সোমবার, ২৮ মার্চ, ২০২২

ওটেসা মোশভেগের গল্প : তালাবদ্ধ কক্ষ



সমকালীন আমেরিকার গল্প
অনুবাদ: ফজল হাসান

তাকাশির পড়নে লম্বা কালো রঙের ছিন্নভিন্ন জামাকাপড়, মাছ ধরার জালের মতো ছেঁড়া স্টকিংস এবং বড় কালো বুট জুতার সঙ্গে লম্বা আলগা ফিতা লাগানো পোশাক, যা হাঁটার সময় মেঝেতে ছেঁছড়াচ্ছিল । সে ঘাম এবং সিগারেটের ধোঁয়ার তীব্র গন্ধ অনুভব করছিল । নোংরা এবং দাঁত দিয়ে কাটা নখের খোঁচাখুঁচির জন্য তার মুখের ফুসকুড়িগুলো থেকে কষ বের হচ্ছিল । সে মুখে পাউডারের প্রলেপ মেখে ক্ষত জায়গাগুলো ঢেকে রেখেছিল এবং তার মুখের প্রলেপ খুবই ফ্যাকাশে দেখাচ্ছিল । সে তার চোখের সব লোম কাটার জন্য কাঁচি ব্যবহার করেছিল । কখনো কখনো সে কালো কালির কলম দিয়ে ফরাসি ছাঁচে গোঁফ আঁকত । সে ছিল অত্যন্ত বুদ্ধিমান, কিন্তু মৃত্যু ও যন্ত্রণায় বিভোর ছিল । নিজের সম্পর্কে তার আলাদা পদ্ধতি ছিল, যা আমি সত্যিই পছন্দ করি । তার চুল ছিল দীর্ঘ এবং চুল পরিস্কার করে রামধনুর মতো রঙ মাখতো । মাঝে মাঝে সে তার ঠোঁটে কামড় দিত এবং তার চিবুক দিয়ে রক্ত ঝরে পড়তো । কখনো কখনো সে শুধু দৃশ্য তৈরি করার জন্য জনগণের সামনে বমি করত । তাকে সাহায্য করার জন্য অপরিচিতরা ছুটে আসত এবং রুমাল ও পানি ভর্তি বোতল তার দিকে এগিয়ে দিত । এমনকি আমরা যখন রাস্তায় হাঁটছিলাম, তখন দেখেছি লোকজন তার ছবি তোলার জন্য থেমেছিল । আমার মতোই ধ্রুপদী সঙ্গীতে তাকাশির দূর্বলতা ছিল: সেন্ট-সায়েন্স, ডেবুসি, রাভেল । বেহালা বাজানো ছিল তার অন্যতম প্রতিভা । সে আমাকে বলেছিল যে, তার যন্ত্রের মূল্য তার বাবার গাড়ির চেয়ে বেশি । সে মাঝে মাঝে যষ্টিমধুর চুইংগাম চিবাত, যা স্বাদ ছিল তার অত্যন্ত প্রিয় । কিন্তু যখন আমরা একে অপরকে চুম্বন করি, তখনও তার মুখে মলত্যাগের মতো স্বাদ পাই । তাকাশি ছিল আমার প্রথম সত্যিকারের পুরুষ বন্ধু ।

গত বসন্তে আমরা সঙ্গীত বিদ্যালয়ের বিশাল কনসার্ট হলের ওপরে একটি অনুশীলন কক্ষের ভেতর তালাবদ্ধ হয়েছিলাম । আমরা দুজনেই সেই অনুশীলন কক্ষে শনিবার বিকেলে সঙ্গীতে তালিম নিতে যেতাম । ঘটনাটি ঘটেছিল যুব অর্কেস্ট্রার কোনো এক রিহার্সালের সময় । সেখানে তাকাশি বেহালা বাজিয়েছিল । প্রথমে আমি ভেবেছিলাম যে, তাকাশি হয়তো আমাকে যৌন হয়রানি করার জন্য ফাঁদের ব্যবস্থা করেছে, কিন্তু আসলে আমার ধারণা ভুল ছিল । ঘটনাটি কীভাবে ঘটেছিল, তা ছিল ভীষণ হাস্যকর: আমরা কনসার্ট হলের পেছনে একটি পেঁচানো গোপন সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠেছিলাম । তখন কক্ষের মধ্যে অর্কেস্ট্রার শিল্পীরা বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে অনুশীলন করছিল । তাকাশির অনুশীলন শুরু হওয়ার আগে আমরা শুধু ঘোরাঘুরি করে দেখার জন্য সামান্য উৎসাহিত ছিলাম । অনুশীলন কক্ষে আমরা আমাদের পেছনে দরজা বন্ধ করে দিয়েছিলাম এবং তারপর আমরা বন্ধ দরজা খুলতে চেষ্টা করেও পারিনি ।

তালাবদ্ধ কক্ষে একটি খাট, একটি রেডিয়েটর, কয়েকটি চেয়ার এবং বাদ্যযন্ত্র রাখার জন্য স্ট্যান্ড ছিল । সেখানে কোনো পিয়ানো ছিল না । একজন পিয়ানোবাদক হিসাবে আমি কখনো কোনো অর্কেস্ট্রা দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম না । আমি তখন মূলত পড়াশোনা করছিলাম এবং আমাকে প্রায়ই অভিনয় করা থেকে দূরে থাকতে হত । আমি তাকাশির মতো বহির্মুখী ছিলাম না । আসলে সবকিছুই আমার স্নায়ুর চাপ বাড়িয়ে দিত । আংশিকভাবে এ জন্যই আমি তাকাশিকে এত বেশি পছন্দ করতাম । তাকে নির্ভীক মনে হযত । সে যা করতে চাইত, তা করতে পারত, এমনকি যদি তা ঘৃণ্য কোন কাজও হয় । ঘরের কোণে জামাকাপড় রাখার জন্য একটি তাক ছিল, যা আমি ফিগারোর ছাত্রের অনুষ্ঠান থেকে চিনেছি । অপেরাটি ছিল ছুটির উৎসবের অংশ এবং সেখানে বেহালা ও তারের বাদ্যযন্ত্রের জন্য আমার রচিত প্রথম সুর আত্মপ্রকাশ করেছিল । তাকাশি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে বেহালা বাজিয়েছিল । তারের বাদ্যযন্ত্রের অংশটি খুবই কঠিন ছিল এবং আমি এতটাই স্নায়ুর চাপে ছিলাম যে, আমার পিয়ানো শিক্ষক, মিসেস ভি, শেষ মুহূর্তে আমার হয়ে বাদ্যযন্ত্র বাজিয়েছিলেন ।

আমরা বন্ধ দরজায় জোরে ধাক্কা দিয়েছি এবং চিৎকার করেছি । কিন্তু কেউ শুনতে পায়নি । আমরা সঙ্গীতানুষ্ঠান পরিচালকের চিৎকার শুনতে পেয়েছি এবং তারপর বাদ্যযন্ত্র বাজতে শুরু করেছিল । আমি বন্ধ দরজার ফুটোয় আমার চুলের ক্লিপ ঢুকিয়ে খোলার চেষ্টা করেছি । তাকাশির কাছে ছোট ছুরি ছিল, যা সে নিজেকে বিকৃত করার জন্য বহন করত । তবে আমরা উভয়ই বন্ধ দরজা ভেঙে ফেলার জন্য বা দরজার কব্জাগুলো আলগা করার জন্য স্ক্রু ড্রাইভার হিসেবে ছুরি ব্যবহার করেছি, কিন্তু দরজা খুলতে পারিনি । অন্য দরজাটি অগ্নি নির্গমন পথের জন্য ছিল, যা ইস্পাতের তৈরি শক্তিশালী বন্ধ দরজা । সেই দরজার পিছনে আরও একটি গোপন সিঁড়ি ছিল এবং তা শুধু দালান রক্ষণাবেক্ষণ কর্মীরা ব্যবহার করত । আমরা পরে তা জানতে পেরেছি । বন্ধ কক্ষে একটি জানালা ছিল, যা সরু পথের দিকে মুখ করা ছিল । সরু পথের অন্যদিকে কংক্রিটের গাড়ি পার্কিং ছিল । আমরা ছিলাম পঞ্চম তলায় ।

“আমাদের উচিত এসব পোশাক এক সঙ্গে বেঁধে দড়ি বানানো এবং রেডিয়েটরের সঙ্গে এক প্রান্ত বেঁধে অন্য প্রান্তকে সরু পথের দিকে ছুড়ে ফেলা । তারপর তুমি দড়ি বেয়ে নিচে নেমে যেতে পারবে এবং আবার ওপরে উঠে এসে আমাকে নিয়ে যেতে পারবে,” আমি তাকাশিকে বললাম ।

তাকাশি তার কব্জির শিরায় আঁচড় কাটে । “এসো, আমরা এখানে চিরকাল থাকি,” সে বলল । “যাহোক, তুমি নিচে নেমে যেতে পারবে । তুমি হালকা এবং তুমিই সেই মেয়ে ।”

তারপর আমরা দু’জনেই কিছুক্ষণ চুপ করে থাকি । একসময় আমি কাপড় ঝুলানোর হ্যাঙ্গার থেকে কয়েকটি সাজসজ্জার পোশাক বের করি এবং সেগুলো পড়ে গায়ে লাগবে কিনা, তা পরীক্ষা করি । তখন আমি জানালার কাঁচে নিজের প্রতিফলন দেখতে পেয়েছি । আমাকে বড় ব্লাউজ এবং খাটো জামায় ছোট ক্লাউনের মতো লাগছিল । তাকাশি ছোট ধূসর পরচুলা খুঁজে পেয়েছিল এবং সে তাই চেষ্টা করেছিল ।

“তোমাকে পরচুলায় দারুণ দেখাচ্ছে,” আমি তাকাশিকে বললাম । সে পরচুলা খুলে ফেলে এবং হাতে ধরে রাখে । একসময় সে পরচুলায় হাত বুলাতে থাকে, যেন পরচুলাটি তার ভীষণ পছন্দের বিড়ালছানার মতো ।

আমি আমার সাজসজ্জার পোশাক খুলে ফেলি এবং আলনার সমস্ত পোশাক এক সঙ্গে দুটি গিঁট দিয়ে বাঁধি । তাকাশি একটা নীল সুতির শার্ট ধরে এবং নাকের কাছে এনে শুঁকে মাটিতে ছুড়ে ফেলে দেয় । “যদি আমাদের প্রস্রাব করতে হয়, তবে আমরা এ শার্টের মধ্যে প্রস্রাব করতে পারি,” সে বলল । সৌভাগ্যবশত আমাকে প্রস্রাব করতে হয়নি । আমরা রেডিয়েটরের সঙ্গে জামাকাপড় দিয়ে বানানো দড়ি বাঁধি । আমরা জানালা খুলে দড়ির এক মাথা বের করে নিচে ঝুলিয়ে দেই । দড়ির শেষাংশ মাটিতে পৌঁছায়নি, কিন্তু আমাদের মধ্যে কেউ যদি দড়ি বেয়ে নিচে নেমে যায়, তবে ফুটপাতের অবশিষ্ট দূরত্ব কেবল এক বা দু’তলার সমান অবশিষ্ট থাকবে । আমি ভাবিনি যে, শেষ পর্যন্ত নিচে নামা প্রাণনাশক হতে পারে ।

আমার মস্তিস্কে চিন্তা এসে হাজির হয় এবং তা ছিল একটি প্রশ্ন: “আপনি কী দেখতে পাচ্ছেন, ঈশ্বর?” ঈশ্বর যেন লুকানো ক্যামেরার মতো দেওয়ালে বসা কোনো মাছি । আমি তাকাশিকে আমার ভাবনার কথা বলেছি । সে আমাকে বলেছে যে, সে একজন নাস্তিক, কিন্তু নরকে বিশ্বাস করে । আমি খোলা জানালা দিয়ে নিচের দিকে তাকাই । গৃহহীন এক লোক সরু গলিতে আবর্জনা ভর্তি ঠেলা গাড়ি ঠেলছে ।

“এই যে!” আমি চিৎকার করে বললাম । তাকাশি আমার হাত ধরে আমাকে চুপ করে থাকতে বলল । “আমরা এখানে আটকা পড়েছি!” আমি আর্তচিৎকার করে বললাম । তাকাশি যখন আমার মুখের উপর হাত চেপে ধরে, তখন আমি তার হাতের পরচুলার ভেতর থেকে শিশু পাউডারের মতো এবং মল-মূত্রের স্বাদ পেয়েছি ।

আমি তাকাশির আঙ্গুলে কামড় দিয়েছি, খুব জোরে নয়, তবে আমাকে আলগা করার সময় তার জন্য যথেষ্ট জোরে ছিল । আমি প্রস্রাব করার জন্য নীল শার্টটি তুলে নিয়েছি এবং এই আশায় জানালার বাইরে ফেলে দিয়েছি যে, শার্টটি গৃহহীন লোকটির দৃষ্টি আকর্ষণ করবে । শার্টটি বাতাসে শুধু সরু পথের এক পাশে চলে গিয়েছে এবং আবর্জণা-স্তুপের আড়ালে অদৃশ্য হয়ে যায় । আমি আপন মনে ঈশ্বরের সঙ্গে কথা বলি । “দয়া করে দরজা খুলুন,” আমি বললাম । আমি পুনরায় উভয় দরজা খোলার চেষ্টা করি । অবশ্য তখনও দরজা দুটি তালাবদ্ধ ছিল । তখন নিজেকে খুব বোকা লাগছিল ।

আমি তাকাশির কাছে আমার মনের কথা প্রকাশ করার চেষ্টা করি । “যদি তুমি কোনো কিছু বিশ্বাস কর, বাস্তবিকভাবে এবং সত্যি সত্যিই, তখন তা বাস্তবে পরিণত হয়,” আমি বললাম । “তুমি কী তাই মনে কর না?”

“আমি মৃত্যু বিশ্বাস করি,” তাকাশি জবাবে বলল । সে ঝুঁকে পড়ে সরু গলির দিকে রক্তের থুতু ফেলে । খানিকটা রক্ত এবং থুতু তার চিবুকের নিচে ফোঁটা হয়ে ঝুলে থাকে । তারপর সে বিছানার উপর বসে আবার পরচুলায় হাত বুলাতে থাকে ।

আমি অনুভব করি, আমাকে তালাবন্ধ ঘর থেকে পালানোর চেষ্টা করতে হবে । আমি জোরে দড়ি টানি । দড়ির এক দিক রেডিয়েটরের সঙ্গে যথেষ্ট শক্ত করে বাধা ছিল বলে মনে হয়েছে । সুতরাং আমি দড়ি আমার বাহুর সঙ্গে পেঁচিয়ে বাঁধি এবং শক্ত করে ধরে জানালা গলিয়ে বেরিয়ে আসার জন্য পা বের করি । তাকাশি সোফায় বসে তার মুখের ওপর থেকে পাঁচড়া তুলে নিয়ে আমার দিকে তাকাল । আমি তাকে বলেছি যে, আমি পড়ে যাওয়ার ভয়ে ভীত নই, এমনকি এক মুহুর্তের জন্যও আমার স্নায়ুর চাপ ওঠানামা করেনি । কোনভাবেই না ।

তারপর যা ঘটেছে, তা পুরোপুরি সত্য । আমি যেই জানালা দিয়ে বেরিয়ে এসেছি, তখন আমি ভয়ে দড়ি আঁকড়ে ধরি, সামান্য নিচুতে নেমে আসি এবং দালানের পাশে আমার জুতার তলি সমান্তরালভাবে স্থাপন করি । তখন একটা গাড়ি সরু রাস্তার ওপর দিয়ে চিৎকার করতে করতে আসে । গাড়ির রঙ তামাটে, তবে খুবই চকচক করছিল । গাড়ির আওয়াজ প্রচন্ড জোরে ছিল । গাড়ি আমার নিচে এসে থামে । আমি বরফের মতো জমে যাই । তাকাশি ধূসর পরচুলা আমার পাশ দিয়ে জানালার বাইরে ফেলে দেয় । আমি চিৎকার করে নিজেকে আবার ওপরে তুলে নেই এবং জানালার কিনারায় হাঁটু গেড়ে বসি । আমি নীচের দিকে তাকাই, যদিও ভয়ে আমার মাথা ঝিমঝিম করছিল । তখন আকাশ জুড়ে ভীষণ জোরে বাতাস বইছিল । এক লোক গাড়ি থেকে নেমে আসে । তার অঙ্গভঙ্গি প্রচন্ড উগ্র এবং সে রাগান্বিত ছিল । যখন সে আমার দিকে ইঙ্গিত করেছিল এবং চিৎকার করে বলেছিল, “যুবতী মহিলা, এ মুহুর্তে আপনার ফিরে যাওয়া উচিত!” আমি কখনো কাউকে এমন রাগান্বিত হতে দেখিনি, এমনকি আমার মাকেও কখনো এত রাগ করতে দেখা যায়নি । “যুবতী মহিলা!” লোকটি পুনরায় বলল । সে আমার দিকে আঙুল তুলে শূন্যে ছুড়ে মারে । এখন আমি মনে মনে তাকে কালো স্যুট এবং চকচকে কালো জুতা পরিহিত কাউকে চিত্রায়িত করি । কেননা এত উঁচু থেকে আমি তার প্যান্ট বা জুতা ঠিক মতো ঠাহর করতে পারিনি । আমার মনে হয় লোকটির পড়নে আসলে সাদা টি-শার্ট এবং চোখে গাঢ় রোদ চশমা ছিল ।

লোকটি আমাকে যা করতে বলেছিল, অবশ্যই আমি তা করেছি । আমি নিজের সঙ্গে দড়ি বাঁধি এবং জানালার ওপর দিয়ে নিজেকে উঁচু করে ঘরের ভেতরে ফিরে আসি । আমি সোফার আড়ালে লুকিয়ে থাকি । তখন ঘরের ভেতরে প্রচন্ড গরম ছিল, তবে পরিবেশ ছিল শান্ত । আমি আমার হৃদস্পন্দন শুনতে পাচ্ছিলাম । তাকাশি উঠে জানালা গলিয়ে বাইরে তাকাল এবং বলল, সে লোকটিকে মাথা নাড়তে এবং গাড়িতে ফিরে যেতে দেখেছে । আমি গাড়ির দরজা বন্ধ করার আওয়াজ এবং দূরে চলে যাওয়ার শব্দ শুনতে পাই ।

“আমাদের পোশাক হ্যাঙ্গারে ঝুলিয়ে রাখা উচিত,” তাকাশি অলস ভঙ্গিতে দড়ি টানতে টানতে বলল ।

আমি বেশ ঘাবড়ে গিয়েছিলাম । আমি লোকটির সম্পর্কে তাকাশির সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিলাম, কিন্তু তাকাশি আমার দিকে তাকায়নি । আমি দড়ি টানতে তাকে সাহায্য করেছি এবং একসময় আমরা পোশাক খুলে আলনার ওপর রেখেছি । আমি চেয়েছি তাকাশি আমাকে বলুক যে, ঘরের ভেতর আমার নিরাপদে থাকার জন্য সে চিন্তামুক্ত এবং যদি আমি মারা যেতাম, তবে সে দুঃখ পেত । আমি রাগী লোকটিকে নিয়ে আলোচনা করতে চেয়েছি । আমি বলতে চেয়েছি যে, দেবদূতের প্রতি বিশ্বাস আছে । কিন্তু আমি ভয় পেয়েছিলাম যে তাকাশি হয়তো তার দৃষ্টি ঘুরিয়ে নেবে । সে সাদা শার্টে নাক পরিস্কার করে এবং ঘাড়ে একটা ফুসকড়ি চেপে ধরে ।

আমরা সোফায় পিঠ ঠেকিয়ে মেঝেতে বসি এবং সরু রাস্তায় গাড়ি পার্কিংয়ের পেছনে বিশাল আকাশ অন্ধকারে ডুবে যেতে দেখি । কয়েক ঘন্টা আগেই অর্কেস্ট্রা রিহার্সাল শেষ হয়েছে । আমি জানতাম আমার মা রেগে যাবেন । কেননা আমি রাতের খাবারের জন্য সময় মতো বাড়িতে পৌঁছুতে পারিনি । তাকাশি তার হাতের ব্যাগ থেকে একটা সিগারেট বের করে এবং তাতে অগ্নি সংযোগ করে । আমরা জ্বলন্ত সিগারেট একজনের সঙ্গে আরেকজনের হাত বদল করি এবং জানালার পাশে মেঝেতে যেখানে বসেছি, সেখান থেকে দৃশ্যমান চাঁদের ফালি লক্ষ্য করে ধোঁয়া ছাড়ি । অবশেষে তাকাশি গাড়িতে থাকা লোকটি সম্পর্কে তার নিজস্ব মতবাদ বলল । “তিনি অলৌকিক অস্তিত্বে বিশ্বাসী । আমরা ঘূর্ণির মধ্যে আছি । আমরা কৃষ্ণ গহ্বরে আটকে আছি । আমরা সব সময় এ পরিস্থিতির মধ্যে আছি । আমরা কখনো বাস্তব কিছুই দেখিনি । শুধু এই তালাবন্ধ কক্ষটিই আসল । সে জ্বলন্ত সিগারেট তার ঠোঁটের ফাঁকে চেপে ধরে । “তোমার সেই নীল জামা জানালার বাইরে ফেলে দেওয়া উচিত হয়নি,” তাকাশি বলল । “এখন আমাদের বাস্তবতা ফুটো হয়ে গেছে । আর আমাকে প্রস্রাব করতে হবে ।”

“তোমার সেই ধূসর পরচুলা ফেলে দেওয়া উচিত হয়নি,” আমি বললাম । যখন আমি ভেবেছি যে, বাতাসের মধ্যে ছোট্ট এক বিড়ালছানা ঘুরে বেড়ানোর মতো কীভাবে ধূসর পরচুলাটি আমার পাশ দিয়ে উড়ে গেল, তখন আমার হৃদস্পন্দন পুনরায় দৌঁড়াতে শুরু করে । আমি জানি না, সেই পরচুলার পরিণতি কী হয়েছিল । হয়তো গাড়িতে বসা কেউ উড়ন্ত পরচুলা ধরে বাড়িতে নিয়ে গেছে । আমি তাকাশিকে বললাম, আমি তার বান্ধবী হতে চাই না । সে কিছু বলেনি ।

সেই ঘটনার পর আমি খুব বিষণ্ণ বোধ করেছি । আমার সামনে অনন্তকাল রাখা হয়েছিল এবং বিছানা, চেয়ার এবং বাদ্যযন্ত্র রাখার স্ট্যান্ড, কুঁচকানো সাজপোশাক, রেডিয়েটর এবং তাকাশি ছাড়া আর কিছুই ছিল না । সেখানে সেই বন্ধ ঘর ছিল নরক । সিগারেট শেষ হয়ে গেলে তাকাশি আমাকে চুম্বন করার চেষ্টা করেছিল । আমি শুধু মাথা অন্য দিকে ঘুরিয়ে নিয়েছি ।

ঘটনার খুব বেশি দিন পরে নয়, একজন প্রহরী এসে আমাদের উদ্ধার করে । “আমি ধোঁয়ার গন্ধ পেয়েছিলাম,” প্রহরী তাকাশির ঠোঁটের চারপাশে জমাট বাঁধা রক্তের দিকে তাকিয়ে বলল ।

আমরা যখন গোপন সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে সঙ্গীত বিদ্যালয়ের অন্ধকার এবং শান্ত বারান্দা দিয়ে যাচ্ছিলাম, তখন আমি কেঁদেছি । তাকাশি তার বেহালা খুঁজে পেয়েছিল এবং কনসার্ট হলের যেখানে বাদ্যযন্ত্রীরা অনুশীলন করেছিল, সেখানে টেবিলের নীচে আমি আমার সঙ্গীতের খাতাটি রেখেছিলাম ।

বাইরে আবহাওয়া উষ্ণ এবং মনোরম সন্ধ্যা ছিল, যেন কোনো কিছুতেই ভুল ছিল না । তাকাশি বাস স্টপেজে হাত নেড়ে আমাকে বিদায় জানায় এবং আমি ট্রামের দিকে এগিয়ে যাই । বাড়িতে পৌঁছে আমি রান্নাঘরে বসি । আমার মা আমাকে একটি ঠান্ডা সেদ্ধ আলু, দুধ ছাড়া কফি এবং স্বাস্থ্যকর দইয়ের একটি ছোট বাটি এগিয়ে দেন ।

“আমাকে খুশি করার জন্য তোমার আরো জোরালোভাবে চেষ্টা করা উচিত,” তিনি বললেন । “নিজের ভালোর জন্যই ।”

“আমি আপ্রাণ চেষ্টা করব,” আমি তাকে বললাম । “আমি প্রতিজ্ঞা করছি ।”

কিন্তু আমার মাকে খুশি করার জন্য আমি কখনোই খুব বেশি চেষ্টা করিনি । আসলে আমি সেই দিনের পরে তালাবন্ধ কক্ষে কাউকে খুশি করার জন্য কঠোর পরিশ্রম করিনি । এখন আমি শুধু নিজেকে খুশি করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছি । এখানে শুধু এটুকুই গুরুত্বপূর্ণ । এটা সেই গোপন জিনিস, যা আমি খুঁজে পেয়েছি ।




লেখক পরিচিতি: সমকালীন মার্কিন কথাসাহিত্যের প্রতিভাবান নারী লেখক ওটেসা মোশভেগের জন্ম ১৯৮১ সালে । তিনি বার্নার্ড কলেজ থেকে ইংরেজিতে বিএ এবং ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লিটারারি আর্টসে এমএফএ ডিগ্রি অর্জন করেন । পরবর্তীতে তিনি স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের কথাসাহিত্যের ওয়ালেস স্টেগনার ফেলো ছিলেন । তার প্রথম উপন্যাস আইলিন (২০১৫ সালে প্রকাশিত) । উপন্যাসটি ২০১৬ সালে ম্যান বুকার পুরস্কারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় স্থান পেয়েছিল এবং ন্যাশনাল বুক ক্রিটিকস সার্কেল অ্যাওয়ার্ডের জন্য মনোনীত হয়েছিল । তবে লেখিকার প্রথম উপন্যাসের জন্য পেন / হেমিংওয়ে পুরষ্কার জিতেছিল। তার দ্বিতীয় উপন্যাস মাই ইয়ার অফ রেস্ট অ্যান্ড রিল্যাক্সেশন (২০১৮) নিউ ইয়র্ক টাইমসের বেস্টসেলার ছিল। তার তৃতীয় উপন্যাস ডেথ ইন হার হ্যান্ডস প্রকাশিত হয় ২০২০ সালে । এছাড়াও তার ঝুলিতে রয়েছে ছোটগল্প সংকলন (হোমসিক ফর অ্যানাদ্যার ওয়ার্ল্ড, ২০১৭) এবং নভেলা (ম্যাগ্লু, ২০১৪) । ম্যাগ্লু নভেলার জন্য তিনি হলেন ‘ফেঞ্চ মডার্ণ প্রাইজ ইন প্রৌজ’-র প্রথম প্রাপক । এছাড়া তার মাই ইয়ার অব রেস্ট অ্যান্ড রিল্যাক্সেশন (২০১৮) ‘ওয়েলকাম বুক প্রাইজ’-এর সংক্ষিপ্ত তালিকায় জায়গা করে নিয়েছিল । বর্তমানে তিনি দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ায় বসবাস করছেন।

গল্পসূত্র: ‘তালাবদ্ধ কক্ষ’ গল্পটি ওটেসা মোশভেগের ‘দ্য লকড্ রুম’ গল্পের অনুবাদ। গল্পটি ‘দ্য ব্যাফলার’ ম্যাগাজিনে (মার্চ ২০১৬) প্রকাশিত হয় এবং সেখান থেকে বাংলায় অনুবাদ করা হয়েছে।





অনুবাদক পরিচিতি:
ফজল হাসান
গল্পকার। অনুবাদক।
অস্ট্রেলিয়ায় থাকেন।













1 টি মন্তব্য: