মারিয়া ভার্গাস ইয়োসা'র গল্প : দাদু


প্রতিবার একটা ছোট্ট শাখার খসখসানি হলে, বা একটা ব্যাঙ ডাকতে থাকলে, অথবা ঝোপের গহীনে থাকা রান্নাঘরের কাচগুলো কেঁপে উঠলে, বৃদ্ধ চট্ করে তাঁর উঁচু চ্যাপটা পাথরের মত আসন থেকে সরে যেতেন, আর পাতার ফাঁক থেকে কৌতূহলে নজর রাখতেন। কিন্তু ছেলেটাকে এখনও দেখা যাচ্ছে না। বদলে খাবার ঘরের জানলাগুলো যেগুলো মাচা হবার জন্য খোলা, সেগুলোর ফাঁক দিয়ে কিছুক্ষণ আগে থেকে জ্বলতে থাকা আলোগুলোকে দেখছিলেন। আর তাদের আবছায়ারা পর্দার সঙ্গে সঙ্গে একপাশ থেকে অন্য পাশে ভেসে বেড়াচ্ছিল ধীরে ধীরে । অল্পবয়স থেকেই চোখে কম দেখতেন। তাই ওদের এতক্ষণে রাতের খাবার সারা হয়েছে কি না অথবা ঐ সব অস্থির ছায়ারা উঁচু গাছগুলো থেকে আসছে কি না সেই উদ্যোগ বৃথাই ছিল।

তিনি বসবার আসনে ফিরে অপেক্ষা করতে লাগলেন। গতরাতে বৃষ্টি হয়েছিল, মাটি আর ফুলেরা মিষ্টি গন্ধ ছড়াচ্ছিল। কিন্তু পোকারা ভনভন করেই যাচ্ছিল। এবঙ এউলোখিও বাবু তাঁর মুখের চারপাশে মরীয়া হাতদুটো নাড়িয়েই যাচ্ছিলেন। পোকাগুলো তাড়াতে পারলেন না; তাঁর কাঁপা চিবুক, কপাল এমনকি চোখের পাতায় গর্তগুলোতেও তাদের অদৃশ্য উঁচু অস্ত্র দিয়ে মাঙস কামড়াতে তারা পৌঁছেই যাচ্ছিল। সারাদিন ধরে জ্বর ছিল। তাঁর নড়বড়ে শরীরটা উত্তেজনা আর আগ্রহে ভরপুর ছিল বলে এখন তাঁর দুর্বল ও ক্লান্ত লাগছিল। এমনকি সামান্য দুঃখীও। বিশাল বাগানের অন্ধকার ভাব তাঁকে বিরক্ত করে তুলছিল। কেউ যেন, হয়ত রাঁধুনি অথবা বাটলার তার নাছোড়, বিনয়ী, প্রতিচ্ছবিকে গুঁড়িয়ে দিচ্ছিল; তাঁর লুকিয়ে থাকার জায়গায় হঠাৎ উদয় হল। তাঁকে দেখে আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করল : “ ঝোপের মধ্যে আপনি কি করছেন এউলোখিও বাবু?” তাতে তাঁর রাজনীতিবিদ ছেলে বা মেয়ে আসতে পারত যারা ওনার সম্পর্কে নিশ্চিত করে ভাবে যে উনি এক সম্পূর্ণ পাগল ব্যক্তি। ভয়ের এক কাঁপুনিতে কেঁপে উঠলেন তিনি। মাথা ঘুরিয়ে পায়রা-ঘর এড়িয়ে নকল দরজা পর্যন্ত যে ছোট্ট পায়ে হাঁটা পথ ক্রিসেনথিমাম আর গোলাপের বেডের মধ্যে দিয়ে গেছে, সেখানেও খুঁজলেন। তিনি অশান্ত ছিলেন। তিনবার পরীক্ষা করে দেখেছিলেন কড়া লাগানো দরজাটা লাগোয়াই ছিল। আর কমুহূর্তের মধ্যে কেউ দেখার আগেই তিনি রাস্তা অবধি পালিয়ে যেতে পারতেন।

