শুভ মৈত্রের গল্প নিয়ে : ছায়ার ভিতর দিয়ে দেখি ভুবনখানি : প্রসঙ্গ দুগ্গাকুড়ানি এবং..


পুরুষোত্তম সিংহ

প্রান্তিক মানুষের ছোটো ছোটো সুখ-দুঃখ, ব্যথা-বেদনা, আনন্দ অনুভূতি নিয়ে শুভ্র মৈত্র আখ্যানভুবন সাজিয়েছেন। বিরাট পরিসর বা বড় ক্যানভাসে যাবার প্রয়োজন হয়নি, চোখের সামনেই যে হাজার বাস্তবতা নানাভাবে ক্রমেই উঁকি দিচ্ছে তিনি সেগুলিকেই ধরতে চেয়েছেন। অভাবী দরিদ্র মানুষগুলির কত অভিযোগ, কত বৈষম্য, কত শ্রেণিচক্র অতিক্রম করে, কখনও সেই দলাদলির মধ্যে পিষ্ট হয়েও বাঁচতে হয়, নতুন করে জীবনস্বপ্ন বুনতে হয় তা তিনি নিবিড়ভাবে দেখেছেন। সাংবাদিকতা বা চাকুরি সূত্রে তিনি যে স্থলে গমন করেন সেখানকার প্রত্যক্ষ বাস্তবতায় এত নির্মমতা, রুক্ষতা, যন্ত্রণা তা হৃদয়গ্রাহী মন নিয়ে দেখলে শুধুই বিষণ্ণ হতে হয়। সেই বিষণ্ণ যাপনের লিপিমালা তিনি অক্ষরভুবনে সাজিয়ে দেন। তাঁর পাত্রপাত্রীরা কেউ অটো চালক, কেউ বেকার টিউশন মাস্টার, কেউ পরিত্যক্ত ঠাকুর কুড়ানি, কেউ হোটেলের কর্মী, কেউ নকল সাপ্লাইয়ার। সুখের স্বরলিপির সুর যেখানে বাজেনা, যেখানে নিত্য বেজে ওঠে অভাবের বীণা, দুঃখ যাদের কপালে স্থায়ী জন্মদাগ এঁকে দিয়ে গেছে, বন্যায় ভেসে যাওয়া যাদের বাৎসরিক নিয়তি সেইসব মানুষের মতো অর্ধ জীবন্ত খোলস নিয়ে শুভ্র মৈত্রের আখ্যানভুবন সেজে উঠেছে।

​‘বিচার’ গল্প শুরুই হচ্ছে—‘বিমলের সবচেয়ে বড় সুবিধা ওর কোনো মতামত নেই’। আজকের ধন্দমূলক বাস্তবতায় এই বাক্য যেমন আধা রাজনৈতিক তেমনি ব্যক্তির নিরপেক্ষ সুখকর ভূমিকার ক্ষেত্রে উপযুক্ত। প্রশ্ন হল এই ‘মতামত নেই’ও তো একপক্ষ সমর্থনেরই জোরালো সাওয়াল হয়ে ওঠে সুযোগ বুঝে। আজকের ধ্বংসপ্রবণ রাক্ষসী সময়প্রবাহে মতামতহীন মানুষের সংখ্যাগরিষ্ঠতা যত বৃদ্ধি পাবে রাজনৈতিক দলগুলির ততই সুবিধা। তেমনি এই পক্ষই গাছের খাব, তলার কুড়াব এর ভূমিকায় অংশ নেয়। বিমলও তাই। এই আখ্যানে শুভ্র মৈত্র অনেকগুলি সত্যের ওপর জোর দিয়েছেন। মেম্বার, গ্রাম্য রাজনীতি, বিধবা ভাতা, গ্রাম্য কদাচার ইত্যাদি ইত্যাদি। ফুলসারি বিবির স্বামী দুলাল বাইরে থাকে। অর্থ তেমন পাঠায় না। ফুলসারি বিবির বিধবা ভাতা হয়েছে এই নিয়ে গণ্ডগোল। ফুলসারির সঙ্গে মেম্বার জাহিরুলের গোপন সম্পর্ক রয়েছে। বিষয় হল একটি গ্রাম্য বধূ (স্বামী ভিন্ন প্রদেশে থাকা) যদি বিধবা ভাতার সামান্য অর্থ পায় এমনকি অসুবিধা? অথচ গ্রামের লোক এটাও সহ্য করবে না। গ্রামীণ সমাজবাস্তবতা এমনই। যদিও সমস্যা সমাধান হয়েছে বিবি থেকে বেওয়াতে পর্যবসিত হওয়ায়। ফুলসেরা জানিয়েছে স্বামী বিদেশেই মারা গেছে। গ্রামীণ সমাজ বিবর্তনের ছবি আছে—পেচ্ছাব, পায়খানা থেকে টয়লেটে উন্নীত। বিমলের নামে এখনও ‘দালাল’ উপমা যুক্ত হয়নি। এইসব হাজারো দুঃখের মর্মবেদনাকর দৃশ্যের সাক্ষী গল্পকার। তাঁকে আখ্যানের জন্য কখনোই কৃত্রিমতার আশ্রয় নিতে হয়না। নিজস্ব ভুবনের নিজস্ব বাস্তবতার চেনা পরিসরে কত অচেনা মুখ, গ্লানিময় মানুষের কত তুচ্ছাতিতুচ্ছ হিংসা, যার মধ্যে রাজনীতির নানা হালচাল ইতিমধ্যেই প্রবেশ করে গেছে, যা মানুষের নিত্য যাপনকে আরও ভয়ংকর করে তুলেছে, যার মধ্যে কোনো রোমান্স নেই, কেবলই যন্ত্রণা, সেই বেদনার বাঁশি তিনি নিজের মতো করে কালের কণ্ঠে বাজিয়েছেন।

​ক্রিকেটের জ্বর কীভাবে প্রান্তকে গ্রাস করছে সেই চিত্র এসেছে ‘আউট’ গল্পে। একদিন হিন্দি সিনেমা প্রান্তের অতি সাধারণ মানুষের মনে রোমান্স, আলগা স্বপ্নের জন্ম দিয়েছিল আজ যুবকদের ভাবনাচিন্তাকে গ্রাস করেছে ক্রিকেট, আই.পি.এল। যদিও সর্বনাশা আই.পি.এল যুব প্রজন্মকে কীভাবে সর্বস্বান্ত করেছে, মৃত্যুর সিঁড়ি পর্যন্ত এগিয়ে নিয়ে গেছে সেই সত্য নেই। যারা প্রতি মুহূর্তে জীবন থেকে আউট হয়ে যেতে পারে তারাও ধোনির আউটে বিষণ্ণ। দুর্গা হোটেল আর প্রিন্স হোটেল। দুর্গা হোটেলের ভোলার কাজ কাস্টমার সংগ্রহ করা। যে ভোলা মালদা টাউনের বাইরে কোনোদিন যায়নি সে নিউজিল্যান্ড, আফ্রিকার ক্রিকেটারদের চেনে। কাস্টমারদের টানতে উচ্চারণ করতে হয় ‘বাড়ি মতো রান্না’। বিজ্ঞাপনের নানা কৌশলে কায়দাকানুনে মধ্যবিত্ত বাঙালি যে নিজের শ্রেণি অবস্থান প্রায়ই ভুলে থাকে তা আবারও স্পষ্ট করে দেন লেখক। হত দরিদ্র মানুষের বাড়িতে কী রান্না হয় সে চিত্রও যে লেখকের জানা। আসলে সেই বাক্যেই মধ্যবিত্ত বাঙালিকে বশ করা যেতে পারে।চমৎকার গল্প ‘গন্ধ’। গ্রামীণ সমাজবাস্তবতা কতটা প্রখর হতে পারে, কতটা তীব্র হতে পারে তা লেখকের জানা। সেই জানা সত্যকেই তিনি আখ্যানে নামিয়ে আনেন। আর্টের বিচারে, শিল্পের বিচারে গল্পগুলি হয়ত শ্রেষ্ঠ নয়। কিন্তু জীবনের আবার আর্ট কি? অভাবী জীবন কোনদিন আর্ট মেনে চলেছে? যিনি জীবন দেখতে জানেন, দেখাতে জানেন সেখানে আর্টের প্রয়োজন নেই। আর আর্টের সত্য এলেই তো বানানো সত্য আসতে চায়। শুভ্র মৈত্র গল্প বানাতে বসেননি। প্রশ্ন হতে পারে কিসের গন্ধ? গল্পের বয়ান থেকে অবধারিতভাবে উত্তর আসে অভাবের গন্ধ, হতাশার গন্ধ। তবুও শবনামরা বাঁচতে চায়। অভাবকে নিত্য সঙ্গী করেই জীবনের দিগন্ত খুঁজতে চায়। গল্পে আছে পাড়ি দেওয়ার বৃত্তান্ত। এ পাড়ি শম্ভু মিত্রের পাড়ি নয়। এ পাড়ি দেবার জন্য তথাকথিত মার্ক্সবাদের পাঠ প্রয়োজন নেই। সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতাই সেই সত্য জানান দিচ্ছে। কর্মের সন্ধানে, পেটভাতের সন্ধানে বিরাট বিরাট গ্রাম স্বভূমি ছেড়ে ভিন্ন প্রদেশে পাড়ি দেয়। কলতলা থেকেই সমাজ সংসার জীবনের পরতে পরতে যে বহুবিধ সত্যনামা লুকিয়ে আছে তা বেরিয়ে আসে। তবুও এই মানুষগুলো স্বপ্ন দেখে, জলের কাছে জীবনের পাঠ নেয়। অভাব আছে, অভিমান আছে, এরা ‘নেই রাজ্যের’ বাসিন্দা, তবুও স্বপ্ন আছে। আর স্বপ্নবান মানুষ কবে পরাজিত হয়েছে?

​সময় সরণির হাত ধরে গ্লোবালাইজেশন, শপিংমল, নগরায়ণ সব গ্রাস করে নিচ্ছে। মানুষকে আধুনিক করে তোলার বিজ্ঞাপনী ফাঁদে সমস্ত ধ্বংসের কুচক্রান্তে আমরা কীভাবে নিজেদের সপে দিয়েছি তা ভেবে নিজেদেরই বিস্মিত হতে হচ্ছে। সেলুন, ছোটো কাপড়ের দোকান, রিকশা, মুদিখানা সব উঠে গেল। মানুষগুলি কোথায় যাবে ভেবে দেখেছে কি নাগরিক সভ্যতা? শঙ্কর মুদিরা একটা প্রতিবাদ জানিয়েছিল, আধা সামন্ততান্ত্রিক, আধা পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের প্রকৃত অবস্থা চিহ্নিত করেছিল। শুভ্র মৈত্ররাও নিজেদের মতো করে লিখে চলেছেন। চোখের সামনে যে ক্রমাগত বিবর্তন ঘটে যাচ্ছে, শতশত মানুষ ঘরছাড়া হচ্ছে, নদীগ্রাস, পুকুর ভরাট থেকে শপিংমল, ফ্ল্যাট কালচার গড়ে উঠছে, নগরায়ণের নামে ক্রমেই বৃক্ষ উৎপাটন চলছে তা দেখে বসে থাকবেন কেমন করে? সিনেমার গুরু থেকে মহাগুরু, ‘এক ছোবলেই ছবি’র তারকা সিনেমার পর্দা থেকে রাজনীতির পর্দায় এসে বাস্তবেই মানুষকে যে ঠকানোর কায়দা কৌশল আয়ত্ত করে চলেছেন তা মানুষ বুঝবে কবে? গল্পকারারা বুঝেছেন। লিখে চলেছেন। কিন্তু এই প্রতিবাদটা সর্বস্তরে কীভাবে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব? কোন মাধ্যমে মানুষকে সচেতন করে দেওয়া সম্ভব? কোনো উত্তর আসেনা। ‘গুর’ গল্প থেকে দুটি সংলাপ উদ্ধৃতি দেওয়া যাক—‘এসব কথা কোনো নিম্নবর্গের ইতিহাসেও লেখা নেই’ ও ‘হয়ে যাবে। লিখিত পরীক্ষায় সাদা খাতা জমা দিস’। বাস্তবতার পাঠকে কোনো নবভাবে নির্মাণ বিনির্মাণ নয় বরং ঘটমান বাস্তবতাকে লেখক ছিঁড়ে খুঁড়ে তন্নতন্ন করে ঘটনার পরতে পরতে যে একাধিক সত্যনামা লুকিয়ে আছে তা দেখিয়ে দেন। ক্লাব, ঠিকাদারি, ভোট, জনসেবা এইসব টুকরো টুকরো একাধিক ইঙ্গিত রেখে শুভ্র মৈত্র আমাদের সভ্যতার প্রকৃত স্বরূপ চিহ্নিত করতে যেমন ক্লান্তিহীন তেমনি স্বল্প কৌতুকে গদ্যের আপাত ব্যঙ্গে আয়নার সামনে আমাদের দাঁড় করিয়ে যেন আমাদেরই একটা ঠাস করে চড় কষাতে চান। যদিও নির্দিষ্টভাবে কেউই লক্ষ্য নয় অথচ অলক্ষ্যে যেন আমাদেরই বলা, এখানেই শুভ্র মৈত্রের সমস্ত কারিগরি দক্ষতা।

​শুভ্র মৈত্র একটা নিজস্ব গদ্য ভাষার আইডেনটিটি গড়ে তুলেছেনবাক্য ও শব্দজালে। তা গভীর ও প্রবলভাবে স্বাতন্ত্র্য চিহ্নিত না হলেও নিজস্ব। পরিচ্ছেদে পরিচ্ছেদে ক্ষণিক ব্যবধানে শব্দ ব্যবহারে ছোটো ছোটো বুড়িমার চকলেট বোম রেখে নিজের অস্তিত্ব পৃথকভাবে জানান দেন। সব গল্পেই রাজনীতির অনুপ্রবেশ থাকে গুপ্তচরের মতো। চব্বিশ ঘণ্টা যে রাজনীতি আমাদের পিষ্ট করছে, সাধারণ মানুষের জীবনে আজ যে গোপন আঁতাত বড় হয়ে উঠেছে সেই পার্টি রাজনীতির নানা সমীকরণ, চালবাজি এসে উপস্থিত হয়। সংবাদপত্র, মিনি ঈশ্বরের দূতদুনিয়ার স্বঘোষিত বার্তাবাহক চ্যানেলগুলিতে ভোট, পূজা ছাড়া সাধারণ মানুষের কোনো সত্যই যে চোখে পড়েনা সেখানে ভাত-কাপড়ের সত্যে বিশ্বাসী মানুষ যাবে কোথায়? সংসদীয় গণতন্ত্রে সমাজ জীবনের সমস্ত সত্যকে অতিক্রম করে রাজনীতি, ভোট, নেতা, কাউন্সিলার, মেম্বার যে সর্বত্র আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসে উপস্থিত হল এর সূত্র কোথায়? সর্বত্র সমস্ত নাশ করে, নাশকতার ছক কেটে, পাবলিকের জীবন স্বপ্নের বারোটা বাজিয়ে, চাকুরির ঠিকুজি কুষ্ঠি ধ্বংস করে, জীবন যখন মধুরের বিজ্ঞাপনে গা ভাসিয়ে দিয়ে মানুষকে কোন সত্য জানাতে চায় রাজনৈতিক দলগুলি? দীর্ঘদিন ধরে ‘টেট’ পরীক্ষার নিয়োগ হয়না। অসীমরা (‘ঘোর’ গল্প) চাকুরি পায়না। কেবল আশায় বুক বাঁধে। হতাশ হতে হতেও চেষ্টা ছাড়েনা। ঋত্বিক ঘটকের ‘নাগরিক’ চলচ্চিত্রে উচ্চারিত হয়েছিল চাকুরি হল জুয়া খেলা। লটারি খেলা। বৃদ্ধ মানুষটি আর লটারি কাটেনা। কিন্তু যুবকটি স্বপ্ন দেখতে চায়, স্বপ্ন দেখতে তো ক্ষতি নেই। অসীমদের স্বপ্ন বারবার ভেঙে যায়। ভোট, পূজা আসে আর যায়। সুখের দিন আসেনা। সামন্য টিউশন নিয়েই চলতে হয়। সেখানেও ষষ্ঠ, সপ্তম, অষ্টম শ্রেণি। উপরের ক্লাসের বাজার সরকারি সিল মারা ব্যক্তিরা ধরে রেখেছে।

​ভাঙন প্রবণ এলাকায় থাকি এমন শব্দবন্ধ উচ্চারণ করেছিলেন তৃপ্তি সান্ত্রা। নদী ক্রমেই গ্রাস করে মানুষগুলিকে। ভূতনি, কালিয়াচক, হরিশ্চন্দ্রপুর সহ মালদা জেলার বহু এলাকায় গঙ্গা ক্রমেই সমস্ত গ্রাস করতে উদ্যত হয়েছে। নদী ভাঙন এত প্রবল হয়ে উঠেছে যে মানুষগুলি ভিটেমাটি ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। উদ্‌বাস্তু হয়ে ভিন্ন রাজ্যে পাড়ি দিচ্ছে স্রেফ বেঁচে থাকতে। কেউ কেউ নিজের জমি চিহ্নিত করতে নদীর মাঝখানে আঙুল নির্দেশ করে। নিজস্ব ভূগোলের এই বিপন্নতাই শুভ্র মৈত্রদের দিয়ে লিখিয়ে নিয়েছে। বর্ষা এলেই গ্রামের পর গ্রাম ঘরছাড়া মানুষ রাস্তার পাশে তাবু টাঙিয়ে পশু-মানুষ মেলবন্ধন করে বাঁচছে। জল নামলে বাড়ি ফিরবে। স্বাধীনতার এতো গুলো বছর পরেও মানুষগুলির জন্য স্থায়ী আবাসভূমি গড়ে তোলা যায়নি। এই শত শত বিপন্নতা, বিষণ্ণতা, ঘরহারা মানুষের যন্ত্রণা দেখে গল্পকার কল্পনার গল্প লিখতে পারেন না, রোমান্সে ভেসে যেতে পারেন না। ‘দিল্লি যাওয়ার আগে’ গল্পে যে বয়ান উঠে আসে সেখান থেকে স্পষ্ট হয় মানুষটি দিল্লি যাবেই। না গিয়ে বেঁচে থাকার ভিন্ন পথ নেই। একটি বাচ্চা ছেলে যে ফ্রি প্রাইমেরি স্কুলে পড়ে, গুলি খেলে সেও বন্যার সত্য দেখছে, ঘরছাড়া হচ্ছে। এইভাবে ভাঙন প্রবণ এলাকার মানুষগুলি বেঁচে থাকে, আর তাদের জীবনচিত্র আঁকেন শুভ্র মৈত্রের মতো ভাঙন প্রবণ এলাকায় যাদের নিত্য যাতায়াত করতে হয়। ঘটমান বাস্তবতাকে তিনি কখনোই কাহিনির মধ্যে বানিয়ে দেন না। বানানো গপ্পের স্কুলে শুভ্র মৈত্রদের যেতে হয়না। তেমনি গল্প বানানও না। ফলে গল্পের আয়তনগুলি ছোটো ছোটো। আসলে তিনি তো নদীর চোখে তীরের গল্প লিখছেন। নদী আবার কবে তীরের গপ্প শোনার জন্য দীর্ঘ সময় দিয়েছে?

​‘দুগ্গাকুড়ুনি’ গল্পে যে আখ্যান উঁকি দেয় তা আমাদের ভাবনাহীন মধ্যবিত্ত জীবনকে যেন নীরবে ব্যঙ্গই করে। লক্ষ লক্ষ টাকা ব্যয় করে পূজা উৎসব বিনোদনে আমরা মজে আছি অথচ সমাজের অপর পিঠে কেউ কেউ নতুন জামা তো বহুদূর দুর্গা ঠাকুরকে কুড়িয়ে সামান্য অর্থ সংস্থানের ভাবনায় অপেক্ষারত সেসব চিন্তা, দৃশ্য চোখে পড়েনা। লেখক এই আখ্যানে যে শ্রেণিচিত্র উপস্থাপন করেছেন তা ছোটো শহরের প্রায় প্রত্যেক ঘাটেই একই। দুর্গা পূজায় নয় নদী তীরবর্তী মানুষের আসল আকর্ষণ বিসর্জনের পরে। ঠাকুরের কাঠামো বিক্রি করে কিছু অর্থ পাওয়া যাবে। সেই কাঠামো সংগ্রহে নেমেছে কিছু হিন্দু-মুসলিম কিশোর-কিশোরী। আমাদের সভ্য বিবেকের চোখে এইসব দৃশ্য ধরা দেয় না, দিলেও আমরা সর্বত্র চোখে ছানি পড়ার ভান করি। আখ্যানে বেশ কিছু ভয়ংকর সত্য উচ্চারিত হয়েছে। গুলেনের পিতা উদ্‌বাস্তু হয়ে এদেশে এসেছে। গঙ্গা ভাঙনে সর্বত্র হারিয়ে আলতাফ আবার নদীর তীরেই আশ্রয় নিয়েছে যা হিন্দু পাড়া। এখনও হিন্দু-মুসলিমের সম্প্রীতি আছে, কিন্তু থাকবে না কেননা ‘তখনও হিন্দু পার্টির এত রবরবা হয়নি’। তবে পরিবেশ খারাপ হয়ে যাচ্ছে এমন গুঞ্জন বাতাসে ভাসছে। আবার নদীতীরও ত্যাগ করতে হবে কেননা ‘কীসব কাগজ নাকি নেই ওদের’। গুলেনরা যেখানে কাঠ বিক্রি করে সেখানেও ঠকানো হয় অর্থাৎ শ্রেণিশত্রু সর্বত্র বিরজমান। ক্ষুদ্র ক্যানভাসে এইসব বলয়কে সামনে রেখে দেশহারা,ঘরহারা মানুষের যে নিত্য বয়ান শুভ্র মৈত্র স্পষ্ট করেন সত্যি তার জুড়ি মেলা ভার। গল্পের অভ্যন্তরে ছোটো ছোটো সংলাপে বা ক্ষুদ্র বাক্যে দেশ, রাষ্ট্র, সমাজের বিধানদাতা, বড় নেতা, পার্টির মিনি নেতা সমস্ত সম্পর্কে যে পক্ষপাত শূন্য চক্রব্যূহের রহস্যতলে আমাদের নিয়ে যান যেখান থেকে বহু অকথিত সত্য পটাপট বেরিয়ে আসে।

​রাজনৈতিক গল্প ‘নবান্ন’। ব্যক্তির মূল্য কোনদিন কোনো পার্টি দেয়নি। ব্যক্তির অন্তর্দ্বন্দ্বে ব্যক্তি নিজেই ক্ষতবিক্ষত হয়ে চলেছে। গ্রাম্য রাজনীতি যে কত ভয়ংকর এইসব আখ্যান পড়লে বোঝা যায়। পাল্টিবাজি রাজনীতি আজ সর্বত্রই চলছে। দলে থেকে কাজ করা যাচ্ছে না এই ভাওতাবাজি দ্বারা নেতার গোত্রান্তর চলছে। আজ পার্টি কোনো আদর্শ নয়, নৈতিকতার পাঠের ধার ধারেনা রাজনৈতিক নেতারা। বড় বৃত্ত থেকে ছোটো বৃত্ত সর্বত্রই চলছে এই কায়েমি স্বার্থ সহ দল ভাঙার প্রক্রিয়া। ভোটে জেতা পঞ্চানন চলেছে পার্টি পরিবর্তন করতে, আজ পঞ্চায়েত গঠন। অথচ ভোটে পার্টির জেতার জন্য যারা পরিশ্রম করল, নিজের জানপ্রাণ দিল তাদের কোনো মূল্যই দেওয়া হল না। পঞ্চাননকে জেতাতে সাধন কী কী করেছে তা বয়ান থেকে স্পষ্ট। বিপক্ষে নিজের বোনজি, প্রচারে নিজের বোনের নামেও কুকথা বলতে পিছপা হয়নি। অথচ পার্টি পরিবর্তনে সাধনদের কোনো মূল্যই দেওয়া হল না। ক্ষমতার নাগাল পাওয়া সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়, তারা ক্ষমতার ব্যবহারকারী জীব হয়ে থাকে, যেমন থাকে আরশোলা—“অনেকক্ষণ ধরে ঘাপটি মেরে থাকা আরোশোলাটা বিস্কুটের বয়ামের দিকে সাহস ভরে খানিক এগিয়ে এল। কিছুই লাভ হবে না, জানে না। নাকি জানে? সেজন্যই খানিক দূর থেকে মেপে নিতে চায়।” (পৃ. ৪৬) ব্যক্তি এইভাবে হীনমন্যতায় ভোগে। হারিয়ে ফেলে নিজের রাজনৈতিক দর্শন, বোধ বিশ্বাস। ঘেন্না জন্মে পার্টির প্রতি। মানুষ রাজনীতি থেকে দূরে চলে যায়। বেনোজলে ভেসে যায় রাজনৈতিক আদর্শ, পার্টি। বড় হয়ে ওঠে ব্যক্তিগত স্বার্থ অর্থ মুনফা, মূল্যবোধের কোনো চুয়া ঢেকুর এখানে চলে না।সংবাদপত্রে কর্মরত এক যুবককে(দেবেশ) সামনে রেখে সংবাদপত্রের হালচাল, মধ্যবিত্ত জীবন পরিসর ও ভার্চুয়াল ওয়ার্ল্ডের কিছু সত্য উঠে এসেছে ‘নোটিফিকেশন’ গল্পে। গল্পের দুটি পরিসর। একদিকে সংবাদপত্র হাউসে কর্মরত দেবেশের সংবাদ সংক্রান্ত চিন্তাভাবনা ও হাউস থেকে বের হলেই কিছু ব্যক্তিগত পরিসর প্রবেশ করেছে। সংবাদ কীভাবে তৈরি হয়, পাঠককে কীভাবে সংবাদ গেলাতে হয়, পাঠকের মন ভোলানো, উপযোগী করে তুলতে কীভাবে সেন্টিমেন্টাল রোমান্স ঢুকিয়ে দিতে হয় সেইসব সাত সতেরোর সত্যনামা। ‘দেবেশ নিজেই খানিক রং মেশালো। পাবলিক এইসব খায়’, ‘মন্ত্রী নিজেই সকালে গিয়েছিল, গিয়ে ক্যামেরার সামনে—পাশে আছি, তদন্ত, চরম শাস্তি, ক্ষতিপূরণ—সব এক লপ্তে বলে দিয়ে এসেছেন’, ‘আর মাল যদি টেঁসে যায়, বডি ছাড়াবে কে?’(ডাক্তার)। এইসব বয়ান থেকে আমাদের সমাজ ব্যবস্থার প্রকৃত অবস্থা যেমন চিহ্নিত হয়ে যায় তেমনি গল্পে আরও কিছু নিত্য দিনের সত্য থাকে। যে জীবনচিত্র থেকে আমাদের যাপনের ভয়ংকর ক্ষতগুলিকেই আরও একবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেন গল্পকার।

