শুক্রবার, ১০ অক্টোবর, ২০১৪

কল্লোল লাহিড়ীর গোরা নকশাল : পর্ব ছয়

কল্লোল লাহিড়ীর গোরা নকশাল : পর্ব পাঁচ



ছয়

“ও আলোর পথ যাত্রী...এযে রাত্রী...এখানে থেমো না...”

এমনিতেই পড়াশুনো আমার ধাতে সয় না। তার ওপর গরমের ছুটি। সকালে একপাতা হাতের লেখা আর সন্ধ্যেবেলা ঢুলতে ঢুলতে দাদার পাশে বসে কোনো মতে কয়েকটা ভাগ, দুই তিনটে যোগ আর মুষ্টিমেয় আনা খানেক গুণ করলেই আমাকে আর দেখে কে। মা সরস্বতী তখন আমার এ্যালুমোনিয়ামের পড়ার বাক্সে বন্দি। আর নকশাল তখন গরমের চোটে নীচের বারান্দায় নামা দূর অস্ত, দানা পানি খেতেও ভুলে যায়। কন্টিদের বাড়ির ছোটো পেয়ারা গাছটার ওপর বসে থাকে। আর মাঝে মাঝে একটু একটু উড়ে গিয়ে পুকুরপাড়ে বিজয় কাকুদের জামরুল গাছে কচি ডাঁসা জামরুলের পাশে বসে পুকুরের হাওয়া খায়। কাজেই কারো আর নজরে পড়ে না টুকনু পড়ছে কিনা। জাত শত্রু নকশালও ভুলে যায় তার নিত্যনৈমিত্তিক বজ্জাতি গুলো। সচরাচর যেগুলো সে আমার সাথে করে থাকে সেগুলোয় কোথাও যেন ছেদ পড়ে। আমার পড়ার এ্যালুমনিয়ামের বাক্সে তার সবুজ হাগু বন্ধ হয়। আমাকে তখন গঙ্গার ঘাট ডাকে। পাপ্পুদের চিলেকোঠা ডাকে। মণির পাশে কাসুন্দি পাহাড়া দিতে দিতে গরমের দুপুরে মণির দেশের সেই পুকুর পাড়ের ফলসা গাছ ডাকে। আমার চোখে ঘুম নামে না। আমি ঘুমিয়ে পড়ি না। জানো না আমারও ঠিক কয়েকদিন পরেই দাদার মতোই ঠোঁটের নীচে কালো একটা রেখা বেরোবে। আর আমিও গম্ভীর হয়ে কে সি নাগের অঙ্ক বই খুলে বসে বসে অঙ্ক কষবো।


