এইচ. এইচ. মুনরো (সাকি)-র গল্প : খোলা জানালা


অনুবাদ : কুলদা রায়

“আমার খালা একটু পরেই নামবেন, মিস্টার নাটেল,”
খুব আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে পনেরো বছরের একটি মেয়ে বলল। “ততক্ষণ পর্যন্ত আপনাকে আমার সঙ্গেই মানিয়ে নিতে হবে।”

ফ্র্যামটন নাটেল এমন একটি যথাযথ কথা বলার চেষ্টা করলেন যাতে বর্তমানের ভাতিজিকে যথেষ্ট প্রশংসা করা যায়, আবার যে খালা কিছুক্ষণের মধ্যেই আসবেন সেই তাকে যেন খাটো না করা হয়। মনে মনে তিনি আগের চেয়ে আরও বেশি সন্দেহ করলেন—একেবারে অপরিচিত লোকেদের সঙ্গে এভাবে আনুষ্ঠানিক সাক্ষাৎ করে আদৌ তার স্নায়ু-চিকিৎসার কোনো উপকার হবে কি না।

“আমি জানি ঠিক কী হবে,”--যখন তিনি এই গ্রামীণ অবকাশে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তখন তার বোন বলেছিলেন, “তুমি সেখানে গিয়ে নিজেকে শান্ত রাখবে। কারও সঙ্গে কথা বলবে না। আর একা একা বসে থাকলে তোমার স্নায়ু আরও দুর্বল হবে। তাই আমি ওখানকার যাদের চিনি, সবার কাছে তোমার পরিচয়পত্র পাঠিয়ে দিচ্ছি। যতদূর মনে পড়ে, তাদের মধ্যে কয়েকজন বেশ ভালোই ছিল।”

যে ভদ্রমহিলার কাছে বোনটি এখন তার পরিচয়পত্র দিলেন তার নাম মিসেস স্যাপলটন। তিনি আদৌ সেই ‘ভালো’ দলের মধ্যে পড়েন কি না সেটা ফ্র্যামটন ভাবছিলেন।

এদিককার লোকজনের সঙ্গে আপনার কি খুব পরিচয় আছে?”
ভাতিজি জিজ্ঞেস করল। তার মনে হল নীরবে বসে থাকা যথেষ্ট হয়েছে।

“আপনি জানেন, চার বছর আগে আমার বোন এখানে চার্চের যাজকের বাড়িতে ছিলেন। এখানকার কয়েকজনের কাছে তিনি আমার পরিচয়পত্র দিয়েছেন।” শেষ কথাটা ফ্রামটন স্পষ্ট অনুশোচনার সুরে বললেন।

“তাহলে আপনি আমার খালা সম্পর্কে আসলে কিছুই জানেন না?”
আত্মবিশ্বাসী মেয়েটি আবার জিজ্ঞেস করল।

“শুধু তার নাম আর ঠিকানা,” ফ্র্যামটন স্বীকার করলেন। তিনি তখন ভাবছিলেন, মিসেস স্যাপলটন কি বিবাহিতা, না বিধবা। ঘরটার ভেতরে এমন কিছু একটা ছিল যা পুরুষ মানুষের উপস্থিতির ইঙ্গিত দিচ্ছিল।

“তার বড় দুর্ঘটনাটি ঘটেছিল ঠিক তিন বছর আগে,” মেয়েটি বলল। “আপনার বোনের চলে যাওয়ার পরে।”

“দুর্ঘটনা?” ফ্র্যামটন জিজ্ঞেস করলেন।
এই শান্ত গ্রামাঞ্চলে দুর্ঘটনার ব্যাপারটি যেন বেমানান লাগছিল।

“আপনি হয়তো ভাবছেন, অক্টোবরের এই বিকেলে আমরা কেন জানালাটা পুরো খোলা রাখি,” ভাতিজি বলল। সে লনের দিকে খোলা একটি বড় ফরাসি জানালার দিকে ইশারা করল।

“এই সময়ের জন্য তো আবহাওয়া বেশ গরমই,” ফ্র্যামটন বললেন। “কিন্তু ওই জানালার সঙ্গে কি সেই দুর্ঘটনার কোনো সম্পর্ক আছে?”

