বৃহস্পতিবার, ৬ জানুয়ারী, ২০২২

নাগিব মাহ্ফুজের দীর্ঘ সাক্ষাৎকার




ভাষান্তর – উৎপল দাশগুপ্ত

নাগিব মাহ্‌ফুজ তাঁর সাহিত্য জীবনের হাতেখড়ির কৃতিত্ব দিয়ে থাকেন হাফিজ় নাজিবকে, যাঁর পরিচয় একজন তস্কর, জেলঘুঘু, প্রখ্যাত পুলিশ বিদ্বেষী এবং বাইশটি গোয়েন্দা উপন্যাসের লেখক হিসেবে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক সহপাঠীর উপরোধে পড়ে, দশ বছর বয়সী মাহ্‌ফুজ নাজিবের “জনসন’স সান” বইটি পড়েন। মাহ্‌ফুজ় বলেন বইটি ওঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল।
পরবর্তীকালে মাহ্‌ফুজ অন্য বহু এবং বিভিন্ন ধারার সাহিত্য থেকে প্রেরণা লাভ করেন। উচ্চতর বিদ্যালয়ে তিনি তহা হুসেনের লেখার প্রতি আকৃষ্ট হন, যাঁর বৈপ্লবিক বিশ্লেষণমূলক রচনা ফিল-শি’র আল-জাহিরি ১৯২৬ সনে প্রকাশিত হবার সাথে সাথেই আশ-আরিৎ পন্থার অনুগামীদের মধ্যে প্রবল চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে। কলেজে পড়বার সময়ে, মাহ্‌ফুজ সালামা মুসা’র লেখা পড়েন, যিনি ‘আল-মজাল্লা আল-জাদিদা’ পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে মহফুজ়ের প্রথম উপন্যাস প্রকাশ করেন। মাহ্‌ফুজ বলেন, এঁর কাছে থেকেই তিনি ‘বিজ্ঞান, সমাজবাদ এবং সহিষ্ণুতায় বিশ্বাস রাখার’ শিক্ষা লাভ করেন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের বছরগুলোতে, মাহ্‌ফুজ তাঁর সমাজবাদী আদর্শ থেকে পিছু হটে গিয়ে তীব্র হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে গিয়েছিলেন। এই সময়, কায়রো’র জালা সেতু সন্নিকট এক লনে বসে তিনি সহযোগী লেখক বন্ধু আদিল কামাল এবং আহমদ জ়াকি মখলুফের সঙ্গে জীবন এবং সাহিত্যের উদ্দেশ্যহীনতা নিয়ে নানান হতাশকর আলোচনায় সিংহভাগ সময় অতিবাহিত করতেন। ওঁরা এই বৃত্তকে ‘অশুভ বৃত্ত’ নামে অভিহিত করতেন। পঞ্চাশের দশকে, বিজ্ঞানে আলোচনা না হওয়া বিভিন্ন আধ্যাত্মিক সমস্যাগুলোর পরীক্ষামূলকভাবে সুফি অতীন্দ্রীয়বাদের মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করতেন। এই সময়ে মাহ্‌ফুজ যে দর্শনে বিশ্বাস করতে শুরু করেন তাকে বলা যেতে পারে বৈজ্ঞানিক সমাজবাদের সঙ্গে আধ্যাত্মবাদী চিন্তাভাবনার মেলবন্ধন। ১৯৪৫-এ তিনি কথাসাহিত্যের সংজ্ঞা নির্ধারণে এই ধারণার সূচনা করেন ---উপন্যাস হল শিল্পায়নের সময়কে লিপিবদ্ধ করার কৌশল। প্রকৃত সত্য জানার জন্য মানুষের আবেগের সঙ্গে কল্পনার জগতের প্রতি মানুষের চিরন্তন প্রণয়ের সমন্বয়ের প্রতীক।

মহফুজের জন্ম কায়রোতে ১৯১১ সালে। লেখালেখির শুরু সতেরো বছর বয়স থেকে। এখন পর্যন্ত তিরিশটিরও বেশি উপন্যাস রচনা করেছেন। ষাট বছর বয়সে সিভিল সার্ভিস থেকে অবসরগ্রহণের আগে পর্যন্ত উনি রাতের বেলা –--অবসর সময়ে –--লেখালেখি করতেন। লেখক হিসেবে যথেষ্ট জনপ্রিয়তা লাভ করলেও, জীবিকা হিসেবে সাহিত্যচর্চাকে গ্রহণ করা তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়নি। আবাথ আল-আকদার, তাঁর প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ, যা ১৯৩৯ সালে প্রকাশিত হয়। ফারাওদের সময় নিয়ে তাঁর লেখা ঐতিহাসিক-ত্রয়ীর এটিই প্রথম কাহিনী। গোড়ার দিকে মহফুজ়ের ইচ্ছে ছিল স্যার উইলিয়াম স্কটের পদাঙ্ক অনুসরণ করে, মিশরের ইতিহাস নিয়ে তিরিশ থেকে চল্লিশটি উপন্যাসের একটি ক্রম রচনা করার। পরবর্তীকালে কায়রোর সমকালীন পটভূমিকায় উপন্যাস রচনা করবার তাগিদে এই পরিকল্পনা বাতিল করে দেন। সমকালীন পটভূমিকার প্রথম উপন্যাস হল খান আল-খালিলি, যা ১৯৪৫ সালে প্রকাশিত হয়।

আরব দুনিয়ার বিভিন্ন প্রান্তে সমাদর লাভ করলেও, মাহ্‌ফুজ ১৯৫৭ সালে ‘দ্য কায়রো ট্রিলজি’ প্রকাশিত হবার আগে পর্যন্ত মিশরে তেমনভাবে সমাদৃত হননি। তিন হাজার পৃষ্ঠার বৃহৎ এই উপন্যাস দুটি বিশ্বযুদ্ধের সমকালীন মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনের প্রাঞ্জল বর্ণনা। অচিরেই এই রচনা তৎকালীন প্রজন্মের আখ্যান হিসেবে চিহ্নিত হয়ে গেল। ষাটের দশকের শেষ দিকে, যখন তাঁর রচনা ইংরেজি, ফরাসি, রাশিয়ান এবং জার্মান ভাষায় অনুদিত হল, তখন থেকে মহফুজের নাম দেশে বিদেশে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। ১৯৮৮ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরষ্কার লাভের সঙ্গে সঙ্গে মাহ্‌ফুজ বিশ্বের দরবারে স্বীকৃতি লাভ করেন।

বর্তমানে অশীতিপর মাহ্‌ফুজ কায়রোর আগুজ়া অঞ্চলে স্ত্রী এবং দুই কন্যার সঙ্গে বসবাস করছেন। লেখক নিভৃতবাসে থাকতেই ভালবাসেন, বিশেষ করে, তাঁর ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কৌতুহল পছন্দ করেন না, যা তাঁর মতে, ‘পত্রিকা এবং রেডিয়োতে আলোচনার সম্পূর্ণ অনুপযুক্ত একটি বিষয়’। ধারাবাহিকভাবে কয়েকটি বৃহস্পতিবারে ঠিক এগারোটার সময় তাঁর সঙ্গে সাক্ষাত করে এই সাক্ষাতকারপর্বটি গ্রথিত হয়েছে। প্রতিটি সাক্ষাতের সময় প্রশ্নকর্ত্রী মাহফুজ়ের বাঁদিকের সচল কানের পাশে একটি চেয়ারে বসে সাক্ষাতকার গ্রহণ করেছেন।

ব্যক্তিগতভাবে মাহ্‌ফুজ খানিক স্বল্পভাষী। কিন্তু অকপট এবং স্পষ্টবক্তা। কথায় কথায় হেসে ওঠেন। গাঢ় নীল রঙের সাবেকী একটি স্যুট পরে থাকেন। স্যুটের বোতামগুলো ওপর পর্যন্ত লাগানো থাকে। ধুমপান করেন, আর তেতো কফিই ওঁর পছন্দ।

প্রশ্নকর্ত্রী
কবে থেকে লিখতে শুরু করেছেন?

নাগিব মাহ্‌ফুজ
১৯২৯-এ। আমার লেখা সব গল্পকেই প্রত্যাখ্যান করা হত। সালামা মুসা –মাজাল্লা’র সম্পাদক, আমায় বলতেন –‘তোমার মধ্যে সম্ভাবনা আছে, তবে এখনও তুমি পুরোপুরি তৈরি নও’। ১৯৩৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসের কথা আমার খুব মনে আছে, কারণ সেই সময় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হল, হিটলার পোল্যান্ড আক্রমণ করলেন। আমার গল্প ‘আবাথ আল-আকদার’ প্রকাশিত হল, মাজাল্লা প্রকাশনীর তরফ থেকে আমার জন্য এক অপ্রত্যাশিত উপহারই বলা যায়। আমার জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা।


প্রশ্নকর্ত্রী
এরপর থেকে কি লেখা প্রকাশের ব্যাপারটা সহজ হয়ে গেল?

মাহ্‌ফুজ
তা নয় …অবশ্য প্রথম লেখাটা বেরোনোর পর আমার এক বন্ধু, সেও লেখে, ওর এক ভাইয়ের কথা বলল, যে একটি ছাপাখানার মালিক। কিছুটা সাফল্য লাভ করা লেখকদের নিয়ে একটি প্রকাশনা কমিটি তৈরি করেছে। ১৯৪৩ থেকে প্রকাশনার ব্যাপারে আমরা কিছুটা নিয়মিত হতে শুরু করলাম। প্রয়েক বছরই আমার লেখা একটি গল্প আমরা প্রকাশ করতাম।

প্রশ্নকর্ত্রী
কিন্তু আপনি জীবিকানির্বাহের জন্য লেখালেখির ওপর নির্ভর করেননি?

মাহ্‌ফুজ
না। আমি সর্বদাই সরকারি চাকুরে ছিলাম। বরং বলতে পারেন –সাহিত্য রচনার জন্য খরচ আমাকেই করতে হয়েছে –বই আর কাগজ কেনার জন্য। অনেকদিন পর্যন্ত লেখালেখি থেকে আমি অর্থোপার্জন করিনি। আমার লেখা প্রায় আশিটি গল্প বের করেছি, কোনও রকম দক্ষিণা ছাড়াই। এমনকি আমার প্রথমদিকের উপন্যাসগুলোও দক্ষিণার আশা না করেই প্রকাশ করেছি, সবই করেছি কমিটিকে সাহায্য করার জন্য।

প্রশ্নকর্ত্রী
কবে থেকে লিখে অর্থোপার্জন করতে শুরু করলেন?

মাহ্‌ফুজ
যখন থেকে আমার লেখা ছোটগল্প ইংরেজি, ফরাসি এবং জার্মান ভাষায় অনুবাদ হতে শুরু হল। বিশেষ করে ‘জ়াবালায়ি’ গল্পটি খুব জনপ্রিয় হয়ে উঠল। আমার অন্য গল্পের তুলনায় এই গল্পটি আমাকে অনেক বেশি অর্থ এনে দিয়েছিল।

আমার যে উপন্যাস প্রথম ভাষান্তরিত হয়েছিল সেটা হল ‘মিডাক অ্যালে’। খৈয়াত নামে একজন লেবানিজ় এটি প্রথম প্রকাশ করেন। আমি কিংবা অনুবাদক, দুজনের কেউই এর থেকে কোনও অর্থই উপার্জন করতে পারিনি, কারণ খৈয়াত আমাদের ঠকিয়েছিলেন। ১৯৭০ সাল নাগাদ হাইনম্যান উপন্যাসটির পুনঃপ্রকাশ করেন। এর পর এটি ফরাসি ভাষায় অনুদিত হয়। আমার অন্যান্য রচনার অনুবাদও এর পর আরম্ভ হয়।

প্রশ্নকর্ত্রী
কুখ্যাত খারাফিশ গোষ্ঠী সম্বন্ধে আমাদের কিছু বলতে পারেন? কারা কারা ছিল এতে, কীভাবে এর গঠন হল?

মাহ্‌ফুজ
এদের ব্যাপারে আমরা প্রথম জানতে পারলাম ১৯৪৩ সনে –মুস্তাফা মাহমুদ, আহমদ বাহা আল-দিন, সালাহ্‌ জাহিন, মুহম্মদ আফিফি। শিল্পকলা আর তৎকালীন রাজনৈতিক সমস্যা নিয়ে আমাদের আলোচনা হত। খরাফিশ কথাটার অর্থ ‘গুণ্ডা’ –ওই যারা যে কোনও গণবিক্ষোভের পেছনের সারিতে ঘাপটি মেরে বসে থাকে –আর প্রথম সুযোগেই লুটপাট শুরু করে দেয়, এরাই হল খরাফিশ। আহমদ মজ়হর (মিশরের একজন নামকরা অভিনেতা) এই নামকরণ করেছিলেন। প্রথমদিকে আমরা মুহম্মদ আফিফি’র বাড়িতে মিলিত হতাম। কখনো কখনো পিরামিডের কাছে সাহারা সিটি বলে একটি জায়গাতেও গিয়েছি। এখন আমরা যেতে শুরু করলাম চিত্র পরিচালক তৌফিক সালেহ্‌’র বাড়িতে, কারণ দশম তলায় ওঁর নীলনদের দিকে মুখ করা একটি ব্যালকনি ছিল। আমাদের মধ্যে চার কি পাঁচজনই মাত্র টিকে ছিল।

প্রশ্নকর্ত্রী
মিশরের কনিষ্ঠ প্রজন্মের লেখকদের সঙ্গে আপনার যোগাযোগ রয়েছে?

মাহ্‌ফুজ
প্রতি শুক্রবার সন্ধ্যেবেলা কাস্‌র এল-নিল ক্যাসিনোতে একটি বৈঠকে যোগ দিই –নতুন লেখকদেরও এখানে আমন্ত্রণ জানানো হয়। অনেকে আসেন –কবি, লেখক, যাঁরা সাহিত্যানুগ … আমি যেহেতু ১৯৭১ থেকে আর সরকারি চাকরি করি না বন্ধুবান্ধবদের জন্য অনেক বেশি সময় দিতে পারি।

প্রশ্নকর্ত্রী
১৯৫২ পূর্ববর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতি আপনার জীবনে কী ভূমিকা নিয়েছে?

মাহ্‌ফুজ
১৯১৯-এ যখন বিপ্লব হল, তখন আমি সাত বছরে পড়েছি। এই ঘটনা ধীরে ধীরে আমার ওপর প্রভাব বিস্তার করে আর ধীরে ধীরে এর আদর্শে আমি উদ্বুদ্ধ হয়ে পড়ি। আমার পরিচিতজনেরা সকলেই ওয়াফ্‌দ পার্টি আর ঔপনিবেশিকতার অবসানের পক্ষে ছিল। পরে জ়াঘলুল পাশা সা’দ-এর একজন সক্রিয় সমর্থনকারী হিসেবে রাজনীতির সঙ্গে ভাল মতই জড়িয়ে পড়লাম। আমি আজও মনে করি সেই জড়িয়ে পড়াটা আমার জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এক পদক্ষেপ। তবে আমি কখনোই রাজনীতিকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করিনি, কোনও কর্ম সমিতির পদাধিকারী থাকিনি বা রাজনৈতিক দলের সদস্যতা গ্রহণ করিনি। ওয়াফ্‌দপন্থী হলেও পার্টির একজন সদস্য হিসেবে আমি পরিচিত হয়ে উঠি, সেটা আমি কখনোই চাইনি। পুরোপুরি স্বাধীন একজন লেখক হিসেবেই থাকতে চেয়েছিলাম, পার্টির সদস্য হলে যা কখনোই সম্ভব হত না।

প্রশ্নকর্ত্রী
আর ১৯৫২-তে?

মাহ্‌ফুজ
বিপ্লব হওয়াতে খুশিই হয়েছিলাম। তবে দুর্ভাগ্যবশত বিপ্লব গণতন্ত্র নিয়ে এল না।

প্রশ্নকর্ত্রী
নাসের এবং সাদাত-এর সময়ের চেয়ে এখন গণতন্ত্রের দিকে বিশেষ কিছু অগ্রগতি হয়েছে – কী মনে হয় আপনার?

মাহ্‌ফুজ
অবশ্যই, সে ব্যাপারে কোনও সন্দেহ নেই। নাসেরের সময় সবাই দেওয়ালকে ভয় পেত। সবার মধ্যেই ভয় ছিল। আমরা কাফেতে গিয়ে বসতাম, কিন্তু কথা বলতে ভয় করত। বাড়িতে বসে থাকতাম, কিন্তু কথা বলতে ভয় করত। বিপ্লবের আগেকার কোনও ঘটনাই নিজের ছেলেমেয়েদেরকে বলতেও ভয় করত। ওরা স্কুলে যাবে, কী বলতে কী বলে বসবে, আর সেটার ভুল ব্যাখ্যা হবে, খুবই উদ্বিগ্ন থাকতাম। সাদাত অবশ্য আমাদের মধ্যে আরও একটু বেশি নিরাপত্তাবোধ জাগিয়ে ছিলেন। হোসনি মুবারক? ওঁর সংবিধান গণতান্ত্রিক নয়, কিন্তু মানুষটা গণতন্ত্রে বিশ্বাস রাখেন। এখন আমরা নির্ভয়ে নিজস্ব মতামত ব্যক্ত করতে পারি। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা রয়েছে। ঘরে বসেই আমরা উচ্চকণ্ঠে কথা বলতে পারি, যেন আমরা ইংল্যান্ডে আছি। কিন্তু সংবিধানটা সংশোধন করা দরকার।


প্রশ্নকর্ত্রী
আপনার কি মনে হয় মিশরের জনসাধারণ পূর্ণ গণতন্ত্রের জন্য প্রস্তুত? গণতন্ত্র কী ভাবে কাজ করে, সে সম্বন্ধে ওরা কি সত্যিকারেই ওয়াকিবহাল?

