“কত্তো দিন মানা কননু, শুনলা না! ওই গাছেই উঠবা! গাছ কামানে ছাড়া কি জগতে আর কাজ নাই? কতদিন বুলিছিনু, হাড়্গুলান পেকি আসচে, ইবার গাছে উঠা ছাড়ো। শুনলা না। গাছ কামাতে গিয়িই পা’টা ভাঙলা! ঠিলি বহি বহি কাঁধটা তো আগেই কুঁজি করি ফেলিচো!” বিড়বিড় করে ওঠে তানজু। গাছলাগানো নিয়ে এর আগেও অনেকবার স্বামীর সাথে তার খুঁটুরমুটুর লেগেছে।
ফড়ুর চামটা শরীরের হাড়গিলে বুকটা খচ খচ করে ডলে যাচ্ছে সে। ডলনির চাপে বুকের কটা চুলের ঝোড়টা দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে। ফড়ুর তখনও ঘোর কাটেনি। দুঃস্বপ্নের ছাপ তখনও চোখে মুখে। ফড়ুর এই হয়েছে এক সমস্যা। দু চোখ বন্ধ করলেই গাছ থেকে পড়ে যাওয়ার দুঃস্বপ্নটা ফিরে ফিরে আসছে। একটা আতঙ্কের মতো তাকে তাড়া করছে। অথচ গাছে ওঠাটা তার কাছে জলভাত। তার সাত পুরুষ গাছাল। গাছে ওঠাটা তার রক্তে। তার বাপ দাদোও গাছাল ছিলেন। কাছ কামানোটা তাদের বংশপেশা। ন্যাংটো অবস্থা থেকেই তার গাছে ওঠার হাতে খড়ি। সে বানরের মতো তিড়িং বিড়িং করে গাছে উঠতে পারে। মগডালে বাঁদরের মতো ঝুলে থাকতে পারে। এ হেন ফড়ুর আজ বেহাল দশা! গাছ থেকে পড়ে ডান পা’টা পুরো ভেঙে গেছে। কোমরেও একটা চিড় ধরেছে।
খেজুর গাছগুলোর কেবলই ‘ছাড়ান’ চলছিল। সবে তো কার্ত্তিক মাস চলছে। নলেন গুড় পেতে এখনও অনেক দেরি। ‘ছাড়ান’( গাছের পাতা কেটে পরিষ্কার করা ) তারপর ‘চাঁচা’ ( যেখান দিয়ে রস নির্গত হবে সে জায়গাটার ছাল তোলা ), ‘ঘাটিমারা’ ( চাঁচা জায়গাটার মাঝখানে একটা গর্ত করে খেজুর পাতার জিভ তৈরি করে লাগানো ), তারপরে তো শুরু হবে ‘লাগান’( রস ঝরতে লাগলে একটা আংটা করে ঠিলি ঝোলানো ) ? আর তার মাঝে মাঝে তো ‘শুকান’( ঠিলি পাতা বিরত রাখা) পর্ব রয়েছেই। ফড়ুর যত না সমস্যা, তার থেকে বেশি সমস্যা গাছের মালিকদের। তাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ! এ বছর খেজুর গুড় খেতে পাব তো? ফড়ুটা তো পা ভেঙে বসে থাকল, গাছ লাগাবে কে?
ফড়ুর কোনও বিকল্প নেই। এ চত্বরে সেইই একমাত্র গাছাল। ব্যাচারি ফড়ুই বংশের পরম্পরাকে টিকিয়ে রেখেছে। এ গাঁ এবং আশপাশের গাঁ-গঞ্জে ফড়ু গাছালের খুউব হাকডাক। নলেন গুড়ের গন্ধের মতো তার নামও ম ম করে ছুটে। তাদের পারিবারিক পদবি ‘সেখ’ কবে থেকেই উধাও। সবার নামের সাথে জুড়ে গেছে ‘গাছাল’। শীত পড়লেই ফড়ু গাছালের ব্যস্ততা তুঙ্গে। তখন আর দম ফেলার জো নেই। এ গাছ থেকে সে গাছ, সারাদিন গাছেই কেটে যায়। তার ওপর আবার গুড় বানানোর হ্যাপা। সারাদিন তপ্ত আগুনের পাশে থেকে জ্বালান দেওয়ার ঠ্যালা। এ কাজে সে বউ’র সহযোগিতা পেলেও জ্বালান জুগাড় করা ঠাপের কাজ। বোঝা বোঝা বুন-জঙ্গল কাটতে হয়। সেখানেও সাপ-পোকামাকড়ের ভয়। জ্বালানির সে বোঝাকে আবার রোদে পরে পরে শুকাতে হয়। এত খাটনি অথচ সে হিসেবে পয়সা নেই। গাছ ঝাড়া থেকে শুরু করে গুড় বানাতে গিয়ে জানের খাটা হয়ে যায়।
দুই.
এখন সবাই ফড়ুর খুউব তখিদ করছে! গোব্যাচারা মুখ্যুসুখ্যু আবোড় মানুষ ফড়ুর এখন বিশাল কদর! যার যার গাছ লাগিয়েছে বা গাছ লাগানোর কথা, সেসব লোকজন দুবেলা করে তার বাড়িতে চক্কর কাটছে। কিন্তু ফড়ুর পায়ের যা হাল তাতে এবছর আর গাছ লাগাতে পারবে কি না সন্দেহ আছে! এমনিতেই দিন পনের হয়ে গেল। এখনও সেভাবে পায়ে ভর দিয়ে খাড়া হয়ে দাঁড়াতে পারছে না। একটু আলতো করে ভর দিতে গেলেই, ভিতরটা যন্ত্রণায় টাটিয়ে উঠছে। ফড়ুরও গাছগুলো দেখলেই ভিতরটা আঁকুপাকু করে উঠছে। গাছ অন্তপ্রাণ মানুষ। এই গাছই সারা বছর তার পরিবারের সবার পেটে অন্ন যোগায়। সংসারকে ধরে রাখে। তার বাড়ির এতগুলো পেটের হিল্লে হয়। কার্ত্তিক থেকে ফাল্গুন, এই পাঁচ মাস সে মূলত খেজুর গাছ লাগায়। নলেন গুড়ের কাজ করে। বছরের অন্য সময়গুলোও সে গাছালের কাজ করে। কখনো তালগাছে উঠে তাল পেড়ে বিক্রি করে, তালপাতা কেটে হাতপাখা বানায়, কখনো আবার নারকেল গাছ থেকে ডাব কিনে হাটে হাটে ফেরি করে। তার বিক্রিবাটার একটা খ্যাতালও আছে।
ফড়ুর বাড়ির সামনেই পাতান সেখের ভিটে। পুরনো আমলের গেরস্ত বাড়ি। বনেদি বাড়িটার পিছনেই একটা বিশাল আচোট। পাশেই একটা গভীর পুকুর। পুকুরের পাড়লাগা উনিশটা খেজুর গাছের সারি। গাছগুলোর একটাও এখনও ‘ছাড়ান’ হয়নি! মাথাগুলো পাতায় ঝোপ বেঁধে আছে। অথচ প্রতি বছর এই সময় গাছগুলোই ‘ঘাটিমারা’ চলে। ফড়ু তার মাটির বারান্দাটায় বসে পিটপিট করে খুঁটোল চোখ দিয়ে গাছগুলোকে দেখছে আর ভিতরে ভিতরে ছটফট করছে। যেন গাছগুলো তাকে ডাকছে। গাছগুলো তার আত্মীয়। দায়েদি। সুখদুখের সাথী। এই গাছকে আঁকড়েই তো তার গা-গতরের বেড়ে ওঠা? সে যখন গাছে থাকে তখন অদ্ভুত একটা গন্ধ টের পায়। তার পূর্ব পুরুষদের গন্ধ। তার বংশের গন্ধ। যেন নাড়ির টান। রক্তের বাঁধন। ফড়ু তখন শুধু মানুষ নয়, একটা গাছও। গাছটাও একটা মানুষ হয়ে ওঠে। গাছে মানুষে তখন অনেক কথা হয়। গল্প হয়। একে অপরকে ধরে বাঁচে। শ্বাস নেয়। গাছের ছালে জড়িয়ে থাকে সুখ।
সাইকেলটা কচ করে এসে থামল বারান্দাটার সামনে। ফড়ুর বাড়িটা একেবারে রাস্তার ছমুতে। মাটির দেয়াল। টালির ছাউনি। দু- খোপ ঘর। এক শীতেন উশরার নিচেই ঘিঞ্জি উঠোন। এই উঠোনের একপাশ জুড়ে ঢাউস আকারের দু দুটো আখা। গুড় বানানোর ভাটি। মুখ উপুড় করে রাখা আছে শ-খানেক মাটির ঠিলি। আখার গা লেগে সটান ধনুকের মতন বেঁকে উঠে গেছে একটা পাকা ঝুন নারকেল গাছ।
“ফড়ু তুমার পায়ের অবস্থা এখন ক্যামুন? হাঁটতে চলতে পাচ্ছ?”
সাইকেল থেকে নেমেই কথাগুলি বললেন হারেজ মাহান্ত। পরনে ঢিলা পাজামা। গায়ে ধবধবে সাদা পাঞ্জাবি। মাথায় সাদা-কালো বাবরি চুল। সেটেলমেন্ট অফিসে মোহরির কাজ করেন।
“হাঁটতে আর পাচ্ছি কই? কুনুরকমে বাঁশে ভর দিয়ি দু অ্যাক পা ফেলতে পাচ্ছি। ভিতরের হাড়্গুলান দুমড়ি মুচড়ি ভেঙি গেছে! অ কি আর দু পাঁচ দিনে সারবে?” ধুকাতে ধুকাতে বলল ফড়ু।
“তাহলে আমার গাছগুলেনের কী হবে! সেই তো ছাড়িয়ে আসলা, এখনও চাঁছাই হয়নি! গাছগুলান ক্যামুন ন্যাড়া ন্যাড়া লাগছে। অমনি করিই কি পড়ি থাকবে? অর কি কুনু বিহিত হবে না?”
হারেজ মাহান্তর গলায় দুশ্চিন্তা। উঁচুডিহির মাঠে তার ছ-খানা খেজুর গাছ আছে। প্রতি বছর গাছ পিছু তিন-চার কেজি গুড় পান। এই গুড় দিয়ে পিঠে-পুলি, ক্ষির-পায়েস, নাড়ু-মণ্ডা, জামায় খাওয়া সবই হয়ে যায়। এ বছর ফড়ুর যা হাবভাব তাতে গুড় চোখে দেখতে পাবেন কি না সন্দেহ আছে।
হারেজ মাহান্ত বললেন, “তুমার ছেলেডা তো বেশ লাগদানা হয়ছে, মাথা চাড়া দিয়ি উঠিছে বেশ। অকে না হয় এবছরটা ভিড়াও। এ বছর দিয়েই না হয় অর গাছ লাগানোর বহনি হোক।“
ফড়ু বলল, “উ ছেলি ই পানে আসতে চায় না হারেজভাই, উ ল্যাখাপড়া কচ্ছে। ছেলির মা ছেলিকে ই ছমুই হতে দেয় না। বুলে, চাষার ব্যাটা চাষা, গাছালের ব্যাটা গাছাল হবে, তার কি কুনু মানে আছে? খাটলেই কপাল পালঠানো যায়। আমার অ্যাকলোতা ছেলিকে গাছে গাছে চড়ি ব্যাড়াতে দিব না। উ ল্যাখাপড়া শিখি মানুষ হবে। শিক্ষাতু হবে। বাপ-দাদোর মুতন গাছে গাছে বাঁদরের মুতন ঝুলি ব্যাড়াবে না।“
“তুমি বুলছ কি ফড়ু! গাছালের কাজ তুমাদের বংশের ঐতিহ্য। বাপ-দাদোর ঘরানা। ই কাজ তুমাদের রক্তে। গায়ে-গতরে। ই কাজ তুলি দিলে তুমার পূর্বপুরুষদের অকল্যাণ হবে! তাদের আত্মা কষ্ট পাবে! তাদের নামগন্ধ মাটিতে মিশি যাবে!”
“কী আর করব বলুন, আমারও তো কষ্ট হয়, বংশের পেশাটা ই বাড়ি থেকি উঠি যাবে! কিন্তু এখুনকার ছেলিপিলি ই লাইনে আসতে চাহাছে না। তাদের সামনে এখুন মেল্লা পথ। এত্ত খেটনের পথে ক্যানই বা আসবে?”
“দেখি, অঘ্রান মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করি। তুমার পা’টা সেরি উঠুক। তাছাড়া তো আর কুনু উপায় নাই।“ কথাগুলি বলে সাইকেলটা নিয়ে বেরিয়ে গেলেন হারেজ মাহান্ত। তিনি তো তাও অঘ্রান মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করবেন বলে গেলেন, ঘাটপাড়ার সাদেক খাঁ তো অন্য কথা শুনিয়ে গেছেন। ‘ঘাটিমারা’ না হলেই, গাছগুলো কেটে ফেলবেন! তা দিয়ে ইটভাটায় ইট পুড়াবেন। খেজুর গাছ দিয়ে খুব ভালো ইট পুড়ানো যায়। ইটের রঙ হয় টকটকে লাল! খরচও কম পড়ে। নিজের ভুঁইয়ের মাটি, নিজের খেজুর গাছ, খরচের বালায়ই নেই। এমনিতেই এখন খেজুর গাছের সংখ্যা অনেক কম। পুরনো গাছ খুউব বেশি নেই। নতুন গাছও আর সেরকম হচ্ছে কই? আগের মতন সেই বুন-বাঁদাড়ও নেই, সেই আচষা আচোটও নেই। জমির পগারে পগারে ভাঁট-পিটুলির জঙ্গল ছিল। আর সেই জঙ্গলে মাথা চাড়া দিয়ে উঠত বুনো খেজুর। এখন সেসবও ক্ষেতি জমি। চাষ-আবাদের ভুঁই। এখন গাছ থাকা বলতে গেলে, বাড়ির আন্টায়-কান্টায় কিছু আর পুকুর-ঘাটের পাড়ে ইতস্তত কিছু ছড়িয়ে ছিটিয়ে।
বারান্দাটায় পাছা ঠেকিয়ে হেলান দিয়ে বসল ফড়ু। বগলের স্ট্রেচারটা ঠেকা দিয়ে ভাঙা পা’টা কে আলতো করে সাট করল। দেখল, কতটা যন্ত্রণা করছে। সেরে উঠতে কতদিন লাগতে পারে। রোদ-বৃষ্টিতে হাড় খাটুনির শরীর। এ তো মোমের মতো সহজেই গলে যাওয়ার নয়? ইস্পাতের মতো পোক্ত। পুড়া হাঁড়ির মতো চিমটে। এ শরীরকে কি সহজে কাবু করতে পারে?
যন্ত্রণাটা এখনও টাটকা হয়েই আছে, বুঝল ফড়ু। একটু নড়ালেই কনকন করে উঠছে। বিকেলের রোদ তার চোখেমুখে এসে পড়ছে। রোদ পুড়া চামটা মুখটা আরও যেন কালচে হয়ে গেছে। দুই চোখের নীচে কালশিটের দাগ। গালে খোঁচা খোঁচা কাঁচা-পাকা দাড়ি। ঝাঁকড়া কটা-পাকা চুল। কাঁধে বাঙ্গির ঘটা। বাঙ্গিতে করে রসের ঠিলি বহে বহে কাঁধটা এমনিতেই কিঞ্চিৎ বাঁকা। ঘাড় কুঁজো করে হাঁটে ফড়ু।
বারান্দাটায় বসে একটু দূরের দিকে চোখ ফেলল ফড়ু। ঝাপসা দৃষ্টিতে ভেসে আসছে নোনাদীঘির মাঠের খেজুরগাছগুলি। মিহি পাতাগুলি হাওয়াতে ফিনফিন করে নড়ছে। এ গাছগুলোর ‘ঘাটিমারা’ হয়ে গেছে। নিয়ম মতো ‘ঘাটিমারা’র দু-চার দিন পর ‘লাগান’ শুরু হয়ে যায়। ‘লাগান’ শুরু হলেই ফড়ুর চোখমুখ পাল্টে যায়। খেজুরপাতার ‘জিভ’ দিয়ে টসটস করে রস ঝরার মতো তার চোখমুখ দিয়ে আনন্দ ঝরে পড়ে। বাড়িতেও তোড়জোড় শুরু হয় চরমে। তানজুর তখন আঁচল গোঁজারও সময় নেই। এক পালা ঠিলি মাজতে মাজতে তার হাতে ঘটা পড়ে যায়। মাজা-পিঠ লেগে যায়। সারাদিন গনগনে আখার পাড়েই পড়ে থাকতে হয় তাকে। একটা কড়াইয়ে কুড়ি ঠিলি গাছারস ঢালতে হয়। তারপর টানা তিন ঘণ্টা ধরে চলে জ্বালান দেওয়ার পর্ব। জ্বাল দিয়ে জ্বাল দিয়ে গরম করেই যেতে হয়। মাঝে মধ্যে লোহার মস্ত বড় ছাঁকনি দিয়ে ‘গাঁদ’ তুলে ফেলতে হয়। কড়াইয়ে সাদা ফ্যানার মতো ‘গাঁদ’ জমতে শুরু করলেই তানজুর মুখটা চিরিক করে হেসে ওঠে। মনে ছলাৎ করে নেচে ওঠে খুশির ঢেউ। সন্তান ভূমিষ্ট হলে যেমন মায়ের চোখে-মুখে একটা অদ্ভূত খুশির ঝিলিক খেলে যায়, ঠিক তেমনই হয়ে ওঠে তানজুর চোখ-মুখ। ছাঁকনি দিয়ে ‘গাঁদ’ তুলে ফেলতে তার আলাদা একটা আনন্দ লাগে। যদিও এ ছাঁকনি জব্বর ভারি। সাদা গাঁদ তুলে ফেলতেই চোখে পড়ে পুড়া বাদামি লালচে রঙের ঢলঢলে লাপ্টো গুড়। তানজু তখন যেন তার গরম ভাপে ঝলসানো চোখে দেখে তার গর্ভজাত সন্তান। তখন তার চোখ থেকে ঠিকরে বের হয় খুশির দ্যুতি। তখন কাজের প্রতি আরও জোর আসে। আরও গতর হেলায়। তারপর চলে ঠেংনে দিয়ে গুড়ের ‘বিচমারা’। তখন কড়াই ফুটে ছুটতে থাকে টাটকা গুড় পুড়ার মিস্টি গন্ধ। এরকম এক কড়াই রস থেকে দশ কেজি গুড় তৈরি হয়। সে গুড় রাখার জন্যও থাকে আলাদা মাটির হাঁড়ি। বড় বড় ভাঁড়।
ফড়ু ভাবে, এই গাছগুলোয় এতদিন ‘লাগান’ হয়ে যেত। কত রসই না দিত গাছগুলো। রসে রসে উপচে পড়ত ঠিলি। তারপর শুরু হত তিনদিনের ‘শুকান’ পর্ব। তারপর যে রস বের হয়, তার চাহিদা খুউব। একে বলে ‘শুকান কাঠের রস’। ‘শুকান কাঠের রস’ অবশ্য তার বাড়িতে কমই যায়। বেশিরভাগই গাছমালিকদের দিয়ে দিতে হয়। তারা খাওয়ার জন্য নেন। ‘শুকান কাঠের রস’ নাকি সবথেকে ভালো। মিস্টি। সুস্বাদু। ফড়ু নেংটি মেরে তড়বড় করে কুয়াশাঢাকা গাছে উঠে পড়ে। ভোরের আধো অন্ধকারে তাকে তখন গাছে একটা বাঁদরের মতো লাগে। নেংটির লুঙ্গিটা পাছার ফাঁকে ঢুকে পড়ে দুই পাশের দুটো আব বের হয়ে পড়ে। কোমরে বাঁধা হুক থেকে ঝুলে পড়ে রসভরতি ঠিলি। ফড়ু যখন এই রসভরতি ঠিলি নিয়ে নীচে নামে তখন টলতে টলতে কিছুটা রস উপচে পড়ে। এভাবে তিন-চারটে গাছের রস ভরতি ঠিলি একজায়গায় জড়ো হলে, বাঙ্গির দুই মুখে ঠিলিগুলো ঠিলির মুখে বাঁধা দড়ি দিয়ে কাঁধে ঝুলিয়ে নেয় ফড়ু। তারপর থপথপ করে হাঁটা ধরে বাড়ির দিকে। ঠিলিতে ঠিলিতে ঠক্কর লাগে। ঘষা খায়। কিছু রস উপচে পড়ে।
ফড়ুর ভিতরটা হুহু করে ওঠে। ভিতরে ভিতরে কাঁদনের হাওয়া পাক খায়। নাড়ি –ভুঁড়িতে মোচড় লাগে। তার ভাঙা পা’টার ওপর তার বড্ড রাগ হয়। মনে মনে খচে ওঠে ফড়ু। ভাঙার আর সময় পেল না? আর কটা মাস পড়ে ভাঙলেই পারত? আল্লাও ভাঙার জন্য এই গরীবের পা’টাই পেলেন! তাঁরও তো একবার মুখতুলে তাকানো উচিৎ ছিল?
তিন.
অঘ্রান মাস চলে গেল! পৌষের শীত গায়ে কাঁটা দিচ্ছে। ঠাণ্ডা ক্রমশ জেঁকে বসছে। সকাল-সন্ধ্যায় জমাট বাঁধছে কুয়াশা। ফড়ুর পা এখনও সেভাবে সেরে ওঠেনি। ডাক্তার বলেছেন, এখনও দশ দিন প্লাস্টার খোলা যাবে না। এদিকে বাড়িতে বসে থেকে বসে থেকে ফড়ুর ভিতরটাও চিড়বিড় করে উঠছে। নিজের প্রতি নিজেই বিরক্ত হয়ে উঠছে। রাতদিন ভূতের মতো খাটা মানুষকে টানা দুমাস ধরে উঠোন আর ঘর, ঘর আর উঠোন করে কাটাতে হচ্ছে! মাঝে মাঝে ফড়ুর মনে হচ্ছে, দা দিয়ে পা’টা কেটেই ফেলি। আর সহ্য হচ্ছে না। পা শরীরকে বইবে তা না তো শরীরকে বইতে হচ্ছে পা!
দাওয়ায় মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে তানজু। গা-হাত-পা’র বিচ্ছিরি অবস্থা। পরনের ছাপা কাপড়টাও তেলে চ্যাটচেটে। বয়সের তুলনায় চেহারায় বয়সের ছাপ অনেকটাই বেশি। অথচ এই তানজুর বিয়ের সময় গা-গতর ছিল হৃষ্টপুষ্ট। পান পাতার মতো মুখের গড়ন। পটল ফালির মতো চোখ। কাঁচা হ্লুদের মতো গায়ের রঙ। মাথায় আড়েবহরে ফড়ুর সমানই লম্বা। কুঁচি করে শাড়ি পড়লে যার তার লোভ হত। সে মেয়ের আজ চিন্তায় চিন্তায় হাড়গিলে অবস্থা! চোখগুলো খুঁটোলে ঢুকে গেছে! গায়ের রঙও পুড়ে তামাটে।
“কী অত চিন্তা কচ্ছো?” জিজ্ঞাসা করল ফড়ু।
“কই কিচ্ছু না তো।“ নিজেকে লুকোনোর চেষ্টা করল তানজু। ফড়ু জানে, চিন্তা করার বিস্তর কারণ আছে। যতই হোক হেঁসেলের হাঁড়ি তো তার হাতেই। সেইই তো এতদিন ধরে সংসারের খুঁটি ধরে আছে। গত দু মাস ধরে একটা টাকাও বাড়িতে ঢোকেনি। একটা পয়সাও রোজগার হয়নি। ধারদেনা করে চলছে। বাড়ি-হাসপাতাল করতে করতেই গাঁটের পয়সা শেষ। গরিব মানুষকে রোগে ধরলে, তাকে না খাওয়া অবদি থামে না। একেবারে নিঃশেষ করেই ছাড়ে। পারলে তার হাড়গুলোকেও চিবিয়ে খায়।
“আমি কি কিছুই বুঝি ন্যা ভাবো, তুমার ওপর দিয়ি কি ঝড় বহি যাচ্ছে, তা কি আমি টের পাচ্ছি ন্যা? এই ক-মাস তো তুমাকে অ্যাকাই সংসারের জুয়াল টানতে হচ্ছে! খাটতে খাটতে তুমার চোখ-মুখ কেলচে হয়ি গেছে!“ কথাগুলি বলল ফড়ু। এই ক দিনে ফড়ুর চেহারারও হাড়গিলে অবস্থা! কালো কুচকুচে শরীরটার আরও কেলঠে অবস্থা! চোখের মণিদুটো ঠিকরে বের হয়ে আসছে! চামটা পেট পাকানো দড়ির মতো আরও দুমড়ে গেছে!
“বছরডা কী করি চালাব, তাই ভাবছি গো!ঘরে তো আর কিছুই মজুদ নাই! তুমার দায়ে সব শেষ!” দুখ কাঁদে তানজু। ভবিষ্যতের কথা ভেবে তার মাথা গুলিয়ে যাচ্ছে। বাড়ির একমাত্র খাটনে মানুষটা কবে থেকেই অচল। সেও বাড়িতে হাত গুটিয়ে বসে আছে। স্বামীর কাজ থেকে সেও কাজ পেত। স্বামীটা তো ঠিলি ঠিলি রস বাড়িতে পৌঁছে দিয়েই খালাস, জ্বাল দিয়ে গুড় তৈরি করার ঠেলাটা তো তাকেই পোহাতে হয়? ঠিলি মাজা, ঘণ্টার পর ঘণ্টা জ্বাল দেওয়া, গাঁদ তোলা, গুড় বাসানো সবই তাকে এক হাতে সামলাতে হয়! কপালের ঘাম পায়ে ফেলা হাড়খাটুনির সে মেয়েটার এখন হাতে কোনও কাজ নেই! শুধু শুয়ে বসে দিন কাটাতে হচ্ছে। তানজু অন্য মেয়েদের মতো বিড়ি বাঁধা বা কাঁথা সেলাইয়ের কাজও জানে না। সে সবে হাতে খড়ি থাকলে স্বামীর এই দুঃসময়ে আকালের সংসারে কিছুটা হিল্লে দেওয়া যেত? মরসুমের শুরুতেই স্বামীটা অক্ষম! যাকে বলে, বহনির খ্যাপেই হুমড়ি খাওয়া! এই পাঁচ মাসে মেয়ে-মরদে দিন-রাত খেটে সারা বছরের পেটের অনেকটা খোরাক উপার্জন করে নেয়। তাছাড়া এখন বাজারে নলেন গুড়ের চড়া দাম। চাহিদা বেশি, উৎপাদন কম। আগের মতো এখন আর সেভাবে গুড় উৎপাদন হয় না। গাছালদের সংখ্যা দিনের দিন কমছে। গাছে চড়া মানুষ আর কই? দিনের দিন রুজি-রোজগারের পরিসর বাড়ছে। কাজের ফাংড়িও মেলা। সেসব কাজে পয়সাও বেশি। এখন শরীর খাটানোর চেয়ে মাথা খাটানোর কাজও বিস্তর। মানুষ সেসব দিকেই বেশি ঝুঁকছে।
তানজু ভেবেছিল, স্বামীর এই দুঃসময়ে বাপের কাছে হাত পাতবে। কিন্তু বুড়ো বাপটারও দিন আনে দিন খায় অবস্থা! তিন কূলেও কোনও জমিজিরেত নেই। গাঁয়ে-গঞ্জে কাঁচা সবজি ফেরি করে বেড়ান। অমনি করেই তিন মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। তানজু বাড়ির মেজো মেয়ে। এদিকে ফড়ুরাও দুই তরফ। তার বাপের দুই বিয়ে। ফড়ুরা তাদের তরফে পাঁচ বোন এক ভাই। অন্য তরফে কোনও ভাই নেই। চারটে বোন। তার সতার মা অনেকদিন আগেই মারা গেছেন। তার নিজের মায়ের মরাও বছর দুয়েক হয়ে গেল। বাপটা সব আগেই ইন্তেকাল করেছেন। ফলে তার বাপের যা দু এক বিঘে জমিজিরেত ছিল, তা কবেই ভাগবাটোয়ারা হয়ে শেষ হয়ে গেছে। ফলে ফড়ুর কোনও কূলেই কোনও কিছু পাওয়ার নেই। জমিজিরেত বলতে গেলেও এই শরীরটা, সম্পদ বলতে গেলেও এই শরীরটা। এই শরীরটায়ই তাদের ক্ষেতি, তাদের আবাদে জমি। তাদের রুটিরুজির উৎস। আর সে শরীরটারই এখন তিন পা অবস্থা! ছেলেটাও এখনও খাটনে হয়ে ওঠেনি। সবে বারো ক্লাসে উঠল। সাকিল তাদের একলোতা সন্তান। অনেক ঘাট ঘাঁটার ফল। কোনোভাবেই তানজুর পেটে ফুল আসছিল না। অনেক গাছগাছড়া খেয়ে, কবিরাজ-ওঝা দেখিয়ে, তাবিজ-কবোজ নিয়েও কোনও কিছুতেই কিছু হচ্ছিল না। শেষে কলকাতার বড় ডাক্তার দেখিয়ে সুফলটা মেলে। কিন্তু ওইই শেষ, আর নতুন করে কোনও খবর হয়নি।
আচমকা ‘ধপাস’ করে একটা কিছু পড়ার শব্দ হল! সঙ্গে ‘কঁক’ করে একটা আওয়াজ! তানজু তড়াক করে লাফিয়ে উঠে দেখে, ফড়ু ছঞ্চেতে মুখ থুবড়ে পড়ে গেছে! এতক্ষণ মাটির দাওয়ায় পা ঝুলিয়ে বসে ছিল। বুঁ করে মাথা ঘুরে এই অবস্থা। শরীরটা এমনিতেই খুব দুর্বল। চিখড়িয়ে উঠল তানজু। মায়ের গলার বিকট আওয়াজ শুনে ঘর থেকে হুড়মুড় করে বেরিয়ে এল সাকিল,“কী হয়েছে, মা?”
“তোর আব্বা মাথা ঘুরি পড়ি গেছে! অজ্ঞ্যান হয়ী গেছে মুনে হয়। তাড়াতাড়ি পানি লিয়ি আয়। মাথায় ঢাইলতে হবে। ও আল্লা গো, অ্যা আমার কি সব্বনাশ হল গো!” হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে তানজু। সাকিল তড়বড় করে বদনায় করে জল আনে। বদনাটা মা’র হাতে দিয়ে টিউবওয়েল থেকে বড় বালতির আরও এক বালতি জল আনে। মা-বেটাতে বাপের মাথায় জল ঢেলেই যায়। কিছুক্ষণের মধ্যেই জ্ঞান ফেরে ফড়ুর। ভারি চোখদুটো মিহি করে খোলে। ঝাপসা দৃষ্টিতে ভেসে ওঠে বউ-বেটার করুণ মুখ। নিকটজন ছেড়ে চলে যাওয়ার যন্ত্রণা। জ্ঞান ফিরতে দেখে মা-বেটা কিছুটা সস্থির নিশ্বাস ফেলে।
তানজু দাওয়ায় শপ পেড়ে সাট করে শুইয়ে দেয় স্বামীকে। তালপাতার পাখা দিয়ে সড়সড় করে হাওয়া করে। সাকিল বাপের পায়ের কাছে ল্যাটা মেরে বসে। সেও একটু একটু টের পাচ্ছে, এই কালোভূতে, হাড়গিলে বাপটা মরে গেলে সংসারটা উচ্ছেন্নে যাবে। তারা মা-বেটা অথৈ সমুদ্রে পড়ে যাবে। এর বাড়ি অর বাড়ি চেহে-চামচে, দুখ করে বেঁচে থাকতে হবে। আর তানাহলে না খেয়ে না খেয়ে মরতে হবে।
তানজু ছেলেকে উদ্দেশ্য করে বলল, “সাকিল, নারকেল গাছে উঠতে পারবি?”
তানজুর কথাটা ফড়ুর কানে চড়াম করে বাজল। বড় করে চোখ খুলল সে। ভাবল, কী বলছে তানজু! অর মাথা ঠিক আছে তো? যে ছেলেকে একটা সামান্য আম গাছে উঠতে দেয় না, তাকেই বলছে নারকেল গাছে উঠতে!
“হ্যাঁ পারব।“ বলল সাকিল।
তানজু বলল, “তাহইলে তোর আব্বার লেগি দুইটি ডাব পেড়ি দে। ডাবের পানি শরিলের পক্ষে খুউব ভালো। ঠাণ্ডা। গায়ে জোর পাবে।“
মা’র কথা শুনে সাকিল শপ থেকে তাড়াহুড়ো করে উঠে পড়ল। চালের ছাউনির গোঁজা থেকে বের করল পাশনিটা। তারপর গটগট করে হেঁটে নারকেলগাছ তলায় গেল। পাশেই রাখা ছিল গাছে ওঠার ছাঁন’টা। প্রথমে পরনের লুঙ্গিটা ভালো করে গিঁট বেঁধে নিল। তারপর পোক্ত করে নেংটি মারল। এরপর ছাঁন’টাকে ভালো করে পায়ে জড়িয়ে নিল। তার গাছে ওঠার আগের প্রস্তুতি দেখে মনে হচ্ছে যেন ছোট্ট সাকিল নয়, অভিজ্ঞ ফড়ুই সাজছে। সে অনেকদিন তার বাপকে গাছে উঠতে দেখেছে। তাছাড়া তার শরীরে তো বয়ছেই গাছালের রক্ত।
সাকিল পায়ে ছাঁন লাগিয়ে, কোমরে পাশনি গুঁজে খপ খপ করে নারকেল গাছে উঠতে লাগল। বেটার কীর্তি ঝাপসা চোখে দেখতে লাগল ফড়ু। তার ভিতরে যেমন একটা ভয় কাজ করছে, ঠিক তেমনই আলাদা একটা আনন্দও ঠিকরে বের হচ্ছে। আহ্লাদিত হয়ে উঠছে তার শরীরের কলকব্জা। ফড়ু তার ঝাপসা চোখে দেখছে, এই বংশের একমাত্র ভবিষ্যত তার বংশের ঐতিহ্যকে গ্রহণ করছে। বংশের পরম্পরাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। সে জানে, তার কাছে ‘গাছাল’ পদবিটা তার অলংকার। তার ভূষণ। তার গর্ব, অহংকার।
ফড়ুর ভিতরটা ছটফট করছে। তার ইচ্ছে হচ্ছে, তার মরহুম বাপ তাকে যেমনভাবে প্রথম গাছে ওঠার তালিম দিয়েছিলেন, তিনিও গাছের নীচে দাঁড়িয়ে থেকে তার একমাত্র সন্তান, এই বংশের একমাত্র প্রদীপকে গাছে ওঠার কলাকৌশল শিখিয়ে দেবে। গাছের নীচ থেকে গলা হামলে হামলে শুধরে দেবে ভুলগুলো। শিখিয়ে দেবে, কীভাবে খামচে খামচে ধরতে হয় গাছের ছাল, গাছের গুঁড়ি। কীভাবে ছাঁনের ভিতর পুরে রাখতে হয় পা। কীভাবে বুকের ভর দিতে হয়। কীভাবে দুই হাত দিয়ে বাগড়ে ধরতে হয় গাছ। কিন্তু তার সে উপায় নেই। তবুও তার আনন্দ আর বাগ মানছে না। গা-গতর খিলখিল করে উঠছে। সে দেখতে পাচ্ছে, তার সেই ছোট্ট বেলার দৃশ্য, সে নেংটি মেরে এই নারকেলগাছটাইই উঠছে আর তার আব্বা নীচ থেকে বলছেন, ‘সাবধানে ফড়ু, সাবধানে, পা ফসকে না যায় যেন’!
এসব ভাবতে ভাবতে হুট করে ফড়ুর মুখ ফুটে বের হয়ে এল, “সাবধানে সাকিল, সাবধানে, পা ফসকে না যায় যেন’!
ফড়ুর বাড়ির সামনেই পাতান সেখের ভিটে। পুরনো আমলের গেরস্ত বাড়ি। বনেদি বাড়িটার পিছনেই একটা বিশাল আচোট। পাশেই একটা গভীর পুকুর। পুকুরের পাড়লাগা উনিশটা খেজুর গাছের সারি। গাছগুলোর একটাও এখনও ‘ছাড়ান’ হয়নি! মাথাগুলো পাতায় ঝোপ বেঁধে আছে। অথচ প্রতি বছর এই সময় গাছগুলোই ‘ঘাটিমারা’ চলে। ফড়ু তার মাটির বারান্দাটায় বসে পিটপিট করে খুঁটোল চোখ দিয়ে গাছগুলোকে দেখছে আর ভিতরে ভিতরে ছটফট করছে। যেন গাছগুলো তাকে ডাকছে। গাছগুলো তার আত্মীয়। দায়েদি। সুখদুখের সাথী। এই গাছকে আঁকড়েই তো তার গা-গতরের বেড়ে ওঠা? সে যখন গাছে থাকে তখন অদ্ভুত একটা গন্ধ টের পায়। তার পূর্ব পুরুষদের গন্ধ। তার বংশের গন্ধ। যেন নাড়ির টান। রক্তের বাঁধন। ফড়ু তখন শুধু মানুষ নয়, একটা গাছও। গাছটাও একটা মানুষ হয়ে ওঠে। গাছে মানুষে তখন অনেক কথা হয়। গল্প হয়। একে অপরকে ধরে বাঁচে। শ্বাস নেয়। গাছের ছালে জড়িয়ে থাকে সুখ।
সাইকেলটা কচ করে এসে থামল বারান্দাটার সামনে। ফড়ুর বাড়িটা একেবারে রাস্তার ছমুতে। মাটির দেয়াল। টালির ছাউনি। দু- খোপ ঘর। এক শীতেন উশরার নিচেই ঘিঞ্জি উঠোন। এই উঠোনের একপাশ জুড়ে ঢাউস আকারের দু দুটো আখা। গুড় বানানোর ভাটি। মুখ উপুড় করে রাখা আছে শ-খানেক মাটির ঠিলি। আখার গা লেগে সটান ধনুকের মতন বেঁকে উঠে গেছে একটা পাকা ঝুন নারকেল গাছ।
“ফড়ু তুমার পায়ের অবস্থা এখন ক্যামুন? হাঁটতে চলতে পাচ্ছ?”
সাইকেল থেকে নেমেই কথাগুলি বললেন হারেজ মাহান্ত। পরনে ঢিলা পাজামা। গায়ে ধবধবে সাদা পাঞ্জাবি। মাথায় সাদা-কালো বাবরি চুল। সেটেলমেন্ট অফিসে মোহরির কাজ করেন।
“হাঁটতে আর পাচ্ছি কই? কুনুরকমে বাঁশে ভর দিয়ি দু অ্যাক পা ফেলতে পাচ্ছি। ভিতরের হাড়্গুলান দুমড়ি মুচড়ি ভেঙি গেছে! অ কি আর দু পাঁচ দিনে সারবে?” ধুকাতে ধুকাতে বলল ফড়ু।
“তাহলে আমার গাছগুলেনের কী হবে! সেই তো ছাড়িয়ে আসলা, এখনও চাঁছাই হয়নি! গাছগুলান ক্যামুন ন্যাড়া ন্যাড়া লাগছে। অমনি করিই কি পড়ি থাকবে? অর কি কুনু বিহিত হবে না?”
হারেজ মাহান্তর গলায় দুশ্চিন্তা। উঁচুডিহির মাঠে তার ছ-খানা খেজুর গাছ আছে। প্রতি বছর গাছ পিছু তিন-চার কেজি গুড় পান। এই গুড় দিয়ে পিঠে-পুলি, ক্ষির-পায়েস, নাড়ু-মণ্ডা, জামায় খাওয়া সবই হয়ে যায়। এ বছর ফড়ুর যা হাবভাব তাতে গুড় চোখে দেখতে পাবেন কি না সন্দেহ আছে।
হারেজ মাহান্ত বললেন, “তুমার ছেলেডা তো বেশ লাগদানা হয়ছে, মাথা চাড়া দিয়ি উঠিছে বেশ। অকে না হয় এবছরটা ভিড়াও। এ বছর দিয়েই না হয় অর গাছ লাগানোর বহনি হোক।“
ফড়ু বলল, “উ ছেলি ই পানে আসতে চায় না হারেজভাই, উ ল্যাখাপড়া কচ্ছে। ছেলির মা ছেলিকে ই ছমুই হতে দেয় না। বুলে, চাষার ব্যাটা চাষা, গাছালের ব্যাটা গাছাল হবে, তার কি কুনু মানে আছে? খাটলেই কপাল পালঠানো যায়। আমার অ্যাকলোতা ছেলিকে গাছে গাছে চড়ি ব্যাড়াতে দিব না। উ ল্যাখাপড়া শিখি মানুষ হবে। শিক্ষাতু হবে। বাপ-দাদোর মুতন গাছে গাছে বাঁদরের মুতন ঝুলি ব্যাড়াবে না।“
“তুমি বুলছ কি ফড়ু! গাছালের কাজ তুমাদের বংশের ঐতিহ্য। বাপ-দাদোর ঘরানা। ই কাজ তুমাদের রক্তে। গায়ে-গতরে। ই কাজ তুলি দিলে তুমার পূর্বপুরুষদের অকল্যাণ হবে! তাদের আত্মা কষ্ট পাবে! তাদের নামগন্ধ মাটিতে মিশি যাবে!”
“কী আর করব বলুন, আমারও তো কষ্ট হয়, বংশের পেশাটা ই বাড়ি থেকি উঠি যাবে! কিন্তু এখুনকার ছেলিপিলি ই লাইনে আসতে চাহাছে না। তাদের সামনে এখুন মেল্লা পথ। এত্ত খেটনের পথে ক্যানই বা আসবে?”
“দেখি, অঘ্রান মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করি। তুমার পা’টা সেরি উঠুক। তাছাড়া তো আর কুনু উপায় নাই।“ কথাগুলি বলে সাইকেলটা নিয়ে বেরিয়ে গেলেন হারেজ মাহান্ত। তিনি তো তাও অঘ্রান মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করবেন বলে গেলেন, ঘাটপাড়ার সাদেক খাঁ তো অন্য কথা শুনিয়ে গেছেন। ‘ঘাটিমারা’ না হলেই, গাছগুলো কেটে ফেলবেন! তা দিয়ে ইটভাটায় ইট পুড়াবেন। খেজুর গাছ দিয়ে খুব ভালো ইট পুড়ানো যায়। ইটের রঙ হয় টকটকে লাল! খরচও কম পড়ে। নিজের ভুঁইয়ের মাটি, নিজের খেজুর গাছ, খরচের বালায়ই নেই। এমনিতেই এখন খেজুর গাছের সংখ্যা অনেক কম। পুরনো গাছ খুউব বেশি নেই। নতুন গাছও আর সেরকম হচ্ছে কই? আগের মতন সেই বুন-বাঁদাড়ও নেই, সেই আচষা আচোটও নেই। জমির পগারে পগারে ভাঁট-পিটুলির জঙ্গল ছিল। আর সেই জঙ্গলে মাথা চাড়া দিয়ে উঠত বুনো খেজুর। এখন সেসবও ক্ষেতি জমি। চাষ-আবাদের ভুঁই। এখন গাছ থাকা বলতে গেলে, বাড়ির আন্টায়-কান্টায় কিছু আর পুকুর-ঘাটের পাড়ে ইতস্তত কিছু ছড়িয়ে ছিটিয়ে।
বারান্দাটায় পাছা ঠেকিয়ে হেলান দিয়ে বসল ফড়ু। বগলের স্ট্রেচারটা ঠেকা দিয়ে ভাঙা পা’টা কে আলতো করে সাট করল। দেখল, কতটা যন্ত্রণা করছে। সেরে উঠতে কতদিন লাগতে পারে। রোদ-বৃষ্টিতে হাড় খাটুনির শরীর। এ তো মোমের মতো সহজেই গলে যাওয়ার নয়? ইস্পাতের মতো পোক্ত। পুড়া হাঁড়ির মতো চিমটে। এ শরীরকে কি সহজে কাবু করতে পারে?
যন্ত্রণাটা এখনও টাটকা হয়েই আছে, বুঝল ফড়ু। একটু নড়ালেই কনকন করে উঠছে। বিকেলের রোদ তার চোখেমুখে এসে পড়ছে। রোদ পুড়া চামটা মুখটা আরও যেন কালচে হয়ে গেছে। দুই চোখের নীচে কালশিটের দাগ। গালে খোঁচা খোঁচা কাঁচা-পাকা দাড়ি। ঝাঁকড়া কটা-পাকা চুল। কাঁধে বাঙ্গির ঘটা। বাঙ্গিতে করে রসের ঠিলি বহে বহে কাঁধটা এমনিতেই কিঞ্চিৎ বাঁকা। ঘাড় কুঁজো করে হাঁটে ফড়ু।
বারান্দাটায় বসে একটু দূরের দিকে চোখ ফেলল ফড়ু। ঝাপসা দৃষ্টিতে ভেসে আসছে নোনাদীঘির মাঠের খেজুরগাছগুলি। মিহি পাতাগুলি হাওয়াতে ফিনফিন করে নড়ছে। এ গাছগুলোর ‘ঘাটিমারা’ হয়ে গেছে। নিয়ম মতো ‘ঘাটিমারা’র দু-চার দিন পর ‘লাগান’ শুরু হয়ে যায়। ‘লাগান’ শুরু হলেই ফড়ুর চোখমুখ পাল্টে যায়। খেজুরপাতার ‘জিভ’ দিয়ে টসটস করে রস ঝরার মতো তার চোখমুখ দিয়ে আনন্দ ঝরে পড়ে। বাড়িতেও তোড়জোড় শুরু হয় চরমে। তানজুর তখন আঁচল গোঁজারও সময় নেই। এক পালা ঠিলি মাজতে মাজতে তার হাতে ঘটা পড়ে যায়। মাজা-পিঠ লেগে যায়। সারাদিন গনগনে আখার পাড়েই পড়ে থাকতে হয় তাকে। একটা কড়াইয়ে কুড়ি ঠিলি গাছারস ঢালতে হয়। তারপর টানা তিন ঘণ্টা ধরে চলে জ্বালান দেওয়ার পর্ব। জ্বাল দিয়ে জ্বাল দিয়ে গরম করেই যেতে হয়। মাঝে মধ্যে লোহার মস্ত বড় ছাঁকনি দিয়ে ‘গাঁদ’ তুলে ফেলতে হয়। কড়াইয়ে সাদা ফ্যানার মতো ‘গাঁদ’ জমতে শুরু করলেই তানজুর মুখটা চিরিক করে হেসে ওঠে। মনে ছলাৎ করে নেচে ওঠে খুশির ঢেউ। সন্তান ভূমিষ্ট হলে যেমন মায়ের চোখে-মুখে একটা অদ্ভূত খুশির ঝিলিক খেলে যায়, ঠিক তেমনই হয়ে ওঠে তানজুর চোখ-মুখ। ছাঁকনি দিয়ে ‘গাঁদ’ তুলে ফেলতে তার আলাদা একটা আনন্দ লাগে। যদিও এ ছাঁকনি জব্বর ভারি। সাদা গাঁদ তুলে ফেলতেই চোখে পড়ে পুড়া বাদামি লালচে রঙের ঢলঢলে লাপ্টো গুড়। তানজু তখন যেন তার গরম ভাপে ঝলসানো চোখে দেখে তার গর্ভজাত সন্তান। তখন তার চোখ থেকে ঠিকরে বের হয় খুশির দ্যুতি। তখন কাজের প্রতি আরও জোর আসে। আরও গতর হেলায়। তারপর চলে ঠেংনে দিয়ে গুড়ের ‘বিচমারা’। তখন কড়াই ফুটে ছুটতে থাকে টাটকা গুড় পুড়ার মিস্টি গন্ধ। এরকম এক কড়াই রস থেকে দশ কেজি গুড় তৈরি হয়। সে গুড় রাখার জন্যও থাকে আলাদা মাটির হাঁড়ি। বড় বড় ভাঁড়।
ফড়ু ভাবে, এই গাছগুলোয় এতদিন ‘লাগান’ হয়ে যেত। কত রসই না দিত গাছগুলো। রসে রসে উপচে পড়ত ঠিলি। তারপর শুরু হত তিনদিনের ‘শুকান’ পর্ব। তারপর যে রস বের হয়, তার চাহিদা খুউব। একে বলে ‘শুকান কাঠের রস’। ‘শুকান কাঠের রস’ অবশ্য তার বাড়িতে কমই যায়। বেশিরভাগই গাছমালিকদের দিয়ে দিতে হয়। তারা খাওয়ার জন্য নেন। ‘শুকান কাঠের রস’ নাকি সবথেকে ভালো। মিস্টি। সুস্বাদু। ফড়ু নেংটি মেরে তড়বড় করে কুয়াশাঢাকা গাছে উঠে পড়ে। ভোরের আধো অন্ধকারে তাকে তখন গাছে একটা বাঁদরের মতো লাগে। নেংটির লুঙ্গিটা পাছার ফাঁকে ঢুকে পড়ে দুই পাশের দুটো আব বের হয়ে পড়ে। কোমরে বাঁধা হুক থেকে ঝুলে পড়ে রসভরতি ঠিলি। ফড়ু যখন এই রসভরতি ঠিলি নিয়ে নীচে নামে তখন টলতে টলতে কিছুটা রস উপচে পড়ে। এভাবে তিন-চারটে গাছের রস ভরতি ঠিলি একজায়গায় জড়ো হলে, বাঙ্গির দুই মুখে ঠিলিগুলো ঠিলির মুখে বাঁধা দড়ি দিয়ে কাঁধে ঝুলিয়ে নেয় ফড়ু। তারপর থপথপ করে হাঁটা ধরে বাড়ির দিকে। ঠিলিতে ঠিলিতে ঠক্কর লাগে। ঘষা খায়। কিছু রস উপচে পড়ে।
ফড়ুর ভিতরটা হুহু করে ওঠে। ভিতরে ভিতরে কাঁদনের হাওয়া পাক খায়। নাড়ি –ভুঁড়িতে মোচড় লাগে। তার ভাঙা পা’টার ওপর তার বড্ড রাগ হয়। মনে মনে খচে ওঠে ফড়ু। ভাঙার আর সময় পেল না? আর কটা মাস পড়ে ভাঙলেই পারত? আল্লাও ভাঙার জন্য এই গরীবের পা’টাই পেলেন! তাঁরও তো একবার মুখতুলে তাকানো উচিৎ ছিল?
তিন.
অঘ্রান মাস চলে গেল! পৌষের শীত গায়ে কাঁটা দিচ্ছে। ঠাণ্ডা ক্রমশ জেঁকে বসছে। সকাল-সন্ধ্যায় জমাট বাঁধছে কুয়াশা। ফড়ুর পা এখনও সেভাবে সেরে ওঠেনি। ডাক্তার বলেছেন, এখনও দশ দিন প্লাস্টার খোলা যাবে না। এদিকে বাড়িতে বসে থেকে বসে থেকে ফড়ুর ভিতরটাও চিড়বিড় করে উঠছে। নিজের প্রতি নিজেই বিরক্ত হয়ে উঠছে। রাতদিন ভূতের মতো খাটা মানুষকে টানা দুমাস ধরে উঠোন আর ঘর, ঘর আর উঠোন করে কাটাতে হচ্ছে! মাঝে মাঝে ফড়ুর মনে হচ্ছে, দা দিয়ে পা’টা কেটেই ফেলি। আর সহ্য হচ্ছে না। পা শরীরকে বইবে তা না তো শরীরকে বইতে হচ্ছে পা!
দাওয়ায় মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে তানজু। গা-হাত-পা’র বিচ্ছিরি অবস্থা। পরনের ছাপা কাপড়টাও তেলে চ্যাটচেটে। বয়সের তুলনায় চেহারায় বয়সের ছাপ অনেকটাই বেশি। অথচ এই তানজুর বিয়ের সময় গা-গতর ছিল হৃষ্টপুষ্ট। পান পাতার মতো মুখের গড়ন। পটল ফালির মতো চোখ। কাঁচা হ্লুদের মতো গায়ের রঙ। মাথায় আড়েবহরে ফড়ুর সমানই লম্বা। কুঁচি করে শাড়ি পড়লে যার তার লোভ হত। সে মেয়ের আজ চিন্তায় চিন্তায় হাড়গিলে অবস্থা! চোখগুলো খুঁটোলে ঢুকে গেছে! গায়ের রঙও পুড়ে তামাটে।
“কী অত চিন্তা কচ্ছো?” জিজ্ঞাসা করল ফড়ু।
“কই কিচ্ছু না তো।“ নিজেকে লুকোনোর চেষ্টা করল তানজু। ফড়ু জানে, চিন্তা করার বিস্তর কারণ আছে। যতই হোক হেঁসেলের হাঁড়ি তো তার হাতেই। সেইই তো এতদিন ধরে সংসারের খুঁটি ধরে আছে। গত দু মাস ধরে একটা টাকাও বাড়িতে ঢোকেনি। একটা পয়সাও রোজগার হয়নি। ধারদেনা করে চলছে। বাড়ি-হাসপাতাল করতে করতেই গাঁটের পয়সা শেষ। গরিব মানুষকে রোগে ধরলে, তাকে না খাওয়া অবদি থামে না। একেবারে নিঃশেষ করেই ছাড়ে। পারলে তার হাড়গুলোকেও চিবিয়ে খায়।
“আমি কি কিছুই বুঝি ন্যা ভাবো, তুমার ওপর দিয়ি কি ঝড় বহি যাচ্ছে, তা কি আমি টের পাচ্ছি ন্যা? এই ক-মাস তো তুমাকে অ্যাকাই সংসারের জুয়াল টানতে হচ্ছে! খাটতে খাটতে তুমার চোখ-মুখ কেলচে হয়ি গেছে!“ কথাগুলি বলল ফড়ু। এই ক দিনে ফড়ুর চেহারারও হাড়গিলে অবস্থা! কালো কুচকুচে শরীরটার আরও কেলঠে অবস্থা! চোখের মণিদুটো ঠিকরে বের হয়ে আসছে! চামটা পেট পাকানো দড়ির মতো আরও দুমড়ে গেছে!
“বছরডা কী করি চালাব, তাই ভাবছি গো!ঘরে তো আর কিছুই মজুদ নাই! তুমার দায়ে সব শেষ!” দুখ কাঁদে তানজু। ভবিষ্যতের কথা ভেবে তার মাথা গুলিয়ে যাচ্ছে। বাড়ির একমাত্র খাটনে মানুষটা কবে থেকেই অচল। সেও বাড়িতে হাত গুটিয়ে বসে আছে। স্বামীর কাজ থেকে সেও কাজ পেত। স্বামীটা তো ঠিলি ঠিলি রস বাড়িতে পৌঁছে দিয়েই খালাস, জ্বাল দিয়ে গুড় তৈরি করার ঠেলাটা তো তাকেই পোহাতে হয়? ঠিলি মাজা, ঘণ্টার পর ঘণ্টা জ্বাল দেওয়া, গাঁদ তোলা, গুড় বাসানো সবই তাকে এক হাতে সামলাতে হয়! কপালের ঘাম পায়ে ফেলা হাড়খাটুনির সে মেয়েটার এখন হাতে কোনও কাজ নেই! শুধু শুয়ে বসে দিন কাটাতে হচ্ছে। তানজু অন্য মেয়েদের মতো বিড়ি বাঁধা বা কাঁথা সেলাইয়ের কাজও জানে না। সে সবে হাতে খড়ি থাকলে স্বামীর এই দুঃসময়ে আকালের সংসারে কিছুটা হিল্লে দেওয়া যেত? মরসুমের শুরুতেই স্বামীটা অক্ষম! যাকে বলে, বহনির খ্যাপেই হুমড়ি খাওয়া! এই পাঁচ মাসে মেয়ে-মরদে দিন-রাত খেটে সারা বছরের পেটের অনেকটা খোরাক উপার্জন করে নেয়। তাছাড়া এখন বাজারে নলেন গুড়ের চড়া দাম। চাহিদা বেশি, উৎপাদন কম। আগের মতো এখন আর সেভাবে গুড় উৎপাদন হয় না। গাছালদের সংখ্যা দিনের দিন কমছে। গাছে চড়া মানুষ আর কই? দিনের দিন রুজি-রোজগারের পরিসর বাড়ছে। কাজের ফাংড়িও মেলা। সেসব কাজে পয়সাও বেশি। এখন শরীর খাটানোর চেয়ে মাথা খাটানোর কাজও বিস্তর। মানুষ সেসব দিকেই বেশি ঝুঁকছে।
তানজু ভেবেছিল, স্বামীর এই দুঃসময়ে বাপের কাছে হাত পাতবে। কিন্তু বুড়ো বাপটারও দিন আনে দিন খায় অবস্থা! তিন কূলেও কোনও জমিজিরেত নেই। গাঁয়ে-গঞ্জে কাঁচা সবজি ফেরি করে বেড়ান। অমনি করেই তিন মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। তানজু বাড়ির মেজো মেয়ে। এদিকে ফড়ুরাও দুই তরফ। তার বাপের দুই বিয়ে। ফড়ুরা তাদের তরফে পাঁচ বোন এক ভাই। অন্য তরফে কোনও ভাই নেই। চারটে বোন। তার সতার মা অনেকদিন আগেই মারা গেছেন। তার নিজের মায়ের মরাও বছর দুয়েক হয়ে গেল। বাপটা সব আগেই ইন্তেকাল করেছেন। ফলে তার বাপের যা দু এক বিঘে জমিজিরেত ছিল, তা কবেই ভাগবাটোয়ারা হয়ে শেষ হয়ে গেছে। ফলে ফড়ুর কোনও কূলেই কোনও কিছু পাওয়ার নেই। জমিজিরেত বলতে গেলেও এই শরীরটা, সম্পদ বলতে গেলেও এই শরীরটা। এই শরীরটায়ই তাদের ক্ষেতি, তাদের আবাদে জমি। তাদের রুটিরুজির উৎস। আর সে শরীরটারই এখন তিন পা অবস্থা! ছেলেটাও এখনও খাটনে হয়ে ওঠেনি। সবে বারো ক্লাসে উঠল। সাকিল তাদের একলোতা সন্তান। অনেক ঘাট ঘাঁটার ফল। কোনোভাবেই তানজুর পেটে ফুল আসছিল না। অনেক গাছগাছড়া খেয়ে, কবিরাজ-ওঝা দেখিয়ে, তাবিজ-কবোজ নিয়েও কোনও কিছুতেই কিছু হচ্ছিল না। শেষে কলকাতার বড় ডাক্তার দেখিয়ে সুফলটা মেলে। কিন্তু ওইই শেষ, আর নতুন করে কোনও খবর হয়নি।
আচমকা ‘ধপাস’ করে একটা কিছু পড়ার শব্দ হল! সঙ্গে ‘কঁক’ করে একটা আওয়াজ! তানজু তড়াক করে লাফিয়ে উঠে দেখে, ফড়ু ছঞ্চেতে মুখ থুবড়ে পড়ে গেছে! এতক্ষণ মাটির দাওয়ায় পা ঝুলিয়ে বসে ছিল। বুঁ করে মাথা ঘুরে এই অবস্থা। শরীরটা এমনিতেই খুব দুর্বল। চিখড়িয়ে উঠল তানজু। মায়ের গলার বিকট আওয়াজ শুনে ঘর থেকে হুড়মুড় করে বেরিয়ে এল সাকিল,“কী হয়েছে, মা?”
“তোর আব্বা মাথা ঘুরি পড়ি গেছে! অজ্ঞ্যান হয়ী গেছে মুনে হয়। তাড়াতাড়ি পানি লিয়ি আয়। মাথায় ঢাইলতে হবে। ও আল্লা গো, অ্যা আমার কি সব্বনাশ হল গো!” হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে তানজু। সাকিল তড়বড় করে বদনায় করে জল আনে। বদনাটা মা’র হাতে দিয়ে টিউবওয়েল থেকে বড় বালতির আরও এক বালতি জল আনে। মা-বেটাতে বাপের মাথায় জল ঢেলেই যায়। কিছুক্ষণের মধ্যেই জ্ঞান ফেরে ফড়ুর। ভারি চোখদুটো মিহি করে খোলে। ঝাপসা দৃষ্টিতে ভেসে ওঠে বউ-বেটার করুণ মুখ। নিকটজন ছেড়ে চলে যাওয়ার যন্ত্রণা। জ্ঞান ফিরতে দেখে মা-বেটা কিছুটা সস্থির নিশ্বাস ফেলে।
তানজু দাওয়ায় শপ পেড়ে সাট করে শুইয়ে দেয় স্বামীকে। তালপাতার পাখা দিয়ে সড়সড় করে হাওয়া করে। সাকিল বাপের পায়ের কাছে ল্যাটা মেরে বসে। সেও একটু একটু টের পাচ্ছে, এই কালোভূতে, হাড়গিলে বাপটা মরে গেলে সংসারটা উচ্ছেন্নে যাবে। তারা মা-বেটা অথৈ সমুদ্রে পড়ে যাবে। এর বাড়ি অর বাড়ি চেহে-চামচে, দুখ করে বেঁচে থাকতে হবে। আর তানাহলে না খেয়ে না খেয়ে মরতে হবে।
তানজু ছেলেকে উদ্দেশ্য করে বলল, “সাকিল, নারকেল গাছে উঠতে পারবি?”
তানজুর কথাটা ফড়ুর কানে চড়াম করে বাজল। বড় করে চোখ খুলল সে। ভাবল, কী বলছে তানজু! অর মাথা ঠিক আছে তো? যে ছেলেকে একটা সামান্য আম গাছে উঠতে দেয় না, তাকেই বলছে নারকেল গাছে উঠতে!
“হ্যাঁ পারব।“ বলল সাকিল।
তানজু বলল, “তাহইলে তোর আব্বার লেগি দুইটি ডাব পেড়ি দে। ডাবের পানি শরিলের পক্ষে খুউব ভালো। ঠাণ্ডা। গায়ে জোর পাবে।“
মা’র কথা শুনে সাকিল শপ থেকে তাড়াহুড়ো করে উঠে পড়ল। চালের ছাউনির গোঁজা থেকে বের করল পাশনিটা। তারপর গটগট করে হেঁটে নারকেলগাছ তলায় গেল। পাশেই রাখা ছিল গাছে ওঠার ছাঁন’টা। প্রথমে পরনের লুঙ্গিটা ভালো করে গিঁট বেঁধে নিল। তারপর পোক্ত করে নেংটি মারল। এরপর ছাঁন’টাকে ভালো করে পায়ে জড়িয়ে নিল। তার গাছে ওঠার আগের প্রস্তুতি দেখে মনে হচ্ছে যেন ছোট্ট সাকিল নয়, অভিজ্ঞ ফড়ুই সাজছে। সে অনেকদিন তার বাপকে গাছে উঠতে দেখেছে। তাছাড়া তার শরীরে তো বয়ছেই গাছালের রক্ত।
সাকিল পায়ে ছাঁন লাগিয়ে, কোমরে পাশনি গুঁজে খপ খপ করে নারকেল গাছে উঠতে লাগল। বেটার কীর্তি ঝাপসা চোখে দেখতে লাগল ফড়ু। তার ভিতরে যেমন একটা ভয় কাজ করছে, ঠিক তেমনই আলাদা একটা আনন্দও ঠিকরে বের হচ্ছে। আহ্লাদিত হয়ে উঠছে তার শরীরের কলকব্জা। ফড়ু তার ঝাপসা চোখে দেখছে, এই বংশের একমাত্র ভবিষ্যত তার বংশের ঐতিহ্যকে গ্রহণ করছে। বংশের পরম্পরাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। সে জানে, তার কাছে ‘গাছাল’ পদবিটা তার অলংকার। তার ভূষণ। তার গর্ব, অহংকার।
ফড়ুর ভিতরটা ছটফট করছে। তার ইচ্ছে হচ্ছে, তার মরহুম বাপ তাকে যেমনভাবে প্রথম গাছে ওঠার তালিম দিয়েছিলেন, তিনিও গাছের নীচে দাঁড়িয়ে থেকে তার একমাত্র সন্তান, এই বংশের একমাত্র প্রদীপকে গাছে ওঠার কলাকৌশল শিখিয়ে দেবে। গাছের নীচ থেকে গলা হামলে হামলে শুধরে দেবে ভুলগুলো। শিখিয়ে দেবে, কীভাবে খামচে খামচে ধরতে হয় গাছের ছাল, গাছের গুঁড়ি। কীভাবে ছাঁনের ভিতর পুরে রাখতে হয় পা। কীভাবে বুকের ভর দিতে হয়। কীভাবে দুই হাত দিয়ে বাগড়ে ধরতে হয় গাছ। কিন্তু তার সে উপায় নেই। তবুও তার আনন্দ আর বাগ মানছে না। গা-গতর খিলখিল করে উঠছে। সে দেখতে পাচ্ছে, তার সেই ছোট্ট বেলার দৃশ্য, সে নেংটি মেরে এই নারকেলগাছটাইই উঠছে আর তার আব্বা নীচ থেকে বলছেন, ‘সাবধানে ফড়ু, সাবধানে, পা ফসকে না যায় যেন’!
এসব ভাবতে ভাবতে হুট করে ফড়ুর মুখ ফুটে বের হয়ে এল, “সাবধানে সাকিল, সাবধানে, পা ফসকে না যায় যেন’!
লেখক পরিচিতি:
সৌরভ হোসেন
কথাসাহিত্যিক
পশ্চিমবঙ্গে থাকেন।


0 মন্তব্যসমূহ