“আমি কি এসেই পড়েছি' ?- অস্থির হয়ে ভাবলেন তিনি। কেননা এক মুহূর্তে, চুপিসাড়ে নিজের বাড়িতে ঢোকার ক মিনিটের মধ্যেই তিনি ঝোপের কথাটা ভুলে গিয়েছিলেন। সেখানে সময়ের হিসাব হারিয়ে ফেলেছিলেন। ঘুমিয়ে পড়ার জন্য পাকাপাকি ভাবে গেঁড়ে বসেছিলেন তিনি। শুধুমাত্র যখন জিনিসটা ওনার কাছে আসছিল সেটা কি না জেনেই তিনি হাতদুটো মেলে ধরলেন আর ওনার মাঙসপেশীতে ঘুষি মারল কেউ, তখনই তিনি প্রতিক্রিয়া জানালেন। কিন্তু সেটা অসম্ভব ছিল। ছেলেটা তখনো ঝোপটা পার হতে পারে নি। কারণ তার ভীতু পায়ের আওয়াজ তাদের জাগিয়ে দিয়েছিল। অথবা ছোট্টটা রান্নাঘরের দিকে যাবার রাস্তার ঠিক ধারে তার লাজুক, ঘুমন্ত দাদুকে দেখে আলাদা করে চিনতে পারলে চেঁচিয়ে উঠত।

এই প্রতিক্রিয়াটাই ওনাকে খুশি করল। বাতাসের ঝাপটায় অত জোর ছিল না। তাঁর শরীর আবহাওয়ার সঙ্গে মানিয়ে নিচ্ছিল। কাঁপুনি ছেড়ে দিয়েছিল। জ্যাকেটের পকেট হাতড়াতে হাতড়াতে বিকেলে কোণের দোকান থেকে কেনা মোমবাতিটার শক্ত শঙ্কু আকৃতির শরীরটা খুঁজে পেলেন। বিকেলের মরা আলোয় বৃদ্ধ হেসে উঠলেন আনন্দে: দোকানদারনীর আশ্চর্য হওয়ার ভঙ্গীটা মনে পড়ল তাঁর। তিনি খুব গম্ভীর হয়ে গেলেন। আভিজাত্যের সঙ্গে গোড়ালিতে ভর দিয়ে যেতে যেতে বৃত্তাকারে তাঁর ধাতুবাঁধানো লাঠিটা ঘোরাতে ঘোরাতে হাঁটছিলেন। সেইফাঁকে দোকানদারনী নিচে রাখা বিভিন্ন আকারের মোমবাতি, লম্বা- বেঁটে ইত্যাদির ওপর চোখ বুলাচ্ছিল। “এইটা”, খুব তাড়াহুড়ো করে তিনি বললেন। এত তাড়া যে সেটা হয়ত কাজটা মিটিয়ে ফেলার পক্ষেও

বিরক্তিকর দ্রুত ছিল। একটা সে মুড়ে দিতে চাইছিল, কিন্তু এউলোখিও বাবু সেটা চান নি। এবঙ তাড়াহুড়ো করে দোকান ছেড়ে বেরিয়ে এসেছিলেন। বাকি বিকেলটা জাতীয় ক্লাব 'কুব নাসিওনাল'-এর একটা ছোট্ট ঘরে, যেটা সাধারণত বন্ধ থাকে সেখানে ছিলেন। যাই হোক, বেয়ারারা এসে যাতে তাঁর একাকীত্ব ভঙ্গ করে বিরক্ত না করে তাই তিনি দরজাটাও চাবি এঁটে বন্ধ করে দিলেন। তারপর আরাম করে বসে সঙ্গে আনা ভীষণ অন্যরকম একটা রঙ, স্কারলেট রঙের স্যুটকেসটা খুলে তার ভেতরে ডুবে গেলেন। ভেতর থেকে বের করে আনলেন একটা দামী মোড়ক। সুন্দর সাদা রেশমের ফিতে দিয়ে সেটা বাঁধা ছিল। তিনি সেই আবিষ্কারের বিকেলে সন্তর্পণে যেটা বয়ে এনেছিলেন।

বিকেলটা যখন ধোঁয়াটে ধূসর লালের মত রঙের হল তিনি ট্যাক্সি ধরে শোফারকে নির্দেশ দিলেন যেন শহরের বাইরে তাঁকে চক্কর দিয়ে আনে; হালকা মিষ্টি ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছিল। আর আকাশের লালচে- ধুসর ছবিটা বিশাল মাঠের পারে অসম্ভব ধাঁধাঁর মত দেখাচ্ছিল। যতক্ষণ পিচের ওপর দিয়ে চারচাকাটা মসৃণ ভাবে এগোচ্ছিল, বৃদ্ধের চকচকে চোখদুটো, তাঁর বিবর্ণ মুখে একমাত্র জীবনের স্পন্দন, সেটা তাঁর ব্যাগের দিকে নিবদ্ধ ছিল। অন্যমনস্ক হয়ে রাস্তার পাশের খালের ধারে তাকাতে তাকাতে হঠাৎ তিনি দেখতে পেয়ে চেঁচিয়ে বললেন: - “রোকে”! ! - বললেন তিনি, যদিও শোফার তা শুনতে পায় নি।- রোকুকে! থামান আপনি!

গাড়িটা যখন থামল, পিছিয়ে এসে নুড়ি-পাথরের স্তূপের ওপর দাঁড়াল। ঐউলোখিওবাবু একটা খুলি নিয়ে হাতেকলমে পরীক্ষা করে দেখছিলেন । বাইরের প্রকৃতি আর বৃষ্টি ভুলে গিয়ে ওটাকে হাতে নিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিলেন সেটা। দুশ্চিন্তা বাড়ছিল তাঁর। ঐ শক্ত, তেরাবেঁকা বিচ্ছিরি জিনিসটা, যেটার মাঙস, চামড়া, নাক, চোখ, মুখ- কিচ্ছু নেই, সেটা নিয়ে। ওটা ছোট আকারের ছিল। ধারণাটা ক্রমেই বাড়ছিল যে ওটা কোন এক বাচ্চার। ধুলোমাখা, নোঙরা ছিল সেটা। একটা আধুলির মত আকারের গর্ত ছিল সেখানে। ধারগুলো খোঁচা খোঁচা। নাকের ফুটো দুটোর জায়গায় নিখুঁত তেকোণা, মুখ থেকে একটা পাতলা হাড় দিয়ে আলাদা করা। সেটা চিবুকটার চেয়ে কম হলুদ ছিল। শূন্য গহ্বরে তিনি হাতের আঙুল ঢোকালেন। টুপির মত খুলির মাথাটা ঢেকে বা নিচের গর্তটা দিয়ে হাতের মুঠো ঢুকিয়ে ভেতরের শেষ সীমা পর্যন্ত জায়গাটা অনুভব করতে চেষ্টা করলেন। ভেতর দিয়ে হাত ঢুকিয়ে নাকের গর্তটা দিয়ে একটা গিঁটের প্রাপ্ত বের করে আনতে আনতে আর অন্য প্রান্ত মুখের ভেতর জিভের জায়গাটা দিয়ে বের করে আনতে আনতে অসীম আনন্দ পাচ্ছিলেন এই ভেবে যেন ওটা জীবন্ত।

দুইদিন সেটা তাঁর চামড়ার স্যুটকেসের ভেতর বড় একটা বাক্সের মধ্যে মুড়ে, কাউকে জানতে না দিয়ে তিনি সেটা লুকিয়ে রেখেছিলেন। পরদিন বিকেলটাও তিনি তাঁর সেই ঘরে পূর্বপুরুষদের পুরোনো আসবাবপত্রের মধ্যে উত্তেজিত ভাবে রয়ে গেলেন। মাথাটা প্রায় তুললেনই না। তিনি হয়ত বলতেন যে তিনি কিছুটা ভয় আর গভীর মনোযোগের সঙ্গে কি পরীক্ষা করে দেখছিলেন? কারন কার্পেটের মাঝখানে রক্তাক্ত আর ঐন্দ্রজালিক ছবি ছিল, কিন্তু তিনি তা ফিরেও দেখেন নি। প্রথমে তিনি সিন্ধান্ত নিতে পারছিলেন না, একটু চিন্তিত ছিলেন। হয়ত তিনি তাঁর পরিবারের জটিলতা সম্পর্কে সচেতন হতেন। হয়ত তারা তাঁর সম্পর্কে হাসাহাসি করছিল। এই ভাবনাটাই তাকে ক্ষুব্ধ করে তুলেছিল। তিনি তিক্ত বিরক্ত হয়ে পড়েছিলেন। তাঁর কান্না পাচ্ছিল। তার পর থেকে এই বিষয়টা তাঁর মন থেকে শুধু একবার সরে গিয়েছিল: যখন তিনি জানলার কাছে গিয়েছিলেন, অসংখ্য ছিদ্রে ভরা ঘোলাটে পায়রার খোপ দেখতে পেলেন। মনে পড়ল সেই কাঠি দিয়ে গড়া অগুণতি দরজায় ভরা বাসাটা খালি, জীবন শূন্য ছিল না। বরঙ সেখানে সাদা ধূসর কতগুলি প্রাণী থাকত যারা তাদের ঠোঁট দিয়ে বাসার গায়ে ঠুকরাত সারাদিন, আর কখনও গাছের মাথায় আবার কখনো বা রান্না বাগানের সবজির ফুলের ওপর ডিগবাজি খেত। মনে পড়ল তারা কত অসহায়, কত প্রিয়: নির্ভয়ে তারা তাঁর হাতের ওপর এসে বসত। তিনি সবসময়ই হাতে কিছু না কিছু শস্যদানা নিয়ে বসতেন। যখনই তিনি তাদের সরাতে চাইতেন তখন চোখদুটো আধখোলা করে থাকতেন বা হাতটা

সামান্য নাড়তেন। পরে তিনি আর তত ভাবছিলেন না তাদের কথা। বাটলার যখন জানাতে এল রাতের খাবার দেওয়া হয়েছে ততক্ষণে তিনি সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছেন। সে রাতে ভাল ঘুম হল তাঁর। পরদিন সকালে তিনি ভুলে গিয়েছিলেন যে শুনেছিলেন একটা লম্বা লাল পিঁপড়ের সারি সে বাসাটাকে ছেঁকে ধরেছিল, আর পাখিগুলোর মধ্যে চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়েছিল। সেই ফাঁকে তিনি তাঁর জানলা থেকে একটা টেলিস্কোপ দিয়ে দৃশ্যটা দেখেছিলেন।

ভেবেছিলেন খুলি ধোওয়ার কাজটা বেশ তাড়াতাড়ি হবে। কিন্তু তিনি পারলেন না। ধুলো। যে ধুলোটা ছিল, তিনি বিশ্বাস করতেন যে সেটা কোন ঝাঁঝাঁলো গন্ধওয়ালা পায়খানারই হবে, সেটা খুলিটার ভেতরকার দেওয়ালে মাখা ছিল কিন্তু বাইরের দিকটা খনিজ ধাতুর মত চকচক করত। সাদা রেশমের মাফলারটা ঢেকে দিয়েছিল। ধুসর দাগকে।সেটা নোঙরা ঢাকার বদলে এউলোখিওবাবুর উত্তেজনা বাড়িয়ে দিল। একসময় রেগে গিয়ে খুলিটাকে ছুঁড়ে ফেলে দিলেন। কিন্তু সেটাকে পড়ে যেতে দেবার আগেই তাঁর অনুতাপ হল। তিনি আসন ছেড়ে উঠে ওটার কাছে পৌঁছনোর জন্য হামাগুড়ি দিতে লাগলেন। সাবধানে সেটা উঠিয়ে নিলেন। তখন মনে হল কোন তেলটেল জাতীয় জিনিস দিয়ে ওটাকে পরিস্কার করা যেতে পারে। ফোনে রান্নাঘর থেকে একটা তেলের টিন আনতে নির্দেশ দিলেন। বেয়ারার জন্য দরজার কাছে অপেক্ষা করতে শুরু করলেন। সে এলে তার হাত থেকে টিনটা প্রায় ছোঁ মেরে নিয়ে নিলেন । বেয়ারার কৌতূহলী দৃষ্টিটা লক্ষ্যও করলেন না। সে সেটিকে দিয়ে চেষ্টা করছিল দৌড়ে এসে তাঁর কাঁধের ওপর দিয়ে ভেতরের ছবিটা দেখতে। উদ্বিগ্নভাবে তিনি তেলের মধ্যে মাফলারটা ভেজানো হলে, প্রথমে নরম করে শুরু করে পরে গতি বাড়িয়ে হাঁফাতে হাঁফাতে দাগ তুলে ফেলে দিয়েছিলেন । আগ্রহ করে শিগগিরি দেখলেন যে এর প্রতিষেধকটা কার্যকরী ছিল; ধুলোর একটা ছোট ফোঁটা বৃষ্টির ফোঁটার মত ওনার পায়ের ওপর পড়ল। যাইহোক তিনি লক্ষ্য করলেন যে তেলটা ওনার ব্যাগের হাতলটা আর জামার হাতার কাফটা ভিজিয়ে দিচ্ছিল। হঠাৎ লাফ দেবার আগে সেই জায়গায় পায়ের ছাপ দেখলেন। আশ্চর্য হলেন যে পরিষ্কার, চকচকে জড় খুলিটা যেটা ওনার মাথার ওপরে শক্ত করে ধরা ছিল । আর বিন্দু বিন্দু ঘামের ফোঁটা তাঁর চিবুক দিয়ে গড়িয়ে যাচ্ছে। নতুনভাবে ওটাকে ভালবেসে মুড়লেন। স্যুটকেস বন্ধ করে বেরিয়ে পড়লেন 'কুব নাসিওনাল' থেকে। প্লাসা-র চৌমাথায় যে গাড়িগুলো থাকে, তারই একটা তাঁকে ওরানতিয়া-তে, তাঁর বাড়ির পিছন দিকে ছেড়ে গেল। সন্ধ্যে হয়ে গিয়েছিল। দরজাটা বন্ধ হয়ে যেতে পারে সেই ভয়ে শীতল আধো অন্ধকারে রাস্তায় এক মুহূর্ত তিনি থমকে দাঁড়ালেন। স্নায়ু টানটান। হাত বাড়িয়ে দিলেন। আর দরজার হাতলটা ঘুরতে দেখে খুশি হয়ে এক লাফ দিলেন। ছোট্ট একটা ক্যাঁচ ক্যাঁচ করে শব্দ করে দরজাটা বন্ধ হয়ে গেল।

ঠিক সেই মুহূর্তে মাচা থেকে গলার আওয়াজ শুনতে পেলেন। এমন মগ্ন হয়েছিলেন যে এমনকি ভুলেই গিয়েছিলেন ঐরকম হৈ চৈ করে যাওয়া আসা র উদ্দেশ্য। আওয়াজগুলো, যাতায়াত এতই অপ্রত্যাশিত ছিল যে মনে হচ্ছিল বুকের অক্সিজেন বেলুনটা আটকানো আছে মৃত্যুর মুহূর্তের সঙ্গে। তাঁর প্রথম প্রতিক্রিয়া ছিল গুটিয়ে যাওয়া। কিন্তু এটা তিনি এলোমেলো ভাবে করলেন। পাথর হড়কে মুখ থুবড়ে পড়ে গেলেন। একটা তীক্ষ্ণ ব্যথা। কপালে আর মুখে ভেজা মাটির বিচ্ছিরি একটা স্বাদ অনুভব করলেন। কিন্তু ওঠে বসার জন্য কোন জোর করলেন না। ওই ভাবেই ঘাসের ভেতর আধা কবরস্থ হয়ে, ক্লান্তির শ্বাস ফেলতে ফেলতে পড়ে রইলেন। পড়ার সময় হাত তোলার সময় ছিল। যে হাত দিয়ে খুলিটা সামলে রাখছিলেন সেটাকে এমন ভাবে আকাশের দিকে তুলে রাখলেন, যে মাটি থেকে কয়েক সেন্টিমিটার উঁচুতে এখনও পরিচ্ছন্ন ছিল।

ওনার লুকিয়ে থাকার জায়গা থেকে এই মিটার কুড়ি দূরত্বে মাচাটা ছিল। এউলোখিও বাবু সুক্ষ্ম ফিসফিসানি গুলো শুনছিলেন, যদিও সেগুলি কি বলছে তা বুঝছিলেন না। অনেক পরিশ্রম করে তিনি উঠে বসলেন। লুকিয়ে লুকিয়ে দেখছিলেন সব। তারপর দেখলেন একটা আর্চ। বিশাল আপেল গাছগুলোর শিকড়গুলো খাবার ঘরের পিলার ছুই ছুই করছিল যেখানে, সেখানেই আর্চটা তৈরী করেছে। তারই মাঝখানে এক অভিজাত ছায়ামূর্তি।

বুঝলেন এটি তাঁরই ছেলে। তার ঠিক পাশেই ছিল আরেকজন। বেশি টিপটপ আর ছোট। একটা বিশেষ বেপরোয়া ভাব নিয়ে ঝুঁকে ছিল। সেটি একজন মেয়ে। ছেলেটিকে আলাদা করে চিহ্নিত করার জন্য চোখ পিটপিট করছে, ডলছে, যন্ত্রণায়। চেষ্টা করেছিল, কিন্তু বিফলে। তখন হাসির শব্দ শুনলেন; ছোট ছেলের স্ফটিকের মত হাসি। একটা পশুর মত অনায়াস ও ভরপুর ছন্দে বাগানটা পেরিয়ে যাচ্ছিল। আর অপেক্ষা করেন নি। জ্যাকেট থেকে তিনি মোমটা বের করলেন। নিশ্চিত হবার জন্য গাছের শাখা, পাথরকুচি, ঢিবি ইতাদি ছুঁয়ে তাড়াতাড়ি কাজ করছিলেন। মোমটাকে পাথরের ওপরে রাখলেন। পরে আস্তে করে উপড়ে ফেলার জন্য হাঁটা পথের মাঝখানে একটা বাধা হিসাবে রাখলেন। কেননা মোমটা তার ভারসাম্য হারিয়ে ফেলতে পারত। তাই ওটাকে খুলির ওপরে দাঁড় করিয়ে রাখলেন। অতি উৎসাহে সুন্দর তেলমাখা দেহটাতে দৃষ্টি আটকে রেখে আনন্দ করলেন: উপায়টা সঠিক ছিল। খুলির গর্তটা দিয়ে মোমের সাদা বিন্দুটা দেখা যাচ্ছিল। ঠিক যেন বুলবুশ গাছ। পর্যবেক্ষণ আর তিনি চালিয়ে যেতে পারলেন না। বাবাটি গলা চড়িয়ে ছিল। তবুও শব্দগুলো বোঝা যাচ্ছিল না। মনে হয় সেগুলো কোন ছোট ছেলেকে উদ্দেশ্য করে বলা। ওটা ছিল তিনজন লোকের মধ্যে শব্দের চালাচালি; ভারি গলাটা বাবার। সবসময় বেশি জোরালো। সুরেলা গুঞ্জন টা ছিল মহিলার। আর টুকরো টুকরো বাধা দেওয়া বায়নাগুলি নাতির। হঠাৎ কোলাহল থেমে গেল। সামান্য নীরবতা; সেটাকে ফুঁড়ে নাতি চেঁচিয়ে উঠল: “ কিন্তু আমি পরিষ্কার করে জানাতে চাই যে আজ শাস্তি শেষ হল। বলেছিলে সাত দিন। আর আজ শেষ হল। কাল আমি যাচ্ছি না। ” শেষের শব্দগুলোর সঙ্গে সঙ্গে শুনতে পেলেন দুপ দাপ পায়ের আওয়াজ ।

সে কি দৌড়ে আসছিল? সেই মুহূর্তটা সিদ্ধান্ত নেওয়ার ছিল। এউলোখিও বাবু শ্বাসকষ্টটাকে হারিয়ে দিয়ে তাকে ফাঁস দিয়ে দিলেন। এবঙ তাঁর পরিকল্পনা শেষ করলেন। প্রথম আগুনের শিখাটা নীল রঙের ফসফরাস ছিল। দ্বিতীয়টা দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল। নখগুলো পুড়ছিল। কিন্তু কোন ব্যথাবোধ ছিল না। খুলিটার পাশে হাতটা রেখেই দিয়েছিলেন। যদিও কয়েক সেকেন্ড পরেও মোমটা জ্বলেই যাচ্ছিল। তিনি দ্বিধায় পড়ে গেলেন। কারণ যা তিনি দেখছিলেন তা ঠিক যা তিনি ভেবেছিলেন সেই অনুযায়ী হচ্ছিল না। আগুন ক্রমশ বাড়ছিল। যখন আগুনের হলকার একটা খসখসে আওয়াজ তাঁর হাতের মধ্যে বেড়ে উঠছিল, সেটা যেন ঝরাপাতার মধ্যে ধপ্ করে আছড়ে পড়ার আওয়াজ। আর তারপর খুলিটা সব থেকে বেশি চকচক করছিল। আগুন চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ছিল । খুলিটার তালুতে, নাকে, মুখে সর্বত্র। অবাক হয়ে বললেন:“ পুরোটায় আগুন ধরে গেল”। থম ধরে বসে ছিলেন। আর রেকর্ডের মত বারবার বলেই চলেছিলেন- “ওটা তেল ছিল”। “ ওটা তেল ছিল”। যেন শিখায় মোড়া আকর্ষণীয় খুলিটার সামনে মন্ত্রমুগ্ধ ।

ঠিক সেই সময় চিৎকারটা শুনলেন। একটা বন্য চিৎকার। যেন বহু তীর বেঁধা কোন এক জন্তুর ডাক। ওনার সামনে ছেলেটা। হাতদুটো ছড়ানো, আঙুলগুলো গোটানো। থরথর করে কাঁপছে। নীল হয়ে গেছে। চোখমুখ খোলা। যেন কোন এক অদ্ভুত আওয়াজে স্বতঃস্ফুর্তভাবেই বাক্যহারা। ভয়ার্ত গলায় এউলোখিও বাবু বললেন “ আমি দেখতে পেয়েছি”। “আমি দেখতে পেয়েছি”। কিন্তু পরমুহূর্তেই দেখতে পেয়ে বুঝলেন যে তিনি আগে দেখেন নি। কিন্তু তাঁর নাতি আরেকটা জিনিস- ওই জ্বলন্ত খুলিটা দেখতে পায় নি। সেই দৃশ্যটা আর সাঙ্ঘাতিক ভয় তাদের মনে চিরকালের মত আঁকা হয়ে গেল। সবকিছু পরপর ঘটে গেল: হঠাৎ ঝলসানো আগুন, জন্তুর চিৎকার, হঠাৎ পাওয়া ভয়ে ঐ ছোট্ট প্যান্ট পরা শরীরটার ভয়ে আকুল হবার দৃশ্য। যখন তিনি সেই দিকে আসা গলার স্বর আর পায়ের আওয়াজ পেলেন, তিনি আগ্রহের চোটে ভাবছিলেন যে সবকিছু ওনার পরিকল্পনা অনুযায়ী ঘটেছে। গন্ডগোলের জন্য সাবধান না হয়ে আধ- ডিগবাজি খেয়ে লাফ দিলেন । রাস্তার থেকে দুরে সরে যেতে যেতে আর পা দিয়ে ক্রিসেনথিমাম ও গোলাপের বেডগুলো মাড়িয়ে দূর থেকে এক ঝলক দেখলেন যে দরজা থেকে যতটা দুরত্বে এটা আলাদা করা ছিল, সেটাকে ডিঙিয়ে আগুনের শিখাগুলো তাকে ছুঁয়ে ফেলেছে। মহিলার চিৎকারের সঙ্গে সঙ্গেই আগুন ভেদ করে গিয়েছিল। কান ফাটা আওয়াজ। তবে তাঁর নাতির গলার আওয়াজের চেয়ে কম একনিষ্ঠ। ধরা পড়েন নি। মাথাটাও ঘোরান নি। পথের ঠান্ডা বাতাস তাঁর মুখে আর মাথার অল্প ক'গাছা চুলে কেটে বসছিল । কিন্তু সেটা খেয়াল করলেন না। ধীরে ধীরে ঝোপের দেওয়ালে পিঠ ঘষরাতে ঘষরাতে মৃদু হাসি হাসতে হাসতে হেঁটেই চলেছিলেন। ভাল করে শ্বাস নিচ্ছিলেন। অনেক শান্তভাবে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

1 মন্তব্যসমূহ