রঞ্জনা ব্যানার্জী'র দুটি গল্প : আয়না ও মিকিমিনি



আয়না

উনি বসতে বসতেই বললেন, ‘বসি?’

মেয়েটা দেখল।

অফিস ফেরার পথে এখানেই গাড়ি ছেড়ে দেন তিনি। এরপর পার্কে দুই চক্কর দিয়ে বাড়ি ফেরেন। ক’জন বখাটেকে ঘুরঘুর করতে দেখেই আজ সিদ্ধান্ত পাল্টালেন।

‘এদিকটা নিরাপদ নয়’, উনি তথ্য দিলেন যেন।

‘গাছের নিচে ভালো লাগছে। খানিক পরেই চলে যাব।’

‘তবে আমিও সেই পর্যন্ত বসি। কোন ক্লাসে পড়?’

‘নাইন।’

‘গাছ ভালোবাস?’

‘সমুদ্র বেশি। ঢেউয়ের চুড়োয় সাদা ফেনা কিংবা অহল্যার মত জমাট বালিয়াড়ির ওপরে বিশাল আকাশ- মনে হয় এইসব আমারই অংশ।’

‘সাংঘাতিক গুছিয়ে কথা বল তো তুমি! অহল্যার মতো বালিয়াড়ি’- এটা কি কবিতায় পেয়েছ?’

‘নাহ’

‘অহল্যাকে চেন?’

‘গৌতম বুড়ো ঘুমিয়ে পড়লে ইন্দ্রের সাথে ইনি মেসেঞ্জারে চ্যাট করতেন।’

হো হো করে হেসে ওঠেন তিনি, ‘এটা কোথায় পেলে?’

মেয়েটা নির্লিপ্ত স্বরে বলে, ‘মজা করছি। আমি রামায়ণ পড়েছি।’

‘তুমি চ্যাট কর?’

‘নিজের সঙ্গে করি। সেই কারণেই গুছিয়ে কথা বলতে পারি। আমার কথারা মগজের খোপে গোছানো থাকে। তাসের ম্যাজিকের মতো ঠিক সময়ে ঠিক কথাটা বার করি।’

‘তার মানে ফাঁকিবাজি’

মেয়েটা ফের বিষণ্ণ হয়। তিনি প্রসঙ্গ ঘোরান।

‘তুমি তাস খেল?

‘নাহ্‌, মা-বাবা খেলতেন। সাজু মামা আর মা পার্টনার, বাবা আর মল্লিকা আন্টি’

‘ওরা কারা?’

‘মাবাবার বন্ধু। মল্লিকা আন্টি মরে গেল।’

‘আহা! অসুখ করেছিল?’

মেয়েটা উত্তর দেয় না।

উনি এবার মোক্ষম প্রশ্নটি করেন, ‘তুমি যে এখানে তা বাড়িতে জানে?’

‘আমি বাড়ির সব আয়না ভেঙে দিয়েছি আজ’।

‘সে কি!’

‘আয়না আপনাকে বদলে দেয়।’

‘কীভাবে?’

‘আয়নায় যাকে দেখেন সে তো আপনি নন। আপনার ডান চোখ ওর বাম চোখ, আপনার ডান হাত ওর বাম হাত। আপনি, আপনি থাকেন না আর।’

‘প্রতিবিম্ব তো অমনই হয়। হুবুহু কেউ কারো মুখোমুখি হতে পারে না। মনে মনেও নয়।’

মেয়েটা ওর স্নিকারের আগা দিয়ে একমনে মাটি খুঁটে যায়।

‘শোনো সবসময় নিজের সঙ্গে কথা বলে কিন্তু সবকিছুর সমাধান হয় না। বাড়িতে এতক্ষণে নিশ্চয় তোমার খোঁজ পড়ে গেছে? তুমি যদি চাও আমি তোমাকে পৌঁছে দিতে পারি।’

‘না আমি একাই যেতে পারব’

উনি উঠে দাঁড়ান, ‘তবে ওঠা যাক’

মেয়েটাও দাঁড়ায়।

রিকশতে ওঠার আগে মেয়েটা হঠাৎ তাঁর দিকে ফেরে। রাস্তার লাইটে ওর চোখ অদ্ভুত চিকচিক করতে থাকে।

‘সাজু মামা, মল্লিকা আন্টি, আম্মু আর আমি সুর্যাস্ত দেখতে গিয়েছিলাম। আন্টির কপালে জ্বলজ্বলে লাল টিপ। বাবার জরুরি কল আসবে বলে মোটেলে ছিলেন। আন্টির মাইগ্রেনের ব্যথা উঠল। মোটেল কাছেই।উনি একাই ফিরে গেলেন। ফেরার পথে আমরাও গেলাম আন্টিকে দেখতে।টিপ নেই তাও আন্টিকে ঝলমলে দেখাচ্ছিল। ওয়াশরুমে ঢুকতেই দেখি টিপটা জ্বলজ্বল করছে আমাদের আয়নায়। সাজু মামার হাতে দিয়ে এসেছিলাম টিপটা।পরদিন সুর্য ওঠার আগেই মল্লিকা আন্টি হেঁটে ঢুকে গেল সমুদ্রে।’

মেয়েটার রিক্সা ক্রমে মিশে যাচ্ছে ভিড়ে।

উনি স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে তখনো...

মিকিমিনি

তেত্রিশ বছর আগের এক বিকেলে ওরা 'নেই' হয়ে গিয়েছিল। সুদীপের নাগাল থেকে দূরে রাখার জন্যে ঠাম্মার দেরাজে তুলে রাখতাম ওদের। সুদীপের এত খেলনা তাও বেছে বেছে এই মিকিমিনিই পছন্দের ছিল। একবার হাতে পেলে আর দিতে চাইতো না। বেঞ্চের নিচে যেখানে কলটা আটকানো ঠিক সেখানটায়, বাঁদিকে একটু ভাঙা---স্পষ্ট মনে আছে।

শার্পনারটা আমার জন্মদিনে সিরাজ কাকু দিয়েছিলেন। প্রথমদিনই আস্ত একটা পেন্সিল খোসা ছাড়াতে ছাড়াতে প্রায় এক কড়ের কাছাকাছি করে ফেলেছিলাম। তাও নিব বেরোয়নি। সিরাজ কাকুও চেষ্টা করেছিলেন---'ধুর! ভোঁতা।' আমাদের কসরত দেখে মা বলেছিলেন, 'এত সুন্দর! নাইবা কাটলে পেন্সিল।' পেন্সিলের খোসাগুলো ভেতর থেকে বেরুচ্ছিল না। মাটিতে ঠুকেছিলাম আমি, শার্পনারের বাঁপাশে তাতেই ছড়ে গিয়েছিল।

এত দেশ ঘুরেছি, কোথাও এমন নিখুঁত মিকিমিনি চোখে পড়েনি। কেউ ব’লে না-দিলে বোঝার উপায় নেই যে এটা একটা শার্পনার। মিনির মাথায় ইয়াব্বড় সেই লাল-শাদা পোলকা ডট রিবন আর মিকির পরনে লাল শর্টস তাতে দুটো সাদা বোতাম। মিকির চোখ মিনির দিকে আর মিনি সরাসরি আমার দিকে তাকিয়ে; ঠিক তেত্রিশ বছর আগের মতোই!

কাকি বলে যাচ্ছেন কাকুর শেষ সময়ের ঘটনা আর আমি ক্রমশ খেই হারাচ্ছি। গরম দুধ জ্বাল দিয়ে উথলে পড়ার মতো হুড়মুড়িয়ে সব দৃশ্য উপচে উঠছে চোখের সামনে---দু’বিনুনি করা আট বছরের মেয়েটা বুক ভেঙে কাঁদছে। বাড়ির সবাই আতিপাতি খুঁজছে। সাত বছরের সুদীপকে মা ধমকাচ্ছে, 'তুই নিয়েছিস?' ঠাম্মা জেরা করছে সোনার মাকে, 'তুই লইইয়স নি খনো?'

সিরাজ কাকুর সাইকেলের দোকানের নাম ছিল 'হিজ অ্যান্ড হারস'। সাইনবোর্ডের নিচে একটা ঝকমকে মেয়ে আর ছেলে। পাশেই ইংরেজিতে প্যাঁচানো লোগো 'এইচ অ্যান্ড এইচ'। একবার আমেরিকায়, টাইম স্কোয়ারে 'এইচ অ্যান্ড এম'-এর সামনে দাঁড়িয়ে হঠাৎ কাকুকে মনে পড়েছিল, মিকিমিনিকেও। সিরাজ কাকু নেই। মা-বাবাও চলে গেছেন জীবনের ওপারে! দেশে এলে এখন আর তিন সপ্তাহ'র বেশি থাকা হয় না আমার। এর মধ্যে অনেকটা সময় চলে যায় আরোপিত সম্পর্কগুলোর দায় মেটাতে। একসময় যারা খুব কাছের ছিলেন এই দায়ের টানাপোড়েনে তাঁরা বৃত্তের বাইরেই রয়ে যান।

দুদিন পরেই ফিরবো। কিছু শপিং বাকি ছিল। আজ নাসিরাবাদের 'আফমি প্লাজা'য় গিয়েছিলাম দীপার সঙ্গে। দীপা, সুদীপের বউ। জিনিসপত্রের সেকি দাম! কেনাকাটার চেয়ে দেখাই হলো বেশি! কখন যে দুপুর পেরিয়ে গেছে খেয়াল করিনি। টেক্সির জন্যে অপেক্ষা করছিলাম রাস্তায়। হঠাৎ পেছন থেকে কেউ জড়িয়ে ধরলো। আঁতকে উঠেছিলাম। দীপাই চেনালো---'মিতু'! কত বছর পর দেখা! জোর করে নিয়ে গেল রনির বাড়িতে। কাছেই বাড়ি। মেহেদিবাগে। 'এত কাছে এসে আম্মিকে না-দেখে ফিরে যাবে?' মিতুর গলায় অভিমান। কাকি রনির সঙ্গেই থাকেন। ভরদুপুরে কারো বাড়িতে খবর না-দিয়ে যাওয়াটা ঠিক? মিতু ম্লান হাসে, 'রুম্পা দি, আগে আম্মি কিংবা কাকিমা কেউই সময় মেপে এবাড়ি-ওবাড়ি যেত না। মনে আছে রনির প্রিয় কোকোলা নুডলস জমা থাকতো কাকিমার জালালমারিতে?' মায়ের রান্নাঘরের সেই নেটের ভাঁড়ারকে আমরা 'জালালমারি' বলতাম। মিতুর মনে আছে!

কাকিকে দেখে মা’র জন্য মনটা হু হু করে উঠলো। রোদে পিঠ দিয়ে ব্যালকনিতে বসে চুষি-সেমাই কাটছিলেন। আমাকে দেখে কী যে খুশি হলেন! রনি অফিসে। ওর সঙ্গেও ফোনে কথা হলো। ও জানালো ফিরছে তাড়াতাড়ি। ফ্ল্যাটটা বেশ বড়। আম-জাম গাছে ছাওয়া দামপাড়ার সেই বাড়িটা নাকি সিরাজ কাকু থাকাকালীনই বিক্রি হয়ে গেছে। সাইকেলের দোকানটাও নেই আর। রনির বৌ সীমাকে এই প্রথম দেখলাম আমি। বেশ মিশুক। অল্প সময়েই টেবিল ভরিয়ে আয়োজন করে ফেললো।

খাওয়া শেষে সবাই বসেছিলাম ড্রইংরুমে। কাকুর অন্তিম সময়ের কথা বলছিলেন কাকি, "পেপার পড়তেসিলেন। বাথরুমে গেলেন; ফিরে বললেন, 'পানি দাও।' পানির গ্লাস হাতে রুমে ঢুকসি, দেখি টেবিলের উপ্রে মাথা এলায় রাখসে।" আমি মা’র মুখে শুনেছিলাম এই ঘটনা। ভালো মানুষ। জ্বর-জারি নেই; ফট্ করে চলে গেলেন! কাকির কথা শুনতে শুনতে আমি চোখ বোলাচ্ছিলাম ড্রইংরুমের সজ্জায়---

যে সোফাটায় আমি বসেছি ঠিক তার সামনে নান্দনিক তাকের বিভাজনে ড্রইং, ডাইনিং আলাদা করা হয়েছে। বাঁদিকে দুটো পুরোনো ডিজাইনের শোকেস। একটাতে বিভিন্ন দেশের শোপিস, আরেকটাতে ক্লাসিক সব বই।

ছেলেবেলায় রনি, মিতুর হাতে গল্পবই দেখেছি, এমনটা মনে পড়ে না। রনি ছিল গাড়ির পাগল। কত যে খেলনা গাড়ি ছিল ওর! হঠাৎ চোখ থমকালো---বইয়ের তাকে মার্কেজের 'লাভ ইন দ্য টাইম অব কলেরা'র গায়ে ঠেস দিয়ে তাকিয়ে আছে মিকিমিনি!

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