মঙ্গলবার, ১৪ জুন, ২০২২

নোরমা ডানিংএর গল্প : অ্যানি মাকটেক


ভাষান্তর : ঋতো আহমেদ

[পাঠ-সহায়িকাঃ কিন্তু কেন পাঠ-সহায়িকার প্রয়োজন পড়ছে এইখানে! তবে কি অনুবাদ যথাযথ হয়নি? অনুবাদকের মনের অতৃপ্তিই এই অংশটুকুর উৎপত্তির কারণ! আবার আমরা তো এও জানি, কোনও অনুবাদই পুরোপুরি হওয়া সম্ভব নয়। দুটি ভাষার মধ্যকার দূরত্ব, দুটি অঞ্চলের ভৌগলিক ব্যবধান, দু’জন লেখকের চিন্তার, বোধের প্রকাশ-ভিন্নতা এইসব চলে আসে নিশ্চিতভাবেই। তাই আজকের এই পাঠ-সহায়িকার অবতারণার কারণ অনুবাদকের অতৃপ্তি নয় মোটেও, বরং একটি অপরিচিত অঞ্চলের মানুষের গল্পে যে অপরিচিত শব্দ ও ভাষা ব্যবহৃত হয়, সেইগুলো সম্পর্কে পাঠের আগেই পাঠককে ধারণা দেয়ার চেষ্টা মাত্র। যা তার পাঠের বিভিন্ন পর্যায়ে গল্পকে বুঝতে সাহায্য করবে। অনূদিত ভাষায় অনেক শব্দ ও কথাই অপ্রচলিত হতে পারে। না, পাঠের আগে গল্পটি নিয়ে কোনও আলোচনার পক্ষপাতি আমি নই। তাতে পাঠক নির্দেশিত ও নির্দিষ্ট পথেই হাঁটতে বাধ্য হবেন। আমি তা চাই না। চাই, পাঠক তার নিজের মতো করে গল্পটি পাঠ করুন, ভাবুন তার নিজস্ব চিন্তার ধারায়। শুধু সামান্য ধারণা দিতেই বলছি—

আমাদের এই গল্পটি লিখেছেন নোরমা ডানিং। ডানিং একজন নেটিভ ক্যানাডিয়ান লেখক। জন্ম ১৯৫৯ সালে কুইবেকে। তিনি ইনুইট লেখক, পণ্ডিত, গবেষক এবং একজন দাদীমা, যিনি আদিমতার এক নিরব রূপের মুখোমুখি বেড়ে উঠেছেন। তিনি আলবার্টা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রভাষক। তার বসবাস ক্যানাডার দক্ষিণাঞ্চলে। তিনি তার আপন গোত্রের ইতিহাস ও ঐতিহ্যে ভর করে লেখেন। আর এটাই তাকে বিশিষ্ট করে তুলেছে। তার সৃজনশীল রচনা সম্ভারের ভিত্তি তার ইনুইটত্ব। ট্র্যাডিশনাল ইনুইটের মতো চিন্তা ও লেখায় সেই অস্তিত্বের অনুভবে তিনি সেরা। বর্তমানে এডমন্টনে থাকছেন। আজকের ‘অ্যানি মাকটেক’ গল্পটি তার ‘অ্যানি মাকটেক ও অন্যান্য গল্প’ বই থেকে নেয়া হয়েছে। বইটি ২০১৭ সালের মার্চে প্রকাশিত হয়। আর ২০১৮ সালে ‘দানুটা গ্লিড’ সাহিত্য পুরস্কার লাভ করে। এ ছাড়াও তার আরেকটি গল্প সংকলনের নাম ‘ডাঈন্না’ এবং একটি কবিতা সংকলনের নাম ‘আকিয়াঃ দি আদার সাইড’।