মাহ্‌ফুজ
মিশরের বেশিরভাগ মানুষই খাওয়ার জন্য রুটির জোগাড় করতেই ব্যস্ত। অল্প কিছু শিক্ষিত মানুষ আছেন যাঁরা সত্যি সত্যিই গণতন্ত্রের মর্ম বোঝেন। ছাপোষা মানুষদের গণতন্ত্র নিয়ে কথা বলে নষ্ট করার মত সময়টুকু পর্যন্ত নেই।

প্রশ্নকর্ত্রী
সেন্সরশিপ নিয়ে আপনি কোনও সমস্যায় পড়েছেন কি? কোনও পাণ্ডুলিপি নতুন করে লিখতে হয়েছে কখনও?

মাহ্‌ফুজ
সাম্প্রতিককালে হয়নি। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আল-কওয়ারা আল জাদিদা আর রাদিবাস সেন্সর করা হয়েছিল। আমাকে বামপন্থী আখ্যা দেওয়া হয়। সেন্সর বলল রাদিবাস প্ররোচনামূলক কারণ এই উপন্যাসে জনসাধারণ রাজাকে হত্যা করে, কিন্তু আমাদের রাজা জীবিতই রয়েছেন। আমি বোঝাবার চেষ্টা করেছিলাম যে এটা নিতান্তই একটি ঐতিহাসিক কাহিনী, ওরা বলল সেটা হল মিথ্যে ইতিহাস, কারণ সেই রাজাকে মোটেই প্রজারা হত্যা করেনি, রাজার মৃত্যু হয়েছিল ‘রহস্যজনক পরিস্থিতিতে’।

প্রশ্নকর্ত্রী
‘দ্য চিলড্রেন অফ গ্যাবালয়ি’ নিয়ে সেন্সর কোনও আপত্তি করেনি?

মাহ্‌ফুজ
করেছিল। যদিও সেই সময় আমিই কলাসংস্কৃতি বিভাগের সব ধরণের সেন্সরশিপের দায়িত্বে ছিলাম। সাহিত্য বিষয়ক সেন্সরশিপের যিনি মাথা, তিনি উপদেশ দিলেন বইটা মিশরে প্রকাশ না করতে, যাতে আল-আজহার –কায়রোতে ইসলাম ধর্মের প্রধান পীঠস্থান –এদের সঙ্গে বিবাদ এড়ানো যায়। বইটা বেইরুট থেকে বেরোয়, তবে মিশরে ঢোকবার অনুমতি পায়নি। ১৯৫৯ সনের কথা –তখন নাসেরের জমানা চলছে। বইটা তখনও এখানে আনা যায়নি। মানুষ গোপনে নিয়ে আসে।

প্রশ্নকর্ত্রী
দ্য চিলড্রেন অফ গ্যাবালয়িতে আপনি কী বলতে চেয়েছিলেন? বইটা কি আপনি প্ররোচনা দেওয়ার উদ্দেশ্যে লিখেছিলেন?

মাহ্‌ফুজ
ওই বইতে আমি দেখাতে চেয়েছিলাম সমাজে বিজ্ঞানের একটি ভূমিকা আছে, ঠিক যেমন ধর্মচারণ একটি ভূমিকা পালন করে। বলতে চেয়েছিলাম যে বিজ্ঞান চর্চাকে যে সর্বদাই ধর্মীয় মূল্যবোধের সঙ্গে দ্বন্দ্বে অবতীর্ণ হতে হবে, এটাও আবশ্যিক নয়। পাঠকদের বোঝাতে চেয়েছিলাম বিজ্ঞানকে অস্বীকার করা মানে সাধারণ মানুষের অস্তিত্বকেও অস্বীকার করা। দুর্ভাগ্যবশত, যাঁরা কোনও কাহিনীকে হৃদয়ঙ্গম করার সঠিক পন্থাটা জানেন না, তাঁরাই বইটার ভুল ব্যাখ্যা করলেন। উপন্যাসটা যদিও সংখ্যালঘু মহল্লাগুলোকে নিয়ে লেখা, এবং সেই সব মহল্লা কারা চালায় তাদের নিয়ে, কিন্তু ব্যাখ্যা করা হল, বইটার আসল উদ্দেশ্য যেন ধর্মগুরুদের দিকে আঙুল তোলা। আর ভুল ব্যাখ্যার কারণে এই কাহিনী, খুব স্বাভাবিকভাবেই, পাঠকের মনে বিরূপ অভিঘাত সৃষ্টি করল, ধর্মগুরুরা নগ্ন পায়ে চলাফেরা করছেন, নৃশংস ব্যবহার করছেন …এটা অবশ্যই একটি রূপকধর্মী রচনা। পরম্পরাগতভাবে রূপকের ব্যবহার আমাদের কাছে নতুন কিছু নয়। যেমন ধরুন, ‘কাহিলা এবং দিমনাহ্‌’ গল্পে সুলতানকে সিংহরূপে কল্পনা করা হয়েছে। কিন্তু কেউ বলেনি যে লেখক সুলতানকে পশুতে রূপান্তরিত করেছেন! গল্পটিতে একটি বার্তা দিতে চাওয়া হয়েছে …রূপককে আক্ষরিক অর্থে নেওয়ার কোনও মানেই হয় না। কিছু কিছু পাঠকের মধ্যে উপলব্ধি করবার ক্ষমতার বেশ অভাব রয়েছে।

প্রশ্নকর্ত্রী
সালমান রুশদীর ঘটনাটা নিয়ে আপনার কী অভিমত? আপনি কি মনে করেন একজন লেখকের পূর্ণ স্বাধীনতা পাওয়া উচিত?

মাহ্‌ফুজ
আমি ঠিক কী মনে করি সেটা বলি। প্রত্যেক সামাজিক ব্যবস্থার নিজস্ব কিছু পরম্পরা আছে, আচরণবিধি আছে, ধর্মীয় বিশ্বাস আছে, যা তারা অক্ষুণ্ণ রাখতে চায়। যুগে যুগে কিছু ব্যক্তির আবির্ভাব হয় যাঁরা সেই ব্যবস্থার পরিবর্তনের দাবী তোলেন। আমার মতে সমাজের নিজেকে রক্ষা করার অধিকার আছে। আবার সেই ব্যক্তিটিরও অধিকার আছে সেই সব বিষয়কে আক্রমণ করার যে সব বিষয়ের সঙ্গে তিনি সমাজের সঙ্গে সহমত পোষণ করেন না। কোনও লেখক যদি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে সমাজের কিছু কিছু বিধি বা বিশ্বাস যুগোপযোগী নয় বা ক্ষতিসাধনও করতে পারে, তাহলে সেটা নিয়ে আওয়াজ ওঠানো তাঁর কর্তব্য। অবশ্য এই স্পষ্টবাদিত্বের মূল্য চোকানোর জন্য লেখককে প্রস্তুত থাকতে হবে। যদি এতে রাজি না থাকেন, তাহলে তিনি নীরব থাকতে পারেন। স্পষ্টবাদিতার জন্য কারাগারে পাঠানো হয়েছে বা পুড়িয়ে মারা হয়েছে, ইতিহাসে এমন ঘটনার বহু নজির আছে। সমাজ সর্বদাই নিজেকে রক্ষা করার চেষ্টা করেছে। আজকাল পুলিশ আর আদালতের সাহায্যে সেটা করা হয়। বাক-স্বাধীনতা এবং সমাজের আত্মরক্ষা করার অধিকার –আমি দুই পক্ষকেই সমর্থন করি। ব্যতিক্রমী হওয়ার মূল্য আমাকে অবশ্যই চোকাতে হবে। এটাই স্বাভাবিক নিয়ম।

প্রশ্নকর্ত্রী
‘দ্য স্যাটানিক ভার্সেস’ পড়েছেন?

