তৃপ্তি সান্ত্রার গল্প : টাইম পাস



জ্বল ওর বৌকে চোখা চোখা গালাগালি দিল ওর বউও দিল—কি দিল? খুউব ডিটেইলসে লেখার জন্য হাত নিশপিশ—কিন্তু লিখছি না। এই ফাঁকা জায়গাটা পাঠক ভর্তি করুন। দেখুন কেমন টাইম পাস হয়ে যাচ্ছে। 

আর উজ্বল যদি সোনালি চতুর্ভূজ। ওর দাদা ভাই দুটোই পঞ্চায়েত সড়ক যোজনা। এ নিয়ে আগে আপনাদের অভিজ্ঞতা লিখুন। পরে আমি লিখছি। এটাও টাইম পাস। 

যে কোনও টাইম পাসের জন্য আপনি খরচ করেন। আমার জন্য? বাঃ! এটা ঠাট্টা! লেখকের জন্য আবার খরচ কি? বইটা কিনে পড়লে, প্রকাশকের টাকা ওঠে। একদিনও আপনাকে আলাপের জন্য বাড়িতে ডাকতে পারলাম না, তাতে কী! আমি বন্ধু বৎসল। কী রকম! এই যেমন সক্কাল সক্কাল পুরনো সিন্দুক থেকে বের করেছি বন্ধুর ১৬ বছর আগের সাড়ে ২৩ পাতার চিঠির উচ্চাশা—আশার আবার আবার উঁচু নীচু কি! কিন্তু ওই ঘন বেগুনি রঙের শাড়িদের সড়ক জুড়ে হল্লা যেন দেখলাম—আশাকেও গলা তুলতে হয়। গাড়িতে কালিন্দী থেকে শোভাবাজার পথ—মহাবিদ্যালয় যেতে এটুকুই শ্রম। তো রিয়াংকা ম্যাম, আশা জানে না। আশা কি গো? বেগুনি শাড়ির মেয়েদের ঢল দেখলাম যেন। কী সুন্দর! ‘নেট ঘেঁটে দেখেনে—দিলাম ১টা টাইমপাস।’ 

আর রিয়াংকার বেগুনি রঙের উল্লেখে মনে পড়ল ভায়োলেটের কথা। বেগুনি ইংরেজি তো ভায়োলেটই না? ভায়োলেট সদর হাসপাতালের মেট্রন হয়ে এসেছিল, রানাঘাট থেকে বদলি হয়ে। ভায়োলেটের ঝকঝকে দাঁত আর চকচকে বেগুনি রঙের শরীরে অপার রহস্য। ক্রিশ্চান মেয়েটিকে নিয়ে প্রচুর কৌতূহল ছিল সবার। দিদিমুণি আর কেরাণী দিদিমণির বাইরে অন্য বৃত্তির মেয়েদের ঘনিষ্ঠ দেখা ছিল না যে!

 নাও। তুবীর চিঠির কথা বলতে গিয়ে বেগুনীতে আটকে গেলে যে। হ্যাঁ! নীল বেগুনী কালো এমন রহস্য, এমন রহস্য। উঠতে পারবে না। নীল অপরাজিতা নীল বেগুনী রঙের দেবী কালার পারপেল। ওদের জানতো? এটাও দিলাম টাইম পাস। 
সব জানবো বাবা। তো আগে চিঠিটাই হোক। 
চিঠি ? চিঠিটা বলা যায় একটা আজাইরা প্যাচাল। 
তবে এটা দেখাও একটা সৌভাগ্যর ব্যাপার। ও! পাঁজি, গ্রহ নক্ষত্র ভাগ্য নির্ণয় আর সৌভাগ্যে তীব্র আপত্তি। তবে বলা যাক একটা চান্স। সুযোগেরও ব্যাপার। 
তো, চিঠিটা কেন? 
কত হাতিঘোড়া গেল জল—তো সব থাকতে এই দুর্মুখ কেলেকুষ্টি কৃষিকে দু লাইন পত্তরের সঙ্গে এক গজ দুককাদুনি বাই-পোলার চিঠি চাপাটি দলিল দস্তাবেজ কেন? আর পনেরো বছর ধরে কৃষির সে সব জুগিয়ে রাখার লীলাখেলাই বা কেন? ফাটাবার জন্য? 

হ্যাঁ। সে হিসেব এতো চিঠি বল। দলিল বল। কার্ড বল। সার্টিফিকেট বল সবইতো এক রকম ফাটানোর চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত। আমাদের সব ঠিকঠাক আছে। তোমাদের সব আছে তো! সব আছে তো? NRC-NPR-আর-আর-আর ‘ছই ছাপ্পা ছই’ দলিল দস্তাবেজ। 

‘ছই ছাপ্পা ছই’ এই লিরিকে একটা গান ছিল না —তাব্বু তখন আগুন—তাব্বুর আগুনে এখন আর কাজ হবে না। ঠান্ডা ঠান্ডা। ঠাণ্ডায় আগুন জোগায় কাগজ। ছিলে — নেই। এই ঠান্ডা ভয়ানক। 

আর কৃষি তাই কাগজ জোগায়। কাগজ ফেলতে ভয় তার। কি জানি কে কবে কোনটা চেয়ে বসে। আর তুবীর চিঠিটা। ডেকার্স লেনে বসে লেখা। ভাবা যায়? ডেকার্সলেন। ধ্যাধ্ধেড়ে মফস্‌সল কে চিঠি দিচ্ছে ডেকার্সলেন। 

ডেকার্সলেনটা যেন কী! 

সেই লেনের একটা ভিড় দোকানে বসে কৃষিকে চিরকুট লিখছে কেউ। 

ডেকার্সলেনে কৃষি কখনও যায়নি। কখনও যায়নি বলা ভুল। এসপ্ল্যানেডে গেছে। অফিসপাড়া গেছে। রাইটার্স গেছে। ডেকার্সলেন ওই চত্বরেই না? ছোড়দার সাথে ঘুরে ঘুরে মোগলাই আর আলু ভাজা—লাইট হাউসের পাশের গলিতে তখন গরম গরম আলু ভাজার দারুণ ডিমান্ড। তখন আলুকাবলির যুগ। রোল, চাও, মোমো—তত ইন নয়। বাটার টোস্ট ওমলেট—হট ডিশ। মফস্‌সল লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে বিরিয়ানি ঢুড়ছে। খিচিড়ির মধ্যে মাংস—ওটাই তো বিরিয়ানি, না?

 না। খাবার। মেনু। কোনওটাই আলোচনায় আনবে না। ভালো না খাবে। ভালো না পরিবে। ইত্যাদি জ্ঞানবাণী টুকে রেখেছিলেন? হ্যাঁ। তাতো লেখাই ছিল। আজন্ম বাড়ি আর পাড়া আর কাজের খোয়াড়ে আটকে থাকতে থাকতে কলম কালিতে জঙ্গমতার অভাব। হাগা, পাদা আর ... এর বাইরে আর কি হল! দেখো কথার পিঠে কোথায়, মলিন মর্ম মুছায়ে একটা দুষ্টু ছিলকা মনে এলো : আদা পাদা লবণ ছাদা/কে পেদেছে বলুন দাদা। ছোটবেলায় বলতে না? এটা গত বিংশের কোন দশকের? মেয়েদের মসকরা না ছেলেদের রসকরা? যে পেদেছে সে তো জানে, বলবে না। কারণ কী, যা খারাপ বলে চিহ্নিত, তা বলতে নেই। বলতে হবে ফাটানো বা বাষ্প করার মতো কথা। এবং সেই ট্রাডিশন সমানে চলছে। 

কমেন্টারি লেখার মতো প্রত্যাহিকী লেখে কেউ কেউ। দরদাম, বাজার খরচ। রোজকার তেল নুনের পাশে—এক কুচি সবুজ আতর বা জবা কুসুম স্বপ্ন। তো কৃষি, তোমার সেই পাঁচ মাইল বা তিরিশ মাইল যাতায়াতের ছিলকা, চর্যাপদ বা মহাকাব্য উচ্চাশা... লেখো লেখো ফাটিয়ে লেখার কথা ছিল না। তা কোথায় কী হল। মাঝখান থেকে টুকলি স্বভাব। আর কাগজের ঝাঁপি জমানো বাই। নার্সারি। প্রাইমারি। হাই। ছিলেম নাই—যদি হারাই। এই সব ভয়। নিজের। ছেলের। মেয়ের। বরের। গুষ্টির কাগজ। রেজাল্টের। জন্মের। বসতের। বিষয় আশয়ের। আর মুখে মুখে পদ। পদাবলী। বললাম গাইলাম। কিন্তু রাখতে পারলাম না। হারালাম। মায়ের সকাল সন্ধ্যায় গান ছিল। প্রতিটি শব্দ পদ ঠোঁটে নাকী হৃদয়ে ছিল সেই পরম্পরা। মাঠে। বীজে। ফসলে। খালবিল নদী হাওরে। তো মাঠ নদী হুস্‌। পাহাড় জঙ্গল হুস্‌। গুচ্ছেক কাগজের শেকড় নামিয়ে মাটির সাথে আটকে থাকো। আর টোকো জ্ঞান। যা মেনে চলা দুঃসাধ্য। 

তখন এদিক ওদিক কত কথা টোকা। বাণী যেমত। কিন্তু বাবু বাঙালি খাবার বাদ দেবে কি? অতো সোজা। যে কোনো উদ্‌যাপনে পশু। ভাইফোঁটা জন্মদিন। বিয়ের দিন ওসব নয় বাদই গেল। নেতাজী। ২৬ জানুয়ারি। ১৫ আগস্ট। মহালয়া। তো এবার তো বেবাক নিবন্ধু রইল স্বাধীনতা দিবস। ৭৫ তো কী। দেশ ভাগেরও ৭৫—সেই কান্নায় মাংস বন্ধ নাকী? না। না। অত সীরিয়াস কিছু না। শ্রাবণ মাস। সোমবার শিবের জন্মদিন—মাংস খেলে জল ঢালা হবে? 

শিবটা ছিল চাষাভুষো চামার কামারের ঠাকুর—তো সেও কেমন হাইজ্যাগ হয়ে নানা রকম নিয়ম টিয়মের ছাই মেখে পৈতে পরা বামুন বামুন হয়ে গেল। চারিদিকে যা রকম সকম এর পর না, বাংলাতেও নবরাত্রি চালু হয়। ভাবো। দুগ্গা ঠাকুর, বাপের বাড়ি এসে নিরিমিষি খেয়ে খেয়ে কৈলাশে ফিরে যাচ্ছে। 

নিরামিষি নিরামিষি বলে কাঁদলে হবে। মাংসর দাম জানো। পশু-মাটন কারা খায়? বাবুলোক। আম আদমির মেনু জেনেছো? না। বেশি দূরে যেতে হবে না। কুকমাসী যে তোমার পঞ্চব্যঞ্জন রাঁদে—তার কাছে জানতে চেয়ে তো বাছা—বাড়িতে কী খায়। মাংসের প্রশ্নই নেই। সবজিও স্বপ্ন—আশি টাকা কেজি পটল, দুশো টাকা কেজি আদা, একশো টাকা কেজি লঙ্কা, কে খায়? কুড়ি বছর আগে যেমন যে কোনও ভ্যাবলা রাস্তার পাশে—পেঁপে গাছ ছিল। ছিঁড়ে, ভেঙে, কুড়িয়েই হেসেল সামাল দেওয়া যেতো। বিমলা যেমন দুপুরের মিলে পেঁপে সেদ্ধ, পেঁপের তরকারি, পেঁপে ভাজা, পেঁপের চাটনি পেঁপে ভর্তা—না এক পাতে নয়। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ব্যঞ্জন তৈরির দক্ষতা। তো কোথায় পেঁপে গাছ। ঝিটকিনি ধুতরো আলকুশি ভ্যারেন্ডার পাশে নদর্মা—নর্দমার ওপর বাঁশ আর টালি দিয়ে মাথা গুঁজে টিকে থাকার লড়াই যে তিনতলা বাবু বিল্ডিং-এর উচ্চাশা হয়ে যায়—ভাবাই যায় না। সমস্ত পাড়ার ছিল একটা টিউকল আর কারো কারো পেঁপে গাছ। বল ভরসা ছিল পুকুরখানা। হরিদাসী, টগরী, আলো, চায়না, তার মাসি শ্বশুর-শাশুড়িদের নিয়ে ছিল হালদারপাড়া। 

হ্যাঁ। কষ্ট গেছে জল টানার। এলো ট্যাপের জল। হল পাকা রাস্তা। ড্রেনের ওপর মুলিবাঁশ পরিবারগুলো গেল দূরে ৫২ বিঘায়। কুলিপাড়ায়। টাকা পেল। বাড়ি বানানোর সরকারি সুযোগ, সুবিধাও। পেঁপের সাথে সাথে যতসব গাঁ গেরামের গাছপালাও গেল। পুকুরপাড়ের লোকজনের ডুবে স্নান করার বদভ্যাস গেল। সংক্রান্তিতে যে পুকুরে স্নান ধ্যান শেষে পাড়ের মাটিতে পোঁতা চড়ক খুঁটিতে ঝোলার হাউস—সেই হাউশটুকু গাজরের মতো ঝুলিয়ে পুকুরের বুকে গাজন মেলা, বিয়েবাড়ি, গাড়ি পার্কিং করতে করতে চড়কের মন্দিরের জন্য দু’হাত ছেড়ে পুরোটাই মার্কেট হবার ছকে আর পুকুর ‘হুঁস’। সেখানে সোজা সটান খাড়া ক্ষমতার দণ্ডটি। সে দণ্ডের ফক্কড়ি, যখন তখন লাফিয়ে ওঠা দেহযন্ত্রের কথা, মেয়েরা ভাবতেই পারবে না। 

তো একবিংশের নবীন গতরে লেগে থাকা সেই পোকিতির একটা নকশা বানাও তো বাছা—কেমন ছিল তোমার এলাকার গতর থোবড়া—হ্যাঁ এটাও একটা টাইম পাস। না, তোমার হাতের ছোট্ট যন্ত্রটা পাসওয়ার্ড দেবে না। রেল লাইন পেরোলে তখনও অনেকটা প্রকৃতি। লেভেল ক্রসিং-এর হুজ্জতি পেরিয়ে বুড়াবুড়ি তলায় দু দুটো হাওর প্রায় পুকুর। জাগ্রত বুড়াবুড়ি মা প্রথমটিকে রাখতে পারলেন না। হেরিটেজ দুগ্গা বেশি ইন—তিনি বছরে ৩ দিন জলকেলি করবেন তার প্রস্তুতিতে চওড়া রাস্তা, বিনোদন, মেলা, বাইক সাম্রাজ্য। 

অন্যটির কথা, মানে অন্য পুকুরের পাড়ে গাজন মাঠ আর হালদারপাড়ার কথা কিছু আগে বলা হল। বাকী জমি, পুকুরগুলি বাবুদের ভোগে। গাছ কেটে, পুকুর বুজিয়ে সুন্দর সুন্দর নামের বাবুপাড়া। তো ২০ বছরেই তাদের শৌখিন অস্তিত্ব হাঁসফাঁস—পাড়ায় পাড়ায় বাড়ি হটিয়ে হোটেল ইন। তো, বাবুয়া কোথায় ছিল সেই আলকুশি, ভ্যারেন্ডা, আকন্দ ঝোপ? আর পুকুর আর ইটভাটা আর খেজুর গাছ, গরুঘোড়া আর কাশফুল? মদভাটি টু ঘোড়াপির—ঘোড়াপির টু নুনবহি—জাহাজ ফিল্ড টু বাহান্ন বিঘা—দিলাম একটা টাইম পাস্‌। 

মদভাটির পাশের মাঠটা মূমুর্ষ। যে সব বায়ু সেবনকারী বৃদ্ধরা মাঠ সচল রেখেছিলেন তাঁরা গত হয়েছেন। মদ ভাটির স্বদেশী মেজাজের মোদো মাতালদের তেমন উৎপাত ছিল না, বাবুপাড়া তবু ভাবতো মদভাটিটা উঠে গেলেই ভালো—গুচ্ছেক বিশ্রী চেহারার চাকর বাকর মার্কা লোকজনের গাতায়াত, গা ঘিনঘিন করে। এখন ভাবে থাকলেই ভালো—তবু তো থাকবে উঁচু বিল্ডিংহীন অনেকটা ফাঁকা জায়গা। ঘোড়াপীরের জলনিকাশী বড় নালা, রাস্তা পেরিয়ে চাতরা বিলের দিকে। মূল রাস্তা যা রাজমহল রোড বলে পরিচিত সেটা সোজা গেছে এয়ারফিল্ডের পাশ দিয়ে, অন্যটি বাঁ হাতে সোজা পাওয়ার প্ল্যান্টের পাশ দিয়ে নুনবহি বরাবর। 

এক ফালি জমি, সরু ফিতের মতো, পাওয়ার প্ল্যান্টের প্রাচীর আর রাস্তার মাঝখানে জিরো ফিগার ঘাস জমি... নিন পছন্দ সই নাম বসিয়ে নিন। আলিয়াভাট নামটা বসাতে চাইছিলাম, তো সে তো আবার গভ্ভোবতী। তো হলই বা ঐ জিরো ফিগার জমি কি অমনই থাকবে। থাক থাক গভ্ভো উঠে যাবে আকাশ অব্দি ... 

তো কমপ্লেক্স, পার্ক, আর পল্লীর মানুষের তখনও কিছু কিছু পুকুরগাছ পোকিতি ছিল। আর বড়দির বাড়ি অরবিন্দ পার্কে যেতে সোজা গেল পেরোতে হয় ফায়ারব্রিগেড অফিস, এয়ার পোর্টের মাঠ। তারপর বাঁ হাতে সোজা নেমে সরস্বতী শিশু মন্দির স্কুলকে বাঁয়ে রেখে পাড়ার মন্দিরতলা—রাধাগোবিন্দর মন্দির ছিল—পরে ভোলেবাবা সংযোজন—এবার রামনবমীতে সেবক হনুমান আসবেন—খেলার মাঠটি সবশেষে মন্দির চত্বর—খেলাধুলা কে করে এখন—জিমে যায়— পুলে যায় ... এইসব আধুনিক আছোলা শূল। তো ঘোড়াপির থেকে বড়দির বাড়ি যাওয়ার এই এক রাস্তা অন্য যে রাস্তা হোলি চাইল্ড, নুনবহির দিকে সোজা গিয়ে চণ্ডীপুরের দিকে—সে রাস্তায় বড় পুকুর। নিরাময় ডাক্তারের পুকুর। পেছনে মাঠ আর বিল। মাধব যদুর বিয়েতে জলসাজা, নদী নেমন্ত, যাবতীয় ক্রিয়া এখানেই না? তো সে কেমন গতর খসিয়ে খসিয়ে জিরো ফিগার। বড় বড় দালান চারপাশ থেকে ঠুসে ধরছে তাকে আর তার পিছনে মাঠ। মাঠের পিছনে চাতরার বিল—মালঞ্চপল্লীর শেষ প্রান্ত—ছোড়দির বাড়ির পাশে মুকুন্দ ডোমের বাড়ি—তার পিছনে বিল—সে বিল ভরতে ভরতে দেখো কেমন গ্যারেজ সহ দোতলা বুক দিয়ে ঠেসে ধরেছে বাঁধকে। আর হ্যাঁ সেই নিরাময় ডাক্তারের পুকুরের পাশের রাস্তা দিয়ে বড়দির বাড়ি হাঁটার সময় ডান দিকে পাওয়ার হাউসের কোয়ার্টারের প্রাচীর ঘেষে, রাস্তা আর প্রাচীরের মাঝে ১-১১/২ ফুট জায়গায় দেশলাই খোপের মতো বসত—নদীপাড়ের ঘর হারানো মানুষ সব। অবশ্য তারা ব্রিজের তলা থেকে খেদানো মানুষও হতে পারে। তো শহরের বাক্সবাড়ির বাইরে তখন এই সব প্রকৃতি বিলাস—কলমি, ধুতরো, ঝিটকিনি, আমরুল। আর মাটির/টিনের বাড়ির দেওয়ালের ওপর টালি বা টাট্টির ছাওনি—রাস্তা এবড়ো খেবড়ো। সে পথে হাঁটতে হাঁটতে পাওয়ার হাউসের ওই তিনতলা কোয়ার্টারের এক ঝলক স্মৃতি ভেসে আসে। আবছা। তবে সামনের মাঠের কৃষ্ণচূড়া গাছের তলার স্মৃতি অনেক টক্‌টকে—এক মাথা চুল আর দীর্ঘ শরীর নিয়ে শুয়ে আছে পদাতিক প্রবালদা—তরুণী ভার্যাকে নিয়ে কী প্রাণপণ গেরস্থালি তাঁর— 

আরে! এল.আই.সি উমা! তখন থেকে কী ‘পাঠান’-এর ‘হামনে তো লুট লিয়া’ দীপিকা রিংটোন বাজাস—মোটেও ধরব না, আচ্ছা—ধরছি, তুই তো সেই অনেক দিন থেকে, সেই কবিতা লেখা ছোপ ছোপ প্রত্ন, লোক-উচ্চাশা প্রবালদাকে চিনিস তো—চিনিস না? 

মনে কর। মনে কর। না। এ জেলায় নয়। হাওড়া। লোক সংস্কৃতি। প্রথম এসে নিজের তোলা ছবি দিয়ে কার্ড বানিয়ে বিজয়া গ্রীটিংস দিয়েছিলেন। কেমন কার্ড, কি ছবি, বলব না। একটু ভাব। ভাব। ভাবা প্র্যাকটিস কর। হ্যাঁ। তোকেও দিলাম এই টাইম পাস। না। টাইম পাসটা তোর চলবে না। মেলা কাজ LIC-র। শেয়ারবাজারে নথিবদ্ধ হওয়ায় ‘পারফর্ম অর পেরিশ’, ‘ডেলিভার অর ডিপার্ট’ এই সব মন্ত্র নিয়ে ছুটতে হচ্ছে পলেসি বিক্রি, প্রিমিয়াম আর লাভ—এই সব লাভ-চক্রে। তো কাকে দিই? এ শহরের হারিয়ে যাওয়া জহরতুহিনপাপুপলুবিচ্চুকিশান এদের নিয়ে Kol-32র কৌলিন্য চোবানো কবিরাজী কাটলেট ফ্রিসফ্রাই না হোক, কান্নি মোড়ের পেঁয়াজি তো হতে পারে। সরকারি মঞ্চে হাত কচলানো কবিকুল পারিবে না। দিব্যেন্দু (তার বাড়ির নাম ‘ফিরে এসো চাকা’) পলাশ ফিরোজ পার্থ—উচ্চাকাঙ্ক্ষাহীন এইসব কবি কুলের ঠেলাঠেলি হাঁসফাঁস যাপনের পাশে এই টাইম পাসটি রাখি। আর টাইম পাস বিলাতে বিলাতে কৃষি যেকোনো পর্যটনে বেরিয়েছিল ভুলে যায়। লোম ভরা পশু শরীর নয়। বাহারি টবে প্যানসি, ক্রিসেন থমাস, ক্যালেন্ডুলা আর পিটুনিয়া নয় গোপন অঙ্গের গোপন কেশের মতো তখনও প্রকৃতিতে একটা দুটো ঝিটকিনি। রোগা সজনে। পেঁপে গাছ। ঘোড়াপির কুলিপাড়া নিত্যানন্দপুর নুনবহি দিয়ে যে পথ পীরানাপীরের দিকে। কে পীরানাপীর? খুঁজে বের কর প্রবাসী সেই পরিব্রাজকের নাম। হ্যাঁ, হ্যাঁ ঘোড়াপীরের কাছে। ঘোড়াপীরটা কি? এখানে তো কোন পীর নাই। গোপাল আছে। লিঙ্গ আছে। না, না। না হাতে গোপাল থাক। শিব থাক। লিঙ্গ থাক। কিন্তু ওখানে পীরও আছে। কোথায়? 

নে। দিলাম একই সঙ্গে দু-দুটো টাইম পাস। খুঁজতে হবে—নীহাররঞ্জন, সুকুমার সেন, হাবিব, থাপার থেকে জেলার গোপাল লাহা আর পাশের জেলার হিমাংশু কুমার সরকার—খুঁজতে হবে চাপা পড়ে থাকা বসতগুলো—ভারত এক খোঁজ। সর্ষে, ধান, অড়হর—সবুজ খেতির হুল্লোড় ছিল যত। উধাও সে সব। মেশিনে না ওঠালে তুবীর সেই ২২ পাতার চিঠির মতো এরাও কি গায়েব হয়ে যাবে কৃষি? মেসেজ আসছে... Link Yr. Voter Card with Adhar Card 

কোনটা বেশি জরুরি? এইরকম একটা টাইম পাস দিয়ে কেটে পড়তে চাইছিল সে। একটা মেসেজ এলো : ভোটার আধার লিংক জরুরি? 

প্রশ্ন করুন। 
না। 
এটা টাইম পাস নয়।
------------

লেখক পরিচিতি: তৃপ্তি সান্ত্রার জন্ম ২ জানুয়ারি, ১৯৫৬ সালে মালদা জেলাশহরের সদর হসপিটালে। বাবা সুরেশচন্দ্র সান্ত্রা, মা বেলা সান্ত্রা। আদি নিবাস রাজশাহী। পেশা শিক্ষকতা। গল্প,উপন্যাস,কবিতা,অনুবাদের পাশাপাশি লিখেছেন গবেষণামূলক নিবন্ধ , বেশ কিছু পত্রিকার মনে ধরা কলাম। নিবিড় এক পাঠকগোষ্ঠির কাছে তৃপ্তি সান্ত্রা এক অতি পরিচিত নাম। লেখার মাধ্যমে পেয়েছেন অনেক বন্ধু,অনুরাগী,সুহৃদ। কবিতাপাক্ষিক আর বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের পুরস্কার পেয়েছেন ২০০৩ আর ২০০৬ তবে লেখক মনে করেন লেখার মাধ্যমে পাওয়া পাঠকরাই তাঁর সবচেয়ে বড় পুরস্কার।

উল্লেখযোগ্য প্রকাশনা: চুড়েইল, মেয়েদের চোরাগোপ্তা স্ল্যাং: শরীর এবং অন্যান্য আলাপ', চিরকুট(উপন্যাস), ছোপ ছোপ কাটাকুটি(কাব্যগ্রন্থ), এক যে ছিল রাজকইন্যা(অনুবাদ), রাতরোয়াকের বুদ্বুদ যাপনের(ছোটগল্প সমগ্র) ইত্যাদি।



একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