হুয়ান রুলফোর গল্প : আসলে আমরা খুবই গরীব


অনুবাদ : শাহাব আহমেদ

[হুয়ান রুলফো লাতিন আমেরিকার সাহিত্যের পুরোধা লেখক। তিনি বিশ্বখ্যাত হয়েছেন মূলত দুটি বইয়ের জন্য। একটি তার উপন্যাস ‘পেদ্রো পারামো’, অন্যটি গল্পগ্রন্থ ‘লেলিহান প্রান্তর’—ইংরেজিতে The Burning Plain (স্প্যানিশ El Llano en llamas)। রুলফোর গল্পগ্রন্থ প্রকাশিত হয় ১৯৫৩ সালে। ‘পেদ্রো পারামো’ প্রকাশের দু’বছর আগে। প্রথম মুদ্রণে গল্প ছিল ১৫টি। দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয় ১৯৭০ সালে। এই সংস্করণে আরো দুটি গল্প যুক্ত করা হয়। রুলফোর এই ১৭টি গল্পই পাওয়া যায়। সম্প্রতি বাংলাদেশের কবি প্রকাশনী থেকে শাহাব আহমেদের অনুবাদে প্রকাশিত হয়েছে হুয়ান রুলফোর গল্পসমগ্র। সেই বই থেকে নেওয়া হয়েছে গল্পটি।] 

সবকিছু এখানে খারাপ থেকে আরো খারাপের দিকে যাচ্ছে। গত সপ্তায় হাসিন্তা খালা মারা যায় এবং শনিবার তাকে মাটি দেয়ার পরে শোকটা একটু থিতু হয়ে আসলে এমন মুসলধারে বৃষ্টি পড়তে শুরু করে যা আগে কোনোদিনও দেখিনি। বাবা ভীষণ রেগে যায়, কারণ ক্ষেত থেকে কেটে আনা রাই শস্যের সবটাই সে মুক্ত আকাশের নীচে স্তুপ করে রেখেছিল রৌদ্রে শুকোনোর জন্য। ভাসিয়ে নেয়া বৃষ্টিটা হঠাৎ করেই তেড়ে আসে তুমুল জলের ধারায়, মুঠোখানেক রাই সংগ্রহ করার সময়ও দেয় না। আমরা ঘরের ভেতরে একসাথে জড়াজড়ি করে বসে দেখি কিভাবে আকাশ থেকে নেমে আসা ঠাণ্ডা জলের ধারা সদ্য কাটা হলুদ রাই-শস্যগুলোকে ধংস করে যাচ্ছে।

আর গতকালই জানতে পাই, বাবা যে গরুটি আমার বোন তাচাকে উপহার দিয়েছিল বারোতম জন্মদিনে, নদী তাকে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে।

নদী ফুলে উঠতে শুরু করে তিনরাত আগে ভোরের দিকে। আমি তখন ঘুমিয়ে ছিলাম কিন্তু নদীর গর্জন আমাকে তৎক্ষণাৎ জাগিয়ে দেয়। আমি কম্বলটি হাতে নিয়ে বিছানা থেকে লাফ দিয়ে উঠি, মনে হয়েছিল যেন ঘরের ছাদ ভেঙে পড়ছে। ওটা নদীর শব্দ বুঝতে পেরে আবার ঘুমাতে যাই, কিন্তু না ঘুমানো পর্যন্ত শব্দটি একইভাবে শোনা যেতেই থাকে।

সকালে ঘুম থেকে জেগে দেখি ভোরটি কালো মেঘে ঢাকা, বৃষ্টির বিরাম নেই, মনে হচ্ছিল এক মুহূর্তের জন্যও থামেনি। নদীর শব্দটা দূর থেকে কাছে এগিয়ে আসছিল, গর্জনটাও উঁচু থেকে আরও উঁচু ও নিকটতর হচ্ছিল। দাবানলের গন্ধের মত নদীর পচা জলের দুর্গন্ধটা নাকে এসে ঝাপটা মারছিল।

ঘর থেকে বের হয়ে দেখতে পাই নদী আর নদীতে নেই, কূল ছাপিয়ে ধীরে ধীরে প্রধান সড়ক ধরে এগিয়ে যাচ্ছে মিসেস ‘লা তাম্বোরা’র বাড়ির দিকে। জল যখন তার আঙিনা ডুবিয়ে প্রচণ্ড বেগে দরজা দিয়ে ঘরের ভেতরে ঢুকতে শুরু করে স্পষ্টই শোনা যায় তার কল কল গল গল শব্দ। ততক্ষণে নদীরই অংশ হয়ে যাওয়া জলের মধ্য দিয়ে লা তাম্বোরা তড়িঘড়ি করে ভেতরে বাইরে ছুটাছুটি করছিল মুরগিগুলোকে তাড়িয়ে দেবার জন্য, যাতে ওরা কোনো নিরাপদ স্থানে লুকোতে পারে, যেখানে স্রোত তাদের গিলে খাবে না।

অন্যদিকে কখন কে জানে, নদী হাসিন্তা খালার তেঁতুল গাছটি ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। তাই এখন আর কোনো তেঁতুল নেই। সারা গ্রামে এই একটাই তেঁতুল গাছ ছিল। লোকজন স্বীকার করে যে বিগত বহু বছরের মধ্যে এবারের প্লাবনটি সবচেয়ে বড়।

দুপুরের পরে বোনকে নিয়ে জলের পাহাড় দেখতে যাই, যা ঘন ও গাঢ় হতে হতে ব্রিজটিকে ডুবিয়ে অনেক উঁচুতে উঠে এসেছে। আমরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা সেখানে ক্লান্তিহীন দাঁড়িয়ে থাকি জলের দিকে তাকিয়ে। তারপরে খাড়া ওপরের দিকে সরু উপত্যকায় উঠে যাই সেখানে লোকজন কী বলছে তা শোনার জন্য। নিচে নদীর কাছে বিরতিহীন গুর গুর শব্দ, সেখান থেকে দেখা যায় ওপরে অনেকগুলো মুখ খুলছে আর মুখ বুজছে কিন্তু তারা কী বলছে শোনা যাচ্ছে না কিছুই। এ কারণেই আমরা ওপরে উঠে আসি যেখানে লোকজন নদীর দিকে তাকিয়ে একে অন্যকে ঘটে যাওয়া ক্ষয় ক্ষতির বিবরণ দিচ্ছে। সেখানেই জানতে পারি যে, নদী আমার বোন তাচা’র লা সের্পেন্তিনা নামের গরুটিকে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। বাবা তাকে জন্মদিনের উপহার হিসেবে গরুটি দিয়েছিল। ওর একটি কান ছিল ধলা, অন্যটি লাল এবং চোখ দুটি ভারী সুন্দর!

যে নদী পার হয়ে সে অভ‍্যস্ত, এটা যে অন‍্যান‍্য দিনের সেই নদী নয় তা জেনেও লা সের্পেন্তিনা কেন নদীটি পার হতে গেল আমার মাথায় এখনও আসে না। সে কখনই এমন হাল্কা বুদ্ধির ছিল না। আমার বিশ্বাস সে ঘুমিয়ে ছিল, তাই নিজেকে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে দিয়েছে। বহুবারই দেখেছি গরুঘরের দরজা খুলে দেয়া সত্ত্বেও সে বের হয়নি, আমার তাকে জাগাতে হয়েছে। নইলে সে সেখানেই সারাদিন নড়াচড়া না করে চোখবুজে পড়ে থাকতো এবং ঘুমন্ত গরুর শ্বাস-নিঃশ্বাসের মত করে নি:শ্বাস ফেলতো।

সম্ভবত এখানেও তাই ঘটেছে। সে ঘুমিয়েছিল, জেগে উঠেছে গায়ে জলের আছাড় খেয়ে এবং সম্ভবত সে ভয় পেয়ে পেছনে ফেরার চেষ্টা করেছে কিন্তু পেছন ফিরতে গিয়ে তার চিন্তায় গোল পাকিয়ে গেছে, সে বুঝেই উঠতে পারেনি কোনদিকে যাবে এবং সেই কালো ও পিছল মাটির মত নির্মম জলে তার গায়ে খিঁচ ধরে গেছে। সে হয়তো হাম্বা হাম্বা চিৎকার করে সাহায্য চেয়েছে। আহা, শুধু ঈশ্বরই জানে কিভাবে সে চিৎকার করেছে!

যে লোক গরুটিকে স্বচক্ষে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে দেখেছে, তাকে জিজ্ঞেস করেছি সাথে থাকা বাছুরটিকেও সে ভেসে যেতে দেখেছে কি না। দেখেছে কিনা সে মনে করতে পারছিল না। শুধু বলেছে সে যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল ঠিক তার অদূরেই গায়ে গোল দাগওয়ালা একটা গরুকে পাগুলো ওপরের দিকে করে ভেসে যেতে দেখেছে। পরে সে ঘুরে গেলে তার শিং, পা বা অন্য কোনো কিছুই আর দেখা যায়নি। শিকড়বাকড়সহ বহু গাছের গুঁড়ি এবং বহুকিছুই নদী দিয়ে ভেসে যাচ্ছিল। আর সে ব্যস্ত ছিল চুলো জ্বালানোর জন্য কাঠ সংগ্রহে, সুতরাং সে নিশ্চিত বলতে পারে না সেখানে কোনো প্রাণি ছিলো, না শুধুই গাছের গুঁড়ি।

তাই সে জানে না বাছুরটা বেঁচে আছে, না মায়ের সাথে সেও নদীপথে ভেসে গেছে।

সর্বনাশটা হচ্ছে এখন আমাদের বাড়িতে বোনের আর কিছুই থাকলো না। বোনকে দেওয়ার জন্য বাছুর-বয়সের লা সের্পেন্তিনাকে জোগাড় করতে বাবার বহু ঝামেলা পোহাতে হয়েছে। দেওয়ার একটাই কারণ: বোনের যাতে অন্তত কিছু পুঁজি থাকে এবং আমার অন্য দুই বোনের মত তাকে বেশ্যায় পরিণত হতে না হয়।

বাবা বলে ওরা দু’জন বেশ্যা হয়েছে কারণ আমরা ছিলাম খুব গরীব আর ওরা ছিল ভীষণ ডানপিটে, ছোটকাল থেকেই বখাটে ও বেয়াড়া। একটু বড় হয়েই বাজে পুরুষের সাথে বাইরে যেতে শুরু করে যারা তাদের নষ্টামীর পথ দেখায়। ওরা খুব দ্রুতই বিদ‍্যাটা রপ্ত করে এবং অচিরেই গহীনরাতে বাইরের শিস শুনে বের হয়ে যেতে শুরু করে। পরে তারা দিনে দুপুরেই বের হয়ে হত। এমনকি যখন নদীতে জল আনতে যেত, বা যা কখনও কল্পনাই করা যায় না, বাইরে খোয়ারে যেত, দেখা যেত ওরা সম্পূর্ণ ন্যাংটা হয়ে মাটিতে হুটোপুটি খাচ্ছে। একেকজনের ওপরে একেকটি মরদ।

তাই বাবা দুজনকেই তাড়িয়ে দেয়। যতদিন সম্ভব সে সহ্য করেছে কিন্তু যখন আর পারছিল না, তাদের রাস্তায় বের করে দেয়। এরপর ওরা আয়ুত্লায় চলে যায়, অথবা অন্য কোথাও, আমি জানি না, কিন্তু তারা বাজে মেয়েমানুষ।

এ কারণেই বাবা তাচাকে নিয়ে দু:শ্চিন্তায় অস্থির ছিল, সে চায়নি তাচা তার দু’বোনের মত উচ্ছন্নে যাক। সে বুঝতে পারছে গরুটি হারিয়ে তাচা এখন নি:স্ব, তার আর কোনো ভরসাই রইলো না যার বলে বড় হয়ে সে ভালো কোনো পুরুষকে বিয়ে করতে পারবে, যে তাকে সবসময় ভালোবাসবে। এখন তা খুবই কঠিন হয়ে গেল। গরুটি যখন ছিল অন্য কথা, অন্তত সুন্দর গরুটি পাবার জন্য হলেও কেউ না কেউ ওকে বিয়ে করতে চাইতো।

আমাদের এখন একটাই আশা যে বাছুরটি বেঁচে আছে। আশা করছি, বাছুরটি তার মায়ের পিছে পিছে নদী পার হবার চেষ্টা করেনি। যদি সে করে থাকে তবে তাচা নষ্ট নারী হবার থেকে মাত্র এক পা দূরে। মা তা মোটেও চায় না।

মা কোনোমতেই বুঝে উঠতে পারে না ঈশ্বর কেন তার গর্ভে এই ধরনের মেয়ে পাঠিয়ে শাস্তি দিল। তার পরিবারে, নানী থেকে শুরু করে এই পর্যন্ত কখনই কোনো মন্দ মেয়েমানুষ ছিল না। সকলেই ঈশ্বরকে ভয় করে বড় হয়েছে, অবাধ্য হয়নি, এবং কখনই কাউকে অশ্রদ্ধা করেনি। হ্যাঁ, সে রকমই ছিল সবাই। কে জানে কোত্থেকে তার মেয়েদুটো এমন মন্দ হলো। সে কিছুই মনে করতে পারে না। স্মৃতিতে তন্নতন্ন করে খুঁজেও কোনো পাপ খুঁজে পায় না যার দরুন একটার পর আর একটা খারাপ মেয়ে জন্ম নেবে। সত্যিই এমন কিছু তার মনে পড়ে না। তাদের কথা মনে পড়লে অশ্রু ধরে রাখতে পারে না এবং প্রার্থনা করে, “হে ঈশ্বর তুমি ওদেরকে দেখে রেখো।”

বাবা বলে, ওদের ব্যাপারে এখন আর কিছুই করার নেই। বাড়িতে যেটি লাঠির মত লকলকিয়ে লম্বা হচ্ছে, যার স্তনগুলো বোনেদের স্তনের মতই ফুলে উঁচু ও তীক্ষ্ণ হয়ে দুলে দুলে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে, বিপদ তাকে নিয়েই। বাবা বলে, যেই তাদের দেখুক না কেন চোখ ওখানে গিয়ে আটকাবেই। সেও মন্দ পথেই যাবে। আমার কথাগুলো লিখে রেখো, নষ্ট সে হবেই।

এ কারণেই সে ভীষণভাবে রেগে আছে।

গরুটিকে নদী নিয়ে গেলে, সে আর ফিরে আসবে না, বুঝতে পেরে তাচা কান্নায় ভেঙে পড়ে। এই তো, সে গোলাপী জামা গায়ে সরু উপত্যকার খাঁড়ির ধারে আমার পাশে দাঁড়িয়ে নদীর দিকে তাকিয়ে কাঁদছে। তার চোখ থেকে নোংরা জল ঝরছে, যেন নোংরা জলের নদীটাই তার ভেতরে ঢুকে গেছে। আমি ওকে জড়িয়ে ধরে শান্তনা দেবার চেষ্টা করছি কিন্তু কাজ হচ্ছে না। আরও বেশি করে কাঁদছে। নদী যেমন তীরে আছাড় খেয়ে শব্দ করছে, তেমনি শব্দ বের হয়ে আসছে ওর মুখ থেকে। আর সারাটা শরীর কেঁপে ওঠছে। নদীটা ফুলতেই থাকে। তার দুর্গন্ধ জলের ছিটা এসে তাচার ভেজা মুখে লাগে এবং তার ছোট স্তন দুটো ওপরে নীচে দুলতে থাকে অবিরাম, যেন হঠাৎ করেই তারা ফুলতে শুরু করেছে এখনই ধ্বংসের পথে যাত্রা শুরু করার জন্য।

**********

অনুবাদকের পরিচিতি : শাহাব আহমেদ শিশুচিকিৎসক ও কথাসাহিত্যিক। উপন্যাস ও ভ্রমণসাহিত্য লিখে ইতোমধ্যে চিন্তাশীল পাঠকদের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন। সোভিয়েত ইউনিয়নে পড়াশোনা করার সূত্রে রুশ ভাষায় পারদর্শী ও রুশ সাহিত্যের বাংলা অনুবাদে সক্রিয়। 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