স্মৃতি ভদ্রের গল্প: শূন্যসময়



গাঢ় অন্ধকার আকাশটাকে আঁকড়ে ধরেছে। বাতাসতাড়িত বৃষ্টির গন্ধ চন্দনাকে একবারের জন্যও আপ্লুত করছে না আজ। বরং নিরন্ধ্র আঁধারে বাতাসের এই দাপাদাপি তার বুকে কাঁপন ধরায়। ঘরের চৌকো দেয়ালগুলোর সাদা সাদা শূন্যতা আজও তাকে আরেকবার মমতায় জড়িয়ে নিল।

‘আজই যেতে হবে?’
কবীরের ভাবান্তর হয় না এই চন্দনার প্রশ্নে। ভাবলেশহীন সে মুখে তাকিয়ে বোঝার উপায় নেই কী ভাবছে সে এখন।

প্রায় দীর্ঘসময় এমনভাবেই বসে আছে কবীর।

চন্দনা জানে সকালের রোদ্দুর এই আঁধার গ্রাস করার আগেই ওদের বেরিয়ে পড়তে হবে। কাঁচা ভোরের বুক মাড়িয়ে চলে যেতে হবে অনেক দূরের পথ।

আচমকা সে ধাক্কা দেয় কবীরকে।

‘সারারাত তো এভাবেই কাটল। যদি যেতেই হয় তবে আর ভেবে লাভ নেই।’

বিমূঢ় কবীর উদভ্রান্ত চোখে তাকায় চন্দনার দিকে।সে চোখে তাকালে অবশ্য ঠাওরানো যায় না তার এই মুহূর্তের ভাবনা।

‘তুমি কী সিদ্ধান্ত বদলালে? আজ যাব না আমরা?’

প্রশ্নটিতেই শেষমেশ জেগে ওঠে কবীর।দীর্ঘসময়ের নীরবতা ভেঙে বলে

‘পারবি এতটা পথ যেতে?’

চন্দনার বিমর্ষ সময় হুট করেই হারিয়ে যায়।

কবীরের এই অগাধ মায়ায় ডুঁবসাতার দিতে দিতে বলে,

‘তোমার সঙ্গে কোথাও যেতে আমি কখনও ডরাই না।’

চন্দনা আর কবীর, বইয়ের ভাঁজে ময়ূরপেখম লুকিয়ে রাখার বয়সেই ওরা একে অন্যকে আবিষ্কার করে ফেলেছিলো।

জলসিঙ্গারা, খড়ের ডাই, শাপলা পুকুর, দাড়িয়াবান্ধার এক অনাবিল শৈশব তারা একে অপরের সঙ্গে কাটিয়েছে। কখনো ভাগাভাগি, কখনো কাড়াকাড়ি, আবার কখনো জবরদখল করে।

একটু একটু করে জমেছে ওদের ভালোবাসা।

আর কৈশোরের উসখুসানি বাড়তে-না-বাড়তেই, লুকিয়ে মায়ের সুগন্ধি তেল বা জমানো দুটাকায় কেনা একটা মিনি শ্যাম্পুর প্যাকেট অথবা বাড়ির সবাইকে লুকিয়ে নারকেলের পিঠা বদলের ক্ষণগুলো ঝিকিমিকি আলোর রোশনাই ছড়িয়ে দিত ওদের দুজনের অভ্যস্ত জীবনের অলিগলিতে।

এরমধ্যেই দুবাড়ির সীমানায় আস্তে আস্তে বেড়ে ওঠে ডুমুর গাছটা। হোগলার বেড়ায় জড়িয়ে যায় তেলাকুচোর সবুজ লতাটা। চন্দনা আর কবীর তখন যৌবনের দোরগোড়ায়।

ততদিনে স্কুলের গন্ডি পেরোতে ব্যর্থ কবীর বাবার মুদিখানায় নিয়ম করে দুবেলা বসা শুরু করে দিয়েছে। আর চন্দনা ক্লাস এইটের পর স্কুলে যাওয়ার অনুমতি হারিয়েছে সৎ মায়ের নির্দেশে।

তাই বলে দুজনার দুরন্ত সময় থেমে থাকে না কিছুতেই। ছুতোনাতায় তখন টুকরো কাপড়ে ফুল তুলে চন্দনা লুকায় তক্তপোষের নিচে। তাতে লেখা,

ফুল ফুটে ঝরে যায়

রেখে যায় স্মৃতি

তুমি বন্ধু দিও মোরে

একরাশ প্রীতি

আর ওদিকে বাবার দোকান থেকে নতুন পাইনঅ্যাপেল বিস্কুটের প্যাকেট কবীর লুকিয়ে ফেলে ফাঁকা মুড়ির কৌটায়, চন্দনার জন্য।

কবীর আর চন্দনার আরক্ত সময়গুলো প্রেমের উদ্ভাসে এভাবেই ভেসে যেতে থাকে গোপনে। তবে দুজনেই জানত প্রেমের এই অনিবার্য সময় যেকোনো দিন হুট করেই থমকে দাঁড়াতে পারে।

কারণ দুই বাড়ির সম্পর্কে সম্প্রীতি কম, শত্রুতাই তো বেশি।

দু’বাড়ির সীমানা নিয়ে বাক্যযুদ্ধ যেকোনো সময়েই পৌঁছে যায় হাতাহাতিতে। দাঁতমুখ খিঁচিয়ে চলে দিনের পর দিন একে অন্যকে নিচু করবার প্রতিযোগিতা। আর কখনো কখনো তো সব ছাপিয়ে শুরু হয় গ্রামছাড়া বা আরো সুর চড়িয়ে সর্বস্ব ছাড়াবার হুমকি।

তবে প্রতিযোগিতা, বাক্যযুদ্ধ, হুমকির চড়া সুরের তলে কবীর-চন্দনার কোমল সন্ধ্যাগুলোর খবর তখনও অজানা দুবাড়ির মানুষগুলোর কাছে।

কিন্তু এই অজানা সময়ের দৌরাত্ম খুব বেশিদিন রইল না। ওত পেতে থাকা দুর্বিষহ সময় কবীর আর চন্দনার সম্মুখে হাজির হয়ে গেল একদিন হৈ হৈ করে।

সুই সুতোয় তোলা ফুলের রঙিন সময় বা পাইনঅ্যাপল বিস্কুট লুকিয়ে রাখার ঔদ্ধত্য সময় আচমকাই মুখ থুবড়ে পড়ল, ওদেরই এক অসাবধানতায়।

সেদিন স্কুলঘরের মাঠের এককোণে করবী গাছের নিচে কাটছিল ওদের নিমগ্ন সন্ধ্যা। চন্দনার সুতোয় তোলা ফুলের ভাঁজে ডাই করা অগাধ মায়ার ডুবসাঁতার কাটছিল কবীর।

‘এত সুন্দর হাতের কাজ তোর! শোন, তুই কিন্তু শুধু আমার জন্যই ফুল তুলবি।’

আহ্লাদিত সময়ের আবেশে ঝুরঝুর হয়ে যেতে যেতে চন্দনা বলছিমো,

‘কথা দিলাম, শুধু তোমার জন্যই সুতোয় নকশা তুলব।’

ভালোবাসামগ্ন সে সময় একটু একটু করে পা বাড়াচ্ছিল অপ্রতিরোধ্য সময়ের দিকে, দুর্নিবার হওয়ার ঐকান্তিক আমন্ত্রণে। আর তখনই খুব কাছাকাছি একটা হুল্লোড় ওঠে। কয়েকটি পরিচিত মুখ সহসা এগিয়ে আসে ওদের নিমগ্ন সময়কে ছিন্নভিন্ন করে।

কুলটা মাইয়া, বেয়াদব ছোকরা, বংশের মান খাইছে, কোন বাড়ির মাইয়া তুই হুশ নাই, খুন কইরা ফেলামু শব্দগুলো শাঁই শাঁই করে তীর ছুড়তে লাগল মোলায়েম সেই সন্ধ্যার বুকে।

রক্তাক্ত হলো কবীর-চন্দনার নিভৃত সময়।

উদোম হয়ে পড়ল ওদের এতদিনের লুকানো ভালোবাসা। অরক্ষিত হয়ে পড়ল যত্নে রাখা ওদের একান্ত সময়।

প্রতিরোধের চেষ্টা প্রথমেই এলো কবীরের তরফ থেকে।

‘আমরা কোনো অন্যায় করি নাই।’

এতে করে অবশ্য হিতে বিপরীত হলো। কবীরের সঙ্গে সঙ্গে আক্রমণ করা হলো চন্দনাকেও।

অকথ্য গালিগালাজ অথবা চড়-থাপ্পড়। এবার কবীর অনুরোধের উপায় বেছে নিল,

‘চন্দনার কোনো দোষ নেই, ওকে কিছু বলবেন না।’

এতে অবশ্য কতটা কাজ হলো তা বোঝা না গেলেও চন্দনার ঘরবন্দি সময়ের দুর্বিষহতা কারও অজানা রইল না।

অপমান আর কটু কথায় চন্দনার জীবনে সকলে মিলে মৃত্যুর মতো অন্ধকার লেপে দিতে সমর্থ হলো। কবীরের নামে কান্নাগোঁজা এক একটি দিন বুকের ভেতর কষ্টের শ্বাস হয়ে ঘূর্ণি তুলল।

