এলি ফানারো'র গল্প : কুকুড়ের ভাগাড়


অনুবাদ : রুখসানা কাজল

সেই কুকুরটা যেদিন মারা গেছিল সেদিনটা ছিল রোদ ঝলমলে এক শনিবার। বাবা আমাকে ঘুম থেকে টেনে তুলে মনে করিয়ে দিয়েছিল, ‘আজ কিন্তু ময়লা ফেলার দিন।’ 
তিনি বলছিলেন, 'এই ছেলে তাড়াতাড়ি ওঠো, ওঠে পড়ো, আমি দুপুরের আগে ময়লা ফেলতে যেতে চাইছি।’

'উম্ম বাবা' আমি চোখ মুছতে মুছতে ঘুম জড়ানো কন্ঠে বিড়বিড় করে বলি, 'এত তাড়াতাড়ি কেন যেতে হবে বাবা।'
‘কারণ তিনটার সময় আমাকে কাজে যেতে হবে।’ তিনি আরও বললেন, ‘তাছাড়া আমি একবার বনি মার্টেও যেতে চাইছিলাম।’

আমি তড়াক করে উঠে পড়লাম। ‘ফ্রুট লুপ্স’ ব্র্যান্ডের রঙিন ফলের টুকরো আর দুধ দিয়ে নাস্তা সেরে ফেললাম। আসলে বনি মার্টে যাওয়ার কথা শুনে আমার মনে একটি নতুন খেলনা পাওয়ার আশা জেগে উঠেছে। মনের মধ্যে কেবলই ‘জারটান’ নামের একটি খেলনার কথা ঘুরপাক খাচ্ছে। আনন্দ উত্তেজনায় তাড়াতাড়ি পোশাক পরে রবারমেইড কোম্পানীর প্ল্যাস্টিকের ময়লা ফেলার ড্রামগুলো টেনে নিয়ে এসেছিলাম।

আমরা, নেটিভ আমেরিকনরা যে সংরক্ষিত এলাকায় থাকতাম, সেখানে ময়লা-আবর্জনা নেওয়ার জন্য কোনো ময়লার গাড়ি আসত না। ফলে আমাদের ময়লা আমাদেরকেই আঁস্তাকুড়ে ফেলে আসতে হত। আমি তাই আগের শনিবারগুলোর মতোই আমাদের ময়লাআবর্জনার বড় বড় ড্রামগুলো এনে ভ্যানগাড়িতে তুলে রাখলাম। আমার আট বছরের শরীর যথেষ্ট শক্তিশালী ছিল বলে ড্রামগুলো আমার সমান সাইজের হলেও সেগুলো আমি টেনে ভ্যানগাড়িতে তুলতে পেরেছিলাম।

যাওয়ার আগে আমার পোষা কুকুরের জন্য বাটিভর্তি পানি আর ‘কিবলস এন বিট’ নামের খাবার ঢেলে দিলাম। ‘কর্কি ডার্লিং এই নে’ আমার কালো ল্যাব্রাডার তার খাবার ভর্তি পাত্রের দিকে ছুটে এলো। আমি ওর ঘাড়ে আদর করে বললাম, ‘খেয়ে নাও বন্ধু।’

বাবা ভ্যানগাড়ি থেকে ডাকতে শুরু করেছিল, ‘তাড়াতাড়ি করতে পারছিস না ? আরে, অই খাদক কুকুরটাকে ত গেলো কালকেই একগাদা খাইয়েছিস, আবার—’
আমি বললাম, ‘ওর খিদে লেগেছে বাবা।’
‘ওর ত সারাক্ষণই খিদে লাগে।’ বাবা উত্তরে বলেছিল, ‘এবার তাহলে তাড়াতাড়ি চলে আয় কেমন?’
আমি গাড়িতে উঠে পড়লে বাবা ইঞ্জিন চালু করে আস্তাকুঁড়ের দিকে চালাতে শুরু করলেন।

আমরা যাচ্ছিলাম নামকরণ হয়নি এমন একটি কাঁচা রাস্তা দিয়ে। গাড়ির সামনের যাত্রী সিটে বসে আমি গ্লোভ কপার্টমেন্টের ভেতরে হাতড়াচ্ছিলাম। সেখানে স্পঞ্জের একটি গোলাপী রঙ বল দেখতে পেলাম। বলটি তুলে হাতের মধ্যে ঘুরাতে শুরু করলে বাবা বললেন, ‘তুই এটা নিতে পারিস।’
আমি জানতে চাইলাম, ‘এটা তুমি কোথায় পেয়েছ বাবা ?’
‘আমার অফিসে’ বাবার উত্তর শুনে অবাক হয়ে গেলাম। আমার বাবা একটি হাসপাতালে পরিচারকের কাজ করেন।
‘অফিস থেকে ? সেখানে বলগুলো দিয়ে কি কাজ হয়?’
‘ওহো’ বাবা ব্যাখ্যা করে বললেন, ‘আমি একটি রুম পরিষ্কার করছিলাম। সেই রুমে একজন বুড়োমানুষ খাটে শুয়েছিলেন—স্রেফ শুয়েছিলেন। তার হাতের মুঠোয় বলটি ধরা ছিল।’
আমি তখন বললাম, ‘ও আচ্ছা, তিনি তোমাকে বলটি দিয়েছেন তাই ত ?’

‘অনেকটা সে রকম’ বাবা জানালেন, ‘ডাক্তাররা মাঝে মাঝে অসুস্থ রুগিদের এসব বল চেপে ধরতে বলেন--- তাদের শরীরে কতখানি শক্তি আছে অথবা, আদৌ তারা বেঁচে আছে কিনা সেটা দেখার জন্য।’ বাবা একটু হেসে বললেন, ‘অই বুড়ো মানুষটি কিছুই চেপে ধরতে পারছিলেন না।’
‘তার মানে তিনি মরে গেছিলেন ?’ আমি নাক কুঁচকে দ্রুত জিগ্যেস করি।
তিনি দুষ্টুমির হাসি হেসে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘হুম’

‘কিইই!’ আমি চেঁচিয়ে উঠে বলটা ফেলে দিলাম। আমাকে মরে যাওয়া লোকটির বল উপহার দিতে চাইছে ! আমি চাইনা এই বলের অছিলায় মৃত লোকটার ভুত আমার পেছনে পেছনে তাড়া করুক। সেই ভয়ে তখুনি বলটা ফেলে দিয়েছিলাম।
‘আমি তাই তুলে নিয়েছিলাম’ বাবা বললেন, ‘তাছাড়া একজন মরা মানুষের বল নিয়ে আর কি কাজ থাকতে পারে ?’

আমি চুপ করে বলের দিকে তাকিয়ে থাকলাম। আর মনে মনে ভাবলাম,এটা ধরে মরে যেতে কেমন লাগে ! অবাক হয়ে ভাবছিলাম, মৃত মানুষদের হাতে ডাক্তাররা কতগুলো বল তুলে দেয় ! আর সেগুলো কি তারা মৃত মানুষদের সাথে কবরেও দিয়ে দেয় ? আমি এটাও ভাবছিলাম, অই বুড়ো মানুষটি কি তার বল নিয়ে নেওয়ার জন্য আমাদের উপর রাগ করবে ! কিন্তু বাবা হাসিমুখে ভ্যান চালিয়ে যেতে থাকলেন।

আস্তাকুঁড় দেখা যাচ্ছিল। যত কাছে যাচ্ছিলাম, ময়লাআবর্জনা পোড়ানোর এক অদ্ভুত কটু গন্ধ আমাদের নাকের ভেতর ঢুকে আসছিল। ঘন কালো আঠালো ধোঁয়া কয়লারং মাজনের মতো গুড়গুড়িয়ে আকাশের দিকে ভেসে যাচ্ছিল। গাঙচিলরা কর্কশ চীৎকার তুলে মাথার উপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছিল। ফেলে দেওয়া নানা রকমের পচা ময়লাআবর্জনার টুকরো উড়িয়ে একটি ভারী বাতাস বয়ে গেল।

জায়গাটি ভর্তি ছিল বড় বড় পাহাড়ের মতো ময়লাআবর্জনার স্তুপে। এর মধ্য দিয়ে একটি মাটির রাস্তা চলে গেছে। চারদিকে আবর্জনা পোড়ানোর অগ্নিশিখাগুলো নাচছিল। নিজেদের ময়লা ফেলছিল এমন গাড়িগুলো থেকে কিছুটা দূরে আমাদের ভ্যান রাখার জন্য ফাঁকা জায়গা পেলাম। সমস্ত জায়গা জুড়ে বিষম পচা দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছিল।

আমি বেরিয়ে ভ্যানের পেছনের দরোজা খুলে দিলাম। ধনুকের মতো বেঁকে ভ্যানের ভেতর থেকে বড় প্ল্যাস্টিকের ড্রাম বের করে ময়লার টিবির কিনারায় টেনে আনলাম। বাবা শেষ দুটি ময়লার ড্রাম বের করে আনলেন।

ড্রামগুলো খালি হয়ে গেলে আমরা নিচের অংশটায় ব্লিচ পাউডার ভরে দিলাম। এর ফলে, গোটা সপ্তাহে জমে থাকা আবর্জনা পচা দুর্গন্ধ দূর হয়ে যায় সেই সাথে ড্রামের ভেতর বাসা করে থাকা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কীটগুলোও মরে যায়। উপরে তখনও গাঙচিলরা উড়ে বেড়াচ্ছিল আর আগের মতোই কর্কশ উঁচু স্বরে চীৎকার করে যাচ্ছিল। ক্লোরেএক্সের কাজ শুরু করার জন্য কয়েক মিনিট অপেক্ষা করছিলাম।

আমি পাহাড়ের মতো জমে থাকা ময়লাআবর্জনার ঢিবির চারপাশে ভালো করে তাকিয়ে দেখলাম। খেয়াল করলাম, অন্যরাও তাদের আবর্জনা ফেলে ড্রাম খালি করছে । লক্ষ্য করলাম ময়লার স্তুপে জ্বলছে আগুনের শিখা আর তার সাথে শূন্যে উড়ছে আবর্জনার নানা রকমের টুকরো জঞ্জাল। ভ্যানগাড়ির খোলা দরোজা দিয়ে দেখতে পেলাম সেই গোলাপি বলটি মেঝেতে পড়ে আছে। আমি হাতে তুলে নিলাম। বাম্পারের উপর বসে বলটি যখন তাকিয়ে দেখছিলাম তখুনি বাবা আমার পাশে এসে দাঁড়ালেন।

‘তুমি কি জানো এগুলো দিয়ে ভালো বেসবল খেলা যায়’ তিনি বললেন, ‘ দূর থেকে নির্দিষ্ট লক্ষ্যে হিট করা যায়।’
আমি তার দিকে তাকিয়ে বললাম, ‘বাবা, তুমি কি মনে করো, এই বলটি নেওয়ার জন্য অই বুড়ো মানুষটি রাগে ক্ষেপে যেতে পারেন ?'
'নাহ, একদম না' বলে তিনি হাসলেন। 'আমার মনে হয়না। তিনি যখন মারা যাচ্ছিলেন সে সময় বলটি নিয়ে কিছু ভাবনার অবস্থায় ছিলেন না। তাছাড়া তিনি ত এটা ধরেও রাখতে পারছিলেন না। তাহলে কেন তিনি এটা নিজের কাছে রাখতে চাইবেন ?'
‘ও আচ্ছা। কিন্তু অন্য বলগুলোর কি হবে ?' আমি জিগ্যেস করলাম। 'যারা মরে গেছেন সেই মৃত মানুষরা কি সেগুলো ধরে রাখতে পেরেছেন বাবা?'
'না রে, খোকা।' তিনি জানালেন, 'আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি, এই একই বল ধরে প্রায় কুড়িজন বিভিন্ন মানুষ মারা গেছেন।'

আমি সভয়ে বলের দিকে তাকালাম। এবার ত দেখি কেবল একজন বুড়ো মানুষ রাগে ক্ষেপে আছেন তা নয়; পুরো কবরস্থানই ক্ষেপে পাগল হয়ে আছে। ভয়ে ভয়ে বলটি আবার নামিয়ে রেখে দিলাম।

ঠিক তখুনি বজ্রপাতের বিস্ফোরণের মতো একটি বিকট শব্দ হলো। সমস্ত আকাশ জুড়ে এই শব্দের প্রতিধ্বনি শোনা যাচ্ছিল। গাঙচিলরা তুমুল প্রলাপধ্বনি তুলে হইচই করে উঠল। কিন্তু ওদের উত্তাল চিৎকারের শব্দকে ছাপিয়ে আমি একটি ক্ষীণ করুণ অভিমানী কান্না শুনতে পেলাম। এটা আকাশ থেকে আসছিল না বরং আস্তাকুঁড়ের অন্য পাশ থেকে শোনা যাচ্ছিল। আমার মনোযোগ গিয়ে পড়ল একটি পুরানো সাদা পিকআপের উপর। একজন বয়স্ক লোক পিকআপের বাইরে দাঁড়িয়েছিলেন। তাঁর হাতে একটি শটগান। আর শটগানের চেম্বারের ভেতর তিনি আরেক রাউন্ড গুলি পাম্প করছিলেন। আমি কৌতূহলী হয়ে তাকিয়ে রইলাম এই ভেবে, তিনি কিসের উপর গুলি করবেন ! মাটিতে একটি হলুদ বালিশের খোল পড়েছিল। সেই ব্যাগের ভেতর থেকে একটি করুণ গোঙানির ধ্বনি ফুঁপিয়ে ভেসে আসছিল।

বিস্ময়ে হতবাক হয়ে আমি দেখলাম বয়স্ক লোকটি শটগানের নলটি নড়াচড়া করতে থাকা বালিশের খোলের দিকে তাক্‌ করে ধরলো। আরেকটি বিস্ফোরণধ্বনি প্রতিধ্বনিত হয়ে গর্জে উঠল। বালিশের খোলটি ফেটে লালচে ধোঁয়া ভেসে উঠলো আর কাপড়ের টুকরোগুলো ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে উড়ে গে্লো। ভয় তরাসে আগের মতোই মাথার উপরে গাঙচিলরা সমস্বরে আর্ত কোলাহল করে উঠলো।

আমি বিস্মিত চোখে তাকিয়ে দেখলাম, বয়স্ক লোকটি রক্তাক্ত বালিশের খোলটি তুলে নিলেন। তারপর ময়লাআবর্জনার মাঠে ঢুকে খোলটি উঁচু করে ছুঁড়ে ফেলে দিলেন। আমি আমার বাবার দিকে তাকালাম।

‘তুমি কি দেখেছ বাবা, এই লোকটি এইমাত্র কি করেছে ? উনি ব্যগের ভেতর কোনো কিছুকে স্রেফ গুলি করে দিয়েছে।’
বাবা আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘তিনি তাঁর কুকুরটিকে ভাগাড়ে ফেলে দিতে নিয়ে গেলেন।’
'ভাগাড় ? সেটা আবার কি ?'
বাবা আমাকে ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে দিলেন, 'যখন তোমার কুকুর মারা যাবে তখন তুমি তাকে ভাগাড়ে ফেলে দেবে। পোষা প্রাণীদের জন্য এটা একটি কবরস্তানের মতো।'
‘কিন্তু উনি যে গুলি করে মেরে ফেললেন বাবা।’ আমি বললাম।
‘যদি পোষ্যটি অনেক বয়স্ক হয়ে যায় বা মরে যায়’ বাবা বললেন, ‘প্রথমে যেটা হবে আর কি। বয়স্ক হয়ে অথর্ব হয়ে গেলে গুলি করে মেরে ফেলা হয়। আমার পোষা কুকুরটি যখন খুব বুড়ো হয়ে গেছিল তখন আমার বাবাও তাকে গুলি করে মেরে ফেলেছিল। হয়ত এখনও আমার সেই কুকুরটা এই ভাগাড়ের মধ্যে আছে।’

আমি বয়স্ক লোকটির দিকে ফিরে দেখলাম। তিনি তার পুরানো লক্কড়ঝক্কড় পিকআপে উঠে বসলেন আর ধীরে ধীরে চলে গেলেন। আমি আস্তাকুঁড়ের ভেতর ব্যবহার শেষে ফেলে দেওয়া নানারকমের ময়লাআবর্জনার স্তুপে হোঁচট খেতে খেতে হাঁটতে থাকলাম। এরই মধ্যে কিছুটা শান্ত হয়ে গেছে গাঙচিলের ঝাঁক। বাবা আবার ময়লার ড্রামগুলো ভ্যানে তুলতে শুরু করেছে।

আমি ভাগাড়ের দিকে হাঁটতে হাঁটতে মাটিতে একটি গর্ত দেখতে পেলাম। গর্তের তল থেকে করুণ কান্নার গোঙানি মৃদুস্বরে ভেসে আসছিল। প্রায় চারফুট চওড়া গর্তটির গভীরতা ছিল বিশাল। আসলে এটা ছিল অনেক আগের অব্যবহৃত একটি কুপ।

আমি ভাগাড়ের কিনারায় দাঁড়িয়ে গর্তের গভীর তলদেশের দিকে তাকিয়ে রইলাম। প্রায় তিরিশ ফুট গভীরে একটি স্তুপ দেখা যাচ্ছিল। এটা কোনো আবর্জনার ঢিবি বা স্তুপ ছিল না। এটাতে ছিল পোষা বুনোপ্রাণীদের মৃতদেহ—ছিল কিলবিলিয়ে ওঠা পোকামাকড়, গলগলে জীবন্ত শূককীট দিয়ে ঢাকা আধপচা কুকুরের মৃতদেহ, হাড় এবং পশম, পচা চামড়ার সাথে পচেগলে ক্ষয়ে যাওয়া মাথার খুলি। আর এগুলোর উপরেই ছিল সেই রক্তাক্ত বালিশের খোলটি। যা এখনও ধীরে ধীরে নড়ছে। রহস্যময় ইঁটের ঘের দেওয়া কুপ, সর্বত্র ধু্লির ধূসরতা আর মাকড়শার জালে ঢাকা গর্ত। সেই গর্তের পচাগলা তলদেশ থেকে ক্ষীয়মান কান্নার করুণ শব্দ ভেসে আসছিল।

আমি শোকস্তব্ধ হয়ে গেলাম। আসন্ন মৃত্যু প্রতিক্রিয়ার কারণে বালিশের খোলটির কম্পন আস্তে আস্তে কমে আসছিল। একসময় করুণ কান্নার শব্দও স্তিমিত হয়ে গেলো। সেই সঙ্গে চিরদিনের জন্য নড়াচড়াও থেমে গে্লো। বালিশের খোলটি এখন শান্তস্থির হয়ে পড়ে আছে। আর একবারের জন্যেও নড়ে উঠলো না।
‘খোকা, চল্‌ এবার যাওয়া যাক !’

আমি ঘুরে দাঁড়িয়ে দেখলাম, কাঁচা রাস্তার ধারে ভ্যানগাড়িটি দাঁড়িয়ে আছে। বাবা ভেতর বসে আমার জন্য অপেক্ষা করছে্ন। আমি ভ্যানগাড়ির দিকে ছুটে গেলাম। বাবা গাড়ির ইঞ্জিন চালু করে দিলেন। আমরা চলতে শুরু করলাম।

‘এবার বলো কুকুরের ভাগাড় দেখে কি মনে হলো ?’ বাবা জিগ্যেস করলেন।
‘কর্কি মারা গেলে’ আমি বিস্মিতভাবে বললাম, ‘ওকেও কি অই গর্তে ফেলে দেওয়া হবে ?’
মৃদু হেসে বাবা বললেন, ‘হুম, তবে তুমি যদি চাও আমরা কর্কিকে বাড়ির উঠানেও কবর দিতে পারি। কিন্তু কর্কি এত তাড়াতাড়ি মারা যাবে না—অনেকদিন বাঁচবে—তাই এসব নিয়ে তুমি দুশ্চিন্তা করো না।’

আমি আবার সেই গোলাপি বলটা দেখে হাতে তুলে নিলাম। ভাবতে শুরু করলাম, আচ্ছা কেমন লাগবে অই গর্তের ভেতর—পচাগলা হাড়, পোকামাকড় আর পিলপিল করে হেঁটে যাওয়া কিড়কিড়ে কৃমিকীটে ঢাকা গ্যাদগেদে মৃতদেহগুলোর সাথে থাকতে!

রাস্তা থেকে ঢালুতে নেমে যাওয়ার আগে গাড়ির আয়না দিয়ে আমি আরেকবার পেছনে তাকিয়ে দেখলাম। আবর্জনার স্তুপে লাগানো আগুনের দাউদাউ শিখা এখনও আকাশ ছেয়ে আছে। আর সেই বিশ্রী কটু গন্ধটা বাতাসে ঘুরে ঘুরে ছড়িয়ে পড়ছে। গোলাপি বলটির দিকে ফিরে তাকালাম। তারপর হাতের মুঠোর ভেতর চেপে ধরলাম। মনে হচ্ছিল, আমি যদি অই কুকুরের ভাগাড়টি কখনই না দেখতে পেতাম !

তবুও আমরা গাড়ি চালিয়ে সরে এলাম। পরে আমরা বণিমার্টেও গেলাম। বাবা আমার পছন্দের ‘জারটান’ খেলনাটার সঙ্গে স্টর্মশ্যাডোটাও কিনে দিলেন। ওই খেলনাগুলো নিয়ে আমি ঘণ্টার পর ঘণ্টা নিজের মতো করে মৃত্যু নিয়ে গল্প বানিয়ে খেলতে খেলতে সব ভুলে গেলাম। সেদিনের বেদনাদায়ক ঘটনাগুলো খুব দ্রুত মিলিয়ে গেল আর মন থেকে হারিয়ে গেল সেই কুকুরের ভাগাড়টাও। ·

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