সোমবার, ২৮ মার্চ, ২০২২

জর্জ স্যন্ডার্সের গল্প: ভালোবাসায় মোড়ানো চিঠি

 



সমকালীন আমেরিকান গল্প
অনুবাদ: মৌসুমী কাদের



ফেব্রুয়ারি ২২,২০২_


প্রিয় রবি,
 
তোমার ই-মেইল পেয়েছি, বাবা। হাতে লিখে উত্তর দেওয়ার জন্য দুঃখিত। যা নিয়ে কথা বলতে চাইছি তা নিয়ে ই-মেইল করাটা ঠিক হচ্ছে কিনা জানি না, তবে অবশ্য এটা নির্ভর করে তোমার উপর, বাবা (তোমার মা বলেছেন, তুমি এখন নাকি প্রায় ছয় ফুট? ), তুমি জানো সময়টা এখন ভীষণ অদ্ভুত। 
এখানে খুব সুন্দর একটা দিন আজ। এক ঝাঁক হাঁস এইমাত্র ডেকের ওপরে নেমে এসেছে। তুমি ভালোবেসে ক্রিসমাসে যে উজ্জ্বল-নীল বড় কাপগুলো পাঠিয়েছিলে, তোমার দিদিমা আর আমি সেগুলো হাতে ধরে আছি। হাঁসগুলো কোমর দুলিয়ে রোজলির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, মনে হয় গলফ কোর্সে পৌঁছালে সহজেই খাবার পাবে।
 
এই চিঠিতে সবার নামের আদ্যাক্ষরগুলো ব্যবহার করছি বলে আমাকে ক্ষমা করো। জি., এম. বা জে. ওদের জন্য আরও অসুবিধা সৃষ্টি করতে চাইনা (ওরা সবাই ভাল মানুষ, গত ইস্টারে তুমি যখন এসেছিলে, তখন ওদের সাথে দেখা হয়ে খুব ভাল লেগেছিল।) যদি এখানে বাড়তি কিছু লেখা হয়, এবং তুমি ছাড়া যদি অন্য কেউ চিঠিটি পড়ে।
 
আমার মনে হয় জি. সম্পর্কে তোমার ধারণা ঠিক। সেই সুযোগটা চলে গেছে। যেতে দেওয়াই ভাল। তোমার ব্যাখ্যা অনুযায়ী এম. এর সঠিক কাগজপত্রের কমতি ছিল না, কিন্তু সে (নারী) জানত জি.-র বিষয়টায় ঝামেলা ছিল, তাই না? কিন্তু সে এ নিয়ে কিছুই করেনি? আমি বলছি না যে, তার করা উচিত ছিল। কিন্তু আমরা যদি চেষ্টা করি তারা কী ভাবছিল, এটা করা উচিতও – তারপর যদি জিজ্ঞেস করি, কেন এম. (আবারও, তাদের মত করে, তাদের চিন্তাভাবনা অনুসারে) যা করা ‘উচিৎ’ ছিল তা করেনি, কর্তৃপক্ষের কাউকে জি. সম্পর্কে জানায়নি? যেহেতু এখানে থাকাটা ‘একটি বিশেষ অনুগ্রহ, অধিকার নয়।’ আমরা কি (এটা শুনতে শুনতে অসুস্থ হয়ে গেছি), ‘আইন মেনে চলার’ জাতি নই?
 
যদিও তারা নিজেদের বিশ্বাসের সাথে মিল রেখে প্রতিনিয়তই আইন পরিবর্তন করছে!

বিশ্বাস করো, এসব নিয়ে তোমার মতো আমিও খুবই বিরক্ত।

কিন্তু এই পৃথিবী, আমার (অতীত) অভিজ্ঞতা অনুসারে, কখনো কখনো একটি নির্দিষ্ট ছক ধরে চলে, এবং এত বিশাল এবং দুর্বোধ্য হওয়ার কারণে, সরে যাওয়ার পর তাকে আর আগের ভাল অবস্থায় ফিরিয়ে আনা যায় না। আর তাই, বর্তমান পরিস্থিতিতে, আমি বলব, তাদের মত ঠিক চিন্তা করা আমাদের জন্য দরকার যাতে – যতটা সম্ভব – বিরসতা এবং ক্ষতি ভবিষ্যতে এড়ানো যায়।
 
কিন্তু, তুমি অবশ্য জে.-র কথা জানতে লিখেছিলে। হ্যাঁ, তুমি যে আইনজীবীর কথা বলেছিলে, তাঁর সাথে আমার এখনো যোগাযোগ আছে। মনে হয় না উনি খুব একটা কাজে আসবেন। এই সময়ে। হ্যাঁ, অতীতে তিনি রাজপুত্রের পদক্ষেপে আদালতে ঢুকতেন বটে, কিন্তু এখন তিনি আর সেই মানুষটি নেই। হয়ত তিনি একটু বেশী উদ্যমী হয়েই বিচার মন্ত্রনালয়ের কার্যরত বিচারকদের মূল্যায়ন/বহিস্কার বিষয়ে বিরোধিতা করেছিলেন এবং এর ফলাফলে সংবাদমাধ্যমে প্রবল লাঞ্ছনাও সয়েছিলেন। তাঁর সম্পত্তিতে আঘাত করা হয়েছিল এবং কিছুদিনের জন্য কারাগারেও ছিলেন। আর এখন যা শুনি, তাঁর সকল চিন্তা-ভাবনা নিজের মধ্যেই রেখে বাড়ির আঙ্গিনায় পায়চারি করেন।

জে. এখন কোথায়? জানো নাকি? স্টেট না ফেডেরাল কারাগারে? এটা জানা দরকার। আমার ধারনা তারা (অনুগতরা, যাদের পেছনে আদালতের ক্ষমতা রয়েছে) বলবে যে, যদিও জে. একজন নাগরিক, কিন্তু তিনি (নারী) – অনুরোধ সত্ত্বেও জি. এবং এম.-এর তথ্য সরবরাহ করতে অস্বীকার করে তার কিছু অধিকার এবং সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। তোমার হয়ত আমাদের বন্ধু আর. এবং কে.-র কথা মনে আছে? তোমার পঞ্চম (বা ষষ্ঠ) জন্মদিনে ওরা তোমাকে একটা ব্রোঞ্জের পয়সা জমানোর লিঙ্কন-মূর্তি উপহার দিয়েছিল। তাদের সঙ্গে আমার এখনো যোগাযোগ আছে, তারা রাষ্ট্রের প্রতি অনুগত – তাদের ধ্যান-ধারনাও সেরকম।

ব্রেমারটনের একজন লোক জিমে আরেকটি লোকের সাথে বন্ধুত্ব করেছিল এবং তারা একসাথে দৌড়াতেও শুরু করেছিল – এরকম ব্যাপার। প্রথম লোকটি তার বন্ধুর ভোট দেবার ইতিহাস সম্পর্কে মন্তব্য করতে অস্বীকার করে, এর পরেই দেখা গেল তার কাজের গাড়িটি আর সে নিবন্ধন করতে পারছে না (তার ছিল ফুলের ব্যবসা, তাই গাড়িটা দরকার ছিল)। আর. এবং কে. এই ব্যাপারে কী মনে করে – যে লোকটি তার স্বদেশী সরকারের একটি ‘সহজ প্রশ্নের’ উত্তর দিতে অস্বীকার করে, সে কখনই ‘দেশপ্রেমিক’ হতে পারে না?

এই অবস্থা এখন আমাদের।

তুমি জিজ্ঞেস করেছিলে যে, তুমি কি কিছুই করবে না, এভাবে তোমার বন্ধুর জীবনকে ধ্বংস হতে দেখবে?

এর দুটো উত্তর রয়েছে; একটি নাগরিক হিসেবে এবং অন্যটি তোমার মাতামহ হিসেবে।

(তোমার একটা কঠিন সময়ে তুমি আমার দিকে হাত বাড়িয়েছ, আমি খোলামেলাভাবে উত্তর দেবার চেষ্টা করব।)
 
একজন নাগরিক হিসেবে আমি অবশ্যই বুঝতে পারি কেন একজন তরুণ (বুদ্ধিমান এবং সুদর্শন, আরও যোগ করি – যাকে চেনাই সবসময় আনন্দের) অনুভব করে যে, তার বন্ধু জে.র জন্য তার ‘কিছু একটা করা’ কর্তব্য।
 
কিন্তু সে ঠিক কী?

এটাই প্রশ্ন।

একটা নির্দিষ্ট বয়সে পৌঁছালে মনে হবে আমাদের অধিকারে শুধু আছে সময়। এটা বলতে বোঝাচ্ছি সেই সব মুহূর্তগুলো – যেমন আজ সকালে যখন মাথার ওপর দিয়ে যখন হাঁসগুলো উড়ে গেল, যেমন তোমার মা’র জন্ম হতে দেখা, যেমন এই খাবার টেবিলে বসে ফোন বেজে ওঠার অপেক্ষায় থাকা যে ফোন জানান দেবে একটি শিশুর (তোমার) জন্মবার্তা, অথবা সেই দিনটির কথা যেদিন আমরা সবাই মিলে পয়েন্ট লোবোসে হাইকিং করতে গিয়েছিলাম। সেই হরিণশাবক, অত্যন্ত সরব সিলমাছ, নিচে কালো লোনা পাথরের কাছে তোমার বোনের স্কার্ফটির পড়ে যাওয়া, মন্টেরিতে ফিরে নিজ ঔদার্যে তাকে তোমার আরেকটি নতুন স্কার্ফ কিনে দেয়া, তোমার সহৃদয়তায় তাকে অসম্ভব আনন্দ দেয়া। সেগুলো সব বাস্তব ছিল। এগুলোই (এবং শুধু এটুকুই) একজন পেতে পারে। অন্যান্য যা কিছু আছে তা ততটুকুই বাস্তব যতটুকু দিয়ে তারা এই মুহূর্তগুলোর উপভোগে বাধা দেয়।

এখন, তুমি হয়ত বলতে পারো (আমি যেন শুনছি তুমি এটা বলছ, তোমার মুখাবয়বে সবসময় যেরকম হয় সেরকম প্রতিক্রিয়াও দেখছি) যে, জে.-র এই ঘটনাটি এক ধরণের ঝামেলা। আমি তোমার মতামতকে শ্রদ্ধা করি। কিন্তু তোমার মাতামহ হিসেবে আমার অনুরোধ, এই সময়ের শক্তি/বিপদগুলোকে অগ্রাহ্য করো না। তোমাকে সম্ভবত আগে কখনও বলা হয়নি: এসবের শুরুতে স্থানীয় পত্রিকার সম্পাদককে আমি দুটো চিঠি লিখেছিলাম। একটা ছিল কথায় ভরপূর, অন্যটি নিতান্তই কমিক। কোনটারই কোন প্রভাব পড়েনি। যারা আমার সাথে একমত ছিল তারা একমতই থাকল, যারা একমত ছিল না তারা নিজেদের সিদ্ধান্তেই বহাল রইল। আমার তৃতীয় প্রচেষ্টাটি যখন প্রত্যাখ্যিত হল, একদিন আমার বাড়ির কাছেই পুলিশ আমার গাড়িকে থামাল। কোনো কারণ ছাড়াই আমি বলব। পুলিশটি (একজন ভাল মানুষ যদি আমাকে বল, একেবারে বাচ্চা) জিজ্ঞেস করল, আমি সারাদিন কী করলাম। আমার কোন শখ আছে কি? আমি বলেছিলাম, নেই। তখন সে বলেছিল, আমরা কেউ কেউ শুনেছি আপনি নাকি টাইপ করতে পছন্দ করেন। গাড়িতেই বসেছিলাম, ওর ফ্যাকাশে বড় বাহু পার হয়ে দেখছিলাম মুখখানা। ওর মুখটা ছিল শিশুর মত, আর বাহু ছিল পুরুষের।

জিজ্ঞেস করেছিলাম, আপনি কীভাবে এটা জানলেন?

‘শুভরাত্রি, স্যার!’ সে বলেছিল, ‘কম্পিউটার থেকে দূরে থাকবেন।’

ওহ ইশ্বর, সেই অন্ধকারে ছেলেটির নির্বুদ্ধিতা আর তার বিরাট আকার, তার কোমড়ের বেল্ট থেকে ধাতব ঝন্‌ঝন্‌ আওয়াজ, তার নৈতিক কার্যকারণ সম্বন্ধে দৃঢ় নিশ্চয়তা! – বলা যায় যে নীতিটি এতদিন পরেও আমি বুঝে উঠতে পারিনি, এমনকী ওদের অবস্থান থেকে দেখতে চেয়েও ব্যর্থ হয়েছি।

আমি চাইনা তুমি কখনো এরকম মানুষের ধারে কাছে আসো, অথবা তার প্রভাবে পড়ো।
 
এবার আমার মনে হয় তোমার ইমেইলের শেষ অংশটির দিকে একটু নজর দিতে বলতে হবে, যেটি (তোমাকে আশ্বস্ত করতে চাই) আমাকে মর্মাহত করেনি বা ‘আমার অনুভূতিতেও আঘাত করেনি’। না। যখন তুমি আমার বয়সে পৌঁছুবে, এবং ভাগ্য ভাল থাকলে তোমারই মতো একজন নাতি (উজ্জ্বল) পাও, তাহলে জানবে যে, সে নাতি যাই বলুক না কেন তোমার অনুভূতিতে তা কোনোভাবেই আঘাত করবে না। আসলে, আমি খুব আবেগপীড়িতই হয়েছি যে, তুমি তোমার প্রয়োজনের সময় আমাকে লেখার কথা ভেবেছ, যে লেখা খুবই সরাসরি এবং (স্বীকার করছি) কিছুটা আমার প্রতি কিছুটা রুক্ষও।
 
হ্যাঁ, এখন সবকিছু বিচার করলে আমার অনুশোচনা হয়। একটা জটিল সময় ছিল। এখন আমি সেটা বুঝতে পারি। সেই সময়ে, তোমার মাতামহী এবং আমি প্রতি রাতে জিগস পাজল খেলতাম, তোমার খুব পরিচিত সেই ডাইনিং-রুমের টেবিলে। তখন আমরা রান্নাঘরটা নতুন করে তৈরী করার চিন্তা করছিলাম, অনেক খরচ করে উঠোনে দেয়ালগুলো মেরামত করার মধ্যে ছিলাম, আর আমার দাঁতের সমস্যাগুলো প্রথম ভোগাতে শুরু করেছিল, আমি তো জানি তুমি দাঁত নিয়ে অনেক শুনেছ (বেশী শুনে ফেলেছ কি?)। প্রতিরাতে, আমরা যখন মুখোমুখি বসে সেই পাজল খেলতাম, পাশের ঘরের টেলিভিশন থেকে এমন সব ঘটনার তিক্ত বিবরণ ভেসে আসত যা আগে কখনও ঘটেনি, যা আমরা আগে ভাবতে পারেনি ঘটবে তাই ঘটছিল। আর টেলিভিশনের পন্ডিতদের প্রতিক্রিয়া ছিল আত্মতুষ্ট অবজ্ঞার, তারা ধরে নিয়েছিল, অনেকটা আমাদের মতনই, যে, ওইসব জিনিস খুব শীঘ্রই উল্টে যাবে এবং সবকিছু আগের অবস্থায় ফিরে যাবে – কোনো প্রাপ্তবয়স্ক বা প্রাপ্তবয়স্করা আসবেন, যেমন তাঁরা অতীতে আসতেন, সবকিছু ঠিক করে দেবার জন্য।
 
আমাদের এটা মনে হয়নি (চিঠিটা পড়ার পরে এটাকে ধ্বংসে করে দিও, প্লিজ) যে এমন ভাঁড়ের মতন কেউ এত মহৎ এবং সময়পরীক্ষিত শক্তিশালী কিছুকে ব্যাহত করতে পারে যা আক্ষরিকভাবে আমাদের নিত্যদিনের সঙ্গী ছিল। বলতে পারো, আমরা একটি অসামান্য উপহারকে গ্রহণ করেছিলাম তাকে মূল্য না দিয়ে। বুঝতে পারিনি যে, সেটি নিতান্তই দুর্লভ এক সমাপতন, অলীক কিছু একটা, পারস্পরিক বোঝাপড়া এবং ঐক্যমতের এক চমৎকার দৈবযোগ।

এর কারণ হল এই ধ্বংসযজ্ঞ শুরু হয়েছিল এমন একটি অযোগ্য উৎস থেকে যাকে (অন্তত সে সময়ে) মনে হয়েছিল নিতান্তই এক হাস্যকর ঠগ, যে কিনা সে যে কত বড় ক্ষতি করছে সে সম্পর্কে জানতই না। আর ওদিকে জীবনতো তার নিয়মে চলছিল, কিন্তু প্রতিদিন সে বা তারা এমনভাবে ভদ্রতার দ্বারগুলো ভাঙ্গছিল যে, মনে হল আমরা যেন আমাদের সব সত্যিকারের ক্ষোভগুলো হারিয়ে ফেলেছি। তুমি যদি আমাকে একটা স্থুল উপমা দিতে অনুমতি দাও (আমি নিশ্চিত তুমি, যে কিনা মজা করার রাজা, সেটা দেবে): এক অতিথি এক ডিনার পার্টিতে এসে বসার ঘরের কার্পেটে মলত্যাগ করে। অন্য অতিথিরা এতে উত্তেজিত হয়ে চিৎকার করে প্রতিবাদ করল। ওদিকে লোকটি দ্বিতীয়বার একই কাজ করল। অতিথিরা বুঝতে পারে চিৎকার করে কোন লাভ নেই। (তাদের মধ্যে কেউ কেউ আবার এই লোকের ধৃষ্টতার প্রশংসা করল)। সে তৃতীয়বার মলত্যাগ করে, এবার টেবিলের ওপর, কিন্তু এরপরও কেউ তাকে বের করে দিল না। ততক্ষণে, ভবিষ্যতে কতখানি মলত্যাগ করা যাবে তার সীমা যেন আকাশ পর্যন্ত নির্ধারিত হয়েছে।

তাই, যদিও ওই সংকট সময়ে তোমার মাতামহী এবং আমি প্রায়ই বলতাম, ‘কারো না কারো একটা মিছিলের আয়োজন করা উচিত’ কিংবা ‘ওই বালের রিপাবলিকান সিনেটররা’, কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই নিজেদের কথা শুনতে শুনতে আমরা ক্লান্ত হয়ে পড়ি, এবং বৃদ্ধ হওয়া এড়াতে শুধু শুধু একই কথার পুনরাবৃত্তি করা বন্ধ করে আমাদের পাজল খেলায় ফিরে যাই, আর নির্বাচনের জন্য অপেক্ষা করি।

আমি এখানে দ্বিতীয়জনের কথা বলছি, তৃতীয়জনের (পুত্রদের মধ্যে) কথা বলছি না, যে সম্পূর্ণ ধোঁকাবাজ হওয়াতে ততবেশি ব্যথা দেয়নি (আশ্চর্য করেনি)।
 
নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে নতুন একটু কঠিন একটা জিগস পাজল (এটা হল ক্যাটস্কিল পাহাড়ের গ্রীষ্মকালীন দৃশ্য) খেলছিলাম, আর আগেভাগে যে সমস্ত রাষ্ট্রীয় ক্ষমা ঘোষণা হচ্ছে সেগুলো খেয়াল করছিলাম (যদিও যতদিনে সেই ক্ষমাগুলো মঞ্জুর হয়েছিল, ততদিনে সেগুলোকে অনুমান এবং সহ্য করতে আমরা প্রস্তুত ছিলাম)। খেয়াল করছিলাম ক্ষমার সেই মহাপ্লাবন (প্রতিটা ক্ষমা-ঘোষণা পরেরটার জন্য পথ তৈরী করে দিচ্ছিল) আর ক্ষমা উদযাপন করে আজেবাজে কথার ঢল (যদিও ওই সময়ের মধ্যে আমরা তাতে অভ্যস্থ হয়ে গিয়েছিলাম), বিচারকদের টার্গেট করা, রেনো এবং লয়েল শহরের ঘটনা, পন্ডিতদের নিয়ে তদন্ত, এবং প্রতিনিধিদের মেয়াদ-সীমাকে পাত্তা না দেওয়া, আমরা বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না যে সেসব ঘটছিল। এমন যেন পাখিরা গাছ থেকে সরবে বের হচ্ছে। 
 
মনে হচ্ছে তোমাকে আমি হতাশ করছি। 
 
আমি শুধু বলতে চাই যে, ইতিহাস যখন ঘটে, হয়ত তাকে বই ঘেঁটে তোমার যে প্রত্যাশা সে অনুযায়ী ঘটে না। বইয়ে বিষয়গুলো খুব পরিষ্কার, সেখানে সবাই যেন জানে ঠিক কী কাজটি করা দরকার। 
 
তোমার মাতামহী এবং আমাকে (এবং আরও অনেককেই) সেই সংকটময় সময়ে হয়ত আরও চরমপন্থী হতে হয়েছে তখন যা করা দরকার ছিল তা করার জন্য। এখন পেছনে তাকিয়ে বুঝতে পারি, চরম অবস্থার জন্য যা দরকার ছিল – সংগঠিত হবার জন্য বা অতটা একাগ্রতা বা উৎসাহী হবার জন্য – জীবন আমাদেরকে সেভাবে প্রস্তুত করেনি। সবকিছু ছেড়ে দিয়ে আমরা সেই ব্যবস্থাকে রক্ষা করতে প্রস্তুত ছিলাম না যে ব্যবস্থাটাকে আমরা অক্সিজেনের মত ক্রমাগত গ্রহণ করছিলাম, কিন্তু যার অস্তিত্ব খেয়াল করছিলাম না। আমার মনে হয় আমি বলতে চাইছি যে, আমরা লাই পেয়ে নষ্ট হয়ে গিয়েছিলাম। অন্য পক্ষে যারা ছিল তাদের ব্যাপারটাও এরকম – তারা সবকিছু টেনে হিঁচড়ে ধ্বংস করে ফেলতে চাইছিল কারণ তারাও লালিত হয়েছিল সেই শূন্য প্রাচুর্যতায় যার মধ্যে আমাদের সবার ছিল বাস – তা ছিল এমন এক সমৃদ্ধ অবস্থা যা মানুষকে ভালভাবে বাঁচতে, মতামত দিতে, রাজা রানির মত গর্বিত পদক্ষেপ ফেলতে সাহায্য করেছে, কিন্তু সেই সময়টুকু ধরে তারা তাদের নিজেদের অতীত সম্পর্কে কিছুই জানেনি।
 
তুমি আমাকে কী করতে বলতে? তুমি হলে কী করতে? আমি জানি তুমি কী বলবে: তুমি হলে লড়াই করতে। কিন্তু কীভাবে? কীভাবে তুমি লড়াই করতে? তুমি কি তোমার সিনেটরকে ফোন করতে? (সেসব দিনে অন্তত, তোমার বিরুদ্ধে বদলা নেবার আশঙ্কা ছাড়াই, সিনেটরের ফোনে তোমার দুর্বল বার্তা রেকর্ড করে রাখা যেত, অবশ্য তুমি যদি সেই ফোনে গান গাইতে বা শিস বাজাতে বা বাতকর্ম করতে তাতেও একই ফল হত, অর্থাৎ কিছুই হত না।) অবশ্য আমরা তাই করেছি। আমরা ফোন করেছি, চিঠি লিখেছি। তুমি কি নির্বাচনে দাঁড়ানোর জন্য কাউকে টাকা দিতে? আমরা সেটাও করেছি। তুমি কি মিছিল করতে? যে কোন কারণেই হোক হঠাৎ সব মিছিল বন্ধ হয়ে গেল। মিছিলের আয়োজন করেছিলাম কি? তখনও জানতাম না, এখনও জানিনা একটা মিছিলের আয়োজন কী করে করতে হয়। আমার কাজ তখনও পূর্ণকালীন ছিল। দাঁতের সমস্যাটা সবে শুরু হয়েছে। ওটাই বরং সারাক্ষণ আমার চিন্তায় ছিল। তুমি তো জানো আমরা কোথায় থাকি, তুমি কি চাইতে যে, আমি ওয়াটারভিলে যেয়ে সেখানকার কর্মকর্তাদের বাক্যবাণে বিদ্ধ করি? তারা তো সবাই আমাদের সাথে একমত ছিল। তুমি কি অস্ত্র হাতে নিতে? আমি নিতাম না, নেবেও না, এবং আমি বিশ্বাস করি না যে, তুমিও নিতে। আমি আশা করি নিতে না। নিলে সব হারিয়ে যেত।

