পায়ে পায়ে
অমিতাভ চক্রবর্ত্তী
বাড়ির সামনে কোথাও ধূলো, কোথাও ঘাসের ছোঁয়া গায়ে মেখে রাস্তাটা সারাদিন এলিয়ে পড়ে আছে। একটা-দুটো পাতা মাঝে মাঝে ডিগবাজি খেয়ে উড়ে যায়। ছোট ছোট পাতার ঘুর্ণী, কোন রিক্সা কি সাইকেল, লাফিয়ে চলা পাখি, এদিক থেকে ওদিকে, চলে যায়।
নদী আর রাস্তার মাঝে অনেকটা জমি জুড়ে এই বাড়ি। কাছাকাছি বড় রাস্তা না থাকায় শহরের এই দিকটায় ব্যস্ততা কম। এই প্রান্তে এসে তা আরও কমে গেছে। একটা নির্জনতার ঘোর চারপাশে স্থির হয়ে জমে আছে। এই নির্জনতাটা আমার ভালো লাগে। যে জীবন নিজের পছন্দে বেছেছি, গড়েছি, সেখান থেকে যখন পায়ে পায়ে বেরিয়ে আসতে হয়, মাথার ভিতরের টানা-পোড়েনগুলো থেকে মুক্তি পেতে এই নির্জনতাটা দরকার হয়ে পড়ে।
লক ডাউনের ফাঁকে ফাঁকে রীতেশ এসে ঘুরে যেত নিয়মিত। পরেও এসেছে। আমায় এখান থেকে নিয়ে যাওয়ার অনেক চেষ্টা করেছে। পারেনি। কান্নাকাটি করেছে একেকদিন। শরীর খুঁড়ে মন-জাগানোর প্রাণান্ত চেষ্টার ব্যর্থতায় খেপে উঠেছে - ‘কি হয়েছে তোমার? কার কথা ভাবো তুমি?’ যে উত্তর আমার নিজের কাছেই পরিস্কার নয়, ওকে তার কি জানাব আমি? শরীর থেকে, বিছানা থেকে নেমে যেতে যেতে হতাশ হয়ে বিড়বিড় করেছে, ‘নেই, নেই, কিচ্ছু নেই আর তোমার।’ চাদর টেনে নিয়ে গা-হাত-পা থেকে আশ্লেষের গন্ধ মুছে ফেলে পাশ ফিরে গেছি আমি। মাঝে মাঝে বলেছে, ‘তোমার মা যদি একবার আসতে পারত, নিশ্চয়ই ফিরিয়ে নিয়ে যেত তোমায়।’ ও বুঝতে পারেনি, পারে না, একটু একটু করে সমস্ত চেনা বৃত্ত থেকে বেরিয়ে চলে এসেছি আমি। জানি, আমাকে ছাড়া এত বড় কারবারের দেখাশোনা করা রীতেশের একার পক্ষে কঠিন হয়ে গেছে। কিন্তু আমার আর তাতে কিছু যায় আসে না।
উত্তর-পশ্চিম কোণের ঘরটা একই সাথে আমার অফিস আর টিভি দেখার ঘর। ছিল। এখন আর কিসের অফিস! দুই দেয়ালের প্রায় পুরোটা জুড়ে একটানা বড় বড় জানালা। জানালার ভিতর দিকে কাঁচের পাল্লা। বাইরের দিকের পাল্লায় মশা আটকানোর জন্য তারজাল লাগানো। ভারী পর্দায় জানালা ঢাকা থাকে। কাঁচের পাল্লা খুলে রাখলে নিস্তব্ধ রাতে নদীর ঢেউয়ের আওয়াজ শোনা যায়। মাঝে মাঝে গানের সুর ভেসে আসে। উত্তরের দেয়াল যেখানে পরের ঘরে যাচ্ছে ঠিক সেখানটায় দেয়াল থেকে চার পাঁচ গজ তফাতে বাড়ি আর নদীর মাঝে একটা বিশাল ঝাঁকড়া গাছ। সে গাছে একেক দিন পাখিদের কিচির-মিচির সন্ধ্যা পেরিয়ে রাতের ভিতরেও গড়িয়ে যায়। নদীর বুক থেকে ভেসে আসা আওয়াজ আর পাখীদের কাকলিতে অনন্তকাল ধরে চলা জীবনের স্পন্দন পাই। যে জীবন মানুষের নয়, প্রকৃতির। ভালো লাগে। এক সপ্তাহের কাজে এক রবিবারে এখানে এসে উঠেছিলাম। ক্লায়েন্ট-ই ঠিক করে দিয়েছিলেন। কাজ শেষ হওয়ার আগেই লকডাউন ঘোষণা হয়ে গেল। ফিরে যেতে পারতাম, যাইনি। সেই থেকে এখানেই আছি। কতকাল হয়ে গেল। মনে হচ্ছে ঠিক জায়গাতেই এসেছি। আর ফিরতে চাই না।
গতকাল মেঘলা থাকার পর আজকের দিনটা বেশ ঝকঝকে কাটল। এখন ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘের উৎপাত সামলে পুর্ণিমার আলো চরাচর ভাসিয়ে দিচ্ছে। রাস্তার দিকের বারান্দায় বসে ছিলাম। বারান্দাতেও মশা আটকানোর জাল লাগিয়ে দিয়েছে, ডেঙ্গুর ভয় বেড়ে গেছে আজকাল। ফোনটা ঘরে ছিল। বেজে ওঠায় ভিতরে এসে ধরতে ধরতে কেটে গেল। অচেনা নাম্বার। যাকগে, যে করেছে তার দরকার থাকলে সে আবার করবে। ল্যাপটপটা নিয়ে হেলানো সোফায় আধশোয়া হলাম। মন বসল না। পাশের টেবিলে ল্যাপটপ নামিয়ে রেখে পর্দা-ঢাকা জানালার পাশে টিভিটা চালু করলাম। টিভির পাশের জানালার একটা পাল্লা খুলে রেখেছি। একটু সরে থাকা পর্দার পাশে জালের ভিতর দিয়ে গাছটা দেখা যাচ্ছে। পাখীদের কিচিরমিচির আজ প্রায় পাগলামিতে পৌঁছে গেছে। সেই উন্মত্ততা ছাপিয়ে টিভিতে ন্যাট জিওর শো চলছে। খাদকের হাত থেকে খাদ্যের বাঁচার অন্তহীন গল্পের টুকরো টুকরো ছবি। মৃত্যু কখনো ছুঁয়ে দিচ্ছে, কখনো এ বারের মত ছেড়ে দিচ্ছে।
এই সময় নদীর দিক থেকে একটা হাওয়া আসে। জাল ভেদ করে ঢুকে আসে। আজকেও আসছে, মাঝে মাঝে পড়ে যাচ্ছে। পাখা চালিয়ে রেখেছি, অল্প করে। হালকা একটা চাদর জড়িয়ে রেখেছি, অভ্যাসে। হেলানো সোফাটায় আধশোয়া, ঘুমিয়ে পড়েছি। ঘুমের মাঝেই আধো জেগে একসময় টিভিটা থামিয়ে দিয়েছি।