‘অ্যানি মাকটেক’ গল্পটির ঘটনা-স্থান ভূ-গোলকের যে অংশে বাংলাদেশের অবস্থান তার ঠিক বিপরীত পার্শে। ক্যানাডার নুনাভাটের কিকিট্‌টালুক অঞ্চলের একটি ছোট দ্বীপ। মেল্ভিল উপদ্বীপের খুব কাছেই ফক্স বেসিনে অবস্থিত। ইগ্লোলিক শব্দটি মূলত ইগলু শব্দ থেকে এসেছে। প্রায় সারা বছর বরফাচ্ছাদিত থাকে। এই অঞ্চলে যেই সোড ঘরগুলো আছে, মূলত ইগলু বলতে সেগুলোই বোঝায়। তাই এর নাম ইগ্লোলিক। গল্পে যে সমস্ত অপরিচিত শব্দ রয়েছে সেগুলোর সাথে অল্প ব্যাখ্যা সহ পরিচয় করিয়ে দিচ্ছি—

    ইনুইট(Inuit)— ইনুইট হল গ্রিনল্যান্ড, কানাডা এবং আলাস্কার আর্কটিক এবং সাবর্কটিক অঞ্চলে বসবাসকারী সাংস্কৃতিকভাবে অনুরূপ আদিবাসীদের একটি দল। ইনুইট ভাষাগুলি এস্কিমো-আলেউত ভাষার অংশ যা ইনুইট-ইউপিক-উনানগান নামেও পরিচিত এবং এস্কালেউট নামেও পরিচিত। ইনুইট সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ হল নুনাভুতে ব্যবহৃত একটি বিপন্ন ভাষা।

    ইনেক(Inuk)— ক্যানাডিয়ান আদিবাসী গোত্র ইনুইটের একজন ব্যক্তিকে বোঝায়।

    মাকটেক(Muktuk)— আর্কটিক অঞ্চলের মানুষের একটি ঐতিহ্যবাহী খাবার, এতে তিমির চামড়া এবং ব্লাবার রয়েছে। এটি প্রায়শই বোহেড তিমি থেকে তৈরি করা হয়, যদিও বেলুগা এবং নার্ভালও ব্যবহার করা হয়। এটি সাধারণত কাঁচা খাওয়া হয়, তবে হিমায়িত বা রান্না বা আচারও খাওয়া যায়।

    ক্যারিবু(Caribou)— উত্তর অ্যামেরিকার এক প্রকার বড় হরিণ বিশেষ। (Caribou track)— ক্যারিবুর পদচিহ্ন।

    এটিভি(ATV- All-terrian vehicle)— একটি অল-টেরেন যান, যা হালকা ইউটিলিটি গাড়ি, কোয়াড বাইক, বা কেবল কোয়াড নামেও পরিচিত; স্টিয়ারিং কন্ট্রোলের জন্য হ্যান্ডেলবার সহ অপারেটর দ্বারা স্ট্র্যাড করা একটি সিট সহ কম চাপের টায়ারে ভ্রমণ করা একটি যান। কক্স-বাজারে গেলে সৈকতে এই চার চাকার গাড়িটি চড়ার সুযোগ হয় পর্যটকদের।

    জিজ(Jizz)— জিজ হলো আকার, অঙ্গবিন্যাস, উড়ন্ত শৈলী বা অন্যান্য অভ্যাসগত গতিবিধি, আকার এবং বর্ণমালা, ভয়েস, আবাস এবং অবস্থানের সাথে মিলিত এমন বৈশিষ্ট্য থেকে প্রাপ্ত পাখির সামগ্রিক ছাপ বা উপস্থিতি।

    পিট স্টপ(Pit stop)— কার রেসের সময় সার্ভিসিং বা রিফুয়েলিংএর জন্য কোনও গর্তের মতো জায়গায় বিরতি নেয়া। কিংবা কোনও ভ্রমণের সময় নেয়া সামান্য বিশ্রাম।

    স্পার্ম হোয়েল(Sperm whale)— দাঁতযুক্ত তিমিগুলির মধ্যে বৃহত্তম এবং দাঁতযুক্ত শিকারের বৃহত্তম শিকারী শুক্রাণু তিমি বা ক্যাকালোট। কোজিয়ার পিগমি শুক্রাণু তিমি এবং বামন শুক্রাণু তিমির পাশাপাশি এটি ফাইসেটর জেনাসের একমাত্র জীবিত সদস্য এবং শুক্রাণু তিমি পরিবারের তিনটি প্রজাতির মধ্যে একটি।

    ক্যারিবু পারকা(Caribou parka)— এস্কিমোর লোকেরা ক্যারিবুর চামড়া দিয়ে বিশেষ ধরনের হুডি জ্যাকেট তৈরি করে যা ক্যারিবু পারকা নামে পরিচিত।

    আরনালেক(Arnaluk)— ইনুইট মিথের একটি নারী চরিত্র যাকে বিভিন্ন নামে ডাকা হয়। আরনালেক এর মধ্যে একটি। যার অর্থ পাতালের রানী। মিথে ঘটনাক্রমে সে একটি পাখিকে বিয়ে করে আর সাগরের সমস্ত প্রাণীদের রানী বনে যায়।

    পাদলেই(Padlei)— পাদলেই কানাডার নুনাভাটের কিভালিক অঞ্চলের প্রাক্তন সম্প্রদায়। এটি মাগুস নদীর সন্ধিক্ষণে কিংগা লেকের উত্তর তীরে মূল ভূখণ্ডে অবস্থিত। তিমি কোভ পূর্বদিকে, হেনিক হ্রদ দক্ষিণ-পশ্চিমে।

    সাশে(Sashay)— অ্যামেরিকার স্কয়ার নাচের মতো, যেখানে পার্টনাররা পাশাপাশি স্টেপ ফেলে পরস্পরকে বৃত্ত করে নাচে।

    অ্যানাঅ্যানাট্‌সিয়া(Anaanatsiaq)— এটি একটি ইনেকটেট শব্দ। এর অর্থ meternal grandmother বা নানী।

    গ্রে গুজ ভদকা(Grey goose vodka)— একটি মদ্যপানীয়, ভদকা।]



নোরমা ডানিংএর গল্প : 
অ্যানি মাকটেক

টোপ। যা দিয়ে অনেক ভালো কিছু করা যায়। বড়শিতে গাঁথা যায়। এক টুকরো ফাঁদ হিসেবে ব্যবহার করা যায়। জলে কিংবা মাঠে-প্রান্তরেও একে ব্যবহার করা যায়। এমন-কি ফ্রিজে রেখে দিয়ে পরে তুমি শহরে নিয়ে গিয়ে বিভিন্ন কাজেও লাগাতে পারো।

হেনরি মূসা আর আমি, আমরা এ ব্যাপারে একদম ওস্তাদ। দুজন কেবল বন্ধু আর রুমমেটই না, আমরা বখাটে ওস্তাদও। আমাদের সাথে কেউ পেরে ওঠে না। গতানুগতিক কোনও ইনেক শিকারী কিংবা জেলে নই আমরা, তবে দুজনেই জানি কীভাবে ওই কাজটা দক্ষতার সাথে করতে হয়। আমাদের বাবারা আমাদের শিখিয়েছেন। পুরনো কিছু পদ্ধতিতেও কীভাবে কাজ করতে হয় তা আমাদের জানা আছে। আমাদের কেবল রয়েছে এক আলাদা পদ্ধতি, এক ভিন্ন নির্বাহ। মাকটেক আমরা অন্যভাবে ব্যবহার করি।

ছোটখাট ইগ্লোলিক মেয়েগুলো যখন শহরের বাইরে শপিং করতে আসে, থালায় করে তুলতুলে নরম টোপ হাতে নিই আমরা। এরপর কিচেন-টেবিলে টেবিল-ক্লথ বিছিয়ে সুন্দর করে সাজাই আর বেরিয়ে যাই সেখান থেকে। দরজা বন্ধ করার আগ মুহূর্তে বাঁ কাঁধের ওপর দিয়ে মাথাটা ঘুরিয়ে তাকাই এক পলক, ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসি, পরস্পরের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলি, “টোপ”। দারুণ জিনিস! সবসময়ই কাজে দেয়।

সমুদ্রবন্দরকে একটা বড় ফাঁদএলাকা মনে হবে তোমার। এখানে মেয়েমানুষদের শিকার করাটা বেশ আনন্দের। ছোটখাট ফাঁদপূর্ণ গর্ত নয় কিন্তু এটা। ভালুকাকৃতির বড়ো ফাঁদ বলতে পারো। আর দরজায় পা ফেলে এই খেলায় যারা ঢুকে যায় তারা হচ্ছে মেয়েমানুষ। ইগ্লোলিকের মেয়েগুলো এই খেলার সবচেয়ে ভালো শিকার। আকারে ওরা ছোটখাট আর সুস্বাদু। মাকটেক ওদের পছন্দের ড্রাগ। বোলে দেখো তোমার কাছে মাকটেক আছে, গ্র্যান্ড স্ল্যাম জিতে যাবে নিশ্চিত, একেবারে বাড়ি পর্যন্ত চলে আসবে তোমার সাথে।

আজ রাত ছিল সেই রাত। এইতো, কয়েক দিন আগেই ওইরকম এক গুচ্ছ ইনেক শরীর যেন ভেসে এসেছিল এখানে। নীরস গাড়লের মতো হেনরি মূসা আর আমি, ঘর্ঘর শব্দে নিঃশ্বাস ছাড়ছিলাম। এ বছর প্রায় নতুন একটি দল ছিল ওরা। কয়েকজন পুরনোও ছিল অবশ্য। অ্যানি মাকলেক ছিল তাদেরই একজন। মূসা ওর পেছনে গোয়েন্দার মতো লেগে ছিল। ওখানেই, ওই উত্তর দিকের দোকানে আবোলতাবোল বকতে শুরু করেছিল। আমি তার পাঁজরে গুঁতো মেরে চুপ করতে বলি। আর সে গজরাতে শুরু করে, হ্যাঁ গজরানোই বলছি। তার ইনুইট চোখগুলো কালো আর লম্বাটে হয়ে যায়। ঠোঁট কুঞ্চিত হয়ে গোল-আকৃতি ধারণ করে। দেখে মনে হয় এক্ষুনি হয়তো আমার গালে একটা থাপ্পড় বসিয়ে দিতে পারে। এমন নয় যে আমরা কোনও দিন মারামারি করিনি, কিন্তু আজ সত্যি হেনরি মূসা—অ্যানি মাকলেকের জন্য?

মূসাকে আমি বোঝাতে পারিনি যে সে কেবল অ্যানি মাকলেক মাত্র নয়। সে ছিল বাইপোলার। আর্কটিক আর এন্টার্কটিক দুটোই তার পছন্দের। সে যেমন মেরু ভালুক নিয়ে খেলেছে তেমনি খেলেছে পেঙ্গুইন নিয়েও। অ্যানি মাকলেক চুদতে পছন্দ করতো। ইগ্লোলিকের প্রায় সবার সাথেই সে করেছে। এমনকি আর যেসব জায়গায় সে গিয়েছে, সেখানেও। পারলে সে তোমার বাবাকেও চুদবে, বোনকে চুদবে, তোমার সবগুলো ভাইকে চুদে তোমার মায়ের সাথে গিয়ে শেষ করবে। তার আলোড়ন উভয় দিকে এবং সমস্ত উপদিকে।

প্রায় বছর খানেক আগে ওর সাথে পরিচয় হয় হেনরি মূসার। তারপর থেকে এখনও ওকে ভুলতে পারেনি। সে ছিল হট্‌, ছিল হর্নি। ওকে ভালবাসতেই যেন তার আবির্ভাব। এই শহরে আমরা দুজনই কেবল ব্যাচেলর। ত্রিশ ও চল্লিশের মাঝামাঝি। আমাদের একটা নিয়ম ছিল—কখনও ভালোবেসো না ওদের। কেবল মজা করো আর সরে যাও। একটা সুনাম ছিল আমাদের। সেটাকে মেনটেইন করাই ছিল সবকিছু।

