শুভদীপ বড়ুয়ার গল্প : ক্রিসমাসের আগের সন্ধ্যায়


সুব্রত ঘোষের বাঁ হাতে ধরা অ্যাটাচি-কেস’টা ছিল ভারি। সেই কারণে বোধহয় বাঁ কাঁধটা বেশিই ঝুলে পড়েছিল। ডান হাতে ধরা ছিল মোবাইল। সেটা আটকে ছিল ডান কানে। ডান কাঁধটাকে একটু যেন উঁচুও দেখাচ্ছিল। ভায়োলিন-বাদকের ভঙ্গিতে দাঁড়িয়েছিল সে। পা দু’টো একেবারে গায়ে গায়ে লাগানো। দু’পায়ের পাতার মধ্যে নব্বই ডিগ্রি মতো ফাঁকও রয়েছে। পরনে ধূসর রঙের সুট, টাই। টাই’য়ের রঙটাকে চট করে কালো মনে হলেও, সেটি ছিল আসলে মিড-নাইট ব্লু। শৌখিন দেখতে। বাতাসের বেগ বেশি না থাকলেও ভায়োলিন-বাদকের ভঙ্গিতে রাস্তার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা সুব্রত ঘোষ যেন তিরতির করে কাঁপছিল। যদিও সে ছিল আসলে স্থির, একেবারে পাথরের মূর্তির মতো। কিন্তু দূর থেকে তাকে দেখে মূর্তি বা ওই জাতীয় অতিরিক্ত সুস্থির কিছু মনে হওয়াটা মোটেও অস্বাভাবিক ছিল না। পথচলতি মানুষজনেরও অবাক হয়ে তার দিকে ফিরে তাকানোর অন্য কোনও কারণ ছিল না। লোকে তাকে ফিরে ফিরে দেখছিল। তারা ধরেই নিয়েছিল, একটা জলজ্যান্ত লোক আচমকা মূর্তি হয়ে গিয়েছে, বা মূর্তিটি এমনই আশ্চর্য এক শিল্পকর্ম, যাকে জীবন্ত বলে মনে হচ্ছে। দুয়েকজন হঠাৎ হঠাৎ দাঁড়িয়েও যাচ্ছিল, চোখেমুখে কোনও নাম-না-জানা শিল্পীর উদ্দেশ্যে তারিফ ফুটে উঠছিল তাদের।

তবে, ভায়োলিন হাতে না ধরেও ভায়োলিন-বাদকের মতো বাঁ-দিক হেলে শক্ত পায়ে দাঁড়িয়ে থাকা সুব্রত ঘোষকে দেখে থমকে যাওয়া লোকজনের ভ্রম কেটে যাচ্ছিল অচিরেই। কারণ, শরীর স্থির থাকলেও জলজ্যান্ত মূর্তিটির ঠোঁট দু’টো জোরে জোরে নড়ছিল। কথা বলছিল সুব্রত ঘোষ। মোবাইলে। অবশ্য কথাগুলো ছিল খুবই সাধারণ, যেগুলো মানুষকে আকর্ষণ করবে না। দু’দণ্ড দাঁড়িয়ে পড়ে কান পাততে প্ররোচিত করবে না। তাছাড়া, কারই বা সময় রয়েছে কারও কথায় বিনা উদ্দেশ্যে কান পাতার? এমনিই আজকালকার ব্যস্ততার দিনে কেউ কারও কথা শোনে না, বরং বলে বেশি। সুব্রত ঘোষ’ও বলছিল। জোরে জোরেই বলছিল। পঞ্চান্ন বছরের জীবনে তার খুব বেশি কথা জমে না উঠলেও, সেগুলো যেন আজও কাউকে বলা হয়ে ওঠেনি। তাই সে প্রাণ খুলে কথা বলছিল। চিৎকার করেই বলছিল। অনেকের মত সেও নিশ্চিন্ত ছিল, কেউ তার কথা শুনতে পাবে না, বা শুনলেও কান দেবে না। সে দু’চোখ বুজে মোবাইলে একটানা কথা বলে যাচ্ছিল। বাঁ-হাতে ধরা ছিল অ্যাটাচি-কেস। বাঁ কাঁধটা হেলে ছিল একটু। তবে পা দু’টো ছিল স্থির। শরীরও স্থির। পাথরের মূর্তির মতো।

‘ডিমানিটাইজেশন, ডোনাল্ড ট্রাম্প, পতঞ্জলি এলোভেরা, জিও সিম, ফুড সাপ্লিমেন্ট, যোগা ম্যাট, টেট, ব্লাডি মেরি, ...’ এতসব যখন-তখন শুনতে পাওয়া শব্দ, আর তাদের ঘিরে জমতে থাকা চেনা ক্ষোভ-বিক্ষোভ নয়ত উথলে ওঠা আহ্লাদের বাইরে আরও কিছু কথা হয়ত শুনতে পাওয়ার ছিল, যদি না কেউ সুব্রত ঘোষের নড়তে থাকা ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে আসা কথাগুলোকে মন দিয়ে খেয়াল করত একটু।

এমন কি, হয়ত কেউ করেও ছিল। আর করেছিল বলেই সে অল্প কিছুক্ষণের জন্যে দাঁড়িয়ে পড়েছিল সুব্রত ঘোষের কথা-বলা মূর্তিটার সামনে। দাঁড়িয়ে পড়ে এক মনে শুনতে চেষ্টা করছিল, কি এত কথা বলছে লোকটা।

