লেখার সময়। তো, উপন্যাস শুরু করার আগে টানা মহালয়া শুনেছি ফেব্রুয়ারি মাসে। 

সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী:
একজন বিজ্ঞানী হিসেবে লেখালেখির কাজকে কতটা শ্রমসাধ্য মনে হয়?

ইন্দ্রাণী দত্ত:

আমি বহুদিন যাবৎ করপোরেট জগতে - সবই কমারশিয়াল কাজকর্ম। কতটা নিজেকে বিজ্ঞানী বলব, কতটা বিজ্ঞানকর্মী- সংশয় হয়। সে অন্য কথা, অন্য গল্প।

আমাদের ল্যাবের কাজের পাশে লেখালেখির বিরাট ভূমিকা আছে। দিস্তা দিস্তা রিপোর্ট, প্রোপোজাল, প্রগ্রেস নোট লিখতে হয়। খুব থরো লেখা। সেই সবের জন্য মাথার, মনের আলাদা টিউনিং - সমস্ত দিন সেই সব করে এসে হয়ত রাতে উপন্যাসের কিস্তির এডিট করতে হবে- শনিবার এসে যাচ্ছে- এই ব্যাপারটা তো ইদানিং ঘনঘনই হচ্ছে- তাই উপন্যাসের উদাহরণ দিলাম।

টিউনিং চেঞ্জ করে লিখতে বসা শরীর মনে কখনও কখনও চাপ ফেলেছে। 

সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী:
এ পর্যন্ত কোন গল্পটি লিখে লেখক হিসেবে শতভাগ তৃপ্তি পেয়েছেন?

ইন্দ্রাণী দত্ত:
শতভাগ তৃপ্তি পাই নি । এখনও কিছুই হয় নি।

"আমার লাগে নাই সে সুর/ আমার বাঁধে নাই সে কথা/ ... আজো ফোটে নাই সে ফুল/ শুধু বহেছে এক হাওয়া।"

সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী:
নিজেকে ডায়াসপোরা সাহিত্যিক ভাবতে পছন্দ করেন?

ইন্দ্রাণী দত্ত:

না। শারীরিকভাবে দেশের বাইরে থাকি (আমি এখনও ভারতের নাগরিক, নাগরিকত্ব ত্যাগ করি নি), সেখান থেকেই লিখি কিন্তু আমার লেখা ডায়াস্পোরিক লিটারেচর (আদৌ লিটরেচর কী না তাও জানি না) বলতে যা বোঝায় তা নয়। বিচ্ছিন্নতা বোধ আছে গল্পে কিন্তু সেই অর্থে ডায়াস্পোরিক লিটরেচরের যে বৈশিষ্ট্যগুলি - , শিকড়হীনতা, শিকড় বসানো, অনভ্যাসের মাটি, নস্টালজিয়া, আত্মপরিচয়ের সন্ধান ইত্যাদি আমার লেখায় নেই- নিরবচ্ছিন্ন ভাবে আসে নি, আসবেও না -মনে করি। কারণ আমার মন , আমার হৃদয় ভারতে বাস করে।

সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী:

একটা গল্প শেষ করে আপনি কি খুশি হতে পারেন না আপনাকে বারবার সেই গল্পে ফিরে যেতে হয় মনের মতো গড়ে তোলার জন্য?

ইন্দ্রাণী দত্ত: 

শেষ করেই খুশি হই না। বহু সময় লাগে এডিট করতে। বারবার ফিরি। 'কাটাকুটি ও সংশোধন' চলতেই থাকে। একটা সময় থামতেই হয়।কিছু গল্প এর ব্যতিক্রম ছিল। একটানেই ঠিকঠাক লিখে গেছি। তবে এই যে খুশি , আনন্দ লেখা শেষের পরে (মানে ফাইনাল এডিট করার পরে) -এ তাৎক্ষণিক খুশি। সেই লেখাই যখন প্রকাশিত হয়- তার দিকে তাকাতে পারি না। অসহ্য রকম খারাপ লেখা মনে হয়। একজন অভিনেতার কথা শুনেছিলাম- নিজের অভিনীত ছবি হলে বসে দেখতে পারতেন না। সেই রকম হয় আমার।

সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী:
পাঠকের ভালো লাগবে কি না সেই ভাবনা লেখার সময় মাথায় থাকে?

ইন্দ্রাণী দত্ত:

কমিউনিকেট করার জন্য লেখা। আমি কমিউনিকেট করতে চাই। শব্দ ব্যবহার , কম্পোজিশন ইত্যাদি ব্যাপারে এজন্য খুঁতখুঁতে ঠিকই কিন্তু সত্যি কথা বলতে কী, পাঠকের ভালো লাগবে কী না সেই ভাবনা লেখার সময় একেবারেই মাথায় থাকে না।

সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী:

গল্প নিয়ে কখনও কোনো ধরণের নিরীক্ষা করতে চেয়েছেন?

ইন্দ্রাণী দত্ত:

না। ভেবে চিন্তে নিরীক্ষা করি নি এখনও। ইচ্ছে আছে। সময় নিয়ে কিছু নিরীক্ষার কথা ভাবি। সদর স্ট্রীট জার্নাল গল্পে সেই সব চিন্তার সামান্য আভাস দিয়েছিলাম।

আর ক্রিস্টোফার নোলানের সিনেমার আমি বড় ভক্ত। ওঁর সিনেমায় সময় নিয়ে খেলা দেখি। ধরুন, ওঁর মেমেন্টো মুভিতে দুটো ভিন্ন সিকোয়েন্সের সিরিজ ছিল- একটা সাদা কালো যেটা ক্রোনোলোজিকালি ঘটছে, অন্যটা রঙীন যেটা রিভার্স অর্ডারে । এই দুটো সিরিজ শেষে মিলে যাচ্ছে- এই ব্যাপারটা লেখায় আনার কথা ভাবি।

আমি প্রচুর থ্রিলার পড়ি বলেছি আগে- কয়েকটি থ্রিলারে এই সময় নিয়ে চমৎকার খেলা দেখেছি। ব্ল্যাক ওয়াটার লিলিজ তার অন্যতম। এই ধরণের লেখা বাংলায় দেখি নি। হয়ত হয়েছে। আমি পড়ি নি।

সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী:

আপনি থ্রিলারের ভক্তপাঠক-দর্শক। লেখক হিসেবে থ্রিলার গল্প/উপন্যাস লেখার পরিকল্পনা আছে?

ইন্দ্রাণী দত্ত:

থ্রিলার লিখতে অনেক পরিকল্পনার প্রয়োজন। শূন্য থেকে যাত্রার ফ্যান যে লেখক, সে কোনদিন থ্রিলার লিখে উঠতে পারবে কী না সন্দেহ। তবে থ্রিলার তো নানারকম হয়। (এই খানে কালোচশমা পরে মুচকি হাসির ইমোজি দিলাম)।

সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী:

সোশ্যাল মিডিয়া অর্থাৎ ফেসবুক, টুইটার, ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউব লেখক- পাঠকের মিথস্ক্রিয়া এবং পাঠক বা ফ্যান-ফলোয়ার তৈরির কার্যকরী এক মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত। আপনি এই মাধ্যমগুলোতে একদমই সক্রিয় নন। এতে করে আপনার কী মনে হয় না আরো অনেক পাঠকের কাছে পৌঁছোনোর সুযোগ আপনার হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে?

ইন্দ্রাণী দত্ত:

আমি হোয়াটস অ্যাপে আছি- আত্মীস্বজন, বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে। লিখি মূলত ওয়েবজিনে- যেখানে পাঠকের সঙ্গে ইন্ট্যার‍্যাকশনের সুযোগ থাকে। কাজেই একদম নিষ্ক্রিয় -তা নয়।

টুইটার ইনস্টাগ্রামে আমি কোনদিনই ছিলাম না। ২০১২ অবধি ফেসবুকে ছিলাম। লেখা নিয়ে সিরিয়াস হওয়ার পরই ফেসবুক থেকে সরে আসি। আমার মনে হচ্ছিল- অনেক দেরিতে নিজেকে চিনেছি, হাতে কতটুকু সময় আছে কে জানে, আমাকে প্রায়োরিটি বেছে নিতে হবে। ফেসবুকে সেই সময় ঐ লাইক কালচার , ভীড় ভাট্টা, কলরব আমার ভালো লাগত না, তবু ছিলাম ঐ আত্মীস্বজনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে- দূরে থাকার জন্য অনেকেই চাইতেন ফেসবুকে যোগাযোগ রাখতে। সেই যোগাযোগ এখন হোয়াট্সয়াপে হয়- ছবি টবি সবই সহজে শেয়ার করা যায়। ফেসবুকের দরকার পড়ে না।

