মূল গল্প : টু কাইন্ডস
অনুবাদ : ফারহানা আনন্দময়ী
তোমার মন যেটা হতে চাইবে, আমেরিকায় তার যে কোনোকিছুই তুমি হতে পার—এরকমই বিশ্বাস আমার মায়ের। একটা রেস্তোরাঁ খুলতে পারো তুমি। কোনো সরকারি চাকরিতে যোগ দিতে পারো এবং অবসরের পরে ভালো একটা ভাতা পেতে পারো। অগ্রিম কোনো টাকা জমা না দিয়েই নতুন একটা বাড়ি কিনতে পারো। প্রচুর অর্থের মালিক হয়ে যেতে পারো। আবার রাতারাতি বিখ্যাতও হয়ে যেতে পারো তুমি।
যখন আমার নয় বছর বয়স, মা তখন আমাকে বলেছিল, “অবশ্যই প্রতিভা দিয়ে একজন বিস্ময়বালিকা হতে পার তুমি। যে কোনো বিষয়ে তুমি সেরা হয়ে উঠতে পার। লিন্ডো আন্টি আর এমন কী জানে? ওর মেয়েটা তো চালাকি বুদ্ধিতেই সেরা শুধু।”
আমার মায়ের সকল আশা-ভরসার কেন্দ্রস্থল হলো আমেরিকা। ১৯৪৯ সালে সবকিছু হারিয়ে মা চীন থেকে আমেরিকায় চলে আসে; তার মা-বাবা, নিজের বাড়ি, প্রথম স্বামী এবং জমজ দুজন কন্যাশিশু সবাইকে হারিয়ে সে আসে। কিন্তু কোনোরকম হাহাকার নিয়ে সে কখনও অতীতের দিকে ফিরে তাকায়নি। নিজের জীবনকে সুন্দর করবার অনেকধরণের পথই তার সামনে উন্মুক্ত ছিল।
কোন ধরনের প্রতিভার চর্চা করে বিস্ময় জাগানো উচিত, সেটা শুরুতে আমরা বুঝে উঠতে পারিনি। মা প্রথমে ভেবেছিল, আমি অভিনেত্রী শার্লি টেম্পলের মতো হতে পারব। শার্লি টেম্পলের পুরনো মুভিগুলো টিভিতে আমরা এমনভাবে দেখতাম যেন সেখানে অভিনয় শেখানো হচ্ছে। আমার বাহুতে গুঁতো দিয়ে মা আমায় বলত, “নি কান, দ্যাখো।” শার্লি ওর পা দিয়ে কীভাবে তালে তাল মেলাচ্ছে, কীভাবে ‘সেইলর সং’ গাইছে, ওর ঠোঁটটা ইংরেজি ‘ও’এর মতো গোলগোল করে কীভাবে ‘ওহ মাই গুডনেস’ উচ্চারণ করছে... এ সবই দেখতাম আমি।
শার্লির চোখ যখন জলে ভরে উঠত, মা আমায় বলত, “নি কান, এরইমধ্যে তুমি জানো কান্না কী। কাঁদবার জন্য তোমার আলাদা প্রতিভা দেখানোর দরকার নেই।”
মায়ের মাথায় শার্লি টেম্পল বানাবার ধারণাটা আসবার পর মা আমাকে নিয়ে যায় মিশন ডিস্ট্রিকের একটা বিউটি প্রশিক্ষণ স্কুলে। সেখানে একজন শিক্ষার্থীর হাতে আমাকে সুন্দর করার ভার দেয়, যে নিজেই কাঁচিটা ঠিকঠাক ধরতে পারে না, তার হাত কাঁপছিল। আমার চুলগুলো বড় বড় সুন্দর কোঁকড়ানো করে দেবার বদলে একগাদা রুক্ষ, এলোমেলো চুলের জটলা বসিয়ে দিল আমার মাথায়। মা সেটা দেখে টেনে আমাকে বাথরুমে নিয়ে গিয়ে, চুলগুলো জলে ভিজিয়ে ঠিক করবার চেষ্টা করল।
“তোমাকে দেখতে লাগছে নিগ্রো-চীনাদের মতো।” এমন আফসোসের স্বরে বলল আমাকে মা, যেন এমনটা আমি নিজেই ইচ্ছে করে করেছি। এবার সেই প্রশিক্ষণ স্কুলের প্রশিক্ষককে দিয়ে আমার মাথার জট-পাকানো ভেজা চুলগুলো কেটে ফেলে দিতে হলো, যেন আবার আগের মতো সমান হয়ে যায়। আমার মাকে আশ্বস্ত করে প্রশিক্ষক তখন বলল, “পিটার প্যান এখন অনেক জনপ্রিয়।” আমার চুলগুলো তখন ছেলেদের চুলের মতো ছোট হয়ে গেছে আর কপালের দিকে ‘ব্যাং-কাট’ হয়ে আড়াআড়ি আমার ভ্রূর ওপরে এসে পড়ছিল। এই হেয়ার কাটটা বেশ পছন্দই হলো আমার। আর আগামীদিনের খ্যাতির কথা কল্পনা করে মনে মনে খুশি লাগছিল।
সত্যি বলতে কি, প্রথমদিকে মায়ের মতোই উত্তেজিত ছিলাম আমি, হতে পারে, তারও চেয়ে বেশি। নিজের সুপ্ত প্রতিভাকে আমি নানাভাবে, নানারূপে কল্পনা করতাম, এবং প্রতিটি রূপকেই বিভিন্ন ছকে বসিয়ে দেখতাম। কল্পনা করতাম যেন আমি মঞ্চের পর্দার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একজন সুন্দর ব্যালেরিনা নৃত্যশিল্পী, যে সুর বেজে উঠবার জন্য অপেক্ষা করছি। পায়ের আঙুলের ওপর ভর করে সেই সঙ্গীতের সুরে ভেসে যাচ্ছি। গোয়ালঘরে খড়ের গাঁদার সেই দেবশিশু আমি যে, অবজ্ঞার পবিত্র কান্না কাঁদছি। কিংবা কল্পনা করতাম, ঝকমকে কার্টুনের মিউজিক ভরা বাতাস বইছে আর আমি যেন সিন্ডারেলা হয়ে কুমড়োর গাড়ি থেকে নেমে আসছি। আমার কল্পনাগুলো আমায় এমন একটা অনুভব দিত যেন খুব শিগগির আমার সমস্ত প্রতিভা নিখুঁত হয়ে উঠবে আর মা-বাবা অনেক ভালোবাসবে আমাকে।
গালমন্দ শুনবার মতো কিছু ভুল থাকবে না আর। কোনোকিছু নিয়ে অনুযোগ করবার মতোও কিছু থাকবে না আমার।
কখনও কখনও এমনও হতো, আমার অন্তর্গত সেই সুপ্ত প্রতিভাগুলো ধৈর্য হারিয়ে অস্থির হয়ে উঠত। ভেতর থেকে বলে উঠত, “এখনই যদি আমাকে বিকশিত না করো, আমি একেবারেই হারিয়ে যাব। আর তুমি চিরজীবন তুচ্ছ, নগণ্য হয়েই রয়ে যাবে।”
প্রতিরাতে খাওয়াদাওয়ার পরে রান্নাঘরের ফরমিকা লাগানো টেবিলটাতে বসতাম আমার মা আমি। সেখানে বসে আমার জন্য নতুন নতুন সব পরীক্ষার আয়োজন করত মা। সেগুলো সে নিত বিভিন্ন বিস্ময়শিশুর জীবনী থেকে আর এই গল্পগুলো মা সংগ্রহ করত ‘রেপ্লিজ বিলিভ ইট অর নট’, ‘গুড হাউজকিপিং’ ‘রিডার্স ডাইজেস্ট’ কিংবা নানারকম পত্রিকা থেকে; যেগুলো জমিয়ে রাখা হতো আমাদের বাড়ির বাথরুমে। পত্রিকাগুলো মা নিয়ে আসত অন্যের বাসা থেকে, যেসব বাসায় সে ঘর পরিষ্কারের কাজ করত। মা প্রতিসপ্তাহে অনেকগুলো বাড়িতে কাজ করত, তাই অনেক পত্রিকা আমাদের সংগ্রহে ছিল। সেইসব পত্রিকায় এইসব বিস্ময়কর প্রতিভার শিশুদের গল্প খুঁজে খুঁজে, মনোযোগ দিয়ে পড়ত মা।
প্রথমদিন রাতে মা বেছে নিল এমন একটা শিশুর গল্প, যার বয়স তিন বছর। শিশুটি প্রতিটা রাজ্যের রাজধানীর নাম বলতে পারত। এমন কি ইওরোপের বিভিন্ন দেশের রাজধানীর নামও সে বলে দিত জিজ্ঞেস করলে। একজন শিক্ষক তাকে উল্লেখ করে বলেছিল, ছোট্ট ছেলেটি বিদেশি শহরের নামগুলোও বলতে পারে শুদ্ধ উচ্চারণে।
গল্পটির দিকে তাকিয়ে থেকে মা আমার কাছে জানতে চাইল, “ফিনল্যান্ডের রাজধানীর নাম কী?”
একমাত্র ক্যালিফোর্নিয়ার রাজধানীর নামই আমি জানতাম। চায়নাটাউনের যে রাস্তাটায় আমরা থাকতাম, সেটার নাম ছিল ‘স্যাক্রামেন্টো।’ আমি বলে উঠলাম, ‘নাইরোবি’, কারণ এই বিদেশি শব্দটাই আমার সবচেয়ে বেশি জানা ছিল। সঠিক উত্তরটা আমাকে বলবার আগে মা নিজে আরেকবার পরীক্ষা করে দেখল যে, এটা কি হেলসিংকি উচ্চারণের কাছাকাছি কোনো শব্দ হতে পারে কি না!
মায়ের পরীক্ষাগুলো আরো কঠিন হয়ে উঠতে লাগল। মনে মনে সংখ্যা গুণ করে বলতে পারা, এক বান্ডিল তাস থেকে ‘হার্ট অভ কুইন’ খুঁজে বের করতে পারা, কিংবা শীর্ষাসন করবার চেষ্টা করা এবং লস এঞ্জেলেস, নিউ ইয়র্ক ও লন্ডনের রোজকার তাপমাত্রা অনুমান করা।
একদিন রাতে তিন মিনিট ধরে বাইবেলের একটা পাতা আমাকে দেখতে বলা হলো, এবং পড়ে কী কী মনে রাখতে পারলাম, সেটাও বলতে হলো। আমি বললাম, “যীহোশাফাটের অনেক ধনসম্পদ আর সম্মান ছিল, এর বাইরে আমার আর কিছুই মনে পড়ছে না, মা।”
এরপর আমি দেখলাম মায়ের চেহারাটা হতাশায় ছেয়ে গেল। সেটা দেখবার পর আমার ভেতরটাতেও কী যেন একটা ধীরে ধীরে মরে যেতে লাগল। এতসব পরীক্ষা আর আমাকে নিয়ে উচ্চাশাগুলো ব্যর্থ হতে দেখতে ঘেন্না লাগতে শুরু করল। সেইদিন রাতে ঘুমাতে যাবার আগে বাথরুমে গিয়ে বাথরুমের আয়নায় তাকিয়ে নিজের মুখটা দেখতে পেলাম কেবল; যে মুখটা নিতান্তই সাধারণ এক মুখ। বুঝতে পারলাম, এ মুখটা এরকমই রয়ে যাবে। কাঁদতে শুরু করলাম আমি। কেমন দুঃখী আর কুশ্রী একটা মেয়ে আমি! কষ্টে আমার পাগল-পাগল লাগতে লাগল, চিৎকার করে আয়নায় দেখা নিজের মুখটা ঘষে মুছে দিতে চেষ্টা করলাম আমি।
আর ঠিক তখনই আমি দেখতে পেলাম আমার ভেতরগত বিস্ময়জাগানো প্রতিভার রূপটি; আগে কখনও এই রূপটি আমি দেখিনি। ঘন ঘন চোখের পলক ফেলে আমি তখন আমার সেই প্রতিবিম্বের দিকে তাকালাম, যাতে আরও স্পষ্ট করে দেখতে পাই। আমার দিকে যে মেয়েটি তাকিয়ে ছিল, সে ছিল রাগী এবং শক্তিমান। সে মেয়েটি আর আমি একই মানুষ ছিলাম। আমার ভাবনায় তখন নতুন সব চিন্তা আসছিল, জেদি চিন্তা; কিংবা এমনও বলা যায়, ‘না’ দিয়ে ভরা সেসব চিন্তা। আমি নিজের সাথে প্রতিজ্ঞা করলাম, ওই মেয়েকে আমি বদলে দিতে দেব না আমাকে। আমি সেটা হবো না, যা আমি নই।
তো এখন যেটা হয়, আমার মা যখন পরীক্ষাগুলো নিত, হাতের ওপর মাথাটা রেখে, আমি জবাব দিতাম উদাসিনভাবে। ভান করতাম, আমি অনেক বিরক্ত। আর আসলেই, বিরক্তও হতাম আমি। সত্যিসত্যিই এত বিরক্ত লাগত আমার, যে, মা আমাকে যখন অন্য সব বিষয়গুলো বোঝাচ্ছিল, আমি তখন গুনতে আরম্ভ করেছিলাম উপসাগর থেকে ভেসে আসা ফগ-হর্নের আওয়াজ। সেই আওয়াজগুলো ছিল আনন্দদায়ী যা আমাকে মনে করিয়ে দিত ছোটবেলার সেই ছড়া, ‘দ্য কাউ জাম্পিং ওভার দ্য মুন’-এর কথা। এরপরের দিন একটা খেলা শুরু করলাম আমি নিজের সাথে। খেলাটা হলো, ফগ-হর্নগুলো আটবার আওয়াজ করবার আগে মা হাল ছেড়ে দেয় কি না আমাকে পড়ানোর। এর কিছুক্ষণ পর একবার আওয়াজটা গুনতাম সাধারণত, বড়জোর দু-বার পর্যন্ত গুনেছিলাম। আমার মা শেষপর্যন্ত হাল ছেড়ে দিয়েছিলেন।
দু-তিনমাস পার হয়ে গেল। আমি যে প্রতিভাজাত একজন বিস্ময়বালিকা, এ কথা কেউ আর বলছিল না। তারপর একদিন হলো কী, টিভিতে ‘দ্য এড সালেভান শো’ দেখছিল আমার মা। টিভিটা ছিল পুরনো আর বারবার করে তার আওয়াজ চলে যাচ্ছিল। আওয়াজ ঠিক করবার জন্য প্রত্যেকবার সোফা থেকে মা অর্ধেক পথ যেতেই আওয়াজ ফিরে আসত এবং এড-এর কথা শোনা যেত। মা ফিরে সোফায় এসে বসতেই এড-এর কথা আবার হারিয়ে যেত। মা যেই আবার উঠল, তখুনি পিয়ানোর বাজনা শুরু হলো। মা আবার যেই-না বসল, বাজনার শব্দ বন্ধ হয়ে গেল। মা উঠছিল-বসছিল, যাচ্ছিল-আসছিল, টিভির আওয়াজ-ও শোনা যাচ্ছিল-হারিয়ে যাচ্ছিল। ঠিক যেন নিশ্চল, আলিঙ্গনবিহীন এক নৃত্যদৃশ্য মা এবং টিভি সেটের সাথে! শেষমেশ সাউন্ডের নবের ওপরে হাত রেখে টিভির পাশেই দাঁড়িয়ে রইল মা।
সঙ্গীতের নেশার ঘোরে মা যেন বুঁদ হয়ে গিয়েছিল। পিয়ানোর ছোট্ট এই মনমাতানো সুরের যাদু ছিল খুবই সম্মোহনী; কিছুক্ষণ দ্রুতলয়ে বাজবার পরেই আবার ফিরে আসছিল মৃদু ছন্দ, এর খানিক পরে আবার চটুল দ্রুতলয়ে।
“নি কান, এদিকে দ্যাখো।” মা খুব দ্রুত হাত ইশারা করে বলল আমাকে।
সঙ্গীতের ওই মূর্ছনায় আমার মা কেন এত মুগ্ধ হলো, আমি বুঝতে পারলাম। নয় বছরের একটা ছোট্ট চীনা মেয়ে, যার ‘পিটার প্যান’-এর হেয়ার কাট, সে খুব জোরে পিয়ানোতে সুর বাজাচ্ছিল। শার্লি টেম্পলের চঞ্চলতা আর দুষ্টামির ছায়াও তার মধ্যে। একজন আদর্শ চীনা শিশুর মতো গর্বিত এবং বিনয়ী ছিল সে। এমন সুন্দর করে মেয়েটি অভিবাদন জানাচ্ছিল যে, ওর পরনে সাদা জামার স্কার্টের ফোলা অংশটি মেঝের চারদিকে এমনভাবে ছড়িয়ে পড়ছিল যেন সেটা বড় একটা কার্নেশন ফুলের পাপড়ি।
এসব সতর্কসংকেতের পরেও চিন্তিত ছিলাম না আমি। কোনো পিয়ানো ছিল না আমাদের পরিবারে এবং একটা পিয়ানো কেনাও ছিল আমাদের সাধ্যের বাইরে। আর তোড়া তোড়া স্বরলিপি কিনে, পিয়ানো শিখবার স্কুলে ভর্তি হওয়াটা তো অনেক দূরের বিষয়। সেজন্যই যখন আমার মা টিভিতে পিয়ানো বাজানো মেয়েটির নিন্দা করছিল, আমি তখন মন্তব্য করছিলাম খোলামনে।
“সঠিক নোটেই বাজাচ্ছে, কিন্তু শুনতে মোটেও ভালো লাগছে না। গানের সুরের মতো শোনাচ্ছে না।” মা বলল অভিযোগের সুরে।
আমি নির্লিপ্তভাবে বললাম, “ওর পেছনে এত লাগছ কেন তুমি? ভালোই তো বাজাচ্ছে মেয়েটা। হতে পারে, সে সেরা নয়, কিন্তু চেষ্টা তো করছে প্রাণপন।” কথাটা বলামাত্র আমি বুঝতে পারলাম, এ কথার জন্য ভুগতে হবে আমাকে।
“একেবারেই তোমার মতো।” মা বলে উঠল। “সেরা নও, কারণ সেই চেষ্টাটাই তোমার নেই।” ছোট একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে, টিভির নবটা ছেড়ে দিয়ে সোফায় গিয়ে বসলো মা।
টিভির ছোট্ট মেয়েটিও গিয়ে বসল, পিয়ানোতে আরেকটা গান বাজাবে বলে। গানটি গ্রিগের ‘আনিট্রাজ ট্যাঞ্জ’। গানটি মনে থাকার কারণ হলো, এ গানটি বাজাবার জন্য আমাকেও পরে শিখতে হয়েছিল।
‘দ্য এড সালেভান শো’ দেখবার তিনদিন পরে মা আমার পিয়ানো শেখা এবং অনুশীলন করবার রোজকার সূচি সম্পর্কে আমাকে বলল। মা মিস্টার চং-এর সাথে এ বিষয়ে কথা বলেছে, যিনি আমাদের অ্যাপার্টমেন্টের নীচতলাতেই থাকতেন। মিস্টার চং একজন অবসরপ্রাপ্ত পিয়ানো শিক্ষক। মা তার বাসায় ঘরদোর পরিষ্কার করবার কাজের বিনিময়ে সপ্তাহে একদিন তিনি আমাকে পিয়ানো শেখাবেন- এমনটাই বন্দোবস্ত করল মা। এছাড়াও প্রতিদিন বিকেলে চারটে থেকে ছ’টা পর্যন্ত, এই দুই ঘন্টা তার ওখানে প্র্যাকটিস করার জন্য একটা পিয়ানোর ব্যবস্থাও করা হলো।
মায়ের এই কথাগুলো শুনে আমার মনে হলো আমাকে যেন নরকে যাবার একটা বন্দোবস্ত করা হলো। কান্নাকাটি শুরু করে দিলাম আমি আর একটা সময়ে এমন অসহ্য লাগছিল যে মাটিতে লাথি দিতে থাকলাম পা দিয়ে।
কাঁদতে কাঁদতে আমি বললাম, “আমি ঠিক যেমন, সেই আমাকে কেন ভালোবাসতে পার না তুমি? আমি কোনো জিনিয়াস নই। পিয়ানো বাজাতে পারি না আমি। আর যদি বাজাতে পারতামও, আমি কখনোই টিভিতে বাজাতে যাব না, এমন কী তুমি যদি আমাকে দশ লাখ ডলারও দাও।”
মা কষে একটা চড় মারল আমাকে। চিৎকার করে বলে উঠল, “জিনিয়াস হতে তোমাকে কে বলেছে? তোমার সেরাটাই শুধু দিতে বলেছি আমি। এবং তোমার নিজের ভালোর জন্যই সেটা করতে বলেছি। কী ভেবেছ তুমি, আমি চাই জিনিয়াস হও তুমি? হাহ! তার কী দরকার? কে তোমাকে বলেছে হতে?”
চীনা ভাষায় মাকে বিড়বিড় করে বলতে শুনলাম। “কেমন অকৃতজ্ঞ! যেমন মেজাজ তার, সেরকম যদি প্রতিভা থাকত, এখনই সে বিখ্যাত হতে পারত।”
মিস্টার চং, আড়ালে যাকে আমি ডাকনামে ডাক্তাম ‘বুড়ো চং’, কেমন অদ্ভুত স্বভাবের মানুষ ছিলেন তিনি। সবসময় নিজের আঙুলে অদৃশ্য একটা অরকেস্ট্রার সুরের সাথে মিলিয়ে তাল ঠুকতেন। আমার কাছে তাকে বয়সে অনেক বুড়ো মনে হতো। মাথার সামনের দিককার বেশিরভাগ চুল পড়ে গিয়েছিল তার, পুরু কাঁচের চশমা পরতেন। তার চোখগুলোকে সবসময়ই ক্লান্ত আর ঘুমে ঢুলুঢুলু দেখাত। তবে তিনি ঠিক ততটা বুড়ো নন, যতটা আমি তাকে ভাবতাম। কারণ তার মায়ের সঙ্গে থাকতেন আর তখনও তিনি অবিবাহিত ছিলেন।
বৃদ্ধা লেডি চঙের সঙ্গে একবারই দেখা হয়েছিল আমার আর সেই দেখাটা পর্যন্তই যথেষ্ট ছিল। কেমন অদ্ভুত একটা গন্ধ বের হতো ওর গা থেকে; বাচ্চারা প্যান্ট নষ্ট করলে যেমন গন্ধ, তেমন। তার আঙুলগুলো মৃত মানুষের মতো ছিল, ফ্রিজের পেছনে অনেকদিনের পচে থাকা পুরনো পিচফলের মতো। চামড়াটা ধরতেই মাংসের গা থেকে আলগা হয়ে উঠে আসছিল।
বুড়ো চং কেন পিয়ানো শেখানো থেকে অবসর নিয়ে ফেলেছেন, সেটা আমি শিগগিরই বুঝতে পারলাম। তিনি কানে শুনতে পেতেন না। “বিটোফেনের মতো!” চিৎকার করে আমাকে তিনি বলতেন, “আমরা দুজনই শুধু শুনতে পাই আমাদের মাথার ভেতরে।” এরপর তিনি বাজাতে শুরু করতেন তার উন্মত্ত নীরব ‘সোনাটা।’
আমাদের শেখা আর শেখাবার প্রক্রিয়াটা চলত এভাবেই। তিনি বই খুলে বিভিন্ন নোটের দিকে দেখিয়ে, সেগুলোর কাজ বুঝিয়ে দিতেন, “কী! ট্রেবল! বেইজ! কোনো শার্প কিংবা ফ্ল্যাট নেই। এটা সি মেজর। আগে শোনো, তারপর আমার পরে বাজাও।”
এরপর খানিকক্ষণ সি স্কেল ও সাধারণ কর্ড বাজাতেন তিনি। তারও পরে তিনি কোনো এক প্রবল আকাঙ্খার অতৃপ্তি নিয়ে আরও নানা রকমের সুরের গভীরে ঢুকে বাজাতেন, তাতে ট্রিল যোগ করতেন। একটা সময়ে এসে বেস সুরের মূর্ছনায় পুরো সঙ্গীতটাই একটা জমকালো আবহ তৈরি করত।
তিনি বাজাবার পরে আমি সাধারণ সুর আর সাধারণ কর্ড ধরে বাজাতাম। এমনই আগোছালো বাজাতাম যেন মনে হতো, আস্তাকুড়ের ওপরে একটা বিড়াল অস্থির ছোটাছুটি করছে এদিকে-ওদিকে। সেটা শুনে বুড়ো চং হাততালি দিয়ে হাসতেন, আর বলতেন, “অনেক ভালো হয়েছে। কিন্তু এবার তোমাকে শিখতে হবে কীভাবে তাল রাখতে হয়।”
এভাবে একটা সময়ে আমি বুঝতে পারলাম, আমি যে সুরগুলো এত ভুলভাল বাজাচ্ছি, সেটা বুড়ো চং ধরতেই পারছিলেন না। কারণ তার চোখ খুবই ধীর গতির ছিল। অর্ধেকটা বাজাবার পরে এসে তিনি গতিটা ধরছিলেন। আমার তাল ঠিক রাখতে সাহায্য করবার জন্য তিনি আমার পেছনে এসে দাঁড়িয়ে ডান কাঁধে নীচের দিকে চাপ দিতেন, প্রতিটা তালের সাথে। এরপর যখন স্কেল আর আরপেজিও বাজানো শিখছিলাম ধীরে ধীরে, তিনি তখন আমার কব্জিটা স্থির যেন থাকে সেটার জন্য কব্জির ওপরে পয়সা রেখে ভারসাম্য রাখতেন। আমার হাতটা একটা আপেলের চারপাশে বাঁকাভাবে রাখতেন, যখন আমি স্কেল আর কর্ড বাজাতে শিখছিলাম। কেমনভাবে আঙুলগুলোকে বাধ্য সৈনিকের মতো স্টাকাটোর মতো তালে তালে উপর-নীচ করতে হয়, সেটা শেখাবার জন্য তিনি কখনও কুচকাওয়াজ করতেন আড়ষ্ঠভঙ্গিতে।
এসব কিছুই তিনি শিখিয়েছিলেন আমাকে। এবং এটাও বুঝতে পেরেছিলাম যে, আলসেমি করতে পারি আমি, ভুলভাল বাজিয়েও পার পেয়ে যেতে পারি, বিস্তর ভুল। ঠিকঠাক প্র্যাকটিস না-করার জন্য বাজাতাম ভুল সুরে আর সে ভুল শুধরে নিতাম না কখনও। ছন্দটা মাথায় রেখে বাজিয়ে যেতাম শুধু। বুড়ো চং নিমগ্ন থাকতেন ওর নিজস্ব কল্পনায়।
হতে পারে আমিই হয়তো নিজেকে সেই সুযোগটা দিইনি সত্যিকারভাবে পূর্ণ বিকশিত হবার। খুব ছোটবেলাতেই যে কোনো বিষয়ের মৌলিক জিনিসটা আয়ত্ব করে নিতে পারতাম আমি। হতে পারতাম একজন ভালো পিয়ানোবাদকও। কিন্তু কোনোরকম চেষ্টা না করবার ইচ্ছায় এবং অন্য কারো মতো না হওয়ার মানসে এতটাই দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলাম আমি যে, কান-ঝাঁঝরা করা সুরের মুখরাটা আর বেসুরো বন্দনাগীতিই বাজাতে শিখেছিলাম।
এর পরের এক বছর খুব মনযোগ দিয়ে অনুশীলন করলাম আমি। এরপর একদিন আমার কানে এলো, মা আর ওর বান্ধবী লিন্ডো জং অন্যদেরকে শুনিয়ে শুনিয়ে, জোরগলায় এবং ডাঁট-দেখানো স্বরে কথা বলছে। এই ঘটনাটা চার্চ ছাড়িয়ে ওখানে হচ্ছিল। পাশেই ইটের একটা শক্ত দেয়ালের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম আমি, পরনে সাদা পেটিকোট লাগানো একটা জামা। ওয়েভারলি—আন্টি লিন্ডোর মেয়ে, আমারই সমবয়সী, সে-ও দাঁড়িয়ে ছিল আমার ঠিক পাঁচ ফিট দূরত্বের ওপাশে একটা দেয়ালে হেলান দিয়ে। একইসাথে বেড়ে উঠেছিলাম আমরা দুজন। পরস্পরের সব অন্তরঙ্গ কথা আমরা ভাগাভাগি করে নিতাম দুই বোনের মতো। ঝগড়াও করতাম রংপেন্সিল আর পুতুল নিয়ে। অন্যদিকে, বেশি যেটা হতো,আমরা একে অপরকে ঘেন্না করতাম। আমার মনে হতো, ও অনেক অহংকারি। ‘চায়নাটাউনের কনিষ্ঠতম দাবা চ্যাম্পিয়ন’ হিসেবে বেশ খানিকটা খ্যাতি অর্জন করেছিল ওয়েভারলি জং।
সেই রোববারে আন্টি লিন্ডো আক্ষেপ ঝরিয়ে বলল, “ও বাড়িভর্তি ট্রফি নিয়ে আসে। দিনভর বসে দাবার চাল দেয়। আর ঘষেমেজে সেগুলোর ধুলো পরিষ্কার করা ছাড়া আমার আর কোনো কাজই থাকে না সারাদিন।” বলে, একটা তীর্যক দৃষ্টি ছুড়ে দিল আন্টি মেয়ের দিকে আর ওয়েভার্লি এমন একটা ভাব করল যেন সে দেখতেই পেল না।
“তোমার কপাল ভালো যে এইসব ঝুটঝামেলা তোমার নেই।” একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আমার মাকে বলল আন্টি লিন্ডো।
আমার মা তখন কাঁধ ঝাঁকিয়ে গর্ব করে বলল, “আমাদের সমস্যাটা তো আরও খারাপ, তোমারটার চেয়েও। জিং-মেইকে আমরা যখন বাসনপত্তর ধুতে বলি, সে কানে সুরের মুর্ছনা বাদে অন্য কিছুই যেন শুনতে পায় না। এমনটা মনে হয় যেন ওর এই প্রকৃতিপ্রদত্ত প্রতিভা কিছুতেই থামাতে পারবে না তুমি।”
ঠিক সেইমুহূর্তে প্রতিজ্ঞা করলাম আমি, মায়ের এই বোকাবোকা গর্ব বন্ধ করতে হবে আমাকে।
এর কয়েক সপ্তাহের মাথায় বুড়ো চং আর মা, দুজনে মিলে চার্চের একটা ‘ট্যালেন্ট শো’তে আমাকে অংশ নেয়াবার পরিকল্পনা করেন। আর ততদিনে একটা পুরনো পিয়ানো কেনার মতো যথেষ্ট টাকা আমার মা-বাবা জমিয়ে ফেলেছিল। দাগওয়ালা বেঞ্চসহ একটা ওয়ার্লিটজার স্পিনেট। এবং সেটাই ছিল আমাদের বসবার ঘরের সবচেয়ে আকর্ষণীয় জিনিস।
শুমানের ‘সিন্স ফ্রম চাইল্ডহুড’ থেকে ‘প্লিডিং চাইল্ড’ নামের একটা পিস সেই ট্যালেন্ট শো’তে বাজাবার কথা ছিল আমার। এটা একটা সোজা এবং বিষন্ন পিস ছিল, যেটা শুনতে যতটা কঠিন মনে হতো, বাজাতে ততটা নয়। কথা ছিল সম্পূর্ণ পিসটা মুখস্থ বাজাব আমি এবং সেটাকে আরো দীর্ঘায়িত করবার জন্য রিপিট অংশগুলো দু-বার করে বাজানোর কথা। কিন্তু আমি সময় নষ্ট করেছিলাম আলসেমি করে, তাই কয়েকটা লাইন বাজানোর পরে ফাঁকি দিয়ে দেখে নিতাম পরের নোটগুলো। কী বাজাচ্ছি, সেটা আদতে কখনোই আমি মন দিয়ে শুনিনি। অন্য কোনোখানে, অন্য কেউ হয়ে উঠবার দিবাস্বপ্ন দেখছিলাম আমি।
আমার সবচেয়ে বেশি ভালো লাগত ওইটা অনুশীলন করতে- দারুণভাবে অভিবাদন জানানো কিংবা নত হয়ে প্রণাম জানানোর অংশটুকু। ডান পা বাড়িয়ে সামনের মেঝেতে রাখা গোলাপটিকে স্পর্শ করে, গোলাপটিকে হাত দিয়ে স্পর্শ করে ঘুরে আসবার ওইটুকু অংশ। এরপর বাম পা ঘুরিয়ে, উপরের দিকে তাকিয়ে হাসা।
‘জয় লাক’ ক্লাবের সমস্ত দম্পতিকে আমার পরিবেশনা দেখবার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন আমার মা-বাবা। আন্টি লিন্ডো এবং আঙ্কেল টিন সেখানে গিয়েছিলেন। ওয়েভারলি আর তার বড় দুই ভাই-ও ছিল। সামনের দুটো সারি আমার চেয়ে ছোট এবং আমার চেয়ে বড় শিশুদের দিয়ে ভরা ছিল। শিশুদেরকে সুযোগ দেয়া হলো সবার আগে। ওরা সাধারণ ছড়াগান গাইল, আবৃত্তি করল, বেসুরো সুর বাজাল ছোট বেহালায়, হোলাহুপ ঘোরাল গোলাপি রঙের ব্যালে জামা গায়ে পরে। যখন তারা নত হয়ে কুর্নিশ করল, দর্শকেরা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে উঠল “অহ!” এরপর উচ্ছসিত হয়ে হাততালি দিল তারা।
এরপর যখন আমার পালা এলো, খুব আত্মবিশ্বাসী ছিলাম আমি। আমার মনে আছে, আমার ভেতরকার সেই শিশুসুলভ উত্তেজনার কথা। কোনোরকম সংশয় ছাড়াই আমি জানতাম যে, আমার অন্তর্গত যে প্রতিভাময় সত্তা, সেটার সত্যিই একটা অস্তিত্ব আছে। কোনোরকম ভয় বা নার্ভাসনেস ছিল না আমার মনে। কেবলই অনুভব করছিলাম, এটাই সেই সময়! এটাই! সামনের দর্শকের দিকে তাকালাম আমি। দেখলাম আমার মায়ের অভিব্যক্তিহীন মুখ, বাবা হাই তুলছে, আন্টি লিন্ডোর মুখে শুষ্ক হাসি আর ওয়েভারলি কেমন মনমরা হয়ে বসে তাছে। অনেক লেয়ারের লেইস লাগানো সাদা একটা ফ্রক পরণে ছিল আমার আর একটা গোলাপি রঙের ফিতে বসানো ছিল আমার ‘পিটার প্যান’ হেয়ার কাট চুলে। পিয়ানোতে যখন বসছিলাম, আমার কল্পনায় ভাসছিল, অনেক মানুষ লাফিয়ে উঠছে আনন্দে আর এড সালেভান তার টিভি শো’তে ডেকে নিয়ে সকলের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে আমাকে।
এবার বাজাতে শুরু করলাম আমি। সবকিছু মিলিয়ে সবটাই সুন্দর ছিল। নিজের সৌন্দর্যে নিজেই এত অভিভূত ছিলাম আমি যে আমার বাজনা কেমন হবে, সেটা নিয়ে কোনো চিন্তাই ছিল না আমার শুরুতে। তাই প্রথম সুরটি যখন আমি ভুল বাজালাম, বেশ অবাক হলাম আমি। আর বুঝতে পারলাম কোথাও গিয়ে ঠিকঠাক শোনাচ্ছে না বাজনাটা। আর এরপর থেকেই একের পর এক ভুলভাল সুরে বাজাতে লাগলাম। হিমশীতল একটা অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ল আমার মাথা থেকে সারা শরীরে। কিছুতেই বাজনা থামাতে পারছিলাম না আমি, যেন আমার আঙুলগুলো কারো জাদুমন্ত্রে বাঁধা। মনে মনে ভাবছিলাম, আঙুলগুলো হয়তো নিজেনিজেই ঠিক হবে—ঠিক যেমনটি করে একটা ট্রেন ভুল রেললাইনে গিয়ে নিজেই আবার ঠিক লাইনে উঠে পড়ে। সেই এলোমেলো ভুলভাল সুরটা আমি দুইবার বাজিয়ে গেলাম, পুনরাবৃত্তি করে। এবং একেবারে শেষ পর্যন্তই আমার সাথেই রয়ে গেল সেসব বেসুরো সুর।
শেষ করে যখন আমি দাঁড়ালাম, টের পেলাম আমার পা দুটো কাঁপছে। আমি বোধহয় খানিকটা নার্ভাস ছিলাম। এমন হয়েছে হয়তো বুড়ো চং-এর মতো যারা দর্শক ছিল, তারা আমার ডান হাতের আঙুলের ঠিকঠাক চলনটা দেখতে পেয়েছিল। বাজনাটাও মোটেও বেসুরো শোনেনি। আমি ডান পা-টা বাড়িয়ে, হাঁটু গেড়ে বসে, সামনের দিকে তাকিয়ে হাসলাম। ওল্ড চং বাদে পুরো ঘরটাই নীরব ছিল। একমাত্র তিনি উচ্ছ্বসিত হয়ে চিৎকার করে বলে উঠলেন, “সাধু! সাধু! দারুণ করেছ!” কিতু এরপর মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখি, তার মুখটা বিষণ্ণ। দর্শকরা খুবই মৃদুভাবে হাততালি দিল। অনেক কষ্টে আমি কান্না আটকাবার চেষ্টা করতে করতে চেয়ারের দিকে ফিরে গেলাম। শুনতে পেলাম, একটা ছেলে বেশ জোরেই ফিসফিস করে তার মাকে বলল, “খুবই বাজে হয়েছে।” শুনে ওর মা বলল, “থাক। সে তো তার চেষ্টাটুকু করেছে।”
এবং এবার আমি বুঝতে পারলাম দর্শকসারিতে আসলে কত মানুষ ছিল; আমার মনে হচ্ছিল যেন পুরো একটা পৃথিবী। শত শত চোখের আগুনঝরা দৃষ্টি যেন এসে লাগছিল আমার পিঠে এসে। আর আয়োজনের বাকি সময়টাই যখন আড়ষ্ট হয়ে বসে ছিল মা আর বাবা, তখন আমি গভীরভাবে অনুভব করতে পারছিলাম ওদের দুজনের লজ্জা আর গ্লানির কষ্ট।
আমরা বিরতির সময়ে লুকিয়ে চলে যেতে পারতাম। কিন্তু অহংকার আর অদ্ভুত অন্য কোনো আত্মসম্মানবোধ আমার মা-বাবাকে ওই চেয়ার থেকে নড়তে দেয়নি। আর এজন্যই পুরো অনুষ্ঠানটাই বসে দেখলাম আমরা। নকল গোঁফ লাগানো আঠার বছর বয়সী একটা ছেলে ম্যাজিক দেখাল সাইকেলে চড়ে এবং জ্বলন্ত রিং নিয়ে জাগলিং করল। ভারীবক্ষের সাদা মেকাপ করা একটা মেয়ে সম্মানজনক স্থান অধিকার করল ‘ম্যাডাম বাটারফ্লাই’ অপেরা থেকে একটা আরিয়া গেয়ে। এবং প্রথম পুরস্কার পেল এগার বছর বয়সী সেই ছেলেটি যে, বেহালায় কঠিন বাজনা বাজিয়ে ‘বিজি বী’র মতো আবহ সৃষ্টি করেছিল।
‘জয় লাক ক্লাব’-এর সদস্য শু, জং এবং সেইন্ট ক্লেয়ার অনুষ্ঠানটি শেষ হবার পরে এগিয়ে এলো আমার মা-বাবার দিকে।
ঠোঁটে চওড়া হাসি নিয়ে আন্টি লিণ্ডো অস্ফুট স্বরে বলল, “বাচ্চারা অনেক প্রতিভাবান।”
“সেটা আসলে অন্যরকম কিছু ছিল।” বলল আমার বাবা। আমি ভাবলাম বাবা কি কথাটা রসিকতা করে বলল, না কি আমার পারফরমেন্স তার ঠিকই মনে আছে!
ওর কাঁধটা ঝাঁকিয়ে ওয়েভারলি আমার দিকে তাকিয়ে একেবারে সোজাসাপ্টাই বলে উঠল, “আমার মতো বিশাল প্রতিভাবান তুমি তো আর নও।” আমার মনটা যদি এত খারাপ না থাকত, তাহলে নিশ্চিত আমি ওর বেনী ধরে টান দিতাম আর ঘুষি মেরে দিতাম ওর পেটের মধ্যে।
তবে আমাকে সবচেয়ে বেশি ভেঙেচুরে দিচ্ছিল আমার মায়ের মুখের অভিব্যক্তিটা; কেমন একটা শূন্য চাহনি, স্থির শান্ত—যেন তিনি সব হারিয়ে নিঃস্ব। ঠিক একইরকম অনুভূতি হচ্ছিল আমারও। মনে হচ্ছিল, সবাই যেন এদিকেই এগিয়ে আসছে, কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে উৎসাহী জনতা যেমন দেখতে আসে কী কী হারাল, ঠিক সেরকমই। আমরা যখন বাসে উঠলাম বাড়ি ফেরার জন্য, আমার বাবা গুনগুন করে সুর ভাঁজছিলেন ‘বিজি-বী’ গানটার। কিন্তু একেবারে নিশ্চুপ ছিল মা। আমি ভেবে চলেছিলাম, মা হয়তো বাড়ি ফিরবার অপেক্ষায় আছে। ফিরেই চিৎকার করে তেড়ে আসবে আমার দিকে। কিন্তু বাড়ি ফিরে বাবা দরজা খুলবার পরে মা হেঁটে সোজা পেছনে চলে গেল- নিজের শোবার ঘরে। কোনো অভিযোগ, কোনো দোষারোপ—কিচ্ছু নেই। এতে আমি খানিকটা হতাশই হয়েছিলাম। কারণ, আমি অপেক্ষায় ছিলাম মা আমার সাথে চিৎকার দিলে, আমিও উলটো চিৎকার করে কেঁদেকেটে মাকে দোষ দিতে পারব আমার সমস্ত দুঃখের জন্য।
ট্যালেন্ট শো’তে এমন ভরাডুবির পরে আমাকে কখনও পিয়ানো বাজাতে হবে না—এমনই ভেবেছিলাম আমি। কিন্তু এর দুদিন পরে, স্কুলে ছুটির পরে মা রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসে আমাকে টিভি দেখতে বলল।
“চারটা বাজে।” মা আমাকে মনে করিয়ে দিয়ে বলে উঠল। আমি একদম অবাক হয়ে গেলাম। ট্যালেন্ট শো’এর সেইসব যন্ত্রণার দিনের মধ্যে দিয়ে আবার যেতে হবে, মনে হচ্ছিল আমার। আমি আরও বেশি শক্ত হয়ে বসে রইলাম টিভির সামনে।
পাঁচ মিনিট পরে রান্নাঘর থেকে গলা উঁচিয়ে মা বলল, “টিভি বন্ধ করো।”
ঠাঁয় বসে রইলাম আমি। তখনই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম আমি যে, মায়ের কোনো কথাই আর শুনবার দরকার নেই আমার। আমি তার দাস নই। আর এটাও চীন নয়। আগে মায়ের কথা শুনে কী হাল হয়েছিল, তা আমার দেখা সারা। বোকা ছিল মা।
রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসে বসবার ঘরের দরজার আগলের সামনে দাঁড়িয়ে আবারও জোর গলায় বলে উঠল মা, “চারটা বাজে।”
“আমি আর বাজাব না।” নির্লিপ্ত স্বরে বললাম আমি। “কেন-ই বা বাজাব? এমন কোনো প্রতিভাময়ী নই আমি।”
হেঁটে এসে টিভির সামনে এসে দাঁড়াল মা। তাকিয়ে দেখলাম, রাগের চোটে তার বুক ওঠানামা করছে।
আমি বলে উঠলাম, “না।” আগের চেয়ে আরো বেশি তেজি মনে হলো নিজেকে; যেন আমিটা আমার আসল সত্তা বেরিয়ে এলো ভেতর থেকে।
“না।” চিৎকার করে বললাম আমি।
মা আমার হাতটা ধরে এক হ্যাঁচকা টানে মেঝে থেকে উঠিয়ে নিয়ে টিভিটা বন্ধ করে দিল। অদ্ভুত এক শক্তি তাকে ভর করেছিল। আমাকে খানিকটা টেনে, খানিকটা বয়ে পিয়ানোর দিকটায় নিয়ে যাচ্ছিল আর আমি তখন মেঝের ছড়ানো কার্পেট লাথি দিয়ে দিয়ে সরাচ্ছিলাম। এরপর মা আমাকে উপরের দিকে তুলে বসিয়ে দিল পিয়ানোর বেঞ্চে। ততক্ষনে আমি কান্নাকাটি শুরু করে দিয়েছিলাম আর ক্ষুব্ধ হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে রইলাম। মায়ের বুকটা তখনও ওঠানামা করছিল আর তার মুখটা হা হয়ে ছিল। এমন পাগলের মতো হাসছিল মা, যেন আমার কান্না দেখে সে খুব পুলকিত।
“আমি সেই মানুষটি নই, যা তুমি আমাকে বানাতে চাও। যেমন মেয়ে তুমি চাও, আমি কখনোই সেরকম মেয়ে হতে পারব না।” ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে আমি বললাম।
“হ্যাঁ, মেয়ে মাত্র দুই ধরণের হয়।” চীনা ভাষায় চেঁচিয়ে বলে উঠল মা। “একটা হলো অনুগত মেয়ে। আরেকরকম হলো, যে তার মনমতো চলে। এ বাড়িতে কেবল একধরণের মেয়ে থাকতে পারবে। অনুগত মেয়ে।”
“তাহলে সেটাই আমি চাইতাম, আমি যদি তোমার মেয়ে না হতাম আর তুমিও আমার মা না হতে।” চিৎকার করে বললাম আমি। যদিও অনেক ভয় করছিল কথাটা বলবার সময়ে। এমন মনে হচ্ছিল যে, আমার বুকের ভেতর থেকে সব কেঁচো, ব্যাং আর পিচ্ছিল কিছু বেরিয়ে আসছে। কিন্তু সাথে এটাও অনেক ভালো লাগছিল, যাক, অবশেষে আমার এই ভয়াবহ চেহারাটাও দেখা গেল।
আমার মা তখন তীক্ষ্ণ গলায় বলে উঠল, “সেটা বদল করবার জন্য এখন অনেকটা দেরি হয়ে গেছে।”
এবার তার রাগ চরম আকার ধারণ করছে, সেটা বুঝতে পারছিলাম আমি। আর কখন তা ফেটে পড়ে, এটাই দেখতে চাইছিলাম। ঠিক সে মুহূর্তে আমার মনে এলো, চীনে মায়ের হারিয়ে ফেলা সেই কন্যাশিশু দুজনের কথা। তাদের কথা আমরা কখনোই আলাপ করতাম না। আমি তখন চিৎকার করে বলে উঠলাম, “সেটাই ভালো ছিল, যদি আমি একেবারে জন্মই না নিতাম; কিংবা মরে যেতাম, ওদেরই মতোন।”
ঘটনাটা এমন হলো যেন মনে হলো আমি কোনো জাদুমন্ত উচ্চারণ করেছি। আলাকাজাম! ঠিক তখুনি মায়ের চেহারাটা ফ্যাঁকাশে হয়ে গেল, মুখটা হাঁ হয়ে গেল, হাত দুটো অবশ হয়ে গেল। সে একেবারে হতবাক হয়ে গিয়ে ঘরের পেছন দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিল; যেন বাদামি ছোট ছোট পাতার মতো উড়ে যাচ্ছিল—হালকা, মচমচে, মরামরা পাতা।
আমাকে নিয়ে মা যা অনুভব করত, তারমধ্যে এটাই একমাত্র হতাশা ছিল, তা নয়। পরের বছরগুলোতে প্রত্যেকবার নিজের ইচ্ছেকে প্রতিষ্ঠিত করতে আর তার প্রত্যাশা পূরন করতে ব্যর্থ হবার অধিকারকে যতবার জানান দিয়েছিলাম; ততবার মা হতাশ হয়েছিল। আমি সরাসরি এ গ্রেড পাইনি। ক্লাস প্রেসিডেন্ট হইনি আমি। স্ট্যানফোর্ডেও ভর্তির সুযোগ পাইনি। পড়ালেখা ছেড়ে দিয়েছিলাম কলেজ থেকেই।
আমার মায়ের বিশ্বাসের মতো আমি যেটা চাই, সেটাই হতে পারি—এই বিশ্বাস ছিল না আমার। আমি কেবল সেটাই হতে পারি, আমি যা।
তারপরে এতগুলো বছর বাদেও আমরা কখনো কথা তুলিনি আমার সেই রিসাইটাল বা পিয়ানো বেঞ্চে বসে বাজাবার সেইসব ব্যর্থতা নিয়ে। সমস্তটাই অমীমাংসিত রয়ে গেল এতদিন, যেন মুখে উচ্চারণ করা যায় না এমন এক বেইমানি এটা। তার কাছে জানতে চাইবার কোনো উপায়ই আমি খুঁজে পাইনি কখনও, কেন সে এতটা উচ্চাকাঙ্ক্ষা করেছে যার ব্যর্থতা অনিবার্য ছিল।
এর ভেয়েও ভয়ঙ্কর বিষয় যা আমাকে ভীত করে তুলেছিল, তা হলো আর কখনোই মাকে জিজ্ঞেস করতে পারিনি—সে কেন সকল আশা হারিয়ে ফেলেছিল।
পিয়ানো বাজানো নিয়ে সেই যে দুজনের টানাপোড়েন, তারপর থেকে মা কখনোই আমাকে আর পিয়ানো বাজাবার কথা বলেনি। বন্ধ হয়ে গেল পিয়ানোর চর্চা। পিয়ানোর ঢাকনা বন্ধ হবার সাথেসাথে সবকিছুই আড়ালে চলে গেল—ধুলোবালি, আমার কষ্ট আর মায়ের স্বপ্ন, সব।
আমাকে অবাক করে দিল মা। ক’বছর আগে, আমার তিরিশতম জন্মদিনে সেই পিয়ানোটা মা আমাকে উপহার দিতে চাইল। মাঝের এতগুলো বছর ছুঁয়েও দেখিনি আমি পিয়ানোটা। মায়ের এই চাওয়াটাকে আমি ক্ষমা করে দেবার চিহ্ন হিসেবে নিলাম। বিশাল এক বোঝা যেন নেবে গেল।
আমি বিনীতভাবে জানতে চাইলাম, “তুমি নিশ্চিত তো? বাবা আর তুমি এটাকে মিস করবে না তো?”
মা ঋজুস্বরে বলল, “না, এই পিয়ানোটা তোমারই। সবসময়ের জন্যই এটা তোমার। কেবল তুমিই এটা বাজাতে পার।”
আমি বললাম, “এটা ঠিক। তবে খুব সম্ভবত আমি আর কখনো বাজাতে পারব না। অনেকগুলো বছর পেরিয়ে গেছে।”
“খুব দ্রুত শিখে নিতে পার তুমি।” এমনভাবে কথাটা বলল মা যেন তিনি একেবারে নিশ্চিত এ বিষয়ে। “জন্মগত প্রতিভা নিয়ে তুমি জন্মেছ। তুমি একজন জিনিয়াস হয়ে উঠতে পারতে, যদি তুমি চাইতে।”
“না, আমি সেটা পারতাম না।”
মা বলল, “চেষ্টা করছ না তুমি।” এটা বলবার সময়ে মা রেগেও ছিল না, আবার বিষণ্ণও ছিল না। কথাটা মা এমনভাবে বলল যে, এটা তেমনই এক সত্য বয়ান, যা মিথ্যে হয়ে যাবে না কোনোদিন। বলল, “নাও এটা।”
কিন্তু প্রথমে আমি সেটা নিইনি। মা এটা দিয়েছে, এটুকুই যথেষ্ট ছিল আমার জন্য। এবং এরপর থেকে মা-বাবার বসবার ঘরে জানালার পাশে যখনই পিয়ানোটিকে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় দেখতাম, আমার কেমন গর্ব লাগত, যেন আমি জিতে এনেছি এমন কোন উজ্জ্বল ট্রফি এটা।
গত সপ্তাহে আমি একজন টিউনারকে পাঠিয়েছিলাম বাবার অ্যাপার্টমেন্টে। পুরোপুরি আবেগী হয়েই মেরামত করিয়ে নিয়েছিলাম পিয়ানোটাকে। আমার মা কয়েক মাস আগে মারা গেছেন। একটু একটু করে ঘরের জিনিসগুলো সব গুছিয়ে রাখছিলাম বাবার জন্য। বিশেষ একটা রেশমী থলেতে গয়নাগুলো রাখলাম। মথ-প্রতিরোধী একটা বাক্সে মায়ের বোনা সেই হলুদ, গোলাপি আর উজ্জ্বল কমলারঙের সোয়েটারগুলো গুছিয়ে রেখেছিলাম—যেগুলো মোটেও পছন্দ ছিল না আমার। পুরনো চীনা সিল্কের কিছু জামা খুঁজে পেলাম, যেটার পাশে ছোট ছোট চেরা ছিল। পুরনো রেশমের কাপড়গুলো আমার গালের দু’পাশে ঘষতে লাগলাম, আর সিদ্ধান্ত নিলাম, সেগুলো টিসু কাগজে মুড়িয়ে আমার নিজের বাসায় নিয়ে যাবার।
পিয়ানোটা টিউন করবার পরে ঢাকনাটা উঠিয়ে ওর রিডগুলোতে স্পর্শ করলাম। আমার মনে হলো, আগের চেয়ে এটার সুর এখন আরও বেশি সমৃদ্ধ। বাস্তবিক, এটা ছিল খুবই ভালো একটা পিয়ানো। বেঞ্চের ভেতরে ছিল পুরনো একটা খাতা যেটায় স্কেলগুলো হাতে লেখা। আর ছিল হলুদ টেপ দিয়ে জোড়াতালি দিয়ে লাগানো মলাটের পুরনো গানের খাতা।
শুম্যান-এর বইটা খুলে, রিসাইটালে আমি বাজিয়েছিলাম যে ছোট্ট ডার্ক পিসটা, সেটা বের করলাম। বইয়ের বাম দিকের পাতায় ‘প্লিডিং চাইল্ড’ নামে এটা ছিল। আগের চেয়েও বেশি কঠিন মনে হলো এটা আমার কাছে। তবে আমি অবাক হয়ে গেলাম যে, কয়েকবার বাজাতেই অনেক সহজ লাগতে লাগল সুরগুলো।
আমার তখন মনে হলো, ডানদিকের অংশটি এই প্রথমবার খেয়াল করলাম আমি। এর শিরোনাম ছিল, ‘পারফেক্টলি কন্টেনটেড।’ এটাও আমি চেষ্টা করেছিলাম বাজাতে। আগেরটার মতোই এটা বহমান ছন্দের হলেও এটি ছিল হালকা সুরের এবং বাজাতেও সহজ। ‘প্লিডিং চাইল্ড’ ছোট্ট কিন্তু ধীর লয়ের ছিল। আর ‘পারফেক্টলি কন্টেনটেড’ ছিল দীর্ঘ কিন্তু দ্রুত লয়ের। কয়েকবার বাজাবার পরে আমার উপলব্ধি হলো, দুটোই ছিল একই গানের আলাদা দুটো অংশ। ·
লেখক পরিচিতি : এমি ট্যান-এর জন্ম ১৯ ফেব্রুয়ারি, ১৯৫২। স্বনামধন্য আমেরিকান ঔপন্যাসিক। তিনি মূলত চীনা-আমেরিকান পরিবার, অভিবাসী অভিজ্ঞতা, এবং মা-মেয়ের সম্পর্কের জটিলতা নিয়ে লেখা উপন্যাসের জন্য বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। ১৯৮৯ সালে প্রকাশিত তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘দ্য জয় লাক ক্লাব’ তাঁকে রাতারাতি আন্তর্জাতিক খ্যাতি এনে দেয়। তাঁর অন্যান্য জনপ্রিয় উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে ‘দ্য কিচেন গডস ওয়াইফ’, ‘দ্য হানড্রেড সিক্রেট সেন্সেস’, এবং ‘দ্য বোনসেটারস ডটার।’


0 মন্তব্যসমূহ