সুতোয় ফুল তোলা ফুরালো, অগাধ মায়ায় ডুবসাঁতারের দিন ফুরাল।

অন্ধকার সময় এতই প্রবল হলো যে চন্দনার রাতের আকাশের শেষ তারাটিও মুছে গেল।

চন্দনার বিয়ে ঠিক হলো। এ তো অনিবার্যই ছিল। কুলটা এই মেয়েকে যত তাড়াতাড়ি কুলান্তর করা যায় ততই ভালো।

বিয়ের তারিখ ঠিক হলো ১২ এপ্রিল, রবিবার।

খবর পৌঁছায় কবীরের কাছে। ওর দিন, সন্ধ্যা, রাত সবেতেই পড়ল একপোচ অন্ধকার। বিষণ্ন সময়ের সাথী হলো চন্দনার দেওয়া রুমাল।

সুতোয় তোলা নকশায় হাত বুলায় কবীর।

‘একরাশ প্রীতি’ দেওয়ার অঙ্গীকারবদ্ধ সে সময় বারবার আকুতি হয়ে ডুকরে ওঠে কবীরের মনে। উপায়হীন অন্ধকারে অস্থির হয়ে ওঠে কবীর।

আত্মীয় শূন্য এই চরাচরে নিজেকে অবাঞ্ছিত মনে হয় তার। নিরবিচ্ছিন্ন অসহায়তা কুঁরে কুঁরে খেতে শুরু করে তাকে।

এরই মধ্যে আব্বার আদেশ, চন্দনার বিয়ের দিন কবীরের গ্রামে থাকা চলবে না। বিয়ে নির্বিঘ্নে শেষ হওয়ার পর গ্রামে ফিরতে পারবে।

বিষণ্ন সে-সময় হাহাকার হয়ে বসত গাড়ে কবীরের বুকে। ভুলে যেতে হবে, দূরে চলে যেতে হবে বাক্যগুলো পাঁশুটে রং ঢেলে দেয় কবীরের জীবনে। আর কখনো দেখতে পাবে না তাকে, মায়ায় জড়ানো সেই আঙুলগুলো ছুঁয়ে দিতে পারবে না—ভাবনাগুলো তীক্ষ্ণ তীর হয়ে বিদ্ধ হতে থাকে কবীরের পরাজিত সময়ে। গলার কাছের কান্না গিলতে গিয়ে চোখ বুজে আসে তার।

আচমকা অন্ধকারে ঝলমল করে ওঠে একবিন্দু আলো। দুর্মর এক সাহস জমা হয় তার মনে।

না, সেইসব অনাবিল সময় এক লহমায় মিথ্যে হয়ে যেতে পারে না। শৈশব, কৈশোর আর উৎসুক যৌবনের ভাগাভাগি-জবরদখল করা সময়গুলো এভাবে হারিয়ে যেতে পারে না।

রাতের এই নিকষ অন্ধকারেই কবীর উজ্জ্বল জীবনের পটভূমি সাজিয়ে ফেলল।

চন্দনার দেওয়া রুমালে হাত বোলাতে বোলাতেই বিড়বিড় করে চন্দন বলে,

‘আর একটু অপেক্ষার কর, চন্দনা।’

অপেক্ষা মোটেও প্রলম্বিত হলো না চন্দনার। মাত্র কয়েক ঘণ্টা পরেই সব অন্ধকার সময় দূরে ঠেলে সামনে এসে দাঁড়াল কবীর।

কীভাবে এই অসাধ্য সাধন হলো? তাহলে সে সন্ধ্যার কথা বিস্তারিত বলতে হয়।

আর পাঁচটা দিনের মতো সেদিনও সন্ধ্যা এসেছিল এক অন্ধকার রাতের নিশানা নিয়ে। অনিচ্ছুক চন্দনা অন্যান্য দিনের মতোই কষ্টের শ্বাসটুকু সন্ধ্যার বাতাসে ছড়িয়ে একটু একটু করে এগিয়ে চলছিল অনাগত ভবিষ্যতের দিকে। যে-ভবিষ্যতে বাবার ঠিক করা বিয়ে নামক এক হাহাকার ওকে গিলে খাবার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। যে-ভবিষ্যতে রঙিন মার্বেল পাথর নেই, ঘুলঘুলি থেকে চুরি করে আনা পাখির নীলচে ডিম নেই, পাইনঅ্যাপল বিস্কুটের ভানহীন ভালোবাসা নেই।

আছে শুধু ভালোবাসাহীন জীবন। যে-জীবন মৃত্যুর মতোই স্থবির।

এই ভাবনাগুলো যখন তীব্র হয়ে চন্দনাকে অসার করে দিচ্ছিল তখনই একটি ডাক ওকে চঞ্চল করে তুলল। গলার স্বর তার খুব পরিচিত। মাঝেমাঝে তো মনে হয় হাতের জন্মদাগের মতোই এই স্বর আজন্ম ওর সঙ্গে আছে।

‘চন্দনা’

ফিসফিসানো সে ডাক হোগলার বেড়া পেরিয়ে খুব নিভৃতে পৌঁছাল চন্দনার কাছে। সেই জরসন্ধ্যায় আলটপকা জ্বলে উঠল সুখতারা।

চন্দনা চট করেই বুঝতে পারল দিকভ্রান্ত অসহায় সময় দিকের দিশা পেল। বেড়ার ফাঁক গলিয়ে আসা একটি চিরকুট উজ্জ্বল বর্ণাঢ্য দিনের আশ্বাস নিয়ে হাজির হলো চন্দনার কাছে,

‘আজ রাতে স্কুলঘরের পাশে চলে আসিস। ভয় করিস না, চলে আসিস। আমি অপেক্ষায় থাকব তোর।’

চন্দনা জানে এত দরদ দিয়ে তাকে একজনই ডাকতে পারে।

সেদিনের সন্ধ্যা কীভাবে রাতের অন্ধকারে মিশে গিয়েছিল তা জানা নেই চন্দনার। সে শুধু এক একটি ক্ষণ পরিত্যক্ত করছিল আগতদিনের অমোঘ আকর্ষণে।

এরপর আলগোছে হলো মধ্যরাতের নিরাপদ আগমন। বাড়ির সকলে তখন পরিশ্রান্ত ঘুমের অতলে। তাদের গভীর নিশ্বাসের শব্দ চন্দনাকে সাহস যোগায় ঘর ছাড়বার।

বেরিয়ে আসে চন্দনা। মাকে হারানোর পর অবাঞ্ছিত হয়ে ওঠার যন্ত্রণা, বুকের মধ্যে পুষে রাখা গভীর অবহেলার চিটচিটে ক্ষত সব ঠেলেঠুলে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে সে। তবু এ কোনায় ও কোনায় ছড়িয়ে থাকা একটু আধটু স্নেহে দুই-একবার যে হোঁচট খেলো না, তা কিন্তু নয়।

তবে স্কুলঘরের পাশে অপেক্ষারত মানুষটির উদাত্ত ডাক, রোদ ঝলমলে পৃথিবীর অকৃত্রিম আহ্বান চন্দনাকে ছুটিয়ে নিয়ে চলল সেদিকে।

স্কুলঘরের পথটুকু চন্দনার বাড়ি থেকে খুব দূরের নয়। তবুও আতঙ্কিত সময় আর অনাবশ্যক এক ঘটনায় সেই পথটুকু বেশ দীর্ঘই মনে হয়েছিল চন্দনার।

পথের অন্ধকার সেদিন মিইয়ে দিয়েছিল বিদ্যুৎ খুঁটির টিমটিমানো বাল্বটি। ঘুমন্ত নীরব জনপদে চন্দনার এক একটি পদক্ষেপ ঠিকই আলোড়ন তুলছিল কতশত সাবধানতা সত্বেও। আর সে আলোড়নেই কি না জানা নেই, মাঝরাস্তা থেকে একটি হ্যাংলা কুকুর পিছু নিল চন্দনার।দুয়েকবার ঘাড় ঘুরিয়ে চন্দনা চোখ রেখেছিল কুকুরটির চোখে। শীতল একজোড়া চোখ তাকে আঁতকে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল।

এরপর সে আর পিছনে তাকায়নি।

অতি সাবধানতায় খরচ করে ফেলা বাড়তি সময় পুষিয়ে নিতেই চলতে শুরু করেছিল দ্রুত আর এরসঙ্গে কুকুরটিকে অনেক পেছনে ফেলে দেওয়ার ইচ্ছেটি তো ছিলই।

সমস্ত অনিশ্চয়তা পিছনে ফেলে চন্দনা দ্রুতই পৌঁছে গিয়েছিল স্কুলঘরের মাঠে।

সে মাঠ তখন ছিল রাত্রির অন্ধকারে নিমজ্জিত। মধ্যরাতের আকাশও ছিল তারাবিহীন। এই অন্ধকারের নিদান জানা ছিল না চন্দনার। আর পেছনে মাটিতে পরে থাকা মরা পাতার মৃদু কর্কশ আওয়াজে চন্দনা বুঝে গিয়েছিল ওর গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে পড়েছে কুকুরটি।

তাই প্রথমে ভয়ে, এরপর আতঙ্কে ফিসফিস করে উঠেছিল,

‘কবীর ভাই, তুমি কই? ডর লাগে।’

আর ঠিক তখনই আত্মগোপন করে থাকা অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসে কবীর।

‘হাত ধর, অনেকদূর যেতে হবে।’

এরপর কীভাবে ওরা গ্রাম ছেড়ে শহরের পথ ধরেছিল তা ভালোভাবে মনে করতে পারেনা চন্দনা। তবে শহরের পথ পাওয়ার আগ পর্যন্ত কুকুরটা যে ওদের সঙ্গে ছিল, তা স্পষ্ট মনে আছে।

আর স্পষ্ট মনে আছে বাদামি কুকুরটির একটি গালের বৈসাদৃশ্য সাদা রংটুকু।

আদি কড়ইগাছের তলা থেকে ওরা ভোরের বাস ধরার পরেই কুকুরটি উলটো পথে হাঁটতে শুরু করেছিল।

এরপর…

এরপর তো রোদ ঝলকানো পৃথিবী। তবে তা পোড়া তামাটে নয় মোটেও। ঝলমলে পৃথিবী। সেখানে ভালোবাসা আর মায়া কড়ি ও কোমলে বাঁধা পড়তে থাকে। সময়ের ওপর প্রচ্ছন্ন আহ্লাদের পরত দুজনকে উজ্জ্বল সুখানুভূতিতে ভরিয়ে দিতে থাকে।

সেদিন বাস থেকে নেমেই এই শহরের শেষ প্রান্তে চলে এসেছিল ওরা। কবীরের এক বন্ধুর দেওয়া ঠিকানা মিলিয়ে। অচেনা এই শহরে এই ঠিকানাই ছিল ওদের নতুন জীবনের বাজি। বন্ধুটি ওদের আশাহত করেনি মোটেও। আগে থেকে ভাড়া করে রাখা একটা ঘর আর কুশলী তৎপরতায় একটা চাকরি যোগাড় করে দিয়ে মানুষটি সুদক্ষ অবদান রাখে ওদের বর্ণাঢ্য জীবনে।

তবে চাকরি শব্দটি যতটা গালভরা শোনায় যোগার করা কাজটি আসলে তা নয়।

একটি গার্মেন্টসে ফিনিশিং সেক্টরের কাজ। বলতে গেলে অমানুষিক খাটুনি। আয়রন আর প্যাকেজিং-এর কাজ। কাজ শেষ করে সারাদিন পর ঘরে ফেরা কবীরের পরিশ্রান্ত চেহারা চন্দনাকে বিক্ষিপ্ত করে তোলে খুব তাড়াতাড়ি।

‘তোমার এত পরিশ্রম আমারে শান্তি দেয় না। মন পুড়ায়।’

চন্দনার চোখের টলটলে জল সবসময়ই টলিয়ে দেয় কবীরকে।

‘পরিশ্রম কই? আমি তো খুশি মনে কাজ করি। তোর নাকফুল, বন্ধুর ধারের টাকা, ঘরভাড়া কত দায়িত্ব আমার।’

হ্যাঁ, ঘরই তো। চারপাশে ম্রিয়মাণ সাদা দেয়াল আর উপরে টিনের চালা। এই অনাড়ম্বর ঘরের একমাত্র আড়ম্বর হলো মায়া। একজনের পরিশ্রান্ত চেহারায় অন্যজনের মন পোড়ায়, একজনের নাকফুলের অভাব অন্যজনকে ভেতর থেকে ঝুরঝুর করে ভেঙে দেয়। এই ভেঙে দেওয়া, এই পোড়ানো মন এই ঘরের ম্রিয়মাণ সাদা দেয়ালে দেয়ালে মায়ার ছবি আঁকে।

‘নাকফুল, ঘরভাড়া সব দায়িত্ব তোমার মানলাম। কিন্তু আমার শখের হিসাব কই?

চন্দনার গালে আদুরে আঙুল ছুঁইয়ে কবীরের উত্তর

‘আর কী শখ? বলো আমাকে।’

‘তোমার জন্য চেকের শার্ট, একটা ঘড়ি আর বোতলের সুবাস।’

ওড়নার বাড়তি কোণা দিয়ে কবীরের ঘাম মুছিয়ে দিয়ে অভিলাষী উত্তর চন্দনার।

এ ঘরের আনন্দ আয়োজনে বাড়তি সুখের আবদার চন্দনার।

রাজি হয় কবীর।

রুমালে ফুলতোলায় অভ্যস্ত চন্দনা গিয়ে বসে সুইং মেশিনে। কাজ নেয় ফ্যাক্টরির সুইং সেকশানে।

সুখের রোশনাই ছড়িয়ে পড়তে থাকে ওদের জীবনে। এরসঙ্গে সৌখিনতার বাড়তি আড়ম্বরও। সাদা দেয়ালের শূন্যঘরে সেকেন্ডহ্যান্ড রড আয়রনের খাট, একটা টেবিল ফ্যান, আয়না আর বোতল ভরা সুবাসে উপচিয়ে পড়ে সুখ।

চন্দনা আর কবীরের আমরণ প্রেমের অনিবার্য সুখের ইতিবৃত্ত।

মাত্র মাস নয়েকের সংসার। পুরনো সকল দেনা মিটিয়ে স্বাবলম্বী সংসার।

নীরোগ পৃথিবীর বুকে ওদের অনিন্দ্য সংসার।

কিন্তু উপচিয়ে পড়া সে সুখের সময় খুব বেশিদিন অপ্রতিরোধ্য থাকল না। আচমকাই অবরুদ্ধ হলো একদিন।

‘নতুন অসুখটা কী খুব কঠিন? কারখানা কতদিন বন্ধ থাকবে?’

চন্দনার এই প্রশ্নগুলোর উত্তরে প্রথম প্রথম কবীর আশ্বাস দিত।

‘চিন্তা করিস না। তাড়াতাড়ি সব ঠিক হয়ে যাবে।’

এর কিছুদিন পর,

‘কবে সবকিছু ঠিক হবে? কাজ শুরু না হলে সংসার চলবে কীভাবে?’

অধৈর্য চন্দনার প্রশ্নে ধৈর্যহারা হয় কবীরও।

‘কীভাবে, কী হবে তা জানলে আমি জমা টাকায় হাত দিতাম না, তুই জানিস।’

মৃত্যুর ছায়া পড়লে পৃথিবী কেমন দেখায় তা জানা ছিল না ওদের। হতাশা, অবিশ্বাস, বিমর্ষতা ছড়ানো এই পৃথিবী ওদের অনিন্দ্য সংসারেও কুটিল ছায়া ফেলতে শুরু করে। অভাব আর উপায়হীনতা মিতালি পাতে সেখানে।

‘জমানো টাকা তো শেষ প্রায়। লকডাউন আবারো বাড়ল। ঘরভাড়া কীভাবে দিব?’

কবীরের বিষাদমাখা মুখ অবসন্ন করে দেয় চন্দনাকে।

‘ঘর না থাকলে খাটপালঙ্কের কী কাজ?’

না, এই প্রচেষ্টা সফল হয়না মৃত্যুলাঞ্ছিত এই সময়ে। সকলেই অনিশ্চিত সময়ের ভয়াবহতার কল্পনায় শেষ পুঁজি আঁকড়ে রেখেছে।

তাই সেখানে শখের বিকিকিনি অবান্তর।

এখন কী উপায়?

তিনমাসের লকডাউনে রুজির সঙ্গে রুটিতেও লাগাম লেগেছে। কিন্তু ঘর ভাড়ার লাগাম তো মালিকের হাতে। জমানো টাকাও ফুরিয়েছে কাল। অভাবী সময় আলো নিভিয়ে দিয়েছে ওদের বর্ণাঢ্য জীবনের।

শেষ উপায় ঘর মালিকের কাছে অনুরোধ। তা উপেক্ষিত হলো মালিকের অসহায়ত্বের কাছে।

‘ভাড়া না দিলে আমি ক্যামনে বিলগুলান দিমু ভাই? কারেন্ট বিল, পানির বিল। আর বস্তির ঘরভাড়ার পার্সেন্টেসে কিন্তু পার্টির পোলাপান এই লকডাউনের বাজারেও ছাড় দেয় না।’

এরপর আর কী উপায় থাকে?

একমাত্র উপায়, শহুরে স্বাবলম্বী সময়ে আপাতত কিছু সময়ের বিরতি দিয়ে গ্রামে ফিরে যাওয়া।

কিন্তু সেখানেও তো অপেক্ষায় ক্রুদ্ধ সময়।

ওরা গ্রাম ছাড়ার কিছুদিন পরেই চন্দনার পরিবার দেশছাড়া হয়েছে। একে তো সীমানা নিয়ে উপদ্রুপ ছিলই আর এরপর মুসলিম ছেলেকে ফুসলিয়ে পালিয়েছে মেয়ে। বিবেচনায় তো তাদের অন্যায় বেশি।

তাই গ্রামের রাজবংশী বাড়ি সব ফেলে দেশ ছেড়েছে রাতের অন্ধকারে।

তবে তাতেও কী দমেছে ক্রুদ্ধ সময়? বলা হয়েছে, কবীরকে ফিরতে হবে একা, চন্দনাবিহীন। অস্বীকার করতে হবে পূর্বজীবন। কবীরের যে-জীবনে জড়িয়ে আছে চন্দনার একছত্র মায়া। বিসর্জন দিতে হবে আহ্লাদের পরত জড়ানো ওদের সংসার।

চন্দনাকে মেনে নেওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয় কবীরের পরিবারের পক্ষে।

কবীর দিব্যি বুঝতে পারে এবার সময় এসেছে নতুন সিদ্ধান্ত নেওয়ার। লকডাউনের অভাবী সময় আর অনাবিল প্রেমের বর্ণাঢ্য এই সংসার, সব অস্বীকার করে ফিরতে হবে গ্রামে।

আর গ্রামে ফেরার সে সিদ্ধান্তই ওদেরকে জাগিয়ে রেখেছে এই ভোররাতে।

তোমার সঙ্গে কোথাও যেতে আমি কখনও ডরাই না….

চন্দনার এই নিপাট আস্থা কবীরকে অপ্রস্তুত করে নতুন করে। অপ্রত্যাশিতভাবে বুকের ভেতরটাও কেঁপে ওঠে কবীরের। তবুও আত্মপ্রত্যয়ের ছবিটা চেহারায় ঝুলিয়ে বলে,

‘সাইকেলে এত পথ যেতে লম্বা সময় লাগবে। তবে তুই ভাবিস না। আমরা ঠিকই পৌঁছে যাব।’

চন্দনা শব্দহীন একটু হেসে কবীরের ঘনিষ্ঠ হয়।

‘এই ঘরের জন্য মন পুড়াবে। লকডাউন শেষ হলে আবার ফিরব আমরা এখানে।’

চন্দনার এ কথায় অগোচরে কবীর একটা দীর্ঘশ্বাস লুকায়।

‘এরপর দেরি হয়ে যাবে, চল বেরিয়ে পড়ি।’

কবীর বাড়িয়ে দেয় হাত। আর যথারীতি চন্দনা সে হাত ধরে আজন্মলালিত একই প্রত্যাশা নিয়ে,

‘চলো।’

এ ঘরের সাদা চৌকো দেয়ালে অজস্রসুখ সময়ের পেইন্টিং, বেপরোয়া প্রেমের নিবিড় মুহূর্ত আর লকডাউনের কিছু অসহায় ক্ষণ পেছনে ফেলে কবীর আর চন্দনা পা বাড়ায় ফেরার পথে।

ভোরের পথ মাড়িয়ে ওরা সাইকেলে ছুটতে থাকে ফেরার পথে।

ওদেরকে এগিয়ে দিয়ে শাঁই শাঁই করে পেছনে সরতে থাকে গাছ, গ্রাম আর ক্ষেত। মাঝেমাঝে সাইকেলের গতি এত বেড়ে যায় যে ডিভাইডারে হুমড়ি খেয়ে পড়তে পড়তে এগিয়ে যায় ওরা।

‘তাড়াহুড়ার দরকার কী? লম্বা পথ, শ্বাসে টান পড়বে তোমার।’

কবীরের শার্টের কোনা শক্ত করে ধরে বলে চন্দনা। তবে সে কথা কবীর পর্যন্ত পৌঁছায় কি না তা বোঝা যায় না। নির্বিকার সে এগিয়ে চলে একই গতিতে।

হু হু বাতাসের ঝাপটা তার চুল এলোমেলো করে দেয়। তাতে কবীরের কোনো ভাবান্তর হয় না। লকডাউনের অসার সময় পুষিয়ে নিতে সে ছুটতে দুর্মর প্রতিজ্ঞ আজ।

সকালের রোদ আজ তীব্র নয়। চন্দনার কাছে তা মিষ্টিই লাগছে। সকালের ঠান্ডা বাতাস লম্বা পথের ক্লান্তি অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছে।

শহর যত পেছনে যাচ্ছে চন্দনা ততই গ্রামের জন্য চঞ্চল হয়ে উঠছে। তবে এখনও অনেকপথ বাকি।

‘আমার বাড়িতে জানে আমরা ফিরছি?’

চন্দনার কথায় একটু আড়ষ্ট হয় কবীর। রাজবংশী বাড়ির দেশছাড়ার কথা কখনো জানানো হয়নি চন্দনাকে। আর এখন জানিয়েও লাভ নেই।

কবীর জানে গ্রামে অপেক্ষারত ক্রুদ্ধ সময়ের চোখ রাঙানিকে উপেক্ষা করার জন্য বিসর্জনের যে সূচিপত্র সে তৈরি করেছে, তাতে খুব বেশি সময় আর হাতে নেই।

সাইকেলের গতি আরো বাড়ে। লকডাউনে স্থবির শহর তখন অনেক পেছনে। তবে তাই বলে গ্রামের পথ কমে আসেনি মোটেও।

ওরা তখন পৌঁছে গেছে দিনের মধ্যভাগে।

‘আর কত পথ?’

জলসিঙারা, পাখির নীলচে ডিম, রঙিন মার্বেল পাথরের অনবদ্য দিন এবার আলগোছে হাতছানি দিচ্ছে চন্দনাকে।

‘ডুমুর গাছটা আরো বড়ো হয়েছে মনে হয়।’

কবীর উত্তর দেয় না। ওর চোখ তখন নিবদ্ধ সামনের রেল ক্রসিং-এ।

‘তেলাকুচার লতাগুলো আমাদের চালে গিয়ে ঠেকেছে, দেখো।’

চন্দনার কথার পিঠে বাড়তে থাকে উত্তরহীন সময়।

অমনোযোগী কবীর দ্রত এগিয়ে যাচ্ছে নির্ধারিত সময়ের দিকে। সে দ্রুততায় চন্দনা একটু টলে ওঠে। এক হাতে আঁকরে ধরে কবীরকে। এই মানুষটিই চন্দনার একমাত্র নির্ভরতার জায়গা।

এই প্রথম চন্দনার আঁকড়ে ধরায় বিব্রত হয় কবীর। হীনমন্যতা কুরে কুরে খায় ওকে। দূর থেকে ভেসে আসা ট্রেনের হুইসেল কবীরকে জানিয়ে দেয়, পরিকল্পনাতে ভুল হয়নি মোটেও।

‘হঠাৎ কী হলো তোমার? এত ধীরে যাচ্ছ? হাঁপিয়ে গেছো?’

চন্দনার কথায় মুচকি হাসে কবীর।

‘আর তাড়াহুড়োর দরকার নেই। অল্প পথ বাকি। চল, বাকি পথ এভাবেই যাই?’

কবীরের এমন আহ্বান তো চন্দনার খুব জানা।

নিজের গাল কবীরের পিঠে ছুঁইয়ে বলে,

‘চলো'

ট্রেনের আলো সন্ধ্যার বুকচিরে এগিয়ে আসছে খুব দ্রুত।

চন্দনার প্রগলভ মায়ায় অল্প সময়ের জন্য তাল হারিয়ে ফেলে কবীর।ট্রেন লাইনের ঠিক পাশে দাঁড় করিয়ে ফেলে সাইকেল। সাইকেলের মুখ ঘুরিয়ে চলে যেতে ইচ্ছা হয় সুখের পেইন্টিং ঝোলানো সেই সাদা চৌকো ঘরে।

কিন্তু শহরের সে ঘরে লকডাউনের বিপর্যস্ত সময় আসন গেড়েছে। আর সামনের পথে অপেক্ষায় আছে ক্রুদ্ধ সময়।

না, সিদ্ধান্ত বদলানোর উপায় নেই।

আচমকাই চন্দনার মায়ার পরত ভেঙে বেরিয়ে আসে কবীর। পরিকল্পনায় নির্ধারিত শেষ-অঙ্কের ছক মনের ভেতর আরেকটু ঝালিয়ে নেয় কবীর।

এরপর খুব বিড়বিড় করে বলে,

‘আমাকে ক্ষমা করিস, চন্দনা’

এরপর...

এরপর তেড়েফুঁড়ে আসা মালবাহী ট্রেন ছিঁড়েখুঁড়ে বেরিয়ে যায় কবীর ও চন্দনার ভালোবাসামগ্ন সময়।

নিথর চন্দনার পাশে রক্তাক্ত কবীর চোখ বুজে আসার আগে আবছা দেখতে পায় মৃত্যু ছায়ায় কাঁপা লকডাউনের এ জনপদে বিছিন্ন ছড়িয়ে রয়েছে চন্দনার যন্তে আনা রুটি আর আলুর তরকারি।  
 
একটি কুকুর নিভৃতে গন্ধ শুঁখছে সে তরকারির।

কুকুরটির রং বাদামি হলেও একগালে স্পষ্ট বৈসাদৃশ্য সাদা রং।


লেখক পরিচিতি:
স্মৃতি ভদ্র
কথাসাহিত্যিক
নিউইর্য়কে থাকেন।




একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

1 মন্তব্যসমূহ

  1. এই সমাপ্তি তো সাধারণ ভাবনার বহিপ্রকাস।সহজ সমাধান।অন্য রকম
    আশা করেছিলাম,হতাশ হলাম!

    উত্তরমুছুন