পর্ব: ৩৫
অনুবাদ: উৎপল দাশগুপ্ত
স্কারলেট যখন ওই বাড়ি থেকে বেরিয়ে এল, বৃষ্টি হচ্ছে, ম্যাড়ম্যাড়ে ছাই রঙের আকাশ। চৌরাস্তার জওয়ানরা যার যার তাঁবুর ভেতরে ঢুকে পড়েছে। পথঘাট জনশূন্য। একটাও গাড়ির দেখা নেই। অতএব হেঁটে যাওয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই। পথটা কম নয়।
ক্লান্তিকে সঙ্গী করে হেঁটে চলা। ব্র্যান্ডির প্রভাবে শরীর গরম হয়েছিল। পা টেনে টেনে চলতে চলতে সেটাও ফিকে হয়ে আসছে। ঠাণ্ডা হাওয়া দিচ্ছে। হাড় অবধি কাঁপিয়ে দিচ্ছে। বৃষ্টির শীতল ছাট ছুঁচের মত মুখে এসে বিঁধছে। আন্ট পিটির পাতলা ক্লোক বৃষ্টির জল থেকে বাঁচাতে পারল না। পোশাকের খাঁজে খাঁজে জল। ভেলভেটের ড্রেসটার দফা যে রফা হয়ে যাচ্ছে জলে, বেশ বুঝছে স্কারলেট। জলে ভিজে বনেটের পালকগুলো নুয়ে পড়েছে। এদের প্রাক্তন মালিক, বৃষ্টিতে ভিজে যখন টারার স্যাঁতস্যাঁতে গোলাঘরে গিয়ে আশ্রয় নিত, পালকগুলো তখনো এমনি করেই নুয়ে পড়ত। ফুটপাথে পাতা ইটগুলো জায়গায় জায়গায় ভাঙ্গা, কোথাও কোথাও বেমালুম উধাও, বেশ অনেকটা জায়গা জুড়েই। গোড়ালি সমান কাদা। কাদায় আটকে স্লিপার খুলে যাচ্ছে বারবার। কাদা ছাড়ানোর জন্য নীচু হলেই স্কার্টের ঝুল কাদায় মাখামাখি হয়ে যাচ্ছে। ডোবাগুলো এড়িয়ে যাবার চেষ্টাও করছে না স্কারলেট। ভারি স্কার্টটা একটু তুলে ধরে আনমনে পা ডুবিয়ে দিচ্ছে। ভিজে পেটিকোট আর গোড়ালিতে প্যান্টালেটের ঠাণ্ডা বেশ মালুম পড়ছে। ড্রেসের এই ছোটোখাটো অসঙ্গতি নিয়ে আর মাথা ঘামানোর সময় নয় এখন। জুয়ো খেলতে গেছিল এই পোশাকটা পরে। হেরে গেছে। শীতে কাবু, হতাশ আর মরিয়া এখন।
কী করে টারায় ফিরে যাবে আর কীভাবে সবার কাছে মুখ দেখাবে এখন? কত বড় বড় কথা বলে এসেছিল তখন! কীভাবে বলবে ওদের, টারার মায়া ত্যাগ করতে হবে – আর কোথাও মাথা গোঁজার ঠাই খুঁজতে হবে? লালে ঢাকা খেত, লম্বা পাইনের সারি, ছায়াময় জলাভূমি, শান্ত সমাধিভূমি যেখানে সেডারের ছায়ার নীচে এলেন চিরনিদ্রায় শুয়ে আছেন – এসব কীভাবে ছেড়ে যাবে?
পিচ্ছিল পথ ধরে চলতে চলতে রেটের প্রতি ঘৃণায় দগ্ধে মরছিল। কী বদমাশ লোক! ওঁকে যেন ফাঁসিই দেয় ওরা, তাহলে এই অপমান আর লজ্জার গ্লানি নিয়ে আর কোনোদিনই ওঁর মুখোমুখি হতে হবে না! টাকা উনি নিশ্চয়ই দিতে পারতেন, একটু সদিচ্ছা থাকলেই! তবে দুঃখের কথা হল ফাঁসিটা ওঁর জন্য যথেষ্ট সাজাই নয়! কপাল ভাল, উনি ওকে এই অবস্থায় দেখতে পাচ্ছেন না! জলে ভিজে জামাকাপড় সপসপ করছে, চুল এলোমেলো হয়ে আছে, দাঁত কপাটি লেগে যাচ্ছে! নিশ্চয়ই ওকে খুব খারাপ দেখাচ্ছে, দেখতে পেলেই উনি হেসে উঠতেন!
যে সব নিগ্রোর পাশ দিয়ে গেল, ওকে দেখে ব্যঙ্গের হাসি হাসল আর হেসে হেসে নিজেদের মধ্যেই কী সব বলাবলি করতে লাগল। দ্রুত পা চালিয়ে পাশ কাটিয়ে এগোতে থাকল। কখনো কাদা পা হড়কে যাচ্ছে, শরীরটা টাল খেয়ে যাচ্ছে, আবার মাঝে মাঝে দাঁড়িয়েও পড়তে হচ্ছে হাঁপাতে হাঁপাতে কাদা থেকে চপ্পল ছাড়িয়ে নেবার জন্য। ওই কালো কালো হনুমানগুলো, কী সাহস ওকে দেখে হাসছে! টারার স্কারলেট ও’হারাকে দেখে হেসে ফেলার আস্পর্ধা! চাবকানো উচিত ওদের সক্কলকে, যতক্ষণ না পিঠ থেকে দরদর করে রক্ত না বেরিয়ে আসে! জিয়াঙ্কিদেরও বলিহারি, এদের স্বাধীন করে দিয়েছে, সাদা চামড়াদের দেখে ঠাট্টা করার স্বাধীনতা!
ওয়াশিংটন স্ট্রীট ধরে হেঁটে চলার সময় যে দৃশ্য চোখে পড়ছে সেটা যেন ওর মনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে একই রকম বিষণ্ণ। পীচট্রী স্ট্রীটে যেমন দেখে, এখানে সেই হই হট্টগোলটাই নেই। কত সুন্দর সুন্দর বাড়ি এক সময় ছিল এই রাস্তার ওপরে, খুব কম বাড়িই আবার নতুন করে বানানো হয়েছে। পুড়ে খাক হয়ে যাওয়া বাড়ির দালান আর কালি মাখা নিঃসঙ্গ চিমনিগুলো জেগে আছে। এখানকার লোক ওগুলোকে ‘শেরম্যানের প্রহরী’ বলে ডাকে এখন। একটু পরে পরেই মাথা উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে, দেখলে মন খারাপ হয়ে যায়। একদা বিদ্যমান অট্টালিকাগুলোর প্রবেশ তোরণ আজ আবর্জনায় ভরে আছে, পুরনো লনগুলোতে মরা আগাছায় ভরে আছে, গাড়ি রাখবার জায়গাগুলোতে এখনও পরিচিত নামের ফলক লাগানো, থামগুলোতে আর কোনোদিনই ঘোড়া বাধা হবে না হয়ত। শীতল হাওয়া, বৃষ্টি, কাদা, ন্যাড়া গাছের সারি, নিস্তব্ধতা আর নির্জনতা – চারপাশ খাঁ খাঁ করছে। পায়ের পাতা ভিজে একেবারে স্যাঁতসেঁতে, বাড়ি অনেক দূর!
পেছন থেকে ঘোড়ার খুরের ছলাৎ ছলাৎ শব্দ কানে এল। আরেকটু এগিয়ে গিয়ে সরু ফুটপাথের ওপর উঠে দাঁড়াল, যাতে আন্ট পিটির ক্লোকের ওপর আরও কাদা না ছেটে। একটা গাড়ি ধীরে ধীরে টানতে টানতে একটা ঘোড়া রাস্তা ধরে আসছে। স্কারলেট ঘাড় ঘুরিয়ে নজর রাখল, যদি সাদা চামড়ার কেউ হন, তাহলে ওকে উঠিয়ে নেবার জন্য অনুরোধ করবে। গাড়িটা এগিয়ে আসছে, কিন্তু বৃষ্টির জন্য ঠিকমত দৃষ্টি চলছে না। গাড়ির চালক ত্রিপলের ফাঁক দিয়ে রাস্তার ওপর নজর রাখার চেষ্টা করছেন। ত্রিপল দিয়ে পা থেকে চিবুক পর্যন্ত ঢাকা। রাস্তায় নেমে আরও ভাল করে নজর করতে গিয়ে মনে হল মুখটা যেন আগে দেখেছে। ভদ্রলোক লাজুকভাবে একবার কাশলেন। তারপর খুব পরিচিত একটা কণ্ঠস্বর কানে এল, একই সঙ্গে খুশি আর বিস্ময় মেশানো। “মিস স্কারলেট না? আশা করি চিনতে ভুল করিনি!”
“আরে, মিস্টার কেনেডি যে!” স্কারলেট চেঁচিয়ে উঠল। কাদার মধ্যে দিয়েই দৌড়ে গিয়ে কাদা মাখা চাকার ওপর দিয়ে ঝুঁকে পড়ল। আন্ট পিটির ক্লোকটা যে আরও নোংরা হয়ে যাবে তার ভ্রূক্ষেপ না করেই। “কারোর দেখা পেয়ে এত আনন্দ আমি আর কখনও পাইনি!”
বলার মধ্যে আন্তরিকতার স্পর্শটা বুঝতে পেরে ভদ্রলোক লজ্জায় রাঙা হয়ে উঠলেন। উনি তাড়াতাড়ি গাড়ির অন্য পাশ দিয়ে মুখ থেকে পিচকারির মত তামাকের পিক ফেলে এক লাফে রাস্তায় নেমে এলেন। খুব উৎসাহ নিয়ে ওর সঙ্গে করমর্দন করলেন, তারপর ত্রিপল উঠিয়ে ওকে গাড়িতে উঠতে সাহায্য করলেন।
“মিস স্কারলেট, এই জায়গায় একা একা আপনি কী করছেন? জানেন না, আজকাল চারদিকে কত রকমের বিপদ? আরে, আপনি তো একেবারে ভিজে গিয়েছেন! নিন, এই কাপড়টা পায়ে জড়িয়ে নিন।”
আনাড়ির মত হাত পা নেড়ে উনি কী সব বকবক করে গেলেন। স্কারলেট পরম আয়েশে ওঁর যত্ন নেবার প্রয়াসটা উপভোগ করল। একজন পুরুষমানুষ পাশে বসে ব্যতিব্যস্ত হয়ে বকবক করে চলেছেন, ওকে বকাবকি করছেন – অনুভব করার মধ্যে একটা ভালোলাগা আছে – হোন না সেই পুরুষমানুষটি ফ্র্যাঙ্ক কেনেডিই – হোক না ওঁর ব্যবহারটা একজন বৃদ্ধা পরিচারিকার মত! তার ওপর রেটের নিষ্ঠুর ব্যবহারের পর ওঁর এই সহানুভূতি দেখানো কথাগুলো তো একেবারে হাতে চাঁদ পাওয়ার মত। আর বাড়ি থেকে এত দূরে কাউন্টির একজন চেনাশোনা মানুষের সাক্ষাৎ পাওয়া কী কম ভাগ্যের! উনি যে সুসজ্জিত সেটাও ওর নজর এড়াল না। ঘোড়ার গাড়িটাও একেবারে নতুন। ঘোড়াটাও চনমনে আর কমবয়সি, খাবারদাবার ভালই জোটে বোঝা যাচ্ছে। তবে ফ্র্যাঙ্ককে ওঁর বয়সের তুলনায় একটু বেশি বৃদ্ধ দেখাচ্ছে। বড়দিনের আগের সন্ধ্যেবেলা – ওঁর সঙ্গীসাথীদের নিয়ে টারাতে এসেছিলেন – তার চেয়েও বেশি বৃদ্ধ দেখাচ্ছে। কৃশ লাগছে, আর একটু ফ্যাকাসেও। চোখদুটো কোটরে ঢুকে গেছে, কেমন যেন ভিজে ভিজে একটা ভাব। দাড়ির বাদামি চুলগুলোও অনেক ঝরে গেছে। তামাকের পিকে মাখামাখি। দাঁড়ি এলোমেলো, মনে হয় অবিরাম দাঁড়ি ধরে টানাটানি করেন। তবে ওঁকে বেশ খুশি খুশি লাগছে আর বেশ নিশ্চিন্তও। আজকাল সবার চেহারায় যে দুশ্চিন্তা আর দুঃখের ছাপ স্কারলেট দেখতে পায়, তার থেকে একেবারে আলাদা।
“আপনার সঙ্গে দেখা হয়ে খুব ভাল লাগছে,” কৃতার্থ কণ্ঠে ফ্র্যাঙ্ক বললেন। “আপনি যে শহরে এসেছেন, আমার জানাই ছিল না। এই তো, মাত্র গত সপ্তাহেই মিস পিটিপ্যাটের সঙ্গে দেখা হল। আপনি যে আসবেন, উনিও কিছু বলেননি। আর – মানে – টারা থেকে আর কেউ কি আপনার সঙ্গে এসেছেন?”
নির্ঘাত স্যুয়েলেনের কথা ভাবছেন। মানুষটা যেমন বোকা, তেমনই সরল।
“উহুঁ,” পশমের কাপড়টা টেনে গলার কাছটা ঢাকতে ঢাকতে বলল। “একাই এসেছি। আন্ট পিটিকেও আগে থেকে না জানিয়েই এসেছি।”
বিড়বিড় করে ঘোড়াটাকে তাড়া লাগালেন। ঘোড়াটা সাবধানে সরু রাস্তাটা ধরে এগিয়ে চলল।
“টারায় সবাই ভাল আছেন?”
“হ্যাঁ, চলে যাচ্ছে মোটামুটি।”
কথা চালিয়ে যাওয়ার জন্য একটা প্রসঙ্গ প্রয়োজন। অথচ কথা বলতে একদম ইচ্ছে হচ্ছে না। পরাজয়ের গ্লানি নিয়ে মনটা সীসের মত ভারি হয়ে আছে। ইচ্ছে করছে এই গরম কম্বলটা জড়িয়ে শুয়ে পড়ে আর মনে মনে বলে, “টারা নিয়ে এখন কিচ্ছু ভাবব না। পরে ভাবব, তখন হয়ত এতটা কষ্ট হবে না।” এমন একটা প্রসঙ্গ যদি ওঁকে ধরিয়ে দেওয়া যেত যাতে উনি বাড়ি অবধি নিজের মনেই বকবক করে যেতেন, আর ও মাঝে মাঝে ‘কী ভাল!’ “আপনি তো দারুণ চালাক!’ এই জাতীয় মন্তব্য করে যেতে পারত!
“মিস্টার কেনেডি, আপনাকে দেখে আমি সত্যিই খুব অবাক হয়েছি। নিজের সাফাই গাইব না, আমি পুরনো বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে সর্বদা যোগাযোগ রেখে উঠতে পারি না। কিন্তু আপনি যে অ্যাটলান্টাতেই আছে, এই খবরটা আমার একদম জানা ছিল না। কে যেন আমাকে বলেছিল, আপনি নাকি মারিয়েট্টাতে থাকেন।”
“হ্যাঁ, মারিয়েট্টাতেই আমার ব্যবসা – বেশ বড়সড় কারবার,” ফ্র্যাঙ্ক বললেন। “মিস স্যুয়েলেন বলেননি আপনাকে যে অ্যাটলান্টাতেই আমি আস্তানা গেড়েছি? আমার স্টোরের কথাও কিছু বলেননি?”
স্যুয়েলেন ফ্র্যাঙ্ক আর ওঁর স্টোর নিয়ে কী একটা বেশ বলছিল, স্কারলেটের অস্পষ্টভাবে মনে পড়ল। তবে স্যুয়েলেন সব কথার মতই এই কথাটাও এক কান দিয়ে ঢুকে অন্য কান দিয়ে বেরিয়ে গেছিল। ফ্র্যাঙ্ক বেঁচেবর্তে আছেন আর কোনো একদিন স্যুয়েলেনকে ওর ঘাড় থেকে নামিয়ে নেবেন, এটুকুই জানাই ওর কাছে অনেক।
“না, কিছু বলেনি তো?” মিথ্যে করে বলল। “আপনি একটা স্টোর করে ফেলেছেন? কী করিতকর্মা মানুষ আপনি!”
খবরটা স্যুয়েলেন কারো কাছে প্রকাশ করেনি শুনে মুখটা সামান্য বেদনাতুর হয়ে উঠল। আবার তোষামুদে কথা শুনে প্রসন্নও হলেন।
“হ্যাঁ, আমার একটা স্টোর আছে, বেশ বড়সড়ই একটা, অন্তত আমার চোখে। বন্ধুবান্ধবরা তো বলে আমি নাকি জন্ম থেকেই একেবারে ঝানু ব্যবসায়ী,” দিল খুলে হাসলেন। হাসতে গেলেই গলা থেকে বের হওয়া ঘড়ঘড়ে শব্দটা স্কারলেটকে খুব জ্বালাতন করছিল।
“বুড়ো আহম্মকটার অহঙ্কার দেখ একবার!” মনে মনে ভাবল।
“যাতেই আপনি হাত লাগাবেন, সোনা ফলবে, মিস্টার কেনেডি। কিন্তু এই স্টোরের ব্যাপারটা মাথা আপনার এলো কীভাবে? বড়দিনের সময় যখন আমাদের দেখা হল, তখন তো আপনি একেবারে কপর্দকশূন্য!”
খাঁকারি দিয়ে গলাটা পরিষ্কার করে নিলেন। দাড়িতে হাত বোলাতে বোলাতে ভীরু লাজুক হাসলেন।
"সে এক লম্বা ইতিহাস, মিস স্কারলেট।”
“নিশ্চিন্ত করলে, হে ঠাকুর!” মনে মনে ভাবল। “একবার চালু করিয়ে দিতে পারলে, বাড়ি পর্যন্ত টেনে দেবেন। মুখে বলল, “বলুন না আমাকে!”
“আপনার মনে আছে – রসদের সন্ধানে শেষ যেবার টারাতে গেলাম? তার অল্প দিনের ভেতরেই আমি সরাসরি লড়াই করতে চলে গেলাম। একেবারে মুখোমুখি লড়াই বলতে পারেন! প্রতিনিধি হয়ে কাজ করা ছেড়ে দিলাম। প্রতিনিধিরও আর তেমন কিছু প্রয়োজনও ছিল না, মিস স্কারলেট, কারণ সেনাবাহিনীর জন্য রসদ জোগাড় করা বেশ কঠিন হয়ে পড়েছিল। মনে হল, সুস্থ সবল একজন মানুষের সত্যিকারের জায়গা হল লড়াইয়ের ময়দান। ঘোড়সওয়ার বাহিনীর সঙ্গে বেশ কিছুদিন কাটালাম। তারপর আমার কাঁধে একটা বুলেট লাগল।”
খুব গর্বের সঙ্গে তাকালেন। স্কারলেট বলে উঠল, “কী সাংঘাতিক!”
“চোট অবশ্য বেশি কিছু নয়, মাংস কেটে বেরিয়ে গেছে মাত্র,” বিনয়ের সঙ্গে স্বীকার করলেন। “দক্ষিণের একটা হাসপাতালে আমাকে পাঠিয়ে দেওয়া হল। প্রায় যখন সেরে উঠেছি, ইয়াঙ্কি হানাদাররা দলবল নিয়ে ধেয়ে এল। সে কী ভয়ানক সব দিন! একেবারেই তৈরি ছিলাম না। যারা মোটামুটি হাঁটতে পারছিলাম আর্মির স্টোরের মালপত্র আর হাসপাতালের সরঞ্জাম তুলে নিয়ে রেল লাইনের ধারে জড়ো করলাম, সরিয়ে ফেলার জন্য। একটা ট্রেনে কিছু মালপত্র আমরা বোঝাই করে ফেলতে না ফেলতেই ইয়াঙ্কিরা শহরের একটা প্রান্তে ধেয়ে এল, আমরাও শহরের অন্য প্রান্তে যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলাম। সে কী করুণ দৃশ্য! ট্রেনের ছাদে বসেই দেখলাম ডিপোতে ছেড়ে আসা মালপত্রে ইয়াঙ্কিরা আগুন ধরিয়ে দিল! প্রায় আধ মাইল জুড়ে সেই চিতা জ্বলছিল। আমরা অবশ্য পালিয়ে আসতে পেরেছিলাম!”
“কী সাংঘাতিক!”
“একদম ঠিক কথা বললেন। সাংঘাতিক। আমাদের লোকেরা অ্যাটলান্টায় ফিরে এসেছিল, তাই আমাদের ট্রেনটা সেখানেই পাঠানো হল। মিস স্কারলেট, এসব লড়াই থেমে যাওয়ার বেশি আগেকার ঘটনা নয় – চিনেমাটির অনেক বাসনপত্র, খাট-পালঙ্ক, গদি, কম্বল পড়েছিল – আর দাবিদার কেউই ছিল না। অবশ্য আত্মসমর্পণের চুক্তি অনুযায়ী এই সব জিনিসের দাবিদার ইয়াঙ্কিদেরই হওয়ার কথা। ঠিক কিনা?”
“হুম,” অন্যমনস্কভাবে স্কারলেট বলল। শরীরের ওম ফিরছে এখন, চোখটা লেগেও আসছে।
“আজও বুঝে উঠতে পারিনি কাজটা আমি ঠিক করেছিলাম কিনা,” সামান্য দ্বিধা নিয়ে কথাটা বললেন। “তবে আমি যুক্তি দিয়ে যা বুঝেছি, ওসব জিনিস ইয়াঙ্কিদের কোনো কাজেই লাগবে না। হয়ত ওরা পুড়িয়েই ফেলবে। অথচ আমাদের লোকেরা রীতিমত গাঁটের কড়ি খরচ করে এই সব জিনিস সংগ্রহ করেছে। তাই আমি এখনও মনে করি এগুলো কনফেডারেসি বা কনফেডারেটদের সম্পত্তি। কী বলতে চাইছি, বুঝতে পারছেন তো?”
“হুঁ।”
“যাক, আপনি তাহলে আমার সঙ্গে একমত, মিস স্কারলেট। আসলে কী জানেন, বিবেকের দংশনে জ্বলছি। কতজন আমাকে বলেছেন, ‘আরে ওসব ভাবনা মন থেকে তাড়াও, ফ্র্যাঙ্ক,’ কিন্তু আমি তাড়িয়ে উঠতে পারছি না। কাজটা ঠিক করিনি ভেবে মাথা আমার হেঁট হয়ে যায়। আপনার কী মনে হয়, কাজটা ঠিক করেছি?”
“অবশ্যই ঠিক করেছেন,” স্কারলেট জবাব দিল। মনে মনে ভাবতে লাগল বোকা মানুষটা কী নিয়ে কথা বলছেন! বিবেকের দংশন টংশন – না কী সব যেন। ফ্র্যাঙ্ক কেনেডির মত বয়স্ক মানুষদের বোঝা উচিত এই সব ব্যাপার নিয়ে ফালতু মাথাব্যথা করার কোনও মানেই হয় না, বিশেষ করে যখন তা নিয়ে কারোই কিছু এসে যাচ্ছে না! মানুষটাই আসলে বায়ুগ্রস্ত আর ব্যস্তবাগীশ আর মেয়েদের মতই ভীরু স্বভাবের।
“আপনার কথা শুনে খুব নিশ্চিন্ত বোধ করছি। আত্মসমর্পণের পরে আমার সম্বল বলতে ছিল রৌপ্যমূদ্রায় দশ ডলারের মত, আর এক কপর্দকও নয়। জোন্সবোরোতে আমার বাড়ি আর স্টোরের হাল ওরা কী করে ছেড়েছিল, সেটা তো আপনার জানাই আছে। আমি হালে পানিই পাচ্ছিলাম না। আমি তখন সেই দশ ডলার দিয়ে ফাইভ পয়েন্টের কাছে পুরনো একটা স্টোরের ছাদ দিয়ে দিলাম আর হাসপাতালের জিনিসপত্র ওখানে রেখে বিক্রি করতে লাগলাম। পালঙ্ক, চিনে মাটির বাসনপত্র, গদি সকলেরই প্রয়োজন। আমি খুব সস্তায় ওগুলো ছেড়ে দিতে লাগলাম, কারণ আমার মনে হল ওই সব জিনিসপত্রে আমার থেকে ওঁদের অধিকার কিছু কম নয়। তবে আমি ওতে কিছু টাকা লাগিয়েছি, আর নতুন কিছু মালপত্রও কিনেছি। তা স্টোর ভালই চলতে শুরু করল। সব ঠিকঠাক চললে, মনে হয়, আমি বেশ কিছু টাকা কামাই করে ফেলতে পারব।”
“টাকা” কথাটা শুনেই স্কারলেটের সম্বিত ফিরল, ওর মন আবার তৎপর হয়ে উঠল।
“কী যেন বললেন – আপনি টাকা কামাই করে ফেলেছেন?”
স্কারলেটের কৌতুহল দেখে বক্ষ স্ফীত হয়ে উঠল। খুব কম মহিলাই ওঁকে ওপর ওপর সৌজন্য দেখানো ছাড়া বিশেষ পাত্তা দেননি, স্যুয়েলেনই তার মধ্যে একমাত্র ব্যতিক্রম। আর স্কারলেট – যে কিনা এক সময় ছেলেদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু ছিল – সে ওঁর কথা এত আগ্রহ নিয়ে শুনছে! ব্যপারটা খুবই তৃপ্তিকর! রাশ টেনে ধরে উনি ঘোড়ার গতি কমালেন, যাতে পুরো কাহিনী বলার আগে যেন ওঁরা বাড়ি না পৌঁছে যান।
“কোটিপতি আমি অবশ্যই নই, মিস স্কারলেট। কিন্তু এক সময় আমার যত টাকাকড়ি ছিল তার তুলনায় এখন যেটুকু কামিয়েছি, তা নিতান্তই সামান্য। তবে চলতি বছরে আমি হাজার ডলার আয় করেছি। হ্যাঁ, নতুন মালপত্র কেনা, স্টোরের মেরামতি আর ভাড়া দেবার জন্য পাঁচশ ডলার খরচ হয়েছে। কিন্তু বলতে পারেন বাকি পাঁচশ ডলার আমার নগদ আয়, ব্যবসাও ভালই চলছে। পরের বছর খরচ-খর্চা বাদ দিয়ে অন্তত দু’হাজার ডলার তো বেঁচেই যাবে। টাকাটা খুবই কাজে আসবে। আরেকটা লোভনীয় কারবারের কথা মাথায় ঘুরছে!”
টাকাকড়ির কথায় স্কারলেটের আগ্রহ এখন একেবারে চূড়ায় পৌঁছে গেছে। লম্বা পালকে চোখদুটো আড়াল করে ও ফ্র্যাঙ্কের দিকে ঘনিয়ে বসল।
“সেটা কী রকম ব্যাপার, মিস্টার কেনেডি?”
হাসতে হাসতে উনি লাগাম দিয়ে ঘোড়ার পিঠে হালকা করে বাড়ি মারলেন।
“এইসব ব্যবসাপাতির কথা তুলে, মনে হয়, আপনাকে খুব বিরক্ত করে ফেলছি, মিস স্কারলেট। আপনার মত সুন্দরী একজন মহিলার ব্যবসাপাতি নিয়ে বেশি মাথা ঘামানোর দরকারই পড়ে না।”
বুড়ো ভাম।
“তা যা বলেছেন, ব্যবসাপাতির ব্যপারটা আমার মাথাতেই ঢোকে না। কিন্তু শুনতে এত ভাল লাগছে! বলুন আপনি, আর কিছু বুঝতে না পারলে আপনি তো নিশ্চয়ই বুঝিয়ে দেবেন!”
“বেশ, লোভনীয় কারবারটা হল একটা করাত মিলের।”
“একটা কিসের?”
“ওই একটা কারখানা আর কি, যেখানে গাছের গুঁড়ি কেটে তক্তা বানানো হয়। কিনিনি এখনও, তবে কিনে ফেলব। জনসন নামে একজন লোকের একটা মিল আছে, পীচট্রী স্ট্রীট থেকে বেশ দূরে, হন্যে হয়ে ওটার একজন খদ্দের খুঁজছেন। এই মুহূর্তে কিছু নগদ টাকার ওঁর বিশেষ দরকার, তাই বিক্রি করে ওখানেই সাপ্তাহিক মজুরির ভিত্তিতে কাজ করতে রাজি। ওই অঞ্চলে অনেকগুলো মিলের মধ্যে এই মিলটাও একটা, মিস স্কারলেট। বেশিরভাগ মিলই ইয়াঙ্কিরা ভেঙ্গে চুরমার করে দিয়েছে। করাত মিলের মালিক হওয়া আর সোনার খনির মালিক হওয়া প্রায় একই ব্যাপার। তক্তার জন্য আপনি যা খুশি দাম হাঁকাতে পারেন। ইয়াঙ্কিরা এত বাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছে, বসবাসযোগ্য বাড়ি নেই বললেই চলে, আর মানুষ তাই সেগুলো নতুন করে বানিয়ে ফেলার জন্য পাগল হয়ে পড়েছে। যথেষ্ট তক্তার খুবই অভাব, আর সহজে পাওয়াই যায় না। দলে দলে লোক এসে অ্যাটলান্টায় এসে করছে। ওই যাদের কাছে নিগারদের ছাড়া চাষবাসের কাজ চালানো দুষ্কর হয়ে পড়েছে। তার ওপর ইয়াঙ্কি আর কার্পেটব্যাগাররাও পঙ্গপালের মত চলে আসছে, আমাদের আরও বেশি করে জ্বালাতন করবার জন্য। দেখে নেবেন, কিছুদিনের মধ্যেই অ্যাটলান্টা অনেক বড় শহর হয়ে যাবে। বাড়ি বানানোর জন্য তক্তার দরকার পড়বে। মিলটা তাই কিনেই নেব ভাবছি – ধারে কিছু মাল বিক্রি করেছি, সেই বকেয়া টাকাগুলো হাতে আসবার যা অপেক্ষা। সামনের বছর এই সময় টাকাকড়ি নিয়ে দুর্ভাবনা অনেকটাই কমে যাবে। কেন যে আমার – কেন আমি এত তাড়া করছি – সেটা তো আপনি বুঝতেই পারছেন, তাই না?”
কথাটা বলেই আবার লাজুকভাবে ঘড়ঘড় করলেন। উনি স্যুয়েলেনের কথা ভাবছেন। স্কারলেট বিরস মনে ভাবল।
ক্ষণেকের জন্য স্কারলেট ভাবল, ওঁর কাছ থেকে তিনশ ডলার ধার চেয়ে নিলে কেমন হয়, কিন্তু ক্লান্ত মনে ভাবনাটা বাতিল করে দিল। অস্বস্তিতে পড়ে যাবেন, তোতলাতে থাকবেন, নানারকম দোহাই দেবেন, কিন্তু টাকাটা ধার উনি দেবেন না। অনেক পরিশ্রম করে টাকাটা উনি জমিয়েছেন যাতে স্যুয়েলেনকে শীতের পরেই বিয়ে করতে পারেন। টাকাটা হাতছাড়া হওয়া মানেই বিয়েটা পিছিয়ে যাওয়া, কতদিনের জন্য কে জানে। যদি ওঁর সহানুভূতি আদায় করতেও পারে – হবু কুটুমের পরিবারের দোহাই দিয়ে – আর উনি যদি ধার দিতে নিমরাজিও হয়ে যান, স্যুয়েলেন ঠিক বাদ সাধবে। বয়স বেড়ে যাচ্ছে অথচ ওর আইবুড়ো দশা ঘুচছে না, এটা ভেবে স্যুয়েলেন ক্রমেই অধৈর্য হয়ে পড়ছে। দরকার হলে ও স্বর্গ মর্ত পাতাল তোলপাড় করে বিয়ে পিছিয়ে যাবার যে কোনো সম্ভাবনাকে রদ করে দেবে।
ওই খিটখিটে, ঘ্যানঘ্যানে মেয়েটার মধ্যে কী এমন পেয়েছেন এই বোকা বুড়ো লোকটা যে ওকে একটা নিরাপদ সংসার দেবার জন্য উনি মুখিয়ে আছেন? স্নেহময় একজন স্বামী আর স্টোর আর করাত মিলের লাভের গুড় খাওয়ার যোগ্যতা কি ওর আছে? একবার ওই টাকাতে স্যুয়ের হাত পড়ুক না, ওর চালিয়াতি আকাশ ছুঁয়ে যাবে, আর টারার রক্ষণাবেক্ষণের জন্য এক পয়সাও ওর আঙ্গুল দিয়ে গলবে না। নাহ্, স্যুয়েলেনকে ভরসা নেই! ও কেবল নিজেকে নিয়েই ভাববে, খাজনা নে মেটানোর জন্য টারা যদি চলেও যায় কি মাটিতে মিশে যায়, ওর কিছুই এসে যাবে না! ভাল ভাল পোশাক পরতে পারলে আর নামের আগে ‘মিসেজ়’ কথাটা লাগাতে পারলেই ও খুশি!
স্যুয়েলেনের নিরাপদ ভবিষ্যৎ আর নিজের এবং টারার বিপজ্জনক ভবিতব্যের কথা নিয়ে যতই ভাবতে লাগল, ওর মাথায় আগুন চড়তে লাগল। জীবনের কী পরিহাস! চট করে গাড়ির বাইরের কর্দমাক্ত পথটার দিকে চোখ ঘোরাল পাছে ওর ভাবগতিক ফ্র্যাঙ্কের নজরে পড়ে যায়। ও সব কিছু হারাতে বসেছে আর অন্য দিকে স্যু – হঠাৎ করে মনে মনে একটা সংকল্প করে ফেলল।
স্যুয়েলেন কিছুতেই ফ্র্যাঙ্ককে পাবে না, এমনকি ওঁর স্টোর আর মিলটাকেও না!
এর যোগ্যই নয় স্যুয়েলেন। এগুলো ও নিজেই দখল করবে। টারার কথা ভাবতেই জোনাস উইল্কারসনের কথা মনে পড়ে গেল – সিঁড়ির ধাপে দাঁড়িয়ে বিষোদ্গার করছে! জাহাজডুবি হয়ে গেছে ওর জীবনে, প্রাণপণে সম্মুখে ভাসমান খড়ের টুকরোটা আঁকড়ে ধরতে চাইল। রেট ওকে ডুবিয়ে দিয়েছেন, কিন্তু পরম করুণাময় ঈশ্বর ফ্র্যাঙ্ককে পাঠিয়ে দিয়েছেন!
কিন্তু ওঁকে পাওয়া কি সম্ভব? শূন্যদৃষ্টিতে বৃষ্টির দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে ওর হাতদুটো মুঠো পাকিয়ে উঠল। ওঁকে কি এমনভাবে পটিয়ে ফেলতে পারব যাতে স্যুকে ভুলে গিয়ে আমাকেই বিবাহের প্রস্তাব দিয়ে দেন – এবং খুব তাড়াতাড়ি? রেটকে তো বিবাহের প্রস্তাব দেবার জন্য প্রায় পটিয়েই ফেলেছিলাম। হ্যাঁ, আমার বিশ্বাস, ফ্র্যাঙ্ককে আমি পটিয়ে ফেলব! ফ্র্যাঙ্কের দিকে তাকাল, চোখের পাতাগুলো তিরতির করে কাঁপছে। একেবারেই সুপুরুষ নন – ঠাণ্ডা মাথায় কাটাছেঁড়া করতে আরম্ভ করল – মুখে খুবই দুর্গন্ধ, আর যা বয়স, আমার বাপ হতে পারেন। তার ওপর অসম্ভব আনাড়ি আর ভিতু, আর খুবই সাদাসিধে। জানি না আর কী কী দোষ একজন পুরুষমানুষের থাকতে পারে! তবে উনি নিপাট ভদ্রলোক, জীবনসঙ্গী হিসেবে উনি রেটের চেয়ে ঢের ভাল হবেন! অন্তত ওঁকে চালনা করা অনেক সহজ হবে। যাই হোক, ভিখিরিদের আবার পছন্দ অপছন্দ কী!
উনি যে প্রকৃতপক্ষে স্যুয়েলেনের প্রণয়ী, এই ভাবনাটাও ওর মনে বিবেকের দংশন জাগাতে পারল না। নীতিবোধকে সম্পূর্ণ বিসর্জন দিয়েই রেটের খোঁজে ও অ্যাটলান্টায় এসেছিল, তার তুলনায় ছোট বোনের বাকদত্তের দখল নেওয়া তো নিতান্তই অকিঞ্চিৎকর ব্যাপার। এটা নিয়ে অত ভাবাভাবির কী আছে?
নতুন করে আশার আলো দেখতে পেয়ে ওর শিরদাঁড়া টানটান হয়ে উঠল, পা দুটো যে জমে আছে, সেটা খেয়ালই রইল না। ওকে সরু চোখ করে তাকাতে দেখে ফ্র্যাঙ্ক একটু ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠলেন। স্কারলেট তাড়াতাড়ি চোখ নামিয়ে নিল। রেটের কথাগুলো মনে পড়ল, “তোমার মত ওইরকম চাউনি আমি আগেও দেখেছি – ড্যুয়েলিং-এর পিস্তল নিয়ে বিশ পা দূরে থাকা আমার প্রতিদ্বন্দ্বীর চোখে … পুরুষ হৃদয়ে সেই চাউনি কোনও কামনা জাগাতে পারে না।”
“কী হয়েছে, মিস স্কারলেট? খুব ঠাণ্ডা লাগছে?”
“হুঁ,” অসহায় গলায় জবাব দিল ও। “আপনি কি কিছু মনে করবেন – ” ভীরু গলায় বলে উঠেই দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ল। “আপনার কোটের পকেটে হাত ঢোকালে, আপনি কি কিছু মনে করবেন? এত ঠাণ্ডা লাগছে আর চামড়ার হাত-ঢাকাটাও ভিজে গিয়ে জবজব করছে।”
“কী – কী যে বলেন – নিশ্চয়ই কিছু মনে করব না! দস্তানাও তো পরেননি দেখছি! মাথাটা আমার একেবারেই গেছে – এতক্ষণ ধরে কেবল নিজের কথাই বকবক করে চলেছি – আর এদিকে আপনার ঠাণ্ডায় জমে যাবার মত অবস্থা, বাড়ি ফিরে আগুন পোয়াতে চাইছেন! স্যালি, একটু টেনে চল, বাছা! হ্যাঁ, আরেকটা কথা, মিস স্কারলেট, নিজের কথা বলতেই এমন ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম, জানাই হয়নি এই অঞ্চলে কোনো কাজে আসতে হয়েছিল আপনাকে? এই রকম দুর্যোগের মধ্যে!”
“ইয়াঙ্কি হেডকোয়ার্টারে গেছিলাম,” বিশেষ কিছু ভাবার আগেই স্কারলেট বলে ফেলল। বিস্ময়ে ওঁর হলদে হয়ে আসা ভ্রূ-জোড়া কপালে উঠে গেল।
“বলেন কী, মিস স্কারলেট! ওদের জওয়ানরা – কিন্তু কেন – ”
“হে জগজ্জননী, হে মা মেরি, চট করে একটা সুন্দর মিথ্যে মাথায় এনে দাও,” ও প্রার্থনা করতে আরম্ভ করল। ফ্র্যাঙ্ককে কোনোভাবেই টের পেতে দেওয়া যাবে না যে ও রেটের সঙ্গে দেখা করতে গেছিল। ফ্র্যাঙ্ক রেটকে কুলাঙ্গারের অধম বলে মনে করেন। মনে করেন ওঁর সঙ্গে মহিলাদের কথা বলা মোটেই নিরাপদ নয়।
“আমি ওখানে গেছিলাম – আমি জানতে গেছিলাম – ওঁরা ওঁদের স্ত্রীদের জন্য আমার কাছ থেকে শৌখিন জিনিসপত্র কিনতে আগ্রহী কিনা। আমি আবার খুব ভাল এমব্রয়ডারি করতে জানি কিনা।”
কথাটা শুনে যারপরনাই হতবাক হয়ে নিজের আসনেই নেতিয়ে পড়লেন। রেগে যাওয়া উচিত না বিহ্বল হওয়া, মনস্থির করতে পাচ্ছেন না।
“ইয়াঙ্কিদের কাছে গেছিলেন – কিন্তু মিস স্কারলেট! একদম যাওয়া উচিত হয়নি। নিশ্চয়ই – আমি নিশ্চিত যে আপনার বাপি এর কিছুই জানেন না! মিস পিটিপ্যাটও মনে হয় – ”
“আন্ট পিটিপ্যাটকে যদি বলে দেন, আমি লজ্জায় মরেই যাব!” স্কারলেট সত্যি সত্যিই চিন্তায় পড়ে গেল। তারপর কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল। কেঁদে ফেলাটা খুবই সহজ, ঠাণ্ডায় যেরকম জড়ভরত হয়ে আছে আর মনটাও ভাল নেই। তবে প্রতিক্রিয়াটা চমকপ্রদ হল। ওঁর সামনে পোশাক বদলাতে শুরু করলেও হয়ত উনি এতটা অস্বস্তিবোধ করতেন না। দাঁতে জিভ ঠেকিয়ে উনি ভেশ কয়েকবার সহানুভূতিসূচক শব্দ করলেন, তারপর বিড়বিড় করে “হায়, হায়!” বলে স্কারলেটকে শান্ত করার ব্যর্থ চেষ্টা করতে লাগলেন। মাথার মধ্যে একটা সাহসী ভাবনাও খেলে গেল। স্কারলেটের মাথাটা কাঁধের ওপর টেনে নিয়ে আস্তে আস্তে চাপড়ে দিতে ইচ্ছে করল। কিন্তু এরকম কাজ আগে কখনো করেননি, তাই ভেবে পেলেন না কাজটা কীভাবে করতে হয়। স্কারলেট ও’হারা, অত্যন্ত প্রাণবন্ত, পরমাসুন্দরী একজন মেয়ে, ওঁর গাড়িতে বসেই কেঁদে চলেছে! স্কারলেট ও’হারা, এত অহংকারী একজন মেয়ে, তাকে কিনা ইয়াঙ্কিদের কাছে সেলাইয়ের কাজ বিক্রি করবার জন্য ছুটতে হচ্ছে! বেদনাতুর হয়ে উঠল ওঁর মন।
স্কারলেট ফুঁপিয়েই চলল, ফাঁকে ফাঁকে একটা কি দুটো কথা বলছে, উনি বুঝলেন টারায় সব ঠিকঠাক চলছে না। মিস্টার ও’হারা ‘এখনও নিজের মধ্যে নেই,’ সকলের পেট ভরার জন্য যথেষ্ট খাবারদাবারও নেই। নিজের আর নিজের ছেলের জন্য কিছু উপার্জন করতেই ওকে অ্যাটলান্টায় আসতে হয়েছে। ফ্র্যাঙ্ক আবার দাঁতে জিভ ঠেকিয়ে আওয়াজ করে সহানুভূতি ব্যক্ত করলেন। হঠাৎ খেয়াল করলেন স্কাধেটের মাথাটা ওঁর কাঁধের ওপর নেতিয়ে পড়েছে। ওটা ওখানে কীভাবে পৌঁছল, বুঝতে পারলেন না। উনি নিশ্চয়ই নিজে থেকে ওটা ওখানে রাখেননি। কিন্তু মাথাটা ওখানেই রাখা, আর স্কারলেট অসহায়ভাবে ওঁর ক্ষীণ বক্ষদেশ ভিজিয়ে দিচ্ছে। ফ্র্যাঙ্ক বিবশ হয়ে পড়লেন, অন্য ধরণের এক অনুভূতি। স্কারলেটের কাঁধে উনি চাপড় মারতে লাগলেন, প্রথম প্রথম ভীরুতা আর সঙ্কোচের সঙ্গে, যখন দেখলেন স্কারলেট বাধা দিচ্ছে না, তখন সাহস করে দৃঢ়তার সঙ্গে। কত অসহায় আর কী নারীসুলভ কমনীয়তা। কত সাহসী, নিজের সেলাইয়ের কাজ বিক্রি করে সামান্য অর্থোপার্জনের কী মরিয়া প্রচেষ্টা। তবে ওই ইয়াঙ্কিদের ডেরায় গিয়ে হাজির হওয়া – এটা একটু বাড়াবাড়ি হয়ে গেছে।
“মিস পিটিপ্যাটকে আমি বলব না, কিন্তু একটা কথা আপনার আমাকে দিতেই হবে, মিস স্কারলেট, এরকম কাজ আর কখনও করবেন না। আপনার বাপির মেয়ে না আপনি – ”
সজল সবুজ চোখে অসহায়ভাবে ওঁর চোখের দিকে চাইল।
“কিন্তু একটা কিছু তো আমাকে করতেই হবে, মিস্টার কেনেডি। বেচারা ছেলেটা বড়ই ছোট, ওর কথা তো আমাকে ভাবতেই হবে, তাই না? আমাদের দেখাশোনা করার মত কেউই তো নেই এখন!”
