এলি স্মিথের গল্প: বেরোবার পথ নেই







অনুবাদ:দোলা সেন

শুয়ে আছি। ভোর তিনটে এখন। দুচোখ টানটান করে জেগে আছি। একবার পাশ ফিরলাম। আবার সোজা হয়ে শুলাম। গত রাতে আমি সিনেমা দেখতে গিয়েছিলাম। সেখানেই ওই মহিলাকে দেখি। আমার দুটো সিটের পরে বসেছিল ও। সিনেমা চলাকালীন অন্ধকারেই উঠে সিঁড়িটা দিয়ে নেমে গেল। সিনেমার পর্দার বাঁদিকের ফায়ার এক্সিটের দরজাটার হাতল ঘুরিয়ে ভেতরে চলে গেল। ভারি দরজাটা আপনা হতেই বন্ধ হয়ে গেল আবার। আমি এই সিনেমাহলের ভেতরটা চিনি। আমি জানি এই ফায়ার এক্সিটটা বেআইনি। এটা দিয়ে কোথাও যাওয়া যায় না। দরজার পিছনে একটা সিঁড়ি নিচের দিকে চলে গেছে, যার শেষপ্রান্তে দুটি তালাবন্ধ দরজা।

আমি চারপাশের লোকজনের দিকে তাকালাম। সবাই সিনেমা দেখতে ব্যস্ত। পূর্ব আর পশ্চিমের সম্পর্কের ওপর একটা নতুন ব্রিটিশ মুভি এটা। সেই মুহূর্তে পর্দায় একজন গোঁফওয়ালা লোক রান্নাঘরের ছুরি হাতে এক খাড়াচুলো লোককে শাসাচ্ছিল।

আমার চোখ ফায়ার এক্সিটের দরজার দিকে ফিরল। পাশে ছুটন্ত সবুজ মানুষের ছবি নিয়ে এক্সিট লেখা আলোটা জ্বলে উঠেছে এবার। কিন্তু দরজাটা বন্ধই আছে। যেন ওখান দিয়ে কেউ চলে যায়নি।

কেউ কি জানে না যে, ওখান দিয়ে বেরোবার কোনো পথ নেই? আমি নিজের মনেই ভাবছিলাম। আর একবার ঢুকে গেলে, ওই বন্ধ ভারি দরজা ঠেলে কেউ ফিরেও আসতে পারবে না। এতজন দর্শকের মধ্যে আমিই কি একমাত্র ব্যাপারটা জানি? ‘সিনেমা শেষ না হওয়া অবধি মহিলাটি যদি তার সিটে না ফিরে আসে’ - আমি নিজেই নিজেকে বলছিলাম – ‘তাহলে ওর সঙ্গীকে আমি বলে দেব যে, আমি দেখেছি সে কোথায় গেছে’। তখন আমরা সিঁড়ি দিয়ে নেমে দরজাটা খুলে দেব। বোধহয় সে দরজার অপর দিকে এমনই কারো জন্য শান্তভাবে অপেক্ষা করছে, যে ওকে হলে ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করবে।

আমি সিনেমায় আর মন দিতে পারছিলাম না।

হয়ত মেয়েটি ভেবেছিল ওটা ওয়াশরুমে যাবার দরজা। অথবা... অথবা সে এই হলেরই কর্মী। কোনো কাজে সে এ পথে গিয়েছে। সম্ভবতঃ তার কাছে ওই তালাবন্ধ দরজার চাবি আছে।

কাহিনির সূত্রগুলির সমাধান না করেই একসময় সিনেমাটি শেষ হয়ে গেল। আলো জ্বলে উঠল। একসময় হলটি খালি হয়ে গেল। সকলের মতো আমিও বের হয়ে এলাম। বেরোবার সময় ওর সিটের ওপর একটা সোয়েটার আর ব্যাগ পড়ে আছে দেখলাম। আমি সিঁড়ি দিয়ে উঠে সঠিক দরজা দিয়ে বের হয়ে এলাম। সিট দেখিয়ে দেয় যে লোকটি, তার পাশ দিয়ে সোজা হেঁটে বেরিয়ে গেলাম। কিন্তু, মেয়েটির ব্যাপারে কিছুই বললাম না। ওরা যখন ব্যাগ আর সোয়েটারটা দেখবে, তখন নিশ্চয়ই মেয়েটির খোঁজ করবে এবং নিচে নেমে ফায়ার এক্সিটের দরজাটাও খুলে দেখবে।

কিন্তু এখন, এই মধ্যরাতে, নির্ঘুম আমি, নিজেকেই প্রশ্ন করে যাচ্ছি – মেয়েটি কি এখনো সেই দরজার পিছনেই রয়ে গেছে?