মণি হাসে। তাল পাতার পাখাটা আমার মাথার ওপরে আরো জোরে জোরে নাড়ে। কপালের ওপর এসে পড়া অবাধ্য চুলগুলোকে সরিয়ে দেয়। আর মাঝে মাঝেই নজর রাখে কাসুন্দির ওপর। রোদ সরে গেলে কাঁচের বয়াম আবার রোদের কাছে নিয়ে যাবে মণি। দাদা বলেছে মণির কেউ নেই। ও কিছু বোঝে না। কারোর কোনোদিন কেউ নেই এমনটা হয় নাকি? এই তো আমি আছি...বাবা আছে...মা আছে...ঠাম্মা আছে...হাঁদা আছে...তুই আছিস...। দাদা বলে তাও। মণির কেউ নেই। মণির বর নেই। মণির বাচ্চা নেই। মণির কলাপোতা নেই...মণির খুলনা নেই...। দেখিসনা মণি কেমন চুপ করে থাকে। দেখিস না মণি কেমন জপ করার সময় কাঁদে? দাদার অদ্ভুত যুক্তি গরমের সকালে আমার পানষে লাগে। বলি তোর মন্ডু আর আমার মাথা...। জপ করার সময় মণি কাঁদে না। ঠাকুরের সাথে কথা বলে। তাই তো মণি মাথায় ফুঁ দিয়ে জ্বর সারিয়ে দেয়। ঘাড়ের ওপর হাত বুলিয়ে ব্যাথা কমিয়ে দেয়। কাঁদে! ইশ...ঠুলি ঠিক বলে...। সব সময় অঙ্ক করলে আর সব সময় ক্লাসে ফাস্ট হলে বুদ্ধি কমে যায়। দাদা রেগে যায়। চিতকার করে বলে ওই দেখো মা...ভাই আবার ঠুলিদের সাথে মিশছে। উলটো দিকের রান্নাঘর থেকে ভেসে আসে মায়ের গলা দাঁড়া এবার ওকে কোমড়ে দড়ি পড়াতে হবে। আমি ভয় পাই। ছুট্টে বেরিয়ে যাই ঘর থেকে। কোমড়ে দড়ি ওরা সুশান্তকেও পড়িয়ে ছিল। আর পিটতে পিটতে পুলিশের ভ্যানে তুলেছিল। সুশান্তকে তারপর থেকে আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। সুশান্তকে খুঁজে চলেছে মরিয়া হয়ে সবাই। জুটমিলের শ্রমিকরা হাঁদার দোকানের সামনে পোষ্টার দিয়েছে। পুলিশে ধরা...পুলিশের কাছ থেকেই ভ্যানিশ হয়ে যাওয়া সুশান্তর হারিয়ে যাওয়া ব্যাপারে খোঁজ খবর নিয়েছে। কেউ কিছু বলতে পারেনি।

“মেরে ফেলেছে”...আমার দিকে না তাকিয়েই এই অমোঘ কথাটা আমাকে বলেছিল ঠুলি গঙ্গার ঘাটে পয়সা কুড়োতে কুড়োতে। মাটির মালসার একটা দিক ভেঙে জল ছেঁচে ছেঁচে পয়সা তোলে ঠুলি। দশ আনা, পাঁচ আনা যাই পায় মুখের মধ্যে পুড়ে দেয় টুপ করে। লজেন্স খাওয়ার মতো দুই দিকের গাল ফুলে ওঠে খুচরো পয়সায়। সেই পয়সা ঠুলি কিছুটা জমায় সামনের বিশ্বকর্মা পুজোয় মাঞ্জা দেবে বলে আর কিছুটা পয়সায় সে রোজ মিঠাই বরফ খায়, সকালবেলা মুড়ি চানাচুর খায়। কখোনো কখোনো কাশির দোকান থেকে তেঁতুলের আচার কেনে। আমাকে দেয়। ঠুলি এখন আমার বন্ধু। দাদা...মা কেউ পছন্দ করে না ব্যাপারটা। তাই লুকিয়ে, চুরিয়ে কাউকে না বলে আমি ঠুলির সাম্রাজ্যে প্রবেশ করি। আর করবো নাই বা কেনো? ঠুলির ওপর যে আমার অগাধ আস্থা! আমাকে সে এনে দেবে বলেছে পায়রা ধরার ফাঁদ। যে ফাঁদে আমি টুপ করে বজ্জাত নকশালটাকে ধরবো আর ওই বিশালদের বড় হুলোটাকে খাওয়াবো। ঠুলি হাসে। তার বড় বড় চোখ গুলো নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বলে “টুকনু...তুই তো পুলিশ গুলোর থেকেও বেল্লিক মাইরি...! শালা...কি নিষ্ঠুর তুই...!” আমিও ছাড়ি না। “মাইরি...শালা...” এই শব্দগুলো খারাপ, দাদা বলেছে! ঠুলি আরো জোরে হাসে। আর আমি বেল্লিক না। নিষ্ঠুরও না। ও আমার পড়ার বাক্সে কেন রোজ হাগবে? ঠুলি বলে কে? ওই পায়রাটা? হা হা হা...ও তো শালা তোর দাদার সাথে থাকতে থাকতে হেবি গান্ডু হয়ে গেছে মাইরি...! বলেই আবার জিভ কাটে। আমি চিৎকার করে বলি দেখলি তো...দেখলি...! আবার গালাগালি দিচ্ছিস। তারপর তোর সাথে থাকতে থাকতে আমারও গালাগালি দিতে ইচ্ছে করবে...আর তখন আমাকে আমার মা বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেবে! ঠুলি হঠাৎই চুপ করে যায়। কিছু বলে না। মাথা নীচু করে ঘাড় গুঁজে বসে থাকে ঠুলি। আমি হাত দিয়ে মাথা ধরে ঝাঁকাই। এই ঠুলি...এই ঠুলি...কী হলো? ঠুলি মুখ তোলে। এই গরম কালেও বর্ষার মেঘের মতো তার চোখের ওপর ভার নেমেছে জলের। আমার থেকে বছর কয়েকের বড় ঠুলি তখন কেমন যেন আনমনা। ঠুলি বলে...তাও তোকে তোর মা বাড়ি থেকে বের করে দেবে বলেছে। আর আমার মাতো কোন সেই ছোট্টবেলায় আমাকে রেখে কোথায় চলে গেছে...! গাল বেয়ে জল নামে ঠুলির। ঠুলির মা নেই...বাবা নেই...ঘর নেই...কেউ নেই! ঠুলি থাকে লালবাবা আশ্রমে। সেখানে রোজ রাতে বাসন মাজার পর প্রসাদী রুটি সুজি খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। তাহলে ঠুলিও কী রোজ রাতে মণির মতো চোখের পাশ দিয়ে জল বের করে? ঠুলি কি তাহলে মণির মতো?

ঠিক সেই সময়েই পোঁ করে সাইরেন বেজে ওঠে। দুজনের কান সজাগ হয়। এটা তো জুটমিলের সাইরেন নয়। আর জুটমিল তো বন্ধ! তাহলে? ঠুলি বলে ভরা কোটালের সাইরেন। তার মানে গঙ্গায় এক্ষুনি জোয়ার আসবে। বড় বড় ঢেউ...। আছড়ে পড়বে আমাদের ঘাটে। ওই দূরে ওপারের কাঁচের মন্দিরে... দক্ষিণেশ্বরের কালি বাড়ির পাড়ে...। ছুট...ছুট...ছুট...। আমি আর ঠুলি ঊর্ধশ্বাসে দৌড় দিই। গঙ্গার ধারে তখন মেলা লোকের ভিড়। সবাইকে সরিয়ে একদম পাড়ের কাছে গিয়ে দাঁড়াই। ঢেউয়ের পরে ঢেউ গিয়ে লাগছে আমাদের ঘাটের সিঁড়িতে। আছড়ে পড়ছে গঙ্গার ঢেউ। কেউ তাদের মধ্যেই বলে উঠছে...চিৎকার করছে জয় মা গঙ্গা...জয় মা গঙ্গা...। আর গঙ্গার ঘোলা জল ঘুরে ঘুরে পাক খেতে খেতে আছড়ে পড়ছে সিঁড়িতে। সেই গরমের দুপুরের গঙ্গার জলের ছিটে এসে লাগছে আমার বুকে...আমার মুখে...আমার ছোট্ট বেলার হারিয়ে যাওয়া দিন গুলোতে। কিন্তু ওটাকি? ওই তো...ওই তো জলের সাথে ঘুরে ঘুরে এগিয়ে আসছে। গুঞ্জন ওঠে ঘাটের মধ্যেই। একটা মানুষ না? ভিড়ের মধ্যে পাঁচুর ঠাকুমা গুরাকু দিয়ে দাঁত মাজতে মাজতে বলে ওঠে। আহার রে...কার বাছা আবার জলে ডুবলো...ওগো তোমরা কেউ কিছু করো গো...বাঁচাও গো...। কেউ শোনে না পাঁচুর মার কথা...। বেশ দূরে...বেশ দূর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে দেহটা...। পঞ্চনন তলার হরি মিত্র এসেছিল ঘাটে স্নান করতে। পঞ্চায়েতের সদস্য সে। কিছুদিন আগেই হাত চিহ্নে ভোট দিন বলে চিতকার করতে করতে মিছিল করে যেত। আমাদের বাড়ির সামনে বড় পাঁচিলটায় লিখেছিল “দিনের বেলায় কৌটো নাড়ায়/ রাতে করে ফিস্ট/ তারাই আবার চেঁচিয়ে বলে/ আমরা কমিউনিস্ট।” লোকটাকে কেউ দু-চক্ষে দেখতে পারে না। কানা ঘুঁশো শোনা যাচ্ছে জুটমিল বন্ধ হওয়ার পেছনে লোকটার একটা লম্বা হাত আছে।

গরমের রাতে দাদার কাছে জানতে চেয়েছিলাম মানুষের লম্বা হাত কী করে হয় রে? তাহলে একবার চেষ্টা করে দেখবো ব্যাপারটা। তখন আর আঁকশি দিয়ে বিজয় কাকুদের জামরুল পাড়তে হবে না। কন্টিদের বাড়ির পেয়ারা গাছে চুপি চুপি লম্বা হাতে পেয়ারা পেড়ে নেব। দাদা মাথায় গাট্টা মারে। টনটন করে ওঠে মাথা। চিৎকার করতে গেলেই ফিসফিস করে বলে ওঠে মাকে কিন্তু বলে দেব...আজ তুই ঠুলির সাথে কোথায় গিয়েছিলিস। বলে দেব রোজ তুই ঠুলির সাথে শ্মশান ঘাটে গিয়ে পয়সা কুড়োস। আমি কথা বলি না। চোখের কোনে বিন্দু বিন্দু বঙ্গোপসাগরের নিম্নচাপ নিয়ে ঘুমিয়ে পড়ি। ঘুমের মধ্যে কেউ আসে না। শুধু দেখি হরি মিত্র তার লম্বা হাত দিয়ে বিজয় কাকুর গাছের সব কচি ডাঁসা জামরুল পেড়ে নিচ্ছে। আর বলছে লম্বা হাতের উপকারিতার কথা। আমাদের বাড়িতে ভোট চাইতে এসে তার লম্বা হাতটা বের করে বলছে ভুলে যাবেন না রবি বাবু...কংগ্রেস সরকার আপনাদের মতো রিফিউজিদের জন্য অনেক করেছে! লম্বা হাত গুটিয়ে চলে যাচ্ছে হরি মিত্র। কিন্তু কোথায় যাচ্ছে? ওই তো দাঁড়িয়ে সে। গঙ্গার ঘাটে হম্বিতম্বি করছে। খবরদার...খবরদার বলছি কেউ নামবে না জলে। কার না কার লাশ...। তার জন্য দরদ একেবারে উথলে পড়ছে গো...। হরি মিত্র গলা চড়ায়...গুড়াকুর নেশায় পাঁচুর ঠাকুমা তার থেকেও বেশি চিতকার করে থুথু ছিটিয়ে বলে ...আহারে কার ঘরের বাছা রে...ওরে কেউ কি ওকে বাঁচাবি নারে...। হরি মিত্র ধমকে ওঠে। আহঃ মলো বুড়ি...দেখছো না গন্ধ উঠে গিয়েছে? সত্যি ঠিক তখনি পচা গন্ধে চারপাশ ভরে যাচ্ছে। বুড়ি তবু থামছে না...আহা গো লাশের তো ঘর থাকে গো...। তারও তো মা থাকে গো...দেখো না গো...জোয়ান ছেলেটা গো...। ওর বুঝি কেউ নেই গো...। বিলাপের মতো শোনায় পাঁচুর ঠাকুমার গলা। মণির কেউ নেই...ঠুলির কেউ নেই...ওই যে ওই দেহটা ভেসে যাচ্ছে ওর কেউ নেই...? ভাবনা গুলো যখন জট পাকাচ্ছে আমার হাফপ্যান্ট পড়া শৈশবের গঙ্গার ঘাটে ঠিক তখনি সঙ্গে সঙ্গে কান্ডটা ঘটাচ্ছে ঠুলি।

সেই বিশাল ঢেউয়ে ফুঁসে ওঠা গঙ্গায় তিন ভল্টে ঝাঁপ দিচ্ছে ঠুলি। সবাই আঁক করে উঠছে। অনেক গভীরে ঝাঁপ দিয়ে...অনেকটা ডুব সাঁতার আর মরিয়া স্রোতে টানতে টানতে কাকে যেন নিয়ে আসছে ঠুলি ঘাটের ধারে। পাড়ার বেশ কিছু লোক তখন নেমে পড়েছে আরো কিছুটা জলে। মরে যাবে তো ছেলেটা। কে বলোতো ছেলেটা? আরে ওই যে দীন দুঃখী লালবাবাতে থাকে। ওদের কি আবার মা বাবার ঠিক আছে? যাদের মা বাবার ঠিক নেই...তাদের মা গঙ্গাও বড় ভালোবাসে। না হলে ওই রকম প্রচন্ড জলের তোড়ে...ওই রকম ভয়ঙ্কর স্রোতে কী করে সাঁতার কাটতে পারে ঠুলি? মা গঙ্গা ফিরিয়ে দেয় ঠুলিকে...ঢেউয়ের পর ঢেউ বেয়ে হাতে ধরা একটা জামার খুট শুদ্ধু দেহ টেনে এনে ঘাটের সিঁড়িতে শুইয়ে দেয় ঠুলি। আর ঠিক তখনি। গরমের দুপুরে...লু বইতে থাকা গ্রীষ্মের পরিমন্ডলে আমার চোখের সামনে ঘটে যায় আমার জীবনের প্রথম মর্মান্তিক বিপর্যয়। আমি এই প্রথম...আমার খুব ভালোলাগা...ভালোবাসার মানুষের মৃতদেহ দেখি চোখের সামনে। আমি কিছু বলতে পারিনা। আমি একটা মিছিলকে দেখি। গান গাইতে গাইতে এগিয়ে চলেছে যে মিছিল। এক সাথে গাইছে সবাই “ও...আলোর পথ যাত্রী...এযে রাত্রী...এখানে থেমো না...”। মিছিলের সামনে বড় লাল পতাকাটা কেউ যেন উঁচু করে ধরে আছে। কেউ যেন আমার দিকে তাকিয়ে মোটা কাঁচের চশমার আড়ালে বলছে “ও তাহলে এই টুকনু”? কেউ যেন মাকে বলছে “বাচ্চাদের মারবেন না...ছোটদের মারতে নেই।” পুলিশের মারে লুটিয়ে পড়ছে ছেলেটা। ছিটকে পড়ছে তার চোখ থেকে চশমা? পুলিশের ভ্যানে তাকে দুমড়ে মুচড়ে উঠিয়ে দিচ্ছে কয়েকটা নরখাদক পুলিশ...। আমি কুড়িয়ে নিচ্ছি ভাঙা চশমাটা। ও যে খালি চোখে দেখতে পায় না কিছু...। ছেলেটা হাসছে। তার কষ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে রক্ত। তার মধ্যেই ছেলেটা আমার থেকে চশমা নিয়ে বলছে “বিদায় কমরেড...দেখা হবে আপনার সাথে আগামী বসন্তে।” কানের কাছে গরম হাওয়ায় আমার সাড় ফেরে। ঠুলি কানের কাছে মুখ নিয়ে এসেছে। ফিসফিস করে বলে...একি রে...এই ছেলেটা তোদের বাড়ি এসে ছিল না? মিছিল করছিল না? এই ছেলেটাকে পুলিশ এসে ধরে নিয়ে গিয়েছিল না? আমি তখনো ঠায় তাকিয়ে লাল গেঞ্জি...। কালো প্যান্ট...। গলার কাছে হাঁ হয়ে থাকা খাদ্য নালীর দিকে। ছেলেটার চোখে শুধু চশমাটুকু নেই। ওরা কি জানে না চশমা ছাড়া সুশান্ত দেখতে পায় না?

গঙ্গার ঘাটে ভিড় বাড়তে থাকে। জুটমিলের লোকজন এসে হাজির হয়। আর সব শেষে যে লোকটা আসে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে তাকে তোমরা সবাই চেনো। এতোদিনে চিনে গেছো। সে আমার গোরা নকশাল। থমকে দাঁড়ায় লোকটা সুশান্তর ফুলে যাওয়া দেহটার সামনে। বিড়বিড় করে বলে “মেরে ফেললো?” চকিতে নজর পড়ে আমার দিকে। টুকনু...! তুই এখানে? আমি কেমন যেন হয়ে যাই। আমি নড়তে পারি না। আমি হাঁটতে পারি না। আমি এগিয়ে যেতে পারিনা গোরা নকশালের কাছে। নিজেই এগিয়ে আসে লোকটা। কোলে তুলে নেয়। আমার চোখ দিয়ে তখন নেমে আসছে গঙ্গার ধারা। ভিজে যাচ্ছে গোরা নকশালের সাদা পাঞ্জাবি...। এই দুপুরে বাড়ি থেকে কেউ বেরোয়? জানতে চায় গোরা নকশাল আমার কাছে। আমি পাল্টা প্রশ্ন করি... কেন মরে গেলো সুশান্ত? গোরা নকশাল উত্তর দেয়। কখন থেকে বসে আছি তুই আসবি...। সুশান্ত কেন সাঁতার কাটতে পারলো না? এবার গোরা নকশাল ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়। দেখে চিকচিক করছে টুকনুর চোখ। চিকচিক করছে টুকনুর গাল। ভর দুপুরে পূর্ণিমার জ্যোৎস্না এলো কোথা থেকে? এই জ্যোৎস্নার আলোকিত ভুবনকেই কি খুঁজে বেড়াচ্ছিল গোরা নকশালরা? এই জ্যোৎস্নার রাতেই তো ছেড়ে দিয়েছে বলে দাবী করেছিল পুলিশ? এই জ্যোৎস্নার রাতেই তো বাড়ি ফিরে আসার কথা ছিল সুশান্তর। খাতায় সই ছিল। সুশান্তর বেরিয়ে যাওয়ার সাক্ষী ছিল...কিন্তু সুশান্ত ঘরে ফিরে আসেনি। তাহলে কী হলো পরিবর্তনের? কী হলো রাইটার্সের মাথায় লাল পতাকা উড়িয়ে? কী হলো জীবনের দশটা বছর জেলের পেছনের অন্ধকারে কাটিয়ে। পা ভেঙে...। অসুস্থ হয়ে...। প্রিয়াংশুর মতো বন্ধু হারিয়ে? ছেলেটার মুখের ওপর মাছি বসছে দেখেছিস টুকনু? যারা প্রতিবাদের কথা বলে...যারা প্রাপ্য চাহিদার কথা বলে...যারা বলে ফিরিয়ে দাও আমাদের অধিকার...আমাদের স্বাধীনতা...আমাদের দুবেলা দু-মুঠো অন্নের অধিকার...তাদের প্রতিবার...প্রতি জনসমুদ্রে এইভাবেই ভাসিয়ে দেওয়া হয়...এইভাবেই বার বার কন্ঠ নালী কেটে...রক্তের গঙ্গায় বিসর্জন দেওয়া হয়...। গোরা নকশাল আস্তে আস্তে নামিয়ে দেয় টুকনুকে কোল থেকে। বাড়ি চলে যাও টুকনু...। আর ভুলে যেও না...তুমি সুশান্তকে দেখেছিলে। কোনোদিন ভুলে যেও না...তোমার সুশান্তকে কারা যেন মেরেছিল।