ইউটিউবে আমার কোনো চ্যানেল নেই। তবে সম্প্রতি গুরুচণ্ডা৯র ইউ টিউব চ্যানেলের জন্য লেখক বিপুল দাসের ইন্টারভিউ নিয়েছিলাম। ভালো লেগেছে। আবার অনুরোধ এলে, আবার ইন্টারভিউ নেব অন্য কোনো লেখকের।

তো, আপনি বলছেন সোশ্যাল মিডিয়ায় সক্রিয় হলে,আমি আরো অনেক পাঠকের কাছে পৌঁছতে পারতাম। ধরুন আমি লিখলাম কোনো পত্রিকায় বা ওয়েবজিনে। যেখানে লিখলাম, তার একটা নির্দিষ্ট রীডারশিপ রয়েছে। অর্থাৎ, কেবল সেখানে লিখলে এবং ব্যক্তিগত উদ্যোগে সোশ্যাল মিডিয়ায় সে লেখার প্রচার না করলে, আমি ঐ সংখ্যক পাঠকের বাইরে যেতে পারছি না। সত্য। কিন্তু একই সঙ্গে ঐ পত্রিকার বা ওয়েবজিনের প্রকাশক/ সম্পাদকীয় টীম এবং ঐ রীডারবেসের বড় অংশ সোশ্যাল মিডিয়ায় রয়েছেন। লেখা যদি ভালো হয়, লেখা যদি তাঁরা আরো অনেককে পড়াতে চান, তবে তাঁরাই তো প্রচার করবেন সোশ্যাল মিডিয়ায় । একদিকে একা লেখক, অন্যদিকে পাঠক, সম্পাদক, প্রকাশক ইত্যাদি- অঙ্কের হিসেবমত ,প্রচারের বিস্তার অন্য দিক থেকেই বেশি হওয়ার কথা -তাই না?

এখানে আরো দুটো কথা উঠে আসে। নিজের লেখার প্রচার করা কী লেখকের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে? আমি জানি না।
দ্বিতীয় কথা, ভালো লেখার প্রচার করা পাঠক, প্রকাশক, সম্পাদকের দায়িত্ব নয়?

এই কথাগুলো বলছি, লেখা ভালো এইটা স্বতঃসিদ্ধ ধরে। যেহেতু প্রচার সেভাবে হচ্ছে না, ধরে নেওয়া যায় স্বতঃসিদ্ধটি ভুল। লেখা সেভাবে পাঠককে ছোঁয় না, তিনি প্রচারও করেন না।

ইদানিং, লেখার নিচে কতজন পড়লেন, ফেসবুকে কতবার শেয়ার হল এই সব পরিসংখ্যান দেখা যায়। শেয়ার তো হয়- তবে তাঁরা কজন আমার মাসি পিসি ভাই বোন বন্ধু- আমি জানি না। শেয়ারের সংখ্যা যথেষ্ট কীনা তাও বুঝি না।নিজের লেখার পরিসংখ্যান দেখলে ব্যাপারটা বোঝা যাবে না, অন্যান্য লেখকের পরিসংখ্যান দেখে তুলনা করতে হবে। এ'সব করি নি কোনদিন। প্রশ্নই ওঠে না । সে সময়ই নেই। তাহলে আর লিখব কখন?

আমার কথা হল- আরো ভালো লিখে যেতে হবে। গাভাসকারের মত। সেঞ্চুরি হ'ল কী অনেক রান, ঠিক আছে, কিন্তু মূল ফোকাস পরের বলে- পিচ ঠোকো, কাঁকর সরাও, স্টান্স নাও, অ্যান্ড কনসেন্ট্রেট.. 

সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী:

গল্পের ফর্ম এবং স্টাইলকে আপনি কী ভাবে দেখেন?