মাহ্‌ফুজ
না, পড়া হয়নি। বইটা যখন বেরোয়, আমি আর ভাল করে পড়তে পারি না –আমার দৃষ্টিশক্তির, সাম্প্রতিক কালে, যথেষ্ট অবনতি ঘটেছে। তবে আলেকজান্দ্রিয়ার সংস্কৃতিবিষয়ক মার্কিন অ্যাটাশে পরিচ্ছেদ ধরে ধরে বইটা আমাকে ব্যাখ্যা করে শুনিয়েছিলেন। যে সমস্ত অবমাননাকর মন্তব্য উনি করেছেন, আমার কাছে সেগুলো একেবারেই গ্রহণযোগ্য বলে মনে হয়নি। এমনকি নবীর রমণীদের সম্পর্কেও অপমানজনক কথা বলেছেন রুশদী! কোনও বিশেষ ধারণাকে আক্রমণ করাই যায়, কিন্তু তাই বলে অবমাননাকর কথা বলব কেন? অবমাননা আদালতের বিচার্য বিষয়। একই সঙ্গে খোমেইনির অবস্থানকেও আমি সমান বিপজ্জনক বলে মনে করি। ফতোয়া জারি করার অধিকার ওঁর নেই –সেটা ইসলামি আদর্শের পরিপন্থী। ইসলামি আদর্শ অনুযায়ী কেউ ধর্মদ্রোহিতার অপরাধে অপরাধী হলে তাকে অনুতাপ করা কিংবা শাস্তি এই দুয়ের মধ্যে একটি বেছে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। রুশদীকে সেই সুযোগ দেওয়া হয়নি। নিজস্ব ধারণার পরিপ্রেক্ষিতে রুশদীর লেখার এবং বলার অধিকারকে আমি সর্বদা সমর্থন করেছি। তবে কোনো কিছুকে, বিশেষ করে পয়গম্বর বা পবিত্র বলে বিবেচিত কোনো কিছুকে অপমান করার অধিকার ওঁর নেই। আপনারও কী তাই মনে হয় না?

প্রশ্নকর্ত্রী
আপনার দৃষ্টিভঙ্গী বুঝতে পারলাম …আচ্ছা, কোরানে কি অবমানননা করা কিংবা অধার্মিক কথা বলা নিয়ে কোনও আলোচনা আছে?

মাহ্‌ফুজ
অবশ্যই আছে। কোরান এবং সমস্ত সভ্য দেশের আইনব্যবস্থাই ধর্মীয় ভাবনাকে অবমাননা করার বিরুদ্ধে আইন প্রণয়ন করেছে।

প্রশ্নকর্ত্রী
আপনি কি ছোটবেলায় ধার্মিক ছিলেন? প্রতি শুক্রবার বাবার সঙ্গে মসজিদে যেতেন?

মাহ্‌ফুজ
ছেলেবেলায় আমি বেশ ধার্মিকই ছিলাম। তবে জুম্মাবারের নামাজে যাবার জন্য বাবা কোনোদিনই আমাকে বাধ্য করেননি, নিজে যদিও প্রতি সপ্তাহেই যেতেন। পরে আমার মনে হতে লাগল ধর্মীয় সংস্কার উন্মুক্ত হওয়া প্রয়োজন; বদ্ধ ধর্মীয় ভাবনা অভিশাপের মত। ধর্ম নিয়ে অত্যধিক উদ্বেগ, জীবন যাদের নিঃশেষিত করে ফেলেছে, তাদেরই শেষ অবলম্বন বলে আমার মনে হত। ধর্মকে আমি খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করি, কিন্তু একই সঙ্গে এর একটি সাম্ভাব্য বিপজ্জনক দিকও আছে। আপনি যদি মানুষকে নাড়া দিতে চান, তাহলে আপনাকে সংবেদনশীল একটি বিন্দু খুঁজে নিতে হবে। আর মিশরে ধর্ম ব্যতীত অন্য কোনও কিছুই মানুষকে সেভাবে নাড়া দেয় না। চাষীদের চাষ করার অনুপ্রেরণা কী? ধর্ম। আর সেই জন্যই খোলা মন নিয়ে ধর্মের ব্যাখ্যার প্রয়োজন। ধর্ম প্রেম আর মানবিকতার কথা বলবে। ধর্মের সম্পর্ক প্রগতির সঙ্গে, সভ্যতার বিকাশের সঙ্গে, কেবল মাত্র আবেগনির্ভর হতে পারাটাই যথেষ্ট নয়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে ইদানিং ধর্মকে প্রায়ই প্রতীপ যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে যা সভ্যতার অগ্রসর হওয়ার প্রয়োজনীয় ধারণার পরিপন্থী।

প্রশ্নকর্ত্রী
মেয়েরা মাথা ঢেকে রাখে, এমনকি মুখ আর হাতও, এই ব্যাপারে কী বলবেন? সভ্যতার প্রয়োজনের সঙ্গে এটা কি ধর্মের সংঘাতের একটি উদাহরণ নয়?

মাহ্‌ফুজ
মাথা ঢেকে রাখাটা এখন কেতার অঙ্গ হয়ে গেছে, এক ধরণের শৈলী। বেশিরভাগ মানুষই এ্টাকে এই চোখেই দেখেন, অন্য কোনও অর্থ খোঁজেন না। তবে আমি ধর্মীয় গোঁড়ামিকে ভয় পাই, ...ধর্মান্ধতার ক্ষতিকর ফলশ্রুতি, সম্পূর্ণরূপে মানবজাতির বিরোধী।

প্রশ্নকর্ত্রী
আপনি নামাজ পড়েন আজকাল?

মাহ্‌ফুজ
মাঝে মাঝে। বয়সের জন্য অসুবিধে হয়। আপনাকেই বলি, আমি মনে করি ধর্ম মানুষের অপরিহার্য আচরণের মধ্যেই পড়ে। তবে নিয়ম করে নামাজ পড়া, রোজা রাখা, মাদুরের ওপর মাথা ঠেকানো, এসবের থেকে একজন মানুষের সঙ্গে ভাল আচরণ করা, স্পষ্টতই, অনেক বেশি জরুরি। ঈশ্বর ধর্মকে একটি অনুশীলন সমিতি হতে দিতে চাননি।

প্রশ্নকর্ত্রী
মক্কা দর্শন করেছেন কখনও?

মাহ্‌ফুজ
না।

প্রশ্নকর্ত্রী
যাবার ইচ্ছে আছে?

মাহ্‌ফুজ
না। ভিড় আমি পছন্দ করি না।

প্রশ্নকর্ত্রী
আপনার যখন বিয়ে হয়, বয়স কত ছিল তখন?

মাহ্‌ফুজ
সাঁইত্রিশ কি আটত্রিশ হবে।

প্রশ্নকর্ত্রী
এত দেরিতে কেন?

মাহ্‌ফুজ
চাকরি আর লেখা নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম। দিনের বেলা আমি ছিলাম একজন সরকারি চাকুরে আর রাতের বেলায় লেখক। সারাদিনই ব্যস্ত থাকতাম। বিয়ে করতে ভয়ই করত, ...বিশেষ করে যখন দেখতাম বিয়ে করার পরে আমার ভাই ও বোনেরা সামাজিক দায়দায়িত্ব সামলাতে কী ভাবে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল। একজনকে হয়ত নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে যেতে হত, তো অন্যজনকে নিমন্ত্রণ করতে হত। আমার ধারণা হয়েছিল বিবাহিত জীবন আমার সমস্ত সময়টা কেড়ে নেবে। মানসচক্ষে সামাজিক মেলামেশা আর আমন্ত্রণ নিমন্ত্রণের বাহুল্যে নিজেকে নিমজ্জিত হয়ে যেতে দেখতে পেতাম। কোনও স্বাধীনতাই নেই।


প্রশ্নকর্ত্রী
এখনও কি আপনি ডিনার বা অভ্যর্থনার আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করে থাকেন না?

মাহ্‌ফুজ
এরকম কোনো অনুষ্ঠানে আমি কখনোই যাই না। এমনকি আমার বন্ধুদের বাড়িও যাই না। ওদের সঙ্গে আমার ক্যাসিনো কাস্‌র এল-নিল বা অন্য দু’একটি কফি হাউসে দেখাসাক্ষাত হয়।

প্রশ্নকর্ত্রী
এই জন্যই কি আপনি নোবেল প্রাইজ় নেওয়ার জন্য সুইডেনে যাননি? রাশি রাশি সাক্ষাতকার, ডিনার, পার্টি …?

মাহ্‌ফুজ
না, ঠিক তা নয়। অল্প বয়সে ঘোরাঘুরি করতে ভালবাসতাম খুবই, কিন্তু আজকাল ইচ্ছেই হয় না। এমনকি দু’সপ্তাহের একটি সফরও আমার জীবনচর্যা ওলটপালট করে দেবে।

প্রশ্নকর্ত্রী
নোবেল প্রাইজ় পাওয়া নিয়ে আপনার কী প্রতিক্রিয়া সেটা নিয়ে আপনাকে নিশ্চয়ই অনেকবার প্রশ্ন করা হয়েছে। আপনি যে পেতে পারেন সেরকম কোনও আভাস কি আগে থেকেই পেয়েছিলেন?