“খুবই সাহসিনী মহিলা আপনি,” ফ্র্যাঙ্ক বলে উঠলেন, “কিন্তু এই ধরণের কাজ আমি আপনাকে কিছুতেই করতে দেব না। আপনার পরিবারের মাথা হেঁট হয়ে যাবে।”
“কী করব আমি, বলে দিন তাহলে?” ভাসা ভাসা চোখে ওঁর দিকে তাকাল যেন উনি সবই জানেন, আর উনি কী বলেন সেটা শোনার জন্য ব্যগ্র হয়ে আছে।
“এখুনি তো মাথায় কিছু আসছে না। তবে ভাবনাচিন্তা করে জানাব আপনাকে।”
“আমি ঠিক জানতাম, কিছু না কিছু আপনি ভেবে বের করবেন। এত বুদ্ধিমান মানুষ আপনি – ফ্র্যাঙ্ক।”
স্কারলেট ওঁকে কখনও নাম ধরে ডাকেনি। তাই শুনে উনি বিস্মিত যেমন হলেন, ডাকটাও কানে মধুর ঠেকল। বেচারি মেয়েটা এতই ভেঙ্গে পড়েছে, ভুলটা ধরতেই পারেনি। খুব করুণা বোধ করলেন মনে মনে, উতলা হয়ে উঠলেন ওকে রক্ষা করার জন্য। স্যুয়েলেন ও’হারার দিদির জন্য কিছু যদি ওঁর করার থাকে, অবশ্যই করবেন। পকেট থেকে লাল পাড় বসানো একটা রুমাল বের করে ওকে দিলেন। স্কারলেট ওটা দিয়ে চোখ মুছে লাজুকভাবে হাসল।
“কথাটা খুবই বোকার মত বলে ফেললাম, না?” ক্ষমাপ্রার্থনা করার মত করে বলল। “দয়া করে মাফ করে দেবেন।”
“বোকার মত কিছুই বলেননি। আপনি অত্যন্ত সাহসী একজন মহিলা আর ওই ছোট্ট কাঁধে বিশাল একটা বোঝা বয়ে নিয়ে চলেছেন। মিস পিটিপ্যাট খুব কিছু সাহায্য আপনাকে করতে পারবেন বলে আমার মনে হয় না। শুনেছি, ওঁর বেশিরভাগ সম্পত্তিই হাতছাড়া হয়ে গেছে আর মিস্টার হেনরি হ্যামিলটন নিজেই সমস্যায় আছেন। একটা মাথা গোঁজার জায়গা যদি আপনাদের জন্য ব্যবস্থা করে দিতে পারতাম, মিস স্কারলেট। তবে একটা কথা মনে রাখবেন, মিস স্যুয়েলেন আমার বিয়ে হয়ে যাবার পরে আমাদের ছাদের তলায় আপনারও জায়গা হয়ে যাবে, আর ছোট্ট ওয়েড হ্যাম্পটনেরও।”
এটাই সুবর্ণ সুযোগ! স্বর্গের দেব-দেবীরা নিশ্চয়ই ওর খেয়াল রেখেই এমন একটা সুযোগ জুটিয়ে দিয়েছেন। স্কারলেট এমন ভাব করল যে কথাটা শুনে ও যারপরনাই অবাক হয়েছে, খুব লজ্জাও পেয়েছে। যেন তাড়াতাড়ি কিছু বলার জন্য মুখ খুলেই আবার মুখ বন্ধ করে ফেলল।
“শীতের শেষে আমি যে আপনার ভগ্নীপতি হতে যাচ্ছি, কথাটা আপনার মনেই নেই, এমন কথা বলবেন না যেন,” ফ্র্যাঙ্ক একটু রসিক হবার চেষ্টা করলেন। তারপরেই ওর চোখ অশ্রুসজল হয়ে উঠতে দেখেই ব্যস্ত হয়ে উঠলেন, “কী ব্যাপার? মিস স্যু সুস্থ আছেন তো?”
“না, না!”
“কিছু একটা সমস্যা তো হয়েছেই? আমার কাছে কিছু লুকোবেন না, দয়া করে।”
“সেই কথা আমি মুখে আনতে পারব না! আমি সত্যিই জানতাম না! ভেবেছিলাম, চিঠিতে ও সবই জানিয়েছে আপনাকে – সত্যিই কত নীচ!”
“কী ব্যাপার, মিস স্কারলেট?”
“কথাটা আমি বলতে চাইনি, ফ্র্যাঙ্ক। ভেবেছিলাম আপনি জানেন – ও আপনাকে সব কিছু লিখে জানিয়েছে – ”
“লিখে জানিয়েছে? কী জানিয়েছে?” ফ্র্যাঙ্ক তখন কাঁপতে আরম্ভ করেছেন।
“আপনার মত এত ভদ্র একজন মানুষের সঙ্গে ও কী করে এমন করতে পারল?”
“কী করেছে ও?”
“তার মানে ও আপনাকে জানায়নি, তাই তো? মনে হয় আপনাকে জানানোর সাহসটাও ওর ছিল না! কোন মুখেই বা জানাবে! আমার নিজের বোন বলতেও লজ্জা করে!”
এতক্ষণে ফ্র্যাঙ্ক একেবারে বাক্যহারা হয়ে পড়লেন। মুখ চুন করে ওর দিকে তাকিয়ে রইলেন। লাগামের রাশও আলগা হয়ে গেল।
“সামনের মাসে ও টোনি ফোনটেনকে বিয়ে করতে চলেছে। খুব দুঃখিত, ফ্র্যাঙ্ক। নিজের মুখেই সব বলতে হল। অপেক্ষা করতে করতে ও ধৈর্য হারিয়ে ফেলেছিল। যদি সারাজীবন আইবুড়ো হয়ে থাকতে হয় – এই ভয়েই অস্থির হয়ে উঠেছিল।”
* * *
ফ্র্যাঙ্ক যখন স্কারলেটকে গাড়ি থেকে নামতে সাহায্য করছিলেন, ম্যামি সামনের বারান্দাতেই অপেক্ষা করছিল। বেশ কিছুক্ষণ ধরেই অপেক্ষা করছিল, কারণ মাথায় দেবার কাপড়টা স্যাঁতস্যাঁত করছে, আর যে পুরনো শাল দিয়ে নিজেকে শক্ত করে জড়িয়ে রেখেছে, তার ওপর বৃষ্টির ছাঁটের দাগ। বলিরেখা চিহ্নিত কালো মুখটা রাগে আর উৎকণ্ঠায় থম থম করছে, ঠোঁট দুটো এতটা সামনে বেরিয়ে আসতে দেখেছে বলে স্কারলেট মনে করতে পারল না। চট করে ফ্র্যাঙ্কের দিকে তাকাল, তারপর চিনতে পেরে ওর মুখের ভাব পালটে গেল। একই সঙ্গে খুশি, বিহ্বলতা আর অপরাধবোধের প্রকাশ। থপ থপ করে এগিয়ে এসে ফ্র্যাঙ্ককে হাসিমুখে অভিবাদন জানাল। উনি করমর্দন করতেই সৌজন্য দেখিয়ে ‘বাও” করল।
“ঘরের মানুষকে দেখতে পেলে খুব ভাল লাগে,” ম্যামি বলল। “কেমন আছেন, মিস্ট’ ফ্র্যাঙ্ক? দেখে তো আপনাকে খুবই ভাল আছেন বলে মনে হচ্ছে! মিস স্কারলেট আপনার সঙ্গেই বেরিয়েছেন জানা থাকলে আমি এত চিন্তাই করতাম না। ওর কোনো অসুবিধেই আপনি হতে দেবেন না, সে আমি জানি। আমি তো ভয়ে কাঁটা হয়ে ছিলাম, কে জানে, ও একা একা বেরিয়ে দৌরোদৌড়ি করছে আর চারপাশে লাগাম ছাড়া বিজ্জাত নিগারগুলো রাস্তায় ঘুরঘুর করছে! তুমি যতুবেরোবে, আমাকে বললে না কেন, বাছা? এত সর্দি-কাশি নিয়ে!”
স্কারলেট ফ্র্যাঙ্কের দিকে তাকিয়ে চোখ টিপল। একটু আগেই স্কারলেটের দেওয়া দুঃসংবাদে মন ভারাক্রান্ত হয়ে আছে, তাও উনি মৃদু হাসলেন। বুঝলেন, নীরবতা দিয়ে স্কারলেট ওঁকেও মজাদার একটা ষড়যন্ত্রের ভাগীদার করে ফেলল।
“যাও ম্যামি আমার জন্য কিছু শুকনো কাপড় নিয়ে এসো তো,” স্কারলেট বলল। “আর গরম গরম চা।”
“হে ভগবান, তোমার সুন্দর পোশাকটার দফা একদম রফা করে ফেলেছ,” ম্যামি গজগজ করল। “আজ সন্ধেবেলা বিয়ে বাড়িতে পরে যাবার জন্য এটা শুকোতে আর কাদা ছাড়াতে অনেকটা সময় চলে যাবে আমার!”
ম্যামি ভেতরে চলে যেতেই স্কারলেট ফ্র্যাঙ্কের দিকে ঝুঁকে চাপা গলায় বলল, “আজ সন্ধ্যের সাপারে আপনিও যোগ দিন। আমাদের এত একলা একলা লাগে! তারপরে আমরা বিয়েবাড়ি যাব। অভিভাবক হয়ে আমাদের সঙ্গেই চলুন না। আর হ্যাঁ, দয়া করে আন্ট পিটিকে কিছু বলবেন না – এই স্যুয়েলেনের ব্যাপার নিয়ে। খুব কষ্ট পাবেন উনি। আমার বোন যে এমন একটা কাজ করেছে, এটা ওঁকে জানাতে আমার – ”
“একদম নিশ্চিন্ত থাকুন আপনি! আমি কিছু বলব না!” ফ্র্যাঙ্ক তাড়াতাড়ি বলে উঠলেন। কথাটা মনে করতেই ওঁর মুখ বেদনাতুর হয়ে উঠল।
“আপনার মধুর ব্যবহারে আমি খুবই মুগ্ধ হয়েছি আজ। অনেকটা ভাল বোধ করছি। সাহসটাও ফিরে পেয়েছি।” বিদায় দেবার সময় ফ্র্যাঙ্কের হাত নিজের হাতে নিয়ে জোরে চেপে ধরল। পূর্ণদৃষ্টিতে ওঁর চোখে চোখ রাখল।
ম্যামি দরজার বাইরেই অপেক্ষা করছিল। অবাক হয়ে ওর দিকে তাকাল। তারপর স্কারলেটের পেছন পেছন হাঁপাতে হাঁপাতে সিঁড়ি বেয়ে উঠে শোবার ঘরে এল। পোশাকটা খুলে চেয়ারের ওপর ঝুলিয়ে দেবার সময় ও চুপ করে রইল। তারপর স্কারলেটকে টেনে বিছানায় এনে বসিয়ে দিল। গরম চা আর সেঁক দেবার জন্য গরম ইট নিয়ে এসে স্কারলেটের দিকে তাকাল। প্রায় কৈফিয়ত দেবার সুরে বলে উঠল, “তোমার নিজের ম্যামিকে মনের কথাটা কেন বললে না, বাছা? তাহলে তো আমার ‘ল্যান্টায় ছুটে আসার দরকারই হত না! এরকম ছোটাছুটি করার বয়স বা শরীর কি আমার আছে?”
“কী বলতে চাইছ?”
“তুমি কি আমাকে বোকা পেয়েছ, সোনা! তোমাকে আমি হাড়ে হাড়ে চিনি। একটু আগেই মিস্ট’ ফ্র্যাঙ্কের চোখ দেখলাম আর তোমার চোখও। বাইবেল পড়ার মতই আমি তোমাকে পড়ে ফেলতে পারি! মিস স্যুয়েলেনকে নিয়ে তুমি ফিসফিস করে ওঁকে কী সব বললে, সেটাও আমার কানে এল! যদি জানতাম, তুমি আসলে মিস্ট’ ফ্র্যাঙ্কের খোঁজেই এসেছ, আমাকে বাড়ি ছেড়ে আসতেই হত না!”
“তা বেশ তো,” কম্বলের উত্তাপে শরীর জুড়োতে জুড়োতে বলল, “তুমি কার কথা ভেবেছিলে শুনি?” ম্যামির নজর ঘুরিয়ে দেবার চেষ্টা করাটা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না।
“বাছা, কেন জানি না, কাল তোমার হাবভাব আমার মোটেই ভাল লাগেনি। আর মিস পিটিপ্যাট মিস মেলিকে লিখেছিলেন যে ওই বাটলার নামের অসভ্য লোকটা নাকি অনেক টাকা! একবার কিছু শুনলে আমি সহজে ভুলি না। কিন্তু মিস্ট’ ফ্র্যাঙ্ক তো খুবই ভদ্রলোক, যদিও দেখতে তেমন ভাল নন।”
স্কারলেট তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে ম্যামির দিকে তাকাল। ম্যামির চোখে একটা সবজান্তা চাউনি।
“তা কী করবে বলে ভাবছ? স্যুয়েলেনের কাছে চুগলি করবে?”
“মোটেই না, বরং মিস্ট’ ফ্র্যাঙ্ক যাতে তোমার ওপর খুশি হন, তার জন্য আমি জান লড়িয়ে দেব।” ওর গলায় কাপড়টা জড়িয়ে দিতে দিতে ম্যামি বলল।
স্কারলেট কিছুক্ষণ চুপচাপ বিছানায় পড়ে রইল আর ম্যামি অস্থির পায়ে ঘরময় পায়চারি করতে লাগল। স্কারলেট খুব স্বস্তিবোধ করছে, দুজনের মধ্যে কোনও কথার আদানপ্রদান হবে না। স্কারলেটের মনে হল ম্যামি ওর থেকেও বেশি আপোসহীন বাস্তববাদী। ওর অভিজ্ঞ চোখ পলকের মধ্যেই বুজে নিয়েছে ব্যাপারটার গুরুত্ব। কোন বিপদ ঘাড়ে করে ওর আদরের বাচ্চা আজ নাজেহাল! ওর নয়নের মণি স্কারলেট, বিপদের পড়ে যদিবা অন্যের অধিকারে হস্তক্ষেপ করেই থাকে, ম্যামি নির্বিকার, সেটা ওকে পাইয়ে দিতে বদ্ধপরিকর। স্যুয়েলেন বা ফ্র্যাঙ্ক কেনেডির অধিকার নিয়ে ভেবে দেখবার প্রয়োজনই বোধ করেনি। একবার শুধু ওই গোমড়া মুখে স্মিতহাসি ফুটে উঠল। বিপদ থেকে বেরিয়ে আসার জন্য স্কারলেট আপ্রাণ চেষ্টা করছে, আর স্কারলেট হল মিস এলেনের সন্তান। তাই দ্বিধাহীনভাবে ম্যামি স্কারলেটের পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে।
এই নীরবে পেছনে এসে দাঁড়ানো স্কারলেট অনুভব করতে পারল। আতপ্ত ইটের উত্তাপ পায়ের পাতা থেকে সমস্ত দেহে ছড়িয়ে পড়ছে। শীতার্ত শরীরে বাড়ি ফেরার পথে যে আশার আলো টিম টিম করে জ্বলতে শুরু করেছিল এখন সেটা অনির্বাণ শিখায় জ্বলছে। সারা দেহে এখন সেই শিখা অনুভব করতে পারছে, বুকের ভেতর রক্ত চলাচল বেড়ে গেছে। মনোবল বেড়ে যাচ্ছে। বেপরোয়া হয়ে হেসে উঠতে ইচ্ছে করছে। এখনও হেরে যায়নি তাহলে – মনে মনে উল্লসিত হয়ে উঠল।
“আয়নাটা একবার দাও তো আমায়, ম্যামি,” বলল ও।
“কাঁধ থেকে ঢাকা যেন সরে না যায়,” পুরু ঠোঁটে হাসির ঝলক টেনে আয়নাটা ওকে দিতে দিতে ম্যামি হুকুম জারি করল।
স্কারলেট আয়নায় নিজেকে দেখল।
“ইস, একেবারে পেতনির মত দেখাচ্ছে আমাকে,” স্কারলেট বলে উঠল। “আর চুলটাও ঘোড়ার ল্যাজের মত লাট খেয়ে আছে!”
“ঠিক কথা, যতটা ঝকঝকে তোমাকে দেখানো উচিত, সেটা লাগছে না।”
“হুম … বৃষ্টি কি খুব জোরে পড়ছে?”
“পড়ছে – তুমি তো জানোই।”
“পড়লেও কিছু করার নেই – একবার আমার জন্য বাজারে যেতে হবে তোমাকে।”
“এই রকম বৃষ্টিতে? আমি পারব না।”
“তোমাকে পারতেই হবে, নইলে আমি নিজেই যাব।”
“কী এমন রাজকার্য করতে হবে শুনি, যা পরে করলে চলবে না? মনে তো হয়, একটা দিনের পক্ষে যথেষ্ট হয়েছে!”
“আমার লাগবে,” আয়নায় নিজেকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে দেখতে স্কারলেট বলল, “এক বোতল অডিকোলন। আমার চুলগুলো শ্যাম্পু করে ধুয়ে দেবে, কোলন লাগাব। আর এক শিশি নাসপাতির বীজের জেল্ও আনবে, মাথায় লাগালে চুলগুলো পেতে বসবে।”
“এই বাজে আবহাওয়ায় মোটেই আমি তোমার চুলে শ্যাম্পু করে দেব না। না তোমার চুলে কোলন লাগাতে দেব, যেরকম বাজারি মেয়েরা লাগিয়ে থাকে! প্রাণ থাকতে নয়!”
“হ্যাঁ, আমি লাগাবই। আমার ব্যাগে দেখ। পাঁচ ডলারের যে স্বর্ণমূদ্রাটা আছে, ওটা নিয়ে বাজারে যাও। আর – হ্যাঁ ম্যামি, বাজার থেকে আমার জন্য – এক – এক বোতল রুজ়ও নিয়ে আসবে।”
“ওটা আবার কী?” ম্যামি সন্দিগ্ধচিত্তে জানতে চাইল।
স্কারলেট শীতল চোখে ম্যামির দিকে তাকাল, কিন্তু শীতল ভাবটা অনুভব করতে পারছে না। ম্যামির ওপর ঠিক কতটা জবরদস্তি করা যেতে পারে সেটা জানার কোনও উপায় নেই।
“সে তোমার না জানলেও চলবে। চাইলেই ওরা দিয়ে দেবে।”
“জিনিসটা কি না জেনে আমি কিছুতেই কিনব না।”
“তা এতই যখন জানার শখ – ওটা এক ধরণের রঙ! মুখে লাগানোর রঙ। ওখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ফোঁস ফোঁস করতে হবে না! যাও!”
“রঙ!” গর্জে উঠল ম্যামি। “মুখে লাগানোর রঙ! এত বড় তুমি হয়ে যাওনি যে তোমাকে চাবুক দিয়ে সিধে করতে পারব না! এমন অসৈরণ কথা আমি জীবনে শুনিনি! লজ্জা-শরমের মাথা একেবারে খেয়ে বসেছ! মিস এলেন এই মুহূর্তে নিশ্চয়ই অস্বস্তিতে কবরে নড়াচড়া শুরু করে দিয়েছেন! মুখে রঙ লাগানো, ঠিক একটা – ”
“গ্র্যান্ডমা রোবিল্যার মুখে রঙ লাগাতেন, তুমি ভাল করেই জান, আর – ”
“জানি বৈকি, আর এটাও জানি উনি পেটিকোট জলে ভিজিয়ে পরতেন যাতে ওঁর সুঠাম পা দুটো বোঝা যায়! তবে তার মানে এই নয়, তুমিও ওরকম কিছু করবে! অল্প বয়সে সেই মিস অনেক বদনাম কুড়িয়েছিলেন। তাছাড়া এখন সময় পালটে গেছে, আর ওঁরা যেটা করেছেন – ”
“দুত্তেরি!” স্কারলেট চেঁচিয়ে উঠল, মেজাজ ক্রমেই খারাপ হয়ে উঠছে। গায়ের ঢাকা ছুঁড়ে ফেলল। “তুমি পত্রপাঠ টারাতে ফিরে যেতে পার!”
“আমার ইচ্ছে না করলে তুমি কেমন করে আমাকে টারাতে ফেরত পাঠাও দেখি! আমি স্বাধীন,” ম্যামি তপ্ত গলায় বলল। “আর আমি এখান থেকে এক পাও নড়ছি না। বিছানায় শুয়ে পড় বলছি। নিউমোনিয়ায় পড়বার ইচ্ছে হয়েছে নাকি? গায়ে চাদরটা দাও। ওগুলো হাত থেকে নামিয়ে রাখ, সোনা আমার। দেখ মিস স্কারলেট, এই দুর্যোগে তুমি কোথাও বেরোচ্ছ না। হে ভগবান! তোমাকে একদম তোমার বাপির মত দেখাচ্ছে! নাও, শুয়ে পড় – আমি যাচ্ছি জিনিসগুলো আনতে – কিন্তু রঙ নয়! লজ্জায় মরে যাব – সবাই বুঝবে এটা আমার বাছার জন্য! মিস স্কারলেট, এমনিতেই তোমাকে খুব মিষ্টি আর সুন্দর দেখাচ্ছে – রঙ লাগানোর কোনো দরকার নেই। রঙ তো বাজে মেয়েরাই লাগায়, তাই না?”
“কিন্তু লাগালে কাজও তো হয়, হয় না?”
“হে ভগবান! শোনো একবার মেয়ের কথা! এসব আজেবাজে কথা মুখেও এনো না! ভিজে মোজাজোড়া খুলে ফেল, সোনা! ওই সব জিনিস তোমাকে কিনতে যেতে হবে না। আমিই যাচ্ছি। দেখি কোনো অচেনা দোকানের খোঁজ পাই কিনা।”
* * *
সেদিন রাত্রে মিসেজ় এলসিং-এর বাড়িতে, ফ্যানির বিয়ে হয়ে যাবার পরে লেভাই যখন ওর গান-বাজনার দলবল নিয়ে বাদ্যযন্ত্রগুলো টিউন করতে শুরু করল, স্কারলেটের খুব খুশি খুশি লাগছিল। চারপাশে একবার নজর চালাল। অনেকদিন পরে আবার সত্যিকারের একটা পার্টিতে আসতে পেরে একটা চাপা উত্তেজনা বোধ করছিল। ফ্র্যাঙ্কের বাহুলগ্না হয়ে পার্টিতে পৌঁছতে না পৌঁছতেই সবাই হই হই করে ওর কাছে ছুটে এল। সাদর অভ্যর্থনা জানাল, কেউ গালে চুমো খেল, কেউ করমর্দন করল। কীভাবে ওরা ওর অভাব বোধ করছিল, বলল। বায়না করল, আর যেন ও টারাতে ফিরে না যায়। বেশ একটা রোমাঞ্চ হচ্ছিল। একটা সময় ছিল যখন স্কারলেট এখানকার অনেক ছেলেকেই প্রলুব্ধ করে এখানকার অনেক মেয়েরই হৃদয়বেদনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সেসব দিনের তিক্ততা ওরা যেন ভুলেই গেছে। এমনকি মিসেজ় মেরিওয়েদার, মিসেজ় হোয়াইটিং, মিসেজ় মীড এবং অন্যান্য প্রবীণা মহিলারা – যাঁরা লড়াইয়ের শেষের দিকে ওর হাবভাবে বিরক্ত হয়ে শীতল ব্যবহার করতেন – মনে হল ওঁরাও ওর উড়নচণ্ডেপনা মনে না রেখে ওকে হাসি মুখে স্বাগত জানালেন। হাজার হলেও ও পিটির বৌমা, আর চার্লির বিধবা, আর লড়াইয়ের শেষে ওঁদের তুলনায় ওর দুর্ভাগ্যও কিছু কম নয়। ওঁরা ওকে চুমো খেয়ে, ওর মায়ের চলে যাওয়ার জন্য সজল চোখে সহানুভূতি জানালেন, বাপি আর বোনেদের কথা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জিগ্যেস করলেন। মেলানি আর অ্যাশলের কথাও উঠল, ওরা অ্যাটলান্টায় ফিরে এল না কেন, সেটাও সকলেই জানতে চাইলেন।
উষ্ণ অভ্যর্থনা পেয়ে স্কারলেট খুব আনন্দ পেলেও, একটা ব্যাপারে ওর মনটা সামান্য খুঁতখুঁত করছিল। ওর ভেলভেটের পোশাকের হাঁটুর দিকটা এখনও ভাল করে শুকোয়নি আর সেলাইয়ের ধার ঘেঁষে কাদার ছিটে এখনও বোঝা যাচ্ছে। গরম ভাপ দিয়ে, বুরুশ ঘসে, আগুনের সামনে ধরে রেখে – ম্যামি আর কুকির এই সব প্রাণান্তকর প্রচেষ্টার পরেও। অস্বস্তিটা মনের মধ্যেই চেপে রাখার চেষ্টা করল। স্কারলেটের ভয়, কেউ ওর অস্বস্তিটা খেয়াল করে ফেলবে আর আন্দাজ করে নেবে, এই একটা পোশাক ছাড়া ওর ভাল পোশাক আর একটাও নেই। অবশ্য একটা ব্যাপার লক্ষ্য করে একটু নিশ্চিন্ত হল, অন্যান্য মেয়েদের পোশাকের অবস্থা আরও খারাপ। ওদের সব পোশাকই অনেক পুরনো, সাবধানে রিফু করা আর জীর্ণ। নিজের পোশাকটা একটু ভিজে থাকলেও, একেবারেই নতুন এবং অক্ষত – সত্যি বলতে কি, এই পার্টিতে একমাত্র নতুন পোশাক – অবশ্য ফ্যানির সাদা স্যাটিনের বিয়ের গাউনটা ছাড়া।
এলসিংদের আর্থিক অবস্থা নিয়ে আন্ট পিটি কী বলেছিলেন, মনে পড়ল। এই সাটিনের পোশাকটা কেনার টাকাটা কোথা থেকে জোগাড় হল, সেটা ভেবে খুব আশ্চর্য হল। তার ওপর এই খাওয়াদাওয়ার খরচ, সাজসজ্জার খরচ, বাজনদারদের খরচ! খরচ-খর্চা ভালই হয়েছে। নির্ঘাত ধার নিয়েছেন আর নয়ত এলসিং পরিবারের আত্মীয়স্বজনরা সবাই কিছু না কিছু টাকা দিয়ে ফ্যানির এরকম ব্যয়বহুল বিবাহের আয়োজন করেছেন। এমন মাগ্যি-গণ্ডার বাজারে এই রকম আয়োজন, স্কারলেটের মনে এ যে টাকার শ্রাদ্ধ। টার্লটন ভাইদের কবরের ওপর ফলক লাগানোর বাজে খরচের সঙ্গে এর কোনো তফাৎ নেই। সেই একই রকম অনুভূতি আর বিরক্তি; স্কারলেটের কোনও সহানুভূতি হল না। যখন দু’হাতে টাকাকড়ি ওড়ালেও কিছু এসে যেত না, সেই সব দিন কবে চলে গেছে! কেন যে এঁরা সেই পুরনো দিনের জাঁকজমক বজায় রাখার চেষ্টা করেন? সেই সব দিন তো কবেই বিদায় নিয়েছে!
এই তাৎক্ষণিক বিরক্তিটা সঙ্গে সঙ্গে মন থেকে ঝেড়ে ফেলল। মরুকগে যাক, ওর গাঁটের কড়ি তো খরচ হয়নি। অন্যদের বোকামির কথা ভেবে সন্ধ্যের এই আনন্দটা শুধু শুধু কেন মাটি করবে!
স্কারলেট আবিষ্কার করল যে বর ওর ভাল মতই চেনা। স্পার্টার টমি ওয়েলবার্ন। কাঁধে জখম নিয়ে ১৮৬৩ সালে যখন হাসপাতালে ভর্তি হল, স্কারলেটই ওর শুশ্রূষা করেছিল। তখন ছ’ফুটের দীর্ঘদেহী সুদর্শন যুবক। ডাক্তারি পড়া ছেড়ে অশ্বারোহী বাহিনীতে যোগ দিয়েছে। এখন ওকে ছোট্টখাট্টো বয়স্ক একজন লোক মনে হচ্ছে, কোমরে চোট লাগার জন্য সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। হাঁটার সমস্যা আছে, আন্ট পিটি বলেছিলেন, পা দুটো ফাঁক করে হাঁটে, খুব খারাপ দেখায়। তবে নিজের চেহারা নিয়ে ও যে খুব উদ্বিগ্ন সেটা মনে হল না, কিংবা হয়ত নির্লিপ্তই থাকাটাই পছন্দ। আচার আচরণ একদম স্বাভাবিক। ডাক্তারি পড়ার সমস্ত আশা ছেড়ে দিয়ে এখন ও ঠিকাদারি করছে। কিছু আইরিশ শ্রমিক লাগিয়ে নতু একটা হোটেল বানানোর কাজে হাত লাগিয়েছে। স্কারলেটের খুব জানতে ইচ্ছে হল, এই রকম শারীরিক অবস্থা নিয়ে, এমন কঠিন একটা কাজ ও কী করে সামলাচ্ছে! নিজে থেকে কিছু জানতে চাইল না। তবে মনে মনে উপলব্ধি করল, ঘাড়ে এসে পড়লে সবাই প্রায় সব কাজই করতে পারে।
টমি আর হিউ এলসিং আর ছোট্টখাট্টো বাঁদরমুখো রেনে পিকার্ড দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ওর সঙ্গে কথা বলছিল। চেয়ার আর আসবাবপত্র দেওয়ালের দিকে ঠেলে সরানো হচ্ছিল নাচের প্রস্তুতির জন্য। ১৮৬২ সালে শেষবার যখন দেখা হয়েছিল, হিউ তার চেয়ে খুব একটা বদলে যায়নি। আগের মতই অনুভূতিপ্রবণ ছিপছিপে চেহারা। কপালের ওপর এক গোছা বাদামি চুল এসে পড়েছে। আগের মতই হাতদুটোও সেই একই রকম পলকা আর অস্থির। তবে রেনে অনেক বদলে গেছে। সাময়িক ছুটির দরখাস্ত দিয়ে মেবেল মেরিওয়েদারকে বিয়ে করতে আসার সময় দেখা হয়েছিল। চোখের তারায় সেই পুরনো গলিক১ চাপল্য, ক্রেওল২দের মতই জ়িন্দাদিল এখনও, কিন্তু চাপল্যের আড়ালে কোথাও একটা তিক্ততা কাজ করছে, লড়াই শুরু হওয়ার পর প্রথম প্রথম যা একেবারেই ছিল না। নজরকাড়া জ়ুয়েভ ইউনিফর্ম পরা উন্নাসিকভাবটা একেবারেই নেই।
“গোলাপের মত সুন্দর গাল, পান্নার মত উজ্জ্বল চোখ!” স্কারলেটের হাত ওষ্ঠে ছুঁইয়ে স্কারলেটের মুখের রুজের তারিফ করে বলল। “বাজারে যখন তোমাকে প্রথম দেখলাম, তখনকার মতই সুন্দর। মনে পড়ে? বিয়ের আংটিটা আমার ঝোলায় ছুঁড়ে দিলে – সেই দৃশ্য কোনোদিনই ভুলতে পারিনি। খুবই সাহসী সিদ্ধান্ত ছিল! তবে আরও একটা আংটির জন্য এতদিন অপেক্ষা করে থাকবে – ভাবতেই পারিনি!”
হিউয়ের পাঁজরে কনুই দিয়ে খোঁচা মেরে, চোখ দিয়ে দুষ্টুমির হাসি হেসে বলল।
“আমিই কী ভেবেছিলাম যে তুমি একদিন পাই ওয়াগন চালাবে, রেনে পিকার্ড?” স্কারলেট বলল। ওর অমার্যাদাকর পেশা নিয়ে ওকে মুখের ওপর বলা সত্ত্বেও লজ্জা পাওয়ার বদলে খুশিই হয়েছে বলে মনে হল। হিয়ের পিঠে চাপড় মেরে অট্টহাস্য করে উঠল।
“শাবাশ!” চেঁচিয়ে উঠল ও। “মাদাম মেরিওয়েদার, আমার শাশুড়ি ঠাকরুন, কাজটা আমাকে দিয়ে করিয়ে ছেড়েছেন – আমার জীবনের প্রথম কাজ – আমি, রেনে পিকার্ড, যার স্বপ্ন ছিল বড় হয়ে রেসের ঘোড়ার তালিম দেবে আর বেহালা বাদক হবে – সেই আজ অন্যের কথায় নাচছে! আমি পাই ওয়াগন চালাই, ভালই লাগে চালাতে! একটা লোককে দিয়ে যা খুশি করিয়ে নেওয়া – এটা আমার শাশুড়ি ঠাকরুনের কাছে খুব তুচ্ছ ব্যাপার। উনি জেনারাল হলে লড়াইতে আমাদের জিত নিশ্চিত ছিল! কী বল, টমি?”
“কী আশ্চর্য সব ব্যাপার!” স্কারলেট মনে মনে ভাবল। কোনোকালে এদের পরিবারের মিসিসিপির ধার ঘেঁষে দশ মাইল লম্বা জমি ছিল, নিউ অরলিয়্যান্সে একটা বিশাল বাড়িও ছিল - তার কিনা আজ পাই ওয়াগন চালাতে ভালই লাগছে!
“মজা করে বলছি না। যদি আমাদের শশুড়ি ঠাকরুনরা সত্যিই লড়াইয়ের নেতৃত্বে থাকতেন, এক সপ্তাহের মধ্যে ইয়াঙ্কিদের আমরা মেরে ভাগিয়ে দিতাম!” টমি ওর সঙ্গে একমত হল। হবু শাশুড়ির ছিপছিপে অনমনীয় উপস্থিতির দিকে ওর নজর বারে বারে ঘুরে যাচ্ছে। “এতদিন আমাদের টিকে থাকার একমাত্র কারণ হল লেডিরা হাল ছাড়বেন না বলে পণ করে বসেছিলেন।”
“একেবারে ধনুক ভাঙা পণ,” হিউ ওকে শুধরে দিল। ওর মুখে গর্বের হাসি, সাথে সাথে কিছু তিক্ততাও। “আজকের সন্ধ্যায় এখানে এমন একজন লেডিও নেই যিনি আত্মসমর্পণ করেছিলেন, অ্যাপোম্যাটক্সে তাঁর স্বামী যাই করে থাকুন না কেন। আমাদের চাইতেও ওঁদের মনোবেদনা অনেক বেশি। আমরা অন্তত লড়াই করবার সুযোগটা পেয়েছিলাম।”
“আর ঘৃণা করবার সুযোগও,” হিউয়ের কথার রেশ টেনে টমি বলল। “কী বল স্কারলেট? ভাগ্য বিড়ম্বনায় পুরুষরা যতটা বিচলিত হন, মহিলারা তার চেয়েও অনেক বেশি বিচলিত বোধ করেন। হিউয়ের বিচারপতি হওয়ার ইচ্ছে ছিল, রেনে’র শখ ছিল ইউরোপের রসিক মহলে বেহালা বাজিয়ে আলোড়ন ফেলে দেবে – ” রেনে ঘুষি পাকাতেই হিউ চট করে সরে গেল। “আর আমার কথা ছিল ডাক্তার হওয়ার, আর এখন – ”
“আরে ভাই, একটু সময় তো দাও আমাদের!” রেনে চেঁচিয়ে উঠল। “তাহলেই আমি দক্ষিণের পাই ওয়াগন বীর হয়ে উঠব! আর বন্ধু হিউ হয়ে উঠবে কাঠুরে শিরোমণি, আর টমি তুমি – ডার্কিদের বদলে আইরিশ ক্রীতদাসদের মালিক হয়ে যাবে! যা মজার ব্যাপার হবে না! আর তোমরা – মিস স্কারলেট আর মিস মেলি – তোমরা গরুর দুধ দোয়াবে, তুলো তুলবে, তাই তো?”
“কক্ষণো না!” স্কারলেট ঠাণ্ডা গলায় বলে উঠল। কী করে যে রেনে সব দুঃখ কষ্ট হাসিমুখে মেনে নেবার তাল করছে, সেটা ওর মাথায় ঢুকতেই চাইছে না। “ওগুলো আমাদের ডার্কিরা করে থাকে।”
“মিস মেলি, শুনেছি, ছেলেকে ‘বিউহোগার্দ’৩ বলে ডাকেন। বোলো ওঁকে, এই আমি, রেনে, ওঁর দেওয়া এই নামটা – আমার খুব পছন্দ হয়েছে। আরও বলবেন একমাত্র ‘যিশু’ ছাড়া এর চেয়ে ভাল নাম আর হতেই পারে না।”
কথাটা মজার ছলে বললেও, রেনে’র দুই চোখ, ল্যুইসিয়ানার এই অপ্রতিরোধ্য বীরের নামে, গর্বে জ্বলে উঠল।
“তাহলে অবশ্যই ‘রবার্ট এডওয়ার্ড লী৪ এঁর নামটাও বলতে হয়,” টমি মন্তব্য করল। “বুড়ো বিউয়ের বীরত্বকে কোনোরকম খাটো না করেই বলছি, আমার প্রথম পুত্রের নাম রাখব ‘বব লী ওয়েলবার্ন’।”
রেনে হেসে সায় দিল।
“চালু একটা রসিকতার কথা তোমাদের শোনাই, তবে রসিকতা নয়, সত্যি ঘটনাই এটা। তাহলেই বুঝতে পারবে, আমরা ক্রেওলরা আমাদের বীর সন্তান বিউহোগার্দ আর তোমাদের জেনারাল লীকে নিয়ে কী ভাবে। নিউ অরলিয়্যান্সের কাছে, ট্রেনে, ভার্জিনিয়ার একজন জওয়ান – জেনারাল লীর লোক – ওর সাথে দেখা হল বিউহোগার্দের বাহিনীর একজন ক্রেওলের। সেই ভার্জিনিয়াওয়ালা তো বলেই চলেছে বলেই চলেছে জেনারাল লী এই করেছেন, জেনারাল লী সেই করেছেন, এই সব। তা সেই ক্রেওল তো খুবই বিনয়ের সঙ্গে মাথা নেড়ে চলল, যেন কিছু মনে করার চেষ্টা করছে। তারপর এক গাল হেসে বলল, ‘ও হো, আপনি জেনারাল লীর কথা বলছেন! হ্যাঁ, হ্যাঁ, এবার বুঝতে পেরেছি! জেনারাল লী! জেনারাল বিউহোগার্ড যাঁর খুব প্রশংসা করেন!’”
স্কারলেটের একবার মনে হল ভদ্রতা করে ওদের হাসিতে হাসি মেলায়। তারপরই মনে হল, চার্লসটন আর স্যাভান্নার লোকদের মতই ক্রেওলরাও নিজেদের নিয়েই বেশি ব্যস্ত। এই গল্প থেকে এর চাইতে বেশি কিছু প্রমাণ হয় না। তাছাড়া অ্যাশলের নামেই অ্যাশলের ছেলের নামকরণ হোক, এটাই ও মনে মনে সর্বদা চেয়ে এসেছে।
গাইয়ে বাজিয়েরা বাদ্যযন্ত্রগুলোর নাড়া বাঁধা এবং আনুষঙ্গিক প্রস্তুতি সারা হতেই ‘ওল্ড ড্যান ট্রাকার’ গানটা বাজাতে শুরু করল। টমি স্কারলেটের দিকে ঘুরল।
“তুমিও তো নাচবে, স্কারলেট? আমি তো পেরে উঠব না, তবে হিউ বা রেনে – ”
“অনেক ধন্যবাদ, কিন্তু দুঃখিত। এখনও আমি মায়ের জন্য শোকপালন করছি,” স্কারলেট তাড়াতাড়ি বলে উঠল। “আমি বরং বসে বসেই দেখি।”
ওর চোখ ফ্র্যাঙ্ক কেনেডিকে খুঁজছে। ইশারা করে মিসেজ় এলসিং-এর পাশ থেকে ডেকে নিল।
“আমি ওখানে একটু নিরিবিলিতে বসছি। অল্প কিছু স্ন্যাক্স আর পানীয় নিয়ে এলে, আমরা দুজনে খেতে খেতে গল্প করতে পারি।” ফ্র্যাঙ্ককে স্কারলেট বলল। বাকি তিনজন অন্য দিকে চলে গেল।
এক গ্লাস ওয়াইন আর পাতলা এক টুকরো কেক আনার জন্য ফ্র্যাঙ্ক চলে যাবার পর স্কারলেট নিরিবিলি একটা কোণ খুঁজে সেখানে বসে পড়ল। বাজে দাগগুলো যাতে দেখা না যায়, সাবধানে স্কার্টটা সামলে নিল। এক সঙ্গে এত মানুষের সমাগম আর সংগীতের মূর্ছনা, রেটের সঙ্গে সকালবেলার অপ্রীতিকর মুহুর্তগুলো ভুলিয়ে দিল। তবে কাল সকাল থেকেই আবার রেটের অসভ্য ব্যবহার আর ওর নিজের অপমানের ঘটনাটা ওকে কুরে কুরে খাবে। ফ্র্যাঙ্কের বেদনাতুর বিহ্বল হৃদয়ে কোনও ছাপ ফেলতে পেরেছে কিনা সেটাও কালই ভেবে দেখবে। আজকের এই সন্ধ্যায় কিছুতেই নয়। আজকের এই সন্ধ্যায় নিজেকে খুব প্রাণবন্ত লাগছে, আশান্বিত লাগছে, চোখদুটো চকচক করছে।
ওখানে বসে স্কারলেট বিশাল ড্রয়িংরুমটায় চোখ বোলাল। নাচে অংশগ্রহণকারীদের দেখল। গৃহযুদ্ধের সময় অ্যাটলান্টায় আসার পর এই কক্ষে প্রথম প্রবেশ করার স্মৃতি মনে পড়ল। কী চমৎকারই না ছিল এই কক্ষটা! পালিশ করা কাঠের মেঝে কাঁচের মত চকচক করত। মাথার ওপরের ঝাড়বাতির অজস্র কাঁচের আড়াল থেকে মোমবাতির আলো কক্ষ জুড়ে হীরে পান্নার দ্যুতি ছড়িয়ে এক স্বপ্নিল পরিবেশ তৈরি করে ফেলত। সম্ভ্রান্ত সদাহাস্যময় প্রয়াত মানুষদের পূর্ণাবয়ব প্রতিকৃতি দেওয়াল অলংকৃত করে রাখত যেন ওঁরা ওখানে দাঁড়িয়ে অতিথি অভ্যাগতদের সাদর অভ্যর্থনা জানাচ্ছেন। রোজ়উডের সোফা ছিল, নরম গদিতে মোড়া, দেখতে পেলেই বসে পড়ার ইচ্ছে হত। সব থেকে বড় সোফাটা – এখন যেখানে বসে আছে স্কারলেট – ঠিক সেখানেই ছিল। পার্টিতে এলে, সেটাই ছিল ওর সবচাইতে পছন্দের বসার জায়গা। এখান থেকে ড্রয়িং রুম আর তার ঠিক পেছনেই ডাইনিং রুমের একটা সুন্দর ছবি দেখতে পাওয়া যেত। মেহগিনি কাঠের ডিম্বাকৃতি ডাইনিং টেবিলে এক সঙ্গে কুড়ি জন অতিথিকে পরিবেশন করা যেত। দেওয়ালের পাশে সার দিয়ে দাঁড় করানো ছিল কুড়িটা সরু পায়ার চেয়ার। বিশাল সাইডবোর্ড আর বুফের টেবিল, ভারি ভারি বাসনপত্র দিয়ে সাজানো থাকত – সাতফলা মোমবাতিদান, পানপাত্র, বোতল, সুরাপাত্র আর ঝকঝকে গ্লাস। যুদ্ধের প্রথম বছরে, সেই সোফাতে, স্কারলেট অনেকবার বসেছে। প্রতিবারই পাশে কোনো না কোনো একজন সুপুরুষ অফিসার থাকতেন। বেহালা, অ্যাকর্ডিয়ান, ব্যাঞ্জোর সম্মিলিত সংগীত শোনার সাথে সাথে মোমপালিশ করা চকচকে ডান্সফ্লোর থেকে নৃত্যরত পায়ের শব্দ শুনে মনে মনে পুলকিত হত।
ঝাড়টা এখনো আছে বটে, তবে আলো জ্বালানো হয়নি। একটু তেরছা হয়ে ঝুলছে, বেশিরভাগ কাঁচই খসে গেছে। মনে হচ্ছে ইয়াঙ্কি সৈন্যদের বুটজুতোর লক্ষ্যই ছিল যেন ওই ঝাড়টার শ্রী। এখন একটা তেলের বাতি, কয়েকটা মোমবাতি আর ফায়ারপ্লেসের আগুন থেকেই ঘরটা আলোকিত হয়েছে। সেই কাঁপা কাঁপা আলোতেই বোঝা যাচ্ছে যে ডান্সফ্লোরের মেঝের ওপর কী তাণ্ডব চালানো হয়েছে। এমনভাবে চলটা উঠে গেছে আর ফেটে গেছে যে তা আর মেরামতযোগ্য থাকেনি। ওয়াল পেপারের ওপরে চৌকো চৌকো দাগ থেকে বোঝা যায়, আগে ওখানে ছবি ঝোলানো থাকত। প্লাস্টারের ওপর বড় বড় ফাটলগুলো অবরোধের দিনটার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। একটা শেল ফেটে গিয়ে বাড়িটার ছাদের কিছু অংশ আর দোতলাটা ধসে যায়। পুরনো, ভারি মেহগিনির টেবিলটা এখনও শূন্য ডাইনিং রুমে বিরাজমান – কেক আর সুরাপাত্র সাজিয়ে রাখা রয়েছে, তবে ক্ষতবিক্ষত, ভাঙা পায়াগুলো কোনোরকমে মেরামত করে দাঁড় করানো হয়েছে। সাইডবোর্ড, বাসনপত্র আর চেয়ারগুলো গায়েব হয়ে গেছে। খিলান দেওয়া ফরাসি জানলায় সোনালি রঙের দামাস্ক আচ্ছাদন আর নেই, তবে ঝালর দেওয়া হালকা পর্দাগুলো পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হলেও অজস্র রিফুর দাগ।
ওর এত পছন্দের বাঁকানো সোফার জায়গায় একটা শক্ত বেঞ্চ, একেবারেই আরামদায়ক নয়। যতটা সুরুচিসম্মত ভাবে বসা যায়, বসেছে। স্কার্টটার এরকম করুণ দশা না হলে নাচতেও পারত! আবার নাচতে পারলে কী ভালই না লাগত! তবে নাচতে নাচতে হাপিয়ে না গিয়ে এই নিরিবিলিতে ফ্র্যাঙ্ককে সঙ্গ দিয়ে সময়টা ভাল মত কাজে লাগানো যাবে। বিগলিত মুখ করে ওঁকে আরও বোকা বোকা কথা বলতে উৎসাহিত করলে আখেরে লাভই হবে।
কিন্তু গানটা ওকে প্রবলভাবে হাতছানি দিচ্ছে। ব্যাঞ্জোর তারে ঝঙ্কার দিয়ে বুড়ো লেভাইয়ের চ্যাটালো পায়ে তাল দেওয়ার তালে তালে স্কারলেটের স্লিপার উদ্বেল হয়ে তাল মেলালো। সব কটা পা গানের কলিদুটোর তালে তালে পড়ছে, শরীর দুলছে, বাহু এসে বাহুতে মিলছে।
“Ole Dan Tucker he got drunk – ’
(Swing yo’ padners!)
‘Fell in de fiah’ an’ be kick up a chunk!’
(Skip light, ladies!)”
মাসের পর মাস ধরে টারার বিরস ক্লান্তিকর দিন কাটিয়ে আবার গান শোনার সুযোগ পাওয়া, নৃত্যরত পায়ের শব্দ কানে আসা, ম্লান আলোয় পরিচিত বন্ধুবান্ধবদের হাসিখুশি মুখ দেখতে পাওয়া, পুরনো পুরনো ঠাট্টা তামাশাগুলো আবার করে শোনা, হই হই করা, আড্ডা মারা, একজোট হওয়া, ফষ্টিনষ্টি করা – বেশ হালকা মনে হচ্ছে নিজেকে। ঠিক যেন মরে ভূত হয়ে যাওয়ার পরে আবার জীবন ফিরে পাওয়া। চোখ বুজে, ওদের জীর্ণ পোশাক আর তাপ্পি মারা জুতোগুলো যদি না লক্ষ্য করা হয় আর যে সব ছেলেরা চিরদিনের মত হারিয়ে গিয়েছে তাদের মুখগুলো মনে না আনলে, খুব কিছু একটা পালটে যায়নি বলে ধরেই নেওয়া যায়। কিন্তু পানপাত্র হাতে প্রবীণ মানুষদের ভিড়, দেওয়াল ঘেঁষে হাতপাখাহীন হাতে প্রবীণা মহিলাদের জটলা, নৃত্যরত তরুণ তরুণীদের শরীরের হিল্লোল, নজর পড়তেই স্কারলেটের শরীরের ঠাণ্ডা স্রোত বয়ে গেল। সব কিছুই এতটাই ভয়াবহভাবে বদলে গেছে যে এইসব পরিচিত মানুষদের অশরীরী বলে মনে হচ্ছে।
চেহারা খুব একটা বদলে যায়নি, কিন্তু এঁরা কেউই আগের মত আর নেই। ঠিক কী হয়ে থাকতে পারে? বয়সটা পাঁচ বছর বেড়ে গেছে – শুধুই তাই? না, কেবল সময়ের চলে যাওয়া নয়, তার চেয়েও বেশি কিছু। কিছু একটা ওঁরা হারিয়ে ফেলেছেন। কী একটা যেন ওঁদের জীবন থেকে চিরতরে হারিয়ে গেছে। পাঁচ বছর আগে একটা নিরাপত্তা বলয় ওঁদের ঘিরে ছিল, ওঁরা নিশ্চিন্ত জীবনযাপন করতেন, অথচ সেটা ওঁরা উপলব্ধিও করতে পারেননি। এই বলয়ের মধ্যে ওঁরা নিজেদের মেলে ধরতে পারতেন। এখন সেই নিরাপদ আশ্রয়টা অদৃশ্য, আর সঙ্গে সঙ্গে নিশ্চিন্ত জীবনযাপনের আনন্দটাও। হারিয়ে গেছে পুরনো কুহক, পুরনো রোমাঞ্চকর জীবন।
স্কারলেট জানে যে ও নিজেও কিছু কম বদলে যায়নি, তবে অন্যেরা যেভাবে বদলে গেছেন, ঠিক সেভাবে নয়, আর এটাই ওর কাছে ধাঁধার মত লাগে। বসে বসে ও অন্যদের লক্ষ্য করতে লাগল। নিজেকে দলছুট মনে হচ্ছিল, নিঃসঙ্গ মনে হচ্ছিল, মনে হচ্ছিল ও যেন অন্য পৃথিবী থেকে উড়ে এসে জুড়ে বসেছে। ওর ভাষা কেউ বুঝতে পারছে না, ওদের ভাষাও ওর কাছে অজানা। আর তখনই মনে হল অ্যাশলের সঙ্গে কথা বললেও ঠিক একই অনুভূতি হয়। ওর সঙ্গে থাকলে বা ওর ধ্যানধারণার লোকের সঙ্গে থাকলে, নিজেকে কেমন যেন বহিরাগত বলে মনে হয়। অথচ ওর চেনা পৃথিবীটা এই ধরণের মানুষেই ভর্তি। হালে পানি পায় না।
এঁদের চেহারা ছবিতে খুব একটা পরিবর্তন দেখতে পাওয়া যায় না, আর এঁদের আচরণ তো একেবারে আগের মতই রয়ে গেছে। একমাত্র এই দুটো বৈশিষ্টই ওর পুরনো বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে এখনও আগের মতই আছে। এক শাশ্বত আত্মমর্যাদাবোধ, অসীম বীরোচিত আস্ফালন এঁরা আঁকড়ে ধরে আছেন, আমৃত্যু আঁকড়ে ধরে থাকবেনও। মৃত্যুহীন তিক্ততাবোধকে সঙ্গী করে এঁরা কবরে যাবেন। এই তিক্ততাবোধকে ভাষায় প্রকাশ করা দুরূহ। মৃদুভাষী কিন্তু উগ্র, অবসন্ন মানুষ এঁরা, পরাজিত হয়েছেন, কিন্তু সেই পরাজয় মেনে নিতে নারাজ। ভেঙ্গে পড়েছেন, তবু মচকাননি। পরাজিত সাম্রাজ্যের এঁরা চূর্ণ-বিচূর্ণ অসহায় নাগরিক। যে দেশকে ওঁরা প্রাণাধিক ভালবাসতেন, সেই দেশকে আজ শত্রুর পদদলিত, নিয়মকানুনের তোয়াক্কা না করে শত্রুরা এই দেশকে তছনছ করে চলেছে। আগে যারা ওঁদের ক্রীতদাস ছিল তারা আজ আপদ হয়ে দাঁড়িয়েছে, ওঁদের নিজদের মানুষ ভোট দেওয়ার অধিকার হারিয়েছেন, ওঁদের নারীরা পদে পদে লাঞ্ছিত হচ্ছেন। কবরে ঘুমিয়ে থাকা শত শত শহীদের স্মৃতি ওঁদের অবিরাম বিচলিত করে চলেছে।
এঁদের চেনা দুনিয়াটায় বুনিয়াদি পরিবর্তন ঘটে গেছে, ওঁরা কেবল পুরনো কাঠামোটা আঁকড়ে ধরে আছেন। পুরনো অভ্যেসগুলো বদলায়নি, কিছুতেই বদলাতে দেওয়া যাবে না, নাহলে আর কী নিয়ে ওঁরা বাঁচবেন? পুরনো দিনের সমস্ত সংস্কার ওঁরা শক্ত করে আঁকড়ে ধরে আছেন, কারণ এইসব সংস্কার সম্বন্ধে ওঁরা ওয়াকিবহাল, এই সব সংস্কার ওঁদের নয়নের মণি। ব্যস্ততাহীন অনিয়ম, সৌজন্যবোধ, অবাধ মেলামেশার আনন্দ, আর সবার ওপরে নারীর সম্ভ্রম রক্ষার সামাজিক দায়িত্ব পালন। যে সংস্কৃতির মধ্যে এঁদের লালনপালন, সেই সংস্কৃতি ওঁদের মার্জিত আর কোমল হতে শিখিয়েছে। আর তার ফলস্বরূপ রূঢ় বাস্তব আর অবাঞ্ছিত পরিস্থিতি থেকে নারীদের রক্ষা করে চলার মত সুন্দর একটা পরিবেশ তৈরি করে নিতে সক্ষম হয়েছিলেন। স্কারলেটের মনে হয় এটা এক ধরণের পাগলামি। গত পাঁচ বছরে কী এমন অবাঞ্ছিত ঘটনা আছে যা সব চেয়ে পর্দানশীন মহিলারও কর্ণগোচর না হতে বাকি আছে! আর্তের সেবা করে গেছে দিনের পর দিন, রাতের পর রাত, মৃত্যুপথযাত্রীর চোখের পাতা নিজের হাতে বন্ধ করেছে, যুদ্ধের সমস্ত রকম প্রতিকূলতা – আতঙ্ক, অনশন এবং প্রাণ বাঁচানোর জন্য পলায়ন – সহ্য করেছে, সহ্য করতে বাধ্য হয়েছে।
যে দৃশ্যই ওঁদের দেখতে হয়ে থাক না কেন, গায়ে গতরে যতই খাটতে হয়ে থাকুক না কেন, ওঁরা তবুও ভদ্রলোক এবং ভদ্রমহিলাই থেকে গিয়েছেন, যদিও গভীর হতাশা, উদাসীনতা আর নিস্পৃহতায় আচ্ছন্ন হয়ে জীবনযাপন করছেন – নির্বাসিত রাজপরিবারের মত। একে অপরের প্রতি সহানুভূতির বনিয়াদটা দৃঢ় থেকে গেছে, হিরের মত শক্ত, মাথার ওপরের ভেঙ্গে যাওয়া ঝড়বাতির কাঁচের টুকরোর মত উজ্জ্বল কিন্তু ভঙ্গুর। সময় বদলে গেছে, কিন্তু এঁরা সেটা মেনে নিতে পারছেন না। ওঁদের কাছে সেই আনন্দমুখর অলস দিনগুলো এখনও যেন বিদ্যমান, ইয়াঙ্কিদের মত হামলে পড়ে, ঠেলাঠেলি করে ভাগ্যসন্ধান না করার ব্যাপারে এঁরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। দৃঢ় প্রত্যয়ের সঙ্গে এঁরা সেই পুরনো জীবনধারাকে বহাল রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
নিজেও যে অনেক বদলে গেছে, স্কারলেট সেটা ভাল করেই জানে। তাই যদি না হবে, তাহলে অ্যাটলান্টায় পা দেবার পর থেকে যা যা করেছে, সেগুলো করল কীভাবে? মরিয়া হয়ে এখন যেটা করতে চলেছে, সেটাই বা করবার কথা মাথাতে আসবে কেন? এঁদের মত ওর মনও তিক্ত হয়ে আছে, কিন্তু সেই তিক্ততার মধ্যেও একটা যেন তফাৎ রয়েছে, কিন্তু তফাৎটা ঠিক কী সেটা
এই মুহূর্তে কিছুতেই ধরতে পারছে না। হয়ত তফাৎ এটাই যে এমন অনেক কিছুই আছে যা ওঁরা মরে গেলেও করতে পারবেন না, কিন্তু ও নিজে কোনো কিছুতেই পিছপা হবে না। হয়ত এঁরা আশার আলো দেখতে না পেলেও, হাসি মুখে সব কিছু মেনে নিয়ে মার্জিত বিনয়ের সঙ্গে জীবনযাপন করছেন। কিন্তু স্কারলেট কিছুতেই এই কাজটা করতে পারবে না।
জীবনকে উপেক্ষা করে চলা স্কারলেটের পক্ষে সম্ভব নয়। জীবনকে কানায় কানায় উপভোগ করতে করতে পথ চলতে হবে, হোক না খুব নির্মম, খুব বন্ধুর সেই পথ। হাসিমুখে সমস্ত প্রতিকূলতা মেনে নিতে ও রাজি নয়। এই যে ওর বন্ধুবান্ধবরা হাসতে হাসতে, ঔদ্ধত্য দেখিয়ে, অনমনীয় দৃঢ়তার সঙ্গে পরিস্থিতির মোকাবেলা করছে, স্কারলেট তার মধ্যে কোনও বীরত্ব দেখতে পায় না। ওর মতে চোখের সামনে বাস্তব পরিস্থিতি দেখতে পেয়েও জেদ ধরে সেটা হেসে উড়িয়ে দেওয়াটা বোকামি ছাড়া আর কিছুই নয়।
কল্পনার জগত থেকে বেরিয়ে নৃত্যরত মানুষদের দিকে চোখ পড়তেই মনে হল পরিস্থিতি ওকে যেমন তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে, এঁদেরকেও কী ঠিক একইভাবে নাড়া দিচ্ছে না? মৃত প্রেমিক, পঙ্গু স্বামী, অনাহারক্লিষ্ট সন্তানদের মুখ, বিঘের পর বিঘে বেদখল হতে থাকা জমিজমা, প্রিয় ছাদের তলাটুকু পর্যন্ত অন্যের দখলে চলে যাওয়া – কিছুই কি এঁদের মনে রেখাপাত করতে পারেনি? নিশয়ই করেছে! ওঁদের দশাও কমবেশি ওর নিজের অবস্থা থেকে খুব একটা আলাদা নয়। ওঁদের লোকসানও ওর চেয়ে কিছু কম নয়, দুঃখকষ্টও একই রকম, ওঁরাও একই রকম সমস্যার মোকাবেলা করছেন। কিন্তু ওঁদের প্রতিক্রিয়ার ধরণটাই আলাদা। ঘরের ভেতর যে মুখগুলো ও দেখতে পাচ্ছে, সেগুলো আসলে ওঁদের সত্যিকারের মুখ নয়, ওঁদের মুখোশ, এমনি আঁটসাঁট মুখোশ যা কিছুতেই খুলে যাবার সম্ভাবনা নেই।
ওর নিজের মতন নির্মম পরিস্থিতির শিকার হওয়া সত্ত্বেও – ওঁরা কেন – কেমন করে – এমন করে আনন্দ করতে পারেন – মন খুলে হাসতে পারে্ন? সেই চেষ্টাটাই বা করেন কী করে? বেশ দুঃসাধ্য ওঁদের বুঝে উঠতে পারা – একটু বিরক্তিকরও। ও কিছুতেই ওঁদের মত হতে পারবে না। এমন পরম উদাসীনতার সঙ্গে পৃথিবীর বিপর্যয়ের সাক্ষী হয়ে থাকাটা ওর পক্ষে অসম্ভব। একপাল শিকারি কুকুর যেন একটা শেয়ালের পিছু নিয়েছে, শেয়ালটা ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটছে, ধরা পড়ে যাবার আগেই যেন গর্তে সেঁধিয়ে যেতে পারে।
হঠাৎ সবার প্রতি ওর ঘেন্না হতে লাগল, কারণ ওঁরা ওর থেকে এত আলাদা, কারণ ওঁদের মত নির্বিবাদে দুর্ভাগ্য মেনে নিতে ও কখনোই পারবে না। মেনে নেবার ইচ্ছেও নেই। এঁদের সবাইকে ও ঘেন্না করে – হাসি হাসি মুখে হালকা পা ফেলে নাচতে থাকা এই সব আজব বুদ্ধু মানুষগুলোকে, সর্বহারা হয়ে যাওয়াটা যেন ওঁদের কাছে বুক ফুলিয়ে জাহির করার মত একটা ব্যাপার! মহিলারা এমন ভাব করছেন যেন ওঁরা এক-একজন লেডি! অথচ প্রতিদিন এঁদের কায়িক পরিশ্রম করতে হয়। এঁদের জানা নেই, পরের বারের জন্য নতুন পোশাকটা কীভাবে জোগাড় করবেন! সবাই নিজেকে এক-একজন লেডি বলেই মনে করছেন! অথচ এই ভেলভেটের পোশাক পরে থাকা সত্ত্বেও, ফুলেল তেল লাগিয়ে চুল বাঁধা সত্ত্বেও, বংশগৌরব আর অতীতের আর্থিক প্রতিপত্তির দোহাই থাকা সত্ত্বেও, ও নিজেকে কিছুতেই একজন লেডি বলে ভাবতে পারছে না! টারার রাঙামাটির স্পর্শে ওর সব সৌজন্যবোধ হারিয়ে গেছে, যতক্ষণ না আবার বিত্তশালী হয়ে উঠতে পারছে, খাবার টেবিল আবার দামী বাসনপত্রে আর মহার্ঘ খাদ্যের সুঘ্রাণে ভরে উঠছে, যতক্ষণ না আস্তাবলে ওর নিজের ঘোড়া, ওর নিজের জুড়িগাড়ি দাঁড় করিয়ে রাখার সামর্থ্য অর্জন করতে পারছে, যতক্ষণ না সাদার বদলে কালো হাত টারায় তুলো চাষের কাজে লাগাতে পারছে, ততক্ষণ ও নিজেকে লেডি বলে মনে করতে পারবে না।
“আসল তফাৎ এখানেই!” সরোষে হাঁপ নিতে নিতে ও ভাবল। “এখানেই ওঁরা ওর থেকে আলাদা! ওঁরা দরিদ্র হলেও নিজেদের লেডি ছাড়া অন্য কিছু ভাবতেই পারেন না, আমি সেটা পেরে উঠছি না। এই সব বোকা মানুষরা বুঝতেই পারেন না, টাকা না থাকলে লেডি হয়ে ওঠা যায় না!”
এই সহজ সত্যিটা বুঝতে পেরেও, স্কারলেটের কেমন যেন মনে হল, বোকা বোকা লাগলেও, ওঁদের মনোভাবটাই স্বাভাবিক। এলেনও সেটাই মনে করতেন। এটা ওর মনের অশান্তিটা বাড়িয়ে তুলল। মনে হল ওর মনোভাবটাও এরকমই হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু সেটা হচ্ছে না। জন্মসূত্রে যিনি লেডি, দরিদ্র হয়ে গেলেও তিনি লেডিই থেকে যান, কিন্তু কথাটা কিছুতেই এখন দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে নিতে পারছে না।
চিরদিনই ইয়াঙ্কিদের নিয়ে নিয়ে নানারকম তাচ্ছিল্যে ভরা কথাবার্তা শুনে এসেছে, কারণ ওদের কাছে টাকাপয়সা থাকাটাই সম্ভ্রান্ত হওয়ার একমাত্র মাপকাঠি, বংশগৌরবের কোনও ভূমিকাই নাকি নেই। কথাটা একটু বেয়াড়া শোনালেও, ইয়াঙ্কিরা যে অন্তত এই একটা ব্যাপারে ঠিক, সেটা স্বীকার করে নিতে স্কারলেটের দ্বিধা হল না। হয়ত অন্যান্য ব্যাপারে ওরা সমালোচনারই যোগ্য। লেডি হতে গেলে টাকাকড়ির দরকার। মেয়ের মুখে এই ধরণের কথা শুনলে এলেন হয়ত অজ্ঞানই হয়ে যেতেন। চরম দারিদ্র্যের মধ্যে পড়লেও এলেন কখনোই অসম্মানিত বোধ করতেন না। অসম্মানিত বোধ করা! হ্যাঁ, ও অসম্মানিতই বোধ করছে! কারণ ও দরিদ্র্য হয়ে পড়েছে, আর যে সব পরিশ্রম নিগ্রোদের করা উচিত, আজ দারিদ্র্যের কারণে ওকে নিজেকেই সেই সব পরিশ্রম করতে হচ্ছে।
চরম বিরক্তিতে কাঁধ ঝাঁকাল। কে জানে হয়ত এঁরাই ঠিক কথা বলছেন, ওর ভাবনাটাই ভুল। তবুও ওর মত রাতের পর রাত না ঘুমিয়ে, আত্মসম্মানবোধ শিকেয় তুলে, বদনাম হবার ঝুঁকি নিয়ে, এই বোকা মানুষগুলো ভবিষ্যতের কথা ভেবে দিশেহারা হচ্ছেন না, হৃত সম্পদ পুনরুদ্ধারের জন্য জান লড়িয়ে দিচ্ছেন না। টাকার পেছনে ছোটাটাকে এঁরা অগৌরবের বলে মনে করেন। বড় কঠিন সময়, বড় নির্মমও। এই পরিস্থিতির মোকাবেলা করার জন্য কঠিন, আপোষহীন সংগ্রামের প্রয়োজন। স্কারলেট জানে যে বংশমর্যাদা এঁদের সেই কঠিন, আপোষহীন লড়াই থেকে বিরত রাখবে – যে লড়াইয়ের চূড়ান্ত উদ্দেশ্যে হল অর্থোপার্জন করা। এঁদের সকলেরই ধারণা, খোলাখুলি টাকার পেছনে দৌড়নো অত্যন্ত কুরুচিকর। ব্যতিক্রম অবশ্যই আছে। মিসেজ় মেরিওয়েদারের বেকারি আর রেনে’র পাই ওয়াগন চালানো। হিউ এলসিং-এর জ্বালানি কাঠ কেটে বিক্রি করা, টমির ঠিকাদারি। আর ফ্র্যাঙ্কও তো সাহস করে একটা স্টোর চালাতে লেগেছেন। কিন্তু সর্বসাধারণ কী করছে? খামারের মালিকরা কয়েক বিঘা জমিতে একটুআধটু লাঙ্গল ঠেলে দারিদ্র্য যাপন করছে। উকিল আর ডাক্তাররা নিজের নিজের পেশায় ফিরে গিয়ে মক্কেলের, রোগীর দেখা পাওয়ার আশায় বসে আছেন, যাদের দেখা কখনও পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ আছে। আর যারা অন্যের উপার্জনের টাকায় আরামে, আয়েসে পরম নিশ্চিন্তে জীবন কাটাচ্ছিল, তারা? ওদের কী হবে?
কিন্তু সারা জীবন গরীব হয়ে থাকা ওর পোষাবে না। একটা অঘটন ঘটে ভোজবাজির মত ওর ভাগ্য পালটে যাবে, সেই আশায় চুপচাপ বসে থাকা ওর পক্ষে সম্ভব নয়। জীবনযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে যতটা পারবে বাগিয়ে নেবে। একজন দরিদ্র্ অভিবাসী হয়ে ওর বাপি এসে টারাতে বিঘের পর বিঘে জমির মালিক হতে পেরেছিলেন। উনি যা করতে পেরেছিলেন, ওঁর মেয়ে হয়ে ও কেন সেটা করতে পারবে না? একটা আদর্শের পেছনে বাজি ধরে যাঁরা সর্বস্ব খুইয়েছেন, যে আদর্শের কারণে সর্বস্ব ত্যাগ করা খুবই তুচ্ছ ব্যাপার – স্কারলেট তাঁদের মত না। ওঁরা সাহস সঞ্চয় করেন অতীত থেকে। স্কারলেট করে ভবিষ্যতের থেকে। এই মুহূর্তে ফ্র্যাঙ্ক কেনেডিই ওর ভবিষ্যৎ। উনি একটা স্টোর সামলান, আর ওঁর হাতে নগদ টাকাও আছে। যদি ওঁকে বিয়ে করতে পারে, সেই টাকায় হাত লাগাতে পারবে। আরও এক বছরের জন্য টারাকে নিয়ে দুশ্চিন্তা ঘুচবে। তারপরে ওই করাতের মিলটা – ওটা ফ্র্যাঙ্ককে কিনতেই হবে। নিজের চোখেই দেখতে পাচ্ছে কী দ্রুততার সাথে শহরটা নতুন করে গড়ে উঠছে। কাঠ চেরাইয়ের ব্যবসাটা ধরতে পারলে – টেক্কা দেবার মতও কেউ নেই এখন – একেবারে মালামাল হয়ে যাবে।
লড়াই শুরু হবার পরে পরেই রেট একটা কথা বলেছিলেন। হঠাৎ মনে পড়ে গেল। অবরোধের সুযোগ নিয়ে উনি কীভাবে অর্থোপার্জন করেছিলেন, সেটা নিয়ে। সেই সময় কথাটা বোঝার চেষ্টাও করেনি। কিন্তু এখন ওঁর বক্তব্যটা জলের মত সোজা মনে হচ্ছে। তবে কি তখন বয়সটা আরও কম ছিল বলে মাথায় ঢোকেনি, নাকি নেহাতই বোকা ছিল বলেই কথাটার তাৎপর্য উপলব্ধি করতে পারেনি!
“সভ্যতা যখন ধ্বংসের মুখে কিংবা নতুন করে কোনও সভ্যতা গড়ে উঠছে – ইচ্ছে মত টাকা কামিয়ে নেওয়ার সুযোগ তখনই পাওয়া যায়।”
“এই ধ্বংসের পূর্বাভাষই উনি সেদিন পেয়েছিলেন,” মনে মনে ভাবল ও, “আর ঠিকই আন্দাজ করেছিলেন। পরিশ্রম করবার সদিচ্ছা থাকলে – আর ছিনিয়ে নেবার সাহস থাকলে – এই পরিস্থিতিতেও দেদার টাকা কামিয়ে নেওয়া যায়।”
ব্ল্যাকবেরি ওয়াইনের গ্লাস হাতে আর অন্য হাতে একটা রেকাবিতে এক টুকরো কেক নিয়ে ফ্র্যাঙ্ক আসছেন। স্কারলেট মুখটা হাসি হাসি করে ওঁর দিকে তাকাল। কেবল টারাকে বাঁচানোর জন্য ওঁকে বিয়ে করে ফেলাটা হঠকারিতা হয়ে যাবে কিনা, এই ভাবনাটা ওর মনকে ছুঁতেও পারল না। হঠকারিতা যে হবে না সেটা ওর দৃঢ় বিশ্বাস, তাই সেটা নিয়ে নতুন করে ভাবার কিছু নেই।
ওয়াইনের গ্লাসে চুমুক দিতে দিতে ওঁর দিকে তাকিয়ে মৃদ্য হাসল। খুব সচেতনভাবেই জানে, এখানকার অন্য সব মেয়ের চাইতে ওর গালের গোলাপি আভাই অনেক বেশি উজ্জ্বল। স্কার্ট সামলে একটু সরে গিয়ে ওঁকে বসার জায়গা করে দিল। আলসভরে হাতের রুমালটা নাড়তে থাকল যাতে কোলোনের সুগন্ধ ওঁর নাকে পৌঁছয়। কোলোনটার জন্য ওর গর্ব হচ্ছিল, এখানকার আর কোনো মহিলারই কোলোন লাগানোর সুযোগ হয়নি। ব্যাপারটা ফ্র্যাঙ্কও লক্ষ্য করেছেন। ক্ষণিকের জন্য সাহস সঞ্চয় করে ওর কানে ফিসফিস করে বলে উঠলেন যে ওকে গোলাপের মত সুন্দর আর সৌরভময় লাগছে।
একটু যদি কম লাজুক হতেন ভদ্রলোক! ওঁকে ঠিক একটা বাদামি রঙের বুড়ো ভীরু খরগোশের মত দেখাচ্ছে। টার্ল্টলন ভাইদের মত একটু যদি ডাকাবুকো হতেন, বা রেটের মত একটু বেহায়া! তাহলে অবশ্য ওর চোখ পিটিপিট করা থেকে ওর মরিয়া ভাবটা ঠিক ধরে ফেলতেন। মহিলাদের ব্যাপারে উনি আসলে এতই আনাড়ি যে তাদের আসল মতলব ধরে ফেলা ওঁর কম্মোই নয়। ভাগ্যই বলতে হবে, তবে ফ্র্যাঙ্কের সম্বন্ধে শ্রদ্ধা বাড়ল না।
---------------
টীকাঃ
১ গলিক – ফরাসি দেশ সংক্রান্ত। আগে ফরাসি দেশকে গল দেশ বলা হত।
২ ক্রেওল – এক ধরণের সংকর জাতিকে বোঝায়। ইউরোপীয় এবং (দক্ষিণ) আমেরিকার জনজাতির বর্ণসংকর গোষ্ঠী।
৩ বিউহোগার্দ – Beauregard – P.G.T. Beauregard – আমেরিকান গৃহযুদ্ধের সময় উনি ছিলেন কনফেডারেট বাহিনীর একজন জেনারাল। ফোর্ট সামটের আক্রমণ এবং দখল করে উনি গৃহযুদ্ধের সূচনা করেছিলেন। উনি ক্রেওল বংশোদ্ভুত ছিলেন।
৪ জেনারাল রবার্ট এডওয়ার্ড লী - গৃহযুদ্ধের শেষের দিকে উনি ছিলেন কনফেডারেট বাহিনীর সর্বময় নেতৃত্বে। কূট কৌশলে ইউনিয়ন বাহিনীকে উনি অনেকদিন ঠেকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন।


0 মন্তব্যসমূহ