ইন্দ্রাণী দত্ত:

প্রথম কথা হল, গল্প লিখছি; আসরে বসে বলছি না, বা ফোন করে বন্ধুকে ' এদিকে হয়েছে কী " বলে গল্প ফাঁদছি না। গল্প লেখা আর বলার একটা পার্থক্য করার চেষ্টা করি। সেখানে শব্দ ব্যবহার, ভাষা , চিত্রকল্পর পাশে ফর্মের একটা ব্যাপার তো থাকেই। আমি কিছু পরীক্ষানিরীক্ষা করি নি ফর্ম নিয়ে- কিন্তু কম্পোজিশন , মুড ধরা - এইগুলো তো এসেইছে ফর্ম হিসেবে।

আর স্টাইল ব্যাপারটা খানিকটা সিগনেচারের মত। মলাট ছিঁড়ে দিলেও বোঝা যাবে কার লেখা। অবশ্য এটাও মাথায় রাখার- ম্যানারিজমে পর্যবসিত না হয় ব্যাপারটা। আমার ক্ষেত্রে মাঝে মাঝে ফীল করছি ম্যানারিজম আসছে। আরো সতর্ক থাকতে হবে।

অর্থাৎ বলতে চাইছি, আমার কাছে ফর্ম এবং স্টাইল সবটুকু নয়, কিন্তু যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ।

সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী:
চূড়ান্ত লেখাটি তৈরির আগে খসড়া লেখায় কতবার কাটা ছেঁড়া করেন?

ইন্দ্রাণী দত্ত:

অজস্রবার। ডেডলাইন না থাকলে কোনোদিন লেখা চূড়ান্ত করে উঠতেই পারব না। লেখা জমা দিয়েও , একবেলার মধ্যে অন্য ভারসন পাঠিয়েছি- এমনও হয়েছে।

এই যে উপন্যাসটা বেরোচ্ছে, এইটিও চূড়ান্ত বলে ভাবতে পারছি না। বেশ কয়েকটি জায়গা এডিট করতে হবে। নিখুঁত বলে আসলে কিছু তো হয় না- অলীকের পিছনে ধাওয়া করি-

সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী:
একটা গল্পের শুরু না শেষ কোনটা আপনাকে বেশি ভাবায়?

ইন্দ্রাণী দত্ত:

দুটিই। যেহেতু ছোটোগল্প, প্রথম লাইনে অনেক কিছু ধরতে হয়- মুড সেট করা, সরাসরি গল্পে যাওয়া এরকম অনেক কিছু থাকে কারণ পরিসর সীমিত। যুৎসই লাইন মাথায় না এলে লেখা শুরু করতে পারি না। লাইন এসে গেলে, লেখা আপনিই এগিয়ে চলে। সমাপ্তি ভাবায় তো বটেই কারণ তখন আমি পাঁচমাথা মোড়ে দাঁড়িয়ে- কোন রাস্তাটা বাছব?

সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী:

গল্পের বিষয়বস্তু আপনার গল্পের ভাষাকে প্রভাবিত করে?

ইন্দ্রাণী দত্ত:

হ্যাঁ। উদাহরণ দিয়েই বলিঃ
সাধুভাষায় একটি গল্প লিখেছিলাম- বকুলকথা- আগাগোড়া সাধুভাষা, শেষ প্যারায় গিয়ে ভাষা চলিত হয়ে যায় - একটি প্রাচীন বকুলগাছকে ঘিরে একটি পরিবারের মামুলি সুখ দুঃখের কথা, গল্পের শেষে বকুলগাছটি কাটা পড়ে, সেখানে বহুতল উঠবে। গল্প আগাগোড়া শুদ্ধভাষায়, গাছ কাটা পড়তেই চলিত ভাষায় যাই। শেষ প্যারার শেষ শব্দ সাধুঘেঁষা ছিল- সেও গল্পের প্রয়োজনেই।

আবার গতবছর, হরিণের কাছাকাছি বলে একটি গল্প লিখি- একটু ছাড়াছাড়া বাক্যগঠন, কাটাকাটা ভাব, কথা। গল্পের শুরুতেই বলা হয়েছে- একটি গল্প লেখার আয়োজন চলছে-ফলে গোটা গল্পটাই লিখেছিলাম খসড়ার মত করে।

আরো উদাহরণ দেওয়া যায়। কিন্তু এইটুকুই থাক। এও বেশিই বলা হল হয়ত।

সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী:

নিজের গল্প বাংলা ভাষার পাঠকবৃত্তের বাইরের পাঠকদের কাছে পৌঁছনোর জন্য অন্য ভাষায় অনুবাদের কোনো পরিকল্পনা আছে?