মাহ্‌ফুজ
একেবারেই পাইনি। আমার স্ত্রী মনে করতেন ওই পুরস্কার আমার পাওয়া উচিত, কিন্তু আমি চিরকালই ভেবে এসেছি যে নোবেল প্রাইজ় হল পাশ্চাত্য লেখকদের জন্য। প্রাচ্যদেশীয় কোনও লেখককে এই পুরস্কার ওরা দেবে সেটা ভাবিনি। একটি জনশ্রুতি অবশ্য ছিল, দুজন আরব লেখকের নাম মনোনীত হয়েছে – ইউসেফ এদ্রিস এবং অ্যাডোনিস।

প্রশ্নকর্ত্রী
আপনার নাম যে বিবেচনা করা হচ্ছে, জানতেন আপনি?

মাহ্‌ফুজ
না। সেদিন সকালে আমি আল-আহ্‌রামে ছিলাম। আরও আধঘন্টা বেশি থাকলে ঠিক জেনে যেতাম। কিন্তু তার বদলে আমি বাড়ি চলে গেছিলাম আর ওখানেই লাঞ্চ করেছিলাম। খবরটা আল-আহ্‌রামের টিকারে এসেছিল, তারপর ওরা আমার বাড়িতে টেলিফোন করল। খবরটা জানানোর জন্য স্ত্রী আমাকে ঘুম থেকে তুললেন। ভাবলাম উনি তামাশা করছেন, তাই আবার ঘুমিয়ে পড়তে চাইলাম। তখন জানালেন যে আল-আহ্‌রাম থেকে টেলিফোনে এসেছে। ফোনটা তুলতেই শুনতে পেলাম কেউ একজন বললেন, অভিনন্দন! কণ্ঠস্বর ছিল মিস্টার বাশা’র। ব্যাপারটা এই রকম যে মিস্টার বাশা মাঝে মাঝেই আমার সঙ্গে রঙ্গতামাশা করে থাকেন, আমি ওঁর কথায় কোনো গুরুত্বই দিলাম না। পাজামা পরেই আমি বসবার ঘরে গিয়ে বসতে যাব, এমন সময়ে দরজায় ঘন্টা বাজল। একজন কেউ এসেছেন, আমি ভাবলাম কোনও সাংবাদিক হবেন। কিন্তু দেখা গেল উনি হচ্ছেন সুইডেনের রাষ্ট্রদূত! ফলে, আমাকে পোশাক পরিবর্তনের জন্য সময় চেয়ে নিতে হল, ...ঘটনাটা এভাবেই ঘটেছিল।

প্রশ্নকর্ত্রী
আপনার লেখালেখির প্রসঙ্গে আবার ফিরে যাই ---কোনও নিয়মিত সময়সূচি মেনে লেখালেখি করেন?

মাহ্‌ফুজ
সর্বদা আমি সেটাই করতে বাধ্য হয়েছি। আটটা থেকে দুটো পর্যন্ত অফিসে থাকতাম। চারটে থেকে সাতটা পর্যন্ত লিখতাম। তারপর সাতটা থেকে দশটা পর্যন্ত পড়াশোনা। শুক্রবার ছাড়া এটাই ছিল আমার প্রতিদিনের নির্ধারিত সময়। যখন খুশি যা ইচ্ছে করার মত সময় আমার ছিল না। তবে বছর তিনেক আগে আমি লেখালেখি বন্ধ করে দিই।

প্রশ্নকর্ত্রী
আপনার কাহিনীর চরিত্র আর ভাবনারা কী ভাবে চলে আসে?

মাহ্‌ফুজ
কথাটা এভাবে বলা যাক। বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে যখন আপনি সময় কাটান, আপনারা কী নিয়ে আলোচনা করেন? সেই দিন –--বা সেই সপ্তাহে –--যে সব ঘটনা আপনাকে নাড়া দিয়েছে, ঠিক একই ভাবে আমি গল্প লিখে থাকি। যা আমার বাড়িতে ঘটল, বা স্কুলে, বা কর্মক্ষেত্রে, কিংবা রাস্তায় যা দেখলাম, এরাই আমার গল্পের উপাদান। কিছু অভিজ্ঞতা মনকে এমন গভীরভাবে নাড়া দিয়ে যায় যে সেই সব অভিজ্ঞতা নিয়ে ক্লাবে আলোচনা করার পরিবর্তে একটি উপন্যাসের রূপ দিয়ে ফেলি।

যে অপরাধী সম্প্রতি এখানে তিনজন লোককে খুন করল, সেই ঘটনাটাই ধরুন। এই বুনিয়াদকে ভিত্তি করে গল্পটা কী ভাবে লেখা যায় সেই ব্যাপারে আমি কিছু সিদ্ধান্ত নেব। যেমন ধরুন, গল্পটা আমি কার দৃষ্টিভঙ্গী থেকে লিখব –স্বামীর, না স্ত্রীর, না চাকরের, না অপরাধীর? হতে পারে আমার সহানুভূতি অপরাধীর দিকেই। একটি গল্পের সঙ্গে অপর একটি গল্পের তারতম্য এই সব পছন্দের ওপর নির্ভর করে।

প্রশ্নকর্ত্রী
লিখতে শুরু করার পরে আপনি কি স্বতস্ফূর্তভাবে আসা শব্দের প্রবাহকেই ব্যবহার করেন না আগে থেকেই একটি খসড়া তৈরি করে নেন? একটি নির্দিষ্ট থিম মাথায় রেখে লেখা শুরু করেন?

মাহ্‌ফুজ
আমার ছোটগল্প সরাসরি মনের ভেতর থেকেই বেরিয়ে আসে। অন্য কিছু লেখার আগে প্রথমে কিছু গবেষণা করে নিই। যেমন, ‘কায়রো ট্রিলজি’ শুরু করার আগে আমি বিস্তারিত গবেষণা করে নিয়েছিলাম। প্রতিটি চরিত্রের জন্য একটি করে ফাইল তৈরি করে নিয়েছিলাম। সেটা করে না নিলে আমি খেই হারিয়ে ফেলতাম আর কিছু না কিছু ভুলেই যেতাম। কখনো কখনো কাহিনীর ঘটনাপ্রবাহ থেকেই থিমটি স্বাভাবিকভাবেই এসে পড়ে, আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে লেখা শুরু করার আগে থেকেই একটি থিম আমার মাথায় থাকে। যদি আমি আগে থেকেই জানি যে এমন একজন মানুষের কথা আমি বলতে চাই যে সমস্ত রকম অশুভ শক্তিকে জয় করবার সামর্থ্য রাখে, তাহলে এমন এক নায়ক চরিত্র সৃষ্টি করব যার মধ্যে এই ক্ষমতা রয়েছে। আবার কখনো কখনো আমি একটি চরিত্রের আচরণের বিশদ বিবরণ দিয়েও গল্প লিখতে আরম্ভ করি যাতে থিমটি নিজে থেকেই পরে প্রকাশিত হয়ে পড়ে।

প্রশ্নকর্ত্রী
একটি কাহিনী সম্পূর্ণ হয়েছে মনে করার আগে আপনি কতবার সংশোধন করেন বা নতুন করে লেখেন?

মাহ্‌ফুজ
খুব ঘন ঘন সংশোধন করতে থাকি। অনেক কিছুই কেটে দিই, পুরো পাতা জুড়ে লিখি, এমনকি পাতার পেছনেও। কখনো কখনো বেশ বড় মাপের সংশোধন করি। সংশোধন হয়ে যাওয়ার পরে, কাহিনীটি নতুন করে লিখে প্রকাশকের কাছে পাঠাই। এরপর আমার সব পুরোনো খসড়াগুলো ছিঁড়ে ফেলে দিই।

প্রশ্নকর্ত্রী
খসড়াগুলো আপনি কখনও রাখেন না? অনেক লেখকই যা যা লিখেছেন সবই রেখে দেন! আপনার কি মনে হয় না যে সংশোধনগুলো বিশ্লেষণ করে লেখকের মানসিক ক্রমিক প্রক্রিয়া সম্বন্ধে চিত্তাকর্ষক ধারণা তৈরি করা যায়?

মাহ্‌ফুজ
হতেই পারে, তবে খসড়া সংরক্ষণ করা আমার মানসিকতার সঙ্গে খাপ খায় না। একেবারে গোড়ার দিকের খসড়া কোনও লেখক সংরক্ষণ করে রাখেন বলে আমার অন্তত জানা নেই – সেটা করলে আমার বাড়ি যে অকাজের কাগজে ভরে যেত! তাছাড়া, আমার হাতের লেখাও ভয়ানক খারাপ।

প্রশ্নকর্ত্রী
ছোটগল্প বা উপন্যাস, কোনোটাই আরবীয় সাহিত্যের উত্তরাধিকার নয়। কিন্তু এই রীতি অনুসরণ করে আপনি যে সাফল্য লাভ করেছেন সেটা কী ভাবে ব্যাখ্যা করবেন?

মাহ্‌ফুজ
একথা ঠিক যে ছোটগল্প এবং উপন্যাসের ধারণা আমরা পশ্চিম থেকেই ধার করেছিলাম। তবে ইতোমধ্যে আমরা এই ধারাকে আমাদের নিজস্ব সাহিত্যে সংশ্লেষ ঘটিয়ে নিয়েছি। চল্লিশের এবং পঞ্চাশের দশকে অনেক অনুবাদ-সাহিত্যই আমাদের হাতে আসে। ওদের গল্প লেখবার শৈলী আমরা গ্রহণ করেছি মাত্র। পাশ্চাত্য ধারাকে অনুসরণ করে আমরা আমাদের নিজস্ব থিম এবং কাহিনীগুলোকেই ব্যক্ত করেছি। তবে ভুলে যাবেন না আমাদের সাহিত্যিক উত্তরাধিকারে ‘আইয়ান আল-আরব’-এর মত রচনাও পড়ে, যেখানে অনেক কাহিনীই রয়েছে –--যেমন ‘আন্‌তার’ এবং ‘কায়েস এবং লায়লা’*। আর সহস্র এক আরব্য রজনী তো আছেই।

*কায়েস এবং লায়লা – লায়লা আর মজনুন

প্রশ্নকর্ত্রী
আপনার সৃষ্টি করা কোনো চরিত্রের সঙ্গে কি নিজেকে চিহ্নিত করতে পারেন?

মাহ্‌ফুজ
ট্রিলজির কামাল চরিত্রটি আমার নিজের প্রজন্মের প্রতিনিধিত্ব করে –আমাদের যাবতীয় ধারণা, আমাদের পছন্দ-অপছন্দ, আমাদের দ্বিধা আর সংশয় এবং আমাদের মনস্তাত্ত্বিক সংকট –এক দিক দিয়ে দেখতে গেলে চরিত্রটি আত্মজীবনীমূলক। অপর দিকে সে আবার সর্বজনীনও। এছাড়া বাবার চরিত্রটি –--আবদুল গাওয়াদ –--এই চরিত্রটির সঙ্গেও নৈকট্য অনুভব করি –--জীবনচর্চার প্রতিটি ক্ষেত্রে উন্মুক্ত বিচরণ, বন্ধুবৎসল, সচেতনভাবে কারও মনে আঘাত দেয় না। এই দুটি চরিত্র আমার ব্যক্তিসত্তার দুটি দিক তুলে ধরেছে। আবদেল গাওয়াদ অত্যন্ত মিশুক মানুষ, শিল্পকলা এবং সংগীত অনুরাগী; কামাল একাধারে আড়ষ্ট, লাজুক, রাশভারি এবং আদর্শবাদী।

প্রশ্নকর্ত্রী
আপনার রচনার নির্দিষ্ট একটি নমুনা নিয়ে আলোচনা করা যাক –--দ্য থিফ অ্যান্ড দ্য ডগস্‌। কী ভাবে আরম্ভ করলেন?

মাহ্‌ফুজ
একজন চোর কিছুদিনের জন্য কায়রো শহরকে নাকে দম দিয়ে রেখেছিল –গল্পটির সেই ঘটনাটিরই অনুপ্রেরণায় লেখা। ওর নাম ছিল মাহমুদ সুলেমান। জেল থেকে ছাড়া পাবার পর নিজের স্ত্রী আর উকিলকে খুন করার চেষ্টা করে। ওরা অক্ষত অবস্থায় পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়, কিন্তু ঘটনাক্রমে লোকটি মারা পড়ে।

প্রশ্নকর্ত্রী
উপন্যাসে যেমন আছে, ওর স্ত্রী কি ওর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে?

মাহ্‌ফুজ
না …গল্পটা লেখার জন্য ওর চরিত্রটা নিয়েছিলাম। সেই সময় আমি অদ্ভুত এক বদ্ধমূল ধারণার বশবর্তী হয়ে পড়েছিলাম যে আমার ওপর নজর রাখা হচ্ছে, আর এরকম একটা বিশ্বাস জন্মে গেছিল যে তৎকালীন রাজনৈতিক আবহাওয়ায় আমাদের জীবন বাস্তবিক অর্থে মূল্যহীন। তাই সেই দুষ্কৃতির কাহিনী লেখার সঙ্গে সঙ্গে আমার নিজের কাহিনীও লেখে ফেললাম। সাধারণ একটি অপরাধের গল্প তৎকালীন সময়ের দার্শনিক আধ্যান হয়ে উঠল! আমার যাবতীয় ধন্দ, আমার সমস্ত কিংকর্তব্যবিমূঢ়তা দিয়ে কাহিনীর প্রধান চরিত্র সায়িদ মহরনের নির্মাণ করেছিলাম। ওকে দিয়ে আমি শেখের কাছ থেকে, পতিতা নারীর কাছ থেকে, সেই আদর্শবাদী মানুষটি –--অর্থ আর যশলাভের মোহে যে ওর অভিপ্রায় ফাঁস করে দিয়েছিল, তার কাছ থেকে –--এইসব বিহ্বলতা অবসানের উপায় অনুসন্ধান করিয়েছিলাম। দেখুন, লেখক তো কেবলমাত্র একজন সাংবাদিক নন। তিনি নিজস্ব সংশয়, কৌতুহল এবং মূল্যবোধ দিয়েই একটি কাহিনীর রূপায়ণ করেন। এরই নাম শিল্পকলা।

প্রশ্নকর্ত্রী
কাহিনীটিতে ধর্মের ভূমিকা নিয়ে কী বলবেন? যেমন শেখ বলেছেন, ঈশ্বরে বিশ্বাস রাখাই কি প্রকৃত আনন্দলাভের পথ? অপরাধী ব্যক্তির জিজ্ঞাসার উত্তর কি সুফিবাদ দিতে পারে?

মাহ্‌ফুজ
জীবন সম্বন্ধে প্রচলিত ধারণাগুলো শেখ অস্বীকার করেন। অপর দিকে অপরাধী ব্যক্তি তার নিজের সমস্যাগুলোর আশু সমাধানের খোঁজ করছে। এরা দুই ভিন্ন জগতের বাসিন্দা। সুফিবাদকে আমি ভালবাসি, যেমন আমি সুন্দর কবিতা ভালবাসি, তবে সুফিবাদ সমাধান নয়। সুফিবাদ হল ঊষর মরুভূমিতে মরীচিকার মত। সুফিবাদ বলতে চায়, এসো, বোসো, দুশ্চিন্তামুক্ত হয়ে কিছুক্ষণের জন্য জীবনকে উপভোগ কর। যেসব পথ জীবনকে অস্বীকার করতে চায়, সেই সব আমার কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। তা সত্ত্বেও আমি সুফিবাদ ভালবাসি, এর অন্তর্নিহিত সৌন্দর্যের জন্য …লড়াইয়ের মাঝপথে এক স্নিগ্ধ বিরতি এনে দেয়।

প্রশ্নকর্ত্রী
আমার বেশ কয়েকজন মিশরীয় বন্ধু আছেন, যাঁরা সমস্যার সমাধানের জন্য নিয়মিতভাবে সুফি শেখদের পরামর্শ গ্রহণ করেন …

মাহ্‌ফুজ
তাঁদের জন্য আমার শুভেচ্ছা রইল। এঁদের সমস্যার সঠিক সমাধান রয়েছে ন্যাশনাল ব্যাঙ্কে।



প্রশ্নকর্ত্রী
নূর-এর ব্যাপারে কী বলবেন, আপনার কাহিনীর মহিলা চরিত্র? এছাড়া দ্য বিগিনিং অ্যান্ড দ্য এন্ড-এর নেফিসা কিংবা মিরামার-এর জ়োহরা নামের মহিলা চরিত্র সম্বন্ধে? ভ্রষ্টা হয়ে পড়লেও এরা নিঃসন্দেহে সহৃদয়া, এবং ভবিষ্যত প্রজন্মের ভরসার জায়গা হিসেবে মূর্ত হয়ে উঠতে দেখা যাচ্ছে।

মাহ্‌ফুজ
ঠিকই বলেছেন, তবে নেফিসা চরিত্রটির মাধ্যমে একটি সাধারণ মিশরীয় পরিবারে অমর্যাদাকর আচরণের পরিণতি কী হতে পারে সেটাই দেখাতে চেয়েছিলাম।

প্রশ্নকর্ত্রী
এই ধরণের শাস্তি আপনি কি অনুমোদন করেন?

