ইতালো কালভিনোর গল্প: চাঁদের দূরত্ব


বাংলা অনুবাদ : উৎপল দাশগুপ্ত

কোনো এক সময়, স্যার জর্জ এচ ডারউইন-এর মতে, চাঁদ পৃথিবীর খুব কাছেই ছিল। তারপর জোয়ারভাটার প্রভাব ক্রমশ তাকে দূরে সরিয়ে দিল; যে জোয়ারভাটা চাঁদই পৃথিবীর জলে তৈরি করে থাকে, যার ফলে পৃথিবী ধীরে ধীরে শক্তি হারিয়ে ফেলে।

কথাটা খুব ভাল করেই আমার জানা!

 – বুড়ো Qfwfq চেঁচিয়ে উঠল, –তোমরা বাকিরা মনে করতেও পারবে না, কিন্তু আমি পারি। সেই ঢাউস চাঁদ – অহরহ আমাদের ওপরেই বিরাজমান ছিল; পূর্ণিমার সময়ে – রাতগুলো হত দিনের মতই উজ্জ্বল, তবে আলোর রঙ ছিল মাখনের মত – মনে হত ওটা যেন আমাদের গিলে খাবে; আর অমাবস্যার সময় সমস্ত আকাশ জুড়ে পাক খেতে থাকত, কালো একটা ছাতায় বাতাসের ঝাপটা লাগলে যেমন হয়; আর অল্প অল্প করে কলা যখন বাড়তে থাকত, শিং বাগিয়ে একেবারে অন্তরীপের ডগা পর্যন্ত নেমে আসত, মনে হত ওখানেই আটকে থাকবে। তবে সেই সময় চাঁদের কলা বৃদ্ধির ব্যাপারটা অন্যভাবে ঘটত; কারণ সূর্যের থেকে দূরত্বে তফাৎ ছিল, কক্ষপথ বা কৌণিক অবস্থান – ঠিক কোনটা সেটা খেয়াল নেই – অন্যরকম ছিল; আর চন্দ্রগ্রহণের ব্যাপারে বলতে গেলে – ওই যখন চাঁদ আর পৃথিবী একসঙ্গে সেঁটে যায় – আমরা তো মিনিটে মিনিটে চন্দ্রগ্রহণ দেখতে পেতাম; খুব স্বাভাবিকভাবেই এই দুই অতিকায় দৈত্য একে অপরকে ঢেকে ফেলত, কখনো এটা ওকে আবার কখনো ওটা একে।

কক্ষপথ? হ্যাঁ, অবশ্যই উপবৃত্তাকারই ছিল – কখনো আমাদের সঙ্গে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে ফেলত, তারপর আবার কিছুদিনের জন্য দূরে পালিয়ে যেত। চাঁদটা যে সময় ঘাড়ের কাছে এসে পড়ত, সেই সময় জোয়ারভাটার টান এমন আকাশচুম্বী হত যে কারোর পক্ষেই সেটা আটকানো সম্ভব হত না। কোনো কোনো রাতে, চাঁদ যখন থালার আকার আর একেবারে নিচে নেমে আসত, জোয়ারভাটার টান এত ওপরে পৌঁছে যেত যে এক চুলের জন্য সমুদ্রের সঙ্গে ঠোক্কর খাওয়া থেকে বেঁচে যেত; অন্ততপক্ষে কয়েক গজের জন্য বলা যেতেই পারে। চাঁদে চড়ে বসা? সেটাই তো করতাম। শুধু একটা নৌকা বেয়ে যেতে হত, আর ঠিক ওর তলায় এসে পড়লে, একটা মই লাগিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে উঠে পড়লেই হত।

ঠিক যে জায়গায় চাঁদটা সব থেকে বেশি নীচে নেমে আসত সেটা হল খাড়া দস্তার পাহাড়গুলোর গায়ে। আমরা ছোট ছোট নৌকো নিয়ে বেরিয়ে পড়তাম, সেই সময়ের কর্ক দিয়ে বানানো চ্যাপটা গোলাকার সব নৌকো। আমরা বেশ কয়েকজন মিলে যেতাম সেই সব নৌকোয় – আমি, ক্যাপ্টেন Vhd Vhd, ওঁর স্ত্রী, আমার এক বোবা-কালা খুড়তুতো ভাই, আর কখনো-সখনো ছোট্ট মেয়ে Xlthlx – সেই সময় বছর বারো বয়স হবে ওর। সেই সব রাত্তিরে খুব শান্ত থাকত জল, আর এমন চকচক করত যে পারার মত লাগত, বেগনে রঙের মাছও থাকত সেই জলে, চাঁদের টান এমন জবরদস্ত হত যে ওপরে ভেসে উঠত, কারোরই রেহাই ছিল না; অক্টোপাস আর গেরুয়া রঙের মেডুসাগুলোরও সেই একই দশা হত। খুব ছোট প্রাণীগুলো – যেমন ছোট ছোট কাঁকড়া, স্কুইড, এমনকি কিছু জলজ উদ্ভিদ, হালকা আর দুধের সরের মত পাতলা, প্রবালের স্তর – সমুদ্রের জল থেকে প্রবল বেগে বেরিয়ে চাঁদে গিয়ে পড়ে চুন-সাদা ছাদ থেকে ঝুলতে থাকত, কিংবা হয়ত ত্রিশঙ্কু হয়ে বাতাসেই ঝুলে থাকত, কলাপাতা নেড়ে ওই ভাসমান অনুজ্জ্বল প্রভা সরিয়ে আমাদের যেতে হত।

কাজটা আমরা এভাবে করতাম – নৌকোয় আমাদের একটা মই রাখা থাকত – আমাদের মধ্যে একজন সেটা তুলে ধরত, আরেকজন সেটাতে চড়ে ওপরে পৌঁছে যেত, আর তৃতীয়জন দাঁড় বেয়ে যেত যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা একেবারে চাঁদের নীচে এসে না পৌঁছতাম; এই কারণেই আমাদের সাথে এতজন লোক লাগত। (আমি কেবলমাত্র মুখ্য লোকদের ভূমিকার কথাই বললাম।) সিঁড়ির ওপরের ধাপে যে লোকটা থাকত, নৌকোটা চাঁদের কাছাকাছি পৌঁছতে পৌঁছতেই ভয় পেয়ে যেত আর চেঁচাতে আরম্ভ করত – “আরে, থামো! থামো! মাথায় ধাক্কা লেগে যাবে যে!” চাঁদকে মাথার ওপরে দেখতে পেলে ঠিক এরকমই মনে হত, বিশালাকায়, গজালের মত বেরিয়ে থাকা ধারগুলো করাতের মত খাঁজকাটা। এখন অন্যরকম হতে পারে, তবে সেই সময়ে চাঁদ, কিংবা বলতে পারো নীচের দিকটা, চাঁদের তলপেটের দিকটা, যে দিকটা পৃথিবীর সবচেয়ে কাছে এসে প্রায় ছুঁয়ে ফেলত, সেখানে থাকত ধারালো আঁশের কঠিন আবরণ। ঠিক মাছের পেটের মত দেখাত, গন্ধটাও, যতদূর আমার মনে পড়ে, একেবারে আঁশটে ছিল, অনেকটা স্মোকড স্যামন মাছের গন্ধ।

বাস্তবে, মইয়ের শেষ ধাপে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে হাতদুটো যদি ওপরে তোল, চাঁদকে তুমি কেবল ছুঁতে পারবে। খুব যত্ন করেই আমরা সেটা মেপে রেখেছিলাম (তখনও আমরা বুঝতে পারিনি ওটা আমাদের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে); শুধু হাতটা কোথায় রাখছ সেই ব্যাপারে একটু সতর্ক থাকতে হত। আমি সর্বদা এমন একটা খাঁজ বেছে নিতাম যেটা ধরা সহজ হবে বলে মনে হত (এক একবারে আমরা পাঁচ-ছ’জন করে চড়তাম), এক হাত দিয়ে ঝুলে পড়ে অন্য হাত দিয়েও ধরে ফেলতাম আর তার পর মুহূর্তেই মনে হত যে মই আর নৌকো পায়ের তলা থেকে সরে যাচ্ছে আর চাঁদের গতিবেগ আমাকে পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ থেকে ছিনিয়ে নিচ্ছে। ঠিকই বলছি, চাঁদ এতটাই শক্তিশালী ছিল যে তোমাকে উঠিয়ে নিত; এখান থেকে ওখানে গিয়ে পড়ার সময়েই সেটা বুঝতে পারতাম – খাঁজ ধরে পা নিচের দিকে মাথা ওপরের দিকে করে কালবিলম্ব না করে একটা ডিগবাজি খেতে হত যতক্ষণ না তুমি চাঁদের মাটিতে পা রাখতে পারছ। পৃথিবী থেকে দেখলে মনে হত তুমি যেন মাথা নিচের দিকে করে ঝুলে আছ, তবে তোমার কাছে ওটাই স্বাভাবিক মনে হত, একটা ব্যাপারই কেবল উদ্ভট লাগত, ওপরের দিকে তাকালেই সমুদ্রের জল দেখতে পেতে, চকচক করছে, আর নৌকোটা আর বাকিরা সকলেই উলটে গিয়ে ঠিক যেন আঙুরের গোছার মত ঝুলছে।

আমার খুড়তুতো ভাই, মানে ওই বোবা কালা ছেলেটা, এই ধরণের ডিগবাজি খাওয়ার ব্যাপারে বেশ ওস্তাদ ছিল। ওর নড়বড়ে হাতদুটো একবার চাঁদের মাটি ছুঁতে পারলেই (মই থেকে সর্বদা ও-ই প্রথম ঝাঁপ লাগাত), ওই হাতদুটো সহসা খুব পটু আর অনুভূতিপ্রবণ হয়ে উঠত। যে জায়গা থেকে চড়তে পারবে সেটা খুব তাড়াতাড়ি খুঁজে পেয়ে যেত; সত্যি কথা বলতে কী হাতের চেটো দিয়ে সামান্য চাপ রাখতে পারলেই উপগ্রহের মাটির সঙ্গে লেগে থাকতে পারত। একবার তো এটাও দেখে ফেলেছিলাম যে হাত বাড়াতেই চাঁদ ওর দিকে সরে এসেছিল।

ফিরতি যাত্রায় পৃথিবীর বুকে নেমে আসার ব্যাপারেও ও একই রকম চৌকস ছিল, যদিও সেই কাজটা ছিল আরও বেশি মুশকিলের। আমাদের যা করতে হত, হাতদুটো মাথার ওপরে তুলে বিশাল একটা লাফ মারতে হত, লাফিয়ে যতখানি ওপরে ওঠা যায় (চাঁদ থেকে যেমন দেখাত, কারণ পৃথিবী থেকে অনেকটা ডুব দেওয়ার মত দেখাত, অনেকটা হাতদুটো পাশে রেখে নিচের দিকে সাঁতরে যাওয়ার মত), অন্যভাবে বলতে গেলে পৃথিবী থেকে ওপরের দিকে ঝাঁপ দেওয়ার মত, কেবল এখন আমাদের কাছে মই নেই, কারণ চাঁদের গায়ে ঠেকনা দেওয়ার মত কিছুই নেই। কিন্তু হাত ছড়িয়ে ঝাঁপ দেওয়ার বদলে আমার খুড়তুতো ভাই চাঁদের মাটির দিকে ঝুঁকে পড়ত, যেন একটা ডিগবাজি খাবে, তারপর হাতে ভর দিয়ে লাফ দিত। নৌকো থেকে আমরা ওকে লক্ষ্য করতাম, সোজা হয়ে শূন্যে দাঁড়িয়ে চাঁদের বিশাল গোলকটাকে ধরে আছে, হাতের চেটো দিয়ে এপাশ ওপাশ করছে; তারপর ওর দুই পা যখন আমাদের নাগালের মধ্যে চলে আসত ওর হাঁটু চেপে ধরে গলুইয়ের ওপর টেনে নামাতাম।

এবারে তোমরা জিগ্যেস করবে কোন চতুর্বর্গ লাভের আশায় আমরা চাঁদে চড়ে বসতাম; বুঝিয়ে বলছি, শোনো। একটা বড়সড় হাতা আর একটা বালতি নিয়ে আমরা দুধ আনতে যেতাম। চাঁদের দুধ ছিল খুবই ঘন, অনেকটা ক্ষীরের মত। একটা খাঁজের থেকে পরের খাঁজের মধ্যে যে ফোকর থাকে সেখানেই বিভিন্ন ধরণের পার্থিব উপাদান গাঁজিয়ে উঠে এগুলো তৈরি হয়। তৃণভূমি, অরণ্য আর জলাশয়ের ওপর দিয়ে চাঁদের ভেসে যাবার সময় এই সব পার্থিব উপাদান ওখানে গিয়ে জমা হত। প্রধানত এই উপাদানে থাকত উদ্ভিজ্জ রস, ব্যাঙাচি, বিটুমেন, শুঁটিজাতীয় ফলের গাছ, মধু, স্টার্চ ক্রিস্টাল, স্টার্জনের ডিম, ছত্রাক, পরাগ, জেলি জাতীয় পদার্থ, পোকামাকড়, রজন, মরিচ, খনিজ লবন, দাহ্য পদার্থের অবশেষ। চাঁদের মামড়ি পড়া ত্বকের ওপরের খানা-খন্দের মধ্যে শুধু একবার শুধু হাতাটা ডোবাও, তারপর বহুমূল্য কাই ভর্তি হাতাটা তুলে নাও। কাদাটা অবশ্যই নিখাদ অবস্থায় থাকত না, প্রচুর ময়লা থাকত। গাঁজন প্রক্রিয়ার সময় (মরুভূমির উষ্ণ বাতাসের রাজত্বের ওপর দিয়ে চাঁদের পেরিয়ে যাবার সময় এই প্রক্রিয়া চলত) অনেক জিনিসই গলতে পারত না; কিছু কিছু জিনিস ওখানেই লেগে থাকত – আঙ্গুলের নখ আর তরুণাস্থি, নাটবল্টু, সমুদ্র-ঘোড়া, বোঁটাসহ শুঁটি, মাটির বাসনকোসনের টুকরো, মাছ ধরার বড়শি, কখনো কখনো একটা আধটা চিরুনিও। তাই সংগ্রহ করার পর এই কাইয়ের পরিশোধন করতে হত, ছাঁকতে হত। সেটা করতে গিয়ে খুব একটা সমস্যা হত না; সেগুলো পৃথিবীতে নামিয়ে আনাটাই ছিল সত্যিকারের কঠিন কাজ। সেই কাজটা কী করে করতাম বলি - হাতাটাকে গুলতির মত ব্যবহার করে এক এক হাতা ভরে জিনিসটাকে আমরা সজোরে বাতাসে নিক্ষেপ করতাম। ক্ষীরটা ছিটকে বেরিয়ে যেত, আর নিক্ষেপ করার জোর যদি বেশি হয়ে যেত, ওটা ছাদে গিয়ে আটকে যেত, অর্থাৎ কিনা সমুদ্রপৃষ্ঠে। একবার ওখানে গিয়ে পড়লে ওটা ভাসতে থাকত, তখন ওটা নৌকোয় তুলে নেওয়াটা কোনো ব্যাপারই হত না। এই কাজেও আমার বোবা কালা খুড়তুতো ভাই বিশেষ দক্ষতা দেখাত; গায়ে জোরও ছিল আর লক্ষ্যভেদেও নিপুণ ছিল; সজোরে একবার নিক্ষেপ করেই ক্ষীরটা একেবারে নৌকোতে আমাদের ধরে রাখা বালতিতে গিয়েই পড়ত। নিজের ব্যাপারে বলতে পারি, আমি কখনোসখনো লক্ষ্যভ্রষ্ট হতাম; হাতায় রাখা জিনিসগুলো চাঁদের মাধ্যাকর্ষণ কাটাতে না পেরে আমার চোখের ওপরেই এসে পড়ত।

আমার খুড়তুতো ভাই কী কী ব্যাপারে পারদর্শী ছিল সেই ব্যাপারে সব কথা তোমাদের এখনও বলাই হয়নি। চাঁদের খানাখন্দ থেকে চান্দ্রেয় দুধ তো ও তুড়ি মেরে বের করে আনত – অনেক সময় হাতার বদলে নিজের হাতদুটোই, এমনকি খালি একটা আঙ্গুলই ঢুকিয়ে দিত। খুব পরিপাটি করে এগোনো ওর ধাতে ছিল না, তবে আদাড়েবাদাড়ে চলে যেত, একদিকে ঘুরতে ঘুরতে সোজা অন্যদিকে চলে যেত, যেন লুকোচুরি খেলে চাঁদকে চমকে দিতে চাইত, কিংবা জ্বালাতন করতে চাইত। আর যেখানেই হাত ঢোকাতো ঝর্ণার মত দুধ বেরিয়ে আসত যেমন ছাগলের বাঁট থেকে বেরোয়। ফলে আমাদের বাকিদের কেবল ওর পেছন পেছন গেলেই চলত আর হাতায় ওর হাতের চাপে বেরিয়ে আসা জিনিসটা সংগ্রহ করতে হত, তবে বেশিরভাগ সময় আমাদের কপালের জোরের ওপরেই নির্ভর করে থাকতে হত, কারণ ওই বোবা কালা ছেলেটার গতিবিধির না ছিল কোনও সুস্পষ্ট হদিস, না যুক্তি দিয়ে বোঝার মত কোনও ব্যাপার।

যেমন ধর, এমন কিছু কিছু জায়গা ছিল যেগুলো ও কেবল মজা করে স্পর্শ করার জন্যেই স্পর্শ করত – দুটো খাঁজের মাঝখানের ফাঁক, চাঁদের উন্মুক্ত কোমল মাটির ভাঁজ। কখনো কখনো আমার ভাই কেবল আঙ্গুল ঢুকিয়েই ক্ষান্ত হত না – হিসেবনিকেশ করে লাফ দিয়ে পায়ের বুড়ো আঙ্গুলটাও ঢুকিয়ে দিত (খালি পায়েই ও চাঁদে চড়ত) আর এই কাজটা করে ও ভীষণ মজা পেত, লাফানোর সময় ওর গলা থেকে যে কিচকিচ আওয়াজ বেরোত, তার থেকেই বুঝতে পারতাম।

চন্দ্রপৃষ্ঠ সব জায়গায় একই ভাবে খাঁজকাটা তা কিন্তু নয়, জায়গায় জায়গায় কাঁচা মাটি বেরিয়ে থাকত, ফ্যাকাশে পেছল কাদামাটি। এই রকম নরম জায়গা পেলে বোবাকালা ছেলেটার খুব ডিগবাজি খাবার ইচ্ছে হত আর ইচ্ছে হত পাখির মত ওড়বার, যেন ও সমস্ত শরীর দিয়ে চাঁদের মজ্জাকে অনুভব করতে চাইত। এই রকম করতে করতে ও আরও দূরে চলে যেত, তারপর এক সময় আমাদের কাছ থেকে হারিয়ে যেত। চাঁদের বুকে এমন অনেক বিস্তীর্ণ প্রান্তর ছিল যেগুলোর অনুসন্ধান করা আমাদের কাছে যুক্তিসঙ্গত মনে হয়নি, কৌতুহলও ছিল না আমাদের, আর এই সব প্রান্তরেই আমার খুড়তুতো ভাই অদৃশ্য হয়ে যেত; সন্দেহ হত, আমাদের চোখের সামনে ওর এই ডিগবাজি খাওয়ার, কসরত দেখানোর পুরো ব্যাপারটাই ছিল আসলে দেখনদারি, গোপন জায়গায় গোপনে কিছু করবার প্রস্তুতি।

সেই সব রাত্রে, দস্তা পাহাড়ের গায়ে বসে আমাদের মেজাজটাও রাজসিক হয়ে উঠত – ফুর্তির মেজাজ তো বটেই, তবে তাতে লাগত একটা অনিশ্চয়তার ছোঁয়া, মনে হত মগজের বদলে আমাদের খুলির ভেতরে চাঁদের টানে একটা মাছ যেন সাঁতার কেটে বেড়াচ্ছে। গান গাইতে গাইতে, বাজনা বাজাতে বাজাতে আমরা পাড়ি লাগাতাম। ক্যাপ্টেনের বউ বাজাতেন হার্প; রীতিমত দীর্ঘ বাহু ওঁর, সেই সব রাতে ঈল মাছের মত রুপোলি দেখাত, আর বাহুমূল ছিল সামুদ্রিক শজারুর মতই রহস্যময় এবং অন্ধকারাচ্ছন্ন; হার্পের মূর্ছনাও ছিল মধুর এবং তীব্র, এতই মধুর আর তীব্র ছিল যে দুঃসহ মনে হত, ফলে আমরা মাঝে মাঝেই আমরা গলা ছেড়ে গেয়ে উঠতাম, বাজনার সঙ্গে সঙ্গত দেবার জন্যে ততটা নয়, যতটা না নিজেদের শ্রবণযন্ত্রকে ওই সংগীতের নগালের বাইরে রাখার জন্য।

বর্ণহীন মেডুসা (জেলি-ফিশ) সমুদ্রের ওপরে মাথা তুলত, কিছুক্ষণ ধড়ফড় করার পর সোজা চাঁদের দিকে ধাওয়া করত। ছোট্ট মেয়ে Xlthlx মাঝ আকাশে সেগুলো ধরে ফেলে খুব মজা পেত, কাজটা অবশ্য খুব সহজ ছিল না। একবার হল কী, একটাকে ধরবার জন্য ছোট ছোট হাতদুটো বাড়াতে গিয়ে ও অল্প একটু লাফিয়ে উঠল আর ছিটকে গেল। মেয়েটা বেশ রোগাপাতলা ছিল, চাঁদের আকর্ষণকে অগ্রাহ্য করে পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণে ওকে ফিরিয়ে আনার জন্য মেয়েটার যে ভর হওয়ার দরকার ছিল ওর ওজন তার চাইতে দু’এক আউন্স কম ছিল; তার ফলে সমুদ্রের ওপর ঝুলে থাকা জেলি-ফিশদের মধ্যে দিয়ে বেরিয়ে গেল। প্রথমে ভয় পেয়ে গেল, কান্নাকাটি করতে থাকল, তারপর হেসে উঠল আর খেলতে লাগল, যেসব শেলফিশ আর ছোট ছোট মাছ লাফিয়ে উঠে ওর নাগালের মধ্যে এসে যেতে লাগল সেগুলো ধরে ধরে মুখে চালান দিয়ে চিবোতে লাগল। মেয়েটার তালে তাল দেবার জন্য আমরা টেনে দাঁড় বাইতে লাগলাম; চাঁদ ডিম্বাকারে চক্কর লাগিয়ে চলতে চলতে শূন্য থেকে সামুদ্রিক জীবের ঝাঁক আর সামুদ্রিক শৈবালের জট পাকানো একটা লম্বা দল যেটা ধরে মাঝখানে Xlthlx ঝুলে আছে, সেসব টেনে নিয়ে যেতে লাগল। খড়ের আঁটির মত ওর বিনুনি দুটো নিজের থেকেই খাড়া হয়ে গেছে, মনে হচ্ছে যেন চাঁদের দিকেই হাত বাড়িয়ে রেখেছে; মেয়েটা অবশ্য সারাক্ষণ শরীরে মোচড় দিচ্ছে, শূন্যে পা ছুঁড়ে যাচ্ছে, যেন ও চাঁদের প্রভাব কাটিয়ে উঠতে চায়, আর ওর মোজাগুলো – জুতোজোড়া তো ওর ছিটকে বেরোনোর সময়ই হারিয়ে ফেলেছে – পা থেকে খুলে গিয়ে পৃথিবীর আকর্ষণে দুলছে। মইয়ের ওপর চড়ে আমরা সেগুলো আঁকড়ে ধরার চেষ্টা করতে লাগলাম।

ছোট ছোট প্রাণীদের খেয়ে ফেলার ভাবনাটা বেশ ভাল ছিল; Xlthlx-এর ওজন যতই বাড়বে ততই ও পৃথিবীর দিকে ঝুলে পড়বে; যেহেতু শূন্যে ভেসে থাকা সব বস্তুর মধ্যে ও-ই সব থেকে বড়, গুগলি শামুক, সামুদ্রিক শৈবাল আর প্ল্যাঙ্কটন ওর চারপাশে এসেই জড়ো হচ্ছিল, দেখতে না দেখতেই বাচ্চাটা গুগলি, শামুক এবং অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণীর শক্ত খোলসে আর সামুদ্রিক উদ্ভিদের আঁশে ঢেকে গেল। আর ও যত এই দঙ্গলের মধ্যে ও আড়াল হয়ে পড়তে থাকল ততই ও চাঁদের প্রভাব থেকে মুক্ত হতে থাকল, এবং শেষ পর্যন্ত জলের সংস্পর্শে এসে সমুদ্রে ডুবে গেল।

ওকে টেনে তোলবার জন্য আমরা জোরে জোরে দাঁড় চালাতে লাগলাম – ওর শরীরটা সম্মোহিত হয়ে পড়েছিল, যে সব কঠিন আবরণে ওর শরীরটা ঢেকে গেছিল, সেগুলো ছাড়ানোর জন্য বেশ বেগ পেতে হল। নরম প্রবাল ওর মাথায় জড়িয়ে ছিল, যতবার চুলে চিরুনি লাগাচ্ছিলাম ঝাঁকে ঝাঁকে চিংড়ি আর সার্ডিন মাছের বর্ষণ হচ্ছিল; চোখের পাতার ওপর লিম্পেট জাতীয় শামুক চোষক লাগিয়ে নাছোড়বান্দার মত বসে থাকায় চোখ খুলতে পারছিল না; ওর ঘাড় আর বাহু স্কুইডের দাঁড়া দিয়ে প্যাঁচানো; আর ওর ছোট্ট পোশাকটাকে মনে হচ্ছিল যেন শুধু শৈবাল আর স্পঞ্জ দিয়ে বোনা। বড় বড় জিনিসগুলো তো আমরা ছাড়িয়ে ফেললাম, কিন্তু তারপরেও অনেক সপ্তাহ ধরেই ওকে আঁশ, শামুকের খোল টেনে বের করে আনতে হত, আর ওর ত্বক ডায়াটোমের (এক ধরণের সামুদ্রিক এককোষী প্রাণী) বিন্দুতে ভরে গেল, চিরকালের জন্য। খুব ঠাহর করে না দেখলে অনেকে ভাবত যেন অসংখ্য হালকা ছুলিতে ত্বক ভরে গেছে।

এর থেকেই তোমরা মোটামুটি আন্দাজ করে নিতে পারবে, কীভাবে পৃথিবী আর চাঁদের প্রভাব –কেউ কারোর চেয়েই কম যায় না – নিজের নিজের জায়গা দখলের জন্য লড়াই চালিয়ে যেত। তোমাদের আরও একটা কথা বলব – উপগ্রহটা থেকে কোনো বস্তু পৃথিবীতে নেমে আসার পরেও বেশ কিছুদিন চাঁদের বলে বলীয়ান হয়েই থেকে যায় আর আমাদের পৃথিবীর আকর্ষণকে অগ্রাহ্য করতে থাকে। এই যে আমি – এত বড় আর ভারি আমার শরীর – ওখান থেকে ঘুরে আসার পর প্রতিবারই পৃথিবীর উত্থান-পতনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে বেশ সময় লেগে যেত, বাহু চেপে ধরে অন্যরা আমাকে সামলাতো, দুলতে থাকা নৌকোয় সবাই মিলে আঁকড়ে ধরত, তখনও আমার মাথা নিচের দিকে ঝুলে থাকত আর পা দুখানা আকাশের দিকে ছড়ানো।

“ধরে রাখ! আমাদের শক্ত করে ধরে থাক!” ওরা সবাই চেঁচিয়ে আমাকে বলতে থাকত, আর এভাবে ধরে রাখতে গিয়ে আমি কখনো কখনো মিসেজ় Vhd Vhd’র স্তনযুগলও চেপে ধরেছি, বেশ সুডৌল আর দৃঢ় স্তন, স্পর্শটা সুখদায়ক এবং নিজেকে বেশ নিরাপদ মনে হত, আর আকর্ষণটা চাঁদের আকর্ষণেরই তুল্য বা হয়ত তার চেয়েও বেশি, বিশেষ করে আমি যদি ঝাঁপ দিয়ে ওঁর কোমরটা জড়িয়ে ধরতে পারি – আর এভাবেই নিজস্ব দুনিয়ায় নেমে এসে ধপ করে নৌকোর পাটাতনে পড়ে যেতাম। ক্যাপ্টেন Vhd Vhd মুখে এক বালতি জল ঢেলে আমার জ্ঞান ফেরাতেন।

এইভাবেই ক্যাপ্টেনের স্ত্রীর সঙ্গে আমার প্রেমকাহিনীর সূত্রপাত হয়েছিল এবং একই সঙ্গে আমার যন্ত্রণারও। কারণ ভদ্রমহিলা কার দিকে নির্নিমেষে তাকিয়ে থাকতেন সেটা বুঝে ফেলতে আমার দেরি হয়নি – আমার খুড়তুতো ভাই হাত দিয়ে যখন উপগ্রহটা আঁকড়ে ধরত, আমি মিসেজ় Vhd Vhd-কে লক্ষ্য করতাম আর ওঁর চোখই দেখে আন্দাজ করতে পারতাম বোবা কালা ছেলেটার চাঁদ নিয়ে চেনা পরিচিতি দেখে ওঁর মনে কোন ভাবনার উদয় হয়েছে; আর যখন ওর রহস্যময় চন্দ্র পরিক্রমা করতে গিয়ে অদৃশ্য হয় যেত, আমি ওঁকে ছটফট করতে দেখেছি, যেন সারা শরীরে ছুঁচ ফুটছে, আর তখনই পরিষ্কার বুঝে ফেলতাম যে মিসেজ় Vhd Vhd চাঁদকে হিংসে করছেন আর আমি আমার খুড়তুতো ভাইকে। মিসেজ় Vhd Vhd’র চোখদুটো হীরের মত ঝকঝক করত; চাঁদের পানে যখন তাকাতেন সেগুলো জ্বলে উঠত, যেন চাঁদকে লড়াইয়ের জন্য আহ্বান জানিয়ে বলছেন – “তুমি ওকে কিছুতেই পাবে না!” মনে হত আমি যেন উড়ে এসে জুড়ে বসেছি।

আর এই সব কাণ্ডকারখানা সব চাইতে কম যে বুঝত সে হল আমার বোবা কালা ভাইটা। আমরা যখন ওকে পা ধরে টেনে নেমে আসতে সাহায্য করতাম – কথাটা আগেই বলেছি তোমাদের – মিসেজ় Vhd Vhd একেবারে আত্মসংযম হারিয়ে ফেলতেন, ওর শরীরের ওজন নিজের শরীরে নেবার জন্য যা যা করা যায় সব করতেন, লম্বা রুপোলি বাহু দিয়ে ওকে জড়িয়ে ধরতেন; বুকে বেদনা বোধ করতাম (যতবার আমি ওঁর শরীরে ভর দিয়েছি, ততবারই ওঁর শরীরের কোমলতা এবং রমণীয়তা অনুভব করেছি, তবে ভাইয়ের ব্যাপারে যে ব্যগ্রতা লক্ষ্য করেছি, সেটা অনুভব করিনি), অথচ ভাইয়ের এসব নিয়ে কোনও মাথাব্যথাই ছিল না, সারাক্ষণ চাঁদের সুখস্বপ্নেই বিভোর হয়ে থাকত।

আমি ক্যাপ্টেনের দিকে তাকাতাম, ভাবতাম নিজের স্ত্রীর আচরণ উনি লক্ষ্য করছেন কিনা; কিন্তু লোনা জলে ক্ষয়ে যাওয়া অসংখ্য কালো কালো বলিরেখায় ভর্তি মুখে কখনোই কোনো অভিব্যক্তি লক্ষ্য করিনি। যেহেতু বোবাকালা ছেলেটা বরাবরই সবার শেষে চাঁদ থেকে ফিরত, তাই ওর ফেরা মানেই ছিল নৌকোগুলোর ফিরে চলার সবুজ সঙ্কেত। তারপর অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে নৌকোর গলুই থেকে Vhd Vhd হার্পটা তুলে এনে স্ত্রীর হাতে তুলে দিতেন। ওঁর স্ত্রী বাধ্য মেয়ের মত সেটা নিয়ে অল্প কয়েকটা সুর বাজাতেন। কিন্তু কোনোভাবেই বোবাকালা ছেলেটার থেকে আলাদা করা যেত না। আমি নিচু গলায় একটা দুঃখের গান গাইতে থাকতাম, কথাগুলো এরকম - "Every shiny fish is floating, floating; and every dark fish is at the bottom, at the bottom of the sea…" আমার খুড়তুতো ভাই ছাড়া সবাই গানের সঙ্গে গলা মেলাত।

প্রতি মাসেই, উপগ্রহটা যখন কাছে চলে আসত, বোবা কালা ছেলেটা বিশ্বসংসারের প্রতি ওর একান্তবাসীর বিচ্ছিন্নতাবোধটা ফিরে পেত; পূর্ণচন্দ্রের পৃথিবীর কাছে চলে আসা ওকে আবার জাগিয়ে তুলত। সেবার বন্দোবস্তটা এমনভাবে করলাম যাতে আমার ওপরে যাবার পালা না আসে, ক্যাপটেনের স্ত্রীর সঙ্গে আমি নৌকোতেই থেকে যেতে পারি। কিন্তু কী হল, যেই আমার ভাই মইয়ের ওপর চড়ল, মিসেজ় Vhd Vhd বলে উঠলেন, “এবারে আমিও ওপরে যেতে চাই!”

আগে কখনও এমন ব্যাপার ঘটেনি; ক্যাপ্টেনের স্ত্রী কোনোদিনই চাঁদে চড়েননি। তবে Vhd Vhd কোনো আপত্তি করলেন না, সত্যি কথা বলতে কী, উনি ওঁকে প্রায় ধরে বেঁধে মইয়ে চড়িয়ে দিয়ে চিৎকার করে বললেন, “তবে তাই যাও!” আমরা সবাই ওঁকে মইয়ে উঠতে সাহায্য করতে লাগলাম। আমি ওঁকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরলাম। বাহুতে ওঁর নরম গোলাকার স্পর্শ অনুভব করতে পারছিলাম। ওঁকে ওপরে তুলে ধরার জন্য মুখ আর বাহু দিয়ে ওঁকে চেপে ধরলাম। যখন বুঝলাম উনি চন্দ্র গোলকে উঠে পড়েছেন, ওঁর সঙ্গে সংযোগ হারিয়ে অত্যন্ত ব্যথিত বোধ করতে লাগলাম। আমি তাই চেঁচিয়ে বললাম, “আমিও কিছুক্ষণের জন্য ওপরে আসছি, আপনাকে সাহায্য করার জন্য।

কেউ যেন সাঁড়াশি দিয়ে চেপে ধরে আমাকে আটকে দিল। “তুমি এখানেই থাক; কিছুক্ষণ পরে তোমার কিছু কাজ আছে,” ক্যাপ্টেন হুকুম দিলেন, গলা না উঠিয়েই।

সেই মুহূর্তে প্রত্যেকের অভিপ্রায়ই পরিষ্কার হয়ে গেছিল। তবুও আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলাম না; আজও আমার কাছে স্পষ্ট নয় যে আমি পুরো ব্যাপারটা ঠিকঠাক আন্দাজ করতে পেরেছিলাম কিনা। এটা নিশ্চিত যে ক্যাপ্টেনের স্ত্রী বহুদিন ধরেই মনে মনে আমার ভাইয়ের সঙ্গে একলা ওখানে চড়ার ইচ্ছে পোষণ করছিলেন (অন্তত চাঁদে ওর একা একা চলে যাওয়াটা আটকাতে চাইছিলেন), কিংবা হয়ত ওঁর আরও গূঢ় কোনো অভিলাষ ছিল, এমন কিছু যেটা করতে হলে বোবা কালা লোকটার সম্মতি লাগবে – উনি হয়ত চেয়েছিলেন ওঁরা দুজনে লুকিয়ে লুকিয়ে চাঁদে এক মাস কাটিয়ে আসবেন। তবে আমার ভাই, বেচারা কানে তো শুনতেই পায় না, উনি ওকে যা কিছু বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন, হয়ত কিছুই বুঝতে পারেনি, কিংবা হয়ত বুঝতেই পারেনি যে ভদ্রমহিলার কাঙ্খিত বস্তু আসলে ও নিজেই। আর ক্যাপ্টেনের মতলবটা কী? বউয়ের কবল থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার চেয়ে উত্তম ওঁর কাছে আর কিছুই হতেই পারে না; সত্যি বলতে কী, যেই দেখলেন বউ ওখানে আটকে পড়েছেন, মতলবটাকে কার্যকরী করবার জন্য ওঁর মাথায় শয়তানী বুদ্ধি চাগাড় দিয়ে উঠল, তারপরেই আমরা বুঝতে পারলাম বউকে আটকানোর কোনো চেষ্টাই উনি কেন করলেন না, উনি কী জানতেন যে চাঁদের কক্ষপথ দূরে সরে যাচ্ছে?

আমরা কেউই এই ব্যাপারের আঁচ পাইনি। বোবা কালা ছেলেটা হয়ত পেয়েছিল, একমাত্র ওরই পাওয়ার কথা – ভাসা ভাসা অনেক ব্যাপারই ওর জানা থাকত, হয়ত একটা পূর্বাভাস পেয়ে গেছিল যে সেই রাতেই ও চাঁদকে বিদায় জানাতে বাধ্য হবে। এই কারণেই ও গোপন সব জায়গায় লুকিয়ে থাকত আর কেবল নৌকোয় নেমে আসার সময় হলেই আবার ওর দেখা পাওয়া যেত। অযথাই ক্যাপ্টেনের স্ত্রী ওর পেছন পেছন গেলেন – আমরা দেখলাম উনি বেশ কিছুক্ষণ ধরে চাঁদের খাঁজকাটা জায়গাগুলো পেরিয়ে পেরিয়ে যেতে লাগলেন, তারপর ওঁকে থেমে যেতে দেখলাম, নৌকোয় আমাদের দিকে তাকালেন, যেন জিগ্যেস করতে যাচ্ছেন আমরা ওঁকে দেখতে পেয়েছি কিনা।

সেই রাতটা সত্যিই একটু অদ্ভুত ছিল। অন্যান্য পূর্ণিমার রাত্তিরের মত সেদিন সমুদ্রপৃষ্ঠ সেরকম টান টান ছিল না, কিংবা আকাশ লক্ষ্য করে ঢেউও উঠছিল না, কেমন যেন শিথিল, ঝুলে পড়া ভাব, যেন চাঁদের চুম্বকীয় আকর্ষণ পুরো শক্তিতে কাজ করতে পারছে না। অন্যান্য পূর্ণিমা রাতের জ্যোৎস্নার সেই রাতের আলোটাও বেশ অন্য রকম; মনে হচ্ছে ছায়াগুলোও যেন গাঢ় হয়ে পড়ছে। আমাদের বন্ধুরা, যারা ওপরে রয়েছে, নিশ্চয়ই আন্দাজ করতে পেরেছে কী ঘটছে; ভয়ার্ত চোখে ওরা আমাদের দিকে তাকিয়েও ছিল। ওদের মুখে থেকে এবং আমাদের মুখ থেকেও আর্তনাদ বেরিয়ে এল, “চাঁদ দূরে সরে যাচ্ছে!”

আমার ভাই যখন ধাবমান অবস্থায় দৃশ্যমান হল, তখনও আর্তনাদটা অনুরণিত হচ্ছে। তবে ও ভয় পেয়েছে বলে মনে হল না, অবাকও হয়নি – চাঁদের মাটিতে হাতে ভর দিয়ে নিজেকে ওপরে ছুঁড়ে দিল, ডিগবাজি দেবার অভ্যস্ত ভঙ্গিতে, কিন্তু এবারে নিজেকে শূন্যে নিক্ষেপ করার পর ত্রিশঙ্কু হয়ে রইল, ঠিক যেমন ছোট্ট Xlthlx-এর সময়ে হয়েছিল। চাঁদ আর পৃথিবীর মাঝখানে কিছুক্ষণ বাতাসে ভেসে রইল, মাথা নিচে পা ওপরে, তারপর সর্বশক্তি লাগিয়ে হাত দুটো আগুপিছু করতে লাগল, যেন স্রোতের বিপরীতে সাঁতার কাটছে, অতি অস্বাভাবিক ধীরগতিতে ও আমাদের গ্রহের পানে এগিয়ে আসতে লাগল।

চাঁদ থেকে অন্যান্য নাবিকরা তাড়াহুড়ো করে ওকে অনুকরণ করতে লাগল। যে চাঁদের দুধ সংগ্রহ করা হয়েছিল, সেসব সঙ্গে করে নৌকোয় নিয়ে যাবার কথা কেউ ভাবলও না, আর এর জন্য ক্যাপ্টেনও ওদের কোনোরকম বকাবকি করলেন না। অপেক্ষা করতে গিয়ে এর মধ্যেই ওরা বেশ দেরি করে ফেলেছে, দূরত্বটা অতিক্রম করা তখন বেশ কঠিন; ওরা যখন আমার ভাইয়ের ডিগবাজি খাওয়া আর সাঁতার দেওয়ার ব্যাপারটা নকল করতে গেল, মাঝ আকাশে ত্রিশঙ্কু হয়ে ওরা হাতড়াতে লাগল। “আরে বুদ্ধুরা, একসাথে জড়াজড়ি করে থাক! একসাথে জড়াজড়ি করে থাক!” ক্যাপ্টেন চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলতে লাগলেন। এই হুকুম শুনে নাবিকরা একজোট হবার চেষ্টা করতে লাগল, দলবদ্ধ হয়ে ধাক্কা মারার চেষ্টা, যতক্ষণ না পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণে ফিরে আসা যায় – তারপর হঠাৎ অনেকগুলো শরীর একসঙ্গে ছলাৎ করে সমুদ্রে এসে পড়ল।

ওদের উদ্ধার করে আনার জন্য সব নৌকো দাঁড় বাইতে লাগল। “দাঁড়াও! দাঁড়াও! ক্যাপটেনের স্ত্রীকে দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না!” আমি আর্তনাদ করে উঠলাম। ক্যাপ্টেনের স্ত্রীও ঝাঁপ দেবার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু উনি চাঁদ থেকে মাত্র কয়েক গজ দূরে ভাসছেন, খুব আস্তে আস্তে ওঁর দীর্ঘ রুপোলি হাত হাওয়ায় নাড়ছেন। মই বেয়ে আমি ওপরে উঠে পড়লাম, ওঁকে কিছু একটা আঁকড়ে ধরার নিরর্থক চেষ্টা করে হার্পটা ওঁর দিকে বাড়িয়ে ধরলাম। “আমি ওঁর কাছে পৌঁছতে পারছি না! আমাদের ওঁর পেছন পেছন যাওয়া উচিত!” বলে আমি হার্পটা বাড়িয়ে ধরে ঝাঁপ দেবার উপক্রম করলাম। মাথার ওপরে চাঁদের বিশাল চাকতিটা আর আগের মত দেখাচ্ছে না – অনেক ছোট দেখাচ্ছে, আর ক্রমাগত সঙ্কুচিত হয়ে পড়ছে, যেন আমার দৃষ্টি ওটাকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে, রিক্ত আকাশটাকে অতলান্ত মনে হচ্ছে, যার তলদেশে তারাদের সংখ্যাবৃদ্ধি ঘটে চলেছে, রাত্রি যেন প্রবাহিণী শূন্যতায় আমাকে ভরিয়ে দিচ্ছে, বিহ্বলতা আর শঙ্কায় আমাকে ডুবিয়ে ফেলেছে।

“আমার ভয় করছে,” মনে মনে বলতে লাগলাম। “ঝাঁপ দিতে আমার খুব ভয় করছে। কাপুরুষ আমি!” আর সেই মুহূর্তেই আমি ঝাঁপ দিলাম। উন্মাদগ্রস্তের মত আমি আকাশে সাঁতরাতে লাগলাম, হার্পটা ওঁর দিকে বাড়িয়ে ধরে, কিন্তু আমার দিকে আসার বদলে উনি কেবলই ঘুরপাক খেতে থাকলেন, প্রথমে আমি ওঁর অনুভূতিশূন্য মুখটা দেখতে পেলাম আর তারপরে ওঁর পেছনের দিকটা।

“আমাকে শক্ত করে চেপে ধরুন!” চেঁচিয়ে বললাম ওঁকে, ততক্ষণে আমি ওঁর থেকে এগিয়ে গেছি, ওঁর শরীরের সঙ্গে আমার শরীর জড়িয়ে নিয়েছি। “জড়াজড়ি করে থাকলেই আমরা নিচে নামতে পারব!” দেহের সমস্ত বল এক করে আমি ওঁকে আরও নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরলাম। সেই আলিঙ্গনের পূর্ণতা আমাকে পুলকিত করছিল, তাই আমার সমগ্র চেতনাকে একাগ্র করতে লাগলাম। এতটাই মগ্ন হয়ে পড়েছিলাম যে বুঝতেই পারিনি যে বাস্তবে আমি ওঁর ভরশূন্য অবস্থা থেকে ছিন্ন করে ওঁকে চাঁদের মাটিতেই গড়িয়ে পড়তে দিচ্ছিলাম। আমি কি সেটা বুঝতে পারিনি? নাকি প্রথম থেকে সেটাই আমার মতলব ছিল? যুক্তি দিয়ে চিন্তা করতে পারার আগেই শুনতে পেলাম আমার গলা থেকে একটা আওয়াজ বেরিয়ে এল, “আমিই আপনার সঙ্গে এক মাস থাকব!” নাকি উত্তেজনার বশে, “আপনার ওপরে” বলেই চেঁচিয়ে উঠেছিলাম – “আপনার ওপরেই এক মাস থাকব!” আর ঠিক তখনই চাঁদের মাটিতে পড়ে আমরা আলিঙ্গনচ্যুত হলাম আর ওই শীতল খাঁজের মধ্যে একে অপরের থেকে দূরে ছিটকে গেলাম।

আমি চোখ তুলে তাকালাম, চাঁদের জমি স্পর্শ করার পর প্রতিবারই যেমন করে থাকি, ভেবেছিলাম অন্তহীন ছাদের মত মাথার ওপরে পৃথিবীর সমুদ্র দেখতে পাব, দেখলামও, এবারেও দেখতে পেলাম, কিন্তু অনেক ওপর থেকে আর অনেক সরু, উপকূল, পাহাড়ের খাড়াই আর অন্তরীপের কিনারা দিয়ে ঘেরা, নৌকোগুলো কত ছোট লাগছে, বন্ধুদের মুখগুলো কেমন অচেনা লাগছে, ওদের কণ্ঠস্বর কত দুর্বল লাগছে! খুব কাছ থেকে একটা আওয়াজ শুনতে পেলাম – মিসেজ় Vhd Vhd হার্পটা খুঁজে পেয়েছেন, সোহাগের সঙ্গে সেটাতে হাত বোলাচ্ছেন, কান্নার মত করুণ একটা সুর বেরিয়ে আসছে।

দীর্ঘ এক মাসের সূচনা হল। চাঁদ শম্বুকগতিতে পৃথিবীর চারপাশে ঘুরে চলল। সেই ঝুলে থাকা গোলকে আমাদের পরিচিত তটরেখা আর দেখতে পাই না, পরিক্রমা করতে করতে নজরে আসে অতলান্ত সমুদ্র, আগ্নেয়গিরি থেকে জ্বলন্ত লাভার স্রোতের মরুভূমি, বরফে ঢাকা মহাদেশ, স্রোতস্বিনী নদীর জলে ধোওয়া পর্বতমালা, জলাবদ্ধ নগর, পাথুরে সমাধিক্ষেত্র, কাদামাটির সাম্রাজ্য। দূরত্বের ফলে সব রঙ মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছিল – দৃষ্টিকোণ বিসদৃশ, তাই প্রতিটা দৃশ্যই বিসদৃশ লাগত; হাতির পাল আর পঙ্গপালের ঝাঁক দল বেঁধে সমতলভূমির ওপর দিয়ে চলে যেত, কিন্তু তাদের জমাট বাধা সুবিশালত্ব আর ঘনত্ব থেকে একে অপরের থেকে আলাদা করে চেনার উপায় ছিল না।

আমার খুশি হওয়ারই কথা – এরকম একটা কিছু হওয়ারই তো স্বপ্ন দেখেছিলাম, ওঁর সঙ্গে একলা থাকব, চাঁদের সঙ্গে আমার ভাইয়ের অন্তরঙ্গতাকে আমি হিংসে করেছি, আর মিসেজ় Vhd Vhd’র ওপর এখন আমার একচেটিয়া অধিকার, চাঁদের দিন আর রাতের এই এক মাসের নির্বিঘ্ন সময় আমাদের সামনে পড়ে রয়েছে, চাঁদের ত্বকে জমে থাকা দুধে আমাদের পুষ্টিসাধন হতে থাকল, ওর টোকো স্বাদটা আমাদের জানাই ছিল। পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে থাকতাম যেখানে আমাদের জন্ম হয়েছিল। অবশেষে সেই পৃথিবীর বিস্তীর্ণ প্রান্তর, প্রাকৃতিক দৃশ্য সব কিছু পরিক্রমার পথে দেখে ফেললাম যা কোনও পৃথিবীবাসীর কোনোদিনই দেখার সুযোগ হয় না। চাঁদকে ছাড়িয়ে যেসব নক্ষত্র রয়েছে, এক টুকরো ফলের থেকেও বড় আলো দিয়ে তৈরি সেইসব নক্ষত্র, পেকে গিয়ে আকাশের ডালপালা থেকে যেন ঝুলে আছে, সবই আমার ভাস্বর প্রত্যাশাকে ছাপিয়ে গিয়েছিল, অথচ আমার কাছে সেটা নির্বাসন বই আর কিছুই মনে হত না।

আমি শুধুই পৃথিবীর কথা ভাবতাম। পৃথিবীর জন্যই আমরা অন্য কিছু না হয়ে আমাদের যেরকম হওয়া উচিত ছিল, সেরকমই রয়েছি; পৃথিবী থেকে ছিনিয়ে আমাদের ওপরে এনে ফেলা হয়েছে যেন আমি আর আমি নেই, উনিও আমার কাছে আর সেই উনি নেই। পৃথিবীতে ফিরে আসার জন্য আমি খুব উতলা হয়ে পড়েছিলাম, কোনোদিন ফিরে যেতে না পারার আশঙ্কায় ভয়ে কাঁপতাম। আমার অনুরাগের অলীক বাসনা, পৃথিবী আর চাঁদের মাঝখানে আমরা দুজনে যখন অবিচ্ছিন্ন হয়ে ঘুরপাক খাচ্ছিলাম, কেবল সেই ক্ষণটুকু পর্যন্তই টিকে ছিল; ভূত্বক থেকে বিচ্ছিন্ন হবার পর থেকে আমি এখন কেবল অপ্রাপ্তির হৃদয়বিদারক স্মৃতিমেদুরতার শিকার – একটা কোথাও-এর জন্য, একটা পারিপার্শ্বিকের জন্য, একটা পূর্বের জন্য, একটা পরের জন্য।

আমার তো এরকমই মনে হচ্ছিল। কিন্তু ওঁর? নিজেকেই প্রশ্নটা যখন করলাম তখন ভয়ে বুক কেঁপে যাচ্ছিল। কারণ উনিও যদি শুধু পৃথিবীর কথাই ভাবেন, সেটা উত্তম লক্ষ্মণ, উনি যে অবশেষে আমাকে বুঝতে পেরেছেন, এটা তারই ইঙ্গিত, কিন্তু এরকমও হতে পারে যে যা কিছু ঘটেছে সবই অর্থহীন, এখনও ওঁর অনুরাগ হয়ত আমার বোবা কালা খুড়তুতো ভাইয়ের দিকেই অচল হয়ে আছে। এটাও হতে পারে যে ওঁর কোনো অনুভূতিই হচ্ছে না। পুরোনো গ্রহটার দিকে উনি চোখ তুলেই তাকাননি, বরং ব্যথিত মনে করুণ একটা সুর গুনগুন করতে করতে আর হার্পে ছড় দিয়ে ঝঙ্কার তুলে ওই মরুভূমির মধ্যে বিচরণ করতে লাগলেন, যেন এই সাময়িক (যেমন আমার মনে হয়েছিল) চান্দ্র অবস্থানের সঙ্গে একাত্ম হয়ে গেছিলেন। এর থেকে কি মনে করা যেতে পারে, আমার প্রতিদ্বন্দ্বীর বিরুদ্ধে জয়লাভ করেছি? উহুঁ, আমি পরাজিত হয়েছি; ব্যর্থ পরাজয়। কারণ উনি বুঝে নিয়েছেন যে আমার ভাই কেবলমাত্র চাঁদকেই ভালবাসত, এখন ওঁর একমাত্র স্বপ্ন নিজেকেই চাঁদে রূপান্তরিত করা, সেই অতিমানবীয় প্রেমের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হওয়া।

যখন চাঁদ গ্রহ পরিক্রমা সম্পূর্ণ করল, আমরা আবারও দস্তার খাড়া পাহাড়ের ওপর এসে পড়লাম। একরাশ হতাশা নিয়ে চিনতে পারলাম – আমার সুদূরপরাহত কল্পনাতেও ছিল না যে দূরত্বের জন্য সেগুলো এত ক্ষুদ্রকায় মনে হবে। সমুদ্রের সেই কাদাটে ডোবার ধারে আমার বন্ধুরা আবার এসে জড়ো হয়েছে, অবশ্য ওরা সেই বেকার মইগুলো আনেনি; কিন্তু নৌকো থেকে অনেকগুলো লাঠির মত জিনিস উঁচিয়ে আছে ঠিক যেন লাঠির জঙ্গল; প্রত্যেকেই একটা করে লাঠি ঘোরাতে লাগল, সেগুলোর মাথায় হার্পুন কিংবা আঁকশি লাগানো, হয়ত শেষবারের মত চাঁদের দুধ চেঁছে আনার বাসনায় কিংবা হয়ত ওপরে ফেঁসে থাকা আমাদের মত হতভাগাদের উদ্ধার করবার জন্য। তবে একটু পরেই বোঝা গেল একটা লাঠিও চাঁদ অবধি পৌঁছনোর মত লম্বা নয়; লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে নিচে পড়ে হৃতমান হয়ে সমুদ্রের জলে ভাসতে লাগল, লাঠিগুলো আসলে হাস্যকরভাবে বেঁটে ছিল; আর এই বিশৃঙ্খলার মধ্যে কিছু কিছু নৌকো ভারসাম্য হারিয়ে উলটেই গেল। আর ঠিক তখনই, অন্য একটা নৌকো থেকে আরও লম্বা একটা লাঠি, যেটা এতক্ষণ পর্যন্ত জলের ওপর দিয়েই টেনে আনা হচ্ছিল, ওপরে ওঠানো হতে লাগল – সম্ভবত লাঠিটা বাঁশ দিয়ে বানানো, পরপর অনেকগুলো বাঁশ জুড়ে দেওয়া হয়েছে। লাঠিটা এত সরু বলে খুব আস্তে আস্তে ওঠাতে হচ্ছিল – বেশি বেশি দোলাতে থাকলে হয়ত ভেঙ্গেই যাবে। ফলে গায়ের সমস্ত জোর লাগিয়ে, খুব কায়দা করে তুলতে হচ্ছিল যাতে খাড়া ওজন সরাসরি নেমে এসে নৌকো ডুবিয়ে না দেয়।

হঠাৎই বোঝা গেল যে লাঠির মাথাটা চাঁদকে ছুঁতে পারবে, দেখলাম ওটা হেলতে দুলতে এগিয়ে আসছে, তারপর খাঁজকাটা মাটিতে এসে লাগল, কয়েক মুহূর্ত ওখানেই থেমে থাকল, তারপর হালকা একটা ঝটকার মত দিল, কিংবা বলা যেতে পারে যে ঝটকা ততটাই জোরে ছিল যাতে ওটা ঠিকরে উঠে আবার একই জায়গায় ঘুরে এসে ধাক্কা মারল, তারপর আবারও একবার সরে গেল। তখন আমি চিনতে পারলাম – ক্যাপ্টেনের স্ত্রী এবং আমি দুজনেই চিনতে পারলাম – আমার খুড়তুতো ভাইকে চিনতে পারলাম - ও ছাড়া আর কেউই হতে পারে না, চাঁদের মাটিতে ওর সর্বশেষ খেলায় মেতে উঠেছে, লাঠির ডগা থেকে চাঁদকে ভেলকি দেখাচ্ছে। দুজনেই বুঝতে পারলাম, কোনো দাক্ষিণ্য দেখানোর উদ্দেশ্যে ওর আগমন হয়নি, বরং তোমার মনে হবে ও যেন চাঁদকে ঠ্যালা দিচ্ছে, ওকে চলে যেতে সাহায্য করছে, যেন ওর দূরের কক্ষপথটা চিনিয়ে দিতে চাইছে। আর এই কাজটাও ও করছে একদম নিজস্ব ঢঙে – চাঁদের গতি প্রকৃতি আর অদৃষ্ট বিরোধী কোনো ইচ্ছের কথা ও মনেও আনতে পারে না। চাঁদ যদি এখন ওর কাছ থেকে সরে যেতেই চায় ও খুশিমনেই সেই আলাদা হয়ে যাবার ব্যপারটা মেনে নেবে যেমন এতদিন পর্যন্ত ও চাঁদের সান্নিধ্যে উৎফুল্ল হয়েছে।

এরকম এক পরিস্থিতিতে মিসেজ় Vhd Vhd’র করার কিইবা আছে? আর কেবল সেই বিশেষ মুহূর্তেই উনি প্রমাণ করে ছাড়লেন যে বোবা কালা মানুষটার প্রতি ওঁর অনুরাগ কোনোরকম খামখেয়ালের বশে নয়, বরং ওঁর কাছে এটা এমন একটা ব্রত যার নড়চড় হবার যো নেই। আমার ভাইয়ের ভালবাসা যদি দূরগামী চাঁদের প্রতি হয় তবে চাঁদে উনিও দূরত্ব বজায় রেখেই চলবেন। বাঁশের লাঠিটার দিকে যখন এগিয়ে গেলেন না, বরং হার্পটা আকাশপানে তুলে পৃথিবীর দিকে ঘুরিয়ে ধরে তারে ঝঙ্কার দিলেন, তখনই আমি একথা বুঝতে পেরে গেছিলাম। বললাম বটে আমি দেখলাম, তবে সত্যি কথাটা হল, পাশ থেকে এক ঝলকই কেবল ওঁকে দেখতে পেয়েছিলাম, কারণ বাঁশের লাঠিটা চাঁদের মাটি স্পর্শ করা মাত্র এক লাফে উঠে ওটা আঁকড়ে ধরেছিলাম, তারপর সাপের মত বাঁশের গাঁটে ভর দিয়ে বাহু আর হাঁটুতে হ্যাঁচকা দিতে দিতে ওপরে চড়তে লাগলাম। ঘনত্বহীন শূন্যে শরীর একেবারে হালকা হয়ে গেছিল, শুধু মাত্র মনের জোরই আমাকে পৃথিবীতে ফিরে আসার হুকুম জারি করছিল। কী উদ্দেশ্যে এখানে আসা সেটা বেমালুম বুলেই গেছিলাম, কিংবা আসার উদ্দেশ্য এবং তার দুর্ভাগ্যজনক পরিণতির কথাই তখন হয়ত বেশি বেশি করে মনে পড়ছিল। ততক্ষণে আমি সেই নড়বড়ে লাঠির এমন এক বিন্দুতে এসে পৌছে গেছি যেখানে আমার আর নিজে থেকে কোনও প্রয়াস করার প্রয়োজন ছিল না, শুধু মাথা নিচের দিকে রেখে পৃথিবীর আকর্ষণে নিজেকে ছেড়ে দেওয়া। তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে লাঠিটা ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে সমুদ্রে পড়ে গেল, নৌকোগুলোর মাঝখানে।

প্রত্যাবর্তনটা মধুরই হয়েছিল, স্বগৃহে ফিরে এলাম, তবুও ওঁকে হারিয়ে ফেলার কষ্ট সর্বক্ষণ আমার মনকে আচ্ছন্ন করে রাখল, আমার দু’চোখ নাগালের বাইরে চিরতরে চলে যাওয়া চাঁদের পানে তাকিয়ে ওঁর খোঁজ করে। আর ওঁকে দেখতেও পেলাম। যে জায়গায় ওঁকে ছেড়ে এসেছিলাম, উনি সেখানেই রয়েছেন, আমাদের ঠিক মাথার ওপরে একটা তটে উনি শুয়ে আছেন, কোনো কথা বলছেন না। ওঁর বর্ণও চাঁদের মতই হয়ে উঠেছে; হার্পটা একপাশে ধরে আছেন, কখনোসখনো একটা হাত নাড়ছেন আর তারপরে বিলম্বিত লয়ে এক-আধটা গৎ বাজাচ্ছেন। ওঁর বক্ষদেশ, ওঁর বাহু, ওঁর জঙ্ঘার গড়ন, যেমনটি আমার মনে গাঁথা ছিল, ঠাহর করতে পারছিলাম, যদিও চাঁদ তখন চ্যাপটা দূরবর্তী এক বৃত্তে পরিণত। এক ফালি চাঁদ প্রথম যখন আকাশে দেখা দিত আমি তখনও ওঁর দর্শন পাওয়ার চেষ্টা করতাম। চাঁদের কলা যতই বাড়তে থাকত, আমি ওঁকে কিংবা ওঁর শরীরের কোনো অংশকে ততই স্পষ্ট করে দেখতে পাচ্ছি বলে মনে হত। উনি, কেবল উনিই – যাঁর কারণে চাঁদ চাঁদ হয়ে উঠেছে – যেন শতসহস্ররূপে আমার কাছে প্রকাশিত হতেন। আর যেদিন পূর্ণ মহিমায় প্রকাশ পেতেন, প্রতিটা কুকুর সমস্ত রাত জুড়ে হাহাকার করে মরত, আর ওদের সাথে সাথে আমিও।  

--------

লেখক পরিচিতি:

ইতালো কালভিনো (১৯২৩-১৯৮৫) – ইতালীয় সাহিত্যিক এবং সাংবাদিক। ওঁর বিখ্যাত রচনাগুলির অন্যতম হল Our Ancestors (Trilogy), Cosmicomics, Invisivible Cities এবং If On A Winter’s Night A Travellor. তাঁর রচনা ব্রিটেন, অস্ট্রেলিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রে অত্যন্ত সমাদৃত। মৃত্যুর সময়ে সমকালীন ইতালীয় লেখকদের মধ্যে তাঁর রচনাই সর্বাধিক অনুদিত হয়েছে।

The Distance of the Moon গল্পটি তাঁর Cosmicomics ছোটগল্প সংকলন থেকে নেওয়া। এই বইটি ইতালীয় ভাষায় ১৯৬৫ সালে এবং এর ইংরেজি অনুবাদ ১৯৬৮ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়। এই সংকলনের প্রতিটি গল্পই তৎকালীন বৈজ্ঞানিক ধারণার ভিত্তিতে লেখা, যদিও বর্তমানে সেই সময়ের অধিকাংশ ধারণাই ভুল প্রমাণিত। গল্পটি ইতালীয় থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করেন উইলিয়াম উইভার।

অনুবাদক পরিচিতি:

উৎপল দাশগুপ্ত - অবসরপ্রাপ্ত ব্যাঙ্কার। কর্মজীবনের শুরু ভারত সরকারে অর্থ মন্ত্রক থেকে। অল্প লেখালেখি আর অনুবাদের কাজ করেন। তবে নিজের লেখালেখির চাইতেও বই পড়তে বেশি ভালবাসেন, বিভিন্ন বিষয়ে।  ঘুরে বেড়াতে, অবসর সময়ে গান শুনতে ভালবাসেন। শখের ফটোগ্রাফি করে থাকেন। কলকাতায় থাকেন।





একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

1 মন্তব্যসমূহ