ইন্দ্রাণী দত্ত: 

আমার নিজস্ব কোনো পরিকল্পনা নেই কারণ এখনও বাংলাভাষী পাঠকদের কাছেই সেভাবে পৌঁছতে পারি নি। তবে, অ্যান্টোনিম নামে একটি ম্যাগাজিন এই নিয়ে কাজ করছেন- আমার একটি গল্পও তাঁরা অনুবাদ করে প্রকাশ করেছেন, তাঁদের অন্য পরিকল্পনাও রয়েছে আমার লেখা নিয়ে। অ্যান্টোনিমকে এই সুযোগে ধন্যবাদ জানাই।
 

সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী:

ইন্দ্রাণী দত্ত কেন লিখেন?

ইন্দ্রাণী দত্ত:

ছোটোবেলায় বোন আর আমি একটা খেলা খেলতাম। তখন বছরে অন্তত একটি সাহিত্য সংখ্যায় লেখকদের কথা প্রকাশিত হত- কী লিখি, কেন লিখি- এইরকম। তো, আমরা দুই বোন পাতা উল্টে উল্টে লেখকদের চেহারা ভঙ্গি , দু একটি কথা মুখস্ত করে ফেলতাম। তারপর খেলা শুরু হতঃ পরস্পরকে জিগ্যেস করতাম - মোটা ফ্রেমের চশমা, কলম কামড়াচ্ছেন, আকাশের দিকে তাকিয়ে- বলত কে?

তো, সেই খেলা খেলতে খেলতে সেই সময় নিজেকে একজন কলম কামড়ানো মোটা ফ্রেমের চশমা পরা চিন্তামগ্ন লেখক ভাবতে ভালো লাগত। কল্পনা করতাম, কোনদিন আমাকে কেউ জিগ্যেস করবেন- কেন লেখেন? শৈশব কাটতেই সেই কল্পনা বিদায় নেয়, বলাই বাহুল্য।

তো, দেখুন, আমার অবাক লাগতে শুরু করল, যখন দেখলাম, সম্পূর্ণ অচেনা পাঠক আমার লেখার এমন বিশ্লেষণ করেন যেন তিনি আমার মনের মধ্যে ঢুকে গেছেন। অচেনা শব্দে জোর দিতে চাইছি কারণ চেনা পাঠক অর্থাৎ বন্ধুরা তো আমাকে অনেকটাই জানেন, চেনেন; খুব ঘনিষ্ঠজনরা আমার লেখা নিয়ে ভাবনাচিন্তাও জানেন। কাজেই তাঁদের সঙ্গে কানেকশন তো হয়েই আছে। যখন দেখলাম, সম্পূর্ণ অচেনা মানুষের সঙ্গে শুধু অক্ষর আর শব্দ দিয়ে কানেকশন করতে পারছি, তখন শঙ্খ ঘোষের সেই বিখ্যাত বক্তৃতা 'অন্ধের স্পর্শের মত' মনে পড়ল। কলকাতার কার্জন পার্কে 'রক্তকরবী' অভিনয় হচ্ছিল। কুশীলবরা সকলেই অন্ধ। অভিনয় শেষে , তাঁরা দর্শকদের বলেছিলেন, " আপনারা যদি আমাদের সকলের হাতের ওপর একটু হাত ছুঁয়ে যান, আপনাদের ভালো লাগাটা আমাদের মধ্যে পৌঁছবে..."। তো, দর্শকরা তাই করেছিলেন। এই গল্পটি শেষ করে, শঙ্খ ঘোষ আশ্চর্য কয়েকটি বাক্য বলেন। "আমরা যখন সত্যিকারের সংযোগ চাই, আমরা যখন কথা বলি, আমরা ঠিক এমনই কিছু শব্দ খুঁজে নিতে চাই, এমনই কিছু কথা, যা অন্ধের স্পর্শের মতো একেবারে বুকের ভিতরে গিয়ে পৌঁছয়। পারি না হয়তো, কিন্তু খুঁজতে তবু হয়, সবসময়েই খুঁজে যেতে হয় শব্দের সেই অভ্যন্তরীণ স্পর্শ।" এই বাক্যগুলো আমার হয়ে গেছে অনেকদিন। বই এর ব্লার্বে , গল্পের শেষে নিজের পরিচিতিতে আমি বাক্যগুলি উদ্ধার করে থাকি। শেষ লাইনে যোগ করি "ইন্দ্রাণী খুঁজে চলেছেন।" এইটাই আপনার প্রশ্নের উত্তর হওয়া উচিত।

কিন্তু এই ২০২১ এর শেষ দিনে , আমার উত্তর শুধু এইটুকুতেই থেমে থাকছে না। আমি নিজেকে উল্টো প্রশ্ন করেছি বারবার " না লিখলে কী হয়?" এই মুহূর্তে যে উত্তর পাচ্ছি: লেখা আমার অস্তিত্বের অঙ্গ হয়ে গেছে। না লিখলে বাঁচব না।

সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী: 

আমাদের সময় দেবার জন্য গল্পপাঠের পক্ষ থেকে আপনাকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি।

ইন্দ্রাণী দত্ত:

আমার কথা শুনতে চেয়েছেন আপনারা। সম্মানিত, কৃতজ্ঞ বোধ করছি। ধন্যবাদ ও নমস্কার জানবেন। সেই সঙ্গে সেই সব পাঠক যাঁরা আমার লেখা পড়েন, তাঁদের নমস্কার।

----------------- 

 ইন্দ্রাণী দত্তের বানানরীতি অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।

৩টি মন্তব্য:

  1. লেখাটি ঠিক সাক্ষাৎকার নয়। একটি বিশ্বস্ত দলিল। একজন সংবেদনশীল মানুষ কীভাবে বা কেন অক্ষরের মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ করেন বা করতে চান। অক্ষরের পৃথিবী কীভাবে দাঁড়াবার জায়গা, নির্ভরতার নোঙর হয়ে ওঠে তা নিয়ে নিজের আয়নার সামনে নীরব কয়েক মুহূর্ত।

    ইন্দ্রাণী দীর্ঘদিন ধরেই আমার প্রিয় কথাকার। তাঁর এ বিষয়ে বক্তব্যের কিছুটা হয়তো জানতুম। কিন্তু অবশ্যই সমগ্রটা নয়। রাজমিস্ত্রির ইঁটজোড়ার পর্ব থেকে শুরু করে সৌধের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের বিস্ময়, সবারই নিজের কথা বলার থাকে। সেসব নিয়েই একজন লেখকের জন্ম বা বেড়ে ওঠা।


    সাধুবাদ রইলো সাক্ষাৎকার গ্রহণকারীর প্রতিও। একজন নৈঃশব্দ্যের শক্তিতে বিশ্বাসী মানুষের থেকে এতোগুলো শব্দ আদায় করে নেবার এলেম তিনি দেখাতে পেরেছেন। জয় হোক।

    উত্তরমুছুন
  2. অসাধারণ লেগেছে।
    ইন্দ্রাণী আমার অন্যতম প্রিয় লেখক। ওঁর 'পাড়াতুতো চাঁদ' গল্পসংগ্রহের পাঠ-প্রতিক্রিয়া লেখার প্রস্তাব ( গুরুচণ্ডালী কর্তৃপক্ষের থেকে) সানন্দে স্বীকার করেছিলাম। ভাবতাম --কখনও মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ হলে (আজও হয়নি) এক কাপ কফির আমন্ত্রণে তাঁকে খানিকক্ষণ আটকে রাখব একটি টেবিলে এবং একটু একটু করে জানার চেষ্টা করব তাঁর জাদুকলমের তন্ত্রমন্ত্রের অনুষ্ঠানের সাতকাহন। তৃণা নাহারের নেয়া ইন্টারভিউটি আমার সেই সাধ ষোলর জায়গায় আঠার আনা পুষিয়ে দিয়েছে।
    ধন্যবাদ।

    উত্তরমুছুন
  3. সাক্ষাৎকার টি খুব ভালো লাগলো। লেখিকা ও সাক্ষাৎকার গ্রহণ কারীকে আন্তরিক ধন্যবাদ।

    উত্তরমুছুন