সবশেষে আবার শুরুতে ফিরে যাই। আমার এটা পরামর্শ, অনুরোধও বটে: জে.-র সবকিছু থেকে দূরে থাকো। তার সাথে তোমার জড়ানোটা কোনো কাজে আসবে না (বিশেষ করে তুমি যখন জানো না ওরা ওঁকে ঠিক কোথায় নিয়ে গেছে, স্টেট নাকি ফেডেরাল কারাগারে) বরং হয়ত ক্ষতিই করবে। আশা করি তুমি এতে অসন্তুষ্ট হবে না যদি বলি সেটা হবে ‘শূন্যগর্ভ পদক্ষেপ’। তা শুধু জে.-র অবস্থাই খারাপ করবে না, তোমার মা, বাবা, বোন, মাতামহী, মাতামহ, এদেরও ক্ষতি করতে পারে। জটিলতার একটা অংশ হলো এতে তুমি একা নও।

আমি তোমার ভাল চাই। আমি চাই তুমিও একদিন আমার মত নিষ্কর্মা বুড়ো হবে, তার (প্রিয়) নাতিকে দীর্ঘ (বেশি দীর্ঘ) চিঠি লিখবে এই পৃথিবীতে আমরা বেশি সময় সাহসের কথা বলি, কিন্তু বিচক্ষণতা এবং সতর্কতা সম্পর্কে যথেষ্ট বলি না। আমি জানি এইসব তোমার কাছে শুনতে কেমন লাগছে। তা লাগুক। এতদিন ধরে যখন বেঁচেছি তাতে আমার কিছু অধিকার জন্মেছে।

এখন মনে হল তোমার আর জে.-র সম্পর্ক হয়ত বন্ধুত্বের চেয়ে বেশি কিছু।

সেক্ষেত্রে, আমি জানি, বিষয়টি (অবশ্যই) আরো জটিল হবে।

গত রাতে নির্বাচনের আগের সেই গুরুত্বপূর্ণ দিনগুলোর একটি স্বপ্ন স্পষ্ট দেখেছিলাম। আমি তোমার মাতামহীর উল্টো দিকে বসেছিলাম, ও ওর জিগস পাজল (কুকুর আর বিড়ালছানার ছবি) নিয়ে মশগুল ছিল, আর আমি আমার পাজলে (গাছে-চড়া বামনদের নিয়ে)। এবং তখনই এক ঝলকে আমরা সবকিছু স্পষ্ট দেখতে পেলাম। আমরা বুঝতে পেরেছিলাম সেটা ছিল একটা গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। টেবিলের দুই দিক থেকে আমরা নতুন দৃষ্টিতে পরষ্পরের দিকে তাকালাম। এটা এভাবে বলতে পারি, তাতে ছিল আমাদের একের অপরের প্রতি গভীর ভালোবাসা, আমাদের দেশের প্রতি ভালবাসা যে দেশে আমরা সারা জীবন কাটিয়েছি, ছিল ভালবাসা অনেক রাস্তা, পাহাড়, হ্রদ, শপিং মল, ছোট রাস্তা, পরিচিত গ্রামের জন্য যেখানে আমরা অবাধে ঘুরে বেরিয়েছি।

আহা, কী মহামূল্যবান আর প্রিয় মনে হয়েছিল সবকিছু।

তোমার মাতামহী উঠে দাঁড়ালেন, সেইরকম অটলতা নিয়ে যা তোমার কাছে পরিচিত।

তিনি বললেন, ‘আমাদের কী করতে হবে তা ভাবতে হবে।’

তারপর আমি জেগে উঠলাম। বিছানাতে শুয়েই মুহূর্তের জন্য যেন অনুভব করলাম আবার সেই সময় এসেছে, কিন্তু ঠিক এই সময়টা নয়। শুয়ে থেকে নানান চিন্তায় আচ্ছন্ন হয়ে, অনেক দিন পর এই প্রথমবার ভাবলাম আমার কী করা উচিত ছিল তা নিয়ে নয়, বরং এখনও আমি কী করতে পারি।

ধীরে ধীরে আমার সম্বিত ফিরে এল। সেটা ছিল দুঃখের। একটা দুঃখের মুহূর্ত। ফিরে এলাম আবার সেখানে যেখানে কোনো পদক্ষেপ নেয়া সম্ভব ছিল না।