মাঝ রাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল এক নিঃসীম স্তব্ধতায়। তারপরেই পরিষ্কার শুনতে পেলাম কথোপকথন। মানুষের গলা, আবার মানুষের নয়ও। এখন আমার নাম ধরে ডাকছে কেউ। টিভি থেকে নয়, ওটা শব্দহীন হয়েই আছে। ডাক এসেছে বাইরে থেকে। আশ্চর্যের হল, আমার একটুও অবাক লাগছে না। যেন এমনটাই হবার কথা ছিল।
জানালার জালের ভিতর দিয়ে দেখতে পাচ্ছি, গাছের মাথায় পাতার জাফরির মধ্যে বসে আছে তারা। দুই পাখি। আমি খুব সহজেই চিনতে পারলাম। সেই ছোটবেলায় এসেছিল তারা। আবার আজ এসেছে – ব্যাঙ্গমা আর ব্যাঙ্গমী।
আমার বুক কেঁপে উঠল। যেন একটা অনন্ত নিদ্রা থেকে জেগে উঠলাম। ঘরে ঢুকে এলো তারা।
‘কি চাও?’ জানতে চাইল ব্যাঙ্গমা।
আমি চুপ করে থাকলাম।
‘আর ভালো লাগছে না?’ আস্তে করে জিজ্ঞাসা করল ব্যাঙ্গমী। মনে হল যেন তার ডান হাত দিয়ে সে আমার চোখের জল মুছিয়ে দিল। জানি, পাখির হাত নেই। তবু মনে হল।
‘কি চাও?’ জানতে চাইল ব্যাঙ্গমা।
আমি চুপ করে থাকলাম।
‘আর ভালো লাগছে না?’ আস্তে করে জিজ্ঞাসা করল ব্যাঙ্গমী। মনে হল যেন তার ডান হাত দিয়ে সে আমার চোখের জল মুছিয়ে দিল। জানি, পাখির হাত নেই। তবু মনে হল।
ব্যাঙ্গমা হাসল একটু। সেই আগের মত। যে রাতে আমি প্রথম দেখেছিলাম তাদের। তার আগের রাতে আমার বারো বছরের জীবনের সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনাটা ঘটে গিয়েছিল। মাঝরাতে জানালার পাশের বটগাছটা থেকে তারা দু’জন নেমে এসেছিল আমার ঘরে। গল্প করেছিল। সব কথা বুঝিনি আমি। কিন্তু ভালো লেগেছিল খুব। জিজ্ঞাসা করেছিলাম – ‘সত্যিকারের ভালোবাসলে কেউ কি করে ছেড়ে যেতে পারে?’ নরম গলায় ব্যাঙ্গমী বলেছিল, ‘ভেবো না, তুমি যাকে ভালবাসবে, সে তোমায় কোনদিন ছেড়ে যাবে না।’ তারপর উড়ে গিয়েছিল। আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ‘আর আমি, আমি কি ছেড়ে যাব তাকে?’ উড়তে থাকা ডানার আওয়াজে আমার প্রশ্নের উত্তর চাপা পড়ে গিয়েছিল।
আমাদের মেয়ের বয়স এখন আঠেরো বছর। উত্তরটা আমার জানা হয়ে গেছে। অথচ আমি সেটা চাইনি। কিন্তু আমার যে আর উপায় ছিল না! রীতেশ আমায় ভালোবাসে। নাকি বেসেছিল, এখন আর বাসে না? জানি না। এও জানি না তার ভালোবাসার কতটা আমায় আর কতটা আমার ওকে টেনে নিয়ে যাওয়ায়।
একে ওকে পট্টি পরিয়ে অর্ডার যোগাড় করে, ঐটা ও খুব পারে। তারপর, বাকি সমস্ত দায় আমার। গোটা ব্যবসা, ব্যবসা কি, পুরো জীবনটাই এ লোক আমার উপরে ফেলে রেখেছে। দায়িত্ব কি করে ঝেড়ে ফেলে দিতে হয়, ওর থেকে ভাল কেউ জানে না। কি অবলীলায় গল্প বানায়! আমাদের সমস্ত বন্ধুরাই ওর দিকে। এত প্রেম তারা আর কোথাও দেখেনি। ওর ঐ একটু বিষণ্ণ, মায়াময় প্রেমিক চোখ, সে যে কত বড় ফাঁকি – যে ঘর করে সে জানে। ও যে কোন দিকে তাকায় না, কোন কিছুর হিসেব রাখে না, সেটা যেন ওর মস্ত উদারতা। আর সে উদারতা সামাল দিতে একটা মেয়ে যে তার সব স্বপ্ন গুটিয়ে নিল, সব যেমন-ইচ্ছে-চলাকে বেঁধে ফেলল হিসাবের শিকলে, তার কি হবে? আর কতকাল তাকে এই রকম টেনে চলতে হবে!
একজোড়া উজ্জ্বল চোখ মেয়েটাকে খুঁজত একদিন, সে চোখদুটো এখন আর তার মনেও পড়ে না ঠিকমত। আজকাল বড় মনে হয়, এরকম হওয়ার কথা ছিল না। দমবন্ধ লাগে আমার। শুধু আমাদের মেয়েটা, সে বেচারী এখনও বুঝে উঠতে পারছে না, কোথায় সুর কেটে গেছে।
মার কাছে যে যাব সে উপায়ও নেই। মা আমাদের ছোটবেলার শহরে সেই বাড়িটাতেই রয়ে গেল। স্বপ্ন-কুটির। বাবার স্মৃতি ও বাড়ির বাতাসে আজও মাকে ঘিরে আছে। আমাদের অবস্থা ফিরতে ঐ ভাড়া বাড়ি-ই মাকে কিনে দিয়েছি। আমার পক্ষে সহজে অত দূরে যাওয়া সম্ভব হয় না। মা মেসেজ করতে ভালোবাসে না। ফোনেই যোগাযোগ রাখি। কিন্তু আজকাল আর রোজ কথা হয় না। ইচ্ছে করে না।
বলার কথা নেই কিছু। সবটাই ত আমি যেমন চেয়েছি। মা আমার ইচ্ছেতেই সায় দিয়েছে। তার নিজের গোটা জীবনটা একটা লোকের স্মৃতিতে আর আমায় দাঁড় করানোয় কাটিয়ে দিল। কত গুণ ছিল। বাবা চলে যাওয়ার পর বাবার নাটকের দলটা মা দুহাতে আগলে রেখেছিল। কিন্তু আমার নাটকে মন ছিল না। আস্তে আস্তে আমি নিজের পছন্দের জগতে মেতে উঠলাম। তারপর একসময় রীতেশ এল। একটু একটু করে পায়ে পায়ে আজ এইখানে। কিন্তু এখন?
পাখিরা চুপ করে আমার কথা শুনছিল। না আমি মুখে কিছু বলিনি, বলতে হয় নি। ব্যাঙ্গমী আমার কাছ ঘেঁষে এল। তার মাথাটা আমার ঘাড়ের কাছে নিয়ে এসে আলতো করে আমার গালটা ছুঁয়ে দিল। আর, ব্যাঙ্গমা আমার ল্যাপটপ কম্পিউটারটার দিকে এগিয়ে গেল। সেটা এতক্ষণ খোলাই ছিল, তবে ঘুমিয়ে ছিল। ব্যাঙ্গমা তাকে জাগিয়ে দিল। তারপর আমার দিকে তাকাতে আমি মাউসের দিকে হাত নাড়ালাম। মাউস ছাড়া কাজ করতে পারি না আমি। মাউসের নড়াচড়ায় আংটিটা পড়ে গেল টেবিল থেকে, আমার আর রীতেশের নামের প্রথম অক্ষরদুটো লেখা আছে ওটার উপরে। আজকাল অনেক সময়ই ওটা খুলে রাখি। গড়িয়ে গেছে। মায়া কাল সকালে এসে তুলে রেখে দেবে। ও খুব বিশ্বাসী।
ব্যাঙ্গমার একটা ডানা আমার আঙ্গুলের উপর নেমে এল। কীবোর্ড আর মাউস নিয়ে নড়াচড়া করে সে একটা ফোল্ডার খুলে ফেলল। তাতে অনেক ফাইল, এখন কোন ফাইলটা খুলছে ও? ভিডিও, একটা মেয়ের। মেয়েটা আমি। কখন তোলা এ ভিডিও? আমার চোখে জল কেন? এখন আবার এমনভাবে ঘোমটাটা দিয়ে মাথা ঢাকলাম যেন আমার মুখ ভালো করে দেখা না যায়। আরে, আমার হাতের আঙ্গুলে এ কোন আংটি? কোথায় যাচ্ছিই বা আমি? রাস্তাটা চেনা-চানা, আবার নয়ও। ওমা, এ ত আমার ছোটবেলার রাস্তা। স্বপ্ন-কুটির থেকে বাস গুমটি হয়ে স্টেশনের দিকে চলে গিয়েছে। অনেক পাল্টে গেছে, যাওয়ারই কথা। কলেজ শেষ করে বিয়ের পরে পরেই সেই যে চলে এসেছি, আর ফিরে যাওয়া হয়নি! এখন মা থাকে ঐ বাড়িতে। কিন্তু আমাদের বাড়ি ছেড়ে কোথায় যাচ্ছি আমি? কবে? কেন যাচ্ছি? এ কোন শাড়ি পড়ে আছি আমি? কোনদিন ছিলনা আমার, আজও নেই।
ব্যাঙ্গমা আরেকটা ফাইল খুলল। ছবি। খবরের কাগজের কাটিং। আমার নামে। আরে! এ ত আমার ডাকনাম! বাবার খুব পছন্দ ছিল এই নাম। আমার খুব ইচ্ছে ছিল, যদি কোনদিন খুব বড় কেউ হই, এই নামেই সবাই চিনবে আমায়। ইচ্ছেপূরণ হয়নি। আজ আর এ নামে আমায় কেউ চেনে না! কিন্তু, এ সব কি লিখেছে আমার নামে?
‘একসময়ের ছোট পর্দার পরিচিত মুখ লিপি চৌধুরির কোন খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। রংমশাল সিরিয়ালে ফুলঝুরি চরিত্রে অভিনয় করে বিখ্যাত হন তিনি। যদিও এর পরেই তিনি অভিনয় জগৎ থেকে হারিয়ে যান। স্থানীয় একটি দোকানের সামনে লাগান সি সি টিভির ফুটেজে তাকে শেষ বারের মতন বাস গুমটির দিকে হেঁটে যেতে দেখা গিয়েছিল। লিপির কম্পিউটারের একটা ফোল্ডারে কয়েকটি লেখা পাওয়া গিয়েছে। ডায়রির মত। কোন কোন লেখা দেখে চিঠি মনে হলেও সেগুলি কাউকে পাঠানো হয়েছে বলে জানা নেই।’
ব্যাঙ্গমা এতক্ষণ কম্পিউটারের মনিটরের দিকে তাকিয়ে ছিল। এবার আমার দিকে মাথাটা ফেরাল। চোখে জিজ্ঞাসা। নাকি জিজ্ঞাসাটা সরাসরি আমার মাথায় এল? আমি সায় দিলাম। ব্যাঙ্গমা আর একটা ফাইল খুলে ফেলল। সেটায় তারিখ দিয়ে দিয়ে ভাগ করে একটানা লেখা। এগুলোই কি সেইসব ডাইরির পাতা আর চিঠি? এভাবে এখানে কে গুছিয়ে রাখল? পাখিদের কেউ? পড়তে শুরু করলাম আমি। পড়ছি, নাকি আমিই ঘটাচ্ছি এসব? সন-তারিখ সব আমার জানা, আপনি ভেসে আসছে। আমার জন্য ওদের দরকার নেই। এখানে দেওয়া না থাকলেও আমি বুঝে নিতে পারতাম।
১৭ জানুয়ারি, ২০০৪
১৭ জানুয়ারি, ২০০৪
এইবার-ই প্রথম, তোমার জন্মদিনে তোমার কাছে থাকা হয়নি। পঞ্চান্ন হলে। তোমার বয়স এখন আমার প্রায় দ্বিগুণ। তোমার অভিজ্ঞতা তার মানে এখন আমার দ্বিগুণ হল। কি, তাই হল? আসলে তোমার অনেক অভিজ্ঞতা। আর তোমার বুদ্ধি ত সব সময়ই আমার বহু গুণ। সমস্ত কিছু তুমি আমার থেকে ভালো পার। কিন্তু মা, তুমি কি আমার মতন সহ্য করতে পার?