****
একবার সিনেমা দেখার সময়, তুমি আমাকে একটা এক্সিট দরজার গল্প বলেছিলে।

সেই সময়ে আমরা একে অপরকে খুব ভালোভাবে চিনতাম না। সিনেমা দেখতে গিয়েছিলাম। সিনেমা শেষ হয়ে গিয়েছিল। মাথার অনেকটা ওপর দিয়ে চরিত্রের নামগুলো ভেসে যাচ্ছিল। আমরা উঠে পড়লাম। তুমি আড়মোড়া ভেঙে হাই তুলছিলে। আমি তোমার ভেজা মুখের ভিতর জিভের নড়াচড়া দেখছিলাম।

তুমি হাই তুলতে তুলতেই চোখ পাকালে – ‘ভারি অন্যায় কথা। একদম চলবে না এসব’। সেই কথা গড়াতে গড়াতে কি করে যে আগুন থেকে বাঁচার আইনকানুনে পৌঁছেছিল, তা আজ আর মনে নেই।

সেই সিনেমাহলটি একটি পুরোনো সিনেমাহলকে সংস্কার করে নতুন করে গড়া হয়েছিল। এর নিচের তলায় একটা মদের দোকান ছিল, যে দাবি করত ব্রিটেনের সবচেয়ে সস্তা বিয়ার সেখানে পাওয়া যায়। তার বাইরেটায় মাতালেরা প্রায়ই বমি করে রাখত। ওপরতলায় নতুন সিনেমাহলটি তৈরি হয়। পুরোনো হলের উর্দ্ধাংশ তিনটে বড় পর্দা দিয়ে ঢাকা হয়েছিল। ফলে নতুন হলে ভাজা খাবারের গন্ধ, পানশালার হট্টগোল - মুভির শব্দের সঙ্গে মিশে যেত। সেদিন আমরা রেলফ ফাইনসের মুভি দেখতে গিয়েছিলাম। সম্ভবতঃ রাশিয়ান – ইউজিন অনিগেন কি? লিভ টাইলারও ছিল বোধহয়। ব্যালালাইকা বাজছিল নেপথ্যে। নাকি আমি ডক্টর জিভাগোর সঙ্গে গুলিয়ে ফেলছি? আমি বিছানায় শুয়ে শুয়ে মনে করার চেষ্টা করছি আপ্রাণ। কিন্তু মুভিতে কী ছিল সঠিকভাবে মনে করতে পারছি না। শুধু মনে আছে, কিছু প্রেমপত্র ছিল, আর ছিল প্রচুর বরফ আর ফারের কোট।

তুমি বলেছিলে, ‘এসো, তোমাকে দেখাই”।

কেউ খেয়াল করেনি, আমরা দুটিতে কী করছিলাম। তুমি ঐ দরজার হাতল নামিয়ে দরজাটা খুললে। ভিতরে গিয়ে, হাঁটু মুড়ে প্রায় বন্ধ দরজার ফাঁকে পাতলা খবরের কাগজ গুঁজে দিলে। দরজাটা না খোলা, না বন্ধ হয়ে আটকে রইল।

দরজার পিছনে সিনেমাহলের চাকচিক্যের কিছুই ছিল না। কীটনাশকের গন্ধ পাচ্ছিলাম। সিঁড়ির ছাদ থেকে অল্প আলোর বাল্ব জ্বলছিল। আমরা সিঁড়ি দিয়ে নেমে একটা তালাবন্ধ দরজার সামনে পৌঁছোলাম। বহুদিন সেটা খোলা হয়নি। তার পাশে আর একটা বন্ধ দরজা। সেটা খোলার জন্য কোনো হাতল নেই। আমি জোরে ঠেললাম। দরজাটা খুললো না।

তুমি বলছিলে – যখন সিনেমাহলটা প্রথম খোলে, তখন ওখানকার ম্যানেজার, যে নাকি আবার তোমার বন্ধু – তোমাকে এই হলটা ঘুরিয়ে দেখিয়েছিল। সেই তোমাকে বলেছিল, সে একটি কমবয়েসী মহিলাকর্মীকে নিয়ে এখানে এসেছিল। কারণ হিসেবে অবশ্য বলেছিল যে পিছনের দরজা দিয়ে তিন ক্রেট ফলের রসের বোতল আসার কথা ছিল। ওরা ভিতরে ঢোকার পর ফায়ার এক্সিটের ভারি দরজাটা নিজের ওজনেই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ওরা সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে যায়। পিঠ দেওয়ালে ঠেকে যাবার পর সেখানে বেশ কয়েকবার দুজনে মিলিত হয়। তারপরে তাদের নজরে পড়ে সেখানে কোনো মোবাইল নেটওয়ার্ক কাজ করছে না। তখন তারা আতঙ্কিত হয়ে ওপরে দৌড়ে এসে বন্ধ দরজায় প্রাণপণ ধাক্কা দিতে থাকে, চিৎকার করে লোক ডাকে। কিন্তু সেই আওয়াজ কারো কানে পৌঁছায়নি। এমন কি সেই ভারি দরজা আর ইটের মোটা দেওয়াল ভেদ করে এপাশে পানশালার অকথ্য গণ্ডগোলও শোনা যাচ্ছিল না। ওই সিঁড়িতে দাঁড়িয়েই তুমি আমায় বলছিলে, প্রায় দেড়দিন ওরা ওখানেই ছিল। অবশেষে এক সাফাইকারিনী লুকিয়ে সিগারেট খাবার জন্যে দরজাটা খোলে। তখন দেখা গেল, সেই বরফজমা ঠাণ্ডায় ওরা দুজন আলাদাভাবে সিঁড়ির দুই কোণে হাত বুকে জড়িয়ে চুপটি করে দাঁড়িয়ে আছে। তুমি ব্যাখ্যা করে বললে – সময়টা শীতকাল ছিল।

শুনতে শুনতে আমিও আতঙ্কিত হয়ে পড়ছিলাম। তুমি যে পাতলা কাগজটা দরজার ফাঁকে ঢুকিয়ে এসেছ, তা কক্ষণো ওই ভারি দরজার ওজন রাখতে পারবে না। ওটা ঠিক নেমে গিয়ে বন্ধ হয়ে যাবে। কয়েক ইঞ্চি পুরু সেই ধাতব দরজা আমরা কিছুতেই খুলতে পারব না। আমার এই ভাবনার মাঝেই তুমি আমাকে দেওয়ালে ঠেসে ধরেছিলে। আলতো করে চুমু খাচ্ছিলে। তারপর আরও জোরে আমার মুখে, ঠোঁটে চুমু খেতে থাকলে। গতানুগতিক মুভির মতো আমি গলে যাচ্ছিলাম। তোমার আঙুল আমার শরীরে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। তোমার হাতের সঞ্চালনে আমি ক্রমশঃ বিবশ, বেপথুমান – আমার সমস্ত শরীর যেন এক গিটারের মতো তোমার হাতের ছোঁয়ায় বেজে উঠছিল।

****

‘হ্যালো! কী বলছ? কী হয়েছে?’

তোমার গলা ভারি, ঘুমজড়ানো।

‘আমি বলছি...’

‘এখন ভোর সাড়ে তিনটে বাজে!’ – তুমি অবাক।

“ভাবছিলাম, তুমি কেমন আছ?’ – আমি বললাম।

তোমার স্বরে বিরক্তি – ‘তুমি এমন করতে পার না। এটা অন্যায় শুধু নয়, অযৌক্তিকও বটে। খুব খারাপ। এমন করব না বলে শপথ করেছিলাম আমরা। করিনি?’

‘আমার এটা জানা খুব দরকার ছিল’ – আমি বললাম।

‘হে ভগবান! আমি অগাধে ঘুমোচ্ছিলাম। আর ঘন্টা তিনেকের মধ্যে আমায় উঠে পড়তে হবে’।

‘আমি ঘুমোতে পারছি না’।

‘বোম পড়েছে? আতঙ্কবাদী হামলা? লন্ডন শহর জ্বলছে? পৃথিবীর শেষ দিন আজ? কাজের জায়গায় কোনো ঝামেলা?’ – তুমি বলে যাচ্ছিলে।

‘তুমি নতুন সিনেমাহলের ফায়ার এক্সিটটার কথা জান, জানোনা?’- আমি বলার চেষ্টা করলাম।

‘কীসের কথা?’

আমি বললাম – ‘ফায়ার এক্সিটটা দিয়ে বেরোনোর পথ নেই’।

‘ক্কী নেই?’

আমি হাল ছাড়লাম না – ‘আমি ভাবছিলাম, ধরো তুমি ওখানে আটকে গেলে... মানে তুমি না, অন্য কেউ। আমি বলতে চাইছি যে কেউ একজন - যদি কেউ ওখানে আটকে পড়ে আর ভারি দরজাটা বন্ধ হয়ে যায়, আর বাকি সবাই বাড়ি চলে গিয়ে থাকে – তাহলে, তাহলেও কি ওই সিঁড়িতে আলো জ্বলবে?’

‘অ্যাঁ?’

‘আচ্ছা, তোমার কি মনে হয় যে সিনেমাহলের লাইটের ব্যবস্থা এমন যে সব কাজ শেষে সুইচ অফ করে দিলে সমস্ত আলো, মায় সিঁড়ি আর করিডোরের আলোগুলোও নিভে যাবে? মানে আমি বলছি, যদি কেউ ওই এক্সিট ডোরের পিছনের করিডোরে আটকে গিয়ে থাকে, আর অন্য কেউ না জানে যে, সে ওখানে আছে? সে হয়ত সেখানে একলা দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে – ভাবছে, কেউ এসে ওকে ঠিকই বের করে নিয়ে যাবে, আর তখনই হঠাৎ দপ করে সব আলো নিভে গেল! তাহলে তো সে সেই অন্ধকারে অপেক্ষা করতে থাকবে কখন পরের দিন কেউ আসবে, এসে আবার হলের আলো জ্বালাবে?’

তুমি বললে -‘তা হতে পারে। কিন্তু এ কেমন ফায়ার এক্সিট যে সেখান দিয়ে বেরোবার পথ নেই?’

‘আচ্ছা, তুমি কি মনে কর যে, ওখানে দিবারাত্র আলো জ্বলে? মানে জরুরি আলোর ক্ষেত্রে যা হয় – সিনেমাহল খোলা বা বন্ধ যাই হোক না কেন - সেই আলোগুলো জ্বলতেই থাকবে?’

‘বেআইনি ব্যাপার হয়ে যাবে না?’ - তুমি বলছিলে।

আমি বললাম – ‘তোমার মনে নেই?’

দেখা গেল যে, তোমার কিছুই মনে নেই। আমাকে সিনেমাহল ঘুরিয়ে দেখানো, দরজা খুলে রাখার জন্যে খবরের কাগজ ভাঁজ করে সেখানে ফাঁসিয়ে রাখা, ফেরার পথে ফায়ার এক্সিটকে ফায়ার এক্সাইট বলা – কিচ্ছুটি না।

অবশেষে তুমি বললে – ‘শুতে যাও। সকালে আমায় ফোন করো, কিংবা লাঞ্চব্রেকে। এখন ঘুমিয়ে পড়ো দেখি। এখন মাঝরাত। নয়তো আমিই কাল সকালে তোমায় ফোন করব ‘খন। শুভরাত্রি’।

আমি তাই করলাম। তুমি বলেছিলে বলেই ঘুমোবার চেষ্টাও করলাম। কিন্তু পুরো ব্যাপারটাই এত বিরক্তিকর ঠেকল যে গায়ের কম্বলটা ছুঁড়ে ফেললাম। সেটা মেঝের ওপর গুটিয়ে রইল।

অন্ধকারে, গায়ে কম্বল জড়িয়ে আমি, মেঝের ওপর চুপটি করে বসে রইলাম।

আর অবিরত নিজেকেই প্রশ্নে প্রশ্নে ক্ষতবিক্ষত করে চলছিলাম – কেন আমি নিচে গিয়ে মেয়েটিকে সাহায্য করার চেষ্টাও করিনি? অন্তত একবার তো দেখতেই পারতাম যে তার সাহায্যের দরকার আছে কিনা? নিদেনপক্ষে বেরোবার সময়ে কোনো কর্মীকে বলে আসতাম! কেন করলাম আমি এমন? কেন কাউকে কিচ্ছু না বলে, আমি সিনেমাহল থেকে বেরিয়ে এলাম - যখন আমি নিশ্চিত জানি যে, কেউ একজন হয়ত বিপদে পড়েছে? কেন? কেন?

আমার হাতের ফোন বেজে উঠল। স্ক্রিন বলছে এটা তুমি।

তুমি বললে – ‘জাগিয়ে দিলাম?’

‘হুঁ’ – ডাহা মিথ্যে বললাম আমি। – ‘সত্যিই অগাধে ঘুমোচ্ছিলাম’।

‘এ বাবা! দুঃখিত’।

আমি বললাম – ‘না না, ঠিকই আছে। জাগানোর খেলায় এবার দুজনেই সমান সমান’।

তুমি বললে – ‘আমার একটা কথা মনে পড়ল। তোমকে বলব বলে কল করলাম’।

‘সিনেমাহলের এক্সিটের ব্যাপারে?’ - আমি বললাম।

‘উঁহু। গতকাল আমি যখন শহর থেকে বড়ি ফিরছিলাম, তখনকার কথা,’ তুমি বলে যাচ্ছিলে –

তুমি যখন রাস্তার পাশ দিয়ে হেঁটে তোমার নতুন আস্তানার দিকে যাচ্ছ, তখন তোমার মাথায় ঠকাস করে কিছু লাগে আর সেটা সামনে মাটিতে পড়ে যায়। ফুটপাথের দিকে তাকিয়ে দেখলে, ম্যাকডোনাল্ডের একট ছোট দুধের কৌটো পড়ে এদিক ওদিক দোল খাচ্ছে। একটা বাস তখন তোমার পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। তার ওপরতলায় কমবয়েসী মেয়েদের একটা দল ছিল। জানলা দিয়ে ওরা তোমায় কাঁচকলা দেখাচ্ছিল। তারপর তুমি দেখলে, বাসটা যখন আরেকজন পথচারীকে পার হয়ে যাচ্ছিল, তখনও ওরা কয়েকটা একইরকম দুধের কৌটো ছুঁড়ে দিল। দু একটা সেই মহিলার গায়েও লাগল। মহিলা তাকিয়ে দেখলেন, বাস থেকে মেয়েগুলো তাঁকে কাঁচকলা দেখাচ্ছে। তিনি দাঁড়িয়ে পড়ে একটা দুধের কৌটো তুলে তাদের দিকে ছুঁড়ে দিলেন।

এটা শুনে আমি খুব হাসছি। তুমিও হাসছিলে। আমরা দুজনে দুজনের হাসির আওয়াজ শুনছি আলাদা ঘরে থেকেও। শহরের দুই প্রান্তে আলাদা বাড়ি থেকে, ভোর চারটেয়, আমরা একসঙ্গে হেসে উঠলাম।

****

বাইরের অন্ধকার পাতলা হচ্ছে। পাখিরা ডাকতে শুরু করেছে। আমি ভাবছি, অন্ধকারে যখন সময় বোঝা যায় না, তখন কেমন লাগে! আমি তোমাকে সেই মেয়েটির কথা বললাম। সে তো এমন একটি ফায়ার এক্সিট দিয়ে ঢুকেছে, যা থেকে সে বেরোতে পারবে না। চেয়ারের ওপর তার জিনিসগুলো পড়ে আছে।

‘আশ্চর্য! তোমার কি কিছুই মনে নেই? সেখানে শুধু দুটো তালাবন্ধ দরজা পাশাপাশি রয়েছে!’ আমি বললাম।

তুমি বললে, ‘ঠিক আছে, ঠিক আছে। এখনি তুমি কিছু করতে পারবে না। কেউ নিশ্চয়ই তাকে খুঁজে পাবে। হয়তো তারা এতদিনে এক্সিটটা ঠিক করে নিয়েছে। তুমি তো জান, এখন আইনকানুন এ বিষয়ে কত কড়া। কিংবা মেয়েটি সেই লোকটার মতো দেয়াল ভেদ করে বেরিয়ে আসবে – যেমনটি তুমি আমায় একবার বলেছিলে’।

‘কোন লোকটার মতো?’ আমি জানতে চাইলাম।

‘আরে, ওই লোকটা - যে বাইরের দেওয়াল আর শব্দনিরোধী দেওয়ালের মাঝের ফাঁকে গলে গিয়েছিল! তোমাদের শহরের সিনেমাহলে গো, তোমার ছোটবেলার সেই ঘটনাটা। তুমিই তো আমাকে গল্পটা শুনিয়েছিলে – মনে নেই?’

‘নাঃ’ – আমার সাফ জবাব।

‘মনে করে দেখ’ – তুমি বললে। ‘আমি সেদিন অফিস থেকে বিধ্বস্ত হয়ে ফিরেছিলাম। চাকরি ছেড়ে দেব ভাবছিলাম, কিন্তু ধারগুলো শোধ না হওয়া পর্যন্ত, সেটাও সম্ভব ছিল না। আমার খুব মন খারাপ ছিল – মনে আছে?’

আমি বললাম – ‘তোমার প্রায়ই খুব মন খারাপ হয়’।

তুমি বললে – ‘বাজে কথা বলো না তো! সেদিন সত্যিই আমি ভেঙে পড়েছিলাম। তুমি আমায় বিছানায় শুইয়ে দিয়ে আমাকে চাদর দিয়ে ঢাকা দিয়ে দিয়েছিলে। আর নিজে চাদরের ওপর শুয়ে আমায় জড়িয়ে রেখেছিলে। সেই সময় তুমি আমায় গল্পটা বলো। এই ঘটনাটা তোমার বাবা, কাজ থেকে ফিরে, রাতে খাবার টেবিলে বসে বলেছিলেন। তুমি বলছিলে, সেই ঘটনা তুমি জীবনেও ভুলতে পারবে না। লোকটি সিনেমার কাউন্টারে বসে তোমার বাবাকে এর কথা বলেছিল। ঘটনাটা শুনে আমি ঘুমিয়ে পড়ি। পরদিন সকালে আমি অফিসে যাই এবং পদত্যাগের নোটিশ দিই’।

আমি বললাম – ‘তোমার অফিস ছাড়ার কথা আমার মনে আছে, কিন্তু ঐ শব্দনিরোধকের গল্পটা মনে করতে পারছি না। সেটা কী ছিল বলোতো?’

‘দাঁড়াও, বলছি’। তুমি বললে। ‘আমার কপাল ভালো হলে গল্পটা শুনে তুমিও ঘুমিয়ে পড়বে, আর আমিও ঘুমোতে পারব’।

‘হয়ত। কিন্তু এখন তো গল্পটা না শোনা অবধি আমার কিছুতেই ঘুম আসবে না’। আমি বললাম।

আমরা দুজনেই আবার হেসে উঠলাম। আমার মন একই সঙ্গে আশা ও নিরাশায় পূর্ণ হয়ে উঠল।

তুমি বললে – ‘আর সকালে, যদি তুমি তখনও চিন্তিত থাকো, তাহলে সিনেমাহলে একবার ফোন করে জেনে নিও যে, কেউ ফেলে যাওয়া সোয়েটার আর ব্যাগের খোঁজ করেছিল কিনা। আর ওরা যদি বলে যে, জিনিসদুটো এখনও ওদের কাছেই রাখা আছে, তাহলে তখন তুমি ওদের সেই মহিলাটির কথা বলো’।

তারপর তুমি আমাকে নিচের গল্পটা শোনালে। তুমি ফোন রাখার পরে আমিও বিছানায় কম্বল মুড়ি দিলাম। নিজেকেই বললাম, যদি ঘুমোতে পারি, তাহলে সকালে উঠেই সিনেমাহলে ফোন করে খবর নেব। আর যদি এখনও ওরা ঠিকঠাক এক্সিট - যেটা সহজেই হাতল ঘুরিয়ে খোলা যায়, সেটা না বানিয়ে থাকে, তাহলে রিপোর্ট করার ভয় দেখাব।

****
একজন লোক সিনেমাহলে কাজ করত। সময়টা ১৯৬০ এর কাছাকাছি। সে সময় সিনেমাহলগুলোর আধুনিকীকরণের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছিল। যেমন, বড় পর্দা, শব্দনিরোধক দেওয়াল,কোয়াড্রোফোনিক সাউন্ড সিস্টেম – এককথায় একটি দুর্দান্ত হল যাকে বলে।

সিনেমাহলের মূল দেওয়ালের সমান্তরালভাবে একটা শব্দনিরোধক দেওয়াল গাঁথা হচ্ছিল। গল্পের লোকটি সেই কাজে সাহায্য করছিল। দেওয়ালটি ছিল প্লাস্টারবোর্ডের। যেহেতু সিনেমাহলটি যথেষ্টই বড়ো এবং ব্যালকনিযুক্ত, ফলে দেওয়ালখানা প্রায় সত্তর ফুট উঁচু। লোকটি তার মাথায় চড়ে ছাদের সঙ্গে দেওয়ালকে আটকানোর প্যানেল লাগাচ্ছিল।

ওপর থেকে ঝুঁকে কাজ করার সময়, প্লাস্টারবোর্ডের দেওয়ালটা কিছুটা হেলে যায়। টাল সামলাতে না পেরে, সে দুই দেওয়ালের মাঝে পড়ে যায়।

রক্ষা এই যে, দেওয়াল দুটির মধ্যে মাত্র এক মিটার ফাঁক। লোকটি পড়ছিল দেওয়ালদুটিতে ধাক্কা খেতে খেতে – ফলে তার ভরবেগ বা মোমেন্টাম – যাই বলো না কেন – বেশ কম হয়ে গিয়েছিল। তাই সে যখন নিচে পড়ল, তখন তার গায়ে ঘষটে ছড়ে যাওয়া ছাড়া কোনো আঘাত লাগেনি। পরে অবশ্য দেখা যায় তার কব্জি ভেঙে গিয়েছিল। তবে সেটা পড়ার জন্য না হয়ে, বেরোবার চেষ্টার সময়েও হয়ে থাকতে পারে। অন্তত লোকটির অভিমত সেরকমই ছিল। অলৌকিকভাবে প্রায় অক্ষত অবস্থায় দাঁড়িয়ে সে যখন গায়ের ধুলো ঝাড়ছিল, তখনই সে উপলব্ধি করতে পারল, সে দুই দেওয়ালের মধ্যে আটকা পড়েছে!

লোকটি সেই অন্ধকারে দুই দেওয়ালের মধ্যে পাউরুটির মাঝের পুরের মতো মিনিটখানেক দাঁড়িয়ে রইল। তারপর নতুন দেওয়ালের দিকে ফিরে প্রাণপণে লাথি ও ধাক্কা মারতে থাকল। দেওয়ালটার কিছুই হলো না। সে হার না মেনে, ক্রমাগত ঘুঁষি, লাথি মারতেই থাকল। অবশেষে সে, প্লাস্টারবোর্ডের গায়ে একটা গর্ত করে ফেলল। তারপর সেই ফাঁক আরেকটু বড় হলে কোনরকমে বাইরে আসতে পারল। তার যে এত শক্তি আছে, তা সে নিজেই জানত না। তার সহকর্মীরা, যারা এতক্ষণ আতঙ্কিত বিড়ালের মতো ছুটোছুটি করছিল, তারা সবাই হাততালি দিয়ে তাকে বাইরে আসার জন্য অভিনন্দন জানাল।

কিন্তু যে সংস্থাটি এই সিনেমাহলের নবীকরণের কাজ করছিল, তারা “সিনেমাহলের সম্পত্তি নষ্ট” এবং “সময়ের অপচয়” করার অভিযোগে লোকটিকে বরখাস্ত করে। অপেক্ষাকৃত সুস্থ হাতটি দিয়ে সে বরখাস্তের কাগজপত্র নিয়ে হল থেকে বেরিয়ে আসে। বিকেলে সে ডাক্তারের কাছে হাত দেখাতে যায়।

ছয় সপ্তাহ পরে সে আবার কর্মসংস্থান কেন্দ্রে গিয়ে জানতে চায় তার জন্য এই একই জাতীয় কী ধরণের কাজ খালি আছে।

***
মূলগল্প: NO EXIT by Ali Smith

লেখক পরিচিতি: দোলা সেন। জন্ম ১৯৬২-র ফেব্রুয়ারিতে। বিজ্ঞানের ছাত্রী। দীর্ঘ তিরিশ বছর যুক্ত ছিলেন শিক্ষকতার সঙ্গে। বই পড়তে, বেড়াতে আর পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাতে ভালোবাসেন। লেখার আকাশে তিনি মুক্তি খুঁজে পান। সোশ্যাল মাধ্যম ও বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় লেখালেখিতে তাঁর আনন্দিত অবসরযাপন। ভ্রমি বিস্ময়ে নামে দুটি খণ্ডে ভ্রমণকাহিনী,পঞ্চকন্যা ও একডজন মেহুলি লেখকের প্রকাশিত গ্রন্থ।








একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