ওর সাথে শুধু একবারই এ বিষয়ে কথা বলতে চেয়েছিলাম। বাইরে ঘুরতে বেরিয়েছিলাম তখন। সারাক্ষণ শুধু মেয়েটার ব্যাপারেই ফোঁপাচ্ছিল। মেয়েটাই ছিল তার “ও”। এটিভি বন্ধ করে, অ-প্রথাগত শিকারীর গতিতে আমরা দুজনে অনেকটা দূর পর্যন্ত হেঁটে বেড়িয়েছিলাম সেদিন। ক্যারিবু ট্র্যাকে হেঁটে চলা দুই ইনেকের চেয়ে, আমাদের দেখে মনে হচ্ছিল আফগানিস্তানের মাটিতে ক্যানাডার দুই সৈনিক। কিন্তু ওর ঘ্যানঘ্যানানি আর ভালো লাগছিল না আমার।

বললাম, “অ্যানি মাকলেকের ভাবনা মাথা থেকে ঝেরে ফেলতে হবে তোর, মূসা। ওর থেকে সরে আসার সময় হয়েছে। তুই যখন ওসব বাজে বকতে শুরু করিস তখন কী মনে হয় জানিস আমাদের—তুই ওর নাম জপিস আর আমার একটা জিঙ্গেল মনে আসে, “ওহ্‌, অ্যানি মাকলেক, কী চোদন রে ভাই, কার সাথে সেঁধিয়েছিলি কাল রাত? ওহ্‌, অ্যানি মাকলেক, কী চোদন রে ভাই, আমরা জানি কেন-যে তুই আর নাই টাইট’।” আপনাআপনি আমার মুখ থেকে বেরিয়ে গেছিল কথাগুলো। আর মূসা, আমি জানতাম মাটিতে ফেলে ড্রাম-পিটানোর মতো লাথি কশিয়েছিল আমার পাছায়।

আঘাতের লেশ আমার মাথার ভেতর থমকে আছে। ওই কুত্তার বাচ্চাটার সাথে পেরে ওঠা কঠিন। সে খুব দ্রুত গতি সম্পন্ন। দারুণ ক্ষিপ্রতার সাথে তোমার শরীরে হিট করতে পারবে যা তুমি কল্পনাও করতে পারবে না।

“ওইভাবে বলতে পারিস না তুই, জনি। মেয়েটাকে ভালোবাসি আমি।”

হাত দুটো বুকের কাছে টেনে, শরীরটা ঝাড়তে ঝাড়তে নিজেকে তুলতে চেষ্টা করলাম মাটি থেকে।

“ওরে হেনরি, ৫৮তম লাইন আপের সবাই তারে পেয়েছে। একবার না, পরপর তিন বার করে পেয়েছে প্রত্যেকে। উত্তরের সমস্ত জিজের কাছে সে একটা পিট স্টপের মতো। সে-ই আসল স্পার্ম হোয়েল। বুঝতে পারছিস না তুই—সে তোর “ও” না! এক ধরনের মানসিক রোগে আক্রান্ত সে, উদ্ভট একটা।”

আরেক দফা ঘুসি আসার আগেই পুরোটা উগড়ে দিতে চেয়েছি। ঘুসি অবশ্য উড়ে এসেছিল ঠিকই কিন্তু আমি সরে যেতে পেরেছিলাম। মনে হচ্ছিল এ যাত্রায় জিতে গেছি। কিন্তু আমি জিতিনি। সংবিৎ ফিরে পেয়ে দেখলাম মূসার বুট আমার চোয়াল বরাবর চেপে আছে। আর আমার ডান চোখ তাকিয়ে আছে তার বন্দুকের তাক করা নলের দিকে। “তোর কথা ফিরিয়ে নে।” খুব ধীরে উচ্চারণ করছিল সে। মূসার ব্যাপারে একটা বিষয় আমি জানি; সে যখন কাজের কথা বোঝায় তখন সে কাজের কথাই বোঝায়। তাই আমি ফিরিয়ে নিয়েছিলাম আর গত আট মাস ধরে একবারও অ্যানি মাকলেকের নাম উচ্চারণ করিনি।

করেছে মূসা হেনরি। কোনও কোনও সকালে শাওয়ার নেয়ার সময় ওর কণ্ঠেই শুনেছি ওই নাম। ওর উপর মেয়েটা এক জাদুকরী প্রেমের মোহজাল বিস্তার করেছে। যার থেকে সে বেরুতে পারছে না কিছুতে। খুবই দরদী কণ্ঠে ওই নামটা গেয়ে ওঠে প্রায়। যখনই আমরা কোনও ইন-টাউন শিকারে যাই, সেখানেও সে ওই মেয়েটাকেই খোঁজে। লোকাল সব মেয়েদের সাথে ওর তুলনা টানে। থামাতে পারি না ওকে। বিয়ারের পর বিয়ার পান করাই, তবু সে ওই মেয়েটার স্মৃতিচারণ করে যায়। অ্যানি মাকলেক নামের জপ, এই নামের ভাবনা, এই নামের শ্বাস নেয়া বন্ধ হবে না তার। আজ রাতে সে এই নামটাকেই চুদতে থাকবে। থালার সমস্ত মাকটেক। মাগীটা খসাবে, আবার মাগীটাই চাটবে আর তারপর ওই মাগী ওটা গিলবে। অ্যানি মাকলেক, মূসার মাথাটা আর খাস না তুই। ছেড়ে দে ওকে।

আমরা এখন সমুদ্রবন্দরে। ফিল কলিন্সের গাওয়া প্রিয় একটা গান বাজছে জুকবক্সে, “ইন এয়ার টু-নাইট”। এই সলোটিই সেরা সলো। আজ আমার প্রতিটা বাহুতে একটি করে ইগ্লোলিক প্রেয়সী। আমার, ওদের গঠন দারুণ লাগে। সামান্য খাটো ওরা। ত্বক কালো, কুচকুচে। বছরে বেশির ভাগ সময় সিলের মাংস চিবোয়। শ্রেষ্ঠ হাসি হাসে আর নিচু স্বরে খিলখিলায়। ওরা যা-ই বলে, কামনা লিকলিকিয়ে ওঠে। ওদের কাছাকাছি নিজেকে উষ্ণ অনুভব করি। ভয় লাগে নাচ শেষ হওয়ার আগেই না দাঁড়িয়ে যায় আমার। বাথরুমে ঢুকে দ্রুত একটু হাত মেরে আসার কথা ভেবে ঊরুসন্ধির দিকে তাকাই আর শুনতে পাই বারের দরজা দুলছে, খোলা।

অ্যানি মাকলেক, অস্থির মহিমায় হেঁটে বেড়াচ্ছে। আজ রাতের সাজ তার ট্র্যাডিশনাল। দীর্ঘ কালো কেশ পেছনে বেণী করে বাঁধা। আজকাল আমার মা-ই শুধু এমন করে বাঁধেন। মাকলেক পরেছে সে, সত্যিকারের মাকলেক। আর সে পুরনো রীতিতে ক্যারিবু পারকাও পরেছে। হয়তো তার দাদীমা তাকে দিয়েছে। এখন আর কেউ ওটা বানায় না। কালো ও ক্ষীণ আইলাইনার তার বাদামী চোখ দুটোকে দারুণভাবে জাহির করছে। চেহারাকে নজর-শীর্ষে তুলতে সে তার মুখটায় ট্যাটু এঁকে সাজিয়েছে। সবাই জানি কাল সকালেই সব ধুয়ে ফেলবে ও। তাকে পাদলেই বলে একেবারেই মনে হবে না তখন।

মূসা হেনরি এখন বিস্মিত অবস্থায় আছে। সে হতবাক। গলা খুসখুস করে ওঠে আমার। মূসার দিকে তাকিয়ে দেখতে পাই তার চেহারায় একটা স্মিত হাসি ফুটে উঠেছে। কারণ অ্যানি মাকলেক তার দিকে সাশে করে এগিয়ে যাওয়ায় পুরো ঘর হঠাৎ আওয়াজ করে থেমে যায়। মাকলেক তার পারকা খুলতে থাকে। বাদামী নাভি দেখতে পাই তার। পেছন থেকে কেউ একজন চেঁচিয়ে ওঠে, “ওই দেখ! সমস্ত মুখ জুড়ে ওর আরনালেক লিখা! দুষ্ট, দুষ্ট, দুষ্ট!” ঘরের ও পাশটা মাতাল হাসিতে ফেটে পড়ে। গ্রে গুজ ভদকার পুকুরে ওদের কাঁধগুলো কাঁপতে থাকে। ঠোঁট উল্টিয়ে আমিও হাসি, কিন্তু আমার নিজের অ্যানাঅ্যানাট্‌সিয়ার কথা মনে আছে, আর মনে আছে ওর স্নিগ্ধ ত্বকের নরম ট্যাটু লাইনও। সবসময় তাকে সুন্দরী ভেবেছি। কিন্তু আজ ওসব মনে পড়ার কোনও প্রয়োজন নেই। সামনে একটা মিশন রয়েছে আমার, কমপ্লিট করতে হবে।

