সৈয়দ শামসুল হকের গল্প : মনোহরকে পাওয়া যাচ্ছে না


ভারি এক আশ্চর্য হয়ে গেল, মনোহরকে পাওয়া যাচ্ছে না। জলেশ্বরীতে কত লোকের নামে কত গল্প আছে, মনোহর কি একটা মানুষ? আজ দেখি তাকে নিয়েও গল্প হয়ে যায় ।

সত্যি তো সে গেল কোথায়? কাল ছিল পূর্ণিমা, পূর্ণিমা রাতে অনেকের মাথা খারাপ হয়ে যায়, সে রকম তো কিছু হয়নি মনোহরের? মনোহর একা হারানো গেলে না হয় সেই রকমই ভাবা যেত, মনোহর কি একা? সে, তার পরিবার, তার ছানাপোনা কারো কোনো পাত্তা নেই, সব যেন ভোজবাজির মতো মিলিয়ে গেছে, রেল লাইনের ধারে, শটিবনের পাড় ঘেঁষে মনোহরের যে ঝুপড়ি, সেই ঝুপড়িটা ঠনঠন করছে, মালা ঠোলা সবই পড়ে আছে, মানুষগুলো শুধু নেই ।

মণ্ডলদের বাড়িতে কামলা খাটছিল মনোহর আজ কদিন থেকে, আজ সকালে মন্ডলদের নতুন দা-খানা খুঁজে পাওয়া যায় না সেই দায়ের খোঁজেই মনোহরের খোঁজ পড়ে। মনোহর তো গতকালই মণ্ডলদের কাছ থেকে পয়সা সব বুঝে নিয়ে গেছে, হয়ত যাবার সময় দা-খানাও তুলে নিয়ে গেছে। এখন দেখা যায়, স্বয়ং মনোহরই নেই।

এগিয়ে মনোহরের খোঁজ দেখে আশপাশের ঝুপড়ি থেকে অনেকেই বেরিয়ে আসে, এগিয়ে আসে; কিন্তু কেউ কোনো খোঁজ দিতে পারে না, তারা নিজেরাও অবাক হয়ে যায়; আবার তারা অবাক হয় না, তারা নিজেরাও তো এভাবে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় একদিন ভেসে যায়, তার জন্যে তো কোনো বাদ্য বাজে না; তবু তারা চিন্তিত হয়, মনোহর গেল কোথায়? সেটা মনোহরের জন্যে যতটা নয়, তারচেয়ে নিজেদের জন্যে দুর্ভাবনায়। ঐ যে দা হারানো গেছে, ঐ দা যদি না পাওয়া যায়, তাহলে কে জানে হয়ত ঝোঁকটা এসে তাদেরই ওপর পড়বে। মণ্ডলদের দা পাওয়া নিয়ে কথা, তা যার কাছ থেকেই পাওয়া যাক, দা না পাওয়া গেলে হাতের সুখ করে নিলেও হয়, তা সে যার পিঠেই হোক। এদের বড়রা এসব ভালো করেই জানে, কেবল শিশুরা জানে না এখনো কিন্তু রক্তের ভেতরে তারাও হয়ত একটা সংবাদ পেয়ে যায়, তাই তারা কান্না থামিয়ে অবোধ দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে থাকে।

আরো একটা সাংঘাতিক গোলমালের কথা হয়ে যায়; মনোহরের খোঁজে মণ্ডলবাড়ি থেকে যারা আসে তারা প্রথমে ডাকাডাকি হাঁকাহাঁকি করে, তারপর কেউ একজন মনোহরের ঝুপড়িটা দেখিয়ে দিলে সেদিকে এগিয়ে যায়, সব টান মেরে ফেলতে থাকে, এক সময়ে তারা ঝুপড়ির চাল-টাল টেনে নামায় এবং সেই তখন ঝুপড়ির ভেতর থেকে স্পষ্ট গন্ধ পাওয়া যায়। ইলিশের গন্ধ, গরগরে রাগী গন্ধ, ভুল হবার মতো নয়, খাঁটি ইলিশ। ঝুপড়ির চাল টেনে নামানোর সঙ্গে সঙ্গে দেখা যায় মেঝের ওপর ছড়িয়ে আছে ইলিশের আঁশ ।

জলেশ্বরীতে ইলিশ আসে চালান হয়ে, ট্রেনে করে, বরফে শুয়ে। ঠাণ্ডা ইলিশ টসটসে ঘ্রাণওয়ালা ইলিশ চাঁদির মতো ঝকঝকে ইলিশ চাঁদির দামেই বিকোয় সে ইলিশ জলেশ্বরীর বাজারে এমনকি বাসি পচা ইলিশও এখানে ফেলা যায় না. কাছারী পাড়ার ভাতের হোটেলগুলো আধা দামে কিনে নিয়ে যায়. সেই ইলিশ মনোহরের ঝুপড়িতে?

মণ্ডলবাড়ির লোকগুলো আশে পাশের ঝুপড়িবাড়িদের দিকে তাকায়; তখন তারা ধীরে ধীরে সরে পড়তে থাকে, তারা জানে ইলিশটাই এখন বিপদের কথা; কি থেকে যে কি এখন হয়ে যাবে, কেউ বলতে পারে না। তারা নিজেরাও কম আশ্চর্য হয়ে যায়নি। ইলিশের আঁশ দেখে। কিন্তু তারা এই রহস্যও ভেদ করতে পারে না, যে, ইলিশ যদি মনোহর এনেই ছিল মনোহরের বৌ যখন রান্না করেছিল তখন তার ঘ্রাণ কেন পাওয়া যায়নি। ইলিশের ঝোলের ঘ্রাণ তো লুকিয়ে রাখবার মতো নয়?

ঝুপড়িবাড়িদের আশংকা সত্যি হয়, মণ্ডলবাড়ির লোকেরা মনোহরের ঝুপড়িতে আগুন লাগিয়ে দেয়। তারা বলাবলি করে। ঐ দা বিক্রি করা টাকাতেই কাল মনোহর ইলিশ কিনেছিল। তারা বিছটা খোঁজ করতে বাজারে চলে যায়, তাদের চলে যাবার সঙ্গে সঙ্গে আগুন নেভানোর জন্য ছুটোছুটি করতে থাকে লোকেরা; আগুন তারা মনোহরের ঝুপড়ির জন্য মায়া করে নেভায় না, আগুন থেকে এটা ওটা বাঁচিয়ে তারা নিজেদের ঝুপড়িতে নিয়ে যায়। সেই তখন একজন আবিষ্কার করে, ঝুপড়ির অদূরে, ঝোপের ভেতরে কাঁচা ইলিশের একটা টুকরা পড়ে আছে, যেন বেড়াল বা কিছু একটাতে ছিঁড়েছে; দেখে বোঝা যায়, আস্ত মাছটাকেই টেনে আনা হয়েছিল এই ঝোপের ভেতরে, কিছুতে খেয়ে গেছে এখন এই চিহ্নটুকু পড়ে আছে।

মণ্ডলবাড়ির লোকেরা বাজারে যায়, নানা জায়গায় জেরা করে; না দা বিক্রির খোঁজ পাওয়া যায় না; তবে তারা খবর পায় মাঝিদের পাড়ায় ছোট একটা ইলিশ তারা বিক্রি করেছিল বটে হতগরিব এক মানুষের কাছে আর সন্দেহ থাকে না যে, এই মানুষটাই মনোহর।

রেল লাইনের ধারে ঝুপড়িগুলোর মানুষেরাও আর সন্দেহ রাখে না যে মনোহরের এই সপরিবারে উধাও হয়ে যাওয়ার সঙ্গে ইলিশের কোনো একটা যোগাযোগ আছে, এটা তারা রক্তের ভেতরে অনুভব করতে পারে, কেবল সেই যোগাযোগের গতি প্রকৃতিই তারা অনুমান করতে পারে না। রমণীরা সারাদিন বনে জঙ্গলে কচুঘেচু সন্ধান করে ফেরে আর ইলিশের ঘ্রাণ পায়, ইলিশের কথা ভাবে, ইলিশের আধ খাওয়া সেই কাঁচা টুকরো বারবার কল্পনায় দেখতে পায়, আর দেখতে পায় মনোহর তার পরিবার আর ছানাপোনার হাত ধরে রাতের অন্ধকারে কোথায় কেবল চলে যায়।

পুরুষগুলো কেউ কাজের সন্ধানে রাস্তায় নামে. কেউ মাঠের দিকে যায়, কেউ নালায় ডোবায় নেমে পড়ে যদিবা চুনোমাছ পাওয়া যায়, তাদের কারো কারো মনে পড়ে যায়, যে মনোহর একদিন কথায় বলেছিল, সে আদিতে সে ছিল মেঘনার মানুষ. মেঘনার বুকে সারারাত জেগে ইলিশ মারত।

কাল রাত ছিল পূর্ণিমার রাত, পূর্ণিমা রাতে কারো কারো মাথায় গোলমাল শুরু হয়ে যায়; কে বলবে পূর্ণিমায় মনোহর আর মনোহর ছিল কি না?

মানুষের গল্প কোথাও লেখা থাকে না, মনোহরের গল্পও তাই কারো জানা হয় না; মনোহরকে নিয়ে অনেক কিছুই বানিয়ে নিতে পারে মানুষেরা, সেই নির্মাণ ভিন্ন মনোহরের আর কিছু এই জগতে থাকে না।

মনোহর ছাড়া আর কেউ জানে না, সে মণ্ডলবাড়ির চারদিনের কামলা খাটার পয়সা নিয়ে বাজারে যায় তেল নুন কিনতে, সত্যি সত্যি নতুন দাঁয়ের বিষয়ে সে কিছুই জানে না, নিজের পরিশ্রমের পয়সা দিয়েই বাজার থেকে ইলিশটি কিনেছিল। গতকাল দেরিতে এসেছিল ট্রেন, তাই ইলিশ উঠেছিল রাতের বাজারে, মেছোপট্টিতে কেন গিয়েছিল মনোহর কে জানে, সারি সারি সাজানো ইলিশ দেখে হঠাৎ মেঘনার ডাক শুনতে পেয়েছিল সে; তার ছেলেমেয়েরা ইলিশ কখনো দেখেনি, দেখলেও ইলিশের কথা মনে নেই তাদের; মাঝে মাঝে রোদে বসে তাদের কাছে মেঘনার গল্প করেছে মনোহর ইলিশ মারা রাতের গল্প করেছে, ছেলেমেয়েদের ইলিশ দেখাতেই বুঝিবা মনোহর সব পয়সা নেশাগ্রস্তের মতো ইলিশের পেছনে খরচ করে বসে, তার পরিবার শাপশাপান্ত করতে থাকে মনোহরকে; সেই চিৎকার, সেই তিরস্কার মনে পড়বে ঝুপড়ির অন্যান্য মানুষদের কিন্তু তারা কারণটি জানবে না; ইলিশটির দিকে ভয়ার্ত চোখ মেলে তাকিয়ে থাকে মনোহরের ছেলেমেয়েরা মনোহর স্তম্ভিত হয়ে বসে থাকে ঝুপড়ির সমুখে, তার পরিবার প্রায় মূর্ছিত হয়ে শুয়ে থাকে মাটিতে, তার পা বেরিয়ে থাকে ঝুপড়ির বাইরে মাথাটা ভেতরে, আর সমস্ত কিছুর কেন্দ্রে সমুখের ফাঁকা জায়গায় পড়ে থাকে ইলিশটি, ঠিক যেখানে মনোহরের পরিবার ওটিকে ছুঁড়ে মেরেছিল; একটি বিড়াল শুধু থেকে থেকেই ঘুরঘুর করছিল, সে এখন থাবা গেড়ে বলে, অচিরে আরো একটি বেড়াল এসে যায়, পরে আরো একটি; মাছটি অরক্ষিত, রমণীটি মূচ্ছির্ত, শিশুরা নিদ্রিত, পুরুষটি বজ্রাহত, তবু বেড়ালেরা মাছটির দিকে অগ্রসর হয় না।

মানুষেরাও মানুষ সম্পর্কে সম্পূর্ণ অনুমান করতে পারে না; মানুষের জীবনের বিস্ময়, তার অস্তিত্বের বিস্ময়, এর সব কিছু সম্পর্কেই মানুষের অজ্ঞতা বিস্ময়কর। অতএব কে বিশ্বাস করবে, মাঝরাতে সমস্ত কিছু নড়ে ওঠে; গাছ, বাড়ি, মাঠ, নদী, মানুষ। মনোহরের স্ত্রী উঠে বসে, মনোহর তাকে উঠে বসতে সাহায্য করে মনোহর তার সন্তানদের জাগায়, মনোহর সবাইকে নিয়ে গোল হয়ে বসে বলে, যদি না খেয়েই মরতে হয় তাহলে চল সেই মেঘনাতেই যাই।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