যদি সম্ভব হতো, তাহলে সমস্ত হৃদয় দিয়ে আমরা তোমার কাছে ওই বোধটা সেভাবেই পাঠিয়ে দিতাম। আসলেই। সেটা বোধহয় এখন আর হবার নয়। এই অনুশোচনা নিয়ে আমি কবরে যাব। বুদ্ধি ব্যবহার করে মানিয়ে নেয়াকে প্রজ্ঞা বলা চলে। আমি বালিতে মাথা গুঁজে বসে থাকতে বলছি না। জে. একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে।আমি সেটার জন্য তাকে সম্মান করি। তবুও। কেউ তোমাকে কিছু করতে বলছে না। আমার মতে, তুমি এখনই ভাল কাজ করছ নিয়মিত সকালে ঘুম থেকে উঠে, যতটুকু সম্ভব সবার জন্য উপস্থিত থেকে, সদয় থেকে, বিশ্বে সুস্থতা বাঁচিয়ে রেখে, যাতে করে একদিন, যদি এই সময়টা পেরিয়ে যায়, তোমার এবং তোমার মত লোকদের সাহায্যে দেশটি আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে যেতে পারে।

এইসবের মধ্যে, তুমি আর আমি, আশা করি, এই অন্ধকার সময়ে, গুহাবাসীদের মতন আগুনের শেষ চিহ্নটিকে বাঁচিয়ে রেখেছি।
 
কিন্তু এটা জেনো যে, আমি বুঝতে পারছি তোমার জন্য নীরব এবং নিষ্ক্রিয় থাকা কতটা কঠিন, যদি জে. আসলেই বন্ধুর চাইতেও বেশি কিছু হয়। জে. খুব সুন্দর একজন মানুষ। আমার মনে পড়ে সেই রুপোলী লম্বা চেনটায় বাঁধা তোমার গাড়ির চাবিগুলো দুলিয়ে, লাবণ্য ও প্রাণময়তা নিয়ে, ওর আমাদের উঠোনটা পার হওয়া। ওর কুকুরটা (হুইস্কি) ওর পাশে দৌড়াচ্ছিল। 
 
আমি মনে করি ওপরে আমার অনুরক্তির বিষয়টি পরিষ্কার করতে পেরেছি। এর পরে যা বলছি তা তোমাকে উৎসাহিত করার জন্য নয়, তবে – আমাদের কিছু টাকা (বেশি নয়) আলাদা করা আছে। যদি জরুরি কাজে লাগে। তোমাকে পরামর্শ দিতে চাইছি না। তুমি কী করতে চাও আমাদের জানিও, প্লিজ, কারণ আপাতত এটাই (তোমাকে) আমরা খালি ভাবতে পারছি।
 
অনেক ভালোবাসা জানবে, তোমার জানার চাইতেও বেশি ভালবাসা,
- দাদু



লেখক পরিচিতি: গল্পকার ও ঔপন্যাসিক জর্জ স্যন্ডার্সের জন্ম ১৯৫৮ সনে টেক্সাসে। শৈশব, কৈশোর কেটেছে শিকাগোতে। বর্তমানে সিরাকিউজ ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক। ছোট গল্পের জন্য পেয়েছেন প্রচুর পুরস্কার, তাঁর উপন্যাস Lincoln in the Bardo ২০১৭-র Man Booker Prize পেয়েছে। তাঁর গল্প নিয়মিতভাবে The New Yorker, Harper’s ইত্যাদি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। স্যন্ডার্সের লেখার স্টাইল অনন্য – উত্তম পুরুষে লেখা, কিন্তু তার মধ্যে যেন ব্যাপকতা নেই, ইচ্ছে করেই যেন পাঠকের দৃষ্টিকে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে; আর আছে যাকে বলে stream of consciousness। এই দুটি বৈশিষ্ট্যই নিচের গল্পটিতে প্রতিভাত হয়েছে। গল্পটির শুরুতে এটা কোনো ভবিষ্যতের dystopia-r সমাজ মনে হতে পারে, কিন্তু ধীরে ধীরে পাঠক বুঝবেন এটি বর্তমান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেরই একটি রূপের কথা বলা হচ্ছে। 
 

অনুবাদক পরিচিতি:
মৌসুমী কাদের
কথাসাহিত্যিক। অনুবাদক
কানাডায় থাকেন।
 
 
 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন