মার্গারেট মিচেলের উপন্যাস : যেদিন ভেসে গেছে

অনুবাদ : উৎপল দাশগুপ্ত
পর্ব - ৪৩

সেটা ছিল ডিসেম্বর মাসের বিরলতম একটা দিন। উত্তর গোলার্ধের বসন্ত ঋতুর মত সূর্যের কিরণ বেশ উষ্ণ। আন্ট পিটির উঠোনের ওক গাছে লাল লাল শুকনো পাতা এখনও ঝরে পড়েনি। ঘাসে একটা শুকনো ভাব এসে গেলেও হালকা হলদেটে সবুজ ভাবটা এখনও চোখে পড়ে। বাচ্চা কোলে নিয়ে স্কারলেট বাইরে এসে উঠোনের এক পাশে রোদের মধ্যে একটা দোলনা চেয়ারে বসে পড়ল। পরনে সবুজ রঙের নতুন একটা চ্যালিস কাপড়ের (সিল্ক আর উল মিশিয়ে তৈরি পোশাকের কাপড়) তৈরি একটা নতুন পোশাক, গজের পর গজ কালো রঙের রিক্র্যাক ব্রেইড (পোশাক সুবিন্যস্ত করার কাছে রিবন জাতীয় বস্তু) দিয়ে সুবিন্যস্ত করা, মাথায় একটা বাড়িতে পরার লেসের টুপি, আন্ট পিটির বানিয়ে দেওয়া। দুটো জিনিসই ওকে খুব মানিয়ে গেছে, ও জানেও সেটা, তাই জিনিসদুটোই ওর খুব পছন্দের। নিজেকে আবার সুন্দর করে দেখাতে কী ভালই না লাগে! বিশেষ করে এতগুলো মাস ধরে ওকে এমন বীভৎস রূপে সবাই দেখার পর!

বাচ্চাটাকে দোল দিতে দিতে স্কারলেট গুনগুন করে গান করছিল। পাশের রাস্তা থেকে ঘোড়ার খুরের আওয়াজ ভেসে এল। কৌতুহলী হয়ে বারান্দা থেকে আঙুরলতার শুকনো ঝাড়ের ফাঁক দিয়ে উঁকি মারল। দেখতে পেল রেট বাটলার ওদের বাড়ির দিকে আসছেন।

বেশ কিছু মাস হল উনি অ্যাটলান্টায় ছিলেন না। জেরাল্ডের মৃত্যুর ঠিক পরে পরেই। এলেনা লোরেনার জন্মের অনেক আগে থেকেই। ওঁর কথা খুবই মনে পড়ত। তবে এখন মনে হল কিছু একটা উপায় খুঁজে বের করা দরকার যাতে ওঁর সঙ্গে দেখা না হয়। সত্যি কথা বলতে কি, ওঁর শ্যামলবরণ মুখটা দেখতে পেয়েই একটা অপরাধবোধে ও সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছিল। অ্যাশলেকে কেন্দ্র করে একটা ব্যাপার ওর বিবেকের বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে, আর সেই ব্যাপারটা নিয়ে রেটের সঙ্গে আলোচনা করবার ইচ্ছে ওর একেবারে নেই। কিন্তু অনিচ্ছা থাকলেও উপায় নেই, উনি যেনতেনপ্রকারেণ সেই ব্যাপারে আলোচনা করতে ওকে বাধ্য করবেন।

উনি গেটের কাছে এলেন, তারপর শরীরে হালকা দোলা দিয়ে মাটিতে নেমে এলেন। ঘাবড়ে যাওয়া চোখে স্কারলেট ওঁর দিকে তাকিয়ে ভাবল যে বইটা ওয়েড ওকে বারবার পড়ে শোনাতে বলছে, সেই বইয়ে আঁকা একটা ছবির মতই দেখাচ্ছে ওঁকে।

“ওঁর দরকার শুধ একজোড়া দুল, আর দাঁতের ফাঁকে ধরে রাখা একটা চাকু,” স্কারলেট ভাবল। “সে উনি জলদস্যু বা আর যাই হোন না কেন, আজ আমি আমার গলায় কোপ বসাতে দেব না, যদি সামলে নিতে পারি।”

পায়ে চলা পথটা ধরে ওঁকে এগিয়ে আস্তে দেখে স্কারলেট একটা অভিবাদন ছুঁড়ে দিল। খুব মিষ্টি করে হেসে। কী ভাগ্যিস, আজ এই নতুন পোশাকটা পরেছে, আর মাথায় মানসই টুপিটা! সেই জন্যে ওকে খুব সুন্দরও দেখাচ্ছে! উনি চটপট একবার স্কারলেটের ওপর চোখ বুলিয়ে নিলেন। স্কারলেট বুঝতে পারল ওঁর চোখেও ওকে সুন্দরই দেখাচ্ছে।

“নতুন শিশু! আরে স্কারলেট! একেবারে চমকে দিলে যে!” নীচু হয়ে এলা লোরেনার ছোট্ট কুৎসিত মুখের ওপর থেকে কম্বলটা সরিয়ে দিতে দিতে হেসে বললেন।

“ঠাট্টা করবেন না,” লজ্জায় স্কারলেট রাঙা হয়ে উঠল। “কেমন আছেন, রেট? অনেকদিন বাইরে ছিলেন।”

“হ্যাঁ, ছিলাম না। একবার বাচ্চাটা আমার কোলে দাও, স্কারলেট। হ্যাঁ, হ্যাঁ, বাচ্চাকে কীভাবে কোলে নিতে হয় আমার জানা আছে। অনেক অদ্ভুত অদ্ভুত কাজই আমি করতে পারি। হুঁ, একেবারে ফ্র্যাঙ্কের মুখ বসানো। শুধু ওই পেল্লায় গোঁপটা ছাড়া, তার জন্য একটু সময় তো দিতেই হবে।”

“দরকার পড়বে না। ও মেয়ে।”

“মেয়ে? খুব ভাল কথা। ছেলেরা এমন ঝামেলা করে না! আর কখনো ছেলে হতে দিও না, স্কারলেট!”

ওর জিভের ডগায় একটা লাগসই জবাব এসে গেছিল। ছেলে হোক বা মেয়ে, আর কোনও বাচ্চা হওয়ানোর বিন্দুমাত্র ইচ্ছেই ওর নেই। কিন্তু ঠিক সময়ে সামলে নিয়ে স্কারলেট হাসল। কথাবার্তা কোন দিকে ঘোরালে অপ্রীতিকর প্রসঙ্গ – যেটা নিয়ে ওর দুশ্চিন্তা – এড়ানো যায়, মনে মনে চট করে তার একটা মতলব ঠিক করে নিল।

“বেড়ানো ভাল হয়েছে, রেট? কোথায় ঘুরতে গেছিলেন এবারে?”

“হ্যাঁ – কিউবা গেলাম – নিউ অরলীন্স – আরও কয়েকটা জায়গা। নাও স্কারলেট, বাচ্চাকে ধর। ওর লালা ঝরতে শুরু করেছে আর হাত জোড়া থাকায় রুমালটা বের করতে পারছি না। খুব ভাল বাচ্চা, সন্দেহ নেই, কিন্তু বুকের কাছে আমার শার্টটা ভিজে যাচ্ছে।”

স্কারলেট বাচ্চাটাকে নিজের কোলে ফিরিয়ে নিল। রেট অলসভাবে রেলিংএর একটা থামে বসে রুপোর কেস থেকে একটা চুরুট বের করলেন।

“নিউ অরলীন্স তো আপনি ঘনঘন যান,” ঠোঁট সামান্য উলটে স্কারলেট বলল। “কিন্তু কী করেন ওখানে, সেটা আপনি আমাকে কখনো বলেননি।”

“আমি কঠোর পরিশ্রমী লোক, স্কারলেট, হয়ত আমার কাজই আমাকে ওখানে টেনে নিয়ে যায়।”

“কঠোর পরিশ্রমী! আপনি!” স্কারলেট প্রগলভ হয়ে হাসল। “আপনি জীবনে কোনদিনও কাজ করেননি। খুব আলসে আপনি। কার্পেটব্যাগারদের চুরিতে মদদ দেওয়ার জন্য ওদের টাকা ধার দেওয়া ছাড়া আর আপনি কিছুই করেননি। নাফার অর্ধেক আপনি পকেটে পোরেন আর ইয়াঙ্কিদের ঘুষ দেন যাতে আমাদের – করদাতাদের ওপর লুটপাট চালানোর ফন্দিতে কোনও বাধা না আসে।”

ভদ্রলোক মাথা পেছনে হেলিয়ে হেসে উঠলেন।

“আহা, কী ভালই না হত যদি তোমারও সরকারি কর্মচারীদের ঘুষ দেওয়ার মত টাকা থাকত, যাতে তুমিও লুটপাট করতে পারতে!”

“কথাটা ভাবলেই আমার – ” স্কারলেটের রোঁয়া খাড়া হয়ে উঠল।

“তবে তুমি হয়ত একদিন অনেক টাকা করে ফেলবে আর বেশ বড় মাপের ঘুষ দেওয়ার কারবারে লেগে পড়বে। হয়ত তোমার ওই লীজ় নেওয়া কয়েদিদের দৌলতেই ধনী হয়ে উঠবে।”

“ওরে বাবা!” একটু হতবুদ্ধি হয়ে স্কারলেট বলল। “এত তাড়াতাড়ি আপনি আমার দলের কথা জানলেন কী করে?”

“কাল রাতে ফিরেছি। সন্ধ্যেটা কাটালাম গার্ল অফ দ্য পিরিওড সেলুনে। শহরের যাবতীয় নতুন কেচ্ছা জানার আখড়া ওটা। গুজব আর কানাঘুষো চালাচালি করার আদর্শ জায়গা। লেডিদের সোয়িং সার্কলের থেকে অনেক ভাল। লোকে বলল আমাকে, তুমি নাকি এক দঙ্গল কয়েদি লীজ় নিয়েছ, আর ওই কসাই গ্যালাঘারকে লাগিয়েছ ওদের মুখের রক্ত তুলে খাটিয়ে নেওয়ার জন্য।”

“মিথ্যে কথা,” স্কারলেট রেগে উঠল। “ও মোটেই ওদের মুখের রক্ত তুলে খাটিয়ে নেবে না। আমি সেটা নজরে রাখব।”

“সত্যি রাখবে?”

“আলবাত রাখব! কী করে আপনি আমাকে এরকম অপবাদ দিতে পারেন?”

“অধমের ধৃষ্টতা মার্জনা করবেন, মিসেজ় কেনেডি! আপনার সব অভিপ্রায়ই যে সমালোচনার ঊর্ধে, সে ব্যাপারে আমি ভালমতই অবগত। তবে কী জানেন, ওই যে গ্যালাগার নামে পিশাচটাকে আপনি লাগিয়েছেন, তার মত কসাই আমি আর দুটো দেখিনি। একটু নজরে রাখবেন, নাহলে ইনস্পেক্টর এসে পড়লে আপনি খামোখা নাজেহাল হয়ে যেতে পারেন।”

“আপনি নিজের চরকায় তেল দিন, আমাকে আমার চরকায় দিতে দিন,” রাগতস্বরে স্কারলেট বলল। “ওই কয়েদিদের নিয়ে আমি আর একটা কথাও বলতে চাই না। এদের নিয়ে সবারই খুব মাথাব্যথা। কাদের দিয়ে আমি কাজ করাব, সেটা আমার ব্যাপার – আর আপনি যে এত ঘনঘন নিউ অরলিয়্যান্সে যান, কী করেন ওখানে, আমাকে বলেননি তো? ওখানে আপনি এতবার যান – সবাই বলে – ” ও চুপ করে গেল। এতটা বলতে চায়নি।

“সবাই কী বলে?”

“বেশ – বলে ওখানে নাকি আপনার একজন প্রেমিকা আছে। আপনি তাকে নাকি বিয়ে করতে চলেছেন। সত্যি নাকি, রেট?”

ব্যাপারটা নিয়ে স্কারলেটের কৌতুহল বহুদিনের। তাই প্রশ্নটা সরাসরি করে ফেলা থেকে নিজেকে সামলাতে পারল না। রেটের বিয়ে হয়ে যাবে কল্পনা করে মনের মধ্যে অদ্ভুত একটা জ্বালা হতে লাগল। অথচ এই জ্বালা ধরার কারণটা কী হতে পারে, সেটা বুঝতে পারল না।

ওঁর স্নিগ্ধ দৃষ্টি সহসা সতর্ক হয়ে উঠল। চোখে চোখ রেখে তাকিয়ে থাকলেন যতক্ষণ না লজ্জার একটা অরুণাভা স্কারলেটের গালে ছড়িয়ে পড়ল।

“খুব কিছু এসে যাবে কি তোমার?”

“না, মানে, আপনার সঙ্গে বন্ধুত্ব নষ্ট হয়ে যাক, সে আমি চাই না,” খুব পরিপাটি করে বলল। যেন ব্যাপারটা এমন কিছুই নয় বোঝানোর জন্য এলা লোরেনার মাথার কাছে কম্বলটা টেনে দেবার জন্য ঝুঁকল।

উনি হেসে উঠলেন। বললেন, “আমার দিকে একবার তাকাও তো, স্কারলেট।”

অনিচ্ছাসহকারে মাথা তুলল। গালের রাঙাভাব আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

“তোমার অতি উৎসুক বন্ধুবান্ধবদের বলে দিতে পার, আমি তখনই বিয়ে করব, যখন কোনো মেয়ে আর কোনোভাবে ধরা দিতে চাইবে না। এখন পর্যন্ত কোনও মেয়েকে বিয়ে করতে চাওয়ার মত মাথা আমার খারাপ হয়ে যায়নি।”

এবার সত্যি সত্যি স্কারলেটের মাথাটা গুলিয়ে গেল, অস্বস্তিবোধ করল রীতিমত। এই উঠোনেই, অবরোধের সময়ে, এক সন্ধ্যায়, উনি বলেছিলেন, “বিয়ে করবার বান্দা আমি নই”, তারপর হালকা চালে ওকে ওঁর মিস্ট্রেস হবার প্রস্তাব দিয়েছিলেন – আরও মনে পড়ল সেই ভয়ানক দিনটার কথা – উনি যখন জেলে ছিলেন – মনে পড়তেই দারুণ লজ্জা হল। ওর চোখের ভাষা পড়তে পড়তে রেটের মুখে একটা ক্রুর হাসি ফুটে উঠল।

“তবে তোমার ওই ধৃষ্ট কৌতুহল আমি চরিতার্থ করে দেব। প্রশ্নটা তুমি কোনও রাখঢাক না করেই যেহেতু করেছ। কোনও প্রেমিকার জন্য আমি মাঝে মাঝে নিউ অরলিয়্যান্স পাড়ি দিই না। দিই একটা বাচ্চার জন্য, একটা ছেলের জন্য।”

“একটা ছোট ছেলে!” অপ্রত্যাশিত খবরটা পেয়ে স্কারলেট যারপরনাই বিস্মিত। ভ্যাবাচ্যাকা খাওয়া ভাবটা কেটে গেল।

“হ্যাঁ, আমি ওর বৈধ অভিভাবক। ওর দেখাশোনার দায়িত্ব আমার ওপরেই বর্তেছে। নিউ অরলিয়্যান্স স্কুলে পড়ে। ওকে দেখার জন্যই ঘনঘন ওখানে যাই।”

“ওর জন্য উপহারও নিয়ে যান?” তাহলে এই জন্যই ওয়েড কী ধরণের উপহার পছন্দ করবে ওঁর জানা!

“হ্যাঁ,” অনিচ্ছাসহকারে কথাটা বললেন।

“ওহ! আমি ভাবতে পারিনি! দেখতে খুব সুন্দর নাকি?”

“উচ্ছন্নে যাবার জন্য একটু বেশিই সুদর্শন।”

“খুব ভাল ছেলে?”

“মোটেই না, মূর্তিমান শয়তান একেবারে! আমি চাইনি ও পৃথিবীতে আসুক। ঝামেলা করবার জন্য ছেলেরা জন্মায়। আর কিছু জানার আছে তোমার?”

সহসা ওঁকে খুব রুষ্ট মনে হল। ভ্রূকুটি করে আছেন। ব্যাপারটা নিয়ে আলোচনা করায় মনে মনে যেন অনুতাপ করছেন।

“সে আপনি আরও কিছু বলতে যদি না চান, আমি শুনতে চাই না,” একটু উদ্ধত হয়েই জবাব দিল, যদিও আরও কিছু শোনার জন্য কৌতুহলে মরে যাচ্ছিল। “তবে অভিভাবক হিসেবে আপনাকে ঠিক ভেবে নিতে পারছি না,” বলে হেসে ফেলল। উদ্দেশ্যে ওঁকে একটু অপ্রতিভ করে দেওয়া।

“না, তোমার পক্ষে ভেবে নেওয়া সম্ভব নয়। তোমার কল্পনাশক্তি খুবই সীমাবদ্ধ।”

আর কথা না বাড়িয়ে উনি নীরবে চুরুট টেনে যেতে লাগলেন। ওঁর কড়া কথার প্রেক্ষিতে একটা যুৎসই জবাব খুঁজতে লাগল, কিন্তু কিছুই পেল না।

“এই ব্যাপারটা পাঁচ কান না করলেই আমি খুশি হব,” শেষমেশ বললেন রেট। “অবশ্য কোনও মহিলাকে মুখে কুলুপ এঁটে থাকতে বলা আর অসম্ভবকে সম্ভব বলে ভাবা একই ব্যাপার।”

“মন্ত্রগুপ্তি রাখার অভ্যেস আমার আছে,” আহতস্বরে বলল স্কারলেট।

“তাই নাকি? বন্ধুদের সম্বন্ধে এরকম অপ্রত্যাশিত তথ্য জানতে পারলে বেশ স্বস্তিবোধ হয়। এবার ঠোঁট ফোলানো থামাও, স্কারলেট। সীমা লঙ্ঘন করে কৌতুহল দেখানোর জন্য তোমাকে কয়েকটা কড়া কথা বলে ফেলেছি। খুব দুঃখিত। তবে অনাবশ্যক নাক গলানোর জন্য এটা তোমার পাওনাই ছিল। নাও এবার একটু মিষ্টি করে হাসো দেখি। অপ্রীতিকর একটা প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা করার আগে, কয়েক মিনিট আমরা একটু আনন্দ করে নিই।”

“এই রে!” স্কারলেট প্রমাদ গুনল। “এবার অ্যাশলে আর মিল নিয়ে আমাকে চেপে ধরবেন!” তাড়াতাড়ি মুখটা হাসি হাসি করল, যাতে গালে ভালভাবে টোল পড়ে। উনি অন্যমনস্ক হয়ে পড়বেন। “আর হ্যাঁ, কোথায় গেছিলেন, রেট? এতদিন ধরে নিশ্চয়ই নিউ,অরলিয়্যান্সেই ছিলেন না, ঠিক কিনা?”

“না, গত মাসটা আমি চার্লসটনেই ছিলাম। আমার বাবা মারা গেলেন।”

“খুব খারাপ লাগছে শুনে।”

“খারাপ লাগতে দিও না। মরতে ওঁর খারাপ লাগেনি, সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত। আর উনি মারা যাওয়ায় আমারও কিছু খারাপ লাগেনি।”

“কী আজেবাজে কথা বলছেন, রেট!”

“আজেবাজে কথা তখনই হত, যদি দুঃখ না পেয়েও আমি দুঃখ পাওয়ার ভান করতাম। তাই নয় কি? আমাদের বাপ-ব্যাটার মধ্যে কোনওদিনই ভালবাসার টান খুব একটা ছিল না। আমার তো মনেই পড়ে না আমার কোনও কাজের তারিফ উনি করেছেন বলে। আসলে আমার স্বভাবটা ছিল ঠিক ওঁর বাবার মত, আর সেই বাপ ছিলেন ওঁর দুচোখের বিষ। যত বড় হলাম, আমার কাজকর্মে ওঁর অসম্মতি ক্রমে ক্রমে আমার প্রতি ঘৃণায় পরিণত হল। এটা অবশ্য স্বীকার করতেই হবে আমার তরফ থেকে বাবার সঙ্গে মানিয়ে চলার চেষ্টা একেবারেই ছিল না। যে কাজগুলো উনি চাইতেন আমার করা উচিত, বা বড় হয়ে আমার কী হওয়া উচিত, সেগুলো খুবই বিরক্তিকর ব্যাপারস্যাপার। শেষমেশ উনি তো আমাকে বাড়ি থেকে বেরই করে দিলেন, এক কানাকড়িও না দিয়ে আর শিক্ষাদীক্ষাও যা দিয়েছিলেন, তাতে চার্লস্টন সমাজে একজন ভদ্রলোক হিসেবে পরিচিত হওয়া, পিস্তলে অব্যর্থ লক্ষ্যভেদ করতে পারা আর দারুণ ভাল পোকার খেলতে পারা – এছাড়া আর কিছুই করা যায় না। তা সত্ত্বেও আমি যে অনাহারে মরে যাইনি, উলটে পোকারে দক্ষতার সুবিধে নিয়ে জুয়ো খেলে রাজকীয় চালচলন বজায় রাখতে পেরেছিলাম, এটাকে উনি ব্যক্তিগত অপমান হিসেবে ধরে নিয়েছিলেন। একজন বাটলারের পাকা জুয়াড়ি হয়ে পড়ায় উনি এত অপমানিত বোধ করেছিলেন যে প্রথম যখন বাড়ি এলাম, মা’কে আমার সঙ্গে দেখা পর্যন্ত করতে নিষেধ করে দিয়েছিলেন। যুদ্ধের পুরো সময়টা যখন চার্লস্টনের বাইরে গিয়ে চোরাই চালানের কারবারে লেগে গেলাম, মা’কে মিথ্যে অজুহাত দিয়ে পালিয়ে আসতে হত আমার সঙ্গে দেখা করতে। খুব স্বাভাবিকভাবেই, এই সব কারণে, বাবার প্রতি ভালবাসা বাড়ার সুযোগ আর হয়নি।”

“ওহো, আমি এসব কিছুই জানতাম না!”

পুরোনো দিনে প্রকৃত বৃদ্ধ ভদ্রলোক বলতে যা বোঝাত, উনি ছিলেন তাই। অর্থাৎ, উনি ছিলেন একাধারে অজ্ঞ, মাথা মোটা আর সেকেলে মানুষদের মত ভাবা ছাড়া অন্য কোনো রকম করে ভাবতে একেবারেই অক্ষম একজন মানুষ। আমাকে ত্যাজ্যপুত্র করায় সবাই ওঁকে ধন্য ধন্য করেছিল। ওঁর কাছে আমি ছিলাম মৃত। “ডান চোখ যদি তোমাকে ভোগায়, উপড়ে ফেল।” আমি ছিলাম ওঁর সেই ডান চোখ, ওঁর জ্যেষ্ঠপুত্র। তাই উনি সমুচিত প্রতিহিংসা নেওয়ার জন্য আমাকে উপড়ে ফেলেছিলেন।”

উনি হাসলেন। মজা করে পুরোনো কথা বলতে বলতে ওঁর দৃষ্টি কঠোর হয়ে উঠল।

“দেখ, ওঁর সব অপরাধ আমি ক্ষমা করে দিতে পারি, পারি না কেবল আমার মা আর বোনের সঙ্গে উনি যা করেছেন, যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর থেকে। একেবারে নিঃস্ব হয়ে গেছিলেন ওঁরা। প্ল্যান্টেশনের বাড়িটা পুড়িয়ে ছারখার করে দেওয়া হয়েছে, ধানক্ষেত সব জলাজমিতে তলিয়ে গেছে। ট্যাক্সের টাকা না মেটাতে পারায় শহরের বাড়িটাও হাতছাড়া হয়ে গেছে। এমন দুটো কামরায় ওঁদের থাকতে হচ্ছিল, যেখানে ডার্কিরাও থাকতে পারবে না। মা’কে টাকা পাঠিয়েছিলাম – কিন্তু বাবা সেই টাকা পত্রপাঠ ফেরত পাঠিয়ে দেন – পাপের কামাই, ভাব একবার! তবুও বেশ কয়েকবার গেছি আমি চার্লস্টনে, বোনের হাতে লুকিয়ে কিছু টাকা তুলে দিয়েছি। কী করে জানি না, বাবা প্রতিবারই ধরে ফেলেছেন, আর অশান্তির একশেষ করে ছেড়েছেন ওঁদের সঙ্গে। টাকাগুলো আমার কাছে ফেরত চলে এসেছে। জানি না কী ভাবে ওঁরা দিন গুজরান করতেন … না, জানতাম – আমার ভাই যথাসাধ্য টাকা পাঠিয়েছে – তবে সেটা যথেষ্ট নয় – কিন্তু ভাইও আমার কাছ থেকে টাকা নিতে রাজি হয়নি – চোরা কারবারির টাকা মানে অভিশপ্ত টাকা, বোঝো একবার! হ্যাঁ, তাছাড়া বন্ধুবান্ধবরাও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। তোমার ওই আন্ট ইউল্যালি – ওঁর খুব মায়াদয়া। মায়ের প্রিয় বন্ধুদের মধ্যে একজন। ওঁদের জামা কাপড় দিয়েছেন। ভাব একবার! আমার মা – দান খয়রাতির ওপর ভরসা করে বেঁচে!”

রেটকে চোখমুখ থেকে চটুলতার আবরণ সরিয়ে কথা বলতে স্কারলেট খুব কমই দেখেছে। ওঁর প্রতিটি কথায় পিতার প্রতি অকৃত্রিম ঘৃণা আর মায়ের দুর্দশার জন্য আন্তরিক বেদনা ফুটে বেরোচ্ছে।

“আন্ট ’ল্যালি! হে ঈশ্বর! কিন্তু রেট, আমি ওঁকে যে টাকা পাঠাতাম, তার ওপরে ওঁর আর কোনও টাকা আছে বলে তো জানতাম না!”

“তাহলে এই ব্যাপার? এখন বুঝলাম, টাকাটা আসত কোথা থেকে! কী অভদ্র তুমি, আমার মুখের ওপর বলে দিয়ে, আমাকেই অপমান করলে! টাকাটা আমাকে ফিরিয়ে দিতে দাও!”

“স্বচ্ছন্দে,” স্কারলেট ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসল। রেটও হাসিটা ফিরিয়ে দিলেন।

“আহা, স্কারলেট, টাকার কথা শুনেই তোমার চোখটা কী রকম চকচক করে উঠল! তুমি কী ঠিক জানো যে তোমার শরীরে আইরিশ রক্তের সঙ্গে সঙ্গে স্কটিশ বা, কে বলতে পারে, ইহুদি রক্তও মিশে নেই?”

“একদম ঠুকে কথা বলবেন না! আমি মোটেই আন্ট ’ল্যালির কথা আপনার মুখের ওপর বলতে চাইনি। তবে, আসল কথাটা কি জানেন, উনি ভাবেন আমি একটা টাকার কুমীর। খালি চিঠি লিখে টাকা পাঠাতে বলেন – আরও – আরও টাকা! ঈশ্বর জানেন, চার্লস্টিনে সাহায্য পাঠানো ছাড়াও, আমার কাঁধে অনেক বোঝা! আচ্ছা আপনার বাবা কিসে মারা গেলেন?”

“ভদ্রতাজনিত অনাহারে মনে হয় – হ্যাঁ সেটাই হবে। বেশ হয়েছে। নিজের সাথে সাথে মা আর রোজ়মেরিকেও অনাহারে রাখতে ওঁর বিবেকে বাধেনি! মারা গিয়ে সুবিধেই হয়েছে, আমি সাহায্য করতে পারব। একটা বাড়ি কিনে দিয়েছি ব্যাটারিতে, ওঁদের জন্য। দেখাশোনা করবার জন্য চাকর-বাকরও রেখে দিয়েছি। অবশ্য টাকাটা যে আমার কাছ থেকে যাচ্ছে, সে কথাটা ওঁরা বলতে পারবেন না।”

“কেন পারবেন না?”

“চার্লস্টনের লোকজনদের তো তুমি ভাল করেই জানো, স্কারলেট! ওখানে তুমি গেছ। হতে পারে আমার পরিবার দরিদ্র, কিন্তু একটা সামাজিক অবস্থান তো আছে, তাই না? সেটা বজায় রাখতে হবে তো! আর সেটা বজায় রাখতে গেলে বলা যাবে না যে এই টাকার সঙ্গে জুয়াড়ির, ফাটকাবাজের আর কার্পেটব্যাগারদের সম্পর্ক আছে। না, বলা হয়েছে যে বাবা অনেক বড় মাপের একটা বীমা করিয়েছিলেন, সেই বীমার কিস্তি মেটানোর জন্যই অনাহারে থেকে মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে। অর্থাৎ তাঁর মৃত্যুর পরে পরিবারের জন্য যাতে একটা সংস্থান থাকে। ফলে চিরাচরিত ভদ্রলোক হিসেবে তাঁর সম্মান আরও বেড়ে গেছে … বলা যেতে পারে পরিবারের জন্য শহীদ হয়েছেন। মনে হয় কবরের ভেতর স্বস্তিতে ঘুমোতে পারছেন না! ওঁর এত চেষ্টা সব বিফলে গেল … মা আর রোজ়মেরি আরামের জীবন কাটাচ্ছেন! একদিক দিয়ে দেখতে গেলে, ওঁর মরে যাওয়ায় আমি দুঃখই পেয়েছি, কারণ উনি তো মরতেই চেয়েছিলেন – মরে গিয়ে দায়িত্ব ঘাড় থেকে নামাতে পেরেছেন!”

“এ কথা কেন বলছেন?”

“আসলে কী জানো, লী আত্মসমর্পণ করার দিন থেকেই উনি মরে গেছিলেন। তুমি জানো এই ধরণের মানুষগুলোকে। এই নতুন সময়ে, নতুন পরিবেশে উনি কিছুতেই খাপ খাইয়ে নিতে পারতেন না। সর্বক্ষণ শুধু ফেলে আসা স্বপ্নময় দিন নিয়ে বিলাপ করে যেতেন।”

“আচ্ছা রেট, সব বুড়োমানুষরাই এক রকম?” জেরাল্ডের কথা ভাবতে ভাবতে জিজ্ঞেস করল। উইল কী বলেছিল মনে পড়ে গেল।

“একেবারেই না! তোমার আঙ্কল হেনরিকেই দেখ না – আর ওই বুড়ো, মিস্টার মেরিওয়েদারকে – দুটো নামই শুধু করলাম। হোমগার্ডদের সঙ্গে মার্চ করে বেরিয়ে গেলেন যখন, তখন থেকেই ওঁরা যেন নতুন করে বাঁচতে শিখলেন, আর আমার তো মনে হয়, তখন থেকেই ওঁরা যেন প্রণশক্তিতে ভরপুর যুবক হয়ে উঠেছেন। আজ সকালেই বৃদ্ধ মিস্টার মেরিওয়েদারের সঙ্গে দেখা হল। রেনে’র পাই ওয়াগনটা চালাচ্ছিলেন, আর ঘোড়াটাকে গালাগালি করছিলেন, যেন সেনাবাহিনীর এক কসাই। আমাকে বলছিলেন, পুত্রবধুর প্রশ্রয়ে বাড়ি থেকে বেরোতে পেরে, আর ওয়াগনটা চালিয়ে, বয়স যেন দশ বছর কমে গেছে। আর তোমার আঙ্কল হেনরি, আদালতে এবং আদালতের বাইরে ইয়াঙ্কিদের বিরুদ্ধে, আর বিধবা আর অনাথ মানুষের পক্ষ নিয়ে কার্পেটব্যাগারদের বিরুদ্ধে বিনে পয়সায় জোরদার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। যুদ্ধ যদি না হত, তাহলে উনি হয়ত এতদিনে অবসর নিয়ে বাতে পঙ্গু হয়ে ঘরে বসে থাকতেন। ওঁদের বয়স যেন আবার কমে গিয়েছে, কারণ ওঁদের কাজ ফুরিয়ে যায়নি, আর ওঁরা বুঝতে পারছেন, মানুষজনের ওঁদেরকে প্রয়োজন আছে। ওঁরা এই নতুন দিনকে স্বাগত জানিয়েছেন, কারণ এই দিন ওঁদের মত বৃদ্ধ মানুষদেরও নতুন করে বাঁচতে শিখিয়েছে। তবে অল্প বয়সের অনেক লোকই আছে, যারা আমার বাবা বা তোমার বাবার মত করেই ভাবে। ওরা কিছুতেই নতুন সময়ের সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিতে পারবে না, আর সেই জন্যই অপ্রীতিকর একটা প্রসঙ্গ এসে পড়ছে, যেটা নিয়ে তোমার সঙ্গে আমি আলোচনা করতে চাই, স্কারলেট।”

ওঁকে সহসা প্রসঙ্গ পরিবর্তন করতে দেখে স্কারলেট ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে তোতলাতে শুরু করল, “ক্‌ – কী – ”মনে মনে আর্তনাদ করে উঠল, “হে ভগবান! যে ভয় পেয়েছিলাম, এবার আসছে! একটু তৈলমর্দন করে কি মন গলাতে পারব?”

“তুমি যে রকম লোক, তোমার কাছ থেকে সততা কিংবা ন্যায্য ব্যবহার আশা করা আমার উচিত হয়নি। তবুও বোকার মত আমি তোমায় বিশ্বাস করেছিলাম।”

“বুঝতে পারলাম না আপনি ঠিক কী বলতে চাইছেন।”

“মনে হয় বুঝতে পেরেছ। সে যাই হোক তোমার চোখেমুখেই অপরাধী ভাবটা ফুটে উঠেছে। এই তো কিছুক্ষণ আগে, আইভি স্ট্রীট দিয়ে ঘোড়া চালিয়ে তোমার কাছেই আসছিলাম, হেজের আড়াল থেকে কাকে দেখতে পেলাম জানো? মিসেজ অ্যাশলে উইল্কস! আমি ঘোড়া থামিয়ে ওঁর সঙ্গে কিছুক্ষণ গল্প করলাম।”

“তাই নাকি?”

“হ্যাঁ, বেশ মনোরম কথাবার্তা হল। কথায় কথায় বললেন, শেষ মুহুর্তে আমি যে কনফেডারেসির হয়ে আঘাত হেনেছি, এর জন্য অনেকদিন থেকেই আমাকে জানাতে চাইছিলেন যে উনি আমার বীরত্বকে কতটা সম্মান করেন।”

“নিকুচি করেছে! মেলি আসলে এক নম্বরের বোকচন্দর! সেই রাতে আপনার বীরত্ব দেখানোর চক্করে, ও মরেও যেতে পারত!”

“উনি হয়ত ভেবে থাকতে পারেন, ওঁর জীবন একটা মহৎ কাজের জন্য বলিপ্রদত্ত হত। তারপর আমি যখন জিগ্যেস করলাম, অ্যাটলান্টাতে উনি কী করছেন, তখন আমার অজ্ঞতায় যারপরনাই অবাক হলেন। জানালেন যে এখন ওঁরা অ্যাটলান্টাতেই থাকছেন, কারণ তুমি মহানুভবতা দেখিয়ে অ্যাশলেকে তোমার মিলের অংশীদার করে নিয়েছ।”

“তাতে কী হল?” স্কারলেট রুক্ষভাবে বলল।

“টাকাটা তোমায় যখন ধার দিয়েছিলাম, একটা শর্ত রেখেছিলাম, আর তুমিও সেই শর্ত মেনে নিয়েছিলে। শর্তটা ছিল এই যে এই টাকা কোনোভাবেই অ্যাশলে উইল্কসের সহায়তা করবার জন্য ব্যবহার করা যাবে না।”

“আপনি কিন্তু পায়ে পা দিয়ে ঝগড়া করছেন। ধার আমি শোধ করে দিয়েছি, তাই মিলটাও এখন আমার। আমার মিল নিয়ে আমি কী করি সেটা আমার ব্যাপার।”

“একটু বুঝিয়ে বল তো, যে টাকা দিয়ে আমার ধার শোধ করলে, সেটা এল কোথা থেকে?”

“কেন, চেরাই কাঠ বেচে সেই টাকা আমি রোজগার করেছি।”

“ব্যবসা শুরু করবার জন্য যে টাকাটা তোমাকে ধার দিয়েছিলাম, তুমি সেই টাকা খাটিয়ে তুমি ওই টাকাটা রোজগার করেছ। এটাই বলতে চাইছ তো? তাহলে আমার টাকাই অ্যাশলের সাহায্যের জন্য ব্যবহার হল কিনা? তুমি হলে একজন মর্যাদাবোধহীন মহিলা। আমার টাকাটা যদি শোধ না দিয়ে থাকতে, তাহলে এই কথাটাই চীৎকার করে সবাইকে জানিয়ে, নিলামে তোমাকে বিক্রি করে ছাড়তাম!”

কথাগুলো খুব হালকাভাবে বললেও, চোখ থেকে ওঁর রাগ ঠিকরে পড়ছিল।

স্কারলেট ঝটিতি লড়াইটা শত্রুপক্ষের শিবিরে নিয়ে গেল।

“অ্যাশলেকে এত ঘৃণা করেন কেন আপনি? আমার বিশ্বাস আপনি ওকে নিয়ে হিংসেয় জ্বলে যান!”

কথাটা বলে ফেলেই জিভ কামড়ালো , কারণ উনি এক ঝাঁকানিতে মাথাটা পেছনে নিয়ে গিয়ে হাসতে শুরু করলেন। হেসেই চললেন, যতক্ষণ না স্কারলেট রাগে অপমানে লাল হয়ে উঠল।

“তার মানে মর্যাদাবোধহীনতার সঙ্গে সঙ্গে আত্মশ্লাঘাও জুড়ে গেল,” রেট বললেন। “কাউন্টির আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু থেকে তুমি কি কোনোদিন বেরিয়ে আসতে পারবে? ধরেই নিয়েছ যে তোমার জাদু করার অফুরন্ত ক্ষমতা, আর প্রতিটি পুরুষমানুষ তোমার প্রেমে হাবুডুবু খাবার জন্য মুখিয়ে আছে।”

“মোটেই না!” রাগে স্কারলেট চেঁচিয়ে উঠল। “কেন যে আপনি অ্যাশলেকে এত ঘেন্না করেন, সে আমার বোধগম্য হয় না। সেই জন্যই আপনার এরকম মনে হয়!”

“অন্য কোনও বাহানা খোঁজো, হে কুহকিনী। যে কারণ দেখালে সেটা ধোপে টিকবে না। অ্যাশলেকে ঘৃণা করি – ওকে আমি ঘেন্নাও করি না, পছন্দও না। সত্যি বলতে কী, ওকে আমি করুণা ছাড়া আর কিছুই করি না।”

“করুণা?”

“ঠিক, তাচ্ছিল্য মেশানো করুণা বলতে পার। একবার রোঁয়া ফুলিয়ে বলেই ফেল যে অ্যাশলে আমার মত হাজারটা কুলাঙ্গারের চেয়ে অনেক বেশি মূল্যবান, ওকে করুণা করার বা তাচ্ছিল্য দেখানোর হকই আমার নেই। তোমার রাগ একটু পড়লে বোঝাতে চেষ্টা করব আমি ঠিক কী বলতে চাইছি। অবশ্য, তুমি যদি শুনতে চাও।”

“আমার শোনার কোনও ইচ্ছেই নেই।”

“তবুও আমি বলবই, কারণ আমার ঈর্ষা নিয়ে তোমার এই ভ্রান্ত বিলাসিতায় ভেসে চলা আমার আর বরদাস্ত হচ্ছে না। ওকে করুণা করি, কারণ ওর মরে যাওয়া উচিত ছিল, কিন্তু মরেনি। ওকে তাচ্ছিল্য করি কারণ ওর স্বপ্নময় জগতটা হারিয়ে গেলেও, ওর কী করা উচিত সেটাই ও ভেবে উঠতে পারেনি।”

ওঁর কথাগুলো কেমন যেন চেনা চেনা লাগছে। ঠিক এই ধরণের কথা আগেও শুনেছে, কিন্তু কবে শুনেছে, কোথায় শুনেছে মনে পড়ল না। তবে রাগ এখনও পড়েনি, তাই মনে করবার জন্য খুব চেষ্টা করল না।

“আপনার মর্জিমাফিক সব কিছু হলে তো দক্ষিণের সব ভালমানুষকেই মরে যেতে হত!”

“আর যদি সব কিছু ওদের মর্জিমাফিক চলতে পারত, মনে হয় অ্যাশলের মতন মানুষেরা মরেই যেতে চাইত। কবরের ওপর সুন্দর করে লেখা থাকত, “এখানে ঘুমিয়ে আছেন কনফেডারেসির একজন সৈনিক, স্বাধীন দক্ষিণদেশের জন্য যিনি শহীদ হয়েছিলেন”, কিংবা ধর, “Dulce et decorum est—“১ বা অন্য কোনও লোকায়ত সমাধিলিপি।”

“আমি সহমত হতে পারলাম না!”

“বড় বড় হরফে লিখে তোমার নাকের সামনে না ধরলে তো তুমি কিছুই দেখতে পাও না, ঠিক কিনা? আরে, মরে গেলে তো ওরা বেঁচেই যেত, এমন কোনো ঝামেলায় পড়তে হত না যার সুরাহা নেই। তার ওপরে আবার বহু প্রজন্ম ধরে ওদের পরিবারের লোকেদের গর্বে মাটিতে পা পড়ত না। শুনেছি, যারা মরে গেছে তারা খুবই সুখে আছে। তোমার কি মনে হয় অ্যাশলে উইল্কস খুব সুখে আছে?”

“কেন থাকবে না – ” বলতে আরম্ভ করেই আজকাল অ্যাশলের চোখে যে উদ্ভ্রান্ত দৃষ্টি দেখতে পায়, সেটা মনে পড়তেই থমকে গেল।

“আচ্ছা ও কি সুখী, না হিউ এলসিং সুখী, নাকি ডঃ মীড? আমার কিংবা তোমার বাবা যেরকম সুখে ছিলেন, তার থেকেো বেশি সুখী?”

“{তা বলতে পারেন, যতটা সুখী হলেও হতে পারতেন, ততটা নন, কারা ওঁরা সকলেই তো যাবতীয় টাকাকড়ি খুইয়ে বসেছিলেন।”

উনি হেসে উঠলেন।

“টাকাকড়ি খুইয়ে বসাটা বড় ব্যাপার নয়, বাছা। বলি শোনো, ওঁরা ওঁদের পরিচিত দুনিয়াটাই হারিয়ে ফেলেছেন – যে দুনিয়াতে ওঁরা বড় হয়ে উঠেছিলেন। ওঁদের অবস্থাটা এখন অনেকটা ডাঙ্গায় তোলা মাছের মত কিংবা পক্ষীরাজ ঘোড়ার মত২। বিশেষ এক মানসিকতা নিয়ে ওঁরা বড় হয়ে উঠেছিলেন, বিশেষ কিছু কর্মপন্থা অবলম্বন করতে পারবেন বলে আশা করেছিলেন, বিশেষ একটা বাতাবরণকে আঁকড়ে ধরে জীবনযাপন করবেন বলে ভেবেছিলেন। কিন্তু যেদিন জেনারাল লী অ্যাপম্যাটক্সে পদার্পণ করলেন সেই সব মানসিকতা, সেই সব কর্মপন্থা, সেই বাতাবরণ চিরতরে হারিয়ে গেল। ওমন বোকার মত মুখ করে চেয়ে থেকো না, স্কারলেট! কী করবে এখন অ্যাশলে উইল্কস যখন ওর মাথার ওপর থেকে ছাদটা চলে গেছে, খাজনা বকেয়া থাকার জন্য অল্যান্টেশনটাও চলে গেছে, আর নিপাট ভালমানুষরা সস্তায় বিকিয়ে যেতে বাধ্য হচ্ছেন? কাজ করবেন কোনটা দিয়ে – মাথা না হাতদুটো – কোনটা দিয়ে? বাজি ধরে বলতে পারি, ওর হাতে মিলটা ছেড়ে দেওয়ার পর থেকে তুমি লোকসানের পর লোকসান করে চলেছ।”

“একেবারেই না!”

“খুবই আনন্দের কথা। তা কোনো রবিবার সন্ধ্যেবেলা তুমি যখন ফাঁকা থাকবে, তোমার খাতাপত্রে একটু চোখ বোলাতে পারি?”

“আপনি বরং শয়তানের কাছে যান, আপনাকে দেওয়ার মত সময় আমার নেই। এখন আপনি মানে মানে বিদেয় হন তো দেখি।”

“বাছা, শয়তানের কাছ থেকেই ঘুরে এলাম তো, ব্যাটা একেবারেই মাটো। আর ওর কাছে যাচ্ছি না, তোমার জন্যে হলেও না – টাকার জন্য যখন তুমি মরিয়া হয়ে পড়েছিলে, আমার কাছ থেকে ধার নিয়েছিলে, আর কাজেও লাগিয়েছিলে। টাকাটা তুমি কীভাবে ব্যবহার করতে পারবে সেটা নিয়ে আমাদের মধ্যে একটা চুক্তি হয়েছিল, তুমি সেই চুক্তি ভঙ্গ করেছ। একটা কথা মনে রেখো, আমার চাঁদমুখ ঠগ, সময় আসবে যখন আমার কাছ থেকে আবার ধার নেবার দরকার পড়বে। অবিশ্বাস্য রকমের কম সুদে তুমি চাইবে আমি তোমাকে টাকা ধার দিই, যাতে তুমি আরও মিল, আরও খচ্চর কিনতে পার, নতুন নতুন পানশালা গড়তে পার। সে গুড়ে বালি।”

“দরকার পড়লে ব্যাঙ্ক থেকে ধার নেব, বুঝেছেন মশাই,” কথাটা শীতল কণ্ঠে বলল, কিন্তু বুক ঠেলে একরাশ আক্রোশ বেরিয়ে আসতে চাইছে।

“তাই বুঝি? একবার চেষ্টা করে দেখই না। ব্যাঙ্কে আমার প্রভূত অর্থ লগ্নী করা আছে।”

“তাই বুঝি?”

“অবশ্যই, কারণ কোনো কোনো সাধু উদ্যোগেও আমি আগ্রহ রাখি।”

“আরও অনেক ব্যাঙ্ক আছে – ”

“বিস্তর আছে। যদি পারি, এমন বন্দোবস্ত করব যাতে শত মাথা কুটলেও কারো কাছ থেকে এক পয়সাও ধার না পাও। টাকার দরকার পড়লে যেও এবার থেকে কার্পেটব্যাগ সুদখোর মহাজনদের কাছে।”

দরকার পড়লে তাই না হয় যাব।”

“সে তুমি নিশ্চয়ই যেতে পার, তবে যখন ওদের সুদের হার জানতে পারবে, তোমার মাথায় বাজ পড়বে। সুন্দরি, কারবার করতে গিয়ে তঞ্চকতার আশ্রয় নিলে তার খেসারৎ দিতে হয়। কপটতা তুমি আমার সঙ্গে না করলেই পারতে।”

“আপনার ভারি দেমাক, তাই না? অনেক টাকাকড়ি আপনার, অনেক ক্ষমতা, তবুও আপনি আমার আর অ্যাশলের মত ভেঙ্গে পড়া মানুষদের পেছনে লাগতে ছাড়েন না!”

“নিজেকে ওর সঙ্গে এক সারিতে রেখো না। তুমি ভেঙ্গে পড়া মানুষ নও। কোনো পরিস্থিতিতেই তুমি ভেঙ্গে পড়বার বান্দা নও। আর ও সত্যি সত্যি একজন ভেঙ্গে পড়া মানুষ, এবং পেছন থেকে উৎসাহী কোনও মানুষ যদি আজীবন ওকে সুপরামর্শ না দেয়, সুরক্ষা না দেয়, তবে ও কোনোদিন মাথা তুলে দাঁড়াতেই পারবে না। এরকম একজন মানুষের পেছনে আমার টাকা খরচ হোক, সেটা আমার না-পসন্দ।”

“কই, আমি যখন ভেঙ্গে পড়েছিলাম, আমাকে সাহায্য করতে তো আপনার বাধেনি, আর – ”

“তোমার ওপর বাজি রাখা যায়, প্রিয়ে, আর খুবই মজাদার ছিল সেই বাজি। কেন? তার কারণ তুমি তোমার পুরুষ আত্মীয়দের কাঁধে সওয়ার হয়ে হারিয়ে যাওয়া দিনগুলোর জন্য হাত পা ছড়িয়ে কাঁদতে বসনি। উলটে তুমি ঘুরে দাঁড়িয়ে একজন মৃত মানুষের ওয়ালেট থেকে চুরি করা টাকা আর কনফেডারেসির কাছ থেকে চুরি করা টাকা দিয়ে তোমার অদৃষ্টকে দৃঢ় অর্থনৈতিক বনিয়াদের ওপর দাঁড় করিয়ে ফেলেছ। একটা খুন করার, অন্যের বরকে চুরি করার, ব্যাভিচারে লিপ্ত হবার চেষ্টার, মিথ্যার আশ্রয় নেওয়ার, অনৈতিক লেনদেনের, ছলচাতুরী করে লোক ঠকানোর – এরকম কত রকমের কৃতিত্ব তোমার ঝুলিতে সঞ্চয় হয়ে আছে তার ইয়ত্তা নেই। সবটুকুই প্রশংসার দাবি রাখে। এর থেকেই আন্দাজ করে নেওয়া যায় তুমি অত্যন্ত করিতকর্মা এবং দৃঢ়চিত্ত ব্যক্তিত্ব – তোমার ওপর টাকা লাগানোর ঝুঁকি নেওয়াই যায়। আর যে মানুষ নিজের বোঝা নিজেই বইতে সক্ষম তাকে সাহায্য করতে পারার সুযোগ পাওয়াটা খুবই আনন্দের ব্যাপার। স্বাধীনচেতা প্রবীণা মিসেজ় মেরিওয়েদারকে আমি ওঁর মুখের কথায় দশ হাজার ডলার ধার দিয়ে দিতে পারি। এক ঝুড়ি পাই দিয়ে শুরু করেছিলেন, আর আজ ওঁর অবস্থা দেখ! ওঁর বেকারিতে জনা ছয়েক লোক কাজ করছে, ডেলিভারি ওয়াগন চালিয়ে বৃদ্ধ গ্র্যান্ডপা খুবই আনন্দে আছেন, আর ওই ছোটখাটো আলসে ক্রেওল, রেনে, খুব পরিশ্রম করছে, এবং ভালবেসেই করছে ... আর ওই বজ্জাত টমি ওয়েলবার্নকেই দেখ না – অর্ধেক শরীর নিয়ে দুজন মানুষের কাজ উদ্ধার করছে – আর খুব ভালভাবেই করছে, অথবা ধর – না থাক, অযথা বকবক করে তোমাকে বিরক্ত করে তুলতে চাই না।”

“সত্যি সত্যি বিরক্তবোধ করছি। বিরক্তিবোধ থেকে মেজাজটা ক্রমেই গরম হয়ে উঠছে,” বিরক্ত গলায় স্কারলেট বলল, মনে একটা ক্ষীণ আশা, রাগিয়ে দিয়ে যদি অ্যাশলের সতত অপ্রীতিকর প্রসঙ্গ থেকে ওঁকে বের করে আনা যায়। কিন্তু উনি মুচকি হাসলেন এবং টোপটা গিললেন না।

“এঁদের মত মানুষ সত্যিই সাহায্য পাওয়ার যোগ্য। তবে অ্যাশলে উইল্কস – ছোঃ! আমাদের এই উল্টেপাল্টে যাওয়া দুনিয়াতে ওদের জাতের মানুষের কোনও দামই নেই। পৃথিবীতে যখন প্রলয় আসে, এই জাতের মানুষরাই সবচেয়ে আগে ধ্বংস হয়ে যায়। যাবে নাই বা কেন? এদের বেঁচে থাকার অধিকারই নেই, কারণ এরা লড়াই করবে না – কী করে লড়াই করতে হয় সেটাই এরা জানে না। পৃথিবীতে এটাই প্রথম ওলটপালট নয়, এবং এটাই যে শেষ, তাও নয়। আগেও এরকম ঘটনা ঘটেছে, ভবিষ্যতে আরও ঘটবে। আর যখন এরকম ঘটে, তখন সকলেই সর্বস্ব হারায়, সবাই একই সমতলে অবতীর্ণ হয়। আর ওদের সবাইকেই আবার শূন্য থেকেই শুরু করতে হয়েছে, কেঁচে গণ্ডূষ করতে হয়েছে। অর্থাৎ ওরা কেবল মাত্র বুদ্ধি খাটিয়েছে আর গায়ের জোরকে কাজে লাগিয়েছে। কিন্তু কিছু কিছু লোক আছে, এই অ্যাশলের মত, যাদের না আছে মাথা খাটানোর মত বুদ্ধি, না আছে গায়ের জোর, বা এগুলোকে কাজে লাগানোর মত ইচ্ছে। ফলে ওদের পতন হতে থাকে, হতেই থাকে। এটাই স্বাভাবিক নিয়ম, আর এরা না থাকলেই দুনিয়ার মঙ্গল। তবে কিছু দুঃসাহসী কিছু মানুষ সর্বদাই থাকে, আর একটু সময় পেলেই, ঠিক ঘুরে দাঁড়ায় আর দুনিয়া ওলটপালট হবার আগের অবস্থায় পৌঁছে যায়।”

“নিঃস্ব তো আপনিও ছিলেন! এই একটু আগেই তো বললেন, আপনার বাবা আপনাকে কপর্দকশূন্য অবস্থায় বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিলেন!” স্কারলেট ভীষণ রেগে উঠে বলল। “আমার মনে হয় অ্যাশলের অবস্থাটা বুঝে ওর প্রতি সহানুভূতি পোষণ করা উচিত আপনার!”

“অবস্থাটা আমি অবশ্যই বুঝতে পারি, রেট বললেন, “তবে সহানুভূতি পোষণ করতে আমার বয়েই গেছে। বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার সময় আমার যেটুকু সম্বল ছিল, অ্যাশলের তার চাইতে অনেক বেশি ছিল। অন্তত ওর বান্ধুবান্ধব ছিল যারা ওকে আশ্রয় দিয়েছিল, আর আমি তো ছিলাম একঘরে। কিন্তু অ্যাশলে নিজের চেষ্টায় কী করে উঠতে পেরেছে?”

“কী এত দেমাক আপনার যে ওকে নিজের সঙ্গে তুলনা করার ধৃষ্টতা দেখাচ্ছেন – ঈশ্বরকে ধন্যবাদ যে ও আপনার মত নয়! কার্পেটব্যাগার, স্ক্যালাওয়াগ আর ইয়াঙ্কিদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে অর্থোপার্জন করে আপনার মত ও নিজের হাত নোংরা করবে না। অ্যাশলে অত্যন্ত খুঁতখুঁতে স্বভাবের মানুষ আর ওর মর্যাদাবোধ আছে!”

“তবে একজন নারীর কাছ থেকে অনুগ্রহ আর ার্থিক আনুকূল্য গ্রহণ করার মত ব্যাপারে তেমন খুঁতখুঁতে নয়, আবার মর্যাবোধেও আঘাত লাগে না।”

“আর কী করতে পারত ও?”

“সে আমি বলবার কে? আমি কী করেছি সেটুকুই শুধু আমি জানি, যখন আমাকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল এবং আজকাল, এই দুটো ক্ষেত্রেই। আমি সেটুকুই শুধু জানি যা অন্যান্য পুরুষমানুষরা করেছিল। আমরা সুযোগের সন্ধান পেয়ে সেটাকে কাজে লাগিয়েছি, কেউ সৎ ভাবে, কেউ বা অসৎ পথে, এবং এখনও সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার করে চলেছি। কিন্তু এই দুনিয়ার অ্যাশলেদেরও সমান সুযোগ রয়েছে, কিন্তু সেটা ওরা গ্রহণ করে না। ওরা একেবারেই চলতাপুর্যা নয়, স্কারলেট, আর একমাত্র চলতাপুর্যা লোকেরই টিকে থাকার অধিকার আছে।”

ওঁর কথাগুলো আর কানে ঢুকছিলই না, কারণ ঊনি কথা বলতে আরম্ভ করার মিনিট কয়েক আগেই যে স্মৃতিটা অস্পষ্টভাবে ওর মনে খচখচ করছিল, সেটা হঠাৎ স্পষ্ট রূপ ধারণ করে ফেলেছে। মনে পড়ে গেল টারার আঙুরের ঝোপের ওপর ঠাণ্ডা হাওয়া ঝাপট দিচ্ছে, ডাঁই করা কাঠের গোছার সামনে অ্যাশলে দাঁড়িয়ে, স্কারলেটকে ছাড়িয়ে ওর দৃষ্টি সুদূরে হারিয়ে গেছে। আর ও বলে উঠল – কী যেন কথাটা বলল? বিজাতীয় – বিদেশি একটা শব্দ –অশুভ ইঙ্গিতবহ একটা শব্দ – পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে, এরকম সব কথা বলছিল। সেদিন ওর কথার তাৎপর্য বুঝতেই পারেনি, কিন্তু এখন সহসা বোধোদয় হয়ে বিভ্রান্ত লাগছে, দুশ্চিন্তা আর ক্লান্তি এসে ওকে ঘিরে ধরছে।

“হ্যাঁ, অ্যাশলেও যেন এরকম কিছু বলছিল – ”

“কী বলছিল?”

“একবার টারাতে বলেছিল কী যেন – দেবতাদের প্রদোষকাল আর পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে এই জাতীয় কিছু বোকা বোকা কথা।”

“বুঝেছি, গটেরড্যামেরুঙ!” রেটের দৃষ্টি কৌতুহলে তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল। “এছাড়া আর কী বলেছিল?”

“উহুঁ, আমার ঠিক মনে নেই। খুব মনে দিয়ে শুনিওনি। তবে হ্যাঁ, শক্তিশালী লোকেরা জিতে যাবে আর দুর্বলরা বাতিল হয়ে যাবে, এই রকম কিছু।”

“অতএব, ওর জানা আছে। আর এর জন্যই ব্যাপারটা ওর কাছে আরও বেশি পীড়াদায়ক হয়ে উঠেছে। তবে না জানার দলটাই ভারি, আর ওরা কোনোদিন জানতেও পারবে না। সারা জীবন ধরে ওরা বিস্মিত মনে ভেবেই যাবে, হারিয়ে যাওয়া মুহূর্তগুলো কোথায় অদৃশ্য হয়ে গেল। মিথ্যে দম্ভের বেড়াজালে বন্দী হয়ে ওরা নীরবে জ্বলেপুড়ে শেষ হয়ে যাবে। ও জানে যে ও বাতিলদের দলে চলে যাচ্ছে।”

“ণা, ও মোটেই বাতিলদের দলে চলে যাচ্ছে না! অন্তত আমার দেহে যতক্ষণ প্রাণ আছে, আমি সেটা কিছুতেই হতে দেব না।”

উনি শান্ত চোখে স্কারলেটের দিকে তাকালেন, তামাটে মুখটা ভাবলেশহীন, মসৃণ।

“আচ্ছা, স্কারলেট, তুমি ওকে অ্যাটলান্টায় এসে মিলটা সামলানোর জন্য রাজি করালে কী করে? তোমাকে নিরস্ত করার জন্য ও কি খুব জোরদার লড়াই করার চেষ্টা করেছিল?”

জেরাল্ডের অন্ত্যেষ্টির পর অ্যাশলের প্রতিবাদী মুখটা মনে ভেসে উঠল, ও সেটা মন থেকে সরিয়ে দিল।

“কেন? মোটেই করেনি,” ক্ষুব্ধ গলায় ও বলে উঠল। “আমি যখন ওকে বুঝিয়ে বললাম যে ওর সাহায্য আমার খুব দরকার, কারণ মিলটা চালানোর ব্যাপারে ওই অপদার্থটার ওপর আমি ভরসা করতে পারছি না, আর ফ্র্যাঙ্ক নিজেও এত ব্যস্ত যে উনি আমাকে সাহায্য করবার অবস্থায় নেই, তাছাড়া আমার তখন যা অবস্থা – মানে, এলা লরেনার ব্যাপারটাও ছিল, বুঝতেই পারছেন। ও খুশি হয়েই আমাকে সাহায্য করতে রাজি হয়ে গেল।”

“সত্যি, মাতৃত্বের আবেদন পাষাণ হৃদয়কেও গলিয়ে দিতে পারে! তার মানে এই ছুতো দিয়েই ওকে তুমি পথে আনতে পেরেছো। বেশ কথা, ঠিক যেখানে চেয়েছিলে, সেখানেই ওকে পেয়ে গেলে, বেচারা, তোমার মহত্বের শেকলে বাঁধা পড়ে গেল, ঠিক যেমন তোমার কয়েদি শ্রমিকরা লোহার শেকলে বাঁধা পড়ে আছে। আনন্দে থাকো তোমরা। তবে, আলোচনার শুরুতেই যেটা বলে দিয়েছি, তোমার যে কোনো অ-নারীসুলভ উদ্যোগের জন্য ভবিষ্যতে আমার কাছ থেকে আর এক পয়সাও আশা কোরো না, হে ছলনাময়ী।”

মাথায় আগুন জ্বলছে, সাথে সাথে দুর্ভাবনাও হচ্ছে। কিছুদিন ধরেই রেটের কাছ থেকে কিছু টাকা ধার নেবার মতলব করছে, শহরের ভেতরে একটা জায়গা কিনে চেরাই কাঠের গুদাম বানানোর জন্য।

“আপনার টাকা ছাড়াও আমার চলে যাবে,” ও চেঁচিয়ে উঠল। “জনি গ্যালাঘারের মিল থেকে আমি টাকা করছি, কারণ আমি মুক্তি পাওয়া ডার্কিদের দিয়ে কাজ করাচ্ছি না, আর বন্ধকের কারবারেও কিছু টাকা লাগিয়েছি, আর সুদের কারবার করেও স্টোর থেকে প্রচুর টাকা কামাচ্ছি।”

“শুনেছি বটে। অসহায়, বিধবা, অনাথ আর অজ্ঞ লোকদের লুটবার বেশ ভাল ধান্ধা ফেঁদে নিয়েছ! কিন্তু লুটতে যদি হয়ই, স্কারলেট, গরীবগুর্বো আর দুর্বল লোকদের না লুটে ধনী আর শক্তিশালী লোকদের লুটছ না কেন? রবিন হুডের সময় থেকে আজও এই ধরণের লুটকে খুবই ন্যায়পরায়ণ বলে মানা হয়।

“কারণ,” স্কারলেট চটে গিয়ে বলল, “এই আপনি যাদের গরীবগুর্বো বলছেন – তাদের লুট করা অনেক সোজা, আর নিরাপদও।”

উনি নীরবে হাসলেন, কাঁধ ঝাঁকিয়ে।

“জোচ্চর হলে কী হয়, কবুল করে নেওয়ার সৎসাহস তোমার আছে, স্কারলেট!”

জোচ্চর! আশ্চর্য, কথাটা গায়ে বিঁধছে যেন। ও মোটেই জোচ্চর নয়, প্রবলভাবে মনে মনে নিজেকে বোঝাল। অন্তত এটা তো ও হতে চায়নি। একজন মহান নারী হতে চেয়েছিল ও। ক্ষণেকের জন্য ওর মন দ্রুতগতিতে অতীতে পাড়ি দিল, মায়ের চেহারাটা ভেসে উঠল, স্কার্টের কুঁচির মধুর আন্দোলন তুলে আর সুগন্ধির মৃদু সৌরভ ছড়িয়ে চলেফিরে বেড়াচ্ছেন, ওঁর ছোটছোট দুই হাত নিরলসভাবে অন্যের সেবায় নিয়োজিত, সকলেই ভালবাসে, শ্রদ্ধা করে, প্রশংসা করে। সহসা ও অসুস্থ বোধ করল।

“যদি আমাকে শয়তানির অপবাদ দিতে চান,” ক্লান্তস্বরে বলে উঠল, “কোনো লাভ নেই। আমি জানি – যতটা নীতিপরায়ণ আমার হওয়া উচিত, সেটা আজকাল আমি হতে পারছি না। দয়ালু আর হাসিখুশি হওয়ার যে শিক্ষা আমি ছোটবেলা থেকে পেয়েছি, সেটাও আমি হতে পারছি না। কিন্তু আমার উপায় নেই, রেট। সত্যিই আমার উপায় নেই। কী এমন করতে পারতাম আমি? আমার কী হত, ওয়েডের কী হত, টারার কী হত, আমাদের সবার কী হত, যদি আমি – ইয়াঙ্কিরা যখন টারার ওপর হামলা করেছিল – ওদের সঙ্গে ভদ্র ব্যবহার করতাম? সেটাই হয়ত উচিত ছিল, কিন্তু আমি সেটা নিয়ে ভাবতেই চাই না। আর যখন জোনাস উইল্কারসন আমাদের বসতবাটি দখল করতে এল – ধরুন আমি দয়া দেখাতাম, নীতিপরায়ণতা দেখাতাম? আজ কোথায় থাকতাম আমরা? আর আমি যদি ফ্র্যাঙ্কের মিষ্টি স্বভাবের সরল বউ হয়ে বকেয়া আদায়ের জন্য ঘ্যানঘ্যান না করতাম – ঠিক আছে, আমি না হয় জোচ্চরই, কিন্তু চিরকাল আমি জোচ্চর থাকব না, রেট। এই গত কয়েক বছরে – এবং এখনও – আমি আর কীইবা করতে পারতাম? অন্য কীভাবে সব কিছু সামলে নিতাম? আমার খালি মনে হয় বিশাল তুফানের মধ্য দিয়ে আমি মাল বোঝাই একটা নৌকা নিয়ে নদী পেরনোর চেষ্টা করছি। আমি প্রাণপণে ভেসে থাকার চেষ্টা করে যাচ্ছি, তুচ্ছ ব্যাপার নিয়ে মাথা ঘামানোর সময়ই নেই, যেসব ব্যাপার আমি সহজেই বর্জন করতে পারি অথচ কিছুই এসে যাবে না, যেমন ভদ্র ব্যবহার আর – আর – এই ধরণের ব্যাপার-স্যাপারগুলো। নৌকাডুবি হয়ে যেতে পারে – এই ভয়টা আমায় কুরে কুরে খাচ্ছে, তাই ফালতু জিনিস সমুদ্রে ছুঁড়ে ফেলে নৌকাটা হালকা করে নিয়েছি।”

“গর্ব আর মর্যাদাবোধ আর মহানুভবতা আর করুণা,” মসৃণ গলায় বিড়বিড় করে রেট একে একে বলে গেলেন। “ঠিকই বলেছ, স্কারলেট। মৌকাডুবি হওয়ার মত অবস্থায় ওসবের কোনও মূল্যই নেই। তবু আশেপাশে তোমার বন্ধুবান্ধবদের দিকে একটু নজর করে দেখ। হয় ওরা ডুবে যাওয়ার হাত থেকে সমস্ত পণ্য রক্ষা করে নৌকা ঘাটে ভিড়িয়ে ফেলেছে, অথবা ঝাণ্ডা উঁচিয়ে রেখে নির্দ্বিধায় ডুবে গেছে।”

“বোকার হদ্দ ওরা,” এক নিঃশ্বাসে স্কারলেট বলে উঠল। “সব কিছুরই একটা সময় আছে। যখন আমার অনেক টাকা হবে, আপনি যেমন চাইবেন, আমি তেমনটাই ভাল হয়ে যাব। আমার মুখ থেকে মধু ছাড়া আর কিছু ঝরবে না। তখন এই সব বিলাসিতা করার সামর্থ্য অর্জন করে ফেলব।”

“সামর্থ্য আছে তোমার – কিন্তু কাজে লাগতে দেবে না। সমুদ্রে ছুঁড়ে ফেলা মালপত্র উদ্ধার করা খুবই শক্ত, আর উদ্ধার যদি বা করা যায়, সেগুলো অপূরণীয়ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে গেছে। আর যতদিনে তোমার ছুঁড়ে ফেলা সুনাম, মহানুভবতা আর করুণা উদ্ধার করার সামর্থ্য হবে, ততদিনে ওই সব মূল্যবোধের আমূল পরিবর্তন ঘটে যাবে, আর আমার ভয় হয় সেই পরিবর্তন হয়ত মহান এবং অদ্ভুত কিছু – ”

সহসা উঠে দাঁড়িয়ে টুপিটা হাতে তুলে নিলেন।

“চললেন আপনি?”

“হ্যাঁ। খুব স্বস্তি পেলে, তাই না? তোমার বিবেকের যেটুকু এখনও বেঁচে আছে, তারই ভরসায় তোমাকে রেখে গেলাম।”

মুহূর্তের জন্য থেমে গিয়ে বাচ্চাটার দিকে চাইলেন, ওর আঁকড়ে ধরার জন্য একটা আঙ্গুল বাড়িয়ে দিলেন।

“ধরে নিতে পারি কি ফ্র্যাঙ্ক গরবে ফেটে পড়ছেন?”

“অবশ্যই।”

“বাচ্চাকে নিয়ে অনেক রকম স্বপ্ন দেখছেন নিশ্চয়ই?”

“হ্যাঁ, জানেনই তো পুরুষমানুষরা নিজেদের সন্তানদের নিয়ে কী রকম আদিখ্যেতা করে থাকে।”

“তাহলে ওঁকে বলে দিও,” বলেই রেট থেমে গেলেন, চোখে এক অদ্ভুত চাউনি, “ওঁকে বলে দিও, যদি বাচ্চাকে নিয়ে ওই সব স্বপ্ন সাকার হওয়া দেখতে চান, তাহলে রাত্তিরে যেন এখনকার চাইতেও আরও বেশি করে বাড়িতেই থাকেন।”

“কী বলতে চাইছেন আপনি?”

“ঠিক যেটা বললাম। ওঁকে বোলো বাড়িতে থাকতে।”

“কতটা নীচ মন আপনার! সাদাসিধে ফ্র্যাঙ্কের নামে এরকম বদনাম দেওয়া – ”

“হে ভগবান!” রেট অট্টহাস্য করে উঠলেন। “উনি মহিলাদের সঙ্গে ফষ্টিনষ্টি করে বেড়াচ্ছেন, এই কথা কখন বললাম! ফ্র্যাঙ্ক! হায় কপাল!”

হাসতে হাসতেই উনি সিঁড়ি বেয়ে নেমে গেলেন।


টীকা :
১. Dulce et decorum est—’ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ইংরেজ কবি উইলফ্রেড ওয়েনের লেখা একটি কবিতার শিরোনাম। এটি একটি লাতিন বাক্যাংশ যার অর্থ ‘ইহা সুন্দর এবং সঙ্গত’।
২. পক্ষীরাজ ঘোড়ার মত – অর্থাৎ যার কোনও অস্তিত্বও নেই। উপন্যাসের Cat with wings এই idiom ব্যবহার করা হয়েছে।
৩. গটেরড্যামেরুঙ – ঈশ্বরের পতন/ ইন্দ্রপতন (জার্মান শব্দ, যার অর্থ হল ঈশ্বরের জীবনসন্ধ্যা)

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