পাঁচটা দিন একটানা টেলিভিশনের সামনে বসে রইল সে। ধসে পড়া ব্যাংক আর হাসপাতাল, গোটা দোকানপাড়া আগুনে জ্বলছে, রেললাইন আর মোটরওয়ে ছিঁড়ে গেছে—এসব দেখতে লাগল। একটা কথাও বলল না। সোফার কুশনে গা ডুবিয়ে, মুখ বন্ধ করে বসে রইল। কোমুরা কথা বললে জবাব দিল না। মাথা নাড়ল না, ঘাড়ও নাড়ল না। তার গলার আওয়াজ আদৌ কানে পৌঁছাচ্ছে কিনা কোমুরা বুঝতে পারছিল না।
কোমুরার স্ত্রী উত্তরের ইয়ামাগাতা থেকে এসেছিল। কোবেতে তার কোনো বন্ধু বা আত্মীয় ছিল বলে কোমুরার জানা ছিল না। তবু সে সকাল থেকে রাত টেলিভিশনের সামনে বসে থাকল। অন্তত তার সামনে সে কিছু খেল না, জলও খেল না, শৌচাগারেও গেল না। মাঝে মাঝে রিমোটে চ্যানেল বদলানো ছাড়া প্রায় নড়লই না।
কোমুরা নিজে টোস্ট আর কফি বানিয়ে অফিস চলে যেত। সন্ধ্যায় ফিরে ফ্রিজে যা পেত তাই দিয়ে একা খেত। রাতের শেষ খবর দেখতে দেখতে সে ঘুমিয়ে পড়ত, স্ত্রী তখনও টেলিভিশনের দিকে তাকিয়ে। নীরবতার একটা পাথরের দেওয়াল তাকে ঘিরে ধরেছিল। কোমুরা সে দেওয়াল ভাঙার চেষ্টা ছেড়ে দিল।
ষষ্ঠ দিন, রবিবার, অফিস থেকে ফিরে দেখল স্ত্রী নেই।
কোমুরা টোকিওর আকিহাবারা ইলেকট্রনিক্স পাড়ার একটি পুরনো অডিও সরঞ্জামের দোকানে বিক্রয়কর্মী। সে সর্বোচ্চ মানের জিনিস বিক্রি করত, বিক্রি হলে ভালো কমিশন পেত। তার বেশিরভাগ খদ্দের ছিল ডাক্তার, ধনী ব্যবসায়ী আর মফস্বলের সম্পন্ন মানুষ। আট বছর ধরে এই কাজ করছে। শুরু থেকেই রোজগার ভালো ছিল। অর্থনীতি তখন চাঙা, জমির দাম বাড়ছে, জাপানে অর্থের ছড়াছড়ি। মানুষের মানিব্যাগ দশ হাজার ইয়েনের নোটে ভরা-- সবাই খরচ করতে মরিয়া। সবচেয়ে দামি জিনিসগুলোই আগে বিকোত।
কোমুরা লম্বা, ছিপছিপে, পোশাকে রুচি আছে। মানুষের সাথে মেশার ক্ষমতাও ভালো। অবিবাহিত থাকতে অনেক মেয়ের সাথে মেলামেশা ছিল। কিন্তু ছাব্বিশে বিয়ের পর নারীসঙ্গের আকাঙ্ক্ষা বলা যায় হঠাৎই—আর অদ্ভুতভাবে—মিলিয়ে গেল। পাঁচ বছরের বিবাহিত জীবনে স্ত্রী ছাড়া আর কারো সাথে শোয়নি। সুযোগ আসেনি তা নয়—কিন্তু ক্ষণিক প্রেম বা এক রাতের সম্পর্কে আর আগ্রহ নেই। বরং তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে স্ত্রীর সাথে শান্তিতে খেতে, সোফায় বসে কথা বলতে, তারপর বিছানায় যেতে ভালো লাগত। এটুকুই সে চাইত।
বন্ধুরা আর সহকর্মীরা তার বিয়ে নিয়ে অবাক হত। পরিষ্কার, ছাঁদশালা চেহারার কোমুরার পাশে স্ত্রীকে একেবারেই সাধারণ দেখাত। বেঁটে, মোটা হাত, চেহারায় কোনো উজ্জ্বলতা নেই। শুধু চেহারা নয়, স্বভাবেও তেমন কোনো আকর্ষণ ছিল না। কম কথা বলত, মুখে সবসময় একটা মনমরা ভাব।
তবু কোমুরা বুঝতে পারত না কেন—স্ত্রীর সাথে এক ছাদের নিচে থাকলে তার সব টানটান ভাব কেটে যেত। তখনই সে সত্যিকারের শান্তি পেত। ঘুম হত ভালো, আগেকার অদ্ভুত স্বপ্নগুলো আর আসত না। যৌনজীবনও উষ্ণ ছিল। মৃত্যু বা রোগভোগ বা মহাবিশ্বের বিশালতা নিয়ে আর মাথা ঘামাতে হত না।
স্ত্রীর দিক থেকে অবশ্য টোকিওর ভিড় পছন্দ ছিল না। ইয়ামাগাতার জন্য তার মন কাঁদত। বাবা-মা আর দুই বড় দিদির কথা মনে পড়ত। ইচ্ছে হলেই বাড়ি চলে যেত। বাবা-মা একটা সফল সরাইখানা চালাতেন, সংসারে অভাব ছিল না। বাবা ছোট মেয়েকে ভীষণ ভালোবাসতেন, খুশিমনে যাতায়াতের খরচ দিতেন। কয়েকবার হয়েছে কোমুরা অফিস থেকে ফিরে দেখেছে স্ত্রী নেই, রান্নাঘরের টেবিলে চিঠি—কিছুদিনের জন্য বাবার বাড়ি যাচ্ছে। কোমুরা কখনও আপত্তি করেনি। অপেক্ষা করত, স্ত্রী ফিরত পরে—এক সপ্তাহ বা দশ দিন পর, মেজাজ ফুরফুরে হয়ে ফিরত।
কিন্তু ভূমিকম্পের পাঁচ দিন পর স্ত্রী যে চিঠি রেখে চলে গেল সেটা আলাদা। আমি আর ফিরব না—এই কথা লিখে সে সহজ কিন্তু স্পষ্ট ভাষায় বুঝিয়ে দিল কেন আর তার সাথে থাকতে চায় না।
সমস্যা হল তুমি আমাকে কিছুই দাও না। আরও সরাসরি বললে তোমার ভেতরে দেওয়ার মতো কিছু নেই। তুমি ভালো, দয়ালু, সুদর্শন, কিন্তু তোমার সাথে থাকা মানে শূন্য বাতাসের সাথে থাকা। তোমার দোষ নেই অবশ্য। অনেক মেয়ে তোমাকে ভালোবাসবে। কিন্তু আমাকে ফোন করো না। আমার যা রয়ে গেল সব ফেলে দাও।
আসলে সে তেমন কিছু রেখে যায়নি। জামাকাপড়, জুতো, ছাতা, কফির মগ, হেয়ার ড্রায়ার—সব নিয়ে গেছে। সেদিন সকালে কোমুরা অফিসে বেরোনোর পর বাক্স বেঁধে পাঠিয়ে দিয়েছে। বাড়িতে তার বলতে গেলে শুধু পড়ে আছে কেনাকাটার সাইকেল আর দু-একটা বই। ব্যাচেলর আমল থেকে কোমুরার সংগ্রহ করা বিটলস আর বিল ইভান্সের সিডিগুলোও উধাও।
পরদিন ইয়ামাগাতায় শ্বশুরবাড়িতে ফোন করল। শাশুড়ি ধরলেন। তিনি বললেন স্ত্রী কথা বলতে চায় না। গলায় একটু বিব্রত ভাব ছিল। বললেন কাগজপত্র পাঠানো হবে, সিল মেরে তাড়াতাড়ি ফেরত দিতে।
কোমুরা বলল, ‘তাড়াতাড়ি হয়তো পারবে না। এটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, ভাবার সময় চাই।’
‘ভাবতে পারো যত খুশি, কিন্তু তাতে কিছু বদলাবে না,’ শাশুড়ি বললেন।
সম্ভবত ঠিকই বলেছেন, কোমুরা মনে মনে ভাবল। যতই ভাবুক বা অপেক্ষা করুক, আগের মতো আর হবে না। সে নিশ্চিত ছিল।
সিলমোহর দিয়ে কাগজ ফেরত পাঠানোর কিছুদিন পর কোমুরা এক সপ্তাহের ছুটি চাইল। বস মোটামুটি জানতেন কী হয়েছে, ফেব্রুয়ারিতে কাজও কম থাকে, তাই ঝামেলা না করেই ছুটি দিলেন। কিছু বলতে যাচ্ছিলেন মনে হল, শেষে চুপ থাকলেন।
দুপুরে সহকর্মী সাসাকি এসে বলল, ‘শুনলাম ছুটি নিচ্ছ। কিছু করার প্ল্যান আছে?’
‘জানি না,’ কোমুরা বলল। ‘কী করা উচিত বলে মনে হয়?’
সাসাকি অবিবাহিত, কোমুরার চেয়ে তিন বছরের ছোট। হালকা গড়ন, ছোট চুল, গোল সোনালি ফ্রেমের চশমা। অনেকে মনে করত বেশি কথা বলে আর একটু অহংকারী ভাব আছে। তবে সহজ স্বভাবের কোমুরার সাথে বেশ জমত।
‘যখন ছুটিই নিচ্ছ, একটা ভালো ট্রিপ করে আসো না কেন?’
‘মন্দ না,’ কোমুরা বলল।
সাসাকি রুমালে চশমা মুছতে মুছতে কোমুরার দিকে তাকাল যেন সে কিছু একটা খুঁজছে।
‘হোক্কাইদো গেছ কখনও?’ সে জিজ্ঞেস করল।
‘না,’ কোমুরা বলল।
‘যেতে চাও?’
‘কেন জিজ্ঞেস করছ?’
সাসাকি চোখ সরু করল, গলা খাঁকারি দিল। ‘আসলে কুশিরোতে একটা ছোট্ট পার্সেল পাঠাতে চাই, তুমি নিয়ে যাবে কি? বড় উপকার হয়। যাতায়াতের বিমান ভাড়া আমি দেব-- কুশিরোতে হোটেলও।’
‘ছোট্ট পার্সেল?’
‘এই রকম,’ সাসাকি হাত দিয়ে চার ইঞ্চির একটা চৌকো মাপ দেখাল। ‘ভারী না।’
‘কাজের ব্যাপার?’
সাসাকি মাথা নাড়ল। ‘একদম না। সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত। ডাকে পাঠাতে চাই না-- নষ্ট হয়ে যেতে পারে। চেনা কেউ হাতে হাতে দিয়ে আসুক সেটাই চাই। আমার নিজে যাওয়া উচিত ছিল, কিন্তু হোক্কাইদো পর্যন্ত যাওয়ার সময় করতে পারছি না।’
‘গুরুত্বপূর্ণ কিছু?’
সাসাকি ঠোঁট বন্ধ রেখে একটু হেসে মাথা নাড়ল। ‘ভাঙার মতো কিছু নেই-- বিপজ্জনকও না। চিন্তা নেই। বিমানবন্দরে এক্স-রেতে আটকাবে না। ঝামেলায় ফেলব না তোমাকে, কথা দিচ্ছি। ওজনও প্রায় নেই। অন্য যেকোনো জিনিসের মতো সাথে নিয়ে যাও। ডাকে না পাঠানোর কারণ শুধু এই যে পাঠাতে ইচ্ছে করছে না।’
ফেব্রুয়ারিতে হোক্কাইদো হবে হাড় কাঁপানো ঠান্ডা—কোমুরা জানত। কিন্তু ঠান্ডা বা গরম, তার কাছে সব সমান।
‘পার্সেলটা কাকে দেব?’
‘আমার বোনকে। ছোট বোন--ওখানেই থাকে।’
কোমুরা রাজি হয়ে গেল। ছুটিতে কী করবে ভাবেনি, এখন পরিকল্পনা করতেও ইচ্ছে করছিল না। আর হোক্কাইদো না যাওয়ার কোনো কারণও ছিল না। সাসাকি তখনই এয়ারলাইনে ফোন করে কুশিরো যাওয়ার টিকিট কাটল। দুদিন পরে-- বিকেলের ফ্লাইট।
পরদিন অফিসে সাসাকি একটা বাক্স দিল কোমুরাকে। চেহারাটা চিতার ছাই রাখার বাক্সের মতো, তবে ছোট, বাদামি কাগজে মোড়া। হাতে নিয়ে মনে হল কাঠের। সাসাকি বলেছিল ঠিকই, প্রায় ওজন নেই। বাদামি কাগজের উপর দিয়ে চওড়া স্বচ্ছ টেপ চারদিকে জড়ানো। কোমুরা হাতে নিয়ে কয়েক সেকেন্ড দেখল। একটু ঝাঁকাল—ভেতরে কিছু নড়ছে বা শব্দ হচ্ছে—এমন কিছু বোঝা গেল না।
‘বোন বিমানবন্দরে নিতে আসবে। থাকার ব্যবস্থাও করবে,’ সাসাকি বলল। ‘তোমাকে শুধু গেটের বাইরে হাতে পার্সেল নিয়ে দাঁড়াতে হবে। সে চিনে নেবে। চিন্তা নেই, বিমানবন্দরটা ছোট ‘
একটা মোটা গরম গেঞ্জিতে মুড়িয়ে কোমুরা সুটকেসে পার্সেলটা ভরল । বিমানে উঠে অবাক হল—এত ভিড়! শীতের মাঝখানে টোকিও থেকে কুশিরো যাচ্ছে এত মানুষ কেন?
সকালের কাগজ ভূমিকম্পের খবরে ভরা। বিমানে বসে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পড়ল। মৃতের সংখ্যা বাড়ছে। অনেক জায়গায় এখনও জল নেই, বিদ্যুৎ নেই, অগণিত মানুষ ঘর হারিয়েছে। প্রতিটা খবরে নতুন বিপদের কথা। কিন্তু কোমুরার কাছে সব কেমন অগভীর মনে হচ্ছিল। সব শব্দ যেন দূর থেকে আসা একঘেয়ে প্রতিধ্বনি। শুধু একটাই চিন্তা মাথায় ঘুরছিল—স্ত্রী ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে।
যন্ত্রের মতো ভূমিকম্পের খবর পড়ছিল। মাঝে মাঝে থামছিল স্ত্রীর কথা ভাবতে। আবার কাগজে ফিরছিল। ক্লান্ত হলে চোখ বুজে ঘুমাল। জেগে উঠে আবার স্ত্রীর কথা মাথায় এল। এত তীব্রভাবে, সকাল থেকে রাত, না খেয়ে না ঘুমিয়ে কেন সে ভূমিকম্পের খবর দেখছিল? ওই ছবিগুলোতে সে কী দেখতে পাচ্ছিল?
বিমানবন্দরে একই ধরন আর রঙের ওভারকোট পরা দুটি তরুণী কোমুরার কাছে এল। একজন ফর্সা, উচ্চতা প্রায় পাঁচ ফুট ছয়, ছোট চুল। নাক থেকে ভরাট উপরের ঠোঁট পর্যন্ত অংশটা অদ্ভুতভাবে লম্বা—দেখে কোমুরার মনে পড়ল ছোট শিংওয়ালা তৃণভোজী প্রাণীর কথা। অন্যজন পাঁচ ফুট এক হবে, নাকটা একটু ছোট না হলে বেশ সুন্দরী বলা যেত। লম্বা চুল কাঁধ পর্যন্ত সোজা নেমেছে। কান খোলা, ডান কানের লতিতে দুটো তিল, দুলের কারণে আরও চোখে পড়ছে। দুজনকেই পঁচিশের কাছাকাছি মনে হল। তারা কোমুরাকে বিমানবন্দরের একটা ক্যাফেতে নিয়ে গেল।
‘আমি সাসাকি কেইকো,’ লম্বাজনটি বলল। ‘দাদা বলেছে আপনি অনেক সাহায্য করেছেন। এ আমার বন্ধু শিমাও।’
‘পরিচয় হয়ে ভালো লাগল,’ কোমুরা বলল।
‘হ্যালো,’ শিমাও বলল।
‘দাদা বলল আপনার স্ত্রী সম্প্রতি মারা গেছেন,’ সাসাকি কেইকো গম্ভীর মুখে বলল।
কোমুরা একটু থেমে বলল, ‘না, মারা যাননি।’
‘পরশু দাদার সাথে কথা হয়েছে। স্পষ্ট বলেছিল স্ত্রীকে হারিয়েছেন।’
‘হারিয়েছি ঠিকই। তালাক হয়ে গেছে। তবে যতদূর জানি সে বেঁচেবর্তে আছে।’
‘অদ্ভুত। এত গুরুত্বপূর্ণ কথা ভুল শুনব কী করে।’
মুখে একটু কষ্ট পাওয়ার ভাব নিয়ে তাকাল। কোমুরা কফিতে অল্প চিনি দিয়ে আস্তে নাড়ল, একটু চুমুক দিল। পানীয়টা পাতলা, তেমন কোনো স্বাদ নেই—আছে বলা যায় না। আমি এখানে কী করছি? মনে মনে ভাবল।
‘তাহলে নিশ্চয়ই ভুল শুনেছি। অন্য কোনো ব্যাখ্যা নেই,’ সাসাকি কেইকো বলল। এবার মনে সে হল সন্তুষ্ট হয়েছে। লম্বা একটা শ্বাস নিল, নিচের ঠোঁট দাঁতে কামড়াল। ‘মাফ করবেন। খুব অসভ্যতা হয়ে গেছে।’
‘থাক। যাই হোক, সে তো চলেই গেছে।’
কোমুরা আর কেইকোর কথার মাঝে শিমাও চুপ করে বসে আছে। কিন্তু হাসিমুখে কোমুরার দিকে তাকিয়ে থাকল। তাকে পছন্দ হয়েছে বলে মনে হল। মুখের ভাব আর শরীরের সূক্ষ্ম ভঙ্গি দেখেই বোঝা যাচ্ছিল। তিনজনের মধ্যে একটু নীরবতা নামল।
‘যাই হোক, গুরুত্বপূর্ণ পার্সেলটা দিয়ে দিই,’ কোমুরা বলল। সুটকেসের চেন খুলে মোটা স্কি আন্ডারশার্টের ভাঁজ থেকে বাক্সটা বের করল। তখন হঠাৎ মাথায় এল বিমান থেকে নামার সময় হাতে বাক্স রাখার কথা ছিল-- তাহলেই চিনতে পারবে। তাহলে এরা কীভাবে চিনল?
সাসাকি কেইকো টেবিলের ওপারে হাত বাড়াল। তার চোখ দুটো ভাবলেশহীন-- বাক্সের উপর স্থির। ওজন দেখল, তারপর কোমুরার মতোই কানের কাছে ধরে একটু ঝাঁকাল। সব ঠিক আছে বলার মতো একটু হেসে বাক্সটা বড় কাঁধের ব্যাগে ঢুকিয়ে নিল।
‘একটা ফোন করতে হবে,’ সে বলল। ‘একটু যাই?’
‘অবশ্যই,’ কোমুরা বলল। ‘যান।’
কেইকো ব্যাগ কাঁধে নিয়ে দূরের ফোনবুথের দিকে হেঁটে গেল। কোমুরা তার হাঁটা দেখল। শরীরের উপরের অংশ স্থির, কোমর থেকে নিচে বড় বড় মসৃণ যান্ত্রিক ছন্দে নড়ছে। অদ্ভুত একটা অনুভূতি হলো, যেন অতীতের কোনো মুহূর্ত হঠাৎ এসে বর্তমানে ঢুকে পড়েছে।
‘হোক্কাইদো আগে আসেননি?’ শিমাও জিজ্ঞেস করল।
কোমুরা মাথা নাড়ল।
‘হ্যাঁ, অনেক দূর তো।’
কোমুরা মাথা নাড়ল, তারপর চারদিকে তাকাল। ‘অদ্ভুত,’ বলল, ‘এখানে বসে মনে হচ্ছে না এত দূর এসেছি।’
‘কারণ উড়ে এসেছেন। ওই বিমানগুলো অনেক বেশি দ্রুত। মন শরীরের সাথে তাল রাখতে পারে না।’
‘হতে পারে।’
‘এত দূর আসতে চাইছিলেন?’
‘মনে হয় চাইছিলাম,’ কোমুরা বলল।
‘স্ত্রী চলে যাওয়ার কারণে?’
কোমুরা মাথা নাড়ল।
‘যত দূরেই যান, নিজেকে ছেড়ে যেতে পারবেন না,’ শিমাও বলল।
কোমুরা টেবিলের চিনির পাত্রের দিকে তাকিয়ে ছিল। তারপর চোখ তুলে শিমাওর চোখে তাকাল।
‘ঠিকই বলেছ,’ সে বলল। ‘যত দূরেই যাও, নিজেকে ছেড়ে যেতে পারবে না। ছায়ার মতো-- সর্বত্র পিছু নেয়।’
শিমাও মনোযোগ দিয়ে কোমুরার দিকে তাকাল। ‘স্ত্রীকে ভালোবাসতেন, তাই না?’
কোমুরা প্রশ্নটা এড়িয়ে গেল। ‘সাসাকি কেইকোর বন্ধু তুমি?’
‘হ্যাঁ। একসাথে কাজ করি।’
‘কী কাজ?’
জবাব না দিয়ে শিমাও জিজ্ঞেস করল, ‘খিদে পেয়েছে?’
‘জানি না,’ কোমুরা বলল। ‘খিদে লাগছেও মনে হচ্ছে, আবার লাগছেও না।’
‘চলুন তিনজনে গরম কিছু খাই। ভালো লাগবে।’
শিমাও একটা ছোট ফোর-হুইল-ড্রাইভ সুবারু চালাল। গাড়ির অবস্থা দেখে মনে হল এক লাখ মাইলেরও বেশি চলেছে। পেছনের বাম্পারে বিশাল একটা দুমড়ানো দাগ। সাসাকি কেইকো শিমাওর পাশে বসল, কোমুরার ভাগে পড়ল পেছনের সরু আসন। শিমাওর চালানোয় বিশেষ সমস্যা ছিল না, কিন্তু পেছনে ভয়ংকর শব্দ-- সাসপেনশন প্রায় শেষ। গিয়ার বদলালে অটোমেটিক ট্রান্সমিশন ধাক্কা মেরে বসে, হিটার কখনও গরম কখনও ঠান্ডা। চোখ বুজলে মনে হয় ওয়াশিং মেশিনে আটকে আছে।
কুশিরোর রাস্তায় বরফ জমতে দেওয়া হয়নি। তবে দুপাশে এলোমেলো জায়গায় নোংরা বরফের স্তূপ। মাথার উপর ঘন মেঘ নেমে এসেছে। সূর্যাস্ত এখনও হয়নি তবু চারদিক অন্ধকার আর বিষণ্ণ। শহরের মধ্যে দিয়ে ঝাঁজালো শিস দিয়ে বাতাস বইছে। পথচারী প্রায় নেই। ট্রাফিক বাতিগুলোও যেন জমে গেছে।
‘হোক্কাইদোর এই অংশে বরফ কম পড়ে,’ সাসাকি কেইকো কোমুরার দিকে ফিরে জোরে বলল। ‘এটা সমুদ্রের কাছে। এখানে বাতাস জোরালো। যা বরফ পড়ে তা উড়ে যায়। ঠান্ডা কিন্তু হাড় কাঁপানো। মনে হয় কান খসে পড়বে।’
‘মাতাল হয়ে রাস্তায় ঘুমিয়ে জমে মরার কথাও শোনা যায়,’ শিমাও বলল।
‘এদিকে ভালুক আছে নাকি?’ কোমুরা জিজ্ঞেস করল।
কেইকো খিলখিল করে হেসে শিমাওর দিকে ফিরল। ‘ভালুক!’
শিমাওও একইভাবে হাসল।
‘হোক্কাইদো সম্পর্কে তেমন জানি না,’ কোমুরা বলল।
‘ভালুক নিয়ে একটা ভালো গল্প জানি,’ কেইকো বলল। ‘তাই না, শিমাও?’
‘দারুণ গল্প!’ শিমাও বলল।
কিন্তু সেখানেই থেমে গেল, ভালুকের গল্প আর বলল না কেউ। কোমুরাও জিজ্ঞেস করল না। একটু পরে হাইওয়ের ধারে একটা বড় নুডলসের দোকানে পৌঁছে গেল। পার্কিংয়ে গাড়ি রেখে ভেতরে ঢুকল। কোমুরা বিয়ার আর এক বাটি গরম রামেন নুডুলস খেল। জায়গাটা নোংরা, ফাঁকা, চেয়ার-টেবিল নড়বড়ে। কিন্তু রামেন চমৎকার। খাওয়া শেষে কোমুরার সত্যিই একটু ভালো লাগল।
‘কোমুরা-সান,’ সাসাকি কেইকো বলল, ‘হোক্কাইদোতে কিছু করার আছে আপনার? দাদা বলল সপ্তাহখানেক থাকবেন।’
কোমুরা একটু ভাবল, কিছু মাথায় এল না।
‘গরম ঝরনায় যাবেন? কাছেই একটা ছোট্ট জায়গা আছে, চমৎকার।’
‘মন্দ হয় না,’ কোমুরা বলল।
‘পছন্দ হবে নিশ্চয়ই। সত্যিই সুন্দর। ভালুকটালুক নেই।’
দুজন আবার হেসে উঠল।
‘স্ত্রীর কথা জিজ্ঞেস করলে কি কিছু মনে করবেন?’ কেইকো জিজ্ঞেস করল।
‘না, করব না।’
‘কবে চলে গেলেন?’
‘ভূমিকম্পের পাঁচ দিন পর। দুই সপ্তাহেরও বেশি হয়ে গেছে।’
‘ভূমিকম্পের সাথে কোনো সম্পর্ক আছে?’
কোমুরা মাথা নাড়ল। ‘সম্ভবত না। মনে হয় না।’
‘তবু মনে হয় এসব কোনোভাবে মনের সঙ্গে জুড়ে থাকে,’ শিমাও মাথা কাত করে বলল।
‘হ্যাঁ,’ কেইকো বলল। ‘শুধু কীভাবে-- সেটা দেখা যায় না।’
‘ঠিক,’ শিমাও বলল। ‘এরকম হতেই থাকে।’
‘এরকম মানে?’ কোমুরা জিজ্ঞেস করল।
‘যেমন ধরুন আমার পরিচিত একজনের কথা,’ কেইকো বলল।
‘সাইকি-সানের কথা?’ শিমাও জিজ্ঞেস করল।
‘হ্যাঁ,’ কেইকো বলল। ‘সাইকি নামে একজন কুশিরোতে থাকে। বয়স চল্লিশের কাছাকাছি। নাপিত। গত বছর শরতে তার স্ত্রী ইউএফও দেখেছিল। রাতের অনেক বেলা একা গাড়ি চালাচ্ছিল শহরের কিনারায়--দেখল একটা বিশাল ইউএফও মাঠে নেমে আসছে। নেমে আসছে ধুম করে-- ক্লোজ এনকাউন্টার্সের মতো। এক সপ্তাহ পর সাইকি বাড়ি ছেড়ে চলে গেল। সংসারে তার কোনো সমস্যা ছিল না। শুধু হাওয়া হয়ে গেল—সে আর ফিরল না।’
‘একেবারে উধাও,’ শিমাও বলল।
‘ইউএফওর কারণে?’ কোমুরা জিজ্ঞেস করল।
‘কেন চলে গেছে জানি না,’ কেইকো বলল। ‘শুধু চলে গেছে। কোনো চিঠিও না। প্রাইমারি স্কুলে পড়া দুটো বাচ্চাও ছিল। যাওয়ার আগের পুরো সপ্তাহ শুধু ইউএফওর কথা বলত সবাইকে। তাকে থামানো যেত না। কত বড়, কত সুন্দর—এই কথাই বলে যেত।’
একটু থামল--কথাটা মাথায় বসতে দিল।
‘আমার স্ত্রী চিঠি রেখে গেছে,’ কোমুরা বলল। ‘আর আমাদের বাচ্চাও নেই।’
‘তাহলে আপনার অবস্থা সাইকির চেয়ে একটু ভালো,’ কেইকো বলল।
‘হ্যাঁ। বাচ্চা থাকলে অনেক ফারাক হয়,’ শিমাও মাথা নাড়ল।
‘শিমাওর বাবা বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছিল। তখন শিমাওর বয়স ছিল সাত,’ কেইকো ভুরু কুঁচকে বলল। ‘স্ত্রীর ছোট বোনকে নিয়ে চলে গিয়েছিল।’
‘হঠাৎ। একদিন,’ শিমাও হেসে বলল।
তিনজনের মধ্যে নীরবতা নামল।
‘হয়তো সাইকির স্ত্রী পালায়নি-- ইউএফওর এলিয়েনরা ধরে নিয়ে গেছে,’ কোমুরা পরিবেশটা হালকা করতে বলল।
‘হতে পারে,’ শিমাও গম্ভীর মুখে বলল। ‘এরকম গল্প অনেক শোনা যায়।’
‘যেমন রাস্তায় হাঁটছ আর ভালুকে খেয়ে ফেলল, সেরকম?’ কেইকো জিজ্ঞেস করল। দুজন আবার হাসল।
তিনজন নুডলসের দোকান ছেড়ে কাছের একটা লাভ হোটেলে গেল। শহরের কিনারায়-- এমন একটা রাস্তায় যেখানে লাভ হোটেল আর কবরের পাথরের দোকান পাশাপাশি। শিমাওর বেছে নেওয়া হোটেলটা অদ্ভুত দেখতে—ইউরোপীয় দুর্গের মতো বানানো। সবচেয়ে উঁচু মিনারে একটা লাল ত্রিকোণ পতাকা উড়ছে।
কেইকো সামনের ডেস্ক থেকে চাবি নিল, তিনজন লিফটে উঠে ঘরে গেল। জানালাগুলো ছোট অথচ বিছানাটা হাস্যকর রকম বড়। কোমুরা ডাউন জ্যাকেট হ্যাঙ্গারে ঝুলিয়ে শৌচাগারে গেল। সে ফেরার আগেই দুই মেয়ে গোসলখানায় জল ভরে ফেলেছে, আলো কমিয়ে দিয়েছে, গরম ঠিক করেছে, টেলিভিশন চালু করেছে, কাছের রেস্তোরাঁর মেনু দেখেছে, বিছানার মাথার দিকের আলোর সুইচ পরীক্ষা করেছে, আর মিনিবারের ভেতরটাও দেখে নিয়েছে।
‘মালিকরা আমার বন্ধু,’ কেইকো বলল। ‘সবচেয়ে বড় ঘরটা রাখতে বলেছিলাম। লাভ হোটেল বলে অস্বস্তি লাগছে না তো?’
‘একদম না,’ কোমুরা বলল।
‘স্টেশনের কাছে কোনো সস্তা হোটেলের ছোট ঘরে রাখার চেয়ে এটা অনেক ভালো মনে হল।’
‘হয়তো ঠিকই,’ কোমুরা বলল।
‘গোসল করুন। জল ভরা আছে।’
কোমুরা সেটাই করল। টবটা বিশাল। একা ভিজতে একটু অস্বস্তি লাগল। এই হোটেলে যে জুটিরা আসে তারা নিশ্চয়ই একসাথে গোসল করে।
গোসল সেরে বেরিয়ে অবাক হলো—সাসাকি কেইকো নেই। শিমাও বসে বিয়ার খাচ্ছে-- টেলিভিশন দেখছে।
‘কেইকো বাড়ি চলে গেছে,’ শিমাও বলল। ‘বলে গেছে মাফ করতে, কাল সকালে আসবে। আমি একটু বসে বিয়ার খেলে অসুবিধা নেই তো?’
‘নেই,’ কোমুরা বলল।
‘সত্যিই? একা থাকতে চাইলে বা কেউ থাকলে স্বস্তি না লাগলে বলুন।’
কোমুরা বলল কোনো সমস্যা নেই। বিয়ার খেতে খেতে তোয়ালে দিয়ে চুল মুছতে মুছতে শিমাওর সাথে টেলিভিশন দেখল। কোবে ভূমিকম্পের বিশেষ খবর চলছে। সেই পরিচিত ছবিগুলো বারবার আসছে—হেলে পড়া বাড়ি, ভাঙা রাস্তা, কাঁদছে বৃদ্ধারা, চারদিকে বিশৃঙ্খলা আর অসহায় রাগ। বিজ্ঞাপন আসতেই শিমাও রিমোট দিয়ে টেলিভিশন বন্ধ করল।
‘কথা বলি,’ সে বলল। ‘এখন যখন এখানে আছি।’
‘ঠিক আছে,’ কোমুরা বলল।
‘কী নিয়ে কথা বলব?’
‘গাড়িতে তুমি আর কেইকো ভালুকের কথা বলছিলে। দারুণ গল্প বললে।’
‘ও হ্যাঁ,’ সে মাথা নাড়ল। ‘ভালুকের গল্প।’
‘বলবে?’
‘কেন নয়?’
শিমাও ফ্রিজ থেকে আরেকটা বিয়ার বের করে দুজনের গ্লাসে ঢালল।
‘একটু রগরগে,’ সে বলল। ‘অসুবিধা নেই?’
কোমুরা মাথা নাড়ল।
‘কিছু গল্প আছে মেয়েদের মুখে শুনতে পছন্দ করে না কেউ কেউ।’
‘আমি সেরকম না।’
‘আমার নিজের ব্যাপার, তাই একটু লজ্জার।’
বলতে স্বস্তি লাগলে শুনতে চাই।’
‘আমার স্বস্তি আছে,’ শিমাও বলল, ‘আপনার থাকলে।’
‘আমারও আছে,’ কোমুরা বলল।
‘তিন বছর আগে—জুনিয়র কলেজে ঢোকার সময়টায়—একটা ছেলের সাথে প্রেম ছিল। আমার চেয়ে এক বছরের বড়। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ত। প্রথম পুরুষ। একদিন দুজনে হাইকিংয়ে গেলাম—একদম উত্তরে পাহাড়ে।’
শিমাও বিয়ারে চুমুক দিল।
‘শরৎকাল, পাহাড়ে ভালুক ভর্তি। ওই সময় ভালুকরা শীতঘুমের আগে খাবার খুঁজে বেড়ায়, তখন বেশি বিপজ্জনক। মাঝে মাঝে মানুষ আক্রমণ করে। আমরা যাওয়ার মাত্র তিন দিন আগে একজন হাইকারকে খারাপভাবে আক্রমণ করেছিল। তাই কেউ একজন আমাদের একটা ঘণ্টা দিল—বাতাসের ঘণ্টির মতো, ওই সাইজের ঘণ্টাটা। হাঁটার সময় বাজাতে হবে, ভালুক বুঝবে মানুষ আছে, বেরোবে না। ভালুক ইচ্ছে করে মানুষ আক্রমণ করে না। তারা মোটামুটি তৃণভোজী। আক্রমণ করার দরকার নেই। তাদের এলাকায় হঠাৎ মানুষের সামনে পড়ে গেলে সমস্যা হয়। তারা চমকে যায় বা রেগে যায়, তখন প্রতিক্রিয়ায় আক্রমণ করে। ঘণ্টা বাজাতে বাজাতে হাঁটলে সরে যায়। বুঝলেন?’
‘বুঝলাম।’
‘তো আমরা সেটাই করছিলাম, ঘণ্টা বাজাতে বাজাতে হাঁটছি। একটা জায়গায় এলাম যেখানে আর কেউ নেই। হঠাৎ সে বলল... করতে চায়। আমারও মন্দ লাগল না-- রাজি হলাম। রাস্তা থেকে সরে ঝোপের মধ্যে গেলাম। সেখানে কেউ আমাদেরকে দেখতে পাবে না। একটা প্লাস্টিকের চাদর বিছালাম। কিন্তু ভালুকের ভয় লাগছিল। ভাবুন, পেছন থেকে ভালুক আক্রমণ করল আর মরে গেলাম—কী ভয়ংকর ঙ্কর! ওভাবে মরতে চাই না কিছুতেই। আপনি চান?’
কোমুরা বলল সেভাবে মরতে চায় না।
‘তো আমরা একহাতে ঘণ্টা বাজাতে বাজাতে করলাম। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত। ঠিং-আ-লিং! ঠিং-আ-লিং!’
‘ঘণ্টা কে বাজাচ্ছিল?’
‘পালা করে। হাত ক্লান্ত হলে বদলাতাম। পুরো সময় ঘণ্টা বাজাতে বাজাতে করা—কী অদ্ভুত! এখনও মাঝে মাঝে মনে পড়ে, হাসি পায়।’
কোমুরাও একটু হাসল।
শিমাও হাততালি দিল। ‘আরে, দারুণ!’ সে বলল। ‘হাসতে পারেন তাহলে!’
‘হাসতে পারি না মানে?’ কোমুরা বলল। কিন্তু ভাবতে গিয়ে মনে হল, সত্যিই অনেকদিন পর হাসল। শেষবার কবে হেসেছিল?
‘আমিও একটু গোসল করি?’ শিমাও জিজ্ঞেস করল।
‘করো,’ কোমুরা বলল।
সে গোসল করতে গেলে কোমুরা টেলিভিশনে একটা ভ্যারাইটি শো দেখল। কোনো একজন চিৎকারে কমেডিয়ান উপস্থাপনা করছে। একটুও মজা লাগল না-- কিন্তু দোষটা অনুষ্ঠানের না নিজের বুঝতে পারল না। বিয়ার খেল। মিনিবার থেকে একপ্যাকেট বাদাম খুলল। শিমাও অনেকক্ষণ গোসলখানায় রইল। শেষে শুধু তোয়ালে জড়িয়ে বেরিয়ে বিছানার কিনারায় বসল। তোয়ালে ফেলে বিড়ালের মতো চাদরের ভেতর ঢুকে সোজা কোমুরার দিকে তাকিয়ে শুয়ে রইল।
‘স্ত্রীর সাথে শেষবার কবে?’ সে জিজ্ঞেস করল।
‘ডিসেম্বরের শেষে মনে হয়।’
‘তারপর থেকে কিছু না?’
‘না।’
‘কারো সাথেই না?’
কোমুরা চোখ বুজে মাথা নাড়ল।
‘আমি কী ভাবছি জানেন?’ শিমাও বলল। ‘একটু হালকা হতে হবে আপনাকে। জীবনটা একটু উপভোগ করতে হবে। ভাবুন—কাল ভূমিকম্প হতে পারে, এলিয়েনরা ধরে নিয়ে যেতে পারে, ভালুকে খেয়ে ফেলতে পারে। কী হবে কেউ জানে না।’
‘কেউ জানে না কী হবে,’ কোমুরা আওড়াল।
‘ঠিং-আ-লিং,’ শিমাও বলল।
শিমাওর সাথে কয়েকবার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে কোমুরা ছেড়ে দিল। এরকম আগে কখনও হয়নি।
‘স্ত্রীর কথা ভাবছিলেন নিশ্চয়ই,’ শিমাও বলল।
‘হ্যাঁ,’ কোমুরা বলল। কিন্তু আসলে সে ভাবছিল ভূমিকম্পের কথা। একটার পর একটা ছবি আসছিল মাথায়, স্লাইড শোর মতো ভেসে উঠছে আর মিলিয়ে যাচ্ছে। মোটরওয়ে, আগুন, ধোঁয়া, ধ্বংসস্তূপ, রাস্তায় ফাটল। নীরব ছবির সেই ধারা ভাঙতে পারছিল না।
শিমাও কানটা তার খালি বুকে রাখল।
‘এরকম হয়,’ সে বলল।
‘হুঁ।’
‘মাথায় নেবেন না।’
‘চেষ্টা করব,’ কোমুরা বলল।
‘পুরুষরা সবসময় মাথায় নেয় অবশ্য।’
কোমুরা চুপ রইল।
শিমাও তার বুকের বোঁটা নিয়ে খেলল।
‘চিঠিতে কী লিখেছিল বললেন না?’
‘বললাম তো।’
‘কী লিখেছিল?’
‘লিখেছিল তোমার সাথে থাকা মানে বাতাসের একটা চাঁই-এর সাথে থাকা।’
‘বাতাসের চাঁই?’ শিমাও মাথা তুলে কোমুরার দিকে তাকাল। ‘মানে কী?’
‘মানে আমার ভেতরে কিছু নেই।’
‘সত্যি?’
‘হতে পারে,’ কোমুরা বলল। ‘নিশ্চিত না। হয়তো ভেতরে কিছু নেই। কিন্তু কিছু থাকা মানেই বা কী?’
‘হ্যাঁ, সত্যিই, ভাবলে তো তাই। কিছু থাকা মানে কী? আমার মা স্যামনের চামড়া খেতে ভালোবাসতেন। সবসময় বলতেন শুধু চামড়া দিয়ে তৈরি স্যামন হলে কী ভালো হত। তাহলে হয়তো কিছু না থাকাটাও কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভালো। তাই না?’
কোমুরা ভাবার চেষ্টা করল শুধু চামড়া দিয়ে তৈরি স্যামন কেমন হবে। কিন্তু সেরকম কিছু থাকলেও চামড়াটাই তো ভেতরের কিছু হয়ে যায়। কোমুরা একটা লম্বা শ্বাস নিল। শিমাওর মাথা তার বুকের উপর উঠল নামল।
‘তবে একটা কথা বলি,’ শিমাও বলল। ‘আপনার ভেতরে কিছু আছে কি নেই জানি না, কিন্তু আপনাকে আমার দারুণ লাগছে। বাজি ধরে বলতে পারি দুনিয়ায় অনেক মেয়ে আছে যারা আপনাকে বুঝবে, ভালোবাসবে।’
‘চিঠিতেও এটাই লিখেছিল।’
‘কী? স্ত্রীর চিঠিতে?’
‘হুঁ।’
‘সত্যি নাকি,’ শিমাও আবার মাথা নামাল বুকে। তার দুল একটা গোপন জিনিসের মতো ত্বকে লাগছিল।
‘এখন মনে হচ্ছে,’ কোমুরা বলল, ‘আমি যে বাক্সটা এনে দিয়েছি তার ভেতরে কী আছে?’
‘ভাবছেন?’
‘আগে ভাবিনি। কিন্তু এখন কেন জানি মাথায় ঘুরছে।’
‘কখন থেকে?’
‘এইমাত্র।’
‘হঠাৎ?’
‘হ্যাঁ, একবার ভাবতে শুরু করতেই হঠাৎ।’
‘হঠাৎ মাথায় ঘুরছে কেন?’
কোমুরা একটু ছাদের দিকে তাকিয়ে রইল ভাবতে। ‘কে জানে।’
দুজনে বাতাসের গোঙানি শুনল। বাতাস কোথা থেকে আসছে কোমুরার জানা নেই, কোথায় যাচ্ছে তাও না।
‘বলব কেন?’ শিমাও নিচু গলায় বলল। ‘কারণ ওই বাক্সে আছে আপনার ভেতরের সেই কিছু। বুঝতে পারেননি, নিজের হাতে বয়ে এনে কেইকোকে দিয়েছেন। এখন আর কখনও ফেরত পাবেন না।’
কোমুরা বিছানা থেকে উঠে মেয়েটার দিকে তাকাল। ছোট নাক, কানের লতিতে তিল। ঘরের গভীর নীরবতায় তার বুকের ভেতর জোরে শুকনো শব্দে হৃৎপিণ্ড ধড়াস ধড়াস করছে। সামনে ঝুঁকতে গিয়ে হাড় মটমট করল। এক মুহূর্তের জন্য কোমুরা বুঝতে পারল সে ভয়ঙ্কর একটা হিংস্র কাজের দ্বারপ্রান্তে।
‘মজা করছিলাম,’ শিমাও তার মুখের ভাব দেখে বলল। "মাথায় যা এল বলে ফেললাম। বাজে ঠাট্টা হয়ে গেছে। মাফ করবেন। মাথায় নেবেন না। কষ্ট দিতে চাইনি।’
কোমুরা নিজেকে শান্ত করল, ঘরের চারদিকে একবার তাকিয়ে আবার বালিশে মাথা রাখল। চোখ বুজে লম্বা শ্বাস নিল। বিশাল বিছানাটা চারদিকে রাতের সমুদ্রের মতো ছড়িয়ে আছে। হিমশীতল বাতাসের শব্দ পাচ্ছিল। বুকের প্রচণ্ড ধড়ফড়ানি হাড় কাঁপাচ্ছে।
‘এবার মনে হচ্ছে অনেক দূর এসেছেন?’ শিমাও জিজ্ঞেস করল।
‘হুঁ। এখন মনে হচ্ছে সত্যিই অনেক দূর এসেছি,’ কোমুরা সত্যিটা বলল।
শিমাও আঙুল দিয়ে কোমুরার বুকে একটা জটিল নকশা আঁকল--যেন কোনো মন্ত্র পড়ছে।
‘কিন্তু আসলে,’ সে বলল, ‘এটা তো সবে শুরু।’
**********
লেখক ও অনুবাদকের পরিচিতি : বিখ্যাত জাপানি ঔপন্যাসিক, ছোটগল্প লেখক হারুকি মুরাকামি। দেশ-কালের সীমানার গণ্ডিতে যাকে আটকানো কঠিন, এমন একজন লেখক তিনি। যার লেখা হৃদয় ছুঁয়েছে সারা বিশ্বের মানুষের। অপরদিকে কুলদা রায় গল্পকার। জন্ম গোপালগঞ্জে, ১৯৬৫ সালে। প্রকাশিত গ্রন্থ : বৃষ্টিচিহ্নিত জল, মার্কেজের পুতুল ও অন্যান্য গল্প, কাঠপাতার ঘর, কাকমানুষের চকখড়ি। বসবাস করছেন মার্কিন দেশে।


0 মন্তব্যসমূহ