একটি মেয়ে। বছর চব্বিশ-পঁচিশের হবে। পরনে গায়ের সঙ্গে লেগে থাকা নরম কাপড়ের জিনস আর সাদা ফুল-শার্ট। সঙ্গে খাটো দৈর্ঘ্যের কালো কার্ডিগান। শার্টের কলারের ভেতর থেকে আইডেন্টিটি-কার্ড ঝোলানোর লম্বা ফিতে বেরিয়ে এসে কার্ডসহ পেটের ঠিক মাঝ বরাবর ঝুলছে। মেয়েটি ছোটখাটো দেখতে হলেও মেদহীন, ছিপছিপে। চুল পরিপাটি করে বাঁধা। উঁচু খোপা। চোখে একটু বেশিই সরু ফ্রেমের চশমা। বুকের কাছটায় লেদারে বাঁধানো অর্গানাইজার-ধরণের ডায়েরি ধরে রাখা। তবে সব ছাপিয়ে চোখ চলে যেতে পারে কলারের ভাঁজ থেকে বেরিয়ে আসা ফিতে আর তার প্রান্তে ঝুলতে থাকা আইডেন্টিটি-কার্ডের দিকে, যেখানে ছোট ছোট করে ছাপা রয়েছে কোথায় চাকরি করে সে।

মেয়েটি এই পথে রোজই যাতায়াত করে সম্ভবত। তাই সে নিশ্চিন্ত মনে হেঁটে আসছিল। কিন্তু সুব্রত ঘোষের কথা-বলা মূর্তির সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়তে হল তাকে। তাকিয়ে দেখছিল তার মুখের দিকে। বুঝতে চেষ্টা করছিল, কার সঙ্গে এমন চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে কথা বলছে লোকটা। হয়ত কথাগুলো খুবই সাধারণ, তবু মেয়েটি উৎসুক হয়ে শুনতে চাইছিল। আর, সুব্রত ঘোষ ফোনে কথা বলতে বলতে বারবার অন্যমনস্ক হয়ে যাচ্ছিল আচমকা সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়া অজানা-অচেনা মেয়েটির কারণে। মুখেচোখে একটু যে বিরক্তির ভাব ফুটে উঠছিল না, এমন নয়। কিন্তু তারও চোখ চলে যাচ্ছিল মেয়েটির গলার থেকে ঝুলতে থাকা আইডেন্টিটি-কার্ডের দিকে। বাঁ-কাঁধ ঝুঁকিয়ে দাঁড়ানো সুব্রত ঘোষ আরও ঝুঁকে গিয়ে আনমনে পড়ে ফেলতে চাইছিল কলারের ভেতর থেকে উঁকি মারা সেই ফিতের গায়ে কি লেখা রয়েছে। কোন কোম্পানি’তে কাজ করে মেয়েটা?

একসময়ে শেষ হল তার ফোন-কল, লাইন’ও কেটে যেতে পারে। ‘ধুত্তোর’ বলে সুব্রত ঘোষ মোবাইল-ফোন’টা কান থেকে নামাতে না নামাতেই এগিয়ে এসেছিল মেয়েটি। সুব্রত ঘোষ এখন টানটান সোজা। সে যে বেশ লম্বা, এখন দূর থেকে দেখেই দিব্যি বোঝা যাচ্ছে। তবে ভায়োলিন-বাদকের এখন আর অস্তিত্ব নেই।

‘একটু কথা বলতে পারি স্যার? যদি আপনার তাড়া না থাকে।’ ক্রিসমাস-ইভের এসপ্লানেড অঞ্চলের এতসব হই-হট্টগোলের মধ্যে থেকে খুব রিনরিনে, অথচ স্পষ্ট স্বর কানে এল তার। সে মাথা ঝুঁকিয়ে শুনতে চেষ্টা করল, মেয়েটি কি বলতে চায়।

‘কথা? কিসের কথা? আমি কোনো পলিসি-টলিসি করতে পারব না, কোনো এনজিওতে এক পয়সাও সাহায্য করতে পারব না, আগেই বলে দিলাম! আমাকে দয়া করে বিরক্ত কোরো না!’

‘আমি দুঃখিত স্যার আপনাকে বিরক্ত করার জন্যে।’ হেসে বলেছিল মেয়েটি। ‘কিন্তু আমি পলিসির জন্য আসিনি। এসেছিলাম ক্রেডিট-কার্ডের ব্যাপারে একটু কথা বলতে। আপনি কি কোনও ক্রেডিট-কার্ড ব্যবহার করেন? মনীশ-জেফারসন ব্যাঙ্ক কিন্তু খুব ভালো অফার নিয়ে এসেছে!’

‘ক্রেডিট কার্ড!’ মারমুখী হয়ে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে ওঠে সুব্রত ঘোষ। মেয়েটি সভয়ে পিছিয়ে যায় দু’পা।

‘একটু নিশ্চিন্তে দাঁড়াতে দেবে না তোমরা? যেখানে পারবে খদ্দের ধরতে নেমে পড়বে! দরকার নেই আমার ক্রেডিট কার্ড! ওয়ালেটে পাঁচটা ব্যাঙ্কের ক্রেডিট কার্ড পড়ে আছে, আরও চাই? আর, ...আমি, আমি কি তোমার জন্যে এখানে দাঁড়িয়ে রয়েছি ভেবেছ? তোমার ওই ইডিয়টের মতো মুখটা দেখতে? ক্রিসমাস-ইভে কোথায় বয়ফ্রেন্ডের হাত ধরে ঘুরবে, আইসক্রিম খাবে, তা না আমার মতো বুড়োর পেছনে পড়েছ?’ একইরকম চিৎকার করে সে বলে গেলেও, একেবারে শেষ দিককার কথাগুলোর সময়ে কোনও কারণে তার স্বর যেন নরম হয়ে এসেছিল।

সুব্রত ঘোষ ভেবেছিল, মেয়েটি বুঝি খুব অপমানিত বোধ করবে। হয়ত রুক্ষ স্বরে কিছু বলবে তাকে, নয় মাথা নীচু করে বিদায় নেবে। কিন্তু মেয়েটি আগের মতোই হাসিমুখে, আগের চাইতেও কোমল স্বরে বলে উঠল, ‘বুঝতে পারছি আপনি বিরক্ত হয়েছেন খুব। কিন্তু বিশ্বাস করুন স্যার, আমার কিচ্ছু করার নেই।’

‘কিচ্ছু করার নেই? তাহলে চাকরি ছেড়ে দাও, অন্য ধান্দা দ্যাখো! তোমার মতো মেয়েদের আবার কাজের অভাব হয় নাকি?’