বাহঃ...বেশ...মাথায় ফট্টি পড়াচ্ছেন তো দেখছি এই বাচ্চা ছেলেটার...। জেলেও আপনারা শুধরোলেন না। কেউ পালালো বিদেশে...কেউ মরলো...আর কিছু পড়ে রইলো হাত পা ভেঙে হ্যান্ডিক্যাপট হয়ে...। হাসালেন মাইরি আপনারা নকশালরা...। হরি মিত্র ভিজে গা মুছতে মুছতে চলে যায়। গোরা নকশাল কিছু বলে না। গাছের ছায়ায় বসে পড়ে। বিকেল হতে শুরু করেছে। পাশের সন্ধ্যামণির গাছটায় আস্তে আস্তে ফুল ফুটছে। বাবা এসে সামনে দাঁড়ায় গোরা নকশালের। গোরা নকশাল তাকিয়ে থাকে। স্কুল থেকে ছুটে এসেছে বাবা। সুশান্ত আর নেই? গোরা নকশাল বলে ওঠে...গাছেরা ঘুমিয়ে পড়লে ফুলেরাও আজকাল ঘুমিয়ে পড়ে রবিদা...। ওই দেখ...আর একটা ফুল ঘুমিয়ে পড়লো। সুশান্তর দিকে তখন অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে মাথায় জবজবে তেল মাখা আমার ফাস্ট হওয়া দাদা। যে একদিন সত্যিই প্রেসিডেন্সি কলেজে সুশান্তর মতো ভর্তি হবে। আমাকে খুঁচিয়ে মনে করাবে কতদিন আগে গঙ্গার ঘাটে পড়ে থাকা এক লাশের কথাকে। আমাকেও হাঁটতে হবে স্মৃতির মিছিলে। আমাকেও বলতে হবে ভুলে যাইনি সুশান্ত তোমাকে। অনেক রাতে দাদা এসে বলবে...চারু মজুমদারের এই বইটা পড়েছিস ভাই? আর ঠিক তখনি কোথাও যেন চটকলের খুন হয়ে যাওয়া চৌকিদারের বিধবা বৌ এগিয়ে আসে। সুশান্তর সেই ভিজে গায়ের ওপর হাত বোলায় সে। তারপর বলে ঠান্ডা লাগছে আমার বাবুয়ার...। ওর ঠান্ডা লাগছে। ওরে আমার বাবুয়ার ঠান্ডা লাগে...। কেউ এসে সুশান্তর গায়ের ওপর বিছিয়ে দেয় একটা লাল রঙের পতাকা। কারা যেন গুমরে গুমরে গেয়ে ওঠে... “হাম ভুখ সে মরনে বালো...ইয়া মৌত সে ডরনে বালো...আজাদিকা ঝান্ডা উঠাও...।” মিছিলটা আস্তে আস্তে একটা অজগর সাপের মতো চেহারা নেয়। ঠুলিকে খুঁজে বেড়াই আমি...। কোথাও খুঁজে পাই না তাকে। অত ভিড়ে। পাবো কী করে? সে তখন মিছিলের এক্কেবারে সামনে। একটা বড় লাল পতাকা হাতে...। ঠুলির চোখে কি জল? না ঠুলির চোখে জল নয়...ঠুলির চোখে তখন সুশান্তর স্বপ্ন...। এক খুন হয়ে যাওয়া মৃত কমরেডের কাছ থেকে এটাই তার একমাত্র উত্তরাধিকার।




লেখক পরিচিতি
কল্লোল লাহিড়ী

কল্লোল লাহিড়ী গল্প লেখেন। টিভিতে সিরিয়ালের কাহিনীর নির্মাতা।

২টি মন্তব্য: