বইপড়া : হামদি বে'র বে অফ বেঙ্গল


ছাপড়ার তিনকড়ি ডাক্তার, তাঁর হাতে যত রুগি মারা যেতো সকলের ময়নাতদন্ত করতেন। তিনকড়ি বিশ্বাস করতেন রোগ নির্ণয়ের ক্ষমতা যে কোনও ঐশ্বরিক ক্ষমতার চেয়ে বেশি। হিন্দু ব্রাহ্মণ তিনকড়ি খ্রিষ্টান হয়ে গিয়েছিলেন যাতে মরাকাটা বিষয়ক জাতের হ্যাপা সইতে না হয়।
তিনকড়ি ডাক্তারের গল্প পড়তে পড়তে আমার মনে পড়লো আঁদ্রে ভেসেলিয়াসএর কথা, রাতের গভীর অন্ধকারে চার্চইয়ার্ড থেকে সদ্যসমাহিত মৃতদেহ তুলে যিনি ব্যবচ্ছেদ করতেন। তাঁর শবব্যবচ্ছেদ আমাদের আধুনিক শারীরসংস্থানবিদ্যাকে ঋণী করে রেখেছে। মনে পড়লো সুশ্রুত কাল্টের চিকিৎসকদের কথা, যাঁরা অনার্য মৃতদেহ শৈবালদামের নীচে রেখে স্তরে স্তরে জানতেন শারীরসংস্থানবিদ্যা।

এসব অনধিকারীর কথা। তিনকড়িকে জানতে একটি ডিমাই সাইজের বইএর পাঁচটি পাতা পড়লেই চলে। তিনকড়িকে মনে হতেই পারতো প্রাগৈতিহাসিক গল্পকথা , পারলো না কারণ ১৯৮৯ সালের ডিসেম্বরে হামদি বে লিখলেন তাঁর "ছাপরার কিংবদন্তী প্রথাবিরোধী তিনকড়ি"। তিনকড়ি অমর হয়ে রইলেন বইএর পাতায়।

আমাদের ছোটবেলায় ইংরেজি খবরের কাগজ পড়তে উৎসাহ দেওয়া হতো কারণ তাতে "ইংরিজি ভাষা"টা শেখা যায়। অপরচুনিটি গ্যাপের কারণে ইংরিজি সেভাবে শেখা পড়া হলো না। তাতে কোনও দুঃখ নেই। কারণ হামদি বে'র বইটি বাংলায়, বে অফ বেঙ্গল। বাংলা বইটির এমত নাম দেখে চমক লাগে, আসলে বঙ্গোপসাগর নয়, বইটির নাম Bey of Bengal, বাংলার বে।

হামদি বে'র জীবনী আমি গুগল খুঁজে পেলাম না। নবকুমারের মতোই কাষ্ঠারোহণ করে সমুদ্রসঙ্গমে উপনীত হতে আমার কেটে গেছে দীর্ঘদিন। এমন কী দ্য স্টেটসম্যান কাগজটিও আর প্রকাশিত হয় না। সেই সব জাঁদরেল জাঁহাবাজ সাংবাদিক-সম্পাদকদের জায়গায় কায়েমী হয়ে বসেছে যত ভুঁইফোড়ের দল।

হামিদ বেগ ওরফে হামদি বে'র আদত লেখাগুলি কজন মনে রেখেছেন আমি জানি না। হামদি সম্পর্কে বইএর ব্লার্ব থেকে জানা যাচ্ছে, তিনি জন্মেছিলেন ১৯১৫ সালে। বিজ্ঞানের ছাত্র। মানবেন্দ্রনাথ রায়ের শিষ্য। রয়টার থেকে দ্য স্টেটসম্যান, সাংবাদিকতার জীবন। তার পর "বে অফ বেঙ্গল" এর রচনাগুলি হামদি লিখেছেন জীবনের শেষ দুটি বছরে। নিজের কথা, মাবাবার কথা, বউমেয়ের কথা হামদি কিছুই বলেননি। শুধু আছে ছেলেবেলার শহর ছাপড়ার কথা। একবার বন্যার সময় এক নীলগাই এসে পড়েছিল ছাপড়া শহরে। নাগরিক স্থাপত্য শিকার সেই নীলগাইকে, সারা শহর ভোজ খায়। পরদিন দেখা যায় অর্থনীতির এক্কেবারে কার্পেটের তলায় থাকা পোকামাকড়ের মতো মানুষও বন্যায় উদ্বাস্তু হয়েছে।

দেশভাগ হবার পরে যে কতিপয় মুসলমান কলকাতাকে নিজের শহর মনে করে রয়ে গিয়েছিলেন, তাঁদের একজন হামদি বে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এক তুর্কী সোলজার হামিদ বেগকে হামদি বে বলে ডাকতো। সেই ডাকটিই হামিদ তুলে নিলেন তাঁর লেখালিখির জন্য।

বইটি চরিত্রচিত্রশালা। অনেক ঘুরেছেন, অনেক দেখেছেন। রমলা ব্যানার্জির প্রিয় দুধিয়া আম থেকে কাজিরাঙা বনের বৃদ্ধ গন্ডার, ডিরোজিও থেকে এম এন রায়। গান্ধী থেকে নেফার উগ্রপন্থী যোদ্ধা। নির্ভার, স্বচ্ছ ভাষা ও ভাষাবোধ ছিল হামদির,যা মীনাক্ষি দত্তের সুচারু অনুবাদে স্পষ্ট হয়েছে।

নিজের লেখাতেই হামদি লিখছেন গলার ক্যান্সারের চিকিৎসার জন্যে অর্থ প্রয়োজন ছিল। এই লেখালিখির পারিশ্রমিকে তার কিছু সুরাহা হল। বইটির শেষ গদ্যগুলি পড়তে পড়তে ঠাওর হয়, আসলে লেখক দূরযাত্রার প্রস্তুতি নিয়েছেন,সেই যাত্রীনিবাসের ঢিলেমি আস্তে আস্তে দখল করে নিচ্ছে তাঁর মুন্সিয়ানা। মৃত্যু এসে সব নেয়।

আমার বরাবরের ধারণা, জ্ঞানী বৃদ্ধ যদি শেষ বয়েসে এসে গদ্য লেখেন, তবে সে লেখার লক্ষ্যভেদ অব্যর্থ হয়। সারাজীবনের যত অভিজ্ঞতার চোলাই মনোযোগী পাঠককে ধরাশায়ী করে দেয়। হামদি'র লেখা পড়ে, তাঁকে গুরু মেনেছি। এই একসেন্ট্রিসিটি এ যে আমারও ব্যারাম। মেলা দেখতে গিয়ে শোনপুর থেকে সিলেটি বান্নি।

কিন্তু হামিদ বেগ, হামদি বে আপনি শুধু এই বইটি ছাড়া আর কোথাও রইলেন না?





লেখক পরিচিতি
প্রজ্ঞাদীপা হালদার
কথাসাহিত্যিক।
কলকাতায় থাকেন। 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