সুব্রত ঘোষ ভেবেছিল, এবার নির্ঘাত মেয়েটি তাকে অপমান করবে, যে অপমানে নিজেকে মিশিয়ে দিতে না পারলে কিছুতেই সে শান্ত হতে পারবে না। আবার এটুকু অপমানও কেউ যদি তাকে না করে, তার যেন কোনও অস্তিত্বই থাকবে না। কিন্তু না, মেয়েটি শান্ত রয়ে গেল একইরকম। কণ্ঠস্বর কি দেহের ভঙ্গিতে এতটুকু পরিবর্তন দেখতে পাবেন না কেউ। মেয়েটি আগের মতোই নিস্পৃহ অথচ স্পষ্ট স্বরে বলল, ‘এটাই শেষ চান্স স্যার, চাকরিটা রাখার। এ বছর টার্গেট রিচ করতে পারিনি, ডিসেম্বর মাস শেষ হতে চলল। আপনি যদি একটা অন্তত ক্রেডিট-কার্ড করেন মনীশ-জেফারসন ব্যাঙ্কের, তবে সামনের বছরে ---’

‘এগুলো তো তোমাদের বহুবার বলা কথা! আমার অনেক শোনা আছে। কাউকে কার্ড গছানোর থাকলে এগুলো তোমরা আকছার বলে থাকো, সামনের মাসেও তুমি সেই একই কথা বলবে! তাই না?’

‘বিশ্বাস করুন স্যার, আমি মিথ্যে বলছি না। সকাল আটটার থেকে ঘুরছি, আর পারছি না। এবার মাথা ঘুরে পড়ে যাব। একজনও যে রাজি হচ্ছেন না! আজকের মধ্যে একজনকে দিয়ে একটা কার্ড করাতেই হবে, না হলে কি যে হবে আমি নিজেও জানি না।’



মেয়েটির স্বরে যে একটু হলেও অনিশ্চয়তা ফুটে উঠেছিল, চোখ দু’টো ছলছল করে উঠেছিল, বুঝতে পেরেছিল সুব্রত ঘোষ। তাই হয়ত সে আচমকাই ওপর-চালাক সাজতে চাইল অসহায় মুখে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটির সামনে।

‘ঠিক আছে, আমি কার্ড করব। কিন্তু তার বদলে আমি কি পাব? মানে, তোমার ব্যাঙ্ক আমাকে কি কি সুবিধে দেবে সেসব জানতে চাইছি না, ওসব তোমার হাতে ধরা ব্রোশিওরেই লেখা আছে। আমি বলতে চাইছি, যদি একটা কার্ড করি তোমার কাছে, তার বদলে তুমি আমাকে কি দেবে?’

মেয়েটি সরু চোখে তাকাল তার দিকে। সরু চশমার ভেতর দিয়ে। তারপর তাকে আগাপাশতলা দেখল। এই প্রথম। তার ধূসর রঙের সুট। হালকা গোলাপি সিল্কের শার্ট, মিড-নাইট ব্লু টাই। ডান হাতের মুঠোয় ধরে রাখা বিরাট মোবাইল। সব দেখল খুঁটিয়ে। একটু বোধহয় ঠাণ্ডা-ঠাণ্ডা ভাব এসেছিল বাতাসে, বা রাগ পড়ে এসেছিল সুব্রত ঘোষের, সে অনুভব করল ---ক্রিসমাস-ইভের এসপ্লানেড আজও একইরকম সুন্দর। ঝলমলে। এমন পরিবেশে মানুষ হয়ত প্রেমে পড়তে পারে, কিন্তু কাউকে অপমান করতে পারে না। তাই বোধহয় সেও এতক্ষণে অপমানিত হবার উচ্চাশা ছেড়ে দিয়েছে। মেয়েটির পাতা ফাঁদে পা দিতে চলেছে।

‘আপনি কি চান স্যার? কোনও গিফট? আমি দিতে রাজি।’

‘কি গিফট দিতে পারবে তুমি আমাকে? আমি সাইমন অ্যাডহেসিভের জেনারেল ম্যানেজার, আর তুমি কটা টাকা মাইনে পাও শুনি?’

‘তবে বুঝতে পেরেছি কি চান আপনি। ওটা দিতেও আমি রাজি স্যার। কিন্তু আজ নয়। ওটা আপনার পাওনা রইল, আমি কথার খেলাপ করব না।’

‘আরে আরে! এই তো তোমাদের স্বভাব। বয়েসের দোষ বলব না, বলতে পারো সময়ের দোষ। নিজের চরিত্রের কিছুই আর রাখলে না যে! আমারও বয়েস হয়ে গিয়েছে, ...তার ওপর সময়টা ভালো যাচ্ছে না, নয়ত তোমার সঙ্গে রাত কাটাতে হত তোমার অফার করা গিফটের সম্মানে। কাল ক্রিসমাস! খেয়াল আছে কি? নাকি কার্ড ফেরি করতে গিয়ে সব ভুলে মেরে দিয়েছ? আজকের সন্ধ্যেয় লোকে এমনিই লোককে গিফট দেয়, বদলে কিছু চায় না। আর তোমার থেকে কিইবা পাওয়ার আছে আমার, একটু না হয় গল্পগুজব করতাম দুজনে, এই আর কি! আসল কথা কি জানো, ...কথা বলার লোক নেই বুঝলে! চলো, তোমাকে আর টেনশনে রাখতে চাইছি না। কোথাও একটা বসি। ড্রিঙ্ক কর? কর না। তবে চলো, সামনের ওই ক্যাফেটেরিয়াতে বসি দুজনে। তুমি যা যা সই করানোর সব করিয়ে নিও, যাতে তোমার চাকরিটা এবারের মতো থাকে, নতুন বছরে যাতে মাথা উঁচু করে অফিস যেতে পারো।’

ওরা দু’জন যে আধো-অন্ধকার ক্যাফেটেরিয়া’তে বসেছিল, কোনও কারণে সেটি ছিল ফাঁকা। ক্রিসমাস-ইভে এমন হওয়াটা স্বাভাবিক কি না, বুঝতে চেষ্টা করছিল সুব্রত ঘোষ। সেইসঙ্গে মনে করতে চেষ্টা করছিল, ঠিক এরকমই প্রায় ফাঁকা কোনও ক্যাফেটেরিয়া’তে শেষ কবে সে বসেছে? একলা? নাকি সুরঞ্জনা’র সঙ্গে? অনেক ভেবেও সুরঞ্জনা’র মুখটাকে নিজের উল্টোদিকে মনে করতে পারল না সে। আবার একদম একলা এসেছে, এমন ভাবতেও কোথায় যেন বাধল। সুরঞ্জনা’র সঙ্গে প্রথম যৌবনে কফি-হাউজ, দিলখুশা কেবিন, হাজরা’র বনফুল-এ একসময়ে যাতায়াত থাকলেও, আজকালকার স্মার্ট ক্যাফেটেরিয়া’গুলোতে আসা হয়নি। নিজেকে আসতে হয়েছে যদিও অনেকবারই। হয়ত বন্ধু-বান্ধব বা সহকর্মীদের সঙ্গে আড্ডা দিতে। স্ত্রী সুরঞ্জনা’ও এমন অনেক ক্যাফেটেরিয়া’র ভেতর ভাসতে থাকা কফি’র সুঘ্রাণ নিয়েছে প্রিয় কোনও বান্ধবি কি সহকর্মীদের সাহচর্যে, কিন্তু দু’জনের আজ পর্যন্ত একসঙ্গে কোনও ক্যাফেটেরিয়া’তে বসা হয়ে ওঠেনি। হয়ত দু’জনেরই ইচ্ছে ছিল খুব, কিন্তু কিছুতেই সময় করা যায়নি। বা দু’জনের সময় মেলেনি।

কড়া করে বানানো এসপ্রেসো-কফি’র গন্ধ ভেসে আসছিল। বাইরের হট্টগোলও যেন স্তিমিত খানিক। হুমায়ূন স্ট্রিটের আজকের সন্ধ্যেকে কারও অন্যান্য সন্ধ্যের তুলনায় মলিন বা চুপসে যাওয়া বলে মনে হতেই পারে, যদি রাস্তার ওপর দাঁড় করানো সবুজ-রূপোলি কি সোনালি তবক দেওয়া লম্বা-লম্বা ক্রিসমাস-ট্রিগুলো তার চোখে না পড়ে। সেইসঙ্গে ফুটপাথ জুড়ে ছড়ানো লাল-সাদা সান্তা-টুপি। নানান মাপের ঝলমলে ক্রিসমাস-ট্রি বিক্রি হচ্ছে নিউ এম্পায়ার থিয়েটারের উল্টোদিকের ফুটপাথের প্রায় অর্ধেকটা আটকে। আচমকা যেন অনেকটা জায়গা জুড়ে ফারের ঘন ঝার গজিয়েছে হুমায়ূন স্ট্রিটের ওপর। সুব্রত ঘোষ উদাস চোখে তাকাল সিনেমা-হাউজ’টার দিকে। এখনও কি শো চলে? চললেও কেউ কি দ্যাখে? এই মুহূর্তে কোনও সিনেমা চলছে কি না, বোঝার উপায় নেই। বাড়িটার সারা শরীর রঙচঙে সব বিজ্ঞাপণে ঢাকা। পাশের বাড়ি, লাইট-হাউজ সিনেমা বন্ধ হয়ে গেছে কিছু বছর আগে। এখন তার তিনটে ফ্লোর জুড়ে বিরাট শপিং মল।

সুব্রত ঘোষের মনে হচ্ছিল, এমন পুরনো-পুরনো ভাব এনে দেওয়া পরিবেশে এই মেয়েটি ভারি বেমানান। কেন এসেছে সে এখানে? এই ক্যাফেটেরিয়া’তে? কেন বসেছে তার উল্টোদিকের চেয়ারে? বড়দিনের আগের সন্ধ্যের এসপ্ল্যানেড, ঝলমলে অথচ একইসঙ্গে মন খারাপ করিয়ে দেওয়া হুমায়ূন স্ট্রিট, কোনো কিছুই যে মেয়েটির জন্যে নয়। তার প্রজন্মের জন্যেই নয়। কিন্তু কেন নয়? যদি জানতে চান কেউ, ধরা যাক, মেয়েটিই যদি হঠাৎ প্রশ্ন করে বসে তাকে, তবে কি জবাব দেবে সে? এমন কোনও কথা কি সে গুছিয়ে বলতে পারবে, যা তাকে মেয়েটির চোখে আচমকাই খুব রোমান্টিক কেউ একজন করে তুলবে?

‘স্যার, আপনি কি ক্লান্ত বোধ করছেন খুব? নাকি অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছেন হঠাৎ করেই?’ মেয়েটি আচমকা প্রশ্ন করে বসে।

‘মানে? তুমি তো কাজের কথা বলতে আমার সঙ্গে এখানে এসেছ। তবে ব্যক্তিগত কথা, ইমোশোনের কথা, এসব কেন? কবে থেকে সেলসের কাজ করছ শুনি? মনে রেখো, তোমার মত একশো মেয়েকে আমি একসময়ে ট্রেনিং দিয়ে সেলসের কাজ করিয়েছি, তারা এখন সব একেকজন এক্সপার্ট। তোমার মত ইমোশোনাল কথাবার্তা বলে তারা সময় নষ্ট করে না। তুমি একেবারে সি-গ্রেড সেলস এজেন্ট!’

‘এজেন্ট নই। আমি সরাসরি স্টাফ, পে-রোল এমপ্লয়ী। তবে বড়সড় টার্গেট দেওয়া থাকে স্যার। অ্যাচিভ করতে না পারলে চাকরি চলেও যেতে পারে। সাধারণ সেলস এজেন্ট হলে অত ভয় ছিল না, কতই বা মাইনে পায় তারা? চাকরি গেলে সেই মাইনেতে আরেকটা ধরেও নেওয়া যায়। কিন্তু আমাদের ভয় বেশি স্যার, চাকরি চলে যাবার ভয়! চাকরি গেলে তিন মাস বসে থাকলেই বিরাট ক্ষতি। তাই হয়ত বেশি-বেশি ভাবি নিজেকে নিয়ে, ইমোশোনাল হয়ে পড়ি। আপনি বলুন, একটুও কি ইমোশোনের দরকার নেই? ইমোশোন না থাকলে কিছুই বোধহয় হয় না। কারও সঙ্গে কথা বলা যায় না। কথা বলার লোকও কমে যায়।’

মেয়েটার মুখে থেকে থেকেই খানিকটা করে অদ্ভুত আলো এসে পড়ছিল। আবার চলেও যাচ্ছিল কয়েক মুহূর্ত পর। লাইট-হাউজ সিনেমা’র ওপর বিরাট এক এল-ই-ডি স্ক্রিন বসানো। সেখানে একের পর এক বিজ্ঞাপণ চলছে। তাই আলোর তারতম্য কাচের দরজার ওপারে। মেয়েটার মুখে। মেয়েটা ব্যাঙ্কের নিজস্ব স্টাফ শুনে একটু যেন নরম হল সুব্রত ঘোষ। নাহ, এসব ব্যাঙ্কগুলো বছর পাঁচেক পর আলাদা করে আর সেলসের লোক রাখবে না। এদের দিয়েই ভেতরের-বাইরের সব কাজ করিয়ে নেবে। যদিও মাইনে দেবে ভেতরের কাজের জন্যেই, আর বাইরের কাজের জন্যে থাকবে খুশি-করানো গোছের সামান্য কমিশন। কিন্তু টার্গেট ধরতে না পারলে দ্রুত ছাটাই। তাই ব্লাড-প্রেশার, শুগার-ডায়াবেটিস, সব অল্প বয়েসে ধরে ফেলবে এদেরকে। মেয়েটির মুখের দিকে ভালো করে দেখল সুব্রত ঘোষ। নাক-চোখ-মুখ সুন্দর। অল্প বয়সের স্বাভাবিক কমনীয়তা কি লাবণ্য, কোনোটারই ঘাটতি হয়নি এখনো। চুল আর ত্বক দেখলে আন্দাজ করা যায়, ভালো-পরিবারের মেয়ে সে। নির্ঘাত কোথাও এম-বি-এ করে চাকরি নিয়েছে ব্যাঙ্কে। কিন্তু ক্রিসমাসের আগের সন্ধ্যেয় যেন একটু বেশিই শীতাতুর ভাব করে একলা-একলা ক্রেডিট কার্ডের খদ্দের যোগার করতে বেরোতে হয়েছে। এমন জীবনের কি মানে? মনে মনে হাসে সুব্রত ঘোষ। তবে মুখে বলে না কিছুই।

ওরা পরস্পরের দিকে তাকিয়েছিল অনেকক্ষণ। মুখে কোনও কথা ছিল না। হয়ত অনেক কথাই হবার ছিল ওদের মধ্যে। কিন্তু দুজনেই ভাবছিল, কি করে সবচাইতে কম কথায় এই সামান্য অবকাশটুকু পেরিয়ে আসা যায়। কিংবা দু’জনেই হয়ত কাচের দরজার ওপারে ফেলে আসা উদ্বেগ-দুশ্চিন্তার পৃথিবীটাতে তাড়াতাড়ি ফিরে যাওয়াকেই শ্রেয় বলে মনে করছিল। যদিও, সুব্রত ঘোষ চাইছিল অজ্ঞাতকুলশীল মেয়েটির সঙ্গে একটু হলেও কথা বলতে, মনের কথা বলতে। কিন্তু মেয়েটির তরফে উৎসাহ ছিল না। একটুক্ষণ পরপরই চুপ হয়ে যাচ্ছিল সে। ভদ্রতা করে হোক, কি সারাদিনের ক্লান্তির কারণে, মেয়েটি চুপ করেই ছিল। বেশ ম্রিয়মান দেখাচ্ছিল তাকে। বাইরের চড়া এল-ই-ডি’র আলোর কারণে কখনো-কখনো তাকে মাত্রা ছাড়ানো ম্রিয়মান বলেও মনে হচ্ছিল। মেয়েটিকে চুপ করে থাকতে দেখে সুব্রত ঘোষও কথা খুঁজে পাচ্ছিল না। মেয়েটিকে করুণার পাত্র, বা নানান সমস্যার মধ্যে রয়েছে সে, এমন কিছু একটা আন্দাজ করেই সুব্রত ঘোষ মনেমনে একরকম রেহাই দিতে চাইছিল তাকে। যে ধরণের রেহাই কাউকে অনায়াসে দেওয়া যেতে পারলে, নিজেকে উদার বা করুণাময় বলে ভাবতে পারেন যে কেউ। তবে সুব্রত ঘোষ চাইছিল, মেয়েটির সামনে সম্পূর্ণ শর্তহীনভাবে করুণাময় হয়ে উঠতে, যাতে নিশ্চিন্ত মনে সে বছরের শেষতম ক্রেডিট কার্ডের খদ্দেরটিকে সংগ্রহ করে বাড়ি ফিরতে পারে।

আর মেয়েটি ভাবছিল, উল্টোদিকের চেয়ারে অপ্রসন্ন মুখে কফি-কাপ হাতে ধরে বসে থাকা উদাসী চোখের লোকটার কথা। বয়েসে তার বাবার কাছাকাছি। তবে বাবার চাইতে স্মার্ট নয়, যদিও ক্রমাগত নিজেকে স্মার্ট দেখাতে চেষ্টা করে চলেছে। কথায় কথায় তার বয়ফ্রেন্ডের প্রসঙ্গও তুলেছিল লোকটা। বুঝতে চাইছিল, সে বিব্রত বোধ করছে কি না। আদিরস ঘেঁষে যাওয়া নানান রসিকতাও যে একটু-আধটু করতে চাইছিল না লোকটা, তাও নয়। কিন্তু কোনও কারণে সেগুলো জমছিল না বিশেষ। হয়ত মেয়েটি নিজের থেকে নির্লিপ্ত হতে চাইছিল, উল্টোদিকে বসা লোকটাকে অগ্রাহ্য করতে চাইছিল। তা না হলে ভীষণ ক্লান্ত বোধ করছিল, প্রায় লোকটার মতই। লোকটা একটুক্ষণ আগে রাস্তায় দাঁড়িয়ে মোবাইল-ফোনে চিৎকার করে বকাবকি করে যাচ্ছিল কাউকে, যে কারণে এখন ক্লান্তিতে ভেঙে পড়তে চাইছে। কফি খেতে খেতে চোখ বুজে আসছে তার। অথচ লোকটার মোবাইলের ভেতর ছুঁড়ে দেওয়া কথাগুলোর একটা-দু’টো টুকরো কানে আসাতেই তাকে কিন্তু দাঁড়িয়ে পড়তে হয়েছিল, না হলে উপেক্ষা করে সে হেঁটে যেতে পারত। কাকে উদ্দেশ্য করে অত চিৎকার করছিল লোকটা, আন্দাজ করা শক্ত নয় খুব। সম্ভবত স্ত্রী, বা আপনার কেউ না হলে কারও সঙ্গে এতটা ‘ইমোশোনাল’ হয়ে কথা বলতে পারেন কি কেউ? লোকটা বলছিল অনেক কথাই, তার মধ্যে যে কথাগুলো মেয়েটিকে ভায়োলিন-বাদকের মত স্থির হয়ে দাঁড়ানো কোনও মূর্তির সামনে আচমকা থেমে যেতে বাধ্য করেছিল, সেগুলো ছিল –আমাকে অপমান কর তো একটু! আমি তোমাকে এত অপমান করি, কিন্তু তুমি ঘুরে অপমান কর না কেন? এভাবে আমাকে দিনের পর দিন তুমি অগ্রাহ্য করতে পারো না!

‘আমাকে কেউ কখনো অপমান করে না জানো! সকলে যে ভালোবাসে, তাও কিন্তু নয়। যেমন ধর, তোমার কাকিমা! ওকে আমি উঠতে বসতে আজকাল নানান কারণে অপমান করে ফেলি। পরে বুঝতে পেরে আমারই খারাপ লাগে, কিন্তু সে আমাকে কক্ষনো ঘুরে অপমান করে না। অফিসেও জানো তো, সক্কলে ভয় পায় আমাকে। সাব-অর্ডিনেটরা ভয়ে কাঁটা হয়ে থাকে, আমি ওদেরকে মা-বাপ তুলে যাচ্ছেতাই বলি, ...কি না কি বলি, কিন্তু ওরা আমাকে ঘুরে একটুও অপমান করে না। ...কিন্তু, আমি যে একটু হলেও অপমানিত হতে চাই পৃথিবীতে। না হলে মনে হবে, আমি বোধহয় কোত্থাও আর নেই! কেউ নই।’

না, কথাগুলো অজানা-অচেনা একটি মেয়েকে কিছুতেই মুখ ফুটে বলে উঠতে পারল না সুব্রত ঘোষ। কোথাও বেধেছিল হয়ত। তবে মনে মনে বলছিল। বারবার বলছিল। যদিও মুখে বলছিল অন্য কথা। অনেকদিন আগেকার সুন্দর সব দিনের কথা। কম বয়সের রোমান্সের কথা। সুরঞ্জনা’র প্রেমে পড়ার কথা। তারপর তাদের দু’জনের বিয়ের কথা। ‘তোমার কাকিমা ছিলেন লাজুক। ভবানিপুরের বনেদি বাড়ির মেয়ে, পাড়াসুদ্ধু লোক একডাকে চিনত ওদেরকে। ওই সময়ে তোমার কাকিমাকে নিয়ে কোনও রেস্টোরান্টে বসাটা যে কি কষ্টকর ছিল, অথচ একইসঙ্গে কি মধুর, ভাবতেই পারবে না তোমরা!’

‘খুব মধুর না? আমার মনে হয়, একটু লুকোছাপা না থাকলে মধুরতাটা নষ্ট হয়ে যায়।’ মোবাইল-ফোনের স্ক্রিন থেকে চোখ তুলে অস্ফুট স্বরে বলেছিল মেয়েটি। সে হয়ত মনে মনে ভাবছিল অন্য কোনও কথা। যদিও সেই কথাটুকুও শেষ পর্যন্ত কোনও না কোনও মধুরতাকে নিয়েই। স্বল্প অভিজ্ঞতার জীবনের বিশেষ কোনও মুহূর্ত হয়ত তার মনে পড়ে গিয়েছিল, না হলে লোকটার মুখে শোনা তার ব্যক্তিগত মধুরতার ক্ষণগুলোকে নিজের মত করে অনুভব করতে চাইছিল। লোকটার মতো তারও একটু পরপর চোখ বুজে আসছিল। মধুরতা। কি সুন্দর এক শব্দ! এই একটা শব্দের জন্যে মানুষ কি না কি করে ফেলতে পারে! ভাবতে চেষ্টা করছিল মেয়েটি।

‘তোমাদেরও কি একই সমস্যা? মানে, এখনও কি খুব লুকোছাপার দরকার পড়ে অল্পবয়েসী ছেলেমেয়েদের ঘোরাঘুরি করতে? চারপাশে যা দেখি, মনে তো হয় না কিছু লুকোতে চেষ্টা করছে তারা!’ সুব্রত ঘোষ মেয়েটির চোখে চোখ রেখে বলেছিল। তার মুখের ওপর আলো বলতে কিছু ছিল না, তবু মেয়েটির মনে হচ্ছিল লোকটার চোখ দু’টো স্বচ্ছ এবং উজ্জ্বল, আর খুবই আন্তরিকভাবে প্রশ্নটিকে তার সামনে রাখা হয়েছে। সুব্রত ঘোষের কথার সঙ্গে লেগে থাকা শ্লেষটুকু সে অনুভব করতে পেরেও শেষ পর্যন্ত উপেক্ষা করতে চাইছিল। ভাবছিল এও বুঝি একরকমের বিরল মধুরতা। অচেনা কারও সঙ্গে ক্রিসমাসের আগের সন্ধ্যেয় ক্যাফেটেরিয়া’তে এসে বসা, বিশেষ কথা না হলেও অনেক কথাই একে অপরকে জানিয়ে দেওয়া। সে উপভোগ করতে চাইছিল এই মধুরতাটুকু। আর চাইছিল বলেই, অনেক কথা তারও বলতে ইচ্ছে করছিল লোকটাকে। কিন্তু সাহস করে বলে উঠতে পারছিল না।

এভাবে বেশ কিছুক্ষণ তারা ক্যাফেটেরিয়া’র ভেতরে কাটিয়েছিল। পরস্পরের দিকে চেয়েছিল বেশি, কথা হচ্ছিল কম। তবু যেটুকু যা কথা হয়েছিল ওদের দু’জনের মধ্যে, তাতে জানা যায়, সুব্রত ঘোষের সঙ্গে তার স্ত্রী সুরঞ্জনা’র নাকি মিলমিশ কোনোকালেও ছিল না। তবু তারা মানিয়ে চলতেন একে অপরকে। যে যার নিজের জগতে থাকতে ভালোবাসতেন। সন্তানাদি বড় হয়ে গিয়েছে এখন। সুব্রত ঘোষ আগে বাইরে-বাইরে সময় কাটাতেন বেশি, পরিবারে কম। কিন্তু এখন বাড়ির দিকে মন এসেছে। এদিকে দু’জনেই বয়সের সঙ্গেসঙ্গে ধৈর্য হারাচ্ছেন, মেজাজ খারাপ করে ফেলছেন। তাই ঝগড়াঝাটি, মনোমালিন্য লেগেই রয়েছে। রেগে গেলে সুব্রত ঘোষ বকাবকি করেন বেশি। সুরঞ্জনা কম। কিন্তু দু’জনেরই রক্তচাপ প্রায় একইরকম বেশি। দু’জনেই নাকি ভাবেন এবার বিচ্ছেদের প্রয়োজন, মুখ ফুটে বলেও ফেলেন মাঝেমাঝে। কিন্তু বাস্তবে সেটি আর হয়ে উঠছে না। কেন হয়ে উঠছে না, সেটিও দু’জনের মাথাব্যথার একটি কারণ হতে পারে।

আর মেয়েটির সম্বন্ধে জানা গিয়েছিল, সেও তার প্রেমিক তথা বয়ফ্রেন্ড’কে নিয়ে বর্তমানে খুবই বিচলিত। এক কথায়, তাদের দু’জনের মধ্যেকার সম্পর্কটি ভবিষ্যতে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, এই নিয়ে অনেক ভেবেও সে কুল-কিনারা পাচ্ছে না। ছেলেটির বয়েস হয়েছে, কিন্তু এখনও ঠিকঠাক উপার্জনের পথ খুঁজে পায়নি। কোনও এক জামা-কাপড়ের রিটেইলে সামান্য মাইনেয় সেলসম্যানের কাজ করে। যদিও দু’জনের উপার্জন ধরলে একেবারে খারাপ অঙ্কের হবে না সেটি। তবু মেয়েটি মন থেকে ভীষণভাবে চায়, তার স্বামী অনেক টাকা উপার্জন করুক। নয়ত কিছুতেই সে নিজেকে সম্মান করতে পারবে না। নিজের সম্মানটুকু নিজের কাছে খেলো হতে শুরু করে দিলে মনে হবে দুনিয়ার প্রতিটি মানুষ বুঝি তাকে অপমান করছে।

‘আমার মনে হয় প্রতিটি মানুষ প্রতি মুহূর্তে অপমান করছে আমায়।’ টেবিল ছেড়ে উঠে আসার সময়ে নীচু স্বরে একবার বলেও ফেলেছিল মেয়েটি।

সুব্রত ঘোষ বোধহয় শুনতে পায়নি, অন্যমনস্ক চোখে মেয়েটির দিকে সে একবার তাকিয়েছিল শুধু। এরপরেও তাদের মধ্যে কথাবার্তা হয়েছিল। ক্যাফেটেরিয়া’র বাইরে শীতের হাওয়া, আর ক্রিসমাসের আগের সন্ধ্যের আলোতে হয়ত দুজনেরই মন ভালো হয়ে যাচ্ছিল। দু’জনেই হাসছিল খুব। পরস্পরের কথায় কৌতুক বোধ করছিল। চমৎকৃত হচ্ছিল। তারপর হাসিতে ফেটে পড়ছিল। কাউকে এতটুকু বিমর্ষ দেখাচ্ছিল না। মলিন বা ক্লান্ত মনে হচ্ছিল না। ওরা পরস্পরকে আরও খানিকটা করে জানতে চাইছিল। যেমন মেয়েটি জানতে পেরেছিল, সুব্রত ঘোষ যুবা-বয়েসে একটুও স্মার্ট ছিল না। মেয়েরা পাত্তা দিত না। যদিও এখন অনেক মেয়েই ঘনিষ্ঠ হতে চায় তার, কিন্তু কি করবে সুব্রত ঘোষ? এখন আর তার বয়েস নেই। এই কারণে মনে তার ক্ষোভ রয়েছে প্রচুর, যা সে কাউকেই বলতে পারে না। আর সুব্রত ঘোষ জানতে পেরেছিল, মেয়েটি নাকি আগে একটি ছেলেকে ভালোবাসত খুব। তারপর তার এখনকার প্রেমিক, যাকে সে বিয়ে করতে চলেছে, সে জীবনে এসে গেলে আগের ছেলেটিকে সে দূরে ঠেলে দেয়। সে শুনেছে, ছেলেটি এখন সুপ্রতিষ্ঠিত। কিন্তু আজও বিয়ে করেনি। মেয়েটির ধারণা, তাকে পায়নি বলেই ছেলেটি বিয়ে করেনি। এবং এও নিশ্চিত, কোনোদিন করতে পারবেও না। এই কারণে মেয়েটির মনে একটু দুঃখ-মেশানো গর্বও হয়, যা সে কাউকে বলতে পারে না।

কিন্তু তবু তারা কথা বলছিল। সব কথা বলা না হলেও, অনেক কিছু না-জানা থেকে গেলেও, ওদের দু’জনেরই বেশ ভালো লাগছিল দু’জনকে। হাঁটতে হাঁটতে নিউ মার্কেট’কে পাক দিয়ে এগোচ্ছিল তারা। লিণ্ডসে স্ট্রিটে ভিড় থাকলেও ক্রিসমাস-ভিড় যেন কম। সুব্রত ঘোষের মন হল, ক্রিসমাসের ঠিক আগের সন্ধ্যেতেই যখন দেখা হল মেয়েটার সঙ্গে, ওকে একটা কেক উপহার দিলে হয়ত সবচাইতে ভালো দেখাবে ব্যাপারটা। এছাড়া আর কি কিনে দেওয়া যেতে পারে মেয়েটিকে, সে ভেবে পাচ্ছিল না। নিউ মার্কেটের নাহুম’জ-এর সামনে লাইন পড়বে নিশ্চয়ই। তবু সুব্রত ঘোষ মেয়েটিকে পার্কোম্যাটের সামনে দাঁড়াতে বলে, সটান চলে গিয়েছিল ভেতরে। বলে গিয়েছিল, সে ক্রিসমাস-ইভে তাকে কেক উপহার দিতে চায়। যদিও মেয়েটি তাকে বারবার নিরস্ত করতে চাইছিল। ভিড় থাকলেও, এক পাউণ্ডের একটা কেক কিনে বাইরে আসতে সুব্রত ঘোষের সময় লেগেছিল মাত্র দশ মিনিট। কিন্তু বেরিয়ে এসে মেয়েটিকে আর খুঁজে পেল না সে। কেকের প্যাকেট’টাকে বুকে চেপে পার্কোম্যাটের সামনে সে দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ। ভারি অ্যাটাচি-কেস’টাকে বাঁ হাতে ধরে, বাঁ কাঁধ ঝুঁকিয়ে, পা দু’টোকে একেবারে গায়ে গায়ে লাগিয়ে। দু’পায়ের পাতার ফাঁকে প্রায় নব্বই ডিগ্রি মতো পরিসর রেখে, ভায়োলিন-বাদকের ভঙ্গিতে। তবে তার মোবাইল ছিল স্তব্ধ। কোনও কথা চলছিল না। তাই হয়ত মেয়েটি আর এল না। ক্রেডিট কার্ডের জন্য প্রয়োজনীয় সই-টইগুলো করিয়ে নিয়ে চলে গেছে। একটি ঘণ্টা অপেক্ষা করেও সেই সন্ধ্যেয় তার আর দেখা পেল না সুব্রত ঘোষ। আশ্চর্য হয়নি। বরং যেন খানিক বিমর্ষ হয়েছে, এমন এক মুখের ভাব করে ধীর পায়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে হাঁটা দিয়েছিল সে।

______________



লেখক পরিচিতি
শুভদীপ বড়ুয়া 
কথাসাহিত্যিক।
ভারত সঞ্চার নিগম, কলকাতায় উপমহাপ্রবন্ধক কলকাতা, ভারতে থাকেন।




একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