মাহ্‌ফুজ
বেশিরভাগ মিশরীয়দের মত আমিও মনে করি এই পর্যায়ের শাস্তি অত্যন্ত কঠোর। আবার এটাও ঠিক যে নেফিসার ভাইয়ের যে প্রতিক্রিয়া হয়েছিল ঠিক সেভাবে একজন মিশরীয় পুরুষ প্রতিক্রিয়া না দেখালে তার পক্ষে সমাজে টিকে থাকা দুষ্কর হয়ে উঠবে। তার ইচ্ছে হোক বা না হোক, সমাজচ্যুত মেয়েটিকে হত্যা করতে সে বাধ্য। পালাবার পথ নেই তার। অনেক সময় লাগবে এই প্রথার বিলোপ হতে, যদিও সাম্প্রতিককালে কিছুটা হলেও শিথিলতা লক্ষ্য করা গেছে, বিশেষত শহরগুলোতে।

প্রশ্নকর্ত্রী
ট্রিলজির আবদুল গাওয়াদ চরিত্রটি সেই সময়ের একজন সাধারণ মিশরীয় পুরুষমানুষের প্রতিরূপ। এই ধরণের চরিত্র আজও কি বর্তমান?

মাহ্‌ফুজ
অবশ্যই। বিশেষ করে মিশরের দক্ষিণাঞ্চল (Upper Egypt), এবং গ্রামাঞ্চলে …তবে আজকের দিনের আবদুল হাওয়াদ হয়ত অপেক্ষাকৃত কম চরমপন্থী হবে। প্রতিটি পুরুষের মধ্যেই কি ওর ছায়া কম বেশি দেখতে পাওয়া যায় না?

প্রশ্নকর্ত্রী
প্রতিটি মিশরীয় পুরুষ, না প্রত্যেক পুরুষমানুষ?

মাহ্‌ফুজ
অপর দেশ সম্পর্কে বলতে পারব না, তবে মিশরীয় পুরুষমানুষ সম্পর্কে অবশ্যই প্রযোজ্য।

প্রশ্নকর্ত্রী
চিন্তা ভাবনায় ইদানিং একটা পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে, আপনার মনে হয় না কথাটা?

মাহ্‌ফুজ
চিন্তা ভাবনায় পরিবর্তন হতে আরম্ভ হয়েছে। পরিবারে মহিলাদের স্থান অনেক মজবুত হয়েছে, মূলত শিক্ষার প্রসারের ফলে, তবে অন্য কারণও আছে।

প্রশ্নকর্ত্রী
সংসারের হাল কার হাতে থাকা উচিত বলে আপনি মনে করেন? সিদ্ধান্ত কার নেওয়া উচিত?

মাহ্‌ফুজ
বিবাহ হল সমান অংশীদারত্বের একটি সংঘের মত। কর্তৃত্বের ভার কারও হাতেই নেই। মতানৈক্য দেখা দিলে, দুজনের মধ্যে অধিকতর বিচক্ষণ মানুষটিই সেটি অতিক্রম করবে। তবে প্রতিটি পরিবারই স্বতন্ত্র। অনেক সময় কর্তৃত্ব আর্থিক সঙ্গতির ওপর নির্ভরশীল। আর্থিক সঙ্গতি যার বেশি, তার ক্ষমতাও বেশি। বাঁধাধরা কোনও নিয়ম নেই।

প্রশ্নকর্ত্রী
মিশরের মত অতি সংরক্ষণশীল এবং বুনিয়াদি সমাজব্যবস্থায়, পুরুষদের ওপর মহিলারা কি অনেক ক্ষেত্রেই প্রাধান্য বিস্তার করে না?

মাহ্‌ফুজ
নিশ্চয়ই। সাম্প্রতিক ইতিহাস থেকেই তার প্রমাণ মেলে। প্রভূত রাজনৈতিক অথবা সামরিক ক্ষমতার অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও পুরুষমানুষদের সিদ্ধান্ত অনেক ক্ষেত্রেই ব্যক্তিত্বময়ী মহিলাদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। এই সব মহিলারা পর্দার আড়াল থেকে শাসন করে থাকেন, অবগুণ্ঠনের আড়াল থেকে শাসন করে থাকেন।

প্রশ্নকর্ত্রী
আপনার নায়িকারা, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সমাজের নিম্নস্তর থেকে উঠে আসা মহিলা, এটা কেন? বৃহত্তর কোনও বিষয়কে প্রতীকীরূপ দান করাই কি আপনার অভিপ্রায়? যেমন মিশরকেই ধরুন না?

মাহ্‌ফুজ
তা নয়। সমাজের নিম্নস্তরের মহিলাদের নিয়ে আমার লেখার উদ্দেশ্যে হল, উপন্যাসে বর্ণিত সময়কালে মহিলাদের কোনও অধিকারই যে ছিল না, সেটিকেই তুলে ধরা। একজন মহিলা যদি সহৃদয় স্বামী লাভ না করেন, কিংবা অত্যাচারী স্বামীকে ত্যাগ করেন, তাহলে সেই মহিলার ভবিষ্যত বলে কিছু থাকে না। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, অনেক সময়ই, তার সামনে অবৈধ আচরণ করা ছাড়া অন্য কোনও পথ খোলা থাকে না। এই সেদিন পর্যন্ত, মহিলাদের বঞ্চিত করেই রাখা হত, প্রায় কোনও অধিকারই দেওয়া হয়নি –--এমনকি মৌলিক অধিকার পর্যন্ত, যেমন বিবাহে ব্যক্তিগত পছন্দ, তালাক দেওয়া, এবং শিক্ষা। আজকাল মেয়েরা শিক্ষালাভ করছে, ফলে পরিস্থিতি বদলাচ্ছে, কারণ শিক্ষা মহিলাদের হাতে একটি অস্ত্র তুলে দিয়েছে। কিছু সমালোচকের চোখে মিডাক অ্যালে’র হামিদা চরিত্রটি নাকি মিশরেরই প্রতীক, কিন্তু এরকম কোনও প্রতীক ভাবনা আমার ছিল না।

প্রশ্নকর্ত্রী
যে সমালোচকরা আপনার রচনাকে প্রতীকের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করে থাকেন, তাঁদের সম্পর্কে আপনার কী ধারণা?

মাহ্‌ফুজ
হামিদা মিশরের প্রতীক এই কথাটা যখন প্রথম আমার কানে এল, আমি চমকে গেলাম, এমনকি একটু ধাক্কাও খেলাম। সন্দেহ হল সমালোচকরা সব কিছুকেই এবং সব চরিত্রকেই প্রতীকে রূপান্তরিত করবেন বলে ঠিক করে ফেলেছেন। কিন্তু তারপরেই আমি হামিদার আচরণে আর রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে সাদৃশ্য খুঁজে পেলাম। প্রবন্ধটি পাঠ করার পরে উপলব্ধি করলাম সমালোচক ভুল কিছু বলেননি –--হামিদাকে নিয়ে লিখতে গিয়ে অবচেতন মনে আমি মিশর সম্বন্ধেই লিখছিলাম। আমার মনে হয়, হয়ত অবচেতনাতেই এই ধরণের সমান্তরাল প্রতীকের সৃজন সর্বদা ঘটে থাকে। এমনটা হতেই পারে যে আমি হয়ত কাহিনীর মাধ্যমে পাঠকের কাছে বিশেষ কোনও মর্মার্থ পৌঁছে দিতে চাইনি, অথচ সেই মর্মার্থটি হয়ত ন্যায্যতই সেই কাহিনীর অঙ্গ।


প্রশ্নকর্ত্রী
কোন বিষয়টি আপনার অন্তরের কাছাকাছি বলে মনে করেন? যে বিষয়টি নিয়ে লিখতে আপনার ভাল লাগে?

মাহ্‌ফুজ
স্বাধীনতা। উপনিবেশায়ন থেকে মুক্তি, রাজার স্বৈরাচারী শাসন থেকে মুক্তি, এবং সামাজিক ও পারিবারিক পরিসরে মৌলিক ব্যক্তিস্বাধীনতা। এই ধরণের স্বাধীনতার একটি থেকে অন্যটিতে উত্তরণ ঘটে চলে। ট্রিলজির উদাহরণ টেনে বলা যায়, বিপ্লব রাজনৈতিক স্বাধীনতা এনে দেওয়ার পরে আবদুল গাওয়াদের পরিবার ওঁর কাছ থেকে অধিকতর স্বাধীনতার দাবী জানাতে থাকে।

প্রশ্নকর্ত্রী
জীবনে সব চাইতে কঠিন কোন পরিস্থিতির মোকাবিলা আপনাকে করতে হয়েছে?

মাহ্‌ফুজ
অবশ্যই লেখালেখির কাজে নিজেকে নিয়োজিত করবার সিদ্ধান্ত, যার ফলে নিজের এবং পরিবারের জন্য সর্বাপেক্ষা নিম্নমানের জীবনযাত্রা বেছে নিতে হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত নেওয়াটা যথেষ্ট কঠিন ছিল, কারণ আমাকে অর্থকরী প্রস্তাবের প্রলোভন দেখানো হয়েছিল …১৯৪৭ সন নাগাদ আমাকে নাট্যলেখক (Scriptwriter) হিসেবে কাজ করবার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল, স্বনামধন্য একজনের সঙ্গে। সালাহ আবু সৈফ (একজন মিশরীয় চলচিত্র পরিচালক) –তাঁর সঙ্গে আমি কাজ করতে আরম্ভ করি, কিন্তু সেটি ছেড়ে দিই। কাজটি চালিয়ে যেতে আমি অস্বীকার করি। যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত, যখন জীবনধারণ খুবই ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছিল, আমি ওঁর সঙ্গে আর কাজ করিনি। দিনকাল আগের মত থাকলে এরকম কিছু করার কথা আমি ভাবতামই না। এই সমস্ত ত্যাগ আমার পরিবার মেনে নিয়েছে।

প্রশ্নকর্ত্রী
খ্যাতনামা অনেক লেখকই, বিশেষ করে পাশ্চাত্যে, অধঃপতিত ব্যক্তিগত জীবনযাপন করেন বলে শোনা যায় –--অতিরিক্ত মদ্যপান, নেশার জিনিসের ব্যবহার, উচ্ছৃঙ্খল যৌন জীবন, আত্মহত্যা করার প্রবণতা …আপনি নিজেকে এই সব কিছুর ঊর্ধে রেখেছেন!

মাহ্‌ফুজ
বেশ …

প্রশ্নকর্ত্রী
এটাই হয়ত আপনার সব চেয়ে বড় ত্রুটি?

মাহ্‌ফুজ
ত্রুটি তো বটেই। তবে আপনার এই পর্যবেক্ষণ আমার বার্ধক্যে পৌঁছনোর পরে। যৌবনে আমিও এই সব কিছুই করেছি –--মদ্যপান করেছি, মেয়েদের পেছনে ছুটেছি, এবং আরও অনেক কিছুই করেছি।

প্রশ্নকর্ত্রী
মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যত নিয়ে আপনি কি আশাবাদী, বিশেষত এই উপসাগরীয় যুদ্ধ এবং অব্যহত সহিংসতার পরিপ্রেক্ষিতে?

মাহ্‌ফুজ
আমার বয়সে নিরাশাবাদী হওয়াটা অনুচিত হবে। মানবজাতির কোনও ভবিষ্যত নেই এই ধরণের কথা কম বয়সে আপনি সহজেই বলে দিতে পারেন, কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আপনি কোনও মানুষকে দুনিয়াকে ঘৃণা করতে উৎসাহ না দেওয়াটাই শ্রেয় বলে ভাবতে শিখে যাবেন।

প্রশ্নকর্ত্রী
নায়ক ব্যাপারটি নিয়ে আপনার ধারণা কী রকম? আপনার লেখায় নায়ক হিসেবে কারও উপস্থিতি থাকে না। প্রকৃতপক্ষে সমসাময়িক কোনও মিশরীয় সাহিত্যিকের লেখাতেই থাকে না।

মাহ্‌ফুজ
কথাটা ঠিকই যে আমার বেশিরভাগ কাহিনীতেই নায়ক হিসেবে কেউ থাকে না – কেবল কিছু চরিত্র থাকে। কেন? কারণ আমাদের সমাজকে আমি বৈশ্লেষিক দৃষ্টিভঙ্গী দিয়ে দেখি, আর কোনও মানুষের মধ্যে কোনো অসাধারণত্বই খুঁজে পাইনি আমি। আমার আগের প্রজন্ম যেমন বীরোচিত আচরণ দেখতে পেয়েছিল –--১৯১৯-এর বিদ্রোহে প্রভাবিত হয়ে শ্রমিকরা যেমন দুর্লঙ্ঘ্য বাধা অতিক্রম করতে পেরেছিল –--এই ধরণের নায়ক। অন্যান্য লেখকেরা –--তৌফিক আল-হাকিম, মুহম্মদ হুসেন হায়কাল, ইব্রাহিম আব্‌দ আল-কাদির আল-মাজ়িনি –--এঁরা নায়কসুলভ চরিত্র নিয়ে লিখেছেন। তবে মোটের ওপর, আমাদের প্রজন্ম এই ব্যাপারে উদাসিন এবং নায়কের উপস্থিতি একটি বিরল ঘটনা। কেবল কল্পকাহিনী না হলে উপন্যাসে নায়ক চরিত্রের অবতারণা করায় অসুবিধে আছে।

প্রশ্নকর্ত্রী
একজন নায়ককে আপনি কী ভাবে বর্ণনা করবেন?

মাহ্‌ফুজ
প্রাচীন আরব সাহিত্যে বহু নায়কের দেখা পাওয়া যায়, প্রত্যেকেই অশ্বারোহী, বীরব্রতী (Knight)। কিন্তু আমার মতে আজকের দিনে নায়ক বলতে তাঁকেই বোঝাবে যিনি কিছু নীতি মেনে চলবেন এবং প্রতিকূলতার মুখেও সেই সব নীতি বিসর্জন দেবেন না। তিনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই করবেন, সুবিধাবাদী হবেন না, এবং তাঁর নৈতিকতার বুনিয়াদ সুদৃঢ় হতে হবে।

প্রশ্নকর্ত্রী
নিজেকে আপনি নায়ক মনে করেন?

মাহ্‌ফুজ
নিজেকে?

প্রশ্নকর্ত্রী
আপনার সন্তানসন্ততি এবং আপনার পাঠকগোষ্ঠী –--আপনি কি তাদের আদর্শ নন –--যিনি সমস্ত প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে নিজের নীতিতে অনড় থাকেন?

মাহ্‌ফুজ
অবশ্যই থাকি। তবে নিজেকে আমি নায়ক বলে মনে করি না।

প্রশ্নকর্ত্রী
সেক্ষেত্রে, নিজেকে আপনি কী ভাবে বর্ণনা করবেন?

মাহ্‌ফুজ
সাহিত্যপ্রেমী একজন মানুষ। এমন একজন মানুষ যিনি নিজের কাজে বিশ্বাস করেন এবং আন্তরিকতার সঙ্গে করে থাকেন। যিনি তাঁর কাজকে অর্থ কিংবা খ্যাতির চাইতেও বেশি ভালবাসেন। অবশ্যই যদি সঙ্গে সঙ্গে অর্থ আর খ্যাতি এসে পড়ে, ক্ষতি নেই! তবে এগুলো কোনোদিনই আমার লক্ষ্য ছিল না। কেন? কারণ অন্য সব কিছুর চেয়ে লিখতে আমি বেশি ভালবাসি। ব্যাপারটা হয়ত ঠিক স্বাস্থ্যকর নয়, তবে আমার অনুভূতি হল সাহিত্য ছাড়া আমার জীবন অর্থহীন হয়ে পড়বে। হয়ত আমার ভাল বন্ধু হবে, বেড়াতে বেরিয়ে পড়তে পারব, বিলাসিতা করতে পারব, কিন্তু সাহিত্য ছাড়া আমার জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠবে। ব্যাপারটা অদ্ভুত লাগতে পারে, কিন্তু আসলে তা নয়, অধিকাংশ লেখকই এই রকম। জীবনে লেখা ছাড়া আর কিছুই করিনি, এই কথা অবশ্য আমি বলতে চাইছি না। আমি বিয়ে করেছি। আমার সন্তানসন্ততি আছে। তার ওপর, ১৯৩৫ থেকে আমার চোখের একটা সমস্যায় ভুগছি, ফলে গ্রীষ্মকালে বই পড়া বা লেখালেখি করে উঠতে পারি না। ফলে এক ধরণের সীমাবদ্ধতায় আমি বাঁধা পড়ে গেছি – ঈশ্বরের দ্বারা আরোপিত সীমাবদ্ধতা! বছরে তিনটি মাস আমাকে এমন একজন মানুষ হয়ে জীবন কাটাতে হয় যে লেখক নয়। এই তিনটি মাস আমি বন্ধুদের সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ করি, সকাল হওয়ার আগে পর্যন্ত বাইরেই থাকি।

আমি কি তবে জীবনকে যাপন করিনি?

-------------

অনুবাদক পরিচিতি:
উৎপল দাশগুপ্ত
অনুবাদক। আলোকচিত্রী
কলকাতায় থাকেন।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন