
১.
একটা বাচ্চা খবরে এসেছিল, দেড়বছর বয়সে পঁচিশ কিলো ওজন। রাতদিন সে খেয়েই চলেছে। দুধ, ডিম, ভাত। গরিব বাবা মা, চোখে জল, মুখে কোনো কথা নেই। তাকে শহরে আনা হল। ডাক্তার নিদান দিলেন কিছু একটা। হাসপাতালে থাকাকালীন, কয়েকমাস পর গলায় ভাত আটকে সে মরেও গেল। খবরে ফের দেখেছি তার সরু সরু বাবা মাকে, হাসপাতালের সাদা দেওয়ালে পিঠ ঠেকা, মুখে তখনো কোনো কথা নেই। যাবজ্জীবন শাস্তি অকস্মাৎ মকুব হওয়া আসামীর মতো থতমত। অবসন্ন। চোখ শুকনো ও নির্বাক।খিদেতে ঘুম ভেঙে গেলে, রক্ত খাওয়া মশার মতো পেট ফুলিয়ে এক বোতল জল পান করে, বিছানায় শুয়ে এসবই ভাবি। কড় গুণে দেখেলে জানি, বাইবেলে রিপু মোট সাতখানা। গ্লুটোনিকে ভারতীয়রা রিপু হিসেবে গ্রাহ্য করেনি। বরং আমাদের ঈশ্বর হাঁ করলে, তাঁর মুখের ভিতর সমগ্র বিশ্ব দেখা যায়। নিজের মনে হাঁ করি। আমার মুখের ভিতর লালাভেজা গোলাপি, বড় বড় শামুকের মতো মাংসল একটা জিভ নড়াচড়া করছে। এই জিভ দিয়ে পৃথিবীকে চেটে দিতে ইচ্ছে করে মাঝেমাঝে। কুকুর- বেড়াল যেভাবে নিজের সারা গা চাটে, সেভাবে।
একটা বাচ্চা খবরে এসেছিল, দেড়বছর বয়সে পঁচিশ কিলো ওজন। রাতদিন সে খেয়েই চলেছে। দুধ, ডিম, ভাত। গরিব বাবা মা, চোখে জল, মুখে কোনো কথা নেই। তাকে শহরে আনা হল। ডাক্তার নিদান দিলেন কিছু একটা। হাসপাতালে থাকাকালীন, কয়েকমাস পর গলায় ভাত আটকে সে মরেও গেল। খবরে ফের দেখেছি তার সরু সরু বাবা মাকে, হাসপাতালের সাদা দেওয়ালে পিঠ ঠেকা, মুখে তখনো কোনো কথা নেই। যাবজ্জীবন শাস্তি অকস্মাৎ মকুব হওয়া আসামীর মতো থতমত। অবসন্ন। চোখ শুকনো ও নির্বাক।খিদেতে ঘুম ভেঙে গেলে, রক্ত খাওয়া মশার মতো পেট ফুলিয়ে এক বোতল জল পান করে, বিছানায় শুয়ে এসবই ভাবি। কড় গুণে দেখেলে জানি, বাইবেলে রিপু মোট সাতখানা। গ্লুটোনিকে ভারতীয়রা রিপু হিসেবে গ্রাহ্য করেনি। বরং আমাদের ঈশ্বর হাঁ করলে, তাঁর মুখের ভিতর সমগ্র বিশ্ব দেখা যায়। নিজের মনে হাঁ করি। আমার মুখের ভিতর লালাভেজা গোলাপি, বড় বড় শামুকের মতো মাংসল একটা জিভ নড়াচড়া করছে। এই জিভ দিয়ে পৃথিবীকে চেটে দিতে ইচ্ছে করে মাঝেমাঝে। কুকুর- বেড়াল যেভাবে নিজের সারা গা চাটে, সেভাবে।
একটা “বহিরাগত” মশা দুম করে আমার হাঁ মুখের ভিতর ঢুকে পড়ল।থু থু করে মেঝেতে থুতু ফেলে মশা নিধন করলাম। এখন আমার পেট ভর্তি জল থই থই করছে। তাতে খিদের নৌকো ভাসছে তো ভাসছেই। সোজা হয়ে শুলে পেটে টান পড়ছে বলে বাঁ দিকে ফিরে শুলাম।
রাফায়েল নাদাল ট্রফি কামড়ায়। কেমন সেই স্বাদ? রক্তের মতো? আমার ভাই সুব্রত, আমার ছোটো ভাই, দু বছর বয়সে মশা মারার কয়েল খেয়ে ফেলেছিল। মেঝে থেকে বাবা ওকে ছোঁ মেরে কোলে তুলে ওর মুখে আঙুল ঢুকিয়ে দিয়ে বমি করিয়েছিল। মশার কয়েল কেমন খেতে হয় সুব্রত বলতে পারবে। আমি নিজে ওই বয়সে খেলনা ডিমপাড়া মুরগির ছোট্ট হলুদ প্লাস্টিকের ডিম গিলে ফেলেছিলাম। তারপর সাতদিন মা আমার পায়খানা ঘেঁটে ডিম খুঁজত। কুকুরে নিজের বমি খায়, অন্য কুকুরের গুও খায়। আমাদের বন্ধু সঞ্জীব, ক্লাস টেনে, “স্যার জল খাবো?” বলেই, সবুজ কোলড্রিংক্স এর বোতল থেকে ঢক ঢক করে তুঁতে মেশানো জল খেয়ে নিয়েছিল। মরে যাওয়ার আগে অবধি সঞ্জীব হেডস্যারের হাত চেপে কেঁদেছিল, “স্যার আমাকে বাঁচান!” বলে। যে মেয়েটার জন্য তুঁতে খেল সঞ্জীব,- শতাব্দী, তার বিয়ে খেলাম আমরা দশ বছর পর। ভেটকীর পাতুরি চমৎকার হয়েছিল। এখনো মুখে লেগে আছে।
আমার মুখের ভিতরটা সেই ভেটকির পাতুরির তরে লালায় ভরে গেল। ভাই বলে, আমি বিষও চেয়ে চেয়ে খাবো। কারণ আমি খাই। সারাদিন খাই। এটাই আমার কাজ। আর কিছু করিনা। বাবার বিজনেস ছিল। ভাই দেখে এখন। তার থেকে আমার যে মাসোহারা আসে তা দিয়ে আমি সবসময় খাই। এই পৃথিবীর সমস্ত খাবার অন্তত একবার করে আমি খেয়েছি। খাবার নয় এমনও অনেক কিছু খেয়েছি খিদের তাড়নায়। সারাক্ষণ খাওয়ার পরেও আমার পেটের ভিতরটা দাউ দাউ করে। খিদে আমার সন্তানের মতো, একবার ক্ষুধা জাগলেই আমার ঘুম ভেঙে যায়। আশেপাশে কোনো খাবার না পেলে তখন আমি আমার স্ত্রী করুণাকে খাই। খেতে খেতে আজকাল ললিপপের মতো শুষে ছোট হয়ে এসেছে করুণা। জিভ দিয়ে করুণাকে ভালো করে চাটার পর পেটটা ভরে। করুণা পোয়াতি বলে বাপের বাড়ি গেছে এক মাস হল। তাই জল। তাই রক্ত খাওয়া মশার মতো মোটা পেট।
এত খাওয়ার পরেও আমার ওজন পঞ্চাশ কেজি, উচ্চতা পাঁচ- চার। আমাকে দূর থেকে দেশলাই কাঠির মতো দেখায়। জ্বালাতে গেলে দুম করে মটকে যেতে পারি যে কোনোদিন। আমার মাথায় বারুদ মজুত থাকলেও সারাগায়ে সোঁদা। তবে আমার মশার কয়েল খেয়ে ফেলা ভাই হল মলোটভ ককটেল। ও চাইলে শাসকদল থেকে দু চারটে এম এল এ, এম পি বলে বলে খসিয়ে দিতে পারে।
একেক দিন রাতে, করুণা হাতের কাছে না থাকায় আমি উঠে টিভি দেখি, চ্যানেল ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখি। পশু দেখি, পাখি দেখি, মানুষ দেখি, নেতা দেখি, নেত্রী দেখি, টাকা দেখি, টাক দেখি, টাকে চুলের ঢল নামানো দেখি, আর আমার ইচ্ছে হয় টেলিভিশন সেটটাকে এক গ্লাস জল দিয়ে গিলে ফেলতে। আমার পেটের ভিতর খবর পড়ুক রবিশ কুমার। আমার পেটের ভিতর শিশুহরিণকে ছিঁড়ে খাক সিংহীর দল। ভগবান হাঁ করেছিলেন, আর বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড দেখা গেছিল। আমি হাঁ করি, মুখের ভিতর আমার আলজিভ টলটল করে। আমি হাঁ করি, আর আমার পেটের ভিতর থেকে খেলার খবর শোনা যায়। মাঝে মাঝে মনে হয় নিজের পেটে উঁকি দিয়ে দেখি।
মা বলতো নরকের আগুন জ্বলছে আমার পেটে। বিয়ের পর করুণা বুঝিয়ে শুনিয়ে নিয়ে গেল ডাক্তারের কাছে। ডাক্তার পেটে ক্যামেরা ঢুকিয়েও কিচ্ছু খুঁজে পেল না। ফেরার পথে করুণা পুজোর জন্য ফুল কিনলো। আমার জন্য আড়াই কিলো আম নিলাম। বাড়ি ফিরে সারাদিন ধরে আম খেলাম আর রাতে আম শেষ হয়ে গেলে পুজোর ফুলের উপর লোভ হল। রাত তিনটের সময় মালা থেকে ছিঁড়ে জবা ফুল খেলাম তিনটে।
আমার মুখের ভিতরটা সেই ভেটকির পাতুরির তরে লালায় ভরে গেল। ভাই বলে, আমি বিষও চেয়ে চেয়ে খাবো। কারণ আমি খাই। সারাদিন খাই। এটাই আমার কাজ। আর কিছু করিনা। বাবার বিজনেস ছিল। ভাই দেখে এখন। তার থেকে আমার যে মাসোহারা আসে তা দিয়ে আমি সবসময় খাই। এই পৃথিবীর সমস্ত খাবার অন্তত একবার করে আমি খেয়েছি। খাবার নয় এমনও অনেক কিছু খেয়েছি খিদের তাড়নায়। সারাক্ষণ খাওয়ার পরেও আমার পেটের ভিতরটা দাউ দাউ করে। খিদে আমার সন্তানের মতো, একবার ক্ষুধা জাগলেই আমার ঘুম ভেঙে যায়। আশেপাশে কোনো খাবার না পেলে তখন আমি আমার স্ত্রী করুণাকে খাই। খেতে খেতে আজকাল ললিপপের মতো শুষে ছোট হয়ে এসেছে করুণা। জিভ দিয়ে করুণাকে ভালো করে চাটার পর পেটটা ভরে। করুণা পোয়াতি বলে বাপের বাড়ি গেছে এক মাস হল। তাই জল। তাই রক্ত খাওয়া মশার মতো মোটা পেট।
এত খাওয়ার পরেও আমার ওজন পঞ্চাশ কেজি, উচ্চতা পাঁচ- চার। আমাকে দূর থেকে দেশলাই কাঠির মতো দেখায়। জ্বালাতে গেলে দুম করে মটকে যেতে পারি যে কোনোদিন। আমার মাথায় বারুদ মজুত থাকলেও সারাগায়ে সোঁদা। তবে আমার মশার কয়েল খেয়ে ফেলা ভাই হল মলোটভ ককটেল। ও চাইলে শাসকদল থেকে দু চারটে এম এল এ, এম পি বলে বলে খসিয়ে দিতে পারে।
একেক দিন রাতে, করুণা হাতের কাছে না থাকায় আমি উঠে টিভি দেখি, চ্যানেল ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখি। পশু দেখি, পাখি দেখি, মানুষ দেখি, নেতা দেখি, নেত্রী দেখি, টাকা দেখি, টাক দেখি, টাকে চুলের ঢল নামানো দেখি, আর আমার ইচ্ছে হয় টেলিভিশন সেটটাকে এক গ্লাস জল দিয়ে গিলে ফেলতে। আমার পেটের ভিতর খবর পড়ুক রবিশ কুমার। আমার পেটের ভিতর শিশুহরিণকে ছিঁড়ে খাক সিংহীর দল। ভগবান হাঁ করেছিলেন, আর বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড দেখা গেছিল। আমি হাঁ করি, মুখের ভিতর আমার আলজিভ টলটল করে। আমি হাঁ করি, আর আমার পেটের ভিতর থেকে খেলার খবর শোনা যায়। মাঝে মাঝে মনে হয় নিজের পেটে উঁকি দিয়ে দেখি।
মা বলতো নরকের আগুন জ্বলছে আমার পেটে। বিয়ের পর করুণা বুঝিয়ে শুনিয়ে নিয়ে গেল ডাক্তারের কাছে। ডাক্তার পেটে ক্যামেরা ঢুকিয়েও কিচ্ছু খুঁজে পেল না। ফেরার পথে করুণা পুজোর জন্য ফুল কিনলো। আমার জন্য আড়াই কিলো আম নিলাম। বাড়ি ফিরে সারাদিন ধরে আম খেলাম আর রাতে আম শেষ হয়ে গেলে পুজোর ফুলের উপর লোভ হল। রাত তিনটের সময় মালা থেকে ছিঁড়ে জবা ফুল খেলাম তিনটে।
জবাফুল আশ্চর্য একটা নেশা। একাধিক জবাফুল খেলে মনে হয় যেন, জলের তলায় আছি। আশেপাশে সবাই মাছ, সাঁতার কাটছে। মুখ থেকে বুদবুদ বেরিয়ে আকাশে উড়ে যায়। হাত পায়ের আঙুলের চামড়া কুঁচকে থাকে,- অনেকক্ষণ জল ঘাটলে যেমন হয়। ঠোঁটের উপরে মাটির প্রলেপ জমে। একদিন ফাঁক পেলেই আমি টপ করে...
করুণার ছেলে হবে- ডাক্তার বলছিল। ছেলে না হলে পেট খসানোর প্রস্তুতি নিতে হত। আমার পেটের ভিতরও অজস্র ছেলে সারাদিন কিববিল করছে, ডাক্তার জানেনা। কেউ ব্যারিকেড ভাঙে, কেউ পাঁচিল বসায়। কেউ গৃহস্থ বাড়িতে ঢুকে পড়ে দলবল নিয়ে। কেউবা ইউনিভার্সিটিতে ঢুকে ডিনকে পেটায়। এক পেট এরকম ছেলে ছোকরা নিয়ে আমি ডাক্তারের কাছে যাই। দুশ্চিন্তায় আমাদের পা কাঁপে। ডাক্তার অভয় দেন। এক পেট ছেলে ছোকরা নিয়ে আমরা ঘরে ফিরি।
২.
গান্ধিজি স্বপ্নে নিজের পেটের ভিতর থেকে ছাগলের কান্না শুনেছিলেন। আমি বহু আগেই অগস্ত্য মুণির মতো বাতাপিকে হজম করে ফেলেছি। আমি দেখি, আমি আমার পেটের ভিতর শুয়ে আছি। এটা ওটা খেতে খেতে আমি আমাকে গিলে ফেলেছি কবে যেন। পুরনো মোবাইলে সাপের একটা খেলা থাকতো। লেজে কামড় পড়লেই গেম ওভার। আমি একটা সাপ, নিজের ল্যাজ আমার মুখে ভরা। নিজেই নিজেকে খাচ্ছি। দিনের পর দিন সাপ বহরে বাড়ছে, তাই নিজেকে খাওয়া ফুরোচ্ছে না। গেম অভার হচ্ছেই না।
আমার মশার কয়েল খাওয়া ভাই একরাতে আমায় ঘুম থেকে ডেকে তুলল। করুণা এখনো বাপের বাড়ি, ভরা সাত মাস চলছে। ভাই ঘুম থেকে তুলে বলল, “আমার সাথে আয়, লুচি আলুর দম খাওয়াবো।”
ভাইয়ের সাথে বাড়ির পিছনের বাগানে এসে দেখলাম এক যুবক যুবতীকে ঘিরে ধরে আছে ভাইয়ের ছেলেরা, সবাই থর থর করে কাঁপছে, ভয়ে বা উত্তেজনায়। আমি ভাইকে জিজ্ঞেস করলাম, “লুচি আলুর দম কই?”, ভাই আমার হাতে একটা ঘোড়া গুঁজে দিয়ে বলল, “হয়ে গেলে খাওয়াবো”
ঘোড়াটা কালো। ঘোড়াটা ঠান্ডা। ঘোড়াটা নিথর। ঘোড়াটা আমার হাত থেকে শীতল চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে।
আমি ভাইকে জিজ্ঞেস করলাম, “ঠিক তো?”
ভাই ঢক ঢক করে মাথা নাড়ল।
আমি দুটো গুলি করলাম ভিনধর্মী ছেলেটার বুকে। আর একটা গুলি করলাম সোমত্থ মেয়েটার মাথায়।
ভাই আমার কাঁধ চাপড়ে বলল, “সাবাস!”
সেই রাতে জানিনা কোন দোকান থেকে, কিন্তু স্বর্গীয় লুচি আলুরদম এনেছিল ভাই। আঙুল চেটে চেটে তার রগরগে লাল ঝোল খেলাম। পরের মাসে ভাই দলবদল করলো। পাড়ার দেওয়ালে দেওয়ালে এখন ভাইয়ের নামে ফুল ফুটে আছে। বাড়ির সামনে দিয়ে দেখি সেদিন চুপি চুপি কিছু বেঁটে বেঁটে মানুষ মোমবাতি হাতে হেঁটে চলে যাচ্ছে, কারো কারো হাতে ওই যুবক যুবতির ছবি ধরা। মোমবাতি দেখে আমার খিদে পেল, কিন্তু মোমবাতিতে আমার পেট ভরবে না জানি। আজকাল খুব মশাল খেতে বাসনা হয়। কোথাও কোনো মশাল জ্বলে না। একটা মশাল খেয়ে, পায়ের উপর পা তুলে মোমবাতি দিয়ে দাঁত খোঁচানোর সাধ আমার বহুদিনের।
করুণার ছেলে হয়েছে। সে নিশ্চয় আমারও ছেলে। আমাদের শিশুটা হাসে কম। বেশিরভাগ সময় ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে। আর বিশেষ কিছু করে না। ইচ্ছে করে ওকে খুব করে দুধ, ডিম, ভাত খাওয়াই। দেড়বছর বয়সে নধর পঁচিশ কিলো। তারপর একদিন কপাত করে... করুণা পই পই করে বলে দিয়েছে, “ছেলের মাথা একদম খাবেনা!”
৩.
“সুগত ও সুগত, এতসব খিদে নিয়ে কতদূর যাবে?”, বারান্দায় ঝোলানো খাঁচা থেকে টট্টরে গলায় টিয়া বলল।
আমাদের ছেলেটা বড় হচ্ছে না। পাঁচ বছর হয়ে গেল, এখনো কাঁধ ছোট, হাত ছোট, কিছুই বাড়েনি। বামনদেবের মতো সরল দুটো চোখে পৃথিবীটা দেখছে নিজের এক ফুট উচ্চতা থেকে। করুণার এসব নিয়ে কোনো চিন্তা নেই। মাঝরাতে আমার ঘুম ভেঙে যায়, আর আমি পেটে খিদে নিয়ে দেখি আমাদের মাঝে বামন অবতার মুখে বুড়ো আঙুল ভরে ঘুমোচ্ছে।
আমার লোভ হয়। আমার মুখ থেকে লালা ঝরে। করুণার এক হাত ছেলের গায়ে রাখা। ভাবি, নেকড়ে পিতাও তো তার শাবকের প্রতি বৎসল। হায়নাবাবাও তো তার ছানাকে স্নেহ করে।
তবু একদিন দুপুরবেলা ভরা পেটে আমি ছেলেটাকে খাই। করুণা গেছে সেদিন ওর বোনের বাড়ি। ভাই ভোটে জেতার পর থেকে শুধু রাতে ঘুমাতে আসে। কোনো কোনো দিন তাও আসে না। দুপুরবেলা ছেলেটা মেঝেতে চুপ করে বসে পিঁপড়ে দেখছিল। আর তখন “বাবা, এদিকে আয় দেখি,” বলে আমি ওকে খেয়ে ফেললাম। ও আমার দিকে তাকিয়ে রইল। মুখে কিচ্ছু বলল না। যেন হাসপাতালের সাদা দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে, এমন নির্বাক হয়ে থাকল পুরোটা সময় ফ্যালফ্যাল করে।
রাতে করুণা ঘরে এসে আবিষ্কার করলো আমাদের দুজনকে। ততক্ষণে অবশ্য আমার খাওয়া শেষ।
“এ কী করেছ তুমি!”
আমি অবাক হয়ে দেখলাম করুণা রাগে ঘেন্নায় থরথর করছে। করুণার চোখ দিয়ে জল, নাক দিয়ে কফ, মুখ দিয়ে লালা সব একসাথে বেরচ্ছে।
মুখ ফসকে বললাম, “খেলাম ওকে।”
সেদিন রাতে ছেলেকে নিয়ে করুণা ঘর ছাড়ল।
৪.
আমার সাধ মেটে না, পেট ভরে না, সকলই ফুরায়ে যায়। আমার মশার কয়েল খাওয়া ভাই, আমার ছোটো ভাই, আমার ভোটে জেতা ভাই সুব্রত একদিন ভোরবেলা বাড়ি ফিরে এলো, আর বেরলো না। সাতটা ডিম, চারটে কলা, এক পোয়া দুধ খেয়ে আমি ওর ঘরে গিয়ে দেখি মে মাসের গরমে মাথা অবধি কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে। ডাকলাম, “ভাই, ও ভাই,”
সাড়া দিলো না।
দুপুরের দিকে পুলিশ এলো বাড়িতে। ভাইকে ডাকলো, ভাই উঠল না। আমায় ডেকে বলল ভাইকে কারা যেন খুঁজছে। খুঁজে না পেলে পরিস্থিতি খারাপ হবে বলে চলে গেল। আমি ভাইয়ের ঘরে ঢুকে ওর গায়ে হাত রাখলাম। গা পুড়ে যাচ্ছে। কেউ যেন ওকে সেঁকছে গরম গরম খাবে বলে।
“ভাই, কে তোকে খেতে চায়?”
ভাই সাড়া দিল না। উলটো দিকে ফিরে শুয়ে থাকল।
আমি আর ভাই ছোটোবেলায় গালে হাত দিয়ে বাবার কাছে পিনোকিওর গল্প শুনতে বসতাম। জেপ্পেটো হাঙরের পেটে ঢুকে গেলে আমি চোখ বুজে ফেলতাম। দেখতাম উত্তাল এক সাগর, তাতে রাতের বেলা একটা হাঙর ঘুরে বেড়াচ্ছে। সেই হাঙরের পেটের মধ্যে টেবিল চেয়ারে জেপ্পেটো একখানা প্রদীপ নিয়ে বসা। আমি আজীবন ওই হাঙর হতে চেয়েছি,- জেপ্পেটো, চেয়ার, টেবিল, প্রদীপ, এমনকি প্রদীপের আলো গিলে ফেলা এক হাঙর, ভরা তুফানের সমুদ্র দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। ভাইয়ের গায়ে হাত রেখে আমি বললাম, “তুই চিন্তা করিস না, কেউ তোকে খুঁজে পাবে না। আমি তোকে আমার মধ্যে লুকিয়ে রাখবো।”
এরপর আমি ভাইকে ওর কম্বলসমেত গিলে খেয়ে ফেললাম। আমার পেটের ভিতর কিলবিল করা ছেলের দল ভাইকে পেয়ে উল্লসিত হয়ে উঠল। আমার মশার কয়েল খাওয়া ভাই, ভোটে জেতা ভাই, আমার পেটের ভিতর ঢুকে উচ্চস্বরে বলে উঠল,-“বন্ধুগণ! সুদিন আসছে!”
করুণার ছেলে হবে- ডাক্তার বলছিল। ছেলে না হলে পেট খসানোর প্রস্তুতি নিতে হত। আমার পেটের ভিতরও অজস্র ছেলে সারাদিন কিববিল করছে, ডাক্তার জানেনা। কেউ ব্যারিকেড ভাঙে, কেউ পাঁচিল বসায়। কেউ গৃহস্থ বাড়িতে ঢুকে পড়ে দলবল নিয়ে। কেউবা ইউনিভার্সিটিতে ঢুকে ডিনকে পেটায়। এক পেট এরকম ছেলে ছোকরা নিয়ে আমি ডাক্তারের কাছে যাই। দুশ্চিন্তায় আমাদের পা কাঁপে। ডাক্তার অভয় দেন। এক পেট ছেলে ছোকরা নিয়ে আমরা ঘরে ফিরি।
২.
গান্ধিজি স্বপ্নে নিজের পেটের ভিতর থেকে ছাগলের কান্না শুনেছিলেন। আমি বহু আগেই অগস্ত্য মুণির মতো বাতাপিকে হজম করে ফেলেছি। আমি দেখি, আমি আমার পেটের ভিতর শুয়ে আছি। এটা ওটা খেতে খেতে আমি আমাকে গিলে ফেলেছি কবে যেন। পুরনো মোবাইলে সাপের একটা খেলা থাকতো। লেজে কামড় পড়লেই গেম ওভার। আমি একটা সাপ, নিজের ল্যাজ আমার মুখে ভরা। নিজেই নিজেকে খাচ্ছি। দিনের পর দিন সাপ বহরে বাড়ছে, তাই নিজেকে খাওয়া ফুরোচ্ছে না। গেম অভার হচ্ছেই না।
আমার মশার কয়েল খাওয়া ভাই একরাতে আমায় ঘুম থেকে ডেকে তুলল। করুণা এখনো বাপের বাড়ি, ভরা সাত মাস চলছে। ভাই ঘুম থেকে তুলে বলল, “আমার সাথে আয়, লুচি আলুর দম খাওয়াবো।”
ভাইয়ের সাথে বাড়ির পিছনের বাগানে এসে দেখলাম এক যুবক যুবতীকে ঘিরে ধরে আছে ভাইয়ের ছেলেরা, সবাই থর থর করে কাঁপছে, ভয়ে বা উত্তেজনায়। আমি ভাইকে জিজ্ঞেস করলাম, “লুচি আলুর দম কই?”, ভাই আমার হাতে একটা ঘোড়া গুঁজে দিয়ে বলল, “হয়ে গেলে খাওয়াবো”
ঘোড়াটা কালো। ঘোড়াটা ঠান্ডা। ঘোড়াটা নিথর। ঘোড়াটা আমার হাত থেকে শীতল চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে।
আমি ভাইকে জিজ্ঞেস করলাম, “ঠিক তো?”
ভাই ঢক ঢক করে মাথা নাড়ল।
আমি দুটো গুলি করলাম ভিনধর্মী ছেলেটার বুকে। আর একটা গুলি করলাম সোমত্থ মেয়েটার মাথায়।
ভাই আমার কাঁধ চাপড়ে বলল, “সাবাস!”
সেই রাতে জানিনা কোন দোকান থেকে, কিন্তু স্বর্গীয় লুচি আলুরদম এনেছিল ভাই। আঙুল চেটে চেটে তার রগরগে লাল ঝোল খেলাম। পরের মাসে ভাই দলবদল করলো। পাড়ার দেওয়ালে দেওয়ালে এখন ভাইয়ের নামে ফুল ফুটে আছে। বাড়ির সামনে দিয়ে দেখি সেদিন চুপি চুপি কিছু বেঁটে বেঁটে মানুষ মোমবাতি হাতে হেঁটে চলে যাচ্ছে, কারো কারো হাতে ওই যুবক যুবতির ছবি ধরা। মোমবাতি দেখে আমার খিদে পেল, কিন্তু মোমবাতিতে আমার পেট ভরবে না জানি। আজকাল খুব মশাল খেতে বাসনা হয়। কোথাও কোনো মশাল জ্বলে না। একটা মশাল খেয়ে, পায়ের উপর পা তুলে মোমবাতি দিয়ে দাঁত খোঁচানোর সাধ আমার বহুদিনের।
করুণার ছেলে হয়েছে। সে নিশ্চয় আমারও ছেলে। আমাদের শিশুটা হাসে কম। বেশিরভাগ সময় ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে। আর বিশেষ কিছু করে না। ইচ্ছে করে ওকে খুব করে দুধ, ডিম, ভাত খাওয়াই। দেড়বছর বয়সে নধর পঁচিশ কিলো। তারপর একদিন কপাত করে... করুণা পই পই করে বলে দিয়েছে, “ছেলের মাথা একদম খাবেনা!”
৩.
“সুগত ও সুগত, এতসব খিদে নিয়ে কতদূর যাবে?”, বারান্দায় ঝোলানো খাঁচা থেকে টট্টরে গলায় টিয়া বলল।
আমাদের ছেলেটা বড় হচ্ছে না। পাঁচ বছর হয়ে গেল, এখনো কাঁধ ছোট, হাত ছোট, কিছুই বাড়েনি। বামনদেবের মতো সরল দুটো চোখে পৃথিবীটা দেখছে নিজের এক ফুট উচ্চতা থেকে। করুণার এসব নিয়ে কোনো চিন্তা নেই। মাঝরাতে আমার ঘুম ভেঙে যায়, আর আমি পেটে খিদে নিয়ে দেখি আমাদের মাঝে বামন অবতার মুখে বুড়ো আঙুল ভরে ঘুমোচ্ছে।
আমার লোভ হয়। আমার মুখ থেকে লালা ঝরে। করুণার এক হাত ছেলের গায়ে রাখা। ভাবি, নেকড়ে পিতাও তো তার শাবকের প্রতি বৎসল। হায়নাবাবাও তো তার ছানাকে স্নেহ করে।
তবু একদিন দুপুরবেলা ভরা পেটে আমি ছেলেটাকে খাই। করুণা গেছে সেদিন ওর বোনের বাড়ি। ভাই ভোটে জেতার পর থেকে শুধু রাতে ঘুমাতে আসে। কোনো কোনো দিন তাও আসে না। দুপুরবেলা ছেলেটা মেঝেতে চুপ করে বসে পিঁপড়ে দেখছিল। আর তখন “বাবা, এদিকে আয় দেখি,” বলে আমি ওকে খেয়ে ফেললাম। ও আমার দিকে তাকিয়ে রইল। মুখে কিচ্ছু বলল না। যেন হাসপাতালের সাদা দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে, এমন নির্বাক হয়ে থাকল পুরোটা সময় ফ্যালফ্যাল করে।
রাতে করুণা ঘরে এসে আবিষ্কার করলো আমাদের দুজনকে। ততক্ষণে অবশ্য আমার খাওয়া শেষ।
“এ কী করেছ তুমি!”
আমি অবাক হয়ে দেখলাম করুণা রাগে ঘেন্নায় থরথর করছে। করুণার চোখ দিয়ে জল, নাক দিয়ে কফ, মুখ দিয়ে লালা সব একসাথে বেরচ্ছে।
মুখ ফসকে বললাম, “খেলাম ওকে।”
সেদিন রাতে ছেলেকে নিয়ে করুণা ঘর ছাড়ল।
৪.
আমার সাধ মেটে না, পেট ভরে না, সকলই ফুরায়ে যায়। আমার মশার কয়েল খাওয়া ভাই, আমার ছোটো ভাই, আমার ভোটে জেতা ভাই সুব্রত একদিন ভোরবেলা বাড়ি ফিরে এলো, আর বেরলো না। সাতটা ডিম, চারটে কলা, এক পোয়া দুধ খেয়ে আমি ওর ঘরে গিয়ে দেখি মে মাসের গরমে মাথা অবধি কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে। ডাকলাম, “ভাই, ও ভাই,”
সাড়া দিলো না।
দুপুরের দিকে পুলিশ এলো বাড়িতে। ভাইকে ডাকলো, ভাই উঠল না। আমায় ডেকে বলল ভাইকে কারা যেন খুঁজছে। খুঁজে না পেলে পরিস্থিতি খারাপ হবে বলে চলে গেল। আমি ভাইয়ের ঘরে ঢুকে ওর গায়ে হাত রাখলাম। গা পুড়ে যাচ্ছে। কেউ যেন ওকে সেঁকছে গরম গরম খাবে বলে।
“ভাই, কে তোকে খেতে চায়?”
ভাই সাড়া দিল না। উলটো দিকে ফিরে শুয়ে থাকল।
আমি আর ভাই ছোটোবেলায় গালে হাত দিয়ে বাবার কাছে পিনোকিওর গল্প শুনতে বসতাম। জেপ্পেটো হাঙরের পেটে ঢুকে গেলে আমি চোখ বুজে ফেলতাম। দেখতাম উত্তাল এক সাগর, তাতে রাতের বেলা একটা হাঙর ঘুরে বেড়াচ্ছে। সেই হাঙরের পেটের মধ্যে টেবিল চেয়ারে জেপ্পেটো একখানা প্রদীপ নিয়ে বসা। আমি আজীবন ওই হাঙর হতে চেয়েছি,- জেপ্পেটো, চেয়ার, টেবিল, প্রদীপ, এমনকি প্রদীপের আলো গিলে ফেলা এক হাঙর, ভরা তুফানের সমুদ্র দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। ভাইয়ের গায়ে হাত রেখে আমি বললাম, “তুই চিন্তা করিস না, কেউ তোকে খুঁজে পাবে না। আমি তোকে আমার মধ্যে লুকিয়ে রাখবো।”
এরপর আমি ভাইকে ওর কম্বলসমেত গিলে খেয়ে ফেললাম। আমার পেটের ভিতর কিলবিল করা ছেলের দল ভাইকে পেয়ে উল্লসিত হয়ে উঠল। আমার মশার কয়েল খাওয়া ভাই, ভোটে জেতা ভাই, আমার পেটের ভিতর ঢুকে উচ্চস্বরে বলে উঠল,-“বন্ধুগণ! সুদিন আসছে!”
সন্ধ্যেবেলা, যারা সেদিন চুপিচুপি বাড়ির সামনে দিয়ে মোমবাতি নিয়ে হেঁটে গেছিল, সেই বেঁটে মানুষগুলো এলো ভাইয়ের খোঁজে। আজ ওরা চুপ নয়, আজ ওদের হাতে মোমবাতি না, মশাল দাউদাউ করছে। বহু বছর পর চোখের সামনে মশাল দেখে আমি জিভ দিয়ে ঠোঁট চাটলাম।
ওরা ভাইকে তন্ন তন্ন করে খুঁজল কিন্তু পেল না। আমায় ঘেরাও করে ওরা ভাইয়ের কথা জিজ্ঞেস করল, আমি সত্যি কথাই বললাম ওদের, “ভাই আমার পেটের ভিতর বক্তৃতা দিচ্ছে”। ওরা মানতে চাইল না। ওরা যুবক যুবতির কথা জানতে চাইল। আমি ওদের লুচি আলুর দমের কথা বললাম। ওরা মোমবাতির কথা বলল। আমি ওদের মশালের কথা জানালাম। ওরা পুলিশের কথা বলল। আমি ওদের মশার কয়েলের কথা বললাম। ওরা বমির কথা বলল। আমি ওদের খাবারের কথা বললাম। ওরা তবু বমির কথা বলে গেল। আরও আরও বমির কথা বলে চলল। আমি ওদের খাওয়ার কথা শোনাতে পারলাম না। আমি টের পেলাম বমির কথা শুনতে শুনতে আমার গা গুলিয়ে উঠছে। সকালের কলা, ডিম, দুধ গলা দিয়ে কুচকাওয়াজ করছে। পেটের ভিতর আমার ভাই, আমার ছেলে, আমার শত সহস্র ছোকরা, গান্ধিজির ছাগল, সঞ্জীবের তুঁতে, শতাব্দীর ভেটকি, পিনোকিওর লম্বা নাক, করুণার করুণ স্তন, বাবার গল্পের বই, মায়ের চোখ রাঙানি তুফান তুলেছে। আমি টের পাচ্ছি, ওদের বমির কথা শুনে জীবনে প্রথমবার আমার বমি পাচ্ছে। সকলের সামনে একসময় আমি হরহর করে বমি করে দিলাম। জীবনে প্রথমবার।
দেখলাম ছোটোবেলায় গিলে ফেলা খেলনা মুরগির হলুদ ডিমটা পড়ে আছে বমির মধ্যে। আর আছে কলার টুকরো, ডিমের সাদা অংশ, জল আর একটা জিভ। আমার মুখ ফসকে গোলাপি, মাংসল শামুকের মতো একটা জিভ মাটিতে পড়ে আছে, যেটা দিয়ে একদিন আমার পৃথিবীকে চেটে দেওয়ার কথা। জিভটা খসে যাওয়ার পর বেঁটে মানুষগুলো আমার মাথায় তাদের একটা পা রাখলো।
ওরা ভাইকে তন্ন তন্ন করে খুঁজল কিন্তু পেল না। আমায় ঘেরাও করে ওরা ভাইয়ের কথা জিজ্ঞেস করল, আমি সত্যি কথাই বললাম ওদের, “ভাই আমার পেটের ভিতর বক্তৃতা দিচ্ছে”। ওরা মানতে চাইল না। ওরা যুবক যুবতির কথা জানতে চাইল। আমি ওদের লুচি আলুর দমের কথা বললাম। ওরা মোমবাতির কথা বলল। আমি ওদের মশালের কথা জানালাম। ওরা পুলিশের কথা বলল। আমি ওদের মশার কয়েলের কথা বললাম। ওরা বমির কথা বলল। আমি ওদের খাবারের কথা বললাম। ওরা তবু বমির কথা বলে গেল। আরও আরও বমির কথা বলে চলল। আমি ওদের খাওয়ার কথা শোনাতে পারলাম না। আমি টের পেলাম বমির কথা শুনতে শুনতে আমার গা গুলিয়ে উঠছে। সকালের কলা, ডিম, দুধ গলা দিয়ে কুচকাওয়াজ করছে। পেটের ভিতর আমার ভাই, আমার ছেলে, আমার শত সহস্র ছোকরা, গান্ধিজির ছাগল, সঞ্জীবের তুঁতে, শতাব্দীর ভেটকি, পিনোকিওর লম্বা নাক, করুণার করুণ স্তন, বাবার গল্পের বই, মায়ের চোখ রাঙানি তুফান তুলেছে। আমি টের পাচ্ছি, ওদের বমির কথা শুনে জীবনে প্রথমবার আমার বমি পাচ্ছে। সকলের সামনে একসময় আমি হরহর করে বমি করে দিলাম। জীবনে প্রথমবার।
দেখলাম ছোটোবেলায় গিলে ফেলা খেলনা মুরগির হলুদ ডিমটা পড়ে আছে বমির মধ্যে। আর আছে কলার টুকরো, ডিমের সাদা অংশ, জল আর একটা জিভ। আমার মুখ ফসকে গোলাপি, মাংসল শামুকের মতো একটা জিভ মাটিতে পড়ে আছে, যেটা দিয়ে একদিন আমার পৃথিবীকে চেটে দেওয়ার কথা। জিভটা খসে যাওয়ার পর বেঁটে মানুষগুলো আমার মাথায় তাদের একটা পা রাখলো।
লেখক পরিচিতি:
অলোকপর্ণা
কথাসাহিত্যিক
বেঙ্গালুরে থাকেন।

0 মন্তব্যসমূহ