“ঠিক তিন বছর আগে, এই দিনেই,” মেয়েটি বলল, “ওই জানালা দিয়েই আমার খালার স্বামী আর তার দুই ছোট ভাই শিকারে বেরিয়েছিলেন। তারা আর ফিরে আসেননি। তারা সবাই প্রিয় স্নাইপ পাখি শিকারের জায়গায় যাওয়ার পথে এক বিপজ্জনক জলাভূমিতে ডুবে যায়। সে বছর গ্রীষ্মটা ভয়ংকর রকম বৃষ্টিভেজা ছিল। যেসব জায়গা অন্য বছর নিরাপদ ছিল, সেগুলো হঠাৎ ভেঙে পড়েছিল। তাদের দেহ আর কখনও পাওয়া যায়নি। সেটাই ছিল সবচেয়ে ভয়ংকর দিক।”

এখানে মেয়েটির কণ্ঠের আত্মবিশ্বাস হারিয়ে গেল। কণ্ঠ হয়ে উঠল কাঁপা আর মানবিক।

“বেচারি খালা আজও মনে করেন একদিন তারা ফিরে আসবে। তার স্বামী, তার দুই ভাই, আর সেই ছোট বাদামি স্প্যানিয়েল কুকুরটাও, যেটা তাদের সঙ্গে হারিয়ে গিয়েছিল। তারা ঠিক আগের মতো এই জানালা দিয়েই হেঁটে ঢুকবে। তাই প্রতিদিন সন্ধ্যা নামা পর্যন্ত জানালাটা খোলা রাখা হয়। কীভাবে তারা বেরিয়েছিল সেটা বেচারি খালা আমাকে কতবার বলেছেন। বলেছেন, তার স্বামী হাতে সাদা ওয়াটারপ্রুফ কোট নিয়ে, আর ছোট ভাই রনি গাইছিল—‘বার্টি, হোয়াই ডু ইউ বাউন্ড?’ গাইছিল শুধু তাকে জ্বালানোর জন্য। কারণ সে বলত গানটা তার মাথা গরম করে দেয়। জানেন তো, এমন শান্ত সন্ধ্যায় আমার মাঝেমাঝে গা ছমছম করে, মনে হয় তারা সবাই এখনই ওই জানালা দিয়ে ঢুকে পড়বে...”

সে হালকা কেঁপে থেমে গেল।
ঠিক তখনই খালা ঘরে ঢুকলেন, দেরি হওয়ার জন্য অজস্র ক্ষমা চাইলেন। “আশা করি ভেরা আপনাকে বিনোদন দিয়েছে?” তিনি বললেন।

“ও খুবই ভালো,” ফ্র্যামটন বললেন।

“আপনি আশা করি খোলা জানালাটা নিয়ে আপত্তি করছেন না,” মিসেস স্যাপলটন চনমনে গলায় বললেন। “আমার স্বামী আর ভাইয়েরা এখনই শিকার থেকে ফিরবে। তারা সবসময় এই জানালা দিয়েই ঢোকে। আজ জলাভূমিতে স্নাইপ পাখি শিকার করতে গিয়েছিল। কাজেই তারা আমার বেচারা কার্পেটগুলো একেবারে নোংরা করে ফেলবে। তোমরা পুরুষরা ঠিক এমনই, তাই না?”

তিনি হাসি মুখে শিকার, পাখির অভাব, শীতকালে হাঁসের সম্ভাবনা—এসব নিয়ে বকবক করতে লাগলেন।

ফ্র্যামটনের কাছে সবকিছুই ভীষণ ভয়াবহ লাগছিল। তিনি কথাবার্তা অন্যদিকে ঘোরানোর আপ্রাণ চেষ্টা করলেন। কিন্তু বুঝতে পারছিলেন তার আতিথেয়ী তাকে অর্ধেক মনোযোগই দিচ্ছেন। তার চোখ বারবার ফ্র্যামটনের পাশ দিয়ে খোলা জানালার দিকে চলে যাচ্ছিল। ঠিক এই ট্র্যাজেডির বার্ষিকীতেই তার আসাটা যে কতটা দুর্ভাগ্যজনক!

“ডাক্তাররা বলেছেন আমাকে পুরো বিশ্রাম নিতে হবে, বেশি ভাবাভাবি করা যাবে না, আর শরীরিক পরিশ্রমও করা চলবে না,” ফ্র্যামটন বললেন। তার ধারণা ছিল অচেনা মানুষরাই এসব কথা শুনতে খুব আগ্রহী। “খাবারদাবার নিয়ে অবশ্য তাদের মধ্যে মতের মিল নেই,” সে যোগ করল।
“ও?” মিসেস স্যাপলটন বললেন। কথাটা যেন হাই তোলার বিকল্প ছিল।

হঠাৎ তিনি চমকে উঠলেন। “ওরা এসে গেছে!” তিনি চিৎকার করলেন। “ একদম ঠিক চা-পানের সময়ে! আর দেখছেন তো—একেবারে চোখ পর্যন্ত কাদায় ভেজা!”

ফ্র্যামটন কেঁপে উঠলেন। সহানুভূতির দৃষ্টি নিয়ে তিনি ভাতিজির দিকে তাকালেন। মেয়েটি খোলা জানালার দিকে তাকিয়ে আছে। তার চোখে হতভম্ব আতঙ্ক। অজানা ভয় নিয়ে ফ্র্যামটনও ঘুরে তাকালেন।

সন্ধ্যার অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে। তিনটি মানুষ লনের ওপর দিয়ে জানালার দিকে হেঁটে আসছে। তাদের হাতে বন্দুক। একজনের কাঁধে সাদা কোট ঝুলছে। ক্লান্ত বাদামি স্প্যানিয়েল কুকুরটি তাদের পেছনে পেছনে আসছে।

নিঃশব্দে তারা কাছে এল। তারপর অন্ধকার থেকে একটি কর্কশ যুবক কণ্ঠ ভেসে এল, “আমি তো বলেছি, বার্টি, তুমি কেন লাফাও?”

ফ্র্যামটন হঠাৎ করে তার লাঠি আর টুপি আঁকড়ে ধরলেন। তিনি দৌড়ে পালাতে লাগলেন। দৌড়াতে দৌড়াতে হলের দরজা, কংক্রিটের রাস্তা আর সামনের ফটক পেরিয়ে গেলেন—সবকিছু যেন ঝাপসা হয়ে চোখের সামনে সরে যাচ্ছিল। ঠিক তখনই এক সাইকেল আরোহী রাস্তা দিয়ে আসছিল। ফ্রামটনের সঙ্গে ধাক্কা লেগে যাচ্ছিল প্রায়। সেটা এড়াতে সে ঝোপের মধ্যে ঢুকে পড়ল।

“এই তো আমরা, প্রিয়,” সাদা রেইনকোট পরা লোকটি জানালা দিয়ে ঢুকতে ঢুকতে বলল। “ভালোই কাদায় ভিজেছি, তবে বেশির ভাগই শুকনো। আমরা আসতেই কে যেন দৌড়ে পালাল?”

“এক অদ্ভুত মানুষ,” মিসেস স্যাপলটন বললেন। “নাম মিস্টার নাটেল। শুধু নিজের অসুখবিসুখ নিয়েই কথা বলছিল। তোমরা ঢুকতেই বিদায় বা ক্ষমা চাওয়ার তোয়াক্কা না করেই ছুটে পালাল। দেখে মনে হচ্ছিল সে ভূত দেখেছে।”

“সম্ভবত কুকুরটার জন্য,” ভেরা শান্তভাবে বলল। “সে আমাকে বলেছিল—তার কুকুরে ভয়। একবার নাকি গঙ্গার ধারে একদল রাস্তার কুকুর তাকে কবরস্থানে তাড়া করেছিল। সদ্য খোঁড়া এক কবরে রাত কাটাতে হয়েছিল তাকে। ওরা ওপর থেকে দাঁত বের করে ফেনা তুলছিল। এমন অভিজ্ঞতায় যে কারোরি স্নায়ু দুর্বল হয়ে যেতে পারে।”

স্বল্প নোটিশে রোমাঞ্চ তৈরি করাই ছিল তার বিশেষত্ব। ·



লেখক পরিচিতি : H. H. Munro (Saki), যিনি সাহিত্যজগতে সাকি নামে পরিচিত। ইংরেজ ছোটগল্পের এক ব্যতিক্রমী লেখক তিনি। তাঁর জন্ম ১৮৭০ সালে বার্মায়। বার্মা ছিল তখন ব্রিটিশ ভারতের অন্তর্ভুক্ত। শৈশবের এই উপনিবেশিক অভিজ্ঞতা তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিকে তীক্ষ্ণ ও সংশয়প্রবণ করে তোলে। পরবর্তীকালে ইংল্যান্ডে ফিরে তিনি সাংবাদিকতা ও সাহিত্যচর্চায় যুক্ত হন।

সাকির গল্প সাধারণত ছোট, সংযত ভাষায় লেখা, কিন্তু ভেতরে থাকে নির্মম ব্যঙ্গ ও অস্বস্তিকর হাস্যরস। তিনি ভদ্র সমাজ, মধ্যবিত্ত নৈতিকতা, পারিবারিক ভণ্ডামি এবং সামাজিক মুখোশকে নির্দয়ভাবে উন্মোচন করেন। তাঁর গল্পে শিশুরা প্রায়ই গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। কিন্তু তারা নিষ্পাপ নয়, বরং ভয়ংকরভাবে বুদ্ধিমান বা নিষ্ঠুর। এই উল্টো দৃষ্টিভঙ্গিই সাকির গল্পকে আলাদা করে তোলে।

তার লেখার আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো শেষ মুহূর্তের মোড়। গল্পের শেষ লাইনে তিনি পাঠকের প্রত্যাশা ভেঙে দেন, কখনো হাসিতে, কখনো ভয় বা অস্বস্তিতে। The Open Window, Tobermory, Sredni Vashtar তাঁর সবচেয়ে পরিচিত গল্প।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে স্বেচ্ছায় যোগ দিয়ে ১৯১৬ সালে ফ্রান্সে তিনি নিহত হন। অল্প আয়ু হলেও সাকি আধুনিক ছোটগল্পে শীতল ব্যঙ্গ ও নিষ্ঠুর কৌতুকের একটি স্থায়ী ছাপ রেখে গেছেন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