​নিম্নবিত্তের প্রতি নিম্নবিত্তের পক্ষপাত নিয়ে গড়ে উঠেছে ‘প্রতিপক্ষ’ গল্প। মানুষ-কুকুড়ের লড়াইয়ে মাংস বিক্রেতা মানুষকেই জিতিয়ে দিয়েছে। কী সেই লড়াই? না মুরগির মাংসের ছাঁট কেনার প্রতিযোগিতা।এক শ্রেণি মুরগির ছাঁট খেয়ে জীবন নামক সংগ্রামে টিকে থাকে, কেউ বাড়িতে পোষা কুকুরের জন্য ছাঁট কেনে। দরিদ্র মানুষ মাংসের ছাঁট,মধ্যবিত্ত খাসির মাংসের বদলে চিকেন। নিম্নবিত্তের এই দৈন্যতা ধরা পড়ে কিন্তু মধ্যবিত্ত কোলেস্টেরলের গল্প শুনিয়ে আড়াল করে। শুভ্র মৈত্র যতই গল্প বলুক আসলে সে আমাদের পচনধরা সমাজকেই নানাভাবে সমস্ত আখ্যানে ধরতে চেয়েছেন। যে সময়ের দহনে কেবলই হলাহল ওঠে, সময়ের রহস্যমন্থনে বিষপাত্র উঠে আসে তাই তিনি দেখতে চান ও আমাদের দেখান। ‘আজ বার্ড ফ্লু তো কাল ভাগাড়। খবরওয়ালাদের আর কাজ নেই।‘, ‘এই শহরে তো ময়লা ফেলার জায়গাই নেই’ ইত্যাদি বহুবিধ বয়ানকে সামনে রেখে তিনি একটি অবধারিত সত্যে উত্তীর্ণ হতে চান। যে সত্যের মুখোমুখি হতে গোটা সমাজই ভয় পায়। তবুও আমাদের প্রতিচ্ছবি আয়নায় ভেসে ওঠে। সমাজবীক্ষণে নিত্য যে কালের মন্দিরা বেজে চলে তাই তিনি নতুন সুরে বাজাতে চান। সাংবাদিকদের প্রয়োজন লাশ, অধিক মৃত্যুর সংখ্যা, খুন, ধর্ষণ। যা দিয়ে গল্প বানানো যায়। যে রসানো গল্প পাবলিক ভালো খায়। ‘বাইলাইন’ গল্পে দুটি দিক আছে। টিভি চ্যানেলের দৌলতে সাংবাদিকদের করুণ চিত্র ও খবর করতে গিয়ে গ্রামের হালচাল। সকালে খোঁজ পাওয়া গেছে মথুরাপুর ঘাটে ছয়জন শিশু জলে ডুবে গেছে। এই ইতিবৃত্তকে সামনে রেখে ছুটছে সাংবাদিক কিশোর। বিবর্তিত সময়ের যাপনে সংবাদপত্রের দিন যে শেষ তা যেমন উঠে এসেছে তেমনি বর্তমান সংবাদিকদের অবস্থা কেরোসিন ফুরিয়ে আসা লণ্ঠনের মতো। তবুও নিজের আসন কে ছাড়তে চায়? যতক্ষণ সভ্যতা বাতিল বলে ঘোষণা না করছে ততক্ষণ মানুষ নিজের অবস্থান টিকিয়ে রাখতে চায়। আর যেখানে ভাত-কাপড়ের সংস্থান জড়িয়ে আছে তা যতই ক্ষয়ে যাক ছাড়া যায়না। সংবাদ হাউস নানা কৌশল করে নিজের অবস্থান টিকিয়ে রাখতে বদ্ধ পরিকর। কিন্তু কালের যাত্রাধ্বনিতে যে দিন ফুরিয়ে আসছে। সেই সত্য আর একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে যা যা ইতিবৃত্ত ঘটে তার হালচাল লেখক আমাদের শুনিয়েছেন। কিন্তু নেতা, সংবাদিক, টিভি চ্যানেল সব মিলিয়ে এই অস্থির সময়ের কোনো দিশা পাওয়া যাচ্ছে না, কেননা সময় গ্রাম্য গোরুর মতো উদাসীন হয়ে রয়েছে।মধ্যবিত্ত জীবনের ছবি স্পষ্ট হয়েছে ‘আঁচিলওয়ালা মানুষটা’ গল্পে। জরুরি তথ্য হিসেবে জানিয়ে দেওয়া যেতে পারে এটি মন্টু মিত্রের জীবন কাহিনি। মধ্যবিত্ত মানুষ কত ভাবে, সামান্য বিষয়েই কেমন নাজেহাল হয়ে যায়, স্ত্রী সন্তান নিয়ে মধ্যবিত্ত মানুষ ভাবনার কোন অতলে ডুব দিয়ে প্রত্যহ দিন অতিবাহিত করে, সংসারের ঘরকান্না সামলেও মদে মাংসে ডুব দেয় সেই দৈনিক রোজনামচা উঠে আসে।

​জীবনে বেঁচে থাকা একটা কৌশল মাত্র। কথা বলা একটা আর্ট। এই কৌশল ও আর্টের দ্বারাই দাম্পত্য সুখ টিকিয়ে রাখতে হয়। ক্রমাগত অভিনয় করতে গিয়ে একসময় প্রকৃত হিংস্র রূপ বেরিয়ে আসে সত্য তবুও নিজেকে আড়াল করতে হয়। ‘বিভঙ্গ’ গল্পে লেখক যে আখ্যান বুনন করেন তা আমাদের সাংস্কৃতিক বোধ, কবিতাচর্চা, সাহিত্য আসর সহ সমস্তকেই যেন ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে দেখতে চান। এই যে শুভ্র মৈত্রের গল্প নিয়ে আমরা লিখছি মনে হচ্ছে যেন অলক্ষ্য থেকে সে আমাদের ব্যঙ্গ করছে। কিন্তু সেই ব্যঙ্গ শরীরে স্পর্শ করে না, মর্মে আঘাত করে। আমাদের ভণ্ডামিমার্কা সাহিত্যচর্চার প্রকৃত খনন বেরিয়ে আসে। শতদ্রু ও উদিতা দুই ভিন্ন মেরুর মানুষ। শতদ্রু হোটেল ব্যবসা নিয়ে মশগুল, স্ত্রী উদিতা কবিতাচর্চা নিয়ে মেতে আছে। ঠিকই ছিল, কিন্তু ভিন্ন মেরুর শতদ্রুকে সাহিত্যের জোরজবরদস্তি পাঠক করে তুলতে গিয়ে বিপদ ঘটেছে। শতদ্রু দেখেছে সাহিত্য আসরের মধ্যে কত ঈর্ষা, দলাদলি, লাইববাজি, কত আহাউহু, ‘অসাধারণ’ ‘এমন প্রথম শুনলাম’ ‘মুগ্ধ’ ইত্যাদি কথার আড়ালে প্রকৃত সত্য কোথায় দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের সাহিত্যচর্চা, লিটল ম্যাগাজিন, ক্রমাগত অমুক দাদা, অমুকদি ইত্যাদির মধ্য দিয়ে নিজেকেই শ্রেষ্ঠ গড়ে তোলার ইঁদুর দৌড়ের সচেতন প্রয়াস, সাহিত্যচর্চাকারী ব্যক্তির আইডেনটিটি ক্রাইসিস, দল ভেঙে দল গড়া ইত্যাদির মধ্যে দিয়ে সাহিত্য তো দূর অস্ত কেবল অর্থ, বিনোদন, সেলফি, একটু হামবড়া ভাব আর রূপচর্চাই জিতে যাচ্ছে সেই গোপন অভিলাস বেরিয়ে আসে। স্মার্ট কথাবার্তা, কণ্ঠস্বরের সুরেলা ভঙ্গি, সবাইকে তোষামোদ করার নিলজ্জ প্রয়াস, পিছনে অন্যকে হেয় করা আর ছেঁদোমার্কা কবিতা এই তো আমাদের সাহিত্যচর্চা, সেই দর্পণে নিজের মুখ নিজেই দেখে নিতে হয় এই আখ্যানে। যেখানে বেঁচে থাকাই একটা বিভ্রম, বিভঙ্গ সেখানে মান-অপমান-সম্মানে কি এসে যায়? যেখানে ক্ষুধার তীব্র লড়াই, জীবন নামক পরিসর যেকোনো মুহূর্তে মৃত্যুর খাদে নেমে যেতে পারে সেখানে সম্মানবোধের মূল্য কতখানি নিম্নবিত্ত জানে না! জানা সম্ভবও নয়। ‘মানী’ গল্পে যে চরম বাস্তবতা, অর্থনৈতিক দুর্দশা, ক্ষুধার টানে ভিন রাজ্যে পাড়ি, প্রতিমুহূর্তে মৃত্যুর ইশারা, তা থেকে বাঁচতে প্রযুক্তির গোপন ফাঁদ সব মিলিয়ে যে বয়ান উপস্থিত হয় তা অনবদ্য। নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত মূল্যবোধে সম্মান নির্ধারিত হয় অর্থ দ্বারা। সন্তান দুলাল শিক্ষকদের ‘আপনি’ না বলে ‘তুই’ বলে। এ গ্রাম্য রীতি, গ্রামের হালচাল। পিতা জানিয়েছে মানী মানুষকে আপনি বলতে হয়। কিন্তু নিজের বেলায় বিত্তবাণের সন্তান সেই রীতি প্রয়োগ না করলে প্রশ্ন তোলে দুলাল। উত্তর পায়না। অর্থহীনতা, বন্যা, রোজগারহীনতায় ভিন্ন রাজ্য গুজরাটে পাড়ি দিতে হয়েছে। খবর আসে গুজরাটে নির্মিত বহুতল ভেঙে গেছে। দুলাল পিতাকে ফোন করে পায়না, ফোন থেকে উত্তর আসে—‘তিনি এখন পরিষেবা সীমার বাইরে’। দুলাল আনন্দিত হয়ে ওঠে, ফোন পিতাকে সম্মান দিয়ে ‘তিনি’ বলেছেন। এই মিথ্যার আনন্দকে আঁকড়ে ধরেই বেঁচে থাকতে হয় দরিদ্র মানুষকে। শুভ্র মৈত্র দরিদ্র জীবনের কথা বললেও তা রঙিন করে বলেন না, ঘটমান বাস্তবতার চৌহদ্দির মধ্যেই গল্পকে টেনে রাখেন। জীবনের সত্য থেকেই গল্পের সত্যে পৌঁছে যান। নিম্নবিত্তের জীবনের পরতে পরতে যে বেদনার সাতকাহন বয়ে চলে, ভাঙাগড়া যাপনের যে নিত্য রুক্ষতা মানুষকে প্রতি মুহূর্তে সংকটে ফেলে দেয়, যেখান থেকে পরিত্রাণের একমাত্র পথ উদ্‌বাস্তু হয়ে ভিন রাজ্যে পাড়ি, সেই ক্লেদময় জীবনের ছবি বারবার যে বয়ানে ভেসে আসে তা আমাদের ভূগোলের যথার্থ সত্যকে যথার্থ ভাবেই স্পষ্ট হয়। যাদের স্কুলে যাওয়া আসার নিত্য অভ্যাসেই দিন কেটে যায়, লাস্ট বেঞ্চে বসে শিক্ষকের ধিক্কার শুনেও যারা মনে আনন্দ পায় সেই প্রজন্মের গল্প শুনিয়েছেন ‘লাস্ট বেঞ্চ’ গল্পে। আসলে এরা সকলেই পরিবারের প্রথম প্রজন্মের শিক্ষার্থী। কেউ স্কুল গেলে সামান্য কাজ থেকে রক্ষা পায়। কেউ হয়ত কোনদিন ভিন রাজ্যে পাড়ি দেবে। প্রান্তিক ভূগোলের চরম বাস্তবতাকেই গল্পকার জরুরি ভিত্তিতে তুলে এনেছেন।

​সিনেমার সেন্টিমেন্টাল রোমান্স সুলভ ফ্যান্টাসিতে গড়ে উঠেছে ‘সনাতনের দিন রাত’ গল্প। ভোটের বাজারে টিকিট পাওয়ার চেনা সুলভ অতি সরল ফর্মে গল্প এগিয়ে গেছে। গোটা রাজ্য জুড়েই এইসব ইতিবৃত্ত ঘটে চলেছে। ঘুষ, জালিয়াতি, পার্টি, টিকিট পাওয়াকে কেন্দ্র করে অর্থ লগ্নী, মিথ্যা প্রচার ইত্যাদি যা বাঙালির মজ্জায় ইতিমধ্যেই প্রবেশ করে গেছে তাই লেখক আমাদের আবারও স্মরণ করিয়ে দেন। চৈত্র এলে যাদের সামান্য বস্ত্র কেনার সাধ্য হয় সেই দরিদ্র জীবনকে সামনে রেখে গড়ে উঠেছে ‘সেল’ গল্প। দরিদ্র দম্পত্তির জীবনস্বপ্ন, মানা-অভিমান, বেদনা-প্রহার, স্নেহ, আশ্রয় এসব নিয়েই গল্পের জমি সম্পূর্ণ হয়েছে। প্রশ্ন ফাঁসে সরকার যখন প্রতিবছরই অনৈতিকতা উৎসব বজায় রেখেছে তখন শুভ্র মৈত্র লিখেছেন গণটোকাটুকরি গল্প। ‘হাড্ডি’ গল্পে যে কাহিনি উঁকি দেয়, নকল সরবরাহ, এমনকি তার পদ্ধতি তা গ্রাম্যজীবনে দীর্ঘদিন বজায় ছিল। গ্রাম বলতে আমরা যা বুঝি তা নয়, এ হল গ্রামের ভিতরে যে হদ্দ গ্রাম আছে তার রীতিপদ্ধতি। পরীক্ষার সময় হাড্ডিদের কদর বারে নকল সাপ্লাইয়ার হিসেবে। ফোন, এস.এম.এসের যুগের হাড্ডিদের কদর কমে এলেও একসময় এরাই গ্রামের যুবক যুবতীদের পরীক্ষা নামক বন্দোবস্ত অতিক্রান্তের হাতিয়ার ছিল। কেমনভাবে সমস্ত কৌশলটা আয়ত্ত করতে হয় সেই গল্পই লেখক আমাদের শুনিয়েছেন।

​শুভ্র মৈত্রের গল্পবলয়ে চেষ্টাকৃত কাহিনি গুঁজে দেওয়ার কোনো অভিপ্রায় নেই। আবার সমস্যাকে সামনে রেখে বৃহৎ জীবনসত্যে যাবারও গোপন অভিসার নেই। সিগারেটের উড়ন্ত ধোঁয়ার যে সামান্য পরিসর সেই সামান্য পরিসরেই তিনি কথাকে উড়িয়ে দিতে চান। একটি সিগারেট খেতে খেতেই গল্প হয়ত শেষ হয়ে আসবে, গল্পের রেশ মাথার মধ্যে পিণ্ড পাকিয়ে কিছু মুষ্টিমেয় ধারণা (যা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এক অর্থে রাজনৈতিক) প্রসব করবে যা ব্যক্তি সহ গোষ্ঠীর পক্ষে ভয়ানক ক্ষতিকর। আসলে যে দূষিত বায়ু আমাদের শশ্মানযাত্রার টিকিট কাটতে তৎপর সেই বিভীষিকাগুলিকেই নিজস্ব পরিমণ্ডলে জ্বালিয়ে আমাদের পতন চিহ্নের জ্বলন্ত বহ্নিশিখা আমাদেরই দেখিয়ে দিতে চান।

​সমাজের সব ভাঙাচোরা, পিছিয়ে পড়া, সভ্যতার চক্রান্তের কাছে হামাগুড়ি দেওয়া মানুষদের নিয়ে শুভ্র মৈত্রের ভাবনা বলয় প্রসারিত হয়েছে। তথাকথিত এলিট সভ্যতার, নাগরিক সভ্যতার অপর পিঠে, যে পিঠে সর্বদাই কুয়াসার অন্ধকার বিরাজ করে তাদের কথা তিনি লিখতে চেয়েছেন। চেনা-জানা পরিসরের মধ্যেই কত অজানা, অ-বলা কথাউকুনের মতো লুকিয়ে থাকে, ব্যক্তির দৈন্যতা, হাহাকার কত গভীর হতে পারে, আমরা যেখানে থাকি বা বাঁচি তার বাইরে শত শত মাইল দূরে নদীভূমিতে কেমন করে মানুষ বেঁচে থাকে, তাদের ভূত-ভবিষ্যৎ কালের খেয়ায় বয়ে এনেছেন লেখক। এরা সকলেই পরাজিত মানুষ, কেউই বিদ্রোহ করেনা, সামান্য ত্রিপল, বন্যার ত্রাণ, ঘরের টিন পেলেই খুশি। কেউ কেউ মেম্বার, রাজনীতির অ-আ-ক-খ বোঝে, ব্যাপক দুর্নীতির সুযোগ এখানে নেই তবুও মনভাঙা বিবাদ ঘটে, তা মিটেও যায়, বর্ষায় স্রোতে সব ধুয়ে যায়। সেইসব মানুষদের বেঁচে থাকা, প্রেম-প্রেমহীনতা, জীবনযুদ্ধ, গোষ্ঠী-সমষ্টি ও ব্যক্তির লড়াই নেভা আগুনের মতো জ্বল জ্বল করে গ্রন্থের সমস্ত আখ্যানে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