কাজী রহমানের গল্প : নির্বাণ



১.
চোখ লেগে আসতেই আবার শুনলাম সেই রোমহর্ষক গোঙানির শব্দ তারপর শুনলাম "ঘোড়ার ডিম ঘোড়ার ডিম"। ভয় পেয়ে উঠে বসেই বুঝলাম ওটা অর্ণবেরই কাণ্ড। দু তিনবার ওর নাম ধরে ডাকতেই সে বলে উঠলো "সব ঠিক আছে, ঘুমিয়ে পড়।" ঘুমিয়ে পড়বার আগে ধরে নিলাম বন্ধুর নিদ্রাকালীন শ্বাসব্যাঘাত রোগ রয়েছে। সে ঘুমিয়ে পড়লো। দুটো আলাদা বিছানার মাঝখানে রাখা নাইটস্ট্যান্ডে উপরকার ঘড়ির এলইডির সবুজাভ আলো পড়েছিল অর্ণবের মুখের উপর। ঘুমন্ত মানুষের মুখমন্ডল নির্বিকার থাকার কথা কিন্তু পাশের বিছানা থেকে আমার তা মনে হচ্ছিল না। সাদা বিছানা বালিশ আর চাদরের আশ্রয়ে চেনা বন্ধুটিকে চিনতে পারা যাচ্ছিল না।

বাড়ি থেকে দুশো মাইল দূরের একটি শহরে প্রশিক্ষণে গিয়েছিলাম কোম্পানির খরচে। থাকছিলাম বেশ বড় একটি হোটেলে। এই শহরে সূর্যাস্তের সময়টাতে চতুর্দিকে অপরূপ সব রঙের ছটায় কেমন যেন ঘোর লাগা পরশ লাগে। একটু উঁচুতে থাকতে পেলে আকাশ পাহাড় উপত্যকা আর গাছপালা গুলোতে যে মায়াময় আলোর খেলা চলে তাতে সারাদিনের ক্লান্তি যেন আপনি থেকেই মুছে যেতে চায়। সেই সময়ে কফি হলে মন্দ হয় না। কাজকর্ম সেরে হোটেলে ফেরার পথে হাল্কা একটা কফি নিতে স্টারবাকস্‌ কফিশপে ঢুকেই দেখেছিলাম অর্ণবকে। অনেকগুলো বছর পর পুরোনো বন্ধু অর্ণবের সাথে দেখা। হোটেলে চেকইন করবার আগে সেও থেমেছিল কফিশপে। বন্ধুকে আমার সাথে থেকে যাবার জন্য বলতে কিছুটা ইতস্তত করেও সম্মত হয়ে গিয়েছিলো আমার সাথে দুটো দিন থাকতে ।

২.
আজকাল কিছুটা সময় পাই পছন্দের কয়েকজন মানুষের সাথে আড্ডা বা ফোনে কথা বলে সময় কাটাবার। বছর দুই হল আমার একজন নতুন বন্ধু জুটেছে। গত সপ্তাহে আমার এই তরুণ বাঙালি বন্ধু অঁদ্রে ডিক্রুজের সাথে জমিয়ে গল্প করছিলাম। অঁদ্রের সাথে গল্প করলে প্রতিবারই বিষয়বস্তু নানা রকমের ভাবনা উস্কে দেবার মত হয়ে তারপর স্থগিত হয়। সেদিন অঁদ্রে বলছিলো "ভদ্রলোককে আমি ঠিক বুঝতে পারি না। এই যে অনন্ত বিপুল মহাবিশ্ব, তা নিয়ে তেমন কোন মাথা না ঘামিয়ে সে ডুবে রইলো শুধু ব্যক্তির দুঃখমুক্তি, মোহমুক্তি আর জন্ম ও মৃত্যুর চক্র নিয়ে। কোন মানে হয়?" বুঝে গেলাম আলোচনায় আজ বুদ্ধ থাকছে। অঁদ্রে আরো বলছিলো যে, "এই মানুষটি অতীত বা ভবিষ্যৎ নিয়ে না ভেবে বর্তমানের অস্তিত্বকে নিয়ে ভেবেছেন। আবার বলেছেন, বর্তমান আছে বলেই অতীত বা ভবিষ্যৎ থাকছে, কিন্তু এই মুহূর্তে আপন অস্তিত্বের উপলব্ধি আর প্রকৃতির সাথে একাকার হবার চিন্তাটাই প্রধান"। মন্তব্য করেছিলো, "এ যেন এক ভাবুক সাধকের কাছ থেকে কোয়ান্টাম পদার্থবিদ্যার সূত্র পাওয়া, কেউ কিছু দেখছে বা ভাবছে বলেই যেন সেটি সৃষ্টি হচ্ছে ।" মনযোগী শ্রোতা হয়ে শুনতে লাগলাম। বর্তমানের ব্যক্তি যেন ভাবছে সে অনন্ত মহাবিশ্বের উপাদানে তৈরী, সে এক সময়ে সেখানে মিশে যাবে ঠিকই কিন্তু এখন নয়, কারণ ব্যক্তিটি বর্তমানের সাথে জুড়ে আছে, নির্বাণ তার এখনো হয়নি। ভাবনার বিষয় হচ্ছে, বর্তমান থেকে বিচ্ছিন্ন হতে মৃত্যু না কি প্রজ্ঞা নির্বাণ এনে দেবে, এমন।

৩.

কুড়ি বছর পর দেখা হয়েছে অর্ণবের সাথে। অর্ণব আমার মতই কম বয়সে দেশের একটি প্রধান বিমান সংস্থায় চাকরি শুরু করেছিল। আন্তর্জাতিক টিকিট ডেস্কে বসতো সে আর আমি কয়েকটি বিদেশী সংস্থার আন্তর্জাতিক ভ্রমন সেবা ও জনসংযোগের চাকরি করতাম। তখন থেকেই সে আমার বন্ধু। তারপর অনেক সময় পেরিয়েছে। ঢাকা ছেড়ে আমি লস এঞ্জেলেসে চলে আসবার আরো বছর দশেক পর সপরিবারে অর্ণব এসেছিলো আমেরিকার এই বিশাল শহরে। শহরকেন্দ্রে নতুন খোলা ছোট্ট একমাত্র শাখার প্রধান হয়ে এসেছিলো সে। সংস্থার হয়ে সবকিছু ওকেই শুরু করতে হয়েছিলো। শুধু অফিসঘরটা ভাড়া নেওয়া ছিল, ব্যাস সেটুকু করতে হয়নি। এমন বিশাল নতুন শহরে এসে হঠাৎ করে কাজ শুরু করাটা বেশ শক্ত। টাকা বাঁচানোর কথা ভাবনায় রেখে সংস্থারই এক পুরোনো বন্ধুর এপার্টমেন্টে অংশীদার হয়ে থাকতে শুরু করেছিলো অর্ণব। বাঙালি এই বন্ধুটি ততদিনে মার্কিন নাগরিকত্ব পেয়ে গিয়েছিলো।

সময়ের সাথে সাথে অর্ণব উপলব্ধি করেছিলো বিশ্ববিখ্যাত হলিউড, ডিজনিল্যান্ড, সমুদ্র সৈকত, রাতের নগরী এবং বিনোদনের রাজধানী বলে পরিচিত এই স্বপ্নিল কসমোপলিটন শহরে টিকে থাকা কতটুকু কঠিন। সে ভেবেছিলো চাকরি, বেতন-ভাতা ইত্যাদি আগে থেকেই হাতে নিয়ে এসে এখানে বাস করাটা বিভিন্ন সম্ভাবনায় পরিপূর্ণ ও আনন্দময় হবে। ভবিষ্যতে এমন শহরেই পাকাপোক্ত ভাবে বাস করবার স্বপ্ন দেখেছিলো সে। সংস্থা তার একার জন্য মোটামুটি যথেষ্ট বেতন ভাতা দিলেও সে নিজ দায়িত্বেই তার স্ত্রী ও দুই কন্যাকে নিয়ে এসেছিলো । ভর্তি করে দিয়েছিলো স্কুলে।

আমেরিকায় বিদেশী সংস্থার প্রতিনিধি অর্ণব প্রচুর খাটুনি করে তার শাখাটি কিছুটা দাঁড় করাতেই সংস্থাটি ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তে এই শাখা বন্ধ করে দেয় । মাত্র দু'বছরের মাথায় দেশে ফিরে যাবার নির্দেশ আসে। চাকরি ছেড়ে দিয়ে আমেরিকাতেই থেকে যাওয়া স্থির করে অর্ণব পরিবারটি, কিন্তু কর্মসংস্থানের জন্য প্রয়োজনীয় ভিসার কাগজপত্র ছিলো না ওদের। ওদের বিবাহ বিচ্ছেদ হলো। ওর স্ত্রী এপার্টমেন্টের সেই নাগরিক বন্ধুর সাথে ঘর বাঁধল পাশের একটি ছোট শহরে। বেদনাদায়ক এই ঘটনাটিতে সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল অর্ণব। শহর থেকে উধাও হয়ে গিয়েছিলো সে। কুড়ি বছর পর আমার দেখা হলো অর্ণবের সাথে।

৪.
অর্ণব আর বিয়ে করেনি। কোনোভাবে এদেশের নাগরিকত্ব পেয়েছে। সরকারি চাকরি করে। জানলাম বিচ্ছেদের পর ওর প্রাক্তন স্ত্রী আর কন্যাদের সাথে ওর আর দেখা হয়নি । লক্ষ করলাম নিজের বাচ্চাদের নাম সহজে মনে করতে পারছিল না সে । বাচ্চারা নাকি তাদের মা ও নতুন বাবার কাছে থাকবে এমন শর্তেই বিচ্ছেদ হয়েছিল। এ নিয়ে কোন দিক থেকে আর কোনো জটিলতা হয়নি। আমার মনে হল সে বেশ নির্ভার হয়ে আছে যদিও সন্তানদের নাম খুব সহজে মনে না করবার ব্যপারটা আমাকে বিস্মিত করেছিল । অতীতের বিপর্যয় নিয়ে বর্তমানে আমি ওর মধ্যে কোনো ভাবাবেগ দেখলাম না । মানুষ বদলায়, অর্ণব বদলেছে। মনে হলো বুদ্ধের মতই অনন্ত বিপুল মহাবিশ্ব নিয়ে মাথা না ঘামিয়েও জেনে গিয়েছে ব্যক্তির দুঃখমুক্তির রহস্য, মোহমুক্ত হয়ে শুধু বর্তমান নিয়ে ভেবেছে। অর্ণব প্রবল আস্থার সাথে বলছিলো, "আনন্দ বেদনা আমাকে আর তেমন করে স্পর্শ করেতে পারে না। আমি চরম বেদনাকে শূন্যতায় নিয়ে গিয়ে তা অতিক্রম করে এসেছি। আমাকে নিয়ে ভেবোনা বন্ধু, আমি এখন স্বর্গসুখে আছি।" ভাবলাম, সে হয়ত সেই বিরল নির্বাণ লাভ করেছে ।

দর্শন, যুক্তিবাদ বা সাহিত্য নিয়ে অর্ণবের সাথে এর আগে কখনো কোনদিন কথা হয়নি, এসবে কোন আগ্রহ ছিল না তার। আমাকে অবাক করে দিয়ে সে দার্শনিক সোরেন কিয়ের্কাগার্ডের লেভেলিং থেকে ফ্রেডরিখ্‌ নিচার সময়ের নিহিলিজম পর্যন্ত গুলে খাইয়ে দিয়ে প্রমাণ করতে চেষ্টা করলো যে সে সত্যিই তাঁর জীবনে ঘটে যাওয়া দুঃখ বেদনার ঊর্ধ্বে উঠে গেছে। অর্ণব বলছিলো "জীবন আসলে একটা ঘোড়ার ডিম, কিছুই না। সমাজের তৈরি সব নীতিপদ্ধতি অকার্যকর, গুরুত্ব, উদ্দেশ্য সবকিছু বিমূর্ত, অর্থহীন একটা অশ্বডিম্ব।" বলতে চাইলাম, অস্তিত্ববাদী দার্শনিক নিচার ভাবনাটা ঠিক তেমনটি ছিল না। কিন্তু অর্ণবের অবস্থাটা ভালো করে বুঝতে চেয়ে আমি চুপ করে থাকলাম।

গল্প করবার মাঝেই স্বপ্নের ঘোরে অর্ণবের সেই 'ঘোড়ার ডিম' এর কথা মনে পড়লো। ভাবলাম, স্বপ্ন কতটা অবচেতন মন থেকে উৎসারিত হতে পারে তা নিয়ে। শূন্যতার ব্যপারে কেন যেন অর্ণবকে জীবনানন্দ শোনাতে চাইলাম - ‘ ‘হৃদয়ের মাঝে এক বোধ জন্ম লয়;
আমি তারে পারি না এড়াতে,
সে আমার হাত রাখে হাতে,
সব কাজ তুচ্ছ হয়—পণ্ড মনে হয়,
সব চিন্তা—প্রার্থনার সকল সময়
শূন্য মনে হয়,
শূন্য মনে হয়।’ শোনানো হলো না।

৫.

আজ চেকআউট করব আমরা। সকাল সকাল ব্রেকফাস্ট সেরে নিতে অর্ণবকে নিয়ে বসে গেছি হোটেল লবির কোলাহলপূর্ণ গমগমে বিশাল রেস্টুরেন্টে। আমাদের পাশের টেবিলে হাসিখুশি দম্পতি বসেছে দুই শিশু কন্যাকে নিয়ে, সাথে সম্ভবত শিশুদের দিদা, তিনি তাঁর ফোন দেখতে ব্যস্ত। দম্পতি কফি আনতে গিয়েছিলো টেবিল ছেড়ে । বড় মেয়েটি আইপ্যাড নিয়ে খেলছিলো, ছোটটি ব্যস্ত তাঁর পুতুল নিয়ে। তারস্বরে আচমকা কেঁদে উঠেছিলো ছোট কন্যাটি । বিব্রত দিদা এদিক ওদিক তাকিয়ে কান্নার কারণ খুঁজছিলো। শিশুটির খেলনা বারবি ডল ছোট্ট হাত ফসকে পায়ের ধাক্কায় ঢুকে পড়েছিলো আমাদের টেবিলে তলায়। খেলনা উদ্ধার করতে পারছে না বলে ব্যাকুল হয়ে কাঁদছিলো ছোট । অর্ণব দ্রুত টেবিলের নিচে মাথাটা ঢুকিয়ে পুতুলটিকে উদ্ধার করলো। তারপর টেবিল থেকে উঠে গিয়ে শিশুটির সামনে হাঁটু গেড়ে তার হাতে পুতুলটি ধরিয়ে দিলো। ওর দিদা বললো - "থ্যাঙ্ক ইউ বলো।" মেয়েটি অর্ণবের মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে সুরেলা গলায় বলে উঠলো, "থ্যাঙ্ক ইউ।" অর্ণব এর পরেও বসে রইলো মনে হয় কয়েক সেকেন্ড, আমি ওর মুখ দেখতে পাচ্ছিলাম না। কী ভেবে যেন পুতুলের মত ছোট্ট মেয়েটি অর্ণবের দিকে উড়ন্ত এক চুমু ছুঁড়ে বলে উঠলো, "আই লাভ ইউ।" এমন মায়াবী একটা মুহূর্ত, দূর থেকে দেখেও আমার গলা যেন ধরে এলো। অর্ণব উঠে এসে আমার উল্টো দিকে ওর চেয়ারে বসলো, মাথা নিচু করে রইলো। বুঝলাম ও চাইছিলো না আমি ওর মুখাবয়ব দেখি। মাথা নিচু করে কপালটা বাঁ হাত দিয়ে ঘষে অর্ণব, তার চোখের জলের ধারা অলক্ষিত থাকে না। অর্ণবের কন্যারা এখন বড় হয়ে গেছে, অর্ণবের কাছে রেখে গেছে তাদের শৈশব, সেখানে তারা বড় হয়নি। সেই দূর একান্ত অতীতের আনন্দ বেদনার স্মৃতি জেগে ওঠে ঘুম থেকে। অর্ণবের চোখে নির্বাণের বদলে গভীর বিষাদকে দেখলাম খুব কাছ থেকে। মনে হলো শূন্যতা নিয়ে আরো অনেক ভাববার আছে।





একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

2 মন্তব্যসমূহ

  1. ব্যক্তিগত কত অভিজ্ঞতা, স্মৃতি, ভালো-মন্দয় মেশানো কত ঘটনা আমাদের সবারই আছে। সেইসব আপাতঃ সাধারণ ঘটনাগুলো থেকেই যে গল্প তৈরি হতে পারে, সেটা হয়ত আমার মতো অনেকেই ভাবেন না। এমনই একটি সাধারণ ঘটনা মনে দাগ কেটে যাওয়া গল্প হয়ে উঠেছে কাজী রহমানের এই লেখায়। তাঁর অসামান্য বর্ণনায় অর্ণবের জীবনগল্প পাঠককে ভাবতে বাধ্য করবে, ' নির্বাণ আসলে কিসে হয়।' খুব ভালো লেগেছে পড়তে কাজী ভাই।

    উত্তরমুছুন
    উত্তরগুলি
    1. অনেক ধন্যবাদ শাওন সময় করে গল্পটি পড়বার জন্য। মন্তব্যের জন্যেও ধন্যবাদ 🙏

      মুছুন