শনিবার, ৯ আগস্ট, ২০১৪

বিরহিলিও পিনিয়েরা'র গল্প : মাংস

অনুবাদ : বিকাশ গণ চৌধুরী

ভূমিকা--বিরহিলিও পিনিয়েরার জন্ম: ১৯১২ সালের ৪-ঠা আগস্ট,মৃত্যু: ১৮-ই অক্টোবর,১৯৯৭। কুবা বা আমাদের চালু কথায় ‘কিউবা’-র এই লেখক একাধারে নাটককার,ঔপন্যাসিক,ছোট-গল্প-লেখক, কবি এবং প্রাবন্ধিক। পিনিয়েরা তাঁর নাটকের জন্য বিখ্যাত হলেও,তাঁর অনুরাগীরা তাঁর ছোটগল্প ও কবিতাগুলোকেই নাটকেরর ওপর স্থান দেন। পিনিয়েরা ১৯৫০ সালে আর্হেন্তিনা (বা আর্জেনটিনা )-য় চলে যান,সেখানে তাঁর পরিচয় হয় বোর্খেস (বা বোর্হেস )-এর সঙ্গে,বোর্খেসের ‘সুর’ পত্রিকায়প্রকাশিত হয় তাঁর লেখা। ১৯৫৭ সালের বিপ্লবের পর দেশে ফেরেন,কিন্তু ১৯৬১ সালেই ‘রাজনৈতিক এবং অনৈতিকতার’ অপরাধে তাঁকে জেলে পোরা হয়। জেল থেকে ছাড়া পাবার পর একজন প্রান্তিক মানুষ হিসেবেই বাকি জীবনটা কাটান। যদিও ১৯৬৯ সালে তাঁর ‘দুটি প্রাচীন আতঙ্ক’ নাটকের জন্য কুবার সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্য পুরস্কার ‘কাসা দু লাস আমেরিকা ’ পান। পিনিয়েরার লেখায় এক কল্প-জগতের পাশাপাশি আমরা পাই এক ভয়ের,এক আতঙ্কের জগৎ,এক মানসিক বৈকল্যের জগৎ;আর এসবের পরতে পরতে লুকিয়ে থাকা নানান রাজনৈতিক ভাষ্যের। তাঁর গল্পসংগ্রহ ‘ঠান্ডা কাহিনি’-র অন্তর্ভুক্ত এরকমই একটি গল্প,বাংলা অনুবাদে আপনাদের সামনে রাখা গেল।
----------------------------------------------------------------------------------------------
ঘটনাটা ঘটেছিল কোনরকম অজুহাত ছাড়াই, সাদামাটাভাবেই। কারণটা বিস্তারিতভাবে বলার দরকার নেই, শহরে মাংসের অভাব চলছিল। সবাইকে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছিল, তবু উল্টোপাল্টা সব কথাবার্তা শোনা যাচ্ছিল; বদ্‌লা নেবার কথাও হচ্ছিল। কিন্তু, যেমনটা হয় আর কি, প্রতিবাদ-ট্রতিবাদ হুমকির ওপর গেল না, আর খুব তাড়াতাড়িই সেই ক্লিষ্ট-ক্লিন্ন শহরবাসী গোগ্রাসে নানারকম শাক-সব্জি গিলতে শুরু করল।


শুধু বাবু অ্যান্‌সালডো সময়ের মতো করে চলল না। খুব শান্তভাবে ও রান্নাঘরের একটা বড় ছুরি নিয়ে ধার দিতে লাগল; আর তারপর প্যান্টটা হাঁটু পর্যন্ত নামিয়ে, নিজের বাঁ-পাছার থেকে একটা দারুন হাড়-ছাড়া পাতলা মাংসের টুকরো কেটে নিল। তারপর টুকরোটাকে ভালো করে ধুয়ে, নুন আর ভিনিগার মাখিয়ে সিদ্ধ করে সবশেষে একটা বড় তাওয়ায় ভাজল, প্রত্যেক রোববারে মেক্সিকান্‌ ওমলেট,তোর্‌তিয়া, যেমনভাবে ও ভাজে। এরপর খাবার-টেবিলে এসে বসে তারিয়ে-তারিয়ে খেতে শুরু করল। আর ঠিক তক্ষুনি, দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ : অ্যান্‌সালডোর প্রতিবেশী তার হতাশা ওগরাতে এসেছে ... অ্যান্‌সালডো এক অভিজাত ভঙ্গীতে তার প্রতিবেশীকে সেই মাংসের টুকরোটা দেখাল। আর যখন তার প্রতিবেশী ওটা নিয়ে প্রশ্ন করলো, অ্যান্‌সালডো খালি ওর বাঁ-পাছাটা দেখিয়ে দিল। সত্যটা প্রকাশ হয়ে গেল। অভিভূত আর উদ্বুদ্ধ হয়ে অ্যান্‌সালডোর সেই প্রতিবেশী কোন কথা না বলে সেই শহরের মেয়রকে নিয়ে ফিরে আসার জন্য চলে গেল। মেয়র অ্যান্‌সালডোকে তাঁর সুতীব্র ইচ্ছের কথা জানালেন যে তিনি চান তাঁর প্রাণপ্রিয় শহরবাসীরা যেন অ্যান্‌সালডোর মতোই নিজেদের ব্যক্তিগত সংগ্রহ, নিজের নিজের মাংস থেকে নিজেদের পুষ্টিসাধন করে। বিদ্বদজনদের বিস্তর চেঁচামেঁচির পরও আলোচ্য বিষয়টার তাড়াতাড়িই সমাধান হয়ে গেল, অ্যান্‌সালডো শহরের প্রধান চত্তরটায়, তার স্বভাবসুলভ বাচনে - “জনসাধারনের জন্য একটা প্রয়োগগত চাক্ষুষ প্রমাণ ” দিতে গেল।

ওখানে দাঁড়িয়ে অ্যান্‌সালডো ঝলমলে আংটায় ঝোলানো মাংস রঙের প্লাস্টারের পাছা দেখিয়ে বোঝালো ঠিক কি ভাবে প্রত্যেকটি মানুষ তার নিজের নিজের বাঁ-পাছা থেকে দুটি হাড়-ছাড়া পাতলা মাংসের টুকরো কেটে নিতে পারে। ও দেখালো কি ভাবে একটা নয়, দুটো পাতলা মাংসের টুকরো কেটে নিতে হবে, ও নিজে বাঁ-পাছা থেকে সুন্দর একটা টুকরো কেটেছিল কারণ এক টুকরোর কম কারো খাওয়া উচিৎ নয়। এ বিষয়টা পরিষ্কার হয়ে যাবার পর প্রত্যেকে তাদের বাঁ-পাছা থেকে দুটো করে পাতলা মাংসের টুকরো কেটে নিতে থাকল। সে এক চমৎকার দৃশ্য, কিন্তু এও অনুরোধ করা হল যেন এইসবের বিবরণ বাইরে না বেরোয়। এই শহর কতদিন এই মাংসের সুফল ভোগ করতে পারবে তা হিশেব করে দেখা হল। একজন বিখ্যাত ডাক্তার ভবিষ্যতবাণী করলেন যে কোন একজন লোকের ওজন যদি একশো পাউন্ড (নাড়ি-ভুঁড়ি আর খাওয়া যায় না এরকম সব অঙ্গ বাদে) হয় তবে সে রোজ আধা পাউন্ড হিশেবে খেলে একশো চল্লিশ দিন পর্য্যন্ত খেতে পারবে। পুরো লোকঠকানো একটা হিশেব। তবে মাথাব্যথার কারণ ছিল একটাই যে যার নিজের মাংসের সুন্দর টুকরোটাই খেতে পারবে। কিছুদিনের মধ্যেই মহিলারা বাবু অ্যান্‌সালডোর ভাবনার সুবিধের দিকগুলো নিয়ে আলোচনা করতে লাগল। যেমন, যেসব মহিলারা লোভীর মতো তাদের দুদুগুলো খেয়ে ফেলেছিল তাদের আর উর্ধাঙ্গ ঢাকার কাপড়ের প্রয়োজন রইল না, নাভির ওপর অবধি ঢেকেই তাদের পোষাক শেষ হল। কয়েকজন মহিলা -- যদিও তাদের সবাই নয় -- আর একদমই কথা বলতে পারল না, কারণ তারা গব্‌গব করে তাদের জিভ খেয়ে ফেলেছিল (যা কিনা, প্রসঙ্গক্রমে, রাজ-রাজড়াদের খুব উপাদেয় খাবার ছিল)। রাস্তায় দারুণসব দৃশ্য দেখতে পাওয়া গেল : দুজন মহিলা অনেকদিন পরে দেখা হবার পরও পরষ্পরকে চুমু খেতে পারছিল না : কারণ তারা দুজনেই তাদের ঠোঁটগুলো দিয়ে দারুনসব পিঠে বানিয়ে ফেলেছিল। জেলখানার প্রধান অপরাধীর মৃত্যুদন্ডের কাগজে সই করতে পারছিল না কারণ তিনি তার আঙুলের ডগার মাংসল অংশগুলো খেয়ে ফেলেছিলেন, যা কিনা সবচেয়ে “খাইয়ে”-দের (যাদের মধ্যে জেলখানার প্রধানও একজন) কথায় “আঙুল চেটে খাওয়া” এই বিখ্যাত প্রবাদটার জন্ম দিয়েছিল।

কিছু ছোটোখাটো প্রতিরোধ হয়েছিল। মেয়েদের পোষাক তৈরির শ্রমিক ইউনিয়ান তাদের আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ বিধিসম্মত কতৃপক্ষের কাছে নথীভূক্ত করিয়েছিল, যার উত্তরে তারা জানিয়েছিল যে এমন কোন শ্লোগান তৈরি করা সম্ভব নয় যাতে মহিলারা দর্জিদের আবার পৃষ্ঠপোষকতা করতে পারে। তবে এইসব প্রতিবাদের কোন মূল্যই ছিল না, আর কোনভাবেই তা শহরের লোকজনদের তাদের নিজেদের মাংস খাওয়ায় বিঘ্ন ঘটাচ্ছিল না।

সবচেয়ে রঙিন ঘটনাগুলোর মধ্যে একটা ছিল শহরের ব্যালে-নর্তকের শেষ মাংসখন্ড ব্যবচ্ছেদের মনোরম উপাখ্যানটা। তার শিল্পের প্রতি শ্রদ্ধায় সে শেষ পর্যন্ত তার পায়ের বুড়ো আঙুলগুলো বাঁচিয়ে রেখেছিল। আর তার প্রতিবেশীরা বেশ কিছুদিন ধরে ওর মধ্যে একটা প্রচন্ড চঞ্চলতা লক্ষ্য করছিল। শেষমেশ ওর এক পায়ের বুড়ো আঙুলের মাথার দিকের মাংসল অংশটা টিঁকে ছিল। এরকম একটা সময় ও ওর এক বন্ধুকে ওটাকে কাটবার জন্য ডাকল। আর সেই রক্তাক্ত নৈঃশব্দের মধ্যে, সে সেই শেষ অংশটা কাটল, আর, তখনিই, ওটাকে গরমও হতে না দিয়ে, ও ওটাকে সেই গর্তে পুরল যেটা একসময় ওর সুন্দর মুখ ছিল। উপস্থিত সকলে হঠাৎই ভীষণ গম্ভীর হয়ে পড়ল।



কিন্তু জীবন চলতেই থাকে, আর এটাই জরুরী। আর যদি, দৈবক্রমে ...? আর এই কারণেই কি সেই নর্তকের জুতো এখন চিরস্মরণীয় কীর্তিমানদের যাদুঘরের একটা ঘরে শোভা পাচ্ছে ? একমাত্র নিশ্চিত এটাই যে শহরের সবচেয়ে মোটা লোকটা (যার ওজন চারশো পাউন্ডেরও বেশী, খেতে দারুন ভালোবাসত ভাজাভুজি আর চকলেটের মন্ডা, আর হজমক্রিয়ার জন্য দরকার পড়তো প্রচুর খাবার) তার খরচা করার মতো নিজের শরীরের সমস্ত মাংস পনেরো দিনের এক ছোট্ট সময়ের মধ্যে শেষ করে ফেলেছিল। তারপর কিছুক্ষণ পর থেকে কেউ তাকে কোথাও খুঁজে পেল না। এটা স্পষ্ট, ও লুকিয়েছিল ... কিন্তু ও একাই নয়, আদপে অনেকেই ওর রাস্তায় হেঁটেছিল। আর একদিন সকালে ওরফিলা মাসিমা ওনার ছেলেকে (যে কিনা তখন ওর বাঁ-কানটা রসিয়ে খাচ্ছিল) কোন একটা জিনিস ও কোথায় রেখেছে প্রশ্ন করে কোন উত্তর পেলেন না। অনুরোধ-উপরোধ, ভয় দেখানো কোনটাতেই কোন কাজ হলো না। হারিয়ে যাওয়া লোক খুঁজে দেওয়ায় অভিজ্ঞ একজনকে ডেকে আনা হল, কিন্তু ওরফিলা মাসিমা দিব্যি গেলে ওনার আদরের ছেলে যেখানটায় জিঞ্জাসাবাদের সময় বসেছিল বলে জানালেন সেখানে একতাল জানোয়ারের হাগু ছাড়া তিনি আর কিছুই খুঁজে বার করতে পারলেন না। কিন্তু এইসব ছো্টোখাটো ঝামেলা শহরবাসীর সুখের কিস্যুই করতে পারল না। আর কি ভাবেই বা একটা শহর খাবারের ব্যাপারের অসন্তোষ থেকে তার পিঠ বাঁচাতে পারে ? এটাই কি মাংসের অভাবে সৃষ্টি হওয়া আইন-শৃঙ্খলার সংকটের একটা নিশ্চিত সমাধান নয় ? এই যে দিনের পর দিন লোকজন চোখের সামনে থেকে উবে যাচ্ছে, এটাই তো মূল বিষয়টার উপসংহার, আর লোকজন তো তাদের অবশ্যপ্রয়োজনীয় পুষ্টিসাধনের এই ব্যাপারে যাকে বলে দৃঢ়সংকল্প। এই উপসংহারে পৌঁছতে কি সবাইকে বাধ্য করা হচ্ছে না ? কিন্তু এরকম বেয়াড়া প্রশ্ন করা তো একটা তুচ্ছ ব্যাপার হবে যখন চিন্তাশীল সুশীল সমাজ ভালোভাবেই খেতে পাচ্ছে।

গল্পকার পরিচিতি : 
বিরহিলিও পিনিয়েরা (Virgilio Piñera) একজন কিউবান লেখক, নাট্যকার, কবি ছোটো গল্পকার ও প্রবন্ধকার। তাঁর জন্ম ৪ আগস্ট, ১৯১২। মারা যান ১৮ অক্টোবর ১৯৭৯।
তিনি দীর্ঘদিন আর্জেন্টিনার বুয়েনেস আয়ারসে প্রবাস জীবন কাটিয়ে কিউবাতে ফেরেন ১৯৫৮ সালে বিপ্লবের মাসখানেক আগে।
তাঁর গল্পের সঙ্কলনের নাম cold tales.

অনুবাদক পরিচিতি
বিকাশ গণ চৌধুরী

আদি নিবাস কুমিল্লা জেলার বুড়িচং গ্রাম হলেও, পাহাড় ঘেরা একটা ছোট্ট শহর দেরাদুনে ১৯৬১ সালে জন্ম, ছোটবেলার অনেকটা সেখানে কাটিয়ে বড় হওয়া কলকাতায়, চাকরিসূত্রে অনেকটা সময় কেটেছে এলাহাবাদ আর মধ্যপ্রদেশের রায়পুরে। বর্তমানে কলকাতার বাসিন্দা... লেখেন কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ; ফরাসি, হিস্পানি, ইংরেজি প্রভৃতি ভাষা থেকে অনুবাদ করেছেন মন্‌পসন্দ নানান লেখা, সম্প্রতি শেষ করেছেন পাবলো নেরুদার শেষ কবিতার বই ‘El libro de las preguntas’ –এর পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ ‘প্রশ্ন-পুঁথি’। দীর্ঘদিন যুগ্মভাবে সম্পাদনা করেছেন সবুজপত্র ‘বিষয়মুখ’।

1 টি মন্তব্য:

  1. মাত্রাহীন বীভতসতা... অতিরঞ্জন শেলের মতো বিঁধছে - অসহনীয়।


    শ্রাবণী দাশগুপ্ত।

    উত্তরমুছুন