তাও পারো নিশ্চয়ই। বেশীই পারো। আমি জানি, আমার মা সব পারে। আমার মার সব কিছু কি সুন্দর! যে যাই বলুক, আমি তো জানি, আজও আমার মা আমার চেয়ে অনেক সুন্দরী। আমার অন্য কথা মানুক না মানুক, এই কথাটা অনিন্দ্যও মানে। এমনকি মাঝে মাঝে হাসতে হাসতে বলে যে তোমাকে দেখেই নাকি আমার প্রেমে পড়েছে। বলে – ‘তোমার মা-র মত কাউকে তো পাওয়া যাবে না, তাই তোমাকেই পছন্দ করেছি!’ কোন মানে হয়! তবে হ্যাঁ, ওর পছন্দের তারিফ করতেই হয়। যেমন এই কম্পিউটারটা! বিয়েতে আমায় উপহার দিল! কালকে এতে একটা অদ্ভুত সুন্দর বাংলা লেখার সফটঅয়্যার নামিয়ে নিয়েছি। কি সুন্দর নাম – অভ্র! বাংলাদেশের একটি ছেলে বানিয়েছে এটা, মেহেদী হাসান। সবার জন্য ফ্রী! এমন হয়! এমন করে কেউ! কি সহজে বাংলা লিখতে পারছি। যেমন খুশী লিখতে পারব এবার, যত খুশী।
২০ জানুয়ারি, ২০০৪
অনিন্দ্য কেন যে এত ওস্তাদী করে, বরাবর! ইচ্ছে করে সব ছেড়েছুড়ে দিয়ে বেরিয়ে চলে যাই। সেই উদ্দাম দিনগুলোতেও একেক সময় ইচ্ছে হত, দিই বলে যে কাল থেকে সব কাট। বলতে পারি নি, সত্যি-ই যদি কাট হয়ে যায়! হয়তো হতো না, কিন্তু আমার ভয় হ্ত। অথচ যখন ওর মেসেজের পর মেসেজ উত্তর দিতাম না, ফোন বন্ধ করে রেখে দিতাম, অনিন্দ্য কিন্ত ঠিক ধৈর্য্য ধরে আমার রাগ ভাঙ্গিয়ে, ভাসিয়ে নিয়ে যেত। তার পরেও একটা সময় আমার ভয় করত।
আসলে বাবা চলে গিয়ে অবধি …
আচ্ছা, মানুষ কখন ঠিক করে বোঝে যে আর থাকা যাবে না, এবার চলে যেতে হবে? না কি যে মানুষগুলো একসাথে থাকে, ভালবাসে, তারা আসলে সেই প্রথম দিন থেকেই দূরে চলে যেতে থাকে? মাকে জিজ্ঞাসা করলে, একটা বিষণ্ণ মিষ্টি হেসে মা বলত – ‘আমি কি করে জানব লিপি, আমি তো যাই নি কোথাও, তোর কাছে-ই আছি!’
কথা বলতে বলতে মায়ের গলা আবছা হয়ে যেত। আমি বড় হতে হতে বুঝে গিয়েছিলাম, যা বোঝার একদিন নিজেই বুঝব, তাই মাকে আর নাড়া দিতাম না। নিজের গভীর গোপনে ব্যথা সয়ে নিতাম। শুধু মাঝে মাঝে ঢেউ ভেঙ্গে কথারা উঠে আসত। পুরানো দিনের কথা। মা’র সাথে সেসব কথার সময় মা যখন আমায় লিপি বলে ডাকে, আমার ভিতরে আর একটা ডাক বেজে ওঠে। একটা আলাদা রকমের ডাক – যেন সমানে-সমানে কথা হচ্ছে, আদরে মাখা অথচ মর্যাদা দিয়ে, একটু ঘন সে ডাক, আমার ভিতরে শির-শির করে। বাবা আমার সাথে ঐভাবে কথা বলত, সব সময়। আমার নামটাও বাবার দেওয়া। কেন চলে গেলে, বাবা!
৫ ফেব্রুয়ারি, ২০০৪
৫ ফেব্রুয়ারি, ২০০৪
কাল কতবার যে আমায় নাম ধরে ডাকলে, মা! আমার নাম নিয়ে একটা ছোট্ট মজা আমি নজর করেছি। যখন পুরনো কোনো আনন্দের কথা মনে পড়ে, হয়তো আমাদের তিনজনের দিনগুলোর কথা, এ কাজে, ও কাজে তুমি আমায় একটু বেশী ডাকাডাকি করো। খুব বেশী না, একটু – আমি ধরতে পারি। বারেবারে লিপি নামটা বলে একটা অন্য সময়কে ছুঁয়ে আসা। যে সময়টা চলে গেছে অথচ কোথাও যায়নি। একটা অদৃশ্য বলয়ের মত তোমাকে আর আমায় ঘিরে রেখেছে।
কাল সে’রকম একটা দিন ছিল। আমার থার্ড অডিশানটা ছিল। দু’ সপ্তাহের মধ্যে তিনটে। তার আগে কতদিন কিচ্ছু আসে নি। তুমি তখন ফোনে, এমন কি মেসেজে, আমায় উৎসাহ দিয়ে গেছ। এইবারে বেশ ভাল একটা সুযোগের সম্ভাবনা আছে। তুমি তাই একটু বেশী উৎসুক ছিলে। যখন ফেরার পথে তোমার কাছে গিয়ে জানালাম যে এইবার মনে হচ্ছে হয়ে যাবে, তোমার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল, তাই দেখে আমার-ও। মা-মেয়ে দুজনেই খুব খুশীতে এঘর ও ঘরে উড়ে বেড়ালাম। মাঝে-মাঝেই তুমি তখন লিপি-লিপি করেছ। বুঝলাম বাবার কথা মনে হচ্ছে। ছোটো ছোটো খুশী, জুড়ে রাখে কত অনন্ত অসহ সময়ের ভেলা। এই খুশীটাতো সেই মানুষটার সাথে ভাগ করে নেওয়ার কথা ছিল!
১০ এপ্রিল, ২০০৪
সব কিছুর জন্য তুমি-ই দায়ী শ্রীতমাদি। তুমি-ই ওকে ডেকে এনেছিলে! আসলে, এই বলে একটা সান্ত্বনা খুঁজি আর কি। একজন মানুষ কেন আরেকজনকে কাছে ডাকে? কথা বলে? যাকে বলে, সে কি শোনে? ঠিক শোনে? কতদিন এমন হয়েছে, আমি অত্যন্ত খুশী হয়ে অনিকে কিছু বললাম – অনি শুনল, হয়তো কিছু বললোও। কিন্তু, সুরে বাজল না! কিসে সুরে বাজে? আমি যেদিন প্রথম অনিন্দ্যকে দেখি, আমার কিছু মনে হয়নি। সত্যি বলতে কি, ঠিক নজরেও পড়ে নি। আর কেউ না জানুক, তুমি তো জানো শ্রীতমাদি। তোমারি বন্ধু সে। আমাদের ক্লাবের নাটকের দলের প্রধান ভরসা ছিলে তুমি। আমার মায়ের স্নেহের নায়িকা, শ্রীতমা। তুমিই ওকে জুটিয়ে এনেছিলে। তারপর ধীরে ধীরে দলটার প্রধানদের একজন হয়ে উঠল সে। মা এই ক্লাব-এর বড় পেট্রন। মার ভালো লাগে তাই ক্লাব লাইব্রেরির নাটকের বইয়ের ভাণ্ডার বেশ বড়, আর নাটকের ছেলেমেয়েদের সংখ্যাও। কিন্তু এত ভিড়ের মধ্যেও অনিন্দ্য আমার মায়ের নজরে পড়ে গিয়েছিল। যেভাবে পছন্দের বই আমার নজরে পড়ে যেত। আর আমি অনিন্দ্যর। আমি ধরতে পারিনি।
তুমিও পারেনি, শ্রীতমাদি!
তুমি তো জান, আমার নাটকে মন ছিল না। আমি গল্প বই পড়তে ভালবাসতাম। কবিতা পড়তেও। কল্পনার জগতে ছড়িয়ে পড়তাম আমি। ইচ্ছে হত, আমিও ওরকম লিখি। পারতাম না। তুমি পারতে। কি সুন্দর কবিতা লিখতে। গান গাইতে, নাচতেও। কত গুণ তোমার শ্রীতমাদি! কত বড় দুনিয়া ছিল তোমার!
আমার দুনিয়াটা নজরে পড়ার মত ছিল না। আমাদের ক্লাব-এর লাইব্রেরিতে নাটকের বইয়ের তাকগুলো ছাড়াও আরও যে সব বইয়ের তাক ছিল, তাদের মাঝে হারিয়ে থাকতাম আমি। বাড়িটার একদিকে তোমরা নাটকের ঘরে রিহার্সাল করতে। আর একদিকে বই পড়ার ঘরে আমি ডুবে যেতাম পৃথিবীর রহস্য উন্মোচনে। আর সেই রহস্য উন্মোচনের জাদুকাঠি হাতেই ঢুকে এল ও।
লাইব্রেরির তাক থেকে বই নামানোর সময় মাঝে মাঝে দেখতে পেতাম উজ্জ্বল আকাশী নীল শার্ট পড়া ছেলেটা নাটকের ঘরে রিহার্সাল দিচ্ছে বা রিহার্সাল না থাকলে ক্যারম খেলছে। কখনো-কখনো লাইব্রেরিয়ান সুদীপ-দা কাছাকাছি না থাকলে এই ঘরে এসে কাউন্টারে ডিউটি দিচ্ছে। ফেরৎ বই জমা নিত, পরেরটা লেন্ডিং-এ এন্ট্রি করে দিত। আগে থাকতে চেয়ে রাখা বই রিজার্ভ-স্টক থেকে খুঁজে এনে দিয়ে দিত। তখন কি জানি, ওটা গট্-আপ থাকত! সুদীপদার সাথে হিসেব করা থাকত, ঠিক সময়মত লাইব্রেরিয়ান মহাশয় ব্যস্ত হয়ে যেতেন আর তার অ্যাসিস্ট্যান্ট এগিয়ে এসে বই আর বই নিতে আসা মেয়েটা দুজনের-ই দায়িত্ব তুলে নেওয়ার চেষ্টা করত। কিচ্ছু বুঝতে পারি নি আমি। আমি কি খুব বোকা? খুব? ঐ, অনি এলো মনে হয়। এখন বন্ধ করি।
১১ এপ্রিল, ২০০৪
১১ এপ্রিল, ২০০৪
কে যে কখন বোকা হয়ে যায়, শ্রীতমাদি! কখন থেকে যে বই নেয়া-বই ফেরৎ দেওয়ার সময় সেই ঝকঝকে চোখের ছেলেটা সামনে না থাকলে লাইব্রেরিতে যাওয়াটা অদ্ভুত অর্থহীন হয়ে যেত, বাড়ি ফিরে আর গলায় কোন গান গুনগুন করত না, অনেকদিন পর্যন্ত সেটা ধরতে পারি নি! ধরতে পারার আগেই অনেক রাস্তা হাঁটা হয়ে গেল।
সত্যি সত্যিই অনেক রাস্তা হাঁটা হয়ে গেল। একটা বই-এর জন্য ডিমান্ড দিয়ে রেখেছিলাম। সুদীপ-দা জানে, বইটার জন্য আমি চাতক পাখির মত বসে আছি। বইটা যে নিয়ে রেখেছে, তার ফেরৎ দেওয়ার তারিখ অনেকদিন পার হয়ে গেছে। সুদীপদার চেনা লোক, একই দিকে বাড়ি। আজ আসার সময় তার বাড়ি থেকে নিয়ে আসবে বলেছিল। সুদীপদা আসেইনি আজ। আমার হতাশ মুখ দেখে অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রস্তাব দিল, ‘লিপি, এক কাজ করি, চলো। বেশি দূরে নয়, হাঁটতে হাঁটতে নিয়ে আসি গিয়ে, সুদীপদা ত কাল বলেই রেখেছে।’ লিপি আমার ডাকনাম। কিন্তু লাইব্রেরির রেজিস্টারে ত আমার সেই নাম নেই। এই ছেলে এ নাম ধরে ডাকল কেন?
লাইব্রেরি থেকে বের হওয়ার মুখে কয়েক জোড়া চোখ একবার আমার দিকে একবার অনিন্দ্যর দিকে তাকিয়ে আবার বইয়ের পাতায় ডুবে গেল। নামের ভাবনায় ঘুরপাক খেতে খেতে আধা মন নিয়ে শুনলাম, এ ছেলে এই বইয়ের বিষয় নিয়ে দু-চার পাতার জ্ঞান রাখে, যেতে যেতে কথা হবে। হল। ঘন্টা খানেক, তার মধ্যেই লাতিন আমেরিকা থেকে কলোনিয়ালিজম হয়ে পুঁজির পাহাড়ে চড়ে সেখান থেকে গড়িয়ে নেমে গড়াতে গড়াতে কোথায় চলে এলাম! ফেরার পথে আলতো করে প্রায় আমায় কানের কাছে মুখ এনে সে জানাল, আমার ডাকনামটা তার খুব ভালো লাগে। কি এমন কথা! কিন্তু আমার ভিতরটা এক না-বোঝা ভালো লাগায় শিরশির করে উঠল!
বুঝতে তুমিও পারোনি শ্রীতমাদি। ওদের পাড়া থেকে তোমার ক্লাসমেট অনিন্দ্যকে তুমি নিজে আমাদের ক্লাবে নিয়ে এসেছিলে। আনার পরের নাটকেই তোমাদের জুটি হিট। আমদের শহরটায় শুধু নয়, যতটা এলাকা জুড়ে লোকেরা আমাদের ক্লাবের নাটকের দলটাকে চেনে সব্বার মুখে মুখে অনি-শ্রী। মা তো একেবারে প্রশংসায় পঞ্চমুখ। আমি নাটকের লোক ছিলাম না। কিন্তু এইবার ইচ্ছে হল। তোমাদের রিহার্সাল দেখতে শুরু করলাম, আস্তে আস্তে মঞ্চে। তারপর কখন যে জুটি বদলে সময়টা অনি-লিপির হয়ে গেল, সেটা বুঝতে তোমার অনেক দেরী হয়ে গেল! আমি তোমায় কাঁদতে দেখেছি, অনিন্দ্যর কাঁধে মাথা রেখে, মঞ্চে, সাজঘরে, অভিনয়ে, অভিনয়ের বাইরে। অনি ধীরে সে জল মুছিয়ে দিয়েছে। জল-মোছা চোখ নিয়ে তুমি সরে গেছ। আমি ধাক্কা খেয়েছি, থমকেছি, কিন্তু অনিন্দ্যকে ছাড়তে পারিনি। তোমার চোখের জলও আমায় ছেড়ে গেল না। আমি পরিষ্কার দেখতে পাই।
১৩ সেপ্টেম্বার, ২০০৬
১৩ সেপ্টেম্বার, ২০০৬
গতমাসে আমাদের বিবাহ বার্ষিকী গেল। শ্রীতমাদি এসেছিল। নাটক ছেড়ে দেয়ার প্রায় বছরখানেক বাদে সেই যে ও কলকাতা চলে গিয়েছিল, এতদিন বাদে আবার এল। কি মিষ্টি আর দুষ্টু হয়েছে ওর মেয়েটা। আমাকে জড়িয়ে ধরে দুগালে চুমো খেল, খেয়েই গেল। খুব হৈচৈ হল। একগুচ্ছ উপহার দিল শ্রীতমাদি, সাথে একটা বই। ওর প্রথম কবিতার বই, এবারের বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছে। আকাশী নীল মলাটের বইটায় কি অদ্ভুত সুন্দর সব কবিতা লিখেছে শ্রীতমাদি – নরম, বিষণ্ণ, পবিত্র। ও কি মনের গহীনে খুব দুঃখী? ভুলতে পারেনি অনিন্দ্যকে? আমার জন্য ওর জীবনটা কি এলোমেলো হয়ে গেল? না কি সমস্ত কবিতাই আসলে বানিয়ে তোলা? কিংবা সমস্ত কিছুই। এমনকি যখন একটা শরীর আরেকটা শরীরে মিশে যেতে চায়, মিশে যায়, তখনও কি একটা বানিয়ে তোলা চলতেই থাকে?
২২ মে, ২০০৮
কালকে অনির অফিসের কয়েকজন ফেরার পথে আমাদের বাড়িতে এসেছিল। জ্বর হয়ে ও অফিস যেতে পারেনি ক’দিন। ওরা দেখতে এসেছিল। আসলে ওদের ফাঁকা ফাঁকা লাগছিল। অনিন্দ্য যখন কথা বলে তখন মুগ্ধ হয়ে শুনতে হয়। যত মুগ্ধ হওয়া যায় অনি তত ঝকঝক করতে থাকে, উজ্জ্বল চোখ উজ্জ্বলতর হয়ে ওঠে। সেই দীপ্তি শ্রোতার চোখে ঘোর লাগায়। তুমি তো জানো মা, আজকাল আমি কারো কথাই বেশীক্ষণ নিতে পারি না। অনিরও না। অন্যমনস্ক হয়ে যাই। সেই শুরুর দিনগুলোয় কিন্তু, আমার অবস্থা ওর এই অফিস সহকর্মীদের মতন-ই ছিল। অনিন্দ্যর কথা না শুনতে পেলে মাথার মধ্যে একটা ফাঁকা-ফাঁকা লাগত। আমি নিজেই নানা কথা ধরিয়ে দিতাম আর অনি, ততদিনে আমার থেকে তিন বছরের বড় এই ছেলেটাকে আর সকলের মত আমিও অনি বলে ডাকছি, সমানে কথা বলে যেত।
অনেক কিছু ও জানে, আর যদি ঠিক করে যে আরো জানা দরকার, তবে অবশ্যই আরো জেনে নেয়। যেমন ধরো সেই শুরুর দিনগুলোয়, তখন সুদীপদার কাছ থেকে নিয়ম করে জেনে নিত আমার কোন বইয়ের দরকার। তারপর একদিন ঠিক সময়মত একটা বই দেবার নাম করে আমার সাথে জুড়ে গিয়েছিল। আর, আস্তে আস্তে আমাকে জড়িয়ে নিয়েছিল ওর সাথে, নাটকের দলে। ওর বিছানায়।
২৯ ডিসেম্বার, ২০০৮
২৯ ডিসেম্বার, ২০০৮
এ বছরের আমাদের নাট্যমেলা শেষ হল গতকাল। খুব ভাল হল এবার প্রায় সব কটা দলের নাটক। আমাদের দলের নাটক ও সবাই ভালো বলেছে। তবে বেশী প্রশংসা হয়েছে মেলার আয়োজনের, মানে অনিন্দ্যর। অনি এখন আর মঞ্চে অভিনয় করে না। নাটকের সাথে সাথে কেরিয়ারকে এগিয়ে নিতে কোন অসুবিধা হয় নি ওর। তারপর একসময় মসৃণ ভাবে বদলে নিয়েছে পথ। তা বলে নাটক ছাড়েনি। এখন মায়ের সাথে সাথে, অনিও আমাদের নাটকের দলের বড় স্পন্সর, রিক্রুটার। অনিন্দ্য সমস্ত কিছু বড় ক্যানভাসে দেখতে পায় আর সেইভাবে কাজ করে। আমি বুঝতে পারিনি। কিন্তু মা সমস্তটা বুঝেছিল, সহজ অঙ্কের মত। আর খুশী মনে ওর সাথে তালে তাল মিলিয়েছিল। ঠিক সময়মত তিয়াসকে নিয়ে এসেছিল ও। মঞ্চে আমার নায়ক তিয়াস, মঞ্চের বাইরে অনিন্দ্য। তারপর যখন কলকাতায় যাতায়াত করে সিরিয়াল সামলাতে সামলাতে ক্লাবের আর সময় দিতে পারছি না, নাটকের দলের অসুবিধা হয় নি। আমার বদলি অনি রিক্রুট করে নিয়েছে। আমি জানি, যদি কোনদিন নিজের জীবনে আমাকে না চায় অনি, আমার বদলি ঠিক রিক্রুট করে নেবে ও।
৩০ ডিসেম্বার, ২০০৮
৩০ ডিসেম্বার, ২০০৮
অনি সমস্ত কিছু এত গুছিয়ে করতে পারে, করে, যে ওর সাথে থাকতে থাকতে বোঝাও যায় না কখন কেমন করে ওর গুছিয়ে রাখার ব্যবস্থার জালের মধ্যে একটা মাছির মত আটকে গেছি। আর কোনো ছাড়ান-কাটান নেই! জালটা যে আছে, সেটা ও নিজেও মানে। কিন্তু ওর বিশ্বাস, জালটা আসলে আমাদের বাঁচানোর জন্য। ট্রাপিজের খেলায় যেমন সেফটি-নেট থাকে – নিরাপত্তা জাল, আমাদের পড়ে গিয়ে আহত কি নিহত হওয়া থেকে বাঁচাবে। ওর মনে করে এই জালটা থাকা খুব দরকার। কারণ আমরা পড়ে যাব, যাব-ই। এতে আমাদের কোন দোষ নেই, এমনকি ভুল-ও নেই। এটা নিছক একটা অপূর্ণতা। মানসিক অপূর্ণতা। যাদের সেই অপূর্ণতাটা আছে, তারা তো ঐভাবেই জন্মেছে। আর সেটা খুব খারাপ ব্যাপার-ও নয়। সব একরকম হলে তো এই পৃথিবীটার কোন বৈচিত্র্যই থাকত না। শুধু মনে রাখতে হবে, যাদের এই অপূর্ণতাটা নেই, যেমন অনিন্দ্য, যেমন আমার মা, তাদের কাজ আমাকে, আমার বাবার মত মানুষদেরকে সাবধানে ঘিরে রাখা, যত্ন করে, গুছিয়ে।
বাবার জন্য কি জালটা ছিল? কি করে ছিঁড়ে গেল সেটা?
আমি যদি বলি আকাশটা কি সুন্দর, অনিন্দ্য যা-ই করতে থাকুক, কাজ থামিয়ে আমার দিকে তাকাবে, আকাশের দিকে তাকাবে, তারপর মিষ্টি হেসে বলবে – ঠিক বলেছ। যদি বলি আকাশটা কি বিচ্ছিরি, অনিন্দ্য কাজ থামিয়ে আমার দিকে তাকাবে, আকাশের দিকে তাকাবে তারপর গম্ভীরভাবে বলবে – খুব খারাপ। আর যদি আমার দিকে তাকিয়ে বুঝে যায় যে আমি উল্টোটা শুনতে চাইছি – একটু কথা কাটাকাটি চাইছি, এবং ঠিক-ঠিক বুঝেও যায়, তা হলে অবশ্যই উল্টোটা বলবে আর তর্কাতর্কির একটা মহা সমারোহ বাধিয়ে তুলে আবার নিজেই একসময় সাবধানে জট ছাড়িয়ে নিজেকে এবং আমাকে তার থেকে বার করে আনবে। আর এই সবটা সময়, আমি জানি, যে সুতোটা ও ভাবতে ভাবতে ছেড়ে এসেছিল সেটা মাথার মধ্যে ঠিক গুছিয়ে রেখেছে। আবার যখন বসবে, যেখানে ছেড়ে এসেছিল সেখানেই ধরে নেবে। আমি কি করব মা?
১৭ অগাস্ট ২০০৯
১৭ অগাস্ট ২০০৯
গতসপ্তাহে অনিন্দ্যর ঘরে এসেছি ছয় বছর হয়ে গেল। রবিবারের পার্টিতে সবাই আমাদের গোছান সংসারের প্রশংসা করেছে। তাদের বন্ধু অনিন্দ্যর বউ-এর যে সুগৃহিনী হয়ে যাওয়া ছাড়া আর কোন রাস্তাই নেই, সবাই প্রচুর হাসির সাথে সে কথা বেশ মজা করে, গর্ব নিয়ে ঘোষণা করেছে। শুধু রীতেশ-দা বার দুয়েক চেষ্টা করেছিল বোঝানোর যে গুছিয়ে থাকাটাই একমাত্র সুখে থাকা নয়, সকলের সমবেত ঘোষণায় সে প্রস্তাব মাটিতে পা রাখার জায়গা পায় নি। হাওয়ায় ভেসে গিয়েছিল। সেই হাওয়াটাকে কি আমি একটু খোঁজাখুঁজি করেছিলাম, মনে মনে? ঠিক জানি না। আমিও তো এখন খুবই চেষ্টা করি – গুছিয়ে চলার!
সবাই চলে যাওয়ার পর অনিন্দ্য ড্রিঙ্কস-এর গ্লাসগুলো ধুয়ে মুছে তুলে রাখতে রাখতে বলেছিল, ‘রীতেশ-এর অবস্থাটা দেখলে, আজো পাল্টালো না। কোথায় কি বলতে হবে, বলতে হয় – শিখল না। ওর জন্য কি না করেছি! এই যে অর্ডারগুলো পায়, আমিই ফোন করে, এই সেদিনও, কমলদা, জ্যোতি সান্যাল, সোম এন্ড রাসেল-এর মিসেস চাওলার কাছে পাঠিয়েছি। সেই কন্ট্যাক্টগুলো কাজে লাগিয়েই এই স্ট্রাগ্ল্-এর বাজারে ওর টিঁকে যাওয়া। আর সেই ছেলে আমারই বাড়িতে বসে আমায় জ্ঞান দিচ্ছে, গুছিয়ে কাজ করাটা একটা অপশান মাত্র, লক্ষ্য নয়!’ অতই যদি পারিস, আজও একটা গুছিয়ে প্রেম করে উঠতে পারলি না কেন?
আমার ভিতরে একটা টুপ টুপ জল পড়ার শব্দ। সে কেমন ঠিকমত বোঝাতে পারব না আমি। রীতেশ কখনো আমায় কথাটা বলে উঠতে পারে নি। কিন্তু ওর বিষণ্ণ চোখে কার ছায়া কাঁপে সে আমার চেয়ে বেশী আর কে জানে! ভুল হল, অনি নিশ্চয় জানে। ও সব জানে। অন্যমনস্ক হয়ে গিয়েছিলাম। হঠাৎ খেয়াল করলাম, অনিন্দ্য জলের গ্লাস বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বলছে, ‘ওষুধটা খেয়ে নাও।’
জলের গ্লাসের দিকে হাত বাড়াতে বাড়াতে আমার চেতনা যেন একটা ঝাঁকুনি খেয়ে ফিরে এল। এক ঝটকায় একটু আগে অন্য মনে শোনা কথাগুলো যেন দ্রুত পার হয়ে যাওয়া চলচ্চিত্র দৃশ্যের মত মাথার ভিতর ভেসে গেল। অনিন্দ্য বলেছিল, ‘এই জন্যই তো দেশটার এই হাল। রীতেশের মত লোকেরা একটা কাজও গুছিয়ে করে না, পারেই না আসলে! আর, তাই তেমন কিছু হয়ও না এদের। জাস্ট চালিয়ে যায়। যাকগে। তুমি এসব নিয়ে বেশী ভেবো না। প্রত্যেককে যার যার পূর্ণতা-অপূর্ণতা নিয়েই বাঁচতে হবে, হয়। দুনিয়ায় সব রকম লোকই থাকবে। তুমি কিন্তু সব গুছিয়ে রাখা হলেই ঘুমিয়ে পোরো। ভালো হয়েছে যে এখন কোন কাজ নেই। শরীরটা একটু সারিয়ে নিতে পারবে। সামনের মাসের কাজটা যদি হয়ে যায়, একদম রেডি।’
সত্যিই ত। অনিন্দ্যরা তুলে না দিলে রীতেশদের হাতে কিছু আসে না। লিপিরা তাদের অধরাই থেকে যায়।
৪ এপ্রিল, ২০১০
৪ এপ্রিল, ২০১০
ভীষণ ক্লান্ত লাগছে। আমি জানি, যতটা গুছিয়ে করা দরকার, আমি ততটা করে উঠতে পারি না। আর, তাই তেমন কিছু একটা হলও না। কোন ভাবে চালিয়ে যাচ্ছি। অথচ দেখো, তুমি কেমন সব দিক গুছিয়ে আমাকে বড় করে তুলেছিলে। আমার জন্য কেমন চমৎকার পার্টনার যোগাড় করে দিয়েছিলে। আমি এখন জানি, অনির আমাকে পছন্দ করায় তোমার কতটা পরিকল্পনা ছিল। তোমার জহুরীর চোখ বুঝে ফেলেছিল যে, তোমার এই সব বুঝেও না বোঝা, বারে-বারে-ভুলি মেয়েটার জন্য অনিন্দ্যর চেয়ে যোগ্য ছেলে সহজে মিলবে না। তোমার গোছানো হিসেবে কোন ভুল নেই, মা। বিজ্ঞাপনের দুনিয়ায় পা রেখে কি সুন্দর এগোচ্ছে অনিন্দ্য! আমিও কেমন গুছিয়ে উঠছি! কিন্তু এত ক্লান্ত লাগে কেন গো?
১৬ মে, ২০১০
১৬ মে, ২০১০
মা গো, এখন আর আমি যখন-তখন আকাশ দেখি না, বৃষ্টিতে ভিজি না, বইমেলায় হারিয়ে যাই না, লাইব্রেরীতে গিয়ে কোনো অচেনা ছেলের সাথে হাঁটতে-হাঁটতে ঘুরে আসি না একটা জীবন, শতাব্দীর থেকে শতাব্দী, চেনা পৃথিবী থেকে অচেনা পৃথিবী। আমার পৃথিবী এখন সুন্দর করে গোছানো। চিনতে পারি না, কিন্তু সুন্দর করে গুছিয়ে রাখি। এমন কিচ্ছু রাখি না যা দরকার নেই। তোমার মত অনিও আমায় আগলে রাখে, যে সবে আমার মায়া পড়ে গেছে কিন্তু কোন কাজে আসবে না সেগুলো ফেলে দ্যায়না, শুধু একটু দূরে রেখে দ্যায়, তাকে তুলে রাখে। আমার সব কটা লেখা, আমার কাটুম-কুটুম-এর বাক্স, সব গুছিয়ে রেখে দিয়েছে; সেসব নিয়ে তো আর বসা হয় না এখন! আচ্ছা মা, বাবা-র সেই গানের ক্যাসেট-গুলো এখনো আছে? ওসব তো আর কোনদিন কেউ বাজাবে না! তবে আছে নিশ্চয়-ই। তুমি ঠিক গুছিয়ে তুলে রেখেছ।
আর বন্দুকটা? ওটা বোধ হয় পুলিশ ফেরৎ দেয়নি, তাই না?
তুমি যে রকম ভাবছ, সে রকম কিছু নয়, মা। আমি তো তোমার-ও মেয়ে! তাই অত আগোছাল ভাবে জীবন-টাকে ছেড়ে চলে যাব না। তবে যাব। পায়ে, পায়ে, ঠিক বেরিয়ে চলে যাব।
১৪ জুলাই, ২০১৫
১৪ জুলাই, ২০১৫
মেয়েটা কোলে আসতে গিয়ে এলো না, তিন বছর হয়ে গেল।
২৫ ডিসেম্বর, ২০২১
২৫ ডিসেম্বর, ২০২১
বাড়িতে বন্ধুদের ডেকেছিল অনিন্দ্য। কতদিন বাদে বাড়িতে লোকজন। রীতেশ এসেছিল। বাড়ির সবার কোভিড হয়েছিল, ও ভোগেনি বেশি। বাবা চলে গেছে, বলল – কোভিডে নয়। চেহারা বেশ ভালই দেখাচ্ছে। কোভিডের সময় যার যখন যা দরকার সাপ্লাই দিত, যেখানে যাকে যা ধরার ধরেছে, ভাল কারবার। রীতেশের সাথে রিনি এসেছিল, শ্রীতমাদির বাড়িতে দেখেছি, অনেক ছোট ছিল তখন, বোন বা কেউ, জানি না, বলছিল, এখন কি যেন হয়েছে, বলছিল, মনে রাখিনি। লাঞ্চের পর ড্রিঙ্ক্স নিয়ে সবাই অনেকক্ষণ গল্প করল। একবার ভাবলাম আমিও গিয়ে বসি ওদের সাথে, উঠলাম না, শুয়ে রইলাম, অন্যদিকে তাকিয়ে। আমি জানি, অনি আমায় নজরে রাখছিল, রীতেশও, আসলে আমায় নিয়েই কথা বলছিল, রিনির সাথে। কেন?
৮ নভেম্বর, ২০২৩
৮ নভেম্বর, ২০২৩
রিনি খুব ভাল মেয়ে, আমার সব কথা ওকে বলেছি। কি সুন্দর করে ডাকে আমায়। আমি ওকে দিদি বলতে না করে দিয়েছি। ও বলেছে ও আমায় ছেড়ে যাবে না কোথাও। আর, আমরা দুজনে একদিন সব কিছু ফেলে রেখে বেরিয়ে চলে যাব।
কম্পিউটারের স্ক্রিন এখন অন্ধকার। বাইরের পূর্ণিমার আলো কিছু ম্লান, হয়ত চাঁদ হাল্কা মেঘে ঢাকা পড়েছে। পাখীদুটো কখন বের হয়ে গিয়েছে খেয়াল করিনি। নদীর উপর উড়ে চলা পাখিদের ডাক। একটা অপার্থিব ধূসর কূলহীন, তলহীন সমুদ্র আমায় ঘিরে নিয়েছে। আমার ভিতর ঢুকে আসছে। একটু একটু করে আমার শরীর জেগে উঠছে, খিদে পাচ্ছে। নরম গলায় খুব চেনা একটা ডাক ভেসে এল – ‘লিপি …’
----------------------
রুট ৬৬ শারদীয়া ২০২০-তে প্রকাশিত
লেখক পরিচিতি:
অমিতাভ চক্রবর্ত্তী
কবি। গল্পকার। অনুবাদক।
টেনেসি, যুক্তরাষ্ট্রে থাকেন।


0 মন্তব্যসমূহ