আনিসুজ জামানের গল্প : মুক্তি


ঠিক কবে কোন সময়ে এই গুহায় এসে ঢুকেছি আর কবে বাগান থেকে বেরিয়েছি, অনেক চেষ্টা করেও মনে করতে পারছি না। আমি পলাতক আসামী। বনের একদম মাঝে খুব সুন্দর এক বাগানে থাকতাম। কারও সাত-পাঁচে না গিয়ে নিজের আনন্দে দিন কাটছিল। হঠাৎ একদিন কিছু সৈন্য এসে বাগানে ঢুকে পড়ে, সরাসরি কুটিরে। তখন কেবল হরিণের কলিজা দিয়ে নাস্তা শেষ করে কাঁচা হলুদের চা খাচ্ছিলাম। একটু পরেই সূর্য মাথার উপর উঠবে। বনের অনেকটা জায়গায় আলো পড়লেও সকাল হয় অনেক পর। সূর্য সাথে সাথেই প্রায় মাথার উপর এসে দ্রুতই আড়ালে হেলে পড়ে। জায়গাটা ছিল ৫ ডিগ্রি নর্থ থেকে ১৫ ডিগ্রি সাউথের মাঝের কোথাও।

ওদের দেখে অবাক হলেও চমকে যাই না, উঠেও দাঁড়াই না। চেহারা দেখে স্পষ্ট বোঝা যায়, ক্ষুব্ধ হয়েছে। জমকালো নিয়মনিষ্ঠ পোশাকের সাথে নড়াচড়া সব কিছুই মানিয়ে যাচ্ছে। রাজপ্রতীক বের করে কুর্নিশ করার আদেশ দেয়। স্পষ্ট করে বলে দিই, আমি স্বাধীন মানুষ, স্বাধীনভাবে থাকার জন্য এখানে এসেছি। কিন্তু সাথে সাথেই দু’ঘা পড়ার পর আর প্রতিরোধ টিকিয়ে রাখতে পারিনি। আমাকে ধরে নিয়ে রাজার সীমান্ত দেখিয়ে দেয়। দুটো উঁচু উঁচু আনহেলিম ভেরমেলহো গাছ দুদিকের সীমান্ত চিহ্নিত করেছে। এর বাইরে পা দিলে রাজার অনুমতি ও অন্য রাজার ভিসা নিতে হবে (দুদিন আগেও জায়গাটা আমার ছিল আর আজ দুজনে যুদ্ধ করে আমারটা ভাগাভাগি করে নিলো! আমাকে একবার জিজ্ঞাসা পর্যন্ত করল না!)। কিছুদিন পর হরিণ তাড়া করতে গিয়ে কখন যে পাহারাদারদের হাতে পড়েছি নিজেও বুঝিনি। ধরে নিয়ে সোজা কারাগারে ঢুকিয়েছিল। অন্য বন্দীদের সাথে মেলাতে না পারলেও উপায় ছিল না। তবে বেশীদিন থাকতে হয় নি। কিছুদিন পরই সুযোগ এসে যায়। জেল ভেঙে অন্যরা বেরুনোর সময় বেরিয়ে ওদের সাথেই এক জাহাজে উঠেছিলাম। ওঠার সাথে সাথেই জাহাজটি ডুব দেয় যাতে উপর থেকে কেউ খুঁজে না বের করতে পারে। আজও জানি না কে সেই বন্দী ছিল যার মুক্তির জন্য এত সব আয়োজন! ঠিক ৭৪ দিন জাহাজে থাকার পর আকস্মিক দুলুনিতে সকলে কেঁপে উঠি। সাগরে প্রচণ্ড ঘূর্ণি। বের হবার জন্য জাহাজটি বারবার আগু-পিছু উপর-নিচ করলেও বেরুতে পারে না। উলটো ভেঙে পড়ে। জানি না কীভাবে, কতক্ষণ সাঁতরে সৈকতে পৌঁছেছিলাম। খুব কম চওড়া সৈকত। মাথার উপর উঁচু পাহাড়। কোনো রকম আছড়েপাছড়ে উপরে উঠলে পাথরে বুটের আওয়াজ শুনেই রাজার সৈন্যদের চিনে ফেলে সামনে পড়া এই গুহায় লুকিয়েছিলাম। স্যাঁতস্যাঁতে ভেজা গুহা। এতই ছোট যে ঠিকমত সোজা হওয়া যায় না। তার উপর বন্য জানোয়ারের উপদ্রব। প্রায়ই ঢুকে পড়লে আমাকে গুহার শেষ মাথায় চলে যেতে হয়। খুব সম্ভবত ওরাও আমার উপস্থিতি টের পায়। কারণ শেষ মাথা পর্যন্ত ঢোকে না। কিছু ঢুকে মলমূত্র ত্যাগ করে বের হয়ে যায়। বাবা! কি বিশ্রী গন্ধ!

বাইরে কখনই বুটের আওয়াজ থামে না। প্রতিদিনই ভোরে পাখপাখালির আওয়াজে ঘুম ভাঙে। রাতের বন্য জন্তুর খুঁরের আওয়াজের ভয় মিলিয়ে যায়। রাখাল আসে গবাদি নিয়ে। গল্প করে সৈন্যদের সাথে। কিন্তু আমি বেরুতে পারি না। কয়েকবার অসহ্য হয়ে চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত হয়ে ওঠে নি। দিনগুলো কাটে গান গেয়ে, কবিতা আওড়িয়ে। এরই মধ্যে অনেক কবিতা মুখস্থ হয়ে গেছে। গুহার গায়ে নরম চক-পাথর দিয়ে দিনপঞ্জি লিখি, গল্প লিখি, হিজিবিজি আঁকি। দিন কাটছে কারণ নিশ্চিত জানি সৈন্যদের একদিন ডাক পড়বে আর আমি বেরুতে পারব।

একদিন রাখালদের সাথে তর্ক হচ্ছিল ওদের। সৈন্যদের মতে তাদের নৃপতিই এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে একমাত্র শক্তিধর, আর কেউ নেই, আসবেও না। অন্যদিকে রাখালরা বলছে, এ ধারণা ভুল। প্রকৃতি এই অরাজকতা সহ্য করবে না। নতুন কেউ আসবে নতুন এক পৃথিবীর প্রতিশ্রুতি নিয়ে; যার গায়ে সীমান্তের রক্তাক্ত খাল নেই, মানুষে মানুষে ধর্মের, জাতীয়তার, লিঙ্গের বিভেদ নেই। নেই অস্ত্রশস্ত্র। আমি ভেতর থেকে বিড়বিড় করি, শুভশ্য শীঘ্রম, শুভশ্য শীঘ্রম…। ক্রমশই তর্ক ঝগড়ার দিকে এগুলে অন্ধকার এসে মিটমাট করে দেয়। গবাদিগুলো যার যার গোয়ালে ঢোকে, রাখাল বিশ্রাম পায়। আমি ঘুমনোর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত সেই দিনের অপেক্ষায় থেকে দিন গুনতে থাকি। বিদ্যুৎ-ঝলকের মতো মনে পড়ে যায় বন্দী হবার দিনটি। হিসেব করতে থাকি মাস, দিন, ঘণ্টা, মিনিট, সেকেন্ড। ২৯,৭২১,৬০০ সেকেন্ড!

বাইরে সার্চলাইট! সৈন্যরা টের পেয়ে গেল? না তো, বুটের আওয়াজ নেই। বাইরে এক বিশাল আকারের বৃদ্ধ। সাদা দাঁতগুলি ধবধবে সাদা চুল দাঁড়ির সাথে ভীষণ মানিয়ে গেছে। চেহারা দেখেই বুঝতে পারি সেই প্রতিশ্রুতিশীল পৃথিবীর অস্তিত্ব কোনো পুরাণ নয়। হামাগুড়ি দিয়ে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করি। এতদিন নিশ্চল থাকায় শরীর আগের মত ছিল না। চলাচল ভুলে গিয়েছে। কষ্ট করে গুহার বাহিরে মাথা বের করলেই দেখতে পাই সেই বিশাল যান, যা আমাকে নতুন পৃথিবীতে নিয়ে যাবে। উনি আমার মাথা ধরেন, ঘাড়ের নীচে হাত রেখে মমতায় পাঁজাকোলা করে তুলে অবলীলায় আশ্চর্য সেই বাহনের দিকে হাঁটতে থাকেন।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