পুরনো সাদাকালো সিনেমার বীর যোদ্ধার মতো ঘর জুড়ে লাফিয়ে যাই। আমাকে এই হ্যান্ড গ্রেনেডটার পিন পুনঃস্থাপন করতে হবে। লোকাল হিরো হতে হবে। আর মূসা হেনরির রেপুটেশানটাও রক্ষা করবো আমি। কিন্তু হঠাৎ ভূপাতিত হয়ে অনুভব করলাম প্রচণ্ড চড় কশিয়েছে কেউ আমার সমগ্র গাল বরাবর। তলের ঠোঁট ফেটে গেছে। রক্ত আমার নীচের দাঁত ধুয়ে দিচ্ছে। বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না ওই কুত্তীটা এমন করতে পারে।

আমার সাহসী প্রতিক্রিয়া শুধু ওইটুকুই ছিল। যে আমি ঘুসি পাকিয়ে অ্যানি মাকলেকের নিপুণ মুখের কাছে পৌঁছে গিয়েছিলাম। মুঠির গিঁট খুব শক্তভাবে ওর নাকের ব্রিজ বরাবর চলে গিয়েছিল। কিন্তু মূসা হেনরি তার হাতের থাবায় আমার কণ্ঠা খাবলে ধরে ফ্যালে। মেঝেয় মোচড়াতে মোচড়াতে শুনতে পেলাম, “বল তুই দুঃখিত। বল এটা। ফিরিয়ে। নে। কথা!” যদিও আমার গলায় একটা ছিদ্র ছিল, কিন্তু শ্বাস নিতে পারছিলাম না আমি। ভাবতে পারছিলাম না। মেঝেতে পড়ে আছি ইংরেজি ‘এইচ’ অক্ষরের মতো কুঁকড়ে। “বল এটা। বল বলছি আমি!”

মূসা হেনরি, যে আমার বেস্ট ফ্রেন্ড, সেই আবাসিক স্কুল-দিনের থেকে বন্ধু আমরা, আমাকে আদেশ করছে। মাথা নেড়েছি আমি। আর্তনাদ করেছি। হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে লাল তরল মুছেছি।

এক বছরেরও কম সময়ে দু’বার হলো এমন। এখন প্রতিশোধ চাই—পুরাতন স্টাইলে! “ওই বেশ্যারে একটা বালও বলবো না আমি!” কথা সম্পূর্ণ করে ধীরে হামাগুড়ি দিতে লাগলাম। কুত্তা যেভাবে দু’পায়ের মাঝখানে লেজ গুটিয়ে পালায়। সেইভাবে পালাতে গিয়ে পেছন ফিরে দেখলাম। কিন্তু আমার মাথা নীচের দিকেই নোয়ানো। হেনরির চোখে চোখ পড়ল।

উলঙ্গ অবস্থায় কিচেন-টেবিলে ঘুম ভাঙে আমার। জানালা খোলা। ধূসর-সাদা পর্দা ঝুলছে ফ্রেমে। গভীর শ্বাস নিচ্ছে ওরা। দ্রুত শ্বাস ছাড়ছে। আবারও শ্বাস নিচ্ছে। আবারও নিঃশ্বাস। বুঝতে পারলাম পর্দা নয়, ওটা আমার ফুসফুস। ঈশ্বর সহায় হউন। ঈশ্বর সহায় হউন। টেবিলের একদিকে কাত হয়ে মাকটেক বমি করলাম। একদম ভাসিয়ে দিলাম। মাছের চুকা গন্ধে ঘর ভরে গেছে। উঠে বসতে চেষ্টা করেও পড়ে গেলাম টেবিলে আবার। কী ঘটেছিল? পরপর ঠিক করে মনে করতে পারছি না।

শুধু মনে আছে ইগ্লোলিক প্রেয়সীরা আমাকে বাড়ি বয়ে নিয়ে এসেছিল। গভীর শ্বাস নিলাম। টাকিলার একটা বোতল মনে পড়ল। গভীর শ্বাস নিলাম। টাকিলার এক শটে আমার মুখে মাকটেক। স্থির শ্বাস নিই। এইতো। এইভাবেই রাত যত গভীর হয়। শ্বাস প্রশ্বাস স্বাভাবিক হয়ে আসে। আবারও বসতে চেষ্টা করি। ঠাণ্ডায় জমে গেছি। জানালাটা বন্ধ করা দরকার। পেটের উপর উপুর হয়ে বসে মেঝেয় পা রাখতে চেষ্টা করি।

মূসা হেনরি, কিচেনেই আমার উল্টো পাশের চেয়ারে বসে ছিল। “এখনও বেঁচে আছিস,” বলে ব্যাঙ্গ করলো।

বিরবিরিয়ে বললাম, “জানালাটা বন্ধ কর।”

চেয়ার না সরিয়েই বললো, “ভেবেছিলাম তুই মরে গেছিস।”

“জানালাটা বন্ধ করবো আমি,” গুঞ্জন করলাম।

কিচেনের সিঙ্ক পর্যন্ত পৌঁছে গেলাম। সমস্ত শরীরে ব্যাথা। সিঙ্কের ভেতর তাকিয়ে আরও একবার উগড়ে দিলাম। কল ছাড়লাম। মুখে পানি ছিটালাম।

“হেনরি, তুই কি আমাকে মেরে ফেলবি?” জিজ্ঞেস করি। ঝগড়া করার কিছু অবশিষ্ট নেই আমার মধ্যে। মেরে ফেললেও কিছু আসে যায় না। শরীরের এই ক্ষতের অসুস্থতার চেয়ে মরে যাওয়াই ভালো এ মুহূর্তে। ওয়েলকাম ম্যাট বিছিয়ে দিব, তূরী বাজিয়ে বলবো, এই যে আমি এসে গেছি।

“না,” মূসা উত্তর দিল, “তুই এখনও আমার বেস্ট ফ্রেন্ড। তুই কখনও মেয়েদের গায়ে হাত তুলিস না, তা তুই ভালোই জানিস।”

“সে কি এখানে?” জানতে চেয়ে একটা ডিশ ক্লথ দিয়ে আমার লজ্জাস্থান ঢেকে চেয়ারে আরাম করে বসলাম। কেন যেন মনে হচ্ছিল লজ্জাস্থান ঢাকাই উচিৎ কাজ।

“না, সে এক শেতাঙ্গের সাথে চলে গেছে।”

“আমি দুঃখিত, মূসা হেনরি।” বলি, একেবারে মন থেকে মিন করে।

সব সময় এমনই হয়। সাদা লোকেরা শো আপ আর অফ করে আর ইনেক মেয়েগুলো পটে যায়। এতে ওদের গর্বের যে কী আছে বুঝি না।

“ধরে নে, আমি একটা শিক্ষা পেয়েছি,” সে বলে, “মনে হয় তুইই সবসময় সঠিক ছিলি। মনে রাখিস, আমিও দুঃখিত এ জন্য।” টেবিল পেরিয়ে সে তার একটা হাত বাড়িয়ে দেয় আমার দিকে। আমি সেটা গ্রহণ করি। ছেলে-ছেলে প্রেমের একটা সংক্ষিপ্ত মুহূর্ত রচিত হয় আমাদের।

“আহা, সে ঠিক আছে,” কাঁধ ঝাঁকিয়ে হেসে বলি, “ফ্রিজ খুলে আজ রাতে কি আরও মাকটেক খাবো আমরা?”

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন